اختبار السنة الثانية لنائل البكالوريوس (الشرف) لعام ۲۰۱۹م
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০১৯
বিভাগ: দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আদ-দাওয়া আল-ইসলামিয়্যাহ ফিল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ (الدعوة الإسلامية في القرآن والسنة)
বিষয় কোড: ২০৩২০১
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
مجموعة (الف) – ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলী
١- قوله تعالى: ﴿وَإِذْ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ إِنَّكُمْ ظَلَمْتُمْ أَنفُسَكُم بِاتِّخَاذِكُمُ الْعِجْلَ فَتُوبُوا إِلَىٰ بَارِئِكُمْ فَاقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ عِندَ بَارِئِكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ ۚ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ • وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَىٰ لَن نُّؤْمِنَ لَكَ حَتَّىٰ نَرَى اللَّهَ جَهْرَةً فَأَخَذَتْكُمُ الصَّاعِقَةُ وَأَنتُمْ تَنظُرُونَ﴾ [البقرة: ٥٤-٥٥]
ভাষান্তর: “আর স্মরণ কর, যখন মূসা স্বীয় জাতিকে বললেন, ‘হে আমার জাতি! তোমরা গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে নিজেদের ওপর চরম যুলুম করেছ। সুতরাং তোমরা তোমাদের সৃষ্টিকর্তার নিকট তওবা কর এবং নিজেদের হত্যা কর (অর্থাৎ অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দাও)। তোমাদের স্রষ্টার নিকট এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর।’ অতঃপর তিনি তোমাদের তওবা কবুল করলেন; নিশ্চয় তিনি পরম তওবা কবুলকারী, অসীম দয়ালু। আর যখন তোমরা বলেছিলে, ‘হে মূসা! আমরা কখনই তোমাকে বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্যে প্রত্যক্ষ করি’, তখন তোমাদের ওপর বজ্রপাত আঘাত হানল আর তোমরা তা প্রত্যক্ষ করছিলে।” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ৫৪-৫৫)।
(الف) اكتب ما تعلم عن حياة سيدنا موسى عليه السلام مع بيان مناهج دعوته موضحا –
[হযরত মূসা (আ.) এর জীবনী ও তাঁর দাওয়াহ কার্যক্রমের পদ্ধতিসমূহের বর্ণনা কর।]
১. হযরত মূসা (আ.)-এর পবিত্র জীবনী:
হযরত মূসা (আ.) উলুল আযম বা শীর্ষস্থানীয় পাঁচজন রসূলের অন্যতম এবং ‘কালীমুগ্ধাহ’ (আল্লাহর সাথে প্রত্যক্ষ বাক্যালাপকারী নবী) হিসেবে খ্যাত। তিনি বনী ইসরাঈলের ইয়াকূব (আ.)-এর পুত্র লাবী (Levi)-এর বংশধর ইমরান ও ইউহানিসের ঘরে মিশরে জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন মিশরের পরাক্রমশালী স্বৈরাচারী শাসক ফেরাউন বনী ইসরাঈলের নবজাতক পুত্রসন্তানদের হত্যা করত। আল্লাহর ওহী অনুযায়ী তাঁর মাতা তাঁকে একটি সিন্দুকে ভরে নীল নদে ভাসিয়ে দেন। অলৌকিকভাবে সিন্দুকটি ফেরাউনের প্রাসাদের ঘাটে পৌঁছায় এবং ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া (রা.)-এর স্নেহে তিনি রাজপ্রাসাদেই লালিত-পালিত হন। একদা এক কিবতী ও ইসরাঈলীর বিরোধে অনিচ্ছাকৃত কিবতীর মৃত্যু হলে তিনি মাদইয়ানে হিজরত করেন এবং হযরত শোয়াইব (আ.)-এর কন্যাকে বিবাহ করে দশ বছর সেখানে অবস্থান করেন। পরবর্তীতে মাদইয়ান থেকে প্রত্যাবর্তনের পথে তূর পর্বতের পাদদেশে আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াত দান করেন এবং তাঁর ভ্রাতা হারূন (আ.)-কে তাঁর উযীর ও সহযোগী রসূল হিসেবে মনোনীত করেন। তিনি দীর্ঘ সাধনা ও মুজিযার মাধ্যমে বনী ইসরাঈলকে ফেরাউনের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে লোহিত সাগর পাড়ি দেন এবং ফেরাউন সৈন্যবাহিনীসহ লোহিত সাগরে নিমজ্জিত হয়।
২. মূসা (আ.)-এর দাওয়াহ কার্যক্রমের পদ্ধতিসমূহ (مناهج دعوته):
- কোমল ও মার্জিত ভাষায় সম্বোধন (القول اللين): চরম উদ্ধত স্বৈরাচারী ফেরাউনের সামনে দাওয়াত পেশ করার ক্ষেত্রে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছিলেন: “فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ” (তোমরা তার সাথে নরম ভাষায় কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে—সূরা ত্বা-হা: ৪৪)। দাওয়াতের সূচনায় আক্রমণাত্মক ভাষা পরিহার করে বিনম্র আচরণ করা মূসা (আ.)-এর দাওয়াতী মানহাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
- স্পষ্ট যুক্তি ও তাওহীদের দলিল উপস্থাপন: ফেরাউন যখন প্রশ্ন করেছিল “وَمَا رَبُّ الْعَالَمِينَ” (জাহানসমূহের প্রতিপালক কে?), মূসা (আ.) মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব, আকাশ-পৃথিবীর পরিচালন ব্যবস্থা এবং পূর্বপুরুষদের সৃষ্টির ধারাবাহিকতার অকাট্য যুক্তি তুলে ধরেন।
- অলৌকিক নিদর্শন বা মুজিযার প্রদর্শন: প্রতিপক্ষের হঠকারিতার মুখে মূসা (আ.) হাতের লাঠিকে অজগরে রূপান্তর (মুজিযায়ে আসা) এবং বগল থেকে হাত বের করলে তা শুভ্র উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় হওয়া (ইয়াদে বায়যা)-এর মতো সুস্পষ্ট মুজিযা প্রদর্শন করেন।
- দলীয় ঐক্য ও যোগ্য সহযোগী গ্রহণ: তিনি একক নেতৃত্বের অহংকার না করে নিজ ভাই হারূন (আ.)-কে দাওয়াতের সহযোগী হিসেবে চেয়ে রবের দরবারে দোয়া করেছিলেন: “وَاجْعَل لِّي وَزِيرًا مِّنْ أَهْلِي • هَارُونَ أَخِي” (সূরা ত্বা-হা: ২৯-৩০)।
- চরম বিপদেও অবিচল ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল: লোহিত সাগরের সামনে বনী ইসরাঈল যখন ভয়ে চিৎকার করে বলেছিল “إِنَّا لَمُدْرَكُونَ” (আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম!), তখন মূসা (আ.) অটল ঈমানে ঘোষণা করেন: “كَلَّا ۖ إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ” (কখনই নয়, নিশ্চয় আমার প্রতিপালক আমার সাথে আছেন, তিনি অচিরেই আমাকে পথ দেখাবেন—সূরা আশ-শু’আরা: ৬২)।
(ب) كم نعمة أنعمها الله على قوم موسى عليه السلام؟ بين –
[মূসা (আ.) এর জাতির ওপর আল্লাহ তায়ালা কয়টি নেয়ামত দান করেছিলেন? বর্ণনা কর।]
পবিত্র কুরআনে বনী ইসরাঈলকে সম্বোধন করে বারবার বলা হয়েছে: “يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اذْكُرُوا نِعْمَتِيَ الَّتِي أَنْعَمْتُ عَلَيْكُمْ” (হে বনী ইসরাঈল! আমার সেই নেয়ামতের কথা স্মরণ কর যা আমি তোমাদের দান করেছি)। মুফাসসিরীনে কেরামের মতে আল্লাহ বনী ইসরাঈলকে অসংখ্য নেয়ামত দিয়েছিলেন, যার মধ্যে প্রধান প্রধান নেয়ামতগুলো নিম্নরূপ:
- ফেরাউনের পাশবিক দাসত্ব ও নির্যাতন থেকে মুক্তি: ফেরাউন তাদের পুত্রসন্তানদের হত্যা করত এবং নারীদের দাসী বানিয়ে রাখত। আল্লাহ সাগর দ্বিখণ্ডিত করে তাদের নিরাপদ উদ্ধার করেন।
- সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত করে অলৌকিক রাজপথ তৈরি: লোহিত সাগরে বারোটি গোত্রের জন্য বারোটি শুষ্ক পথ তৈরি করে দেওয়া এবং শত্রুদের চোখের সামনে ডুবিয়ে ধ্বংস করা।
- উত্তপ্ত তিহ প্রান্তরে মেঘমালার শীতল ছায়া: উন্মুক্ত মরুভূমিতে তীব্র রোদ থেকে সুরক্ষার জন্য আল্লাহ অলৌকিক মেঘমালা পাঠিয়ে তাদের ওপর শীতল ছায়া বিস্তার করেছিলেন।
- আকাশ থেকে মান্না ও সালওয়ার মতো সুস্বাদু খাদ্য অবতরণ: কোনো চাষাবাদ ছাড়াই তাদের জন্য কুদরত থেকে সুস্বাদু আহার ‘মান্না’ (শিশিরের মতো মিষ্ট আহার) এবং ‘সালওয়া’ (সুস্বাদু পাখির ভুনা গোশত) নাজিল করা হয়েছিল।
- পাথর থেকে দ্বাদশ সুপেয় পানির ঝর্ণাধারা: মূসা (আ.) লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করতেই বারোটি গোত্রের জন্য বারোটি সুমিষ্ট পানির নহর প্রবাহিত হয়েছিল (সূরা বাক্বারাহ: ৬০)।
- তাওরাত কিতাব ও শরীয়ত দান: তূর পর্বতে চল্লিশ রাত অবস্থানের পর মানবজাতির হেদায়েতের জন্য ফলকে লিখিত তাওরাত প্রদান করা হয়েছিল।
- মৃত্যুর পর পুনরায় জীবনদান: আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখার অবাস্তব দাবি করায় যখন বজ্রপাতে তাদের মৃত্যু হয়, তখন মূসা (আ.)-এর দোয়ার বরকতে তাদের পুনরায় জীবিত করা হয়।
- অসংখ্য নবী ও বাদশাহর আগমন: মানবজাতির মধ্যে বনী ইসরাঈল বংশেই সর্বাধিক সংখ্যক নবী-রসূল প্রেরণ করা হয়েছিল।
٢- قوله تعالى: ﴿يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ عَلَىٰ فَتْرَةٍ مِّنَ الرُّسُلِ أَن تَقُولُوا مَا جَاءَنَا مِن بَشِيرٍ وَلَا نَذِيرٍ ۖ فَقَدْ جَاءَكُم بَشِيرٌ وَنَذِيرٌ ۗ وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ﴾ [المائدة: ١٩]
ভাষান্তর: “হে আহলুল কিতাব (ইহুদি ও খ্রিস্টানগণ)! দীর্ঘকাল রসূলগণের আগমন বন্ধ থাকার পর আমাদের রসূল তোমাদের নিকট এসেছেন, যিনি তোমাদের নিকট সবকিছু সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করছেন; যাতে তোমরা এ কথা বলতে না পার যে, আমাদের নিকট কোনো সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী আসেননি। অতএব নিশ্চয় তোমাদের নিকট সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী আগমন করেছেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ১৯)।
(الف) ما المراد بأهل الكتاب؟ تحدث عن مناهج الرسول صلى الله عليه وسلم في الدعوة –
[আহলুল কিতাব দ্বারা উদ্দেশ্য কী? অতঃপর রাসূল (স.) এর দাওয়াত পদ্ধতি আলোচনা কর।]
১. আহলুল কিতাবের পরিচয় (المراد بأهل الكتاب):
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ‘আহলুল কিতাব’ (গ্রন্থধারী সম্প্রদায়) বলতে প্রধানত ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বোঝানো হয়, যাদের কাছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসমানী কিতাব হিসেবে যথাক্রমে ‘তাওরাত’ (হযরত মূসা আ.-এর ওপর) এবং ‘ইনজিল’ (হযরত ঈসা আ.-এর ওপর) নাজিল হয়েছিল। কুরআনুল কারিমে জাযিরাতুল আরবে বসবাসকারী এই দুই সম্প্রদায়কে মৌলিক সত্যের দিকে আহ্বান জানাতে বিশেষভাবে ‘আহলুল কিতাব’ অভিধায় সম্বোধন করা হয়েছে।
২. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতী মানহাজ বা পদ্ধতিসমূহ:
- হিকমত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল (الحكمة): স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করে মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝে উপযোগী পন্থায় দাওয়াত উপস্থাপন। মহান আল্লাহ বলেন: “ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ” (আপনার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করুন—সূরা আন-নাহল: ১২৫)।
- আচরণগত উত্তম দৃষ্টান্ত ও নিষ্কলুষ চরিত্র (القدوة الحسنة): নবীজী (সা.) নিজে ছিলেন জীবন্ত কুরআন। শত্রুরাও তাঁকে ‘আল-আমীন’ (বিশ্বস্ত) বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কথার চেয়ে আমল ও চরিত্রের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করাই ছিল তাঁর প্রধান পদ্ধতি।
- ধাপে ধাপে দাওয়াত সম্প্রসারণ (التدرج في الدعوة):
- গোপন দাওয়াত: প্রথম তিন বছর নিকটাত্মীয় ও বিশ্বস্ত বন্ধুদের মাঝে গোপনে দাওয়াত।
- প্রকাশ্য দাওয়াত: সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে আত্মীয়স্বজন ও কুরাইশদের প্রকাশ্য দাওয়াত।
- বহিঃবিশ্বে দাওয়াত: মদিনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রোম, পারস্য, আবিসিনিয়া ও মিশরের শাসকদের নিকট কূটনৈতিক দূত ও চিঠি প্রেরণের মাধ্যমে সার্বজনীন দাওয়াত।
- সুন্দরতম পন্থায় বিতর্ক ও যুক্তি উপস্থাপন (الجدال بالتي هي أحسن): আহলুল কিতাব ও মুশরিকদের সাথে বিতর্কের সময় তিনি কখনো গালিগালাজ বা উত্তেজনা সৃষ্টি করতেন না; বরং কুরআনের অকাট্য যুক্তি ও পূর্ববর্তী কিতাবের ভবিষ্যদ্বাণী উপস্থাপন করতেন।
- সর্বজনীন ক্ষমা ও উদারতা: মক্কা বিজয়ের দিনে পরম শত্রুদের লক্ষ্য করে ঘোষণা করেছিলেন: “لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ ۖ يَغْفِرُ اللَّـهُ لَكُمْ” (আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন)। এই ক্ষমা হাজার হাজার মানুষকে ইসলামের পতাকাতলে এনেছিল।
(ب) حلل كلمة الفترة والرسل – ثم اوضح مدة الفترة بين عيسى و محمد صلى الله عليه وسلم –
[الرسل ও الفترة শব্দদ্বয়ের বিশ্লেষণ কর। অতঃপর ঈসা ও মুহাম্মদ (স.) এর মাঝে দাওয়াতের সময়কাল বর্ণনা কর।]
- শব্দ বিশ্লেষণ (التحليل اللغوي والصرفي):
- الفترة (আল-ফাতরাহ): এটি একবচন বিশেষ্য (اسم مفرد)। মূলধাতু ف – ت – ر (ফাতারা)। আভিধানিক অর্থ বিরতি, স্থবিরতা, ছেদ বা মধ্যবর্তী অবকাশ। পারিভাষিক অর্থে দুই নবীর আগমনের মধ্যবর্তী যে দীর্ঘ সময়কালে কোনো নতুন নবী বা ওহীর আগমন ঘটে না, তাকে ‘ফাতরাতুর রুসুল’ বা নবুওয়াতের বিরতিকাল বলা হয়।
- الرسل (আর-রুসুল): এটি বহুবচন (جمع تكسير), যার একবচন হলো ‘রসূল’ (رسول)। মূলধাতু ر – س – ل (রাসালা)। এর অর্থ প্রেরিত দূত বা বার্তাবাহক। পরিভাষায় যিনি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নতুন শরীয়ত ও কিতাবপ্রাপ্ত হয়ে মানবজাতির নিকট আল্লাহর বাণী পৌঁছাতে প্রেরিত হন, তাঁকে রসূল বলা হয়।
- হযরত ঈসা (আ.) ও মুহাম্মদ (সা.)-এর মধ্যবর্তী বিরতিকাল (مدة الفترة):
হযরত ঈসা (আ.)-কে আকাশে উঠিয়ে নেওয়ার পর থেকে আখিরী নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত দীর্ঘ সময়কে ফাতরাতের যুগ বলা হয়। ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরদের মতে এই সময়কালের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৬০০ বছর। ইমাম বুখারী (রহ.) সহীহ বুখারীতে হযরত সালমান ফারসী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: “فَتْرَةٌ بَيْنَ عِيسَى وَمُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سِتُّ مِائَةِ سَنَةٍ” (হযরত ঈসা ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যবর্তী বিরতিকাল ছিল ছয়শত বছর)। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে তা ছিল ৫৬৯ থেকে ৬০০ বছর। এই সুদীর্ঘ সময়কালে জাযিরাতুল আরবসহ গোটা বিশ্বে তাওহীদের আলো নিভে ঘোর অন্ধকার ও পৌত্তলিকতা বিস্তার লাভ করেছিল।
٣- قوله تعالى: ﴿وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ آزَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلِهَةً ۖ إِنِّي أَرَاكَ وَقَوْمَكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ • وَكَذَٰلِكَ نُرِي إِبْرَاهِيمَ مَلَكُوتَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلِيَكُونَ مِنَ الْمُوقِنِينَ﴾ [الأنعام: ٧٤-٧٥]
ভাষান্তর: “আর স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম স্বীয় পিতা আযরকে বললেন, ‘আপনি কি মূর্তিসমূহকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করছেন? নিশ্চয় আমি আপনাকে ও আপনার জাতিকে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।’ আর এভাবেই আমি ইবরাহীমকে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সার্বভৌমত্ব ও মহিমা প্রদর্শন করি, যাতে তিনি দৃঢ় বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হন।” (সূরা আল-আন’আম: ৭৪-৭৫)।
(الف) اكتب ما تعلم عن حياة إبراهيم عليه السلام – ثم بين مناهج دعوته مختصرا –
[হযরত ইবরাহীম (আ.) এর জীবনী লেখ। অতঃপর তাঁর দাওয়াতের পদ্ধতিসমূহ সংক্ষেপে বর্ণনা কর।]
১. হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর জীবনী:
হযরত ইবরাহীম (আ.) হলেন ‘আবুল আম্বিয়া’ (নবীগণের পিতা) এবং ‘খলীলুল্লাহ’ (আল্লাহর অন্তরঙ্গ বন্ধু)। তিনি প্রাচীন ব্যবিলনের (বর্তমান ইরাক) বাবেল নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জাতির শাসক ছিল চরম অহংকারী নমরূদ। তিনি মূর্তিপূজা ও নক্ষত্রপূজার বিরুদ্ধে তাওহীদের শাশ্বত ঝাণ্ডা উত্তোলন করেন। নমরূদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হলে আল্লাহ আগুনকে নির্দেশ দেন: “يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ” (হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের জন্য শীতল ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও—সূরা আল-আম্বিয়া: ৬৯)। তিনি ইরাক থেকে শাম (সিরিয়া), ফিলিস্তিন ও মিশরে হিজরত করেন। বার্ধক্যে ইসমাইল ও ইসহাক (আ.) নামে দুই সুযোগ্য নবী-পুত্র লাভ করেন। আল্লাহর নির্দেশে স্ত্রী হাজেরা ও শিশু ইসমাইলকে মক্কার জনমানবহীন প্রান্তরে রেখে আসেন, যেখানে যমযম কূপের অলৌকিক সৃষ্টি হয়। আল্লাহর আদেশে পুত্র ইসমাইলকে কুরবানির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পরবর্তীতে পিতা-পুত্র মিলে কা’বা ঘর পুনর্নির্মাণ করেন।
২. ইবরাহীম (আ.)-এর দাওয়াতী মানহাজ বা পদ্ধতি:
- পিতার প্রতি পরম শ্রদ্ধাশীল সম্বোধন (يا أبت): চরম কাফের ও মূর্তিনির্মাণকারী পিতাকে দাওয়াত দেওয়ার সময় তিনি বারংবার অত্যন্ত কোমল ও ভালোবাসাময় সম্বোধন “ইয়া আবাতি” (হে আমার স্নেহময় পিতা!) ব্যবহার করেছেন।
- পর্যবেক্ষণমূলক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি উপস্থাপন: নক্ষত্র, চাঁদ ও সূর্যের উদয়-অস্ত পর্যবেক্ষণ করে তিনি জাতিকে প্রমাণ করে দেন যে, যা অস্তমিত ও ধ্বংসশীল তা কখনই উপাস্য হতে পারে না: “لَا أُحِبُّ الْآفِلِينَ” (আমি অস্তগামীদের ভালোবাসি না)।
- কার্যকর বাস্তব পরীক্ষা ও মূর্তির অসারতা প্রমাণ: মেলা চলাকালীন মন্দিরের সকল ছোট মূর্তি ভেঙে বড় মূর্তির কাঁধে কুঠার ঝুলিয়ে রেখে তিনি প্রমাণ করেন যে, যারা নিজের আত্মরক্ষা করতে পারে না, তারা কীভাবে উপাস্য হতে পারে!
- শাসকের সাথে যুক্তিতর্ক (المناظرة): নমরূদ যখন বলল সে জীবন ও মৃত্যু দিতে পারে, ইবরাহীম (আ.) তাৎক্ষণিক যুক্তিতে বললেন: “আল্লাহ পূর্ব দিক থেকে সূর্য উদিত করেন, তুমি পশ্চিম দিক থেকে তা উদিত করে দেখাও।” এতে নমরূদ হতভম্ব হয়ে গেল।
(ب) ما اسم أبي إبراهيم؟ وما المراد بقوله: ملكوت السماوات والأرض؟
[ইবরাহিম (আ.) এর বাবার নাম কী? ملكوت السموت والارض দ্বারা উদ্দেশ্য কী?]
- ইবরাহীম (আ.)-এর পিতার নাম:
পবিত্র কুরআনে সূরা আল-আন’আমের ৭৪ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্টভাবে তাঁর পিতার নাম ‘আযর’ (آزر) উল্লেখ করা হয়েছে: “وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ آزَرَ”। অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরদের মতে আযর ছিল তাঁর জন্মদাতা পিতা। আবার ইবনে আব্বাস (রা.) ও সুদ্দী (রহ.) সহ কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে তাঁর আসল বংশীয় নাম ছিল ‘তারিখ’ (تارح), আর ‘আযর’ ছিল তার উপাধি অথবা মূর্তিশালার রক্ষক হিসেবে উপাধিস্বরূপ নাম। তবে কুরআনুল কারিমে যেহেতু পিতা হিসেবে ‘আযর’ শব্দই ব্যবহৃত হয়েছে, তাই আযর নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। - ‘মালাকূতুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ’-এর ব্যাখ্যা (المراد بملكوت السماوات والأرض):
‘মালাকূত’ (ملكوت) শব্দটি ‘মুলক’ (রাজত্ব বা কর্তৃত্ব) শব্দের মুবালাগা বা আধিক্যসূচক রূপ। এর অর্থ হলো সমগ্র আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর একচ্ছত্র সার্বভৌমত্ব, নিরঙ্কুশ রাজত্ব, নিখুঁত পরিচালন ব্যবস্থা এবং মহান আল্লাহর কুদরত ও মহিমার অকাট্য নিদর্শনসমূহ। আল্লাহ তা’আলা ইবরাহীম (আ.)-কে তাঁর ঐশী নূর ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে বিশ্বজগতের প্রতিটি সৃষ্টির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নিদর্শন এমনভাবে প্রত্যক্ষ করিয়েছিলেন, যার ফলে তাওহীদের ওপর তাঁর ঈমান ‘ইলমুল ইয়াকীন’ (জ্ঞানের দৃঢ়তা) থেকে ‘আইনুল ইয়াকীন’ (প্রত্যক্ষদর্শীর চরম দৃঢ়তা)-এ উন্নীত হয়েছিল।
٤- قوله تعالى: ﴿لَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَىٰ قَوْمِهِ فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ • قَالَ الْمَلَأُ مِن قَوْمِهِ إِنَّا لَنَرَاكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ﴾ [الأعراف: ٥٩-٦٠]
ভাষান্তর: “নিশ্চয় আমি নূহকে তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। তিনি বললেন, ‘হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো উপাস্য নেই। নিশ্চয় আমি তোমাদের ওপর এক মহাদিবসের শাস্তির আশঙ্কা করছি।’ তাঁর সম্প্রদায়ের প্রধান ব্যক্তিরা বলল, ‘নিশ্চয় আমরা আপনাকে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।'” (সূরা আল-আ’রাফ: ৫৯-৬০)।
(الف) اكتب حياة سيدنا نوح عليه السلام – بين مع ذكر مناهج دعوته بالاختصار –
[হযরত নূহ (আ.) এর জীবনী লেখ। অতঃপর তাঁর দাওয়াতের পদ্ধতিসমূহ সংক্ষেপে বর্ণনা কর।]
১. হযরত নূহ (আ.)-এর জীবনী:
হযরত নূহ (আ.) মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা (আবুশ বাশার আস-সানী) হিসেবে পরিচিত। হযরত আদম (আ.) ও নূহ (আ.)-এর মধ্যবর্তী দশ শতাব্দী মানুষ তাওহীদের ওপর ছিল। পরবর্তীতে ওয়াদ্দ, সুওয়া’, ইয়াগূছ, ইয়া’ঊক ও নাসর নামক পাঁচজন নেককার ব্যক্তির মৃত্যুর পর শয়তানের প্ররোচনায় তাদের মূর্তি বানিয়ে পূজা শুরু হয়। তখনই আল্লাহ নূহ (আ.)-কে প্রথম সতর্ককারী রসূল হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি সাড়ে নয়শত বছর (৯৫০ বছর) ধরে জাতিকে দিবারাত্র দাওয়াত দেন (সূরা আনকাবূত: ১৪)। কিন্তু মুষ্টিমেয় অসহায় দরিদ্র লোক ছাড়া অধিকাংশই অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে তিনি বিশাল কিশতী (নৌকা) নির্মাণ করেন। এরপর সর্বপ্লাবী মহাপ্লাবন (তুফান) সৃষ্টি হয় এবং কাফেররা নিমজ্জিত হয়, যার মধ্যে তাঁর অবাধ্য স্ত্রী ও পুত্র কান’আনও ছিল। প্লাবন শেষে তাঁর কিশতী জুদী পর্বতে নোঙর করে এবং তাঁর সাথে রক্ষা পাওয়া মুমিনদের থেকেই বিশ্বে মানবজাতির নতুন সূচনা হয়।
২. নূহ (আ.)-এর দাওয়াতী মানহাজ বা পদ্ধতি:
- একনিষ্ঠ তাওহীদের দাওয়াত: সকল নবীগণের মতো তাঁর মূল দাওয়াত ছিল এক আল্লাহর ইবাদত ও সকল তাগুত-মূর্তির বর্জন।
- অবিরাম ও বহুমুখী দাওয়াতী প্রচেষ্টা: তিনি রাতে ও দিনে, প্রকাশ্যে ও গোপনে সব পদ্ধতিতে দাওয়াত দিয়েছেন: “قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلًا وَنَهَارًا • ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا” (সূরা নূহ: ৫, ৯)।
- দুনিয়াবী নিয়ামতের প্রতিশ্রুতি ও মনস্তাত্ত্বিক আকর্ষণ: তিনি জাতিকে বোঝান যে তওবা ও ইস্তিগফার করলে আল্লাহ প্রচুর বৃষ্টিবর্ষণ করবেন, ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে বরকত দেবেন এবং ফলবান বাগান ও ঝর্ণাধারা দান করবেন (সূরা নূহ: ১০-১২)।
- নজিরবিহীন ধৈর্য ও সহনশীলতা: সাড়ে নয়শত বছর ধরে উপহাস, বিদ্রূপ ও মারধরের মুখেও তিনি কখনই দাওয়াতী ময়দান ত্যাগ করেননি।
(ب) أوضح الواقعة المتعلقة بهذه الآيات المذكورة –
[উল্লিখিত আয়াত-সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি বর্ণনা কর।]
পটভূমি ও ঐতিহাসিক ঘটনা:
হযরত নূহ (আ.) যখন জাতিকে মূর্তিপূজা ত্যাগ করে এক আল্লাহর বন্দেগীর আহ্বান জানালেন, তখন তাঁর জাতির অভিজাত সমাজ (আল-মালা’) চরম অহংকার প্রদর্শন করল। তারা ভাবত, সমাজে যারা ধনী ও প্রতাপশালী কেবল তারাই সঠিক পথে রয়েছে। নূহ (আ.)-এর চারপাশে যখন সমাজের দরিদ্র ও দুর্বল শ্রেণির দাস-মজুরদের সমবেত হতে দেখল, তখন তারা উপহাস করে বলল: “إِنَّا لَنَرَاكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ” (আমরা তোমাকে সুস্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যে দেখছি)।
নূহ (আ.) তাদের কটূক্তির জবাবে অত্যন্ত মার্জিতভাবে বলেন: “يَا قَوْمِ لَيْسَ بِي ضَلَالَةٌ وَلَٰكِنِّي رَسُولٌ مِّن رَّبِّ الْعَالَمِينَ” (হে আমার জাতি! আমার মধ্যে কোনো ভ্রষ্টতা নেই, বরং আমি সৃষ্টিজগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত রসূল—সূরা আল-আ’রাফ: ৬১)। তিনি স্পষ্ট করলেন যে তিনি তাদের কাছে কোনো পার্থিব প্রতিদান বা ধন-সম্পদ চান না, তাঁর প্রতিদান একমাত্র আল্লাহর জিম্মায়। কিন্তু জাতির নেতারা হঠকারিতা বজায় রেখে বলল: “যদি তুমি সত্যবাদী হও, তবে যে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো।” পরবর্তীতে তাদের অবিরাম কুফর ও অবাধ্যতার কারণেই মহাপ্লাবনের মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়।
٥- (الف) ما معنى الدعوة لغة واصطلاحا؟ ثم بين تاريخ نشأة الدعوة الإسلامية وتطورها بإيجاز –
[(ক) الدعوة শব্দের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? ইসলামি দাওয়ার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সংক্ষেপে বর্ণনা কর।]
১. দাওয়াহ-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক পরিচয়:
- শাব্দিক অর্থ: ‘আদ-দাওয়াহ’ (الدعوة) আরবি শব্দ। এর মূলধাতু د – ع – و (দা’আ)। এর অর্থ আহ্বান করা, ডাকা, দাওয়াত দেওয়া, প্রার্থনা করা, উদ্বুদ্ধ করা বা কোনো কিছুর প্রতি আকৃষ্ট করা।
- পারিভাষিক অর্থ: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়, মানবজাতিকে আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাঁর বিধানের আনুগত্য এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের মাধ্যমে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির পথে আহ্বান করার সামগ্রিক প্রচেষ্টাকে ‘আদ-দাওয়াহ আল-ইসলামিয়্যাহ’ বলা হয়। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন: “الدعوة إلى الله هي الدعوة إلى الإيمان به وبما جاءت به رسله” (আল্লাহর দিকে দাওয়াত হলো তাঁর প্রতি এবং তাঁর রসূলগণ যা এনেছেন তার প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানানো)।
২. ইসলামী দাওয়াহর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস:
- সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রসূলগণের যুগ: আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে দাওয়াতের সূচনা হয়। যুগে যুগে নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা (আ.) সহ লক্ষাধিক পয়গম্বর নিজ নিজ সম্প্রদায়কে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন।
- নবুওয়াতী যুগ (মাক্কী ও মাদানী পর্যায়): ৬১০ খ্রিস্টাব্দে হেরা গুহায় বিশ্বনবী (সা.)-এর নবুওয়াত লাভের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী দাওয়াহর নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়। মাক্কী ১৩ বছরে আকীদাহ ও আত্মশুদ্ধির দাওয়াত এবং মাদানী ১০ বছরে ইসলামী রাষ্ট্র, আইন ও বিশ্বব্যাপী দাওয়াতী বিস্তৃতি ঘটে।
- খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ: বিশ্বনবী (সা.)-এর ওফাতের পর চার খলিফার আমলে পারস্য, সিরিয়া, মিশর ও রোম সাম্রাজ্যের বিশাল অংশে দাওয়াত ছড়িয়ে পড়ে। সাহাবায়ে কেরাম জীবন বাজি রেখে পৃথিবীর দূর-দূরান্তে দাওয়াত পৌঁছান।
- উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগ: এই যুগে মধ্য এশিয়া, স্পেন (আন্দালুস), সিন্ধু ও আফ্রিকা মহাদেশে ইসলামী সাম্রাজ্য ও দাওয়াহর অভূতপূর্ব বিস্তৃতি ঘটে।
- সুফী-সাধক ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিশ্বায়ন: ভারতীয় উপমহাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও আফ্রিকায় মুসলিম বণিক এবং মুখলিস সুফী-দরবেশদের অনুপম চরিত্র ও দাওয়াতে কোটি কোটি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন।
- আধুনিক যুগ: বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক সংস্থা, মিডিয়া, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দাওয়াত আজ বৈশ্বিক রূপ ধারণ করেছে।
(ب) بين ماذا تعلم عن مناهج الأنبياء والمرسلين في الدعوة إلى الله تعالى –
[(খ) আল্লাহর প্রতি দাওয়াত প্রদানের ক্ষেত্রে নবী-রাসূলগণের পদ্ধতি সম্পর্কে যা জান বর্ণনা কর।]
কুরআনুল কারীম পর্যালোচনা করলে নবী-রসূলগণের দাওয়াহর সাধারণ ও মৌলিক পদ্ধতিগুলো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে:
- তাওহীদের ভিত্তি স্থাপন: প্রত্যেক নবীর প্রথম বাণী ছিল: “يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ” (হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর বন্দেগী কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো ইলাহ নেই)। আকীদাহ সংশোধনই ছিল সকল সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু।
- নিঃস্বার্থ সেবা ও পারিশ্রমিকহীন দাওয়াত: সকল নবী স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন: “وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ ۖ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَىٰ رَبِّ الْعَالَمِينَ” (আমি তোমাদের নিকট এর জন্য কোনো প্রতিদান চাই না, আমার প্রতিদান তো জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে—সূরা আশ-শু’আরা: ১০৯)।
- মাতৃভাষায় প্রাঞ্জল ভাষায় দাওয়াত: মহান আল্লাহ প্রত্যেক নবীকে তাঁর স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছেন, যাতে বক্তব্য স্পষ্টভাবে বোধগম্য হয় (সূরা ইবরাহীম: ৪)।
- উত্তম চরিত্র ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব: নবীগণ সমাজে সর্বাধিক সত্যবাদী, আমানতদার ও চরিত্রবান ছিলেন। ফলে মানুষ তাঁদের দাওয়াতের সত্যতা সহজেই উপলব্ধি করত।
- পরকালীন জবাবদিহিতা ও আখেরাতমুখী চেতনা সৃষ্টি: জান্নাতের সুসংবাদ ও জাহান্নামের শাস্তির কথা তুলে ধরে মানুষের অন্তরে খোদাভীতি জাগ্রত করা ছিল তাঁদের অন্যতম মানহাজ।
٦- (الف) بين العقبات التي يواجهها الداعي في أعماله الدعوية في العصر الراهن –
[(ক) বর্তমান যুগে ইসলামি দাওয়াহ কার্যক্রমে দাঈ যে সব প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন তা বর্ণনা কর।]
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ইসলামের প্রচার সহজতর হলেও বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে দাঈদের বহুবিধ বহুমুখী চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে:
- পশ্চিমা গণমাধ্যমের ইসলামোফোবিয়া ও অপপ্রচার: আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সুপরিকল্পিতভাবে ইসলামকে সন্ত্রাসবাদ ও মৌলবাদের সাথে যুক্ত করে ভীতিকর উপস্থাপন (Islamophobia) করা হয়। ফলে অমুসলিমদের মনস্তত্ত্বে পূর্ব থেকেই এক ধরনের বিরূপ ধারণা তৈরি থাকে।
- বস্তুবাদ, সেক্যুলারিজম ও নাস্তিকতার আগ্রাসন: আধুনিক ভোগবাদী সভ্যতা মানুষকে পরকালবিমুখ করে তুলছে। বিজ্ঞান ও দর্শনের নামে বিভ্রান্তিকর নাস্তিক্যবাদী মতবাদ তরুণ প্রজন্মের চিন্তাজগতে সংশয়বাদ তৈরি করছে।
- দাঈদের আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির ঘাটতি: বহু দাঈ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েশন, আন্তর্জাতিক ভাষা (ইংরেজি) এবং আধুনিক দর্শন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না রাখায় আধুনিক শিক্ষিত মহলে কার্যকরভাবে দাওয়াত পৌঁছাতে পারছেন না।
- মুসলিম উম্মাহর অভ্যন্তরীণ অনৈক্য ও ফিরকাবাজি: উম্মাহর মধ্যে মতপার্থক্য, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি ও চরম অসহনশীলতা সাধারণ মানুষ ও অমুসলিমদের ইসলামের সৌন্দর্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
- রাজনৈতিক নিপীড়ন ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: বহু দেশে ইসলামপন্থী দাঈদের ওপর নজরদারি, কণ্ঠরোধ, কারারুদ্ধকরণ এবং দাওয়াতী কার্যক্রমে অন্যায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
(ب) اذكر أساليب دعوة غير المسلمين إلى الإسلام على ضوء القرآن والسنة –
[(খ) কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে অমুসলিমকে ইসলামের প্রতি দাওয়াত দেয়ার পদ্ধতি বর্ণনা কর।]
- পারস্পরিক অভিন্ন বিশ্বাসের সূত্র দিয়ে সূচনা (الكلمة السواء): অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে কুরআন অভিন্ন সত্য থেকে শুরুর নির্দেশ দেয়: “قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَىٰ كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ” (বলুন, হে আহলুল কিতাব! তোমরা এমন এক বাণীর দিকে আস যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এক—যেন আমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত না করি—সূরা আলে ইমরান: ৬৪)।
- তাদের উপাস্যদের গালি না দেওয়া: অমুসলিমদের দেব-দেবী বা বিশ্বাসকে কটূক্তি করতে কুরআন কঠোরভাবে নিষেধ করেছে: “وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّـهِ فَيَسُبُّوا اللَّـهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ” (তারা আল্লাহ ছাড়া যাদের ডাকে তোমরা তাদের গালি দিও না, অন্যথায় তারা অজ্ঞতাবশত শত্রুতা করে আল্লাহকে গালি দেবে—সূরা আল-আন’আম: ১০৮)।
- অনুপম মানবিক আচরণ ও সদাচরণ (البر والقسط): যে অমুসলিমরা দ্বীনের ব্যাপারে যুদ্ধ করে না, তাদের সাথে ন্যায়সঙ্গত ও অনুগ্রহপূর্ণ আচরণের নির্দেশ রয়েছে (সূরা আল-মুমতাহিনা: ৮)।
- উপহার বিনিময় ও হৃদয় জয় (تأليف القلوب): রাসূলুল্লাহ (সা.) অমুসলিম গোত্রপ্রধানদের হাদিয়া পাঠাতেন এবং তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেন।
- ইসলামের সৌন্দর্য ও মানবিক মূল্যবোধের যুক্তিপূর্ণ উপস্থাপন: তাত্ত্বিক যুক্তিতর্কের চেয়ে ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক ন্যায়বিচার ও নারী অধিকারের বাস্তব শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরা।
مجموعة (ب) – খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্নাবলী
٧- عرف الدعوة – ثم بين أهميتها بأدلة من القرآن والسنة –
[৭. الدعوة এর পরিচয় দাও। অতঃপর কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর গুরুত্ব আলোচনা কর।]
উত্তর:
দাওয়াহর পরিচয়: ‘দাওয়াহ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ডাকা, আহ্বান করা বা উৎসাহিত করা। পরিভাষায় মানুষকে আল্লাহর তাওহীদের পথে ডাকা এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করাকে দাওয়াত বলে।
কুরআনের আলোকে গুরুত্ব:
- সর্বোত্তম উম্মাহর উপাধি: দাওয়াতের দায়িত্বের কারণেই মুসলিম উম্মাহ শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে: “كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ” (তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্য যাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অন্যায় কাজে নিষেধ কর—সূরা আলে ইমরান: ১১০)।
- সর্বশ্রেষ্ঠ বাণীর মর্যাদা: আল্লাহর পথে ডাকার চেয়ে সুন্দর কথা আর কারও হতে পারে না (সূরা হা-মীম সাজদাহ: ৩৩)।
সুন্নাহর আলোকে গুরুত্ব: রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে বলেছিলেন: “فَوَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا، خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ” (আল্লাহর শপথ! তোমার মাধ্যমে যদি একজন মানুষও হেদায়েত লাভ করে, তবে তা তোমার জন্য মূল্যবান লাল উট অপেক্ষাও উত্তম—সহীহ বুখারী)।
٨- بين صفات الداعي في ضوء القرآن والسنة –
[৮. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে দাঈর গুণাবলি বর্ণনা কর।]
উত্তর:
একজন সফল দাঈ ইলাল্লাহর মধ্যে কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী নিম্নোক্ত মৌলিক গুণাবলি থাকা অপরিহার্য:
- ইখলাস বা নিষ্ঠা (الإخلاص): যাবতীয় খ্যাতি, সম্পদ ও পার্থিব স্বার্থ পরিহার করে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দাওয়াত পরিচালনা করা।
- শরীয়তের গভীর জ্ঞান (العلم والبصيرة): সুস্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে দাওয়াত দেওয়া: “قُلْ هَٰذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّـهِ ۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ” (বলুন, এটিই আমার পথ, আমি ও আমার অনুসারীরা জাগ্রত জ্ঞানের ভিত্তিতে আল্লাহর দিকে ডাকি—সূরা ইউসুফ: ১০৮)।
- কথার সাথে কাজের মিল (مطابقة القول للعمل): নিজে আমল না করে অন্যকে উপদেশ দেওয়া কুরআন কঠোরভাবে নিন্দা করেছে (সূরা আস-সফ: ২-৩)।
- ধৈর্য ও সহনশীলতা (الصبر والتحمل): মানুষের কটূক্তি ও প্রতিকূলতায় ধৈর্য ধারণ করা।
- নম্রতা ও উত্তম চরিত্র (الحلم والرفق): রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “যে বিষয়ে নম্রতা থাকে তা তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে, আর যা থেকে তা কেড়ে নেওয়া হয় তা কলুষিত হয়” (সহীহ মুসলিম)।
٩- كيف بدأ النبي صلى الله عليه وسلم دعوته في حياته المكية؟
[৯. রাসূল (স.) মাক্কী জীবনে কীভাবে দাওয়াতের সূচনা করেন?]
উত্তর:
নবী করীম (সা.) মাক্কী জীবনে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতিতে দাওয়াত পরিচালনা করেছিলেন:
- গোপন দাওয়াতী পর্যায় (তিন বছর): সূরা আল-মুদ্দাসসির নাজিলের পর তিনি অত্যন্ত সন্তর্পণে নিকটাত্মীয় ও অন্তরঙ্গ বন্ধুদের মাঝে দাওয়াত শুরু করেন। এতে হযরত খাদিজা, আবু বকর, আলী, যায়েদ ইবনে হারেসা ও উসমান (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আরকাম (রা.)-এর বাড়িকে (দারুল আরকাম) দাওয়াতের গোপন কেন্দ্র করা হয়।
- নিকটাত্মীয়দের মাঝে প্রকাশ্য দাওয়াত: সূরা শু’আরার ২১৪ নং আয়াত “وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ” (আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন) নাজিল হলে তিনি হাশেমী গোত্রকে দাওয়াত দেন।
- সার্বজনীন প্রকাশ্য ঘোষণা: সূরা হিজরের ৯৪ নং আয়াত “فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ” নাজিল হলে তিনি সাফা পাহাড়ে উঠে কুরাইশদের ডাকেন এবং প্রকাশ্যে তাওহীদের ঘোষণা দেন।
١٠- اكتب مناهج دعوة سيدنا شعيب عليه السلام بالإيجاز –
[১০. সংক্ষেপে শোয়াইব (আ.) এর দাওয়াতের পদ্ধতিসমূহ লিখ।]
উত্তর:
হযরত শোয়াইব (আ.)-কে মাদইয়ান ও আসহাবুল আইকার অধিবাসীদের নিকট পাঠানো হয়েছিল। তাঁর অপূর্ব বাগ্মিতার কারণে তাঁকে ‘খাতীবুল আম্বিয়া’ (নবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বক্তা) বলা হতো। তাঁর দাওয়াতী পদ্ধতির মূল দিকগুলো:
- অর্থনৈতিক দুর্নীতির সরাসরি সংশোধন: তাওহীদের সাথে সাথে মাদইয়ানবাসীর প্রধান অপরাধ—ওজনে কম দেওয়া ও ব্যবসায় কারচুপির বিরুদ্ধে তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করেন: “أَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ” (তোমরা ইনসাফের সাথে মাপ ও ওজন পূর্ণ কর—সূরা হূদ: ৮৪)।
- জনগণের কল্যাণের মানসিকতা: তিনি জাতিকে বলেন: “إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ” (আমি আমার সাধ্যমতো কেবল সংস্কার ও সংশোধনই করতে চাই—সূরা হূদ: ৮৮)।
- অতীতের ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির ইতিহাস স্মরণ করানো: কাওমে লূত ও সালেহ (আ.)-এর ভয়াবহ ধ্বংসের ইতিহাস মনে করিয়ে তাদের তওবার তাগিদ দেন।
١١- تحدث عن مشاكل الدعوة وحلها على ضوء القرآن والسنة –
[১১. ইসলামি দাওয়াতের সমস্যাসমূহ ও সমাধান কুরআন ও হাদিসের আলোকে আলোচনা কর।]
উত্তর:
দাওয়াতের প্রধান সমস্যাসমূহ: সমাজের কাফেল ও অজ্ঞদের বিরোধিতা, অপপ্রচার ও সামাজিক বয়কট, দাঈদের পারস্পরিক বিরোধ, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা এবং শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক নিপীড়ন।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সমাধান:
- ধৈর্য ও অবিচলতা অবলম্বন: “وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا أَصَابَكَ ۖ إِنَّ ذَٰلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ” (বিপদে ধৈর্য ধারণ কর, নিশ্চয় এটি অত্যন্ত সাহসিকতার কাজ—সূরা লুকমান: ১৭)।
- প্রজ্ঞাপূর্ণ উত্তর ও বিদ্বেষ পরিহার: মন্দের জবাব ভালো দিয়ে দেওয়া, যাতে পরম শত্রুও অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয় (সূরা ফুসসিলাত: ৩৪)।
- সংগঠিত ঐক্য ও সীসাঢালা প্রাচীর তৈরি: পারস্পরিক কোন্দল পরিহার করে উম্মাহর ঐক্য রক্ষা করা (সূরা আস-সফ: ৪)।
- আল্লাহর ওপর ভরসা ও সাহায্য প্রার্থনা: সালাত ও ধৈর্যের মাধ্যমে রবের সাহায্য অন্বেষণ করা।
١٢- علق على اثنين مما يأتي:
[১২. যে কোনো দুটির টীকা লিখ:]
(الف) خمس آيات من الدعوة (দাওয়াত সম্পর্কিত পাঁচটি আয়াত)
- “ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ” (সূরা আন-নাহল: ১২৫) – প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশে দাওয়াত।
- “وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّـهِ وَعَمِلَ صَالِحًا” (সূরা ফুসসিলাত: ৩৩) – শ্রেষ্ঠতম বাণীর মর্যাদা।
- “وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ” (সূরা আলে ইমরান: ১০৪) – কল্যাণকামী দাওয়াতী দল গঠনের নির্দেশ।
- “يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৬৭) – পূর্ণাঙ্গ রিসালাত পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ।
- “كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ” (সূরা আলে ইমরান: ১১০) – সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধকারী শ্রেষ্ঠ উম্মাহ।
(ج) مصادر الدعوة الإسلامية (ইসলামী দাওয়াহর উৎসসমূহ)
ইসলামী দাওয়াহর মূল ভিত্তি ও উৎস চারটি:
- আল-কুরআনুল কারীম: দাওয়াহর প্রধানতম সংবিধান ও মূল নির্দেশনাবলী।
- আস-সুন্নাহ আন-নববিয়্যাহ: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনী ও দাওয়াতী বাস্তব কর্মপদ্ধতি।
- সাহাবায়ে কেরামের ইতিহাস ও জীবনী (সীরাতুস সাহাবা): দাওয়াতের ময়দানে সাহাবীদের ত্যাগ ও বাস্তব দৃষ্টান্ত।
- মুসলিম উম্মাহর ফিকহ ও তাজদীদী ইতিহাস: যুগে যুগে বিজ্ঞ মুজাদ্দিদ ও ফকীহগণের প্রজ্ঞাপূর্ণ দাওয়াতী নীতিমালা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ইসলামী দাওয়াহর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: ইসলামী দাওয়াহর মূল উদ্দেশ্য হলো মানবজাতিকে সৃষ্টির দাসত্ব থেকে মুক্ত করে একমাত্র মহান আল্লাহর দাসত্বে আনয়ন করা এবং পরকালীন চিরস্থায়ী জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচিয়ে জান্নাত লাভের উপযোগী করে গড়ে তোলা।
প্রশ্ন ২: ফাতরাতুর রুসুল বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: দুই নবীর আগমনের মধ্যবর্তী যে দীর্ঘ বিরতিকালে কোনো নতুন নবী বা ওহীর আগমন ঘটেনি, তাকে ফাতরাতুর রুসুল বলে। যেমন হযরত ঈসা (আ.) ও মহানবী (সা.)-এর মধ্যবর্তী প্রায় ৬০০ বছরের সময়কাল।
প্রশ্ন ৩: মূসা (আ.)-কে আল্লাহ কী কী প্রধান মুজিযা দিয়েছিলেন?
উত্তর: মূসা (আ.)-কে নয়টি প্রকাশ্য নিদর্শন দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে প্রধান ছিল তাঁর হাতের লাঠি অজগরে রূপান্তর হওয়া এবং হাত বগলে রেখে বের করলে তা শুভ্র উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় হওয়া।
প্রশ্ন ৪: ইবরাহীম (আ.)-কে কেন ‘আবুল আম্বিয়া’ বলা হয়?
উত্তর: হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর দুই পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) ও ইসহাক (আ.)-এর বংশধারা থেকেই পরবর্তী যুগের প্রায় সকল নবী ও রসূলের আগমন ঘটেছে, তাই তাঁকে ‘আবুল আম্বিয়া’ বা নবীদের পিতা বলা হয়।
প্রশ্ন ৫: হযরত শোয়াইব (আ.) স্বীয় কাওমকে কোন অন্যায় থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন?
উত্তর: হযরত শোয়াইব (আ.) শিরকের পাশাপাশি তাঁর কওমকে ব্যবসা-বাণিজ্যে মাপে ও ওজনে কম দেওয়া এবং মানুষের প্রাপ্য অধিকার আত্মসাৎ করা থেকে বিরত থাকার জোর তাগিদ দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন ৬: দাওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমত বা প্রজ্ঞা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: হিকমত হলো স্থান, কাল, পাত্র এবং শ্রোতার মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বিবেচনা করে অত্যন্ত উপযুক্ত, যুক্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য পন্থায় দ্বীনের সত্য কথা উপস্থাপন করা।