ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা—২০২৩
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: إعجاز القرآن والعلوم الحديثة في القرآن (ই’জাযুল কুরআন ওয়াল উলূমুল হাদীসাহ ফিল কুরআন)
বিষয় কোড: ২০১৮০৭ | পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১১৭
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অন্যতম মৌলিক যৌথ শাস্ত্রীয় কোর্স হলো “إعجاز القرآن والعلوم الحديثة في القرآن” (কুরআনের অলৌকিকত্ব ও কুরআনে আধুনিক বিজ্ঞান – বিষয় কোড: ২০১৮০৭)। এ কোর্সটি মূলত দুটি স্বতন্ত্র ও পরিপূরক অর্ধাংশে বিভক্ত: প্রথম অংশে কুরআনের চিরন্তন অলৌকিকত্ব (ই’জায), সাহিত্যিক ও ভাষাতাত্ত্বিক উৎকর্ষ, আরবের কবিদের অক্ষমতা, উলামায়ে কেরামের ই’জায সম্পর্কিত অভিমত, তাহাদ্দীর পরিমাণ, প্রাচ্যবিদদের অপপ্রচারের খণ্ডন এবং সারফাহ মতবাদের অসারতা আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় অংশে আধুনিক বিজ্ঞানের আলোড়ন সৃষ্টিকারী আবিষ্কারসমূহ—যেমন বিগ ব্যাং তত্ত্ব, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, লোহা অবতীর্ণ ও তার পারমাণবিক রহস্য, সূর্য-চন্দ্র-পৃথিবীর কক্ষপথ ও ঘূর্ণন, মৌমাছির জীবনচক্র, ভূ-কম্পন ও সমুদ্রবিজ্ঞানের সাথে কুরআনিক আয়াতের বিস্ময়কর সামঞ্জস্য ও প্রামাণিক ভিত্তি বিশ্লেষিত হয়েছে। নিচে পরীক্ষার্থী ও গবেষকগণের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও অ্যাকাডেমিক সাফল্যের জন্য প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য সমাধান উপস্থাপন করা হলো।
একনজরে প্রশ্নপত্রের রূপরেখা ও মানবণ্টন
| অংশ / বিভাগ | গ্রুপ / শ্রেণি | মোট প্রশ্ন | উত্তর দেওয়ার নিয়ম | প্রতি প্রশ্নের মান | মোট নম্বর |
|---|---|---|---|---|---|
| الجزء الأول : إعجاز القرآن (প্রথম অংশ: ই’জাযুল কুরআন) | مجموعة (أ) – বিশদ রচনামূলক | ৪টি | যেকোনো ২টি | ১৫ | ৩০ |
| مجموعة (ب) – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি | ৪টি | যেকোনো ২টি | ৫ | ১০ | |
| الجزء الثاني : العلوم الحديثة في القرآن (দ্বিতীয় অংশ: আধুনিক বিজ্ঞান ও কুরআন) | مجموعة (أ) – বিশদ রচনামূলক | ৪টি | যেকোনো ২টি | ১৫ | ৩০ |
| مجموعة (ب) – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি | ৪টি | যেকোনো ২টি | ৫ | ১০ | |
| সর্বমোট | ১৬টি | মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে | — | ৮০ | |
الجزء الأول : إعجاز القرآن (প্রথম অংশ : ই’জাযুল কুরআন) [মান: ৪০]
مجموعة (أ) : বিশদ রচনামূলক প্রশ্নাবলি [মান: ১৫ × ২ = ৩০]
١- “القرآن الكريم معجز لفظا ومعنى وأثرا” – أثبت بالأدلة النقلية والعقلية-
[“কুরআনুল কারিম শব্দগত, অর্থগত ও প্রভাবগত অক্ষমকারী”—কুরআন সুন্নাহ ও যুক্তি দ্বারা প্রমাণ কর।]
১. ভূমিকা ও ই’জাযের সামগ্রিক স্বরূপ:
পবিত্র কুরআনুল কারিম কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ কিংবা উপদেশমালা নয়; বরং এটি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ-এর শাশ্বত ও চিরন্তন জীবন্ত মুজিযা (المعجزة الخالدة)। ‘ই’জায’ (الإعجاز) শব্দের আভিধানিক অর্থ অন্যকে অপারগ বা অক্ষম করা। পারিভাষিক অর্থে, নবুওয়তের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ তাআলা নবীর মাধ্যমে এমন অলৌকিক নিদর্শন প্রকাশ করেন, যার অনুরূপ আনয়নে সমগ্র সৃষ্টিজগতের মেধা ও শক্তি চূড়ান্তভাবে অক্ষম প্রমাণিত হয়। কুরআনুল কারিম কোনো একক দিক দিয়ে নয়; বরং এর শব্দবিন্যাস (لفظاً), ভাব ও অর্থগভীরতা (معنىً) এবং মানবমনস্তত্ত্ব ও সমাজ বিপ্লবে এর আধ্যাত্মিক প্রভাব (أثراً)—এই ত্রিমুখী সমন্বয়ে এক অনুপম ও অপরাজেয় মুজিযা।
২. শব্দগত ই’জায (معجز لفظاً):
আরবি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ বাগ্মী, কবি ও অলঙ্কারবিদদের সামনে কুরআন যখন অবতীর্ণ হয়, তখন তারা কুরআনের ধ্বনিমাধুর্য ও শব্দচয়ন দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল:
- ফাসাহাত ও বালাগাতের পরাকাষ্ঠা: কুরআনের প্রতিটি শব্দ তার স্থানিক মর্যাদায় এমনভাবে বিন্যস্ত যে, একটি শব্দ সরিয়ে তদস্থলে সমগ্র আরবি অভিধানের শ্রেষ্ঠ সমার্থক শব্দ বসালেও সেই অর্থগাম্ভীর্য ও সৌন্দর্য রক্ষা করা অসম্ভব। ইমাম আব্দুল ক্বাহির জুরজানি (রহ.) তাঁর ‘দালাইলুল ই’জায’ গ্রন্থে প্রমাণ করেছেন যে, শব্দের নিজস্ব কোনো অলৌকিকত্ব নেই, বরং শব্দের পারস্পরিক সমন্বয় ও গঠনরীতিই (النظم) হলো মূল মুজিযা।
- অনুপম ধ্বনিমাধুর্য ও সংগীতময় প্রবাহ: কুরআন গদ্যও নয়, পদ্যও নয়; অথচ এর তিলাওয়াতে এক অভূতপূর্ব ঐশী সুরতরঙ্গ সৃষ্টি হয়। ছন্দহীন হয়েও এর অন্ত্যমিল (الفاصلة القرآنيّة) মানুষের শ্রবণযন্ত্র ও আত্মায় অপার্থিব প্রশান্তি তৈরি করে।
- আরব পণ্ডিতদের অসহায় স্বীকারোক্তি: তৎকালীন আরবের শীর্ষ বাগ্মী ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা কাফের অবস্থায় কুরআন শুনে স্তব্ধ হয়ে বলতে বাধ্য হয়েছিল:
«وَاللَّهِ إِنَّ لِقَوْلِهِ لَحَلَاوَةً، وَإِنَّ عَلَيْهِ لَطَلَاوَةً، وَإِنَّ أَسْفَلَهُ لَمُغْدِقٌ، وَإِنَّ أَعْلَاهُ لَمُثْمِرٌ، وَمَا يَقُولُ هَٰذَا بَشَرٌ، وَإِنَّهُ لَيَعْلُو وَلَا يُعْلَى عَلَيْهِ»
“আল্লাহর কসম! তাঁর বাণীতে রয়েছে অনুপম মিষ্টতা, এর ওপরে রয়েছে এক অপূর্ব শোভা, এর নিম্নদেশ শাখা-প্রশাখায় সুশোভিত, এর ঊর্ধ্বাংশ ফলবতী; কোনো মানুষ এরূপ কথা বলতে পারে না এবং এটি সদা বিজয়ী থাকে, একে পরাভূত করা যায় না।”
৩. অর্থগত ই’জায (معجز معنىً):
কুরআনের অর্থ ও বিষয়বস্তুর গভীরতা সৃষ্টির সকল গ্রন্থের ঊর্ধ্বে:
- নিখুঁত ও শাশ্বত আকিদা দর্শন: তাওহিদ, রিসালাত ও আখেরাতের এমন প্রজ্ঞাময় উপস্থাপন কুরআন উপহার দিয়েছে, যা মানবীয় দর্শনের বিভ্রান্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তির সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- ত্রুটিহীন আইন ও সমাজব্যবস্থা (শরীয়ত): ব্যক্তিগত চরিত্র গঠন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কূটনীতি পর্যন্ত কুরআনের প্রতিটি বিধান মানবিক ন্যায়বিচার ও কল্যাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। চৌদ্দশত বছরেও এর কোনো বিধান অকার্যকর প্রমাণিত হয়নি।
- অতীত ও ভবিষ্যতের গায়েবি সংবাদ: নিরক্ষর নবীর মুখ দিয়ে এমন সব অতীতের জাতিদের (যেমন আদ, সামুদ, লূত ও ফেরাউনের যুগের গোপন সত্য) নিখুঁত বিবরণ এসেছে যা তৎকালীন আহলে কিতাবদের বিকৃত ধর্মগ্রন্থেও ছিল না। একইভাবে রোম সাম্রাজ্যের বিজয় (সূরা আর-রূম: ১-৪) এবং মক্কা বিজয়ের মতো ভবিষ্যৎবাণী হুবহু সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
- কোনো অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য না থাকা: সাধারণ মানুষের দীর্ঘ কোনো গ্রন্থে বহু পরস্পরবিরোধী কথা থাকে; কিন্তু কুরআন ঘোষণা করেছে:
«أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا» [সূরা আন-নিসা: ৮২]
“তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? যদি এটি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো পক্ষ থেকে হতো, তবে এতে তারা বহু বৈপরীত্য ও অসঙ্গতি দেখতে পেত।”
৪. প্রভাবগত ই’জায (معجز أثراً):
কুরআনের আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক প্রভাব মানবজাতির ইতিহাসে অতুলনীয়:
- আত্মা ও অন্তরের ওপর সম্মোহনী প্রভাব: চরম শত্রুভাবাপন্ন ব্যক্তির অন্তরেও কুরআন মুহূর্তে আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম। কুরাইশ নেতা জুবাইর ইবনে মুতঈম (রা.) তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি; তিনি যখন রসূলুল্লাহ ﷺ-কে মাগরিবের সালাতে সূরা আত-তূর তিলাওয়াত করতে শুনলেন, তখন তিনি বলেছিলেন:
«كَادَ قَلْبِي أَنْ يَطِيرَ، وَذَلِكَ أَوَّلُ مَا وَقَرَ الْإِيمَانُ فِي قَلْبِي» [সহীহ বুখারী: ৪৮৫৪]
“আমার হৃদয় যেন উড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল; আর তখনই আমার অন্তরে সর্বপ্রথম ঈমানের আলো দৃঢ়ভাবে স্থান করে নিল।” হযরত উমর (রা.)-এর মতো সিংহপুরুষ কেবল সূরা ত্বাহার কয়েকটি আয়াত শুনেই অস্ত্র ত্যাগ করে রসূলুল্লাহ ﷺ-এর পদপ্রান্তে লুটিয়ে পড়েছিলেন। - মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লব: জাহেলিয়াতের নিকষ অন্ধকারে নিমজ্জিত বর্বর আরবের পশুতুল্য মানুষকে কুরআন মাত্র দুই দশকে বিশ্বের সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ, চরিত্রবান ও আদর্শ জাতিতে রূপান্তরিত করেছিল। সমাজবিজ্ঞানীরা স্বীকার করেছেন, কোনো দার্শনিক তত্ত্ব বা আইন এত দ্রুত এমন সার্বিক নৈতিক বিপ্লব ঘটাতে পারেনি।
৫. কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিল (الأدلة النقلية):
- মানব ও জিনের সম্মিলিত অক্ষমতার ঘোষণা:
«قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَىٰ أَن يَأْتُوا بِمِثْلِ هَٰذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا» [সূরা আল-ইসরা: ৮৮]
“বলুন: সমগ্র মানবজাতি ও জিন জাতি যদি একত্রিত হয়ে এই কুরআনের অনুরূপ রচনা করার চেষ্টা করে, তবুও তারা এর সমকক্ষ কিছু আনতে পারবে না; যদিও তারা পরস্পরের পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারী হয়।” - দশটি স্বরচিত সূরার চ্যালেঞ্জ:
«أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ ۖ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِّثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُم مِّن دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ» [সূরা হূদ: ১৩]
“তারা কি বলে যে সে এটি নিজে রচনা করেছে? বলুন: তবে তোমরা এর অনুরূপ স্বরচিত দশটি সূরা নিয়ে এসো এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো ডেকে নাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” - একটিমাত্র সূরার চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জ:
«وَإِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ – فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا وَلَن تَفْعَلُوا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ» [সূরা আল-বাক্বারা: ২৩-২৪] - হাদিসে নববীর সাক্ষ্য: রসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
«مَا مِنَ الأَنْبِيَاءِ نَبِيٌّ إِلاَّ أُعْطِيَ مِنَ الآيَاتِ مَا مِثْلُهُ آمَنَ عَلَيْهِ الْبَشَرُ، وَإِنَّمَا كَانَ الَّذِي أُوتِيتُ وَحْيًا أَوْحَاهُ اللَّهُ إِلَيَّ، فَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ أَكْثَرَهُمْ تَابِعًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ» [সহীহ বুখারী: ৪৯৮১]
“সকল নবীকেই এমন কিছু নিদর্শন দেওয়া হয়েছিল যার ওপর মানুষ ঈমান এনেছে; আর আমাকে যা দেওয়া হয়েছে তা হলো ঐশী ওহী যা আল্লাহ আমার প্রতি নাজিল করেছেন। অতএব আমি আশা করি কিয়ামতের দিন আমার অনুসারীর সংখ্যা সর্বাধিক হবে।”
৬. বুদ্ধিবৃত্তিক ও যৌক্তিক প্রমাণ (الأدلة العقلية):
- নিরক্ষর (উম্মী) নবীর আগমন: বিশ্বনবী ﷺ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি, কোনো শিক্ষকের সান্নিধ্য পাননি। এমন একজন নিরক্ষর মানুষের মুখ থেকে ভাষা, দর্শন, আইন, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের নিখুঁত বিশ্বকোষ আত্মপ্রকাশ করা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে এটি মানুষের বাণী নয়, বরং সরাসরি রব্বুল আলামিনের ওহী।
- সাহিত্যের বিকল্পে তরবারি গ্রহণ: কুরাইশরা নিজেদের আকিদা ও আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য মরিয়া ছিল। কুরআন তাদের বাপ-দাদার ধর্মকে মিথ্যা ঘোষণা করছিল। মাত্র তিন লাইনের একটি সূরার সমকক্ষ সাহিত্য রচনা করে তারা বিশ্বমঞ্চে ইসলামকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারত। কিন্তু তারা সাহিত্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে ধনসম্পদ বিলীন করে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছিল। কোনো সুস্থ বিবেকবান মানুষ সহজে সহজ পথ ছেড়ে আত্মঘাতী কঠিন পথে যায় না—এটাই প্রমাণ করে তারা সাহিত্যিক জবাবে সম্পূর্ণ অক্ষম ছিল।
- চৌদ্দশত বছর ধরে অবিকৃত ও অপরাজেয় স্থায়িত্ব: হাজার বছর ধরে লক্ষ লক্ষ অমুসলিম সাহিত্যিক ও ভাষাবিদ কুরআনের ভুল খোঁজার চেষ্টা করেছে, কিন্তু একটি আয়াতের সমকক্ষও তৈরি করতে পারেনি।
৭. উপসংহার:
সুতরাং অকাট্য দলিল ও যুক্তির আলোকে এটি শতভাগ প্রমাণিত যে, আল-কুরআনুল কারিম শব্দবিন্যাসে, অর্থগাম্ভীর্যে এবং আত্মিক ও বৈপ্লবিক প্রভাবে এক চিরন্তন, অপরাজেয় ও অতুলনীয় মুজিযা।
٢- اذكر أقوال العلماء فى بيان وجوه إعجاز القرآن الكريم مفصلا-
[إعجاز القرآن এর দিকসমূহ বর্ণনায় আলেমগণের মতামত বিস্তারিত উল্লেখ কর।]
১. ভূমিকা:
পবিত্র কুরআনুল কারিম এমন এক ঐশী মহাসমুদ্র যার গভীরতা পরিমাপ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। যুগ যুগ ধরে মুসলিম উলামায়ে কেরাম ও বালাগাত বিশারদগণ কুরআনের অলৌকিকত্বের রহস্য ও দিকসমূহ (وجوه الإعجاز) উন্মোচনে গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তাঁদের প্রত্যেকেই কুরআনের এক বা একাধিক অনন্য বৈভবকে এর মূল ই’জায হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা সামগ্রিকভাবে কুরআনের বহুবিধ অলৌকিকত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
২. প্রধান প্রধান ইমাম ও পণ্ডিতগণের দৃষ্টিভঙ্গি:
- ইমাম আবু সুলাইমান আল-খাত্তাবী (রহ.) [মৃত্যু ৩৮৮ হি.]:
তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘বায়ানু ই’জাযিল কুরআন’ (بيان إعجاز القرآن)-এ তিনি উল্লেখ করেন যে, কুরআনের মূল অলৌকিকত্ব নিহিত রয়েছে এর অনন্য বালাগাত ও বাক্যরীতির মধ্যে। তাঁর মতে, ভাষার তিনটি উপাদান রয়েছে—শব্দ (لفظ), অর্থ (معنى) এবং উভয়ের সুসংবদ্ধ সংযুক্তি (رباط ناظم)। সাধারণ মানবীয় সাহিত্যে এই তিনটির কোনো একটির ঘাটতি ঘটে; কিন্তু কুরআনে এই তিনটির এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ মিলন ঘটেছে যা সৃষ্টির পক্ষে অর্জন করা অসম্ভব। এছাড়া তিনি কুরআনের আত্মিক প্রভাবকে (التأثير في النفوس) অন্যতম প্রধান দিক হিসেবে তুলে ধরেন। - ইমাম আবু বকর আল-বাকিল্লানী (রহ.) [মৃত্যু ৪০৩ হি.]:
তাঁর জগদ্বিখ্যাত কিতাব ‘ই’জাযুল কুরআন’ (إعجاز القرآن)-এ তিনি তিনটি মৌলিক দিক বিস্তারিতভাবে প্রমাণ করেছেন:- অতীতের গায়েবি সংবাদ: নিরক্ষর নবীর মুখ দিয়ে পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহ ও নবীদের সঠিক ইতিহাস প্রকাশ।
- ভবিষ্যতের অভ্রান্ত ঘোষণা: ভবিষ্যৎ ঘটনাবলির নিশ্চিত সংবাদ দেওয়া, যা পরবর্তীতে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
- অনুপম নাযম ও গঠনরীতি: কুরআন তৎকালীন আরবের প্রচলিত কাব্যরীতি (কবিতা, কাসীদা, রজয) কিংবা গদ্যরীতি (সাজ’, খুতবা)—কোনোটিরই অন্তর্ভুক্ত নয়; অথচ এটি সকল সাহিত্যরীতিকে অতিক্রম করে সম্পূর্ণ নতুন ও অপার্থিব এক শৈলী প্রবর্তন করেছে।
- ইমাম আলী ইবনে ঈসা আর-রুম্মানী (রহ.) [মৃত্যু ৩৮৬ হি.]:
তাঁর গ্রন্থ ‘আন-নুকাতু ফী ই’জাযিল কুরআন’ (النكت في إعجاز القرآن)-এ তিনি ই’জাযের সাতটি দিক উল্লেখ করেছেন:- ১. সমকক্ষ রচনায় মানুষের অক্ষমতা (ترك المعارضة مع توفر الدواعي)।
- ২. প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ও ভীতি প্রদর্শন (التحدي للكافة)।
- ৩. আস-সারফাহ মতবাদের অবতারণা (যদিও জমহুর উলামা এটি প্রত্যাখ্যান করেছেন)।
- ৪. অলংকারশাস্ত্রের চরম পরাকাষ্ঠা (البلاغة)।
- ৫. ভবিষ্যতের সত্য সংবাদ (الأخبار الصادقة عن الأمور المستقبلة)।
- ৬. প্রচলিত রীতির ব্যতিক্রম এক স্বতন্ত্র রূপ (نقض العادة)।
- ৭. কুরআনের সাথে অন্যান্য মুজিযার তুলনা ও শ্রেষ্ঠত্ব।
- ইমাম আব্দুল ক্বাহির আল-জুরজানী (রহ.) [মৃত্যু ৪৭১ হি.]:
বালাগাত শাস্ত্রের ইমাম জুরজানী তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘দালাইলুল ই’জায’ (دلائل الإعجاز)-এ ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণিক দর্শনের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জগদ্বিখ্যাত ‘নাযম তত্ত্ব’ (نظريّة النظم)। তিনি প্রমাণ করেন, কেবল একক শব্দের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; বরং ব্যাকরণিক নিয়ম (علم النحو) এবং বালাগাতের সূক্ষ্মতম চাহিদার সাথে শব্দের নিখুঁত স্থানায়ন ও পারস্পরিক অর্থগত সম্পর্কই কুরআনের অপরাজেয় ই’জাযের মূল রহস্য। - ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী (রহ.) [মৃত্যু ৬০৬ হি.]:
ইমাম রাযী তাঁর ‘তাফসীরে কাবীর’-এ উল্লেখ করেন, কুরআনের প্রধান ই’জায হলো এর ‘ইলমী ও মা’রেফতি ই’জায’। অর্থাৎ এমন এক ঐশী জ্ঞান, নিখুঁত শরীয়ত এবং নৈতিক বিধানের সমাহার—যা কোনো নিরক্ষর মানুষের চিন্তা থেকে আসা অসম্ভব। - ইমাম জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী (রহ.) [মৃত্যু ৯১১ হি.]:
ইমাম সুয়ূতী তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন’ (الإتقان في علوم القرآن)-এ উলামায়ে কেরামের সকল মতামতকে একত্র করে ই’জাযের মোট ৩৫টি দিক বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন।
৩. ই’জাযুল কুরআনের প্রধান দিকসমূহের সমন্বিত রূপরেখা:
| ই’জাযের ক্ষেত্র | মূল তাৎপর্য ও স্বরূপ | প্রখ্যাত প্রবক্তা |
|---|---|---|
| ১. ভাষাতাত্ত্বিক ও বালাগাতগত ই’জায | শব্দচয়ন, ধ্বনিমাধুর্য, অনুপম ছন্দ ও ‘নাযম’ তত্ত্বের চরম উৎকর্ষ। | ইমাম আব্দুল ক্বাহির জুরজানী, খাত্তাবী |
| ২. গায়েবি সংবাদ বিষয়ক ই’জায | অতীতের নির্ভুল ইতিহাস ও ভবিষ্যতের অভ্রান্ত ঘটনার আগাম বর্ণনা। | ইমাম আল-বাকিল্লানী, ইবনে আতিয়্যাহ |
| ৩. আইন ও বিধানগত ই’জায (تشريعي) | মানব কল্যাণে শাশ্বত, ইনসাফপূর্ণ ও সমাজ সংস্কারক আইনের ব্যবস্থা। | ইমাম কুরতুবী, শানকীতী |
| ৪. বৈজ্ঞানিক ই’জায (علمي) | আধুনিক বিজ্ঞান আবিষ্কৃত মহাজাগতিক ও শারীরিক সত্যের আগাম স্পষ্ট ইঙ্গিত। | ইমাম রাযী, মুস্তফা সাদিক আর-রাফেয়ী |
| ৫. আত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব (أثري) | শ্রবণকারীর অন্তরে ভয়, ভক্তি ও অশ্রুপ্রবাহ সৃষ্টি এবং জীবনের আমূল রূপান্তর। | ইমাম খাত্তাবী, সাঈদ হাওয়া |
৪. সিদ্ধান্ত:
উলামায়ে কেরামের এই বহুমুখী মতামত কোনো বিরোধ নয়, বরং কুরআনের সার্বিক শ্রেষ্ঠত্বের বিভিন্ন প্রকাশ। পবিত্র কুরআন কোনো একটি নির্দিষ্ট দিক দিয়েই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সাহিত্য, দর্শন, আইন, ইতিহাস, বিজ্ঞান এবং আত্মিক প্রভাবের সামগ্রিক রূপই হলো এর চিরন্তন ই’জায।
٣- ما التحدى؟ اذكر أقوال العلماء فى موضوع القدر المعجز من القرآن الكريم-
[التحدى কী? কুরআনুল কারিমের অক্ষমকারী পরিমাণের বিষয়ে আলেমগণের মতামত উল্লেখ কর।]
১. ‘আত-তাহাদ্দী’ (التحدي)-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক পরিচয়:
- শাব্দিক অর্থ: আরবি ‘তাহাদ্দী’ (التَّحَدِّي) শব্দটি বাবে তাফা’উল (التَّفَعُّل)-এর মাজদার। এর মূল ধাতু ح-د-و বা ح-د-ي। এর আভিধানিক অর্থ হলো—প্রতিযোগিতা বা মুকাবিলায় প্রকাশ্যে আহ্বান জানানো (طلب المبارزة والمنازعة), চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া, কাউকে নিজের সমকক্ষ কিছু করে দেখানোর উন্মুক্ত দাওয়াত দেওয়া।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: উলূমুল কুরআনের পরিভাষায়:
«التَّحَدِّي هُوَ طَلَبُ اللَّهِ تَعَالَى وَرَسُولِهِ ﷺ مِنَ الْعَرَبِ وَالْبَشَرِيَّةِ جَمْعَاءَ أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَٰذَا الْقُرْآنِ أَوْ بِبَعْضِهِ، إِثْبَاتًا لِعَجْزِهِمْ وَتَصْدِيقًا لِرِسَالَةِ النَّبِيِّ ﷺ»
“আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রসূল ﷺ কর্তৃক তৎকালীন আরবের সেরা সাহিত্যিকসহ সমগ্র মানবজাতিকে কুরআনের অনুরূপ কিংবা তার কিয়দংশের সমকক্ষ কোনো কালাম রচনা করে দেখানোর যে প্রকাশ্য আহ্বান জানানো হয়েছিল—যাতে তাদের চূড়ান্ত অক্ষমতা প্রমাণিত হয় এবং নবুওয়তের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়—তাকেই ‘তাহাদ্দী’ বা চ্যালেঞ্জ বলা হয়।”
২. আল-কুরআনের তাহাদ্দীর তিনটি পর্যায়ক্রম (مراتب التحدي):
- প্রথম স্তর (সমগ্র কুরআনের মতো রচনার চ্যালেঞ্জ): সর্বপ্রথমে মক্কী জীবনের শুরুতে সমগ্র মানব ও জিনকে একত্র হয়ে কুরআনের সমকক্ষ গ্রন্থ আনার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়:
«قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَىٰ أَن يَأْتُوا بِمِثْلِ هَٰذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ…» [সূরা আল-ইসরা: ৮৮] - দ্বিতীয় স্তর (দশটি স্বরচিত সূরার চ্যালেঞ্জ): যখন তারা সমগ্র কুরআনের জবাবে ব্যর্থ হলো, তখন তাদের জন্য শর্ত শিথিল করে মাত্র দশটি স্বরচিত সূরার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হলো:
«أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ ۖ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِّثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ…» [সূরা হূদ: ১৩] - তৃতীয় ও চূড়ান্ত স্তর (যেকোনো একটিমাত্র সূরার চ্যালেঞ্জ): সর্বশেষে তাদের চরম অহংকার গুঁড়িয়ে দিতে মাত্র একটি সূরার আহ্বান জানানো হলো:
«وَإِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ…» [সূরা আল-বাক্বারা: ২৩]
৩. ‘আল-ক্বাদরুল মু’জিয’ (القدر المعجز – কুরআনের অক্ষমকারী পরিমাণের সীমা):
কুরআনের কতটুকু পরিমাণ পাঠ বা আয়াত উপস্থাপিত হলে তা মানব সৃষ্টির জন্য অক্ষমকারী মুজিযা হিসেবে গণ্য হবে? এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মাঝে কয়েকটি সুপ্রসিদ্ধ অভিমত রয়েছে:
- জমহুর উলামা ও ফুক্বাহাগণের অভিমত (ইমাম শাফেয়ী, মালেক ও আহমদ অনুসারীগণ):
জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে, কুরআনের সর্বনিম্ন মুজিযা হলো একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা—তা দৈর্ঘ্যে যতই ছোট হোক না কেন (مثل سورة الكوثر أو ثلاث آيات) অথবা সমপরিমাণ তিনটি সংক্ষিপ্ত আয়াত।- দলিল: কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণা—«فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ»। এখানে ‘স সূরাহ’ শব্দটি অনির্দিষ্ট (نكرة) হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা ক্ষুদ্রতম সূরাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। কুরআনের ক্ষুদ্রতম সূরা হলো ‘সূরা আল-কাওসার’, যার মধ্যে রয়েছে তিনটি সংক্ষিপ্ত আয়াত ও দশটি শব্দ। অতএব, এই পরিমাণ কালামই স্বয়ংসম্পূর্ণ মুজিযা।
- ইমাম আবু বকর আল-বাকিল্লানী ও বালাগাতবিদদের অভিমত:
ইমাম বাকিল্লানীর মতে, পরিমাণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘নাযম’ (শব্দ ও অর্থের বালাগাতগত সমন্বয়)। যদি কোনো একটি আয়াতও এমন দীর্ঘ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় যাতে কুরআনের অনুপম বালাগাত, বিধান ও অর্থের গভীরতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় (যেমন আয়াতুল কুরসী বা আয়াতুদ দায়ন), তবে সেই একক আয়াতটিও মুজিযার অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে যদি কোনো আয়াত অতি সংক্ষিপ্ত হয় এবং তাতে এককভাবে সম্পূর্ণ নাযম ফুটে না ওঠে (যেমন: «مُدْهَامَّتَانِ»), তবে তা এককভাবে ক্বাদরে মু’জিয হবে না যতক্ষণ না তার সাথে পূর্বাপর ভাব যুক্ত হয়। - মু’তাযিলাদের একাংশের অভিমত (প্রত্যাখ্যাত মত):
কিছু বিচ্ছিন্ন পণ্ডিতের মতে, পুরো কুরআন বা তার একটি সুবিশাল অংশ ছাড়া অল্প পরিমাপে ই’জায ফুটে ওঠে না।- এ মতের খণ্ডন: এ মতটি সুস্পষ্ট দলিলের পরিপন্থী। কারণ আল্লাহ তাআলা চ্যালেঞ্জে মাত্র একটি সূরার কথা বলেছেন। যদি অল্প অংশে মুজিযা না থাকত, তবে মাত্র তিন লাইনের সূরা কাওসার দিয়ে কুরাইশদেরকে চ্যালেঞ্জ করা বৈধ হতো না।
৪. প্রাধান্যপ্রাপ্ত অভিমত (القول الراجح):
সার্বিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে জমহুর আলেমগণের মতই সর্বাধিক শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ কুরআনের সর্বনিম্ন ক্বাদরে মু’জিয হলো ক্ষুদ্রতম পূর্ণাঙ্গ সূরার সমপরিমাণ তিনটি সংক্ষিপ্ত আয়াত। এই ক্ষুদ্রতম অংশেরও সমকক্ষ রচনা করতে চৌদ্দশত বছর ধরে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ব্যর্থ হয়েছে।
٤- ما أهم شبهات المستشرقين حول القرآن الكريم وكيف ترد عليها؟ بين-
[কুরআনুল কারিমের বিষয়ে প্রাচ্যবিদগণের গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলো কী? কীভাবে তা খণ্ডন করবে? বর্ণনা কর।]
১. প্রাচ্যবিদদের পরিচয় ও গবেষণার প্রেক্ষাপট:
‘মুস্তাশরিক’ (المستشرق / Orientalist) হলেন সেই সকল পাশ্চাত্য ও অমুসলিম পণ্ডিত, যাঁরা প্রাচ্যের ভাষা, ধর্ম, বিশেষ করে ইসলাম, কুরআন, হাদিস ও ইসলামী ইতিহাস নিয়ে সুপরিকল্পিত একাডেমিক গবেষণা করেছেন। ক্রুসেড যুদ্ধোত্তর কাল থেকে উপনিবেশবাদী যুগ পর্যন্ত পশ্চিমা পণ্ডিতদের এই গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের মনে কুরআন ও ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস সম্পর্কে সূক্ষ্ম সংশয় ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেওয়া।
২. প্রাচ্যবিদদের প্রধান প্রধান সংশয় ও তাদের অকাট্য একাডেমিক খণ্ডন:
- সংশয় ১: কুরআন মুহাম্মাদ ﷺ-এর স্বরচিত বা বাইবেল থেকে ধার করা (Theft / Plagiarism Theory):
থিওডোর নোলডেকে (Theodor Nöldeke), উইলিয়াম মুর (William Muir) এবং রেভারেন্ড টিসডালের মতো প্রাচ্যবিদরা দাবি করেন যে, কুরআন ওহী নয়; বরং নবীজি ﷺ তাওরাত ও ইঞ্জিলের পণ্ডিতদের (যেমন ওরাকা ইবনে নওফেল বা বাহিরা খ্রিস্টান পাদ্রী) সাথে আলোচনা করে তাদের বিষয়বস্তুকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছেন।- অকাট্য খণ্ডন:
- রসূল ﷺ ছিলেন উম্মী (নিরক্ষর): তিনি কোনো দিন কোনো শিক্ষকের কাছে যাননি কিংবা হিব্রু বা সিরিয়াক ভাষার কিতাব পড়তে জানতেন না। পবিত্র কুরআন নিজেই এ বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করেছে:
«وَمَا كُنتَ تَتْلُو مِن قَبْلِهِ مِن كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ ۖ إِذًا لَّارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ» [সূরা আল-আনকাবুত: ৪৮] - ইতিহাসের বিশুদ্ধতা ও তাওরাতের বিকৃতি সংশোধন: বাইবেলে নবীদের চরিত্রে জঘন্য ব্যভিচার, মদ্যপান ও বিভ্রান্তির মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা হয়েছে (যেমন লূত ও দাউদ আ.-এর ওপর মিথ্যা অপবাদ)। কুরআন সেখানে নবীদেরকে নিষ্পাপ হিসেবে তুলে ধরেছে। যদি কুরআন বাইবেল থেকে ধার করা হতো, তবে সেই বিকৃতিগুলোও কুরআনে আসত। বরং কুরআন পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের বিকৃতি সংশোধন করে সত্যকে পুনরুদ্ধার করেছে।
- বাহিরার সাথে সাক্ষাতের সত্যতা: ১২ বছর বয়সে ব্যবসায়িক কাফেলায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য পথিমধ্যে এক পাদ্রীর সাথে দেখা করে ৩০ বছর পর সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য ও আইন দর্শন রচনা করা মানবীয় যুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
- রসূল ﷺ ছিলেন উম্মী (নিরক্ষর): তিনি কোনো দিন কোনো শিক্ষকের কাছে যাননি কিংবা হিব্রু বা সিরিয়াক ভাষার কিতাব পড়তে জানতেন না। পবিত্র কুরআন নিজেই এ বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করেছে:
- অকাট্য খণ্ডন:
- সংশয় ২: কুরআনের পাঠ ও সংকলন নিয়ে বিভ্রান্তি (Collection & Variant Readings):
ইগনায গোল্ডজিহার (Ignaz Goldziher) ও আর্থার জেফরি (Arthur Jeffery) দাবি করেন যে, রসূল ﷺ-এর যুগে কুরআন সংকলিত হয়নি, বরং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রয়োজনে খলিফারা নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন পাঠ তৈরি করেছিলেন এবং বহু অংশ হারিয়ে গেছে।- অকাট্য খণ্ডন:
- অবিচ্ছিন্ন তাওয়াতুর ও লাখো সাহাবীর হিফজ: কুরআনের মূল সংরক্ষণ লিখিত কাগজের ওপর নির্ভরশীল ছিল না; বরং তা হাজার হাজার সাহাবীর বক্ষে তাওয়াতুরের সাথে মুখস্থ ছিল।
- হযরত আবু বকর ও উসমান (রা.)-এর আনুষ্ঠানিক সংকলন: কোনো আয়াতই কেবল একজনের সাক্ষ্যে গৃহীত হয়নি; বরং লিখিত পাণ্ডুলিপি ও ন্যূনতম দুজন নির্ভরযোগ্য মুখস্থকারী সাহাবীর সমন্বয়ে কঠোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মুসহাফ প্রস্তুত করা হয়। সমগ্র সাহাবা সমাজ সর্বসম্মতভাবে (ইজমা) এর ওপর একমত হয়েছিলেন। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের পাণ্ডুলিপির সাথে বর্তমান কুরআনের বর্ণে বর্ণে হুবহু মিল প্রমাণ করে যে এটি অপরিবর্তনীয়।
- অকাট্য খণ্ডন:
- সংশয় ৩: কুরআনের ভাষাগত পুনরাবৃত্তি ও অসংলগ্নতার অভিযোগ:
প্রাচ্যবিদ কার্লাইল ও রেনান দাবি করেন যে, কুরআনে একই কাহিনী বারবার ফিরে এসেছে এবং এতে কোনো ধারাবাহিকতা নেই।- অকাট্য খণ্ডন:
- বালাগাতের উদ্দেশ্য ও তাদরীজ: কুরআন কোনো ইতিহাস বা গল্প উপন্যাসের বই নয়; এটি হেদায়াত ও চেতনার গ্রন্থ। একই নবীর কাহিনী বিভিন্ন সূরায় ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে পেশ করা হয়েছে যাতে মানুষের অন্তরে ঈমানের বিভিন্ন দিক বিকশিত হয়।
- ভাষাতাত্ত্বিক তাকীদ: আরবি বালাগাত শাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ‘তাকরার’ বা পুনরাবৃত্তি কেবল অলঙ্কার নয়, বরং তা কথার গভীরতা ও গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার প্রধান মাধ্যম।
- অকাট্য খণ্ডন:
- সংশয় ৪: নাসিখ ও মানসুখ (রহিতকরণ) নিয়ে সংশয়:
তারা দাবি করে, বিধান পরিবর্তন প্রমাণ করে যে রচয়িতা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না।- অকাট্য খণ্ডন:
- তাদরীজ বা পর্যায়ক্রমিক সমাজ সংস্কার: মদ্যপান হারাম করার মতো কঠিন সামাজিক ব্যাধি এক দিনে দূর করা যেত না। আল্লাহ মানব মনস্তত্ত্বের উপযোগী করে ধীরে ধীরে বিধান পূর্ণতা দিয়েছেন। এটি আল্লাহর অসীম প্রজ্ঞার প্রমাণ, কোনো অজ্ঞতা নয়।
- অকাট্য খণ্ডন:
৩. উপসংহার:
প্রাচ্যবিদদের এই সকল সংশয় কোনো সত্যানুসন্ধিৎসু গবেষণা নয়; বরং ইসলামবিদ্বেষী পূর্বধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যুক্তি, ইতিহাস ও ভাষাতাত্ত্বিক মানদণ্ডে তাদের প্রতিটি অভিযোগ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে কুরআনের ঐশী সত্যতাই উজ্জ্বলতর হয়েছে।
مجموعة (ب) : সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি [মান: ৫ × ২ = ১০]
٥- ما الفرق بين معنى الإعجاز والصرفة فى القرآن الكريم؟ بين-
[কুরআনুল কারিমের ক্ষেত্রে الإعجاز এবং الصرفة এর মাঝে পার্থক্য কী? বর্ণনা কর।]
১. আল-ই’জায (الإعجاز)-এর স্বরূপ:
‘ই’জায’ হলো পবিত্র কুরআনের নিজস্ব ও অন্তর্নিহিত অলৌকিক গুণ। অর্থাৎ কুরআনের ভাষা, শব্দবিন্যাস, বালাগাত ও অর্থের গভীরতা এতটাই শ্রেষ্ঠ ও অতিপ্রাকৃতিক যে, সৃষ্টির কোনো মানুষের পক্ষেই এর সমকক্ষ কিছু তৈরি করার কোনো সহজাত ক্ষমতাই নেই (عجز ذاتي في البشر أمام كمال القرآن)। এটি আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকিদা।
২. আস-সারফাহ (الصرفة)-এর স্বরূপ:
‘সারফাহ’ মতবাদের অর্থ হলো—আরব সাহিত্যিকদের মধ্যে কুরআনের অনুরূপ বা সমকক্ষ রচনা করার মেধা, ভাষা ও ক্ষমতা বিদ্যমান ছিল; কিন্তু আল্লাহ তাআলা অলৌকিকভাবে তাদের মন-মস্তিষ্ক থেকে সেই ক্ষমতা ও ইচ্ছা হরণ বা বিচ্যুত (صرف) করে রেখেছিলেন। অর্থাৎ কুরআন নিজে অলৌকিক নয়, বরং মানুষের ক্ষমতা আটকে রাখাই ছিল অলৌকিক।
৩. ই’জায ও সারফার মধ্যে মৌলিক তুলনামূলক পার্থক্য:
| পার্থক্যের ক্ষেত্র | আল-ই’জায (الإعجاز) | আস-সারফাহ (الصرفة) |
|---|---|---|
| মূল উৎস | কুরআনের নিজস্ব অতুলনীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও ঐশী গুণাবলী। | কুরআনে কোনো স্বকীয় শ্রেষ্ঠত্ব নেই, বরং মানুষের ইচ্ছা হরণ। |
| মানুষের সামর্থ্য | মানুষের স্বভাবজাত মেধা কুরআনের সমকক্ষ রচনায় চিরকাল অক্ষম। | মানুষ ইচ্ছা করলেই লিখতে পারত, যদি না আল্লাহ মেধা ছিনিয়ে নিতেন। |
| তাহাদ্দীর মর্যাদা | কুরআনের সার্বিক চ্যালেঞ্জ সত্য ও যৌক্তিক। | চ্যালেঞ্জ অর্থহীন হয়ে পড়ে (যেমন হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটতে বলার মতো)। |
| শরয়ি গ্রহণযোগ্যতা | আহলুস সুন্নাহ ও জমহুর উলামার সর্বসম্মত সহীহ আকিদা। | মু’তাযিলাদের মনগড়া ও চরম প্রত্যাখ্যাত ভ্রান্ত মতবাদ। |
٦- من هم أهل الصرفة؟ وما عقيدتهم فى إعجاز القرآن؟ بين-
[أهل الصرفة কারা? إعجاز القرآن এর বিষয়ে তাদের আকিদা কী? বর্ণনা কর।]
১. আহলুস সারফাহ (أهل الصرفة)-এর পরিচয়:
ইসলামী ধর্মতত্ত্বের ইতিহাসে যারা কুরআনের স্বকীয় ভাষাগত মুজিযাকে অস্বীকার করে এবং অলৌকিকত্বকে মানুষের মেধা হরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করে, তাদেরকে ‘আহলুস সারফাহ’ বলা হয়। এই ভ্রান্ত মতবাদের মূল প্রবক্তারা হলেন:
- আবু ইসহাক ইবরাহিম আন-নাজ্জাম (النظام – মৃত্যু ২২১/২৩১ হি.): তিনি ছিলেন মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের একজন অন্যতম শীর্ষ দার্শনিক। তিনিই সর্বপ্রথম ইসলামে এই মতবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন।
- আশ-শরীফ আল-মুরতাজা (الشريف المرتضى – মৃত্যু ৪৩৬ হি.): শিয়া মু’তাযিলা পণ্ডিত, যিনি তাঁর ‘আল-মুওয়াযাহ’ গ্রন্থে এ মতবাদকে জোরদার করার চেষ্টা করেন।
- ইবনে হাজম আন্দালুসী (রহ.): কোনো কোনো বিষয়ে তাঁর এক ভিন্নধর্মী সারফাহ সম্পর্কিত ব্যাখ্যা থাকলেও তিনি নাজ্জামের মতো কুরআনের ফাসাহাতকে খাটো করেননি।
২. ই’জাযুল কুরআন সম্পর্কে তাদের আকিদা ও দর্শন:
আহলুস সারফাহর মূল আকিদা হলো: আরবরা স্বভাবগতভাবে কুরআনের মতো বাক্য বা সূরা রচনা করতে সক্ষম ছিল। কারণ কুরআন তাদের পরিচিত আরবি ভাষাতেই নাজিল হয়েছিল। কিন্তু যখনই তারা কুরআনের মুকাবিলা করতে উদ্যত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা অলৌকিক ক্ষমতাবলে তাদের স্মৃতিশক্তি ও প্রতিভাকে অবরুদ্ধ (صرف الهمم والخواطر) করে দিয়েছেন। ফলে তারা অক্ষম হয়ে পড়ে।
৩. জমহুর সালাফ ও উলামায়ে কেরামের খণ্ডন:
ইমাম বাকিল্লানী, ইমাম খাত্তাবী এবং ইমাম আব্দুল ক্বাহির জুরজানী এ মতবাদকে সম্পূর্ণ বাতিল ও অযৌক্তিক ঘোষণা করেছেন। কারণ:
- যদি সারফাহ সত্য হতো, তবে আরব কাফেররা বলত: “মুহাম্মদ আমাদের ওপর জাদু করেছে এবং আমাদের স্বাভাবিক চিন্তা করার ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছে।” কিন্তু তারা তা কখনো বলেনি; বরং তারা কুরআনের বালাগাত দেখে নিজেরাই মোহিত ও নির্বাক হয়ে গিয়েছিল।
- হাত-পা বেঁধে কাউকে সাগরে ফেলে সাঁতার কাটতে না পারাকে সাঁতারুর অপারগতা বলা যায় না। সারফাহ মতবাদ গ্রহণ করলে কুরআনের ঐশী মর্যাদাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করা হয়।
٧- ما الحكمة فى تنزيه القرآن عن الشعر الموزون؟ وما الجواب عما وجد فى القرآن مما صورته صورة الموزون؟
[ছন্দময় কবিতা থেকে কুরআনকে মুক্তকরণের তাৎপর্য কী? কুরআনে দৃশ্যত ছন্দময় যে আয়াতসমূহ আছে, সে ব্যাপারে উত্তর কী?]
১. কুরআনুল কারিমকে ছন্দময় কবিতা থেকে পবিত্র রাখার হিকমতসমূহ:
- কবিতা কল্পনা ও অতিরঞ্জনভিত্তিক: আরবি কবিতা মূলত কল্পনাপ্রসূত ভাবাবেগ, মিথ্যার আশ্রয় এবং অতিরঞ্জনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আরবরা বলত: «أَحْسَنُ الشِّعْرِ أَكْذَبُهُ» (কবিতা যত বেশি মিথ্যা, তত বেশি সুন্দর)। পক্ষান্তরে কুরআন শাশ্বত সত্য ও হেদায়াতের গ্রন্থ। পবিত্র কুরআন ঘোষণা করেছে:
«وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ – أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ – وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ» [সূরা আশ-শু’আরা: ২২৪-২২৬] - কুরাইশদের অপবাদের চূড়ান্ত মূলোৎপাটন: মক্কার কাফেররা রসূল ﷺ-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে কবি (شاعر) বলে অপবাদ দিত। কুরআন ছন্দময় কবিতার ধারা বর্জন করে কাফেরদের সেই দাবিকে চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
«وَمَا عَلَّمْنَاهُ الشِّعْرَ وَمَا يَنبَغِي لَهُ ۚ إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ وَقُرْآنٌ مُّبِينٌ» [সূরা ইয়াসীন: ৬৯] - কুরআনের নিজস্ব মর্যাদাবোধ ও কর্তৃত্ব: মানব রচিত ছন্দের বাহ্যিক নিয়মের (যেমন খলিল ইবনে আহমদের ১৬টি ইলমুল আরূজের বাহর) দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন ও ঐশী এক ধ্বনিমাধুর্য প্রতিষ্ঠা করাই ছিল অন্যতম হিকমত।
২. কুরআনে দৃশ্যত ছন্দময় মনে হওয়া অংশসমূহের উত্তর:
কুরআনের কিছু কিছু সংক্ষিপ্ত আয়াত আপাতদৃষ্টিতে কবিতার বাহরের সাথে মিলে যায়; যেমন:
- «تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ» (বাহরে সারী’-এর ওজনে)।
- «وَالصَّافَّاتِ صَفًّا – فَالزَّاجِرَاتِ زَجْرًا» (বাহরে মুতাদ্বারিকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ)।
- «هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ» (বাহরে রজযের অংশবিশেষের মতো)।
ভাষাতাত্ত্বিক ও বালাগাত বিশারদগণের অকাট্য উত্তর:
- কবিতার মূল শর্ত হলো ইচ্ছাকৃত ছন্দের অনুসরণ (القصد إلى الوزن): সাহিত্যের সংজ্ঞায় কবিতা কেবল তখনই হয় যখন বক্তা বা রচয়িতা সচেতনভাবে নির্দিষ্ট বাহর ও কাফিয়া রক্ষা করার সংকল্প নিয়ে শব্দ নির্বাচন করেন। কুরআনে কখনোই এরূপ উদ্দেশ্যমূলক ছন্দমিল সাধন করা হয়নি।
- স্বাভাবিক ভাষার প্রবাহে আকস্মিক মিল কবিতা নয়: আরবি গদ্যের স্বাভাবিক গতিতে কোনো বাক্য দুর্ঘটনাবশত কোনো বাহরের মাত্রায় পড়ে গেলেই তাকে কবিতা বলা যায় না। এমনকি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তাতেও অনেক সময় কবিতার ওজনের শব্দ এসে যায়, যা কেউ কবিতা বলে না।
- কুরআনের অন্ত্যমিল হলো ‘ফাসিলা’ (فاصلة قرآنيّة): এটি কোনো কাব্যের কাফিয়া নয়; বরং অর্থের গভীরতা এবং আত্মার ভেতর ঐশী অনুরণন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে গঠিত অনুপম অন্ত্যমিল।
٨- اذكر خمسة كتب حول إعجاز القرآن مع ذكر مؤلفيها-
[লেখকের নাম উল্লেখসহ إعجاز القرآن বিষয়ে পাঁচটি কিতাবের নাম উল্লেখ কর।]
১. পাঁচটি বিখ্যাত মৌলিক গ্রন্থ ও গ্রন্থকারদের পরিচয়:
- إعجاز القرآن (ই’জাযুল কুরআন):
গ্রন্থকার: ইমাম আবু বকর মুহাম্মদ ইবনুত তাইয়িব আল-বাকিল্লানী (রহ.) [মৃত্যু: ৪০৩ হিজরি]।
বৈশিষ্ট্য: এটি উলূমুল কুরআনের ইতিহাসে ই’জায বিষয়ে রচিত সর্বাধিক প্রভাবশালী ও প্রামাণ্য গ্রন্থ। এতে তিনি আরব কবি ইমরুল কায়েস ও বুহতুরির কবিতার সাথে কুরআনের তুলনামূলক বালাগাতগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন এবং সারফাহ মতবাদকে সম্পূর্ণরূপে নাকচ করেছেন। - دلائل الإعجاز (দালাইলুল ই’জায):
গ্রন্থকার: ইমাম আবু বকর আব্দুল কাহির ইবনে আব্দুর রহমান আল-জুরজানী (রহ.) [মৃত্যু: ৪৭১ হিজরি]।
বৈশিষ্ট্য: বালাগাত শাস্ত্রের এই মহান ইমাম তাঁর এ গ্রন্থে জগদ্বিখ্যাত ‘নাযম তত্ত্ব’ (نظريّة النظم) উদ্ভাবন ও প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রমাণ করেন ব্যাকরণ ও অর্থের গভীর সামঞ্জস্যই কুরআনের ই’জাযের মূল ভিত্তি। - بيان إعجاز القرآن (বায়ানু ই’জাযিল কুরআন):
গ্রন্থকার: ইমাম আবু সুলাইমান হামদ ইবনে মুহাম্মদ আল-খাত্তাবী (রহ.) [মৃত্যু: ৩৮৮ হিজরি]।
বৈশিষ্ট্য: অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু সারগর্ভ একটি ক্লাসিক্যাল পুস্তিকা। এতে তিনি বালাগাত, আত্মিক প্রভাব ও কুরআনের নিজস্ব মহত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ই’জাযকে ব্যাখ্যা করেছেন। - النكت في إعجاز القرآن (আন-নুকাতু ফী ই’জাযিল কুরআন):
গ্রন্থকার: ইমাম আবুল হাসান আলী ইবনে ঈসা আর-রুম্মানী (রহ.) [মৃত্যু: ৩৮৬ হিজরি]।
বৈশিষ্ট্য: এই গ্রন্থে তিনি ই’জাযুল কুরআনের সাতটি মৌলিক দিক বিশ্লেষণ করেছেন এবং যুক্তি ও বালাগাতের সমন্বয়ে কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছেন। - معترك الأقران في إعجاز القرآن (মু’তারাকুল আক্বরাআন ফী ই’জাযিল কুরআন):
গ্রন্থকার: ইমাম জালালুদ্দীন আব্দুর রহমান আস-সুয়ূতী (রহ.) [মৃত্যু: ৯১১ হিজরি]।
বৈশিষ্ট্য: সুয়ূতী (রহ.) এই বিশাল গ্রন্থে পূর্ববর্তী সকল উলামায়ে কেরামের গবেষণাকে একত্রিত করে কুরআনের ই’জাযের বহুবিধ মাত্রা (ভাষাতাত্ত্বিক, অদৃশ্য জগতের সংবাদ, শরীয়ত ও বিজ্ঞান) বিশদভাবে সংকলন করেছেন।
الجزء الثاني : العلوم الحديثة في القرآن (দ্বিতীয় অংশ : আধুনিক বিজ্ঞান ও কুরআন) [মান: ৪০]
مجموعة (أ) : বিশদ রচনামূলক প্রশ্নাবলি [মান: ১৫ × ২ = ৩০]
٩- عرف العلوم (السائنس) لغة واصطلاحا- ثم بين العلاقة بين القرآن الكريم والعلوم الحديثة-
[বিজ্ঞান (সাইন্স) এর শাব্দিক ও পারিভাষিক পরিচয় দাও। কুরআনুল কারিম ও আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্ক বর্ণনা কর।]
১. বিজ্ঞানের (العلوم / Science) শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:
- শাব্দিক অর্থ:
- আরবিতে: ‘আল-উলূম’ (العلوم) শব্দটি ‘ইলম’ (العلم)-এর বহুবচন। এর মূল অর্থ হলো—কোনো কিছুকে তার প্রকৃত অবস্থায় স্পষ্টভাবে জানা, সম্যক উপলব্ধি করা ও অনুধাবন করা। এটি অজ্ঞতা বা মূর্খতার (الجهل) বিপরীত।
- ইংরেজিতে: ‘Science’ শব্দটি ল্যাটিন শব্দ ‘Scientia’ থেকে এসেছে, যার অর্থ Knowledge বা জ্ঞান। প্রাচীন গ্রিক ভাষায় এর সমার্থক শব্দ হলো ‘Episteme’, যার অর্থ পদ্ধতিগত সত্য জ্ঞান।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা:
পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণ (Systematic Observation), পরীক্ষণ (Experimentation) এবং যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বস্তুগত জগতের প্রাকৃতিক নিয়ম ও কার্যকারণ আবিষ্কার ও প্রমাণের সুসংবদ্ধ জ্ঞানকে বিজ্ঞান বলে। বিশিষ্ট চিন্তাবিদদের মতে: «العِلْمُ هُوَ مَجْمُوعَةُ الْمَعَارِفِ الْمُنَظَّمَةِ الَّتِي يَتِمُّ التَّوَصُّلُ إِلَيْهَا بِالْمُلَاحَظَةِ وَالتَّجْرِبَةِ وَالْبَحْثِ الْمَنْهَجِيِّ»।
২. কুরআনুল কারিম ও আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্ক:
পবিত্র কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞানের সম্পর্ক পারস্পরিক বিরোধের নয়; বরং তা এক গভীর সৌহার্দ্য ও পরিপূরকতার সম্পর্ক। নিম্নে এই সম্পর্কের বিভিন্ন মাত্রা তুলে ধরা হলো:
- কুরআন বিজ্ঞানের বই নয়, বরং দিকনির্দেশনা ও নিদর্শনের গ্রন্থ:
কুরআন কোনো রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান বা জীববিজ্ঞানের পাঠ্যবই (Book of Science) নয়; বরং এটি হেদায়াত ও নিদর্শনের গ্রন্থ (Book of Signs/Ayat)। বিজ্ঞানের লক্ষ্য হলো প্রাকৃতিক জগতের ‘কীভাবে’ (How) প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, আর কুরআনের লক্ষ্য হলো ‘কেন’ (Why) এবং ‘কার দ্বারা’ এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে—সেই স্রষ্টার পরিচয় তুলে ধরা। - বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও গবেষণার প্রতি কুরআনের ঐশী তাগিদ:
কুরআন অন্ধ বিশ্বাসের পথ পরিহার করে বিশ্বজগত পর্যবেক্ষণ, বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা ও গবেষণার অবারিত আহ্বান জানিয়েছে:
«قُلِ انظُرُوا مَاذَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ» [সূরা ইউনুস: ১০১] — “বলুন: আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে তার দিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করো।”
«أَفَلَا يَنظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ – وَإِلَى السَّمَاءِ كَيْفَ رُفِعَتْ – وَإِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ – وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ» [সূরা আল-গাশিয়াহ: ১৭-২০] — উটের সৃষ্টি, আকাশের উচ্চতা, পর্বতমালার স্থায়িত্ব এবং পৃথিবীর বিস্তৃতি নিয়ে গবেষণার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুরআনে প্রায় ৭৫০টিরও বেশি আয়াত রয়েছে যা সরাসরি প্রাকৃতিক জগত ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার সাথে সম্পর্কিত। - আধুনিক আবিষ্কারের মাধ্যমে কুরআনের সত্যতা উন্মোচন (الإعجاز العلمي):
চৌদ্দশত বছর পূর্বে যখন কোনো দূরবীক্ষণ যন্ত্র, অণুবীক্ষণ যন্ত্র কিংবা আধুনিক ল্যাবরেটরি ছিল না, তখন কুরআন এমন সব মহাজাগতিক সত্যের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে যা বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিজ্ঞান মাত্র সেদিন আবিষ্কার করেছে। যেমন: মহাবিশ্ব সম্প্রসারণ, বিগ ব্যাং, ভ্রূণতত্ত্বের ধাপ, লোহা অবতীর্ণ ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:
«سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنفُسِهِمْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ» [সূরা ফুসসিলাত: ৫৩]
“অচিরেই আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনসমূহ প্রদর্শন করব বিশ্বজগতের দিগন্তসমূহে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে; যাতে তাদের কাছে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে যে এই কুরআনই সত্য।” - শাশ্বত ঐশী সত্য বনাম পরিবর্তনশীল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব:
কুরআন ও বিজ্ঞানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুসলিম গবেষকগণের একটি সতর্কতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:- কুরআন হলো মহান আল্লাহর অপরিবর্তনীয় ও শাশ্বত ওহী (Absolute Truth)।
- পক্ষান্তরে আধুনিক বিজ্ঞান হলো পরিবর্তনশীল মানুষের পর্যবেক্ষণ ও অনুকল্প (Relative & Changing Hypotheses)। বিজ্ঞান প্রতিদিন নতুন নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে তার পূর্ববর্তী থিওরি পরিবর্তন করে।
- অতএব, কোনো পরিবর্তনশীল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ওপর কুরআনের আয়াতকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া যাবে না; বরং যখন কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার অকাট্য ও চূড়ান্ত সত্যে (Established Scientific Fact) পরিণত হয়, তখন দেখা যায় তা কুরআনের শাশ্বত বাণীর সাথে শতভাগ সংগতিপূর্ণ।
৩. উপসংহার:
কুরআন ও প্রকৃত বিজ্ঞান পরস্পরবিরোধী নয়; বরং আধুনিক বিজ্ঞান যত বেশি অগ্রসর হচ্ছে, কুরআনের ঐশী অলৌকিকত্ব মানবজাতির সামনে তত বেশি দীপ্তিমান হয়ে উঠছে।
١٠- ما معنى قوله تعالى : ولا الليل سابق النهار، وكل فى فلك يسبحون؟ بين فى ضوء القرآن والسائنس-
[মহান আল্লাহর বাণী: ولا الليل سابق النهار، وكل في فلك يسبحون এর অর্থ কী? কুরআন ও বিজ্ঞানের আলোকে বর্ণনা কর।]
১. আয়াতে কারিমার পূর্ণ পাঠ ও শাব্দিক অর্থ:
পবিত্র কুরআনের সূরা ইয়াসীনের ৪০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
«لَا الشَّمْسُ يَنبَغِي لَهَا أَن تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ ۚ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ» [সূরা ইয়াসীন: ৪০]
অর্থ: “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া এবং রাতের পক্ষে সম্ভব নয় দিনকে অতিক্রম করে আগে চলে যাওয়া; আর প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে (সন্তরণশীল)।”
২. তাফসিরের আলোকে আয়াতের তাৎপর্য:
- «وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ» (রাতের পক্ষে দিনকে অতিক্রম করা সম্ভব নয়):
ক্লাসিক্যাল তাফসিরকারকগণ (যেমন ইবনে কাসীর ও তাবারী) উল্লেখ করেছেন, আল্লাহ তাআলা দিন ও রাতের জন্য এমন এক নিখুঁত পরিক্রমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, দিনের নির্দিষ্ট সময় শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাত এসে তাকে বাধা দিতে পারে না, আবার রাতের সময় শেষ না হওয়া পর্যন্ত দিন এসে তাকে ব্যাহত করতে পারে না। তারা একে অপরের পেছনে অবিরাম ছুটে চলেছে। - «وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ» (প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণশীল):
‘ফালাক’ (فَلَك) অর্থ ঘূর্ণনপথ বা কক্ষপথ (Orbit)। আর ‘ইয়াসবাহুন’ (يَسْبَحُونَ) শব্দটি ‘সিবাহাত’ (السباحة) থেকে গৃহীত, যার মূল অর্থ পানিতে সাঁতার কাটা। মহাকাশের সুবিশাল শূন্যতায় সূর্য, চন্দ্র এবং গ্রহ-নক্ষত্রসমূহ যেভাবে স্বীয় গতিতে কোনো পতন ছাড়াই অবিরাম ভাসমান অবস্থায় পরিভ্রমণ করছে, তাকে বোঝানোর জন্য কুরআনে সাঁতার কাটার অনুপম উপমা ব্যবহার করা হয়েছে।
৩. আধুনিক বিজ্ঞানের (জ্যোতির্বিজ্ঞান ও সাইন্স) আলোকে অকাট্য বিশ্লেষণ:
- দিন ও রাতের অবিচ্ছিন্ন সহাবস্থান এবং পৃথিবীর গোলকীয় রূপ:
প্রাচীনকালে মানুষ ভাবত দিন ও রাত দুটি পৃথক সত্তা যা একটির পর আরেকটি আসে। কিন্তু আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট চিত্র প্রমাণ করেছে:
পৃথিবী একটি গোলক এবং এটি নিজের অক্ষের ওপর অবিরাম পশ্চিম থেকে পূর্বে ঘুরছে (আহ্নিক গতি)। এর ফলে পৃথিবীর ঠিক যে অর্ধাংশ সূর্যের দিকে থাকে সেখানে দিন, আর বিপরীত অর্ধাংশে রাত বিরাজ করে। রাত কখনো দিনকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না; কারণ তারা একই সাথে পৃথিবীপৃষ্ঠে সহাবস্থান করছে এবং একটি অবিচ্ছিন্ন গোলকীয় সীমানায় পরস্পরকে অনুসরণ করছে। কুরআনে অন্যত্র বলা হয়েছে: «يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا» (তিনি রাত দ্বারা দিনকে আচ্ছাদিত করেন, যা তাকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে)। - মহাজাগতিক সন্তরণশীলতা (Celestial Mechanics & Orbital Motion):
একসময় বিজ্ঞানীরা ধারণা করতেন মহাবিশ্বের কেন্দ্র হলো পৃথিবী এবং সূর্য স্থির (টলেমির ভূ-কেন্দ্রিক মতবাদ)। পরবর্তীতে কোপার্নিকাস বললেন সূর্য স্থির। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে—মহাবিশ্বের কোনো বস্তুই স্থির নয়।- চাঁদের গতি: চাঁদ প্রতি ২৭.৩ দিনে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করছে।
- সূর্যের গতি: সূর্য নিজেও স্থির নয়; বরং সূর্য তার সমগ্র সৌরজগৎকে সাথে নিয়ে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (Milky Way Galaxy) কেন্দ্রকে ঘিরে সেকেন্ডে প্রায় ২২০ কিলোমিটার বেগে অবিরাম এক নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে ছুটে চলেছে (Solar Apex)।
- শূন্যস্থানে সাঁতার কাটার অলৌকিক রূপক: মহাকাশে কোনো রেললাইন বা শক্ত ভিত্তি নেই। সেখানে গ্রহ-নক্ষত্রগুলো মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মধ্যে ঠিক সেভাবেই ভাসমান ও গতিশীল রয়েছে যেভাবে জলরাশির ওপর কোনো জাহাজ বা সাঁতারু ভেসে থাকে। এ কারণেই কুরআনুল কারিম ‘ইয়াতহাররাকুন’ (তারা নড়াচড়া করছে) বা ‘ইয়ামশূন’ (তারা হাঁটছে) না বলে অত্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে «يَسْبَحُونَ» (তারা সাঁতার কাটছে) শব্দটি ব্যবহার করেছে।
৪. উপসংহার:
চৌদ্দশত বছর পূর্বে যখন আধুনিক টেলিস্কোপ ও পদার্থবিজ্ঞানের কোনো ধারণাই ছিল না, তখন মহাজাগতিক এই গতিশীলতা ও কক্ষপথীয় সন্তরণশীলতার নিখুঁত বর্ণনা প্রমাণ করে যে, এই বাণী সর্বজ্ঞানী আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই অবতীর্ণ।
١١- تحدث عن إنزال الحديد فى ضوء سورة الحديد وعلم الفيزياء – ثم بين معنى قوله تعالى : فيه بأس شديد ومنافع للناس-
[সূরা হাদীদ ও পদার্থবিজ্ঞানের আলোকে লৌহ অবতীর্ণের ব্যাপারে আলোচনা কর। অতঃপর মহান আল্লাহর বাণী: فيه بأس شديد ومنافع للناس আলোচনা কর।]
১. আয়াতে কারিমার পূর্ণ পাঠ:
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হাদীদের ২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
«وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ وَرُسُلَهُ بِالْغَيْبِ ۚ إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ» [সূরা আল-হাদীদ: ২৫]
অর্থ: “এবং আমি অবতীর্ণ করেছি লৌহ, যাতে রয়েছে প্রচণ্ড রণশক্তি এবং মানবজাতির জন্য বহুবিধ কল্যাণ; যাতে আল্লাহ জেনে নেন কে না দেখেও তাঁকে ও তাঁর রসূলগণকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, মহাপরাক্রমশালী।”
২. পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোকে ‘লৌহ অবতীর্ণকরণ’ (إنزال الحديد):
কুরআনের এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা লোহা সৃষ্টির ক্ষেত্রে ‘খালাক্বনাল হাদীদ’ (আমরা লোহা সৃষ্টি করেছি) কিংবা ‘জা’আলনাল হাদীদ’ (আমরা লোহা তৈরি করেছি) না বলে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে শব্দ চয়ন করেছেন—«وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ» (এবং আমরা লোহা অবতীর্ণ করেছি / নামিয়ে দিয়েছি)। এই ‘আনযালনা’ শব্দের বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে:
- লোহা পৃথিবীতে তৈরি হওয়া অসম্ভব: আধুনিক পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান (Nuclear Physics) ও জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান (Astrophysics) প্রমাণ করেছে যে, লোহা (Iron, রাসায়নিক প্রতীক Fe, পারমাণবিক সংখ্যা ২৬) এমন একটি ভারী মৌল যা পৃথিবী কিংবা আমাদের সমগ্র সৌরজগতের কোনো সাধারণ প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হতে পারে না।
- সুপারনোভা বিস্ফোরণ ও শতকোটি ডিগ্রির শক্তি: লোহা পরমাণুর নিউক্লিয়াস অত্যন্ত ঘন ও সুদৃঢ়। লোহার একটি পরমাণু তৈরি হতে প্রায় ১০০ কোটি থেকে কয়েকশ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। আমাদের সৌরজগতের সূর্য একটি মাঝারি আকারের নক্ষত্র, যার কেন্দ্রের তাপমাত্রা মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস; ফলে সূর্যের পক্ষেও লোহা উৎপাদন করা অসম্ভব। লোহা কেবল তখনই তৈরি হয় যখন সূর্যের চেয়ে বহু গুণ বড় কোনো বিশাল নক্ষত্র তার জ্বালানি শেষ করে এক প্রলয়ঙ্করী ‘সুপারনোভা বিস্ফোরণ’ (Supernova Explosion) ঘটায়।
- মহাশূন্য থেকে পৃথিবীতে আগমন: সেই দূরবর্তী মহাশূন্যের মহাজাগতিক বিস্ফোরণে তৈরি হওয়া লোহা কোটি কোটি বছর ধরে উল্কাপিন্ড (Meteorites) ও গ্রহাণুর মাধ্যমে মহাকাশ থেকে ছিটকে এসে আদিম পৃথিবীর বুকে ‘অবতীর্ণ’ হয়েছে এবং ভূত্বকে জমা হয়েছে। সুতরাং বিজ্ঞান স্বীকার করেছে যে লোহা পৃথিবীর নিজস্ব উপাদান নয়, এটি মহাকাশ থেকে অবতীর্ণ এক ‘বহিরাগত’ ধাতু। কুরআনের ‘আনযালনা’ (আমরা অবতীর্ণ করেছি) শব্দ ব্যবহারের চেয়ে নিখুঁত বৈজ্ঞানিক সত্য আর কিছুই হতে পারে না।
৩. «فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ»-এর বিশদ ব্যাখ্যা:
আল্লাহ তাআলা লোহার দুটি প্রধান গুণের কথা উল্লেখ করেছেন:
- «فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ» (যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি ও রণশক্তি):
- পারমাণবিক বন্ধন ও দৃঢ়তা: পদার্থবিজ্ঞানে লোহার পারমাণবিক বাইন্ডিং এনার্জি (Nuclear Binding Energy per Nucleon) সমস্ত মৌলের মধ্যে সবচেয়ে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী। লোহার কাঠামোগত শক্তি ও স্থায়িত্ব অপরিসীম।
- প্রতিরক্ষা ও যুদ্ধাস্ত্রের মূল ভিত্তি: মানব ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বর্ম, তলোয়ার, কামান, বুলেটপ্রুফ ঢাল, যুদ্ধজাহাজ, ট্যাংক ও আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা—সবকিছুর প্রধান ভিত্তি হলো লোহা ও ইস্পাত।
- «وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ» (এবং মানবজাতির জন্য বহুবিধ কল্যাণ):
- পৃথিবীর ভূ-চৌম্বকীয় ঢাল (Geomagnetic Field): আধুনিক ভূ-পদার্থবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, পৃথিবীর কেন্দ্রের কেন্দ্রস্থল (Outer Core) প্রায় পুরোটাই গলিত লোহা ও নিকেল দ্বারা গঠিত। এই ঘূর্ণায়মান গলিত লোহা একটি বিশাল ডায়নামো তৈরি করে পৃথিবীর চারপাশে এক শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র (Magnetosphere / Van Allen Belts) তৈরি করে রেখেছে। এই অদৃশ্য চৌম্বক ঢাল যদি না থাকত, তবে সূর্য থেকে নির্গত ক্ষতিকর সৌরঝড় ও প্রাণঘাতী কসমিক রশ্মি মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও সমগ্র জীবজগৎকে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিত। এটি মানবজাতির বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় কল্যাণ।
- মানবদেহের রক্তের মূল উপাদান: মানবদেহের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেয় রক্তের লোহিত কণিকার ‘হিমোগ্লোবিন’ (Hemoglobin)। আর এই হিমোগ্লোবিনের কেন্দ্রবিন্দু হলো লোহার পরমাণু (Fe)। শরীরে লোহার ঘাটতি হলে মানুষ রক্তশূন্যতায় মারা যেত।
- আধুনিক শিল্প ও নগরায়নের মেরুদণ্ড: যানবাহন, রেললাইন, সুউচ্চ ভবন, সেতু, কলকারখানা, ইলেকট্রনিক্স ও কৃষি সরঞ্জাম—লোহা ব্যতীত আধুনিক মানব সভ্যতার এক মুহূর্তও টিকে থাকা অসম্ভব।
৪. উপসংহার:
সূরা আল-হাদীদে লোহার এই মহাজাগতিক উৎপত্তি ও এর বহুমাত্রিক কল্যাণ তুলে ধরা আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে কুরআনের এক জীবন্ত মুজিযা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
١٢- تحدث عن دوران الأرض والشمس والقمر مع بيان منازل القمر بالأدلة –
[পৃথিবী, সূর্য ও চাঁদের ঘূর্ণন সম্পর্কে আলোচনা কর। প্রমাণসহ চাঁদের মানাযিল বর্ণনা কর।]
১. ভূমিকা:
প্রাচীন গ্রিক ও রোমান জ্যোতির্বিজ্ঞানে ধারণা করা হতো পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবিচল দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পবিত্র কুরআনুল কারিম চৌদ্দশত বছর পূর্বেই মহাবিশ্বের গতিশীলতা, পৃথিবী, সূর্য ও চাঁদের নিজস্ব আবর্তন এবং চাঁদের সুনির্দিষ্ট কক্ষীয় পর্যায়ের কথা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে।
২. পৃথিবী, সূর্য ও চাঁদের ঘূর্ণন বিষয়ে কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি:
- পৃথিবীর ঘূর্ণন (دوران الأرض):
- কুরআনিক ইঙ্গিত: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
«وَتَرَى الْجِبَالَ تَحْسَبُهَا جَامِدَةً وَهِيَ تَمُرُّ مَرَّ السَّحَابِ ۚ صُنْعَ اللَّهِ الَّذِي أَتْقَنَ كُلَّ شَيْءٍ» [সূরা আন-নামল: ৮৮]
“এবং আপনি পর্বতমালাকে দেখে অচল ও স্থির মনে করেন; অথচ তা মেঘমালার মতো দ্রুত চলমান। এটি আল্লাহরই নিখুঁত সৃষ্টি, যিনি সবকিছুকে সুদৃঢ় করেছেন।”
পর্বতমালা ভূমির সাথে পেরেকসদৃশভাবে প্রোথিত। মেঘের মতো পর্বত চলার অর্থ হলো সমগ্র পৃথিবীই তার পর্বতমালentity নিয়ে মহাশূন্যে আবর্তিত হচ্ছে। - বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে: পৃথিবী তার নিজের অক্ষের ওপর প্রতি ২৪ ঘণ্টায় একবার ঘুরছে (আহ্নিক গতি), যার কারণে দিন-রাতের সৃষ্টি হয়; এবং সূর্যের চারদিকে বছরে একবার পরিভ্রমণ করছে (বার্ষিক গতি), যার ফলে ঋতু পরিবর্তন ঘটে।
- কুরআনিক ইঙ্গিত: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
- সূর্যের ঘূর্ণন ও অবিরাম গতি (دوران الشمس):
- কুরআনিক ঘোষণা: আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
«وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَّهَا ۚ ذَٰلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ» [সূরা ইয়াসীন: ৩৮]
“এবং সূর্য তার নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে অবিরাম ছুটে চলেছে; এটি মহাপরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর সুপরিকল্পিত নির্ধারণ।” - বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে: একসময় সূর্যকে স্থির মনে করা হলেও আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, সূর্য স্থির নয়। সূর্য তার নিজস্ব অক্ষের ওপর প্রায় ২৫ দিনে একবার নিজ অক্ষে ঘুরছে এবং সমগ্র সৌরজগতকে সঙ্গে নিয়ে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে সেকেন্ডে প্রায় ২২০ কিলোমিটার বেগে। এই গতিকে আধুনিক বিজ্ঞানে বলা হয় ‘সোলার এপেক্স’ (Solar Apex)।
- কুরআনিক ঘোষণা: আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
- চাঁদের ঘূর্ণন (دوران القمر):
- চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ। এটি পৃথিবীর চারদিকে প্রতি ২৭.৩ দিনে একবার প্রদক্ষিণ করছে। পাশাপাশি চাঁদ তার নিজের অক্ষের ওপরও প্রায় একই সময়ে একবার ঘুরছে, যার কারণে পৃথিবী থেকে আমরা সর্বদা চাঁদের একটি পিঠই দেখতে পাই (Synchronous Rotation)।
৩. প্রমাণসহ চাঁদের মানাযিল (منازل القمر – Lunar Mansions):
চাঁদের আবর্তন ও এর বিভিন্ন আকার ধারণ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন:
- কুরআনিক দলিলসমূহ:
«وَالْقَمَرَ قَدَّرْنَاهُ مَنَازِلَ حَتَّىٰ عَادَ كَالْعُرْجُونِ الْقَدِيمِ» [সূরা ইয়াসীন: ৩৯]
“আর চাঁদের জন্য আমি নির্ধারণ করেছি নির্দিষ্ট মানাযিল (পর্যায়সমূহ); অবশেষে তা শুকিয়ে যাওয়া বাঁকা প্রাচীন খেজুরের শাখার মতো হয়ে ফিরে যায়।”
«هُوَ الَّذِي جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَاءً وَالْقَمَرَ نُورًا وَقَدَّرَهُ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ» [সূরা ইউনুস: ৫]
“তিনিই সূর্যকে করেছেন তেজোদৃপ্ত এবং চাঁদকে করেছেন আলোকময় এবং তার জন্য নির্ধারণ করেছেন মানাযিল, যাতে তোমরা বছর গণনা ও হিসাব জানতে পারো।” - মানাযিলের বিবরণ ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য:
- ‘মানাযিল’ (منازل) হলো ‘মানযিল’ (منزل)-এর বহুবচন, যার অর্থ কক্ষীয় পর্যায়, অবতরণস্থল বা দশা (Phases of the Moon)। প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যায় চন্দ্রপথকে ২৮টি মানাযিলে ভাগ করা হতো, যেখানে প্রতি রাতে চাঁদ একটি নির্দিষ্ট নক্ষত্রপুঞ্জের কাছে অবস্থান করে।
- চাঁদের রূপান্তর ও দশাসমূহ: মাসের শুরুতে চাঁদ শুরু হয় এক অতি সূক্ষ্ম রেখা দিয়ে, যাকে বলা হয় ‘হিলাল’ (New Crescent)। ধীরে ধীরে তার আলোকিত অংশ বৃদ্ধি পেতে পেতে মাসের ১৪ তারিখে পূর্ণিমার চাঁদে (بدر / Full Moon) পরিণত হয়। এরপর আবার তা ক্রমান্বয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে হতে মাসের শেষে এমন এক সূক্ষ্ম, ফ্যাকাশে ও বাঁকানো রূপ ধারণ করে, যা ঠিক শুকনো ও প্রাচীন খেজুর গাছের বাঁকা ডালের মতো দেখায়। কুরআনে একে বলা হয়েছে—«كَالْعُرْجُونِ الْقَدِيمِ»। কোনো মরুচারী মানুষ খেজুরের শুকনো বাঁকা ডাল দেখলে বুঝতে পারে চাঁদের এই শেষ দশার উপমা কতটা জীবন্ত ও নিখুঁত।
- বর্ষগণনা ও মানবজীবনের হিসাব: চান্দ্র মাস ও চাঁদের মানাযিল গণনা করা মানবজাতির জন্য সূর্যের চেয়েও সহজ; কারণ চাঁদের দৃশ্যমান আকৃতি দেখেই সাধারণ মানুষ ক্যালেন্ডারের তারিখ নির্ধারণ করতে পারে।
৪. উপসংহার:
পৃথিবী, সূর্য ও চাঁদের সুসমন্বিত ঘূর্ণন এবং চাঁদের মানাযিলের নিখুঁত হিসাব প্রমাণ করে যে, এই মহাজগৎ কোনো অন্ধ বিবর্তনের ফল নয়; বরং এক পরম কুশলী স্রষ্টার নিখুঁত প্রকৌশল।
مجموعة (ب) : সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি [মান: ৫ × ২ = ১০]
١٣- إلى ما أشير فى هذه الآية الكريمة: والسماء بنيناها بأيد وإنا لموسعون؟ بين-
[والسماء بنيناها بأيد وإنا لموسعون আয়াতে কারিমাটিতে কীসের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে? বর্ণনা কর।]
১. আয়াতে কারিমার পাঠ ও শাব্দিক অর্থ:
পবিত্র কুরআনের সূরা আয-যারিয়াতের ৪৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
«وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ» [সূরা আয-যারিয়াত: ৪৭]
অর্থ: “এবং আমি আসমান নির্মাণ করেছি মহা পরাক্রম ও শক্তির মাধ্যমে; আর নিশ্চয়ই আমি এর সম্প্রসারণকারী।”
২. তাফসিরি ব্যাখ্যা:
- «بِأَيْدٍ» (বিআইদিন): আরবিতে ‘আইদ’ (أيد) অর্থ ক্ষমতা, পরম শক্তি ও কুদরত। অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর অসীম শক্তিবলে এই মহাজাগতিক ছাদকে স্তম্ভহীনভাবে স্থাপন করেছেন।
- «وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ» (ওয়া ইন্না লামূসি’ঊন): তাফসিরবিদ ইমাম ইবনে কাসীর ও তাবারী উল্লেখ করেছেন, এর অর্থ হলো—আল্লাহ আকাশমণ্ডলীকে বিশাল প্রশস্ততা দান করেছেন এবং তিনি ক্রমাগত এর সীমানা বৃদ্ধি করতে সক্ষম।
৩. আধুনিক বিজ্ঞানের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ইঙ্গিত (The Expanding Universe):
বিংশ শতাব্দীর সূচনা পর্যন্ত বিজ্ঞান জগতের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনসহ সকলেই বিশ্বাস করতেন যে মহাবিশ্ব স্থির ও অপরিবর্তনীয় (Static Universe)। কিন্তু আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান একে ভুল প্রমাণ করেছে:
- এডউইন হাবলের যুগান্তকারী আবিষ্কার (১৯২৯ খ্রি.): আমেরিকান বিজ্ঞানী এডউইন হাবল (Edwin Hubble) মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরে শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে গ্যালাক্সিগুলো পর্যবেক্ষণের সময় লক্ষ্য করেন যে, দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো থেকে আগত আলোর বর্ণালী লাল রঙের দিকে সরে যাচ্ছে (Redshift)। এটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, প্রতিটি গ্যালাক্সি অন্য গ্যালাক্সি থেকে তীব্র বেগে দূরে সরে যাচ্ছে এবং সমগ্র মহাবিশ্ব বেলুনের মতো চারিদিকে ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে (Expanding Universe)।
- কুরআনের অনুপম অলৌকিকত্ব: বিজ্ঞানীরা মাত্র ১৯২৯ সালে যে মহাবিশ্ব সম্প্রসারণ তত্ত্ব আবিষ্কার করলেন, পবিত্র কুরআন চৌদ্দশত বছর পূর্বে কোনো টেলিস্কোপ ছাড়া অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছিল—«وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ» (এবং নিশ্চয়ই আমরা একে সম্প্রসারিত করে চলেছি)। আয়াতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নির্দেশক ইসমুল ফায়েল (اسم فاعل) ব্যবহার করা হয়েছে, যা নির্দেশ করে যে এই সম্প্রসারণের কাজ অবিরাম চলছে। এটি কুরআনের এক অনন্য বৈজ্ঞানিক মুজিযা।
١٤- تحدث عن النحل على ضوء القرآن الكريم والسائنس-
[কুরআনুল কারিম এবং বিজ্ঞানের আলোকে মৌমাছি সম্পর্কে আলোচনা কর।]
১. পবিত্র কুরআনে মৌমাছির বর্ণনা:
পবিত্র কুরআনের ১৬ নম্বর সূরার নামকরণ করা হয়েছে ‘সূরা আন-নাহল’ (মৌমাছি)। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
«وَأَوْحَىٰ رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا وَمِنَ الشَّجَرِ وَمِمَّا يَعْرِشُونَ – ثُمَّ كُلِي مِن كُلِّ الثَّمَرَاتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكِ ذُلُلًا ۚ يَخْرُجُ مِن بُطُونِهَا شَرَابٌ مُّخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءٌ لِّلنَّاسِ ۗ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ» [সূরা আন-নাহল: ৬৮-৬৯]
“আর আপনার পালনকর্তা মৌমাছিকে ওহী (স্বভাবগত প্রেরণা) দান করেছেন যে: পাহাড়ে, বৃক্ষে এবং মানুষের তৈরি উঁচুতে আবাস গড়ে তোলো। অতঃপর সর্বপ্রকার ফল-ফুল থেকে আহার করো এবং তোমার রবের সহজ সরল পথে চলো। তাদের পেট থেকে নির্গত হয় বিভিন্ন বর্ণের পানীয়, যাতে রয়েছে মানুষের জন্য রোগ নিরাময়।”
২. কুরআন ও বিজ্ঞানের আলোকে মৌমাছির বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য:
- স্ত্রীবাচক ক্রিয়াপদের অলৌকিক ব্যবহার (ভাষাতাত্ত্বিক বিজ্ঞান):
আরবি ব্যাকরণে পুরুষ ও স্ত্রীর জন্য আলাদা ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়। কুরআনুল কারিমে মৌমাছির প্রতি সম্বোধনে প্রতিটি স্থানে স্ত্রীবাচক ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে: «اتَّخِذِي» (তুমি বাসা বানাও—স্ত্রীলিঙ্গ), «كُلِي» (তুমি খাও—স্ত্রীলিঙ্গ), «فَاسْلُكِي» (তুমি গমন করো—স্ত্রীলিঙ্গ)।
আধুনিক জীববিজ্ঞানের আবিষ্কার: আধুনিক প্রাণিবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, মৌচাকে তিন ধরণের মৌমাছি থাকে—রানী মৌমাছি (Queen), পুরুষ মৌমাছি (Drone) এবং কর্মী মৌমাছি (Worker Bees)। মৌচাকে বাসা তৈরি করা, ফুল থেকে নেকটার সংগ্রহ করা এবং মধু তৈরি করার যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে কেবল কর্মী মৌমাছি—যারা শারীরবৃত্তীয়ভাবে বন্ধ্যা স্ত্রী মৌমাছি (Female Bees)। পুরুষ মৌমাছিদের এই কাজ করার কোনো হুল বা অঙ্গই নেই। নিরক্ষর নবীর যুগে কর্মী মৌমাছিদের এই লিঙ্গ পরিচয় জানা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। - দিকনির্ণয় ও ওয়াগল ড্যান্স (Waggle Dance):
আয়াতে বলা হয়েছে: «فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكِ ذُلُلًا» (তোমার রবের সহজ পথে চলো)। ১৯৭৩ সালে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী কার্ল ভন ফ্রিশ (Karl von Frisch) প্রমাণ করেন যে, মৌমাছিরা ফুলের সন্ধান পাওয়ার পর মৌচাকে ফিরে এসে সূর্যের অবস্থান ও কোণ পরিমাপ করে এক বিশেষ ধরণের নৃত্য (Waggle Dance) প্রদর্শন করে অন্যান্য মৌমাছিকে সঠিক পথ নির্দেশ করে। শত কিলোমিটার দূর থেকেও তারা ভুল না করে নিজ পথে ফিরে আসতে পারে। - মধুর নিরাময় ক্ষমতা (فيه شفاء للناس):
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, খাঁটি মধুতে রয়েছে প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদান। ক্ষত সারাতে, পেটের আলসারে, সর্দি-কাশিতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে মধুর বিকল্প নেই। এছাড়া কুরআন বলেছে: «يَخْرُجُ مِن بُطُونِهَا» (তাদের পেট থেকে নির্গত হয়)—বিজ্ঞান নিশ্চিত করেছে যে মৌমাছির শরীরে মধু জমার জন্য একটি বিশেষ দ্বিতীয় পাকস্থলী (Honey Stomach) থাকে।
١٥- تحدث عن زلزلت الأرض على ضوء القرآن الكريم-
[ভূ-কম্পন সম্পর্কে কুরআনুল কারিমের আলোকে বর্ণনা কর।]
১. পবিত্র কুরআনে ভূমিকম্পের বর্ণনা:
পবিত্র কুরআনে ভূমিকম্প বিষয়ে একাধিক সূরা ও আয়াতে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। বিশেষ করে ৯৯তম সূরার নামই হলো ‘সূরা আয-যিলযাল’ (الزلزلة – মহাকম্পন):
«إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا – وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا» [সূরা আয-যিলযাল: ১-২]
“যখন পৃথিবী তার প্রচণ্ড কম্পনে প্রকম্পিত হবে, এবং পৃথিবী তার ভেতরের ভারী বোঝাসমূহ বাইরে বের করে দেবে।”
অন্যত্র কিয়ামতের ভূমিকম্পের ভয়াবহতা সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে:
«يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ ۚ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ» [সূরা আল-হাজ্জ: ১]
২. বিজ্ঞান ও ভূতত্ত্বের (Geology) আলোকে ভূমিকম্প ও কুরআনিক সংগতি:
- টেকটোনিক প্লেটের আলোড়ন (Plate Tectonics):
আধুনিক ভূতত্ত্ববিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, পৃথিবীর উপরিভাগের ভূত্বক (Crust) একক কোনো কঠিন খণ্ড নয়; বরং তা কতগুলো বিশাল পাথুরে প্লেটের ওপর ভাসমান, যাকে টেকটোনিক প্লেট বলা হয়। এই প্লেটগুলো যখন ম্যান্টেলের ওপর গতিশীল অবস্থায় পরস্পরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় কিংবা একটির নিচে আরেকটি দেবে যায় (Subduction), তখন ভূত্বকে প্রচণ্ড শক্তি নির্গত হয়, যাকে আমরা ভূমিকম্প বলি। - «وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا»-এর বৈজ্ঞানিক রহস্য:
ভূমিকম্প ও ভূ-অভ্যন্তরের আলোড়নের ফলে পৃথিবী তার পেটের ভেতরের ভারী বোঝা (Heavy Metals & Magma) বাইরে বের করে দেয়। ভূতত্ত্ববিজ্ঞানীরা জানেন, পৃথিবীর ভূত্বকের চেয়ে এর কেন্দ্রস্থল (Mantle & Core) বহু গুণ ভারী এবং তা গলিত লোহা, নিকেল ও ম্যাগমা দ্বারা গঠিত। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও তীব্র ভূ-কম্পনে এই ভারী পদার্থ বাইরে নিক্ষিপ্ত হয়। আর কিয়ামতের দিন সমগ্র মৃতদেহ ও ভূগর্ভস্থ খনিজসমূহ সম্পূর্ণ বাইরে নিক্ষিপ্ত হবে। - পর্বতমালা দ্বারা পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা:
আল্লাহ তাআলা ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলা থেকে পৃথিবীকে স্থির রাখতে পর্বতমালার ভূমিকা তুলে ধরেছেন:
«وَأَلْقَىٰ فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَن تَمِيدَ بِكُمْ» [সূরা আন-নাহল: ১৫] — “এবং তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে হেলে না পড়ে (কম্পিত না হয়)।”
ভূতত্ত্ববিজ্ঞানে ‘আইসোস্ট্যাসি’ (Isostasy) তত্ত্ব প্রমাণ করেছে যে পর্বতের শিকড় ভূত্বকের নিচে বহু দূর প্রবেশ করে টেকটোনিক প্লেটগুলোকে স্থিতিশীল রাখে।
৩. আধ্যাত্মিক শিক্ষা:
কুরআনে বর্ণিত পার্থিব ভূমিকম্প মানুষের জন্য আল্লাহর শক্তির নিদর্শন এবং পাপের বিরুদ্ধে এক সতর্কবার্তা। এটি মানুষকে অহংকার ত্যাগ করে পরকালের অনন্ত জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণের শিক্ষা দেয়।
١٦- اذكر خمسة أمثلة على الإعجاز العلمى فى القرآن الكريم-
[কুরআনুল কারিমে উল্লিখিত পাঁচটি বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্বের দৃষ্টান্ত উল্লেখ কর।]
পবিত্র কুরআন বিজ্ঞানগ্রন্থ না হওয়া সত্ত্বেও এতে এমন বহু মহাজাগতিক ও প্রাকৃতিক সত্যের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যা আধুনিক বিজ্ঞানের অতি সাম্প্রতিক আবিষ্কার। নিম্নে এর পাঁচটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত সংক্ষেপে পেশ করা হলো:
- ১. মহাবিশ্ব সৃষ্টি ও বিগ ব্যাং তত্ত্ব (The Big Bang Theory):
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে সমগ্র মহাবিশ্ব শুরুতে একটি একক বিন্দুতে পিণ্ডীভূত অবস্থায় ছিল, অতঃপর এক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে তা পৃথক হয়ে গ্যালাক্সি ও নক্ষত্রে রূপ নেয়। পবিত্র কুরআন চৌদ্দশত বছর পূর্বে হুবহু এই চিত্র তুলে ধরে ঘোষণা করেছে:
«أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا» [সূরা আল-আম্বিয়া: ৩০]
“কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে, আসমানসমূহ ও জমিন পরস্পরে ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল (একীভূত পিণ্ড ছিল), অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিয়েছি?” - ২. পানি থেকেই সকল প্রাণের উৎপত্তি (Water as the Origin of Life):
আধুনিক সাইটোলজি (কোষবিজ্ঞান) ও জীববিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, প্রতিটি জীবকোষের প্রোটোপ্লাজমের ৮০-৯০ ভাগই পানি এবং পৃথিবীতে জীবনের প্রথম উৎপত্তি ঘটেছিল সমুদ্রে। কুরআনুল কারিম ঘোষণা করেছে:
«وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ ۖ أَفَلَا يُؤْمِنُونَ» [সূরা আল-আম্বিয়া: ৩০]
“এবং আমি পানি থেকেই প্রতিটি জীবন্ত জিনিস সৃষ্টি করেছি; তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?” - ৩. মানব ভ্রূণতত্ত্বের পর্যায়ক্রমিক বিকাশ (Human Embryology):
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগের চেয়ারম্যান ও প্রখ্যাত ভ্রূণতত্ত্ববিদ প্রফেসর কেইথ এল. মুর (Prof. Keith L. Moore) কুরআনের বর্ণনা দেখে বিস্মিত হয়ে ইসলামি সত্যতা স্বীকার করেছিলেন। কুরআন মানব ভ্রূণের পর্যায়সমূহকে নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছে:
«ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ» [সূরা আল-মুমিনূন: ১৪]
“অতঃপর আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি ‘আলাকা’য় (ঝুলন্ত জোঁকসদৃশ পিণ্ড), অতঃপর আলাকাকে পরিণত করি ‘মুদগাহ’য় (চর্বিত মাংসপিণ্ড), অতঃপর মুদগাহকে রূপ দিই অস্থিপঞ্জরে, তারপর অস্থিপঞ্জরকে ঢেকে দিই গোশত (পেশী) দ্বারা; অবশেষে তাকে গড়ে তুলি এক নতুন সৃষ্টিতে।” - ৪. পর্বতের পেরেকসদৃশ ভারসাম্য রক্ষা (Mountains as Stabilizing Pegs):
ভূতত্ত্ববিজ্ঞানে জানা গেছে যে, ভূত্বকের ওপর পর্বতের দৃশ্যমান অংশের চেয়ে কয়েকগুণ গভীর অংশ মাটির নিচে মূল বা পেরেকের মতো প্রোথিত থাকে যা ভূত্বককে ভাসমান অবস্থায় স্থায়িত্ব দেয়। কুরআন অত্যন্ত নিখুঁত রূপকে বলেছে:
«أَلَمْ نَجْعَلِ الْأَرْضَ مِهَادًا – وَالْجِبَالَ أَوْتَادًا» [সূরা আন-নাবা: ৬-৭] — “আমি কি জমিনকে বিছানা সদৃশ করিনি? এবং পর্বতমালাকে পেরেকস্বরূপ (أَوْتَادًا) করিনি?” - ৫. দুই সাগরের মাঝে অদৃশ্য অন্তরাল (Barrier between Seas):
আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান (Oceanography) প্রমাণ করেছে যে, যেখানে দুটি সাগর মিলিত হয় (যেমন ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগর), সেখানে দুই সাগরের পানির ঘনত্ব, লবণাক্ততা ও তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে এক অদৃশ্য প্রাকৃতিক প্রাচীর তৈরি হয়, যার ফলে একটির পানি অন্যটির সাথে মিশে নিজের স্বকীয়তা হারায় না। কুরআন ঘোষণা করেছে:
«مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ يَلْتَقِيَانِ – بَيْنَهُمَا بَرْزَخٌ لَّا يَبْغِيَانِ» [সূরা আর-রহমান: ১৯-২০]
“তিনি প্রবাহিত করেন দুই সমুদ্র যারা পরস্পরে মিলিত হয়, অথচ তাদের মাঝে রয়েছে এক অদৃশ্য অন্তরাল যা তারা অতিক্রম করে না।”
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ই’জাযুল কুরআন বলতে মূলত কী বোঝায়?
উত্তর: ‘ই’জাযুল কুরআন’ বলতে বোঝায় কুরআনুল কারিমের এমন এক শাশ্বত ও অলৌকিক বৈশিষ্ট্য, যার ফলে মানবজাতি ও জিন সম্প্রদায়ের সম্মিলিত সাহিত্য প্রতিভা ও জ্ঞান কুরআনের ক্ষুদ্রতম একটি সূরার অনুরূপ কিছু রচনা করতেও চিরতরে অক্ষম ও অপারগ প্রমাণিত হয়েছে।
প্রশ্ন ২: কুরআনের তাহাদ্দী বা চ্যালেঞ্জের সর্বনিম্ন পরিমাণ কতটুকু?
উত্তর: জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে, কুরআনের চ্যালেঞ্জের সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো ক্ষুদ্রতম একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা—যেমন সূরা আল-কাওসার (মাত্র তিনটি আয়াত) কিংবা তার সমপরিমাণ তিনটি সংক্ষিপ্ত আয়াত। এই ক্ষুদ্রতম অংশের জবাব আনতেও সমগ্র সৃষ্টি ব্যর্থ হয়েছে।
প্রশ্ন ৩: মু’তাযিলাদের ‘সারফাহ’ মতবাদ মুসলিম উম্মাহ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত কেন?
উত্তর: কারণ সারফাহ মতবাদ অনুসারে কুরআনের নিজস্ব কোনো ভাষাগত শ্রেষ্ঠত্ব নেই, বরং আল্লাহ কাফেরদের মেধা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। এই ভ্রান্ত দাবি গ্রহণ করলে কুরআনের ঐশী গুণ ও মর্যাদাকে চরমভাবে খাটো করা হয় এবং কাফেরদের ওপর আরোপিত চ্যালেঞ্জ অর্থহীন হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন ৪: লোহা অবতীর্ণ করার মধ্যে আধুনিক বিজ্ঞানের কী বিস্ময় রয়েছে?
উত্তর: আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে লোহা পৃথিবী বা সৌরজগতের কোনো স্বাভাবিক তাপমাত্রায় তৈরি হতে পারে না; এটি দূরবর্তী নক্ষত্রের কোটি কোটি ডিগ্রি তাপমাত্রায় সুপারনোভা বিস্ফোরণে তৈরি হয়ে মহাকাশ থেকে উল্কাপিন্ডের মাধ্যমে পৃথিবীতে ‘অবতীর্ণ’ হয়েছে, যা কুরআনের «وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ» বাণীর হুবহু সত্যতা প্রকাশ করে।
প্রশ্ন ৫: কুরআনে মৌমাছিকে স্ত্রীবাচক সম্বোধন করার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব কী?
উত্তর: কুরআনে মৌমাছির জন্য স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আধুনিক জীববিজ্ঞানে প্রমাণিত হয়েছে যে মৌচাকে বাসা তৈরি, খাদ্য সন্ধান ও মধু সংগ্রহের সমস্ত কাজ কেবল স্ত্রী কর্মী মৌমাছিরাই সম্পন্ন করে; পুরুষ মৌমাছিদের এই ভূমিকা পালনের ক্ষমতা নেই।
প্রশ্ন ৬: বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল হলে কুরআনের সাথে বিজ্ঞানের সমন্বয় কীভাবে সম্ভব?
উত্তর: কুরআন হলো পরম ঐশী সত্য এবং বিজ্ঞান হলো মানবীয় গবেষণালব্ধ জ্ঞান। কোনো সাময়িক ধারণাকে কুরআনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় না; বরং বিজ্ঞানের যখন কোনো আবিষ্কার চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় অকাট্য সত্যে রূপ নেয়, তখন দেখা যায় তা কুরআনের পূর্বঘোষিত বাণীর সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ।