اختبار السنة الثانية لتفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ۲۰۱۹م
الدعوة والدراسات الإسلامية
تاريخ الدعوة الإسلامية [কোর্স কোড: 203202]
الزمن: ٤ ساعات | الدرجات الكاملة: ۸۰
مجموعة (ألف) [ক-বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি]
١- تحدث عن تاريخ دعوة الرسول صلى الله عليه وسلم في مكة المكرمة
الدعوة النبوية في العهد المكي / মক্কা মুকাররমায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দাওয়াতের ইতিহাস
নবুয়ত লাভের পর থেকে মদিনায় হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ তেরো বছর মক্কা মুকাররমায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ যে অবিরাম দাওয়াতী সংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন, তা ইসলামের ইতিহাসে ‘মাক্কী জীবনের দাওয়াত’ নামে পরিচিত। জাহিলিয়্যাতের ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত পৌত্তলিক কুরাইশ সমাজের বিরুদ্ধে তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতের দাওয়াত পৌঁছে দিতে তাঁকে অবর্ণনীয় ত্যাগ ও পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে মক্কী দাওয়াতের ইতিহাসকে প্রধানত দুটি মৌলিক পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়:
১. গোপন দাওয়াতের পর্যায় (الدعوة السرية):
নবুয়তের প্রথম তিন বছর রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও সতর্কতার সাথে গোপনে ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের নিকট ইসলামের দাওয়াত উপস্থাপন করেন।
- সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ: নারীদের মাঝে উম্মুল মুমিনীন খাদিজা (রা.), পুরুষদের মাঝে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), কিশোরদের মাঝে হযরত আলী (রা.) এবং দাসদের মাঝে হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আবু বকর (রা.)-এর দাওয়াতে উসমান ইবনে আফফান, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ এবং সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ দ্বীন গ্রহণ করেন।
- দারুল আরকাম (প্রথম দাওয়াতী কেন্দ্র): গোপন দাওয়াতী কার্যক্রম ও নবদীক্ষিত মুসলমানদের প্রশিক্ষণের কেন্দ্র হিসেবে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত হযরত আরকাম ইবনে আবিল আরকাম (রা.)-এর বাড়িকে নির্বাচন করা হয়। সেখানে গোপনে কুরআন তিলাওয়াত, তাযকিয়াহ এবং দ্বীনের তালিম প্রদান করা হতো।
২. প্রকাশ্য দাওয়াতের পর্যায় (الدعوة الجهرية):
তিন বছর গোপন দাওয়াতের পর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রকাশ্য দাওয়াতের নির্দেশ নাযিল হয়: ﴿فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ﴾ (অতএব আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন তা প্রকাশ্যে প্রচার করুন এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন)।
- নিকটাত্মীয়দের মাঝে দাওয়াত: সর্বপ্রথম আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দেন: ﴿وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ﴾। রাসূলুল্লাহ ﷺ বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রকে একত্রিত করে দাওয়াত পেশ করেন। আবু লাহাব তীব্র বিরোধিতা করলেও হযরত আলী (রা.) দৃঢ় সমর্থন ঘোষণা করেন।
- সাফা পাহাড়ের চূড়ায় উদাত্ত আহ্বান: প্রকাশ্য দাওয়াতের অংশ হিসেবে রাসূলুল্লাহ ﷺ সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে কুরাইশদের সকল শাখাকে সমবেত করে সত্যবাদিতার শপথ স্মরণ করিয়ে তাওহীদের দাওয়াত দেন। আবু লাহাব অভিশাপ বর্ষণ করলে সূরা লাহাব নাযিল হয়।
- নির্যাতন ও নিপীড়ন: প্রকাশ্য দাওয়াত শুরুর সাথে সাথেই কুরাইশরা দাঈ ও নতুন মুসলমানদের ওপর নির্মম অত্যাচার শুরু করে। বিলাল (রা.), খাব্বাব (রা.), সুমাইয়াহ (রা.) প্রমুখ সাহাবীদের ওপর বর্বরোচিত নির্যাতন চালানো হয়। সুমাইয়াহ (রা.) ইসলামের প্রথম শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
- হাবশায় হিজরত (৬১৫ খ্রি.): অত্যাচার সহ্যসীমার বাইরে চলে গেলে রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবাদের আবিসিনিয়ার (হাবশা) ন্যায়পরায়ণ খ্রিস্টান বাদশাহ নাজ্জাশীর নিকট হিজরতের নির্দেশ দেন। সেখানে জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.) বাদশাহর দরবারে ইসলামের সুমহান আদর্শ তুলে ধরেন।
- বয়কট বা শিয়াবে আবু তালিবে বন্দিত্ব (৬১৭-৬১৯ খ্রি.): কুরাইশরা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবকে শিয়াবে আবু তালিবে তিন বছর অবরুদ্ধ করে রাখে। চরম খাদ্যসংকটে গাছের পাতা খেয়ে তাঁরা দিনাতিপাত করেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ দাওয়াত বন্ধ করেননি।
- আমুল হুযন (দুঃখের বছর) ও তায়েফের দাওয়াত (৬১৯ খ্রি.): আবু তালিব ও খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর নবীজি ﷺ আশ্রয় ও দাওয়াতের উদ্দেশ্যে তায়েফে গমন করেন। কিন্তু তায়েফবাসী তাঁকে পাথর নিক্ষেপ করে রক্তাক্ত করে। চরম বিপদেও তিনি তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করেন।
- ইসরা ও মিরাজ এবং বিভিন্ন গোত্রে দাওয়াত: মিরাজের অলৌকিক ঘটনার পর হজের মৌসুমে আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত গোত্রগুলোর তাঁবুতে তাঁবুতে গিয়ে নবীজি ﷺ ইসলামের দাওয়াত দেন। এরই ধারাবাহিকতায় মদিনার বনু খাযরাজ গোত্রের লোকজনের সাথে সাক্ষাত হয়।
