জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

সিয়ারুল আম্বিয়া ওয়া মানাহিজু দাওয়াতিহিম ফিল কুরআন (Siyarul Anbiya wa Manahijud Dawah) – 201809, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
১২৩ মিনিট পড়ার সময়
১৮ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা—২০২২
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: সিয়ারুল আম্বিয়া ওয়া মানাহিজু দাওয়াতিহিম ফিল কুরআন (سير الأنبياء ومناهج دعوتهم في القرآن)
বিষয় কোড: ২০১৮০৯ (201809) | প্রশ্নপত্র কোড: ১১৯
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০


[দ্রষ্টব্য: (الف) অংশ থেকে চারটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি মোট আটটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। এখানে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির স্বার্থে সকল প্রশ্নের প্রামাণ্য ও গবেষণাধর্মী উত্তর সন্নিবেশিত হলো।]


مجموعة (الف) : রচনামূলক প্রশ্নাবলি

[পূর্ণমান: ৪ × ১৫ = ৬০]


١- ما المراد بالرسالة؟ وما حاجة الناس إلى الرسالة السماوية؟ وما الحكمة في إرسال الرسل؟ بين مفصلاً –

[‘রিসালত’ বলতে কী বোঝায়? মানবজাতির জন্য ঐশী রিসালতের প্রয়োজন কী? রসুল (স) প্রেরণের উদ্দেশ্য ও হিকমত কী? বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

মানবজাতির সৃষ্টি কেবল নিছক পার্থিব ভোগের জন্য নয়, বরং এক মহান উদ্দেশ্যে মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর তা হলো একমাত্র মহাপ্রভু আল্লাহ তাআলার দাসত্ব ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা। মানুষ দুর্বল ও সীমাবদ্ধ বুদ্ধির অধিকারী হওয়ায় তার পক্ষে নিছক যুক্তি ও চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে স্রষ্টার সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি, সঠিক জীবনপদ্ধতি এবং পরকালীন জবাবদিহিতার বিস্তারিত রূপরেখা প্রণয়ন করা সম্ভব ছিল না। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় অপার অনুগ্রহ ও প্রজ্ঞার তাগিদে মানবজাতির মধ্য থেকেই মনোনীত বান্দাদের মাধ্যমে ওহির জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার যে শাশ্বত ব্যবস্থা চালু করেছেন, তাকেই ইসলামি আকিদায় ‘রিসালত’ বলা হয়।

১. রিসালতের আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়

ক. আভিধানিক অর্থ:
‘রিসালত’ (الرِّسَالَةُ) শব্দটি আরবি ر-س-ل (রা-সিন-লাম) মূলধাতু থেকে উৎসারিত একটি মাসদার বা ভাববাচ্যক বিশেষ্য। এর শাব্দিক অর্থ হলো—বার্তা, পয়গাম, চিঠি, দূতের দায়িত্ব, সুসংবাদ বহন করা কিংবা কোনো বার্তা নিয়ে প্রেরিত হওয়া। যিনি বার্তা পৌঁছান তাঁকে বলা হয় ‘রাসুল’ (الرَّسُولُ)।

খ. পারিভাষিক সংজ্ঞা:
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তাআলা স্বীয় সন্তুষ্টি অর্জন ও সঠিক পথপ্রদর্শনের নিমিত্তে মানবজাতির হিদায়েতের জন্য ওহির মাধ্যমে বিশেষ বার্তাবাহক বা রাসুল মনোনীত করে শরিয়তের বিধান মানবজাতির কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব অর্পণ করাকে রিসালত বলা হয়।
বিখ্যাত আকিদাবিদ ইমাম আল-জুরজানি (রহ.) তাঁর আত-তা’রিফাত গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
الرِّسَالَةُ هِيَ تَبْلِيغُ أَحْكَامِ اللَّهِ تَعَالَى إِلَى عِبَادِهِ بِوَاسِطَةِ الْوَحْيِ إِلَى النَّبِيِّ الْمُرْسَلِ.
“রিসালত হলো প্রেরিত নবীর নিকট ওহির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার আহকাম ও বিধানাবলি তাঁর বান্দাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।”

গ. নবী ও রাসুলের পার্থক্য:
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ‘নবী’ ও ‘রাসুল’ শব্দের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান। ইমাম ইবনে আবিল ইয্য আল-হানাফি (রহ.) ও জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে, ‘রাসুল’ হলেন এমন পুরুষ যাঁকে আল্লাহ তাআলা নতুন কিতাব বা স্বাধীন শরিয়তসহ কোনো অবাধ্য ও অস্বীকারকারী জাতির প্রতি প্রেরণ করেছেন। আর ‘নবী’ হলেন এমন পুরুষ যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীপ্রাপ্ত হয়েছেন, কিন্তু তিনি নতুন শরিয়ত নয় বরং পূর্ববর্তী রাসুলের শরিয়তের পুনরুজ্জীবন ও প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছেন। সুতরাং প্রত্যেক রাসুলই নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসুল নন।

২. মানবজাতির জন্য ঐশী রিসালতের প্রয়োজনীয়তা

মানবজাতির ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ঐশী রিসালত অপরিহার্য। এর প্রধান কারণসমূহ নিম্নরূপ:

  1. মানব বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা (قصور العقل البشري): মানব বুদ্ধি বস্তুজগতের দৃশ্যমান বিষয় অনুধাবনে সক্ষম হলেও গায়েবের জগত (আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলি, রূহ, ফেরেশতা, বরযখ, কিয়ামত, মিজান, পুলসিরাত, জান্নাত ও জাহান্নাম) সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত জ্ঞান দিতে পারে না। ওহির জ্ঞান ব্যতিরেকে মানুষ এসব ক্ষেত্রে কাল্পনিক ধারণা ও কুসংস্কারের শিকার হতে বাধ্য।
  2. মানুষের সহজাত স্বভাব ও ফিতরাতের সুরক্ষা: আল্লাহ তাআলা মানুষকে একনিষ্ঠ তাওহিদের ফিতরাতের ওপর সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু পরিবেশ, শয়তানি প্ররোচনা ও প্রবৃত্তির মোহে মানুষ সেই সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। রিসালতের মাধ্যমেই মানুষ পুনরায় সঠিক ফিতরাতের দিশা পায়।
  3. ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণ: মানুষ যখন নিজের প্রবৃত্তি দিয়ে আইন রচনা করে, তখন সেখানে বর্ণবাদ, শ্রেণিভেদ, শোষণ ও স্বার্থপরতা প্রাধান্য পায়। ঐশী রিসালতের ওপর প্রতিষ্ঠিত শরিয়তই কেবল ধনী-দরিদ্র, শাসক-শাসিত নির্বিশেষে সার্বজনীন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
  4. আত্মার পরিশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নয়ন (تزكية النفوس): আত্মাকে পশুপ্রবৃত্তি, অহংকার, লোভ ও হিংসা থেকে পবিত্র করে নৈতিক চরিত্রে সুশোভিত করার কোনো চিকিৎসালয় মানব রচিত ব্যবস্থায় নেই। রিসালতের নির্দেশিত পথেই আত্মিক পবিত্রতা অর্জিত হয়।
  5. পরকালীন জবাবদিহিতার ভিত্তি স্থাপন: কিয়ামতের দিন মানুষ যেন এটি বলতে না পারে যে, আমরা সত্য ও অসত্যের পার্থক্য জানতাম না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
    ﴿رُّسُلًا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ ۚ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا﴾
    “সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রাসুলগণকে আমি পাঠিয়েছি, যাতে রাসুলগণের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো ওজর পেশ করার সুযোগ না থাকে। আর আল্লাহ মহাশক্তিশালী, পরম প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আন-নিসা: ১৬৫)

৩. রাসুল প্রেরণের উদ্দেশ্য ও হিকমত

আল্লাহ তাআলা অসীম প্রজ্ঞাময়, তিনি কোনো কাজই উদ্দেশ্যহীনভাবে করেন না। রাসুল প্রেরণের প্রধান হিকমত ও উদ্দেশ্যসমূহ হলো:

  • একত্ববাদ (তাওহিদ) প্রতিষ্ঠা ও শিরক উচ্ছেদ: সমস্ত রাসুলের দাওয়াতের মূল ভিত্তি ছিল তাওহিদ। ইরশাদ হয়েছে:
    ﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ﴾
    “নিশ্চয় আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসুল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর।” (সূরা আন-নাহল: ৩৬)
  • কিতাব ও হিকমতের বিধান বাস্তবায়ন: কেবল কিতাব নাযিল করাই যথেষ্ট ছিল না, বরং কিতাবের বাস্তব প্রয়োগ দেখানোর জন্য রাসুলের আগমন অনিবার্য ছিল। ইরশাদ হয়েছে: ﴿وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ﴾ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১২৯)।
  • বাস্তব আদর্শ (উসওয়ায়ে হাসানা) উপস্থাপন: মানুষ পথচলার জন্য কোনো তাত্ত্বিক দর্শনের চেয়ে বাস্তব জীবন্ত আদর্শকে বেশি অনুসরণ করতে পারে। আল্লাহ তাআলা মানবজাতির মধ্য থেকেই রাসুল পাঠিয়েছেন যাতে মানুষ তাঁকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। ইরশাদ হয়েছে:
    ﴿لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ﴾
    “তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ—তার জন্য, যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রত্যাশা করে।” (সূরা আল-আহযাব: ২১)
  • সুসংবাদ ও সতর্কীকরণ (البشارة والنذارة): সৎকর্মশীল মুমিনদের জন্য অনন্ত জান্নাতের সুসংবাদ এবং অবাধ্য কাফির-ফাসিকদের জন্য জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির সতর্কবার্তা প্রদান করা।
  • বিশ্ববাসীর জন্য খোদায়ী রহমত বিতরণ: বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে ঘোষণা করা হয়েছে:
    ﴿وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ﴾
    “আর আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭)

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, রিসালত হলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে হেদায়েতের একমাত্র সেতুবন্ধন। মানবজাতির সামগ্রিক কল্যাণ, সামাজিক ইনসাফ ও পরকালীন চিরস্থায়ী মুক্তির একমাত্র পথ হলো ওহির প্রদর্শিত রিসালতের আনুগত্য করা।


٢- من هم أولو العزم من الرسل؟ لماذا وصفهم الله بهذه الصفة؟ اذكر خصائصهم الرئيسية –

[রসুলগণের মধ্যে ‘উলুল আযম’ কারা? তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা কেন এ বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন? তাঁদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর।]

ভূমিকা

আল্লাহ তাআলা মানবজাতির পথপ্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসুল প্রেরণ করেছেন। যদিও মর্যাদার দিক থেকে সকল নবী সম্মানিত, তথাপি আল্লাহ তাঁদের পরস্পরের মধ্যে মর্যাদাগত তারতম্য নির্ধারণ করেছেন। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: ﴿تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ﴾ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৫৩)। রাসুলগণের মধ্যে যাঁরা দ্বীনের দাওয়াত প্রচার ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে চরম প্রতিকূলতার মাঝে পর্বতসম ধৈর্য, অটল সংকল্প ও বীরত্বপূর্ণ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদেরকে কুরআন মাজিদে ‘উলুল আযম’ (أُولُو الْعَزْمِ) অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে।

১. উলুল আযম রাসুলগণের পরিচয় ও সংখ্যা

ক. শাব্দিক ব্যাখ্যা:
‘উলু’ (أُولُو) শব্দের অর্থ—অধিকারী, বিশিষ্ট। আর ‘আল-আযম’ (الْعَزْمُ) শব্দের অর্থ—দৃঢ় সংকল্প, অটল সংকল্প, ধৈর্য, অবিচলতা ও সাহস। পরিভাষায়, যেসকল রাসুল দাওয়াতি মিশনে সীমাহীন বাধা-বিপত্তি ও উৎপীড়নের মুখে অনন্য ধৈর্য ও অবিচল সংকল্প প্রদর্শন করেছেন, তাঁদেরকে ‘উলুল আযম’ বলা হয়।

খ. উলুল আযম রাসুলদের সংখ্যা ও নাম:
জমহুর মুফাসসিরীন, মুহাদ্দিসীন ও ধর্মতাত্ত্বিকদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উলুল আযম রাসুল হলেন পাঁচজন:
১. হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম)
২. হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)
৩. হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম)
৪. হযরত ঈসা (আলাইহিস সালাম)
৫. সাইয়্যিদুনা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।

গ. কুরআনিক দলিল:
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আহযাবের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই পাঁচজন মহান রাসুলের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করে ইরশাদ করেন:
﴿وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنكَ وَمِن نُّوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ۖ وَأَخَذْنَا مِنْهُم مِّيثَاقًا غَلِيظًا﴾
“আর স্মরণ করুন, যখন আমি নবীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং আপনার কাছ থেকে, আর নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মারইয়াম-তনয় ঈসার কাছ থেকে; আর আমি তাদের থেকে গ্রহণ করেছিলাম সুদৃঢ় অঙ্গীকার।”
অনুরূপভাবে সূরা আশ-শূরার ১৩ নম্বর আয়াতেও এই পাঁচজনের কথাই বিবৃত হয়েছে:
﴿شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ﴾.

