ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা—২০২১
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: ই’জাযুল কুরআন ওয়াল উলূমুল হাদীছা ফিল কুরআন (إعجاز القرآن والعلوم الحديثة في القرآن)
বিষয় কোড: 201407 | প্রশ্নপত্র কোড: 153
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ২০২১ সালের ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অন্যতম মৌলিক ও যুগোপযোগী কোর্স হলো “ই’জাযুল কুরআন ওয়াল উলূমুল হাদীছা ফিল কুরআন” (বিষয় কোড: 201407)। এই প্রশ্নপত্রটি দুটি স্বতন্ত্র অংশে বিভক্ত—প্রথম অংশে রয়েছে কুরআনের চিরন্তন অলৌকিকত্ব (ই’জায), আল-কুরআনের চ্যালেঞ্জ (তাহাদ্দী), প্রাচ্যবিদদের আপত্তির খণ্ডন ও সারফা মতবাদের পর্যালোচনা; এবং দ্বিতীয় অংশে রয়েছে আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভ্রূণতত্ত্ব, ভূতত্ত্ব ও প্রাণিবিদ্যার সাথে আল-কুরআনের অভ্রান্ত ঐশী সম্পর্কের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। নিম্নে এই প্রশ্নপত্রের উভয় অংশের অন্তর্ভুক্ত মোট ১৬টি প্রশ্নেরই গভীর, প্রামাণ্য ও তথ্যবহুল সমাধান উপস্থাপিত হলো।
একনজরে প্রশ্নপত্রের রূপরেখা ও মানবণ্টন
| বিভাগ ও অংশ | মোট প্রশ্ন | উত্তর দিতে হবে | প্রতি প্রশ্নের মান | মোট নম্বর |
|---|---|---|---|---|
| প্রথম অংশ: إعجاز القرآن – ‘ক’ বিভাগ (রচনামূলক) | ৪টি | ২টি | ১৫ | ৩০ |
| প্রথম অংশ: إعجاز القرآن – ‘খ’ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত) | ৪টি | ২টি | ৫ | ১০ |
| দ্বিতীয় অংশ: العلوم الحديثة في القرآن – ‘ক’ বিভাগ (রচনামূলক) | ৪টি | ২টি | ১৫ | ৩০ |
| দ্বিতীয় অংশ: العلوم الحديثة في القرآن – ‘খ’ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত) | ৪টি | ২টি | ৫ | ১০ |
| সর্বমোট | ১৬টি প্রশ্ন | ৮টি প্রশ্ন | – | ৮০ নম্বর |
প্রথম অংশ: إعجاز القرآن (ই’জাযুল কুরআন) [পূর্ণমান: ৪০]
مجموعة (الف) – ‘ক’ বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)
যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও: ১৫ × ২ = ৩০
١- ما هو الإعجاز وكم نوعًا له؟ بين شروط الإعجاز مع بيان موضوعه عند المحققين-
الإعجاز (মুজিযা/অলৌকিকত্ব) কী এবং তা কত প্রকার? এর আলোচ্য বিষয় উল্লেখপূর্বক মুহাক্কীকগণের মতানুসারে এর শর্তসমূহ কী তা বর্ণনা কর।
ভূমিকা: নবুওয়াত ও রিসালাতের সত্যতা প্রমাণের জন্য মহান আল্লাহ নবী-রাসুলগণের মাধ্যমে যে সকল অলৌকিক নিদর্শন প্রকাশ করেন, তাকে ইসলামী আকিদায় মুজিযা বা ই’জায বলা হয়। আল-কুরআনুল কারীম হলো সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর চিরন্তন ও জীবন্ত মুজিযা, যা মানবজাতি ও জিনজাতিকে কিয়ামত পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ করে আসছে।
الإعجاز-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:
১. আভিধানিক অর্থ: ‘আল-ই’জায’ (الإِعْجَازُ) শব্দটি বাবে ইফ’আল (الإِفْعَالُ)-এর মাসদার। এর মূলধাতু হলো ‘আইন-জিম-যা’ (ع – ج – ز)। এর আভিধানিক অর্থ হলো অক্ষম বা অপারগ করা (إِثْبَاتُ الْعَجْزِ), পরাভূত করা এবং কোনো কিছুকে অন্যের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া।
২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামী শরীয়ত ও কালামশাস্ত্রবিদদের পরিভাষায় মুহাক্কীক ইমাম আল্লামা আল-জুরজানী (রহ.) ‘আত-তা’রীফাত’ গ্রন্থে বলেন:
«الْمُعْجِزَةُ أَمْرٌ خَارِقٌ لِلْعَادَةِ، دَاعِيَةٌ إِلَى الْخَيْرِ وَالسَّعَادَةِ، مَقْرُونٌ بِالتَّحَدِّي، سَالِمٌ عَنِ الْمُعَارَضَةِ، يَظْهَرُ عَلَى يَدِ مُدَّعِي النُّبُوَّةِ تَصْدِيقًا لِدَعْوَاهُ»
অর্থাৎ: “মুজিযা হলো এমন এক প্রাকৃতিক নিয়মবহির্ভূত (অলৌকিক) বিষয়, যা কল্যাণ ও সৌভাগ্যের দিকে আহ্বান করে, নবুওয়াতের দাবির সাথে সম্পৃক্ত থাকে, প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ সংবলিত হয়, বিরোধিতার মুকাবিলা থেকে মুক্ত থাকে এবং নবুওয়াতের দাবিদারের সত্যতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে তাঁর হাতে প্রকাশ পায়।”
الإعجاز-এর প্রকারভেদ:
মুজিযা বা অলৌকিকত্ব প্রধানত দুই প্রকার:
১. المعجزة الحسية (দৃশ্যমান বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য মুজিযা): যা মানুষের বাহ্যিক পঞ্চইন্দ্রিয় (চোখ, কান, স্পর্শ) দ্বারা সরাসরি প্রত্যক্ষ করা যায়। এটি সাময়িক এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রযোজ্য ছিল। যেমন: মূসা (আ.)-এর লাঠি সাপে পরিণত হওয়া, লোহিত সাগর বিভক্ত হওয়া, ঈসা (আ.)-এর জন্মান্ধকে দৃষ্টিদান করা এবং কুষ্ঠরোগীকে নিরাময় করা, কিংবা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়া (শাক্কুল ক্বামার)।
২. المعجزة العقلية أو المعنوية (বুদ্ধিবৃত্তিক বা ভাবার্থগত মুজিযা): যা মানুষের বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, গবেষণা ও চিন্তাশক্তির মাধ্যমে উপলব্ধ হয়। এটি স্থান ও কালের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত চিরভাস্বর। আল-কুরআনুল কারীম হলো একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিরন্তন মুজিযা।
মুহাক্কীকগণের মতে মুজিযার অপরিহার্য শর্তাবলি (شروط الإعجاز عند المحققين):
কালামশাস্ত্রের ইমাম ও মুহাক্কীক উলামায়ে কিরামের মতে একটি ঘটনা মুজিযা হিসেবে গণ্য হতে হলে পাঁচটি শর্ত পূরণ হতে হবে:
- প্রাকৃতিক নিয়মবহির্ভূত হওয়া (أَنْ يَكُونَ أَمْرًا خَارِقًا لِلْعَادَةِ): ঘটনাটি সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়ম বা বিজ্ঞানসম্মত কার্যকারণ সূত্রের বাইরে সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক হতে হবে। সাধারণ কোনো প্রাকৃতিক আবিষ্কার মুজিযা নয়।
- নবুওয়াতের দাবির সাথে প্রকাশ পাওয়া (أَنْ يَكُونَ مَقْرُونًا بِدَعْوَى النُّبُوَّةِ): অলৌকিক ঘটনাটি প্রকাশকারীকে অবশ্যই আল্লাহর নবী বা রাসুল হওয়ার দাবি করতে হবে। নবীর আবির্ভাবের পূর্বে হলে তা ‘ইরহাস’ (إرهاص) এবং ওলীর মাধ্যমে হলে তা ‘কারামত’ (كرامة)।
- নবীর দাবির সম্পূর্ণ অনুকূল হওয়া (أَنْ يَكُونَ مُوَافِقًا لِدَعْوَاهُ): নবী যা প্রকাশ করতে চাইবেন ঘটনাটি হুবহু তা-ই হতে হবে। ভণ্ড নবী মুসাইলামা কাযযাব যখন এক কানা ব্যক্তির চোখে হাত বুলিয়ে দিয়ে ভালো করতে চেয়েছিল, তখন তার অপর চোখটিও অন্ধ হয়ে গিয়েছিল—এটি মুজিযা নয়, বরং অপমান (إهانة)।
- চ্যালেঞ্জ সংবলিত হওয়া (أَنْ يَكُونَ مَقْرُونًا بِالتَّحَدِّي): ঘটনাটির সমকক্ষ কিছু তৈরি করার জন্য সমগ্র সৃষ্টিজগতকে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে হবে।
- প্রতিপক্ষের অক্ষমতা ও মুকাবিলাহীন থাকা (أَنْ يَعْجِزَ الْمُعَارِضُونَ عَنْ مِثْلِهِ): চরম বিদ্বেষ ও সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কোনো প্রতিপক্ষ যেন এর সমকক্ষ কিছু উপস্থাপন করতে সক্ষম না হয়।
মুহাক্কীকগণের মতে ই’জাযের আলোচ্য বিষয় (موضوع الإعجاز):
ই’জাযুল কুরআনের মূল আলোচ্য বিষয় হলো: আল-কুরআনুল কারীমের প্রতিটি শব্দ, বাক্য, শৈলী, বিধান ও অন্তর্নিহিত তত্ত্বসমূহ। এটি আলোচনা করে কেন এবং কীভাবে কুরআনের বাণী মানব রচিত সকল সাহিত্যের ঊর্ধ্বের এক অতুলনীয় ঐশী গ্রন্থ এবং কেন জিন ও ইনসান মিলিত হয়েও এর একটি ক্ষুদ্রতম সূরার অনুরূপ কোনো কিছু রচনা করতে চিরকাল অক্ষম ও অপারগ।
٢- تحدث عن وجوه إعجاز القرآن الكريم مفصلا-
إعجاز القرآن (কুরআনের অলৌকিকত্ব)-এর দিকসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর।
ভূমিকা: আল-কুরআনুল কারীম কেবল একটি মাত্র দিক থেকে অলৌকিক নয়; বরং এটি বহুমাত্রিক ঐশী মহিমায় ভাস্বর। ইমাম আল-বাক্বিল্লানী, ইমাম খাত্তাবী, কাজী আয়্যায এবং আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) কুরআনের বিভিন্ন অলৌকিক দিক বিশদভাবে উন্মোচন করেছেন।
কুরআনের প্রধান প্রধান ই’জায বা অলৌকিকত্বের দিকসমূহ:
- ১. ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক ই’জায (الإعجاز البياني واللغوي):
কুরআন এমন এক যুগে অবতীর্ণ হয়েছিল যখন আরবরা সাহিত্য, কবিতা ও বাগ্মিতায় বিশ্বসেরা ছিল। কুরআনের শব্দচয়ন, ছন্দবিন্যাস, ধ্বনিমাধুর্য এবং উপমার গভীরতা আরব সাহিত্যিকদের স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এর প্রতিটি শব্দ এত সুনির্দিষ্ট যে, একটি শব্দের বদলে অন্য কোনো সমার্থক শব্দ বসালে বাক্যের দ্যোতনা নষ্ট হয়ে যায়। আল-ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরাহ কুরআনের বাণী শুনে বাধ্য হয়ে বলেছিল:
«وَاللهِ إِنَّ لِقَوْلِهِ لَحَلَاوَةً، وَإِنَّ عَلَيْهِ لَطَلَاوَةً، وَإِنَّ أَعْلَاهُ لَمُثْمِرٌ، وَإِنَّ أَسْفَلَهُ لَمُغْدِقٌ، وَإِنَّهُ لَيَعْلُو وَلَا يُعْلَى عَلَيْهِ»
অর্থ: “আল্লাহর শপথ! তার বাণীতে এক অনাবিল মিষ্টতা রয়েছে, তার ওপর রয়েছে অনন্য দীপ্তি; তার উপরিভাগ ফলবান এবং নিম্নভাগ সুজলা; এটি সদা বিজয়ী থাকে, একে কেউ পরাভূত করতে পারে না।” - ২. অদৃশ্যের নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী (الإعجاز الإخباري عن الغيب):
কুরআনে ভবিষ্যতের এমন বহু ঘটনার স্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। যেমন:
– রোমানদের বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী: পারসিকদের কাছে রোমানরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়ার পর কুরআন ঘোষণা করে যে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তারা পুনরায় বিজয়ী হবে (সূরা আর-রূম: ১-৪)। নয় বছরের মাথায় ঐতিহাসিক নিনেভের যুদ্ধে রোমানরা বিজয় অর্জন করে।
– বদর যুদ্ধের বিজয় ও কাফিরদের পরাজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী (সূরা আল-কামার: ৪৫)।
– মক্কা বিজয়ের ও শান্তিতে মসজিদুল হারামে প্রবেশের ভবিষ্যদ্বাণী (সূরা আল-ফাতহ: ২৭)। - ৩. অতীত ইতিহাস ও প্রাচীন জাতির নিখুঁত বিবরণ (الإخبار عن الأمم السابقة):
রাসুলুল্লাহ ﷺ ছিলেন উম্মী (নিরক্ষর)। তিনি কোনো গ্রন্থ পড়েননি বা কোনো ঐতিহাসিকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেননি। অথচ তিনি নূহ, আদ, সামূদ, লূত, ইব্রাহীম, ইউসুফ ও মূসা (আ.)-এর সম্প্রদায় সম্পর্কে এমন নিখুঁত বিবরণ দিয়েছেন যা তৎকালীন তাওরাত ও ইনজীলের বিকৃতি দূর করে সত্য প্রকাশ করেছে। কুরআনে ফেরাউনের লাশ সংরক্ষণের ঘোষণা (সূরা ইউনুস: ৯২) আধুনিক প্রত্নতত্ত্বে অবিকল প্রমাণিত হয়েছে। - ৪. আইনগত ও বিধানগত ই’জায (الإعجاز التشريعي):
কুরআন যে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, বিচারিক ও আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা প্রদান করেছে, তা মানব রচিত সকল সংবিধানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ। এর মীরাস আইন (উত্তরাধিকার), যাকাত ব্যবস্থা, সুদ নিষিদ্ধকরণ এবং কিসাস ও দণ্ডবিধি মানবজাতির সার্বিক শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একমাত্র চিরন্তন রূপরেখা। - ৫. বৈজ্ঞানিক ই’জায (الإعجاز العلمي):
কুরআন কোনো বিজ্ঞানের বই নয়, তবে এতে বিজ্ঞানের এমন বহু চিরায়ত সত্য অবতীর্ণ হয়েছে যা সপ্তম শতকের মরু আরবের কোনো মানুষের পক্ষে জানা অসম্ভব ছিল। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভ্রূণতত্ত্ব, সমুদ্রবিজ্ঞান ও ভূতত্ত্বের আবিষ্কারগুলো কুরআনের আয়াতসমূহের নিখুঁত সত্যায়ন করেছে (যেমন বিগ ব্যাং, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, ভ্রূণের স্তরসমূহ, ভূগর্ভে পর্বতের পেরেকের মতো অবস্থান ইত্যাদি)।
٣- اذكر شبهات المستشرقين حول إعجاز القرآن مع بيان الرد عليهم-
إعجاز القرآن-এর বিষয়ে প্রাচ্যবিদদের সন্দেহ ও অভিযোগগুলো উল্লেখ করে তা নিরসন কর।
ভূমিকা: পশ্চিমা প্রাচ্যবিদ (Orientalists) ও ইসলামবিদ্বেষী গবেষকগণ আল-কুরআনের ঐশী অলৌকিকত্বকে ধূলিসাৎ করার জন্য যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন সূক্ষ্ম সন্দেহ ও অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। তবে মুসলিম স্কলারগণ যুক্তিনির্ভর গবেষণার মাধ্যমে তাদের প্রতিটি অভিযোগের দাঁতভাঙা জবাব প্রদান করেছেন।
প্রাচ্যবিদদের প্রধান প্রধান সন্দেহ ও অভিযোগসমূহ এবং তার প্রামাণ্য নিরসন:
- প্রথম সন্দেহ: কুরআন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর স্বরচিত সাহিত্য বা মনস্তাত্ত্বিক প্রতিভার ফল।
প্রাচ্যবিদ থিওডোর নোল্ডেকে এবং উইলিয়াম মুর দাবি করেছে যে, মুহাম্মদ ﷺ অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও কাব্যিক প্রতিভাধর ব্যক্তি ছিলেন এবং তিনি নিজেই আত্মমগ্ন হয়ে এই গ্রন্থ রচনা করেছেন।
প্রামাণ্য নিরসন:
– রাসুলুল্লাহ ﷺ নবুওয়াত প্রকাশের পূর্বে দীর্ঘ চল্লিশ বছর মক্কাবাসীদের মাঝে কাটিয়েছেন। এই সুদীর্ঘ সময়ে তিনি কোনো কবিতা রচনা করেননি বা কোনো সাহিত্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেননি। হঠাৎ চল্লিশ বছর বয়সে এসে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য সৃষ্টি করা কোনো মানুষের পক্ষে অসম্ভব।
– রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিজস্ব বাণীর ভাণ্ডার হলো ‘হাদীস’। হাদীসের ভাষা ও শৈলীর সাথে কুরআনের ভাষা ও শৈলীর স্পষ্ট ও যোজন যোজন পার্থক্য বিদ্যমান। কোনো লেখকের দুটি লেখার মধ্যে এমন মৌলিক ও আকাশ-পাতাল তফাত থাকা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব।
– কুরআনে বহু স্থানে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে কঠোর সতর্কবাণী ও সংশোধন করা হয়েছে (যেমন সূরা আবাসা: ১-২, সূরা আত-তাহরীম: ১)। কোনো মানুষ নিজের রচিত গ্রন্থে নিজেকে এভাবে তিরস্কার করে না। - দ্বিতীয় সন্দেহ: কুরআন বাইবেল ও ইহুদি-খ্রিস্টান সূত্র থেকে ধার করা (Borrowed from Judeo-Christian sources)।
প্রাচ্যবিদ আব্রাহাম গাইগার দাবি করে যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ ওরাকা ইবনে নওফেল কিংবা বাহীরা পাদ্রীর কাছ থেকে পূর্ববর্তী কিতাবের কাহিনী শুনে কুরআনে সংযোজন করেছেন।
প্রামাণ্য নিরসন:
– শৈশবে বাহীরা পাদ্রীর সাথে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাক্ষাৎ ছিল মাত্র কয়েক মিনিটের কাফেলাযাত্রায়। কয়েক মিনিটের সাক্ষাতে তাওরাত ও ইনজীলের মতো বিশাল ধর্মগ্রন্থ মুখস্থ বা আত্মস্থ করা অসম্ভব।
– বাইবেলে নবীদের চরিত্রে যেসব গুরুতর অপবাদ দেওয়া হয়েছে (যেমন লূত আ.-এর মদ্যপান, দাউদ আ.-এর ব্যভিচারের অপবাদ), কুরআন সেগুলোকে সম্পূর্ণরূপে খণ্ডন করে নবীদের নিষ্পাপ সত্তা হিসেবে তুলে ধরেছে। এটি প্রমাণ করে কুরআন কোনো বিকৃত উৎস থেকে অনুলিখিত নয়; বরং স্বয়ং ওহীর অবিকল প্রকাশ। - তৃতীয় সন্দেহ: কুরআনে পুনরাবৃত্তি ও ব্যাকরণগত অসঙ্গতি রয়েছে।
গোল্ডজিহার দাবি করেছে যে, কুরআনে একই কাহিনী বারবার আনা হয়েছে এবং কিছু স্থানে সাধারণ ব্যাকরণিক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে।
প্রামাণ্য নিরসন:
– কুরআনে পুনরাবৃত্তি কোনো অনর্থক বিষয় নয়; বরং এটি আরবি বালাগাতের অনন্য কৌশল। প্রতিটি পুনরাবৃত্তির স্থানে নতুন কোনো শিক্ষা, ভিন্ন আঙ্গিক এবং প্রেক্ষাপটের নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে।
– কুরআনের ভাষা হলো শাস্ত্রীয় আরবি ব্যাকরণ প্রণয়নের মূল ভিত্তি। ব্যাকরণবিদগণ কুরআনের শব্দচয়ন দেখেই ব্যাকরণের নিয়ম তৈরি করেছেন। অতএব, কুরআনের বালাগাতীয় বাক্যগঠনকে ব্যাকরণের ভুল বলা চরম অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
٤- ما معنى التحدى؟ بين اقسامه-
التحدى (চ্যালেঞ্জ)-এর অর্থ কী? التحدى-এর প্রকারগুলো বর্ণনা কর।
ভূমিকা: নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ এবং প্রতিপক্ষের বিরোধিতাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য কুরআনুল কারীম মানবজাতি ও জিনজাতিকে যে উন্মুক্ত আহ্বান ও মুকাবিলা করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল, তাকে উলূমুল কুরআনে ‘আত-তাহাদ্দী’ (التَّحَدِّي) বলা হয়।
التحدى-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:
‘আত-তাহাদ্দী’ (التَّحَدِّي) শব্দটি বাবে তাফা’উল (التَّفَعُّلُ)-এর মাসদার। এর আভিধানিক অর্থ হলো: আহ্বান করা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা দাবি করা, শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া (طَلَبُ الْمُبَارَزَةِ وَالْمُنَازَعَةِ)।
পারিভাষিক অর্থে: কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হওয়ার সময় আরবের শীর্ষ বাগ্মী, কবি ও বিরোধী শক্তিগুলোকে কুরআনের অনুরূপ কোনো সূরা বা আয়াত রচনা করে আনার জন্য যে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করা হয়েছিল, তাকে আত-তাহাদ্দী বলা হয়।
التحدى-এর পর্যায় ও প্রকারভেদ (أقسام التحدي ومراحله):
কুরআন মাজীদের চ্যালেঞ্জটি আকস্মিকভাবে একবারে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি; বরং এটি অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণভাবে চারটি ক্রমান্বয়িক পর্যায়ে বা প্রকারে অবতীর্ণ হয়েছিল:
- প্রথম প্রকার: সমগ্র কুরআনের অনুরূপ কিতাব আনার চ্যালেঞ্জ (التحدي بالقرآن كله):
সর্বপ্রথম মক্কী জীবনের শুরুতে সমগ্র কুরআন মাজীদের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করে আনার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়। ইরশাদ হয়েছে:
﴿قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا﴾ (সূরা আল-ইসরা: ৮৮)
অর্থ: “বলুন, যদি মানবজাতি ও জিনজাতি এই কুরআনের অনুরূপ রচনা করে আনার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ আনতে পারবে না, যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়।” - দ্বিতীয় প্রকার: দশটি সূরার অনুরূপ রচনা করে আনার চ্যালেঞ্জ (التحدي بعشر سور):
যখন তারা সমগ্র কুরআনের মুকাবিলায় ব্যর্থ হলো, তখন চ্যালেঞ্জ শিথিল করে কুরআনের মতো মাত্র দশটি সূরা তৈরি করে আনার আহ্বান জানানো হয়। ইরশাদ হয়েছে:
﴿أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ﴾ (সূরা হূদ: ১৩)
অর্থ: “তারা কি বলে যে, সে এটি নিজে রচনা করেছে? বলুন, তবে তোমরা এর অনুরূপ দশটি স্বরচিত সূরা নিয়ে এসো এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো ডেকে নাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” - তৃতীয় প্রকার: মাত্র একটি সূরার অনুরূপ আনার চ্যালেঞ্জ (التحدي بسورة واحدة):
দশটি সূরায়ও ব্যর্থ হওয়ার পর চ্যালেঞ্জ আরও সংকুচিত করে যেকোনো একটি মাত্র সূরা—এমনকি সূরা আল-কাউছারের মতো তিন লাইনের ক্ষুদ্রতম একটি সূরা তৈরি করার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়। ইরশাদ হয়েছে:
﴿أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِثْلِهِ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ﴾ (সূরা ইউনুস: ৩৮) - চতুর্থ প্রকার: বিশ্বজনীন চূড়ান্ত ও চিরন্তন চ্যালেঞ্জ (التحدي العام الخالد):
মদিনায় অবতীর্ণ সূরা আল-বাকারায় সমগ্র কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির প্রতি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করা হয় যে, তারা কখনো পারবে না এবং এর শাস্তি হবে জাহান্নাম:
﴿وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا وَلَنْ تَفْعَلُوا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ﴾ (সূরা আল-বাকারা: ২৩-২৪)
অর্থ: “আর আমি আমার বান্দার ওপর যা অবতীর্ণ করেছি, তাতে যদি তোমরা কোনো সন্দেহে থাকো, তবে এর অনুরূপ একটি মাত্র সূরা নিয়ে এসো… আর যদি তোমরা তা করতে না পারো—আর কিছুতেই তোমরা তা পারবে না—তবে সেই আগুনকে ভয় করো যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।”
مجموعة (ب) – ‘খ’ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)
যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও: ৫ × ২ = ১০
٥- تحدث عن كيفية الوقوف على إعجاز القرآن-
إعجاز القرآن-এর বিষয়ে কীভাবে অবহিত হওয়া যায় তা বর্ণনা কর।
ভূমিকা: সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের গবেষক পর্যন্ত আল-কুরআনের অলৌকিকত্ব উপলব্ধি করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু পথ ও পদ্ধতি রয়েছে।
কুরআনের ই’জায অনুধাবনের উপায়সমূহ:
- আরবি ভাষার গভীর জ্ঞান অর্জন: আরবি ব্যাকরণ (নাহু-সরফ) এবং অলঙ্কারশাস্ত্র (মা’আনী, বায়ান, বাদী’) গভীরভাবে অধ্যয়নের মাধ্যমে কুরআনের শব্দবিন্যাস ও বাচনভঙ্গির অনন্যতা প্রত্যক্ষ করা যায়।
- ইতিহাস ও পরিবেশের পর্যালোচনা: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মী (নিরক্ষর) হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন আরবের বিশ্বসেরা সাহিত্যিকদের সামনে এমন কিতাব পেশ করা এবং তাদের চরম ব্যর্থতার ঐতিহাসিক সত্য অনুধাবন করা।
- আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে তুলনা: আধুনিক বিজ্ঞানের প্রমাণিত আবিষ্কারসমূহের আলোকে কুরআনের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিত পাঠ করলে এর ঐশী উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
- আত্মিক অনুভূতি ও অন্তর্দৃষ্টি: পবিত্র মনে কুরআন তিলাওয়াত ও গভীর তাদাব্বুর (গবেষণা) করলে মুমিনের অন্তরে কুরআনের ঐশী নূর ও অলৌকিক প্রভাব সরাসরি অনুভূত হয়।
٦- من أهل الصرفة؟ وما عقيدتهم في إعجاز القرآن؟
أهل الصرفة কারা? إعجاز القرآن-এর বিষয়ে তাদের আক্বিদাসমূহ উল্লেখ কর।
ভূমিকা: ইসলামী ইতিহাসের একটি বিশেষ যুগে মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের কিছু তাত্ত্বিক কুরআনের অলৌকিকত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি বিভ্রান্তিকর ধারণার জন্ম দেন, যা ‘সারফা’ মতবাদ নামে পরিচিত।
আহলে সারফার পরিচয়:
‘আস-সারফাহ’ (الصَّرْفَةُ) অর্থ ফিরিয়ে রাখা বা বাধা দেওয়া। এই মতবাদের প্রবক্তা ছিলেন মু’তাযিলা চিন্তাবিদ আবু ইসহাক ইব্রাহীম আন-নাজ্জাম (ওফাত ২২১ বা ২৩১ হি.) এবং পরবর্তীকালে হিশাম আল-ফুওয়াতী ও শিয়া আলেম শরীফ আল-মুরতাজা। যাঁরা বিশ্বাস করতেন যে আরবরা কুরআনের মতো সাহিত্য রচনা করতে সক্ষম ছিল, কিন্তু আল্লাহ তাদের বাধা দিয়েছেন, তাঁদের ‘আহলে সারফা’ বলা হয়।
কুরআনের ই’জায বিষয়ে তাদের ভ্রান্ত আক্বিদা:
আহলে সারফার মূল দাবি হলো:
১. আল-কুরআন তার নিজস্ব ভাষা, শব্দ বা সাহিত্যের দিক থেকে কোনো অলৌকিক কিতাব নয়; বরং আরবরা চাইলে স্বাভাবিকভাবে কুরআনের অনুরূপ সূরা রচনা করতে সক্ষম ছিল।
২. যখনই আরবরা কুরআনের সমকক্ষ কিছু রচনা করতে উদ্যত হয়েছিল, মহান আল্লাহ কুদরতিভাবে তাদের বুদ্ধি ও ইচ্ছাশক্তি ছিনিয়ে নিয়েছিলেন এবং তাদের মনোযোগ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন (صَرَفَهُمُ اللهُ عَنْ ذَلِكَ)।
৩. অতএব, তাদের মতে মুজিযা কুরআনের নিজস্ব সত্তায় নয়; বরং মানুষের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার মধ্যে নিহিত।
٧- كيف ترد على أهل الصرفة في اعجاز القرآن؟
إعجاز القرآن-এর ব্যাপারে আহলে সারফার ভ্রান্ত আক্বিদাগুলো কীভাবে খণ্ডন করবে?
ভূমিকা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের ইমামগণ যুক্তি ও দলিলের মাধ্যমে আহলে সারফার এই মতবাদকে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন প্রমাণ করেছেন।
আহলে সারফার মতবাদের প্রামাণ্য খণ্ডন:
- ১. কুরআনের নিজস্ব প্রশংসার পরিপন্থী: আল্লাহ তা’আলা কুরআনের নিজস্ব সত্তাকে অনুপম ও অলৌকিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে: ﴿قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ﴾ (সূরা বনী ইসরাঈল: ৮৮)। সারফা সত্য হলে চ্যালেঞ্জটি মানুষের মেধার প্রতি হতো না; বরং আল্লাহর ক্ষমতার প্রতি হতো।
- ২. আরব সাহিত্যিকদের বিস্ময় ও স্বীকারোক্তি: আরবের শীর্ষ কাফির সাহিত্যিকরা (যেমন ওতবা ইবনে রাবিয়া, ওলীদ ইবনুল মুগীরা) কুরআন শুনে এর সাহিত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। তারা কখনোই বলেনি যে “আমাদের ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে”, বরং তারা বলেছিল এটি কোনো মানুষের বাণী হতেই পারে না।
- ৩. মুজিযার সংজ্ঞার লঙ্ঘন: মুজিযা নবীর হাতের নিদর্শনে প্রকাশ পেতে হয়। সারফা মতবাদ মানলে কুরআন নিজে কোনো মুজিযা থাকে না, বরং এটি একটি সাধারণ গ্রন্থে পরিণত হয়, যা সুস্পষ্ট কুফরি ও বাতিল আকিদা।
- ৪. উম্মাহর সর্বসম্মত ইজমা: ইমাম বাযযাবী, ইমাম খাত্তাবী, বাক্বিল্লানী ও সুয়ূতীসহ সমগ্র উম্মাহ একমত যে, কুরআন তার নিজস্ব শব্দ, বাক্য ও বালাগাতের কারণেই চিরন্তন মুজিযা।
٨- لما مست الحاجة إلى التحدى لإثبات إعجاز القرآن-
إعجاز القرآن (কুরআনের অলৌকিকত্ব) প্রমাণে تحدى (চ্যালেঞ্জ)-এর প্রয়োজন কেন হলো?
ভূমিকা: রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন মক্কার কাফিরদের সামনে একত্ববাদের দাওয়াত ও ওহীর বাণী পেশ করলেন, তখন তারা এটিকে মানব রচিত কাব্য, যাদু কিংবা প্রাচীন উপকথা বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। এই প্রেক্ষাপটেই চ্যালেঞ্জের অপরিহার্যতা দেখা দেয়।
তাহাদ্দী বা চ্যালেঞ্জের প্রয়োজনীয়তার কারণসমূহ:
- কাফিরদের মিথ্যা অপবাদের মুখ বন্ধ করা: কুরাইশরা দাবি করেছিল: ﴿لَوْ نَشَاءُ لَقُلْنَا مِثْلَ هَذَا﴾ (“আমরা ইচ্ছা করলে এর মতো রচনা করে আনতে পারি”)। তাদের এই আত্মম্ভরিতা ও অহংকার চূর্ণ করতেই কুরআন তাদের সরাসরি রচনা করে আনার চ্যালেঞ্জ দেয়।
- আরবদের চরম সাহিত্য গর্বে আঘাত করা: তৎকালীন আরবরা তাদের ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গর্ব করত এবং অনারবদের ‘আজমী’ (বোবা বা ভাষাহীন) বলত। তাদের সেই সেরা অস্ত্রেই তাদের চূড়ান্ত পরাজয় নিশ্চিত করার জন্য চ্যালেঞ্জ অপরিহার্য ছিল।
- কিয়ামতের সকল মানুষের কাছে নবুওয়াতের প্রমাণ প্রতিষ্ঠা: নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণের নিয়ম হলো প্রতিপক্ষকে অপারগ করা। চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যে, সমগ্র মানবজাতি সম্মিলিত হয়েও এর একটি ছোট সূরার সমকক্ষ রচনা করতে চিরকাল অক্ষম।
দ্বিতীয় অংশ: العلوم الحديثة في القرآن (আল-উলূমুল হাদীছা ফিল কুরআন) [পূর্ণমান: ৪০]
مجموعة (الف) – ‘ক’ বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)
যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও: ১৫ × ২ = ৩০
٩- عرف العلوم لغة واصطلاحا- ثم بين العلاقة بين القرآن الكريم والعلوم الحديثة-
বিজ্ঞানের শাব্দিক ও পারিভাষিক পরিচয় দাও। কুরআনুল কারীম ও আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্ক বর্ণনা কর।
ভূমিকা: আল-কুরআনুল কারীম হলো বিশ্বজাহানের স্রষ্টা মহান আল্লাহর বাণী, আর বিজ্ঞান হলো আল্লাহরই সৃষ্টি প্রকৃতির বাস্তব নিয়মাবলির আবিষ্কার। অতএব, স্রষ্টার বাণী এবং তাঁর সৃষ্টির বাস্তব নিয়মের মাঝে কোনো মৌলিক বৈপরীত্য থাকতে পারে না।
বিজ্ঞানের শাব্দিক ও পারিভাষিক পরিচয়:
১. শাব্দিক পরিচয়: ‘বিজ্ঞান’ শব্দটি বাংলা ভাষায় সংস্কৃত ‘বি’ (বিশেষ) + ‘জ্ঞান’ (জানা) সংযোগে গঠিত, যার অর্থ ‘বিশেষ জ্ঞান’। আরবি ভাষায় এর প্রতিশব্দ হলো ‘আল-ইলম’ (العِلْمُ), যা অজ্ঞতার বিপরীত এবং নিশ্চিত জ্ঞান অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Science’ এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘Scientia’ থেকে, যার অর্থ জ্ঞান (Knowledge)।
২. পারিভাষিক পরিচয়: বৈজ্ঞানিক পরিভাষায়: “ভৌত ও প্রাকৃতিক জগতের গঠন ও আচরণ সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ এবং যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রণালীবদ্ধ ও সুসংগঠিতভাবে অর্জিত জ্ঞানই হলো বিজ্ঞান।”
কুরআনুল কারীম ও আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যকার নিবিড় সম্পর্ক:
- কুরআন কোনো বিজ্ঞানের বই নয়, তবে এটি বিজ্ঞানের দিশারী: কুরআন মূলত হেদায়েতের কিতাব (কিতাবুল হিদায়াহ), তবে এতে প্রায় এক হাজারেরও বেশি আয়াত রয়েছে যা মহাবিশ্ব, মানুষ, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের মৌলিক নির্দেশক। ড. মরিস বুকাইলি তাঁর সুবিখ্যাত ‘The Bible, The Qur’an and Science’ গ্রন্থে প্রমাণ করেছেন যে, কুরআনের একটি আয়াতও আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।
- বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের জোরালো অনুপ্রেরণা: কুরআন মানুষকে অন্ধ বিশ্বাস পরিহার করে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেয়। ইরশাদ হয়েছে:
﴿سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنْفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ﴾ (সূরা ফুসসিলাত: ৫৩)
অর্থ: “শীঘ্রই আমি তাদের আমার নিদর্শনাবলি প্রদর্শন করব দূরদিগন্তে (মহাবিশ্বে) এবং তাদের নিজেদের মধ্যে, যাতে তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে এটিই সত্য।” - প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান বনাম কুরআনের সামঞ্জস্য: যখন বিজ্ঞান কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সত্যে উপনীত হয় (যেমন ভ্রূণের স্তর, পানির চক্র, বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর), দেখা যায় কুরআন সপ্তম শতকেই তা নির্ভুলভাবে ইঙ্গিত করেছে।
- বিজ্ঞান যেখানে সীমিত, কুরআন সেখানে পথপ্রদর্শক: বিজ্ঞান কেবল ‘কীভাবে’ (How)-এর উত্তর দিতে পারে, কিন্তু মহাবিশ্ব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ‘কেন’ (Why)-এর উত্তর বিজ্ঞান দিতে পারে না; কুরআন সেই আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সত্যের পূর্ণতা দান করে।
١٠- تحدث عن دوران الأرض والشمس والقمر مع بيان منازل القمر بالأدلة-
পৃথিবী, সূর্য ও চাঁদের ঘূর্ণন সম্পর্কে আলোচনা কর। প্রমাণসহ চাঁদের মনযিলসমূহ বর্ণনা কর।
ভূমিকা: প্রাচীন যুগে মানুষ বিশ্বাস করত পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে স্থির এবং সূর্য ও অন্যান্য গ্রহ তাকে প্রদক্ষিণ করছে। কিন্তু কুরআনুল কারীম চৌদ্দশত বছর পূর্বেই মহাজাগতিক বস্তুপুঞ্জের নিজস্ব কক্ষপথে সন্তরণ ও ঘূর্ণনের বৈজ্ঞানিক সত্য ঘোষণা করেছে।
পৃথিবী, সূর্য ও চাঁদের ঘূর্ণন সম্পর্কে কুরআনের বৈজ্ঞানিক বর্ণনা:
- সূর্য ও চাঁদের নিজস্ব কক্ষপথে পরিভ্রমণ:
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে সূর্য স্থির নয়; বরং এটি ছায়াপথের কেন্দ্রকে ঘিরে সেকেন্ডে প্রায় ২৫০ কিমি বেগে ঘুরছে। কুরআন মাজীদ ইরশাদ করে:
﴿وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ﴾ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৩৩)
অর্থ: “এবং তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ; প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে (সন্তরণ করছে)।”
এখানে ‘ইয়াসবাহূন’ (يَسْبَحُونَ) শব্দটি তরল মাধ্যমে ঘূর্ণায়মান সন্তরণকে নির্দেশ করে, যা আধুনিক মহাকাশবিদ্যার নিখুঁত চিত্র। আরও ইরশাদ হয়েছে:
﴿وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَهَا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ﴾ (সূরা ইয়াসীন: ৩৮)
অর্থ: “এবং সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে; এটি পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের সুনির্ধারিত ব্যবস্থাপনা।” - পৃথিবীর আবর্তন ও গতিশীলতা:
কুরআন পাহাড়ের গতিশীলতার উপমার মাধ্যমে পৃথিবীর নিজ অক্ষে আবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে:
﴿وَتَرَى الْجِبَالَ تَحْسَبُهَا جَامِدَةً وَهِيَ تَمُرُّ مَرَّ السَّحَابِ صُنْعَ اللَّهِ الَّذِي أَتْقَنَ كُلَّ شَيْءٍ﴾ (সূরা আন-নামল: ৮৮)
অর্থ: “আপনি পর্বতমালাকে দেখে অচল মনে করেন, অথচ তারা মেঘমালার মতো ছুটে চলছে। এটি আল্লাহরই কারিগরি, যিনি সবকিছুকে সুষম করেছেন।” পৃথিবী মেঘের মতো ঘুরছে বলেই পাহাড়ও চলমান।
চাঁদের মনযিলসমূহ (কক্ষপথের ধাপসমূহ) ও তার প্রামাণ্য বিশ্লেষণ:
চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে গিয়ে প্রতিদিন এর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে এবং সূর্যালোক প্রতিফলনের কারণে চাঁদের আকৃতি পরিবর্তিত হয়। একে ‘মনযিল’ বা চন্দ্রকলা বলা হয়।
আল্লাহ তা’আলা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন:
﴿وَالْقَمَرَ قَدَّرْنَاهُ مَنَازِلَ حَتَّى عَادَ كَالْعُرْجُونِ الْقَدِيمِ﴾ (সূরা ইয়াসীন: ৩৯)
অর্থ: “এবং চাঁদের জন্য আমি নির্দিষ্ট করেছি বিভিন্ন মনযিল (পর্যায়); অবশেষে তা শুকিয়ে যাওয়া পুরানো খেজুরের ডালের মতো হয়ে ফিরে আসে।”
আরও ইরশাদ হয়েছে:
﴿هُوَ الَّذِي جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَاءً وَالْقَمَرَ نُورًا وَقَدَّرَهُ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ﴾ (সূরা ইউনুস: ৫)
অর্থ: “তিনিই সূর্যকে তেজস্কর এবং চাঁদকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং তার জন্য মনযিলসমূহ নির্ধারণ করেছেন, যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পারো।”
আরব জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদদের মতে চাঁদের ২৮টি মনযিল রয়েছে (যেমন শরাতাইন, বুতাইন, সুরাইয়া ইত্যাদি)। চাঁদ প্রতি রাতে একটি করে মনযিল অতিক্রম করে এবং ২৯ বা ৩০ দিনে চক্র সম্পন্ন করে পুনরায় কাস্তের মতো ‘উরজুনিল কাদীম’ রূপ ধারণ করে।
١١- ما هو الانفجار العظيم؟ تحدث عن بدء الكون ونشأته وتمدده في ضوء القرآن الكريم والعلوم الحديثة-
বিগ ব্যাং কী? কুরআনুল কারীম ও আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে মহাবিশ্বের সূচনা, উৎপত্তি ও প্রসারণ সম্পর্কে আলোচনা কর।
ভূমিকা: আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হলো মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্বের ‘বিগ ব্যাং’ (Big Bang) মডেল। আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে যখন বিজ্ঞানের কোনো অস্তিত্ব ছিল না, তখন পবিত্র কুরআন অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় বিগ ব্যাং এবং মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের তথ্য উন্মোচন করেছিল।
বিগ ব্যাং (الانفجار العظيم)-এর পরিচয়:
বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এবং পরবর্তীতে জর্জ ল্যামেটারের গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, আজ থেকে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে সমগ্র মহাবিশ্ব একটি অতি ঘন, উত্তপ্ত এবং ক্ষুদ্রতম বিন্দুতে পুঞ্জীভূত ছিল, যাকে ‘Singularity’ বলা হয়। অতঃপর এক মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) মাধ্যমে স্থান, কাল ও পদার্থের সূচনা ঘটে এবং মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়।
কুরআনের আলোকে মহাবিশ্বের সূচনা ও আদি অবস্থা (بدء الكون):
পবিত্র কুরআনে এই পুঞ্জীভূত আদি অবস্থা এবং তার থেকে মহাবিশ্ব উন্মোচনের কথা বিস্ময়করভাবে বর্ণিত হয়েছে:
﴿أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ أَفَلَا يُؤْمِنُونَ﴾ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৩০)
অর্থ: “কাফিররা কি দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী একত্রে পুঞ্জীভূত (সংযুক্ত) অবস্থায় ছিল, অতঃপর আমি তাদের পৃথক করে দিলাম; এবং প্রাণবান সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা বিশ্বাস করবে না?”
– রতক্ব (رَتْقًا): আরবিতে এমন জিনিসকে বোঝায় যা একসাথে আঁটসাঁটভাবে জোড়া লাগানো।
– ফাতক্ব (فَتَقْنَاهُمَا): অর্থ বিদীর্ণ করে আলাদা করা। এটি অবিকল আধুনিক ‘বিগ ব্যাং’-এর প্রতিচ্ছবি।
মহাবিশ্বের প্রাথমিক গ্যাসীয় অবস্থা (ধোঁয়া):
বিগ ব্যাং-এর পর মহাবিশ্ব গরম ধোঁয়া ও হাইড্রোজেন-হিলিয়াম গ্যাসের মেঘে আচ্ছন্ন ছিল। কুরআন ইরশাদ করে:
﴿ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانٌ فَقَالَ لَهَا وَلِلْأَرْضِ ائْتِيَا طَوْعًا أَوْ كَرْهًا قَالَتَا أَتَيْنَا طَائِعِينَ﴾ (সূরা ফুসসিলাত: ১১)
অর্থ: “অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন, যা ছিল ধোঁয়াচ্ছন্ন (গ্যাসীয় কুয়াশা)…”
মহাবিশ্বের ক্রমাগত প্রসারণ (تمدد الكون):
১৯২৯ সালে এডউইন হাবল আবিষ্কার করেন যে গ্যালাক্সিগুলো একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, অর্থাৎ মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। অথচ কুরআনুল কারীম সপ্তম শতকেই ইরশাদ করেছে:
﴿وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ﴾ (সূরা আয-যারিয়াত: ৪৭)
অর্থ: “এবং আমি আমার কুদরতি শক্তিতে আকাশ নির্মাণ করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি একে ক্রমাগত সম্প্রসারণকারী।”
١٢- ما هو الجنين؟ بين أطوار خلق الإنسان ونموه في ضوء القرآن الكريم مفصلا-
ভ্রূণ কী? কুরআনুল কারীমের আলোকে মানব সৃষ্টি ও বিকাশের ধাপসমূহ বর্ণনা কর।
ভূমিকা: আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের পূর্বে মাতৃগর্ভের অন্ধকার কুঠুরিতে মানবশিশুর ক্রমবিকাশের ধাপ জানা মানুষের সাধ্যের বাইরে ছিল। কানাডার বিখ্যাত ভ্রূণতত্ত্ববিদ ড. কিথ এল. মুর কুরআনের ভ্রূণতত্ত্বীয় আয়াতসমূহ বিশ্লেষণ করে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
ভ্রূণ (الجنين)-এর সংজ্ঞা:
‘আল-জানীন’ (الجَنِينُ) শব্দটি আরবি ‘জান্না’ (جَنَّ) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ আবৃত বা গোপন থাকা। মাতৃগর্ভের জরায়ুতে পিতা-মাতার শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনের পর থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত শিশুটি আবৃত অবস্থায় যে রূপ ধারণ করে ও বেড়ে ওঠে, তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভ্রূণ (Embryo/Fetus) বলা হয়।
কুরআনুল কারীমের আলোকে মানব সৃষ্টির ধারাবাহিক ধাপসমূহ (أطوار خلق الإنسان):
সূরা আল-মু’মিনূনের ১২-১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা’আলা মানব সৃষ্টির প্রতিটি স্তর বৈজ্ঞানিকভাবে বর্ণনা করেছেন:
- প্রথম স্তর: সুলালাহ মিন তীন (سُلَالَةٍ مِنْ طِينٍ) — মাটির নির্যাস:
মানবজাতির আদি পিতা আদম (আ.)-কে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং পরবর্তী বংশধরদের খাদ্যের উপাদানও মাটির নির্যাস থেকেই উৎপাদিত হয়। - দ্বিতীয় স্তর: নুত্বফাতুন আমশাজ (نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ) — নিষিক্ত ডিম্বাণু (Zygote):
পুরুষের শুক্রকীট ও নারীর ডিম্বাণুর সংমিশ্রণে গঠিত ফোঁটা পানি। কুরআন বলে: ﴿إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ﴾ (সূরা আল-ইনসান: ২)। এই নিষিক্ত নুত্বফাহ জরায়ুর সুরক্ষিত স্থানে (ক্বারারিম মাকীন) স্থান পায়। - তৃতীয় স্তর: আলাক্বাহ (عَلَقَةً) — জোঁকের মতো ঝুলন্ত পিণ্ড:
নিষিক্ত ডিম্বাণু জরায়ুর দেয়ালে প্রোথিত হয়ে রক্তচোষা জোঁকের মতো ঝুলে থাকে এবং মায়ের রক্ত থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে। ‘আলাক্বাহ’ শব্দের তিনটি অর্থই এখানে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রযোজ্য: ১. জোঁকের মতো আকৃতি, ২. ঝুলন্ত বস্তু, ৩. রক্তপিণ্ড। - চতুর্থ স্তর: মুদ্বগাহ (مُضْغَةً) — চর্বিত মাংসপিণ্ড:
ভ্রূণের বয়স যখন চার সপ্তাহ হয়, তখন এটি দেখতে মানুষের দাঁত দিয়ে চিবানো মাংসপিণ্ডের মতো দেখায়। কুরআন বলে: ﴿مُضْغَةٍ مُخَلَّقَةٍ وَغَيْرِ مُخَلَّقَةٍ﴾ (সূরা আল-হাজ্জ: ৫)—অর্থাৎ কিছু অঙ্গের রূপরেখা গঠিত হয় এবং কিছু অপূর্ণ থাকে। - পঞ্চম স্তর: ইযাম (عِظَامًا) — কঙ্কাল ও হাড় গঠন:
মাংসপিণ্ডের ভেতরে তরুণাস্থি ও হাড়ের কাঠামো তৈরি হয়। কুরআন বলে: ﴿فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا﴾ (“অতঃপর মাংসপিণ্ডকে কঙ্কালে পরিণত করলাম”)। - ষষ্ঠ স্তর: লাহম (لَحْمًا) — পেশি ও মাংস দিয়ে হাড় আবৃতকরণ:
কঙ্কাল তৈরির পর আল্লাহ তা’আলা তার ওপর পেশি ও মাংসের আস্তরণ পরিয়ে দেন: ﴿فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا﴾। আধুনিক ভ্রূণতত্ত্ব প্রমাণ করেছে প্রথমে হাড় গঠিত হয় এবং পরবর্তীতে পেশিতন্তু হাড়কে পরিবেষ্টন করে। - সপ্তম স্তর: নাসআহ অন্য এক সৃষ্টি ও রূহ সঞ্চারণ (خَلْقًا آخَرَ):
অবশেষে এতে জীবন সঞ্চার করা হয়, শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও অনুভূতি দান করে পূর্ণাঙ্গ মানব অবয়বে রূপ দেওয়া হয়। ﴿فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ﴾ (“অতএব কতই না মহান ও বরকতময় আল্লাহ, যিনি শ্রেষ্ঠতম স্রষ্টা!”)।
مجموعة (ب) – ‘খ’ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)
যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও: ৫ × ২ = ১০
١٣- إلى ما أشير في هذه الآية الكريمة (والسماء بنيناها بأيد وإنا لموسعون)؟ بين-
(আর আমি স্বীয় ক্ষমতায় আকাশ সৃষ্টি করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি সম্প্রসারণকারী।) আয়াতে কারীমাটিতে কীসের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে? বর্ণনা কর।
ভূমিকা: সূরা আয-যারিয়াতের ৪৭ নম্বর আয়াতটি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অলৌকিক আয়াত হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
আয়াতের ইঙ্গিত ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য:
পবিত্র আয়াতে বলা হয়েছে: ﴿وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ﴾।
এখানে ‘বি-আইদিন’ (بِأَيْدٍ) অর্থ আল্লাহর কুদরত ও মহা শক্তি। আর ‘লামূসি’ঊন’ (لَمُوسِعُونَ) শব্দটি বাবে ইফ’আলের ইসমে ফায়েল (কর্তাবাচক বিশেষ্য), যার অর্থ ‘সম্প্রসারণকারী’ এবং আরবি ব্যাকরণ অনুসারে এটি নিরবচ্ছিন্ন ও ক্রমাগত চলমান ক্রিয়া (Continuous Process) নির্দেশ করে।
১. বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য: বিংশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত আইনস্টাইনসহ সকল বিজ্ঞানী মনে করতেন মহাবিশ্ব স্থির (Static)। কিন্তু ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে গ্যালাক্সিগুলো অবিরত অপসারিত হচ্ছে এবং সমগ্র মহাবিশ্ব বেলুনের মতো ফুলে ফেঁপে প্রসারিত হচ্ছে।
২. ঐশী সত্যের ঘোষণা: কুরআন মাজীদ কোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্র ছাড়াই চৌদ্দশত বছর পূর্বে এই ‘Expanding Universe’ বা মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের নিখুঁত ইঙ্গিত প্রদান করেছে, যা কুরআনের অকাট্য ঐশী অলৌকিকত্ব প্রমাণ করে।
١٤- اذكر أسماء الطيور في القرآن الكريم مدللا-
কুরআনুল কারীমে আলোচিত পাখিদের নাম দলিলসহ উল্লেখ কর।
ভূমিকা: কুরআন মাজীদে আল্লাহর সৃষ্টির বৈচিত্র্য ও নিদর্শন বোঝাতে বিভিন্ন পাখির নাম সবিস্তারে উল্লেখ করা হয়েছে।
কুরআনে আলোচিত পাখিদের নাম ও দলিল:
- ১. হুদহুদ (الهُدْهُدُ – কাঠঠোকরা/হুপো পাখি): হযরত সুলাইমান (আ.)-এর রাজসভার বার্তাবাহক পাখি।
দলিল: ﴿وَتَفَقَّدَ الطَّيْرَ فَقَالَ مَا لِيَ لَا أَرَى الْهُدْهُدَ أَمْ كَانَ مِنَ الْغَائِبِينَ﴾ (সূরা আন-নামল: ২০)। - ২. গুরাব (الغُرَابُ – কাক): আদম (আ.)-এর পুত্র কাবীল যখন হাবীলকে হত্যা করে, তখন দাফন প্রক্রিয়া শেখানোর জন্য আল্লাহ কাক পাঠিয়েছিলেন।
দলিল: ﴿فَبَعَثَ اللَّهُ غُرَابًا يَبْحَثُ فِي الْأَرْضِ لِيُرِيَهُ كَيْفَ يُوَارِي سَوْءَةَ أَخِيهِ﴾ (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩১)। - ৩. সালওয়া (السَّلْوَى – বয়েল/কোয়েল পাখি): বনী ইসরাঈলের জন্য আসমান থেকে প্রেরিত কুদরতি খাদ্য ‘মান্না ও সালওয়া’।
দলিল: ﴿وَأَنْزَلْنَا عَلَيْكُمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوَى﴾ (সূরা আল-বাকারা: ৫৭)। - ৪. আবাবিল (أَبَابِيلَ – ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি): হস্তীবাহিনী (আসহাবুল ফীল)-কে ধ্বংস করার জন্য প্রেরিত আল্লাহর বিশেষ পাখি।
দলিল: ﴿وَأَرْسَلَ عَلَيْهِمْ طَيْرًا أَبَابِيلَ﴾ (সূরা আল-ফীল: ৩)।
١٥- اذكر أسماء الحيوانات البرية في القرآن الكريم مدللا-
কুরআনুল কারীমে আলোচিত স্থল-প্রাণীদের নাম দলিলসহ উল্লেখ কর।
ভূমিকা: মহান রাব্বুল আলামীন আল-কুরআনে বিভিন্ন পশু ও স্থল-প্রাণীর নাম উল্লেখ করে তাদের স্বভাব, মানবকল্যাণে তাদের উপযোগিতা এবং শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন।
কুরআনে উল্লেখিত প্রধান প্রধান স্থল-প্রাণী ও তাদের দলিল:
- ১. বাক্বারাহ (البَقَرَةُ – গরু/গাভী): দলিল: ﴿إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تَذْبَحُوا بَقَرَةً﴾ (সূরা আল-বাকারা: ৬৭)।
- ২. জামাল বা ইবিল (الإِبِلُ / الجَمَلُ – উট): দলিল: ﴿أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ﴾ (সূরা আল-গাশিয়াহ: ১৭)।
- ৩. খায়ল (الخَيْلُ – ঘোড়া): দলিল: ﴿وَالْخَيْلَ وَالْبِغَالَ وَالْحَمِيرَ لِتَرْكَبُوهَا وَزِينَةً﴾ (সূরা আন-নাহল: ৮)।
- ৪. গনাম বা না’জাহ (الغَنَمُ / النَّعْجَةُ – ভেড়া/দুম্বা): দলিল: ﴿إِنَّ هَذَا أَخِي لَهُ تِسْعٌ وَتِسْعُونَ نَعْجَةً﴾ (সূরা সোয়াদ: ২৩)।
- ৫. ক্বলব (الكَلْبُ – কুকুর): আসহাবুল কাহাফের বিশ্বস্ত সঙ্গী কুকুর। দলিল: ﴿وَكَلْبُهُمْ بَاسِطٌ ذِرَاعَيْهِ بِالْوَصِيدِ﴾ (সূরা আল-কাহাফ: ১৮)।
- ৬. ক্বিসওয়ারা বা আসাদ (القَسْوَرَةُ – সিংহ): দলিল: ﴿فَرَّتْ مِنْ قَسْوَرَةٍ﴾ (সূরা আল-মুদ্দাসসির: ৫১)।
- ৭. খিনযীর (الخِنْزِيرُ – শুকর): দলিল: ﴿حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ﴾ (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩)।
- ৮. যি’ব (الذِّئْبُ – নেকড়ে বাঘ): ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনায় উল্লিখিত। দলিল: ﴿وَأَخَافُ أَنْ يَأْكُلَهُ الذِّئْبُ﴾ (সূরা ইউসুফ: ১৩)।
- ৯. ক্বিরদাহ (القِرَدَةُ – বানর): সাবাথ লঙ্ঘনকারীদের শাস্তিস্বরূপ রূপান্তর। দলিল: ﴿كُونُوا قِرَدَةً خَاسِئِينَ﴾ (সূরা আল-বাকারা: ৬৫)।
- ১০. ফীল (الفِيلُ – হাতি): দলিল: ﴿أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِأَصْحَابِ الْفِيلِ﴾ (সূরা আল-ফীল: ১)।
١٦- تحدث عن اهتزاز الأرض فى ضوء القرآن الكريم-
ভূ-কম্পন সম্পর্কে কুরআনুল কারীমের আলোকে বর্ণনা কর।
ভূমিকা: ভূ-কম্পন বা ভূমিকম্প হলো পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক স্তরের আকস্মিক আলোড়ন। আল-কুরআনুল কারীমে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে আল্লাহর মহাশক্তির নিদর্শন, বান্দার জন্য সতর্কবার্তা এবং কিয়ামতের প্রলয়ংকরী মহাবিপ্লবের চিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কুরআনের আলোকে ভূ-কম্পন (اهتزاز الأرض)-এর বিভিন্ন দিক:
- কিয়ামতের প্রলয়ংকরী মহাকম্পন (যিলযাল): কিয়ামতের সূচনালগ্নে সমগ্র পৃথিবী জুড়ে যে অভাবনীয় ভূ-কম্পন সংঘটিত হবে, তা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র সূরাই নাযিল হয়েছে—সূরা আয-যিলযাল। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন:
﴿إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا﴾ (সূরা আয-যিলযাল: ১-২)
অর্থ: “যখন পৃথিবী তার প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং পৃথিবী তার ভেতরের সমস্ত ভার বের করে দেবে।”
আরও ইরশাদ হয়েছে: ﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ﴾ (সূরা আল-হাজ্জ: ১)। - অতীত পাপাচারী জাতির ওপর আযাব হিসেবে ভূ-কম্পন (আর-রাজফাহ): আল্লাহর আদেশ অমান্যকারী দাম্ভিক জাতিসমূহকে শায়েস্তা করতে ভূ-কম্পন প্রেরিত হয়েছিল। যেমন সামূদ জাতি ও শোয়াইব (আ.)-এর কওমের ওপর:
﴿فَأَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ فَأَصْبَحُوا فِي دَارِهِمْ جَاثِمِينَ﴾ (সূরা আল-আ’রাফ: ৭৮)
অর্থ: “অতঃপর এক তীব্র ভূ-কম্পন তাদের পাকড়াও করল, ফলে প্রভাতকালে তারা নিজ নিজ গৃহে উপুড় হয়ে মৃত অবস্থায় পড়ে রইল।” - পর্বতমালার ভূমিকা ও ভূ-পৃষ্ঠের ভারসাম্য রক্ষা: ভূ-কম্পন থেকে পৃথিবীকে স্থির রাখতে আল্লাহ তা’আলা ভূগর্ভে সুউচ্চ পর্বতমালাকে কিলক বা পেরেকের মতো প্রোথিত করেছেন। কুরআন বলে:
﴿وَأَلْقَى فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ﴾ (সূরা আন-নাহল: ১৫)
অর্থ: “এবং তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে হেলে না পড়ে।” আধুনিক প্লেট টেকটনিক্স তত্ত্ব প্রমাণ করেছে পর্বতমালার শিকড় ভূগর্ভের গভীরে প্রবেশ করে টেকটনিক প্লেটগুলোকে অতিরিক্ত ভূ-কম্পন থেকে সুরক্ষা দেয়। - মৃত জমিনের পুনর্জীবন ও ভূ-আলোড়ন: বৃষ্টিপাতের পর মৃত শুকনো মাটি সজীব হয়ে কেঁপে ওঠে ও ফেঁপে ওঠে। ইরশাদ হয়েছে: ﴿فَإِذَا أَنْزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ﴾ (সূরা ফুসসিলাত: ৩৯)—অর্থ: “অতঃপর যখন আমি তার ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করি, তা সজীব হয়ে আন্দোলিত হয় ও স্ফীত হয়।”
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ফাজিল ৪র্থ বর্ষের ই’জাযুল কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান পরীক্ষার বিষয় কোড কত?
উত্তর: এই কোর্সের বিষয় কোড হলো 201407 এবং প্রশ্নপত্র কোড হলো 153।
প্রশ্ন ২: ই’জাযুল কুরআন বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: আল-কুরআন এমন এক অতুলনীয় ঐশী কিতাব, যার সমকক্ষ কোনো সাহিত্য বা গ্রন্থ রচনা করতে সমগ্র মানব ও জিনজাতি চিরকাল সম্পূর্ণ অক্ষম ও অপারগ—কুরআনের এই অলৌকিক বৈশিষ্ট্যকেই ই’জাযুল কুরআন বলা হয়।
প্রশ্ন ৩: ‘আহলে সারফা’ মতবাদটি কেন বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত?
উত্তর: কারণ তারা দাবি করে কুরআনের নিজস্ব সত্তায় কোনো সাহিত্যিক অলৌকিকত্ব নেই, যা কুরআনের প্রকাশ্য আয়াত ও সর্বসম্মত উম্মাহর ইজমার সরাসরি বিরোধী।
প্রশ্ন ৪: কুরআনে বর্ণিত ‘বিগ ব্যাং’-এর সবচেয়ে স্পষ্ট আয়াত কোনটি?
উত্তর: সূরা আল-আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াত: ﴿أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا﴾, যেখানে মহাবিশ্ব আদি অবস্থায় পুঞ্জীভূত থাকা এবং পরবর্তীতে বিস্ফোরণের মাধ্যমে পৃথক হওয়ার নিখুঁত বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন ৫: কুরআনের ভ্রূণতত্ত্বীয় ধাপগুলো সংক্ষেপে কী কী?
উত্তর: প্রধান ধাপগুলো হলো: নুত্বফাহ (নিষিক্ত তরল), আলাক্বাহ (ঝুলন্ত রক্তপিণ্ড), মুদ্বগাহ (চর্বিত মাংসপিণ্ড), ইযাম (হাড় গঠন), লাহম (হাড়ের ওপর মাংসের আস্তরণ) এবং নাসআহ (রূহ সঞ্চারণ ও পূর্ণ মানব অবয়ব দান)।
প্রশ্ন ৬: কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যকার মূল সম্পর্কটি কেমন?
উত্তর: কুরআন কোনো বিজ্ঞানের তত্ত্বগ্রন্থ নয় বরং হেদায়েতের ঐশী আলোকবর্তিকা; তবে বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত কোনো আবিষ্কারের সাথেই কুরআনের কোনো বৈপরীত্য নেই, বরং বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত কুরআনের অভ্রান্ত সত্যকেই নতুন করে উন্মোচন করছে।
উপসংহার ও পরীক্ষার প্রস্তুতি পরামর্শ
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের “ই’জাযুল কুরআন ওয়াল উলূমুল হাদীছা ফিল কুরআন” (বিষয় কোড: 201407) অত্যন্ত বরকতময় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক একটি বিষয়। এই কোর্সে পূর্ণাঙ্গ নম্বর প্রাপ্তির জন্য শিক্ষার্থীদের আল-কুরআনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জের আয়াত, আরবের সাহিত্যিকদের প্রতিক্রিয়া, বিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহের গভীর বিশ্লেষণ এবং আরবি নস তিলাওয়াত ও অর্থসহ মুখস্থ রাখতে হবে। উল্লিখিত ধারাবাহিক ও গবেষণালব্ধ উত্তরসমূহ নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করতে পারবে ইনশাআল্লাহ।