اختبار السنة الثانية لتفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ۲۰۱۹م
الدعوة والدراسات الإسلامية
السيرة النبوية [কোর্স কোড: 203204]
الزمن: ٤ ساعات | الدرجات الكاملة: ۸۰
مجموعة (ألف) [ক-বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি]
١- اكتب الحالات الاجتماعية والدينية والخلقية للعرب الجاهلية
أحوال العرب قبل الإسلام / প্রাক-ইসলামী জাহিলি যুগে আরবের সামাজিক, ধর্মীয় ও চারিত্রিক অবস্থা
মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর আবির্ভাবের পূর্বে আরব উপদ্বীপের সামগ্রিক অবস্থাকে পবিত্র কুরআনে ‘জাহিলিয়্যাত’ (অজ্ঞতা ও বর্বরতার যুগ) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। নিম্নে তৎকালীন আরবের সামাজিক, ধর্মীয় ও চারিত্রিক চিত্র বিশদভাবে তুলে ধরা হলো:
১. সামাজিক অবস্থা (الحالة الاجتماعية):
- গোত্রীয় কলহ ও আসাবিয়াত (التعصب القبلي): সমাজ বিভক্ত ছিল অসংখ্য যাযাবর বেদুইন গোত্রে। ‘গোত্রীয় অন্ধ পক্ষপাতিত্ব’ বা আসাবিয়াত ছিল তাদের প্রধান নীতি। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেমন উটের পা কেটে দেওয়া বা ঘোড়দৌড়ের বিবাদ নিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হতো এবং তা যুগ যুগ ধরে চলত (যেমন: আল-বাসূস যুদ্ধ ও দাহিস-গাবরা যুদ্ধ)।
- নারী জাতির চরম অবমূল্যায়ন ও কন্যাশিশু হত্যা: নারীর কোনো মানবিক, বৈবাহিক বা সামাজিক অধিকার ছিল না। বহুবিবাহের কোনো সীমা ছিল না। পিতা মৃত্যুবরণ করলে সৎমাতাকে সম্পদের মতো উত্তরাধিকার সূত্রে ভোগ করা হতো। সবচেয়ে মর্মান্তিক ছিল দারিদ্র্য ও সামাজিক অপবাদের ভয়ে সদ্যজাত কন্যাশিশুকে জীবন্ত প্রোথিত করা (وأد البنات)। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে: ﴿وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ * بِأَيِّ ذَنبٍ قُتِلَتْ﴾।
- দাসপ্রথা ও অমানবিক শোষণ: দাস-দাসীদের পশুর চেয়েও অধম বিবেচনা করা হতো। তাদের ক্রয়-বিক্রয়, অমানুষিক নির্যাতন এবং হত্যা করলেও মনিবের কোনো শাস্তি হতো না।
২. ধর্মীয় অবস্থা (الحالة الدينية):
- মূর্তিপূজা ও বহুশ্বরবাদ (الشرك والوثنية): হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ.)-এর রেখে যাওয়া হানীফি তাওহীদি ধর্মকে বিকৃত করে আরবে আমর ইবনে লুহাই আল-খুযায়ী সর্বপ্রথম শাম থেকে মূর্তি এনে পূজার প্রচলন করে। পবিত্র কাবাগৃহের ভেতরে ও চারপাশে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল (যেমন: হুবাল, লাত, মানাত, উযযা)।
- ভাগ্যপরীক্ষা ও কুসংস্কার: তির নিক্ষেপের মাধ্যমে ভাগ্য নির্ধারণ (الاستقسام بالأزلام), জিন-ভূতের পূজা, জ্যোতিষী ও ভবিষ্যৎ বক্তাদের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস এবং অলৌকিক কুসংস্কারে সমাজ ডুবে ছিল।
- অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়: ইয়ামেন ও মদিনায় কিছু ইয়াহুদি এবং নজরা ও ঘাসসান অঞ্চলে খ্রিস্টান সম্প্রদায় ছিল, কিন্তু তাদের ধর্মেও চরম বিকৃতি, পুরোহিততন্ত্র ও আধ্যাত্মিক শূন্যতা বিরাজ করছিল।
৩. চারিত্রিক অবস্থা (الحالة الخلقية):
- নেতিবাচক দিক: মদপান, প্রকাশ্যে ব্যভিচার, জুয়া (আল-মাইসির), সুদখোরি, লুণ্ঠন, বিশ্বাসঘাতকতা এবং নিষ্ঠুরতা দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। সাধারণ নৈতিক মূল্যবোধ সম্পূর্ণ ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল।
- ইতিবাচক গুণাবলি: অন্ধকারের মাঝেও তাদের কিছু স্বভাবজাত মহৎ গুণ ছিল; যেমন—অনুপম আতিথেয়তা (কঠিন দুর্ভিক্ষের দিনেও মেহমানের জন্য উট জবাই করা), প্রতিশ্রুতি রক্ষা, বীরত্ব, যুদ্ধক্ষেত্রে আপসহীন সাহস, তেজস্বিতা এবং আরবি ভাষার অলংকারপূর্ণ বাগ্মীতা ও প্রাঞ্জল কবিতা চর্চা। এই ইতিবাচক গুণগুলোই পরবর্তীতে ইসলামের ছায়াতলে এসে মহান দাঈ তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে কাজ করেছিল।
٢- تحدث عن أهم الأحداث التي وقعت قبل و بعد مولد النبي صلى الله عليه وسلم
أهم الأحداث قبل وبعد المولد النبوي الشريف / মহানবী ﷺ-এর জন্মের পূর্বে ও পরে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ
মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর ধরাধামে আগমন মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ আলোকোজ্জ্বল মোড়। তাঁর জন্মকে কেন্দ্র করে বহু ঐতিহাসিক ও অলৌকিক নিদর্শন প্রকাশিত হয়েছিল:
১. জন্মের পূর্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ (أحداث قبل المولد):
- হস্তী বাহিনীর ধ্বংসলীলা (عام الفيل – ৫৭০ বা ৫৭১ খ্রি.): রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জন্মের মাত্র ৫০ বা ৫৫ দিন পূর্বে ইয়েমেনের খ্রিস্টান গভর্নর আবরাহা বিশাল হস্তী বাহিনী নিয়ে কাবাঘর ধ্বংসের উদ্দেশ্যে মক্কা আক্রমণ করে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল পাখি প্রেরণ করে পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে শক্তিশালী বাহিনীকে চর্বিত ঘাসের ন্যায় ধ্বংস করে দেন (সূরা আল-ফীল)। এ ঘটনা সমগ্র আরবে কুরাইশদের মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- জমজম কূপের পুনঃখনন: নবীজি ﷺ-এর পিতামহ আবদুল মুত্তালিব স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশিত হয়ে প্রাচীন হারিয়ে যাওয়া পবিত্র জমজম কূপ পুনঃখনন করেন।