- আকাবাহর বাইয়াত ও হিজরতের ভিত্তি: একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ নবুয়ত বর্ষে আকাবার তিনটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক বাইয়াতের মাধ্যমে মদিনাবাসী ইসলামের সুরক্ষা ও দাওয়াতের দায়িত্ব গ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে সফল হিজরত ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত করে।
٢- من هم الصحابة؟ وما فضلهم؟ بيّن مساهمتهم في نشر الدعوة الإسلامية
تعريف الصحابة وفضلهم ومساهمتهم في نشر الدعوة / সাহাবাদের পরিচয়, তাঁদের মর্যাদা এবং দাওয়াত প্রসারে তাঁদের অবদান
১. সাহাবীর পারিভাষিক পরিচয়:
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ইসাবাহ ফি তাময়ীযিস সাহাবাহ’-তে সাহাবীর সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা দিয়ে উল্লেখ করেছেন:
«الصَّحَابِيُّ: مَنْ لَقِيَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُؤْمِنًا بِهِ، وَمَاتَ عَلَى الإِسْلَامِ»
ভাষান্তর: “সাহাবী হলেন সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যিনি ঈমান অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাক্ষাত বা সাহচর্য লাভ করেছেন এবং ইসলামের ওপরই মৃত্যুবরণ করেছেন।” এতে অন্ধ সাহাবীগণও অন্তর্ভুক্ত হন এবং সাময়িক ধর্মত্যাগের পর পুনরায় তওবা করে ইসলামে প্রত্যাবর্তনকারীও সাহাবী হিসেবে গণ্য হন।
২. সাহাবায়ে কিরামের সুমহান মর্যাদা (فضل الصحابة):
পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিলে সাহাবায়ে কিরামের শ্রেষ্ঠত্ব সাব্যস্ত:
- আল্লাহর সন্তুষ্টির সনদ (তাযকিয়াহ): আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: ﴿وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ﴾ (মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট – সূরা আত-তাওবাহ: ১০০)।
- উম্মতের শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম: রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «خَيْرُ أُمَّتِي قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ» (আমার উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম হলো আমার যুগের সাহাবীগণ, অতঃপর তাদের পরবর্তী প্রজন্ম, অতঃপর তাদের পরবর্তী প্রজন্ম – সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
- সাহাবাদের সম্মান রক্ষার নির্দেশ: নবীজি ﷺ সতর্ক করে বলেছেন: «لَا تَسُبُّوا أَصْحَابِي، فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ» (তোমরা আমার সাহাবীদের গালি দিও না; যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ, তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও ব্যয় করে, তবে তাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ ব্যয়ের সমকক্ষ হতে পারবে না – সহীহ বুখারী)।
৩. ইসলামি দাওয়াত প্রচার ও প্রসারে সাহাবাদের অবদান (مساهمتهم في نشر الدعوة):
- কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভুল সংরক্ষণ ও প্রচার: সাহাবায়ে কিরামই ওহীর প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতিটি বাণী, কর্ম ও অনুমোদন মুখস্থ করে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমানতদারিতার সাথে পৌঁছে দিয়েছেন।
- জীবন ও সম্পদের চূড়ান্ত কোরবানি: বদর, উহুদ, খন্দক, মুতা এবং তাবুকসহ সকল অভিযানে সাহাবীগণ নিজেদের রক্ত দিয়ে তাওহীদের ঝাণ্ডা সমুন্নত রেখেছেন। হযরত আবু বকর, উসমান ও আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) অকাতরে তাঁদের সমগ্র সম্পদ দ্বীনের দাওয়াত ও জিহাদের পথে দান করেছেন।
- বিশ্বব্যাপী দাওয়াতী কাফেলা পরিচালনা: খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে সাহাবীগণ শাম (সিরিয়া), ইরাক, পারস্য, মিসর, উত্তর আফ্রিকা, রোম সাম্রাজ্যের সীমান্ত এবং মধ্য এশিয়ায় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন। প্রায় এক লক্ষ চব্বিশ হাজার সাহাবীর মধ্যে মাত্র দশ হাজারের কবর মক্কা-মদিনায় রয়েছে; অবশিষ্ট সাহাবীগণ দাওয়াতের কাজে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিলেন।
- নৈতিক চরিত্রের মাধ্যমে হৃদয় জয়: সাহাবীগণ কেবল তলোয়ার দিয়ে দেশ জয় করেননি, বরং তাঁদের অনুপম সততা, আমানতদারিতা, ইনসাফ ও বিনম্র ব্যবহারের মাধ্যমে অমুসলিমদের হৃদয় জয় করে কোটি কোটি মানুষকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আনয়ন করেন।
٣- اكتب نبذة من حياة أبي بكر الصديق رضي الله عنه مع بيان خدماته في الدعوة الإسلامية
سيرة أبي بكر الصديق رضي الله عنه وخدماته للدعوة / হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর জীবনী ও দাওয়াতে তাঁর ঐতিহাসিক অবদান
১. সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও প্রাক-ইসলামিক জীবন:
ইসলামের প্রথম খলিফা এবং সাহাবায়ে কিরামের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। তাঁর নাম আবদুল্লাহ, উপনাম আবু বকর, উপাধি ‘সিদ্দিক’ (সত্যবাদী) ও ‘আতীক’ (জাহান্নাম থেকে মুক্ত)। পিতার নাম উসমান (আবু কুহাফা) এবং মাতার নাম সালমা (উম্মুল খায়ের)। তিনি ৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের বনু তাইম শাখায় জন্মগ্রহণ করেন। জাহিলিয়্যাতের যুগেও তিনি মদ, জুয়া ও মূর্তিপূজা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সজ্জন ব্যবসায়ী এবং নসববিদ্যায় পারদর্শী শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব।
২. ইসলাম গ্রহণ ও মাক্কী জীবনে দাওয়াতী ভূমিকা:
- প্রথম পুরুষ মুসলিম: নবীজি ﷺ যখন তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দেন, তখন তিনি কোনো প্রকার দ্বিধা বা ইতস্তত না করে সাথে সাথে ঈমান আনেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “আমি যার কাছেই দাওয়াত পেশ করেছি, কিছু না কিছু দ্বিধা করেছে, কিন্তু আবু বকরের মধ্যে কোনো সংশয় দেখিনি।”
