জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আল-ফিকহ ওয়া উসুলুহু (Al-Fiqh wa Usuluhu) – 201808, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
১২৫ মিনিট পড়ার সময়
২১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩ (অনুষ্ঠিত: ২০২৪/২০২৫)
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আল-ফিকহ ওয়া উসুলুহু (الفقه وأصوله – Al-Fiqh wa Usuluhu)
বিষয় কোড: ২০১8০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১১৮ | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা


ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অন্যতম শীর্ষ শাস্ত্রীয় ও প্রায়োগিক কোর্স হলো “الفقه وأصوله” (আল-ফিকহ ওয়া উসুলুহু – বিষয় কোড: ২০১8০৮)। এ কোর্সটি ইসলামী শরীয়তের দ্বিমুখী অপরিহার্য ভিত্তির ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত: প্রথম ভাগে রয়েছে ইলমুল ফিকহ (ব্যবহারিক বিধিবিধান)—যেখানে ক্রয়-বিক্রয় (বাই), বন্ধক (রাহন), সুদ (রিবা), পোশাক-পরিচ্ছদের হালাল-হারাম এবং জীবনের বাস্তব সমস্যার বিধান আলোচিত হয়েছে; আর দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে উসূলে ফিকহ (আইনবিজ্ঞানের মূলনীতি)—যেখানে সুন্নাহর প্রামাণিকতা, ইজমা, কিয়াস, ইজতিহাদের স্তর এবং ইস্তিহসানের মতো সূক্ষ্ম আইনতত্ত্বের সামগ্রিক কাঠামো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নিম্নে পরীক্ষার্থী ও গবেষকদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও একাডেমিক সাফল্যের জন্য প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য সমাধান উপস্থাপন করা হলো।

একনজরে প্রশ্নপত্রের রূপরেখা ও মানবণ্টন

অংশ / বিভাগ গ্রুপ / শ্রেণি মোট প্রশ্ন উত্তর দেওয়ার নিয়ম প্রতি প্রশ্নের মান মোট নম্বর
الجزء الأول : الفقه (প্রথম অংশ: ফিকহ) مجموعة (أ) – বিশদ রচনামূলক ৪টি যেকোনো ২টি ১৫ ৩০
مجموعة (ب) – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি ৪টি যেকোনো ২টি ১০
الجزء الثاني : أصول الفقه (দ্বিতীয় অংশ: উসূলে ফিকহ) مجموعة (أ) – বিশদ রচনামূলক ৪টি যেকোনো ২টি ১৫ ৩০
مجموعة (ب) – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি ৪টি যেকোনো ২টি ১০
সর্বমোট ১৬টি ৮টি ৮০

الجزء الأول : الفقه (প্রথম অংশ: ফিকহ) [মান: ৪০]

مجموعة (أ) : বিশদ রচনামূলক প্রশ্নাবলি (যেকোনো ২টি প্রশ্নের উত্তর দাও: ১৫ × ২ = ৩০)

١- اكتب ضرورة علم الفقه ثم بين نشأته وتطوره بالتفصيل-

ইলমুল ফিকহের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর। অতঃপর এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।

ভূমিকা

ইসলাম কেবল কতগুলো বিশ্বাস ও তাত্ত্বিক দর্শনের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান (نظام حياة كامل)। মানবজীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে—ইবাদত-বন্দেগি থেকে শুরু করে সামাজিক আচরণ, পারিবারিক ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথনির্দেশ করে যে শাস্ত্র, তা-ই হলো ইলমুল ফিকহ (علم الفقه)। কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক নীতিমালার আলোকে মানবজীবনের নতুন নতুন সমস্যার বাস্তব সমাধান উপহার দিয়ে ফিকহ শাস্ত্র ইসলামী সমাজকে চির সচল ও প্রাণবন্ত রেখেছে।

ইলমুল ফিকহের পরিচয়

১. আভিধানিক অর্থ: আরবি ‘ফিকহ’ (الفقه) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো গভীর বুঝ, সূক্ষ্ম উপলব্ধি বা অন্তর্দৃষ্টি (الفهم الدقيق والفطنة)। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

«قَالُوا يَا شُعَيْبُ مَا نَفْقَهُ كَثِيرًا مِّمَّا تَقُولُ»

অর্থ: “তারা বলল, হে শুআইব! তুমি যা বলো তার অনেক কথাই আমরা বুঝতে পারি না।” (সূরা হূদ: ৯১)।

২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলে ফিকহের পরিভাষায় ফিকহের সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে ইমাম বাযদাবী ও ইমাম সদরুশ শরীয়াহ বর্ণনা করেছেন:

«العِلْمُ بِالأَحْكَامِ الشَّرْعِيَّةِ العَمَلِيَّةِ المُكْتَسَبَةِ مِنْ أَدِلَّتِهَا التَّفْصِيلِيَّةِ»

অর্থ: “বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট দলীল-প্রমাণ থেকে ইস্তিম্বাত বা গবেষণার মাধ্যমে ব্যবহারিক শরয়ি বিধানাবলি জানার নামই হলো ইলমুল ফিকহ।”

ইলমুল ফিকহের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব

মানবজাতির জন্য ইলমুল ফিকহের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এর প্রধান দিকগুলো নিম্নরূপ:

  1. ইবাদতের বিশুদ্ধতা নিশ্চিতকরণ: নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি ইবাদতসমূহ সহীহভাবে আদায়ের জন্য সেগুলোর রোকন, ওয়াজিব, সুন্নাত ও ফাসিদ হওয়ার কারণগুলো ফিকহের মাধ্যমেই নিখুঁতভাবে জানা যায়।
  2. হালাল ও হারামের সীমারেখা নির্ধারণ: ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, পেশা ও খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে কোনটি শরীয়তসম্মত এবং কোনটি নিষিদ্ধ (হারাম ও মাকরূহ), তা ইলমুল ফিকহ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে নির্ধারণ করে দেয়।
  3. সমকালীন নতুন সংকটের সমাধান (فقه النوازل): যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞান, শেয়ার মার্কেট, ব্যাংকিং, অনলাইন লেনদেন ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো যে নিত্যনতুন জটিল বিষয়ের উদ্ভব ঘটছে, ফিকহী ইজতিহাদের মাধ্যমেই সেগুলোর সমাধান প্রদান সম্ভব হয়।
  4. পারিবারিক ও সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠা: বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার বণ্টন, প্রতিবেশীর হক ও সামাজিক চুক্তির শরয়ি কাঠামো ফিকহের ওপর নির্ভরশীল, যা সমাজে বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করে।
  5. দ্বীনের সঠিক ভারসাম্য রক্ষা ও চরমপন্থা দমন: ইলমুল ফিকহ মানুষকে কুরআন-সুন্নাহর বিধান বাস্তবায়নে ভারসাম্যপূর্ণ প্রজ্ঞা দান করে এবং বিভ্রান্তিকর চরমপন্থা থেকে রক্ষা করে।

ইলমুল ফিকহের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস (نشأة الفقه وتطوره)

ইলমুল ফিকহ একদিনে বর্তমান কাঠামো লাভ করেনি। এটি পর্যায়ক্রমিক ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে:

  1. প্রথম পর্যায়: নবুওয়াত ও রিসালাতের যুগ (عصر النبوة والرسالة):

    এ যুগে শরীয়তের আইনপ্রণেতা ছিলেন মহান আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.)। সাহাবায়ে কেরাম যেকোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হতেন এবং ওহী মাতলূ (কুরআন) বা ওহী গাইরে মাতলূ (হাদীস)-এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ফয়সালা লাভ করতেন। এ যুগে কোনো কৃত্রিম মতভেদ বা পৃথক আইনশাস্ত্রের প্রয়োজন ছিল না।

  2. দ্বিতীয় পর্যায়: খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবায়ে কেরামের যুগ (عصر الخلفاء الراشدين):

    রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর ওহীর ধারা সমাপ্ত হয় এবং ইসলামী খেলাফত বিস্তৃতির সাথে সাথে নতুন নতুন জাতির সংস্কৃতি ও বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। হযরত আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী (রা.) কোনো নতুন সমস্যা আসলে প্রথমে কুরআনে খুঁজতেন, অতঃপর সুন্নাহে তালাশ করতেন। সেখানে না পেলে বিশিষ্ট সাহাবীদের একত্রিত করে শুরা বা পরামর্শভিত্তিক ইজতিহাদের মাধ্যমে ঐকমত্য (ইজমা) প্রতিষ্ঠা করতেন। এ যুগে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) কুফায় এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) মদীনায় ফিকহ চর্চায় অসামান্য অবদান রাখেন।

  3. তৃতীয় পর্যায়: তাবেয়ীনদের যুগ ও দুটি প্রধান ঘরানার উদ্ভব (عصر التابعين):

    উমাইয়্যা শাসনামলে সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েন। এ যুগে ফিকহের দুটি স্বতন্ত্র ধারা প্রকাশ পায়:

    • মাদরাসায়ে হাদীস (মদীনা কেন্দ্রিক): সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ও মদীনার সাত ফকীহ (الفقهاء السبعة)-এর নেতৃত্বে হাদীস ও সাহাবীদের আসার-এর ওপর সর্বোচ্চ নির্ভর করতেন।
    • মাদরাসায়ে রায় (ইরাক/কুফা কেন্দ্রিক): আলকামা ও ইবরাহীম নাখঈর নেতৃত্বে হাদীসের সাথে সাথে মাসআলার অন্তর্নিহিত হিকমত, যুক্তি ও কারণ অনুসন্ধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন।
  4. চতুর্থ পর্যায়: মাযহাব প্রতিষ্ঠা ও সংকলনের স্বর্ণযুগ (عصر الأئمة الأربعة والتدوين):

    দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরী শতাব্দীতে চার প্রধান ইমামের মাধ্যমে ফিকহ শাস্ত্র সুবিন্যস্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে:

    • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) (৮০-১৫০ হি.): কিয়াস, ইস্তিহসান ও সম্মিলিত শুরার ভিত্তিতে হানাফী মাযহাবের বিশাল ফিকহী সৌধ নির্মাণ করেন।
    • ইমাম মালিক (রহ.) (৯৩-১৭৯ হি.): মদীনার আমল ও মুওয়াত্তা সংকলনের মাধ্যমে মালেকী ধারা প্রতিষ্ঠা করেন।
    • ইমাম শাফেয়ী (রহ.) (১৫০-২০৪ হি.): উসূলে ফিকহের প্রথম গ্রন্থ ‘আর-রিসালাহ’ ও ‘কিতাবুল উম্ম’ রচনার মাধ্যমে উভয় ধারার অপূর্ব সমন্বয় ঘটান।
    • ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) (১৬৪-২৪১ হি.): হাদীস ও আসারের ওপর পূর্ণ নির্ভর করে হাম্বলী ধারা প্রতিষ্ঠা করেন।
  5. পঞ্চম পর্যায়: তাকলীদ ও তাখরীজের যুগ (عصر التقليد والتخريج):

    চতুর্থ হিজরীর পর থেকে মুজতাহিদ ফকীহগণের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে শাখা-প্রশাখার বিশ্লেষণ, তারজীহ ও ফতোয়া সংকলনের কাজ শুরু হয়। এ যুগে রচিত হয় হেদায়া, বাদায়েউস সানায়ে, আল-মাজমূ, আল-মুগনী ইত্যাদি কালজয়ী গ্রন্থ।

  6. ষষ্ঠ পর্যায়: আধুনিক যুগ ও সমষ্টিগত ইজতিহাদ (العصر الحديث والاجتهاد الجماعي):

    আধুনিক বিশ্বে ব্যক্তিগত ইজতিহাদের পরিবর্তে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমি’ (مجمع الفقه الإسلامي الدولي)-এর মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ আলেমগণ যৌথভাবে নতুন অর্থনৈতিক, চিকিৎসা ও প্রযুক্তিগত বিষয়ের সমাধান প্রদান করছেন।

উপসংহার

ইলমুল ফিকহ কেবল ইতিহাসের অতীতের কোনো স্মৃতি নয়, বরং তা হলো ইসলামী জীবনধারার চিরন্তন আলোকবর্তিকা। এর প্রয়োজনীয়তা সর্বকালে সর্বাবস্থায় বিদ্যমান এবং এর ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ প্রমাণ করে যে, ইসলামী শরীয়ত চিরকাল মানবজাতির পথপ্রদর্শনে সক্ষম।


٢- عرف البيع لغة واصطلاحا ، ثم بين أقسامه وأركانه وشروطه-

البيع এর আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয় দাও। অতঃপর এর প্রকার, রোকন ও শর্তাবলির বিবরণ দাও।

