পরীক্ষা কোড: ২০২ | বিষয় কোড: ২০৩২০৫ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৫৪
اختبار السنة الثانية للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ۲۰۲۱
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
বিভাগ: দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ (الدعوة والدراسات الإسلامية)
বিষয়: উলূমুল কুরআন (علوم القرآن)
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
مجموعة (الف) [‘ক’ অংশ – রচনামূলক প্রশ্নাবলি]
أجب عن أربعة من مجموعة (الف) (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও): মান: ১৫ × ৪ = ৬০
(পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ ও সর্বোচ্চ প্রস্তুতির স্বার্থে ‘ক’ অংশের ৬টি প্রশ্নেরই বিশদ সমাধান নিচে প্রস্তুত করা হলো):
١- عرف علوم القرآن- ثم اكتب تاريخ نشأتها وتطورها مفصلا-
[১. علوم القرآن এর পরিচয় দাও। উলূমুল কুরআন এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস বিস্তারিতভাবে লেখ।]
১. উলূমুল কুরআনের সংজ্ঞা ও পরিচয় (تعريف علوم القرآن)
শাব্দিক বিশ্লেষণ: ‘উলূমুল কুরআন’ (علوم القرآن) একটি যৌগিক শব্দগুচ্ছ (মুরাক্কাবে ইযাফী)। ‘উলূম’ (علوم) শব্দটি ‘ইলম’ (علم)-এর বহুবচন, যার আভিধানিক অর্থ জ্ঞান, শাস্ত্র বা বিজ্ঞানসমূহ। আর ‘আল-কুরআন’ (القرآن) হলো আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর দীর্ঘ ২৩ বছরে পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ সর্বশেষ মু’জিযাপূর্ণ অবিনশ্বর আসমানি কিতাব।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: উলূমুল কুরআনের সর্বজনগ্রাহ্য পারিভাষিক সংজ্ঞায় শায়খ মান্না’ আল-কাত্তান (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘মাবাহিস ফী উলূমিল কুরআন’ গ্রন্থে বলেন:
«عُلُومُ الْقُرْآنِ هُوَ الْعِلْمُ الَّذِي يَتَنَاوَلُ الْأَبْحَاثَ الْمُتَعَلِّقَةَ بِالْقُرْآنِ الْكَرِيمِ مِنْ حَيْثُ نُزُولُهُ، وَتَرْتِيبُهُ، وَجَمْعُهُ، وَكِتَابَتُهُ، وَقِرَاءَتُهُ، وَتَفْسِيرُهُ، وَإِعْجَازُهُ، وَنَاسِخُهُ وَمَنْسُوخُهُ، وَدَفْعُ الشُّبَهِ عَنْهُ، وَنَحْوُ ذَلِكَ»
অর্থ: “উলূমুল কুরআন হলো এমন একটি পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্র, যার মধ্যে কুরআনুল কারীমের নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট (শানে নুযূল), মক্কী ও মাদানী সূরাসমূহ, সংকলন, গ্রন্থায়ন ও লিখনপদ্ধতি, কিরাত ও পঠনরীতি, তাফসীর ও ব্যাখ্যাপদ্ধতি, অলৌকিকত্ব (ই’জায), নাসিখ ও মানসূখ, এবং কুরআন সম্পর্কিত যাবতীয় সন্দেহ-সংশয় নিরসন ইত্যাদি যাবতীয় গবেষণামূলক বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়।”
২. উলূমুল কুরআনের উৎপত্তি ও পর্যায়ক্রমিক ক্রমবিকাশের ইতিহাস
উলূমুল কুরআনের বিকাশ মানব ইতিহাসের অন্যতম সুসংহত ও ঐশ্বরিক জ্ঞানতাত্ত্বিক যাত্রা। নিম্নে এর প্রধান পর্যায়সমূহ আলোচনা করা হলো:
- প্রথম পর্যায়: নবুওয়ত ও সাহাবায়ে কেরামের যুগ (মৌখিক চর্চা ও ধারণকাল): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় ও সাহাবাদের যুগে উলূমুল কুরআন কোনো পুস্তকাকারে লিখিত শাস্ত্র ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম জন্মগতভাবে বিশুদ্ধ আরবি ভাষাজ্ঞানের অধিকারী ছিলেন এবং ওহী নাযিলের প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ায় শানে নুযূল ও বিধানসমূহের গভীর রহস্য অবগত ছিলেন। কোনো বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকলে তাঁরা সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করে নিতেন। সাহাবাদের মধ্যে তাফসীর ও কুরআনিক বিদ্যায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন চার খলিফা (আবু বকর, ওমর, উসমান ও আলী রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (যাঁকে ‘সুলতানুল মুফাসসিরীন’ বলা হয়), আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, উবাই ইবনে কা’ব এবং যায়েদ ইবনে সাবিত (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)।
- দ্বিতীয় পর্যায়: তাবেয়ীনদের যুগ (বিভিন্ন আঞ্চলিক পাঠশালা গঠন): ইসলামের ভৌগোলিক বিস্তৃতির সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েন এবং সেখানে তাফসীর ও উলূমুল কুরআনের বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ গড়ে ওঠে:
- মক্কার পাঠশালা: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর প্রখ্যাত ছাত্রগণ—মুজাহিদ, আতা ইবনে আবি রাবাহ, তাউস, ইকরামা প্রমুখ।
- মদীনার পাঠশালা: উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর বিশিষ্ট ছাত্রগণ—যায়েদ ইবনে আসলাম, আবুল আলিয়াহ, মুহাম্মদ ইবনে কা’ব আল-কুরাযী।
- ইরাকের পাঠশালা: হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর যোগ্য উত্তরসূরিগণ—আলক্বামাহ, আসওয়াদ, ইব্রাহিম নাখয়ী, হাসান বসরী ও কাতাদাহ (রহ.)।
- তৃতীয় পর্যায়: গ্রন্থায়নের সূচনা ও একক বিষয়ে গ্রন্থ রচনা (২য় ও ৩য় হিজরী শতাব্দী): দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীর শেষভাগ থেকে মুহাদ্দিসীনগণ হাদিস সংকলনের অংশ হিসেবে ‘কিতাবুত তাফসীর’ অধ্যায় সংযোজন শুরু করেন (যেমন ইমাম বুখারী, ওয়াকী’ ইবনুল জাররাহ ও সুফিয়ান ইবনে উয়ায়নাহ)। পরবর্তীতে কুরআনের একক বিষয়ের ওপর গ্রন্থ রচিত হতে থাকে; যেমন:
- আলী ইবনুল মাদীনী রচনা করেন ‘আসবাবুয নুযূল’।
- আবু উবাইদ কাসিম ইবনে সাল্লাম (ওফাত: ২২৪ হি.) রচনা করেন ‘আল-নাসিখ ওয়াল মানসূখ’ এবং ‘ফাদায়িলুল কুরআন’।
- ইবনু কুতাইবাহ রচনা করেন ‘তা’বীলু মুশকিলিল কুরআন’।
- আবু ইসহাক আয-যাজ্জাজ ও আল-ফারা’ রচনা করেন ‘মা’আনিল কুরআন’।
- চতুর্থ পর্যায়: সামগ্রিক বিশ্বকোষ প্রণয়ন ও উলূমুল কুরআনের পূর্ণাঙ্গ রূপ: পঞ্চম হিজরী শতাব্দীর পর থেকে উলূমুল কুরআনের সকল শাখাকে একত্রিত করে সমন্বিত বিশ্বকোষ জাতীয় বিশাল গ্রন্থ রচিত হতে শুরু করে:
- ইবনুল মারযাবান (রহ.) সর্বপ্রথম ‘আল-হাবী ফী উলূমিল কুরআন’ নাম দিয়ে গ্রন্থ রচনা করেন।
- আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী (ওফাত: ৭৯৪ হি.) রচনা করেন যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন’ (البرهان في علوم القرآن), যেখানে তিনি উলূমুল কুরআনের ৪৭টি পৃথক শাখা সুবিন্যস্ত করেন।
- ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (ওফাত: ৯১১ হি.) তাঁর সুবিখ্যাত মাস্টারপিস গ্রন্থ ‘আল-ইতক্বান ফী উলূমিল কুরআন’ (الإتقان في علوم القرآن) রচনা করেন, যাতে তিনি উলূমুল কুরআনের ৮০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংকলন করে শাস্ত্রটিকে পূর্ণতার চূড়ায় পৌঁছে দেন।
- আধুনিক যুগে শায়খ মুহাম্মদ আবদুল আযীম আয-যারক্বানীর ‘মানাহিলুল ইরফান ফী উলূমিল কুরআন’ এবং শায়খ মান্না’ আল-কাত্তানের ‘মাবাহিস ফী উলূমিল কুরআন’ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত।
٢- ما معنى الوحى؟ ثم بين أنواع الوحى وصور نزوله على محمد صلى الله عليه وسلم-
[২. وحی কাকে বলে? ওহি এর প্রকারভেদ এবং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর ওহি নাযিল হওয়ার পদ্ধতিসমূহ বর্ণনা কর।]
১. ওহীর সংজ্ঞা ও মর্মার্থ (معنى الوحي)
আভিধানিক অর্থ: ‘ওহী’ (الوَحْيُ) শব্দের মূল আভিধানিক অর্থ হলো অত্যন্ত দ্রুত, গোপনে ও নিঃশব্দে কোনো তথ্য বা সংকেত পৌঁছে দেওয়া (الإعلام الخفي السريع)। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ইশারা-ইঙ্গিত, স্বপ্ন, বা অন্তরে প্রক্ষিপ্ত ভাব।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় আল্লামা যারক্বানী বলেন:
«الْوَحْيُ هُوَ إِعْلَامُ اللَّـهِ تَعَالَى رَسُولاً مِنْ رُسُلِهِ بِحُكْمٍ شَرْعِيٍّ أَوْ نَحْوِهِ بِطَرِيقَةٍ سَرِيعَةٍ خَفِيَّةٍ غَيْرِ مُعْتَادَةٍ لِلْبَشَرِ»
অর্থ: “আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রেরিত কোনো রাসূলকে কোনো শরীয়তের বিধান, নির্দেশনা বা সংবাদ অতি দ্রুত ও সংগোপনে এমন অলৌকিক পদ্ধতিতে জানিয়ে দেওয়া, যা সাধারণ মানুষের স্বভাবজাত যোগাযোগের ঊর্ধ্বে—তাকে ওহী বলা হয়।”
২. ওহীর প্রকারভেদ (أنواع الوحي)
পবিত্র কুরআনের সূরা আশ-শূরার ৫১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা’আলা মানবজাতি ও স্রষ্টার মধ্যকার যোগাযোগের তিনটি মৌলিক মাধ্যম উল্লেখ করেছেন: ﴿وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللَّـهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ﴾। শরীয়তের বিচারে ওহী প্রধানত দুই প্রকার:
- ওহীয়ে মাতলূ (الوحي المتلو – পঠিত ওহী): যে ওহীর ভাব ও শব্দ উভয়ই সরাসরি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং যা নামাযে তিলাওয়াত করা ফরজ ও যার প্রতিটি হরফ পাঠে দশটি করে নেকি রয়েছে। এটিই হলো পবিত্র কুরআনুল কারীম। এটি চিরন্তন মু’জিযা এবং মানবজাতি এর সামান্যতম পরিবর্তনেরও কোনো ক্ষমতা রাখে না।
- ওহীয়ে গায়রে মাতলূ (الوحي غير المتلو – অপঠিত ওহী): যে ওহীর মূল মর্ম ও ভাব আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে রাসূল (সা.)-এর অন্তরে ঢেলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাসূল (সা.) নিজের প্রাঞ্জল নববী ভাষায় তা প্রকাশ করেছেন। এটিই হলো হাদীসে নববী বা সুন্নাহ। এটি নামাযে তিলাওয়াত করা হয় না, তবে কুরআনের মতোই এটি শরীয়তের অপরিহার্য অকাট্য হুজ্জত বা প্রমাণ।
৩. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর ওহী নাযিলের পদ্ধতিসমূহ (صور نزول الوحي)
সহীহ বুখারীর প্রথম হাদিস এবং সহীহ মুসলিমের দীর্ঘ বর্ণনানুসারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর একাধিক অলৌকিক পদ্ধতিতে ওহী নাযিল হতো:
- সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصالحة في المنام): নবুওয়তের সূচনাপর্বে ছয় মাসব্যাপী রাসূল (সা.) যে স্বপ্ন দেখতেন তা ভোরের উজ্জ্বল প্রভাতের ন্যায় অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হতো। আম্বিয়াদের স্বপ্ন ওহীর অন্তর্ভুক্ত।
- ঘণ্টার ধ্বনির ন্যায় গম্ভীর শব্দ (مثل صلصلة الجرس): এটি ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য সবচেয়ে কষ্টকর ও ভারী পদ্ধতি। বাতাসের তরঙ্গের মতো তীব্র ঘণ্টার ধ্বনি অনুভূত হতো এবং রাসূল (সা.) চরম মানসিক ও শারীরিক চাপ অনুভব করতেন। তীব্র শীতের দিনেও তাঁর ললাট থেকে মুক্তোর মতো ঘাম ঝরে পড়ত। তিনি উটের পিঠে আরোহণরত অবস্থায় এই ওহী আসলে উটটি ভার সইতে না পেরে মাটিতে বসে পড়ত।
- জিবরাঈল (আ.)-এর মানুষের সুরতে আগমন (تمثل الملك رجلاً): জিবরাঈল (আ.) একজন সুদর্শন ও পরিচ্ছন্ন যুবকের বেশে উপস্থিত হয়ে অত্যন্ত সাধারণ মানুষের মতো কথা বলতেন। অধিকাংশ সময় তিনি সাহাবী হযরত দাহিয়াতুল কালবী (রা.)-এর আকৃতিতে আসতেন (যেমন বিখ্যাত ‘হাদীসে জিবরাঈল’)। এটি ছিল সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি।
- জিবরাঈল (আ.)-এর স্বীয় আসল রূপ ধারণ (رؤية الملك على صورته الحقيقية): জিবরাঈল (আ.)-কে তাঁর মূল ছয়শত ডানাবিশিষ্ট দিগন্ত বিস্তৃত স্বর্গীয় আকৃতিতে রাসূল (সা.) জীবনে দুইবার প্রত্যক্ষ করেছিলেন—প্রথমবার হেরা গুহার পর মক্কার আকাশে, এবং দ্বিতীয়বার মি’রাজের রাতে সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে।
- অন্তরে প্রক্ষিপ্ত বাণী (النفث في الروع): কোনো প্রকাশ্য বাহ্যিক মাধ্যম ছাড়াই জিবরাঈল (আ.) রাসূল (সা.)-এর পবিত্র অন্তরে সরাসরি ওহীর বক্তব্য ফুঁকে দিতেন। রাসূল (সা.) বলতেন: «إِنَّ رُوحَ الْقُدُسِ نَفَثَ فِي رُوعِي أَنَّ نَفْسًا لَنْ تَمُوتَ حَتَّى تَسْتَكْمِلَ رِزْقَهَا» (নিশ্চয়ই জিবরাঈল আমার অন্তরে ফুঁকে দিয়েছেন যে, কোনো প্রাণীই তার জন্য নির্ধারিত রিযিক পূর্ণ না করে মৃত্যুবরণ করবে না)।
- পর্দার অন্তরাল থেকে প্রত্যক্ষ বাক্যালাপ (التكليم من وراء حجاب): আল্লাহ তা’আলা কোনো ফেরেশতার মাধ্যম ব্যতীত সরাসরি তাঁর রাসূলের সাথে কথা বলেছেন; যেমনটি মূসা (আ.)-এর সাথে তূর পর্বতে এবং আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-এর সাথে পবিত্র মি’রাজের রজনীতে আরশে আজীমে সংঘটিত হয়েছিল।
٣- زعموا “أن محمدًا صلى الله عليه وسلم ابتكر معاني القرآن الكريم وصاغ أسلوبه وليس وحيا يوحى” فند شبهتهم هذه بالحجج الدامقة-
[৩. ওহি অস্বীকারকারীরা বলে যে, “কুরআনের অর্থ ও শৈলী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উদ্ভাবিত, এটি কোনো ওহি নয়” তাদের এই সন্দেহ অকাট্য দলিল দ্বারা খণ্ডন কর।]
১. প্রাচ্যবিদ ও ওহী অস্বীকারকারীদের সন্দেহের সারসংক্ষেপ
ইসলামবিদ্বেষী প্রাচ্যবিদ (Orientalists), নাস্তিক ও ইসলামের সূচনালগ্নের কুরাইশ কাফেরদের এক সাধারণ অভিযোগ হলো—নাউযুবিল্লাহ, “মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছিলেন একজন প্রতিভাবান কবি, দূরদর্শী চিন্তাবিদ বা দার্শনিক। তিনি নিজেই কুরআনের গভীর অর্থসমূহ চিন্তা করে উদ্ভাবন করেছেন এবং আরবি ভাষার অলঙ্কারশৈলী দিয়ে তা নিজেই রচনা করেছেন; এটি কোনো আসমানি ওহী নয়।”
২. অকাট্য যুক্তি ও ঐতিহাসিক প্রমাণ দ্বারা এই সন্দেহের চূড়ান্ত খণ্ডন (الحجج الدامقة)
নিম্নে বুদ্ধিবৃত্তিক, ঐতিহাসিক ও পাঠভিত্তিক এমন কিছু অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হলো যা এই দাবিকে সমূলে উৎপাটিত করে:
- রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রাতিষ্ঠানিক নিরক্ষরতা (كونه نبياً أمياً):
রাসুলুল্লাহ (সা.) শৈশব থেকে চল্লিশ বছর পর্যন্ত মক্কাবাসীর চোখের সামনে বড় হয়েছেন। তিনি কোনো দিন কোনো শিক্ষক, পণ্ডিত বা কবির কাছে যাননি এবং লিখতে বা পড়তে জানতেন না। পবিত্র কুরআন স্বীয় শত্রুদের সামনে চ্যালেঞ্জ করে বলে:﴿وَمَا كُنْتَ تَتْلُو مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ ۖ إِذًا لَارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ﴾
অর্থ: “আপনি তো এর পূর্বে কোনো কিতাব পাঠ করেননি এবং নিজ হাতে কোনো কিতাব লেখেননি; যদি করতেন তবে সত্য অস্বীকারকারীরা সন্দেহ পোষণ করতে পারত” (সূরা আল-আনকাবূত: ৪৮)। যিনি একটি বর্ণও লিখতে শেখেননি, তাঁর পক্ষে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য ও জ্ঞানসমৃদ্ধ গ্রন্থ রচনা করা অসম্ভব।
- তৎকালীন শীর্ষ বাগ্মীদের অপারগতা ও কুরআনের উন্মুক্ত চ্যালেঞ্জ (عجز فصحاء العرب):
তৎকালীন আরবরা ছিল ভাষার অলঙ্কার, কবিতা ও বাগ্মিতায় পৃথিবীর অদ্বিতীয় জাতি। তারা কাবার দেয়ালে ঝুলন্ত সপ্তগীতিকা (সাব’আ মু’আল্লাক্বাত) নিয়ে গর্ব করত। কুরআন তাদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল—যদি এটি মুহাম্মদের স্বরচিত হয়, তবে তোমরা সবাই মিলে এর অনুরূপ একটি সূরাও রচনা করে আন: ﴿فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّـهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ﴾ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৩)। তারা নিজেদের সমস্ত মেধা ও অহংকার বিলীন করেও একটি ক্ষুদ্রতম সূরার অনুরূপ রচনা করতে পারেনি। আরবরা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হতে রাজি হয়েছিল, কিন্তু কুরআনের একটি সূরার মোকাবিলা করতে পারেনি। যদি মুহাম্মদ (সা.) একজন সাধারণ আরব হয়ে তা রচনা করতে পারতেন, তবে আরবের শত শত কবি-সাহিত্যিক কেন একটি বাক্যও বানাতে পারল না? - কুরআনের ভাষা বনাম হাদিসের ভাষার আকাশ-পাতাল ব্যবধান (المفارقة الأسلوبية):
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহস্র হাদীসে নববী বিশ্বকোষগুলোতে সংকলিত আছে। একজন মানুষের নিজস্ব রচনাশৈলী যতই উন্নত হোক না কেন, তার নিজস্ব কথার একটি অভিন্ন ঢং থাকে। কিন্তু কুরআনের অনন্য সুর, গম্ভীর ধ্বনিমাধুর্য ও অলৌকিক বালাগাতের সাথে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীসের বাক্যশৈলীর কোনো মিল নেই। আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিক কম্পিউটার বিশ্লেষণেও প্রমাণিত হয়েছে যে হাদীসের শব্দবিন্যাস এবং কুরআনের বাক্যকাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি সত্তা থেকে উৎসারিত। - কুরআনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কঠোর ভর্ৎসনা ও সতর্কবার্তা (العتاب الرباني للنبي):
কোনো মিথ্যাবাদী বা নিজের রচিত গ্রন্থের লেখক কখনই নিজের গ্রন্থে নিজের ভুল সংশোধন, অনুযোগ বা জনসমক্ষে ভর্ৎসনা অন্তর্ভুক্ত করে না। কিন্তু কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বহু আয়াতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে অনুযোগ করেছেন; যেমন:- অন্ধ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর আগমনে ভ্রু কুঁচকানোর কারণে সূরা আবাসায় তীব্র তিরস্কার: ﴿عَبَسَ وَتَوَلَّىٰ ¤ أَنْ جَاءَهُ الْأَعْمَىٰ﴾।
- বদরের বন্দীদের বিষয়ে: ﴿مَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَىٰ حَتَّىٰ يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ﴾।
- স্ত্রীগণের সন্তুষ্টির জন্য মধু বর্জনের ঘটনায়: ﴿يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّـهُ لَكَ﴾ (সূরা আত-তাহরীম: ১)।
যদি কুরআন মুহাম্মদের স্বরচিত হতো, তবে তিনি কখনই নিজের বিরুদ্ধাচরণমূলক এই আয়াতগুলো সংরক্ষণ ও কিয়ামত পর্যন্ত তিলাওয়াতের জন্য লিপিবদ্ধ করতেন না।
- ওহী বিলম্বিত হওয়ার ব্যাকুলতা ও সংকট মুহূর্ত (احتباس الوحي):
মক্কায় কাফেররা যখন আসহাবে কাহাফ ও যুলকারনাইন সম্পর্কে প্রশ্ন করল, রাসূল (সা.) বললেন “আগামীকাল উত্তর দেব”, কিন্তু ‘ইনশাআল্লাহ’ বলতে ভুলে যান। ফলে দীর্ঘ ১৫ দিন ওহী বন্ধ থাকে। তিনি কাফেরদের উপহাসে চরম মনোকষ্টে ছিলেন। যদি কুরআন তাঁর স্বরচিত হতো, তবে তিনি তাৎক্ষণিক বানিয়ে উত্তর দিতেন, ১৫ দিন ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করতেন না। অনুরূপভাবে হযরত আয়েশা (রা.)-এর ওপর অপবাদের (ইফকের ঘটনা) সময় দীর্ঘ এক মাস ওহী আসেনি এবং তিনি প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায় কেঁদেছেন; অবশেষে আল্লাহ সূরা নূরে ওহী নাযিল করে আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা ঘোষণা করেন। - আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে বিস্ময়কর ঐকমত্য:
কুরআনে বর্ণিত মহাবিশ্বের আদি বিন্দু বিস্ফোরণ (বিগ ব্যাং), মহাশূন্যের ক্রমান্বয়ে বিস্তার, সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকার ও অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ, এবং মানুষের ভ্রূণ বিকাশের সূক্ষ্ম স্তরসমূহ এমন সব সত্য যা আধুনিক উন্নত মাইক্রোস্কোপ ও স্যাটেলাইট ছাড়া জানা সম্ভব নয়। মরুভূমির নিরক্ষর নবীর পক্ষে এগুলো ১৪০০ বছর পূর্বে কল্পনা করা অসম্ভব; এটি কেবল সর্বজ্ঞানী স্রষ্টার ওহী দ্বারাই সম্ভব।
٤- اكتب دوافع وخصائص جمع القرآن الكريم في عهد أبى بكر رضى الله عنه-
[৪. আবু বকর (রা) এর যুগে কুরআন সংকলনের কারণ ও বৈশিষ্ট্যসমূহ বিস্তারিতভাবে লেখ।]
১. আবু বকর (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলনের ঐতিহাসিক পটভূমি ও কারণসমূহ (الدوافع)
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওফাতের সময় সম্পূর্ণ কুরআন সাহাবাদের সিনায় হাফেয হিসেবে সংরক্ষিত ছিল এবং বিচ্ছিন্নভাবে চামড়া, খেজুরের ডাল ও পাথরের ফলকে লিখিত ছিল, কিন্তু একক খণ্ডে বাঁধাইকৃত ছিল না। হযরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতকালে কুরআন সংকলনের প্রধান কারণগুলো ছিল:
- ভণ্ড নবীদের বিরুদ্ধে ইয়ামামার যুদ্ধ ও হাফেযদের শাহাদাত: ১২ হিজরীতে কুখ্যাত ভণ্ড নবী মুসায়লামাতুল কাযযাবের বিরুদ্ধে ইয়ামামার রক্তক্ষয়ী প্রান্তরে প্রায় ৭০ জন (মতান্তরে কয়েকশত) শীর্ষস্থানীয় হাফেযে কুরআন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন।
- হযরত ওমর (রা.)-এর দূরদর্শী উদ্যোগ: এত বিপুল সংখ্যক হাফেয সাহাবীর শাহাদাতে হযরত ওমর (রা.) গভীর শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি খলিফা আবু বকর (রা.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে প্রস্তাব দেন: “ইয়ামামার যুদ্ধে হাফেযদের শাহাদাতের ফলে কুরআনের বহু অংশ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অতএব আপনি অবিলম্বে সমগ্র কুরআন একত্রিত করে গ্রন্থাকারে সংকলনের রাষ্ট্রীয় নির্দেশ দিন।”
- আবু বকর (রা.)-এর প্রাথমিক দ্বিধা ও বক্ষ উন্মোচন: আবু বকর (রা.) প্রথমে বলেছিলেন: “যে কাজ রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বীয় জীবদ্দশায় করেননি, সে কাজ আমি কীভাবে করব?” কিন্তু ওমর (রা.) বললেন: “আল্লাহর কসম! এতেই দ্বীনের মহা কল্যাণ নিহিত।” ওমর (রা.) বারবার বোঝানোর পর আল্লাহ আবু বকর (রা.)-এর অন্তরকে এই ঐতিহাসিক কাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।
২. সংকলনের অনন্য পদ্ধতি ও বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص ومنهجية الجمع)
হযরত আবু বকর (রা.)-এর নির্দেশনায় কুরআন সংকলনে এক অভূতপূর্ব, কঠোর ও বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়:
- প্রধান সংকলক হিসেবে যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে দায়িত্ব প্রদান: হযরত যায়েদ (রা.) ছিলেন তরুণ, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রধান ওহী লেখক এবং স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের বছর জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে শেষ কুরআন পঠনে (আর্দায়ে আখিরাহ) উপস্থিত থাকা ব্যক্তি। আবু বকর (রা.) তাঁকে বলেন: “তুমি বুদ্ধিমান যুবক, তোমার আমানতদারিতা প্রশ্নাতীত; সুতরাং তুমি কুরআনের সমস্ত পাণ্ডুলিপি অনুসন্ধান করে সংকলন কর।”
- কঠোর দ্বৈত সাক্ষ্য ও প্রমাণনীতি (الشهادتان): যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) কেবল নিজের মুখস্থ স্মৃতির ওপর কিংবা অন্য হাফেযদের স্মৃতির ওপর নির্ভর করেননি। বরং তিনি শর্তারোপ করেন যে—প্রতিটি আয়াত অবশ্যই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে লিখিত হতে হবে এবং অন্তত দুজন নির্ভরযোগ্য ন্যায়পরায়ণ সাহাবীর মৌখিক সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে যে এটি নবীর সামনেই হুবহু লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল।
- সর্বশেষ দুই আয়াত প্রাপ্তি: সূরা আত-তাওবার শেষ দুটি আয়াত (﴿لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ…﴾) কেবল প্রবীণ সাহাবী খুযাইমাহ ইবনে সাবিত আল-আনসারী (রা.)-এর নিকট লিখিত পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবদ্দশায় কোনো এক ঘটনায় খুযাইমার একক সাক্ষ্যকে দুজনের সাক্ষ্যের সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছিলেন; ফলে তা দ্বৈত সাক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হয়।
- ঐকমত্যের ভিত্তিতে অনুমোদন (الإجماع): পুরো কুরআন সংকলনকালে মদীনার মসজিদে নববীতে প্রকাশ্যে সাহাবায়ে কেরামের সামনে তা যাচাই-বাছাই করা হয় এবং সকল বদরী ও আনসার-মুহাজির সাহাবীর সর্বসম্মত ঐকমত্যের ভিত্তিতে এটি প্রামাণ্য রূপ লাভ করে।
- একক বাঁধানো খণ্ড প্রস্তুত (المصحف البكري): বিচ্ছিন্ন চামড়া ও ফলক থেকে সমগ্র কুরআন সমান মাপের পাতায় নিখুঁতভাবে লিখে চামড়ার আবরণে একীভূত খণ্ডে রূপ দেওয়া হয়। এই সংকলনটি খলিফা আবু বকর (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল, তাঁর ওফাতের পর ওমর (রা.)-এর কাছে এবং পরবর্তীতে উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা.)-এর তত্ত্বাবধানে সুরক্ষিত রাখা হয়।
٥- عرف النسخ ثم اكتب أهميته وأنواعه وأدلة جوازه مفصلا-
[৫. نسخ এর সংজ্ঞা দাও। নসখ এর গুরুত্ব, প্রকারভেদ এবং তা জায়েজ হওয়ার দলিলসমূহ বিস্তারিতভাবে লেখ।]
১. নসখের সংজ্ঞা ও পরিচয় (تعريف النسخ)
আভিধানিক অর্থ: ‘নসখ’ (النَّسْخُ) শব্দের দুটি প্রধান আভিধানিক অর্থ রয়েছে: (১) বিলুপ্ত করা, দূর করা বা রহিত করা (الإزالة والرفع); যেমন: نَسَخَتِ الشَّمْسُ الظِّلَّ (সূর্য ছায়াকে দূরীভূত করেছে); এবং (২) নকল করা বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অবিকল স্থানান্তর করা (النقل والتحويل); যেমন: نَسَخْتُ الْكِتَابَ (আমি বইটি প্রতিলিপি করেছি)।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলে ফিকহ ও উলূমুল কুরআনের পরিভাষায় আল্লামা ইবনুল হাজিব ও সুয়ূতী (রহ.) বলেন:
«النَّسْخُ هُوَ رَفْعُ حُكْمٍ شَرْعِيٍّ بِدَلِيلٍ شَرْعِيٍّ مُتَرَاخٍ عَنْهُ»
অর্থ: “পরবর্তীকালে অবতীর্ণ কোনো প্রামাণ্য শারয়ী দলীল দ্বারা পূর্ববর্তী কোনো শারয়ী বিধানকে রহিত বা প্রত্যাহার করে নেওয়ার নামই হলো নসখ।” যে বিধানটি রহিত হয় তাকে ‘মানসূখ’ (المنسوخ) এবং যা দ্বারা রহিত হয় তাকে ‘নাসিখ’ (الناسخ) বলা হয়।
২. উলূমুল কুরআনে নসখ জানার গুরুত্ব
- হালাল ও হারামের বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি: কোনো আলেম বা মুফতির পক্ষে কুরআনের নাসিখ ও মানসূখ আয়াত না জেনে ফতোয়া প্রদান করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (রা.) এক ব্যক্তিকে মসজিদে নসীহত করতে দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “তুমি কি নাসিখ ও মানসূখ সম্পর্কে জান?” সে বলল: “না।” আলী (রা.) বললেন: “তবে তুমি নিজেও ধ্বংস হয়েছ এবং অন্যকেও ধ্বংস করেছ!”
- শরীয়তের ক্রমবিকাশ ও হেকমত অনুধাবন: নসখের মাধ্যমে বোঝা যায় কীভাবে আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য প্রাথমিক কঠিন অবস্থা থেকে সহজ ও পূর্ণাঙ্গ বিধানের দিকে ধাবিত করেছেন (যেমন মদ্যপানের ক্রমান্বয়ে নিষেধাজ্ঞা)।
৩. নসখ জায়েয বা বৈধ হওয়ার শারয়ী ও যুক্তিভিত্তিক দলীলসমূহ (أدلة جواز النسخ)
মু’তাযিলাদের একাংশ ও ইহুদিরা নসখ অস্বীকার করে বলে যে নসখ মানলে আল্লাহর অজ্ঞতা (বদা) প্রমাণিত হয়। কিন্তু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের মতে নসখ সম্পূর্ণরূপে বৈধ ও বাস্তবায়িত। এর দলীলসমূহ:
- পবিত্র কুরআনের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা:
﴿مَا نَنْسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنْسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِنْهَا أَوْ مِثْلِهَا ۗ أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّـهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ﴾
অর্থ: “আমি কোনো আয়াত রহিত করলে কিংবা তা বিস্মৃত করিয়ে দিলে, তার চেয়ে উত্তম অথবা তার অনুরূপ আয়াত এনে দিই। তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান?” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১০৬)। অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: ﴿وَإِذَا بَدَّلْنَا آيَةً مَكَانَ آيَةٍ ۙ وَاللَّـهُ أَعْلَمُ بِمَا يُنَزِّلُ قَالُوا إِنَّمَا أَنْتَ مُفْتَرٍ﴾ (সূরা আন-নাহল: ১০১)।
- পূর্ববর্তী শরীয়তের বিধান বাতিল: সমস্ত আসমানি কিতাব স্বীকার করে যে এক নবীর শরীয়তের বিধান পরবর্তী নবীর শরীয়ত দ্বারা রহিত হয়েছে (যেমন তাওরাতের কিছু খাবার যা বনী ইসরাঈলের জন্য হারাম ছিল তা কুরআনে হালাল করা হয়েছে)। এটিই নসখের বাস্তব প্রমাণ।
- যুক্তির নিরিখে দলীল: বিধান পরিবর্তন আল্লাহর অজ্ঞতা নয়, বরং মানুষের অবস্থা পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে। একজন দক্ষ চিকিৎসক যেমন রোগীর রোগের ক্রমোন্নতির সাথে সাথে পূর্বের ঔষধ বদলে নতুন কার্যকর ঔষধ দেন, বিশ্বজাহানের পালনকর্তা আল্লাহ তা’আলাও বান্দার মানসিক ও সামাজিক অগ্রগতির স্বার্থে উপযোগী বিধান নির্ধারণ করেছেন।
৪. কুরআনে নসখের প্রধান প্রকারভেদ (أنواع النسخ في القرآن)
কুরআনে নসখ প্রধানত তিনটি প্রকারে সংঘটিত হয়েছে:
- বিধান রহিত কিন্তু তিলাওয়াত বহাল (نسخ الحكم وبقاء التلاوة): এটি কুরআনে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। অর্থাৎ আয়াতটি কুরআনে তিলাওয়াত করা হয় কিন্তু তার আমল বা আইনি হুকুম রহিত। যেমন: বিধবা নারীর ক্ষেত্রে প্রথমে এক বছরের ভরণপোষণ ও ঘরে অবস্থানের নির্দেশ ছিল (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৪০), যা পরবর্তীতে চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালনের বিধান (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৩৪) দ্বারা রহিত হয়ে যায়।
- তিলাওয়াত রহিত কিন্তু বিধান বহাল (نسخ التلاوة وبقاء الحكم): যে আয়াতের শব্দসমূহ কুরআন থেকে তিলাওয়াত হিসেবে বিলুপ্ত করা হয়েছে, কিন্তু তার আইনি দণ্ড শরীয়ত হিসেবে বলবৎ রয়েছে। যেমন: বিবাহিত নারী-পুরুষ ব্যভিচার করলে পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ডের বিধান (আয়াতুর রজম): «الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ إِذَا زَنَيَا فَارْجُمُوهُمَا أَلْبَتَّةَ»। এটি কুরআনের তিলাওয়াত থেকে রহিত হলেও এর বিধান সুন্নাহর ইজমা দ্বারা কিয়ামত পর্যন্ত বহাল।
- তিলাওয়াত ও বিধান উভয়ই রহিত (نسخ التلاوة والحكم معاً): যে আয়াতের শব্দ ও হুকুম উভয়ই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। যেমন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বর্ণিত দশবার দুধপানের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হওয়ার বিধান, যা পরবর্তীতে পাঁচবারে এবং পরিশেষে তিলাওয়াত থেকে রহিত হয়।
٦- ماذا تعرف عن إعجاز القرآن؟ ثم اكتب أنواع إعجاز القرآن بالأمثلة-
[৬. إعجاز القرآن বলতে কী বুঝ? ই’যাজুল কুরআন এর প্রকারসমূহ উদাহরণসহ লেখ।]
১. ই’জাযুল কুরআনের ধারণা ও সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘ই’জায’ (الإعجاز) শব্দটি عجز (আযয) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ অক্ষম করা, অপারগ করে দেওয়া, বা পরাভূত করা। আর ‘মু’জিযা’ (المعجزة) হলো এমন অলৌকিক নিদর্শন যা মানবজাতির সাধারণ ক্ষমতার বাইরে এবং যা কোনো নবীর নবুওয়তের সত্যতার সমর্থনে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদর্শিত হয়।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: উলূমুল কুরআনের পরিভাষায় আল্লামা যারকাশী বলেন:
«إِعْجَازُ الْقُرْآنِ هُوَ إِثْبَاتُ عَجْزِ الْخَلْقِ جَمِيعًا عَنِ الْإِتْيَانِ بِمِثْلِهِ أَوْ بِمِثْلِ سُورَةٍ مِنْهُ مَعَ تَوَفُّرِ دَوَاعِيهِمْ وَتَحَدِّي الْقُرْآنِ لَهُمْ»
অর্থ: “পবিত্র কুরআনের ই’জায হলো—কুরআনের উন্মুক্ত চ্যালেঞ্জ এবং শত্রুদের চরম বিরোধিতার তীব্র প্রেরণা থাকা সত্ত্বেও সমগ্র মানব ও দানব জাতিকে কুরআনের সমকক্ষ বা এর একটি সূরার সমকক্ষ কোনো কালাম রচনা করতে চিরকালের জন্য সম্পূর্ণরূপে অক্ষম ও ব্যর্থ প্রমাণ করা।”
২. ই’জাযুল কুরআনের প্রধান প্রকারসমূহ ও উদাহরণ (أنواع الإعجاز بالأمثلة)
- ভাষাতাত্ত্বিক ও অলঙ্কারশাস্ত্রীয় অলৌকিকতা (الإعجاز البياني واللغوي):
কুরআনের সুরমাধুর্য, শব্দচয়ন, রূপক ও বাক্যালঙ্কার মানব রচিত যে কোনো সাহিত্যের ঊর্ধ্বে।- উদাহরণ: সূরা আল-বাক্বারার ১৭৯ নম্বর আয়াত: ﴿وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ﴾ (হে বুদ্ধিমানগণ! কিসাসের মধ্যেই তোমাদের জন্য জীবন নিহিত রয়েছে)। তৎকালীন আরবরা এই অর্থ বোঝাতে বলত: “الْقَتْلُ أَنْفَى لِلْقَتْلِ” (হত্যাই হত্যার পথ রুদ্ধ করে)। কিন্তু কুরআনের সংক্ষিপ্ত শব্দচয়ন, ছন্দের নিখুঁত বিন্যাস এবং অর্থের গভীরতা আরব সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রূপকেও শতগুণে অতিক্রম করেছে।
- অদৃশ্য ও ঐতিহাসিক সংবাদের অলৌকিকতা (الإعجاز الغيبي والتاريخي):
রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো ইতিহাসবিদ ছিলেন না, কিন্তু কুরআন অতীতের হাজার বছরের বিলুপ্ত জাতি এবং ভবিষ্যতের সংবাদের এমন নিখুঁত বিবরণ দিয়েছে যা হুবহু সত্য প্রমাণিত হয়েছে।- অতীতের উদাহরণ: ফেরাউনের ডুবে মরার মুহূর্তে কুরআনের ঘোষণা: ﴿فَالْيَوْمَ نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لِمَنْ خَلْفَكَ آيَةً﴾ (সুতরাং আজ আমি তোমার দেহটিকে রক্ষা করব যাতে তুমি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিদর্শন হতে পার – সূরা ইউনুস: ৯২)। বিংশ শতাব্দীতে লোহিত সাগরের তলদেশে মমি আবিষ্কৃত হয়ে প্রমাণ করে যে ফেরাউনের দেহ অক্ষত রয়েছে।
- ভবিষ্যতের উদাহরণ: পারস্যের কাছে শক্তিশালী রোমকদের শোচনীয় পরাজয়ের পর কুরআনের অগ্রিম ঘোষণা: ﴿غُلِبَتِ الرُّومُ ¤ فِي أَدْنَى الْأَرْضِ وَهُمْ مِنْ بَعْدِ غَلَبِهِمْ سَيَغْلِبُونَ ¤ فِي بِضْعِ سِنِينَ﴾ (সূরা আর-রূম: ২-৪)। ঠিক সাত বছরের মাথায় রোমানরা পুনরায় পারস্যকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়।
- আইনগত ও বিধানিক অলৌকিকতা (الإعجاز التشريعي):
কুরআন এমন এক সার্বজনীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান উপহার দিয়েছে যা মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও মুক্তির গ্যারান্টি দেয়।- উদাহরণ: কুরআনের মীরাস বা উত্তরাধিকার আইন (সূরা আন-নিসা: ১১-১২), পারিবারিক বিবাহ ও তালাকের বিধান, যাকাত ও সুদমুক্ত অর্থনীতি এবং ফৌজদারি দণ্ডবিধি। মানব রচিত শত সহস্র আইন প্রতি যুগে পরিবর্তিত হলেও কুরআনিক আইন ১৪০০ বছর ধরে অপরিবর্তিত থেকেও সমাজকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদানে সক্ষম।
- বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা (الإعجاز العلمي):
আধুনিক বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে প্রমাণিত হয়েছে যে কুরআনে বর্ণিত মহাজাগতিক ও প্রাকৃতিক সৃষ্টিতত্ত্ব বিজ্ঞানের সাথে শতভাগ সঙ্গতিপূর্ণ।- উদাহরণ ১ (মহাবিশ্বের উৎপত্তি): ﴿أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا﴾ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৩০) — যা আধুনিক বিজ্ঞানের বিগ ব্যাং (Big Bang) তত্ত্বের হুবহু প্রতিচ্ছবি।
- উদাহরণ ২ (মাতৃগর্ভে ভ্রূণ গঠন): সূরা আল-মুমিনূনের ১২-১৪ আয়াতে বর্ণিত বীর্যবিন্দু (নুতফাহ) থেকে রক্তপিণ্ড (আলাক্বাহ), মাংসপিণ্ড (মুদগাহ), হাড় গঠন এবং গোশত পরানোর ধারাবাহিক ধাপ আধুনিক এমব্রায়োলজি (ভ্রূণবিদ্যা)-র সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়।
مجموعة (ب) [‘খ’ অংশ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি]
أجب عن أربعة من مجموعة (ب) (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও): মান: ৫ × ৪ = ২০
(পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ ও সর্বোচ্চ প্রস্তুতির স্বার্থে ‘খ’ অংশের ৬টি প্রশ্নেরই বিশদ সমাধান নিচে প্রস্তুত করা হলো):
٧- اكتب أوصاف القرآن الكريم-
[৭. কুরআন কারীম এর গুণবাচক নামসমূহ লেখ।]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআন কেবল একটি নামেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহ তা’আলা এর মর্যাদা, গভীরতা ও প্রভাব বুঝানোর জন্য বহু বরকতময় গুণবাচক নাম ও বৈশিষ্ট্য (আওসাফ) উল্লেখ করেছেন। আল্লামা যারকাশী ‘আল-বুরহান’ গ্রন্থে কুরআনের ৫৫টিরও বেশি গুণবাচক নাম সংকলন করেছেন।
কুরআনের প্রধান প্রধান গুণবাচক নাম ও বৈশিষ্ট্যসমূহ
- আল-কিতাব (الكتاب – গ্রন্থ): লিখিত ও সুবিন্যস্ত রূপ নির্দেশ করে। ﴿ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ﴾ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২)।
- আল-ফুরক্বান (الفرقان – সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী): সত্য ও বাতিলের মাঝে সুস্পষ্ট প্রভেদকারী। ﴿تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ﴾ (সূরা আল-ফুরক্বান: ১)।
- আয-যিক্র (الذكر – উপদেশ ও স্মারক): অন্তরের স্মরণ ও মর্যাদার বাণী। ﴿إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ﴾ (সূরা আল-হিজর: ৯)।
- আন-নূর (النور – জ্যোতি): জাহেলিয়াত ও কুফরের অন্ধকার দূরকারী আলোকবর্তিকা। ﴿وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُبِينًا﴾ (সূরা আন-নিসা: ১৭৪)।
- আল-হুদা (الهدى – পথপ্রদর্শক): মানবজাতির ইহ ও পরলৌকিক মুক্তির দিশারী। ﴿هُدًى لِلْمُتَّقِينَ﴾।
- আশ-শিফা (الشفاء – আরোগ্যকারী): অন্তরের সংশয়, রোগ ও আত্মিক ব্যাধির মহৌষধ। ﴿وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ﴾ (সূরা আল-ইসরা: ৮২)।
- আল-হাকীম (الحكيم – প্রজ্ঞাময়): গভীর প্রজ্ঞা ও যুক্তিপূর্ণ বাণী। ﴿يس ¤ وَالْقُرْآنِ الْحَكِيمِ﴾।
- আল-মুবারাক (المبارك – বরকতময়): অফুরন্ত কল্যাণ ও বরকতের উৎস। ﴿كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ﴾ (সূরা সোয়াদ: ২৯)।
٨- تحدث عن فوائد نزول القرآن منجمًا-
[৮. কুরআন ধীরে ধীরে নাযিল হওয়ার উপকারিতাসমূহ বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
পূর্ববর্তী অন্যান্য আসমানি কিতাবসমূহ (তাওরাত, ইনজীল) এককালীন ফলক বা পুস্তকে অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু পবিত্র কুরআনকে মহান আল্লাহ দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অল্প অল্প করে (منجماً) নাযিল করেছেন। কাফেররা এর ওপর আপত্তি তুলেছিল: ﴿لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً﴾ (তার ওপর সম্পূর্ণ কুরআন একবারে অবতীর্ণ হলো না কেন?)। এর জবাবে কুরআন বহু প্রজ্ঞাময় উপকারিতা স্পষ্ট করেছে:
ধীরে ধীরে নাযিল হওয়ার প্রধান উপকারিতাসমূহ (الفوائد والحكم)
- রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র অন্তরকে সুদৃঢ় রাখা (تثبيت فؤاد النبي): কাফেরদের তীব্র বিরোধিতা, নির্যাতন ও উপহাসের মুখে যখনই রাসূল (সা.) মনোকষ্টে ভুগতেন, তখনই সান্ত্বনা ও উৎসাহ দিয়ে নতুন আয়াত নাযিল হতো। আল্লাহ বলেন: ﴿كَذَٰلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ ۖ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلًا﴾ (সূরা আল-ফুরক্বান: ৩২)।
- সহজে মুখস্থকরণ ও ধারণ (تيسير حفظه وفهمه): আরবরা ছিল অধিকাংশে নিরক্ষর। একবারে পুরো কিতাব অবতীর্ণ হলে মুখস্থ করা অসম্ভব হতো। কয়েক আয়াত করে নাযিল হওয়ায় সাহাবায়ে কেরাম তা সহজে মুখস্থ করতেন এবং জীবনে প্রয়োগ করতেন।
- বিধানের পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন (التدرج في التشريع): দীর্ঘদিনের জাহেলী পাপাচারে অভ্যস্ত জাতিকে এক আঘাতে সমস্ত অভ্যাস ত্যাগ করতে বাধ্য করা সম্ভব ছিল না। যেমন মদ ও জুয়ার ওপর প্রথমে অপকারিতা বর্ণনা, পরে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাযে নিষেধ, এবং পরিশেষে চিরতরে হারাম ঘোষণা করা হয়।
- সময়োপযোগী প্রশ্নের তাৎক্ষণিক সমাধান ও সংকট নিরসন: সাহাবা বা কাফেরদের বহু জটিল প্রশ্ন (যেমন রূহ, যুলকারনাইন, কিবলা পরিবর্তন) এবং যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিতে আল্লাহ তাৎক্ষণিক ওহী নাযিল করে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতেন।
- কুরআনের অলৌকিক উৎসের প্রমাণ: দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বিভিন্ন যুদ্ধ, শান্তি, আনন্দ ও শোকের পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সময় অবতীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও পুরো কুরআনের আয়াতসমূহের মধ্যে বিন্দুমাত্র বৈপরীত্য বা অসঙ্গতি নেই: ﴿وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّـهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا﴾ (সূরা আন-নিসা: ৮২)।
٩- أذكر أقسام التفسير-
[৯. তাফসির এর প্রকারগুলো উল্লেখ কর।]
১. তাফসীরের সংজ্ঞা
‘তাফসীর’ (التفسير) শব্দটি الفسر থেকে উদ্ভূত, যার আভিধানিক অর্থ স্পষ্ট করা, উম্মোচন করা বা ব্যাখ্যা করা। পরিভাষায় আল-কুরআনের আয়াতসমূহের অন্তর্নিহিত অর্থ, শানে নুযূল, ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ও শরীয়তের হুকুম-আহকাম উদঘাটনের শাস্ত্রকে তাফসীর বলা হয়।
২. পদ্ধতি ও উৎসের বিচারে তাফসীরের প্রধান প্রকারভেদ
- আত-তাফসীর বিল-মা’সূর (التفسير بالمأثور – বর্ণনাভিত্তিক তাফসীর):
কুরআনের কোনো আয়াতকে অপর আয়াত দ্বারা, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহীহ হাদীস দ্বারা, সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দ্বারা এবং শীর্ষ তাবেয়ীনদের উদ্ধৃতি দ্বারা ব্যাখ্যা করার পদ্ধতি। এটি তাফসীরের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক বিশুদ্ধ ভিত্তি।- বিখ্যাত গ্রন্থাবলি: ইমাম তাবারীর ‘জামেউল বায়ান’, ইমাম ইবনে কাসীরের ‘তাফসীরুল কুরআনিল আযীম’, ইমাম বাগাভীর ‘মা’আলিমুত তানযীল’, এবং সুয়ূতীর ‘আদ-দুররুল মানসূর’।
- আত-তাফসীর বির-রা’য় (التفسير بالرأي – যুক্তি ও ভাষাগত গবেষণামূলক তাফসীর):
কুরআন ও হাদিসের মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে আরবি ভাষা, অলঙ্কারশাস্ত্র, শব্দতত্ত্ব ও যুক্তিনির্ভর গভীর ইজতিহাদের মাধ্যমে কৃত ব্যাখ্যা। এটি দুই প্রকার:- রা’য়ে মাহমূদ (প্রশংসনীয়): যা শরীয়তের সীমানার মধ্যে কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সঙ্গতি রেখে রচিত হয়। যেমন: ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর ‘মাফাতিহুল গায়ব’ (তাফসীরে কাবীর), আল্লামা নাসাফীর ‘মাদারিকুত তানযীল’, আল্লামা বায়াযাবীর ‘আনওয়ারুত তানযীল’, এবং আল্লামা আলুসী প্রণীত ‘রূহুল মা’আনী’।
- রা’য়ে মাযমুম (নিন্দনীয়): কোনো দলীল বা ভাষাগত জ্ঞান ছাড়াই নিছক মনগড়া কুপ্রবৃত্তি ও ভ্রান্ত মতবাদ প্রমাণের জন্য অপব্যাখ্যা করা। এটি হাদীসে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
- আত-তাফসীরুল ইশারী (التفسير الإشاري – আধ্যাত্মিক বা ইঙ্গিতপূর্ণ তাফসীর):
বাহ্যিক অর্থকে অক্ষুণ্ণ রেখে আধ্যাত্মিক সাধক ও আলেমগণের অন্তরে প্রস্ফুটিত গভীর রূপক ও আত্মিক হেকমতের ব্যাখ্যা। যেমন: সাহলুত তুসতারীর তাফসীর এবং নিশাপূরীর ‘গারায়িবুল কুরআন’। - আত-তাফসীরুল মাওদূ’ঈ (التفسير الموضوعي – বিষয়ভিত্তিক তাফসীর):
আধুনিক যুগের এক জনপ্রিয় পদ্ধতি, যেখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয় (যেমন মানব সৃষ্টি, অর্থনীতি, নারী অধিকার) নিয়ে কুরআনের সমস্ত আয়াত একত্রিত করে সমন্বিত গবেষণা উপস্থাপন করা হয়।
١٠- بين أحكام النون الساكنة والميم الساكنة ممثلا-
[১০. নূন সাকিন ও মিম সাকিন এর বিধানসমূহ উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
১. নূন সাকিন ও তানভীনের বিধান (أحكام النون الساكنة والتنوين)
জযমযুক্ত নূন (نْ) এবং তানভীন (ً ٍ ٌ)-এর পর আরবি হরফ আসার ভিত্তিতে তাজবীদের নিয়ম মোট চারটি:
- ইযহার (الإظهار – স্পষ্ট করে পড়া): নূন সাকিন বা তানভীনের পর হরফে হলক্বীর ৬টি অক্ষরের (ء، هـ، ع، ح، غ، خ) কোনো একটি আসলে গুন্নাহ ছাড়া স্পষ্ট উচ্চারণে পড়তে হয়। যেমন: مَنْ آمَنَ, أَنْعَمْتَ, عَلِيمٌ حَكِيمٌ।
- ইদগাম (الإدغام – মিলিয়ে পড়া): এর পর ‘ইয়ারমালূন’ (يَرْمَلُون) অর্থাৎ (ي، ر، م، ل، و، ن)-এর কোনো হরফ আসলে মিলিয়ে পড়তে হয়। এটি দুই প্রকার:
- ইদগাম মা’আল গুন্নাহ (গুন্নাহসহ): ৪টি হরফ (ي، ن، م، و – يَنْمُو)। যেমন: مَنْ يَقُولُ, مِنْ مَالٍ।
- ইদগাম বিলা গুন্নাহ (গুন্নাহ ছাড়া): ২টি হরফ (ل، ر)। যেমন: مِنْ رَبِّهِمْ, مِنْ لَدُنْهُ।
- ইক্বলাব (الإقلاب – পরিবর্তন করে পড়া): নূন সাকিন বা তানভীনের পর কেবল ‘বা’ (ب) অক্ষর আসলে নূনকে একটি ছোট মীম (م) দ্বারা পরিবর্তন করে গুন্নাহসহ পড়তে হয়। যেমন: مِنْ بَعْدِ (উচ্চারণ: মিম বা’দি), عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ।
- ইখফা (الإخفاء – গোপন করে গুন্নাহ করা): উপরোক্ত ১৩টি হরফ ব্যতীত বাকি ১৫টি হরফের (ت، ث، ج، د، ذ، ز، س، ش، ص، ض، ط، ظ، ف، ق، ك) কোনোটি আসলে নূনকে নাকের বাঁশিতে লুকিয়ে ১ আলিফ পরিমাণ গুন্নাহসহ পড়তে হয়। যেমন: مَنْ كَانَ, أَنْفُسَكُمْ, مِنْ دُونِ اللَّـهِ।
২. মীম সাকিনের বিধান (أحكام الميم الساكنة)
জযমযুক্ত মীম (مْ)-এর পরবর্তী অক্ষরের ভিত্তিতে এর বিধান তিনটি:
- ইখফায়ে শাফাবী (الإخفاء الشفوي – ওষ্ঠের গোপন গুন্নাহ): মীম সাকিনের পর কেবল ‘বা’ (ب) আসলে ঠোঁট দুটি নরমভাবে মিলিয়ে গুন্নাহর সাথে ইখফা করতে হয়। যেমন: تَرْمِيهِمْ بِحِجَارَةٍ, وَهُمْ بِالْآخِرَةِ।
- ইদগামে শাফাবী / মেছলাইন (الإدغام الشفوي): মীম সাকিনের পর দ্বিতীয় আরেকটি হরকতমুক্ত মীম (م) আসলে প্রথম মীমকে দ্বিতীয় মীমে মিলিয়ে তাশদীদসহ গুন্নাহ করে পড়তে হয়। যেমন: لَهُمْ مَّا يَشَاءُونَ, فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ।
- ইযহারে শাফাবী (الإظهار الشفوي – ওষ্ঠের স্পষ্ট উচ্চারণ): বা (ب) ও মীম (م) ব্যতীত বাকি ২৬টি হরফের যে কোনোটি আসলে মীম সাকিনকে বিন্দুমাত্র গুন্নাহ ছাড়া অত্যন্ত পরিষ্কার ও স্পষ্ট করে পড়তে হয় (বিশেষ করে ‘ফ’ ও ‘ওয়াও’ অক্ষরের পূর্বে সতর্ক থাকা জরুরি)। যেমন: أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ, هُمْ فِيهَا, لَكُمْ دِينُكُمْ।
١١- ما معنى المد؟ اكتب أنواع المد بالأمثلة-
[১১. المد অর্থ কী? المد এর প্রকারগুলো উদাহরণসহ লেখ।]
১. মাদ্দের পরিচয় ও হরফসমূহ (معنى المد وحروفه)
আভিধানিক অর্থ: ‘মাদ্দ’ (المَدُّ) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বৃদ্ধি করা, টেনে লম্বা করা বা দীর্ঘায়িত করা (الزيادة والمط)।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইলমুত তাজবীদের পরিভাষায় হরফে মাদ্দের ধ্বনিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ সময় দীর্ঘ করে টানার পদ্ধতিকে মাদ্দ বলা হয়।
হরফে মাদ্দ তিনটি: (১) আলিফ সাকিন যার পূর্বের অক্ষরে যবর থাকে (যেমন: بَا); (২) ওয়াও সাকিন যার পূর্বের অক্ষরে পেশ থাকে (যেমন: بُو); (৩) ইয়া সাকিন যার পূর্বের অক্ষরে যের থাকে (যেমন: بِي)। এই তিনটি হরফ نُوحِيهَا শব্দের মধ্যে একত্র হয়েছে।
২. মাদ্দের প্রধান প্রকারভেদ ও উদাহরণ (أقسام المد)
মাদ্দ প্রধানত দুই প্রকার:
১. মাদ্দে আসলীয়্যাহ বা তাবি’ঈ (المد الأصلي / الطبيعي):
যে মাদ্দের ক্ষেত্রে হরফে মাদ্দের পর হামযাহ বা সুকুনের মতো কোনো অতিরিক্ত কারণ থাকে না, বরং সাধারণ নিয়মে স্বাভাবিকভাবে এক আলিফ পরিমাণ (দুই হরকত) টানতে হয়। যেমন: قَالَ, يَقُولُ, قِيلَ।
২. মাদ্দে ফার’ঈ (المد الفرعي – শাখাগত মাদ্দ):
হরফে মাদ্দের পর হামযাহ (ء) অথবা সুকুন (وْ/ ّ) আসার কারণে এক আলিফের চেয়ে বেশি (৩, ৪ বা ৬ হরকত) টানতে হয়। এর প্রধান প্রকারগুলো নিম্নরূপ:
- মাদ্দে মুত্তাসিল (المد المتصل): হরফে মাদ্দ এবং তার পরবর্তী হামযাহ একই শব্দের মধ্যে যুক্ত থাকলে তাকে মাদ্দে মুত্তাসিল বলে। এটি ৪ বা ৫ হরকত টেনে পড়া ওয়াজিব। যেমন: جَاءَ, السَّمَاءِ, سُوءَ, سِيئَتْ।
- মাদ্দে মুনফাসিল (المد المنفصل): হরফে মাদ্দ প্রথম শব্দের শেষে এবং পরবর্তী হামযাহ দ্বিতীয় শব্দের শুরুতে পৃথকভাবে আসলে তাকে মাদ্দে মুনফাসিল বলে। এটি ৩ বা ৪ হরকত টেনে পড়া যায়েয। যেমন: إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ, قُوا أَنْفُسَكُمْ, فِي أَنْفُسِكُمْ।
- মাদ্দে লাযিম (المد اللازم): হরফে মাদ্দের পর শব্দে আসল বা স্থায়ী সুকুন অথবা তাশদীদ আসলে তাকে মাদ্দে লাযিম বলে। এটি ৬ হরকত (তিন আলিফ) পূর্ণমাত্রায় টেনে পড়া আবশ্যক। যেমন:
- লাযিম কিলমী মুসাক্ক্বাল (শব্দে তাশদীদ): الضَّالِّينَ, الحَاقَّةُ।
- লাযিম কিলমী মুখাফফাফ (শব্দে সাকিন): آلْآنَ।
- লাযিম হারফী (হুরুফে মুকাত্তায়াত): الم (লাম ও মীম), ق, ص।
- মাদ্দে ‘আরিয লিস-সুকুন (المد العارض للسكون): হরফে মাদ্দের পরবর্তী অক্ষরে ওয়াকফ (থামা)-এর কারণে সাময়িকভাবে সাকিন সৃষ্টি হলে তাকে মাদ্দে ‘আরিয বলে। এটি ১, ২ বা ৩ আলিফ টেনে পড়া যায়। যেমন: الرَّحِيمِ (ওয়াকফে: আর-রাহী-ম), العَالَمِينَ, نَسْتَعِينُ।
- মাদ্দে লীন (مد اللين): লীন অক্ষরের (যবরযুক্ত অক্ষরের পর ওয়াও সাকিন বা ইয়া সাকিন) পরবর্তী অক্ষরে ওয়াকফের কারণে সাকিন হলে। যেমন: خَوْفٍ, بَيْتٍ, قُرَيْشٍ।
١٢- اكتب من حفظك سورة مما يلى: (الف) سورة البروج (ب) سورة الشمس (ج) سورة الطارق
[১২. নিচের যে কোনো একটি সূরা মুখস্ত লেখ: মান: ৫]
(পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির স্বার্থে তিনটি সূরারই বিশুদ্ধ আরবি পাঠ এবং প্রামাণ্য বাংলা রূপান্তর নিম্নে প্রদত্ত হলো):
(الف) سورة البروج (সূরা আল-বুরূজ – মক্কী সূরা, আয়াত সংখ্যা: ২২)
﴿وَالسَّمَاءِ ذَاتِ الْبُرُوجِ ¤ وَالْيَوْمِ الْمَوْعُودِ ¤ وَشَاهِدٍ وَمَشْهُودٍ ¤ قُتِلَ أَصْحَابُ الْأُخْدُودِ ¤ النَّارِ ذَاتِ الْوَقُودِ ¤ إِذْ هُمْ عَلَيْهَا قُعُودٌ ¤ وَهُمْ عَلَىٰ مَا يَفْعَلُونَ بِالْمُؤْمِنِينَ شُهُودٌ ¤ وَمَا نَقَمُوا مِنْهُمْ إِلَّا أَنْ يُؤْمِنُوا بِاللَّـهِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ ¤ الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ وَاللَّـهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ ¤ إِنَّ الَّذِينَ فَتَنُوا الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَتُوبُوا فَلَهُمْ عَذَابُ جَهَنَّمَ وَلَهُمْ عَذَابُ الْحَرِيقِ ¤ إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْكَبِيرُ ¤ إِنَّ بَطْشَ رَبِّكَ لَشَدِيدٌ ¤ إِنَّهُ هُوَ يُبْدِئُ وَيُعِيدُ ¤ وَهُوَ الْغَفُورُ الْوَدُودُ ¤ ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيدُ ¤ فَعَّالٌ لِمَا يُرِيدُ ¤ هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ الْجُنُودِ ¤ فِرْعَوْنَ وَثَمُودَ ¤ بَلِ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي تَكْذِيبٍ ¤ وَاللَّـهُ مِنْ وَرَائِهِمْ مُحِيطٌ ¤ بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيدٌ ¤ فِي لَوْحٍ مَحْفُوظٍ﴾
সারগর্ভ অর্থ ও শিক্ষা: শপথ গ্রহ-নক্ষত্রশোভিত আকাশের এবং প্রতিশ্রুতি দিবসের। অভিশপ্ত হয়েছিল অগ্নিকুণ্ডের অধিপতিরা, যখন তারা মুমিনদের ওপর নির্যাতন প্রত্যক্ষ করছিল শুধু এ কারণে যে তারা পরাক্রমশালী প্রশংসিত আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছিল। নিশ্চয়ই যারা মুমিন নর-নারীদের ওপর জুলুম করে তওবা করেনি, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দহন শাস্তি; আর যারা ঈমান এনে সৎকাজ করেছে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। বস্তুত আপনার রবের পাকড়াও অতি কঠোর। এটি মহা সম্মানিত কুরআন, যা লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত।
(ب) سورة الشمس (সূরা আশ-শামস – মক্কী সূরা, আয়াত সংখ্যা: ১৫)
﴿وَالشَّمْسِ وَضُحَاهَا ¤ وَالْقَمَرِ إِذَا تَلَاهَا ¤ وَالنَّهَارِ إِذَا جَلَّاهَا ¤ وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَاهَا ¤ وَالسَّمَاءِ وَمَا بَنَاهَا ¤ وَالْأَرْضِ وَمَا طَحَاهَا ¤ وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا ¤ فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا ¤ قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا ¤ وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا ¤ كَذَّبَتْ ثَمُودُ بِطَغْوَاهَا ¤ إِذِ انْبَعَثَ أَشْقَاهَا ¤ فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللَّـهِ نَاقَةَ اللَّـهِ وَسُقْيَاهَا ¤ فَكَذَّبُوهُ فَعَقَرُوهَا فَدَمْدَمَ عَلَيْهِمْ رَبُّهُمْ بِذَنْبِهِمْ فَسَوَّاهَا ¤ وَلَا يَخَافُ عُقْبَاهَا﴾
সারগর্ভ অর্থ ও শিক্ষা: শপথ সূর্যের ও তার দীপ্তির, চন্দ্রের যখন তা সূর্যের পশ্চাতে আসে, দিবসের যখন তা সূর্যকে উদ্ভাসিত করে, রাত্রির যখন তা আচ্ছন্ন করে, আকাশের এবং তার সুনিপুণ নির্মাতার, পৃথিবীর ও তার বিস্তৃতির, এবং মানব আত্মার ও যিনি তাকে সুঠাম করেছেন। অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। নিশ্চয়ই সে-ই সফলকাম হয়েছে যে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে, আর সে-ই ব্যর্থ হয়েছে যে আত্মাকে কলুষিত করেছে। সামূদ জাতি স্বীয় অবাধ্যতার কারণে নবীর বাণী অমান্য করে আল্লাহর উষ্ট্রীকে হত্যা করেছিল; ফলে তাদের রব তাদের ওপর ধ্বংসের আজাব নামিয়ে একাকার করে দেন।
(ج) سورة الطارق (সূরা আত-তারিক্ব – মক্কী সূরা, আয়াত সংখ্যা: ১৭)
﴿وَالسَّمَاءِ وَالطَّارِقِ ¤ وَمَا أَدْرَاكَ مَا الطَّارِقُ ¤ النَّجْمُ الثَّاقِبُ ¤ إِنْ كُلُّ نَفْسٍ لَمَّا عَلَيْهَا حَافِظٌ ¤ فَلْيَنْظُرِ الْإِنْسَانُ مِمَّ خُلِقَ ¤ خُلِقَ مِنْ مَاءٍ دَافِقٍ ¤ يَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ ¤ إِنَّهُ عَلَىٰ رَجْعِهِ لَقَادِرٌ ¤ يَوْمَ تُبْلَى السَّرَائِرُ ¤ فَمَا لَهُ مِنْ قُوَّةٍ وَلَا نَاصِرٍ ¤ وَالسَّمَاءِ ذَاتِ الرَّجْعِ ¤ وَالْأَرْضِ ذَاتِ الصَّدْعِ ¤ إِنَّهُ لَقَوْلٌ فَصْلٌ ¤ وَمَا هُوَ بِالْهَزْلِ ¤ إِنَّهُمْ يَكِيدُونَ كَيْدًا ¤ وَأَكِيدُ كَيْدًا ¤ فَمَهِّلِ الْكَافِرِينَ أَمْهِلْهُمْ رُوَيْدًا﴾
সারগর্ভ অর্থ ও শিক্ষা: শপথ আকাশের এবং রাত্রিতে প্রকাশমান তারকার; আপনি কি জানেন রাত্রিতে প্রকাশমান বস্তুটি কী? তা উজ্জ্বল তীব্র আলোকচ্ছটাময় তারকা। প্রতিটি জীবের ওপরই এক সতর্ক অভিভাবক রয়েছে। মানুষের লক্ষ্য করা উচিত কী বস্তু থেকে সে সৃষ্ট হয়েছে—এক সবেগে নির্গত তরল থেকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষকে পুনরুত্থিত করতে পূর্ণ সক্ষম। সেই দিন অন্তরের গোপন রহস্য ফাঁস হয়ে যাবে। শপথ বৃষ্টিবর্ষী আকাশের এবং উদ্ভিদের জন্য বিদীর্ণ পৃথিবীর; নিশ্চয়ই এই কুরআন এক মীমাংসাকারী বাণী, এটা কোনো তামাশা নয়। কাফেররা গভীর চক্রান্ত করছে, আর আমিও কৌশল করছি; অতএব কাফেরদের সামান্য অবকাশ দিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: উলূমুল কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্লাসিক্যাল বিশ্বকোষ গ্রন্থ কোনটি?
উত্তর: আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) প্রণীত ‘আল-ইতক্বান ফী উলূমিল কুরআন’ (الإتقان في علوم القرآن), যেখানে উলূমুল কুরআনের ৮০টি প্রধান বিষয় সংকলিত হয়েছে।
প্রশ্ন ২: ওহীয়ে মাতলূ ও ওহীয়ে গায়রে মাতলূর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
উত্তর: ওহীয়ে মাতলূ হলো আল-কুরআন, যার শব্দ ও ভাব উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং যা নামাযে তিলাওয়াত করা ফরজ; পক্ষান্তরে ওহীয়ে গায়রে মাতলূ হলো হাদীসে নববী, যার মর্মার্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে কিন্তু প্রকাশভঙ্গি রাসূল (সা.)-এর ভাষায় এবং তা নামাযে তিলাওয়াত করা হয় না।
প্রশ্ন ৩: হযরত আবু বকর (রা.)-এর সংকলনে কুরআন সংরক্ষণের প্রধান মানদণ্ড কী ছিল?
উত্তর: কেবল স্মৃতির ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি আয়াত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে লিখিত হওয়ার চাক্ষুষ প্রমাণ এবং অন্তত দুজন বিশ্বস্ত সাহাবীর প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য গ্রহণ নিশ্চিত করা।
প্রশ্ন ৪: কুরআনে নসখ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: শরীয়তের কোনো পূর্ববর্তী বিধানকে পরবর্তীকালে অবতীর্ণ কোনো প্রামাণ্য শারয়ী দলীল দ্বারা প্রত্যাহার বা রহিত করাকে নসখ বলা হয়।
প্রশ্ন ৫: নূন সাকিন ও তানভীনের বিধান কয়টি?
উত্তর: মোট চারটি: ইযহার (স্পষ্ট করা), ইদগাম (মিলিয়ে পড়া), ইক্বলাব (মীম দ্বারা পরিবর্তন করা), এবং ইখফা (নাকের বাঁশিতে লুকিয়ে গুন্নাহ করা)।
প্রশ্ন ৬: কেন কুরআন এককালীন নাযিল না হয়ে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে নাযিল হয়েছিল?
উত্তর: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র অন্তরকে সুদৃঢ় রাখা, সাহাবীদের সহজে মুখস্থ ও অনুধাবনে সহায়তা করা, বিধানসমূহ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন সংকট ও প্রশ্নের সময়োপযোগী সমাধান প্রদানের সুবিধার্থে।