- অন্যান্য বিশিষ্ট সাহাবীদের ইসলামে আনয়ন: ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ঘরে বসে থাকেননি। তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব ও দাওয়াতের মাধ্যমে উসমান ইবনে আফফান, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)-এর মতো আশারায়ে মুবাশশারার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ ইসলাম গ্রহণ করেন।
- মজলুম সাহাবীদের মুক্তিদান: কাফেরদের হাতে নির্যাতিত ক্রীতদাস ও দুর্বল মুসলমানদের নিজ অর্থে ক্রয় করে মুক্ত করে দেন। তাঁদের মধ্যে হযরত বিলাল (রা.), খাব্বাব, আমের ইবনে ফুহাইরা ও উম্মে উবাইস অন্যতম।
- হিজরতের বিশ্বস্ত সঙ্গী: ঐতিহাসিক মদিনা হিজরতের রাতে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিশ্বস্ত সফরসঙ্গী ছিলেন এবং সাওর পর্বতের গুহায় অবস্থানকালে পরম আত্মোৎসর্গকারী হিসেবে কুরআনে ‘ছানিয়াছনাইন’ (দুইজনের দ্বিতীয়জন) অভিধায় ভূষিত হন।
৩. মদিনা জীবন ও খিলাফতকালে দাওয়াতী খিদমত:
- তাবুক অভিযানে সর্বস্ব দান: তাবুক অভিযানের সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ দ্বীনের জন্য দান করার আহ্বান জানালে আবু বকর (রা.) তাঁর ঘরের যাবতীয় মালামাল ও অর্থ এনে পেশ করেন। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ? তিনি উত্তর দিলেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি।”
- মুরতাদ আন্দোলন ও ভণ্ড নবীদের দমন (حروب الردة): রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর আরবের বিভিন্ন গোত্রে ধর্মত্যাগের হিড়িক পড়ে এবং মুসাইলামা কাযযাব, তুলাইহা, আসওয়াদ আনসী ও সাজাহ নিজেদের নবী দাবি করে। আবু বকর (রা.) এক চুলও আপস না করে এগারোটি সেনাদল গঠন করে কঠোর হস্তে ভণ্ড নবী ও মুরতাদদের মূলোৎপাটন করেন।
- যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ: কিছু গোত্র সালাত আদায় করতে চাইলেও যাকাত দিতে অস্বীকার করে। আবু বকর (রা.) ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন: “আল্লাহর শপথ! যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে একটি রশি বা ছাগলের বাচ্চা যাকাত দিত, তা দিতে অস্বীকার করলে আমি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করব।” এর মাধ্যমে তিনি ইসলামের পূর্ণাঙ্গ দ্বীনি কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রাখেন।
- পবিত্র কুরআন সংকলন: ইয়ামামার যুদ্ধে বহু সংখ্যক হাফেজে কুরআন সাহাবী শহীদ হলে হযরত উমর (রা.)-এর পরামর্শে তিনি যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে পবিত্র কুরআনের বিক্ষিপ্ত পাণ্ডুলিপি একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ মুসহাফ তৈরি করেন, যা দাওয়াতের চিরন্তন ভিত্তি রক্ষা করেছে।
- আন্তর্জাতিক বিজয়ের সূচনা: তিনি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও আবু উবাইদাহ (রা.)-এর নেতৃত্বে পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তে মুজাহিদ প্রেরণ করে বাইজান্টাইন ও সাসানীয় শক্তির পতন এবং ইসলামের বৈশ্বিক বিস্তারের দ্বার উন্মোচন করেন।
٤- من التابعي؟ تحدث عن وسائل الدعوة الإسلامية في عهد التابعين
تعريف التابعي ووسائل الدعوة في عهدهم / তাবেয়ির পরিচয় এবং তাবেয়ি যুগে দাওয়াতের মাধ্যমসমূহ
১. তাবেয়ির পারিভাষিক সংজ্ঞা (تعريف التابعي):
ইসলামী পরিভাষায় তাবেয়ি বলা হয় সেই মহান ব্যক্তিত্বকে, যিনি কোনো সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছেন ঈমানের অবস্থায় এবং ইসলামের ওপরই মৃত্যুবরণ করেছেন।
হাফেয জালালুদ্দিন সুয়ূতী (রহ.) ‘তাদরীবুর রাবী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
«التَّابِعِيُّ: هُوَ مَنْ لَقِيَ صَحَابِيًّا مُؤْمِنًا بِمَا جَاءَ بِهِ الرَّسُولُ وَمَاتَ عَلَى الْإِسْلَامِ»
ভাষান্তর: “তাবেয়ি হলেন তিনি, যিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ যা এনেছেন তার ওপর ঈমান পোষণকারী কোনো সাহাবীর সাক্ষাত পেয়েছেন এবং ইসলামের ওপরই ইন্তেকাল করেছেন।” বিখ্যাত তাবেয়িদের মধ্যে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, উরওয়াহ ইবনুয যুবাইর, হাসান আল-বসরী, মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন, আতা ইবনে আবি রাবাহ এবং ইমাম আবু হানিফা (রহ.) অন্যতম।
২. তাবেয়ি যুগে ইসলামি দাওয়াতের মাধ্যমসমূহ (وسائل الدعوة):
সাহাবাদের যুগের পর তাবেয়ি যুগ ছিল ইসলামী সাম্রাজ্যের বিশাল বিস্তৃতি ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের যুগ। এ যুগে দাওয়াত প্রচারের ক্ষেত্রে নানাবিধ আধুনিক ও সময়োপযোগী মাধ্যম ব্যবহৃত হয়:
- ১. মসজিদভিত্তিক শিক্ষাবলয় (حلقات المساجد): মসজিদগুলো ছিল প্রধান দাওয়াতী মারকায। মসজিদে নববী, কুফা জামে মসজিদ, বসরা জামে মসজিদ, দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ এবং ফুসতাত (কায়রো)-এর মসজিদে তাবেয়ি উলামায়ে কিরাম প্রতিদিন তাফসির, হাদিস ও ফিকহের হালাকা বা শিক্ষাচক্র পরিচালনা করতেন। সাধারণ মানুষ ও নওমুসলিমরা সেখানে দ্বীন শিখতে আসত।
- ২. হাদিস সংকলন ও ইলমী সফর (الرحلة في طلب الحديث): সুন্নাহকে অবিকৃত রাখতে তাবেয়িগণ দূর-দূরান্তে ইলমী সফর করতেন এবং হাদিস শিক্ষা দিতেন। মদিনা থেকে মিশর, সিরিয়া, ইরাক ও খোরাসান পর্যন্ত সফর করে তাঁরা দ্বীনের সহীহ জ্ঞান বিলিয়ে দিতেন। উমর বিন আব্দুল আজিজের নির্দেশে তাবেয়ি ইমাম মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব আয-যুহরী (রহ.) রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রথম হাদিস সংকলন শুরু করেন।
- ৩. ওয়াজ, নসীহত ও আত্মশুদ্ধি (المواعظ والتزكية): তাবেয়িযুগে দুনিয়ার প্রাচুর্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বহু আলেম আত্মশুদ্ধি ও যুহদ (দুনিয়াবিমুখতা)-এর দাওয়াত দেন। হাসান আল-বসরী (রহ.)-এর জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা ও উপদেশমালা মানুষের অন্তরকে বিগলিত করত এবং আখিরাতমমুখী করে তুলত।
- ৪. ফাতাওয়া ও ইজতিহাদ (الإفتاء والاجتهاد): বিজিত এলাকার নতুন নতুন জাতিগোষ্ঠীর সামনে নিত্যনতুন মাসআলা তৈরি হতো। মদিনার ‘ফুকাহায়ে সাবআহ’ (সাতজন শীর্ষ ফকীহ) এবং কুফার ফকীহগণ কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ফাতাওয়া প্রদান করে মানুষকে শরীয়তের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতেন।
- ৫. বিভিন্ন ভাষায় দাওয়াত উপস্থাপন ও সংলাপ: পারস্য, রোমান, বারবার ও কপ্টিক জাতিগোষ্ঠী ইসলামে প্রবেশ করায় তাবেয়িগণ ফারসি ও সিরিয়াক ভাষাভাষীদের কাছে তাঁদের ভাষায় ইসলামের মৌলিক সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করেন এবং কালাম শাস্ত্রের মাধ্যমে নাস্তিক্যবাদী ও বিভ্রান্ত ফিরকাগুলোর সংশয় নিরসন করেন।
- ৬. ন্যায়পরায়ণ শাসন ও বিচারব্যবস্থা: খলিফা উমর বিন আব্দুল আজিজ ও সুপ্রসিদ্ধ কাজী শুরাইহ (রহ.)-এর মতো তাবেয়ি বিচারপতিদের নিরপেক্ষ ও ইনসাফভিত্তিক বিচারকর্ম দেখে হাজার হাজার ভিন্নধর্মী মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
٥- ماذا تعلم عن عمر بن عبد العزيز؟ بيّن مساهمته في الدعوة الإسلامية
عمر بن عبد العزيز وجهوده في الدعوة الإسلامية / উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহ.)-এর পরিচিতি ও ইসলামি দাওয়াতে তাঁর অবদান
১. পরিচিতি ও প্রাথমিক জীবন:
আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহ.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে পঞ্চম খুলাফায়ে রাশেদ হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এক মহান সংস্কারক। তিনি ৬১ বা ৬৩ হিজরীতে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল আজিজ ছিলেন মিশরের দীর্ঘমেয়াদী গভর্নর এবং মাতা উম্মে আসিম ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর পৌত্রী। মদিনার শীর্ষস্থানীয় তাবেয়ি ফকীহ ও উলামাদের সান্নিধ্যে তিনি ইলমে দ্বীন অর্জন করেন। অত্যন্ত খোদাভীরু, ন্যায়পরায়ণ ও নম্র স্বভাবের এই মহামানব ৭১৭ খ্রিস্টাব্দে (৯৯ হিজরী) উমাইয়া সাম্রাজ্যের খলিফা মনোনীত হন এবং ৭২০ খ্রিস্টাব্দে (১০১ হিজরী) মাত্র আড়াই বছরের শাসনের পর ইন্তেকাল করেন।
২. ইসলামি দাওয়াতে উমর বিন আব্দুল আজিজের ঐতিহাসিক অবদান:
মাত্র দুই বছর পাঁচ মাসের সংক্ষিপ্ত শাসনামলে তিনি দাওয়াত ও সংস্কারের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন:
- ১. রাজতন্ত্রের অবসান ও খুলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শের পুনরুজ্জীবন: ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথেই তিনি ঘোষণা করেন যে, বায়াত জনগণের অধিকার। তিনি উমাইয়া শাসকদের ভোগবিলাস, রাজপ্রাসাদের অপচয় এবং অন্যায়ভাবে দখলকৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে বায়তুলমালে জমা দেন। এমনকি নিজের ও স্ত্রীর অলংকারাদিও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সমর্পণ করেন।
- ২. জিযিয়া কর রহিতকরণ ও নওমুসলিমদের সম্মান প্রদান: পূর্ববর্তী কিছু উমাইয়া গভর্নর রাজস্ব ঘাটতির ভয়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের কাছ থেকেও জিযিয়া কর আদায় অব্যাহত রেখেছিল। উমর বিন আব্দুল আজিজ এই অনৈসলামিক প্রথা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন। জনৈক গভর্নর আপত্তি জানালে তিনি ঐতিহাসিক নির্দেশ দেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ ﷺ-কে দাঈ ও পথপ্রদর্শক বানিয়ে পাঠিয়েছেন, কর আদায়কারী বা ট্যাক্স কালেক্টর হিসেবে পাঠাননি।” ফলে পারস্য, খোরাসান ও উত্তর আফ্রিকার লক্ষ লক্ষ মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে।
- ৩. রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হাদিস সংকলন: তিনিই সর্বপ্রথম সুন্নাহ ও হাদিস বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় ফরমায়েশ জারি করেন। তিনি মদিনার গভর্নর আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আমর ইবনে হাযম এবং ইমাম ইবনে শিহাব আয-যুহরীকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিসসমূহ লিখিতভাবে সংকলনের নির্দেশ দেন।
- ৪. আঞ্চলিক রাজা ও শাসকদের কাছে দাওয়াতী পত্র প্রেরণ: তিনি সিন্ধুর রাজা জয়সিংহ এবং মধ্য এশিয়ার তুর্কি ও তাতার নৃপতিদের কাছে ইসলামের দাওয়াত সংবলিত পত্র প্রেরণ করেন। তাঁর ন্যায়পরায়ণতার সুনাম শুনে সিন্ধুর রাজাসহ বহু নৃপতি ইসলাম গ্রহণ করেন।
- ৫. সামাজিক ন্যায়বিচার ও দারিদ্র্য বিমোচন: তিনি বায়তুলমালের সুষম বণ্টন এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যে, যাকাত গ্রহণ করার মতো কোনো দরিদ্র ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যেত না। সমাজে ইনসাফ ও অর্থনৈতিক মুক্তির এই বাস্তব রূপ ইসলামের দাওয়াতকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী গ্রহণযোগ্যতা দেয়।
- ৬. উগ্রপন্থী ফিরকাগুলোর সাথে শান্তিপূর্ণ সংলাপ: খারেজী ও শিয়াদের মতো ভিন্নমতাবলম্বীদের সামরিক দমন না করে তিনি উলামাদের মাধ্যমে সংলাপের উদ্যোগ নেন এবং যুক্তি ও প্রমাণের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে বিভ্রান্তির পথ থেকে ফিরিয়ে আনেন।
- ৭. মিম্বার থেকে রাজনৈতিক গালিগালাজ নিষিদ্ধকরণ: জুমার খুতবায় তৎকালীন রাজনৈতিক কুৎসা নিষিদ্ধ করে তিনি কুরআনের সুমহান আয়াত পাঠের বিধান জারি করেন: ﴿إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ﴾ (নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন)।
٦- تحدث عن تاريخ الدعوة الإسلامية في بنغلاديش
تاريخ الدعوة الإسلامية في بنغلاديش / বাংলাদেশে ইসলামি দাওয়াতের ইতিহাস
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মুসলিম জনবহুল দেশ। এ ভূখণ্ডে ইসলামের আগমন কোনো সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ঘটেনি; বরং আরব ও পারস্যের সুফি-সাধক, দাঈ, মুবাল্লিগ এবং মুসলিম ব্যবসায়ীদের আত্মত্যাগ, উন্নত নৈতিক চরিত্র ও মানবসেবার ফলেই বাঙালি জাতির মাঝে ইসলাম চিরস্থায়ী শিকড় গেড়েছে। নিম্নে বাংলাদেশে ইসলামি দাওয়াতের ধারাবাহিক ইতিহাস বিশদভাবে আলোচিত হলো:
১. প্রাথমিক যুগ: আরব বণিক ও দাঈদের আগমন (৮ম – ১২শ শতক):
- ইসলামের প্রাথমিক যুগেই চট্টগ্রাম ছিল আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। আরব বণিকরা পণ্যবাহী জাহাজে করে চট্টগ্রাম উপকূলে আসতেন। তাঁদের সততা, আমানতদারিতা ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ স্থানীয় বৌদ্ধ ও পৌত্তলিক জনগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করত।
- কুমিল্লার ময়নামতী ও লালমাই পাহাড়ে আব্বাসীয় খলিফাদের যুগের রৌপ্যমুদ্রা (দিরহাম) আবিষ্কৃত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে সেন বা পাল যুগেরও বহু পূর্বে এ দেশে মুসলিম দাঈ ও বণিকদের পদার্পণ ঘটেছিল।
২. সুফি-দরবেশ ও অলি-আউলিয়াদের দাওয়াতী বিপ্লব:
বাংলাদেশে ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে শত শত সুফি-সাধক নিজেদের জন্মভূমি ত্যাগ করে এ দেশে এসেছিলেন। সনাতন বর্ণবাদের নিগড়ে পিষ্ট নিম্নবর্ণের নির্যাতিত হিন্দু ও সাধারণ মানুষ সুফিদের প্রেম, ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের বাণীতে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে:
- শাহ সুলতান বলখী মাহীসওয়ার (র.): একাদশ শতকে বগুড়ার মহাস্থানগড়ে এসে ইসলামের দাওয়াত দেন।
- বাবা আদম শহীদ (র.): ঢাকার বিক্রমপুরে এসে ইসলাম প্রচার করেন এবং শহীদ হন।
- শাহ মাখদুম রূপোশ (র.): রাজশাহী অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের নেতৃত্ব দেন।
- হযরত শাহজালাল মুজাররাদ ইয়ামেনী (র.): ৭০৩ হিজরীতে (১৩০৩ খ্রি.) ৩৬০ জন আউলিয়া সমভিব্যাহারে সিলেটে আগমন করেন। সিলেটের অত্যাচারী রাজা গৌড় গোবিন্দকে পরাজিত করে সমগ্র আসাম ও সিলেট অঞ্চলে ইসলামের মশাল প্রজ্বলিত করেন। তাঁর সঙ্গী শাহ পরান (র.) প্রমুখ সিলেটজুড়ে দাওয়াত বিস্তার করেন।
- খান জাহান আলী (র.): পঞ্চদশ শতকে দক্ষিণবঙ্গের খুলনা, বাগেরহাট ও সুন্দরবন অঞ্চলে এসে একাধারে দাওয়াত, শাসন এবং রাস্তাঘাট, দিঘি খনন ও বিশ্ববিখ্যাত ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে ইসলামী সভ্যতার বিকাশ ঘটান।
- বদরুদ্দিন শাহ মাদার ও বদর শাহ (র.): চট্টগ্রাম ও পূর্ববঙ্গে দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
৩. রাজনৈতিক বিজয়ের সুফল (১২০৪ খ্রি. ও পরবর্তী সুলতানী ও মুঘল আমল):
১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী নিয়ে নদীয়া জয় করেন এবং বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। এর ফলে সুফি ও দাঈদের দাওয়াতী কাজ এক নিরাপদ রাজনৈতিক ছত্রছায়া লাভ করে। ইলিয়াস শাহী ও হোসেন শাহী আমলে রাজধানী গৌড়, সোনারগাঁ ও পান্ডুয়া ইসলামী ইলম ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। সোনারগাঁয়ে মাওলানা শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা এক বিশাল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ইলমে হাদিস ও ফিকহ শিক্ষা নিতে সমগ্র হিন্দুস্তান থেকে শিক্ষার্থীরা আসত।
৪. আধুনিক যুগ ও সংস্কার আন্দোলন:
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও শিরক-বিদয়াতমুক্ত শুদ্ধ দাওয়াতের লক্ষ্যে হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে ফরায়েজী আন্দোলন এবং মীর নিসার আলী তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার সংগ্রাম বাংলার মুসলমানদের স্বকীয়তা ফিরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে দারুল উলূম দেওবন্দ ও আলিয়া ধারার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ কওমী ও আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাবলীগ জামাত, বিভিন্ন দ্বীনি সংস্থা এবং আধুনিক ইসলামি স্কলারদের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামি দাওয়াত আজ কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্পন্দিত হচ্ছে।
مجموعة (ب) [খ-বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি]
٧- بيّن وسائل الدعوة في عهد الصحابة
وسائل الدعوة في عصر الصحابة رضوان الله عليهم / সাহাবাদের যুগে দাওয়াতের মাধ্যমসমূহ
সাহাবায়ে কিরাম ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সরাসরি হাতে গড়া শ্রেষ্ঠ দাঈ দল। তাঁরা নিজেদের মেধা, সম্পদ ও জীবন বাজি রেখে দ্বীনের দাওয়াতকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। সাহাবাদের যুগে দাওয়াতের প্রধান মাধ্যমগুলো নিম্নরূপ:
- ১. বাস্তব জীবনাদর্শ ও উত্তম চরিত্র (القدوة الحسنة): সাহাবীগণের সততা, আমানতদারিতা, ইনসাফ ও বিনম্র আচরণ ছিল দাওয়াতের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। তাঁদের চরিত্র দেখেই সাধারণ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করত।