২. আল্লাহ তাআলা কেন তাঁদেরকে এ বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন?

পবিত্র কুরআনে সূরা আল-আহকাফের ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বিশ্বনবী (সা.)-কে লক্ষ্য করে ইরশাদ করেন:
﴿فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ وَلَا تَسْتَعْجِل لَّهُمْ﴾
“অতএব আপনি ধৈর্য ধারণ করুন যেভাবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসুলগণ ধৈর্য ধারণ করেছিলেন এবং তাদের (শাস্তির) জন্য তাড়াহুড়া করবেন না।”

তাঁদেরকে ‘উলুল আযম’ উপাধিতে ভূষিত করার কারণসমূহ হলো:

  1. অনুপম ও দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্য: হযরত নূহ (আ.) সুদীর্ঘ সাড়ে নয়শত বছর ধরে স্বজাতির উপহাস, মারধর ও অবজ্ঞা সহ্য করেও এক মুহূর্তের জন্য দাওয়াত বন্ধ করেননি।
  2. চরম আত্মত্যাগ ও অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ: হযরত ইবরাহীম (আ.) তাওহিদের জন্য নমরূদের প্রজ্বলিত আগুনে নিক্ষিপ্ত হন, প্রিয় পুত্র ও স্ত্রীকে জনমানবহীন প্রান্তরে রেখে আসেন এবং পুত্রকে কুরবানির নির্দেশ পালনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি।
  3. ফেরাউনি স্বৈরতন্ত্র ও নিজ জাতির অবাধ্যতার মুকাবিলা: হযরত মূসা (আ.) অহংকারী ফেরাউনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেছেন এবং পরবর্তীতে বনি ইসরাঈলের বারবার ঔদ্ধত্য ও ধৃষ্টতার মুখে অটল ধৈর্য ধারণ করেছেন।
  4. হত্যার ষড়যন্ত্র ও নির্যাতন সহ্য করা: হযরত ঈসা (আ.) বনি ইসরাঈলের কঠোর যাজকশ্রেণির নির্মম শত্রুতা ও ক্রুশবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রের মধ্যেও আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত অবিচলভাবে এগিয়ে নিয়েছেন।
  5. সকল নবীর চরমতম পরীক্ষার সম্মিলিত রূপ: সাইয়্যিদুনা মুহাম্মদ (সা.) শিয়াবে আবি তালিবে তিন বছরের অবরুদ্ধ জীবন, তায়েফের রক্তক্ষয়ী আঘাত, উহুদের ময়দানে দাঁত মোবারক শহীদ হওয়া এবং কাফিরদের চরম নির্যাতনের মুখেও শত্রুদের ধ্বংসের দোআ না করে তাদের হিদায়েতের জন্য রহমতের দোআ করেছেন।

৩. উলুল আযম রাসুলগণের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

  • মৌলিক শরিয়তের ধারক ও প্রবর্তক: তাঁরা মানব ইতিহাসের প্রধান প্রধান যুগান্তকারী শরিয়ত ও আসমানি কিতাব প্রাপ্ত হয়েছিলেন, যা মানবসভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
  • বৃহৎ উম্মত ও আন্তর্জাতিক প্রভাব: তাঁদের দাওয়াত ও প্রচারিত দ্বীনের অনুসারীদের বিস্তার ছিল বিশ্বব্যাপী এবং ইতিহাসের গতিধারায় তাঁদের অবদান সর্বাধিক।
  • উচ্চাঙ্গের আধ্যাত্মিক একাগ্রতা ও নিষ্কলুষ সমর্পণ: কোনো পার্থিব লোভ-লালসা, ক্ষমতা বা জীবনের হুমকি তাঁদেরকে আল্লাহর নির্দেশ পালন থেকে একচুল পরিমাণও বিচ্যুত করতে পারেনি।
  • সর্বশ্রেষ্ঠ অলৌকিক মোজেযা লাভ: যেমন—নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের কিশতী, ইবরাহীম (আ.)-এর জন্য আগুনের শীতল বাগান হওয়া, মূসা (আ.)-এর লাঠি ও সাগর দ্বিখণ্ডিত হওয়া, ঈসা (আ.)-এর স্পর্শে মৃত জীবিত হওয়া এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর শাশ্বত মোজেযা আল-কুরআন ও ইসরা-মিরাজ।

উপসংহার

উলুল আযম রাসুলগণ হলেন মানবজাতির ইতিহাসে আত্মত্যাগ, ধৈর্য ও অবিচলতার সর্বোচ্চ শিখর। মুসলিম উম্মাহর দাঈদের জন্য তাঁদের সংগ্রামী জীবন চিরকালীন প্রেরণার আলোকবর্তিকা।


٣- من أصحاب الأيكة؟ ومن الرسول الذي أرسل إليهم؟ تحدث عن أسلوب دعوته وعاقبة قومه في ضوء القرآن الكريم –

[‘আসহাবুল আয়কা’ কারা? তাদের কাছে কোন রাসুলকে প্রেরণ করা হয়েছিল? কুরআনের আলোকে তাঁর দাওয়াতের পদ্ধতি ও তাঁর জাতির পরিণতি আলোচনা কর।]

ভূমিকা

পবিত্র কুরআনে মানবজাতির সতর্কতার জন্য অতীত বহু অবাধ্য জাতির ইতিহাস ও ধ্বংসলীলার চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একটি কুখ্যাত সম্প্রদায় ছিল ‘আসহাবুল আয়কা’। আল্লাহ তাআলা তাদের হিদায়েতের জন্য একজন প্রাজ্ঞ রাসুল প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু তারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে ব্যবসায়িক প্রতারণা ও কুফরিতে লিপ্ত থাকায় আল্লাহর ভয়াবহ গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

১. ‘আসহাবুল আয়কা’ কারা এবং তাদের ভৌগোলিক পরিচয়

ক. শাব্দিক পরিচয়:
‘আল-আয়কা’ (الأَيْكَةُ) আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো—ঘন কাঁটাযুক্ত গাছের জঙ্গল বা নিবিড় বৃক্ষরাজি দ্বারা আচ্ছাদিত বাগান। সুতরাং ‘আসহাবুল আয়কা’ (أَصْحَابُ الْأَيْكَةِ) অর্থ হলো ‘জঙ্গল বা বাগান পরিবেষ্টিত অঞ্চলের অধিবাসী’।

খ. ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিচয়:
মুফাসসিরীনদের মতে, তারা লোহিত সাগরের উত্তরাংশে আকাবা উপসাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় হিজায ও শামের সীমান্তবর্তী মাদইয়ান অঞ্চলের সন্নিকটে বসবাস করত। তাদের ভূমি ছিল অত্যন্ত উর্বর, ঘন সবুজ গাছপালায় সমৃদ্ধ এবং তাদের মূল অর্থনীতি ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাফেলার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা। ইমাম ইবনে কাসির ও ইবনে জারির আত-তাবারির মতে, আসহাবুল আয়কা এবং মাদইয়ানবাসী হয়তো একই জাতি ছিল যাদের দুটি পৃথক বৈশিষ্ট্য কুরআনে এসেছে, অথবা তারা ছিল প্রতিবেশী দুটি শাখা যাদের উভয়ের কাছেই হযরত শুআইব (আ.) প্রেরিত হয়েছিলেন।

২. তাদের কাছে প্রেরিত রাসুল

আসহাবুল আয়কার নিকট প্রেরিত হয়েছিলেন মহান নবী হযরত শুআইব (আলাইহিস সালাম)। তাঁর সুমিষ্ট বক্তব্য, অলংকারপূর্ণ যুক্তি ও চমৎকার উপস্থাপনার কারণে তাঁকে নবীদের সমাজে ‘খাতীবুল আম্বিয়া’ (خَطِيبُ الْأَنْبِيَاءِ – নবীদের মধ্যে বাগ্মী প্রবক্তা) বলা হতো।
কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে:
﴿كَذَّبَ أَصْحَابُ الْأَيْكَةِ الْمُرْسَلِينَ ۞ إِذْ قَالَ لَهُمْ شُعَيْبٌ أَلَا تَتَّقُونَ ۞ إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ﴾
“আসহাবুল আয়কা রাসুলদেরকে অস্বীকার করেছিল। যখন শুআইব তাদের বলল: তোমরা কি আল্লাহকে ভয় করবে না? নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য একজন বিশ্বস্ত রাসুল।” (সূরা আশ-শুআরা: ১৭৬-১৭৮)

৩. কুরআনের আলোকে হযরত শুআইব (আ.)-এর দাওয়াতের পদ্ধতি

হযরত শুআইব (আ.) অত্যন্ত প্রজ্ঞা, যুক্তি ও দরদমাখা ভাষায় তাঁর জাতিকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। তাঁর দাওয়াতের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো:

  1. তাওহিদের মৌলিক আহ্বান: সকল নবীর মতো শুআইব (আ.)-ও প্রথমে তাদের শিরক বর্জন করে একমাত্র আল্লাহর দাসত্বে আসার আহ্বান জানান:
    ﴿يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ﴾ (সূরা হূদ: ৮৪)।
  2. ব্যবসায়িক সততা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের আহ্বান: আসহাবুল আয়কার প্রধান সামাজিক ব্যাধি ছিল লেনদেনে ওজনে কম দেওয়া এবং মানুষকে প্রতারিত করা। তিনি জোরালোভাবে বললেন:
    ﴿أَوْفُوا الْكَيْلَ وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُخْسِرِينَ ۞ وَزِنُوا بِالْقِسْطَاسِ الْمُسْتَقِيمِ ۞ وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ﴾
    “মাপ পূর্ণভাবে দাও এবং যারা ক্ষতিসাধন করে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। সঠিক পাল্লা দিয়ে ওজন করো এবং মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্তুতে কম দিয়ো না আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে ঘুরে বেড়িয়ো না।” (সূরা আশ-শুআরা: ১৮১-১৮৩)
  3. আল্লাহর নিয়ামতের স্মরণ ও অতীত ধ্বংসের হুঁশিয়ারি: তিনি তাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, কীভাবে আল্লাহ তাদের সংখ্যায় অল্প থাকা সত্ত্বেও সমৃদ্ধি দান করেছেন এবং লূত, সালেহ ও হূদ জাতির মতো অবাধ্যদের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন।
  4. বিনয় ও নিঃস্বার্থ মনোভাব প্রদর্শন: তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, এই দাওয়াতের জন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিক বা রাজকীয় ক্ষমতা চান না। ইরশাদ হয়েছে: ﴿وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ ۖ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَىٰ رَبِّ الْعَالَمِينَ﴾ (সূরা আশ-শুআরা: ১৮০)।

৪. আসহাবুল আয়কার অবাধ্যতা ও ভয়াবহ পরিণতি

শুআইব (আ.)-এর সুমধুর নসিহতের জবাবে আসহাবুল আয়কা চরম দাম্ভিকতা প্রদর্শন করল। তারা তাঁকে বলল, তুমি তো এক জাদুগ্ৰস্ত ব্যক্তি এবং আমাদের মতোই একজন মানুষ। তারা উপহাস করে চ্যালেঞ্জ জানাল:
﴿فَأَسْقِطْ عَلَيْنَا كِسَفًا مِّنَ السَّمَاءِ إِن كُنتَ مِنَ الصَّادِقِينَ﴾
“অতএব তুমি যদি সত্যবাদী হও তবে আকাশের এক টুকরো আমাদের ওপর ফেলে দাও।” (সূরা আশ-শুআরা: ১৮৭)

তাদের এহেন স্পর্ধার পর আল্লাহর অবধারিত গযব নেমে আসে। তাদের ওপর নেমে আসা শাস্তির বিবরণ কুরআনে নিম্নরূপ দেওয়া হয়েছে:

  • মেঘাচ্ছন্ন দিবসের শাস্তি (عَذَابُ يَوْمِ الظُّلَّةِ): আল্লাহ তাদের ওপর সাত দিন ও সাত রাত অসহ্য খরতাপ ও উত্তাপ চাপিয়ে দিলেন। তীব্র গরমে তাদের ঘরবাড়ি আগুনের চুল্লির মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠল। এরপর আকাশে একখণ্ড কালো মেঘ দেখা দিল এবং মৃদু বাতাস বইতে লাগল। প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে তারা সবাই শীতল ছায়ার আশায় সেই মেঘের নিচে আনন্দধ্বনি সহকারে সমবেত হলো। যখন সবাই মেঘের নিচে একত্র হলো, তখন সেই মেঘ থেকে অগ্নিবৃষ্টি বর্ষিত হতে লাগল এবং এক বিকট আসমানি বজ্রনিনাদ (الرَّجْفَةُ والصَّيْحَةُ) তাদের ছিন্নভিন্ন করে দিল।
  • কুরআনিক ঘোষণা:
    ﴿فَكَذَّبُوهُ فَأَخَذَهُمْ عَذَابُ يَوْمِ الظُّلَّةِ ۚ إِنَّهُ كَانَ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ ۞ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً ۖ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُم مُّؤْمِنِينَ﴾
    “অতঃপর তারা তাকে অস্বীকার করল, ফলে তাদের গ্রাস করল মেঘাচ্ছন্ন দিবসের শাস্তি। নিশ্চয় তা ছিল এক ভয়াবহ দিবসের আযাব। এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই মুমিন ছিল না।” (সূরা আশ-শুআরা: ১৮৯-১৯০)

উপসংহার

আসহাবুল আয়কার করুণ ধ্বংসলীলা প্রমাণ করে যে, সমাজে অর্থনৈতিক শোষণ, মাপে কম দেওয়া ও ব্যবসায়িক দুর্নীতি কেবল সামাজিক অপরাধ নয়, বরং জাতির ওপর ঐশী গযব ডেকে আনার অন্যতম প্রধান কারণ।


٤- من لوط عليه السلام؟ وأين أرسل؟ لماذا أهلك الله قومه؟ بين مفصلاً –

[হযরত লূত (আ) কে? তাঁকে কোথায় রাসুল হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছিল? তাঁর জাতিকে কেন আল্লাহ তা’লা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন? বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

মানবজাতির ইতিহাসে নৈতিক অধঃপতন ও যৌন বিকৃতির চরমতম সীমায় পৌঁছেছিল কওমে লূত। আল্লাহ তাআলা তাঁদের সংশোধনের জন্য একজন নিষ্পাপ ও মহান রাসুল প্রেরণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন হযরত লূত (আলাইহিস সালাম)। তাঁর জাতি তাঁর পবিত্র নসিহত প্রত্যাখ্যান করে এমন নিকৃষ্ট অপকর্মে মত্ত হয়েছিল, যা ইতিপূর্বে পৃথিবীর কোনো সৃষ্টি করেনি। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর এমন নজিরবিহীন শাস্তি নাযিল করেন যা মানবজাতির জন্য কেয়ামত পর্যন্ত এক চাক্ষুষ শিক্ষা হয়ে রয়েছে।

১. হযরত লূত (আ.)-এর পরিচয় ও বংশপরম্পরা

হযরত লূত (আলাইহিস সালাম) ছিলেন একজন জলিলুল ক্বদর নবী ও রাসুল। বংশপরম্পরায় তিনি ছিলেন জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর আপন ভাতিজা। তাঁর পিতার নাম হারান (هاران), যিনি ছিলেন ইবরাহীম (আ.)-এর ভাই। লূত (আ.) ইরাকের বাবেল শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর ওপর সর্বপ্রথম পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে ঈমান আনেন। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: ﴿فَآمَنَ لَهُ لُوطٌ ۘ وَقَالَ إِنِّي مُهَاجِرٌ إِلَىٰ رَبِّي﴾ (সূরা আল-আনকাবুত: ২৬)। পরবর্তীতে তিনি ইবরাহীম (আ.)-এর সাথে কেন’আন (বর্তমান ফিলিস্তিন ও জর্ডান অঞ্চল) অভিমুখে হিজরত করেন এবং সেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁকে নবুওয়াত ও রিসালতের দায়িত্বে অভিষিক্ত করেন।

২. তাঁকে কোথায় প্রেরণ করা হয়েছিল?

হযরত লূত (আ.)-কে বর্তমান জর্ডান ও অধিকৃত ফিলিস্তিনের সীমান্তসংলগ্ন ঐতিহাসিক মৃত সাগর (بَحْرُ الْمَيِّتِ বা Dead Sea)-এর তীরে অবস্থিত ‘সাদূম’ (سَدُومُ – Sodom) নগরীতে এবং তার পার্শ্ববর্তী উপত্যকায় রাসুল হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছিল। এই অঞ্চলের প্রধান পাঁচটি জনপদকে কুরআনে ‘আল-মু’তাফিকাহ’ বা ‘আল-মু’তাফিকাত’ (الْمُؤْتَفِكَاتُ – উল্টে দেওয়া জনপদসমূহ) বলা হয়েছে, যার প্রধান কেন্দ্র ছিল সাদূম নগরী। এই অঞ্চলটি সে যুগে প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষিপণ্য ও পানির প্রাচুর্যে ভরপুর ছিল।

৩. আল্লাহ তাআলা কেন লূত (আ.)-এর জাতিকে ধ্বংস করেছিলেন?

কওমে লূতের ধ্বংসের পেছনে বেশ কয়েকটি চরম অন্যায়, শিরক ও নৈতিক অবক্ষয় কার্যকর ছিল:

  1. প্রকৃতিবিরুদ্ধ সমকামিতার উদ্ভাবন ও বিস্তার (فاحشة اللواط): মানব ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে কোনো প্রাণী বা মানব সম্প্রদায় যা কল্পনাও করেনি, কওমে লূত সেই বিকৃত যৌনাচার ও পুরুষে-পুরুষে যৌনমিলন আবিষ্কার ও উন্মুক্তভাবে চর্চা শুরু করে। হযরত লূত (আ.) তাদের ভর্ৎসনা করে বলেন:
    ﴿أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ مَا سَبَقَكُم بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِّنَ الْعَالَمِينَ ۞ إِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِّن دُونِ النِّسَاءِ ۚ بَلْ أَنتُمْ قَوْمٌ مُّسْرِفُونَ﴾
    “তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ যা তোমাদের পূর্বে সৃষ্টিজগতের কেউ কখনো করেনি? তোমরা নারীদের ছেড়ে কামবশত পুরুষদের নিকট গমন করছ; বরং তোমরা এক সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।” (সূরা আল-আ’রাফ: ৮০-৮১)
  2. প্রকাশ্য মজলিসে কুকর্ম ও রাহাজানি (قطع السبيل وإتيان المنكر): তারা পথচারী বাণিজ্য কাফেলার ওপর হামলা চালিয়ে লুণ্ঠন করত এবং তাদের প্রকাশ্য জনসমাবেশে নির্লজ্জ পাপাচার করত। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
    ﴿أَئِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ وَتَقْطَعُونَ السَّبِيلَ وَتَأْتُونَ فِي نَادِيكُمُ الْمُنكَرَ﴾ (সূরা আল-আনকাবুত: ২৯)।
  3. পবিত্র মানুষদের দেশান্তরের ধৃষ্টতাপূর্ণ হুমকি: লূত (আ.) যখন তাদের এই বিকৃতি পরিহার করতে বললেন, তখন তারা ব্যঙ্গ করে ঘোষণা করল:
    ﴿أَخْرِجُوا آلَ لُوطٍ مِّن قَرْيَتِكُمْ ۖ إِنَّهُمْ أُنَاسٌ يَتَطَهَّرُونَ﴾
    “লূতের পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও, এরা তো এমন লোক যারা অতি পবিত্র হতে চায়!” (সূরা আন-নামল: ৫৬)
  4. মেহমানদের ওপর আক্রমণের কুৎসিত চেষ্টা: আল্লাহ যখন রূপবান যুবকের বেশে ফেরেশতাদের লূত (আ.)-এর ঘরে মেহমান হিসেবে পাঠালেন, তখন সাদূমবাসী লূত (আ.)-এর বাড়ি ঘেরাও করে সেই মেহমানদের লাঞ্ছিত করার উদ্দেশ্যে দাবি করতে লাগল। এটি ছিল তাদের পাপের ষোলকলা পূর্ণ হওয়ার মুহূর্ত।

৪. কওমে লূতের ওপর আপতিত ভয়াবহ ধ্বংসলীলা

যখন পাপের মাত্রা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন জিবরাঈল (আ.) লূত (আ.)-কে তাঁর ঈমানদার অনুসারী ও দুই কন্যাসহ রাতের শেষ প্রহরে এলাকা ত্যাগ করার নির্দেশ দিলেন এবং তাঁর কাফিরা স্ত্রীকে পেছনে রেখে যেতে বললেন। ভোর হওয়ার সাথে সাথে তাদের ওপর চার স্তরের শাস্তি নেমে আসে:

  • প্রথমত, চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়া: যারা লূত (আ.)-এর ঘরে হামলা করতে এসেছিল, জিবরাঈল (আ.)-এর ডানার ঝাপটায় তাদের সবার চোখ অন্ধ হয়ে যায়।
  • দ্বিতীয়ত, ভূমি উল্টে দেওয়া (جَعْلُ عَالِيَهَا سَافِلَهَا): জিবরাঈল (আ.) তাঁর ডানার অগ্রভাগ দিয়ে পুরো সাদূম ও আশপাশের পাঁচটি শহরকে উপড়ে আকাশের কাছাকাছি উঠিয়ে নিয়ে উল্টে জমিনের ওপর আছড়ে ফেলেন।
  • তৃতীয়ত, চিহ্নিত পাথরবৃষ্টি বর্ষণ: আকাশ থেকে উত্তপ্ত পোড়ামাটির চিহ্নিত পাথর তাদের প্রত্যেকের ওপর লক্ষ্যভেদী বুলেটের মতো বর্ষণ করা হয়। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
    ﴿فَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا جَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهَا حِجَارَةً مِّن سِجِّيلٍ مَّنضُودٍ ۞ مُّسَوَّمَةً عِندَ رَبِّكَ ۖ وَمَا هِيَ مِنَ الظَّالِمِينَ بِبَعِيدٍ﴾
    “অতঃপর যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছল, তখন আমি জনপদটিকে উল্টে উপর-নিচ করে দিলাম এবং তার ওপর অবিশ্রান্ত ধারায় বর্ষণ করলাম পোড়ামাটির পাথর, যা আপনার রবের নিকট চিহ্নিত ছিল। আর এ শাস্তি এই যালিমদের থেকে দূরে নয়।” (সূরা হূদ: ৮২-৮৩)

উপসংহার

কওমে লূতের করুণ পরিণতি বর্তমান সভ্যতার জন্য এক মারাত্মক সতর্কবার্তা। যে জমিন উল্টে দেওয়া হয়েছিল, আজ তা পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্নভূমি ও বিষাক্ত ‘মৃত সাগর’ নামে পরিচিত, যেখানে কোনো জলজ প্রাণী বাঁচতে পারে না। এটি প্রমাণ করে যে, বিকৃত কামাচার ও ফিতরাতবিরোধী কর্মকাণ্ড আল্লাহর জমিনকে বিষাক্ত করে তোলে।


٥- تحدث عن معجزة صالح عليه السلام وقصة هلاك قومه –

[সালেহ (আ) এর মো’জেযা এবং তাঁর জাতির ধ্বংসের কাহিনী আলোচনা কর।]

ভূমিকা

প্রাচীন আরবের বিলুপ্ত জাতিসমূহের (العرب البائدة) মধ্যে ‘কওমে সামূদ’ ছিল স্থাপত্যবিদ্যা, ধনসম্পদ ও শক্তিমত্তায় এক বিস্ময়কর জাতি। আদ জাতির ধ্বংসের পর আল্লাহ তাআলা সামূদ জাতিকে পৃথিবীতে সমৃদ্ধি দান করেছিলেন। কিন্তু তারা অচিরেই শিরক ও ঔদ্ধত্যের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়। তাদের হিদায়েতের জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁদেরই বংশোদ্ভূত হযরত সালেহ (আলাইহিস সালাম)-কে রাসুল হিসেবে মনোনীত করেন।

১. হযরত সালেহ (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়ের পরিচয়

হযরত সালেহ (আ.) ছিলেন কওমে সামূদের একজন সম্মানিত ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। সামূদ জাতি হিজায ও শামের মধ্যবর্তী ‘ওয়াদিউল কুরা’ ও ‘আল-হিজর’ (যা বর্তমানে মাদাঈনে সালেহ নামে পরিচিত) অঞ্চলে বসবাস করত। তারা পাহাড় খোদাই করে সুরম্য ও দুর্ভেদ্য প্রাসাদ এবং শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাসভবন নির্মাণ করত। আল্লাহ বলেন: ﴿وَتَنْحِتُونَ الْجِبَالَ بُيُوتًا فَارِهِينَ﴾ (সূরা আশ-শুআরা: ১৪৯)।

২. হযরত সালেহ (আ.)-এর অনন্য মোজেযা: অলৌকিক উটনী (ناقة الله)

সালেহ (আ.) যখন একনিষ্ঠভাবে তাওহিদের দাওয়াত দিতে থাকলেন, তখন সামূদ জাতির নেতৃস্থানীয় অহংকারী ব্যক্তিরা তাঁকে এক অসম্ভব শর্ত জুড়ে দিল। তারা বলল, “তুমি যদি সত্য নবী হয়ে থাকো, তবে আমাদের এই কঠিন নিরেট পাথর (সাখরাহ) থেকে এমন একটি দশ মাসের গর্ভবতী বিশালাকার উটনী বের করে দেখাও, যা আমাদের চোখের সামনে বাচ্চা প্রসব করবে।”

সালেহ (আ.) তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলেন যে, এই মোজেযা প্রত্যক্ষ করলে তারা অবশ্যই ঈমান আনবে কি না। তারা দৃঢ় অঙ্গীকার করল। এরপর হযরত সালেহ (আ.) সালাত আদায় করে আল্লাহর দরবারে রোনাজারি ও দোআ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কুদরতে বিশাল নিরেট পাথরটি বিদীর্ণ হয়ে গর্ভবতী উটনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল এবং সবার সামনে একটি বলিষ্ঠ বাচ্চা প্রসব করল। এই দৃশ্য দেখে কওমের কিছু দুর্বল মানুষ ঈমান আনলেও নেতৃস্থানীয় অহংকারীরা তাদের অন্তরের কুফরি বহাল রাখল।

উটনী সম্পর্কিত ঐশী শর্তাবলি:
সালেহ (আ.) তাদের জানিয়ে দিলেন যে, এই উটনী কোনো সাধারণ প্রাণী নয়, এটি ‘নাক্বাতুল্লাহ’ (আল্লাহর উটনী) এবং তাদের জন্য এক চরম পরীক্ষা। তিনি ঘোষণা করলেন:
﴿قَالَ هَٰذِهِ نَاقَةٌ لَّهَا شِرْبٌ وَلَكُمْ شِرْبُ يَوْمٍ مَّعْلُومٍ ۞ وَلَا تَمَسُّوهَا بِسُوءٍ فَيَأْخُذَكُمْ عَذَابُ يَوْمٍ عَظِيمٍ﴾
“সালেহ বলল: এই যে উটনী, এর জন্য থাকবে একদিনের পানি পানের পালা এবং তোমাদের জন্য থাকবে একটি নির্ধারিত দিনের পালা। আর একে কোনো মন্দ স্পর্শও করবে না, অন্যথায় এক মহাদিবসের শাস্তি তোমাদের গ্রাস করবে।” (সূরা আশ-শুআরা: ১৫৫-১৫৬)
উটনীটি যেদিন কূপের পানি পান করত, সেদিন সে পুরো কূপের পানি শেষ করত এবং বিনিময়ে সমগ্র সামূদ জাতিকে পর্যাপ্ত পরিমাণ সুমিষ্ট ও পুষ্টিকর দুধ প্রদান করত।

৩. উটনী হত্যা ও অবাধ্যতার চরম রূপ

সামূদ জাতির নয়জন কুখ্যাত সর্দার (যাদেরকে কুরআনে ‘তিস’আতু রাহ্ব্ত’ বলা হয়েছে) উটনীর অস্তিত্ব ও প্রভাব সহ্য করতে পারল না। বিশেষত তাদের দুই দুশ্চরিত্র নারী উনাইযা ও সাদূফ চক্রান্তে মেতে উঠল। ক্বাদার ইবনে সালিফ নামক এক পাপাচারী তাদের প্ররোচনায় উটনীটিকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল। সে ওঁৎ পেতে থেকে বিষাক্ত তীর নিক্ষেপ করে এবং তরবারি দিয়ে উটনীর পা কেটে ফেলে হত্যা করল (عَقَرُوا النَّاقَةَ)। উটনীর বাচ্চাটি পাহাড়ের চূড়ায় উঠে তিনবার আর্তনাদ করে অদৃশ্য হয়ে গেল। এরপর তারা চরম স্পর্ধা দেখিয়ে সালেহ (আ.)-কে বলল:
﴿يَا صَالِحُ ائْتِنَا بِمَا تَعِدُنَا إِن كُنتَ مِنَ الْمُرْسَلِينَ﴾
“হে সালেহ! তুমি যার ভয় দেখাচ্ছিলে তা আমাদের ওপর নিয়ে আসো, যদি তুমি সত্যিই রাসুলদের একজন হয়ে থাকো।” (সূরা আল-আ’রাফ: ৭৭)

৪. সামূদ জাতির ধ্বংসের লোমহর্ষক কাহিনী

উটনী হত্যার পর হযরত সালেহ (আ.) অত্যন্ত বেদনার সাথে ঘোষণা করলেন:
﴿تَمَتَّعُوا فِي دَارِكُمْ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ ۖ ذَٰلِكَ وَعْدٌ غَيْرُ مَكْذُوبٍ﴾
“তোমরা তোমাদের ঘরে তিনটি দিন উপভোগ করে নাও। এটি এমন এক প্রতিশ্রুতি যা কখনো মিথ্যে হবে না।” (সূরা হূদ: ৬৫)

সেই তিন দিনের সতর্কবার্তা ছিল নিম্নরূপ:

  1. প্রথম দিন (বৃহস্পতিবার): সকালে সামূদ জাতির সকলের মুখমণ্ডল ভয়ে হলুদ বর্ণ ধারণ করল।
  2. দ্বিতীয় দিন (শুক্রবার): সকলের মুখমণ্ডল রক্তবর্ণ বা লাল হয়ে গেল।
  3. তৃতীয় দিন (শনিবার): সবার মুখমণ্ডল কয়লার মতো কুচকুচে কালো হয়ে গেল এবং তারা নিশ্চিত মৃত্যুর প্রহর গুণতে লাগল।
  4. চতুর্থ দিন (রবিবার প্রভাত – চূড়ান্ত গযব): রবিবার সূর্যোদয়ের সাথে সাথে আকাশ থেকে নেমে আসে এক ভয়াবহ বিকট গর্জন ও বজ্রনিনাদ (الصَّيْحَةُ) এবং নিচ থেকে শুরু হয় এক প্রলয়ঙ্করী ভূকম্পন (الرَّجْفَةُ)। সেই শব্দ ও ভূকম্পনের তীব্রতায় তাদের বুকের কলিজা ফেটে যায় এবং তারা সবাই নিজ নিজ ঘরের ভেতর উপুড় হয়ে মৃতদেহে পরিণত হয়। ইরশাদ হয়েছে:
    ﴿فَأَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ فَأَصْبَحُوا فِي دَارِهِمْ جَاثِمِينَ﴾
    “অতঃপর এক প্রচণ্ড ভূমিকম্প তাদের গ্রাস করল, ফলে তারা তাদের নিজ নিজ গৃহেই মুখ থুবড়ে পড়ে রইল।” (সূরা আল-আ’রাফ: ৭৮)

আল্লাহ তাআলা তাঁর অপার কুদরতে সালেহ (আ.) এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নকারী ক্ষুদ্র দলটিকে নিরাপদে উদ্ধার করেন।

উপসংহার

কওমে সামূদ নিজেদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও পাহাড়ি দুর্গ নিয়ে অহংকার করেছিল। কিন্তু আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে কোনো প্রযুক্তি বা পাহাড়ি দুর্গ মানুষকে রক্ষা করতে পারে না। তাদের ধ্বংসাবশেষ আজও পৃথিবীর মানুষের জন্য গভীর শিক্ষণীয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


٦- متى وكيف بعث سيدنا موسى عليه السلام؟ وكيف دعا فرعون إلى الله؟ بين موضحاً –

[মুসা (আ) কখন কীভাবে নবুওয়াত প্রাপ্ত হন? তিনি কীভাবে ফেরাউনকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানান? বিশদভাবে বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম) ছিলেন উলুল আযম রাসুলদের অন্যতম এবং বনি ইসরাঈলের শ্রেষ্ঠতম নবী ও রাসুল। তাঁর কাছে প্রধান আসমানি কিতাব ‘তাওরাত’ নাযিল হয়েছিল। তিনি স্বৈরাচারী ফেরাউনের চরম জুলুমের যুগে জন্মগ্রহণ করে অলৌকিকভাবে ফেরাউনের রাজপ্রাসাদেই প্রতিপালিত হন। পরবর্তীতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা তাঁকে প্রত্যক্ষ বাক্যালাপের মাধ্যমে নবুওয়াতের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন।

১. মূসা (আ.) কখন ও কীভাবে নবুওয়াত প্রাপ্ত হন?

ক. পটভূমি ও সময়কাল:
মিশরে এক কিবতিকে অনিচ্ছাকৃতভাবে হত্যার ঘটনার পর মূসা (আ.) জীবনের নিরাপত্তার তাগিদে মাদইয়ান চলে যান। সেখানে তিনি প্রবীণ নবী হযরত শুআইব (আ.)-এর আশ্রয়ে দীর্ঘ আট বা দশ বছর অতিবাহিত করেন এবং তাঁর কন্যাকে বিবাহ করেন। চুক্তি মোতাবেক নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ করার পর তিনি স্বীয় পরিবারবর্গ নিয়ে পুনরায় মিশরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। শীতের এক ঘনঘোর অন্ধকার রাতে পথ চলতে গিয়ে তিনি সিনাই উপত্যকার সন্নিকটে দিক হারিয়ে ফেলেন এবং তীব্র শীতে আলোর প্রয়োজন অনুভব করেন।

খ. তূর পর্বতে নবুওয়াতের শুভ সূচনা (তুওয়ায়ে মুকাদ্দাস):
মরুভূমির অন্ধকারে মূসা (আ.) হঠাৎ তূর পাহাড়ের এক ঝোপের মধ্য থেকে প্রদীপ্ত আগুনের আলো দেখতে পান। তিনি তাঁর পরিবারকে বললেন, তোমরা অপেক্ষা কর, আমি সেখান থেকে কিছু আগুন নিয়ে আসি অথবা পথের সন্ধান পাই।
তিনি যখন আগুনের কাছে পৌঁছালেন, তখন দেখলেন এটি কোনো সাধারণ আগুন নয়, বরং এক সবুজ বৃক্ষের মধ্য থেকে স্বর্গীয় নূর বিচ্ছুরিত হচ্ছে। হঠাৎ এক গায়বি আওয়াজ ধ্বনিত হলো:
﴿يَا مُوسَىٰ إِنِّي أَنَا رَبُّكَ فَاخْلَعْ نَعْلَيْكَ ۖ إِنَّكَ بِالْوَادِ الْمُقَدَّسِ طُوًى ۞ وَأَنَا اخْتَرْتُكَ فَاسْتَمِعْ لِمَا يُوحَىٰ﴾
“হে মূসা! নিশ্চয় আমিই আপনার রব, অতএব আপনি আপনার জুতো খুলে ফেলুন; কারণ আপনি পবিত্র ‘তুওয়া’ উপত্যকায় রয়েছেন। আর আমি আপনাকে মনোনীত করেছি, অতএব যা ওহি পাঠানো হচ্ছে তা মনোযোগ দিয়ে শুনুন।” (সূরা ত্বাহা: ১২-১৩)

গ. দুটি তাৎক্ষণিক মোজেযা প্রদান:
আল্লাহ তাআলা মূসা (আ.)-কে তাঁর হাতের লাঠি নিক্ষেপ করতে বললেন। লাঠিটি নিক্ষেপ করার সাথে সাথে তা এক বিশাল জীবন্ত সাপে (ثُعْبَانٌ مُّبِينٌ) পরিণত হয়ে ছুটতে লাগল। মূসা (আ.) ভীত হলে আল্লাহ বললেন, নির্ভয়ে একে ধরুন, আমি একে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেব। অতঃপর আল্লাহ তাঁকে বগলের নিচে হাত রাখতে বললেন; বের করতেই তা কোনো রোগ ছাড়াই উজ্জ্বল শুভ্র আলোকময় (يَدٌ بَيْضَاءُ) হয়ে উঠল। এই দুটি অলৌকিক মোজেযা দিয়ে আল্লাহ তাঁকে স্বৈরাচারী ফেরাউন ও তার অমাত্যদের নিকট রিসালতের দায়িত্ব দিয়ে পাঠালেন।

২. মূসা (আ.) কীভাবে ফেরাউনকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানান?

মূসা (আ.) তাঁর ভাই হযরত হারূন (আ.)-কে সাথে নিয়ে ফেরাউনের দরবারে উপস্থিত হন। সেখানে তাঁর দাওয়াতের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ ও কুরআনিক নির্দেশনার ওপর প্রতিষ্ঠিত:

  1. নম্র ও শালীন ভাষার ব্যবহার (القول اللين): আল্লাহ মূসা ও হারূন (আ.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন:
    ﴿فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ﴾
    “তোমরা তার সাথে নরম সুরে কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় পাবে।” (সূরা ত্বাহা: ৪৪)
    সর্বোচ্চ স্বৈরাচারের সামনেও দাওয়াত দিতে গিয়ে দাঈর মেজাজ ও ভাষা কতটা সংযত ও ভদ্র হওয়া উচিত, এই আয়াত তার চূড়ান্ত প্রমাণ।
  2. রব্বুল আলামিনের যৌক্তিক পরিচয় প্রদান: ফেরাউন যখন অহংকারভরে প্রশ্ন করল, “হে মূসা! তোমাদের দুজনের রব কে?” তখন মূসা (আ.) দার্শনিক ও মহাজাগতিক উত্তর দিয়ে বললেন:
    ﴿رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَىٰ كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَىٰ﴾
    “আমাদের রব তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার উপযোগী আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর পথনির্দেশ করেছেন।” (সূরা ত্বাহা: ৫০)
  3. বনি ইসরাঈলকে দাসত্ব থেকে মুক্তির মানবিক দাবি: মূসা (আ.) ধর্মের সাথে সাথে মানবাধিকারের দাবি তুললেন:
    ﴿أَنْ أَدُّوا إِلَيَّ عِبَادَ اللَّهِ ۖ إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ﴾
    “আল্লাহর বান্দাদের (বনি ইসরাঈলকে) আমার হাতে অর্পণ কর; নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসুল।” (সূরা আদ-দুখান: ১৮)
  4. মোজেযা ও অকাট্য প্রমাণের প্রদর্শন: ফেরাউন যখন প্রমাণ দাবি করল, মূসা (আ.) তাঁর লাঠি নিক্ষেপ করলেন এবং তা অজগরে রূপ নিল, আর শুভ্র হাত বের করে দেখালেন। এরপর রাজকীয় জাদুকরদের সাথে ঐতিহাসিক মোকাবেলায় মূসা (আ.)-এর লাঠি জাদুকরদের সমস্ত ইন্দ্রজাল গিলে ফেলে। জাদুকররা তাৎক্ষণিকভাবে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে মুসা ও হারূনের রবের প্রতি ঈমান আনয়ন করে।

উপসংহার

হযরত মূসা (আ.)-এর নবুওয়াত ও দাওয়াত ছিল বাতিলের বিরুদ্ধে হকের নির্ভীক সংগ্রামের এক অনুপম দৃষ্টান্ত। তিনি রাজপ্রাসাদের ভয়াল পরিবেশেও বিন্দুমাত্র আপস না করে তাওহিদ ও মানবমুক্তির পয়গাম বুলন্দ করেছিলেন।


٧- ما التحديات والمشاكل التي واجهها موسى عليه السلام بعد خروجه ببني إسرائيل من مصر؟ وكيف عالجها؟ بين موضحاً –

[বনি ইসরাঈলকে নিয়ে মিশর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর মুসা (আ) কী কী চ্যালেঞ্জ ও সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন? এবং তিনি তা কীভাবে মোকাবেলা করেছিলেন? বিশদভাবে বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ফেরাউনের সলিল সমাধি এবং বনি ইসরাঈলকে অলৌকিকভাবে লোহিত সাগর পার করিয়ে মুক্ত করা ছিল হযরত মূসা (আ.)-এর জীবনের এক বিশাল বিজয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কিবতিদের দাসত্ব ও শোষণে পিষ্ট হওয়ার কারণে বনি ইসরাঈলের মনস্তত্ত্বে এক হীনমন্যতা, নৈতিক স্খলন ও অবাধ্যতার মানসিকতা বাসা বেঁধেছিল। ফলে মিশর থেকে মুক্তির পর মূসা (আ.)-কে বহিরাগত শত্রুর চেয়ে নিজ জাতির মানসিকতা ও আচরণ নিয়ে চরমতর চ্যালেঞ্জ ও সংকটের মোকাবেলা করতে হয়েছিল।

১. মূসা (আ.)-এর সম্মুখীন হওয়া প্রধান প্রধান চ্যালেঞ্জ ও সমস্যাসমূহ

  1. মূর্তিপূজার প্রতি অন্ধ আকর্ষণ: সমুদ্র পার হয়েই বনি ইসরাঈল একটি মূর্তিপূজক সম্প্রদায়কে তাদের প্রতিমার সামনে নতশির দেখতে পায়। অলৌকিকভাবে সাগর দ্বিখণ্ডিত হওয়ার দৃশ্য চাক্ষুষ দেখার পরও তারা মূসা (আ.)-কে বলল:
    ﴿اجْعَل لَّنَا إِلَٰهًا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ﴾
    “তাদের যেমন বহু উপাস্য রয়েছে, আমাদের জন্যও তেমনি একজন উপাস্য বানিয়ে দিন।” (সূরা আল-আ’রাফ: ১৩৮)
  2. পানির জন্য হাহাকার ও অসন্তোষ: তিহ মরুভূমির তপ্ত বালুকায় পানির অভাব দেখা দিলে তারা শোকর আদায় না করে মূসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও চরম অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করে।
  3. খাবারের প্রতি চরম অকৃতজ্ঞতা: আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য আসমান থেকে রাজকীয় খাবার ‘মান্না ও সালওয়া’ (কুয়াশার মতো সুমিষ্ট খাদ্য ও ভাজা পাখির গোশত) নাযিল করলেন। কিন্তু তারা এতে তৃপ্ত না হয়ে ধৃষ্টতার সাথে বলল:
    ﴿يَا مُوسَىٰ لَن نَّصْبِرَ عَلَىٰ طَعَامٍ وَاحِدٍ فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجْ لَنَا مِمَّا تُنبِتُ الْأَرْضُ مِن بَقْلِهَا وَقِثَّائِهَا وَفُومِهَا وَعَدَسِهَا وَبَصَلِهَا﴾
    “হে মূসা! আমরা এক খাবারে কখনো ধৈর্য ধারণ করতে পারব না; অতএব আপনার রবের কাছে দোআ করুন, তিনি যেন আমাদের জন্য শাকসবজি, শসা, গম, মসুর ও পেঁয়াজ উৎপন্ন করে দেন।” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ৬১)
  4. সামিরীর গোবৎস পূজা (عبادة العجل): মূসা (আ.) যখন তাওরাত গ্রহণের জন্য তূর পাহাড়ে চল্লিশ রাতের জন্য গমন করেন, তখন সামিরী নামক এক প্রতারকের প্ররোচনায় তারা স্বর্ণালঙ্কার গলিয়ে একটি শব্দকারী গোবৎস তৈরি করে এবং মূসা (আ.)-এর অনুপস্থিতিতে তার পূজায় লিপ্ত হয়।
  5. পবিত্র ভূমিতে জিহাদে অস্বীকৃতি ও চরম বেয়াদবি: যখন তাদেরকে ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করে জালিমদের বিরুদ্ধে জিহাদের নির্দেশ দেওয়া হলো, তখন তারা কুরুচিপূর্ণ ভাষায় বলল:
    ﴿فَاذْهَبْ أَنتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِلَا إِنَّا هَاهُنَا قَاعِدُونَ﴾
    “অতএব আপনি ও আপনার রব গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানেই বসে থাকলাম!” (সূরা আল-মায়েদাহ: ২৪)

২. মূসা (আ.) যেভাবে এসব সংকট মোকাবেলা করেছিলেন

হযরত মূসা (আ.) আল্লাহর নির্দেশনায় অত্যন্ত প্রজ্ঞা, কঠোরতা ও অনুকম্পার সমন্বয়ে এই জটিল মনস্তাত্ত্বিক রোগগুলো নিরাময় করেন:

  • তাওহিদের কঠোর বার্তা ও মূর্খতার তিরস্কার: মূর্তির দাবি শুনে তিনি স্পষ্ট বললেন: ﴿إِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ﴾—”তোমরা একটি চরম মূর্খ জাতি।” তিনি তাদের জানিয়ে দেন যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
  • মোজেযার মাধ্যমে পানির ব্যবস্থা: পানির তীব্র সংকটে মূসা (আ.) আল্লাহর নির্দেশে পাথরে লাঠি মারলেন। ফলে বারোটি গোত্রের জন্য বারোটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হলো (﴿فَانفَجَرَتْ مِنْهُ اثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًا﴾)। এতে তাদের গোত্রীয় বিবাদ দূরীভূত হয়।
  • গোবৎস পূজার মূলোৎপাটন: তূর থেকে ফিরে এসে তিনি ভ্রাতা হারূন (আ.)-কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, সামিরীকে বহিষ্কার করেন এবং সেই স্বর্ণের বাছুরটিকে পুড়িয়ে ছাই করে সাগরে ভাসিয়ে দেন যাতে শিরকের কোনো স্মৃতিচিহ্নও অবশিষ্ট না থাকে। এরপর তাওবার বিধান হিসেবে অপরাধীদের আত্মশুদ্ধির কঠিন ব্যবস্থা কার্যকর করেন।
  • আল্লাহর দরবারে কান্না ও ক্ষমা প্রার্থনা: তিনি কোনো প্রতিশোধ না নিয়ে জাতির অজ্ঞতার জন্য আল্লাহর দরবারে বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করেন: ﴿رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ﴾ (সূরা আল-আ’রাফ: ১৫১)।
  • তিহ প্রান্তরে দীর্ঘ চল্লিশ বছরের পুনর্বাসন: জিহাদ অস্বীকার করার কারণে আল্লাহ তাদের ওপর চল্লিশ বছর তিহ মরুভূমিতে দিশেহারা হয়ে ঘোরার শাস্তি দেন। এই সময় মূসা (আ.) দাসত্বগ্রস্ত পুরনো প্রজন্মের পরিবর্তে নতুন এক মুক্তমনা, সাহসী ও ঈমানদার প্রজন্ম গড়ে তোলেন, যারা পরবর্তীতে ইউশা ইবনে নূন (আ.)-এর নেতৃত্বে পবিত্র ভূমি জয় করে।

উপসংহার

বনি ইসরাঈলের বিভ্রান্ত মানসিকতা মোকাবেলায় হযরত মূসা (আ.)-এর ভূমিকা প্রমাণ করে যে, নিছক ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলেই একটি জাতি মুক্ত হয় না; তাদের মনোজগতের দাসত্ব ও আত্মিক গোলামি থেকে মুক্ত করার জন্য সুদীর্ঘ সংস্কার ও আদর্শিক তারবিয়াত অপরিহার্য।


٨- تحدث عن اسلوب دعوة سيدنا عيسى عليه السلام وثمرتها في ضوء القرآن الكريم –

[কুরআনের আলোকে ঈসা (আ) এর দাওয়াতের পদ্ধতি এবং তার ফলাফল আলোচনা কর।]

ভূমিকা

হযরত ঈসা (আলাইহিস সালাম) ছিলেন বনি ইসরাঈল ধারার সর্বশেষ মহান রাসুল এবং উলুল আযম রাসুলদের অন্যতম। পিতা ব্যতিরেকে কেবল আল্লাহর কুদরতি কালেমা ও রূহের ফুৎকারে তিনি হযরত মারইয়াম (আ.)-এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এমন এক যুগে আবির্ভূত হয়েছিলেন যখন বনি ইসরাঈল তাওরাতের আত্মাকে ভুলে গিয়ে নিছক বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা, কপটতা ও দুনিয়াপূজায় মত্ত ছিল। তিনি তাঁদেরকে আধ্যাত্মিক পুনরুজ্জীবন ও খোদাভীতির এক অনন্য দাওয়াত প্রদান করেন।

১. কুরআনের আলোকে ঈসা (আ.)-এর দাওয়াতের বৈশিষ্ট্য ও পদ্ধতি

  1. খাঁটি তাওহিদ ও দাসত্বের ঘোষণা: ঈসা (আ.) দোলনায় থাকাকালীন শৈশব থেকেই এবং নবুওয়াতের পূর্ণ মেয়াদে সর্বদা নিজেকে আল্লাহর বান্দা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন:
    ﴿إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ ۚ هَٰذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيمٌ﴾
    “নিশ্চয় আল্লাহ আমার রব এবং তোমাদেরও রব; অতএব তোমরা তাঁরই ইবাদত কর। এটিই সরল সঠিক পথ।” (সূরা আলে ইমরান: ৫১)
  2. তাওরাতের সত্যায়ন ও কঠিন বিধিবিধানের শিথিলকরণ: তিনি পূর্ববর্তী তাওরাতের সত্যতা ঘোষণা করেন এবং তাদের অবাধ্যতার কারণে যেসব হালাল বস্তু হারাম করা হয়েছিল, তার কিছু অংশ বৈধ করার ঘোষণা দেন:
    ﴿وَمُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَلِأُحِلَّ لَكُم بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ﴾ (সূরা আলে ইমরান: ৫০)।
  3. সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের সুসংবাদ: তাঁর দাওয়াতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল বিশ্বনবী (সা.)-এর শুভাগমনের ঘোষণা দেওয়া। কুরআনে এসেছে:
    ﴿وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِن بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ﴾
    “এবং আমার পর ‘আহমাদ’ নামে যে রাসুল আসবেন, তাঁর সুসংবাদদাতা হিসেবে আমি প্রেরিত হয়েছি।” (সূরা আস-সফফ: ৬)
  4. হৃদয়ের পরিশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকতার ওপর গুরুত্বারোপ: বনি ইসরাঈলের ফিকহি মারপ্যাঁচ ও বাহ্যিক প্রতারণা থেকে ফিরিয়ে তিনি অন্তরের বিনয়, ক্ষমা, আখলাক ও প্রেমের শিক্ষাদান করেন।
  5. অলৌকিক মোজেযার মাধ্যমে সত্যের সাক্ষ্য উপস্থাপন: আল্লাহ তাআলা ঈসা (আ.)-কে চিকিৎসাবিদ্যায় চরম উৎকর্ষ অর্জনকারী যুগের প্রেক্ষাপটে এমন সব মোজেযা দেন যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের অতীত ছিল:
    – মাটির তৈরি পাখিতে ফুঁক দিলে তা আল্লাহর হুকুমে জীবন্ত পাখি হয়ে উড়ে যেত।
    – জন্মান্ধ ও শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে আল্লাহর হুকুমে স্পর্শ করে নিরাময় করতেন।
    – আল্লাহর হুকুমে মৃত মানুষকে কবর থেকে জীবিত করতেন।
    – মানুষ ঘরে কী খায় এবং কী সঞ্চয় করে রাখে তা বলে দিতেন।

২. ঈসা (আ.)-এর দাওয়াতের ফলাফল ও পরিণতি (ثمار دعوته)

ঈসা (আ.)-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ দাওয়াতের বহুমুখী ফলাফল কুরআনে বিবৃত হয়েছে:

  • হাওয়ারীগণের (আনসারুল্লাহ) আত্মপ্রকাশ ও ঈমান আনয়ন: বনি ইসরাঈলের নেতারা যখন তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়াল, তখন একদল নিষ্কলুষ যুবক তাঁর প্রতি ঈমান আনল, যাদের কুরআনে ‘আল-হাওয়ারিয়্যূন’ বলা হয়েছে:
    ﴿فَلَمَّا أَحَسَّ عِيسَىٰ مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنصَارِي إِلَى اللَّهِ ۖ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنصَارُ اللَّهِ آمَنَّا بِاللَّهِ وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ﴾
    “অতঃপর ঈসা যখন তাদের থেকে কুফরি প্রত্যক্ষ করল, তখন বলল: আল্লাহর পথে কারা আমার সাহায্যকারী হবে? হাওয়ারীগণ বলল: আমরাই আল্লাহর সাহায্যকারী; আমরা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনি সাক্ষী থাকুন যে আমরা মুসলিম।” (সূরা আলে ইমরান: ৫২)
  • আসমানি খাদ্যপূর্ণ দস্তরখান (আল-মায়েদাহ) নাযিল: হাওয়ারীগণের অন্তরের বিশ্বাসকে মজবুত করার জন্য ঈসা (আ.) আল্লাহর দরবারে দোআ করেন এবং আসমান থেকে অলৌকিক খাদ্যপূর্ণ মায়েদাহ অবতীর্ণ হয়।
  • ইহুদিদের হিংসা ও হত্যার ষড়যন্ত্র: ইহুদি যাজকরা রোমান শাসকদের প্ররোচিত করে ঈসা (আ.)-কে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র করে।
  • আল্লাহর কুদরতে জীবিত আকাশে উত্তোলন (الرفع إلى السماء): আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে ইহুদিদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করে জীবিতাবস্থায় আকাশে তুলে নেন এবং ষড়যন্ত্রকারী একজন বিশ্বাসঘাতককে ঈসা (আ.)-এর আকৃতি দান করেন, যাকে তারা ক্রুশে বিদ্ধ করে হত্যা করে। কুরআন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছে:
    ﴿وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَٰكِن شُبِّهَ لَهُمْ ۚ … بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ ۚ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا﴾
    “এবং তাদের এই কথার কারণে যে, আমরা মারইয়াম-পুত্র ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি, যিনি ছিলেন আল্লাহর রাসুল। অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করেনি; বরং তাদের জন্য সাদৃশ্যপূর্ণ করা হয়েছিল। … বস্তুত আল্লাহ তাকে নিজের দিকে তুলে নিয়েছেন। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আন-নিসা: ১৫৭-১৫৮)

উপসংহার

হযরত ঈসা (আ.)-এর দাওয়াত ছিল একত্ববাদ ও আত্মিক উৎকর্ষের এক শাশ্বত আহ্বান। কিয়ামতের পূর্বে তিনি পুনরায় পৃথিবীতে অবতরণ করে দাজ্জালকে নিধন করবেন, খ্রিষ্টধর্মের ত্রিত্ববাদের অবসান ঘটিয়ে বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর শরিয়ত মোতাবেক ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে ইসলামকে বিশ্বব্যাপী বিজয়ী করবেন।


مجموعة (ب) : সংক্ষিপ্ত উত্তরীয় প্রশ্নাবলি

[পূর্ণমান: ৪ × ৫ = ২০]


٩- صف قوم نوح عليه السلام كما وصفهم القرآن الكريم –

[কুরআনের বর্ণনার আলোকে নূহ (আ) এর জাতির বর্ণনা দাও।]

উত্তর

হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর জাতি ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম শিরককারী এবং চরম হঠকারী ও অহংকারী সম্প্রদায়। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা নিম্নে তুলে ধরা হলো:

  1. মূর্তি পূজার গোঁড়ামি: তারা অতীতকালের সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের নামে তৈরি পাঁচটি মূর্তির পূজায় অন্ধভাবে লিপ্ত ছিল। কুরআন তাদের নেতাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলে: ﴿وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا﴾—”এবং তারা বলল: তোমরা কখনো তোমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করো না; আর ওয়াদ, সুওয়া’, ইয়াগূস, ইয়াঊক ও নাসরকে কখনো বর্জন করো না।” (সূরা নূহ: ২৩)।
  2. চরম হঠকারিতা ও দাওয়াত শ্রবণে অনীহা: নূহ (আ.) যখনই তাদের হিদায়েতের জন্য ডাকতেন, তারা কানে আঙুল দিয়ে রাখত এবং কাপড়ে মুখ ঢেকে নিত। আল্লাহ বলেন:
    ﴿وَإِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا﴾
    “আর আমি যখনই তাদেরকে ডেকেছি যাতে আপনি তাদের ক্ষমা করেন, তারা তাদের কানে আঙুল দিয়েছে, কাপড়ে নিজেদের ঢেকে নিয়েছে, অবাধ্যতায় অটল থেকেছে এবং চরম অহংকার প্রদর্শন করেছে।” (সূরা নূহ: ৭)
  3. দরিদ্র ঈমানদারদের উপহাস ও তাচ্ছিল্য: সমাজের বিত্তশালী কাফিররা নূহ (আ.)-এর অনুসারী দরিদ্র শ্রমজীবীদের ‘নিম্নশ্রেণির মানুষ’ (الأراذل) বলে আখ্যায়িত করত এবং তাদের সাথে বসতে অস্বীকার করত।
  4. দীর্ঘ মেয়াদে অবিচল কুফরি: সুদীর্ঘ সাড়ে নয়শত বছরের দাওয়াতেও হাতে গোনা অল্প কয়েকজন ব্যতীত বাকি পুরো সম্প্রদায় কুফরিতে অবিচল ছিল। ফলে আল্লাহ তাআলা মহাপ্লাবনের মাধ্যমে তাদের সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দেন।

١٠- من يُسمى بـ ‘أبو الأنبياء’ ولماذا؟ بين موجزاً –

[‘আবুল আম্বিয়া’ বা ‘নবিদের পিতা’ বলা হয় কাকে? কেন? সংক্ষেপে বর্ণনা দাও।]

উত্তর

১. ‘আবুল আম্বিয়া’ কাকে বলা হয়:
ইসলামি পরিভাষা ও ইতিহাসে খলিলুল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে ‘আবুল আম্বিয়া’ (أَبُو الْأَنْبِيَاءِ) অর্থাৎ ‘নবিদের পিতা’ বলা হয়।

২. কেন তাঁকে এই উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে:
হযরত ইবরাহীম (আ.)-কে ‘আবুল আম্বিয়া’ বলার মূল কারণ হলো—তাঁর পরবর্তী যুগে যত নবী ও রাসুল পৃথিবীতে আগমন করেছেন, তাঁরা সকলেই ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর রক্তজাত বংশধর। আল্লাহ তাআলা তাঁর দুই পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.) ও হযরত ইসহাক (আ.)-এর মাধ্যমে নবুওয়াতকে তাঁর বংশের মধ্যে চিরস্থায়ী করে দিয়েছিলেন।

  • ইসহাক (আ.)-এর ধারা: হযরত ইসহাক (আ.)-এর পুত্র হযরত ইয়াকুব (আ.) থেকে শুরু করে হযরত ইউসুফ, মূসা, হারূন, দাউদ, সুলাইমান, আইয়ূব, ইউনুস, যাকারিয়া, ইয়াহইয়া এবং ঈসা (আলাইহিমুস সালাম) পর্যন্ত বনি ইসরাঈলের হাজারো নবী আবির্ভূত হন।
  • ইসমাঈল (আ.)-এর ধারা: হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর পবিত্র বংশধারাতেই সমগ্র সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠতম রাসুল, খাতামুন নাবিয়্যীন সাইয়্যিদুনা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুভাগমন করেন।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
﴿وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَجَعَلْنَا فِي ذُرِّيَّتِهِ النُّبُوَّةَ وَالْكِتَابَ﴾
“এবং আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুব এবং তার বংশধরদের মাঝে নবুওয়াত ও কিতাব রেখে দিলাম।” (সূরা আল-আনকাবুত: ২৭)
এই ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক কারণেই তিনি সকল নবীর পিতা বা ‘আবুল আম্বিয়া’ হিসেবে স্বীকৃত।


١١- من أصحاب السبت؟ وماذا كان مصيرهم؟ بين موجزاً –

[‘আসহাবুস সাবত’ কারা? তাদের পরিণতি কী ছিল? সংক্ষেপে বর্ণনা কর।]

উত্তর

১. আসহাবুস সাবতের পরিচয়:
‘আসহাবুস সাবত’ (أَصْحَابُ السَّبْتِ) অর্থ হলো ‘শনিবারের অধিবাসী’ বা শনিবারের বিধান লঙ্ঘনকারী দল। এরা ছিল হযরত দাউদ (আ.)-এর যুগের বনি ইসরাঈলের একটি সম্প্রদায়, যারা লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত ‘আইলাহ’ (أَيْلَة – বর্তমান আকাবা সংলগ্ন) নামক বন্দর নগরীতে বসবাস করত।

আল্লাহ তাআলা পরীক্ষার অংশ হিসেবে তাদের জন্য শনিবারকে ইবাদতের পবিত্র দিন ধার্য করেন এবং শনিবারে মাছ শিকার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। অন্যদিকে শনিবারে সাগরের ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ পানির উপরিভাগে ভেসে উঠত, আর অন্যান্য দিনে মাছ আসত না (সূরা আল-আ’রাফ: ১৬৩)।

২. তাদের অপকৌশল ও ধূর্ততা (الحيلة):
লোভ সংবরণ করতে না পেরে তারা সরাসরি শনিবারে শিকার না করে এক ধূর্ত কৌশল বের করল। তারা শুক্রবার সমুদ্রের পাড়ে নালা ও গর্ত খুঁড়ে রাখত এবং শনিবার মাছ সেই গর্তে প্রবেশ করলে মুখ বন্ধ করে দিত, অতঃপর রবিবার গিয়ে মাছগুলো শিকার করত। তারা ভাবত এই চাতুর্যের মাধ্যমে আল্লাহর বিধানকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব।

৩. তাদের পরিণতি:
তাদের এই অবাধ্যতা ও প্রতারণার কারণে আল্লাহর ভয়াবহ গযব নেমে আসে। আল্লাহ তাদের আকৃতিকে বিকৃত করে নিকৃষ্ট বানরে রূপান্তরিত করে দেন (مَسْخُ الصُّورَةِ)। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
﴿فَلَمَّا عَتَوْا عَن مَّا نُهُوا عَنْهُ قُلْنَا لَهُمْ كُونُوا قِرَدَةً خَاسِئِينَ﴾
“অতঃপর তারা যখন তাদের নিষিদ্ধ কাজ অহংকারভরে করতে থাকল, তখন আমি তাদের বললাম: তোমরা লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত বানরে পরিণত হও।” (সূরা আল-আ’রাফ: ১৬৬)
তাফসিরবিদগণের মতে, বিকৃত হওয়ার পর তারা মানুষের ভাষা বুঝতে পারত কিন্তু কথা বলতে পারত না। তারা মাত্র তিন দিন জীবিত ছিল এবং খাবার না খেয়ে অশ্রু ফেলতে ফেলতে অবশেষে মৃত্যুবরণ করে সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়।


١٢- من بنو إسرائيل؟ بين بعض خصائصهم –

[বনি ইসরাঈল কারা? তাদের কিছু বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।]

উত্তর

১. বনি ইসরাঈলের পরিচয়:
‘বনি ইসরাঈল’ (بَنُو إِسْرَائِيلَ) অর্থ ‘ইসরাঈলের সন্তানগণ’। ‘ইসরাঈল’ ছিল হযরত ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম)-এর উপাধি, যার হিব্রু ও আরবি অর্থ হলো ‘আব্দুল্লাহ’ বা আল্লাহর একনিষ্ঠ দাস। হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর বারো জন পুত্রের ঔরসে যে বারোটি বিশাল শাখা বা গোত্র প্রসার লাভ করেছিল, তাদের সমষ্টিকেই ইতিহাসে ‘বনি ইসরাঈল’ বলা হয়।

২. বনি ইসরাঈলের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
পবিত্র কুরআনে বনি ইসরাঈলের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় ধরনের বৈশিষ্ট্যের বিস্তারিত আলোচনা এসেছে:

  • ঐশী অনুগ্রহ ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ: তাদের যুগে আল্লাহ তাদের সমগ্র বিশ্বের ওপর মর্যাদা দিয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে সর্বাধিক নবী-রাসুল প্রেরণ ও আসমানি কিতাব নাযিল করেছিলেন (সূরা আল-বাক্বারাহ: ৪৭)।
  • অঙ্গীকার ভঙ্গ ও গাদ্দারি (نقض العهود): তাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল আল্লাহর সাথে কৃত শক্ত অঙ্গীকার বারবার লঙ্ঘন করা। ইরশাদ হয়েছে: ﴿فَبِمَا نَقْضِهِم مِّيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ﴾ (সূরা আল-মায়েদাহ: ১৩)।
  • নবীদের হত্যা ও অসদাচরণ (قتل الأنبياء): নিজেদের স্বার্থ ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে গেলেই তারা আল্লাহর নিষ্পাপ নবীদের হত্যা করত বা চরম নির্যাতন করত (যেমন হযরত যাকারিয়া ও ইয়াহইয়া আ.)।
  • আল্লাহর কালামের বিকৃতি সাধন (تحريف الكلم): তারা তাওরাত ও ইনজিলের আয়াতসমূহের শব্দগত ও অর্থগত বিকৃতি ঘটিয়ে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো ফতোয়া তৈরি করত।
  • অতি-জিজ্ঞাসা ও হঠকারিতা: যে কোনো সহজ বিধান পেলেই তারা নানা কূটতর্ক ও খুঁটিনাটি প্রশ্ন তুলে জটিল করে তুলত (যেমন গাভীর ঘটনায়)।
  • দুনিয়াপ্রেম ও মৃত্যুর ভীতি: কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, তারা পার্থিব জীবনের প্রতি এতটাই আসক্ত ছিল যে প্রত্যেকে হাজার বছর বেঁচে থাকার আকঙ্ক্ষা করত (সূরা আল-বাক্বারাহ: ৯৬)।

١٣- تحدث عن أسلوب دعوة يوسف عليه السلام في السجن –

[জেলখানায় ইউসুফ (আ) এর দাওয়াতের পদ্ধতি আলোচনা কর।]

উত্তর

হযরত ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) ছিলেন একজন আদর্শ দাঈ। নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও যখন তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হলো, তখন তিনি বন্দিশালার চরম প্রতিকূল পরিবেশকেও দাওয়াতের এক উর্বর ময়দানে রূপান্তরিত করেছিলেন। তাঁর দাওয়াতি পদ্ধতির প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:

  1. উত্তম চরিত্র দ্বারা আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন: ইউসুফ (আ.) কারাগারে এমন নিষ্কলুষ চরিত্র, সততা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করেছিলেন যে সহবন্দিরা তাঁকে বলেছিল: ﴿إِنَّا نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ﴾—”আমরা আপনাকে একজন সদাচারী মানুষ হিসেবে দেখতে পাচ্ছি।” (সূরা ইউসুফ: ৩৬)। দাঈর ব্যক্তিগত চরিত্রই দাওয়াতের প্রাথমিক ভিত্তি।
  2. সুযোগের চমৎকার সদ্ব্যবহার: যখন দুজন বন্দি তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইল, ইউসুফ (আ.) তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাখ্যা না দিয়ে সেই কৌতূহলকে তাওহিদের দাওয়াত দেওয়ার স্বর্ণালী সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করলেন।
  3. নিজের পরিচয় ও তাওহীদি ঐতিহ্যের ঘোষণা: তিনি শুরুতেই বললেন, আমার এই ইলম কোনো জ্যোতির্বিদ্যা নয়, বরং আল্লাহপ্রদত্ত। তিনি ঘোষণা করলেন:
    ﴿وَاتَّبَعْتُ مِلَّةَ آبَائِي إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ ۚ مَا كَانَ لَنَا أَن نُّشْرِكَ بِاللَّهِ مِن شَيْءٍ﴾
    “আমি আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের আদর্শ অনুসরণ করেছি; আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করা আমাদের পক্ষে শোভা পায় না।” (সূরা ইউসুফ: ৩৮)
  4. যুক্তিগ্রাহ্য তুলনামূলক প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া: তিনি সহবন্দিদের উদ্দেশ্যে এক অকাট্য যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করলেন:
    ﴿يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَأَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ﴾
    “হে আমার কারাসঙ্গীদ্বয়! বহু ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপালক ভালো, নাকি মহা পরাক্রমশালী একক আল্লাহ?” (সূরা ইউসুফ: ৩৯)
  5. আল্লাহর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা: তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করলেন যে, সমস্ত হুকুম ও কর্তৃত্বের একমাত্র মালিক আল্লাহ: ﴿إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۚ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ﴾। এরপর তিনি নিখুঁতভাবে তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

١٤- اذكر بعض معجزات سليمان عليه السلام –

[সোলাইমান (আ) এর কয়েকটি মোজেযা আলোচনা কর।]

উত্তর

হযরত সোলাইমান (আলাইহিস সালাম) ছিলেন হযরত দাউদ (আ.)-এর পুত্র। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এমন এক নজিরবিহীন রাজত্ব ও অলৌকিক ক্ষমতা দান করেছিলেন, যা ইতিপূর্বে কাউকে দেননি এবং পরবর্তীতেও কাউকে দেবেন না। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত তাঁর প্রধান কয়েকটি মোজেযা নিম্নরূপ:

  1. বায়ুপ্রবাহের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ (تسخير الريح): আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বাতাসকে সোলাইমান (আ.)-এর অনুগত করে দিয়েছিলেন। তাঁর হুকুমে বাতাস তাঁর বিশাল বাহিনীকে বহন করে সকালে এক মাসের পথ এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ নিয়ে যেত। ইরশাদ হয়েছে:
    ﴿وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيحَ غُدُوُّهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ﴾ (সূরা সাবা: ১২)।
  2. জ্বিন ও শয়তানদের অনুগতকরণ: অবাধ্য ও অদৃশ্য জ্বিন জাতিকে আল্লাহ সোলাইমান (আ.)-এর সেবায় নিয়োজিত করেছিলেন। তারা ডুবুরি হিসেবে সাগর থেকে মুক্তা আনত এবং বিশাল প্রাসাদ, ভাস্কর্য, দুর্গ ও বিশালাকার পাত্র নির্মাণ করত (সূরা সাবা: ১৩)।
  3. পশুপাখি ও কীটপতঙ্গের ভাষা বোঝার ক্ষমতা: আল্লাহ তাঁকে ‘মানত্বিকাত তাইর’ (مَنْطِقَ الطَّيْرِ – পাখির ভাষা) শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি হুদহুদ পাখির ভাষা বুঝতেন এবং পিপীলিকার কথোপকথন বহু দূর থেকে শুনে মুচকি হেসেছিলেন (সূরা আন-নামল: ১৬-১৯)।
  4. গলিত তামার প্রস্রবণ লাভ: আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য কঠিন তামাকে পানির মতো তরল করে ভূগর্ভ থেকে প্রবাহিত করেছিলেন (﴿وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ الْقِطْرِ﴾), যা দিয়ে তাঁর যুগে বিপুল হাতিয়ার ও পাত্র নির্মিত হতো।
  5. পাখিদের সেনাদলে রূপান্তর: হুদহুদ পাখির মাধ্যমে সাবা রাজ্যের রাণী বিলকিসের খবর সংগ্রহ এবং সুসংগঠিতভাবে তাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা।

١٥- بين قصة ولادة عيسى عليه السلام بإيجاز –

[ঈসা (আ) এর জন্মের কাহিনী সংক্ষেপে বর্ণনা কর।]

উত্তর

হযরত ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর জন্ম ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর মোজেযা। পিতা ব্যতিরেকে কেবল কুদরতি আদেশে তাঁর জন্ম হয়েছিল। পবিত্র কুরআনের সূরা মারইয়ামে এর সংক্ষিপ্ত ও মনোজ্ঞ বিবরণ নিম্নরূপ:

  1. স্বর্গীয় দূতের আগমন ও সুসংবাদ: হযরত মারইয়াম (আ.) বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব পাশে নির্জন কক্ষে আল্লাহর ইবাদতে রত ছিলেন। হঠাৎ জিবরাঈল (আ.) একজন পূর্ণাঙ্গ সুদর্শন পুরুষের বেশে তাঁর সামনে আবির্ভূত হন। মারইয়াম ভীত হয়ে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করলে জিবরাঈল (আ.) বললেন:
    ﴿إِنَّمَا أَنَا رَسُولُ رَبِّكِ لِأَهَبَ لَكِ غُلَامًا زَكِيًّا﴾
    “আমি তো কেবল আপনার রবের প্রেরিত দূত, যাতে আপনাকে এক পবিত্র পুত্র সন্তান দান করতে পারি।” (সূরা মারইয়াম: ১৯)
  2. পবিত্র গর্ভধারণ: মারইয়াম (আ.) বিস্মিত হয়ে বললেন, কোনো পুরুষ আমাকে স্পর্শ করেনি এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই, তবে কীভাবে সন্তান হবে? জিবরাঈল (আ.) বললেন, এটি আল্লাহর জন্য নিতান্তই সহজ এবং একে মানবজাতির জন্য নিদর্শন ও রহমত করা হবে। অতঃপর জিবরাঈল (আ.) তাঁর জামার কলারের কাছে আল্লাহর নির্দেশিত রূহের ফুঁক দিলেন এবং তিনি গর্ভবতী হলেন।
  3. প্রসববেদনা ও ঐশী সান্ত্বনা: সন্তান প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে লোকলজ্জা ও কষ্টের ভয়ে তিনি বহুদূরের এক নির্জন স্থানে একটি শুকনা খেজুর গাছের নিচে আশ্রয় নেন। প্রসববেদনায় কাতর হয়ে তিনি বললেন:
    ﴿يَا لَيْتَنِي مِتُّ قَبْلَ هَٰذَا وَكُنتُ نَسْيًا مَّنسِيًّا﴾
    “হায়! আমি যদি এর পূর্বেই মারা যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে যেতাম!” (সূরা মারইয়াম: ২৩)
    তখন নিচ থেকে আওয়াজ এলো—ভয় পেয়ো না, তোমার রব তোমার নিচ দিয়ে একটি ঝরনা প্রবাহিত করেছেন। আর তুমি খেজুর গাছের ডালটি নাড়া দাও, তোমার ওপর তাজা পাকা খেজুর ঝরে পড়বে। তুমি খাও, পান করো এবং চোখ জুড়াও।
  4. দোলনায় অলৌকিক বাকস্ফুরণ: মারইয়াম যখন নবজাতককে কোলে নিয়ে স্বজাতির নিকট আসলেন, তখন তারা চরম কটূক্তি করে ব্যভিচারের অপবাদ তুলল। মারইয়াম (আ.) মৌনব্রত রেখেছিলেন, তাই তিনি নবজাতকের দিকে ইঙ্গিত করলেন। তারা অবাক হয়ে বলল, দোলনার শিশুর সাথে আমরা কীভাবে কথা বলব? তখনই নবজাতক ঈসা (আ.) অলৌকিকভাবে বলে উঠলেন:
    ﴿قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا ۞ وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا﴾
    “তিনি বললেন: নিশ্চয় আমি আল্লাহর বান্দা; তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। আর আমি যেখানেই থাকি না কেন, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন এবং যতদিন জীবিত থাকি ততদিন আমাকে সালাত ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।” (সূরা মারইয়াম: ৩০-৩১)

١٦- تحدث عن موضوعات دعوة الأنبياء عليهم السلام باختصار –

[নবিগণের (আ) দাওয়াতের বিষয়বস্তু সংক্ষেপে আলোচনা কর।]

উত্তর

আদম (আ.) থেকে শুরু করে সাইয়্যিদুনা মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত যুগে যুগে যত নবী ও রাসুল পৃথিবীতে আগমন করেছেন, স্থান-কাল ও ভাষার ভিন্নতা থাকলেও তাঁদের দাওয়াতের মূল বিষয়বস্তু ও রূপরেখা ছিল অভিন্ন। পবিত্র কুরআনের আলোকে নবিগণের দাওয়াতের মৌলিক বিষয়বস্তুসমূহ সংক্ষেপে নিম্নে তুলে ধরা হলো:

  1. তাওহিদ ও আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা (إفراد الله بالعبودية): সমস্ত নবীর সর্বপ্রথম ও প্রধানতম দাওয়াত ছিল এক আল্লাহর ইবাদত করা এবং সকল প্রকার শিরক ও তাগুতকে অস্বীকার করা। কুরআনে এসেছে:
    ﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ﴾ (সূরা আন-নাহল: ৩৬)। সকল নবীর সম্মিলিত স্লোগান ছিল: ﴿يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ﴾।
  2. রিসালতের প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য (الإيمان بالرسالة وطاعة الرسل): নবীরা মানবজাতিকে সতর্ক করেছেন যে, মুক্তি পেতে হলে আল্লাহর প্রেরিত রাসুলের নির্দেশিত পথে চলতে হবে। তাই তাঁরা বলতেন: ﴿فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ﴾—”অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর।”
  3. আখেরাত ও পরকালীন জবাবদিহিতা (الإيمان باليوم الآخر والجزاء): কিয়ামত, কবর, হাশর-নশর, মিজান, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ দিয়ে মানুষকে সতর্ক করা এবং দুনিয়াকে আখেরাতের শস্যক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করার শিক্ষা দেওয়া।
  4. আত্মশুদ্ধি ও চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধন (تزكية النفوس ومكارم الأخلاق): মিথ্যা, প্রতারণা, ব্যভিচার, জুলুম, কৃপণতা ও অহংকার দূর করে সততা, ইনসাফ, ধৈর্য ও দানশীলতার মতো সর্বোত্তম মানবিক গুণাবলি প্রতিষ্ঠা করা।
  5. সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা (إقامة القسط والعدل): দুর্বল ও অসহায়দের অধিকার প্রতিষ্ঠা, মাপে কম না দেওয়া, সুদ ও শোষণ বন্ধ করে ইনসাফভিত্তিক সমাজ কায়েম করা। ইরশাদ হয়েছে:
    ﴿لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ﴾
    “নিশ্চয় আমি আমার রাসুলগণকে সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও ন্যায়দণ্ড (মিযান) অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।” (সূরা আল-হাদীদ: ২৫)

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ‘উলুল আযম’ রাসুল কারা এবং তাঁদের সংখ্যা কত?

ইসলামি শরিয়তের জমহুর উলামা ও মুফাসসিরীনদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মতে ‘উলুল আযম’ রাসুল হলেন পাঁচজন: ১. হযরত নূহ (আ.), ২. হযরত ইবরাহীম (আ.), ৩. হযরত মূসা (আ.), ৪. হযরত ঈসা (আ.), এবং ৫. সাইয়্যিদুনা হযরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)। চরম প্রতিকূলতা ও পরীক্ষার মুখে পর্বতসম ধৈর্য ও অবিচল সংকল্প প্রদর্শনের কারণে আল্লাহ তাঁদের এই বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন।

২. আসহাবুল আয়কার নিকট কোন রাসুল প্রেরিত হয়েছিলেন এবং তাঁদের মূল অপরাধ কী ছিল?

আসহাবুল আয়কার নিকট মহান নবী হযরত শুআইব (আলাইহিস সালাম) প্রেরিত হয়েছিলেন। তাঁদের প্রধান অপরাধ ছিল শিরক করা, মাপে ও ওজনে কম দেওয়া, পথচারীদের মালামাল লুণ্ঠন করা এবং ব্যবসায়ে প্রতারণা করা। ফলে মেঘাচ্ছন্ন দিবসের ভয়াবহ অগ্নিবৃষ্টি ও বজ্রনিনাদে (আযাবু ইয়াউমিয জুল্লাহ) তারা সমূলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

৩. লূত (আ.)-এর জাতিকে কেন সমূলে ধ্বংস করা হয়েছিল?

কওমে লূত মানব ইতিহাসের প্রথম জঘন্য বিকৃত যৌনাচার (সমকামিতা), পথচারীদের রাহাজানি এবং প্রকাশ্য জনসমাবেশে নির্লজ্জ পাপাচারের সাথে যুক্ত ছিল। তারা রাসুলের নসিহত অগ্রাহ্য করে পবিত্র লোকদের দেশান্তরের হুমকি দিয়েছিল। ফলে জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে পুরো সাদূম নগরীকে উল্টে আকাশ থেকে পোড়ামাটির চিহ্নিত পাথরবৃষ্টি বর্ষণ করে তাদের ধ্বংস করা হয়।

৪. সালেহ (আ.)-এর উটনীর মোজেযা এবং তাঁর জাতির ধ্বংসের কারণ কী ছিল?

সামূদ জাতির কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে সালেহ (আ.) আল্লাহর নিকট দোআ করলে পাহাড়ের নিরেট পাথর ফেটে এক অলৌকিক গর্ভবতী উটনী (নাক্বাতুল্লাহ) আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু অবাধ্যরা উটনীর পানি পানের অধিকার হরণ করে ক্বাদার ইবনে সালিফের নেতৃত্বে উটনীটিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ফলে প্রচণ্ড ভূকম্পন ও আসমানি বজ্রনিনাদে তারা নিজ নিজ গৃহে ধ্বংস হয়ে যায়।

৫. মূসা (আ.) তূর পর্বতে কীভাবে নবুওয়াত লাভ করেন?

মাদইয়ান থেকে পরিবার নিয়ে মিশরে ফেরার পথে শীতের রাতে পথ হারিয়ে সিনাইয়ের পবিত্র তুওয়া উপত্যকার তূর পর্বতে আগুনের নূরের সন্ধান পান। সেখানে আল্লাহ তাআলা সরাসরি তাঁর সাথে কথা বলেন (তাকলিমুল্লাহ) এবং তাঁকে নবুওয়াতের দায়িত্ব প্রদান করেন। সাথে সাথে লাঠির অজগরে রূপান্তর এবং উজ্জ্বল শুভ্র হাত (ইয়াদে বায়যা) নামক দুটি মহান মোজেযা প্রদান করেন।

৬. আসহাবুস সাবত (শনিবারওয়ালা) কারা এবং তাঁদের কী পরিণতি হয়েছিল?

আসহাবুস সাবত ছিল হযরত দাউদ (আ.)-এর যুগের বনি ইসরাঈলের একটি দল, যারা আইলাহ নামক সাগরের তীরে বাস করত। শনিবার আল্লাহর পক্ষ থেকে মাছ শিকার নিষিদ্ধ থাকলেও তারা ধূর্ত কৌশল (হিলাহ) করে রবিবার মাছ ধরত। এই প্রতারণার শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাআলা তাদের চেহারা বিকৃত করে লাঞ্ছিত বানরে রূপান্তরিত করে দেন এবং তিন দিন পর তারা মৃত্যুবরণ করে।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন