জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

উলুমুল কুরআন (Ulumul Quran) – 203205, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা 2020

Abswer.com Abswer.com
21 September, 2026
৭২ মিনিট পড়ার সময়
১০ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০২ | বিষয় কোড: ২০৩২০৫ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৫৪
اختبار السنة الثانية للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ۲۰۲۰
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২০
বিভাগ: দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ (الدعوة والدراسات الإسلامية)
বিষয়: উলূমুল কুরআন (علوم القرآن)
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা


مجموعة (أ) [‘ক’ বিভাগ – রচনামূলক প্রশ্নাবলি]

اجب عن أربعة من الأسئلة التالية (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও): মান: ১৫ × ৪ = ৬০

١- عرف القرآن الكريم – ثم بيّن بعض أسمائه وصفاته مع توضيح الفرق بينه وبين الحديث القدسي-

[১. আল-কুরআনের পরিচয় দাও। অতঃপর কুরআনের কিছু নাম ও বিশেষণের বর্ণনা দাও এবং কুরআন ও হাদিসে কুদসীর মধ্যে পার্থক্য বিশদভাবে আলোচনা কর।]

১. কুরআনুল কারীমের পরিচয় ও সংজ্ঞা (تعريف القرآن الكريم)

আভিধানিক অর্থ: ‘কুরআন’ (القرآن) শব্দটি আরবি ভাষায় ‘ক্বিরাআত’ (القراءة) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ পাঠ করা বা একত্রিত করা (الجمع والقراءة)। যেহেতু এটি বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ এবং এতে অতীত ও ভবিষ্যতের সমগ্র জ্ঞান এবং সমস্ত আসমানী কিতাবের সারবস্তু একত্রিত করা হয়েছে, তাই একে ‘কুরআন’ বলা হয়।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামী শরিয়ত ও উসূলে ফিকহের পরিভাষায় আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী এবং ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) বলেন:

«هُوَ كَلَامُ اللَّهِ الْمُعْجِزُ، الْمُنَزَّلُ عَلَى قَلْبِ مُحَمَّدٍ ﷺ، الْمَنْقُولُ إِلَيْنَا بِالتَّوَاتُرِ، الْمُتَعَبَّدُ بِتِلَاوَتِهِ، الْمَبْدُوءُ بِسُورَةِ الْفَاتِحَةِ وَالْمَخْتُومُ بِسُورَةِ النَّاسِ»

ভাষান্তর: “আল-কুরআন হলো মহান আল্লাহর মুজিযাপূর্ণ চিরন্তন বাণী, যা তাঁর সর্বশেষ রাসুল হযরত মুহাম্মাদ ﷺ-এর অন্তরে অবতীর্ণ হয়েছে, যা আমাদের নিকট অবিচ্ছিন্ন সূত্রে (তাওয়াতুর সহকারে) বর্ণিত হয়েছে, যার তিলাওয়াত ইবাদত হিসেবে গণ্য, যা মুসহাফে সূরা আল-ফাতিহা দ্বারা শুরু এবং সূরা আন-নাস দ্বারা সমাপ্ত।”

২. কুরআনের কতিপয় প্রসিদ্ধ নাম ও গুণবাচক বিশেষণ (أسماؤه وصفاته)

আল্লামা যারকাশী (রহ.) আল-বুরহান ফী উলূমুল কুরআন গ্রন্থে কুরআনের ৫৫টিরও বেশি নাম ও বিশেষণের উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে প্রধান কয়েকটি নিম্নরূপ:

  1. আল-কুরআন (القرآن): সর্বাধিক পরিচিত নাম। ইরশাদ হয়েছে: ﴿إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ﴾।
  2. আল-কিতাব (الكتاب): লিখিত ও সংকলিত গ্রন্থ অর্থে। ইরশাদ হয়েছে: ﴿ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ﴾।
  3. আল-ফুরকান (الفرقان): সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী। ইরশাদ হয়েছে: ﴿تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا﴾।
  4. আয-যিকর (الذكر): উপদেশ ও স্মারক গ্রন্থ। ইরশাদ হয়েছে: ﴿إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ﴾।
  5. আত-তানযীল (التنزيل): আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। ইরশাদ হয়েছে: ﴿وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ﴾।
  6. গুণবাচক বিশেষণসমূহ: আন-নূর (জ্যোতি), আশ-শিফা (আরোগ্যকারী), আল-হুদা (পথপ্রদর্শক), আল-মাজীদ (মহিমান্বিত), আল-হাকীম (প্রজ্ঞাময়), আল-মুবারাক (বরকতময়)।

৩. আল-কুরআন ও হাদিসে কুদসীর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য (الفرق بين القرآن والحديث القدسي)

পার্থক্য কুরআনুল কারীম (القرآن الكريم) হাদিসে কুদসী (الحديث القدسي)
শব্দ ও অর্থ শব্দ (لفظ) ও অর্থ (معنى) উভয়ই সরাসরি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরীল (আ.)-এর মাধ্যমে অবতীর্ণ। অর্থ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এলহাম বা ওহির মাধ্যমে প্রাপ্ত, কিন্তু এর শব্দ ও ভাষা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিজের।
মুজিযা ও চ্যালেঞ্জ এটি একটি চিরন্তন মুজিযা (معجز)। কিয়ামত পর্যন্ত একটি সূরার অনুরূপ রচনার প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছে। এটি মুজিযা নয় এবং এর মতো কোনো বাক্য রচনার কোনো চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়নি।
নামাযে পাঠ নামাযে এর তিলাওয়াত ফরজ ও অপরিহার্য (متعبد بتلاوته); কুরআন ব্যতীত নামায শুদ্ধ হয় না। নামাযে হাদিসে কুদসীর পাঠ বৈধ নয় এবং তা দ্বারা নামায আদায় হয় না।
প্রতি অক্ষরে সওয়াব প্রতিটি হরফ তিলাওয়াতে নির্দিষ্ট ১০টি নেকি লাভের ঘোষণা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এর সাধারণ পাঠে হাদিসের মতো সওয়াব মিলবে, কিন্তু কুরআনের মতো প্রতি হরফে ১০ নেকির বিশেষ মর্যাদা নেই।
সনদের তাওয়াতুর এর প্রতিটি শব্দ ও আয়াত অকাট্য তাওয়াতুর দ্বারা সাব্যস্ত। এর একটি হরফ অস্বীকারকারী কাফের। অধিকাংশ হাদিসে কুদসী ‘খবরে ওয়াহেদ’ (একক সূত্রে বর্ণিত)। এর মধ্যে সহিহ, হাসান এমনকি জয়িফও রয়েছে।
পবিত্রতা ও স্পর্শ অজু বা পবিত্রতা ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা বৈধ নয় (﴿لَّا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ﴾)। অজু ব্যতীত হাদিসে কুদসীর কিতাব স্পর্শ করা ও পাঠ করা জায়েজ।

٢- ما معنى الآية والسورة؟ وما الحكمة فى تقسيم القرآن إلى آيات وسور؟ بيّن مع ذكر عدد آيات القرآن وسوره-

[২. السورة ও الآية এর অর্থ কী? কুরআনকে বিভিন্ন আয়াত ও সূরায় বিভক্ত করার কারণ কী? কুরআনের আয়াত ও সূরার সংখ্যা উল্লেখপূর্বক আলোচনা কর।]

১. ‘আল-আয়াহ’ ও ‘আস-সূরাহ’র অর্থ ও সংজ্ঞা (معنى الآية والسورة)

  • আল-আয়াহ (الآية):
    • আভিধানিক অর্থ: নিদর্শন বা চিহ্ন (العلامة), অলৌকিক বিষয় বা মুজিযা (المعجزة), শিক্ষা ও উপদেশ (العبرة)। যেমন: ﴿وَجَعَلْنَا اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ آيَتَيْنِ﴾।
    • পারিভাষিক সংজ্ঞা: কুরআনের একটি সূরার অন্তর্গত নির্দিষ্ট বাক্য বা বাক্যাংশ, যার একটি নির্দিষ্ট সূচনা ও সমাপ্তি চিহ্ন রয়েছে এবং যা আল্লাহর নির্দেশক্রমে ওহির ভিত্তিতে সুনির্ধারিত (توقيفي), তাকে ‘আয়াত’ বলা হয়।
  • আস-সূরাহ (السورة):
    • আভিধানিক অর্থ: উচ্চ মর্যাদা বা মনজিল (المنزلة الرفيعة), প্রাচীর বা শহরের সুরক্ষাবেষ্টনী (سور المدينة)। যেমন কবি নাবিকা বলেন: «أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ أَعْطَاكَ سُورَةً» (তুমি কি দেখনি আল্লাহ তোমাকে এক সমুচ্চ মর্যাদা দান করেছেন?)।
    • পারিভাষিক সংজ্ঞা: কুরআনের অন্তত তিনটি আয়াত সমন্বিত এমন একটি স্বতন্ত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ অধ্যায় বা অংশ, যার একটি নির্দিষ্ট নাম, সূচনা এবং পরিসমাপ্তি রয়েছে, তাকে ‘সূরা’ বলা হয়।

২. কুরআনকে বিভিন্ন আয়াত ও সূরায় বিভক্ত করার হিকমত ও কারণসমূহ (الحكمة في التقسيم)

  1. হিফয ও তিলাওয়াত সহজীকরণ (تيسير الحفظ والقراءة): সমগ্র কুরআন যদি একটিমাত্র দীর্ঘ অবিচ্ছিন্ন পাঠ হতো, তবে তা মুখস্থ করা, নামাজে পাঠ করা এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদান অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হতো। ছোট ছোট অংশে বিভক্ত থাকার কারণে মানুষ অতি সহজে তা হিফয করতে পারে।
  2. পাঠকের মানসিক ক্লান্তি দূরীকরণ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি (تنشيط القارئ): একটি নির্দিষ্ট সূরা সমাপ্ত করে নতুন সূরা শুরু করার সময় তিলাওয়াতকারীর অন্তরে এক নবতর আনন্দ ও মানসিক তৃপ্তি অনুভূত হয়।
  3. বিষয়বস্তুর স্বতন্ত্রতা ও বৈচিত্র্য: প্রতিটি সূরার একটি নিজস্ব মূলভাব (عمود السورة) বা কেন্দ্রীয় বার্তা থাকে। সূরায় বিভক্ত হওয়ায় আকীদা, আহকাম, কিসসা ও আখলাকের বিভিন্ন দিক সুশৃঙ্খলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
  4. কুরআনের ই’জাযের পূর্ণতা প্রকাশ: আল্লাহ তা’আলা কাফেরদের চ্যালেঞ্জ করেছেন কুরআনের ক্ষুদ্রতম একটি সূরার মতো কিছু তৈরি করতে: ﴿فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ﴾। সূরা কাউছারের মতো মাত্র তিন আয়াতের একটি সূরায়ও যে সাহিত্যিক ও ভাবগত শ্রেষ্ঠত্ব বিদ্যমান, তা সূরার কাঠামোগত বিভাজনের মাধ্যমেই স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।

৩. কুরআনের সূরা ও আয়াতের সংখ্যা (عدد آيات القرآن وسوره)

  • সূরার সংখ্যা: উম্মতে মুহাম্মাদীর সর্বসম্মত ঐকমত্যে কুরআনের মোট সূরার সংখ্যা ১১৪টি। তন্মধ্যে মক্কী সূরা ৮৬টি এবং মাদানী সূরা ২৮টি। সবচেয়ে দীর্ঘ সূরা হলো সূরা আল-বাকারা (২৮৬ আয়াত) এবং ক্ষুদ্রতম সূরা হলো সূরা আল-কাউসার (৩ আয়াত)।
  • আয়াতের সংখ্যা: আমাদের অঞ্চলে প্রচলিত কূফী গণনাপদ্ধতি (আলী ও ইবনু মাসউদ রা.-এর সূত্রে ইমাম আসেম ও হাফস রহ. কর্তৃক বর্ণিত) অনুসারে কুরআনের মোট আয়াত সংখ্যা ৬,২৩৬টি। বিভিন্ন শহরের কারীগণের গণনানুসারে সামান্য সংখ্যার পার্থক্য রয়েছে (মাদানী গণনায় ৬,২১৪ বা ৬,২১৪টি, মাক্কী গণনায় ৬,২১৯টি, বসরী গণনায় ৬,২০৪ বা ৬,২২৫টি, শামী গণনায় ৬,২২৬টি)। মনে রাখা আবশ্যক যে, এই পার্থক্য কোনো মূল পাঠের পার্থক্য নয়; বরং রাসুলুল্লাহ ﷺ তিলাওয়াতের সময় কোথায় পূর্ণ বিরতি (ওয়াকফ) দিয়েছেন আর কোথায় মিলিয়ে পড়েছেন—কেবল সেই বিরতিচিহ্ন নির্ধারণের গণনাগত তারতম্য মাত্র। সাধারণ মানুষের মুখে প্রচলিত ‘৬৬৬৬ আয়াত’ সংখ্যাটি একটি সামগ্রিক ধারণামূলক হিসাব (যেমন ১০০০ ওয়াদা, ১০০০ ধমক, ১০০০ হালাল, ১০০০ হারাম ইত্যাদি)।

٣- لماذا نزل القرآن الكريم منجما ومفرقا؟ بيّن فوائده فى مجال التعليم والتربية-

[৩. কুরআনুল কারীম কেন ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ হয়েছে? শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতির উপকারিতাসমূহ বর্ণনা কর।]

১. কুরআন পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট ও হিকমতসমূহ

পূর্ববর্তী অন্যান্য আসমানী কিতাব (যেমন তাওরাত, ইঞ্জিল ও যাবুর) তাদের নবিদের ওপর একবারে কিতাববদ্ধ আকারে অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু আল-কুরআন দীর্ঘ ২৩ বছর ব্যাপী নবুওয়তী জীবনে অল্প অল্প করে বাস্তব জীবনের ঘটনা ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে। কাফেররা এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল: ﴿وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً﴾। মহান আল্লাহ তাদের প্রশ্নের জবাবে ও ধীরে ধীরে নাজিলের পেছনে বহুবিধ হিকমত ব্যক্ত করেছেন:

  1. নবিজি ﷺ-এর পবিত্র অন্তরকে সুদৃঢ় রাখা (تثبيت فؤاد النبي ﷺ): কাফেরদের তীব্র বিরোধিতা, কটূক্তি ও নির্যাতনের মুখে যখনই নবিজি ﷺ মানসিকভাবে ব্যথিত হতেন, তখনই নতুন ওহি নাজিল হয়ে তাঁর হৃদয়কে শান্ত ও অবিচল রাখত। ইরশাদ হয়েছে: ﴿كَذَٰلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ ۖ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلًا﴾।
  2. উম্মতের জন্য হিফয ও অনুধাবন সহজ করা: তৎকালীন আরবরা ছিল নিরক্ষর উম্মত (أمة أمية)। একবারে সমগ্র গ্রন্থ নাজিল হলে তা মুখস্থ করা ও সংরক্ষণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। অল্প অল্প করে নাজিলের কারণে সাহাবিগণ তা সহজে মুখস্থ ও আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন।
  3. বিধান প্রণয়নে পর্যায়ক্রমিকতা (التدرج في التشريع): আরবের মানুষ যেসব কুঅভ্যাসে শত শত বছর অভ্যস্ত ছিল (যেমন মদ্যপান, জুয়া, সুদ), তা এক ঘোষণায় বন্ধ করা সম্ভব ছিল না। কুরআন ধাপে ধাপে বিধান আরোপ করেছে। হযরত আয়িশা (রা.) যথার্থই বলেছেন: “কুরআনে সর্বপ্রথম জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা সম্বলিত সূরা নাজিল হয়েছে। মানুষ যখন ইসলামের প্রতি অনুরক্ত হলো, তখন হালাল ও হারামের বিধান আসল। যদি শুরুতেই বলা হতো মদ্যপান করো না, তবে মানুষ বলত আমরা কখনো মদ ত্যাগ করব না!”
  4. সমসাময়িক সমস্যা ও প্রশ্নের তাৎক্ষণিক সমাধান: সাহাবিদের বিভিন্ন প্রশ্ন (﴿يَسْأَلُونَكَ عَنِ…﴾), পারিবারিক সংকট (যেমন সূরা মুজাদালায় খাওলা বিনতে সা’লাবার ঘটনা, ইফকের অপবাদ) ইত্যাদির তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য সময় উপযোগী ওহি নাজিল আবশ্যক ছিল।
  5. কুরআনের অলৌকিকতা ও ই’জাযের প্রমাণ: দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে যুদ্ধ, শান্তি, সুখ, দুঃখ, সফর ও বাসস্থানের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অবতীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সমগ্র গ্রন্থের ভাষা, শব্দশৈলী ও বাণীর মধ্যে চুল পরিমাণ অসঙ্গতি বা বৈপরীত্য দেখা যায়নি। ইরশাদ হয়েছে: ﴿وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا﴾।

২. শিক্ষা-দীক্ষা ও তরবিয়তের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিক নাজিলের উপকারিতা (فوائده في التعليم والتربية)

  • বাস্তবমুখী জ্ঞানার্জন: সাহাবিগণ কেবল তত্ত্বীয় জ্ঞান অর্জন করতেন না; বরং একটি বিধান নাজিল হওয়ার সাথে সাথে তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতেন। হযরত আবু আব্দুর রহমান আস-সুলামী বলেন: সাহাবায়ে কেরাম একসাথে দশটি আয়াত শিখতেন, যতক্ষণ না তার ইলম ও আমল পরিপূর্ণ হতো ততক্ষণ তারা পরবর্তী আয়াতে যেতেন না।
  • মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি ও আত্মিক পরিশুদ্ধি: মানুষের চরিত্র রাতারাতি পরিবর্তন করা যায় না। ধীরে ধীরে নাজিলের ফলে জাহিলি যুগের বর্বর মানুষগুলো পর্যায়ক্রমে পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম নীতিবান ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হতে পেরেছিলেন।
  • শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মিথস্ক্রিয়া: রাসুলুল্লাহ ﷺ শিক্ষক হিসেবে সাহাবিদের প্রতিটি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ওহির আলোকে দিকনির্দেশনা প্রদান করার পর্যাপ্ত অবকাশ পেয়েছিলেন।

٤- اكتب ما تعرف عن أول ما نزل وآخر ما نزل من القرآن الكريم مع ذكر فوائد هذا العلم-

[৪. কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ আয়াত ও শেষ অবতীর্ণ আয়াত সম্পর্কে যা জান লেখ এবং এ বিষয়টি জানার উপকারিতা বর্ণনা কর।]

১. সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত (أول ما نزل من القرآن)

কুরআনুল কারীমের সর্বপ্রথম কোন্ অংশ নাজিল হয়েছিল সে ব্যাপারে একাধিক বর্ণনা থাকলেও ইমাম বুখারি ও মুসলিমের সহিহ হাদিসের আলোকে জমহুর উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো:

  • সর্বপ্রথম নাজিলকৃত আয়াত: হেরা গুহায় ওহি সূচনার মুহূর্তে সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত:

    ﴿اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ¤ خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ ¤ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ ¤ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ¤ عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ﴾

  • অন্যান্য মতামতের সমন্বয়:
    • সূরা আল-মুদ্দাসসিরের প্রথম অংশ: ওহি সাময়িক বন্ধ থাকার পর (ফাতরাতুল ওহি) প্রকাশ্য দাওয়াতের সূচনা হিসেবে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়।
    • সূরা আল-ফাতিহা: একবারে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসেবে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়।
    • তাসমিয়াহ (তাওফিক প্রার্থনা): প্রতিটি নতুন সূরার সূচনাকারী হিসেবে প্রথম নাজিল হয়।

২. সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত (آخر ما نزل من القرآن)

সর্বশেষ নাজিলকৃত আয়াত সম্পর্কে সাহাবিদের বিভিন্ন অভিমত রয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও শক্তিশালী অভিমতটি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত:

  • সর্বাধিক বিশুদ্ধ অভিমত: সূরা আল-বাকারার ২৮১ নং আয়াত:

    ﴿وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ۖ ثُمَّ تُوَفَّىٰ كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ﴾

    ভাষান্তর: “আর তোমরা ভয় কর সেই দিনকে, যেদিন তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার উপার্জনের পূর্ণ প্রতিফল দেওয়া হবে এবং তাদের প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না।”

    ইমাম নাসায়ী ও ইবনু আবি হাতিম বর্ণনা করেন, এই আয়াত নাজিলের মাত্র ৯ বা ২১ দিন পর রাসুলুল্লাহ ﷺ ওফাত লাভ করেন।

  • অন্যান্য বিশিষ্ট অভিমত:
    • সুদের বিধান সম্বলিত আয়াত (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮): হযরত উমর (রা.)-এর মতে এটি অন্যতম শেষ নাজিলকৃত আয়াত।
    • কালালার আয়াত (সূরা আন-নিসা: ১৭৬): মীরাসের বিধান সম্বলিত শেষ আয়াত।
    • সূরা আল-মায়িদার ৩ নং আয়াত: ﴿الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ﴾। এটি দশম হিজরির বিদায় হজে আরাফার ময়দানে নাজিল হয়েছিল। তবে এটি আকীদা ও শরিয়ত পরিপূর্ণতার দিক থেকে শেষ আয়াত, ওহির অবতরণের সমাপ্তির দিক থেকে নয়।

৩. প্রথম ও শেষ নাজিলকৃত আয়াত জানার উপকারিতা (فوائد هذا العلم)

  1. নাসিখ ও মানসূখ নির্ণয় (معرفة الناسخ والمنسوخ): শরিয়তের দুটি বিধানের মধ্যে বাহ্যিক বৈপরীত্য দেখা দিলে কোনটি পূর্বে নাজিল হয়েছিল এবং কোনটি পরে নাজিল হয়েছিল তা জানার মাধ্যমেই পরবর্তী আয়াতটিকে ‘নাসিখ’ (রহিতকারী) এবং পূর্ববর্তী আয়াতটিকে ‘মানসূখ’ (রহিত) হিসেবে সুনির্দিষ্ট করা যায়।
  2. ইসলামী শরিয়তের ক্রমবিকাশ ও দর্শন অনুধাবন: আল্লাহ তা’আলা কীভাবে মানবজাতিকে ধাপে ধাপে সহজ থেকে দৃঢ় বিধানের দিকে পরিচালিত করেছেন তা স্পষ্ট হয়।
  3. কুরআনের ঐতিহাসিক নির্ভুলতা সংরক্ষণ: এই জ্ঞান প্রমাণ করে যে সাহাবায়ে কেরাম কুরআনের প্রতিটি আয়াতের স্থান, কাল ও প্রেক্ষাপট অত্যন্ত নিখুঁত ও বিশ্বস্ততার সাথে সংরক্ষণ করেছিলেন।

٥- عرف التفسير ثم بين أقسامه مع ذكر الفرق بينه وبين التأويل-

[৫. التفسير এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর التفسير ও التأويل এর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়পূর্বক التفسير এর প্রকারসমূহ আলোচনা কর।]

১. তাফসিরের পরিচয় ও সংজ্ঞা (تعريف التفسير)

আভিধানিক অর্থ: ‘তাফসির’ (التفسير) শব্দটি বাবে তাফঈলের মাসদার, যার মূল ধাতু ‘আল-ফাসর’ (الفسر) অথবা ‘আত-তাফসির’। এর অর্থ স্পষ্ট করা, উন্মোচন করা, আবরণ সরিয়ে ব্যাখ্যা করা (الكشف والإظهار والبيان)।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম যারকাশী এবং আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) বলেন:

«عِلْمٌ يُفْهَمُ بِهِ كِتَابُ اللَّهِ الْمُنَزَّلُ عَلَى نَبِيِّهِ مُحَمَّدٍ ﷺ، وَبَيَانُ مَعَانِيهِ، وَاسْتِخْرَاجُ أَحْكَامِهِ وَحِكَمِهِ»

ভাষান্তর: “তাফসির হলো এমন একটি শাস্ত্র, যার সাহায্যে মহান আল্লাহর সর্বশেষ নবি মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর অবতীর্ণ মহাগ্রন্থ আল-কুরআনকে যথাযথভাবে অনুধাবন করা যায়, এর অন্তর্নিহিত অর্থ ব্যাখ্যা করা যায় এবং এর থেকে বিধি-বিধান ও হিকমতসমূহ উদঘাটন করা যায়।”

২. তাফসির ও তাবিলের মধ্যে পার্থক্য (الفرق بين التفسير والتأويل)

‘তাবিল’ (التأويل) শব্দের আভিধানিক অর্থ মূল উৎসে প্রত্যাবর্তন করা (الرجوع إلى الأصل)। পারিভাষিক অর্থে কোনো শব্দের প্রকাশ্য অর্থকে বাদ দিয়ে দলিলের ভিত্তিতে তার অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য দূরবর্তী অর্থে প্রয়োগ করাকে তাবিল বলা হয়। তাফসির ও তাবিলের মধ্যকার প্রধান পার্থক্যগুলো নিম্নরূপ:

  • রিওয়ায়াত বনাম দিরায়াত: ইমাম আবু তালিব আস-সা’লাবী বলেন: তাফসির হলো রেওয়ায়েত বা বর্ণনার সাথে সম্পৃক্ত (যা ওহি ও সুন্নাহর ভিত্তিতে নির্ধারিত); আর তাবিল হলো দেরায়েত বা যুক্তিসিদ্ধ ইজতিহাদের সাথে সম্পৃক্ত।
  • বাহ্যিক বনাম অন্তর্নিহিত অর্থ: আল্লামা রাগিব আল-ইসফাহানী বলেন: শব্দের প্রকাশ্য ও শাব্দিক ব্যাখ্যাকে তাফসির বলে; আর শব্দের গভীর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও রূপক অর্থকে অনুধাবন করাকে তাবিল বলে।
  • সাধারণ বনাম বিশেষ: তাফসির শব্দ ও বাক্যের সাধারণ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়; আর তাবিল বিশেষত জটিল ও রূপক (মুতাশাবিহাত) আয়াতের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়।

৩. তাফসিরের প্রধান প্রকারভেদ (أقسام التفسير)

পদ্ধতি ও উৎসের ভিত্তিতে তাফসির প্রধানত তিন প্রকার:

  1. আত-তাফসির বিল-মা’ছুর (التفسير بالمأثور): ওহি ও সাহাবিদের প্রামাণ্য বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল তাফসির। অর্থাৎ—কুরআন দ্বারা কুরআনের ব্যাখ্যা, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সহিহ হাদিস দ্বারা ব্যাখ্যা, সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ও তাবেঈগণের নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যার সমন্বয়।

    প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ: ইমাম তাবারীর জামিউল বায়ান, ইবনু কাসীরের তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ইমাম সুয়ূতীর আদ-দুররুল মানছুর।
  2. আত-তাফসির বির-রায় (التفسير بالرأي): আরবি ভাষা, ব্যাকরণ, অলংকারশাস্ত্র ও শরিয়তের মূলনীতির আলোকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণাধর্মী তাফসির। এটি দুই ভাগে বিভক্ত:
    • প্রশংসনীয় (رأي محمود): যা বিশুদ্ধ আরবি ভাষা ও শরিয়তের মূলনীতির অনুগামী। যেমন: ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর তাফসীরে কাবীর (মাফাতিহুল গাইব), আল-বায়দাবীর আনওয়ারুত তানযীল।
    • নিন্দনীয় (رأي مذموم): যা মনগড়া, প্রমাণহীন ও নিজস্ব ভ্রান্ত মতবাদ প্রমাণের জন্য অপব্যাখ্যা। হাদিসে এসেছে: «مَنْ قَالَ فِي الْقُرْآنِ بِرَأْيِهِ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ» (যে ব্যক্তি উপযুক্ত জ্ঞান ছাড়া নিজের মত দিয়ে কুরআনের ব্যাখ্যা করে, সে যেন জাহান্নামে নিজের ঠিকানা বানিয়ে নেয়)।
  3. আত-তাফসিরুল ইশারী (التفسير الإشاري): যে তাফসিরে আয়াতের বাহ্যিক অর্থকে অক্ষুণ্ন রেখে আধ্যাত্মিক সাধক ও আলেমগণ অন্তর্দৃষ্টি ও ইশারার মাধ্যমে কোনো গোপন তত্ত্ব বা আত্মিক অর্থ উন্মোচন করেন। যেমন: ইমাম আলূসীর রূহুল মা’আনী, সহল আত-তুসতারীর তাফসির।