- ২. সরাসরি মুখামুখি বিতর্ক ও নসীহত (الخطاب المباشر والموعظة): সাহাবীগণ হাটে-বাজারে, মসজিদে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত কাফের ও অমুসলিমদের সাথে বিনম্র ভাষায় সরাসরি দাওয়াতী সংলাপ পরিচালনা করতেন।
- ৩. জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ও ন্যায়ভিত্তিক বিজয়: রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের জুলুমের শিকার প্রজাদের মুক্ত করতে এবং দাওয়াতের উন্মুক্ত পথ নিশ্চিত করতে তাঁরা জিহাদ পরিচালনা করেন। বিজয়ের পর জোরপূর্বক কাউকে ধর্মান্তরিত না করে ন্যায়ের শাসন কায়েম করেন।
- ৪. বিভিন্ন অঞ্চলে দাঈ ও প্রতিনিধি প্রেরণ: খলিফাগণ দূরবর্তী প্রদেশগুলোতে অভিজ্ঞ সাহাবীদের মুয়াল্লিম ও দাঈ হিসেবে নিয়োগ দেন; যেমন কুফায় আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, বসরায় আবু মুসা আশয়ারী এবং সিরিয়ায় মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)।
- ৫. কুরআন তিলাওয়াত ও সুন্নাহর তালিম: সাহাবীগণ নবদীক্ষিতদের কুরআন শিক্ষা দেওয়া এবং সুন্নাহর বাস্তব প্রশিক্ষণকে দাওয়াতের অবিচ্ছেদ্য মাধ্যম বানিয়েছিলেন।
٨- بيّن دور معاذ بن جبل رضي الله عنه في نشر الدعوة الإسلامية
دور معاذ بن جبل رضي الله عنه في الدعوة / ইসলামি দাওয়াতের প্রচার ও প্রসারে হযরত মুয়ায ইবনু জাবাল (রা.)-এর অবদান
হযরত মুয়ায ইবনু জাবাল (রা.) ছিলেন আনসার সাহাবীদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় এক মহান দাঈ ও ফকীহ। তিনি আঠারো বছর বয়সে আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াতে ইসলাম গ্রহণ করেন। দাওয়াতী অঙ্গনে তাঁর অবদান অনন্য:
- ১. হালাল-হারামের সেরা পণ্ডিত: রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর ইলমী মর্যাদা সম্পর্কে বলেন: «أَعْلَمُهُمْ بِالْحَلَالِ وَالْحَرَامِ مُعَاذُ بْنُ جَبَلٍ» (আমার উম্মতের মাঝে হালাল ও হারাম সম্পর্কে সর্বাধিক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি হলেন মুয়ায ইবনু জাবাল)।
- ২. ইয়েমেনে দাওয়াতী মিশন ও রাসূলের ঐতিহাসিক নির্দেশনা: দশম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে ইয়েমেনে প্রধান দাঈ, বিচারক ও গভর্নর হিসেবে প্রেরণ করেন। যাত্রাকালে নবীজি তাঁকে দাওয়াতের ধারাবাহিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করে দেন: “তুমি আহলে কিতাবদের কাছে যাচ্ছ; তাই প্রথমে তাদের সাক্ষ্য দিতে আহ্বান জানাও যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। তারা তা মেনে নিলে জানাবে যে, আল্লাহ তাদের ওপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছেন। তা মানলে জানাবে যে, আল্লাহ তাদের সম্পদে সদকা (যাকাত) ফরজ করেছেন, যা ধনীদের কাছ থেকে নিয়ে দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা হবে।”
- ৩. ইজতিহাদ ও ফিকহী বিচারিক পদ্ধতি: ইয়েমেনে পাঠানোর সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করেন, তুমি কীভাবে বিচার করবে? মুয়ায (রা.) বললেন, আল্লাহর কিতাব দিয়ে। নবীজি বললেন, যদি সেখানে না পাও? তিনি বললেন, রাসূলের সুন্নাহ দিয়ে। নবীজি বললেন, যদি সেখানেও না পাও? মুয়ায (রা.) বললেন, “আমি আমার বুদ্ধি দিয়ে ইজতিহাদ করব এবং কোনো ত্রুটি করব না।” নবীজি সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর বক্ষে হাত রেখে আল্লাহর শোকর আদায় করেন।
- ৪. শাম দেশে দাওয়াত ও শাহাদাত: খলিফা আবু বকর ও উমর (রা.)-এর যুগে তিনি সিরিয়া (শাম) অঞ্চলে গমন করে সেখানে সাহাবী ও তাবেয়িদের ইলম ও ফিকহ শিক্ষাদানে দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং ১৮ হিজরীতে আমওয়াসের মহামারীতে শাহাদাত বরণ করেন।
٩- اذكر مساهمة التابعين في نشر الدعوة الإسلامية
مساهمة التابعين في نشر الدعوة الإسلامية / ইসলামি দাওয়াতের প্রচার ও প্রসারে তাবেয়িদের অবদান
তাবেয়িগণের যুগ ছিল ইসলামের দাওয়াত ও ইলমী নবজাগরণের স্বর্ণযুগ। সাহাবায়ে কিরামের ইন্তেকালের পর তাঁরাই দাওয়াতের ঝাণ্ডা উড্ডীন রাখেন:
- ১. ইলমে হাদিস ও ফিকহের পদ্ধতিগত প্রণয়ন: তাবেয়িগণ সুন্নাহ সংগ্রহ, শ্রেণীবদ্ধকরণ এবং নতুন উদ্ভূত সমস্যার শরয়ী সমাধানের জন্য ফিকহ শাস্ত্রের ভিত্তি রচনা করেন। ইমাম আবু হানিফা, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব প্রমুখের খেদমত দাওয়াতের বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড গড়ে তোলে।
- ২. দূরবর্তী ভূখণ্ডে দাওয়াতের বিস্তার: তাবেয়ি যুগে তারিক বিন যিয়াদ স্পেনে (আন্দালুস), মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে এবং কুতাইবাহ বিন মুসলিম মধ্য এশিয়ার বুখারা ও সমরকন্দে দাওয়াত ও ন্যায়ের পতাকা পৌঁছে দেন।
- ৩. অনারবদের মাঝে ইসলামী সংস্কৃতির প্রচার: অনারবদের ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য সত্ত্বেও তাবেয়িগণ তাদের মাতৃভাষায় ও সুষম আচরণের মাধ্যমে ইসলামকে একটি সার্বজনীন দ্বীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
- ৪. আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক বিপ্লব: হাসান আল-বসরী, উয়াইস আল-কারনী প্রমুখের মতো তাবেয়িগণ সমাজের ভোগবাদিতা রুখতে যুহদ ও তাযকিয়ার দাওয়াত দেন, যা মানুষকে দ্বীনের প্রতি একনিষ্ঠ করে তোলে।
١٠- تحدث عن خمسة من أشهر الدعاة من أتباع التابعين
أشهر خمسة دعاة من أتباع التابعين / তাবায়ে তাবেয়িন হতে বিখ্যাত পাঁচজন দাঈর আলোচনা
তাবায়ে তাবেয়িন হলেন সেই পুণ্যবান মনীষীগণ, যাঁরা তাবেয়িদের সাহচর্য পেয়েছেন। নিম্নে এই প্রজন্মের পাঁচজন বিখ্যাত দাঈ ও ইমামের সংক্ষিপ্ত অবদান আলোচনা করা হলো:
- ১. ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) [৯৩-১৭৯ হি.]: ‘ইমাম দারুল হিজরাহ’ হিসেবে খ্যাত। মদিনায় অবস্থান করে সারা জীবন হাদিস ও ফিকহের খেদমত করেছেন। তাঁর রচিত হাদিস গ্রন্থ ‘মুওয়াত্তা ইমাম মালিক’ দ্বীনের দাওয়াত ও সুন্নাহর চর্চাকে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়।
- ২. ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.) [৯৭-১৬১ হি.]: তাঁকে ‘আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিস’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। পার্থিব মোহমুক্ত জীবনযাপন করে নির্ভীকভাবে তৎকালীন শাসকদের অন্যায়ের প্রতিবাদ ও সংস্কারমূলক দাওয়াত পরিচালনা করেন।
- ৩. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) [১১৮-১৮১ হি.]: তিনি ছিলেন একাধারে মুহাদ্দিস, ফকীহ, বীর মুজাহিদ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী। তিনি ব্যবসার অর্জিত মুনাফা দিয়ে দরিদ্র আলেম ও দাঈদের অর্থায়ন করতেন এবং নিজে সীমান্ত পাহারা ও জিহাদে অংশ নিয়ে বাস্তব দাওয়াত পেশ করতেন।
- ৪. ইমাম লাইস ইবনে সাদ (রহ.) [৯৪-১৭৫ হি.]: মিশরের সর্বশ্রেষ্ঠ ইমাম ও ফকীহ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। তিনি মিশরে সুন্নাহর দাওয়াত প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইমাম শাফেয়ীর মতে তিনি ফিকহে ইমাম মালিকের চেয়েও অধিক প্রাজ্ঞ ছিলেন।
- ৫. ফুদাইল ইবনে ইয়াদ (রহ.) [১০৫-১৮৭ হি.]: প্রথম জীবনে দস্যু দলের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও কুরআনের এক আয়াত শুনে তওবা করে যুগশ্রেষ্ঠ আবেদ ও দাঈতে রূপান্তরিত হন। তাঁর উপদেশমালা তৎকালীন আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশীদের মতো প্রতাপশালী শাসকদেরও অশ্রুসিক্ত করত।
١١- اكتب تاريخ الدعوة الإسلامية في شبه القارة الهندية بإيجاز
تاريخ الدعوة الإسلامية في شبه القارة الهندية / ভারত উপমহাদেশে ইসলামি দাওয়াতের ইতিহাস সংক্ষেপে
ভারত উপমহাদেশে ইসলামের আগমন বিশ্ব দাওয়াতী ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এ অঞ্চলে ইসলামের আগমনকে কয়েকটি প্রধান যুগে বিভক্ত করা যায়:
- ১. বাণিজ্য ও প্রাথমিক নৌ-অভিযানের যুগ (১ম হিজরী / ৭ম শতক): হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে মালাবার (কেরালা) উপকূলে আরব মুসলিম বণিকদের পদার্পণ ঘটে। চেরামন পেরুমল নামক স্থানীয় রাজা ইসলাম গ্রহণ করে মক্কায় যান বলে ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। কোদুঙ্গালুরে প্রথম ‘চেরামন জামে মসজিদ’ নির্মিত হয়।
- ২. রাজনৈতিক অভিযান ও সিন্ধু বিজয় (৭১২ খ্রি.): উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের আমলে সতেরো বছর বয়সী বীর সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু ও মুলতান জয় করেন। তিনি হিন্দু ও বৌদ্ধ প্রজাদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা প্রদান করেন, যার ফলে বহু স্থানীয় জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে।
- ৩. সুফি-সাধকদের আগমন ও আধ্যাত্মিক বিপ্লব: ভারতে ইসলামের ব্যাপক বিস্তারের মূল কৃতিত্ব সুফিদের।
- লাহোরে হযরত আলী হুজবীরী (দাতা গঞ্জেবখশ – র.) ‘কাশফুল মাহজুব’ রচনার মাধ্যমে দাওয়াত দেন।
- দ্বাদশ শতকে সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী (র.) আজমীরে চিশতিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠা করে লক্ষ লক্ষ নিম্নবর্ণের হিন্দুকে ইসলামের সাম্যের বাণীতে দীক্ষিত করেন।
- দিল্লিতে কুতবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী, বাবা ফরিদ গঞ্জে শাকার এবং হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া (র.) মানবসেবা ও লঙ্গরখানার মাধ্যমে ইসলামের মহত্ত্ব তুলে ধরেন।
- সিন্ধুতে হযরত লাল শাহবাজ কালান্দার এবং মুলতানে বাহাউদ্দিন জাকারিয়া মুলতানী (র.) দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
- ৪. মুঘল আমল ও মুজাদ্দিদিয়াত: সম্রাট বাবরের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ঘটে। আকবরের বিদয়াতপূর্ণ ‘দ্বীনে ইলাহী’র বিরুদ্ধে মোজাদ্দেদে আলফে সানী হযরত শায়খ আহমদ সিরহিন্দী (র.) আপসহীন সংস্কার আন্দোলন পরিচালনা করে ইসলামকে রক্ষা করেন। পরবর্তীতে আওরঙ্গজেব আলমগীর ‘ফাতাওয়া-ই-আলমগীরী’ প্রণয়ন করে ইসলামী শরীয়ত রাষ্ট্রীয়ভাবে কায়েম করেন।
- ৫. শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) ও আধুনিক জাগরণ: অষ্টাদশ শতকে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী কুরআন ও হাদিসের পুনরুজ্জীবন করেন এবং তাঁর সুযোগ্য বংশধর ও অনুসারীগণ দারুল উলূম দেওবন্দ ও অন্যান্য শিক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে উপমহাদেশে ইসলামের দাওয়াত ও ঐতিহ্য চিরস্থায়ী করেন।
١٢- علق على اثنين مما يلي
টীকা লিখন (চারটি বিষয়েরই পূর্ণাঙ্গ ও সমৃদ্ধ সমাধান)
(أ) الدعوة في المدينة المنورة في عهد سيدنا رسول الله صلى الله عليه وسلم
মদিনা মুনাওয়ারায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দাওয়াত:
মদিনা মুনাওয়ারায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর দাওয়াতী কার্যক্রম ছিল ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপায়নের যুগ। মক্কায় তেরো বছরের অসহনীয় নির্যাতনের পর মদিনায় হিজরত করে তিনি প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদে নববী নির্মাণ ছিল এর ভিত্তিপ্রস্তর, যা একই সাথে উপাসনালয় ও দাওয়াতী মারকায হিসেবে কাজ করত। মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ববন্ধন (মুআখাত) স্থাপন এবং সকল ধর্মাবলম্বীদের অধিকার নিশ্চিত করে ‘মদিনা সনদ’ প্রণয়নের মাধ্যমে তিনি এক সুসংহত সমাজের পত্তন করেন। এ যুগে সালাত, সাওম, যাকাত ও হজের মতো শরয়ী বিধিবিধান নাযিল হয়। দাওয়াতের সুরক্ষায় প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ এবং হুদাইবিয়ার সন্ধির পর বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর রাজন্যবর্গের নিকট দাওয়াতী চিঠি প্রেরণের মাধ্যমে মদিনার দাওয়াত বৈশ্বিক রূপ পরিগ্রহ করে।
(ب) أم المؤمنين عائشة رضي الله عنها
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.):
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) ছিলেন ইসলামের শ্রেষ্ঠ নারী দাঈ, মুহাদ্দিস ও ফকীহ। তিনি ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর কন্যা। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সান্নিধ্যে থেকে দ্বীনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আহকাম ও পারিবারিক বিধিবিধানের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। তিনি নবীজি থেকে ২,২১০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। সাহাবায়ে কিরামের কোনো জটিল ফিকহী মাসআলায় সংশয় দেখা দিলে তাঁরা হযরত আয়েশা (রা.)-এর দরবারে যেতেন এবং তিনি নির্ভুল ফাতাওয়া প্রদান করতেন। তিনি একাধারে কুরআন, হাদিস, ফিকহ, নসববিদ্যা, চিকিৎসা ও আরবি সাহিত্যে অনন্য প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন। মুসলিম নারীদের দ্বীন শিক্ষা ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে তিনি চিরন্তন রোল মডেল।
(ج) حسن البصري رحمه الله تعالى
ইমাম হাসান আল-বসরী (রহ.):
ইমাম হাসান আল-বসরী (২১-১১০ হিজরী) ছিলেন তাবেয়ি প্রজন্মের অবিসংবাদিত নেতা, মহান দাঈ ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। তিনি উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালমা (রা.)-এর মুক্তদাসী খায়রাহর গর্ভে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং শিশুকালে উম্মুল মুমিনীনদের কোলে-পিঠে লালিত-পালিত হন। তিনি হযরত আলী ও উসমান (রা.) সহ বহু জলীলুল কদর সাহাবীর সাহচর্য লাভ করেন। উমাইয়া যুগে যখন মুসলিম সমাজে পার্থিব ভোগবিলাসিতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তখন হাসান বসরী বসরায় অবস্থান করে মানুষের অন্তরে খোদাভীতি, আখিরাতমুখী চেতনা এবং যুহদ বা দুনিয়াবিমুখতার দাওয়াত দেন। তাঁর আবেগঘন ওয়াজ ও খুতবা পাষাণ অন্তরকেও কাঁদিয়ে দিত।
(د) القدوة الحسنة
আল-কুদওয়াতুল হাসানাহ (উত্তম জীবনাদর্শ):
ইসলামী দাওয়াতের সবচেয়ে ফলপ্রসূ ও শক্তিশালী পদ্ধতি হলো দাঈর নিজের বাস্তব উত্তম চরিত্র বা জীবনাদর্শ। কেবল মুখে মিষ্টি কথা বলে নয়, বরং কর্মের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলাকেই ‘কুদওয়ায়ে হাসানাহ’ বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনকে বিশ্ব মানবতার জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ হিসেবে ঘোষণা করেছেন: ﴿لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ﴾ (নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মাঝে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ – সূরা আল-আহযাব: ২১)। একজন দাঈর সততা, আমানতদারিতা, বিনয় ও তাকওয়া সাধারণ মানুষকে ইসলামের প্রতি চুম্বকের মতো আকৃষ্ট করে। সাহাবী ও সুফিগণ উত্তম জীবনাদর্শের মাধ্যমেই বিশ্বের দেশে দেশে ইসলামের বিপ্লব সাধন করেছিলেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: মাক্কী জীবনে ইসলামি দাওয়াতের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
উত্তর: মাক্কী জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তাওহীদের মজবুত ভিত্তি স্থাপন, শিরক ও কুসংস্কার নির্মূল, আখিরাতের জবাবদিহিতা জাগ্রত করা এবং অমানুষিক জুলুম-নির্যাতনের মুখেও চরম ধৈর্য ও ক্ষমার সাথে দাওয়াত অব্যাহত রাখা।
প্রশ্ন ২: পরিভাষায় সাহাবী কাকে বলা হয়?
উত্তর: যিনি ঈমানের অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাক্ষাত বা সান্নিধ্য লাভ করেছেন এবং ইসলামের ওপরই মৃত্যুবরণ করেছেন, ইসলামী পরিভাষায় তাঁকেই সাহাবী বলা হয়।
প্রশ্ন ৩: হযরত উমর বিন আব্দুল আজিজকে কেন পঞ্চম খলিফা বলা হয়?
উত্তর: উমাইয়া রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে থেকেও তিনি ব্যক্তিগত ভোগবিলাস ত্যাগ করে খুলাফায়ে রাশেদীনের মতো ন্যায়বিচার, ইনসাফ, শুরাভিত্তিক শাসন ও ধর্মীয় অনুশাসন কঠোরভাবে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন বিধায় তাঁকে পঞ্চম খলিফা হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রশ্ন ৪: বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে সুফিদের ভূমিকা কেমন ছিল?
উত্তর: বাংলাদেশে ইসলামের ভিত্তি গড়ে উঠেছে হযরত শাহজালাল (র.), শাহ পরান (র.), খান জাহান আলী (র.) প্রমুখ সুফি-সাধকদের মাধ্যমে। তাঁদের নিষ্কলুষ চরিত্র, মানবসেবা ও ভ্রাতৃত্বের আহবানে আকৃষ্ট হয়ে সাধারণ ও নির্যাতিত মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে।
প্রশ্ন ৫: হযরত মুয়ায ইবনু জাবাল (রা.)-এর দাওয়াতী কর্মপদ্ধতি কী ছিল?
উত্তর: তিনি পর্যায়ক্রমিক দাওয়াতী নীতি অনুসরণ করতেন—প্রথমে তাওহীদ ও রিসালাত, এরপর সালাত এবং পরবর্তীতে অর্থনৈতিক পরিশুদ্ধি হিসেবে ধনীদের ওপর যাকাত আদায় ও দরিদ্রদের মাঝে বণ্টনের নীতি প্রয়োগ করতেন।
প্রশ্ন ৬: দাওয়াতুল ইসলামের ক্ষেত্রে ‘কুদওয়ায়ে হাসানাহ’ কেন অপরিহার্য?
উত্তর: কথার চেয়ে কাজের প্রভাব মানুষের অন্তরে অনেক বেশি গভীর হয়। একজন দাঈ যখন ইসলামের আদর্শ নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখান, তখন সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করে তা গ্রহণ করে।