- আব্দুল্লাহর আত্মোৎসর্গ ও মুক্তিপণ (الذبيح الثاني): জমজম খননকালে আবদুল মুত্তালিব মানত করেছিলেন যে তাঁর দশটি পুত্র হলে একজনকে আল্লাহর রাহে কোরবানি করবেন। লটারিতে প্রিয়তম পুত্র আব্দুল্লাহর নাম উঠলে কুরাইশদের পরামর্শে ১০০টি উট সদকা করে আব্দুল্লাহকে মুক্ত করা হয়।
- পিতার ওফাত: নবীজি ﷺ মাতৃগর্ভে থাকাকালে পিতা আব্দুল্লাহ ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া গিয়ে ফেরার পথে মদিনায় ইয়াছরিবে অসুস্থ হয়ে মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ফলে তিনি এতিম অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন: ﴿أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَىٰ﴾।
২. জন্মের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ (أحداث بعد المولد):
- জন্ম ও মুজিযাপূর্ণ নিদর্শনাদি (৫৭১ খ্রি. ১২ রবিউল আউয়াল): সুবহে সাদেকের সময় নবীজি জন্ম নেন। জন্মের সাথে সাথেই পারস্যের কিসরা রাজপ্রাসাদের ১৪টি স্তম্ভ ধসে পড়ে, পারস্যের হাজার বছর ধরে প্রজ্বলিত অগ্নি নির্বাপিত হয় এবং সাওয়া হ্রদের পানি শুকিয়ে যায়।
- দুধমাতা হালিমার ঘরে প্রতিপালন (رضاعته في بني سعد): আরবের কুরাইশদের ঐতিহ্য অনুযায়ী বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিক্ষা ও দৈহিক সুস্থতার জন্য বনু সাদ গোত্রের হালিমা সাদিয়ার কোলে তাঁকে সমর্পণ করা হয়। সেখানে অবস্থানকালে হালিমার ঘরে বরকতের বন্যা বয়ে যায়। চার বছর বয়সে প্রথমবার ‘সিনাচাক’ বা বক্ষ বিদারণের (شق الصدر) ঘটনা ঘটে।
- মাতার ইন্তেকাল (৬ষ্ঠ বছর): ছয় বছর বয়সে মা আমিনা তাঁকে নিয়ে মদিনায় পৈতৃক কবর জিয়ারত শেষে ফেরার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন। নিঃসঙ্গ শিশুকে মক্কায় দাদা আবদুল মুত্তালিব লালন-পালন করতে থাকেন।
- দাদার ইন্তেকাল ও চাচা আবু তালিবের দায়িত্ব গ্রহণ (৮ম বছর): আট বছর বয়সে দাদা আব্দুল মুত্তালিবের ইন্তেকাল হলে পরম স্নেহশীল চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে তিনি বেড়ে ওঠেন।
- সিরিয়া সফর ও পাদ্রী বুহাইরা (১২তম বছর): চাচার সাথে সিরিয়া বাণিজ্য কাফেলায় গেলে বুসরায় পাদ্রী বুহাইরা শেষ নবীর সমস্ত নিদর্শন (মোহরে নবুয়ত ও মেঘমালার ছায়াদান) প্রত্যক্ষ করে তাঁকে দ্রুত মক্কায় ফিরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
- ফুজ্জার যুদ্ধ ও হিলফুল ফুজুল গঠন: অন্যায় ফুজ্জার যুদ্ধের বিভীষিকা দেখে তরুণ মুহাম্মদ ﷺ মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে আর্তমানবতার সেবা ও মজলুমের অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে ‘হিলফুল ফুজুল’ শান্তি চুক্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
- খাদিজা (রা.)-এর সাথে বিবাহ (২৫তম বছর): সততা ও আমানতদারিতার সুনামে মুগ্ধ হয়ে ধনাঢ্য সম্ভ্রান্ত কুরাইশ নারী খাদিজাতুল কুবরা (রা.) নবীজির সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
- কাবাগৃহে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন বিতর্ক নিরসন (৩৫তম বছর): কাবাঘর পুনর্নির্মাণের পর হাজরে আসওয়াদ বসানো নিয়ে গোত্রীয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মুখে নবীজি ﷺ একখানা চাদরের ওপর পাথরটি রেখে সকল গোত্রপতিদের দিয়ে চাদরটি ওঠান এবং নিজ হাতে তা যথাযুক্ত স্থানে স্থাপন করে গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটান।
٣- ماذا تعرف عن بيعة العقبة؟ وكم مرة وقعت؟ تحدث عمن شارك فيها و نتائجها
بيعة العقبة وتاريخها ونتائجها / বাইয়াতুল আকাবার পরিচয়, সংখ্যা, অংশগ্রহণকারী ও ফলাফল
১. বাইয়াতুল আকাবার পরিচয় ও স্থান:
‘আকাবা’ (العقبة) শব্দের অর্থ গিরিপথ বা সংকীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকা। মিনা ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত জামরায়ে আকাবার সন্নিকটে হজের মৌসুমে ইয়াসরিবের (পরবর্তীতে মদিনা) লোকদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যে ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক আনুগত্যের অঙ্গীকার সংঘটিত হয়েছিল, সীরাতের পরিভাষায় তাকে ‘বাইয়াতুল আকাবা’ (আকাবার শপথ) বলা হয়।
২. বাইয়াতুল আকাবা কতবার সংঘটিত হয়েছে:
ঐতিহাসিকদের সর্বসম্মত মতে বাইয়াতুল আকাবা দুইবার আনুষ্ঠানিকভাবে সংঘটিত হয়েছে (পূর্বের প্রাক-সাক্ষাতকে গণনা করলে মোট তিন পর্যায়):
- প্রাথমিক সূচনা (নবুয়তের ১১শ বর্ষ / ৬২০ খ্রি.): হজের মৌসুমে ইয়াসরিবের খাযরাজ গোত্রের ৬ জন যুবকের সাথে সাক্ষাৎ হয় এবং তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন।
- প্রথম আকাবার বাইয়াত (নবুয়তের ১২শ বর্ষ / ৬২১ খ্রি.): ১২ জন মদিনাবাসী আকাবায় এসে বাইয়াত গ্রহণ করেন।
- দ্বিতীয় আকাবার বাইয়াত (নবুয়তের ১৩শ বর্ষ / ৬২২ খ্রি.): ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারী মোট ৭৫ জন আকাবায় এসে ঐতিহাসিক আত্মরক্ষা ও জিহাদের শপথ গ্রহণ করেন।
৩. অংশগ্রহণকারী ও শপথের বিস্তারিত বিবরণ:
- প্রথম আকাবার বাইয়াত (بيعة العقبة الأولى): এতে ইয়াসরিবের ১২ জন ব্যক্তি অংশ নেন (১০ জন খাযরাজ ও ২ জন আওস গোত্রের)। শীর্ষ নেতা ছিলেন আসআদ ইবনে যুরারাহ (রা.)। এটি ছিল ‘বাইয়াতুন নিসা’ বা অহিংস সামাজিক ও চারিত্রিক শপথ। শপথের মূল বক্তব্য ছিল: “আমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করব না, চুরি করব না, ব্যভিচার করব না, সন্তান হত্যা করব না, অপবাদ দেব না এবং সৎকাজে রাসূলের অবাধ্য হব না।” রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের দ্বীন শিক্ষা ও কুরআনের তালিম দেওয়ার জন্য মক্কার প্রথম দাঈ হিসেবে হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)-কে মদিনায় প্রেরণ করেন।
- দ্বিতীয় আকাবার বাইয়াত (بيعة العقبة الثانية): মুসআব (রা.)-এর অবিরাম দাওয়াতে মদিনার ঘরে ঘরে ইসলাম প্রবেশ করে। পরের বছর হজের সময় গভীর রাতে গোপনে ৭৫ জন (৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারী: নুসাইবা বিনতে কাব ও আসমা বিনতে আমর) সমবেত হন। সাথে ছিলেন নবীজির চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (তখনও মুসলিম হননি)। তিনি মদিনাবাসীকে সতর্ক করে বলেন, রক্ষা করতে পারলে তবেই দায়িত্ব নাও। মদিনার পক্ষে আল-বারা ইবনে মারুর এবং আসআদ ইবনে যুরারাহ অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন: “আমরা নিজেদের পরিবার-সন্তানকে যেভাবে রক্ষা করি, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ঠিক সেভাবেই জীবনের বিনিময়ে রক্ষা করব।” রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের মধ্য থেকে ১২ জন নকীব বা প্রতিনিধি নির্বাচন করেন (৯ জন খাযরাজ ও ৩ জন আওস থেকে)।
৪. বাইয়াতুল আকাবার ঐতিহাসিক ফলাফল (نتائج بيعة العقبة):
- নিরাপদ আশ্রয়ের সুনিশ্চিত ভিত্তি: মক্কার চরম নির্যাতনের মুখে মুসলিমদের জন্য মদিনা একটি উন্মুক্ত ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
- ঐতিহাসিক হিজরতের অনুমোদন: এই শপথের মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের মদিনায় হিজরতের অনুমতি দান করেন।
- প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর: আকাবার বাইয়াত কেবল ধর্মীয় আচার ছিল না; বরং এটি ছিল রাজনৈতিক ও সামরিক জোটের সূচনা, যা অতি দ্রুত মদিনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত করে।
- আওস ও খাযরাজের শতাব্দীর দ্বন্দ্বের চির অবসান: শতবর্ষ ধরে বুয়াস যুদ্ধের আগুনে জ্বলতে থাকা দুটি ভ্রাতৃঘাতী গোত্র ইসলামের পতাকাতলে এসে রক্তহীন সুদৃঢ় ভ্রাতৃত্বে একতাবদ্ধ হয়।
٤- عرف وثيقة المدينة مع بيان خمسة عشر بندًا مهمًا منها
دستور المدينة (الصحيفة) وأهم بنودها / মদিনা সনদের পরিচয় এবং এর ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ ধারা
১. মদিনা সনদের পরিচয় (تعريف وثيقة المدينة):
৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় হিজরতের পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ মদিনার বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, শান্তি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যে ঐতিহাসিক লিখিত চুক্তিপত্র প্রণয়ন করেন, তা ইতিহাসে ‘মদিনা সনদ’ (وثيقة المدينة বা صحيفة المدينة) নামে খ্যাত। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের ঐতিহাসিকদের মতে এটিই বিশ্বের সর্বপ্রথম লিখিত সাংবিধানিক দলিল (The First Written Constitution of the World)। এতে সর্বমোট ৪৭টি (মতান্তরে ৫৩টি) অনুচ্ছেদ বা ধারা ছিল।
২. মদিনা সনদের ১৫টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ধারা (أهم خمسة عشر بندًا):
- একক জাতি গঠন (أمة واحدة): মুহাজির, আনসার এবং সনদের অন্তর্ভুক্ত সকল দল মিলে অন্যান্য মানুষের মোকাবেলায় একটি অখণ্ড রাজনৈতিক জাতি (উম্মাহ) গঠিত হবে।
- রক্তপণ ও মুক্তিপণ পরিশোধ: মুহাজির ও আনসারদের পূর্ববর্তী ন্যায়সংগত প্রথা অনুযায়ী নিজ নিজ গোত্রের রক্তপণ ও বন্দীদের মুক্তিপণ ন্যায়বিচারের সাথে পরিশোধ করতে হবে।
- সামাজিক নিরাপত্তা ও ঋণগ্রস্তের মুক্তি: কোনো ঋণগ্রস্ত বা নিঃস্ব ব্যক্তিকে সমাজে অসহায় ফেলে রাখা যাবে না; সততার সাথে তার বোঝা লাঘব করতে হবে।
- সন্ত্রাস ও অপরাধের বিরুদ্ধে আপসহীন ঐক্য: সনদে স্বাক্ষরকারী সকল পক্ষ সর্বপ্রকার অপরাধী, বিদ্রোহী, অত্যাচারী ও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সমবেতভাবে রুখে দাঁড়াবে, অপরাধী নিজ সন্তান হলেও কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
- মুসলিম হত্যার নিষিদ্ধতা: কোনো মুমিন অপর মুমিনকে কাফেরের পক্ষাবলম্বন করে হত্যা করতে পারবে না এবং মুমিনের বিরুদ্ধে কোনো কাফেরকে সাহায্য করতে পারবে না।
- আল্লাহর নিরাপত্তার সার্বজনীনতা (ذمة الله واحدة): আল্লাহর নিরাপত্তা এক ও অভিন্ন; মুসলিম সমাজের একজন সাধারণ বা দুর্বল ব্যক্তি কাউকে নিরাপত্তা দিলে তা সকলের ওপর কার্যকর হবে।
- ইয়াহুদিদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা: ইয়াহুদিরা মুসলিমদের মতোই স্বাধিকার লাভ করবে। ইয়াহুদিদের জন্য তাদের নিজস্ব ধর্ম এবং মুসলমানদের জন্য তাদের নিজস্ব ধর্ম সুরক্ষিত থাকবে; কেউ কারো ধর্মীয় বিশ্বাসে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
- নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা: সনদে অনুগত কোনো ইয়াহুদি বা অমুসলিমের ওপর কোনো প্রকার জুলুম করা যাবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে শত্রুকে সাহায্য করা যাবে না।
- যুদ্ধ ব্যয়ের যৌথ দায়িত্ব: মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ চলাকালীন সময় পর্যন্ত ইয়াহুদি ও মুসলিমরা যৌথভাবে যার যার যুদ্ধের খরচ বহন করবে।
- মদিনা নগরীকে হারাম ও যুদ্ধমুক্ত ঘোষণা: সনদের অন্তর্ভুক্ত সকল পক্ষের জন্য মদিনা নগরী ও তার আশেপাশের উপত্যকাকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র, অহিংস এবং রক্তপাতমুক্ত এলাকা (حرم آمن) হিসেবে ঘোষণা করা হলো।
- শত্রুর বহিরাক্রমণে যৌথ প্রতিরোধ: বাইরের কোনো শত্রুশক্তি মদিনা আক্রমণ করলে সকল দল ও গোত্র ঐক্যবদ্ধভাবে মদিনা রক্ষা ও যুদ্ধ পরিচালনা করবে।
- কুরাইশদের আশ্রয় দানে নিষেধাজ্ঞা: মক্কার আক্রমণকারী কুরাইশ বা তাদের সহযোগীদের মদিনার কোনো নাগরিক আশ্রয় দিতে পারবে না এবং তাদের জান-মালের সুরক্ষা দিতে পারবে না।
- শান্তি চুক্তিতে পারস্পরিক বাধ্যবাধকতা: মুসলিমরা যদি কোনো শত্রুর সাথে শান্তি চুক্তি সম্পাদন করে, তবে অন্য দলগুলোও তা মানতে বাধ্য থাকবে (দ্বীনি যুদ্ধ ব্যতীত)।
- অন্যায়কারীর ব্যক্তিগত দায়: কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে কেবল অপরাধী ব্যক্তি ও তার পরিবার দায়ী থাকবে; পুরো গোত্রকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যাবে না।
- সর্বোচ্চ বিচারিক কর্তৃত্ব আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের: সনদে স্বাক্ষরকারীদের মাঝে যেকোনো মতবিরোধ, কলহ বা সংঘাতের সৃষ্টি হলে তার চূড়ান্ত ফায়সালার জন্য তা মহান আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদ ﷺ-এর আদালতে পেশ করতে হবে।
٥- عرف الجهاد مع بيان مشروعيته وحكمه في الزمن الراهن
حقيقة الجهاد ومشروعيته وحكمه المعاصر / জিহাদের পরিচয়, শরয়ী বৈধতার দলিল এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর বিধান
১. জিহাদের আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়:
‘জিহাদ’ (الْجِهَادُ) শব্দটি আরবি (جَهْدٌ / جُهْدٌ) ধাতু থেকে নিষ্পন্ন। এর শাব্দিক অর্থ সর্বোচ্চ শক্তি ও সামর্থ্য ব্যয় করা, সাধনা করা বা কঠোর প্রচেষ্টা চালানো।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরীয়তের পরিভাষায় জিহাদ বলা হয়:
«الْجِهَادُ: بَذْلُ الْوُسْعِ وَالطَّاقَةِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ تَعَالَى بِالْقَوْلِ أَوْ الْفِعْلِ أَوْ الْمَالِ أَوْ النَّفْسِ؛ لِإِعْلَاءِ كَلِمَةِ اللَّهِ وَدَفْعِ الْعُدْوَانِ»
ভাষান্তর: “আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত রাখতে এবং অন্যায় ও আগ্রাসন প্রতিহত করতে কথা, কাজ, অর্থ ও জীবনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে সর্বোচ্চ ত্যাগ ও প্রচেষ্টা নিয়োজিত করাকে জিহাদ বলে।”
২. জিহাদের শরয়ী বৈধতা (مشروعية الجهاد):
জিহাদ কোনো আগ্রাসী বা সন্ত্রাসবাদী কাজ নয়; বরং এটি মানবতা রক্ষা, ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং উৎপীড়ন নির্মূলের এক মহান বিধান। কুরআন ও হাদিসে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে:
- কুরআন মাজিদের দলিল:
আল্লাহ তায়ালা হিজরতের পর সর্বপ্রথম প্রতিরক্ষামূলক জিহাদের অনুমতি দিয়ে ইরশাদ করেন:
﴿أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ﴾ (যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো, কারণ তারা অত্যাচারিত; আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাহায্য করতে পূর্ণ সক্ষম – সূরা আল-হাজ্জ: ৩৯)।
অন্যত্র ইরশাদ করেন: ﴿وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ﴾ (তোমরা আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করো না – সূরা আল-বাকারা: ১৯০)। - সুন্নাহর দলিল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «جَاهِدُوا الْمُشْرِكِينَ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ وَأَلْسِنَتِكُمْ» (তোমরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে তোমাদের মাল, জান এবং কথা/জিহ্বা দিয়ে জিহাদ কর – সুনানে আবু দাউদ)।
৩. বর্তমান যুগে জিহাদের হুকুম ও বিভিন্ন রূপ (حكمه في الزمن الراهن):
- ১. আত্মরক্ষামূলক সশস্ত্র জিহাদ (جهاد الدفع): বর্তমান মুসলিম বিশ্বের কোনো ভূখণ্ডে যদি প্রত্যক্ষ শত্রু আক্রমণ করে (যেমন ফিলিস্তিনে দখলদার বাহিনীর আগ্রাসন), তবে সেই ভূখণ্ডের অধিবাসীদের জন্য আক্রমণ প্রতিহত করা ‘ফরযে আইন’ (ফারদুল আইন)। আর পার্শ্ববর্তী মুসলমানদের জন্য তাঁদের সমর্থন ও সহায়তা করা ফরযে কিফায়া। তবে সশস্ত্র সামরিক অভিযানের জন্য বৈধ ইসলামী সরকার, নিয়মতান্ত্রিক নেতৃত্ব ও সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী অপরিহার্য; বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসবাদ কখনো জিহাদ নয়।
- ২. মেধা, কলম ও দাওয়াতের জিহাদ (جهاد البيان واللسان): বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে নাস্তিক্যবাদ, ইসলামবিদ্বেষ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি ও মিডিয়ার মাধ্যমে সত্য তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জিহাদ। আল্লাহ বলেন: ﴿وَجَاهِدْهُم بِهِ جِهَادًا كَبِيرًا﴾ (কুরআনের মাধ্যমে তাদের সাথে বড় জিহাদ পরিচালনা করুন)।
- ৩. আর্থিক জিহাদ (الجهاد بالمال): নিপীড়িত মুসলমানদের পুনর্বাসন, মসজিদ-মাদরাসা ও দাওয়াতী প্রতিষ্ঠান নির্মাণে অর্থ ব্যয় করা।
- ৪. নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ (جهاد النفس): অভ্যন্তরীণ কুপ্রবৃত্তি দমন ও তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদের অন্তর্ভুক্ত (জিহাদে আকবার)।
٦- تحدث عن غزوة أحد مع ذكر العبر التي تعلمها المسلمون من هذه الغزوة
غزوة أحد ودروسها وعبرها للمسلمين / ঐতিহাসিক ওহুদ যুদ্ধ এবং মুসলমানদের জন্য এর শিক্ষণীয় দিকসমূহ
১. ওহুদ যুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি ও বিবরণ:
- তারিখ ও স্থান: ৩য় হিজরীর শাওয়াল মাসে (মার্চ ৬২৫ খ্রি.) মদিনা মুনাওয়ারার উত্তর সীমান্তে অবস্থিত ওহুদ পাহাড়ের পাদদেশে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
- যুদ্ধের কারণ: দ্বিতীয় হিজরীতে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে কুরাইশদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ নিহত ও শোচনীয় পরাজয় বরণ করায় আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে ৩,০০০ সুসজ্জিত সৈন্য, ২০০ অশ্বারোহী ও ৭০০ বর্মধারী নিয়ে মদিনা আক্রমণ করে।
- মুসলিম বাহিনীর প্রস্তুতি: রাসূলুল্লাহ ﷺ ১,০০০ সাহাবী নিয়ে বের হন। কিন্তু পথিমধ্যে মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তার ৩০০ অনুসারী নিয়ে দলত্যাগ করে বিশ্বাসঘাতকতা করে। ফলে মাত্র ৭০০ নিষ্ঠাবান মুসলিম সাহাবী নিয়ে নবীজি ওহুদ প্রান্তরে যুদ্ধের মুখোমুখি হন।
- কৌশলগত তীরন্দাজ দল: রাসূলুল্লাহ ﷺ জাবালে রুমাত (তীরন্দাজদের পাহাড়)-এর ওপর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.)-এর নেতৃত্বে ৫০ জন দক্ষ তীরন্দাজ মোতায়েন করে কঠোর নির্দেশ দেন: “আমরা বিজয়ী হই বা পরাজিত হই, পাখিরা আমাদের লাশ ঠুকরে খেলেও আমার নির্দেশ ছাড়া তোমরা এ স্থান ত্যাগ করবে না।”
- যুদ্ধের সূচনা ও সাময়িক বিভ্রান্তি: যুদ্ধের শুরুতে মুসলিম মুজাহিদদের প্রচণ্ড আক্রমণে কুরাইশরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটে এবং মালপত্র ফেলে পালাতে থাকে। এই দৃশ্য দেখে পাহাড়ে থাকা তীরন্দাজদের সিংহভাগ ভেবেছিলেন যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। আমীরের বারণ সত্ত্বেও ৪০ জন তীরন্দাজ গনীমতের মাল সংগ্রহের জন্য স্থান ত্যাগ করেন।
- বিপর্যস্ত পরিস্থিতি ও বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ: সুযোগসন্ধানী অশ্বারোহী সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (তখনও অমুসলিম) পাহাড়ের পেছন দিক দিয়ে অতর্কিত মুসলিমদের ওপর আক্রমণ চালায়। এই রক্তক্ষয়ী বিশৃঙ্খলায় হযরত হামযা (রা.) শহীদ হন এবং নবীজি ﷺ-এর পবিত্র দানদান মোবারক শহীদ ও চেহারা মোবারক ক্ষতবিক্ষত হয়। নবীজি নিহত হয়েছেন বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে হতাশার সৃষ্টি হয়, কিন্তু নবীজিকে জীবিত দেখে সাহাবায়ে কিরাম নিজেদের জীবন দিয়ে তাঁকে ঘিরে প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি করেন। পরিশেষে মুসলিমরা পাহাড়ের উঁচুতে অবস্থান নিয়ে নিজেদের সামলে নেন এবং কুরাইশরা মদিনা দখলের সাহস না পেয়ে মক্কার দিকে ফিরে যায়। এতে ৭০ জন বিশিষ্ট সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন।
২. ওহুদ যুদ্ধ থেকে মুসলমানদের শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ (العبر والدروس):
- ১. নেতার নির্দেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের অপরিহার্যতা: ওহুদ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশের প্রতি বিন্দুমাত্র অবহেলার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। সামান্য পার্থিব লালসায় স্থান ত্যাগের কারণে নিশ্চিত বিজয় বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছিল।
- ২. পার্থিব লোভের ক্ষতিসাধন (خطر إرادة الدنيا): আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের সংশোধন করে বলেন: ﴿مِنكُم مَّن يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنكُم مَّن يُرِيدُ الْآخِرَةَ﴾ (তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ দুনিয়া চাইছিল, আবার কেউ কেউ আখিরাত চাইছিল – সূরা আলে ইমরান: ১৫২)। দ্বীনি কাফেলায় বস্তুগত লালসা প্রবেশ করলে পরাজয় নেমে আসে।
- ৩. পরীক্ষা ও শাহাদাতের মাধ্যমে খাঁটি মুমিন বাছাই: সংকট ও বিপদের মাধ্যমেই প্রকৃত মুমিন এবং কপট মুনাফিকদের মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যায়। মুনাফিকরা দলত্যাগ করে নিজেদের মুখোশ উন্মোচন করেছিল।
- ৪. আল্লাহর বিধানের চিরন্তন অপরিবর্তনীয়তা (সুনানুল্লাহ): কেবল দোয়া বা নবীর উপস্থিতিই যথেষ্ট নয়; বরং বাস্তব ময়দানে শৃঙ্খলা, কৌশল ও সতর্কতা অবলম্বন করা আল্লাহর প্রাকৃতিক বিধানের দাবি।
- ৫. চরম বিপর্যয়েও অবিচল থাকা ও মনোবল না হারানো: ৭০ জন সাহাবীর শাহাদাত সত্ত্বেও পরের দিনই রাসুলুল্লাহ ﷺ শত্রুর পেছনে ‘হামরাউল আসাদ’ পর্যন্ত ধাওয়া করে প্রমাণ করেন যে সত্যপন্থীরা কখনো ভগ্নোৎসাহ হয় না।
مجموعة (ب) [খ-বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি]
٧- اكتب ما تعرف عن حلف الفضول
حلف الفضول / হিলফুল ফুজুল শান্তি চুক্তি
নবুয়তপূর্ব জীবনে মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য হলো ‘হিলফুল ফুজুল’ (শান্তি ও মৈত্রী সংঘ)।
- ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কুরাইশ ও হাওয়াযিন গোত্রের মধ্যে নিষিদ্ধ ও অন্যায় ‘হারবুল ফুজ্জার’ (পাপের যুদ্ধ)-এর মর্মান্তিক রক্তপাত ও ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করে যুবক মুহাম্মদ ﷺ গভীরভাবে ব্যথিত হন। এর পরপরই ইয়েমেনের এক অসহায় ব্যবসায়ীর পণ্য কুরাইশ নেতা আস ইবনে ওয়ায়েল জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়। মজলুম ব্যবসায়ী আবু কুবাইস পাহাড়ে উঠে আর্তনাদ করলে কুরাইশদের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নেতারা নড়েচড়ে বসেন।
- চুক্তির স্থান ও রূপকার: বনু হাশিম, বনু মুত্তালিব, বনু আসাদ ও বনু তাইম গোত্রের নেতৃবৃন্দ বিশিষ্ট কুরাইশ ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের বাড়িতে সমবেত হন। যুবক মুহাম্মদ ﷺ এবং তাঁর চাচা যুবাইর ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সক্রিয় উদ্যোগে এই শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রাচীন জুরহুম গোত্রের ফাদল, ফুদাইল ও মুফাদদাল নামক তিন ব্যক্তির পূর্ববর্তী অনুরূপ চুক্তির স্মরণে একে ‘হিলফুল ফুজুল’ বলা হয়।
- চুক্তির মূল অঙ্গীকার: ১. মক্কায় কোনো মজলুমের ওপর অন্যায় অত্যাচার হতে দেওয়া হবে না, ২. যেকোনো অন্যায়কারীর হাত থেকে মজলুমের হক আদায় করে দেওয়া হবে, ৩. স্বদেশী ও বিদেশী সকল নাগরিক ও ব্যবসায়ীর পূর্ণ জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মূল্যায়ন: নবুয়ত লাভের পর তিনি বলতেন: “আমি আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে এমন এক চুক্তিতে উপস্থিত ছিলাম, যার বিনিময়ে আমাকে লাল উট দেওয়া হলেও আমি আনন্দিত হতাম না। ইসলামেও যদি আমাকে এমন কোনো চুক্তির জন্য আহ্বান জানানো হয়, তবে আমি সানন্দে সাড়া দেব।”
٨- تحدث عن الرحلة التجارية التي قام بها رسول الله صلى الله عليه وسلم قبل البعثة
رحلات النبي صلى الله عليه وسلم التجارية قبل البعثة / নবুয়তপূর্ব জীবনে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ব্যবসায়িক সফর
নবুয়ত লাভের পূর্বে মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর ব্যবসায়িক সফরগুলো তাঁর চরিত্র ও বিশ্বস্ততাকে সমগ্র আরবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল:
- প্রথম সফর (চাচার সাথে সিরিয়া সফর): বারো বছর বয়সে তিনি স্নেহময় চাচা আবু তালিবের সাথে বাণিজ্যিক কাফেলায় যুক্ত হয়ে সিরিয়ার বুসরা নগরীতে গমন করেন। সেখানে পাদ্রী বুহাইরা তাঁর মধ্যে শেষ নবীর অলৌকিক নিদর্শন দেখতে পেয়েছিলেন।
- ইয়ামেন ও আরবের বিভিন্ন বাণিজ্য মেলায় সফর: যৌবনে তিনি জুরশ (ইয়ামেন), হুবাইশা এবং মক্কার পার্শ্ববর্তী ওকাজ, মাজান্না ও যুল-মাজাযের বিখ্যাত বাণিজ্যিক মেলাগুলোতে সততার সাথে বাণিজ্য পরিচালনা করেন। সায়িব ইবনে আবী সায়িব (রা.) তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন এবং তিনি বলতেন, “মুহাম্মদ ﷺ ছিলেন আমার সেরা অংশীদার, যিনি কখনো কোনো বিরোধ বা প্রতারণা করেননি।”
- খাদিজা (রা.)-এর বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে ঐতিহাসিক সিরিয়া সফর (২৫তম বছর): আরবের শীর্ষ নারী ব্যবসায়ী খাদিজাতুল কুবরা (রা.) নবীজি ﷺ-এর সততা ও বিশ্বস্ততার কথা শুনে তাঁকে নিজের ব্যবসায়ের দায়িত্ব দিয়ে সিরিয়ায় পাঠান এবং বিশ্বস্ত গোলাম মাইসারাকে সাথে দেন। মাইসারা লক্ষ্য করেন যে একখণ্ড মেঘ নবীজির ওপর ছায়া ফেলে রাখত এবং বাণিজ্যে অভাবনীয় প্রভূত মুনাফা অর্জিত হয়। মাইসারার মুখে নবীজির অনুপম চরিত্র ও ন্যায়নিষ্ঠার কথা শুনে খাদিজা (রা.) মুগ্ধ হন এবং পরবর্তীতে তাঁর নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠান।
٩- اكتب ما تحمل رسول الله صلى الله عليه وسلم من الإيذاءات عند الجهر بالدعوة موجزًا
أذى قريش للنبي صلى الله عليه وسلم عند الجهر بالدعوة / প্রকাশ্য দাওয়াতের সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর নির্যাতনের চিত্র
নবুয়তের চতুর্থ বর্ষে যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ সাফা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে প্রকাশ্য তাওহীদের দাওয়াত ঘোষণা করেন, তখন থেকে মক্কার কাফেররা তাঁর ওপর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক অবর্ণনীয় নির্যাতন শুরু করে:
- শারীরিক আক্রমণ ও লাঞ্ছনা: আবু লাহাব প্রকাশ্যে তাঁকে পাথর নিক্ষেপ ও অভিশাপ দেয়। কাবাগৃহে সালাতরত অবস্থায় উকবা ইবনে আবি মুয়ীত উটের পচা নাড়িভুঁড়ি নবীজির পিঠের ওপর চাপিয়ে দেয়, যা তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা.) এসে অপসারণ করেন। কাফেলা চলাকালে তাঁর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখা হতো।
- মানসিক নির্যাতন ও অপবাদ: কাফেররা তাঁকে ‘জাদুকর’ (ساحر), ‘উন্মাদ’ (مجنون), ‘কবি’ (شاعر) এবং ‘গণক’ (كاهن) বলে কটূক্তি করত। তাঁর পুত্রদের অকাল মৃত্যুতে তারা তাঁকে ‘আবতার’ বা নির্বংশ বলে তাচ্ছিল্য করত, যার জবাবে সূরা আল-কাউসার নাযিল হয়।
- হত্যার ষড়যন্ত্র ও সামাজিক বয়কট: কুরাইশরা তাঁকে শিয়াবে আবু তালিবে তিন বছর চরম ক্ষুধার মুখে বন্দি রাখে। পরিশেষে মদিনা হিজরতের প্রাক্কালে দারুন নদওয়ায় বসে সকল গোত্রের তরুণেরা মিলে তাঁকে রাতের আঁধারে হত্যার চূড়ান্ত নীল নকশা তৈরি করে, যা আল্লাহ ব্যর্থ করে দেন।
١٠- تحدث عن الهجرة إلى الحبشة
الهجرة إلى الحبشة أسبابها ونتائجها / আবিসিনিয়ায় (হাবশায়) হিজরত
মক্কায় কাফেরদের বর্বর নির্যাতন যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের নিরাপত্তার স্বার্থে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে খ্রিস্টান রাজা আসহামা নাজ্জাশীর শাসনাধীন আবিসিনিয়ায় হিজরতের নির্দেশ দেন।
- প্রথম হিজরত (নবুয়তের ৫ম বর্ষ – ৬১৫ খ্রি.): বারো জন পুরুষ ও চার জন নারী সাহাবী গোপনে লোহিত সাগর পাড়ি দেন। এর মধ্যে হযরত উসমান (রা.) এবং তাঁর স্ত্রী রাসূল-কন্যা রুকাইয়াহ (রা.) অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম হিজরত।
- দ্বিতীয় হিজরত: মক্কার কাফেররা ইসলাম গ্রহণ করেছে বলে ভুল গুজব শুনে অনেকে মক্কায় ফিরে এসে দেখেন নির্যাতন আরও বেড়েছে। তখন ৮৩ জন পুরুষ ও ১৯ জন নারী সাহাবী পুনরায় হাবশায় হিজরত করেন।
- নাজ্জাশীর দরবারে ঐতিহাসিক বিতর্ক: কুরাইশরা আমর ইবনুল আস ও আব্দুল্লাহ ইবনে আবি রাবিয়ার নেতৃত্বে দামি উপহার নিয়ে নাজ্জাশীর দরবারে গিয়ে মুসলিমদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানায়। বাদশাহ নাজ্জাশী মুসলিমদের ডাকেন। তখন হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.) এক যুগান্তকারী ভাষণ দেন। তিনি জাহিলিয়্যাতের অন্ধকার এবং ইসলামের নৈতিক সৌন্দর্যের কথা তুলে ধরেন এবং সূরা মারয়ামের প্রাথমিক আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে শোনান। আয়াত শুনে বাদশাহ নাজ্জাশী ও তাঁর দরবারের পাদ্রীরা অশ্রুসিক্ত হন এবং বাদশাহ ঘোষণা করেন: “এই বাণী এবং ঈসা (আ.)-এর বাণী একই প্রদীপের আলোকচ্ছটা।” তিনি মুসলিমদের আশ্রয় দেন এবং কুরাইশদের উপহার ফেরত দেন।
١١- بيّن الوصايا التي أوصى بها رسول الله صلى الله عليه وسلم أمته في حجة الوداع
وصايا النبي صلى الله عليه وسلم في خطبة حجة الوداع / বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে উম্মতকে প্রদত্ত উপদেশমালা
দশম হিজরীতে আরাফাতের ময়দানে জাবালুর রাহমার পাদদেশে দাঁড়িয়ে লক্ষাধিক সাহাবীর মহাসমাবেশে মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ যে দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেন, তা বিশ্ব মানবতার মুক্তি ও মানবাধিকারের চিরন্তন দলিল। তাঁর প্রধান উপদেশগুলো নিম্নরূপ:
- ১. জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা: “হে লোকসকল! তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ এবং তোমাদের ইজ্জত-সম্মান আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই শহরের মতোই পরস্পরের জন্য চিরতরে হারাম ও পবিত্র।”
- ২. জাহিলিয়্যাতের রক্তপাত ও কুসংস্কারের বিলুপ্তি: জাহিলি যুগের সকল রক্তের দাবি এবং সকল প্রকার অন্ধ প্রতিশোধ প্রথা সম্পূর্ণভাবে বাতিল ঘোষণা করা হলো।
- ৩. সুদের চিরতরে মূলোৎপাটন: জাহিলি যুগের সকল সুদ বাতিল ঘোষণা করা হলো এবং সর্বপ্রথম তিনি তাঁর চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের যাবতীয় সুদ রহিত করেন।
- ৪. নারী অধিকারের সুদৃঢ় সুরক্ষা: “তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ। তাদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তোমাদের ওপরও তাদের অনুরূপ অধিকার রয়েছে।”
- ৫. বর্ণবাদ ও জাত্যভিমানের অবসান: “কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের এবং কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের বা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো প্রাধান্য নেই—একমাত্র তাকওয়া বা খোদাভীতি ব্যতীত।”
- ৬. কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ: “আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি, যতদিন তোমরা তা শক্তভাবে ধারণ করবে ততদিন কখনো পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাহ।”
- ৭. মানবাধিকার ও অধীনস্তদের অধিকার: দাস-দাসীদের ব্যাপারে নির্দেশ দেন—”তোমরা যা খাবে তাদেরকেও তা খাওয়াবে, যা পরবে তাদেরকেও তা পরাবে।”
١٢- تحدث عن أهل بيت النبي صلى الله عليه وسلم وأولاده
أهل بيت النبي صلى الله عليه وسلم وأولاده الكرام / মহানবী ﷺ-এর আহলে বাইত ও পবিত্র সন্তান-সন্ততি
১. আহলে বাইতের পরিচয় ও মর্যাদা (أهل البيت):
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াতে আহলে বাইতের পবিত্রতা ঘোষণা করা হয়েছে: ﴿إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا﴾। জমহুর আহলে সুন্নাতের মতে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত হলেন—উম্মাহাতুল মুমিনীন (সকল পবিত্র স্ত্রীগণ), হযরত আলী (রা.), সাইয়্যিদাতু নিসা ফাতিমাতুয যাহরা (রা.), ইমাম হাসান ও হুসাইন (রা.) এবং বনু হাশিমের মুমিন বংশধরগণ যাঁদের ওপর সদকা গ্রহণ হারাম।
২. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সন্তান-সন্ততির বিবরণ (أولاد النبي):
ঐতিহাসিকদের সর্বসম্মত মতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মোট সন্তান ছিলেন সাতজন—তিনজন পুত্র ও চারজন কন্যা। শেষ পুত্র ইবরাহীম ব্যতীত অপর ছয় সন্তানের মাতাই ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রা.):
- পুত্রসন্তানগণ (الأبناء):
- কাসিম (القاسم): নবীজির প্রথম সন্তান। তাঁর নামানুসারেই নবীজিকে ‘আবুল কাসিম’ উপনামে ডাকা হতো। তিনি শৈশবেই মক্কায় ইন্তেকাল করেন।
- আব্দুল্লাহ (عبد الله): নবুয়তের পর মক্কায় জন্ম নেন। তাঁকে ‘তাইয়্যিব’ ও ‘তাহির’ বলা হতো। তিনিও শৈশবেই ইন্তেকাল করেন।
- ইবরাহীম (إبراهيم): অষ্টম হিজরীতে মদিনায় উম্মুল মুমিনীন মারিয়া আল-কিবতিয়্যা (রা.)-এর গর্ভে জন্ম নেন। মাত্র ১৬ বা ১৮ মাস বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। নবীজি তাঁর বিয়োগে ব্যথিত হয়ে অশ্রু বিসর্জন করেন।
- কন্যাসন্তানগণ (البنات):
- যয়নব (زينب – রা.): নবীজির জ্যেষ্ঠ কন্যা। আবু আল-আস ইবনে রবির সাথে তাঁর বিবাহ হয়। অষ্টম হিজরীতে মদিনায় ইন্তেকাল করেন।
- রুকাইয়াহ (رقية – রা.): ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.)-এর সাথে বিবাহ হয়। বদর যুদ্ধের সময় তিনি মদিনায় ইন্তেকাল করেন।
- উম্মে কুলসুম (أم كلثوم – রা.): রুকাইয়াহ (রা.)-এর ওফাতের পর উসমান (রা.)-এর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। ফলে উসমান (রা.) ‘যুন-নুরাইন’ (দুই জ্যোতির অধিকারী) উপাধি পান। নবম হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
- ফাতিমাতুয যাহরা (فاطمة الزهراء – রা.): নবীজির কনিষ্ঠ ও সর্বাধিক প্রিয় কন্যা, জান্নাতী নারীদের নেত্রী। হযরত আলী (রা.)-এর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁর গর্ভেই হাসান ও হুসাইন (রা.) জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁদের মাধ্যমেই নবীজির পবিত্র বংশধারা অব্যাহত থাকে। নবীজির ওফাতের মাত্র ছয় মাস পর তিনি ইন্তেকাল করেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: জাহিলিয়্যাতের যুগে আরবের ধর্মীয় অবস্থা কেমন ছিল?
উত্তর: তৎকালীন আরবে তাওহীদ বিলুপ্ত হয়ে মূর্তি ও বহুশ্বরবাদের চরম বিস্তার ঘটেছিল। পবিত্র কাবাগৃহে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল এবং মানুষ জ্যোতিষী, ভাগ্যগণনা ও অলৌকিক কুসংস্কারে নিমজ্জিত ছিল।
প্রশ্ন ২: মদিনা সনদকে কেন বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান বলা হয়?
উত্তর: ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের সহাবস্থান, জান-মালের নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষার জন্য ৪৭টি সুনির্দিষ্ট ধারার একটি লিখিত রাজনৈতিক চুক্তি প্রণয়ন করা হয়, যা লিখিত সংবিধানের প্রাচীনতম নজির।
প্রশ্ন ৩: ওহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের সাময়িক বিপর্যয়ের মূল কারণ কী ছিল?
উত্তর: পাহাড়ের চূড়ায় নিয়োজিত তীরন্দাজ বাহিনীর একটি বড় অংশ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে নিশ্চিত বিজয়ের মুখে গনীমতের মাল সংগ্রহের জন্য স্থান ত্যাগ করায় খালিদ বিন ওয়ালীদের অশ্বারোহী দল পেছন থেকে অতর্কিত আক্রমণ চালায়।
প্রশ্ন ৪: হিলফুল ফুজুল চুক্তির মূল লক্ষ্য কী ছিল?
উত্তর: মজলুম ও দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষা করা, সমাজে অন্যায়-জুলুম প্রতিরোধ করা এবং বহিরাগত কোনো ব্যবসায়ী বা সাধারণ নাগরিকের ওপর নির্যাতন হতে না দেওয়া ছিল এই চুক্তির মূল লক্ষ্য।
প্রশ্ন ৫: ইসলামে জিহাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা জিহাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং অন্যায়-অত্যাচার প্রতিহত করা, সত্যের দাওয়াত প্রচারের উন্মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত রাখাই জিহাদের মূল উদ্দেশ্য।
প্রশ্ন ৬: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মোট সন্তান-সন্ততি কতজন ছিলেন?
উত্তর: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সর্বমোট সাতজন সন্তান ছিলেন—তিনজন পুত্র (কাসিম, আব্দুল্লাহ ও ইবরাহীম) এবং চারজন কন্যা (যয়নব, রুকাইয়াহ, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা)। ইবরাহীম ব্যতীত অপর ছয় সন্তানের মাতা ছিলেন হযরত খাদিজা (রা.)।