٦- ما هي شروط المفسر؟ بيّن بالتفصيل-

[৬. একজন মুফাসসিরের জন্য কী কী শর্ত রয়েছে বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

কুরআনুল কারীম মহান আল্লাহর বাণী। এর অপব্যাখ্যা রোধ এবং এর প্রকৃত মর্মোদঘাটনের জন্য কুরআন বিশারদ ও মুফাসসিরের জন্য কঠোর যোগ্যতা ও শর্তাবলী নির্ধারণ করা হয়েছে। ইমাম সুয়ূতী (রহ.) আল-ইতকান গ্রন্থে এবং ইমাম যারকাশী আল-বুরহান গ্রন্থে একজন আদর্শ মুফাসসিরের মৌলিক শর্তাবলি বিশদভাবে আলোচনা করেছেন।

মুফাসসিরের আবশ্যকীয় শর্ত ও গুণাবলি

  1. বিশুদ্ধ আকীদা (صحة العقيدة): মুফাসসিরকে খাঁটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আকীদার অধিকারী হতে হবে। কারণ বিদআতী বা ভ্রান্ত আকীদার লোক তার নিজস্ব মতবাদকে সমর্থন করার জন্য কুরআনের বিকৃত ব্যাখ্যা দাঁড় করায়।
  2. প্রবৃত্তির অনুসরণ ও পক্ষপাতহীনতা: দলীয় পক্ষপাতিত্ব, অন্ধ মাযহাবী সংকীর্ণতা বা পার্থিব স্বার্থের মোহমুক্ত হয়ে একমাত্র সত্যের সন্ধানে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা।
  3. আরবি ভাষা ও অভিধানের পূর্ণ জ্ঞান (معرفة لغة العرب ومفرداتها): কুরআনের প্রতিটি শব্দের আভিধানিক অর্থ, তার বিভিন্ন ব্যবহার এবং জাহিলি যুগের প্রামাণ্য কবিতার আলোকে তার মূল ভাব অনুধাবন করা। ইমাম মুজাহিদ বলেন: যে ব্যক্তি আরবি ভাষার গভীরে প্রবেশ করেনি তার পক্ষে আল্লাহর কিতাব নিয়ে কথা বলা হালাল নয়।
  4. নাহু ও সরফের গভীর পাণ্ডিত্য (علم النحو والصرف): একটি যের-যবর পরিবর্তনের ফলে বাক্যের কর্তা, কর্ম ও অর্থের আকাশ-পাতাল পরিবর্তন হয়ে যায়। তাই শব্দরূপান্তর (সরফ) ও বাক্যতত্ত্বের (নাহু) ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব অপরিহার্য।
  5. বালাগাত বা অলংকারশাস্ত্রের জ্ঞান (علم البلاغة): কুরআনের ই’জায বা অলৌকিকত্ব প্রস্ফুটিত হয় বালাগাতের মাধ্যমে। এর তিনটি শাখায় পণ্ডিত হতে হবে:
    • ইলমুল মা’আনী (علم المعاني): বাক্যের গঠন ও পরিস্থিতি অনুধাবন।
    • ইলমুল বায়ান (علم البيان): রূপক, উপমা ও রূপকাশ্রয়ী ভাব বোঝা।
    • ইলমুল বাদী’ (علم البديع): ভাষার নান্দনিক অলংকার অনুধাবন।
  6. উসূলে ফিকহ ও ফিকহের জ্ঞান (علم أصول الفقه): কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের নির্দেশক রূপ (আম, খাস, মুজমাল, মুফাসসাল, মুত্বলাক, মুকাইয়্যাদ ইত্যাদি) বুঝতে উসূলে ফিকহের জ্ঞান আবশ্যক।
  7. উলূমুল হাদিস ও সুন্নাহর জ্ঞান (علم الحديث النبوي): রাসুলুল্লাহ ﷺ হলেন কুরআনের সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকারী। তাই হাদিসের বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা যাচাইয়ের জ্ঞান মুফাসসিরের জন্য অপরিহার্য।
  8. আসবাবুন নুযূলের জ্ঞান (علم أسباب النزول): কোনো আয়াত কোন্ পরিস্থিতিতে, কার উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছিল তা না জানলে আয়াতের সঠিক মর্ম বোঝা অসম্ভব। যেমন ওয়াহিদী ও সুয়ূতীর আসবাবুন নুযূল সংক্রান্ত গ্রন্থাবলি।
  9. নাসিখ ও মানসূখের জ্ঞান (علم الناسخ والمنسوخ): কোন্ আয়াত রহিত হয়েছে এবং কোন্ আয়াত বহাল রয়েছে তা না জানলে হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল ফতোয়া দেওয়ার মারাত্মক বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। হযরত আলী (রা.) এক বক্তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন: “তুমি কি নাসিখ ও মানসূখ জান?” সে বলল: “না।” আলী (রা.) বললেন: “তাহলে তুমি নিজেও ধ্বংস হলে এবং অন্যদেরও ধ্বংস করলে!”
  10. ইলমে কিরাআতের জ্ঞান (علم القراءات): বিভিন্ন মুতাওয়াতির কেরাতের ভিন্নতার কারণে অর্থের যে গভীরতা ও সূক্ষ্মতা বৃদ্ধি পায় তা অনুধাবন করার জন্য কেরাত শাস্ত্রের জ্ঞান আবশ্যক।
  11. ইলমে লাদুন্নী বা ওয়াহবী জ্ঞান (الموهبة الربانية): তাকওয়া, ইখলাস ও কুরআন অনুযায়ী আমল করার ফলে আল্লাহ তা’আলা তাঁর খাস বান্দার অন্তরে যে বিশেষ প্রজ্ঞা ও নূর দান করেন। হাদিসে এসেছে: «مَنْ عَمِلَ بِمَا عَلِمَ وَرَّثَهُ اللَّهُ عِلْمَ مَا لَمْ يَعْلَمْ» (যে ব্যক্তি তার জানা জ্ঞান অনুযায়ী আমল করে, আল্লাহ তাকে অজানা বিষয়ের জ্ঞান দান করেন)।

مجموعة (ب) [‘খ’ বিভাগ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি]

اجب عن أربعة من الأسئلة التالية (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও): মান: ৫ × ৪ = ২০

٧- كيف تم حفظ القرآن الكريم في عهد الرسول صلى الله عليه وسلم؟

[৭. রসুল (স) এর যুগে কুরআনুল কারীম কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল?]

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশায় কুরআনুল কারীম মূলত দুটি প্রধান ও শক্তিশালী উপায়ে সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত হয়েছিল:

  1. সিনাবন্দি সংরক্ষণ বা হিফজ (الحفظ في الصدور):
    • আরবদের স্মৃতিশক্তি ছিল অলৌকিকভাবে তীক্ষ্ণ ও অসাধারণ। রাসুলুল্লাহ ﷺ ওহি নাজিলের সাথে সাথে তা নিজে মুখস্থ করে নিতেন এবং সাহাবিদের তা তিলাওয়াত করে শোনাতেন।
    • সাহাবায়ে কেরাম তা গভীর শ্রদ্ধার সাথে তৎক্ষণাৎ মুখস্থ করে নিতেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে ও তাহাজ্জুদে তা পাঠ করতেন। বহুসংখ্যক সাহাবি সম্পূর্ণ কুরআনের হাফিজ ছিলেন; যেমন: উবাই বিন কা’ব, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ, যায়েদ বিন সাবিত, মুয়ায বিন জাবাল, আলী বিন আবি তালিব এবং আবু বকর (রা.)।
  2. লিপিবদ্ধকরণ বা কিতাবত (الكتابة في السطور):
    • ওহি নাজিল হওয়ার সাথে সাথেই নবিজি ﷺ ‘কাতিবিনে ওহি’ (ওহি লেখক সাহাবিগণ)-কে ডেকে তা লিখে রাখার নির্দেশ দিতেন। যায়েদ বিন সাবিত, উবাই বিন কা’ব, আলী ও মুয়াবিয়া (রা.) সহ প্রায় ৪০ জন সাহাবি কাতিবে ওহির দায়িত্ব পালন করতেন।
    • কাগজের তীব্র সংকট থাকায় তারা মসৃণ পাথরের ফলক (লিখাফ), শুকনা চামড়ার টুকরো (রিকা’), খেজুরের ডাল (উসব), উটের কাঁধের হাড় (আকতাফ) ইত্যাদিতে লিখে রাখতেন।
    • নবিজি ﷺ জিবরীল (আ.)-এর নির্দেশক্রমে আয়াত ও সূরার বিন্যাস সুনির্দিষ্ট করে দিতেন (توقيفي)। প্রতি রমযান মাসে জিবরীল (আ.) নবিজি ﷺ-এর সাথে সমগ্র কুরআনের পারস্পরিক পুনরাবৃত্তি বা দাওর করতেন, আর ওফাতের বছর দুবার দাওর সম্পন্ন হয়েছিল (العرضة الأخيرة)।

٨- اذكر ثلاث آيات تدل على إعجاز القرآن-

[৮. পবিত্র কুরআন থেকে তিনটি আয়াত লেখ যে গুলো إعجاز القرآن এর প্রমাণ করে।]

আল-কুরআন একটি চিরন্তন মুজিযা। কুরআন বিরোধীদের সাহিত্যিক চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কুরআনুল কারীমে একাধিক আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। তন্মধ্যে তিনটি সুপ্রসিদ্ধ আয়াত নিম্নরূপ:

  1. সমগ্র সৃষ্টির প্রতি পূর্ণ কুরআনের অনুরূপ রচনার চ্যালেঞ্জ (সূরা আল-ইসরা: ৮৮):

    ﴿قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَىٰ أَن يَأْتُوا بِمِثْلِ هَٰذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا﴾

    ভাষান্তর: “বলুন: যদি সমগ্র মানব ও দানব জাতি এই কুরআনের অনুরূপ একটি গ্রন্থ রচনার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ রচনা করতে পারবে না; যদিও তারা পরস্পরকে সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা করে।”

  2. দশটি সূরার মতো রচনার চ্যালেঞ্জ (সূরা হূদ: ১৩):

    ﴿أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ ۖ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِّثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُم مِّن دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ﴾

    ভাষান্তর: “তারা কি বলে যে, সে এটি নিজে বানিয়ে নিয়েছে? বলুন: তবে তোমরা এর অনুরূপ বানানো দশটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো ডেকে নাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।”

  3. একটিমাত্র সূরার অনুরূপ রচনার চ্যালেঞ্জ (সূরা আল-বাকারা: ২৩):

    ﴿وَإِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ﴾

    ভাষান্তর: “আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি, তাতে যদি তোমরা কোনো সন্দেহে থাক, তবে এর মতো একটিমাত্র সূরা রচনা করে নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষ্যদাতাদের আহ্বান কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।”


٩- عرف علم تجويد القرآن ثم بيّن أهميته-

[৯. علم تجويد القرآن এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এর গুরুত্ব বর্ণনা কর।]

১. ইলমে তাজবীদের পরিচয় ও সংজ্ঞা

আভিধানিক অর্থ: ‘তাজবীদ’ (التجويد) শব্দটি বাবে তাফঈলের মাসদার, যার অর্থ সুন্দর করা, উত্তম করা বা সুচারুরূপে সম্পাদন করা (التحسين والإتقان)।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: তাজবীদশাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল জাযারী (রহ.) বলেন:

«هُوَ إِعْطَاءُ كُلِّ حَرْفٍ حَقَّهُ مِنْ مَخْرَجٍ وَصِفَةٍ، وَمُسْتَحَقَّهُ مِنْ تَرْقِيقٍ وَتَفْخِيمٍ وَمَدٍّ وَغُنَّةٍ مِنْ غَيْرِ تَكَلُّفٍ»

ভাষান্তর: “ইলমে তাজবীদ হলো আরবি প্রতিটি হরফকে তার নিজস্ব মাখরাজ ও মূল সিফাত (হক) এবং তার পার্শ্ববর্তী অবস্থার প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য বারীক, পুর, মদ ও গুন্নাহ (মুস্তাহাক) কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি বা কৃত্রিমতা ছাড়াই যথাযথভাবে আদায় করে পাঠ করা।”

২. ইলমে তাজবীদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

  • কুরআনের নির্দেশ: মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন: ﴿وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا﴾ (এবং কুরআন তিলাওয়াত করুন স্পষ্ট ও তারতীলের সাথে)। হযরত আলী (রা.) তারতীলের সংজ্ঞায় বলেন: «التَّرْتِيلُ هُوَ تَجْوِيدُ الْحُرُوفِ وَمَعْرِفَةُ الْوُقُوفِ» (হরফসমূহকে তাজবীদসহ আদায় করা এবং বিরতির স্থানসমূহ চেনা)।
  • ইমাম ইবনুল জাযারীর ফতোয়া: তিনি তাঁর আল-মুকাদ্দিমাতুল জাযারিয়্যাহ গ্রন্থে বলেন:

    «وَالأَخْذُ بِالتَّجْوِيدِ حَتْمٌ لازِمُ ¤ مَنْ لَمْ يُجَوِّدِ الْقُرْآنَ آثِمُ»

    অর্থাৎ: তাজবীদ মেনে কুরআন পাঠ করা প্রতিটি মুসলিমের ওপর অপরিহার্য দায়িত্ব; যে তাজবীদ ছাড়া পাঠ করে সে গুনাহগার হবে।

  • অর্থ বিকৃতি রোধ: তাজবীদ না জানলে লাহনে জালী বা মারাত্মক ভুল হয়, যার ফলে অর্থ সম্পূর্ণরূপে বিকৃত হয়ে কুফরিতে রূপ নিতে পারে। যেমন ‘ক্বলব’ (قلب – অন্তর)-কে ‘কালব’ (كلب – কুকুর) পাঠ করা।

١٠- ما معنى اللحن؟ وكم قسما له؟ وما هو؟

[১০. اللحن অর্থ কী? اللحن কত প্রকার ও কী কী?]

