পরীক্ষা কোড: ২০৩ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৮০
اختبار السنة الثالثة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۳ م
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৩
الحديث والدراسات الإسلامية (আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ)
الصحيح لمسلم (আস সহীহ লি মুসলিম)
বিষয় কোড: ২০২৩০২
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
الملاحظة : اجب عن خمسة من مجموعة (أ) وعن واحد من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য: (ক) অংশ থেকে পাঁচটি এবং (খ) অংশ থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) [ক অংশ] (মান: ৫ × ১৪ = ৭০)
১ নম্বর প্রশ্ন
عَنْ ابْنِ عُمَرَ (رض) قَالَ : كَانَ أَهْلُ الْجَاهِلِيَّةِ يَتَبَايَعُوْنَ لَحْمَ الْجَزُوْرِ إِلَى حَبَلِ الْحَبَلَةِ، وَحَبَلُ الْحَبَلَةِ أَنْ تُنْتَجَ النَّاقَةُ ثُمَّ تَحْمِلَ الَّتِيْ نُتِجَتْ فَنَهَاهُمْ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ ذٰلِكَ –
(أ) مَا مَعْنَى الْبَيْعِ لُغَةً وَشَرْعًا؟ وَكَمْ قِسْمًا لَهُ؟ بَيِّنْ –
(ب) مَا الْفَرْقُ بَيْنَ الْبَيْعِ الْبَاطِلِ وَالْبَيْعِ الْفَاسِدِ؟ فَصِّلْ –
[১. আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: জাহেলি যুগের লোকেরা উটের গোশত ‘হাবালুল হাবালাহ’ মেয়াদে বেচাকেনা করত। ‘হাবালুল হাবালাহ’ হলো কোনো গর্ভবতী উষ্ট্রী সন্তান প্রসব করবে, অতঃপর সেই গর্ভজাত সন্তান বড় হয়ে পুনরায় গর্ভধারণ করবে (ততদিন পর্যন্ত বাকিতে ক্রয়-বিক্রয় চলত)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে এ ধরনের বেচাকেনা করতে নিষেধ করেছেন।]
[(ক) বায় (ক্রয়-বিক্রয়)-এর আভিধানিক ও শরয়ি অর্থ কী? এটি কত প্রকার? বর্ণনা কর।]
[(খ) বায়ে বাতিল ও বায়ে ফাসিদের মধ্যে পার্থক্য কী? বিস্তারিত লেখ।]
(ক) বায় (البيع)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ এবং প্রকারভেদ
আভিধানিক অর্থ: আরবি ‘বায়’ (البيع) শব্দটি ‘বা’উন’ (হাত প্রসারিত করা) থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ বিনিময় করা (المبادلة), ক্রয়-বিক্রয় করা এবং এক বস্তু দিয়ে অন্য বস্তু গ্রহণ করা।
পারিভাষিক অর্থ: ফিকহের পরিভাষায়, উভয়পক্ষের পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে মালের বিনিময়ে মালের মালিকানা হস্তান্তর করাকে ‘বায়’ বা ক্রয়-বিক্রয় বলা হয় (مبادلة مال بمال بالتراضي
)।
বায়ের প্রধান প্রকারভেদ: ফিকহে ইসলামিতে মূল্যের আদান-প্রদানের ভিত্তিতে বায় চার প্রকার:
- বায় মুকায়াযা (بيع المقايضة): পণ্যের বিনিময়ে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় (দ্রব্য বিনিময় প্রথা বা Barter system)।
- বায় সরফ (بيع الصرف): মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা বা স্বর্ণ-রৌপ্যের বিনিময় (Currency exchange)।
- বায় সালাম (بيع السلم): অগ্রিম মূল্যে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সরবরাহের ক্রয়-বিক্রয়।
- বায় মুতলাক (البيع المطلق): সাধারণ নগদ বা বাকিতে মুদ্রার বিনিময়ে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়।
(খ) বায়ে বাতিল (البيع الباطل) ও বায়ে ফাসিদ (البيع الفاسد)-এর মধ্যকার পার্থক্য
| তুলনার বিষয় | বায়ে বাতিল (Void Sale) | বায়ে ফাসিদ (Irregular/Voidable Sale) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | যে বেচাকেনায় বায়ের মূল ভিত্তি (আসল বা রুকন) অথবা বিষয়বস্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ। | যে বেচাকেনায় মূল ভিত্তি ও পণ্য হালাল কিন্তু কোনো অবৈধ শর্ত বা গুণগত ত্রুটি যুক্ত হয়েছে। |
| দৃষ্টান্ত | মদ, শূকর, মৃত প্রাণী বা মুক্ত মানুষের ক্রয়-বিক্রয়; অথবা অপ্রাপ্তবয়স্ক পাগলের চুক্তি। | অজ্ঞাত মূল্যে বা অজ্ঞাত মেয়াদে বেচাকেনা, যাতে প্রতারণার অবকাশ থাকে। |
| মালিকানা স্বত্ব | পণ্যের ওপর ক্রেতার কোনো মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না; দখল করলেও তা অবৈধ থাকে। | ক্রেতা পণ্য হস্তগত (কবজা) করলে শর্তসাপেক্ষে খবিস মালিকানা লাভ করে এবং মূল্য দেওয়া ওয়াজিব হয়। |
| চুক্তির বৈধতা ফিরিয়ে আনা | কোনো অবস্থাতেই এটি বৈধ করার সুযোগ নেই; চুক্তি গোড়া থেকেই বাতিল। | ত্রুটিপূর্ণ অবৈধ শর্তটি বাতিল করে পুনরায় চুক্তি সংশোধন করা সম্ভব। |
২ নম্বর প্রশ্ন
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ (رض) قَالَ نَهَى رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْمُحَاقَلَةِ وَالْمُزَابَنَةِ وَالْمُخَابَرَةِ وَعَنْ بَيْعِ الثَّمَرِ حَتَّى يَبْدُوَ صَلَاحُهُ وَلَا يُبَاعُ إِلَّا بِالدِّيْنَارِ وَالدِّرْهَمِ إِلَّا الْعَرَايَا –
(أ) مَا مَعْنَى الْمُحَاقَلَةِ وَالْمُزَابَنَةِ وَالْمُخَابَرَةِ؟ بَيِّنْ مُوَضَّحًا –
(ب) مَا مَعْنَى الْعَرَايَا لُغَةً وَشَرْعًا؟ وَمَا حُكْمُ الْبَيْعِ بِالْعَرَايَا؟
[২. জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাকালাহ, মুযাবানাহ ও মুখাবারাহ করতে নিষেধ করেছেন এবং ফল পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পূর্বে তা বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। আর স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) ও রৌপ্যমুদ্রা (দিরহাম) ব্যতীত ফল বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন; তবে ‘আরায়া’ এর ব্যতিক্রম।]
[(ক) মুহাকালাহ, মুযাবানাহ ও মুখাবারাহ-এর অর্থ কী? সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা কর।]
[(খ) আরায়ার আভিধানিক ও শরয়ি অর্থ কী? বায়ে আরায়ার বিধান কী?]
(ক) মুহাকালাহ, মুযাবানাহ ও মুখাবারাহ-এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা
- মুহাকালাহ (المحاقلة): ক্ষেতে থাকা কাঁচা বা দাঁড়িয়ে থাকা শিষের ফসলকে নির্দিষ্ট পরিমাপকৃত শুকনা খাদ্যশস্যের (যেমন গম) বিনিময়ে অনুমান করে বিক্রি করা। এটি নিষিদ্ধ কারণ এতে পরিমাণের অসমতা ও সুদের (রিবা আল-ফাদল) প্রবল সম্ভাবনা থাকে।
- মুযাবানাহ (المزابنة): গাছের কাঁচা খেজুর বা আঙুরকে মাটিতে থাকা শুষ্ক খেজুর বা কিসমিসের বিনিময়ে অনুমান করে বিক্রয় করা। এটিও অনিশ্চয়তা ও সুদের কারণে নিষিদ্ধ।
- মুখাবারাহ (المخابرة): জমির উৎপন্ন ফসলের একটি নির্দিষ্ট অংশের (যেমন এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ) শর্তে বর্গা বা চাষাবাদে জমি প্রদান করা; বিশেষ করে জমির কোনো নির্দিষ্ট অংশের ফলন নিজের জন্য খাস করে নেওয়া।
(খ) ‘আরায়া’ (العرايا)-এর পরিচয় ও শরয়ি বিধান
আভিধানিক অর্থ: ‘আরায়া’ শব্দটি ‘আরিয়্যাহ’ (العريّة)-এর বহুবচন; যার অর্থ উপহার বা দানকৃত বস্তু।
পারিভাষিক অর্থ: কোনো দরিদ্র ব্যক্তিকে কেউ একটি খেজুর গাছ ফল খাওয়ার জন্য দান করেছিল, কিন্তু বাগানে ঘন ঘন দরিদ্র ব্যক্তির আসা-যাওয়া গৃহকর্তার পরিবারে পর্দা বা অস্বস্তির কারণ হতো। তাই আনুমানিক পরিমাপে গাছের কাঁচা খেজুরের সমপরিমাণ শুকনা খেজুর দরিদ্র ব্যক্তিকে প্রদান করে গাছটি মুক্ত করে নেওয়াকে ‘বায়ে আরায়া’ বলা হয়।
শরয়ি বিধান: সাধারণ অবস্থায় কাঁচা খেজুরের বিনিময়ে শুকনা খেজুর বিক্রি করা নিষিদ্ধ হলেও, গরিবের প্রয়োজন ও দাতাদের স্বস্তির স্বার্থে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঁচ ওসাক (প্রায় ৬০০-৭৫০ কেজি) বা তার কম পরিমাণে বায়ে আরায়াকে বিশেষ অনুমতি (রুখসত) দিয়েছেন।
৩ নম্বর প্রশ্ন
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ (رض) قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنِ ابْتَاعَ طَعَامًا فَلَا يَبِعْهُ حَتَّى يَكْتَالَهُ – فَقُلْتُ لِابْنِ عَبَّاسٍ : لِمَ؟ فَقَالَ أَلَا تَرَاهُمْ يَتَبَايَعُوْنَ بِالذَّهَبِ وَالطَّعَامُ مُرْجَأٌ – وَلَمْ يَقُلْ أَبُوْ كُرَيْبٍ مُرْجَأً –
(أ) هَلْ يَجُوْزُ بَيْعُ الْمَبِيْعِ قَبْلَ الْقَبْضِ؟
(ب) اكْتُبْ نُبْذَةً عَنْ حَيَاةِ سَيِّدِنَا عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا –
[৩. ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি কোনো খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করে, সে যেন তা পূর্ণরূপে মেপে হস্তগত (দখল) করার পূর্বে পুনরায় বিক্রি না করে। বর্ণনাকারী বলেন, আমি ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করলাম: কেন এ নিষেধ? তিনি বললেন: তুমি কি দেখছ না যে তারা স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বেচাকেনা করছে অথচ খাদ্য স্থগিত (হস্তান্তরহীন) রয়েছে!]
[(ক) পণ্য হস্তগত (কবজা) করার পূর্বে বিক্রি করা কি জায়েয?]
[(খ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর জীবনী সংক্ষেপে লেখ।]
(ক) পণ্য হস্তগত (কবজা) করার পূর্বে বিক্রির বিধান
ফিকহের দৃষ্টিতে পণ্য হস্তগত করার পূর্বে তা পুনরায় বিক্রি করার বিধানে উলামায়ে কেরামের মতামত নিম্নরূপ:
- খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে: সকল মুজতাহিদ ফকিহের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করার পর তা নিজের আয়ত্তে ও দখলে নেওয়ার পূর্বে তৃতীয় কারও কাছে বিক্রি করা সম্পূর্ণ হারাম ও বাতিল। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট নিষেধ করেছেন।
- খাদ্যদ্রব্য ব্যতীত সাধারণ অস্থাবর পণ্যের ক্ষেত্রে: ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমদ (র.)-এর মতে, যে কোনো অস্থাবর পণ্য (স্থাবর জমিজমা ব্যতীত) কবজা করার পূর্বে পুনরায় বিক্রি করা নাজায়েয। কারণ এতে ‘গারার’ (অনিশ্চয়তা) এবং এমন মালের লাভ গ্রহণের সুযোগ থাকে যার ঝুঁকি ক্রেতা নিজে বহন করেনি।
- স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে (জমি ও বাড়িঘর): ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফের মতে, স্থাবর সম্পত্তি ধ্বংস বা পালিয়ে যাওয়ার ভয় না থাকায় হস্তান্তরের পূর্বে বিক্রি করা জায়েয; তবে ইমাম শাফেঈর মতে কোনো পণ্যই কবজার পূর্বে বিক্রি করা সমীচীন নয়।
(খ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর জীবন সংক্ষেপ
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় চাচাতো ভাই। তিনি অসাধারণ ধীশক্তি ও কুরআনের গভীর জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিলেন। উমর ফারুক (রা.) তাঁকে বদরি সাহাবিদের মজলিসে শূরার বিশেষ স্থান দিতেন এবং ‘ফাতাল কুহূল’ (প্রবীণ জ্ঞানীদের সমকক্ষ যুবক) উপাধিতে ডাকতেন। তিনি বহু সাহাবি ও তাবেয়ীদের শিক্ষক ছিলেন। ৬৮ হিজরিতে তায়েফে ইন্তেকাল করেন।
৪ নম্বর প্রশ্ন
عَنْ عَائِشَةَ (رض) قَالَتْ اشْتَرَى رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ يَهُوْدِيٍّ طَعَامًا بِنَسِيْئَةٍ وَأَعْطَاهُ دِرْعًا لَهُ رَهْنًا –
(أ) مَا مَعْنَى الرَّهْنِ لُغَةً وَشَرْعًا؟ وَمَا حُكْمُ الْبَيْعِ بِالنَّسِيْئَةِ؟
(ب) كَمْ صَاعًا مِنَ الطَّعَامِ أَخَذَ الرَّسُوْلُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ يَهُوْدِيٍّ وَمَا اسْمُهُ؟
[৪. আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ইহুদির কাছ থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদের বাকিতে কিছু খাদ্যশস্য ক্রয় করেছিলেন এবং নিজের একটি লৌহবর্ম তার নিকট বন্ধক রেখেছিলেন।]
[(ক) বন্ধক (রাহন)-এর আভিধানিক ও শরয়ি অর্থ কী? বাকিতে বেচাকেনার বিধান কী?]
[(খ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদির নিকট থেকে কত সা’ খাদ্য গ্রহণ করেছিলেন এবং সেই ইহুদির নাম কী ছিল?]
(ক) রাহন (বন্ধক)-এর অর্থ এবং বাকিতে বিক্রির বিধান
রাহন (الرهن)-এর অর্থ: আভিধানিক অর্থে রাহন হলো আবদ্ধ রাখা (الحبس) বা স্থায়ী করা। শরীয়তের পরিভাষায়, পাওনাদারের হক সুরক্ষার নিশ্চয়তাস্বরূপ ঋণের বিপরীতে কোনো আর্থিক মূল্যমানসম্পন্ন বস্তুকে জামানত হিসেবে আটকে রাখাকে রাহন বা বন্ধক বলে।
বাকিতে বিক্রির বিধান (البيع بالنسيئة): মূল্য পরিশোধের জন্য সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে বাকিতে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা সম্পূর্ণ বৈধ ও জায়েয। তবে মেয়াদ অস্পষ্ট বা অজ্ঞাত থাকা যাবে না।
(খ) ইহুদির নাম ও গৃহীত খাদ্যের পরিমাণ
- খাদ্যের পরিমাণ: সহীহ বুখারী ও অন্যান্য হাদিসের প্রামাণ্য বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ পরিবারের জন্য ৩০ সা’ (صاعًا) যব (শস্য) বাকিতে ক্রয় করেছিলেন।
- ইহুদির নাম: প্রখ্যাত সিরাত ও হাদিস ব্যাখ্যাকারগণের মতে উক্ত ইহুদির নাম ছিল ‘আবুশ শাহম আল-জাফরী’ (أبو الشحم الظفري)। রাসুলুল্লাহর ওফাতের সময়ও তাঁর লৌহবর্মটি এই ইহুদির কাছে বন্ধক রাখা ছিল, যা পরবর্তীতে হযরত আবু বকর (রা.) বাইতুল মাল থেকে মূল্য পরিশোধ করে মুক্ত করেন। এটি রাসুলুল্লাহর চরম অনাড়ম্বর জীবনের অনন্য প্রতীক।
৫ নম্বর প্রশ্ন
عَنْ أَبِي سَعِيْدٍ الْخُدْرِيِّ (رض) أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : لَا تَبِيْعُوا الذَّهَبَ بِالذَّهَبِ إِلَّا مِثْلًا بِمِثْلٍ وَلَا تُشِفُّوْا بَعْضَهَا عَلَى بَعْضٍ وَلَا تَبِيْعُوا الْوَرِقَ بِالْوَرِقِ إِلَّا مِثْلًا بِمِثْلٍ وَلَا تُشِفُّوْا بَعْضَهَا عَلَى بَعْضٍ وَلَا تَبِيْعُوْا مِنْهَا غَائِبًا بِنَاجِزٍ –
(أ) عَرِّفِ الرِّبَا – ثُمَّ بَيِّنْ عِلَّةَ الرِّبَا فِي الْأَمْوَالِ الرِّبَوِيَّةِ –
(ب) أَوْضِحْ قَوْلَ الرَّسُوْلِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : “وَلَا تَبِيْعُوْا مِنْهَا غَائِبًا بِنَاجِزٍ” –
[৫. আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: তোমরা স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি করো না সমান সমান ব্যতীত, এবং একের ওপর অন্যকে বাড়িয়ে দিও না। আর রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য বিক্রি করো না সমান সমান ব্যতীত, এবং একের ওপর অন্যকে বাড়িয়ে দিও না। আর অনুপস্থিত (বাকি) বস্তুর বিনিময়ে উপস্থিত (নগদ) বিক্রি করো না।]
[(ক) সুদের সংজ্ঞা দাও। অতঃপর সুদি পণ্যে সুদের মূল কার্যকর কারণ (ইল্লত) বর্ণনা কর।]
[(খ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “অনুপস্থিত বস্তুর বিনিময়ে উপস্থিত বিক্রি করো না”—এর ব্যাখ্যা দাও।]
(ক) রিবা (সুদ)-এর সংজ্ঞা ও সুদের ইল্লত
সুদের সংজ্ঞা: আভিধানিক অর্থে রিবা হলো বৃদ্ধি পাওয়া বা অতিরিক্ত হওয়া। শরীয়তের পরিভাষায়, শরয়ি কোনো বিনিময় ব্যতীত চুক্তিতে অতিরিক্ত কোনো শর্তযুক্ত মাল গ্রহণ করাকে রিবা বা সুদ বলে।
সুদি পণ্যে সুদের ইল্লত (কার্যকর কারণ): হাদিসে ছয়টি সুদি মালের কথা বলা হয়েছে: স্বর্ণ, রৌপ্য, গম, যব, খেজুর ও লবণ। এগুলোতে সুদের ইল্লত নিয়ে ফকিহদের মাঝে বিভিন্ন মতামত রয়েছে:
- হানাফী মাযহাবের মতে: সুদের ইল্লত হলো পণ্যটি ওজনযোগ্য (ওজনি) অথবা পরিমাপযোগ্য (কায়লি) হওয়া এবং সাথে জাতীয় ঐক্য (একই জাতের) থাকা।
- শাফেঈ মাযহাবের মতে: স্বর্ণ-রৌপ্যের ক্ষেত্রে মূল্যমান (ছামানিয়্যাত) এবং অবশিষ্ট চারটিতে মানুষের প্রধান খাদ্য ও পুষ্টিগুণ (তু’ম) হওয়া।
- মালেকী মাযহাবের মতে: খাদ্য হওয়া এবং যা সংরক্ষণ করে রাখা যায় (ইদ্দিকার ও ইকতিয়াত)।
(খ) “অনুপস্থিতের বিনিময়ে উপস্থিত বিক্রি করো না”-এর ব্যাখ্যা
স্বর্ণ ও রৌপ্যের মতো মুদ্রাজাতীয় পণ্য বা একই জাতীয় সুদি পণ্যের বিনিময়ে লেনদেন করতে হলে দুটি মৌলিক শর্ত পূরণ করা অপরিহার্য: (১) পরিমাণের সমতা (مثلًا بمثل) এবং (২) মজলিসেই উভয় পক্ষের হাতবদল বা নগদ হওয়া (يدًا بيد)। যদি এক পক্ষ নগদ দেয় আর অন্য পক্ষ বাকি রাখে (غائبًا بناجز), তবে তা ‘রিবা আন-নাসিয়া’ (মেয়াদি সুদ)-এ পরিণত হবে, যা শরীয়তে সম্পূর্ণ হারাম।
৬ নম্বর প্রশ্ন
عَنْ عُبَيْدِ بْنِ عُمَيْرٍ (رض) قَالَ : قَالَتْ أُمُّ سَلَمَةَ لَمَّا مَاتَ أَبُوْ سَلَمَةَ قُلْتُ غَرِيْبٌ وَفِيْ أَرْضِ غُرْبَةٍ لَأَبْكِيَنَّهُ بُكَاءً يُتَحَدَّثُ عَنْهُ فَكُنْتُ قَدْ تَهَيَّأْتُ لِلْبُكَاءِ عَلَيْهِ إِذْ أَقْبَلَتِ امْرَأَةٌ مِنَ الصَّعِيْدِ تُرِيْدُ أَنْ تُسْعِدَنِيْ فَاسْتَقْبَلَهَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَالَ : أَتُرِيْدِيْنَ أَنْ تُدْخِلِي الشَّيْطَانَ بَيْتًا أَخْرَجَهُ اللهُ مِنْهُ مَرَّتَيْنِ فَكَفَفْتُ عَنِ الْبُكَاءِ فَلَمْ أَبْكِ –
(أ) مَا حُكْمُ الْبُكَاءِ عَلَى الْمَيِّتِ؟ فَصِّلْ –
(ب) بَيِّنْ أَرْكَانَ صَلَاةِ الْجَنَازَةِ مُدَلَّلًا –
[৬. উবাইদ ইবনে উমাইর (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: উম্মে সালামা (রা.) বলেছেন: যখন আবু সালামা (রা.) ইন্তেকাল করলেন, আমি ভাবলাম—তিনি তো প্রবাসী এবং পরবাসের মাটিতে মৃত্যুবরণ করেছেন, আমি তাঁর জন্য এমন কান্নাকাটি করব যা মানুষের মুখে মুখে আলোচিত হবে। আমি তাঁর জন্য কান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, এমন সময় এক গ্রাম্য মহিলা আমাকে কান্নাকাটিতে সঙ্গ দিতে এগিয়ে আসল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুখোমুখি হয়ে বললেন: আল্লাহ যে ঘর থেকে বিতাড়িত করেছেন, তোমরা কি পুনরায় সেখানে শয়তানকে প্রবেশ করাতে চাও? এ কথা শুনে আমি কান্না সংবরণ করলাম এবং আর কাঁদিনি।]
[(ক) মৃতের জন্য কান্নাকাটির শরয়ি বিধান কী? বিস্তারিত আলোচনা কর।]
[(খ) দলিলের আলোকে জানাজার সালাতের রুকনসমূহ বর্ণনা কর।]
(ক) মৃতের জন্য কান্নাকাটির শরয়ি বিধান
মৃত ব্যক্তির শোকে কান্নাকাটি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত:
- জায়েয ও প্রশংসনীয় কান্না: কোনো বিলাপ বা চিৎকার ছাড়া অন্তরের গভীর ব্যথায় চোখ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে অশ্রু প্রবাহিত হওয়া সম্পূর্ণ জায়েয ও মানবিক রহমতের অংশ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় পুত্র ইব্রাহিমের ওফাতের সময় কেঁদে বলেছিলেন:
إِنَّ الْعَيْنَ تَدْمَعُ، وَالْقَلْبَ يَحْزَنُ، وَلَا نَقُولُ إِلَّا مَا يَرْضَى رَبُّنَا
(চক্ষু অশ্রুসজল হয়, অন্তর ব্যথিত হয়, তবে আমরা তা-ই বলি যাতে আমাদের রব সন্তুষ্ট হন)। - হারাম ও নিষিদ্ধ কান্না: জাহেলি যুগের মতো বুক চাপড়ানো, চুল ছেঁড়া, জামার কলার ছেঁড়া এবং চিৎকার করে হায়-হুতাশ ও বিলাপ (নিয়াহা) করা সর্বসম্মতভাবে হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি গালে চপেটাঘাত করে, পোশাক ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলি যুগের মতো চিৎকার করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”
(খ) জানাজার সালাতের রুকনসমূহ
হানাফী ফিকহের আলোকে জানাজার নামাজের মূল রুকন দুটি:
- চারটি তাকবীর বলা (التكبيرات الأربع): প্রতিটি তাকবীর সাধারণ সালাতের এক একটি রাকাতের স্থলাভিষিক্ত। চার তাকবীরের কোনো একটি ছুটে গেলে সালাত সহীহ হবে না।
- দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করা (القيام): ওজর ছাড়া বসে বা সওয়ারিতে জানাজার সালাত আদায় করা বৈধ নয়।
(অন্যান্য বিষয়াবলি যেমন আল্লাহর হামদ ও সানা, দরূদ শরীফ পাঠ এবং মৃতের জন্য দোয়া করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ)।
৭ নম্বর প্রশ্ন
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (رض) أَنَّهُ قَالَ نَعَى لَنَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ النَّجَاشِيَّ صَاحِبَ الْحَبَشَةِ فِي الْيَوْمِ الَّذِيْ مَاتَ فِيْهِ فَقَالَ : اسْتَغْفِرُوْا لِأَخِيْكُمْ – قَالَ ابْنُ شِهَابٍ : وَحَدَّثَنِيْ سَعِيْدُ بْنُ الْمُسَيَّبِ أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ حَدَّثَهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَفَّ بِهِمْ بِالْمُصَلَّى فَصَلَّى فَكَبَّرَ عَلَيْهِ أَرْبَعَ تَكْبِيْرَاتٍ –
(أ) مَا حُكْمُ صَلَاةِ الْجَنَازَةِ عَلَى الْغَائِبِ؟ وَمَا الْإِخْتِلَافُ فِيْهِ؟
(ب) هَلْ تَجُوْزُ صَلَاةُ الْجَنَازَةِ إِذَا كَانَ الْمَيِّتُ مَحْمُوْلًا عَلَى مَرْكَبٍ أَوْ عَلَى دَابَّةٍ؟
[৭. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আবিসিনিয়ার শাসক নাজ্জাশী যেদিন মৃত্যুবরণ করেন, সেদিনই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ দিয়ে বললেন: তোমাদের ভাইয়ের জন্য মাগফিরাত কামনা কর। ইবনে শিহাব বলেন, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব আমাকে হাদিস শুনিয়েছেন যে, আবু হুরায়রা (রা.) তাঁকে বলেছেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে ঈদগাহে কাতারবদ্ধ হলেন এবং চার তাকবীরের সাথে তাঁর গায়েবানা জানাজার সালাত আদায় করলেন।]
[(ক) গায়েবানা জানাজার শরয়ি বিধান কী এবং এ বিষয়ে ফকিহদের মতপার্থক্য কী?]
[(খ) মৃতদেহ যদি কোনো নৌকা/যানবাহন বা পশুর পিঠে থাকে, তবে তার জানাজা পড়া কি জায়েয?]
(ক) গায়েবানা জানাজার বিধান ও ফকিহগণের মতপার্থক্য
- ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমদ (র.)-এর মত: দূরবর্তী কোনো মুসলিম মৃত্যুবরণ করলে তার জন্য গায়েবানা জানাজা পড়া জায়েয ও সুন্নাত। দলিল হিসেবে তাঁরা রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক নাজ্জাশীর গায়েবানা জানাজা আদায়কে পেশ করেন।
- ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালেক (র.)-এর মত: গায়েবানা জানাজা সাধারণ ক্ষেত্রে জায়েয নেই। জানাজার জন্য মৃতদেহ উপস্থিত থাকা এবং ইমামের সামনে জমিনে রাখা শর্ত। নাজ্জাশীর ঘটনা ছিল রাসুলুল্লাহর জন্য একটি বিশেষ অলৌকিক ঘটনা; কারণ মুজিযাস্বরূপ জমিন সংকুচিত করে নাজ্জাশীর খাটিয়া রাসুলুল্লাহর চোখের সামনে উপস্থিত করা হয়েছিল। অন্য কোনো সাহাবির মৃত্যুর পর রাসুলুল্লাহ কখনো গায়েবানা জানাজা পড়েননি।
- ইবনে তাইমিয়া ও আধুনিক মুহাদ্দিসগণের সমন্বয়: যদি কোনো মুসলিম এমন স্থানে মারা যায় যেখানে তার জানাজা পড়ার কোনো সুযোগ হয়নি (যেমন সাগরে ডুবে যাওয়া বা কাফের দেশে মৃত্যু), তবে তার জন্য গায়েবানা জানাজা পড়া যাবে; কিন্তু যেখানে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে আর পুনরাবৃত্তি করা সমীচীন নয়।
(খ) যানবাহন বা পশুর পিঠে থাকা অবস্থায় জানাজা পড়ার বিধান
মৃতদেহ যদি কোনো চলন্ত বা স্থির যানবাহন (গাড়ি, ট্রেন, নৌকা) অথবা পশুর পিঠে থাকে, তবে জমিনে নামানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে অবস্থায় জানাজার সালাত আদায় করা মাকরূহে তাহরিমি বা নাজায়েয। কারণ সুন্নাত হলো মৃতদেহকে জমিনে কিবলার দিকে সামনে রাখা। তবে যদি পানিতে প্লাবিত থাকে বা এমন কোনো চরম অপারগতা থাকে যেখানে জমিনে লাশ নামানো অসম্ভব, তবে অনন্যোপায় অবস্থায় তা জায়েয হবে।
৮ নম্বর প্রশ্ন
عَنْ أَبِي قَتَادَةَ بْنِ رِبْعِيٍّ (رض) أَنَّهُ كَانَ يُحَدِّثُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُرَّ بِجَنَازَةٍ فَقَالَ : مُسْتَرِيْحٌ وَمُسْتَرَاحٌ مِنْهُ قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ! مَا الْمُسْتَرِيْحُ وَالْمُسْتَرَاحُ مِنْهُ؟ فَقَالَ : الْعَبْدُ الْمُؤْمِنُ يَسْتَرِيْحُ مِنْ نَصَبِ الدُّنْيَا وَالْعَبْدُ الْفَاجِرُ يَسْتَرِيْحُ مِنْهُ الْعِبَادُ وَالْبِلَادُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ –
(أ) بَيِّنْ حُكْمَ قِرَاءَةِ الْفَاتِحَةِ فِي صَلَاةِ الْجَنَازَةِ –
(ب) مَنْ فَاتَهُ بَعْضُ تَكْبِيْرَاتِ الْجَنَازَةِ فَكَيْفَ يُتِمُّ صَلَاتَهُ؟
[৮. আবু কাতাদাহ ইবনে রিবঈ (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশ দিয়ে একটি জানাজা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তখন তিনি বললেন: এ ব্যক্তি শান্তি লাভকারী অথবা তার থেকে অন্যরা শান্তি লাভকারী। সাহাবিগণ আরজ করলেন: হে আল্লাহর রাসুল! শান্তি লাভকারী এবং যার থেকে অন্যরা শান্তি লাভকারী—এর অর্থ কী? তিনি বললেন: মুমিন বান্দা মৃত্যুর মাধ্যমে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে আল্লাহর রহমতে শান্তি লাভ করে; আর পাপিষ্ঠ বান্দার মৃত্যুর মাধ্যমে আল্লাহর বান্দাগণ, জনপদ, গাছপালা ও জীবজন্তু তার জুলুম থেকে শান্তি লাভ করে।]
[(ক) জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠের শরয়ি বিধান বর্ণনা কর।]
[(খ) যার জানাজার সালাতের কিছু তাকবীর ছুটে যায়, সে কীভাবে সালাত পূর্ণ করবে?]
(ক) জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠের বিধান
- ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমদের মত: জানাজার সালাতে প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করা রুকন বা ওয়াজিব। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “সূরা ফাতিহা ছাড়া কোনো সালাতই হয় না।”
- ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালেকের মত: জানাজার সালাত মূলত সালাত হলেও এটি কিয়াম ও দোয়ার সমষ্টি; এতে রুকু-সিজদা বা কিরআত নেই। তাই এতে সূরা ফাতিহা কিরআতের নিয়তে পড়া নিষেধ; তবে প্রশংসাসূচক দোয়ার নিয়তে পড়লে কোনো অসুবিধা নেই। হানাফী মতে প্রথম তাকবীরের পর সানা পাঠ করাই মূল সুন্নাত।
(খ) মাসবুকের ছুটে যাওয়া তাকবীর আদায়ের নিয়ম
যে ব্যক্তি জামায়াতে পরে এসে শরিক হয়েছে এবং ইমামের এক বা একাধিক তাকবীর ছুটে গেছে, সে ইমামকে যে অবস্থায় পাবে তাকবীরে তাহরিমা বলে সালাতে শামিল হবে। অতঃপর ইমাম যখন উভয় দিকে সালাম ফিরাবেন, তখন সালাম না ফিরিয়ে নিজের ছুটে যাওয়া তাকবীরগুলো যথাসম্ভব দ্রুত পাঠ করবে (লাশ উঠিয়ে নেওয়ার পূর্বেই)। যদি দোয়া পড়ার সময় না পায়, তবে কেবল তাকবীরগুলো বলে সাথে সাথে সালাম ফিরিয়ে সালাত সমাপ্ত করবে।
مجموعة (ب) [খ অংশ] (মান: ১ × ১০ = ১০)
৯ নম্বর প্রশ্ন
اكْتُبْ نُبْذَةً عَنْ سِيْرَةِ الْإِمَامِ مُسْلِمٍ رَحِمَهُ اللهُ – ثُمَّ اكْتُبْ مَنْزِلَتَهُ فِي الْجَرْحِ وَالتَّعْدِيْلِ –
[৯. ইমাম মুসলিম (র.)-এর জীবনী সংক্ষেপে তুলে ধর। অতঃপর জারহ ও তাদীল শাস্ত্রে তাঁর মর্যাদা ও স্থান আলোচনা কর।]
ইমাম মুসলিম (র.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
নাম ও জন্ম: ইমামুল মুহাদ্দিসীন আবুল হুসাইন মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আল-কুশায়রী আন-নিশাপুরী (র.)। তিনি ২০৪ অথবা ২০৬ হিজরিতে তৎকালীন খোরাসানের বিখ্যাত জ্ঞানকেন্দ্র নিশাপুরে এক সম্ভ্রান্ত আরব কুশায়র গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন।
ইলম অর্জন ও শিক্ষকবৃন্দ: তিনি অতি অল্প বয়সে হাদিস অন্বেষণে আত্মনিয়োগ করেন। হিজায, ইরাক, সিরিয়া ও মিসরের প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাঁর শ্রেষ্ঠ উস্তাদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ এবং বিশেষ করে আমিরুল মুমিনীন ফিল হাদিস ইমাম বুখারী (র.)। ইমাম মুসলিম ইমাম বুখারীকে ভক্তিভরে বলতেন: “হে উস্তাদদের উস্তাদ ও মুহাদ্দিসকুলের সরদার! আমাকে আপনার পা চুম্বন করার অনুমতি দিন।”
ওফাত: তিনি ২৬১ হিজরির রজব মাসে নিশাপুরের নিকটবর্তী নাসরাবাদে ৫৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
জারহ ও তাদীল শাস্ত্রে তাঁর মর্যাদা
হাদিসের রাবি বা বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই (তাদীল) এবং ত্রুটি চিহ্নিতকরণে (জারহ) ইমাম মুসলিম ছিলেন যুগান্তকারী ইমাম:
- পদ্ধতিগত সততা ও ইনসাফ: তিনি কোনো রাবির প্রতি ব্যক্তিগত রাগ বা অনুরাগের বশবর্তী হয়ে মন্তব্য করতেন না; বরং গভীর প্রজ্ঞা ও প্রমাণের ভিত্তিতে রাবির সততা মূল্যায়ন করতেন।
- রাবিদের স্তরভেদ নিরূপণ: তিনি সহীহ মুসলিমের অনন্য ভূমিকায় রাবিদের তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন: (১) শীর্ষ স্মৃতিশক্তি ও সততাসম্পন্ন প্রথম শ্রেণি, (২) মধ্যম স্তরের বর্ণনাকারী, এবং (৩) দুর্বল ও প্রত্যাখ্যাত শ্রেণি। তিনি কেবল প্রথম দুই শ্রেণির হাদিস গ্রহণ করেছেন।
- কিতাবুত তাময়ীয ও রিজালশাস্ত্র: তাঁর রচিত ‘আল-কুনা ওয়াল আসমা’ এবং ‘কিতাবুত তাময়ীয’ জারহ ও তাদীল শাস্ত্রের আকর গ্রন্থ হিসেবে চিরস্মরণীয়।
১০ নম্বর প্রশ্ন
اكْتُبْ مَزَايَا “الصَّحِيْحِ لِمُسْلِمٍ” مَعَ ذِكْرِ مَنْهَجِ الْإِمَامِ مُسْلِمٍ رَحِمَهُ اللهُ فِي تَرْتِيْبِ كِتَابِهِ الصَّحِيْحِ –
[১০. ‘সহীহ মুসলিম’-এর বৈশিষ্ট্যাবলি লেখ এবং সহীহ গ্রন্থ বিন্যাসে ইমাম মুসলিম (র.)-এর সংকলন পদ্ধতি উল্লেখ কর।]
সহীহ মুসলিমের অনন্য বৈশিষ্ট্যাবলি ও সংকলন পদ্ধতি
| বৈশিষ্ট্য | বিশ্লেষণ ও শ্রেষ্ঠত্ব |
|---|---|
| একই স্থানে হাদিসের সকল সনদের সমাবেশ | সহীহ বুখারীতে একটি হাদিস বিভিন্ন অধ্যায়ে ছড়িয়ে থাকে, কিন্তু ইমাম মুসলিম একটি হাদিসের সকল সনদ ও সমার্থক পাঠ একই জায়গায় সুন্দরভাবে একত্র করেছেন। ফলে গবেষকদের জন্য তা অত্যন্ত সহায়ক। |
| শব্দচয়নে চরম সতর্কতা | রাবিদের বর্ণিত শব্দের সামান্যতম তারতম্যও তিনি সতর্কতার সাথে উল্লেখ করেছেন। যেমন: কে ‘হাদ্দাসানা’ (আমাদের হাদিস শুনিয়েছেন) বলেছেন আর কে ‘আখবারানা’ (আমাদের খবর দিয়েছেন) তা সুস্পষ্টভাবে রক্ষা করেছেন। |
| অনন্য ইলমি ভূমিকা (মুক্বাদ্দিমাহ) | গ্রন্থের শুরুতে একটি তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক ভূমিকা যুক্ত করেছেন, যা উসুলুল হাদিস ও জারহ-তাদীল শাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছে। |
| পুনরাবৃত্তিমুক্ত সাবলীলতা | অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি পরিহার করে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে হাদিসগুলো বিন্যস্ত করেছেন। |
| উম্মাহর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থান | সহীহ বুখারীর পরেই বিশুদ্ধতার দিক থেকে সহীহ মুসলিম সমগ্র মুসলিম জাহানে অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ আসন দখল করে আছে। |
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে সনদের বিশুদ্ধতায় কোনটি অগ্রগণ্য?
জমহুর মুহাদ্দিসগণের মতে সনদের কঠোর শর্ত ও বিশুদ্ধতায় সহীহ বুখারী অগ্রগণ্য; তবে বিন্যাসপদ্ধতি ও সনদের একত্রীকরণে সহীহ মুসলিম অধিক সুবিধাজনক ও সাবলীল।
২. ইসলামে ‘বায়ে বাতিল’ ও ‘বায়ে ফাসিদ’-এর ব্যবহারিক পার্থক্য কী?
বায়ে বাতিল গোড়া থেকেই সম্পূর্ণ অকার্যকর ও হারাম; পক্ষান্তরে বায়ে ফাসিদের অবৈধ শর্ত প্রত্যাহার করে পুনরায় চুক্তি সংশোধন করলে তা বৈধ বায়ে রূপান্তরিত হতে পারে।
৩. স্বর্ণের সাথে স্বর্ণের লেনদেনে কোন দুটি শর্ত পূরণ করা ওয়াজিব?
উভয় পাশের স্বর্ণের ওজন হুবহু সমান হতে হবে এবং একই মজলিসে কোনো পক্ষকে বাকি না রেখে নগদ হাতে হাতে বিনিময় সম্পন্ন হতে হবে।
৪. ইসলামে কোনো মৃত ব্যক্তির জন্য চিৎকার করে কাঁদা কেন নিষিদ্ধ?
কারণ চিৎকার করে হায়-হুতাশ ও বিলাপ করা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরের ওপর ক্ষোভ প্রকাশের শামিল এবং এটি জাহেলি যুগের অনৈসলামিক কুপ্রথা।
৫. রাসুলুল্লাহ (সা.) কেন নাজ্জাশীর গায়েবানা জানাজা পড়েছিলেন?
আবিসিনিয়ায় কোনো ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ছিল না এবং সেখানে তাঁর জানাজা পড়ার মতো মুসলিম না থাকায় রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের নিয়ে এ বিশেষ জানাজা আদায় করেন।
৬. ফাজিল ৩য় বর্ষের সহীহ মুসলিম পরীক্ষার প্রস্তুতি কীভাবে নেওয়া উচিত?
হাদিসের মূল পাঠের সাথে ফিকহুল হাদিস, রাবিদের শর্তাবলি এবং বিভিন্ন মাযহাবের তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে সাজিয়ে লিখলে সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন সম্ভব।