পরীক্ষা কোড: 204 | প্রশ্নপত্র কোড: 181
اختبار السنة الرابعة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ۲۰۲۱
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
اللغة العربية وآدابها
[আরবি ভাষা ও সাহিত্য]
تاريخ الأدب العربي-٣ (العصر الحديث من ۱۷৯৮ حتى اليوم)
[আরবি সাহিত্যের ইতিহাস-৩ (আধুনিক যুগ— ১৭৯৮ থেকে বর্তমান পর্যন্ত)]
বিষয় কোড: 204408
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য: (الف) অংশ থেকে চারটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (الف) / (ক) বিভাগ : রচনামূলক প্রশ্নাবলি
الدرجات — ١٥ × ٤ = ٦٠
١- ما المراد بالأدب العربى الحديث؟ بين نشأته وتطوره-
[১. আধুনিক আরবি সাহিত্য বলতে কী বোঝায়? এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা:
আরবি সাহিত্যের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ‘আল-আদাবুল আরাবী আল-হাদীস’ বা আধুনিক আরবি সাহিত্য (الأدب العربي الحديث) এক গৌরবোজ্জ্বল ও নবজাগরণমূলক অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করে। তুর্কি উসমানীয় শাসনামলের স্থবিরতা, অন্ধ অনুকরণ ও অবক্ষয়ের দীর্ঘ অন্ধকার যুগ পেরিয়ে ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মিসর অভিযানের মাধ্যমে আরব বিশ্বে যে পাশ্চাত্য সভ্যতার অভিঘাত ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ শুরু হয়, তাকেই আধুনিক আরবি সাহিত্যের সূচনাপর্ব হিসেবে গণ্য করা হয়।
১. আধুনিক আরবি সাহিত্যের পরিচয় ও স্বরূপ (مفهوم الأدب العربي الحديث):
সাহিত্য গবেষকদের মতে, ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত রচিত আরবি কবিতা, গদ্য, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প ও সাহিত্য সমালোচনার সামগ্রিক রূপই হলো আধুনিক আরবি সাহিত্য। এটি কেবল কালানুক্রমিক আধুনিকতা নয়, বরং বিষয়বস্তু, প্রকাশভঙ্গি, মননশীলতা ও মানবিক অনুভূতির এক বৈপ্লবিক রূপান্তর। এতে ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের শুদ্ধতার সাথে আধুনিক জীবনের বাস্তব সমস্যা, স্বাধীনতা সংগ্রাম, জাতীয়তাবোধ এবং পাশ্চাত্য সাহিত্যের গঠনশৈলীর অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।
২. আধুনিক আরবি সাহিত্যের উৎপত্তি ও কারণসমূহ (عوامل نشأة الأدب الحديث):
আধুনিক আরবি সাহিত্যের অভ্যুদয় ও রেনেসাঁ (النهضة الأدبية)-র পেছনে কতগুলো মৌলিক ঐতিহাসিক উপাদান কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল:
- মুহাম্মদ আলী পাশার আধুনিকীকরণ আন্দোলন: উসমানীয় গভর্নর মুহাম্মদ আলী পাশা (১৮০৫-১৮৪৮ খ্রি.) মিসরে আধুনিক সামরিক, প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন করেন।
- ইউরোপে শিক্ষা মিশন প্রেরণ: রেনেসাঁ ব্যক্তিত্ব রিফায়া আত-তাহতাবীর (১৮০১-১৮৭৩ খ্রি.) নেতৃত্বে তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের ফ্রান্সে প্রেরণ করা হয়, যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে চিন্তার সেতুবন্ধন রচনা করে।
- ছাপাখানার প্রতিষ্ঠা: ১৮২১ সালে কায়রোতে ঐতিহাসিক ‘মাতবাআতুল বুলাক’ (مطبعة بولاق) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ক্লাসিক্যাল আরবি সাহিত্যের দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ও আধুনিক অনুবাদ সাহিত্য গণমানুষের নাগালে আসে।
- অনুবাদ আন্দোলন (حركة الترجمة): রিফায়া তাহতাবী প্রতিষ্ঠিত ‘দারুল আলসুন’ (ভাষাশিক্ষা ও অনুবাদ একাডেমি)-এর মাধ্যমে ফরাসি ও ইংরেজি সাহিত্যের ধ্রুপদী নাটক, উপন্যাস ও বিজ্ঞানসম্মত গ্রন্থাবলি আরবিতে অনূদিত হয়।
- সংবাদপত্র ও সাময়িকীর বিকাশ (الصحافة): ‘আল-ওয়াকায়িউল মিসরিয়্যাহ’ (الوقائع المصرية), ‘আল-আহরাম’ (الأهرام), ‘আল-মুআইয়াদ’ প্রভৃতি জাতীয় দৈনিক ও সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশ আরবি গদ্যকে কৃত্রিম ছন্দোবদ্ধতা ও অলঙ্কারবহুল জটিলতা থেকে মুক্ত করে সহজ-সরল ও সার্বজনীন রূপ দেয়।
৩. আধুনিক আরবি সাহিত্যের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ (أطوار تطور الأدب العربي الحديث):
সাহিত্যতাত্ত্বিকগণ আধুনিক আরবি সাহিত্যের বিকাশকে চারটি প্রধান স্তরে বিন্যস্ত করেছেন:
- পুনরুজ্জীবন বা নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (مرحلة الإحياء والبعث): এ যুগে মাহমুদ সামী আল-বারূদী, আহমদ শাওকী এবং হাফিজ ইবরাহিম প্রমুখ কবি জাহেলী ও আব্বাসীয় যুগের বিশুদ্ধ কাব্যশৈলীকে ফিরিয়ে এনে মৃতপ্রায় আরবি কবিতায় নতুন প্রাণ সঞ্চার করেন।
- রোমান্টিক ও ভাববাদী ধারা (الاتجاه الرومانسي والوجداني): বিশ শতকের প্রথমার্ধে গঠিত ‘দিওয়ান গ্রুপ’ (আল-আক্কাদ, আল-মাজিনী, শুকরী), ‘অ্যাপোলো আন্দোলন’ (আহমদ জাকী আবু শাদী, ইব্রাহিম নাজী) এবং প্রবাসী সাহিত্যিকদের ‘রাবিতা কালামিয়্যাহ’ (জীবরান খলিল জীবরান, মিখাইল নুআইমাহ) সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে মানবিক অনুভূতি, প্রকৃতিপ্রেম ও আত্মিক স্বাধীনতাকে স্থাপন করে।
- বাস্তববাদী ও সামাজিক চেতনা (الاتجاه الواقعي): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৪৮ সালের ফিলিস্তিন ট্র্যাজেডির পর আরবি সাহিত্য সমাজের নিপীড়িত মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধ ও জাতীয় মুক্তির দর্পণে পরিণত হয়। নজীব মাহফূয, ইউসুফ ইদ্রিস ও গাসসান কানাফানী এ ধারার নেতৃত্ব দেন।
- আধুনিক রূপ ও মুক্তছন্দ কবিতা (الشعر الحر والتجديد المعاصر): বদর শাকির আস-সাইয়্যাব ও নাযিক আল-মালাইকার হাত ধরে ১৯৪৮ সালে মুক্তছন্দ বা আধুনিক মুক্ত কবিতার জন্ম হয়, যা ক্লাসিক্যাল ‘বাহর’ বা ওজনের কঠোর শৃঙ্খল ভেঙে আধুনিক কবিতার এক নবদিগন্ত উন্মোচন করে।
উপসংহার:
আধুনিক আরবি সাহিত্য অতীত ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ ভিত্তি এবং সমকালীন বৈশ্বিক সাহিত্যের নবীন ভাবধারার সংমিশ্রণে আজ বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও প্রভাবশালী অঙ্গনে উন্নীত হয়েছে।
٢- اكتب نشأة المسرحية وتطورها فى الأدب العربى، ثم بين مساهمة توفيق الحكيم فى هذا الحقل-
[২. আরবি সাহিত্যে নাটকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ লিপিবদ্ধ করে এক্ষেত্রে তাওফিক আল-হাকিমের অবদান আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা:
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় আরবি সাহিত্যে মহাকাব্য ও নাট্যকলা (المسرحية)-এর প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব ছিল না; বরং সেখানে একক কবিতা ও খুতবাই ছিল প্রধানতম প্রকাশমাধ্যম। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইউরোপীয় নাট্যসাহিত্যের সংস্পর্শে এসে আরবি সাহিত্যে নাট্যকলা এক নতুন শিল্পমাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং দ্রুততম সময়ে পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করে।
১. আরবি নাটকের উৎপত্তি ও প্রারম্ভিক বিকাশ (نشأة المسرحية وتطورها):
- মারুন আন-নাক্কাশের অগ্রণী ভূমিকা (১৮৪৭ খ্রি.): লেবাননের মারুন আন-নাক্কাশ (مارون النقاش) ১৮৪৭ সালে বৈরুতে নিজ গৃহে ফরাসি নাট্যকার মলিয়েরের নাটক অবলম্বনে ‘আল-বাখীল’ (البخيل – কৃপণ) মঞ্চস্থ করেন। এটিই আরবি ভাষার সর্বপ্রথম আধুনিক মঞ্চনাটক। এরপর তিনি ‘আবু হাসান আল-মুগাফফাল’ (أبو الحسن المغفل) রচনা করেন।
- সিরিয়া থেকে মিসরে নাটকের স্থানান্তর: ১৮৭০-এর দশকে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার কারণে সিরিয়া ও লেবাননের নাট্যদলগুলো মুক্তচিন্তার কেন্দ্রভূমি মিসরে হিজরত করে। আহমাদ আবু খলিল আল-কব্বানী (أحمد أبو خليل القباني) এবং সুলাইমান আল-ক্বারদাহী মিসরে পেশাদার নাট্যচর্চার ভিত্তি স্থাপন করেন।
- গীতিনাট্য বা পদ্য-নাটকের স্বর্ণযুগ: আমিরুশ শুয়ারা আহমদ শাওকী (أحمد شوقي) আরবি কাব্য-নাট্যের জনক। তিনি প্রাচীন ছন্দোবদ্ধ রীতিতে ঐতিহাসিক ও রোমান্টিক নাটক রচনা করেন, যেমন: ‘মাসরাউ কিলিয়োপাতরা’ (مصرع كليوباترا), ‘মাজনুন লাইলা’ (مجنون ليلى), ‘কাম্বীয’ (قمبيز) এবং ‘আলী বাক আল-কাবীর’।
২. নাট্যক্ষেত্রে তাওফিক আল-হাকিমের অবদান (مساهمة توفيق الحكيم في المسرح):
তাওফিক আল-হাকিম (১৮৯৮-১৯৮৭ খ্রি.) হলেন আরবি আধুনিক নাটকের প্রধান রূপকার ও পুরোধা ব্যক্তিত্ব (رائد المسرح الذهني)। তিনি নাটককে কেবল বিনোদনের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে গভীর দার্শনিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক চিন্তার এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর প্রধান অবদানসমূহ নিম্নরূপ:
- বুদ্ধিবৃত্তিক নাটক বা মানসিক থিয়েটার (المسرح الذهني): হাকিমের সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্ভাবন হলো ‘আল-মাসরাহ আয-যিহনী’। এসব নাটক মঞ্চের চেয়ে মানুষের বুদ্ধি ও চিন্তার পর্দায় অধিকতর আলোড়ন সৃষ্টি করে। পবিত্র কুরআনের আসহাবে কাহাফের ঘটনা অবলম্বনে রচিত তাঁর যুগান্তকারী নাটক ‘আহলুল কাহাফ’ (أهل الكهف – ১৯৩৩ খ্রি.) আরবি নাটকের ইতিহাসে এক মাইলফলক। এতে সময়, মৃত্যু ও মানুষের অস্তিত্বের চিরন্তন দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে।
- দার্শনিক নাটক (المسرحيات الفلسفية): গ্রিক ও প্রাচ্য মিথলজির আলোকে তিনি গভীর দার্শনিক প্রশ্নাবলি উত্থাপন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে: ‘শাহরাযাদ’ (شهرزاد – ১৯৩৪ খ্রি.), ‘আল-মালিক আওদীব’ (الملك أوديب – ইডিপাস রাজা), এবং ‘বুগমালেয়ন’ (بجماليون – পিগম্যালিয়ন)।
- সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গনাট্য: মিসরীয় সমাজের অসংগতি, ভণ্ডামি ও সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে তিনি ব্যঙ্গাত্মক ও বাস্তবমুখী নাটক লেখেন, যেমন: ‘আল-আইদী আন-নাহিমা’ (الأيدي الناعمة – কোমল হাতসমূহ), ‘আস-সুলতান আল-হাইর’ (السلطان الحائر – বিভ্রান্ত সুলতান), এবং ‘ইয়া তালিআশ শাজারাহ’ (يا طالع الشجرة – অ্যাবসার্ড নাটক)।
- তৃতীয় ভাষা বা মধ্যম ভাষার উদ্ভাবন (اللغة الثالثة): তিনি চরম আভিধানিক ক্লাসিক্যাল আরবি (ফুসহা) এবং প্রচলিত কথ্য ভাষার (আম্মিয়্যাহ) মধ্যকার দূরত্ব দূর করে এক প্রাঞ্জল, মার্জিত অথচ সাবলীল সংলাপরীতি গড়ে তোলেন।
উপসংহার:
তাওফিক আল-হাকিমের সৃষ্টিশীল প্রতিভার স্পর্শেই আরবি নাটক বিশ্বমানের ক্লাসিক নাট্যসাহিত্যের সমমর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এজন্য তাকে যথার্থই ‘আরবি নাটকের জনক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
٣- عرف القصة القصيرة- ثم اكتب تطور القصة القصيرة فى الأدب العربى الحديث-
[৩. ছোট গল্পের সংজ্ঞা দাও। আধুনিক আরবি ছোট গল্পের ক্রমবিকাশ লেখ।]
উত্তর:
ভূমিকা:
আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় ও শক্তিশালী গদ্য আঙ্গিক হলো ছোটগল্প (القصة القصيرة)। জীবনের সমগ্রতাকে ধারণ না করে কোনো একটি খণ্ড মুহূর্ত, বিশেষ অনুভূতি বা তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাকে অল্প পরিসরে সংহত ও তীব্রভাবে প্রকাশ করাই ছোটগল্পের মূল কথা। আধুনিক আরবি সাহিত্যে বিংশ শতাব্দীতে ছোটগল্পের দ্রুত ও অভূতপূর্ব বিকাশ সাধিত হয়।
১. ছোটগল্পের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য (تعريف القصة القصيرة وخصائصها):
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: বিশিষ্ট সাহিত্যতাত্ত্বিক ও সমালোচকদের মতে: «القصة القصيرة هي فن نثري أدبي يعالج جانبا واحدا أو لحظة خاطفة من حياة الإنسان وشخصية واحدة أو فكرة محددة، في أسلوب مركز ومكثف يوحي بأثر كلي واحد» — অর্থাৎ “ছোটগল্প হলো সাহিত্যের এমন এক গদ্যকলা, যা অত্যন্ত ঘনসংবদ্ধ ও সুনির্দিষ্ট শৈলীতে মানুষের জীবনের কোনো একক দিক, ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত, একক চরিত্র বা সুনির্দিষ্ট ভাবনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যা পাঠকের মনে একটি সামগ্রিক ও অবিভাজ্য প্রভাব তৈরি করে।”
- মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ: এডগার অ্যালান পো এবং আধুনিক আরব সমালোচকদের মতে ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:
- একমুখী প্রভাব (وحدة الأثر أو الانطباع): সমগ্র গল্পে একটি মাত্র মূল ভাব ও সুর বজায় থাকে।
- সংক্ষিপ্ততা ও তীব্রতা (الإيجاز والتركيز): কোনো বাহুল্য বা অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা থাকে না।
- চরিত্রের সীমাবদ্ধতা: চরিত্রের সংখ্যা থাকে অত্যন্ত সীমিত।
- নাটকীয় ক্লাইম্যাক্স ও পরিণতি: সমাপ্তিতে একটি আকস্মিক অথচ অর্থবহ মোড় থাকে।
২. আধুনিক আরবি ছোটগল্পের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ (تطور القصة القصيرة في الأدب العربي):
আরবি ছোটগল্পের বিকাশধারাকে মূলত তিনটি সুস্পষ্ট যুগে ভাগ করা যায়:
১. সূচনা ও ভিত্তিস্থাপন পর্ব (مرحلة النشأة والتأسيس: ১৯০০-১৯২৫ খ্রি.):
- আরবি ছোটগল্পের প্রথম সফল পথপ্রদর্শক হিসেবে মুহাম্মদ তৈমুর (محمد تيمور: ১৮৯২-১৯২১ খ্রি.)-কে বিবেচনা করা হয়। ১৯১৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত ছোটগল্প ‘ফিল কিতার’ (في القطار – ট্রেনে) আরবি ভাষার সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক শৈলীসম্মত ছোটগল্প হিসেবে স্বীকৃত।
- লেবানন ও আমেরিকার প্রবাসী সাহিত্যিক জীবরান খলিল জীবরানের ‘আরাইসু মারূজ’ (عرائس المروج) এবং মিখাইল নুআইমাহর ‘কানা মা কান’ (كان ما كان) গভীর দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক ছোটগল্পের ভিত গড়ে তোলে।
- মুস্তফা লুৎফী আল-মানফালূতীর ‘আল-ইবারাত’ (العبرات)-এর গল্পগুলো sentimental ও করুণ রসে ভরপুর হলেও আধুনিক কাঠামোর বিকাশে সহায়ক ছিল।
২. বিকাশ ও সংহতির যুগ (مرحلة التطور والتأصيل: ১৯২৫-১৯৫০ খ্রি.):
- মুহাম্মদ তৈমুরের অকাল প্রয়াণের পর তাঁর ভাই মাহমুদ তৈমুর (محمود تيمور: ১৮৯৪-১৯৭৩ খ্রি.) আরবি ছোটগল্পকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তিনি বিশটিরও অধিক ছোটগল্পের সংকলন রচনা করেন, যার মধ্যে ‘আশ-শাইখ জুমা’ (الشيخ جمعة) ও ‘আম্মু মুতওয়ালী’ অন্যতম। এজন্য তাঁকে ‘আরবি ছোটগল্পের জনক’ (رائد القصة العربية) বলা হয়।
- এ যুগে মাহমুদ তাহির লাশীন ‘হাদীছু কুরইয়াহ’ (حديث قرية) রচনার মাধ্যমে গ্রামীণ বাস্তবতার নিখুঁত প্রতিফলন ঘটান।
৩. আধুনিকতা ও মনস্তাত্ত্বিক উৎকর্ষের যুগ (مرحلة النضج والواقعية المعاصرة: ১৯৫০ পরবর্তী কাল):
- ইউসুফ ইদ্রিস (يوسف إدريس): আরবি ছোটগল্পের অবিসংবাদিত সম্রাট। তাঁর বিখ্যাত সংকলন ‘আরখাছ লায়ালী’ (أرخص ليالي – সবচেয়ে সস্তা রাতসমূহ) ও ‘ক্বা’উল মাদীনা’ (قاع المدينة)-এর মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সমাজের রূঢ় বাস্তবতাকে তিনি শিল্পীত রূপ দিয়েছেন।
- নজীব মাহফূয তাঁর ‘হামস আল-জুনুন’ (همس الجنون) ও ‘খাম্মারাতুল কিত আল-আসওয়াদ’-এর মাধ্যমে দার্শনিক ছোটগল্পের রূপরেখা নির্মাণ করেন।
- যাকারিয়া তামির (সিরিয়া), গাসসান কানাফানী (ফিলিস্তিন) এবং আল-তৈয়ব সালেহ (সুদান) আরবি ছোটগল্পকে রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও অস্তিত্ববাদী গভীরতায় সমৃদ্ধ করেছেন।
উপসংহার:
আধুনিক আরবি ছোটগল্প আজ আঙ্গিক, ভাষা ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতায় বিশ্বমানের যেকোনো উন্নত সাহিত্যের সাথে সমকক্ষ এবং এটি আরব সমাজের স্পন্দন ও আত্মোপলব্ধির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিচ্ছবি।
٤- بين خدمات نجيب محفوظ فى ميدان الأدب الروائى العربى-
[৪. আরবি উপন্যাস সাহিত্যে নাজীব মাহফুজের অবদান আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা:
আধুনিক আরবি উপন্যাস (الرواية العربية)-এর ইতিহাসে নাজীব মাহফূয (نجيب محفوظ: ১৯১১-২০০৬ খ্রি.) এক আলোকবর্তিকা ও যুগস্রষ্টা ব্যক্তিত্ব। তিনি আরবি উপন্যাসকে আঞ্চলিক সীমানা অতিক্রম করিয়ে বিশ্বসাহিত্যের শীর্ষাসনে অধিষ্ঠিত করেন। ১৯৮৮ সালে প্রথম এবং একমাত্র আরব সাহিত্যিক হিসেবে সাহিত্যে সম্মানজনক ‘নোবেল পুরস্কার’ লাভ করে তিনি আরবি সাহিত্যের বিশ্বজনীন মর্যাদাকে চিরস্মরণীয় করে তোলেন।
১. ঐতিহাসিক উপন্যাস পর্ব (المرحلة التاريخية الفرعونية):
সাহিত্যজীবনের শুরুতে নাজীব মাহফূয প্রাচীন মিসরের ফারাও যুগের ঐতিহাসিক পটভূমি অবলম্বনে তিনটি সফল জাতীয়তাবাদী উপন্যাস রচনা করেন:
- ‘আবাসুল আকদার’ (عبث الأقدار – ভাগ্যের পরিহাস, ১৯৩৯ খ্রি.)
- ‘রাদুবীস’ (رادوبيس – নর্তকী রাদোবিস, ১৯৪৩ খ্রি.)
- ‘কিফাহ তিবাহ’ (كفاح طيبة – থিবসের সংগ্রাম, ১৯৪৪ খ্রি.)
এসব উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি প্রাচীন মিসরের স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপক দিয়ে সমকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী জাতীয় চেতনাকে জাগ্রত করেন।
২. সামাজিক বাস্তবতাবাদের স্বর্ণযুগ (المرحلة الواقعية والملحمة الشعبية):
নাজীব মাহফূযের প্রতিভার পূর্ণতম বিকাশ ঘটে তাঁর সামাজিক বাস্তবতাবাদী উপন্যাসে। তিনি কায়রোর অলিগলি, মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন, সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ও সংগ্রামকে জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন:
- ‘খান আল-খালিলী’ (خان الخليلي – ১৯৪৬ খ্রি.) ও ‘যুকাকুল মিদাক্ক’ (زقاق المدق – মিদাক্ক গলি, ১৯৪৭ খ্রি.)।
- ‘বিদায়াহ ওয়া নিহায়াহ’ (بداية ونهاية – সূচনা ও সমাপ্তি, ১৯৪৯ খ্রি.)।
- কায়রো ট্রিলজি বা আল-ছুলাছিয়্যাহ (الثلاثية): এটি তাঁর সাহিত্যজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ মাস্টারপিস, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। তিনটি খণ্ডে বিভক্ত এই সুবিশাল উপন্যাসে আল-সাইয়্যিদ আহমদ আব্দ আল-জাওয়াদ এবং তাঁর পরিবারের তিন প্রজন্মের বিবর্তনের মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে ১৯৫২ সালের বিপ্লব পর্যন্ত মিসরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তনের ইতিহাস আঁকা হয়েছে:
- ‘বাইনাল কাসরাইন’ (بين القصرين – প্রাসাদের মাঝে, ১৯৫৬ খ্রি.)
- ‘কাসরুশ শাওক’ (قصر الشوق – আকাঙ্ক্ষার প্রাসাদ, ১৯৫৭ খ্রি.)
- ‘আস-সুক্কারিয়্যাহ’ (السكرية – সুক্কারি স্ট্রিট, ১৯৫৭ খ্রি.)
৩. রূপক ও দার্শনিক পর্ব (المرحلة الرمزية والفلسفية):
১৯৫২ সালের জুলাই বিপ্লবের পর তিনি বাস্তবতাবাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে গভীর রূপক ও অস্তিত্ববাদী দর্শনের আশ্রয় নেন:
- ‘আওলাদু হারাতিনা’ (أولاد حارتنا – আমাদের পাড়ার ছেলেরা, ১৯৫৯ খ্রি.): মানবজাতির সৃষ্টি, নবীগণের আগমন এবং আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে সত্য ও ন্যায়ের সন্ধানের এক রূপক আখ্যান।
- ‘আল-লিসসু ওয়াল কিলাব’ (اللص والكلاب – চোর ও শিকারী কুকুর, ১৯৬১ খ্রি.): বিপ্লব-পরবর্তী বিশ্বাসভঙ্গ, বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতিশোধের মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ণ।
- ‘আস-ছারছারা ফাউকান নীল’ (الثرثرة فوق النيل – নীল নদে অর্থহীন বকবকানি, ১৯৬৬ খ্রি.) এবং ‘মিরামার’ (ميرامار – ১৯৬৭ খ্রি.)।
৪. এপিক ও মরমি পর্ব (المرحلة الملحمية والتراثية):
শেষ জীবনে তিনি লোকঐতিহ্য ও সুফি দর্শনের আধ্যাত্মিক ভাবধারায় সমৃদ্ধ উপন্যাস রচনা করেন, যার মধ্যে ‘মালহামাতুল হারাফীশ’ (ملحمة الحرافيش – যাযাবরদের মহাকাব্য) এবং ‘হাদীসুস সাবাহ ওয়াল মাসা’ (حديث الصباح والمساء) বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
উপসংহার:
নাজীব মাহফূয আরবি ভাষার উপন্যাসকে কাঠামোগত দুর্বলতা থেকে মুক্ত করে এক নিটোল শিল্পরূপ দিয়েছেন। তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি আরবি সাহিত্যের জন্য একটি বৈশ্বিক স্বীকৃতি এনে দেয়, যা তাঁকে আধুনিক আরবি উপন্যাসের অবিসংবাদিত স্থপতি বানিয়েছে।
٥- اكتب مقالة على تطور الأدب العربى فى شبه القارة الهندية-
[৫. ভারতীয় উপমহাদেশে আরবি সাহিত্যের ক্রমবিকাশের উপর একটি প্রবন্ধ লেখ।]
উত্তর:
ভূমিকা:
ভারতীয় উপমহাদেশে আরবি সাহিত্যের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন, সমৃদ্ধ ও গৌরবময়। ভৌগোলিক ও ভাষাতাত্ত্বিক দূরত্বের কারণে আরবি এ অঞ্চলের মানুষের মাতৃভাষা না হওয়া সত্ত্বেও, ইসলামের আগমন এবং কুরআনিক চেতনার প্রভাবে উপমহাদেশীয় মনীষীগণ আরবি ভাষা ও সাহিত্যে এমন অসামান্য অবদান রেখেছেন যা সমগ্র মুসলিম বিশ্বে শ্রদ্ধার সাথে স্বীকৃত।
১. প্রাক-ইসলাম ও প্রাথমিক যুগ (عصر ما قبل الإسلام والقرون الأولى):
- ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ব থেকেই আরব বণিকদের সাথে দক্ষিণ ভারতের মালাবার উপকূল ও শ্রীলঙ্কার বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল।
- ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ ইবনে কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে উপমহাদেশে সরাসরি ইসলামী শাসন ও আরবি ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ঘটে। মানসুরা ও মুলতান ইসলামী ইলম ও আরবি কবিতা চর্চার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
২. সালতানাত ও মুঘল যুগে আরবি চর্চা (العصر الإسلامي والمغولي):
- দিল্লি সালতানাত ও মুঘল আমলে ফারসি সরকারি ভাষা থাকলেও কুরআন, হাদিস, ফিকহ এবং উচ্চতর ধর্মতত্ত্ব চর্চার মূল বাহন ছিল আরবি ভাষা।
- আল্লামা হাসান ইবনে মুহাম্মদ আস-সাগানী (মৃ. ৬৫০ হি./১২৫২ খ্রি.): লাহোরে জন্মগ্রহণকারী এই ভাষাতাত্ত্বিক আরবি অভিধান শাস্ত্রে কালজয়ী গ্রন্থ ‘মাজমাউল বাহরাইন’ (مجمع البحرين) এবং ‘আল-উবাব আয-জাখির’ (العباب الزاخر) রচনা করে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।
- মুঘল আমলে বাদশাহ আওরঙ্গজেবের নির্দেশে রচিত ‘আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ’ (الفتاوى الهندية বা ফতোয়ায়ে আলমগীরী) আরবি ফিকহ সাহিত্যের এক অমর মহাকাব্য।
- শায়খ আলী মুত্তাকী আল-হিন্দী তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ‘কানযুল উম্মাল’ (كنز العمال) হাদিস সংকলনের মাধ্যমে হাদিস সাহিত্যে অমরত্ব লাভ করেন।
৩. শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী ও তাঁর যুগান্তকারী বিপ্লব (عصر الإمام الشاه ولي الله الدهلوي):
দ্বাদশ হিজরী শতকে মুজাদ্দিদে জামান শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) (১৭০৩-১৭৬২ খ্রি.) উপমহাদেশের আরবি সাহিত্যের গতিপথকে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেন। তাঁর অমর দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক গ্রন্থ ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ (حجة الله البالغة) বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল আরবি ভাষায় রচিত এক অনুপম শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। তিনি বিশুদ্ধ আরবি কবিতা ও গদ্যের প্রসারে এক নতুন ধারার সূচনা করেন। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি শাহ আব্দুল আযীয ও শাহ ইসমাঈল শহীদ এ ধারাকে আরও শক্তিশালী করেন।
৪. আধুনিক যুগ ও নদওয়াতুল উলামার অবদান (العصر الحديث ودور ندوة العلماء):
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি আরবি ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় নবজাগরণ সৃষ্টি হয়:
- দারুল উলুম দেওবন্দ (১৮৬৬ খ্রি.) হাদিস ও আরবি ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের এক ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
- নদওয়াতুল উলামা লাখনৌ (১৮৯৪ খ্রি.): উপমহাদেশের আরবি সাহিত্যের আধুনিকায়নে লাখনৌর নদওয়াতুল উলামা সবচেয়ে বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করে। আল্লামা শিবলী নোমানী, আল্লামা সুলাইমান নদভী এবং আল্লামা মাসউদ আলম নদভী বিশুদ্ধ আধুনিক সাহিত্যের চর্চা শুরু করেন।
- সাইয়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) (১৯১৪-১৯৯৯ খ্রি.): বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক আরবি সাহিত্যিক ও মনীষী। তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘মাজা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমীন’ (ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين – মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারাল?), ‘কাসাসুন নাবিয়্যীন’ (قصص النبيين) এবং ‘মুখতারাত মিন আদাবিল আরব’ গোটা আরব বিশ্বে ক্লাসিক টেক্সট হিসেবে সমাদৃত। তিনি আরবদের মতোই মার্জিত ও অলঙ্কারসমৃদ্ধ আরবি গদ্যের স্রষ্টা ছিলেন।
৫. সাহিত্যিক অঙ্গনে উপমহাদেশের অনন্য স্বীকৃতি:
- আল্লামা গোলাম আলী আজাদ বিলগ্রামী (রহ.)-কে তাঁর আরবি কবিতায় অসাধারণ নৈপুণ্যের কারণে ‘হাসসানুল হিন্দ’ (حسان الهند – হিন্দুস্তানের হাসসান) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি ‘সুবহাতুল মারজান ফী আসারিল হিন্দুস্তান’ (سبحة المرجان) গ্রন্থ রচনা করেন।
- মুহাম্মদ আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) তাঁর অতুলনীয় আরবি শায়েরী ও হাদিস ব্যাখ্যাগ্রন্থের জন্য আরব বিশ্বে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন।
উপসংহার:
উপমহাদেশের উলামা ও সাহিত্যিকগণ প্রমাণ করেছেন যে, আরবি ভাষা কেবল আরবদের ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষা। উপমহাদেশে আরবি সাহিত্যের এ সুমহান ঐতিহ্য আজও সমান মর্যাদায় বহমান।
٦- اكتب خصائص الشعر العربى الحديث مفصلا-
[৬. আধুনিক আরবি পদ্যের বৈশিষ্ট্যাবলি বিস্তারিত লেখ।]
উত্তর:
ভূমিকা:
আধুনিক আরবি কবিতা (الشعر العربي الحديث) উসমানীয় যুগের স্থবিরতা, শব্দাড়ম্বর ও প্রাণহীন অলঙ্কারশাস্ত্রের নিগড় ভেঙে এক নবজীবনের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে। উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে সূচিত হয়ে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মুক্তছন্দের আবিষ্কার পর্যন্ত আধুনিক কবিতা ভাব, বিষয়বস্তু, আবেগ ও ছন্দের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে।
আধুনিক আরবি কবিতার মৌলিক বৈশিষ্ট্যাবলি (خصائص الشعر العربي الحديث):
১. জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক জাগরণ (النزعة القومية والوطنية):
আধুনিক আরবি কবিতা আরব জাতির স্বাধীনতা সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধ এবং ফিলিস্তিন ট্র্যাজেডির এক জীবন্ত হাতিয়ার। মাহমুদ সামী আল-বারূদী, হাফিজ ইবরাহিম ও মারূফ আর-রুসাফীর কবিতায় স্বাধিকার আন্দোলনের অগ্নিঝরা বাণী উচ্চারিত হয়েছে। মাহমুদ দারবিশ ফিলিস্তিনি আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠেন: «سَجِّلْ أَنَا عَرَبِيٌّ» (লিখে রাখো, আমি একজন আরব)।
২. মানবিক ও রোমান্টিক ভাবাবেগ (الاتجاه الوجداني والإنساني):
‘দিওয়ান’, ‘অ্যাপোলো’ এবং ‘রাবিতা কালামিয়্যাহ’-এর কবিগণ কবিতায় কৃত্রিমতার বদলে হৃদয়ের গভীর অনুভূতি, প্রেম, প্রকৃতি, বিষাদ ও আত্মোপলব্ধিকে প্রাধান্য দেন। মিখাইল নুআইমাহ ও জীবরান খলিল জীবরানের কবিতায় এই সর্বজনীন মানবতাবোধ প্রস্ফুটিত হয়েছে।
৩. সামাজিক বাস্তবতাবাদ ও গণমানুষের অধিকার (الواقعية الاجتماعية):
আধুনিক কবিগণ সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, এতিম ও দরিদ্রদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। রুসাফীর ‘উম্মুল ইয়াতীম’ বা আহমদ শাওকীর নৈতিক কবিতাসমূহ সমাজের তৃণমূলের বাস্তবতাকে ধারণ করেছে।
৪. ছন্দের বিপ্লব ও মুক্তছন্দ কবিতা (الشعر الحر والتفعيلة):
১৯৪৭-৪৮ সালে ইরাকি কবি নাযিক আল-মালাইকা (نازك الملائكة) তাঁর ‘আল-কুলেরা’ (الكوليرا) কবিতার মাধ্যমে এবং বদর শাকির আস-সাইয়্যাব (بدر شاكر السياب) ক্লাসিক্যাল খলিলী ওজনের দ্বিপদী (الشطرين) ও অভিন্ন কাফিয়া (قافية موحدة) পরিত্যাগ করে একক তাফঈলা-ভিত্তিক ‘মুক্তছন্দ কবিতা’র ভিত্তি স্থাপন করেন। এটি আধুনিক আরবি কবিতার সবচেয়ে বড় গঠনতান্ত্রিক বিপ্লব।
৫. পৌরাণিক ও ধর্মীয় রূপক এবং প্রতীকের ব্যবহার (توظيف الأسطورة والرمز):
আধুনিক কবিগণ কেবল সরাসরি বার্তা না দিয়ে গ্রিক মিথলজি, বাবিলীয় উপাখ্যান এবং ইসলামিক ইতিহাস থেকে রূপক ও প্রতীক ধার করেছেন। সাইয়্যাবের ‘তাম্মূয’ (উর্বরতার দেবতা), আদুনিস এবং খলিল হাবীর কবিতায় ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসের মধ্য থেকে পুনর্জন্মের প্রতীক বারবার ব্যবহৃত হয়েছে।
৬. ভাষার সরলতা ও জীবন্ত সুর (سهولة اللغة وعذوبة الأسلوب):
প্রাচীন যুগের জটিল ও অপরিচিত শব্দভাণ্ডার (الغرابة والتعقيد) বর্জন করে আধুনিক জীবনের উপযোগী সাবলীল, প্রাঞ্জল ও গতিশীল ভাষা গ্রহণ করা হয়েছে।
উপসংহার:
আধুনিক আরবি কবিতা তার রূপ, রস ও শৈলীর বৈচিত্র্যে একাধারে ক্লাসিক্যাল ঐতিহ্যের ধারক এবং সমকালীন বৈশ্বিক চিন্তার এক সার্থক রূপকার।
مجموعة (ب) / (খ) বিভাগ : সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি
الدرجات — ٥ × ٤ = ٢٠
٧- من هم شعراء المهجر؟ بين-
[৭. شعراء المهجر কারা? বর্ণনা কর।]
উত্তর:
পরিচয়:
‘শুআরাউল মাহজার’ (شعراء المهجر) বা প্রবাসী কবি হলেন উনিশ শতকের শেষভাগে এবং বিশ শতকের প্রারম্ভে উসমানীয় তুর্কিদের নিপীড়ন, অর্থনৈতিক অনটন ও ধর্মীয় সংঘাতের কারণে লেবানন, সিরিয়া ও ফিলিস্তিন ছেড়ে উত্তর আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র) এবং দক্ষিণ আমেরিকায় (ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা) স্থায়ীভাবে অভিবাসী হওয়া আরব কবি ও সাহিত্যিকদের দল।
প্রধান দুটি ধারা:
- উত্তর আমেরিকার প্রবাসী ধারা (الرابطة القلمية – কলম সমিতি): ১৯২০ সালে নিউইয়র্কে জীবরান খলিল জীবরান (رئيس), মিখাইল নুআইমাহ (مستشار), ইলিয়া আবু মাদী ও নাসীব আরীদ্বাহর নেতৃত্বে গঠিত হয়। তাঁদের বৈশিষ্ট্য ছিল বিদ্রোহ, আত্মিক মুক্তি, মুক্তছন্দ ও গভীর দার্শনিকতা।
- দক্ষিণ আমেরিকার প্রবাসী ধারা (العصبة الأندلسية – আন্দালুসী সংঘ): ১৯৩২ সালে ব্রাজিলের সাঁও পাওলোতে মিশেল মালূফ, ফাউযী আল-মালূফ, শফীক আল-মালূফ এবং ইলিয়াস ফারহাতের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁরা ক্লাসিক্যাল আরবি ভাষা ও ছন্দোবদ্ধ কাঠামোর প্রতি তুলনামূলক বেশি অনুগত ছিলেন।
সাহিত্যে তাঁদের অবদান: মাহজার সাহিত্যের মাধ্যমে আরবি সাহিত্যে প্রথম রোমান্টিক ভাবধারা, প্রকৃতিপ্রেম, আত্মজিজ্ঞাসা এবং স্বদেশের প্রতি তীব্র বিরহের সুর সংযোজিত হয়।
٨- ما المراد بالنقد الأدبى؟ بين-
[৮. النقد الأدبى বলতে কী বোঝায়? বর্ণনা কর।]
উত্তর:
সংজ্ঞা:
‘আন-নাকদুল আদাবী’ (النقد الأدبي) বা সাহিত্য সমালোচনা হলো সাহিত্যের কোনো সৃষ্টিকর্ম (কবিতা, গদ্য, নাটক বা উপন্যাস)-কে সাহিত্যিক ও শৈল্পিক মানদণ্ডে বিচার-বিশ্লেষণ করে তার সৌন্দর্য, উৎকর্ষ, অন্তর্নিহিত ত্রুটি এবং সাহিত্যিক মূল্য নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক শাস্ত্র।
সমালোচক ড. শওকী দাইফ বলেন: «النقد الأدبي هو دراسة النصوص الأدبية وفحصها لتمييز جيدها من رديئها، وبيان قيمتها الفنية والإنسانية» — অর্থাৎ “সাহিত্য সমালোচনা হলো সাহিত্যিক পাঠ্যসমূহের এমন গভীর পাঠ ও পরীক্ষা, যার মাধ্যমে উত্তম ও অধমের পার্থক্য নির্দেশ করা যায় এবং তার শৈল্পিক ও মানবিক মূল্য নিরূপণ করা হয়।”
সাহিত্য সমালোচনার মূল উদ্দেশ্যসমূহ:
- সাহিত্যের উৎকর্ষ (জায়্যিদ) ও অপকর্ষ (রাদী)-এর বিভাজন স্পষ্ট করা।
- লেখকের ভাব ও দর্শনের অন্তর্নিহিত অর্থ উন্মোচন করে সাধারণ পাঠকের কাছে সহজবোধ্য করা।
- নতুন সাহিত্য সৃষ্টিকে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা।
٩- اكتب خصائص النثر العربى الحديث موجزا-
[৯. আধুনিক আরবি গদ্যের বৈশিষ্ট্যাবলি সংক্ষেপে লেখ।]
উত্তর:
ভূমিকা:
আধুনিক আরবি গদ্য মধ্যযুগীয় কৃত্রিম মিলযুক্ত ছন্দ (السجع المتكلف) ও বাহুল্য অলঙ্কার ত্যাগ করে বক্তব্যপ্রধান ও প্রাঞ্জল রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।
প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি:
- সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষা (السهولة والوضوح): জটিল ও দুর্বোধ্য আভিধানিক শব্দের পরিবর্তে সমকালীন আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা (الفصحى المعاصرة) গ্রহণ।
- সাজ’ ও কৃত্রিমতামুক্তি (التخلص من السجع المتكلف): বক্তব্যকে কৃত্রিম অন্ত্যমিলের শৃঙ্খলে না বেঁধে বিষয়বস্তুর স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহকে প্রাধান্য দান।
- নতুন সাহিত্য রূপের আবির্ভাব (ظهور الفنون النثرية الحديثة): ছোটগল্প, আধুনিক উপন্যাস, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নাটক এবং সাহিত্যিক প্রবন্ধ (المقالة)-এর যুগান্তকারী সংযোজন।
- বাস্তবতা ও সামাজিক অঙ্গীকার (الواقعية والالتزام الاجتماعي): গণমানুষের দৈনন্দিন সংকট, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং নারী অধিকারের মতো বিষয়াবলিকে গদ্যের প্রধান উপজীব্য করা।
١٠- عرف المسرحية والرواية-
[১০. الرواية ও المسرحية এর সংজ্ঞা দাও।]
উত্তর:
১. আল-মাসরাহিয়্যাহ (المسرحية – নাটক)-এর সংজ্ঞা:
নাটক হলো এমন একটি সাহিত্যিক রূপ, যা পাত্র-পাত্রীর সংলাপ ও পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো একটি দ্বন্দ্বমূলক ঘটনাকে দর্শকের সামনে জীবন্তভাবে মঞ্চে রূপায়িত করার উদ্দেশ্যে রচিত হয়। এতে প্লট, চরিত্রায়ন, সংলাপ, দ্বন্দ্ব (الصراع) এবং ক্লাইম্যাক্স অপরিহার্য উপাদান। নাটকের আবেদন মূলত দৃশ্যমান অভিনয়ের ওপর নির্ভরশীল।
২. আর-রিওয়ায়াহ (الرواية – উপন্যাস)-এর সংজ্ঞা:
উপন্যাস হলো সাহিত্যের দীর্ঘতম ও সবচেয়ে বিস্তৃত কল্পকাহিনিনির্ভর গদ্যকলা, যাতে মানবজীবনের এক বা একাধিক চরিত্রের সুদীর্ঘ জীবনের কাহিনী, পারিপার্শ্বিক সমাজ, সময় এবং বহুবিধ ঘটনার বিস্তারিত ও বাস্তবসম্মত আখ্যান তুলে ধরা হয়। এতে চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক ক্রমবিকাশ এবং কাহিনীর জটিল বিন্যাস বিশদ পরিসরে বর্ণিত হয়।
١١- من هو أمير الشعراء فى الأدب العربى؟ ومتى لقب به؟
[১১. আরবি সাহিত্যে কবিসম্রাট কে? তাঁকে কখন এ উপাধি দেয়া হয়?]
উত্তর:
১. পরিচয়:
আধুনিক আরবি সাহিত্যে ‘আমিরুশ শুয়ারা’ (أمير الشعراء) বা কবিসম্রাট হলেন বিশ্বখ্যাত মিসরীয় কবি **আহমদ শাওকী** (أحمد شوقي: ১৮৬৮-১৯৩২ খ্রি.)। তিনি আধুনিক আরবি কবিতার নিও-ক্লাসিক্যাল ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ স্থপতি এবং আধুনিক আরবি গীতিনাট্যের জনক।
২. উপাধি প্রাপ্তির সময় ও প্রেক্ষাপট:
১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কায়রোতে সমগ্র আরব বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের এক ঐতিহাসিক মহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেই মহা সম্মেলনে লেবাননের বিখ্যাত কবি খলিল মুতরান (خليل مطران), হাফিজ ইবরাহিম সহ সমকালীন সকল প্রতিনিধি সর্বসম্মতভাবে আহমদ শাওকীকে আরবি কবিতার শীর্ষনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে **’আমিরুশ শুয়ারা’ (أمير الشعراء)** উপাধিতে ভূষিত করেন। অনুষ্ঠানে হাফিজ ইবরাহিম তাঁর বিখ্যাত চরণে শাওকীকে অভিবাদন জানান:
«أَمِيرَ القَوَافِي قَدْ أَتَيْتُ مُبَايِعًا * وَهَذِي وُفُودُ الشَّرْقِ قَدْ بَايَعَتْ مَعِي»
(হে কবিতার সম্রাট! আমি আজ আপনার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করতে এসেছি, আর এই দেখুন প্রাচ্যের সকল প্রতিনিধি দল আমার সাথে সমবেতভাবে আপনার হাতে আনুগত্য প্রকাশ করছে)।
١٢- من حاز على جائزة نوبل فى الأدب العربى؟ وعلى أي تأليفه؟
[১২. আরবি সাহিত্যে কে এবং কোন গ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন?]
উত্তর:
১. নোবেলজয়ী সাহিত্যিক:
আরবি সাহিত্যে সর্বপ্রথম এবং আজ পর্যন্ত একমাত্র সাহিত্যিক হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন মিসরের বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক ও গল্পকার **নাজীব মাহফূয** (نجিব মাহফুজ – نجيب محفوظ: ১৯১১-২০০৬ খ্রি.)।
২. নোবেল প্রাপ্তির সাল ও কারণ/গ্রন্থ:
নাজীব মাহফূয **১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে** সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল একাডেমি তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্মের সামগ্রিক উৎকর্ষের জন্য এ পুরস্কার প্রদান করলেও বিশেষ করে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস সংকলন **’কায়রো ট্রিলজি’ বা ‘আল-ছুলাছিয়্যাহ’ (الثلاثية)**—যার অন্তর্ভুক্ত হলো বাইনাল কাসরাইন, কাসরুশ শাওক ও আস-সুক্কারিয়্যাহ—এবং তাঁর রূপক উপন্যাস **’আওলাদু হারাতিনা’ (أولاد حارتنا)**-কে তাঁর এই বিশ্বজয়ী স্বীকৃতির মূল ভিত্তি হিসেবে মূল্যায়ন করে। সুইডিশ একাডেমি তাদের প্রশংসাপত্রে উল্লেখ করে: “নাজীব মাহফূয এমন এক আরবীয় আখ্যানকলার স্রষ্টা যা সূক্ষ্ম দূরদৃষ্টি ও বাস্তবসম্মত স্পষ্টতায় সমগ্র মানবজাতির জন্য এক সার্বজনীন আবেদন তৈরি করেছে।”
١٣- علق على : ممارسة الأدب العربى فى بنغلاديش-
[১৩. বাংলাদেশে আরবি সাহিত্য চর্চার উপর একটি টীকা লেখ।]
উত্তর:
ভূমিকা:
বাংলাদেশে আরবি ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ইতিহাস এ ভূখণ্ডে ইসলামের আগমন ও সূফী-সাধকদের দাওয়াতী কাফেলা আগমনের সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভৌগোলিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও বাঙালি মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগ ও জ্ঞানতৃষ্ণা এ দেশে আরবি সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বিনির্মাণ করেছে।
বাংলাদেশে আরবি সাহিত্য চর্চার প্রধান ক্ষেত্রসমূহ:
- মাদ্রাসা শিক্ষার অবদান: প্রাচীনকাল থেকেই এ দেশে কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসাসমূহ আরবি সাহিত্যের প্রধান দুর্গ হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ‘দারুল হাদিস’ ও ফাজিল-কামিল মাদ্রাসাসমূহে জাহেলী, উমাইয়্যা ও আব্বাসীয় যুগের ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের পাশাপাশি আধুনিক সাহিত্য নিয়মিত পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
- বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের উচ্চতর গবেষণা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (প্রতিষ্ঠা ১৯২১ খ্রি.), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগসমূহে আন্তর্জাতিক মানের আরবি সাহিত্য চর্চা ও গবেষণা সম্পাদিত হচ্ছে। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং ড. সিরাজুল হকের মতো মনীষীগণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাদৃত আরবি গবেষণা সম্পন্ন করেছেন।
- আরবি পত্রিকা ও প্রকাশনা: বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত উচ্চমানের আন্তর্জাতিক আরবি সাময়িকী প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে। যেমন: ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘আল-হুদা’ (الهدى), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মাজাল্লাতুল কিবলাহ’ (مجلة القبلة), এবং বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে প্রকাশিত আরবি দেয়ালপত্রিকা ও ত্রৈমাসিক জার্নাল তরুণদের মধ্যে বিশুদ্ধ আরবি রচনার প্রেরণা যোগাচ্ছে।
- আরবি রচনা ও সাহিত্য সৃষ্টি: বাংলাদেশি আলেম ও গবেষকগণ বহু উচ্চমানের আরবি কিতাব, তাফসীর ও কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)-এর বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান এবং আধুনিক গবেষকগণের মৌলিক আরবি গ্রন্থাবলি আরব বিশ্বের বিদগ্ধ মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
উপসংহার:
বাংলাদেশে আরবি সাহিত্য কেবল ধর্মীয় প্রয়োজন মেটানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আরব বিশ্বের সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের এক শক্তিশালী সেতুবন্ধন হিসেবে বিকশিত হচ্ছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. আধুনিক আরবি সাহিত্যের সূচনা কোন ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে ঘটেছিল?
১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের নেতৃত্বে ফরাসি বাহিনীর মিসর অভিযানের মাধ্যমে আরব বিশ্বে পাশ্চাত্য শিক্ষা, ছাপাখানা ও আধুনিক চিন্তাধারার অভিঘাত ঘটে, যা আধুনিক আরবি সাহিত্যের সূচনাবিন্দু হিসেবে স্বীকৃত।
২. আরবি সাহিত্যের ইতিহাস-৩ বিষয়ের বিষয় কোড কত?
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের আরবি সাহিত্যের ইতিহাস-৩ বিষয়ের বিষয় কোড হলো ২০৪৪০৮।
৩. আরবি সাহিত্যে ‘আমিরুশ শুয়ারা’ বা কবিসম্রাট কাকে বলা হয়?
আধুনিক আরবি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক্যাল কবি ও গীতিনাট্যের জনক মিসরের আহমদ শাওকী (أحمد شوقي)-কে ১৯২৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সমগ্র আরব বিশ্বের পক্ষ থেকে ‘আমিরুশ শুয়ারা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
৪. আরবি সাহিত্যে সর্বপ্রথম নোবেল পুরস্কার কে এবং কবে লাভ করেন?
মিসরের বিশ্বখ্যাত কথাসাহিত্যিক নাজীব মাহফূয (نجيب محفوظ) ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে আরবি সাহিত্যের প্রথম এবং একমাত্র লেখক হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।
৫. আরবি নাটকের ইতিহাসে তাওফিক আল-হাকিম কোন ধারার প্রবর্তক?
তাওফিক আল-হাকিম আরবি নাট্যসাহিত্যে ‘আল-মাসরাহ আয-যিহনী’ (المسرح الذهني) বা বুদ্ধিবৃত্তিক নাট্যরীতির প্রবর্তক, যার সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো তাঁর ঐতিহাসিক নাটক ‘আহলুল কাহাফ’ (أهل الكهف)।
৬. ‘শুআরাউল মাহজার’ (شعراء المهجر) বলতে কাদের বোঝানো হয়?
উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের শুরুতে উসমানীয় শাসন ও দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে সিরিয়া ও লেবানন ছেড়ে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় পাড়ি জমানো অভিবাসী আরব কবি ও সাহিত্যিকদের ‘শুআরাউল মাহজার’ বলা হয়, যাঁদের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ছিলেন জীবরান খলিল জীবরান ও মিখাইল নুআইমাহ।