১. লাহনের অর্থ ও সংজ্ঞা

আভিধানিক অর্থ: ‘লাহন’ (اللحن) শব্দের অর্থ বিচ্যুত হওয়া, সত্যের পথ থেকে সরে যাওয়া বা ভুল উচ্চারণ করা (الميل عن الصواب والخطأ)।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: কুরআন তিলাওয়াতের সময় তাজবীদের প্রতিষ্ঠিত নিয়মাবলী ও উচ্চারণের বিশুদ্ধতা থেকে বিচ্যুত হওয়া বা ভুল পাঠ করাকে ‘লাহন’ বলা হয়।

২. লাহনের প্রকারভেদ ও বিস্তারিত বিবরণ

ইলমে তাজবীদের সর্বসম্মত নীতিমালায় লাহন প্রধানত দুই প্রকার:

  1. লাহনে জালী বা স্পষ্ট মারাত্মক ভুল (اللحن الجلي):
    • সংজ্ঞা: এমন প্রকাশ্য ভুল যা শব্দের গঠন ও ব্যাকরণিক কাঠামোর ওপর আঘাত হানে, চাই এর দ্বারা অর্থ বিকৃত হোক বা না হোক। এ ভুল সাধারণ ও বিশেষজ্ঞ সকলেই সহজে বুঝতে পারে।
    • উদাহরণ: এক হরফের স্থলে অন্য হরফ পড়া (যেমন: ت এর স্থলে ط পড়া, অথবা عَسَى এর স্থলে عَصَى পড়া); হরকত পরিবর্তন করা (যেমন সূরা ফাতিহায় أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ শব্দের তা-এর যবরের স্থলে পেশ দিয়ে أَنْعَمْتُ পড়া); হরফ কম বা বেশি করা।
    • শরীয়তের হুকুম: লাহনে জালী করা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম ও কবিরা গুনাহ। ইচ্ছাকৃতভাবে নামাযে এই ভুল করলে নামায ভেঙে যায়।
  2. লাহনে খাফী বা সূক্ষ্ম ভুল (اللحن الخفي):
    • সংজ্ঞা: এমন সূক্ষ্ম ভুল যা শব্দের মূল গঠন বা অর্থ পরিবর্তন করে না, কিন্তু তিলাওয়াতের সৌন্দর্য ও তাজবীদের সৌন্দর্যবোধ নষ্ট করে। এ ভুল কেবল অভিজ্ঞ কারী ও তাজবীদবিদগণই ধরতে পারেন।
    • উদাহরণ: গুন্নাহ ছেড়ে দেওয়া বা কম করা, ওয়াজিব মদ্দের পরিমাণ সঠিক না রাখা, ইখফা বা ইদগামের ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণতা, হরফের তাফখীম (পুর) বা তারকীকে (বারীক) সামান্য শিথিলতা করা।
    • শরীয়তের হুকুম: এটি মাকরূহ। এটি নামাযকে নষ্ট করে না, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে এর পুনরাবৃত্তি করা উচিত নয়।

١١- اكتب مخارج الحروف التالية: التاء ، الطاء ، الجيم ، الفاء-

[১১. নিম্নোক্ত হরফসমূহের মাখরাজ লেখ: ت ، ط ، ج ، ف]

মাখরাজের পরিচয়

মুখগহ্বরের যে নির্দিষ্ট স্থান থেকে কোনো আরবি হরফের উচ্চারণ উৎপন্ন হয়, তাকে সেই হরফের ‘মাখরাজ’ (المخرج) বলা হয়। মোট মাখরাজের সংখ্যা ১৭টি। উল্লেখিত চারটি হরফের সুনির্দিষ্ট মাখরাজ নিম্নরূপ:

হরফ মাখরাজের আরবি পরিচয় বাংলায় উচ্চারণ স্থানের বিশদ বিবরণ
التاء (ت) طَرَفُ اللِّسَانِ مَعَ أُصُولِ الثَّنَايَا الْعُلْيَا জিহ্বার আগা যখন সামনের উপরের দুই দাঁতের গোড়ার সাথে স্পর্শ করে। এটি একটি বারীক বা পাতলা হরফ (مستفلة)।
الطاء (ط) طَرَفُ اللِّسَانِ مَعَ أُصُولِ الثَّنَايَا الْعُلْيَا مَعَ الِاسْتِعْلَاءِ وَالْإِطْبَاقِ জিহ্বার আগা সামনের উপরের দুই দাঁতের গোড়ার সাথে স্পর্শ করবে, তবে জিহ্বার পেছনের অংশ ওপরের তালুর দিকে উঠে যাবে। ফলে এটি অত্যন্ত ভারী ও পুর (مستعلية ومطبقة) হরফ হিসেবে উচ্চারিত হয়। (তা ও ত্বা একই মাখরাজভুক্ত হলেও সিফাতের কারণে ভিন্ন)।
الجيم (ج) وَسَطُ اللِّسَانِ مَعَ مَا يُحَاذِيهِ مِنَ الْحَنَكِ الْأَعْلَى জিহ্বার মধ্যভাগ যখন তার ঠিক সোজাসুজি উপরের শক্ত তালুর সাথে গভীরভাবে চেপে লাগে। এটি ‘আহরুফে শাজারিয়্যাহ’ (أحرف شجرية)-এর অন্তর্ভুক্ত (জীম, শীন ও ইয়া)।
الفاء (ف) بَطْنُ الشَّفَةِ السُّفْلَى مَعَ أَطْرَافِ الثَّنَايَا الْعُلْيَا নিচের ঠোঁটের ভেতরের আর্দ্র অংশ (পেট) যখন সামনের উপরের দুটি প্রধান দাঁতের (ছানায়া উলয়ার) তীক্ষ্ণ আগার সাথে সংযুক্ত হয়।

١٢- اكتب من حفظك سورة مما يلى: (أ) سورة الأعلى؛ (ب) سورة الزلزال؛ (ج) سورة التين-

[১২. নিচের যে কোনো একটি সূরা মুখস্থ লেখ: (ক) সূরা আল-আলা (খ) সূরা আয-যিলযাল (গ) সূরা আত-তীন]

[পরীক্ষায় যেকোনো একটি সূরা লিখতে হয়, এখানে শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে ৩টি সূরাই পূর্ণ তশকীল ও প্রাঞ্জল অর্থসহ দেওয়া হলো:]

(ক) سورة الأعلى (সূরা আল-আ’লা) – মাক্কী সূরা, আয়াত ১৯


﴿سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى ¤ الَّذِي خَلَقَ فَسَوَّىٰ ¤ وَالَّذِي قَدَّرَ فَهَدَىٰ ¤ وَالَّذِي أَخْرَجَ الْمَرْعَىٰ ¤ فَجَعَلَهُ غُثَاءً أَحْوَىٰ ¤ سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنسَىٰ ¤ إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ۚ إِنَّهُ يَعْلَمُ الْجَهْرَ وَمَا يَخْفَىٰ ¤ وَنُيَسِّرُكَ لِلْيُسْرَىٰ ¤ فَذَكِّرْ إِن نَّفَعَتِ الذِّكْرَىٰ ¤ سَيَذَّكَّرُ مَن يَخْشَىٰ ¤ وَيَتَجَنَّبُهَا الْأَشْقَى ¤ الَّذِي يَصْلَى النَّارَ الْكُبْرَىٰ ¤ ثُمَّ لَا يَمُوتُ فِيهَا وَلَا يَحْيَىٰ ¤ قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ ¤ وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّىٰ ¤ بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا ¤ وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ ¤ إِنَّ هَٰذَا لَفِي الصُّحُفِ الْأُولَىٰ ¤ صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ﴾

ভাষান্তর: “পবিত্রতা ঘোষণা করুন আপনার মহান প্রতিপালকের নামের, যিনি সৃষ্টি করেছেন ও সুষম করেছেন; যিনি পরিমিত নির্ধারণ করেছেন অতঃপর পথপ্রদর্শন করেছেন; এবং যিনি চারণভূমি থেকে সবুজ ঘাস উৎপন্ন করেছেন, অতঃপর তাকে শুষ্ক কালো আবর্জনায় পরিণত করেছেন। আমি আপনাকে পাঠ করাব, ফলে আপনি ভুলবেন না; তবে আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত। নিশ্চয় তিনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সবকিছু জানেন। আর আমি আপনার জন্য সহজ পথকে সুগম করে দেব। অতএব উপদেশ দিন, যদি উপদেশ ফলপ্রসূ হয়। যে ভয় করে সে উপদেশ গ্রহণ করবে, আর তা উপেক্ষা করবে পরম দুর্ভাগা ব্যক্তি; যে প্রবেশ করবে মহা অগ্নিতে। অতঃপর সে সেখানে মরবেও না, বাঁচবেও না। নিশ্চয় সাফল্য লাভ করল সেই ব্যক্তি যে নিজেকে পবিত্র করল, এবং স্বীয় প্রতিপালকের নাম স্মরণ করল ও নামায আদায় করল। বরং তোমরা তো পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখেরাত অধিকতর উৎকৃষ্ট ও চিরস্থায়ী। নিশ্চয় এটি পূর্ববর্তী সহীফাগুলোতেও বিদ্যমান ছিল—ইবরাহিম ও মূসার সহীফাসমূহে।”


(খ) سورة الزلزال (সূরা আয-যিলযাল) – মাদানী সূরা, আয়াত ৮


﴿إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا ¤ وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا ¤ وَقَالَ الْإِنسَانُ مَا لَهَا ¤ يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا ¤ بِأَنَّ رَبَّكَ أَوْحَىٰ لَهَا ¤ يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِّيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ ¤ فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ ¤ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ﴾

ভাষান্তর: “যখন পৃথিবী তার ভয়াবহ কম্পনে প্রকম্পিত হবে; এবং পৃথিবী তার ভেতরের সমস্ত ভার বের করে দেবে; আর মানুষ বলবে—এর কী হলো? সেই দিন পৃথিবী তার সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে, কারণ আপনার প্রতিপালক তাকে আদেশ করবেন। সেই দিন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দলে বের হয়ে আসবে যাতে তাদের কৃতকর্ম দেখানো যায়। অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে সে তা দেখতে পাবে; এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকাজ করলে তাও সে দেখতে পাবে।”


(গ) سورة التين (সূরা আত-তীন) – মাক্কী সূরা, আয়াত ৮


﴿وَالتِّينِ وَالزَّيْتُونِ ¤ وَطُورِ سِينِينَ ¤ وَهَٰذَا الْبَلَدِ الْأَمِينِ ¤ لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ ¤ ثُمَّ رَدَدْنَاهُ أَسْفَلَ سَافِلِينَ ¤ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَلَهُمْ أَجْرٌ غَيْرُ مَمْنُونٍ ¤ فَمَا يُكَذِّبُكَ بَعْدُ بِالدِّينِ ¤ أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَحْكَمِ الْحَاكِمِينَ﴾

ভাষান্তর: “শপথ তীন ও যাইতূনের; এবং সিনাই পর্বতের; আর এই নিরাপদ নগরীর (মক্কার)। নিশ্চয় আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে। অতঃপর আমি তাকে হীনতমদের হীনতম স্তরে নামিয়ে দিয়েছি। তবে তারা ব্যতীত যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে অবিরাম পুরস্কার। অতএব এরপর কোন্ বস্তু তোমাকে প্রতিফল দিবস সম্পর্কে অবিশ্বাসী করে তোলে? আল্লাহ কি বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক নন?”


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: উলূমুল কুরআন ২০৩২০৫ বিষয়ের পরীক্ষার নম্বর বণ্টন কেমন?

উত্তর: সর্বমোট পূর্ণমান ৮০ নম্বর। প্রশ্নপত্রে ‘ক’ বিভাগে ৬টি রচনামূলক প্রশ্ন থেকে ৪টি (৪ × ১৫ = ৬০) এবং ‘খ’ বিভাগে ৬টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন থেকে ৪টি (৪ × ৫ = ২০) উত্তর করতে হয়।

প্রশ্ন ২: কুরআনুল কারীম ও হাদিসে কুদসীর মূল পার্থক্য কী?

উত্তর: কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং তা তিলাওয়াত করা নামাযে ফরজ ও মুজিযাপূর্ণ; পক্ষান্তরে হাদিসে কুদসীর অর্থ আল্লাহর হলেও তার ভাষা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিজের এবং তা নামাযে পঠিত হয় না।

প্রশ্ন ৩: কুরআন দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হওয়ার প্রধান হিকমত কী?

উত্তর: নবিজি ﷺ-এর অন্তরকে সুদৃঢ় রাখা, নিরক্ষর সাহাবিদের জন্য মুখস্থ ও অনুধাবন সহজ করা এবং সমসাময়িক সমস্যার বাস্তব সমাধানসহ ইসলামী বিধানগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা।

প্রশ্ন ৪: তাফসির ও তাবিলের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

উত্তর: তাফসির হলো সুস্পষ্ট আয়াতের প্রকাশ্য অর্থ ও বর্ণনানির্ভর (রেওয়ায়েত) ব্যাখ্যা; আর তাবিল হলো রূপক বা অপ্রকাশ্য অর্থের গভীর গবেষণা ও যুক্তিসিদ্ধ (দেরায়েত) অনুসন্ধান।

প্রশ্ন ৫: লাহনে জালী বলতে কী বোঝায় এবং এর হুকুম কী?

উত্তর: হরফ পরিবর্তন করা বা যবর-যের-পেশের পরিবর্তনের মতো প্রকাশ্য বড় ভুলকে লাহনে জালী বলে। এটি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হারাম এবং নামাযের মধ্যে করলে নামায নষ্ট হয়ে যায়।

প্রশ্ন ৬: উলূমুল কুরআন পরীক্ষায় কীভাবে সর্বোচ্চ নম্বর নিশ্চিত করা যায়?

উত্তর: প্রতিটি পারিভাষিক সংজ্ঞার আরবি মূলপাঠ উপস্থাপন করা, কুরআনের প্রাসঙ্গিক আয়াত ও নির্ভরযোগ্য তাফসিরের রেফারেন্স দেওয়া এবং মাখরাজ ও সূরার নির্ভুল তশকীলসহ উত্তর লেখা।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *