ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: الفقه وأصوله (আল-ফিকহ ওয়া উসূলুহু / ব্যবহারিক ফিকহ ও উসূলে ফিকহ)
বিষয় কোড: ২০১৮০৮ | পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১১৮
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
القسم الأول : الفقه الإسلامي (প্রথম অংশ – ব্যবহারিক ফিকহ ও মুয়ামালাত) [পূর্ণমান: ৪০]
مجموعة (الف) : الأسئلة التحريرية (গ্রুপ ‘ক’ – বিশদ রচনামূলক প্রশ্নাবলি) [মান: ২ × ১৫ = ৩০]
١- ما هو علم الفقه؟ اذكر موضوعه وغرضه مفصلا-
[علم الفقه কাকে বলে? এর আলোচ্য বিষয় ও উদ্দেশ্য বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
১. ইলমুল ফিকহের সংজ্ঞা (تعريف علم الفقه):
আভিধানিক অর্থ: ‘ফিকহ’ (الْفِقْهُ) শব্দের আভিধানিক অর্থ কোনো বস্তুর গভীর তত্ত্বজ্ঞান, সূক্ষ্ম জ্ঞান ও প্রজ্ঞা (الْفَهْمُ الدَّقِيقُ)।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমামে আযম আবু হানিফা (রহ.) ফিকহের সার্বিক সংজ্ঞা দিয়েছেন—
«مَعْرِفَةُ النَّفْسِ مَا لَهَا وَمَا عَلَيْهَا»
অর্থাৎ: “মানুষের আত্মা বা ব্যক্তির জন্য কোনটি কল্যাণকর ও অধিকারভুক্ত এবং কোনটি ক্ষতিকর ও বর্জনীয়—তা গভীরভাবে জানাই হলো ফিকহ।”
পরবর্তীতে জমহুর ফুকাহায়ে কিরামের সংজ্ঞায়—
«الْعِلْمُ بِالْأَحْكَامِ الشَّرْعِيَّةِ الْعَمَلِيَّةِ الْمُكْتَسَبَةِ مِنْ أَدِلَّتِهَا التَّفْصِيلِيَّةِ»
অর্থাৎ: “কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের মতো বিস্তারিত প্রামাণ্য দলিলসমূহ থেকে উদ্ভাবিত মানুষের ব্যবহারিক ও বাস্তব জীবনের শরয়ি হুকুম-আহকামের বিজ্ঞানভিত্তিক সুশৃঙ্খল জ্ঞানকেই ইলমুল ফিকহ বলে।”
২. ইলমুল ফিকহের আলোচ্য বিষয় (موضوع علم الفقه):
ফিকহ শাস্ত্রের মূল আলোচ্য বিষয় হলো “মুকাল্লাফ বা প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষের বাস্তব কর্ম” (أَفْعَالُ الْمُكَلَّفِينَ)। মানুষের জীবনের যেকোনো কাজই হোক না কেন, ফিকহ শাস্ত্র তার ওপর পাঁচটি শরয়ি হুকুমের কোনো একটি আরোপ করে:
১. ওয়াজিব/ফরজ (বাধ্যতামূলক),
২. মানদুব/মুস্তাহাব (প্রশংসনীয়),
৩. মুবাহ (অনুমোদিত/নিরপেক্ষ),
৪. মাকরূহ (অপছন্দনীয়), অথবা
৫. হারাম (নিষিদ্ধ ও অবৈধ)।
মানবজীবনের ইবাদত (নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত), মুয়ামালাত (ব্যবসা-বাণিজ্য, চুক্তি, বন্ধক), মুনাজাহাত (বিবাহ, তালাক, পরিবার) এবং জিনায়াত (দণ্ডবিধি, বিচার ব্যবস্থা) এর অন্তর্ভুক্ত।
৩. ফিকহ শাস্ত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (غرض علم الفقه وغايته):
- পার্থিব জীবনে মহান আল্লাহর নির্দেশাবলি সঠিকভাবে পালন করে ব্যক্তির ইহকালীন শান্তি ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা।
- আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবনে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি, ক্ষমার পরোয়ানা এবং জান্নাতুল ফিরদাউস অর্জন করা।
- উম্মাহকে হালাল-হারামের সুস্পষ্ট সীমারেখা শিক্ষা দিয়ে জুলুম ও বিশৃঙ্খলা থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করা।
٢- اكتب تاريخ نشأة علم الفقه وتطوره موضحا-
[ফিকহ শাস্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস বিশদভাবে লেখ।]
১. উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক পর্যায়ক্রম (مراحل تطور الفقه):
ইসলামী ফিকহের ইতিহাস মানব সভ্যতার আইনের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ও গতিশীল ধারা। এটি মূলত পাঁচটি ঐতিহাসিক যুগে বিকাশ লাভ করেছে:
- প্রথম যুগ: নবুয়তের স্বর্ণযুগ (عصر الرسالة والنبوة):
- আইন প্রণয়ন ও বিধিবিধানের একমাত্র কেন্দ্র ছিলেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ।
- বিধানাবলি প্রধানত দুটি ঐশী মাধ্যমে নাজিল হতো: ওহিয়ে মাতলু (পবিত্র কুরআন) এবং ওহিয়ে গায়রে মাতলু (সুন্নাতে রাসুল)। সাহাবীগণ কোনো জটিলতায় পড়লে সরাসরি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ফয়সালা গ্রহণ করতেন।
- দ্বিতীয় যুগ: খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ (عصر الخلفاء الراشدين):
- রাসুলের ওফাতোত্তর নতুন পরিস্থিতি ও সাম্রাজ্য বিস্তারের যুগে খলিফাগণ কোনো সমস্যায় পড়লে প্রথমে কুরআনে খুঁজতেন, না পেলে হাদিসে খুঁজতেন; হাদিসে না পেলে বিশিষ্ট সাহাবীদের নিয়ে শুরা ও ইজমার মাধ্যমে রায় দিতেন।
- প্রয়োজনে তাঁরা ইল্লত বা কার্যকারণের ভিত্তিতে কিয়াস করতেন। হযরত উমর, আলী, ইবনে মাসউদ ও আয়িশা (রা.) এ যুগের শ্রেষ্ঠ ফকিহ ছিলেন।
- তৃতীয় যুগ: তাবেয়ীন ও উমাইয়া আমল (মাদরাসাতুল হাদিস বনাম মাদরাসাতুর রায়):
- সাহাবায়ে কিরাম বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়লে দুটি প্রধান ধারা গড়ে ওঠে: মদিনায় প্রখ্যাত সাত ফকিহ (ফুকাহায়ে সাবআ)-এর নেতৃত্বে হাদিসভিত্তিক ধারা (মাদরাসাতুল হাদিস) এবং কুফা ও ইরাকে ইবনে মাসউদের ধারায় যুক্তি ও কিয়াসভিত্তিক ধারা (মাদরাসাতুর রায়)।
- চতুর্থ যুগ: সংকলন ও চার প্রধান মাযহাবের বিকাশ (আব্বাসী যুগ):
- দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরী শতাব্দীতে চার প্রধান ইমাম—আবু হানিফা, মালিক, শাফেয়ী ও আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর মাধ্যমে ফিকহ শাস্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক সংকলন সম্পন্ন হয়। উসূলে ফিকহ রচিত হয় এবং মাসআলাসমূহ গ্রন্থবদ্ধ হয়।
- পঞ্চম যুগ: তাকলীদ, ফতোয়া ও আধুনিক সংহিতাকরণ:
- পরবর্তী শতকগুলোতে চার মাযহাবের অধীনে ফতোয়া ও বিশ্বকোষীয় আইনগ্রন্থ সংকলিত হয় (যেমন ফতোয়ায়ে আলমগীরী ও মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ)। বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমিগুলো সমকালীন আধুনিক ব্যাংক, চিকিৎসা ও প্রযুক্তির ফিকহি সমাধান দিচ্ছে।
٣- ما البيع؟ وما الفرق بين البيع الباطل والفاسد بالتفصيل-
[البيع শব্দের অর্থ কী? البيع الباطل ও البيع الفاسد এর মধ্যে পার্থক্য বিস্তারিতভাবে লেখ।]
১. বায়ে’ বা ক্রয়-বিক্রয়ের সংজ্ঞা (مفهوم البيع):
আভিধানিক অর্থ: ‘বায়’ (الْبَيْعُ) শব্দের অর্থ লেনদেন করা, বিনিময় করা বা কোনো পণ্য হস্তান্তর করা।
শরিয়তের পরিভাষায়: পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে কোনো নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে কোনো হালাল পণ্যের মালিকানা একজনের কাছ থেকে অন্যজনের নিকট হস্তান্তর করাকে ‘বায়’ বা ক্রয়-বিক্রয় বলে (مُبَادَلَةُ مَالٍ بِمَالٍ بِالتَّرَاضِي)।
২. বায়েলে বাতিল ও বায়েলে ফাসেদ-এর পরিচয় ও পার্থক্য (الفرق بين البيع الباطل والبيع الفاسد):
হানাফী ফিকহে অবৈধ চুক্তিকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে (জমহুর ফুকাহায়ে শাফেয়ী ও মালেকীর নিকট উভয়টিই বাতিল):
| পার্থক্যের ক্ষেত্র | বায়েলে বাতিল (البيع الباطل) | বায়েলে ফাসেদ (البيع الفاسد) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা ও কারণ | যে চুক্তিতে চুক্তির মূল ভিত্তি বা রুকনেই গলদ থাকে; অর্থাৎ চুক্তির উপাদানটিই শরিয়তে মাল নয় (যেমন মদ, শূকর বা মৃত প্রাণীর বেচাকেনা)। | চুক্তির মূল ভিত্তি ও রুকন সহিহ কিন্তু এর কোনো বাহ্যিক শর্ত বা গুণগত অবস্থায় শরিয়তবিরোধী ত্রুটি ঢুকেছে (যেমন অজ্ঞাত শর্ত বা ধোঁকা)। |
| আইনি অস্তিত্ব | শরিয়তের দৃষ্টিতে চুক্তিটি আদৌ অস্তিত্ব লাভ করেনি (عدم الانعقاد)। | চুক্তিটি মূলত সংঘটিত হয়েছে কিন্তু এর কার্যকারিতা দূষিত হয়ে আটকে আছে (انعقد بأصله دون وصفه)। |
| মালিকানা স্বত্ব | ক্রেতা পণ্য হস্তগত করলেও কোনো অবস্থাতেই মালের মালিকানা স্বত্ব অর্জিত হয় না। পণ্যে হাত দেওয়া হারাম। | যদি ক্রেতা বিক্রেতার সম্মতিতে পণ্যটি দখল (কবজা) করে নেয়, তবে তার ওপর শর্তযুক্ত অপূর্ণ মালিকানা কার্যকর হয়। |
| চুক্তির প্রতিকার | বাতিল চুক্তি কখনো কোনো শর্ত বিলোপ করে সহিহ বা বৈধ করা যায় না; এটি শুরু থেকেই অকার্যকর। | যদি চুক্তির ফাসেদ সৃষ্টিকারী অবৈধ শর্তটি দূর করে দেওয়া হয়, তবে চুক্তিটি বৈধ ও সহিহ কেনাবেচায় রূপান্তরিত হয়। |
| বাস্তব উদাহরণ | স্বাধীন মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রি করা, অথবা রক্ত ও শবদেহ বিক্রি করা। | অনির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রি করা, অথবা এমন শর্তারোপ করা যাতে শুধু এক পক্ষ অন্যায় সুবিধা পায়। |
٤- عرّف الكراهية- وكم قسما لها؟ اذكر اراء الفقهاء فى حكمها مفصلا-
[الكراهية এর অর্থ কী? এটা কত প্রকার? এর হুকুম নিয়ে ফকীহদের মতামত বিস্তারিত লেখ।]
১. কারাহিয়্যাত-এর সংজ্ঞা (مفهوم الكراهية):
আভিধানিক অর্থ: অপছন্দনীয়তা, বিরক্তি বা বর্জনীয় হওয়া।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে কাজের ব্যাপারে শরিয়ত তা বর্জন বা পরিত্যাগ করার দাবি জানিয়েছে, কিন্তু সেই দাবিটি হারামের মতো অকাট্য ও চূড়ান্ত বাধ্যবাধকতামূলক নয়, তাকে ‘মাকরূহ’ (المكروه) বলা হয়।
২. কারাহিয়্যাতের প্রকারভেদ ও ফুকাহায়ে কিরামের অভিমত:
হানাফী উসূলবিদদের মতে কারাহিয়্যাত মূলত দুই প্রকার:
- المكروه تحريما (মাকরূহে তাহরীমী):
- সংজ্ঞা: যে কাজের নিষেধ কোনো যন্নী বা প্রবল ধারণামূলক দলিল (যেমন একক হাদিস বা খবরুল ওয়াহিদ) দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। এটি মূলত হারামের কাছাকাছি (قريب من الحرام)।
- হুকুম: এটি পরিত্যাগ করা ওয়াজিব এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পাদন করা কবিরা গুনাহ ও ফিসক। তবে যেহেতু দলিলটি অকাট্য নয়, তাই একে অস্বীকারকারী কাফের হবে না। যেমন: অন্যের চলমান ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর অনুপ্রবেশ করে দালালি করা, অথবা পুরুষের রৌপ্যের আংটি ব্যতীত অন্য ধাতুর আংটি পরা।
- المكروه تنزيها (মাকরূহে তানযীহী):
- সংজ্ঞা: যে কাজের বর্জনের তাগিদ রয়েছে কিন্তু তার মধ্যে কোনো শাস্তির ভীতি প্রদর্শন নেই; বরং কাজটি পরিহার করাই উত্তম ও শিষ্টাচারসম্মত (قريب من المباح)।
- হুকুম: এটি পরিহার করলে সওয়াব মিলবে, কিন্তু করলে কোনো গুনাহ বা আখেরাতের শাস্তি হবে না; তবে তা অপছন্দনীয় ও ভর্ৎসনাযোগ্য। যেমন: দাঁড়িয়ে পানি পান করা, অথবা অজুতে অপ্রয়োজনীয় পানি ব্যয় করা।
জমহুর ফুকাহায়ে কিরামের মত: ইমাম শাফেয়ী ও আহমাদ (রহ.)-এর মতে সাধারণভাবে মাকরূহ বলতে মাকরূহে তানযীহী বোঝায়; আর যা বর্জন করা বাধ্যতামূলক তা সরাসরি ‘হারাম’-এর অন্তর্ভুক্ত।
مجموعة (ب) : الأسئلة الموجزة (গ্রুপ ‘খ’ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি) [মান: ২ × ৫ = ১০]
٥- من هنّ المحرمات؟ وما حكم مسّ المحرمات؟ بيّن-
[মুহাররামাত কারা? মুহাররামা মহিলাকে স্পর্শ করার বিধান কী? বর্ণনা কর।]
১. মুহাররামাত (যাদের বিবাহ চিরতরে হারাম)-এর পরিচয়:
পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ২৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখিত যে নারীদের সাথে কোনো পুরুষের বিবাহ চিরতরে হারাম, তাদের ‘মুহাররামাত’ বা মাহরাম বলা হয়। এরা প্রধানত তিন শ্রেণিতে বিভক্ত:
- রক্তসম্পর্কীয় মাহরাম (المحرمات بالنسب): মা, দাদী, কন্যা, নাতনী, সহোদর বা বৈমাত্রেয় বোন, ফুফু এবং খালা।
- দুধসম্পর্কীয় মাহরাম (المحرمات بالرضاع): দুধমা এবং দুধবোন (দুধসম্পর্কে রক্তসম্পর্কের অনুরূপ সমস্ত সম্পর্ক হারাম হয়)।
- বৈবাহিক সম্পর্কীয় মাহরাম (المحرمات بالمصاهرة): শাশুড়ি, সৎমা, পুত্রের স্ত্রী (পুত্রবধূ) এবং স্ত্রীর পূর্ববর্তী ঘরের কন্যা।
২. মুহাররামা নারীকে স্পর্শ করার শরয়ি বিধান:
- মুহাররামা নারীর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা, সালাম দেওয়া এবং সম্মানসূচক মাথায় বা কপালে স্নেহচুম্বন ও করমর্দন করা সম্পূর্ণ বৈধ।
- তবে শর্ত হলো—তা অবশ্যই কামভাব ও কুপ্রবৃত্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে হবে (بشرط أمن الفتنة والشهوة)। যদি কামভাব জাগ্রত হওয়ার সামান্যতম আশঙ্কা থাকে, তবে স্পর্শ করা সম্পূর্ণরূপে হারাম।
٦- ما معنى الرهن؟ وما اركانه وشروطه؟ بيّن بالاختصار-
[الرهن এর অর্থ কী? এর রুকন ও শর্তগুলো কী কী? সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
১. রাহানের সংজ্ঞা (معنى الرهن):
কোনো আর্থিক ঋণের নিশ্চয়তা ও জামানত হিসেবে পাওনাদারের নিকট কোনো মূল্যবান সম্পদ বা স্থাবর-অস্থাবর বস্তু আইনগতভাবে আটকে রাখাকে ‘রাহান’ বা বন্ধক বলে।
২. রাহানের প্রধান রুকন ও শর্তাবলি:
- রুকন: প্রস্তাব ও গ্রহণ (ইজাব ও কবুল) এবং বন্ধকি বস্তুটি পাওনাদারের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা (আল-ক্ববয)।
- শর্তাবলি:
- বন্ধকদাতা (রাহিন) ও গ্রহণকারী (মুরতাহিন) সুস্থ বিবেকসম্পন্ন ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া।
- বন্ধকি বস্তুটি শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ মাল এবং হস্তান্তরযোগ্য হওয়া।
- বন্ধকি বস্তুটি অবিভক্ত (গায়রে শায়ে’) হওয়া যাতে ঋণের বিকল্প হিসেবে বিক্রি করা সম্ভব হয়।
٧- اكتب كيفية استعمال المرهون وحفاظته مع بيان حكم الرهن-
[বন্ধকি বস্তুর ব্যবহার ও তার সংরক্ষণ পদ্ধতি ও الرهن এর বিধান উল্লেখ কর।]
- বন্ধক রাখার শরয়ি হুকুম: প্রয়োজনের সময় ঋণ গ্রহণের নিশ্চয়তা হিসেবে বন্ধক রাখা কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য বিধানে মুস্তাহাব ও জায়েজ (فَرِهَانٌ مَّقْبُوضَةٌ)। রাসুল ﷺ এক ইহুদির কাছে নিজের বর্ম বন্ধক রেখে খাদ্যশস্য ঋণ নিয়েছিলেন।
- বন্ধকি বস্তুর সংরক্ষণ (حفظ المرهون): বন্ধকি সম্পদটি পাওনাদারের কাছে একটি পবিত্র আমানত। সে নিজের সম্পদের মতো তা যত্নসহকারে হেফাজত করবে। অবহেলাজনিত কারণে নষ্ট হলে পাওনাদারকে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
- বন্ধকি বস্তুর ব্যবহারিক বিধান (استعمال المرهون): পাওনাদারের জন্য বন্ধকি জমি ভোগ করা, ঘরে বসবাস করা বা ফলফলাদি খাওয়া সম্পূর্ণ হারাম ও সুদ; কারণ ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত যেকোনো সুবিধাই রিবা (كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ مَنْفَعَةً فَهُوَ رِبًا)। তবে বাহন বা দুধেল পশু হলে তার ঘাস-পানির খরচের সমপরিমাণ দুধ গ্রহণ বা আরোহণ করা জায়েজ।
٨- ما المضاربة؟ بين حكمها بالاختصار-
[المضاربة কী? এর বিধান সংক্ষেপে বর্ণনা কর।]
১. মুদারাবার সংজ্ঞা:
মুদারাবা হলো ইসলামি অর্থনীতির এমন একটি বিশেষ যৌথ ব্যবসায়িক চুক্তি—যেখানে এক পক্ষ অর্থ বা মূলধন বিনিয়োগ করে (রব্বুল মাল) এবং অপর পক্ষ তার মেধা ও শারীরিক শ্রম দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে (মুদারিব)।
২. মুদারাবার শরয়ি বিধান:
- মুদারাবা ব্যবসা সর্বসম্মতভাবে বৈধ ও সুন্নাত। রাসুলুল্লাহ ﷺ নবুয়তপূর্ব জীবনে উম্মুল মুমিনীন খাদিজা (রা.)-এর পুঁজি নিয়ে মুদারাবা ভিত্তিতেই সিরিয়ায় বাণিজ্য করেছিলেন।
- মুনাফার বণ্টন: চুক্তির শুরুতেই মুনাফা আনুপাতিক হারে (যেমন ৫০:৫০ বা ৬০:৪০) নির্ধারণ করতে হবে; কোনো নির্দিষ্ট অংকের টাকা (যেমন মাসে ১০ হাজার টাকা) ধার্য করা হারাম ও সুদ।
- ক্ষতিপূরণের নিয়ম: ব্যবসায় কোনো লোকসান হলে সম্পূর্ণ আর্থিক ক্ষতি বহন করবে মূলধনদাতা (রব্বুল মাল); আর শ্রমিকের শ্রমটাই বৃথা যাবে, তার ওপর কোনো আর্থিক ক্ষতি বর্তাবে না (যদি না সে খেয়ানত করে)।
القسم الثاني : أصول الفقه (দ্বিতীয় অংশ – উসূলে ফিকহ ও আইনদর্শন) [পূর্ণমান: ৪০]
مجموعة (الف) : الأسئلة التحريرية (গ্রুপ ‘ক’ – বিশদ রচনামূলক প্রশ্নাবলি) [মান: ২ × ১৫ = ৩০]
٩- ما هى اصول الشرع؟ اذكر اقسامها مفصلا-
[اصول الشرع কী? এর প্রকারভেদ বিস্তারিত লেখ।]
১. উসূলে শরিয়তের সংজ্ঞা (مفهوم أصول الشرع):
ইসলামী আইনশাস্ত্রে ‘উসূলে শর’ (أصول الشرع) হলো সেই মৌলিক ও প্রামাণ্য শাস্ত্রীয় উৎসসমূহ—যেখান থেকে মুজতাহিদ ফকিহগণ জীবনের প্রতিটি সমস্যার শরয়ি হুকুম-আহকাম উদ্ভাবন ও নিষ্কাশন করে থাকেন।
২. উসূলে শরিয়তের চার প্রধান প্রকার (الأدلة الأربعة المتفق عليها):
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সমস্ত ইমাম ও উসূলবিদদের ঐকমত্যে শরিয়তের মৌলিক দলিল চারটি:
- ১ম মূলনীতি: কিতাবুল্লাহ (كتاب الله – আল-কুরআন): এটি শরিয়তের সর্বপ্রধান, অপরিবর্তনীয় ও অকাট্য ঐশী সংবিধান। যা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর মুতাওয়াতির সনদে অবতীর্ণ হয়েছে। কুরআনের প্রতিটি নির্দেশ সমস্ত দলিলের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে।
- ২য় মূলনীতি: সুন্নাতে রাসুল (سنة رسول الله ﷺ – হাদিস): রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কথা, কাজ ও মৌন সম্মতি। সুন্নাহ হলো পবিত্র কুরআনের বাস্তব রূপ, এর ব্যাখ্যা ও স্বাধীন আইনদাতা। কুরআনে যা সংক্ষিপ্ত, সুন্নাহ তাকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে।
- ৩য় মূলনীতি: আল-ইজমা (الإجماع – সর্বসম্মত ঐকমত্য): রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর যেকোনো যুগে মুসলিম উম্মাহর সমস্ত মুজতাহিদ আলেমদের কোনো একটি শরয়ি মাসআলায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে একমত হওয়া। ইজমা শরিয়তের এক অনড় সুরক্ষা প্রাচীর।
- ৪র্থ মূলনীতি: আল-কিয়াস (القياس – যৌক্তিক সাদৃশ্যবিধান): যে নতুন সমস্যার কোনো স্পষ্ট নস (কুরআন-হাদিস) নেই, তাকে কার্যকারণ বা ইল্লতের (العِلّة) মিলের কারণে পূর্ববর্তী মূল নসযুক্ত সমস্যার হুকুমের সাথে যুক্ত করে নতুন বিধান উদ্ভাবন করা।
١٠- ما معنى السنّة؟ ثم أثبت ان السنّة المصدر الثانى للتشريع الاسلامى-
[السنّة শব্দের অর্থ কী? সুন্নাহ ইসলামি জীবন দর্শনের দ্বিতীয় প্রধান উৎস প্রমাণ কর।]
১. সুন্নাহর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:
আভিধানিক অর্থ: ‘সুন্নাত’ (السُّنَّةُ) শব্দের অর্থ পথ, কর্মপদ্ধতি, স্বভাব বা অনুসৃত রীতি (الطَّرِيقَةُ وَالسِّيرَةُ)।
উসূলে ফিকহের পরিভাষা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কুরআন ব্যতীত শরয়ি দলিল হিসেবে যা কিছু উচ্চারিত হয়েছে (ক্বওল), সম্পাদিত হয়েছে (ফে’ল) কিংবা অনুমোদিত হয়েছে (তাক্বরীর)—তাকেই সুন্নাত বলা হয়।
২. সুন্নাহ যে শরিয়তের দ্বিতীয় প্রধান উৎস তার অকাট্য প্রমাণসমূহ:
- কুরআনের দ্ব্যর্থহীন নির্দেশাবলি:
- «وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا» [সূরা আল-হাশর: ৭]
“আর রাসুল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।” - «مَّن يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ» [সূরা আন-নিসা: ৮০]
“যে রাসুলের আনুগত্য করল, সে মূলত আল্লাহরই আনুগত্য করল।” - আল্লাহ তাআলা নিজের সত্তার শপথ করে বলেছেন, রাসুলের ফয়সালাকে অকপটে মেনে না নেওয়া পর্যন্ত কেউ মুমিন হতে পারবে না (সূরা নিসা: ৬৫)।
- «وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا» [সূরা আল-হাশর: ৭]
- সুন্নাহ ছাড়া কুরআন পালন অসম্ভব: পবিত্র কুরআনে সালাত কায়েমের নির্দেশ আছে, কিন্তু সালাতের রাকাআত সংখ্যা, রুকু-সিজদার তাসবিহ এবং ওয়াক্তের বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে নেই; তা সম্পূর্ণভাবে সুন্নাহর মাধ্যমেই উম্মাহ জেনেছে। সুন্নাহ হলো কুরআনের প্রধান রূপকার।
- রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুস্পষ্ট হাদিস: রাসুলুল্লাহ ﷺ বিদায় হজের ভাষণে ঘোষণা করেন—
«تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ»
“আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি; যতদিন তোমরা এ দুটিকে শক্তভাবে আঁকড়ে থাকবে ততদিন কখনো পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাত।” [মুয়াত্তা ইমাম মালিক]
١١- اذكر اقسام السنّة على طبق اصول الفقه مع بيان التعريف-
[উসূলে ফিকহের স্তর অনুযায়ী سنّة এর প্রকারভেদ সংজ্ঞাসহ লেখ।]
উসূলে ফিকহে বর্ণনার বিস্তার ও সনদের নির্ভরযোগ্যতার স্তরের ভিত্তিতে সুন্নাহ প্রধানত তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত:
- السنة المتواترة (মুতাওয়াতির সুন্নাত):
- সংজ্ঞা: যে হাদিস রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি যুগে এত বিপুলসংখ্যক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন যে, তাদের সবার পক্ষে মিথ্যা বা ভুলের ওপর একমত হওয়া স্বাভাবিক ও যুক্তির নিরিখে সম্পূর্ণ অসম্ভব।
- হুকুম: এটি নিশ্চিত ও অকাট্য ইলম (العلم اليقيني القطعي) প্রদান করে। এর অস্বীকারকারী কাফের হয়ে যায়। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও আজানের বিবরণ।
- السنة المشهورة (মশহুর সুন্নাত):
- সংজ্ঞা: যে হাদিস প্রথম যুগে (সাহাবীদের স্তরে) মাত্র এক বা কয়েকজন সাহাবী বর্ণনা করেছেন, কিন্তু পরবর্তীতে তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনের যুগে এসে তা মুতাওয়াতির পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক লোক কর্তৃক বর্ণিত ও সমাদৃত হয়েছে।
- হুকুম: এটি অন্তরের সুদৃঢ় প্রশান্তি (العلم الطمأنينة) প্রদান করে। হানাফী মাযহাব মতে মশহুর হাদিস দ্বারা কুরআনের সাধারণ আম বিধানকে খাস (নির্দিষ্ট) করা যায়। এর অস্বীকারকারী গোমরাহ ও বিদআতী হয়। যেমন মোজার ওপর মাসেহ করার হাদিস।
- السنة الآحادية أو خبر الواحد (আহাদ বা একক হাদিস):
- সংজ্ঞা: যে হাদিস কোনো যুগে এমন অল্পসংখ্যক বর্ণনাকারী দ্বারা বর্ণিত হয়েছে, যা মুতাওয়াতির বা মশহুরের স্তরে পৌঁছেনি।
- হুকুম: এটি প্রবল ধারণামূলক জ্ঞান (العلم الظني) প্রদান করে। আমলের ক্ষেত্রে এর ওপর আমল করা ওয়াজিব হলেও আকিদার ক্ষেত্রে এর দ্বারা ফরজ-হারাম অকাট্যভাবে সাব্যস্ত হয় না।
١٢- عرّف الاجماع- ثم بيّن حجيته فى الشريعة الإسلامية-
[الاجماع এর পরিচয় দাও। এটা ইসলামি শরিয়তের প্রামাণ্যতা বর্ণনা কর।]
১. ইজমার সংজ্ঞা (تعريف الإجماع):
আভিধানিক অর্থ: দৃঢ় সংকল্প করা (العزم) অথবা কোনো বিষয়ে সর্বসম্মতভাবে একমত হওয়া (الاتفاق)।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলবিদগণের সর্বসম্মত সংজ্ঞায়—
«اتِّفَاقُ جَمِيعِ الْمُجْتَهِدِينَ مِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ ﷺ فِي عَصْرٍ مِنَ الْعُصُورِ بَعْدَ وَفَاتِهِ عَلَى حُكْمٍ شَرْعِيٍّ»
অর্থাৎ: “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাতের পর যেকোনো যুগে মুসলিম উম্মাহর সমস্ত মুজতাহিদ ফকিহদের কোনো একটি শরয়ি হুকুমের ব্যাপারে সর্বসম্মতভাবে ঐকমত্য পোষণ করাকেই ইজমা বলা হয়।”
২. ইসলামি শরিয়তে ইজমার অকাট্য প্রামাণ্যতা (حجية الإجماع):
- পবিত্র কুরআনের দলিল: আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—
«وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَىٰ وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا» [সূরা আন-নিসা: ১১৫]
“আর যে ব্যক্তি সত্য পথ প্রকাশিত হওয়ার পরও রাসুলের বিরোধিতা করবে এবং সমস্ত মুমিনদের অনুসৃত পথ ছাড়া অন্য কোনো পথের অনুসরণ করবে, আমি তাকে সেদিকেই ফিরিয়ে দেব যে পথ সে বেছে নিয়েছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।” ইমাম শাফেয়ী (রহ.) এই আয়াত দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে মুমিনদের সামগ্রিক ঐকমত্যের বিরুদ্ধাচরণ করা হারাম ও জাহান্নামের কারণ। - হাদিসে নববীর দলিল: রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
«إِنَّ أُمَّتِي لَا تَجْتَمِعُ عَلَى ضَلَالَةٍ»
“নিশ্চয়ই আমার সমগ্র উম্মাহ কখনো কোনো ভ্রান্তির ওপর একমত হতে পারে না।” [তিরমিযী, ইবনে মাজাহ]
সুতরাং উম্মাহর সমস্ত মুজতাহিদ যখন একটি বিষয়ে একমত হন, তখন তা ঐশীভাবে সত্যের নিশ্চয়তা লাভ করে। - বাস্তব ভূমিকা: সাহাবায়ে কিরামের যুগে কুরআন গ্রন্থবদ্ধকরণ, আবু বকর (রা.)-এর খেলাফত মনোনয়ন এবং দাদীর উত্তরাধিকারের মতো মৌলিক বিষয়সমূহ ইজমার মাধ্যমেই চিরস্থায়ী সমাধান লাভ করেছে।
مجموعة (ب) : الأسئلة الموجزة (গ্রুপ ‘খ’ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি) [মান: ২ × ৫ = ১০]
١٣- ما الاجتهاد- هل هو يبقى الى يوم القيامة ام لا؟ بيّن-
[الاجتهاد এর সংজ্ঞা দাও। কিয়ামত পর্যন্ত এটা কি বহাল থাকবে? বর্ণনা কর।]
১. ইজতিহাদের সংজ্ঞা:
কোনো যোগ্য মুজতাহিদ কর্তৃক কুরআন ও সুন্নাহর বিস্তারিত দলিলসমূহ গভীরভাবে গবেষণা করে শরয়ি বিধানাবলি আবিষ্কারে নিজের মেধা ও সামর্থ্যের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নিয়োগ করাকে ‘ইজতিহাদ’ বলে।
২. কিয়ামত পর্যন্ত ইজতিহাদের দরজা কি উন্মুক্ত থাকবে?
হ্যাঁ, শর্তসাপেক্ষে কিয়ামত পর্যন্ত ইজতিহাদের দরজা উন্মুক্ত থাকবে। কারণ মানুষের জীবন ও সভ্যতা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল; কিয়ামত পর্যন্ত হাজারো নতুন নতুন সংকট (যেমন অঙ্গ প্রতিস্থাপন, টেস্টটিউব বেবি, আধুনিক শেয়ার মার্কেট ও ক্রিপ্টোকারেন্সি) সৃষ্টি হতেই থাকবে। যদি ইজতিহাদ বন্ধ হয়ে যায় তবে শরিয়তের সার্বজনীনতা অচল হয়ে পড়বে। তবে এই ইজতিহাদ স্বাধীনভাবে নতুন ধর্ম বানানোর জন্য নয়, বরং উসূল ও মূলনীতির অধীনে নতুন সংকটের সমাধান দেওয়ার জন্য। যারা প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করবে তাদের জন্য এটি ফরজে কিফায়াহ।
١٤- ما حكم الاجماع الصحابى؟ بيّن ممثلاً-
[الاجماع الصحابى এর হুকুম কী? উদাহরণসহ লেখ।]
১. সাহাবায়ে কিরামের ইজমার হুকুম (حكم إجماع الصحابة):
উসূলে ফিকহের সর্বসম্মত মূলনীতি অনুযায়ী সাহাবায়ে কিরামের ইজমা হলো সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন এবং অকাট্য ক্বাতয়ী দলিল (حجة قاطعة كالكتاب والسنة)। পরবর্তী যুগের সাধারণ আলেমদের ইজমার চেয়ে সাহাবীদের ইজমার শক্তি বহুগুণ বেশি। সাহাবীদের ইজমার বিরুদ্ধাচরণ করা হারাম ও চরম গোমরাহী।
২. উদাহরণ:
- পবিত্র কুরআনকে গ্রন্থাকারে একটি মুসহাফে একত্রিত ও সংকলন করার ওপর সমস্ত সাহাবায়ে কিরামের ইজমা।
- হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে প্রথম খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করার ওপর সাহাবীদের ইজমা।
- জুমার প্রথম আজান চালু এবং ২০ রাকাত তারাবি কায়েমের ওপর সাহাবীদের ঐতিহাসিক ইজমা।
١٥- ما الاستحسان؟ بيّن بالتمثيل-
[الاستحسان কাকে বলে? উদাহরণসহ উল্লেখ কর।]
১. ইস্তিহসান-এর সংজ্ঞা:
ফিকহে হানাফীর পরিভাষায়: কোনো প্রকাশ্য সাধারণ সাদৃশ্যমূলক কিয়াস (কিয়াসে জলী)-এর কঠোরতা পরিহার করে কোনো শক্তিশালী গোপন দলীল, কুরআনের বিশেষ নস, সামাজিক প্রয়োজনীয়তা বা উরফের কারণে অপেক্ষাকৃত সহজ ও জনকল্যাণমুখী সূক্ষ্ম কিয়াস (কিয়াসে খফী) গ্রহণ করাকে “ইস্তিহসান” বলে।
২. বাস্তব উদাহরণ (التمثيل):
- ভুলবশত আহারকারীর রোজা: প্রকাশ্য সাধারণ কিয়াস বলে—যেহেতু পেটে খাদ্য প্রবেশ করেছে তাই রোজা নষ্ট হয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বিশেষ হাদিসের কারণে হানাফী ফকিহগণ সাধারণ কিয়াস ছেড়ে ইস্তিহসানের ভিত্তিতে ফতোয়া দিয়েছেন যে তার রোজা ভাঙবে না; কারণ আল্লাহই তাকে খাইয়েছেন।
- ইস্তিসনা’ বা অর্ডার দিয়ে পণ্য তৈরি: সাধারণ কিয়াসে অবিক্রীত বা অস্তিত্বহীন পণ্য কেনাবেচা নিষিদ্ধ। কিন্তু মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয়তা ও সামাজিক অভ্যাসের কারণে ইস্তিহসানের ভিত্তিতে দর্জি বা কারিগরকে অগ্রিম অর্ডার দিয়ে পণ্য তৈরি বৈধ করা হয়েছে।
١٦- ما معنى القياس لغةً وشرعًا؟ اذكر اركانه مع بيان الاقسام-
[القياس এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? এর রুকন ও প্রকারসমূহ বর্ণনা কর।]
১. কিয়াসের সংজ্ঞা (تعريف القياس):
আভিধানিক অর্থ: পরিমাপ করা বা দুই বস্তুকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করা (التَّقْدِيرُ وَالتَّسْوِيَةُ)।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: মূল সমস্যার সাধারণ কার্যকারণ (ইল্লত)-এর মিল থাকার কারণে নসবিহীন কোনো নতুন শাখাগত সমস্যার ওপর পূর্ববর্তী মূল সমস্যার হুকুম সমভাবে আরোপ করাকে ‘কিয়াস’ বলে।
২. কিয়াসের চারটি মৌলিক রুকন (أركان القياس):
- আসল (الأصل): মূল বিষয়—যার হুকুম কুরআন বা হাদিসে স্পষ্টভাবে বিদ্যমান (যেমন: মদ / খমর)।
- ফর’ (الفرع): নতুন শাখা—যার স্পষ্ট বিধান নসে নেই (যেমন: আধুনিক মাদক বা হেরোইন)।
- হুকুমুল আসল (حكم الأصل): মূল বিষয়ের যে শরয়ি হুকুম বিদ্যমান (যেমন: মদের হারাম হওয়া)।
- ইল্লত (العلة): মূল ও শাখার মধ্যকার সাধারণ কার্যকর কারণ (যেমন: মস্তিষ্ক বিকৃতকারী নেশা সৃষ্টি হওয়া)।
৩. কিয়াসের প্রধান প্রকারভেদ:
- কিয়াসে জলী (القياس الجلي): যার কার্যকারণ অত্যন্ত স্পষ্ট ও স্বতঃসিদ্ধ।
- কিয়াসে খফী (القياس الخفي): যার কার্যকারণ অতি সূক্ষ্ম এবং গভীর গবেষণাসাপেক্ষ (ইস্তিহসান)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের الفقه وأصوله বিষয়ের কোড ও মান বণ্টন কেমন?
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কারিকুলামে الفقه وأصوله বিষয়ের কোড হলো ২০১৮০৮ (পরীক্ষা কোড ২০৮, প্রশ্নপত্র কোড ১১৮)। মোট ৮০ নম্বরের পরীক্ষাটি দুটি ভাগে বিভক্ত: প্রথম অংশ ‘আল-ফিকহ’ (৪০ নম্বর) এবং দ্বিতীয় অংশ ‘উসূলে ফিকহ’ (৪০ নম্বর)।
২. হানাফী ফিকহে ‘বায়েলে বাতিল’ ও ‘বায়েলে ফাসেদ’-এর প্রধান পার্থক্য কী?
বায়েলে বাতিল হলো এমন চুক্তি যার মূল ভিত্তিই অবৈধ (যেমন মদের বেচাকেনা), এটি কখনোই কার্যকর হয় না। আর বায়েলে ফাসেদ হলো যার মূল চুক্তি সঠিক কিন্তু কোনো অবৈধ শর্ত যুক্ত হয়েছে; শর্তটি দূর করলে তা বৈধ কেনাবেচায় পরিণত হয়।
৩. বন্ধকি (রাহান) সম্পদ ব্যবহারের শরয়ি বিধান কী?
পাওনাদারের জন্য বন্ধকি সম্পদ (যেমন জমি বা বাড়ি) ভোগ করা বা সেখান থেকে লাভ গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম ও সুদের অন্তর্ভুক্ত; কারণ ঋণের মাধ্যমে অর্জিত যেকোনো অতিরিক্ত সুবিধাই রিবা।
৪. সুন্নাহর মুতাওয়াতির ও আহাদ বিভাগের মধ্যে পার্থক্য কী?
মুতাওয়াতির হাদিস প্রতিটি যুগে এত বিপুলসংখ্যক লোক বর্ণনা করেছেন যে তা শতভাগ অকাট্য নিশ্চিত জ্ঞান দেয় এবং অস্বীকারকারী কাফের হয়। আর আহাদ হাদিস অল্প বর্ণনাকারীর দ্বারা বর্ণিত হওয়ায় তা আমলের জন্য প্রযোজ্য হলেও আকিদায় অকাট্যতার দাবি রাখে না।
৫. উসূলে ফিকহে ‘ইস্তিহসান’ বলতে কী বোঝায়?
কোনো জটিল পরিস্থিতিতে সাধারণ কিয়াসের অনমনীয়তা পরিহার করে কোনো বিশেষ দলিল, জনকল্যাণ বা সামাজিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে অপেক্ষাকৃত সহজ ও জনবান্ধব সমাধান গ্রহণ করাকে ইস্তিহসান বলে।
৬. শরিয়তে কিয়াসের চারটি অপরিহার্য রুকন কী কী?
কিয়াসের চারটি রুকন হলো: ১. আসল (মূল ভিত্তি), ২. ফর’ (নতুন শাখা), ৩. হুকুমুল আসল (মূলের প্রতিষ্ঠিত হুকুম), এবং ৪. ইল্লত (উভয়ের মধ্যকার সাধারণ কার্যকারণ)।