ভূমিকা

মানবজীবনের পারস্পরিক অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ এবং বৈধ পন্থায় সম্পদ আদান-প্রদানের জন্য আল্লাহ তাআলা ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন। পবিত্র কুরআনে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে:

«وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا»

অর্থ: “আর আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)।

বাই (البيع)-এর পরিচয়

১. আভিধানিক অর্থ: ‘বাই’ (البيع) শব্দটি ‘বা’ (باع) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার মূল অর্থ বাহু প্রসারিত করা (مد الباع); কারণ প্রাচীনকালে ক্রেতা ও বিক্রেতা চুক্তি সম্পাদনের সময় একে অপরের দিকে হাত বা বাহু প্রসারিত করত। আভিধানিক অর্থে বাই হলো: «مُبَادَلَةُ مَالٍ بِمَالٍ» অর্থাৎ মালের বিনিময়ে মাল বিনিময় করা। ক্রয় ও বিক্রয় উভয় অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: ফিকহের পরিভাষায় ‘হিদায়া’ প্রণেতা আল্লামা মারগীনানী (রহ.) বলেন:

«مُبَادَلَةُ مَالٍ بِمَالٍ بِالتَّرَاضِي عَلَى وَجْهٍ مَخْصُوصٍ»

অর্থ: “পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট পন্থায় মালের বিনিময়ে মাল বিনিময় করাকে البيع বলে।”

বাই-এর রোকন (أركان البيع)

হানাফী ফকীহগণের মতে, ক্রয়-বিক্রয়ের মূল রোকন হলো ইজাব ও কবুল (الإيجاب والقبول)—অর্থাৎ এক পক্ষের প্রস্তাব এবং অপর পক্ষের গ্রহণ, যা উভয়ের আন্তরিক সন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। পক্ষান্তরে জমহুর ফকীহগণের মতে বাই-এর রোকন তিনটি:

  1. আকিদাইন (العاقدان): ক্রেতা ও বিক্রেতা।
  2. সিগাহ (الصيغة): প্রস্তাব ও সম্মতি (ইজাব ও কবুল)।
  3. মা’কূদ আলাইহি (المعقود عليه): বিক্রিত পণ্য ও পণ্যের মূল্য।

বাই-এর প্রকারভেদ (أقسام البيع)

ইসলামী ফিকহে ক্রয়-বিক্রয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেণিবিভাগ করা হয়েছে:

১. বিনিময়ের প্রকৃতি অনুযায়ী:

  • বাইয়ে মুকায়েদ্বাহ (بيع المقايضة): পণ্যের বিনিময়ে পণ্য বিনিময় (Barter system)।
  • বাইয়ে সারফ (بيع الصرف): মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা বিনিময় (স্বর্ণের বদলে স্বর্ণ, টাকার বদলে ডলার ইত্যাদি)।
  • বাইয়ে মুত্বলাক (البيع المطلق): সাধারণ কেনাবেচা, অর্থাৎ মুদ্রার বিনিময়ে নির্দিষ্ট পণ্য কেনা।
  • বাইয়ে সালাম (بيع السلم): অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট মেয়াদে পণ্য গ্রহণের চুক্তি।
  • বাইয়ে ইসতিসনা (بيع الاستصناع): কোনো কারিগর বা ফ্যাক্টরিকে অর্ডার দিয়ে কোনো পণ্য তৈরি করিয়ে নেওয়ার চুক্তি।

২. মূল্যের প্রকৃতি ও স্বচ্ছতা অনুযায়ী:

  • মুরাবাহা (المرابحة): মূল ক্রয়মূল্য প্রকাশ করে নির্দিষ্ট লাভে বিক্রি করা।
  • তাওলিয়া (التولية): যে মূল্যে কেনা হয়েছে ঠিক একই মূল্যে কোনো লাভ ছাড়া বিক্রি করা।
  • ওয়াদীআহ (الوضيعة): ক্রয়মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে (ক্ষতিতে) বিক্রি করা।
  • মুসাওয়ামাহ (المساومة): ক্রয়মূল্য প্রকাশ না করে সাধারণ দরকষাকষির মাধ্যমে বিক্রি করা।

৩. শরয়ি হুকুম ও বৈধতা অনুযায়ী:

  • বাইয়ে সহীহ (البيع الصحيح): যা রোকন ও শর্তাবলি পূর্ণ করে সম্পাদিত হয় এবং তাৎক্ষণিক ফলদায়ক হয়।
  • বাইয়ে ফাসিদ (البيع الفاسد): যার মূল কাঠামো সঠিক কিন্তু কোনো ক্ষতিকর শর্তযুক্ত হওয়ার কারণে ত্রুটিপূর্ণ।
  • বাইয়ে বাতিল (البيع الباطل): যা রোকন বা শর্তের অভাবে সম্পূর্ণ অকার্যকর (যেমন মরা জীবজন্তু কেনাবেচা)।
  • বাইয়ে মাওকূফ (البيع الموقوف): যা অন্যের মালের ওপর অনুমতি ছাড়া সম্পাদিত হয় এবং আসল মালিকের সম্মতির ওপর স্থগিত থাকে।

বাই-এর শর্তাবলি (شروط البيع)

ক্রয়-বিক্রয় বিশুদ্ধ ও কার্যকর হওয়ার জন্য চার স্তরের শর্তাবলি বিদ্যমান:

  1. শর্তে ইনইকাদ (শর্তাবলি চুক্তি সংঘটিত হওয়ার জন্য): ক্রেতা-বিক্রেতার জ্ঞানবান (আকিল) হওয়া, পণ্যের অস্তিত্ব থাকা এবং পণ্যটি শরীয়তসম্মত মাল হওয়া।
  2. শর্তে সিহ্বাত (শর্তাবলি লেনদেন সহীহ হওয়ার জন্য): পণ্য ও মূল্য সুনির্দিষ্ট ও জ্ঞাত হওয়া (জাহালাত মুক্ত), জুয়া ও প্রতারণা মুক্ত হওয়া (গারার মুক্ত) এবং এতে কোনো সুদী শর্ত না থাকা।
  3. শর্তে নুফূয (শর্তাবলি কার্যকর হওয়ার জন্য): বিক্রেতার পণ্যের ওপর পূর্ণ মালিকানা বা আইনগত অভিভাবকত্ব (বিলায়াত) থাকা।
  4. শর্তে লুজূম (চুক্তি বাধ্যতামূলক হওয়ার জন্য): চুক্তিতে উভয় পক্ষের জন্য কোনো অবৈধ খিয়ার (পছন্দাধিকার) না থাকা এবং চুক্তিটি নিশ্চিত হওয়া।

উপসংহার

ইসলামী ফিকহে ক্রয়-বিক্রয়ের এ নীতিমালাগুলো মানুষের অর্থনৈতিক লেনদেনে পারস্পরিক জুলুম, প্রতারণা ও বিবাদ চিরতরে বন্ধ করে একটি স্বচ্ছ, ইনসাফপূর্ণ ও বরকতময় সমাজ গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে।


٣- هل يجوز للراهن أن ينتفع بالرهن؟ وما الخلاف فى ذلك؟ بين موضحا-

বন্ধকদাতার জন্য বন্ধকি বস্তু দ্বারা উপকৃত হওয়া জায়েজ আছে কি না? এ ব্যাপারে কী মতভেদ রয়েছে? সুস্পষ্ট বিবরণ দাও।

ভূমিকা

ইসলামী অর্থব্যবস্থায় ঋণ লেনদেনের নিশ্চয়তা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে ‘রাহন’ (الرهن বা বন্ধক) একটি স্বীকৃত শরয়ি বিধান। ঋণগ্রহীতা তার ঋণের জামানত হিসেবে ঋণদাতার কাছে কোনো সম্পদ আবদ্ধ রাখে। প্রশ্ন দেখা দেয়—বন্ধককৃত বস্তুর মূল মালিক যেহেতু বন্ধকদাতা (الراهن – রাহিন), সে কি বন্ধক চলাকালীন ঐ বস্তু থেকে কোনো প্রকার উপকার বা মুনাফা ভোগ করতে পারবে? এ বিষয়ে ফকীহগণের মধ্যে অত্যন্ত গভীর ও সূক্ষ্ম মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।

রাহনের পরিচয় ও মূলনীতি

আভিধানিকভাবে রাহন অর্থ আবদ্ধ রাখা (الحبس)। শরীয়তের পরিভাষায়:

«حَبْسُ شَيْءٍ مَالِيٍّ بِحَقٍّ يُمْكِنُ اسْتِيفَاؤُهُ مِنْهُ»

অর্থ: “এমন কোনো আর্থিক সম্পদ ঋণের বিপরীতে আটকে রাখা, যেখান থেকে ঋণ আদায় অসম্ভব হলে তা বিক্রি করে ঋণ উসুল করা সম্ভব।”

এখানে মূল নীতি হলো: বন্ধকি বস্তুর মূল মালিকানা (الملكية) থাকে বন্ধকদাতার (রাহিন), কিন্তু তার আটকে রাখার অধিকার (حق الاحتباس) থাকে বন্ধকগ্রহীতার (মুরতাহিন)।

বন্ধকদাতার (রাহিনের) বন্ধকি বস্তু থেকে উপকৃত হওয়ার বিধান ও ফকীহগণের মতভেদ

বন্ধকদাতার উপকার ভোগ করার বিষয়ে ফকীহগণের মূল দৃষ্টিভঙ্গি তিনটি প্রধান ধারায় বিভক্ত:

  1. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফী মাযহাবের অভিমত:

    হানাফী ফকীহগণের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত হলো—বন্ধকদাতা (রাহিন) বন্ধকগ্রহীতার (মুরতাহিন) সম্মতি ছাড়া কোনো অবস্থাতেই বন্ধকি বস্তু দ্বারা উপকৃত হতে পারবে না।

    • যুক্তি: বন্ধকি বস্তুর ওপর মুরতাহিনের ‘হস্তগত রাখার অধিকার’ (حق الحبس) পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত। রাহিন যদি তা ব্যবহার করতে শুরু করে (যেমন বন্ধকি বাড়িতে বাস করা বা বন্ধকি গাড়ি চালানো), তবে মুরতাহিনের হাত থেকে বস্তুটি কার্যত বের হয়ে যায়, ফলে বন্ধকের মূল উদ্দেশ্য (ঋণের নিরাপত্তা) ব্যাহত হয়।
    • অনুমতি সাপেক্ষে: তবে মুরতাহিন যদি সানন্দে অনুমতি দেয়, তবে রাহিন উপকৃত হতে পারবে, بشرط أن لا ينقص من قيمته (শর্ত হলো এর ফলে বন্ধকের মূল্য হ্রাস পেতে পারবে না)। যদি রাহিন অনুমতি ছাড়া জোরপূর্বক ব্যবহার করে এবং বস্তুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে রাহিন ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে।
  2. ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম মালিক (রহ.)-এর অভিমত:

    শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবের মতে, রাহিন বন্ধকি বস্তুর প্রকৃত মালিক। সুতরাং সে এমন সকল প্রকার উপকার ভোগ করতে পারবে যা বন্ধকি বস্তুর নিরাপত্তা ও মূল্যকে ক্ষুণ্ণ করে না।

    • যুক্তি: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

      «لاَ يُغْلَقُ الرَّهْنُ مِنْ صَاحِبِهِ الَّذِي رَهَنَهُ، لَهُ غُنْمُهُ وَعَلَيْهِ غُرْمُهُ»

      অর্থ: “বন্ধক তার প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে হাতছাড়া হয়ে যায় না; এর যাবতীয় লাভ-মুনাফা তার জন্যই এবং এর ক্ষয়ক্ষতিও তার ওপর বর্তাবে।” (দারা কুতনী, বায়হাকী)।

      অতএব, বন্ধকি গাছের ফলমূল, ছাগলের দুধ বা ফসলের মালিক রাহিন। তবে সে এমন কোনো ব্যবহার করতে পারবে না যা মুরতাহিনের জিম্মাদারীকে বিনষ্ট করে।

  3. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ও হাম্বলী মাযহাবের অভিমত:

    হাম্বলী মাযহাবের মতে, বন্ধকি বস্তুটি যদি বাহনযোগ্য পশু বা দুগ্ধবতী প্রাণী হয়, তবে যে ব্যক্তি তার খাদ্য ও লালন-পালনের খরচ বহন করবে, সে তার বিনিময়ে দুধ পান ও পিঠে চড়ার অধিকার পাবে। হাদীস শরীফে এসেছে:

    «الرَّهْنُ يُرْكَبُ بِنَفَقَتِهِ إِذَا كَانَ مَرْهُونًا، وَلَبَنُ الدَّرِّ يُشْرَبُ بِنَفَقَتِهِ إِذَا كَانَ مَرْهُونًا، وَعَلَى الَّذِي يَرْكَبُ وَيَشْرَبُ النَّفَقَةُ»

    অর্থ: “বন্ধকি পশুর পিঠে আরোহণ করা যাবে তার খরচের বিনিময়ে, আর দুগ্ধবতী পশুর দুধ পান করা যাবে তার খরচের বিনিময়ে। আর যে আরোহণ করবে বা দুধ পান করবে, তাকেই এর খরচ বহন করতে হবে।” (সহীহ বুখারী: ২৫১২)।

ঋণদাতার (মুরতাহিনের) উপকার ভোগের সাথে তুলনা ও সতর্কতা

স্মরণীয় যে, ঋণদাতা (মুরতাহিন)-এর জন্য বন্ধকি জমি চাষ করা, বাড়ি ভাড়া নেওয়া বা গাড়ি ব্যবহার করা সম্পূর্ণরূপে হারাম ও সুদের অন্তর্ভুক্ত। কারণ ফিকহের সর্বসম্মত উসূল হলো:

«كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا»

অর্থ: “যে ঋণ কোনো সুবিধা বা মুনাফা বয়ে আনে, তা-ই সুদ।”

অতএব, উপকৃত হওয়ার যে কোনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কেবল রাহিন (মূল মালিক) কেন্দ্রিক হতে পারে, মুরতাহিন কেন্দ্রিক নয়।

সারসংক্ষেপ

সারকথা হলো, বন্ধকদাতা তার মালিকানাস্বত্বে বহাল থাকলেও বন্ধকের সুরক্ষার স্বার্থে মুরতাহিনের হক নষ্ট করতে পারে না। অতএব, উভয় পক্ষের সম্মতি এবং বন্ধকের মূল্যের কোনো অপচয় না ঘটলে রাহিনের উপকার ভোগ করা শরীয়তসম্মতভাবে অনুমোদিত।


٤- اذكر اللباس الممنوع للرجال والنساء ، ثم بين القدر المرخص للرجال من لبس الحرير فى عامة الأحوال-

পুরুষ ও মহিলাদের জন্য নিষিদ্ধ পোশাকের বিবরণ দাও। অতঃপর পুরুষদের জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় রেশমি কাপড় পরিধানের অনুমোদিত পরিমাণ সম্পর্কে আলোচনা কর।

ভূমিকা

ইসলাম মানবজীবনের সৌন্দর্য ও শালীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। পোশাক কেবল লজ্জা নিবারণের মাধ্যম নয়, বরং তা মানুষের ঈমান, আত্মমর্যাদা ও তাকওয়ার বহিঃপ্রকাশ। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

«يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ»

অর্থ: “হে বনী আদম! আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং সৌন্দর্য বিধান করে; আর তাকওয়ার পোশাকই হলো সর্বোত্তম।” (সূরা আল-আ’রাফ: ২৬)।
ইসলামে পোশাকের স্বাধীনতা থাকলেও নারী ও পুরুষের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু পোশাক পরিধান করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

পুরুষদের জন্য নিষিদ্ধ পোশাকসমূহ (لباس الرجال الممنوع)

  1. খাঁটি রেশমি পোশাক (الحرير الخالص): পুরুষদের জন্য খাঁটি রেশমি বস্ত্র পরিধান করা সর্বসম্মতভাবে হারাম।
  2. স্বর্ণখচিত ও স্বর্ণালঙ্কারযুক্ত পোশাক: স্বর্ণমিশ্রিত বা স্বর্ণখচিত জামাকাপড় পরা পুরুষদের জন্য নিষিদ্ধ।
  3. নারীদের সদৃশ পোশাক (تشبه الرجال بالنساء): যেসব পোশাক সাধারণত নারীরা পরিধান করে, পুরুষদের জন্য তা পরা অভিশপ্ত কাজ। হাদীসে এসেছে: রাসূলুল্লাহ (সা.) ঐসব পুরুষকে অভিসম্পাত করেছেন যারা নারীদের বেশ ধারণ করে (সহীহ বুখারী)।
  4. টাখনুর নিচে পোশাক ঝুলিয়ে পরা (إسبال الإزار): অহংকারবশত পায়ের গিরার (টাখনুর) নিচে পায়জামা, লুঙ্গি বা জুব্বা ঝুলিয়ে পরা হারাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “লুঙ্গির যে অংশ টাখনুর নিচে যাবে তা জাহান্নামে জ্বলবে।” (সহীহ বুখারী)।
  5. অহংকার ও আত্মপ্রদর্শনের পোশাক (لباس الشهرة والخيلاء): সমাজে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে বা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে চরম জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরা নিষিদ্ধ।
  6. অমুসলিমদের ধর্মীয় প্রতীকযুক্ত পোশাক: ক্রুশ বা বিধর্মীদের ধর্মীয় নিদর্শনযুক্ত পোশাক পরা হারাম।
  7. অতিরিক্ত পাতলা পোশাক: যা পুরুষের নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত সতরকে প্রকাশ করে দেয়।

নারীদের জন্য নিষিদ্ধ পোশাকসমূহ (لباس النساء الممنوع)

  1. পাতলা ও স্বচ্ছ পোশাক (الملابس الشفافة): যে কাপড়ে শরীরের ত্বক বা অবয়ব দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) এমন নারীদের ‘পোশাক পরিহিতা কিন্তু নগ্ন’ (كاسيات عاريات) বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং তাদের জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন (সহীহ মুসলিম)।
  2. অতিরিক্ত আঁটসাঁট পোশাক (الملابس الضيقة): যা শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গের গঠন ফুটিয়ে তোলে এবং ফিতনা সৃষ্টি করে।
  3. পুরুষের সদৃশ পোশাক (تشبه النساء بالرجال): পুরুষের পোশাক, প্যান্ট বা পুরুষের জন্য নির্ধারিত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত পোশাক নারীদের জন্য পরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  4. বেগানা পুরুষের সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী পোশাক (تبرج الجاهلية): ঘরের বাইরে পরপুরুষের সামনে অলঙ্কৃত, ঝকমকে ও সুগন্ধিযুক্ত পোশাক পরে বের হওয়া হারাম।
  5. খ্যাতি ও অহংকারের পোশাক (لباس الشهرة): অহংকার সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কৃত্রিম প্রদর্শনমূলক পোশাক।

পুরুষদের জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় রেশম ব্যবহারের অনুমোদিত পরিমাণ

মৌলিকভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) এক হাতে রেশম ও অপর হাতে স্বর্ণ গ্রহণ করে উম্মতকে দেখিয়ে ঘোষণা করেছিলেন:

«إِنَّ هَذَيْنِ حَرَامٌ عَلَى ذُكُورِ أُمَّتِي، حِلٌّ لِإِنَاثِهِمْ»

অর্থ: “নিশ্চয়ই এ দুটি বস্তু (স্বর্ণ ও রেশম) আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম এবং নারীদের জন্য হালাল।” (সুনানে আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)।

তবে শরীয়ত পুরুষদের জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় ও বিশেষ প্রয়োজনে নিম্নোক্ত পরিমাণ রেশম ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করেছে:

  • ১. দুই, তিন বা চার আঙুল পরিমাণ রেশমের পাড় বা নকশা:

    জুব্বা, পাগড়ি বা জামার বর্ডারে, কলার বা হাতার মুখে দুই থেকে চার আঙুল চওড়া রেশমের বর্ডার বা নকশা থাকা সম্পূর্ণ বৈধ। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বর্ণনা করেন:

    «نَهَى نَبِيُّ اللَّهِ ﷺ عَنْ لُبْسِ الْحَرِيرِ إِلاَّ مَوْضِعَ إِصْبَعَيْنِ أَوْ ثَلاَثٍ أَوْ أَرْبَعٍ»

    অর্থ: “আল্লাহর নবী (সা.) পুরুষদের রেশম পরতে নিষেধ করেছেন—কেবল দুই, তিন বা চার আঙুল পরিমাণ জায়গা ব্যতীত।” (সহীহ মুসলিম: ২০৬৯)।

  • ২. মিশ্র কাপড় (রেশম ও তুলার সংমিশ্রণ):

    যদি কাপড়ের টানা বা বোনা উপাদানে রেশমের চেয়ে সুতা বা তুলার অংশ বেশি থাকে, তবে হানাফী ফকীহগণের মতে পুরুষদের জন্য তা পরিধান করা মাকরূহ নয় বরং মুবাহ।

  • ৩. চিকিৎসাজনিত বিশেষ প্রয়োজন:

    চর্মরোগ, চুলকানি বা উকুনের তীব্র উপদ্রবের কারণে পুরুষদের রেশমি কাপড় পরার বিশেষ অনুমতি রয়েছে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ ও হযরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.)-কে তাঁদের চর্মরোগের কারণে রেশমি জামা পরার অনুমতি দিয়েছিলেন।

উপসংহার

ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য শালীনতা, সতর আবৃতকরণ ও খোদাভীতির যে আদর্শ মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে, তা অনুসরণ করলেই মানবসমাজে চারিত্রিক পবিত্রতা ও পারিবারিক মর্যাদা সুনিশ্চিত হয়।


مجموعة (ب) : সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (যেকোনো ২টি প্রশ্নের উত্তর দাও: ৫ × ২ = ১০)

٥- بين الفرق بين البيع الباطل والبيع الفاسد-

البيع الفاسد ও البيع الباطل এর মধ্যকার পার্থক্য বর্ণনা কর।

উত্তর

হানাফী উসূলে ফিকহ ও আইনশাস্ত্রে বাতিল (الباطل) এবং ফাসিদ (الفاسد)-এর মধ্যে অত্যন্ত নিখুঁত ও মৌলিক পার্থক্য নিরূপণ করা হয়েছে, যা জমহুর ফকীহগণের চেয়ে ভিন্ন।

সংজ্ঞাগত পার্থক্য

  • বাইয়ে বাতিল (البيع الباطل): «مَا لاَ يَصِحُّ بِأَصْلِهِ وَلاَ بِوَصْفِهِ» অর্থাৎ যে ক্রয়-বিক্রয় তার মূল কাঠামো (রোকন) এবং বহিরাগত গুণাবলি (শর্ত)—উভয় দিক থেকেই শরীয়তসম্মত নয়, তাকে বাইয়ে বাতিল বলে। যেমন: পাগল বা অবুঝ শিশুর লেনদেন, কিংবা মৃত প্রাণী বা শূকর বিক্রি করা।
  • বাইয়ে ফাসিদ (البيع الفاسد): «مَا صَحَّ بِأَصْلِهِ وَبَطَلَ بِوَصْفِهِ» অর্থাৎ যে ক্রয়-বিক্রয়ের মূল ভিত্তি ও রোকন সঠিক, কিন্তু কোনো ত্রুটিপূর্ণ বহিরাগত গুণ বা শরীয়তবিরোধী শর্তের কারণে তা নষ্ট হয়েছে, তাকে বাইয়ে ফাসিদ বলে। যেমন: পণ্যের মূল্য বা বিতরণের মেয়াদ অজ্ঞাত রেখে বিক্রি করা, বা শর্তযুক্ত কেনাবেচা।

মৌলিক পার্থক্যের সারসংক্ষেপ ছক

পার্থক্যের বিষয় বাইয়ে বাতিল (البيع الباطل) বাইয়ে ফাসিদ (البيع الفاسد)
আইনগত ভিত্তি মূল ও গুণ উভয় দিক থেকেই অবৈধ ও শূন্য। মূলত বৈধ কিন্তু বাহ্যিক কোনো গুণ বা শর্তের কারণে অবৈধ।
মালিকানা সাব্যস্ত হওয়া পণ্য হস্তগত (ক্ববযা) করলেও কখনোই কোনো মালিকানা সৃষ্টি হয় না। বিক্রেতার অনুমতিতে পণ্য হস্তগত করলে ত্রুটিপূর্ণ মালিকানা সাব্যস্ত হয়।
চুক্তির পরিণতি চুক্তিটি শুরু থেকেই অস্তিত্বহীন; কোনো সংশোধন সম্ভব নয়। যদি ফাসিদ শর্তটি দূর করে দেওয়া হয়, তবে চুক্তিটি সহীহ রূপে কার্যকর হতে পারে।
চুক্তি বাতিলের হুকুম স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল। উভয় পক্ষের ওপর চুক্তিটি فسخ (ভেঙে দেওয়া) করা ওয়াজিব।
ক্ষতিপূরণের নীতি পণ্য ধ্বংস হলে আমানতদারের মতো ক্ষতিপূরণ দেয়। পণ্য ধ্বংস বা রূপান্তরিত হলে বাজারমূল্য (ক্বিমাত) পরিশোধ করতে হয়।

٦- عرف الربوا مع بيان أسبابه-

الربوا এর কারণ বর্ণনাসহ এর পরিচয় দাও।

উত্তর

ইসলামী অর্থনীতিতে সবচেয়ে জঘন্য ও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ অর্থনৈতিক অপরাধ হলো রিবা (الربا – সুদ)। এটি সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণের মূল হাতিয়ার।

রিবার পরিচয়

১. আভিধানিক অর্থ: ‘রিবা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধি বা বেশি হওয়া (الزيادة والنماء)।
২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: হানাফী ফকীহগণের মতে:

«فَضْلُ مَالٍ خَالٍ عَنْ عِوَضٍ شُرِطَ لِأَحَدِ العَاقِدَيْنِ فِي مُعَاوَضَةِ مَالٍ بِمَالٍ»

অর্থ: “আর্থিক লেনদেনে কোনো এক পক্ষের জন্য কোনো শরয়ি বিনিময় ব্যতীত অতিরিক্ত যে মাল পূর্বশর্ত হিসেবে ধার্য করা হয়, তাকে রিবা বা সুদ বলে।”

রিবার কারণসমূহ (أسباب الربا / علة الربا)

রাসূলুল্লাহ (সা.) ছয়টি পণ্যের মধ্যে রিবার মূল ভিত্তি নির্ধারণ করে ইরশাদ করেছেন:

«الذَّهَبُ بِالذَّهَبِ، وَالْفِضَّةُ بِالْفِضَّةِ، وَالْبُرُّ بِالْبُرِّ، وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ، وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ، وَالْمِلْحُ بِالْمِلْحِ، مِثْلاً بِمِثْلٍ، يَدًا بِيَدٍ»

অর্থ: “স্বর্ণের বদলে স্বর্ণ, রৌপ্যের বদলে রৌপ্য, গমের বদলে গম, যবের বদলে যব, খেজুরের বদলে খেজুর এবং লবণের বদলে লবণ—সমান সমান ও হাতে হাতে বিক্রি করতে হবে।” (সহীহ মুসলিম: ১৫৮৪)।

এ হাদীসের আলোকে ফকীহগণ রিবার কারণ বা ইল্লত (علة) নির্ণয় করেছেন:

  1. হানাফী মাযহাবের মতে: রিবার কারণ হলো দুটি—সমজাতীয়তা (اتحاد الجنس) এবং পরিমাণযোগ্যতা (القدر)—অর্থাৎ পণ্যটি ওজনযোগ্য (وزني) অথবা পাত্রে পরিমাপযোগ্য (كيلي) হওয়া। এই দুটি পাওয়া গেলে অতিরিক্ত গ্রহণ হারাম এবং বাকি বিক্রিও হারাম।
  2. শাফেয়ী মাযহাবের মতে: রিবার কারণ হলো স্বর্ণ ও রৌপ্যের ক্ষেত্রে ‘মূল্যমান হওয়া’ (الثمنية) এবং বাকি চার পণ্যের ক্ষেত্রে ‘খাদ্যদ্রব্য হওয়া’ (الطعم বা الأقوات)।
  3. মালেকী মাযহাবের মতে: কারণ হলো খাদ্য হওয়া এবং তা ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণযোগ্য (الادخار والاقتيات) হওয়া।

মূলত কোনো পরিমাপযোগ্য বা সমজাতীয় পণ্যে বিনা মূল্যে অতিরিক্ত গ্রহণ করাই রিবার মূল কারণ।


٧- متى ينعقد الرهن وبم يصح؟ بين بالإيجاز-

الرهن কখন সংঘটিত হয় এবং কীসের বিনিময়ে তা বিশুদ্ধ? সংক্ষেপে বিবরণ দাও।

উত্তর

ইসলামী ফিকহে ‘রাহন’ (বন্ধক) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আর্থিক জিম্মানামা চুক্তি। এর সংঘটিত হওয়া ও বিশুদ্ধতার সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে:

রাহন কখন সংঘটিত হয় (متى ينعقد الرهن)

হানাফী ফিকহ অনুসারে রাহন মূলত ইজাব ও কবুল (الإيجاب والقبول) অর্থাৎ বন্ধকদাতা ও বন্ধকগ্রহীতার প্রস্তাব ও সম্মতির মাধ্যমে সংঘটিত হয়।
তবে চুক্তিটি তামাম ও লাযিম (পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর) হওয়ার জন্য পণ্যটি ঋণদাতার হাতে হস্তান্তর বা ক্ববযা (القبض) করা অপরিহার্য শর্ত। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

«فَرِهَانٌ مَّقْبُوضَةٌ»

অর্থ: “তবে হস্তগত বন্ধক রাখা বিধেয়।” (সূরা আল-বাকারা: ২৮৩)।
অতএব, মৌখিক চুক্তির মাধ্যমে ইনইকাদ হলেও পণ্য হস্তান্তর না করা পর্যন্ত রাহিন যে কোনো সময় তা প্রত্যাহার করতে পারে; কিন্তু হস্তান্তরের পর চুক্তিটি অপরিহার্য (লাযিম) হয়ে যায়।

কীসের বিনিময়ে রাহন সহীহ হয় (بم يصح الرهن)

রাহন বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো থাকা আবশ্যক:

  1. সাব্যস্ত ঋণ (الدين الثابت الواجب): এমন ঋণ যার অস্তিত্ব নিশ্চিত এবং যা আদায় করা অপর পক্ষের ওপর ওয়াজিব। ভবিষ্যতের কাল্পনিক ঋণের জন্য বন্ধক সহীহ নয়।
  2. মূল্যবান ও বৈধ মাল (مال متقوم مقدور التسليم): বন্ধকি বস্তুটি এমন হতে হবে যার শরয়ি মূল্য আছে, যা অস্তিত্বশীল এবং যা হস্তান্তর করা সম্ভব। মদ বা শূকর বন্ধক রাখা সহীহ নয়।
  3. সুদ ও অবৈধ শর্তমুক্ত হওয়া: বন্ধক কেবল ঋণের নিরাপত্তার জন্য হতে হবে; ঋণদাতা বন্ধকি বস্তু ব্যবহার করে কোনো প্রকার সুদ বা মুনাফা গ্রহণ করার শর্ত জুড়ে দিলে রাহন ফাসিদ হয়ে যাবে।

٨- بين حكم التختم بالذهب والفضة والحجر مختصرا-

সংক্ষেপে স্বর্ণ, রৌপ্য ও পাথরের আংটির বিধান বর্ণনা কর।

উত্তর

ইসলামী শরীয়ত মানব স্বভাবজাত সৌন্দর্যচর্চাকে উৎসাহিত করেছে, তবে নারী ও পুরুষের মর্যাদা ও স্বভাব অনুযায়ী অলঙ্কারের বিধানে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করেছে।

১. স্বর্ণের আংটি পরিধানের বিধান (التختم بالذهب)

  • পুরুষদের জন্য: পুরুষদের জন্য স্বর্ণের আংটি পরিধান করা সর্বসম্মতভাবে হারাম ও কবিরা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) এক সাহাবীর হাতে স্বর্ণের আংটি দেখে তা টেনে খুলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বললেন:

    «يَعْمِدُ أَحَدُكُمْ إِلَى جَمْرَةٍ مِنْ نَارٍ فَيَجْعَلُهَا فِي يَدِهِ»

    অর্থ: “তোমাদের কেউ কি নিজের হাতে জ্বলন্ত আগুনের অঙ্গার রাখতে চায়?” (সহীহ মুসলিম: ২০৯০)।

  • নারীদের জন্য: নারীদের জন্য স্বর্ণের আংটি ও যেকোনো স্বর্ণালঙ্কার পরিধান করা সম্পূর্ণ হালাল ও মুবাহ

২. রৌপ্যের আংটি পরিধানের বিধান (التختم بالفضة)

  • পুরুষদের জন্য: পুরুষদের জন্য রৌপ্যের আংটি পরিধান করা সুন্নাত বা মুবাহ। বিশেষ করে রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক বা যাদের সিলমোহর ব্যবহার করতে হয় তাঁদের জন্য এটি সুন্নাত। তবে শর্ত হলো আংটিটি এক মিসকাল (৪.৩৭ গ্রাম বা প্রায় সাড়ে চার মাশা)-এর কম ওজনের হতে হবে এবং একাধিক আংটি পরা যাবে না।
  • নারীদের জন্য: নারীদের জন্য রৌপ্যের আংটি পরা সর্বসম্মতভাবে বৈধ।

৩. পাথরের আংটির বিধান (التختم بالحجر والأحجار الكريمة)

রৌপ্যের আংটির মধ্যে আকিক, ইয়াকুত, ফিরোজা বা যে কোনো মূল্যবান বা সাধারণ পাথর বসিয়ে পরিধান করা পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য জায়েজ ও মুবাহ। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে:

«كَانَ خَاتَمُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ مِنْ وَرِقٍ، وَكَانَ فَصُّهُ حَبَشِيًّا»

অর্থ: “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আংটি ছিল রূপার এবং তাতে খচিত পাথরটি ছিল হাবশী।” (সহীহ মুসলিম: ২০৯৪)।
তবে লোহা, তামা, কাঁসা বা পিতলের আংটি পরিধান করা পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য মাকরূহ।


الجزء الثاني : أصول الفقه (দ্বিতীয় অংশ: উসূলে ফিকহ) [মান: ৪০]

مجموعة (أ) : বিশদ রচনামূলক প্রশ্নাবলি (যেকোনো ২টি প্রশ্নের উত্তর দাও: ১৫ × ২ = ৩০)

٩- عرف أصول الفقه ، ثم بين نشأته وتطوره مع بيان موضوعه وغرضه-

أصول الفقه এর পরিচয় দাও। অতঃপর এর আলোচ্য বিষয় ও উদ্দেশ্যসহ উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বর্ণনা কর।

ভূমিকা

ইসলামী আইনবিজ্ঞানের দর্শন ও মৌলিক কার্যপদ্ধতি যে শাস্ত্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তা-ই হলো ইলমে উসূলে ফিকহ (علم أصول الفقه)। এটি মূলত শরীয়তের আইন প্রণয়নের পদ্ধতিবিদ্যা (Methodology of Islamic Jurisprudence)। কুরআন ও সুন্নাহর অতল সমুদ্র থেকে কীভাবে বিধানাবলি আহরণ ও নির্গত করতে হবে, উসূলে ফিকহ সেই নির্ভুল কম্পাস হিসেবে কাজ করে।

উসূলে ফিকহের পরিচয়

উসূলে ফিকহের পরিচয় দুই দিক থেকে দেওয়া যায়:

১. যৌগিক বা সংযোজিত (তারকীবী) অর্থ:

  • উসূল (الأصول): ‘উসূল’ শব্দটি ‘আসল’ (الأصل)-এর বহুবচন। আসল অর্থ ভিত্তি বা মূল (ما يُبنى عليه غيره)—যার ওপর অন্য কিছু প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • ফিকহ (الفقه): আভিধানিক অর্থ গভীর প্রজ্ঞা ও সূক্ষ্ম বুঝ। শরঈ পরিভাষায়: বিস্তারিত দলীল থেকে ইস্তিম্বাত প্রক্রিয়ায় আহরিত ব্যবহারিক শরয়ি বিধানের জ্ঞান।
  • অতএব, শাব্দিক সংযোগে উসূলে ফিকহ হলো—যেসব মূল ভিত্তির ওপর ফিকহ শাস্ত্র প্রতিষ্ঠিত।

২. একক শাস্ত্র বা পারিভাষিক (লকবী) অর্থ:
একক বিজ্ঞান হিসেবে উসূলে ফিকহের প্রামাণ্য সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ইমামুল হারামাইন আল-জুওয়াইনী ও কাজী বায়যাবী (রহ.) বলেন:

«القَوَاعِدُ وَالبُحُوثُ الَّتِي يُتَوَصَّلُ بِهَا إِلَى اسْتِفَادَةِ الأَحْكَامِ الشَّرْعِيَّةِ العَمَلِيَّةِ مِنْ أَدِلَّتِهَا التَّفْصِيلِيَّةِ»

অর্থ: “এমন সব সাধারণ মূলনীতি ও প্রণালীবদ্ধ গবেষণা, যার মাধ্যমে বিস্তারিত দলীলসমূহ থেকে ব্যবহারিক শরয়ি বিধানাবলি উদ্ভাবন করা যায়।”

উসূলে ফিকহের আলোচ্য বিষয় (موضوع أصول الفقه)

উসূলে ফিকহের মূল আলোচ্য বিষয় হলো শরীয়তের সামগ্রিক দলীলসমূহ (الأدلة الإجمالية / الكلية) এবং এগুলোর মাধ্যমে বিধান সাব্যস্ত হওয়ার পদ্ধতি (كيفية دلالتها على الأحكام)
প্রধান চারটি মৌলিক দলীল হলো:

  1. আল-কুরআনুল কারীম (الكتاب)।
  2. সুন্নাহ বা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত (السنة)।
  3. ইজমা বা উম্মতের মুজতাহিদগণের ঐকমত্য (الإجماع)।
  4. কিয়াস বা যৌক্তিক সাদৃশ্যমূলক অনুসিদ্ধান্ত (القياس)।

এছাড়াও ইস্তিহসান, ইসতিসহাব, মাসালিহে মুরসালাহ, উরফ ও সাদদুয যারায়ে’ উসূলে ফিকহের আলোচ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত।

উসূলে ফিকহের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য (غرض / فائدة أصول الفقه)

  1. ইস্তিম্বাত ও গবেষণার নির্ভুল জ্ঞান অর্জন: মুজতাহিদ ফকীহ কীভাবে কুরআন-সুন্নাহর শব্দগত কাঠামো (আম, খাস, মুজমাল, মুফাস্সাল, মুত্বলাক, মুক্বাইয়্যাদ) থেকে সঠিক বিধান বের করবেন তা শিক্ষা দেওয়া।
  2. ভুল ব্যাখ্যা ও স্বেচ্ছাচারিতা রোধ: শরীয়তের নصوص নিয়ে ব্যক্তিগত খেয়ালখুশিমতো মনগড়া অপব্যাখ্যার পথ চিরতরে বন্ধ করা।
  3. আধুনিক সমস্যার সমাধান নিশ্চিতকরণ: যুগে যুগে নতুন সমস্যার ক্ষেত্রে পূর্বতন ইমামদের গৃহীত উসূল প্রয়োগ করে সঠিক ফয়সালা দান করা।
  4. মাযহাবের ইমামগণের দলীল অনুধাবন: সাধারণ আলেম ও গবেষকদের জন্য চার ইমামের পারস্পরিক ইখতিলাফের গভীর কারণ ও দলীলের সৌন্দর্য উপলব্ধি করার যোগ্যতা সৃষ্টি করা।
  5. আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীনের হেফাজত: শরীয়তের মূল চেতনা অক্ষুণ্ণ রেখে মানবজাতির সামগ্রিক কল্যাণ সাধন।

উসূলে ফিকহের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ (نشأته وتطوره)

উসূলে ফিকহ শাস্ত্রের বিকাশ তিনটি প্রধান ঐতিহাসিক ধাপে সম্পন্ন হয়েছে:

  1. প্রথম ধাপ: প্রাথমিক যুগ (সাহাবা ও তাবেয়ীনদের যুগ):

    রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় ওহীর উপস্থিতির কারণে উসূলের আলাদা শাস্ত্রীয় রূপের প্রয়োজন ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম আরবি ভাষার স্বভাবজাত দক্ষতা ও নববী সাহচর্যের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নাসের অর্থ ও মাক্বাসিদ বুঝতেন। তাঁরা কুরআন, সুন্নাহ ও কিয়াসের প্রয়োগ করতেন, কিন্তু তা কোনো পুস্তকে লিপিবদ্ধ ছিল না।

  2. দ্বিতীয় ধাপ: সংকলনের সূচনা (ইমাম শাফেয়ী রহ.-এর যুগ):

    দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীর শেষভাগে আরবি ভাষার মধ্যে অনারবদের মিশ্রণ ঘটায় ভাষাগত জটিলতা তৈরি হয় এবং রায় ও হাদীসপন্থীদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। এমতাবস্থায় ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী (রহ.) (১৫০-২০৪ হি.) সর্বপ্রথম উসূলে ফিকহের পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ ‘আর-রিসালাহ’ (الرسالة) রচনা করেন। তিনি কুরআন, সুন্নাহর স্তরভেদ, নাসিখ-মানসূখ, আম-খাস এবং কিয়াসের শর্তাবলি সুশৃঙ্খলভাবে লিপিবদ্ধ করে এ শাস্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা জনকের গৌরব অর্জন করেন।

  3. তৃতীয় ধাপ: সংকলন ধারার বিভক্তি ও বিকাশ:

    ইমাম শাফেয়ীর পর উসূলে ফিকহ রচনার দুটি প্রধান পদ্ধতি গড়ে ওঠে:

    • ত্বরীকাতুল মুতাকাল্লিমীন বা শাফেয়ী পদ্ধতি: ফিকহী শাখা-প্রশাখার পরোয়া না করে বিশুদ্ধ যৌক্তিক ও ভাষাতাত্ত্বিক নিয়মের ভিত্তিতে উসূল প্রণয়ন। এর প্রধান গ্রন্থ: ইমাম গাযালীর ‘আল-মুসতাসফা’ এবং কাজী আব্দুল জব্বারের ‘আল-উমাদ’।
    • ত্বরীকাতুল ফুক্বাহা বা হানাফী পদ্ধতি: ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর প্রধান ছাত্রগণের প্রদত্ত ফতোয়া ও শাখা মাসআলার ওপর ভিত্তি করে উসূল নির্ণয়। এর প্রধান গ্রন্থ: ইমাম জাস্সাসের ‘উসূলে জাস্সাস’, ইমাম দাবূসীর ‘তাকভীমুল আদিল্লাহ’, ইমাম সারাখসীর ‘উসূলে সারাখসী’ এবং ফখরুদ্দীন বাযদাবীর ‘উসূলে বাযদাবী’।
    • সমন্বিত পদ্ধতি (ত্বরীকাতুল মুতাআখখিরীন): পরবর্তী যুগের আলেমগণ উভয় ধারার সমন্বয় সাধন করেন। যেমন ইমাম ইবনুস সাআতির ‘বাদীউন নিযাম’, তাফতাযানীর ‘আত-তালবীহ আলাত তাওদ্বীহ’ এবং ইমাম আশ-শাতিবীর ‘আল-মুওয়াফাকাত’।

উপসংহার

উসূলে ফিকহ হলো ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের সর্বোত্তম আইনদর্শন। এটি শরীয়তকে স্থবিরতা থেকে মুক্ত করে চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা দান করেছে।


١٠- عرف السنة لغة وشرعا ، ثم بين أقسامها على طبق أصول الفقه-

السنة এর আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয় দাও। অতঃপর উসূলে ফিকহ অনুযায়ী তার প্রকারভেদ বর্ণনা কর।

ভূমিকা

ইসলামী শরীয়তের দ্বিতীয় মৌলিক উৎস এবং কুরআনে কারীমের অকাট্য প্রামাণ্য ব্যাখ্যা হলো আস-সুন্নাহ (السنة)। সুন্নাহ ছাড়া কুরআনের অনেক সংক্ষিপ্ত নির্দেশের বাস্তব রূপ অনুধাবন করা অসম্ভব। উসূলে ফিকহে সুন্নাহর অবস্থান অত্যন্ত সুউচ্চ ও সুসংজ্ঞায়িত।

সুন্নাহর পরিচয়

১. আভিধানিক অর্থ: ‘সুন্নাহ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো অনুসৃত পথ, রীতিনীতি বা চালচলন—তা ভালো হোক বা মন্দ (السيرة والطريقة المتبعة، حسنة كانت أو قبيحة)। হাদীস শরীফে এসেছে:

«مَنْ سَنَّ فِي الإِسْلاَمِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا»

অর্থ: “যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো ভালো রীতির প্রচলন করবে, সে তার প্রতিদান পাবে এবং যারা সে অনুযায়ী আমল করবে তাদেরও প্রতিদান পাবে।” (সহীহ মুসলিম: ১০১৭)।

২. উসূলে ফিকহের পরিভাষায় সুন্নাহর সংজ্ঞা:
মুহাদ্দিসীনদের কাছে সুন্নাহ ও হাদীস সমার্থক হলেও উসূলে ফিকহের ফকীহগণের দৃষ্টিতে সুন্নাহর সংজ্ঞা হলো:

«مَا صَدَرَ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ غَيْرَ القُرْآنِ مِنْ قَوْلٍ أَوْ فِعْلٍ أَوْ تَقْرِيرٍ مِمَّا يَصْلُحُ أَنْ يَكُونَ دَلِيلاً لِحُكْمٍ شَرْعِيٍّ»

অর্থ: “পবিত্র কুরআন ব্যতীত রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে প্রকাশিত এমন সকল বাণী, কর্ম ও মৌনসম্মতি—যা শরয়ি বিধানের জন্য দলীল হওয়ার উপযুক্ত, তাকে সুন্নাহ বলে।”

উসূলে ফিকহ অনুযায়ী সুন্নাহর প্রকারভেদ (أقسام السنة)

উসূলে ফিকহে সুন্নাহকে প্রধানত দুটি মৌলিক দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেণিবিভাগ করা হয়:

প্রথমত: প্রকৃতি বা স্বরূপ অনুযায়ী (من حيث طبيعتها)

  1. সুন্নাতে ক্বাওলিয়্যা (السنة القولية – বাচনিক সুন্নাহ): রাসূলুল্লাহ (সা.) শরয়ি বিধান বর্ণনার উদ্দেশ্যে নিজ মুখে যা বলেছেন। যেমন: «إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ» (নিশ্চয়ই যাবতীয় আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল)।
  2. সুন্নাতে ফিয়লিয়্যা (السنة الفعلية – কর্মগত সুন্নাহ): রাসূলুল্লাহ (সা.) যা নিজে বাস্তবে আমল করে উম্মতকে দেখিয়েছেন। যেমন নামায আদায়ের পদ্ধতি ও হজ্জের তাওয়াফ-সায়ী। ইরশাদ হয়েছে: «صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي» (তোমরা সেভাবে নামায পড় যেভাবে আমাকে নামায পড়তে দেখেছ)।
  3. সুন্নাতে তাক্বরীরিয়্যা (السنة التقريرية – মৌনসম্মতিমূলক সুন্নাহ): রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে কোনো সাহাবী কোনো কথা বলেছেন বা কাজ করেছেন, আর তিনি তা দেখে বা জেনেও নিষেধ করেননি বরং নীরব থেকে সম্মতি দিয়েছেন। যেমন তায়াম্মুম করে নামায পড়ার পর পানি পেয়েও পুনরায় নামায না পড়ার ঘটনায় নবীজীর নীরব সম্মতি।

দ্বিতীয়ত: বর্ণনা ও সনদের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী (من حيث السند والورود)

হানাফী উসূলবিদগণের মতে সনদের বিশুদ্ধতা ও বর্ণনাকারীর সংখ্যা অনুযায়ী সুন্নাহ তিন প্রকার:

  1. সুন্নাতে মুতাওয়াতির (السنة المتواترة):

    যে সুন্নাহ রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে শুরু করে সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনের যুগে এমন বিপুল সংখ্যক রাবী বা বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন, যাদের সবার পক্ষে মিথ্যার ওপর একমত হওয়া স্বভাবতই অসম্ভব।

    • হুকুম: এটি নিশ্চিত জ্ঞান (علم قطعي ويقيني) দান করে। এর অস্বীকারকারী কাফির বলে গণ্য হয়।
  2. সুন্নাতে মাশহুর (السنة المشهورة):

    যে হাদীস সাহাবী যুগে এক বা দুইজন বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন (খবরে ওয়াহিদ ছিল), কিন্তু তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীন যুগে তা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়ে তাওয়াতুরের সীমায় পৌঁছেছে।

    • হুকুম: হানাফীদের মতে এটি পরম মানসিক তৃপ্তিদায়ক জ্ঞান (علم طمأنينة) দান করে। এর দ্বারা কুরআনের সাধারণ বিধানকে খাস (تخصيص) বা শর্তযুক্ত (تقييد) করা যায়। এর অস্বীকারকারী বিভ্রান্ত বা ফাসিক।
  3. সুন্নাতে আহাদ বা খবরে ওয়াহিদ (خبر الآحاد):

    যে হাদীসের বর্ণনাকারীর সংখ্যা কোনো যুগেই তাওয়াতুরের সীমায় পৌঁছেনি, অর্থাৎ এক, দুই বা অল্প কয়েকজন বর্ণনাকারী দ্বারা বর্ণিত হয়েছে।

    • হুকুম: এটি ধারণাপ্রসূত কিন্তু প্রবল জ্ঞান (علم ظني غالب) দান করে। আক্বীদা সাব্যস্ত না হলেও আমলগত বিষয়ে এর ওপর আমল করা ওয়াজিব।

উপসংহার

সুন্নাহ হলো কুরআনের বাস্তবায়ন রূপরেখা। উসূলে ফিকহের এ সুবিন্যস্ত শ্রেণিবিভাগ প্রমাণ করে যে, সাহাবা ও উসূলবিদগণ কত নিখুঁত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সুন্নাহর মর্যাদা ও প্রামাণিকতা সংরক্ষণ করেছেন।


١١- عرف القياس ، ثم بين أراء العلماء فى حجية القياس فى الأمور الدينية والدنيوية مدللا-

القياس এর পরিচয় দাও। অতঃপর দ্বীন ও দুনিয়ার বিষয়ে কিয়াস হুজ্জাত হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের অভিমত দলিলসহ বর্ণনা কর।

ভূমিকা

পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার পর ইসলামী শরীয়তের চতুর্থ সর্বসম্মত প্রামাণ্য উৎস হলো আল-কিয়াস (القياس)। কিয়াসের মাধ্যমেই ইসলামী শরীয়ত স্থান ও কালের পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন উদ্ভূত সকল সংকটের যৌক্তিক ও প্রামাণ্য শরয়ি ফয়সালা দান করতে সক্ষম হয়েছে।

কিয়াসের পরিচয়

১. আভিধানিক অর্থ: ‘কিয়াস’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো পরিমাপ করা বা দুই বস্তুর মাঝে সমতা বিধান করা (التقدير والمساواة)। যেমন বলা হয়: قست الثوب بالذراع (আমি গজ দিয়ে কাপড়টি পরিমাপ করলাম)।
২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলে ফিকহের পরিভাষায় صدر الشريعة ও ইমাম বাযদাবী বলেন:

«تَعْدِيَةُ الحُكْمِ مِنَ الأَصْلِ إِلَى الفَرْعِ لِعِلَّةٍ مُتَّحِدَةٍ لاَ تُدْرَكُ بِمُجَرَّدِ اللُّغَةِ»

সহজ কথায় জমহুর উসূলবিদদের মতে কিয়াসের সংজ্ঞা হলো:

«إِلْحَاقُ وَاقِعَةٍ لاَ نَصَّ عَلَى حُكْمِهَا بِوَاقِعَةٍ وَرَدَ نَصٌّ بِحُكْمِهَا، فِي الحُكْمِ الشَّرْعِيِّ لاِشْتِرَاكِهِمَا فِي عِلَّةِ الحُكْمِ»

অর্থ: “যে নতুন ঘটনার বিধানের ব্যাপারে সরাসরি কোনো নাস (কুরআন-সুন্নাহর বাণী) নেই, তাকে এমন পূর্বতন ঘটনার সাথে শরয়ি বিধানে একীভূত করা যার ব্যাপারে নাস বিদ্যমান—উভয় ঘটনার মাঝে বিধানের মূল কারণ (ইল্লত)-এ ঐক্য থাকার কারণে।”

কিয়াসের চারটি রোকন (أركان القياس)

  1. আসল (الأصل): যার বিধানের ব্যাপারে সরাসরি নাস রয়েছে (যেমন: মদ/খামর)।
  2. ফার’আ (الفرع): নতুন বিষয় যার বিধান কিয়াস করে বের করতে হবে (যেমন: হিরোইন বা ইয়াবা)।
  3. হুকমুল আসল (حكم الأصل): আসলের যে শরয়ি বিধান নাসে সাব্যস্ত (যেমন: মদের হারাম হওয়া)।
  4. ইল্লত (العلة): উভয়ের সাধারণ কার্যকারণ বা বৈশিষ্ট্য (যেমন: মাদকতা ও জ্ঞাননাশকতা)।

দ্বীন ও দুনিয়ার বিষয়ে কিয়াসের হুজ্জিয়াত (حجية القياس)-এ আলেমদের অভিমত ও দলীল

কিয়াস শরীয়তের দলীল বা হুজ্জাত কি না, এ ব্যাপারে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে প্রধানত দুটি ধারা বিদ্যমান:

১. জমহুর আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত (চার মাযহাবের ইমামগণ): কিয়াস শরীয়তের অকাট্য হুজ্জাত

ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ (রহ.) সর্বসম্মতভাবে একমত যে, যেসব বিষয়ে স্পষ্ট নাস বা ইজমা নেই, সেসব বিষয়ে কিয়াস শরীয়তের অন্যতম মৌলিক দলীল। তাঁদের দলীলসমূহ:

  • কুরআনী দলীল:

    «فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الأَبْصَارِ»

    অর্থ: “অতএব, হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা শিক্ষা ও সাদৃশ্য গ্রহণ করো।” (সূরা আল-হাশর: ২)। এখানে ‘ই’তিবার’ অর্থ এক বস্তুকে অপর বস্তুর সাথে তুলনা ও অনুধাবন করা, যা কিয়াসেরই নির্দেশ।

  • সুন্নাহর দলীল:

    হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রা.)-কে যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) ইয়েমেনে বিচারক হিসেবে পাঠান, তখন জিজ্ঞেস করলেন: কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলিল্লাহ-তে সমাধান না পেলে কী করবে? হযরত মুআয উত্তর দিলেন: «أَجْتَهِدُ رَأْيِي وَلاَ آلُو» (আমি আমার বুদ্ধিমত্তা ও কিয়াস দ্বারা ইজতিহাদ করব এবং কোনো ত্রুটি করব না)। রাসূলুল্লাহ (সা.) সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন (সুনানে তিরমিযী ও আবু দাউদ)।

  • সাহাবায়ে কেরামের ইজমা:

    সাহাবায়ে কেরাম বহু ক্ষেত্রে কিয়াস প্রয়োগ করেছেন। যেমন: হযরত আবু বকর (রা.)-কে খলীফা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাহাবীগণ কিয়াস করেছিলেন: “রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের দ্বীনের বিষয়ে (নামাযে) যাকে সন্তুষ্ট হয়ে ইমাম বানিয়েছেন, আমরা কি আমাদের দুনিয়ার বিষয়ে (খেলাফতে) তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হব না?”

২. জাহেরী মাযহাব ও কিয়াস অস্বীকারকারীদের অভিমত:

দাউদ জাহেরী এবং ইবনে হাযম আন্দালুসী (রহ.) কিয়াসকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তাঁদের মতে কিয়াস দ্বীনের মধ্যে অনুমানভিত্তিক রায় চাপিয়ে দেওয়া। তাঁদের দলীল: «وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ» (আমি আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি প্রতিটি বস্তুর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যারূপে) এবং «إِنَّ الظَّنَّ لا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا» (নিশ্চয়ই ধারণা সত্যের কোনো বিকল্প হতে পারে না)।

জমহুরের জবাব: কুরআনে সবকিছু থাকার অর্থ হলো এর মূলনীতি ও নির্দেশনার মধ্যে সবই নিহিত। আর কিয়াস কোনো মনগড়া রায় নয়, বরং তা নাসের ইল্লতকে খুঁজে বের করে নাসেরই নির্দেশ বাস্তবায়ন করে।

দ্বীনী বিষয় বনাম দুনিয়াবী বিষয়ে কিয়াসের প্রয়োগের পার্থক্য

  1. দ্বীনের তাওকীফিয়্যা বা ইবাদত সংক্রান্ত বিষয়ে কিয়াস চলে না:

    নামাযের রাকাত সংখ্যা, হজ্জের তওয়াফের চক্কর, যাকাতের সুনির্দিষ্ট নিসাব, কাফফারা ও হুদূদের পরিমাণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিয়াস প্রয়োগ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। ফিকহের উসূল হলো: «لاَ قِيَاسَ فِي التَّعَبُّدَاتِ وَالمُقَدَّرَاتِ»। কারণ এগুলোর ইল্লত মানববুদ্ধি দিয়ে চূড়ান্তভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

  2. মুয়ামালাত ও দুনিয়াবী লেনদেনের বিষয়ে কিয়াস অপরিহার্য:

    ব্যবসা-বাণিজ্য, চুক্তি, সমকালীন অপরাধের শাস্তি, নতুন মাদক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন সংকটের বিধান নির্ণয়ে কিয়াস হলো মূল হাতিয়ার।

উপসংহার

কিয়াস ইসলামী শরীয়তের গতিশীলতার চাবিকাঠি। শরীয়তের সার্বজনীনতা ও অমরত্ব রক্ষায় কিয়াসের হুজ্জিয়াত অনস্বীকার্য।


١٢- عرف الاجتهاد ، ثم بين حكمه وأقسامه وشروطه-

اجتهاد এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এর প্রকারভেদ, শর্তাবলি ও হুকুম বর্ণনা কর।

ভূমিকা

ইসলামী শরীয়তের বিধিবিধানকে কিয়ামত পর্যন্ত মানবজীবনের প্রতিটি যুগ ও পরিস্থিতির উপযোগী রাখার জীবন্ত চালিকাশক্তি হলো আল-ইজতিহাদ (الاجتهاد)। ওহীর সমাপ্তির পর দ্বীনী বিধানের গতিশীলতা ও উপযোগিতা ইজতিহাদের মাধ্যমেই রক্ষিত হয়।

ইজতিহাদের পরিচয়

১. আভিধানিক অর্থ: ‘ইজতিহাদ’ শব্দের মূল ধাতু হলো ‘জুহদ’ (الجهد বা الجَهد), যার অর্থ কোনো কঠিন কাজ সম্পাদনে নিজের পূর্ণ শক্তি, শ্রম ও সামর্থ্য ব্যয় করা (بذل الجهد واستفراغ الوسع)।
২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলে ফিকহের পরিভাষায় ইমাম গাযালী (রহ.) ‘আল-মুসতাসফা’ গ্রন্থে বলেন:

«اسْتِفْرَاغُ المُجْتَهِدِ وُسْعَهُ فِي طَلَبِ العِلْمِ بِالأَحْكَامِ الشَّرْعِيَّةِ»

জমহুর উসূলবিদদের সংজ্ঞানুযায়ী:

«اسْتِفْرَاغُ الفَقِيهِ وُسْعَهُ لِتَحْصِيلِ ظَنٍّ بِحُكْمٍ شَرْعِيٍّ عَمَلِيٍّ بِطَرِيقِ الاسْتِنْبَاطِ»

অর্থ: “একজন যোগ্য ফকীহ কর্তৃক বিস্তারিত শরয়ি দলীল থেকে ব্যবহারিক বিধান উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে নিজের পূর্ণ জ্ঞানীয় শক্তি ও সামর্থ্য নিয়োগ করাকে ইজতিহাদ বলে।”

ইজতিহাদের শরয়ি হুকুম (حكم الاجتهاد)

পরিস্থিতি ও ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে ইজতিহাদের হুকুম কয়েক ধরনের হতে পারে:

  1. ফরযে আইন (فرض عين): কোনো মুজতাহিদের সামনে যখন এমন কোনো নতুন মাসআলা উপস্থিত হয় যার তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন, এবং সেখানে দ্বিতীয় কোনো মুজতাহিদ বিদ্যমান না থাকে, তখন তাঁর ওপর ইজতিহাদ করা ফরযে আইন। অনুরূপভাবে মুজতাহিদের নিজের ব্যক্তিগত আমলের ক্ষেত্রেও তা ফরযে আইন।
  2. ফরযে কিফায়াহ (فرض كفاية): সাধারণ অবস্থায় উম্মতের মধ্যে ইজতিহাদের যোগ্যতা সম্পন্ন একদল আলেম বিদ্যমান থাকা ফরযে কিফায়াহ। যদি কেউ ইজতিহাদ না করে তবে সমগ্র উম্মত গুনাহগার হবে।
  3. মুস্তাহাব (مستحب): যে সমস্যা এখনো বাস্তব জীবনে ঘটেনি, ভবিষ্যতে ঘটতে পারে—এমন কাল্পনিক বিষয়ের শরয়ি সমাধান প্রস্তুত করে রাখা।
  4. হারাম বা নিষিদ্ধ (حرام): যেসব বিষয় কুরআন বা সুন্নাহর অকাট্য নাস (قطعي الدلالة) এবং উম্মতের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত, তাতে ইজতিহাদ করা সম্পূর্ণ হারাম। যেমন নামাযের পাঁচ ওয়াক্ত হওয়া, মদের হারাম হওয়া। উসূলের মূলনীতি হলো: «لاَ اجْتِهَادَ مَعَ النَّصِّ» (নাসের উপস্থিতিতে কোনো ইজতিহাদ চলে না)।

ইজতিহাদের প্রকারভেদ ও মুজতাহিদগণের স্তর (أقسام الاجتهاد ومراتبه)

  1. ইজতিহাদে মুতলাক বা মুস্তাক্বিল (الاجتهاد المطلق): স্বাধীন ইজতিহাদ, যেখানে মুজতাহিদ নিজেই আইন উদ্ভাবনের মৌলিক উসূল ও নীতিমালা তৈরি করেন এবং তার আলোকে সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিধান বের করেন। যেমন: চার ইমাম (ইমাম আবু হানিফা, মালিক, শাফেয়ী ও আহমদ রহ.)।
  2. ইজতিহাদুল মুনতাসিব বা ফিল মাযহাব (الاجتهاد في المذهب): ইমামের নির্ধারিত উসূল ও মূলনীতি অনুসরণ করে সরাসরি দলীল থেকে নতুন মাসআলার বিধান উদ্ভাবন করা। যেমন: ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)।
  3. ইজতিহাদুল মাসায়িল (الاجتهاد في المسائل): যে বিষয়ে মাযহাবের মূল ইমামদের সুস্পষ্ট ফতোয়া নেই, সেখানে তাঁদের মূলনীতি প্রয়োগ করে সমাধান দান। যেমন: ইমাম খাসসাফ, তাহাবী ও কারখী (রহ.)।
  4. আসহাবুত তাখরীজ ও আসহাবু তারজীহ: ইমামদের মতভেদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও যুগোপযোগী মতকে প্রাধান্য দেওয়া। যেমন: হেদায়া প্রণেতা আল্লামা মারগীনানী ও কুদূরী প্রণেতা (রহ.)।
  5. সমষ্টিগত ইজতিহাদ (الاجتهاد الجماعي): আধুনিক বিশ্বে একক ব্যক্তির পরিবর্তে বিভিন্ন দেশের ইসলামী বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ ও বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ফিকহ একাডেমি’র মাধ্যমে সমকালীন জটিল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

মুজতাহিদের শর্তাবলি (شروط المجتهد)

যেকোনো ব্যক্তি চাইলেই ইজতিহাদ করতে পারে না। মুজতাহিদ হওয়ার জন্য অপরিহার্য শর্তাবলি:

  • ১. কিতাবুল্লাহর গভীর জ্ঞান: বিশেষত কুরআনের আহকাম সংক্রান্ত আয়াতসমূহ (প্রায় ৫০০ আয়াত), নাসের প্রেক্ষাপট এবং শানে নুযূল জানা।
  • ২. সুন্নাহর অগাধ ইলম: আহকাম সংক্রান্ত হাদীসসমূহ, হাদীসের সহীহ-যঈফ যাচাই এবং সনদের বর্ণনাকারীদের অবস্থা (ইলমুল জারহ ওয়াত তা’দীল) জানা।
  • ৩. নাসিখ ও মানসূখের জ্ঞান: কুরআনের কোন বিধানটি কোন আয়াত বা হাদীস দ্বারা রহিত হয়েছে তা নির্ভুলভাবে জানা।
  • ৪. ইজমার স্থানসমূহ অবগত থাকা: যাতে তাঁর ইজতিহাদ পূর্ববর্তী উম্মতের সর্বসম্মত ঐকমত্যের বিপরীত না হয়।
  • ৫. আরবি ভাষা ও সাহিত্যে পূর্ণ পাণ্ডিত্য: নাহু, সরফ, বালাগাত ও আরবি ভাষার প্রয়োগরীতির ওপর অগাধ দখল থাকা।
  • ৬. উসূলে ফিকহ ও কিয়াসের ইল্লত বের করার প্রজ্ঞা (تخريج المناط): দলীল থেকে বিধান নিষ্কাশনের নিয়মাবলি জানা।
  • ৭. মাক্বাসিদুশ শারীয়াহ (শরীয়তের উচ্চতর লক্ষ্য) অনুধাবন: দ্বীন, জীবন, বংশ, সম্পদ ও বুদ্ধির নিরাপত্তার শরয়ি দর্শন জানা।
  • ৮. তাকওয়া ও ন্যায়পরায়ণতা (العدالة): সত্যের ওপর অবিচল এবং দুনিয়াবী লোভ-লালসা ও রাজনৈতিক চাপমুক্ত হওয়া।

উপসংহার

ইজতিহাদ হলো ইসলামী শরীয়তের এমন এক ইঞ্জিন যা উম্মাহকে কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নেতৃত্বদানের যোগ্যতা প্রদান করে। যোগ্য আলেমগণের মাধ্যমে এর চর্চা অব্যাহত রাখা উম্মাহর ঈমানী দায়িত্ব।


مجموعة (ب) : সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (যেকোনো ২টি প্রশ্নের উত্তর দাও: ৫ × ২ = ১০)

١٣- بين حجية السنة ومرتبتها فى التشريع الإسلامى-

শরয়ি আইনের ক্ষেত্রে سنة এর প্রামাণিকতা ও স্থান বর্ণনা কর।

উত্তর

ইসলামী শরীয়তের মূল কাঠামোতে সুন্নাহর প্রামাণিকতা (حجية السنة) এবং অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও অকাট্য।

সুন্নাহর প্রামাণিকতা (حجية السنة)

সুন্নাহ যে শরীয়তের দলীল ও বিধান রচনার অন্যতম উৎস, তা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত:

  1. পবিত্র কুরআন: আল্লাহ তাআলা রাসূলের আনুগত্যকে নিজের আনুগত্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন:

    «مَّن يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ»

    অর্থ: “যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে মূলত আল্লাহরই আনুগত্য করল।” (সূরা আন-নিসা: ৮০)।
    অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে: «وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا» (সূরা আল-হাশর: ৭)।

  2. হাদীস শরীফ: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

    «أَلاَ إِنِّي أُوتِيتُ الكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ»

    অর্থ: “জেনে রেখো! নিশ্চয়ই আমাকে কিতাব (কুরআন) দেওয়া হয়েছে এবং তার সাথে অনুরূপ আরেকটি বস্তুও (সুন্নাহ) দেওয়া হয়েছে।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪৬০৪)।

  3. ইজমায়ে উম্মাহ: সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে সকল যুগের উম্মাহর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, সহীহ সনদে প্রমাণিত সুন্নাহর অনুসরণ করা প্রত্যেক মুমিনের ওপর ওয়াজিব।

আইন প্রণয়নে সুন্নাহর মর্যাদা ও ভূমিকা (مرتبتها فى التشريع)

আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কুরআনের পরেই সুন্নাহর অবস্থান। কুরআনের সাপেক্ষে সুন্নাহ তিন ধরনের ভূমিকা পালন করে:

  • ১. কুরআনের বিধানের সমর্থক ও সুদৃঢ়কারী (مؤكدة لأحكام القرآن): যে বিধান কুরআনে আছে তা সুন্নাহ এসে সমর্থন করে; যেমন নামায, রোযা ও যাকাতের নির্দেশ।
  • ২. কুরআনের সংক্ষিপ্ত বিধানের ব্যাখ্যাকারী (مبينة ومفسرة لمجمل القرآن): কুরআনে নামায কায়েমের আদেশ আছে, কিন্তু ওয়াক্ত ও রাকাত সুন্নাহ বর্ণনা করেছে; কুরআনে যাকাত দিতে বলা হয়েছে, কিন্তু সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের নিসাব সুন্নাহ নির্ধারণ করেছে।
  • ৩. স্বাধীনভাবে নতুন বিধান প্রবর্তনকারী (منشئة ومثبتة لأحكام جديدة): যেসব বিধান কুরআনে সরাসরি আসেনি তা সুন্নাহ প্রণয়ন করেছে; যেমন—দাদী বা নানীর ওয়ারিশী স্বত্ব, গাধার গোশত ও নখযুক্ত হিংস্র প্রাণী খাওয়া হারাম হওয়া, এবং রক্তসম্পর্কের মতো দুধসম্পর্কের কারণেও বিবাহ হারাম হওয়া।

١٤- تحدث عن العزيمة والرخصة فى الإجماع-

ইজমার মধ্যে আযীমাত ও রুখসাত সম্পর্কে আলোচনা কর।

উত্তর

উসূলে ফিকহের এক অত্যন্ত গভীর ও সূক্ষ্ম অধ্যায় হলো ইজমার মধ্যে ‘আযীমাত’ (العزيمة) এবং ‘রুখসাত’ (الرخصة)-এর বাস্তব প্রয়োগ।

আযীমাত ও রুখসাতের পরিচয়

  • আযীমাত (العزيمة): শরীয়তের সেই মূল, আদর্শ ও প্রাথমিক সাধারণ বিধান—যা কোনো প্রকার ওযর বা ছাড় ছাড়াই স্বাভাবিক অবস্থায় পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
  • রুখসাত (الرخصة): কোনো বিশেষ ওযর, কষ্ট, অক্ষমতা বা প্রয়োজনের কারণে মূল আযীমাতকে শিথিল করে যে সহজ বিধান দেওয়া হয়। যেমন মুসাফিরের নামায কসর করা।

ইজমাতে আযীমাত ও রুখসাত

হানাফী উসূলবিদগণের মতে, উম্মতের মুজতাহিদগণের সর্বসম্মত ঐকমত্য বা ‘ইজমা’ দুটি ভিন্ন স্তরে সাব্যস্ত হয়, যা আযীমাত ও রুখসাত দ্বারা চিহ্নিত:

  1. ইজমায়ে আযীমাত (إجماع العزيمة):

    এটি হলো ইজমায়ে ক্বাওলী বা সরীহ (الإجماع الصريح / القولي)। অর্থাৎ কোনো এক যুগের সকল মুজতাহিদ যদি কোনো একটি মাসআলায় প্রকাশ্যে নিজ নিজ মুখে বা লেখনীর মাধ্যমে স্পষ্ট সম্মতি ও ঐকমত্য প্রকাশ করেন, তবে তাকে ইজমার ‘আযীমাত’ বলা হয়।

    • হুকুম: এটি অকাট্য ও নিশ্চিত দলীল (حجة قطعية)। এর দ্বারা প্রমাণিত বিধান ফরয হয় এবং এর অস্বীকারকারী কাফির বলে গণ্য হয়। এটিই ইজমার সর্বোচ্চ ও আদর্শ রূপ।
  2. ইজমায়ে রুখসাত (إجماع الرخصة):

    এটি হলো ইজমায়ে সুকূতী (الإجماع السكوتي)। অর্থাৎ কোনো এক যুগের একজন বা একাধিক মুজতাহিদ কোনো মাসআলায় ফতোয়া দিলেন এবং সে ফতোয়া অন্যান্য সমকালীন মুজতাহিদদের নিকট পৌঁছাল; কিন্তু তাঁরা এর কোনো বিরোধিতা বা প্রতিবাদ না করে নীরবতা অবলম্বন করলেন।

    • হুকুম: হানাফী ফকীহগণের মতে, নীরবতা হলো মৌন সম্মতি। তবে যেহেতু এতে মতবিরোধের ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকে, তাই এটি ‘রুখসাত’ হিসেবে গৃহীত। এটি প্রবল ধারণাপ্রসূত দলীল (حجة ظنية) হিসেবে আমলযোগ্য, তবে তা ইজমায়ে সরীহ-এর মতো অকাট্য ক্বাতঈ নয়। জমহুর শাফেয়ীগণের মতে এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইজমা নয়, বরং কেবল দলীল।

অতএব, ইজমার মধ্যে সরীহ ইজমা হলো আযীমাত এবং সুকূতী ইজমা হলো রুখসাত।


١٥- بين منهج الاجتهاد فى عصر الصحابة مدللا-

সাহাবিদের যুগে ইজতেহাদ করার পদ্ধতি দলিলসহ বর্ণনা দাও।

উত্তর

সাহাবায়ে কেরামের যুগ হলো নববী যুগের পর ইজতিহাদের স্বর্ণালী ও আদর্শ যুগ। তাঁরা ব্যক্তিগত খেয়ালখুশির ঊর্ধ্বে উঠে অত্যন্ত সংযত ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইজতিহাদ পরিচালনা করতেন।

সাহাবায়ে কেরামের ইজতিহাদের পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি (منهج الاجتهاد)

সাহাবায়ে কেরাম বিশেষ করে খুলাফায়ে রাশেদীন কোনো নতুন সমস্যার সম্মুখীন হলে নিম্নোক্ত সুবিন্যস্ত ক্রমানুসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন:

  1. কিতাবুল্লাহ-তে অনুসন্ধান: সমস্যা দেখা দিলে সর্বাগ্রে পবিত্র কুরআনের আয়াত তালাশ করতেন। সেখানে সরাসরি বিধান পেলে তৎক্ষণাৎ তা বাস্তবায়ন করতেন।
  2. সুন্নাতে রাসূলিল্লাহ-তে অনুসন্ধান: কুরআনে স্পষ্ট না পেলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও পূর্ববর্তী কোনো ফয়সালায় তা খুঁজতেন।
  3. অন্যান্য সাহাবীদের নিকট সুন্নাহর সাক্ষ্য তলব: নিজের জানা না থাকলে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞেস করতেন যে, এ বিষয়ে নবীজী (সা.)-এর কোনো সিদ্ধান্ত কারও জানা আছে কি না? যেমন দাদীর ওয়ারিশের ক্ষেত্রে মুগীরা ইবনে শু’বা ও মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.)-এর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে হযরত আবু বকর (রা.) এক-ষষ্ঠাংশের ফয়সালা দেন।
  4. পরামর্শ ও ইজমা প্রতিষ্ঠা (الشورى والإجماع): সুন্নাহে সরাসরি না পেলে শীর্ষস্থানীয় মুজতাহিদ সাহাবীগণকে (যেমন উমর, আলী, উসমান, ইবনে মাসউদ, উবাই ইবনে কা’ব প্রমুখ) একত্রিত করে পরামর্শ করতেন এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেন।
  5. কিয়াস ও মাক্বাসিদ ভিত্তিক রায় প্রয়োগ: সর্বসম্মত ইজমা সম্ভব না হলে শরীয়তের মূল উদ্দেশ্য ও সাধারণ নীতিমালার আলোকে কিয়াস ও গভীর বুদ্ধিমত্তা দ্বারা রায় দিতেন।

ঐতিহাসিক ও প্রামাণিক দলীল

১. মায়মূন ইবনে মিহরান (রহ.)-এর বর্ণনা:
তাবেয়ী মায়মূন ইবনে মিহরান বর্ণনা করেন: “হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর নিকট কোনো বাদী-বিবাদী এলে তিনি আল্লাহর কিতাবে দেখতেন। পেলে ফয়সালা দিতেন। না পেলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাতে খুঁজতেন। সেখানেও না পেলে সাহাবীদের জিজ্ঞেস করতেন। কোনো সাহাবী সাক্ষ্য দিলে তিনি শুকরিয়া আদায় করতেন। আর সেখানেও কোনো সুন্নাহ না পেলে তিনি শীর্ষ সাহাবীদের ডেকে পরামর্শ করতেন এবং তাঁদের ঐকমত্য অনুযায়ী বিচার করতেন।” (দারেমী, বায়হাকী)।

২. হযরত উমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক নির্দেশনা:
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বিশিষ্ট বিচারক কাযী শুরাইহ (রহ.)-কে লিখে পাঠিয়েছিলেন:

«اقْضِ بِمَا فِي كِتَابِ اللَّهِ، فَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَبِسُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ، فَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيمَا قَضَى بِهِ الصَّالِحُونَ، فَإِنْ شِئْتَ أَنْ تَجْتَهِدَ بِرَأْيِكَ فَتَقَدَّمْ، وَإِنْ شِئْتَ أَنْ تَأَخَّرَ فَتَأَخَّرْ»

অর্থ: “আল্লাহর কিতাবে যা পাও সে অনুযায়ী বিচার করো। তাতে না পেলে আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী বিচার করো। তাতেও না পেলে যা নিয়ে নেককার সাহাবীগণ ফয়সালা করেছেন তার অনুসরণ করো। আর তাতেও না পেলে তুমি চাইলে নিজের রায় দিয়ে ইজতিহাদ করো অথবা বিরত থাকো।” (সুনানে নাসাঈ, সুনানে দারেমী)।

এভাবেই সাহাবায়ে কেরাম ইজতিহাদের এক ভারসাম্যপূর্ণ আদর্শ রেখে গেছেন।


١٦- عرف الاستحسان- وكم قسما له؟ بين-

استحسان এর পরিচয় দাও এবং উহা কত প্রকার? বর্ণনা কর।

উত্তর

হানাফী উসূলে ফিকহের এক অত্যন্ত মৌলিক, দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাপূর্ণ আইনতত্ত্ব হলো আল-ইস্তিহসান (الاستحسان)। এটি মানুষের কষ্ট লাঘব এবং শরীয়তের সুবিচার প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকা পালন করে।

ইস্তিহসানের পরিচয়

১. আভিধানিক অর্থ: ‘ইস্তিহসান’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো কোনো কিছুকে সুন্দর বা উত্তম মনে করা (عَدُّ الشَّيْءِ حَسَنًا)।
২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলে ফিকহের পরিভাষায় হানাফী ইমাম আবুল হাসান আল-কারখী (রহ.) বলেন:

«هُوَ العُدُولُ فِي مَسْأَلَةٍ عَنْ مِثْلِ مَا حُكِمَ بِهِ فِي نَظَائِرِهَا إِلَى خِلاَفِهِ، لِوَجْهٍ أَقْوَى يَقْتَضِي العُدُولَ»

অর্থ: “কোনো নির্দিষ্ট মাসআলায় তার সমজাতীয় অন্যান্য মাসআলার সাধারণ কিয়াসী বিধান ত্যাগ করে আরও শক্তিশালী কোনো শরয়ি প্রমাণের কারণে বিপরীত বিধান গ্রহণ করাকে ইস্তিহসান বলে।”

সহজ কথায়, প্রকাশ্য কিন্তু জটিল কিয়াসের (কিয়াসে জালী) বিপরীতে মানুষের কল্যাণার্থে কোনো শক্তিশালী দলীল বা সূক্ষ্ম কিয়াসের (কিয়াসে খাফী) ভিত্তিতে সহজ ফয়সালা দেওয়া হলো ইস্তিহসান।

ইস্তিহসানের প্রকারভেদ (أقسام الاستحسان)

যে দলীলের ওপর ভিত্তি করে সাধারণ নিয়ম বা কিয়াস বর্জন করা হয়, তার ভিত্তিতে ইস্তিহসান ছয় প্রকার:

  1. ইস্তিহসান বিন-নাস (الاستحسان بالنص):

    সরাসরি কুরআন বা হাদীসের নাসের কারণে সাধারণ কিয়াস ত্যাগ করা। যেমন: রোযা অবস্থায় ভুলক্রমে পানাহার করলে কিয়াস বলে রোযা ভেঙে যাবে; কিন্তু হাদীসের নাসের কারণে রোযা শুদ্ধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অনুরূপভাবে বাইয়ে সালাম ও ইসতিসনা নাসের কারণে জায়েজ।

  2. ইস্তিহসান বিল-ইজমা (الاستحسان بالإجماع):

    উম্মতের ঐকমত্যের কারণে সাধারণ কিয়াস বর্জন। যেমন: কারিগরকে অগ্রিম অর্ডার দিয়ে জুতো বা কাপড় তৈরি করানো (ইসতিসনা), কিংবা সাধারণ গোসলখানায় নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি নির্ধারণ না করে গোসলের অনুমোদন।

  3. ইস্তিহসান বিদ-দারূরাহ (الاستحسان بالضرورة):

    চরম অপারগতা ও মানবিক সংকট নিরসনে কিয়াস পরিহার করা। যেমন: নাপাক হয়ে যাওয়া কূপের পানি কিয়াস অনুযায়ী পুরোটাই ফেলে দেওয়া অসম্ভব; কিন্তু জরুরি প্রয়োজনে নির্দিষ্ট বালতি পানি তোলার পর কূপকে পবিত্র গণ্য করা হয়।

  4. ইস্তিহসান বিল-উরফ (الاستحسان بالعرف):

    জনগণের দীর্ঘদিনের প্রচলিত নির্দোষ সামাজিক প্রথার কারণে কিয়াস ত্যাগ করা। যেমন: স্থাবর সম্পত্তির সাথে অস্থাবর জিনিস বা নির্দিষ্ট তৈজসপত্র ওয়াকফ করা।

  5. ইস্তিহসান বিল-কিয়াসিল খাফী (الاستحسان بالقياس الخفي):

    প্রকাশ্য স্থূল কিয়াসের বিপরীতে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু অধিকতর যৌক্তিক ও শক্তিশালী কিয়াস গ্রহণ করা। যেমন: শিকারী পাখির উচ্ছিষ্ট পানির পবিত্রতা।

  6. ইস্তিহসান বিল-মাসলাহাহ (الاستحسان بالمصلحة):

    বৃহত্তর জনকল্যাণ ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য ব্যতিক্রমী বিধান কার্যকর করা।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের “আল-ফিকহ ওয়া উসুলুহু” (কোড: ২০১8০৮) বিষয়ের পরীক্ষার মানবণ্টন কেমন?

এ পরীক্ষাটি মোট ৮০ নম্বরে ৪ ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। প্রশ্নপত্র দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত: ১ম অংশ ফিকহ (৪০ নম্বর) এবং ২য় অংশ উসূলে ফিকহ (৪০ নম্বর)। প্রতিটি অংশে ৪টি বিশদ প্রশ্ন থেকে ২টি (১৫ × ২ = ৩০) এবং ৪টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন থেকে ২টি (৫ × ২ = ১০) করে মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।

٢. البيع الفاسد এবং البيع الباطل এর মধ্যে মূল পার্থক্য কী?

হানাফী ফিকহ অনুসারে, বাইয়ে বাতিল হলো যা মূল ও গুণ উভয় দিক থেকেই অবৈধ (যেমন মৃত প্রাণী বিক্রি করা) এবং এতে কখনোই মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না। পক্ষান্তরে বাইয়ে ফাসিদ হলো যার মূল ভিত্তি সঠিক কিন্তু কোনো ত্রুটিপূর্ণ শর্তযুক্ত হয়েছে; বিক্রেতার অনুমতিতে পণ্য হস্তগত করলে এতে অপূর্ণাঙ্গ মালিকানা জন্ম নেয় এবং শর্ত দূর করলে তা সহীহ হতে পারে।

৩. বন্ধকদাতার (রাহিনের) জন্য বন্ধকি বস্তু থেকে উপকৃত হওয়ার বিধান কী?

হানাফী মাযহাব অনুযায়ী ঋণদাতার (মুরতাহিন) অনুমতি ছাড়া বন্ধকদাতা বন্ধকি বস্তু ব্যবহার করতে পারবে না, যাতে বন্ধকের মূল জামানত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবের মতে বন্ধকের মূল্য ক্ষুণ্ণ না করে ফল বা দুধের মতো অর্জিত মুনাফা ভোগ করার অধিকার মূল মালিকের রয়েছে। তবে ঋণদাতার জন্য বন্ধকি সম্পদ থেকে ফায়দা নেওয়া সর্বসম্মতভাবে সুদের অন্তর্ভুক্ত।

৪. উসূলে ফিকহ ও ফিকহ শাস্ত্রের মধ্যকার মৌলিক তফাত কী?

উসূলে ফিকহ হলো আইন প্রণয়নের পদ্ধতিবিদ্যা বা সাধারণ মূলনীতি (যেমন: কিয়াস, ইজমা, সুন্নাহর প্রকারভেদ ও দালালাত); পক্ষান্তরে ফিকহ হলো সেই মূলনীতিসমূহ বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করে কুরআন-সুন্নাহ থেকে আহরিত শাখা-প্রশাখার ব্যবহারিক বিধানাবলি (যেমন: নামায, রোযা, ক্রয়-বিক্রয় ও বন্ধকের নিয়ম)।

৫. সমকালীন যুগে ব্যক্তিগত ইজতিহাদের চেয়ে যৌথ ইজতিহাদ (الاجتهاد الجماعي) কেন বেশি গ্রহণযোগ্য?

আধুনিক বিশ্বের নিত্যনতুন সংকটগুলো অত্যন্ত জটিল ও বহুবিদ্যায় বিস্তৃত (যেমন অঙ্গ প্রতিস্থাপন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শেয়ার মার্কেট ও আধুনিক ব্যাংকিং)। কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে সকল বিজ্ঞানের নিখুঁত জ্ঞান রাখা সম্ভব নয় বিধায় আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমিগুলোতে ফকীহ, অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসক ও আইনজ্ঞদের সমন্বিত গবেষণার মাধ্যমে প্রদত্ত ফতোয়া অধিকতর নিরাপদ ও নির্ভুল হয়।

৬. পুরুষদের জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় রেশম ও আংটি ব্যবহারের অনুমোদিত সীমা কতটুকু?

পুরুষদের জন্য খাঁটি রেশমি পোশাক এবং স্বর্ণের আংটি পরিধান করা সম্পূর্ণ হারাম। তবে কাপড়ের কলার বা হাতার বর্ডারে দুই থেকে চার আঙুল পরিমাণ রেশমের নকশা বা পাড় থাকা জায়েজ। এছাড়া পুরুষদের জন্য এক মিসকাল (৪.৩৭ গ্রাম)-এর কম ওজনের একটি রূপার আংটি পরা সুন্নাত বা মুবাহ, যাতে পাথর খচিত থাকতে পারে।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন