পরীক্ষা কোড: ২০২ | বিষয় কোড: ২০৩২০৪ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৫৩
اختبار السنة الثانية للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ۲۰۲۱
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
বিভাগ: দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ (الدعوة والدراسات الإسلامية)
বিষয়: আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ (السيرة النبوية)
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
مجموعة (الف) [‘ক’ অংশ – রচনামূলক প্রশ্নাবলি]
أجب عن أربعة من مجموعة (الف) (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও): মান: ১৫ × ৪ = ৬০
(পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ ও সর্বোচ্চ প্রস্তুতির স্বার্থে ‘ক’ অংশের ৬টি প্রশ্নেরই বিশদ সমাধান নিচে প্রস্তুত করা হলো):
١- اكتب الحالات الإجتماعية والدينية والخلقية للعرب قبل الإسلام-
[১. ইসলামপূর্ব যুগে আরবের সামাজিক, ধর্মীয় ও চারিত্রিক অবস্থা লেখ।]
ভূমিকা
ইসলামের আলো উদ্ভাসিত হওয়ার পূর্ববর্তী ঐতিহাসিক সময়কালকে ইসলামী পরিভাষায় ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞতা ও মূর্খতার যুগ বলা হয়। ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীর সূচনালগ্নে সমগ্র আরব উপদ্বীপ সামাজিক অবক্ষয়, ধর্মীয় বিভ্রান্তি এবং নৈতিক স্খলনের চরম অতল গহ্বরে নিমজ্জিত ছিল। বিশ্বশান্তির অগ্রদূত হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নবুওয়ত লাভের প্রাক্কালে আরবের সামাজিক, ধর্মীয় ও চারিত্রিক অবস্থা নিম্নে পর্যালোচনা করা হলো:
১. সামাজিক অবস্থা (الحالة الاجتماعية)
- গোত্রীয় বিভেদ ও অন্ধ আসাবিয়্যাহ (العصبية القبلية): জাহেলী সমাজে কোনো কেন্দ্রীয় সরকার, রাষ্ট্রীয় সংবিধান বা বিচার ব্যবস্থা ছিল না। মানুষ বিভিন্ন যাযাবর গোত্রে বিভক্ত ছিল। গোত্রীয় অন্ধ পক্ষপাতিত্ব (আসাবিয়্যাহ) ছিল সমাজের মূল চালিকাশক্তি। ন্যায়-অন্যায় বিচার না করে নিজ গোত্রের অন্ধ সমর্থন করাকে কর্তব্য মনে করা হতো। সামান্য তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বংশ পরম্পরায় যুদ্ধ চলত (যেমন—বসূসের যুদ্ধ দীর্ঘ ৪০ বছর এবং বুআসের যুদ্ধ ১২০ বছর স্থায়ী হয়েছিল)।
- নারীর চরম অবমূল্যায়ন ও অধিকারহীনতা: সমাজে নারীদের কোনো মর্যাদা, মানবিক অধিকার বা সম্পত্তির উত্তরাধিকার ছিল না। নারীদের ভোগ্যপণ্য মনে করা হতো এবং পিতার মৃত্যুর পর সৎপুত্ররা পিতার বিধবা স্ত্রীদের উত্তরাধিকার সূত্রে দখল করত।
- কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া (وأد البنات): আরবরা কন্যাসন্তানের জন্মকে অপমান ও দারিদ্র্যের কারণ মনে করত। পাষাণ হৃদয়ে তারা নিষ্পাপ কন্যাসন্তানদের মরুভূমির বালুর নিচে জীবন্ত প্রোথিত করত। পবিত্র কুরআনে এই বর্বরতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে: ﴿وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأُنْثَىٰ ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ … أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ﴾ (সূরা আন-নাহল: ৫৮-৫৯)।
- বহুবিবাহ ও জঘন্য পারিবারিক প্রথা: পুরুষরা অবাধে যত ইচ্ছা বিবাহ করত। নিকাহে বাগল, নিকাহে ইস্তিবা’ (সন্তানের বীরত্ব কামনায় অন্যের সাথে স্ত্রীকে সহবাসে পাঠানো) এবং মুত’আ বিবাহের মতো জঘন্য ব্যভিচার সমাজে বৈধ রীতি হিসেবে চালু ছিল।
- অমানুষিক দাসপ্রথা: ক্রীতদাসদের পশুর চেয়েও অধম মনে করা হতো। তাদের কোনো মানবাধিকার ছিল না। মনিব ইচ্ছামতো দাস-দাসীদের হত্যা বা নির্যাতন করতে পারত এবং নারীদের দিয়ে জোরপূর্বক ব্যভিচার করিয়ে অর্থ উপার্জন করত।
২. ধর্মীয় অবস্থা (الحالة الدينية)
- তাওহীদের বিস্মৃতি ও পৌত্তলিকতার প্রসার: হযরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আলাইহিমাস সালাম)-এর খাঁটি একত্ববাদী দ্বীন কালক্রমে বিস্মৃত হয়ে পড়ে। আমর ইবনে লুহাই আল-খুজায়ী প্রথম সিরিয়া থেকে আরবে মূর্তিপূজা আমদানি করে। পবিত্র কাবা ঘরকে তারা ৩৬০টি মূর্তির আখড়ায় পরিণত করেছিল। তাদের প্রধান প্রধান মূর্তি ছিল হুবাল, লাত, মানাত, উযযা, সুওয়া ও ইয়াগূস।
- কুসংস্কার ও ভাগ্য গণনা (الأزلام والكهانة): আরবরা যে কোনো কাজ শুরু করার আগে গণক ও জ্যোতিষীদের নিকট যেত এবং কাবার সামনে রক্ষিত তিনটি তীরের (আযলাম) মাধ্যমে ভাগ্য পরীক্ষা করত।
- প্রকৃতিপূজা ও জ্বিনপূজা: বহু গোত্র সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র (যেমন শা’রা তারকা), এমনকি বৃক্ষ ও পাথরের পূজা করত। চলার পথে সুন্দর পাথর দেখলে পূজা করত, আর পাথর না পেলে ছাগলের দুধ দিয়ে বালুর পিণ্ড তৈরি করে তা পূজা করত।
- আখেরাত অস্বীকার: অধিকাংশ আরব পুনরুত্থান ও পরকালকে অসম্ভব মনে করে প্রত্যাখ্যান করত। তারা বলত: ﴿مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ﴾ (সূরা আল-জাসিয়াহ: ২৪)।
- হানিফ সম্প্রদায়: চরম পৌত্তলিকতার মাঝেও হাতেগোনা কয়েকজন সত্যসন্ধানী ব্যক্তি মূর্তিপূজা বর্জন করে ইব্রাহিমী তাওহীদের সন্ধান করতেন; তাঁদের ‘হানিফ’ (যেমন—যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েল, ওয়ারাক্বা ইবনে নওফেল) বলা হতো।
৩. চারিত্রিক অবস্থা (الحالة الخلقية)
জাহেলী যুগের আরবদের চরিত্রে নেতিবাচক স্খলনের পাশাপাশি মরুভূমির জলবায়ুপ্রসূত কিছু প্রশংসনীয় মানবিক গুণাবলিও বিদ্যমান ছিল:
- চারিত্রিক স্খলন ও পঙ্কিলতা:
- মদ্যপান ও জুয়া (الميسر والخمر): মদ ও জুয়া ছিল তাদের দৈনন্দিন সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মদ ছাড়া কোনো আতিথেয়তা কল্পনা করা যেত না এবং জুয়ায় বাজি ধরে নিজেদের পরিবার ও সম্পদ বিলিয়ে দিত।
- লুটতরাজ ও রক্তপাত: দুর্বল কাফেলা আক্রমণ করে ধনসম্পদ ছিনিয়ে নেওয়াকে তারা সাহসিকতার প্রতীক মনে করত।
- প্রতিহিংসা পরায়ণতা: অন্যায়ের প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত মদ বা তেল স্পর্শ না করার কঠোর শপথ গ্রহণ করত।
- প্রশংসনীয় ও মহৎ গুণাবলি:
- অতুলনীয় মেহমানদারি ও দানশীলতা (الكرم والضيافة): মরুভূমির অন্ধকারের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে রাখত যাতে পথহারা মুসাফির এসে আতিথেয়তা গ্রহণ করতে পারে (যেমন হাতেম তাঈ-এর বদান্যতা)।
- প্রতিশ্রুতি রক্ষা (الوفاء بالعهد): জীবন দিয়ে হলেও তারা অঙ্গীকার ও আশ্রয় প্রার্থনাকারীর নিরাপত্তা রক্ষা করত।
- সাহসিকতা ও তেজস্বিতা (الشجاعة والنخوة): যুদ্ধক্ষেত্রে পিছু হটাকে তারা চরম লজ্জা মনে করত।
- অনন্য কাব্য প্রতিভা ও বাগ্মিতা (الفصاحة والبيان): তারা ভাষার অলঙ্কার ও কাব্যের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গভীর গর্ব করত।
٢- اكتب واقعة هجرة النبى صلى الله عليه وسلم من مكة الى المدينة- بين أهميتها فى التاريخ الإسلامى-
[২. মহানবি (স) এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঘটনা লেখ। ইসলামের ইতিহাসে এর গুরুত্ব আলোচনা কর।]
১. মক্কা থেকে মদীনায় ঐতিহাসিক হিজরতের প্রেক্ষাপট ও ঘটনা
মক্কায় দীর্ঘ ১৩ বছর কুরাইশদের অসহনীয় নির্যাতন, শি’আবে আবু তালিবে তিন বছরের বন্দিদশা এবং তায়েফের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার পর মদীনার আনসারদের সাথে আক্বাবার ঐতিহাসিক শপথ (বায়’আতুল আক্বাবাহ) অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে মদীনায় ইসলামের উন্মুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত হয় এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দেন।
দারুন নদওয়ায় কুরাইশদের গুপ্তহত্যা ষড়যন্ত্র:
মুসলমানরা নিরাপদে মদীনায় আশ্রয় নিচ্ছে দেখে কুরাইশ নেতারা তাদের সংসদ ভবন ‘দারুন নদওয়া’য় এক জরুরি বৈঠকে বসে। সেখানে ইবলিস নজদীয় বৃদ্ধের বেশে উপস্থিত হয়ে পরামর্শ দেয়—কুরাইশের প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী যুবক নির্বাচন করতে হবে এবং তারা সবাই মিলে একযোগে মুহাম্মদ (সা.)-কে হত্যা করবে। এতে বনু হাশিম সমগ্র কুরাইশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে না পেরে রক্তপণ নিতে বাধ্য হবে।
ঐশী নির্দেশনা ও হযরত আলী (রা.)-এর আত্মত্যাগ:
আল্লাহ তা’আলা জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে রাসূল (সা.)-কে এই ষড়যন্ত্রের সংবাদ জানিয়ে হিজরতের অনুমতি দেন: ﴿وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ﴾ (সূরা আল-আনফাল: ৩০)। হিজরতের রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে নিজের সবুজ চাদর পরিয়ে স্বীয় বিছানায় শুয়ে থাকার নির্দেশ দেন, যাতে তিনি মক্কাবাসীর নিকট রক্ষিত আমানতগুলো পরদিন তাদের কাছে নিরাপদে ফেরত দিতে পারেন।
কুরাইশদের বেষ্টনী ভেদ ও সাওর গুহায় আশ্রয়:
কুরাইশ ঘাতকরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাড়ি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সূরা ইয়াসীনের প্রথম আটটি আয়াত তিলাওয়াত করে তাদের মুখে ধূলি নিক্ষেপ করেন। আল্লাহ তাদের দৃষ্টি অন্ধ করে দেন এবং তিনি নির্বিঘ্নে তাদের মধ্য দিয়ে বের হয়ে হযরত আবু বকর (রা.)-এর বাড়িতে পৌঁছান। সেখান থেকে তাঁরা দক্ষিণ দিকে গিয়ে সাওর পর্বতের গুহায় (غار ثور) আশ্রয় নেন। সেখানে তাঁরা তিন দিন অবস্থান করেন। কুরাইশরা গুহামুখ পর্যন্ত পৌঁছে গেলেও মাকড়সার জাল ও কবুতরের ডিম দেখে ফিরে যায়। এ সময় আতঙ্কিত আবু বকর (রা.)-কে অভয় দিয়ে রাসূল (সা.) বলেন: ﴿لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّـهَ مَعَنَا﴾ (ভয় পেয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন – সূরা আত-তাওবাহ: ৪০)।
মদীনার পথযাত্রা ও পৌঁছানো:
১লা রবিউল আউয়াল পথপ্রদর্শক আবদুল্লাহ ইবনে উরায়ক্বিতের সাহায্যে তাঁরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় পথ ধরে মদীনাভিমুখে রওনা হন। পথিমধ্যে সুরাকা ইবনে মালিক তাঁদের বন্দী করতে এসে অলৌকিকভাবে তার ঘোড়ার পা বালিতে দেবে যায় এবং সে তওবা করে ফিরে যায়। ৮ই রবিউল আউয়াল তাঁরা মদীনার উপকণ্ঠ কুবায় পৌঁছেন এবং সেখানে ইসলামের প্রথম মসজিদ ‘মসজিদে কুবা’ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১২ই রবিউল আউয়াল রাসুলুল্লাহ (সা.) মদীনায় প্রবেশ করেন। বনু নাজ্জারের বালিকা ও মদীনাবাসী «طَلَعَ الْبَدْرُ عَلَيْنَا ¤ مِنْ ثَنِيَّاتِ الْوَدَاعِ» সঙ্গীতের মাধ্যমে তাঁকে সংবর্ধনা জানায়।
২. ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব ও তাৎপর্য
- মক্কী দুর্বলতা থেকে মাদানীয় সার্বভৌমত্বে রূপান্তর: হিজরত নিছক কোনো দেশত্যাগ ছিল না; বরং তা ছিল নিপীড়িত অবস্থা থেকে এক স্বাধীন, সার্বভৌম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ।
- হিজরী সনের প্রবর্তন: খলিফা হযরত ওমর (রা.) সাহাবাদের সাথে পরামর্শক্রমে হিজরতের বছর থেকেই ইসলামী সন গণনা শুরু করেন, যা মুসলিম উম্মাহর চিরন্তন স্বকীয়তার প্রতীক।
- আইন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পূর্ণতা: হিজরতের পরই সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি, জিহাদ, উত্তরাধিকার আইন এবং যাকাত-হজ্জের মতো সামাজিক ও আন্তর্জাতিক বিধানসমূহ অবতীর্ণ হয়।
- বিশ্বভ্রাতৃত্বের অনুপম দৃষ্টান্ত (المؤاخاة): মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যে আত্মত্যাগী ভ্রাতৃত্ব কায়েম হয়েছিল, তা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন।
- বিশ্বজয়ের ভিত্তি স্থাপন: হিজরতের মাধ্যমেই ইসলাম মক্কার সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক ধর্মে রূপান্তরিত হয়, যা পরবর্তী এক দশকের মধ্যে সমগ্র আরব উপদ্বীপে শান্তি ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।
٣- عرف وثيقة المدينة مع بيان خمسة عشر بندًا مهمًا منها-
[৩. মদিনা সনদের পরিচয় দাও এবং এই সনদের পনেরটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বর্ণনা কর।]
১. মদিনা সনদের পরিচয় ও ঐতিহাসিক পটভূমি (تعريف وثيقة المدينة)
সংজ্ঞা: ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদীনায় হিজরতের পর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবগঠিত মদীনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মুসলিম (মুহাজির ও আনসার), ইহুদি এবং অন্যান্য অমুসলিম গোত্রসমূহের সাথে পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করেন, তাকে ইতিহাসে ‘মদীনা সনদ’ (وثيقة المدينة বা دستور المدينة) বলা হয়।
পটভূমি ও গুরুত্ব: তৎকালীন মদীনায় আওস ও খাযরাজ গোত্রের শতাব্দীপ্রাচীন রক্তক্ষয়ী সংঘাত (যেমন বুআসের যুদ্ধ) এবং প্রভাবশালী ইহুদি গোত্রসমূহের (বনু কায়নুকা, বনু নাযীর, বনু কুরায়যা) পারস্পরিক অবিশ্বাস বিদ্যমান ছিল। এই সনদ ছিল বিশ্ব ইতিহাসের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান, যা একটি বহু-সাংস্কৃতিক ও বহু-ধর্মীয় সমাজকে অভিন্ন রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছিল। মূল সনদে ৪৭টি (মতান্তরে ৫৩টি) সুনির্দিষ্ট ধারা সন্নিবেশিত ছিল।
২. মদীনা সনদের ১৫টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধারা (خمسة عشر بندًا مهمًا)
নিম্নে মদীনা সনদের ১৫টি ঐতিহাসিক ও মৌলিক ধারা আলোচনা করা হলো:
- অভিন্ন জাতি গঠন (أمة واحدة): সনদে স্বাক্ষরকারী সকল পক্ষ (কুরাইশ মুহাজির, মদীনার আনসার এবং তাদের অনুসারী সকল সম্প্রদায়) অন্যান্য সকল মানুষ থেকে পৃথক হয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রীয় জাতি (উম্মাহ) গঠন করবে।
- রক্তপণ ও বন্দিমুক্তি: কুরাইশ মুহাজির এবং আনসারদের সকল গোত্র তাদের প্রচলিত ন্যায়সঙ্গত রীতি অনুযায়ী নিজেদের মধ্যকার রক্তপণ (দিয়াত) পরিশোধ করবে এবং নিজ বন্দীদের মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত করবে।
- অসহায় ও ঋণগ্রস্তের সহায়তা: মুমিনগণ কোনো ঋণগ্রস্ত ও অসহায় ব্যক্তিকে বোঝা মনে করে পরিত্যাগ করবে না, বরং রক্তপণ ও মুক্তিপণে তাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য দেবে।
- ঐক্যবদ্ধভাবে অন্যায়ের প্রতিরোধ: সকল মুমিন ঐক্যবদ্ধভাবে বিদ্রোহী, অত্যাচারী, অপরাধী ও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের প্রতিরোধ করবে; অপরাধী যদি কারো নিজ সন্তানও হয় তবুও তার পক্ষ নেওয়া যাবে না।
- কাফেরের জন্য মুমিনকে হত্যা নিষিদ্ধ: কোনো মুমিন কোনো কাফেরের স্বার্থের জন্য অপর কোনো মুমিনকে হত্যা করতে পারবে না এবং মুমিনের বিরুদ্ধে কোনো কাফেরকে সাহায্য করতে পারবে না।
- ঐশ্বরিক নিরাপত্তা ও সমতা (ذمة الله واحدة): আল্লাহর নিরাপত্তা সবার জন্য এক ও অভিন্ন; মুসলিমদের মধ্যে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও সাধারণ ব্যক্তিও কোনো শত্রুকে আশ্রয় দিলে তা গোটা রাষ্ট্রের ওপর কার্যকর হবে।
- ইহুদিদের নাগরিক অধিকার: যে সকল ইহুদি এই সনদের আনুগত্য করবে, তারা সমান নাগরিক মর্যাদা ও সার্বিক সহায়তা লাভ করবে; তাদের ওপর কোনো জুলুম করা হবে না এবং তাদের শত্রুকে সাহায্য করা হবে না।
- ধর্মীয় স্বাধীনতা (لليهود دينهم وللمسلمين دينهم): ইহুদিরা তাদের নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে এবং মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে। তাদের আশ্রিত ব্যক্তি ও দাসদের ক্ষেত্রেও এই স্বাধীনতা বলবৎ থাকবে।
- যৌথ যুদ্ধব্যয় বহন: বহিরাগত কোনো শত্রুর সাথে যুদ্ধাবস্থা চলাকালীন ইহুদি ও মুসলমান উভয় পক্ষ নিজ নিজ অংশের যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করবে।
- মদীনা নগরীর পবিত্রতা ও শান্তি রক্ষা: মদীনা উপত্যকার অভ্যন্তরীণ এলাকা সনদের অন্তর্ভুক্ত সকল নাগরিকের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ, পবিত্র ও যুদ্ধ নিষিদ্ধ এলাকা (হারাম) হিসেবে গণ্য হবে।
- কুরাইশদের সাথে সম্পর্ক নিষিদ্ধ: মক্কার আগ্রাসী কুরাইশ এবং তাদের সহযোগীদের কাউকে মদীনায় কোনো প্রকার আশ্রয়, বাণিজ্য সুবিধা বা আর্থিক সাহায্য প্রদান করা যাবে না।
- ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা: মদীনার ওপর কোনো বহিরাগত শত্রু আক্রমণ চালালে মুসলিম ও ইহুদি উভয় পক্ষ সম্মিলিতভাবে আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে মদীনা প্রতিরক্ষা করবে।
- ব্যক্তির দায় ব্যক্তির ওপর: অপরাধের দায় কেবল অপরাধী ব্যক্তি এবং তার প্রত্যক্ষ পরিবারের ওপরই বর্তাবে; একজনের অপরাধের জন্য সমগ্র গোত্রকে দায়ী করা যাবে না।
- মজলুমের সুরক্ষা: মদীনায় বসবাসরত প্রতিটি নিরপরাধ ও মজলুম ব্যক্তিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা প্রদান করা হবে।
- সর্বোচ্চ বিচারিক কর্তৃত্ব (المرجعية العليا): সনদের স্বাক্ষরকারী পক্ষসমূহের মধ্যে যদি কোনো বিরোধ, বিবাদ বা রক্তপাতের মতো জটিল সংকট তৈরি হয়, তবে তার চূড়ান্ত ফয়সালা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর ন্যস্ত থাকবে।
٤- عرف الجهاد مع بيان مشروعيته وحكمه فى الزمن الراهن-
[৪. জিহাদের পরিচয় দাও এবং এর সপক্ষে শরয়ি দলিল ও বর্তমান সময়ে এর বিধান সম্পর্কে আলোচনা কর।]
১. জিহাদের সংজ্ঞা ও মর্মার্থ (تعريف الجهاد)
আভিধানিক অর্থ: ‘জিহাদ’ (الجِهَادُ) শব্দটি আরবি الجهد (জুহদ/জহদ) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার আভিধানিক অর্থ হলো চরম প্রচেষ্টা চালানো, পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করা, কষ্ট সহ্য করা বা সাধ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত চেষ্টা করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ইমাম ইবনে কুদামা, ইবনে তাইমিয়্যাহ ও আল্লামা জারজানী (রহ.) বলেন:
«الجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّـهِ هُوَ بَذْلُ الْوُسْعِ وَالطَّاقَةِ فِي قِتَالِ أَعْدَاءِ الدِّينِ لِإِعْلَاءِ كَلِمَةِ اللَّـهِ تَعَالَى وَحِمَايَةِ حَوْزَةِ الْإِسْلَامِ»
অর্থ: “আল্লাহর জমিনে আল্লাহর কালেমাকে সমুন্নত করা, দীন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং আগ্রাসীদের আক্রমণ থেকে মুসলিম ভূখণ্ড ও মানবতাকে রক্ষার উদ্দেশ্যে নিজের জান, মাল, জ্ঞান ও শক্তি দিয়ে সাধ্যের সবটুকু প্রচেষ্টা ব্যয় করাকে জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ বলে।”
২. জিহাদের শারয়ী দলীল ও বৈধতার ভিত্তি (مشروعية الجهاد)
ইসলামে জিহাদ কোনো রক্তপিপাসা বা ভূখণ্ড দখলের জন্য নয়, বরং জুলুম ও নিপীড়ন বন্ধের জন্য বৈধ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এর সুস্পষ্ট বিধান এসেছে:
- প্রথম যুদ্ধের অনুমোদনের আয়াত: মক্কায় ১৩ বছর অকথ্য নির্যাতন সহ্য করার পর হিজরতের ২য় বর্ষে আল্লাহ তা’আলা জিহাদের প্রথম অনুমতি দিয়ে ইরশাদ করেন: ﴿أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا ۚ وَإِنَّ اللَّـهَ عَلَىٰ نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ﴾ (যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো, কারণ তারা অত্যাচারিত; আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাহায্য করতে পূর্ণ সক্ষম – সূরা আল-হাজ্জ: ৩৯)।
- সীমালঙ্ঘন না করার নীতি: ﴿وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّـهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّـهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ﴾ (তোমরা আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না – সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৯০)।
- হাদিসে নববীর সাক্ষ্য: রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: «جَاهِدُوا الْمُشْرِكِينَ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ وَأَلْسِنَتِكُمْ» (তোমরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে তোমাদের সম্পদ দিয়ে, তোমাদের জান দিয়ে এবং তোমাদের জিহ্বা/বাকশক্তি দিয়ে জিহাদ পরিচালনা কর – সুনানে আবু দাউদ: ২৫০৪)।
৩. বর্তমান সময়ে জিহাদের বিধান ও স্বরূপ (حكم الجهاد في الزمن الراهن)
সমকালীন বিশ্বে জিহাদের বিধান প্রয়োগে ফিকহী নীতিমালা অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট:
- প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ (جهاد الدفع – ফরযে আইন): সমকালীন কোনো মুসলিম দেশে যদি শত্রু আগ্রাসন চালায় এবং মানুষের জীবন, সম্ভ্রম ও স্বাধীনতা বিপন্ন হয় (যেমন ফিলিস্তিন বা দখলকৃত ভূখণ্ডসমূহ), তবে সেই ভূখণ্ডের সকল নাগরিকের ওপর দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা ও স্বাধিকার রক্ষা করা ফরযে আইন। অন্যান্য মুসলিমদের জন্য সাধ্যানুযায়ী তাদের রাজনৈতিক, মানবিক ও আর্থিক সাহায্য করা ওয়াজিব।
- সশস্ত্র জিহাদ ঘোষণার রাষ্ট্রীয় শর্ত: ফিকহের সর্বসম্মত নীতি অনুযায়ী, কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি বা দল নিজেরা আইন হাতে তুলে নিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে না। সশস্ত্র জিহাদের বৈধ ঘোষণার একমাত্র এখতিয়ার ইসলামী রাষ্ট্রের বৈধ সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের (ইমাম/উলিল আমর)। অন্যথায় সমাজে নৈরাজ্য ও ফিতনা সৃষ্টি হয়।
- জিহাদের বহুমুখী আধুনিক ক্ষেত্রসমূহ:
- বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রচার মাধ্যম জিহাদ (جهاد الكلمة والإعلام): বর্তমানে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার বিরুদ্ধে সত্যের দাওয়াত, যুক্তি, সাহিত্য ও আধুনিক মিডিয়ার মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা সবচেয়ে বড় জিহাদ।
- অর্থনৈতিক জিহাদ (الجهاد بالمال): অভাবগ্রস্ত ও মজলুম মানবতার পাশে দাঁড়ানো এবং দাওয়াতী ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অর্থায়ন করা।
- নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ (جهاد النفس): প্রবৃত্তি ও গুনাহের বিরুদ্ধে অন্তরের লড়াই কায়েম রাখা।
- সন্ত্রাসবাদের সাথে জিহাদের মৌলিক বৈসাদৃশ্য: ইসলামে নিরীহ মানুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ, ধর্মযাজক হত্যা এবং ফসল, গাছপালা ও উপাসনালয় ধ্বংস কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। অতএব সন্ত্রাসবাদ কখনই জিহাদ হতে পারে না; জিহাদ হলো জুলুমের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা।
٥- اكتب مقالة عن غزوة أحد-
[৫. উহুদ যুদ্ধ সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লেখ।]
ভূমিকা
হিজরী ৩য় বর্ষের শাওয়াল মাসে সংঘটিত উহুদ যুদ্ধ (غزوة أحد) ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ও শিক্ষণীয় যুদ্ধ। বদর প্রান্তরে শোচনীয় পরাজয়ের গ্লানি মোচন এবং মক্কার কুরাইশদের বাণিজ্যিক আধিপত্য পুনরুদ্ধারের তীব্র উন্মাদনা থেকে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা হয়। এতে একদিকে ছিল মুসলিমদের অটুট ঈমান ও ত্যাগ, অন্যদিকে ছিল নববী নির্দেশনার গুরুত্ব ও অবাধ্যতার করুণ পরিণতির এক শাশ্বত শিক্ষা।
১. যুদ্ধের পটভূমি ও কুরাইশদের প্রস্তুতি
বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের ৭০ জন নেতৃস্থানীয় যোদ্ধা নিহত ও ৭০ জন বন্দী হওয়ায় মক্কায় ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে যায়। আবু সুফিয়ান বদরের প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত সুবাসিত তেল ব্যবহার করবে না বলে শপথ নেয়। কাফেলা থেকে অর্জিত ৫০ হাজার দীনার যুদ্ধের তহবিলে জমা করে এক বিশাল বাহিনী গঠন করা হয়। মক্কার ৩,০০০ সুসজ্জিত সৈন্য, যার মধ্যে ২০০ অশ্বারোহী (নেতৃত্বে খালিদ বিন ওয়ালিদ ও ইকরামা ইবনে আবি জাহল) এবং ৭০০ বর্মধারী সৈন্য ছিল। সাথে ছিল নারীদের একটি দল, যারা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সৈন্যদের উৎসাহিত করছিল।
২. মুসলমানদের পরামর্শ ও রণকৌশল
কুরাইশ বাহিনীর মদীনাভিমুখে রওনা হওয়ার সংবাদ পেয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে পরামর্শ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও প্রবীণ সাহাবীদের মত ছিল মদীনার অভ্যন্তরে থেকে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ করা। কিন্তু বদরে অংশ নিতে না পারা তরুণ সাহাবীদের আবেগময় পীড়াপীড়িতে রাসুলুল্লাহ (সা.) খোলা ময়দানে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন এবং স্বীয় বর্ম পরিধান করেন। ১,০০০ সৈন্য নিয়ে মদীনা থেকে রওনা হলেও পথিমধ্যে মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই স্বীয় ৩০০ অনুসারী নিয়ে দলত্যাগ করে বিশ্বাসঘাতকতা করে। ফলে রাসুলুল্লাহ (সা.) মাত্র ৭০০ জন অকুতোভয় সাহাবী নিয়ে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছান।
৩. তীরন্দাজদের টিলা ও নববী নির্দেশ
উহুদ পাহাড়কে পেছনে রেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিম বাহিনীকে সাজান। বাম পাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথ ছিল, যেখান দিয়ে শত্রু বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণের সমূহ সম্ভাবনা ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর নেতৃত্বে ৫০ জন দক্ষ তীরন্দাজকে সেই গিরিপথের টিলায় (جبل الرماة) মোতায়েন করেন এবং অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নির্দেশ দেন:
«إِنْ رَأَيْتُمُونَا تَخْطَفُنَا الطَّيْرُ فَلَا تَبْرَحُوا مَكَانَكُمْ هَذَا حَتَّى أُرْسِلَ إِلَيْكُمْ، وَإِنْ رَأَيْتُمُونَا هَزَمْنَا الْقَوْمَ وَوَطِئْنَاهُمْ فَلَا تَبْرَحُوا حَتَّى أُرْسِلَ إِلَيْكُمْ»
অর্থ: “যদি তোমরা দেখ পাখি আমাদের লাশ ছিঁড়ে খাচ্ছে তবুও আমার নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তোমরা এই স্থান ত্যাগ করবে না; আর যদি দেখ আমরা শত্রুদের পরাস্ত করে তাদের মাড়িয়ে যাচ্ছি তবুও আমার নির্দেশ ব্যতীত জায়গা ছেড়ে নড়বে না” (সহীহ বুখারী: ৩০৩৯)।
৪. যুদ্ধের সূচনা ও মুসলিমদের প্রাথমিক বিজয়
শনিবার ৭ই শাওয়াল যুদ্ধ শুরু হয়। দ্বৈরথ যুদ্ধে হযরত আলী ও যুবায়ের (রা.) কুরাইশ পতাকাবাহী তালহা ইবনে আবি তালহাসহ একের পর এক যোদ্ধাকে নিপাত করেন। এরপর সাধারণ যুদ্ধ শুরু হলে হযরত হামযা, আলী, আবু দুজানা (রা.) প্রমুখের বীরত্বপূর্ণ আক্রমণে কুরাইশ বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং তারা ময়দান ছেড়ে পালাতে শুরু করে।
৫. তীরন্দাজদের ভুল ও যুদ্ধের রূপ পরিবর্তন
কুরাইশদের পলায়ন এবং ময়দানে গণিমতের মাল পড়ে থাকতে দেখে গিরিপথের অধিকাংশ তীরন্দাজ মনে করলেন যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। আমীর আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর বারবার বারণ সত্ত্বেও প্রায় ৪০ জন তীরন্দাজ রাসূল (সা.)-এর নির্দেশ অমান্য করে গণিমত সংগ্রহের জন্য টিলা ছেড়ে নিচে নেমে আসেন। এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল খালিদ বিন ওয়ালিদের অশ্বারোহী বাহিনী। তিনি তৎক্ষণাৎ টিলার অবশিষ্ট প্রহরীদের শহীদ করে পেছন দিক থেকে অতর্কিত আক্রমণ চালান। কুরাইশদের পলায়মান সৈন্যরাও পুনরায় ঘুরে দাঁড়িয়ে আক্রমণ করে। ফলে মুসলমানরা উভয় দিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
৬. ক্ষয়ক্ষতি ও হযরত হামযা (রা.)-এর শাহাদাত
এই ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার মধ্যে জাবালে নূর হযরত হামযা (রা.) হাবশী ওয়াহশীর বর্শার আঘাতে শাহাদাত বরণ করেন। কাফের আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা তাঁর বুক চিরে কলিজা বের করে চিবিয়েছিল। কুরাইশরা গুজব ছড়িয়ে দেয় যে “মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন!” এতে সাহাবীদের মধ্যে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু আনাস ইবনে নযর (রা.) গর্জে উঠে বলেন: “রাসূল যদি শহীদ হয়ে থাকেন তবে তাঁর পর বেঁচে থেকে কী লাভ? ওঠো, তিনি যে সত্যের জন্য জীবন দিয়েছেন তোমরাও সেই সত্যের জন্য জীবন দাও!”
রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কেন্দ্র করে একদল জানবায সাহাবী (হযরত তালহা, সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, আবু দুজানা, নুসাইবা বিনতে কা’ব রা.) মানবঢাল তৈরি করেন। হযরত তালহা (রা.) নিজের হাত পেতে তীর প্রতিহত করেন, যার ফলে তাঁর হাত অবশ হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিরস্ত্রাণ ভেঙে মাথায় বিদ্ধ হয় এবং নিচের একটি দাঁত মুবারক শহীদ হয়। শেষ পর্যন্ত সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে উহুদের গিরিদুর্গে নিরাপদে সরিয়ে নিতে সক্ষম হন। এই যুদ্ধে মোট ৭০ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন।
৭. উহুদ যুদ্ধের শিক্ষা
উহুদের প্রান্তরে মুসলমানদের জন্য এক চিরন্তন ও মহা শিক্ষণীয় শিক্ষা অর্জিত হয়েছিল:
- আমীর বা নেতার নির্দেশ লঙ্ঘনের ভয়াবহ জাগতিক ও পারলৌকিক পরিণতি।
- দুনিয়ার লোভ ও গণিমতের মোহ বিজয়ের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
- আল্লাহ মুমিনদের পরীক্ষা করেন এবং মুনাফিকদের খাঁটি মুমিন থেকে পৃথক করে দেন: ﴿مَا كَانَ اللَّـهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَىٰ مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّىٰ يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ﴾ (সূরা আলে ইমরান: ১৭৯)।
٦- عرّف المعراج- ثم بين واقعة المعراج على ضوء القرآن والسنة-
[৬. মি’রাজ এর পরিচয় দাও। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মি’রাজের ঘটনা বর্ণনা কর।]
১. ইসরা ও মি’রাজের পরিচয় ও সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘ইসরা’ (الإسراء) শব্দের অর্থ রাত্রিকালীন ভ্রমণ। আর ‘মি’রাজ’ (المعراج) শব্দটি عروج (উর্ধ্বগমন) থেকে উদ্ভূত, যার আভিধানিক অর্থ আরোহণের সিঁড়ি বা ঊর্ধ্বজগতে গমন করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: নবুওয়তের দশম বা একাদশ বর্ষে রজব মাসের ২৭তম রজনীতে মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে সপ্তাকাশ ও সিদরাতুল মুনতাহা পেরিয়ে আরশে আজীমে স্বীয় নৈকট্যে নিয়ে গিয়ে পুনরায় মক্কায় ফিরিয়ে আনার অলৌকিক মহাঘটনাকে ইসরা ও মি’রাজ বলা হয়।
২. পবিত্র কুরআনে মি’রাজের প্রমাণ
পবিত্র কুরআনে ইসরা ও মি’রাজের বর্ণনা দুটি স্বতন্ত্র সূরায় সুস্পষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে:
- পবিত্র ইসরা (ভূ-ভ্রমণ): সূরা বনী ইসরাঈলের প্রথম আয়াতে আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা করেন:
﴿سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ﴾
অর্থ: “পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলা মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাঁকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা” (সূরা আল-ইসরা: ১)।
- পবিত্র মি’রাজ (ঊর্ধ্বজগতের ভ্রমণ): সূরা আন-নাজমে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
﴿وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَىٰ ¤ عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَىٰ ¤ عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ ¤ إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَىٰ ¤ مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَىٰ ¤ لَقَدْ رَأَىٰ مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَىٰ﴾
অর্থ: “নিশ্চয়ই তিনি তাঁকে আরেকবার দেখেছিলেন সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে, যার পাশে অবস্থিত জান্নাতুল মা’ওয়া। যখন বৃক্ষটিকে আচ্ছাদিত করেছিল যা আচ্ছাদিত করার ছিল। তাঁর দৃষ্টি বিভ্রান্ত হয়নি এবং লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। নিশ্চয়ই তিনি স্বীয় রবের মহান নিদর্শনাবলি প্রত্যক্ষ করেছিলেন” (সূরা আন-নাজম: ১৩-১৮)।
৩. সুন্নাহর আলোকে মি’রাজের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের দীর্ঘ হাদিসসমূহের আলোকে মি’রাজের ধারাবাহিক বিবরণ নিম্নে প্রদত্ত হলো:
- বক্ষ বিদারণ ও পবিত্রতা সম্পাদন (شق الصدر): হিজরতের পূর্বে এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) কা’বা চত্বরের হাতিমে ঘুমে ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলেন। এমন সময় জিবরাঈল (আ.) এসে তাঁর বক্ষ মুবারক বিদীর্ণ করেন এবং যমযমের পানিতে তা ধুয়ে ঈমান ও হিকমতে পরিপূর্ণ একটি স্বর্ণের পাত্র থেকে নূর ঢেলে তা পুনরায় জোড়া লাগিয়ে দেন।
- বুরাকে আরোহণ ও বায়তুল মুকাদ্দাস যাত্রা: এরপর বিদ্যুৎগতির এক স্বর্গীয় বাহন ‘বুরাক’ আনা হয়, যার এক একটি কদম পড়ত দৃষ্টির শেষ সীমায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছেন। সেখানে তিনি আম্বিয়ায়ে কেরামের পবিত্র আত্মাসমূহের ইমাম হয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। এর মাধ্যমে তিনি ‘সাইয়্যিদুল মুরসালীন’ (নবীগণের নেতা) হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
- সপ্তাকাশ ভ্রমণ ও নবীগণের সাথে সাক্ষাৎ:
- প্রথম আসমান: মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
- দ্বিতীয় আসমান: হযরত ঈসা (আ.) ও হযরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
- তৃতীয় আসমান: রূপ-সৌন্দর্যের প্রতীক হযরত ইউসুফ (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
- চতুর্থ আসমান: হযরত ইদরীস (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
- পঞ্চম আসমান: হযরত হারুন (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
- ষষ্ঠ আসমান: হযরত মূসা (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ (যিনি উম্মতে মুহাম্মদীর প্রতি বিশেষ শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন)।
- সপ্তম আসমান: মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ, যিনি বায়তুল মা’মুরে হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। বায়তুল মা’মুরে প্রত্যহ ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন যারা কিয়ামত পর্যন্ত আর দ্বিতীয়বার সুযোগ পান না।
- সিদরাতুল মুনতাহা ও আরশে আজীমে উপস্থিতি: সপ্তম আসমানের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) সৃষ্টিজগতের সীমানা ‘সিদরাতুল মুনতাহা’য় পৌঁছেন। সেখানে জিবরাঈল (আ.) থেমে গিয়ে বলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি এক চুল পরিমাণও অগ্রসর হই, তবে আল্লাহর নূরের তাজাল্লিতে পুড়ে ছাই হয়ে যাব।” অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) রফরফে আরোহণ করে এমন এক স্তরে উপনীত হন যেখানে ভাগ্যলিপির কলম চলার খসখস শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সেখানে তিনি পর্দা হীনভাবে রাব্বুল আলামীনের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য ও কথোপকথনের পরম সৌভাগ্য লাভ করেন।
- মি’রাজের শ্রেষ্ঠ উপহার: মি’রাজের রাতে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে দৈনিক ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। পরবর্তীতে মূসা (আ.)-এর পরামর্শে রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর দরবারে বারবার আরজি জানিয়ে তা কমিয়ে ৫ ওয়াক্তে রূপান্তর করান। মহান আল্লাহ ঘোষণা দেন: “আমলে পাঁচ ওয়াক্ত হলেও সওয়াবের দিক থেকে তা পঞ্চাশ ওয়াক্তেরই সমান থাকবে।” এছাড়া সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত এবং শিরককারী ব্যতীত সকলের ক্ষমার সুসংবাদ দেওয়া হয়।
- মক্কায় প্রত্যাবর্তন ও ‘সিদ্দিক’ উপাধি: সকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কাবাসীর কাছে এই অলৌকিক সফরের কথা প্রকাশ করলে কুরাইশরা তা নিয়ে উপহাস শুরু করে। তারা আবু বকর (রা.)-এর কাছে গিয়ে বলল: “তোমার নবী নাকি এক রাতে জেরুজালেম ঘুরে আসমানে গিয়ে ফিরে এসেছে!” আবু বকর (রা.) বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলেছিলেন: “মুহাম্মদ (সা.) যদি এ কথা বলে থাকেন, তবে তা ধ্রুব সত্য! আমি তো এর চেয়েও বড় আসমানি ওহীর সংবাদ বিশ্বাস করি।” এই নিখাদ বিশ্বাসের কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ‘আস-সিদ্দিক’ (পরম সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত করেন।
مجموعة (ب) [‘খ’ অংশ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি]
أجب عن أربعة من مجموعة (ب) (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও): মান: ৫ × ৪ = ২০
(পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ ও সর্বোচ্চ প্রস্তুতির স্বার্থে ‘খ’ অংশের ৬টি প্রশ্নেরই বিশদ সমাধান নিচে প্রস্তুত করা হলো):
٧- تحدث عن الهجرة الى الحبشة-
[৭. আবিসিনিয়ায় হিজরত সম্পর্কে আলোচনা কর।]
১. আবিসিনিয়ায় হিজরতের কারণ ও প্রেক্ষাপট
নবুওয়তের ৫ম বর্ষে মক্কার কুরাইশদের নির্যাতন যখন সহ্যের সীমা অতিক্রম করে, বিশেষ করে দুর্বল সাহাবীদের ওপর অবর্ণনীয় শারীরিক নিপীড়ন চলতে থাকে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের জীবন ও ঈমান রক্ষার বিকল্প নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করেন। তিনি লোহিত সাগরের ওপারে আবিসিনিয়ার (বর্তমান ইথিওপিয়া) খ্রিস্টান বাদশাহ নাজ্জাশী (আসহামাহ)-এর সুবিচারের প্রশংসা করে বলেন: «لَوْ خَرَجْتُمْ إِلَى أَرْضِ الْحَبَشَةِ، فَإِنَّ بِهَا مَلِكًا لَا يُظْلَمُ عِنْدَهُ أَحَدٌ» (তোমরা যদি আবিসিনিয়ায় চলে যেতে, তবে সেখানে এমন একজন শাসক রয়েছেন যাঁর রাজ্যে কারো ওপর জুলুম করা হয় না)।
২. হিজরতের দুটি পর্যায়
- প্রথম হিজরত (৫ম নববী বর্ষ – রজব মাস): হযরত উসমান ইবনে আফ্ফান ও তাঁর সহধর্মিণী রাসুলকন্যা রুকাইয়্যাহ (রা.)-এর নেতৃত্বে ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী সংগোপনে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে হাবশায় হিজরত করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের সম্পর্কে বলেছিলেন: “ইব্রাহিম ও লূত (আ.)-এর পর উসমানই প্রথম ব্যক্তি যে স্বীয় পরিবারসহ আল্লাহর পথে হিজরত করেছে।”
- দ্বিতীয় হিজরত (৭ম নববী বর্ষ): কুরাইশদের অত্যাচারের তীব্রতা পুনরায় বৃদ্ধি পেলে হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর নেতৃত্বে ৮৩ জন পুরুষ ও ১৯ জন নারী দ্বিতীয় দফায় হাবশায় হিজরত করেন।
৩. নাজ্জাশীর দরবারে হযরত জাফর (রা.)-এর ঐতিহাসিক ভাষণ
কুরাইশরা বিপুল উপঢৌকনসহ আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ ইবনে আবি রাবিয়াকে নাজ্জাশীর দরবারে পাঠিয়ে মুসলিমদের ফিরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করে। বাদশাহ নাজ্জাশী মুসলিমদের ডেকে তাদের বক্তব্য শুনতে চান। তখন হযরত জাফর (রা.) এক যুগান্তকারী ও প্রাঞ্জল ভাষণ দেন। তিনি জাহেলিয়াতের অনাচার ও ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরেন এবং সূরা মারইয়ামের প্রারম্ভিক আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন। হযরত ঈসা ও মারইয়াম (আ.)-এর সম্মানজনক বর্ণনা শুনে বাদশাহ নাজ্জাশী এবং তাঁর দরবারের খ্রিস্টান বিশপগণ কেঁদে ফেলেন। নাজ্জাশী কুরাইশদের উপঢৌকন ফিরিয়ে দিয়ে ঘোষণা করেন: “তোমরা নিরাপদে আমার দেশে বাস কর, এক পাহাড় সমপরিমাণ সোনার বিনিময়েও আমি তোমাদের কাউকে হস্তান্তর করব না।” পরবর্তীকালে বাদশাহ নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর ওফাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) মদীনায় গায়েবানা জানাজা আদায় করেন।
٨- اكتب أنواع إعجاز القرآن الكريم-
[৮. আল-কুরআনুল কারিম এর ই’জায এর প্রকারসমূহ লেখ।]
১. ই’জাযুল কুরআনের ধারণা
‘ই’জায’ (الإعجاز) শব্দের অর্থ অপারগ করা, অক্ষম প্রমাণ করা। পবিত্র কুরআন মানবজাতির মুক্তির শাশ্বত সংবিধান এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ চিরন্তন মু’জিযা। তৎকালীন আরবের শীর্ষস্থানীয় বাগ্মী ও কবিদের কুরআনের একটি সূরার অনুরূপ রচনা করার উন্মুক্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া সত্ত্বেও তারা আজ পর্যন্ত এর মোকাবিলায় সম্পূর্ণরূপে অপারগ প্রমাণিত হয়েছে।
২. ই’জাযুল কুরআনের প্রধান প্রকারভেদ
- ভাষাগত ও সাহিত্যিক অলৌকিকতা (الإعجاز اللغوي والبياني): শব্দের ছন্দময় বিন্যাস, অতুলনীয় বাক্যশৈলী, বালাগাত ও অলঙ্কারশাস্ত্রের এমন উচ্চমান যা কোনো মানুষের পক্ষে রচনা করা অসম্ভব। কাফেররা কুরআনের অপূর্ব সুর ও প্রভাব শুনে বলেছিল: “এ কোনো মানুষের কালাম নয়!”
- অদৃশ্য ও ঐতিহাসিক সংবাদের অলৌকিকতা (الإعجاز الغيبي والتاريخي):
- অতীতের খবর: রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মী (নিরক্ষর) হওয়া সত্ত্বেও কুরআন হাজার বছর আগের নূহ, হূদ, সালেহ, ইউসুফ ও মূসা (আ.) এবং ফেরাউনের সঠিক ইতিহাস নির্ভুলভাবে বর্ণনা করেছে।
- ভবিষ্যতের ঘটনা: পারস্যের কাছে রোমানদের শোচনীয় পরাজয়ের পর কুরআন অগ্রিম ঘোষণা করেছিল যে কয়েক বছরের মধ্যে রোমানরা আবার বিজয়ী হবে (সূরা আর-রূম: ১-৪), যা হুবহু সত্যে পরিণত হয়।
- আইনগত ও বিধানিক অলৌকিকতা (الإعجاز التشريعي): ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এমন সুষম, ভারসাম্যপূর্ণ ও সর্বজনীন জীবনবিধান উপস্থাপন করেছে যা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির সকল সমস্যার সমাধানে কালোত্তীর্ণ।
- বৈজ্ঞানিক ও মহাজাগতিক অলৌকিকতা (الإعجاز العلمي): আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে আবিষ্কৃত মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব (বিগ ব্যাং – সূরা আল-আম্বিয়া: ৩০), মহাশূন্যের সম্প্রসারণ (সূরা আয-যারিয়াত: ৪৭), মাতৃগর্ভে মানব ভ্রূণের ক্রমবিকাশের নিখুঁত ধাপ (সূরা আল-মুমিনূন: ১২-১৪), এবং দুই সমুদ্রের মিলনস্থলে অদৃশ্য পর্দা (সূরা আর-রহমান: ১৯-২০)—১৪০০ বছর পূর্বে কোনো মানুষের পক্ষে জানা অসম্ভব ছিল।
٩- بين الوصايا التى أوصى بها رسول الله صلى الله عليه وسلم أمته فى حجة الوداع-
[৯. বিদায় হজের সময় রসূল (স) উম্মতকে যে উপদেশগুলো দিয়েছেন, তা বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
১০ম হিজরীর ৯ই যিলহজ্জ আরাফাত ময়দানে জাবালে রাহমাতের পাদদেশে লক্ষাধিক সাহাবীর বিশাল সমাবেশে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেছিলেন, তা বিশ্ব মানবতার প্রথম পূর্ণাঙ্গ মানবাধিকারের সনদ (Charter of Human Rights)। এই ভাষণে তিনি উম্মতকে বহু কালজয়ী উপদেশ প্রদান করেন:
বিদায় হজের প্রধান প্রধান উপদেশাবলি
- জান, মাল ও সম্মানের পবিত্রতা: আজকের এই পবিত্র দিন, এই বরকতময় মাস এবং এই সম্মানিত নগরী মক্কার ন্যায় কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি মানুষের রক্ত, ধনসম্পদ ও ইজ্জত-আব্রু অপর মুসলমানের জন্য সম্পূর্ণ হারাম ও অলঙ্ঘনীয়।
- বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও বর্ণবাদের মূলোৎপাটন: হে মানবজাতি! তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের আদি পিতাও এক (আদম)। কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; সাদার ওপর কালোর কিংবা কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই—কেবলমাত্র ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি ব্যতীত।
- সুদের চিরতরে বিলোপ সাধন: জাহেলী যুগের সমস্ত সুদের লেনদেন চিরতরে বাতিল ঘোষণা করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সমস্ত সুদ মওকুফ করে দিলাম।
- জাহেলী রক্তের প্রতিশোধ বাতিল: অতীতের সমস্ত অন্যায় রক্তের দাবি ও প্রতিশোধের রীতি সম্পূর্ণরূপে রহিত করা হলো।
- নারীদের অধিকার ও মর্যাদার সুরক্ষা: নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। তাদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তোমাদের ওপরও তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে। তাদের সাথে উত্তম ও কোমল আচরণ কর।
- দাস-দাসীদের প্রতি মানবিক আচরণ: তোমাদের অধীনস্থদের খেয়াল রেখো। তোমরা যা খাবে তাদেরও তা খাওয়াবে, তোমরা যা পরবে তাদেরও তা পরাবে।
- কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার নির্দেশ: আমি তোমাদের মাঝে দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি; যতদিন তোমরা তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকবে ততদিন কখনই পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব (কুরআন) এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ।
- দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি না করা: ধর্মে অতিরঞ্জন ও চরমপন্থা পরিহার কর; কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধর্মে বাড়াবাড়ির কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
- দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার সার্বজনীন দায়িত্ব: এখানে যারা উপস্থিত আছ, তারা যেন এই বাণী অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দেয়। হয়তো কোনো কোনো অনুপস্থিত ব্যক্তি উপস্থিত শ্রোতার চেয়েও এর উত্তম হেফাজতকারী হবে।
- রিসালাতের দায়িত্ব পালনের ঐশী সাক্ষ্য: পরিশেষে তিনি আসমানের দিকে শাহাদাত আঙুল তুলে তিনবার বললেন: «اللَّهُمَّ اشْهَدْ» (হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক, আমি তোমার বাণী পৌঁছে দিয়েছি)। সাহাবায়ে কেরাম সমস্বরে সাক্ষ্য দিলেন: “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আপনার দায়িত্ব পরিপূর্ণ পালন করেছেন।”
١٠- اكتب واقعة فتح مكة-
[১০. মক্কা বিজয়ের ঘটনা লেখ।]
১. মক্কা বিজয়ের কারণ ও প্রেক্ষাপট
৬ষ্ঠ হিজরীতে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ার সন্ধির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল—উভয় পক্ষ ১০ বছর পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে এবং আরবের যে কোনো গোত্র স্বাধীনভাবে যে কোনো পক্ষের সাথে মৈত্রী চুক্তি করতে পারবে। এই সুবাদে বনু খুযা’আহ গোত্র মুসলমানদের মিত্র হয় এবং বনু বকর গোত্র কুরাইশদের মিত্র হয়। ৮ম হিজরীতে কুরাইশরা অস্ত্র ও সৈন্য দিয়ে গোপনে বনু বকরকে সহযোগিতা করে কাবা চত্বরে নিরীহ বনু খুযা’আহর ওপর রাতের আঁধারে গণহত্যা চালায়। এর মাধ্যমে কুরাইশরা সন্ধির শর্ত সরাসরি ভঙ্গ করে। বনু খুযা’আহর প্রতিনিধি মদীনায় এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট বিচার প্রার্থনা করলে তিনি রক্তপাতহীনভাবে মক্কা বিজয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
২. মক্কার পথে ঐতিহাসিক অভিযান
৮ম হিজরীর ১০ই রমজান রাসুলুল্লাহ (সা.) ১০,০০০ বীর সাহাবীর এক সুবিশাল বাহিনী নিয়ে মদীনা থেকে মক্কাভিমুখে রওনা হন। কুরাইশরা যাতে প্রতিরোধ গড়ার সুযোগ না পায় সেজন্য এই অভিযান অত্যন্ত গোপন রাখা হয়। মক্কার অদূরে মাররুয যাহরানে পৌঁছে মুসলিম বাহিনী রাতের বেলা দশ হাজার পৃথক অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জ্বলন করে। কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এসে হতভম্ব হয়ে পড়েন এবং হযরত আব্বাস (রা.)-এর আশ্রয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু সুফিয়ানের সম্মান রক্ষার্থে ঘোষণা করেন: “যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের বাড়িতে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ, যে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে সে নিরাপদ, এবং যে পবিত্র কাবা চত্বরে আশ্রয় নেবে সে নিরাপদ।”
৩. রক্তপাতহীন বিজয় ও পবিত্র কাবার পরিশোধন
২০শে রমজান মুসলিম বাহিনী অত্যন্ত বিনম্র ভঙ্গিতে চারটি দলে বিভক্ত হয়ে মক্কায় প্রবেশ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহ তা’আলার দরবারে চরম কৃতজ্ঞতায় কাসওয়া উটের পিঠে মাথা এত নিচু করে রেখেছিলেন যে তাঁর দাড়ি মুবারক জিন স্পর্শ করছিল। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর অংশে সামান্য বাধা ব্যতীত সম্পূর্ণ রক্তপাতহীনভাবে মক্কা বিজিত হয়। কাবার চত্বরে প্রবেশ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) হাতে থাকা ধনুক দিয়ে ৩৬০টি মূর্তির ওপর আঘাত করে ভূপাতিত করেন এবং তিলাওয়াত করতে থাকেন: ﴿وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ ۚ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا﴾ (বলুন: সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল – সূরা আল-ইসরা: ৮১)।
৪. বিশ্ব ইতিহাসের নজিরবিহীন সাধারণ ক্ষমা (العفو العام)
মক্কার কুরাইশরা যারা দীর্ঘ ২১ বছর রাসুলুল্লাহ (সা.) ও মুসলমানদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছে, দেশত্যাগে বাধ্য করেছে এবং তাঁর প্রাণপ্রিয় সাহাবীদের হত্যা করেছে, তারা আজ কাবার চত্বরে কম্পিত হৃদয়ে মৃত্যুদণ্ডের ভয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের প্রশ্ন করলেন: “হে কুরাইশমণ্ডলী! বল তো আজ আমি তোমাদের সাথে কেমন আচরণ করব বলে তোমরা ধারণা করছ?” তারা অবনত মস্তকে বলল: “আপনি একজন দয়ালু ভাই এবং দয়ালু ভাইয়ের সন্তান।” তখন দয়ার সাগর রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করলেন:
«لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ، يَغْفِرُ اللَّـهُ لَكُمْ، اذْهَبُوا فَأَنْتُمُ الطُّلَقَاءُ»
অর্থ: “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো প্রতিশোধ নেই; আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। যাও, তোমরা সবাই আজ মুক্ত ও স্বাধীন!” (সুনানে বায়হাকী)। এই অভূতপূর্ব ক্ষমার দৃশ্য দেখে মক্কার আবালবৃদ্ধবনিতা দলে দলে ইসলামে দীক্ষিত হয়।
١١- تحدث عن أهل بيت النبى صلى الله عليه وسلم وأولاده-
[১১. নবি করিম (স) এর আহলে বাইত সম্পর্কে আলোচনা কর।]
১. আহলে বাইতের পরিচয় ও মর্যাদা (مفهوم أهل البيت ومكانتهم)
সংজ্ঞা: ‘আহলে বাইত’ (أهل البيت) অর্থ ঘরের অধিবাসী বা পরিবারের সদস্য। কুরআন ও সুন্নাহর পরিভাষায় রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পুণ্যবতী স্ত্রীগণ (উম্মাহাতুল মুমিনীন), তাঁর প্রিয় কন্যাগণ, হযরত আলী, হযরত ফাতিমা, ইমাম হাসান ও হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) এবং বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের সকল মুমিন ব্যক্তিবর্গ যাঁদের জন্য সদকা গ্রহণ চিরতরে হারাম করা হয়েছে, তাঁদের সকলকে যৌথভাবে ‘আহলে বাইত’ বলা হয়।
কুরআনিক মর্যাদা: পবিত্র কুরআনে আহলে বাইতের পবিত্রতা ও সম্মান ঘোষণা করে আল্লাহ ইরশাদ করেন: ﴿إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّـهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا﴾ (হে নবীর আহলে বাইত! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের সম্পূর্ণরূপে পবিত্র রাখতে – সূরা আল-আহযাব: ৩৩)। এছাড়া হাদিসে কিসা (হযরত আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইনকে চাদরাবৃত করে দুআ করার ঘটনা)-এর মাধ্যমে তাঁদের প্রতি বিশেষ ভালোবাসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সন্তান-সন্ততি (أولاد النبي صلى الله عليه وسلم)
ঐতিহাসিকদের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মোট সন্তান ছিলেন সাতজন—তিনজন পুত্র ও চারজন কন্যা। সর্বকনিষ্ঠ পুত্র হযরত ইব্রাহিম ব্যতীত বাকি ছয়জন সন্তানেরই গর্ভধারিণী মা ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রাযি.)।
ক. পুত্র সন্তানগণ (৩ জন – যাঁরা সকলেই শৈশবে ইন্তেকাল করেন):
- আল-কাসিম (القاسم): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জ্যেষ্ঠ সন্তান। তাঁর নামানুসারেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উপনাম (কুনিয়াত) রাখা হয়েছিল ‘আবুল কাসিম’। তিনি নবুওয়ত পূর্ববর্তী যুগে শৈশবে মক্কায় ইন্তেকাল করেন।
- আবদুল্লাহ (عبد الله): নবুওয়ত লাভের পর মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁকে ‘তাইয়্যিব’ (পবিত্র) ও ‘তাহির’ (পরিচ্ছন্ন) উপাধিতে ডাকা হতো। তিনিও শৈশবেই মক্কায় ওফাত পান। তাঁর ইন্তেকালের পর আস ইবনে ওয়ায়েলের মতো কাফেররা উপহাস করে রাসূল (সা.)-কে ‘আবতার’ (বংশহীন) বলেছিল, যার জবাবে আল্লাহ সূরা আল-কাওসার অবতীর্ণ করেন।
- ইব্রাহিম (إبراهيم): ৮ম হিজরীতে মদীনায় উম্মুল মুমিনীন হযরত মারিয়াতুল কিবতিয়াহ (রা.)-এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। ১৬ বা ১৮ মাস বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে ব্যথিত হয়ে রাসূল (সা.) বলেছিলেন: «إِنَّ الْعَيْنَ تَدْمَعُ، وَالْقَلْبَ يَحْزَنُ، وَلَا نَقُولُ إِلَّا مَا يَرْضَى رَبُّنَا» (চোখ অশ্রুসজল হয়, অন্তর শোকাহত হয়, কিন্তু আমরা মুখে তা-ই বলি যা আমাদের রবের সন্তুষ্টি লাভ করে)।
খ. কন্যা সন্তানগণ (৪ জন):
- হযরত যয়নব (زينب رضى الله عنها): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জ্যেষ্ঠ কন্যা। তাঁর বিবাহ হয়েছিল খালাতো ভাই আবুল আস ইবনে রাবীর সাথে। তিনি মদীনায় হিজরত করেন এবং ৮ম হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
- হযরত রুকাইয়্যাহ (رقية رضى الله عنها): দ্বিতীয় কন্যা। প্রথমে হযরত উসমান (রা.)-এর সাথে বিবাহ হয় এবং দু’জনে মিলে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। বদর যুদ্ধের বিজয়ের দিন ২য় হিজরীতে তিনি মদীনায় ওফাত পান।
- হযরত উম্মে কুলসুম (أم كلثوم رضى الله عنها): রুকাইয়্যাহ (রা.)-এর ওফাতের পর ৩য় হিজরীতে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে হযরত উসমান (রা.)-এর সাথে বিবাহ দেন। এ কারণে উসমান (রা.) ‘যুন্নূরাইন’ (দুই জ্যোতির অধিকারী) উপাধি পান। তিনি ৯ম হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
- সাইয়্যিদাতু নিসায়িল আলামীন হযরত ফাতিমাতুয যাহরা (فاطمة الزهراء رضى الله عنها): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কনিষ্ঠা ও সবচেয়ে আদরের কন্যা, জান্নাতের নারীদের নেত্রী। ২য় হিজরীতে হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রা.)-এর সাথে তাঁর বরকতময় বিবাহ হয়। তাঁদের ঘরেই জন্ম নেন ইসলামের দুই প্রদীপ্ত নক্ষত্র—ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (রা.)। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের মাত্র ছয় মাস পর ১১ হিজরীর ৩রা রমজান তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। তাঁর মাধ্যমেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বংশধারা পৃথিবীতে বিস্তৃত হয়েছে।
١٢- تحدث عن اخلاق النبى صلى الله عليه وسلم فى ضوء القرآن والسنة-
[১২. কুরআন ও হাদিসের আলোকে নবি করিম (স) এর চারিত্রিক গুণাবলি আলোচনা কর।]
ভূমিকা
বিশ্বজাহানের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, রাহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছিলেন চরিত্রমাধুর্য ও মানবীয় গুণাবলির সর্বোত্তম মূর্ত প্রতীক। অন্ধকার জাহেলী সমাজেও তিনি সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার কারণে সর্বসম্মতিক্রমে ‘আল-আমীন’ (বিশ্বস্ত) ও ‘আস-সাদিক্ব’ (সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।
১. কুরআনের আলোকে নববী চরিত্রের শ্রেষ্ঠত্ব
- আল্লাহ তা’আলার অনুপম প্রশংসাবাক্য: স্বয়ং রাব্বুল আলামীন তাঁর হাবীবের মহান চরিত্রের স্বীকৃতি দিয়ে ইরশাদ করেন:
﴿وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ﴾
অর্থ: “আর নিশ্চয়ই আপনি এক মহান ও সুউচ্চ চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত” (সূরা আল-কলম: ৪)।
- সর্বোত্তম আদর্শ (الأسوة الحسنة): সমগ্র মানবজাতির জন্য তাঁর জীবনকে অনুকরণীয় আদর্শ ঘোষণা করে কুরআন বলে: ﴿لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّـهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّـهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ﴾ (নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ – সূরা আল-আহযাব: ২১)।
- বিশ্বজগতের জন্য রহমত: ﴿وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ﴾ (আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি – সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭)।
২. সুন্নাহর আলোকে চারিত্রিক গুণাবলির বাস্তব রূপায়ন
- কুরআনই ছিল তাঁর জীবন্ত রূপ (كان خلقه القرآن): উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাযি.)-কে নবী করীম (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন: “তোমরা কি কুরআন তিলাওয়াত কর না? নিশ্চয়ই আল্লাহর নবীর চরিত্র ছিল স্বয়ং আল-কুরআন” (সহীহ মুসলিম: ৭৪৬)। অর্থাৎ কুরআনের নির্দেশ ও শিক্ষার নিখুঁত বাস্তবায়ন ছিল তাঁর চরিত্র।
- চারিত্রিক পূর্ণতা দানের মিশন: রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের আগমনের মূল উদ্দেশ্য ঘোষণা করে বলেন: «إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ» (নিশ্চয়ই আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্রের পরিপূর্ণতা সাধনের জন্য – মুসনাদে আহমদ: ৮৯৫২)।
- অনুপম ক্ষমা ও সহনশীলতা: তায়েফের রক্তক্ষয়ী নির্যাতনের পর পাহাড়ের ফেরেশতা এসে জনপদ দুটিকে ধ্বংস করার অনুমতি চাইলে তিনি বলেছিলেন: “না, বরং আমি আশা করি আল্লাহ তাদের বংশধরদের থেকে এমন মানুষ সৃষ্টি করবেন যারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে।” মক্কা বিজয়ে পরম শত্রুদের তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
- বিনয় ও অনাড়ম্বর জীবনযাত্রা: সমগ্র আরবের একচ্ছত্র অধিপতি হয়েও তিনি খেজুর পাতার পাটিতে ঘুমাতেন, যার দাগ তাঁর পিঠে বসে যেত। তিনি নিজের জুতো নিজে মেরামত করতেন, বকরির দুধ দোয়াতেন এবং কোনো অহংকার ছাড়াই সাধারণ গোলামদের সাথে বসে আহার করতেন।
- অধীনস্থ ও দুর্বলদের প্রতি স্নেহ: হযরত আনাস (রা.) বলেন: “আমি দীর্ঘ দশ বছর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করেছি। তিনি কখনও আমার প্রতি ‘উহ’ শব্দ পর্যন্ত করেননি এবং বলেননি—তুমি এ কাজ কেন করলে, বা অমুক কাজ কেন করলে না?” (সহীহ বুখারী)।
- ন্যায়বিচার ও সততা: কুরাইশের অভিজাত মাখযূম বংশের এক নারী চুরির অপরাধে ধরা পড়লে উসামা ইবনে যায়েদ সুপারিশ করতে আসেন। রাসূল (সা.) ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন: “তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো এই জন্য ধ্বংস হয়েছিল যে তাদের কোনো দুর্বল চুরি করলে দণ্ড দিত, আর অভিজাত ব্যক্তি চুরি করলে ছেড়ে দিত। আল্লাহর কসম! যদি আমার মেয়ে ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তারও হাত কাটার নির্দেশ দিতাম।”
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: আইয়ামে জাহেলিয়াত বলতে কোন সময়কে বোঝায়?
উত্তর: হযরত ঈসা (আ.)-এর আসমানে উত্তোলনের পর থেকে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়ত প্রাপ্তির পূর্ববর্তী অন্ধকার যুগকে সামাজিক ও ধর্মীয় অবক্ষয়ের কারণে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বলা হয়।
প্রশ্ন ২: মদীনা সনদকে কেন মানব ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান বলা হয়?
উত্তর: ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত মদীনা সনদে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার, বিচারিক স্বাধীনতা, যৌথ প্রতিরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় রূপরেখা সুস্পষ্ট আইনের আকারে লিখিতভাবে ধার্য করা হয়েছিল।
প্রশ্ন ৩: উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের প্রাথমিক বিজয় বিপর্যয়ে রূপ নেওয়ার মূল কারণ কী ছিল?
উত্তর: জাবালে রুমাত (তীরন্দাজদের টিলা)-এ মোতায়েন থাকা ৫০ জন তীরন্দাজের মধ্যে অধিকাংশের রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুস্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে গণিমতের লোভে স্থান ত্যাগ করা।
প্রশ্ন ৪: পবিত্র মি’রাজের রাতে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার কী ছিল?
উত্তর: দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, যার আমল পাঁচ ওয়াক্ত হলেও সওয়াবের দিক থেকে তা পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান সওয়াব বয়ে আনে।
প্রশ্ন ৫: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মোট সন্তান-সন্ততি কতজন ছিলেন?
উত্তর: বিশুদ্ধ মতানুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মোট সাতজন সন্তান ছিলেন—তিনজন পুত্র (কাসিম, আবদুল্লাহ ও ইব্রাহিম) এবং চারজন কন্যা (যয়নব, রুকাইয়্যাহ, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা রা.)।
প্রশ্ন ৬: হযরত আবু বকর (রা.)-কে কেন ‘আস-সিদ্দিক’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়?
উত্তর: মি’রাজের অলৌকিক ঘটনার কথা শুনে কাফেরদের চরম উপহাস ও অস্বীকারের বিপরীতে তিনি কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়াই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণীর ওপর অটল বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন।