ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩ (অনুষ্ঠিত: ২০২৪/২০২৫)
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: সিয়ারুল আম্বিয়া ওয়া মানাহিজু দাওয়াতিহিম ফিল কুরআন (سير الأنبياء ومناهج دعوتهم في القرآن – Siyarul Anbiya wa Manahijud Dawah)
বিষয় কোড: ২০১8০৯ | প্রশ্নপত্র কোড: ১১৯ | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অন্যতম মৌলিক ও আধ্যাত্মিক কোর্স হলো “سير الأنبياء ومناهج دعوتهم في القرآن” (সিয়ারুল আম্বিয়া ওয়া মানাহিজু দাওয়াতিহিম ফিল কুরআন – বিষয় কোড: ২০১8০৯)। এ কোর্সটি মূলত পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবী ও রাসূলগণের বরকতময় জীবনচরিত, তাঁদের নবুওয়াতী দায়িত্ব, দাওয়াতী কর্মপদ্ধতি, তাগূতের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম এবং সমকালীন দাওয়াতী কলাকৌশলের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রশ্নপত্রটি দুটি স্বতন্ত্র গ্রুপে বিভক্ত: প্রথম গ্রুপে রয়েছে مجموعة (أ) – বিশদ রচনামূলক প্রশ্নাবলি (মান: ৬০) এবং দ্বিতীয় গ্রুপে রয়েছে مجموعة (ب) – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (মান: ২০)। নিম্নে পরীক্ষার্থী ও গবেষকদের সর্বোচ্চ সাফল্য ও একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য প্রতিটি প্রশ্নের গভীর, প্রামাণ্য ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান উপস্থাপন করা হলো।
একনজরে প্রশ্নপত্রের রূপরেখা ও মানবণ্টন
| গ্রুপ / বিভাগ | প্রশ্নের ধরন | মোট প্রশ্ন | উত্তর দেওয়ার নিয়ম | প্রতি প্রশ্নের মান | মোট নম্বর |
|---|---|---|---|---|---|
| مجموعة (أ) | বিশদ রচনামূলক প্রশ্নাবলি | ৮টি (প্রশ্ন ১ থেকে ৮) | যেকোনো ৪টি | ১৫ | ৬০ |
| مجموعة (ب) | সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি | ৮টি (প্রশ্ন ৯ থেকে ১৬) | যেকোনো ৪টি | ৫ | ২০ |
| সর্বমোট | ১৬টি | ৮টি | – | ৮০ | |
مجموعة (أ) : বিশদ রচনামূলক প্রশ্নাবলি [মান: ১৫ × ৪ = ৬০]
[দ্রষ্টব্য: যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে]
١- عرف الرسول- ثم بين الفرق بين الرسول والنبى- اذكر عدد الرسل عليهم السلام-
রসুল এর পরিচয় দাও। রসুল ও নবি এর মধ্যকার পার্থক্য বর্ণনা কর। রসুল (আ) এর সংখ্যা উল্লেখ কর।
ভূমিকা
মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে পরিচালিত করা এবং মহান আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য যুগে যুগে আল্লাহ তাআলা যেসব মনোনীত মহামানবদের প্রেরণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদাবান হলেন রাসূলগণ (الرسل عليهم السلام)। নবুওয়াত ও রিসালাত ইসলামী আকিদা ও বিশ্বাসের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ।
রাসূলের পরিচয় (تعريف الرسول)
১. আভিধানিক অর্থ: ‘রাসূল’ (الرسول) শব্দটি আরবি ‘রিসালাত’ (الرسالة) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ প্রেরিত ব্যক্তি, বার্তাবাহক বা দূত (المُرسَل)। বহুবচনে الرسل (রুসুল)। যিনি এক সত্তার পক্ষ থেকে অন্য সত্তার কাছে বার্তা বা পয়গাম বহন করে নিয়ে যান, তাকে রাসূল বলা হয়।
২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামী শরীয়ত ও ইলমুল কালামের পরিভাষায় আল্লামা সা’দুদ্দীন তাফতাযানী (রহ.) ‘শারহুল আকাইদিন নাসাফিয়্যাহ’ গ্রন্থে বলেন:
«الرَّسُولُ هُوَ إِنْسَانٌ بَعَثَهُ اللَّهُ تَعَالَى إِلَى الخَلْقِ لِتَبْلِيغِ الأَحْكَامِ، وَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْهِ بِكِتَابٍ أَوْ شَرْعٍ جَدِيدٍ»
অর্থ: “রাসূল হলেন এমন মানব ব্যক্তিত্ব, যাঁকে মহান আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির কাছে শরয়ি আহকাম পৌঁছানোর জন্য প্রেরণ করেছেন এবং যাঁর প্রতি নতুন আসমানী কিতাব কিংবা স্বতন্ত্র নতুন শরীয়ত অবতীর্ণ করা হয়েছে।”
রাসূল ও নবীর মধ্যকার পার্থক্য (الفرق بين الرسول والنبي)
ইসলামী আকিদাবিদগণের মাঝে নবী ও রাসূলের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম আলোচনা বিদ্যমান:
- সাধারণ ও বিশেষের সম্পর্ক (عموم وخصوص مطلق):
ফিকহ ও আকিদার সর্বসম্মত মূলনীতি হলো: «كُلُّ رَسُولٍ نَبِيٌّ وَلَيْسَ كُلُّ نَبِيٍّ رَسُولاً» অর্থাৎ প্রত্যেক রাসূলই নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসূল নন। সুতরাং নবুওয়াত একটি ব্যাপক গুণ এবং রিসালাত হলো এক বিশেষ মর্যাদা।
- নতুন কিতাব ও স্বতন্ত্র শরীয়ত:
রাসূলের প্রতি আল্লাহ তাআলা নতুন আসমানী কিতাব অথবা একটি স্বাধীন নতুন শরীয়ত প্রদান করেন (যেমন: মূসা আ., দাঊদ আ., ঈসা আ., এবং মুহাম্মদ সা.)। পক্ষান্তরে, নবী কোনো নতুন কিতাব বা শরীয়ত নিয়ে আসেন না; বরং তিনি পূর্ববর্তী রাসূলের শরীয়ত ও কিতাবের বিধান প্রচার ও পুনরুজ্জীবিত করেন (যেমন: বনী ইসরাঈলের নবী হযরত হারূন, ইউশা ইবনে নূন আ.)।
- দাওয়াতের ক্ষেত্র ও উম্মতের অবস্থা:
রাসূলকে এমন জাতির কাছে পাঠানো হয় যারা মূলত কাফির, অবাধ্য বা সত্যবিচ্যুত। পক্ষান্তরে নবী কখনো কখনো এমন জাতির মাঝেও প্রেরিত হন যারা ইতোমধ্যে মুমিন, কিন্তু তাদের মধ্যে পথভ্রষ্টতা দেখা দিয়েছে।
- কুরআনিক পৃথক উল্লেখ:
পবিত্র কুরআনে উভয় পদবীকে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা তাঁদের পার্থক্যের অকাট্য দলীল:
«وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ وَلا نَبِيٍّ إِلَّا إِذَا تَمَنَّىٰ أَلْقَى الشَّيْطَانُ فِي أُمْنِيَّتِهِ»
অর্থ: “আমি আপনার পূর্বে এমন কোনো রাসূল কিংবা নবী প্রেরণ করিনি, যার আকাঙ্ক্ষায় শয়তান কোনো বিঘ্ন নিক্ষেপ করেনি…” (সূরা আল-হাজ্জ: ৫২)।
রাসূল (আ.)-গণের সংখ্যা (عدد الرسل)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন যে, তিনি বহু রাসূল পাঠিয়েছেন যাঁদের অনেকের কথা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এবং অনেকের কথা বর্ণিত হয়নি:
«وَرُسُلاً قَدْ قَصَصْنَاهُمْ عَلَيْكَ مِن قَبْلُ وَرُسُلاً لَّمْ نَقْصُصْهُمْ عَلَيْكَ»
অর্থ: “এমন অনেক রাসূল যাঁদের বিবরণ আমি পূর্বে আপনার কাছে বর্ণনা করেছি এবং এমন অনেক রাসূল যাঁদের বিবরণ আমি আপনার কাছে বর্ণনা করিনি।” (সূরা আন-নিসা: ১৬৪)।
হাদীসের বর্ণনা:
হযরত আবু যার আল-গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! নবীদের সংখ্যা কত? রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করলেন: «مِائَةُ أَلْفٍ وَأَرْبَعَةٌ وَعِشْرُونَ أَلْفًا» (এক লক্ষ চব্বিশ হাজার)। পুনরায় জিজ্ঞেস করা হলো: তাঁদের মধ্যে রাসূল কতজন? তিনি ইরশাদ করলেন:
«ثَلاَثُمِائَةٍ وَثَلاَثَةَ عَشَرَ جَمًّا غَفِيرًا»
অর্থ: “তিনশত তেরো (৩১৩) জন—এক বিশাল জামাত।” (অন্য বর্ণনায় ৩১৫ জন) (মুসনাদে আহমদ, সহীহ ইবনে হিব্বান)।
তবে পবিত্র কুরআনে নাম উল্লেখ করে মাত্র ২৫ জন নবী ও রাসূলের নাম আলোচনা করা হয়েছে।
উপসংহার
রাসূলগণ মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত ও হেদায়েতের জ্যোতি। তাঁদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য শর্ত।
٢- اذكر أسماء الأنبياء المذكورين عليهم السلام فى القرآن الكريم ، ثم اذكر حياة إبراهيم عليه السلام-
কুরআনে উল্লিখিত নবি (আ)-গণের নাম উল্লেখপূর্বক হযরত ইবরাহিম (আ) এঁর জীবনী আলোচনা কর।
ভূমিকা
মহান আল্লাহ মানবজাতির হেদায়েতের জন্য অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করলেও পবিত্র কুরআনে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শিক্ষণীয় ও পথপ্রদর্শক হিসেবে ২৫ জন নবী-রাসূলের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মধ্যে হযরত ইবরাহীম (আ.) হলেন ‘খলীলুল্লাহ’ (আল্লাহর পরম বন্ধু) এবং ‘আবুল আম্বিয়া’ (নবীকুলশিরোমণি বা নবীদের পিতা)।
কুরআনে উল্লিখিত ২৫ জন নবী ও রাসূলের পবিত্র তালিকা
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আনআমের ৮৩ থেকে ৮৬ নম্বর আয়াতে ১৮ জন নবীর নাম একাধারে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বাকিদের নাম অন্যান্য সূরায় এসেছে। মোট ২৫ জন নবীর তালিকা নিম্নরূপ:
- হযরত আদম (آدم عليه السلام)
- হযরত ইদরীস (إدريس عليه السلام)
- হযরত নূহ (نوح عليه السلام)
- হযরত হূদ (هود عليه السلام)
- হযরত সালেহ (صالح عليه السلام)
- হযরত ইবরাহীম (إبراهيم عليه السلام)
- হযরত লূত (لوط عليه السلام)
- হযরত ইসমাঈল (إسماعيل عليه السلام)
- হযরত ইসহাক (إسحاق عليه السلام)
- হযরত ইয়াকূব (يعقوب عليه السلام)
- হযরত ইউসুফ (يوسف عليه السلام)
- হযরত আইয়ূব (أيوب عليه السلام)
- হযরত শুআইব (شعيب عليه السلام)
- হযরত মূসা (موسى عليه السلام)
- হযরত হারূন (هارون عليه السلام)
- হযরত যুলকিফল (ذو الكفل عليه السلام)
- হযরত দাঊদ (داود عليه السلام)
- হযরত সুলাইমান (سليمان عليه السلام)
- হযরত ইলিয়াস (إلياس عليه السلام)
- হযরত আল-ইয়াসা’ (اليسع عليه السلام)
- হযরত ইউনুস (يونس عليه السلام)
- হযরত জাকারিয়া (زكريا عليه السلام)
- হযরত ইয়াহিয়া (يحيى عليه السلام)
- হযরত ঈসা (عيسى عليه السلام)
- সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন হযরত মুহাম্মদ (محمد ﷺ)।
হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর বরকতময় জীবনচরিত
হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর জীবন ছিল ঈমান, আত্মত্যাগ, তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও আল্লাহর ভালোবাসার এক কালজয়ী মহাকাব্য।
- জন্ম ও বংশপরিচয়:
তিনি ইরাকের প্রাচীন বাবেল (ব্যাবিলন) অঞ্চলের উর বা কালদানীয় শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন আযর (তারেখ), যিনি ছিলেন রাজদরবারের প্রধান প্রতিমা কারিগর ও পুরোহিত। এমন পৌত্তলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও ইবরাহীম (আ.) শৈশব থেকেই ছিলেন নির্মল ফিতরাত ও তাওহীদের আলোয় উদ্ভাসিত।
- তাওহীদের অন্বেষণ ও বুদ্ধিদীপ্ত বিতর্ক:
তিনি প্রকৃতির পরিবর্তনশীল রূপ দেখে এক অদৃশ্য মহাশক্তিকে উপলব্ধি করেন। নক্ষত্র, চাঁদ ও সূর্য উদিত হয়ে ডুবে গেলে তিনি ঘোষণা করলেন:
«فَلَمَّا أَفَلَتْ قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّي بَرِيءٌ مِّمَّا تُشْرِكُونَ إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ حَنِيفًا»
অর্থ: “অতঃপর যখন তা অস্ত গেল, তখন তিনি বললেন: হে আমার জাতি! তোমরা যেসব অংশীদার স্থাপন করো তা থেকে আমি সম্পূর্ণ মুক্ত। নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে ফেরালাম যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আল-আনআম: ৭৮-৭৯)।
- মূর্তি ধ্বংস ও নমরূদের সাথে বিতর্ক:
জাতির বাৎসরিক মেলার সুযোগে তিনি মন্দিরের সমস্ত ছোট মূর্তি চূর্ণবিচূর্ণ করে কুঠারটি বড় মূর্তির কাঁধে ঝুলিয়ে দেন। পুরোহিতরা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন: বড় মূর্তিকে জিজ্ঞেস করো! এভাবে তিনি তাদের বিবেককে নাড়া দেন। অতঃপর জালিম শাসক নমরূদের দরবারে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন: আমার রব জীবন দেন ও মৃত্যু দেন। নমরূদ মিথ্যা দাবি করলে তিনি বলেন: আমার রব সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি পারলে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করো! এতে নমরূদ হতভম্ব হয়ে যায়।
- অগ্নিকুণ্ডের অলৌকিক পরীক্ষা:
ক্রুদ্ধ কাফিররা বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করে ইবরাহীম (আ.)-কে নিক্ষেপ করে। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতি নির্দেশে আগুন বাগিচায় পরিণত হয়:
«قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ»
অর্থ: “আমি বললাম: হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের জন্য শীতল ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ৬৯)।
- হিজরত ও মক্কায় পরিবার পুনর্বাসন:
তিনি ফিলিস্তিন ও মিসরে হিজরত করেন। বার্ধক্যে বিবি হাজেরার গর্ভে হযরত ইসমাঈল (আ.) জন্মগ্রহণ করলে আল্লাহর আদেশে দুধের শিশু ইসমাঈল ও মা হাজেরাকে মক্কার নির্জন মরুপ্রান্তরে রেখে আসেন। সেখানেই আল্লাহর কুদরতে যমযম কূপের উৎপত্তি হয়।
- পুত্র কুরবানী ও চরম আত্মত্যাগ:
স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে তিনি প্রিয়তম পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানীর জন্য প্রস্তুত হন। পিতা-পুত্রের এ অনন্য আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ জান্নাত থেকে দুম্বা কুরবানীর ব্যবস্থা করেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য সুন্নাতে ইবরাহীমী হিসেবে অমর হয়ে রয়েছে।
- বাইতুল্লাহ পুনর্নির্মাণ ও হজ্জের আহ্বান:
পিতা-পুত্র মিলে মক্কায় কাবা শরীফ পুনর্নির্মাণ করেন এবং সমগ্র মানবজাতিকে হজ্জের আহ্বান জানান।
উপসংহার
হযরত ইবরাহীম (আ.) ছিলেন এক অনন্য উম্মাহ ({إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً})। তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ মানবজাতির জন্য একনিষ্ঠ আনুগত্য ও খোদাভীতির চিরন্তন আলোকবর্তিকা।
٣- اكتب حياة سيدنا نوح عليه السلام مع ذكر منهج دعوته عليه السلام بالتفصيل-
হযরত নূহ (আ) এর জীবনী আলোচনামূলক তাঁর (আ) দা’ওয়াতের পদ্ধতি বিস্তারিত বর্ণনা কর।
ভূমিকা
মানব ইতিহাসের দ্বিতীয় পিতা (أبو البشر الثاني) এবং প্রথম উলুল আযম রাসূল হলেন হযরত নূহ (আ.)। হযরত আদম (আ.)-এর প্রায় দশ শতাব্দী পর যখন মানুষ সর্বপ্রথম আল্লাহর তাওহীদ ভুলে মূর্তিপূজা ও চরম গোমরাহীতে লিপ্ত হয়েছিল, তখন আল্লাহ তাআলা নূহ (আ.)-কে সত্যের আলোকবর্তিকাস্বরূপ প্রেরণ করেন।
হযরত নূহ (আ.)-এর বরকতময় জীবনচরিত
- নবুওয়াত লাভ ও জাতির অবস্থা:
হযরত নূহ (আ.) তৎকালীন ইরাক অঞ্চলে প্রেরিত হন। তাঁর জাতি ওয়াদ, সুওয়া’, ইয়াগূস, ইয়াঊক ও নাসর নামের সৎ ব্যক্তিদের স্মরণে তৈরি মূর্তির পূজা করত। তিনি তাদের এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানান।
- সুদীর্ঘ ৯৫০ বছরের দাওয়াতী সংগ্রাম:
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
«فَلَبِثَ فِيهِمْ أَلْفَ سَنَةٍ إِلاَّ خَمْسِينَ عَامًا»
অর্থ: “তিনি তাদের মাঝে অবস্থান করেছিলেন পঞ্চাশ বছর কম এক হাজার বছর (অর্থাৎ ৯৫০ বছর)।” (সূরা আল-আনকাবূত: ১৪)। এ দীর্ঘ সময়ে গুটি কয়েক দুর্বল ও দরিদ্র মানুষ ব্যতীত তাঁর জাতির অধিকাংশ নেতৃস্থানীয় লোক ঔদ্ধত্য ও কুফরিতে অটল ছিল।
- কিশতি (নৌকা) নির্মাণ:
আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন যে, ইতোমধ্যে যারা ঈমান এনেছে তারা ছাড়া আর কেউ ঈমান আনবে না। অতঃপর আল্লাহর নির্দেশক্রমে শুষ্ক মরুভূমিতে তিনি এক বিশাল কিশতি তৈরি করেন। কাফিররা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উপহাস করে বলত: নূহ নবী থেকে ছুতোর হয়ে গেল!
- ঐতিহাসিক মহাপ্লাবন (তূফান) ও কাফিরদের ধ্বংস:
আল্লাহর গযব হিসেবে জমিনের বুক চিরে পানির প্রস্রবণ ছুটে আসে এবং আসমান থেকে প্রবল বারিধারা বর্ষিত হয়। হযরত নূহ (আ.) মুমিনদের এবং প্রতিটি প্রাণীর এক এক জোড়া নিয়ে কিশতীতে আরোহণ করেন। তাঁর অবাধ্য স্ত্রী ওয়াগেলা এবং ঔরসজাত পুত্র কানআন (ইয়াম) পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়ার দম্ভ দেখিয়ে পানিতে ডুবে ধ্বংস হয়। প্লাবন শেষে জুদী পর্বতে কিশতি স্থির হয়।
হযরত নূহ (আ.)-এর দাওয়াতী পদ্ধতি ও কৌশল (منهج دعوته بالتفصيل)
সূরা নূহে তাঁর দাওয়াতী পদ্ধতির বিস্ময়কর ও নিখুঁত বিবরণ আল্লাহ তাআলা চিরন্তন করে রেখেছেন:
- দিবা-রাত্রির অবিরাম দাওয়াত (الدعوة ليلاً ونهاراً):
তিনি ক্লান্তিহীনভাবে দিন-রাত দাওয়াত দিতেন:
«قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلاً وَنَهَارًا»
অর্থ: “তিনি বললেন: হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমি আমার জাতিকে দিন-রাত দাওয়াত দিয়েছি।” (সূরা নূহ: ৫)।
- প্রকাশ্য ও গোপন দাওয়াতের অপূর্ব সমন্বয়:
তিনি জনসমাবেশে প্রকাশ্যে যেমন দাওয়াত দিতেন, তেমনি ঘরে ঘরে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে একান্তে বুঝাতেন:
«ثُمَّ إِنِّي دَعَوْتُهُمْ جِهَارًا ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا»
অর্থ: “অতঃপর আমি তাদের প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছি। অতঃপর আমি তাদের উন্মুক্তভাবে বলেছি এবং গোপনেও একান্তে বুঝিয়েছি।” (সূরা নূহ: ৮-৯)।
- তাওহীদের বিশুদ্ধ আহ্বান:
তাঁর দাওয়াতের মূল কথা ছিল: «اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ» অর্থাৎ “তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো সত্য মাবুদ নেই।”
- তারগীব ও পার্থিব নিয়ামতের লোভ দেখানো:
তিনি মানুষকে বুঝাতেন যে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে কেবল আখেরাত নয়, দুনিয়ার জীবনেও প্রাচুর্য আসবে:
«فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا»
অর্থ: “আমি বললাম: তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টিবর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধ করবেন এবং তোমাদের জন্য উদ্যান ও নদীমালা প্রবাহিত করবেন।” (সূরা নূহ: ১০-১২)।
- বিশ্বজগৎ ও মানব সৃষ্টির নিদর্শনের মাধ্যমে যুক্তি উপস্থাপন:
তিনি সপ্ত আকাশ, উজ্জ্বল চাঁদ, প্রদীপরূপী সূর্য এবং মাটি থেকে মানুষের সৃষ্টির ধারাবাহিকতা স্মরণ করিয়ে যৌক্তিক চিন্তা জাগ্রত করতেন।
- চরম সহনশীলতা ও ধৈর্য (الصبر والمصابرة):
জাতির লোকেরা কানে আঙুল ঢুকিয়ে নিত, কাপড়ে মুখ ঢেকে রাখত এবং তাঁকে পাথর মারার হুমকি দিত। তিনি সাড়ে নয়শত বছর সবকিছু পরম ধৈর্যের সাথে সহ্য করেছেন।
- নিঃস্বার্থ দাওয়াত:
তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন: «وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ» অর্থাৎ “আমি তোমাদের কাছে এ দাওয়াতের কোনো প্রতিদান চাই না, আমার প্রতিদান তো কেবল বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছে।”
উপসংহার
হযরত নূহ (আ.)-এর দাওয়াতী জীবন প্রমাণ করে যে, সংখ্যাধিক্য নয়, বরং সত্যের ওপর অবিচল থাকা এবং হিকমতের সাথে দাওয়াত অব্যাহত রাখাই একজন দাঈর পরম সাফল্য।
٤- اكتب نبذا من حياة سيدنا موسى عليه السلام مختصرا مع ذكر اسلوب دعوته الخالدة-
সংক্ষেপে মুসা (আ) এর জীবনী আলোচনা কর। অতঃপর তাঁর (আ) দাওয়াতের পদ্ধতি আলোচনা কর।
ভূমিকা
বনী ইসরাঈলের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী এবং আল্লাহর সাথে সরাসরি কথোপকথনের মর্যাদাপ্রাপ্ত ‘কালীমূল্লাহ’ হলেন হযরত মূসা (আ.)। পবিত্র কুরআনে সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত ও বিশদভাবে হযরত মূসা (আ.)-এর সংগ্রামী জীবনের বিভিন্ন পর্যায় আলোচিত হয়েছে।
হযরত মূসা (আ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত
- জন্ম ও অলৌকিক শৈশব:
মিশরের জালিম বাদশাহ ফেরাউন বনী ইসরাঈলের নবজাতক পুত্র সন্তানদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল। এমন সংকটময় মুহূর্তে তাঁর জন্ম হলে আল্লাহর আদেশে মা তাঁকে এক সিন্দুকে ভরে নীল নদে ভাসিয়ে দেন। অলৌকিকভাবে সিন্দুকটি ফেরাউনের রাজপ্রাসাদে গিয়ে পৌঁছায় এবং ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া (রা.)-এর স্নেহে তিনি রাজপ্রাসাদেই পরম যত্নে বড় হন।
- মাদয়ানে হিজরত:
যৌবনে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় এক কিবতী নিহত হলে তিনি জালিমদের ভয়ে মাদয়ানে হিজরত করেন। সেখানে হযরত শোয়াইব (আ.)-এর কন্যাকে বিবাহ করেন এবং দশ বছর তাঁর ছাগল চরান।
- তূর পাহাড়ে নবুওয়াত লাভ:
পরিবার নিয়ে মিসরে ফেরার পথে সিনাই উপত্যকার তূর পর্বতের পবিত্র ‘তুওয়া’ উপত্যকায় আলো দেখে এগিয়ে যান। সেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর সাথে সরাসরি কথা বলেন এবং নবুওয়াত দান করেন। তাঁকে দুটি প্রধান মু’জিযা দেওয়া হয়: লাঠি (عصا) যা অজগরে রূপ নিত এবং শুভ্র উজ্জ্বল হাত (يد بيضاء)।
- ফেরাউনের দরবারে দাওয়াত ও জাদুকরদের সাথে মুকাবিলা:
ভাই হারূন (আ.)-কে সাথে নিয়ে তিনি ফেরাউনের কাছে যান এবং এক আল্লাহর ইবাদতের ও বনী ইসরাঈলকে মুক্ত করার দাবি জানান। ফেরাউন অস্বীকার করে জাদুকরদের সমবেত করে। মূসা (আ.)-এর লাঠি জাদুকরদের সমস্ত ইন্দ্রজাল গিলে ফেলে। ফলে জাদুকররা তৎক্ষণাৎ সিজদায় পড়ে ঈমান আনে।
- লোহিত সাগর পাড়ি ও ফেরাউনের সলিল সমাধি:
ফেরাউনের নির্যাতনের মুখে রাতে বনী ইসরাঈলকে নিয়ে রওনা হন। সামনে সাগর এবং পেছনে ফেরাউনের বাহিনী উপস্থিত হলে লাঠির আঘাতে সাগরে বারোটি শুষ্ক পথ তৈরি হয়। বনী ইসরাঈল নিরাপদে পার হয় এবং ফেরাউন সৈন্যসহ ডুবে মারা যায়।
- তাওরাত লাভ ও বনী ইসরাঈলের পথভ্রষ্টতা:
তূর পাহাড়ে চল্লিশ দিন ইবাদতের পর তাওরাত ফলক লাভ করেন। কিন্তু ফিরে এসে দেখেন সামেরীর চক্রান্তে বনী ইসরাঈল গোবৎস পূজায় লিপ্ত। পরে অবাধ্যতার কারণে বনী ইসরাঈল ৪০ বছর তিয়াহ প্রান্তরে উদ্দেশ্যহীন ঘুরপাক খায়।
হযরত মূসা (আ.)-এর অমর দাওয়াতী কৌশল (أسلوب دعوته الخالدة)
- কোমল ভাষা ও মার্জিত আচরণ (القول اللين):
আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সর্বনিকৃষ্ট জালিম ফেরাউনের কাছে পাঠানোর সময়ও মূসা ও হারূন (আ.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন:
«فَقُولا لَهُ قَوْلاً لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ»
অর্থ: “তোমরা তার সাথে নরম ও কোমল ভাষায় কথা বলো, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় পাবে।” (সূরা ত্বাহা: ৪৪)।
- দোয়া ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি গ্রহণ:
তিনি কঠিন দায়িত্ব পালনের পূর্বে আল্লাহর কাছে মানসিক প্রশান্তি ও বাক্যস্ফূর্তির জন্য দোয়া করেন:
«قَالَ رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي»
অর্থ: “তিনি বললেন: হে আমার পালনকর্তা! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন, আমার কাজ সহজ করে দিন এবং আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।” (সূরা ত্বাহা: ২৫-২৮)।
- অকাট্য প্রমাণ ও বাস্তব মু’জিযা প্রদর্শন:
তিনি তাত্ত্বিক আলোচনার সাথে সাথে চোখের সামনে লাঠি ও শুভ্র হাতের মু’জিযা দেখিয়ে সত্যকে অপরাজেয় প্রমাণিত করেন।
- চরম বিপদে আল্লাহর ওপর অটল তাওয়াক্কুল:
যখন পেছনে ঘাতক ফেরাউন এবং সামনে উত্তাল সাগর, বনী ইসরাঈল আতঙ্কে চিৎকার করে বলল: “আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম!” মূসা (আ.) পর্বতসম দৃঢ়তায় উত্তর দিলেন:
«قَالَ كَلاَّ ۖ إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ»
অর্থ: “তিনি বললেন: কখনই নয়! নিশ্চয়ই আমার সাথে আমার প্রতিপালক আছেন, তিনি আমাকে অবশ্যই পথ দেখাবেন।” (সূরা আশ-শুয়ারা: ৬২)।
- নিপীড়িত মানবতার মুক্তি আন্দোলন:
তিনি কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং একটি গোটা নিপীড়িত জাতিকে অত্যাচারীর দাসত্ব থেকে মুক্ত করার রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন।
উপসংহার
হযরত মূসা (আ.)-এর দাওয়াতী দর্শন প্রতিটি যুগের দাঈ ও ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য বাতিলের সাথে মুকাবিলা ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার চিরন্তন আদর্শ।
٥- تحدث عن المشاكل التى واجهها سيدنا ونبينا محمد صلى الله عليه وسلم فى دعوة اهل مكة المكرمة-
মক্কাবাসীদের মাঝে দা’ওয়াত প্রচার করতে গিয়ে আমাদের নবি হযরত মুহাম্মদ (স) যে সব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন তা আলোচনা কর।
ভূমিকা
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) যখন নবুওয়াত লাভ করেন, তখন সমগ্র মক্কা ছিল জাহেলিয়াতের ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত—মূর্তিপূজা, ব্যভিচার, কন্যাশিশু হত্যা, জুলুম ও বংশীয় অহংকারে জর্জরিত। সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি যখন এক আল্লাহর তাওহীদের দাওয়াত দিলেন, তখন তাঁর আজীবনের পরম বিশ্বস্ত মক্কাবাসী তাঁর চরম শত্রুতে পরিণত হলো। দীর্ঘ তেরো বছর মক্কায় দাওয়াত দিতে গিয়ে তিনি যেসব অবর্ণনীয় সংকট ও বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তা ইতিহাসে বিরল।
মক্কায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মুখীন হওয়া প্রধান প্রধান সমস্যা ও সংকটসমূহ
- মানসিক নির্যাতন ও কুৎসা রটনা (الحرب النفسية):
মক্কার কুরাইশরা সত্যের আলো প্রতিহত করতে চরিত্রহনন ও মিথ্যা অপবাদের ঝড় তোলে:
- তাঁকে ‘মাজনূন’ বা পাগল বলে আখ্যায়িত করা হয় ({وَقَالُوا يَا أَيُّهَا الَّذِي نُزِّلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ إِنَّكَ لَمَجْنُونٌ})।
- তাঁকে ‘সাহির’ (জাদুকর) এবং ‘কাযযাব’ (চরম মিথ্যাবাদী) বলে অপপ্রচার করা হতো।
- তাঁকে অলীক কল্পনাকারী ‘কবি’ বা গণক আখ্যা দেওয়া হয়। হজ্জের মৌসুমে মক্কার প্রবেশদ্বারে লোক বসিয়ে বহিরাগতদের রাসূল (সা.)-এর কাছে যেতে নিষেধ করা হতো।
- শারীরিক আক্রমণ ও হত্যাচেষ্টা:
নবীজী (সা.)-এর ব্যক্তিগত জীবনের ওপর বারবার বর্বর আক্রমণ চালানো হয়:
- কাবা প্রাঙ্গণে সিজদারত অবস্থায় উটের পচা নাড়িভুঁড়ি ও বর্জ্য তাঁর পিঠে চাপিয়ে দেওয়া হয় (আবু জাহেল ও তার সঙ্গীদের চক্রান্তে)। মা ফাতেমা (রা.) কেঁদে কেঁদে তা অপসারণ করেন।
- নামাযরত অবস্থায় উকবা ইবনে আবি মুয়াইত চাদর পেঁচিয়ে তাঁর শ্বাসরোধ করে হত্যার অপচেষ্টা চালায়, হযরত আবু বকর (রা.) এসে তাঁকে রক্ষা করেন।
- চলার পথে ও দরজার সামনে বিষাক্ত কাঁটা ও আবর্জনা ফেলে রাখা হতো (উম্মে জামিল ও আবু লাহাবের দ্বারা)।
- সর্বশেষ ‘দারুন নাদওয়া’য় সকল গোত্রের তরুণেরা মিলে তাঁকে একযোগে হত্যার ষড়যন্ত্র করে, যার প্রেক্ষিতে আল্লাহর নির্দেশে তিনি মদীনায় হিজরত করেন।
- সাহাবায়ে কেরামের ওপর অমানুষিক নিপীড়ন:
রাসূল (সা.)-এর চোখের সামনে তাঁর প্রিয় অনুসারীদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হতো, যা তাঁর জন্য ছিল মানসিক যন্ত্রণার অন্যতম কারণ:
- হযরত বেলাল (রা.)-কে তপ্ত মরুভূমির বালুর ওপর শুইয়ে বুকের ওপর ভারী পাথর চাপা দেওয়া হতো।
- হযরত খাব্বাব (রা.)-কে জ্বলন্ত কয়লার ওপর শুইয়ে দেওয়া হতো, পিঠের চর্বি গলে সে কয়লা নিভত।
- হযরত সুমাইয়্যা ও ইয়াসির (রা.)-কে বর্বর নির্যাতন করে শহীদ করা হয় (ইসলামের প্রথম শহীদ পরিবার)। এ পরিস্থিতির কারণে তিনি সাহাবীদের হাবশায় হিজরতের নির্দেশ দেন।
- সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট (شعب أبي طالب):
নবুওয়াতের ৭ম হিজরী পূর্ব সনে কুরাইশরা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করার লিখিত চুক্তি করে। টানা তিনটি বছর রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণ ‘শে’আবে আবু তালিবে’ অবরুদ্ধ থাকেন। খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে শিশুরা ক্ষুধার জ্বালায় চিৎকার করত, সাহাবীগণ গাছের পাতা ও শুকনো চামড়া চিবিয়ে জীবন ধারণ করেছিলেন।
- আপসকামিতা ও রাজনৈতিক প্রলোভন:
কুরাইশ নেতা উতবা ইবনে রাবিয়া রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে প্রস্তাব দেয়: আপনি যদি সম্পদ চান তবে মক্কার সবচেয়ে ধনী বানিয়ে দেব, সম্মান চাইলে বাদশাহ বানাব, কোনো সুন্দরী নারী চান তবে বিয়ে দেব—তবুও দাওয়াত বন্ধ করুন। রাসূল (সা.) সূরা ফুসসিলাতের আয়াত তিলাওয়াত করে তা প্রত্যাখ্যান করেন। চাচা আবু তালিবের কাছে তিনি ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন:
«وَاللَّهِ يَا عَمُّ! لَوْ وَضَعُوا الشَّمْسَ فِي يَمِينِي، وَالقَمَرَ فِي يَسَارِي عَلَى أَنْ أَتْرُكَ هَذَا الأَمْرَ حَتَّى يُظْهِرَهُ اللَّهُ أَوْ أَهْلِكَ فِيهِ، مَا تَرَكْتُهُ»
অর্থ: “আল্লাহর শপথ চাচাজান! তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদ এনে দেয় তবুও আমি এ দাওয়াতের পথ ত্যাগ করব না, যতক্ষণ না আল্লাহ একে বিজয়ী করেন অথবা আমি ধ্বংস হয়ে যাই।”
- শোকের বছর ও তায়েফের চরম হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি:
একই বছরে পরম স্নেহময় চাচা আবু তালিব ও প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর ওফাত ঘটে (عام الحزن বা শোকের বছর)। মক্কায় পথ রুদ্ধ দেখে আশার আলো নিয়ে তায়েফে দাওয়াত দিতে যান। কিন্তু তায়েফবাসীরা বখাটে যুবকদের লেলিয়ে দেয়, যারা পাথর নিক্ষেপ করে রাসূল (সা.)-এর পবিত্র শরীর রক্তাক্ত করে দেয় এবং তাঁর জুতো মোবারক রক্তে রঞ্জিত হয়। পাহাড়ের ফেরেশতা এসে ধ্বংসের প্রস্তাব দিলেও তিনি রহমতের নবী হিসেবে তাদের হেদায়েতের দোয়া করেন।
উপসংহার
এতসব বাধা, জুলুম ও অমানবিক সংকটের মুখেও রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ক্ষমার মূর্ত প্রতীক ও সত্যের পাহাড়। তাঁর এ পর্বতসম ধৈর্য ও ত্যাগের ফলেই পরবর্তীতে মক্কা বিজয় সম্পন্ন হয় এবং জাহেলিয়াত বিলুপ্ত হয়ে তাওহীদের বিজয় নিশান উড্ডীন হয়।
٦- اذكر أهداف دعوة الانبياء عليهم السلام وموضوعاتها بالادلة النقلية-
নবি (আ)-গণের দা’ওয়াতের উদ্দেশ্য ও আলোচ্য বিষয় দলিলসহ আলোচনা কর।
ভূমিকা
মানবজাতির সৃষ্টি কোনো অর্থহীন বা উদ্দেশ্যহীন ঘটনা নয়। মানুষকে তার সৃষ্টির মূল লক্ষ্য সম্পর্কে সচেতন করা এবং সঠিক পথের সন্ধান দেওয়াই ছিল যুগে যুগে নবী-রাসূলগণের আগমনের উদ্দেশ্য। তাঁদের দাওয়াতী মিশন ছিল সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও শাশ্বত আলোচ্য বিষয়ে সুবিন্যস্ত।
নবী-রাসূলগণের দাওয়াতের মূল উদ্দেশ্যসমূহ (أهداف دعوة الأنبياء)
- এক আল্লাহর ইবাদত ও তাগূত বর্জন:
নবীগণের প্রধানতম উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সকল মিথ্যা খোদাত্ব ও তাগূতের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে একমাত্র আল্লাহর গোলামীতে আবদ্ধ করা। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
«وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ»
অর্থ: “আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগূতকে বর্জন করো।” (সূরা আন-নাহল: ৩৬)।
- সুসংবাদ দান ও সতর্কীকরণ (البشارة والنذارة):
মুমিনদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ এবং অবাধ্য কাফিরদের জন্য জাহান্নামের শাস্তির সতর্কবার্তা প্রদান করা:
«رُّسُلاً مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلاَّ يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ»
অর্থ: “সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণের পর আল্লাহর কাছে মানুষের কোনো অজুহাত না থাকে।” (সূরা আন-নিসা: ১৬৫)।
- আত্মশুদ্ধি ও চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধন (التزكية والتربية):
মানুষের অন্তরকে হিংসা, অহংকার ও পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করে নৈতিকতার শীর্ষ শিখরে উন্নীত করা:
«يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ»
অর্থ: “যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের আত্মশুদ্ধি করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন।” (সূরা আল-জুমুআ: ২)।
- সমাজে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা:
ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় জীবনে জুলুমের অবসান ঘটিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সুবিচার নিশ্চিত করা:
«لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ»
অর্থ: “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে কিতাব ও মীযান (ন্যায়দণ্ড) অবতীর্ণ করেছি যাতে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে।” (সূরা আল-হাদীদ: ২৫)।
নবী-রাসূলগণের দাওয়াতের মৌলিক আলোচ্য বিষয়সমূহ (موضوعات الدعوة)
সকল নবী-রাসূলের দাওয়াত মূলত চারটি মৌলিক বিষয়ের ওপর আবর্তিত ছিল:
- আল-আক্বাইদ (العقائد – ঈমান ও বিশ্বাস):
- তাওহীদ: আল্লাহর রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও আসমা ওয়াস সিফাতের একত্ববাদ।
- রিসালাত: আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী ও নবীগণের আনুগত্যের অপরিহার্যতা।
- মালাইকা ও আসমানী কিতাব: অদৃশ্য ফেরেশতাকুল ও পূর্ববর্তী কিতাবের ওপর বিশ্বাস।
- আখেরাত: কিয়ামত, কবরের জীবন, হাশরের ময়দানে পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ, জান্নাত ও জাহান্নামের নিশ্চিত বিশ্বাস।
- আল-ইবাদাত (العبادات – বন্দেগি ও উপাসনা):
নামায কায়েম করা, যাকাত প্রদান, রোযা পালন, কুরবানী এবং আল্লাহর স্মরণ। ইরশাদ হয়েছে: «وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ وَإِقَامَ الصَّلاةِ وَإِيتَاءَ الزَّكَاةِ» (সূরা আল-আম্বিয়া: ৭৩)।
- আল-মুয়ামালাত ও সমাজব্যবস্থা (المعاملات):
অর্থনৈতিক লেনদেনে সততা, মাপে কম না দেওয়া (শুআইব আ.-এর দাওয়াত), এতিমের মাল আত্মসাৎ না করা, ব্যভিচার ও অশ্লীলতা বর্জন (লূত আ.-এর দাওয়াত) এবং অত্যাচারী শাসকের প্রতিরোধ।
- আল-আখলাক ও শিষ্টাচার (الأخلاق الفاضلة):
পিতা-মাতার সেবা, ওয়াদা পূরণ, সত্যবাদিতা, ইনসাফ ও দুর্বলদের প্রতি দয়া প্রদর্শন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ الأَخْلاَقِ» (নিশ্চয়ই আমি প্রেরিত হয়েছি সৎ চরিত্রের পূর্ণতা সাধনের জন্য)।
উপসংহার
নবী-রাসূলগণের দাওয়াতের উদ্দেশ্য ও বিষয়বস্তু ছিল সম্পূর্ণ সার্বজনীন ও শাশ্বত, যা মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মর্যাদায় সমাসীন করে আল্লাহর সন্তুষ্টির দ্বারে পৌঁছে দেয়।
٧- بين حكمة الدعوة وصفات الدعاة على ضوء القرآن العظيم-
আল-কুরআনের আলোকে দা’ওয়াতের কৌশল ও দা’য়ীর গুণাবলি আলোচনা কর।
ভূমিকা
ইসলামী দাওয়াত কোনো এলোমেলো বা আবেগী প্রচার কার্যক্রম নয়; বরং এটি একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত, বিজ্ঞানসম্মত ও হিকমতপূর্ণ পবিত্র আমানত। পবিত্র কুরআনুল কারীমে দাওয়াতের অন্তর্নিহিত কৌশল (حكمة الدعوة) এবং একজন সফল দাঈর চরিত্র ও গুণাবলির পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা বর্ণিত হয়েছে।
আল-কুরআনের আলোকে দাওয়াতের কৌশল বা হিকমত (حكمة الدعوة)
পবিত্র কুরআনে দাওয়াতের মূলনীতি বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা সার্বজনীন নির্দেশ দিয়েছেন:
«ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ»
অর্থ: “আপনি আপনার প্রতিপালকের পথের দিকে আহ্বান করুন হিকমত (প্রজ্ঞা) ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন সর্বোত্তম পন্থায়।” (সূরা আন-নাহল: ১২৫)।
এ আয়াতের আলোকে মুফাসসিরীন ও উলামায়ে কেরাম দাওয়াতের তিনটি স্তরের কৌশল নির্ধারণ করেছেন:
- হিকমত (الحكمة – প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি):
যারা গভীর চিন্তাশীল, দার্শনিক ও উচ্চশিক্ষিত সমাজ, তাদের সামনে কুরআন-সুন্নাহর অকাট্য যুক্তি, বৈজ্ঞানিক সত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক দলীল উপস্থাপন করতে হবে। স্থান, কাল ও পাত্র বিবেচনা করে কথা বলাই হলো হিকমত।
- মাওইযায়ে হাসানাহ (الموعظة الحسنة – উত্তম ও হৃদয়স্পর্শী উপদেশ):
সাধারণ মানুষের মানসিকতা যুক্তি-তর্কের চেয়ে স্নেহ, মমতা ও আন্তরিক নসীহতের দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়। তাই জাহান্নামের ভীতি এবং জান্নাতের নেয়ামতের কথা কোমল ও দরদমাখা কণ্ঠে তুলে ধরা।
- মুজাদালাহ বিল্লাতী হিয়া আহসান (المجادلة بالتي هي أحسن – সর্বোত্তম পন্থায় বিতর্ক):
যদি প্রতিপক্ষ একগুঁয়েমি বা বিতর্ক করে, তবে তাদের সাথে কোনো প্রকার গালিগালাজ, ক্রোধ বা উপহাস ছাড়া অত্যন্ত শান্ত, শালীন ও অকাট্য প্রমাণের সাথে যুক্তিখণ্ডন করা।
আল-কুরআনের আলোকে দাঈর গুণাবলি (صفات الدعاة)
কুরআনের নির্দেশনানুযায়ী একজন সফল দাঈর মধ্যে নিম্নোক্ত গুণাবলি থাকা অপরিহার্য:
- ইখলাস বা নিঃস্বার্থ নিষ্ঠা (الإخلاص لله):
দাওয়াত কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। এতে কোনো পার্থিব স্বার্থ, অর্থ বা পদমর্যাদার লোভ থাকা চলবে না। সকল নবী বলতেন:
«وَيَا قَوْمِ لا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مَالاً ۖ إِنْ أَجْرِيَ إِلاَّ عَلَى اللَّهِ»
অর্থ: “হে আমার জাতি! আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে কোনো ধন-সম্পদ চাই না; আমার প্রতিদান তো কেবল আল্লাহরই কাছে।” (সূরা হূদ: ২৯)।
- গভীর জ্ঞান ও দূরদর্শিতা (العلم والبصيرة):
জ্ঞাত বিষয় ছাড়া না জেনে মনগড়া দাওয়াত দেওয়া নিষেধ। আল্লাহ বলেন:
«قُلْ هَٰذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ ۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي»
অর্থ: “বলুন: এটিই আমার পথ, আমি এবং আমার অনুসারীগণ সুস্পষ্ট দূরদর্শিতা ও জ্ঞানের ভিত্তিতে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাই।” (সূরা ইউসুফ: ১০৮)।
- কথা ও কাজের চমৎকার মিল (مطابقة القول للعمل):
দাঈ নিজে যা আমল করবেন না তা অন্যকে বলা মহাপাপ:
«يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لا تَفْعَلُونَ»
অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা যা করো না তা কেন বলো? তোমরা যা করো না তা বলা আল্লাহর নিকট অত্যন্ত ক্রোধের বিষয়।” (সূরা আস-সফ: ২-৩)।
- কোমলতা, দয়া ও বিনম্র আচরণ (اللين والرحمة):
দাঈর আচরণ হবে স্নেহময় ও অমায়িক। আল্লাহ তাআলা রাসূল (সা.)-কে লক্ষ্য করে ইরশাদ করেন:
«فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ ۖ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ»
অর্থ: “আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলেন; যদি আপনি কঠোরভাষী ও কঠোর হৃদয়ের হতেন তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।” (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)।
- ধৈর্য ও অবিচলতা (الصبر والتحمل):
দাওয়াতের পথে নির্যাতন ও উপহাস অবধারিত। তাই দাঈকে হতে হবে পাহাড়সম ধৈর্যশীল: «وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا يَقُولُونَ وَاهْجُرْهُمْ هَجْرًا جَمِيلاً» (সূরা আল-মুযযাম্মিল: ১০)।
- উত্তম চরিত্র ও ক্ষমাশীলতা:
মন্দের জবাব ভালো দিয়ে দেওয়া: «ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ» (সূরা ফুসসিলাত: ৩৪)।
উপসংহার
হিকমতপূর্ণ কৌশল ও প্রশংসনীয় চরিত্রের অধিকারী দাঈর দাওয়াত মানুষের মনকে বিগলিত করে সত্যের সুবাস ছড়িয়ে দেয়।
٨- تحدث عن أسلوب دعوة سيدنا يوسف عليه السلام مع بیان حياته المباركة إيجازا-
হযরত ইউসুফ (আ) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী আলোচনাসহ তাঁর (আ) দা’ওয়াতের পদ্ধতি বর্ণনা কর।
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনে যে নবীর জীবনকাহিনীকে ‘আহসানুল ক্বাসাস’ (أحسن القصص – সর্বশ্রেষ্ঠ কাহিনী) বলে ভূষিত করা হয়েছে, তিনি হলেন হযরত ইউসুফ (আ.)। ষড়যন্ত্র, দাসত্ব, অপবাদ ও কারাগারের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে রাজপ্রাসাদের শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার প্রতিটি ধাপে তিনি তাওহীদের দাওয়াতের যে প্রজ্ঞাপূর্ণ রূপরেখা তুলে ধরেছেন, তা চিরভাস্বর।
হযরত ইউসুফ (আ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত
- শৈশবের স্বপ্ন ও ভাইদের ঈর্ষা:
হযরত ইউসুফ (আ.) হযরত ইয়াকূব (আ.)-এর প্রিয় পুত্র ছিলেন। তিনি স্বপ্নে এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্রকে তাঁর প্রতি সিজদারত দেখেন। এতে তাঁর সৎ ভাইয়েরা ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে অন্ধকূপে ফেলে দেয় এবং পিতাকে নেকড়ে বাঘে খাওয়ার মিথ্যা খবর দেয়।
- দাস হিসেবে বিক্রি ও মিসরের আযীযের ঘরে আশ্রয়:
এক কাফেলা তাঁকে কূপ থেকে উদ্ধার করে মিসরের বাজারে নগণ্য মূল্যে বিক্রি করে দেয়। মিসরের অর্থমন্ত্রী (আযীযে মিসর) তাঁকে দত্তক পুত্রের মতো নিজ প্রাসাদে লালন-পালন করেন।
- যুলায়খার ফিতনা ও আত্মমর্যাদার পরীক্ষা:
যৌবনে পদার্পণ করলে আযীযের স্ত্রী যুলায়খা তাঁর প্রেমে অন্ধ হয়ে অসৎকাজের প্রস্তাব দেয়। তিনি আল্লাহর ভয়ে অটল থেকে বললেন: «مَعَاذَ اللَّهِ ۖ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ» (আল্লাহর আশ্রয় চাই! নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রভু, তিনি আমাকে উত্তম আশ্রয় দিয়েছেন)। নিজের পবিত্রতা প্রমাণ হলেও যুলায়খার প্ররোচনায় তাঁকে অন্যায়ভাবে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়।
- কারাবাস ও স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা:
কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি সত্যের দাওয়াত দেন। পরবর্তীতে মিসরের বাদশাহর দেখা এক অদ্ভুত স্বপ্ন (সাতটি মোটাতাজা গাভীকে সাতটি জীর্ণ গাভী খাচ্ছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও সাতটি শুষ্ক শীষ)-এর নির্ভুল ব্যাখ্যা ও ১৪ বছরের খাদ্য পরিকল্পনার রূপরেখা প্রদান করেন।
- মিশরের অর্থমন্ত্রী পদে আসীন ও দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা:
বাদশাহ তাঁর নির্দোষিতা ও অসাধারণ প্রজ্ঞায় মুগ্ধ হয়ে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে সমগ্র মিসরের অর্থনৈতিক দায়িত্ব ও শাসনভার অর্পণ করেন। তিনি সুকৌশলে সাত বছরের দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা করেন।
- ভাইদের ক্ষমা ও পরিবারের পুনর্মিলন:
খাদ্য সংগ্রহে আসা ভাইদের পরিচয় প্রকাশ পেলে তিনি কোনো প্রতিশোধ না নিয়ে বললেন: «لا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ ۖ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ» (আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন)। পিতা-মাতাকে মিসরে নিয়ে আসেন এবং তাঁর শৈশবের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়।
হযরত ইউসুফ (আ.)-এর দাওয়াতী পদ্ধতি ও কৌশল (أسلوب دعوته)
হযরত ইউসুফ (আ.)-এর দাওয়াতী কার্যপদ্ধতি ছিল চরম মনস্তাত্ত্বিক ও যুগোপযোগী:
- সুযোগের সদ্ব্যবহার (اغتنام الفرصة المناسبة):
কারাগারে দুই সহবন্দী যখন নিজেদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইল, তিনি বুঝতে পারলেন এখন তাদের অন্তর তাঁর প্রতি সম্পূর্ণ ঝুঁকে আছে। তিনি সরাসরি স্বপ্নের ব্যাখ্যা না দিয়ে প্রথমে তাদের দৃষ্টি তাওহীদের দিকে আকৃষ্ট করলেন।
- যৌক্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন উত্থাপন:
তিনি বন্দীদের বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা জাগ্রত করতে বললেন:
«يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَأَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ»
অর্থ: “হে কারাগারের সঙ্গীদ্বয়! বহুসংখ্যক ভিন্ন ভিন্ন প্রভু শ্রেয়, নাকি মহা পরাক্রমশালী এক আল্লাহ?” (সূরা ইউসুফ: ৩৯)।
- পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যের সাথে যোগসূত্র স্থাপন:
তিনি নিজেকে একক কেউ দাবি না করে সত্যের চিরন্তন ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত করে বললেন: «وَاتَّبَعْتُ مِلَّةَ آبَائِي إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ» (আমি আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকূবের মিল্লাত অনুসরণ করি)।
- সততা ও আমানতদারিতা প্রদর্শন (الدعوة بالقدوة والأمانة):
তিনি মুখে দাওয়াত দেওয়ার পূর্বে নিজ চরিত্র ও বিশ্বস্ততার মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বন্দীরা নিজেরাই সাক্ষ্য দিয়েছিল: «إِنَّا نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ» (নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাচ্ছি)।
- প্রতিশোধহীন মহানুভবতা ও ক্ষমা প্রদর্শন:
ক্ষমতার শীর্ষে বসেও তিনি চরম শত্রুদের বিনাশর্তে ক্ষমা করে প্রমাণ করেছেন যে, দাঈর অন্তর হয় আকাশের মতো উদার।
উপসংহার
হযরত ইউসুফ (আ.)-এর দাওয়াতী রূপরেখা প্রমাণ করে যে, প্রতিকূল পরিবেশেও চারিত্রিক দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল বজায় রাখলে সত্যের বিজয় সুনিশ্চিত হয়।
مجموعة (ب) : সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি [মান: ৫ × ৪ = ২০]
[দ্রষ্টব্য: যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে]
٩- عرف الكرامة- اشرح “كرامة الأولياء حق”-
كرامة এর পরিচয় দাও। ব্যাখ্যা কর— “আল্লাহর ওলিদের কারামাত সত্য”।
উত্তর
ইসলামী আকিদাশাস্ত্রে অলৌকিক বিষয়াদির অন্যতম একটি রূপ হলো কারামাত (الكرامة)।
কারামাতের পরিচয়
১. আভিধানিক অর্থ: ‘কারামাত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো সম্মান, মর্যাদা, বুযুর্গি বা আভিজাত্য (الشرف والفضل)।
২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: আকাইদবিদগণের মতে:
«أَمْرٌ خَارِقٌ لِلْعَادَةِ يَظْهَرُ عَلَى يَدِ عَبْدٍ صَالِحٍ مُتَّبِعٍ لِلشَّرِيعَةِ، غَيْرِ مُقْتَرِنٍ بِدَعْوَى النُّبُوَّةِ»
অর্থ: “নবুওয়াতের দাবি ব্যতীত শরীয়তের পূর্ণ অনুসারী কোনো খাঁটি পরহেযগার নেককার বান্দার (ওলি) মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা যে স্বভাববিরুদ্ধ বা অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ করেন, তাকে কারামাত বলে।”
“কারামাতুল আউলিয়া হাক্কুন” (كرامة الأولياء حق)-এর ব্যাখ্যা
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সকল ইমাম ও আকিদাবিদ একমত যে, ওলিগণের কারামাত সত্য ও বাস্তব। ইমাম তাহাবী (রহ.) ‘আকীদাতুত তাহাবীয়্যাহ’ গ্রন্থে বলেন: «وَنُؤْمِنُ بِمَا جَاءَ مِنْ كَرَامَاتِهِمْ» (এবং আমরা ওলিগণের যেসব সহীহ কারামাত বর্ণিত হয়েছে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করি)। মু’তাযিলা সম্প্রদায় কারামাতকে অস্বীকার করেছিল, কিন্তু তাদের অভিমত বাতিল। কারামাত সত্য হওয়ার দলীলসমূহ:
- পবিত্র কুরআন থেকে প্রমাণ:
- আসহাবে কাহাফের ঘটনা: গুহাবাসী নেককার যুবকেরা কোনো নবী ছিলেন না; অথচ আল্লাহ তাঁদের কুকুরসহ কোনো পানাহার ছাড়া ৩০৯ বছর জাগ্রতের মতো অক্ষত অবস্থায় জীবিত রেখেছিলেন।
- হযরত মরিয়ম (আ.)-এর ঘটনা: মেহরাবে কোনো মৌসুম ছাড়াই তাঁর কাছে ফলমূল আসত। যাকারিয়া (আ.) জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন: «هُوَ مِنْ عِندِ اللَّهِ» (তা আল্লাহর নিকট থেকে)।
- আসিফ ইবনে বারখিয়ার ঘটনা: হযরত সুলাইমান (আ.)-এর এক জ্ঞানী সাহাবী চোখের পলক ফেলার পূর্বেই সাবা দেশ থেকে রাণী বিলকিসের ভারী সিংহাসন হাজির করেছিলেন ({أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَن يَرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ})।
- সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের ঘটনা:
হযরত উমর (রা.) মদীনার মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুৎবা দেওয়ার সময় শত শত মাইল দূরে পারস্যের যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা মুসলিম সেনাপতি সারিয়াকে নির্দেশ দিয়েছিলেন: «يَا سَارِيَةُ الْجَبَلَ الْجَبَلَ» (হে সারিয়া! পাহাড়ের দিকে যাও), যা সারিয়া ময়দান থেকে স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিলেন (বায়হাকী)।
অতএব, ওলির কারামাত মূলত তাঁর অনুসৃত নবীরই মু’জিযার সত্যতা প্রমাণ করে। তাই ওলিদের কারামাত অকাট্য সত্য।
١٠- ما حاجة إرسال الأنبياء والرسل عليهم السلام إلى الناس؟ بين مختصرًا-
মানবজাতির জন্য নবি ও রসুল প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা কী? সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা কর।
উত্তর
মানবজাতির ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন অনন্ত মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী ও রাসূল প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা ছিল অপরিহার্য। এর প্রধান কারণসমূহ নিম্নরূপ:
- স্রষ্টার সুনির্দিষ্ট পরিচয় ও গুণাবলি জানা:
মানুষের সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি এটুকু অনুধাবন করতে পারে যে এ মহাবিশ্বের একজন স্রষ্টা আছেন; কিন্তু সেই স্রষ্টার নাম কী, তাঁর সিফাত কেমন এবং তাঁর সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি কীসে—তা মানববুদ্ধি দ্বারা জানা অসম্ভব। এজন্য নবীগণের আগমন আবশ্যক ছিল।
- ইবাদতের সহীহ পদ্ধতি শিক্ষা দান:
আল্লাহর বন্দেগি কীভাবে করতে হবে—নামাযের ওয়াক্ত, রাকাত, হজ্জ ও যাকাতের নিয়ম ইত্যাদি নবী-রাসূলগণ সরাসরি আল্লাহ তাআলা থেকে শিখে উম্মতকে হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়েছেন।
- অদৃষ্টের বিষয়াবলির (গায়েব) জ্ঞান প্রদান:
মৃত্যুর পরবর্তী জীবন, কবরের সওয়াল-জওয়াব, কিয়ামত, মীযান, পুলসিরাত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ নবীগণ ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে জানা সম্ভব নয়।
- কিয়ামতের দিন মানুষের অজুহাত খণ্ডন করা:
যাতে মানুষ কিয়ামতে বলতে না পারে যে, আমরা সঠিক পথ জানতাম না। আল্লাহ বলেন:
«رُّسُلاً مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلاَّ يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ»
অর্থ: “সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো ওজর-আপত্তি না থাকে।” (সূরা আন-নিসা: ১৬৫)।
- জীবন্ত বাস্তব চারিত্রিক মডেল উপস্থাপন:
কেবল নীতিবাক্য যথেষ্ট নয়; মানুষ যেন স্বচক্ষে দেখে বুঝতে পারে যে শরীয়তের নির্দেশনাবলি বাস্তব জীবনে পালনযোগ্য, সেজন্য নবীগণ ছিলেন পরিপূর্ণ আদর্শ প্রতীক।
١١- بين أهمية الدعوة الإسلامية فى ضوء القرآن والسنة-
আল-কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামি দা’ওয়াতের গুরুত্ব আলোচনা কর।
উত্তর
ইসলাম একটি প্রচারমুখী ও সর্বজনীন দ্বীন। দাওয়াত ছাড়া ইসলামের প্রসার ও টিকে থাকা অসম্ভব। কুরআন ও হাদীসে ইসলামী দাওয়াতকে ঈমানের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআনের আলোকে দাওয়াতের গুরুত্ব
- উম্মতে মুহাম্মদীর শ্রেষ্ঠত্বের মূল ভিত্তি:
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে ঘোষণা করেছেন কেবল দাওয়াতী দায়িত্বের কারণে:
«كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ»
অর্থ: “তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে; তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে, অন্যায় কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখবে।” (সূরা আলে ইমরান: ১১০)।
- দাওয়াত হলো সর্বোত্তম বাক্য:
«وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلاً مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا»
অর্থ: “তার কথার চেয়ে কার কথা উত্তম হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে এবং সৎকাজ করে?” (সূরা ফুসসিলাত: ৩৩)।
সুন্নাহর আলোকে দাওয়াতের গুরুত্ব
- প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর পৌঁছানোর নির্দেশ:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজ্জের ভাষণে এবং সহীহ বুখারীতে ইরশাদ করেছেন:
«بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً»
অর্থ: “আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও মানুষের কাছে পৌঁছে দাও।” (সহীহ বুখারী: ৩৪৬১)।
- দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদের চেয়েও উত্তম:
খায়বারের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন:
«فَوَاللَّهِ لأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلاً وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ»
অর্থ: “আল্লাহর শপথ! তোমার মাধ্যমে যদি একজন মানুষকেও আল্লাহ হেদায়েত দান করেন, তবে তা তোমার জন্য মূল্যবান লাল উটের চেয়েও উত্তম।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
- গযব থেকে সুরক্ষার ঢাল:
হাদীসে সতর্ক করা হয়েছে যে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ ছেড়ে দিলে আল্লাহ এমন গযব পাঠাবেন যে, দোয়া করলেও তা কবুল হবে না (তিরমিযী)।
١٢- ما قولك فى— “عصمة الأنبياء عليهم السلام”؟ بين-
“আল্লাহর নবিগণ (আ) নিষ্পাপ”—এ ব্যাপারে তোমার মতামত কী? বর্ণনা কর।
উত্তর
ইসলামী আকিদার অন্যতম মৌলিক বিষয় হলো ‘ইসমাতুল আম্বিয়া’ (عصمة الأنبياء عليهم السلام) বা নবীগণের নিষ্পাপত্ব। এ ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সুস্পষ্ট ও অকাট্য মতামত নিম্নে ব্যক্ত করা হলো:
ইসমাতের পরিচয়
আভিধানিকভাবে ‘ইসমাত’ অর্থ রক্ষা করা বা পবিত্র রাখা। শরীয়তের পরিভাষায়: মহান আল্লাহ তাআলা নবী ও রাসূলগণকে যাবতীয় শিরক, কুফর, কবিরা গুনাহ এবং হীন পাপ কাজ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও মুক্ত রেখেছেন।
আমার মতামত ও আহলুস সুন্নাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত
আমার সুদৃঢ় মতামত হলো—আল্লাহর সকল নবী ও রাসূল সর্বসম্মতভাবে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও পুতপবিত্র (معصومون)। এর বিবরণ নিম্নরূপ:
- কুফর ও শিরক থেকে মুক্তি:
নবীগণ নবুওয়াত লাভের পূর্বে ও পরে সমগ্র জীবনে মুহূর্তের জন্যও কোনো কুফর বা শিরকে লিপ্ত হননি।
- কবিরা গুনাহ থেকে পবিত্রতা:
সকল নবী ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত সর্বপ্রকার কবিরা গুনাহ (যেমন মিথ্যা, ব্যভিচার, খুন, আত্মসাৎ) থেকে নবুওয়াত লাভের আগে ও পরে সর্বসম্মতভাবে পুতপবিত্র।
- ওহী প্রচার ও তাবলীগে নিষ্পাপত্ব:
আল্লাহর শরীয়ত ও ওহী মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নবীগণ শতভাগ নির্ভুল। এতে কোনো প্রকার ভুল, বিস্মৃতি বা পরিবর্তন ঘটা অসম্ভব।
- সগিরা গুনাহ ও যাল্লাতের ব্যাখ্যা:
নবীগণের দ্বারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তাকে ‘যাল্লাত’ (زلات) বা ‘তারকুল আওলা’ (ترك الأولى) বলা হয়—অর্থাৎ দুটি ভালো কাজের মধ্যে উত্তমটি ছেড়ে অনুত্তমটি করা। তাঁদের দ্বারা যদি অনিচ্ছাকৃত কোনো মানবিক ত্রুটি ঘটেও থাকে, তবে আল্লাহ তাআলা তাৎক্ষণিক ওহী পাঠিয়ে তা সংশোধন করে দিয়েছেন, যাতে তা ভুল হিসেবে উম্মতের শরীয়ত না হয়।
যৌক্তিক ও প্রামাণিক কারণ
নবীগণ যদি নিষ্পাপ না হতেন, তবে কুরআনে তাঁদের প্রতিটি কাজের নিঃশর্ত আনুগত্য করার নির্দেশ দেওয়া হতো না। আল্লাহ বলেন: «وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا»। শয়তান নিজেই ঘোষণা করেছে যে, আল্লাহর মুখলিস বান্দাদের পথভ্রষ্ট করার কোনো ক্ষমতা তার নেই ({إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ})। অতএব, নবীগণ নিষ্পাপ—এ বিশ্বাস পোষণ করা ঈমানের অপরিহার্য অঙ্গ।
١٣- عرف المعجزة- ثم اذكر بعض معجزات نبينا محمد صلى الله عليه وسلم بالادلة-
মু’জিযা এর পরিচয় দাও। অতঃপর আমাদের নবি হযরত মুহাম্মদ (স) এর কতিপয় মু’জিযা দলিলসহ বর্ণনা কর।
উত্তর
নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণের জন্য মহান আল্লাহ নবীগণের মাধ্যমে যে অলৌকিক নিদর্শন প্রকাশ করেন, তা-ই হলো মু’জিযা (المعجزة)।
মু’জিযার পরিচয়
১. আভিধানিক অর্থ: ‘মু’জিযা’ শব্দটি ‘আজয’ (العجز) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ প্রতিপক্ষকে অক্ষম বা পরাভূতকারী অলৌকিক বিষয়।
২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: আকিদাশাস্ত্রে মু’জিযার সংজ্ঞা হলো:
«أَمْرٌ خَارِقٌ لِلْعَادَةِ، يَظْهَرُ عَلَى يَدِ مُدَّعِي النُّبُوَّةِ، تَأْيِيدًا لِدَعْوَاهُ، مَقْرُونًا بِالتَّحَدِّي، مَعَ عَدَمِ القُدْرَةِ عَلَى مُعَارَضَتِهِ»
অর্থ: “নবুওয়াতের দাবির সত্যতা প্রমাণের জন্য চ্যালেঞ্জসহকারে প্রতিপক্ষকে পরাভূত করে মহান আল্লাহ নবীর মাধ্যমে যে স্বভাববিরুদ্ধ অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ করেন, তাকে মু’জিযা বলে।”
আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কতিপয় প্রখ্যাত মু’জিযা
- সর্বশ্রেষ্ঠ চিরন্তন মু’জিযা—আল-কুরআনুল কারীম:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ ও কিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক মু’জিযা হলো কুরআন। আরবের সেরা সাহিত্যিকদের কুরআনের একটি ছোট সূরার সমকক্ষ কিছু রচনার চ্যালেঞ্জ দিয়েও কুরআন অপরাজেয় রয়েছে:
«قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَىٰ أَن يَأْتُوا بِمِثْلِ هَٰذَا الْقُرْآنِ لا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ»
অর্থ: “বলুন: সমগ্র মানব ও জ্বিন জাতি মিলে যদি এ কুরআনের অনুরূপ কিছু আনার চেষ্টা করে, তবে তারা এর অনুরূপ আনতে পারবে না।” (সূরা আল-ইসরা: ৮৮)।
- শাক্কুল ক্বামার বা চন্দ্র দ্বিখণ্ডিতকরণ:
মক্কার কুরাইশদের দাবির মুখে রাসূল (সা.) আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলে পূর্ণিমার চাঁদ স্পষ্ট দুই খণ্ডে বিভক্ত হয়ে হেরা পর্বতের দুই পাশে দৃশ্যমান হয়:
«اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانشَقَّ الْقَمَرُ»
অর্থ: “কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়েছে।” (সূরা আল-ক্বামার: ১)।
- ইসরা ও মি’রাজ:
এক রাতের স্বল্প সময়ে মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের মসজিদুল আকসা এবং সেখান থেকে সাত আসমান পেরিয়ে সিদরাতুল মুনতাহা ও আল্লাহর দীদার লাভ করা (সূরা আল-ইসরা: ১)।
- আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে পানির ঝর্ণা প্রবাহিত হওয়া:
হুদায়বিয়ার সফরে পানির তীব্র সংকটে রাসূল (সা.) একটি পাত্রে হাত রাখলে তাঁর আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে ঝর্ণার মতো পানি প্রবাহিত হতে থাকে এবং প্রায় দেড় হাজার সাহাবী পানাহার ও ওযু সম্পন্ন করেন (সহীহ বুখারী: ৩৫৭৬)।
- অল্প খাদ্যে বিপুল বরকত:
খন্দকের যুদ্ধে হযরত জাবের (রা.)-এর ঘরে মাত্র এক পেয়ালা যবের আটা ও একটি ছোট ছাগলছানার গোশত দিয়ে প্রায় এক হাজার সাহাবী পরিতৃপ্ত হয়ে আহার করেন এবং খাবার পূর্বের মতোই অবশিষ্ট থাকে (সহীহ বুখারী)।
١٤- اذكر الواقعة القرآنية التى تتعلق بسيدنا اسماعيل عليه السلام مدللا-
হযরত ইসমাইল (আ) এর সাথে সংশ্লিষ্ট কুরআনের ঘটনাটি দলিলসহ উল্লেখ কর।
উত্তর
পবিত্র কুরআনে হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও ঈমানদীপ্ত ঐতিহাসিক ঘটনা হলো ‘মহান কুরবানী’ (الذبيح) ও আত্মসমর্পণের মহা পরীক্ষা।
ঘটনার প্রামাণিক কুরআনীয় বিবরণ (সূরা আস-সাফফাত: ১০০-১০৮)
- দোয়ার মাধ্যমে সন্তান লাভ:
বৃদ্ধ বয়সে হযরত ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন: «رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ» (হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এক সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন)। আল্লাহ তাঁকে এক ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দেন: «فَبَشَّرْنَاهُ بِغُلامٍ حَلِيمٍ»।
- পিতা-পুত্রের ঐতিহাসিক কথোপকথন:
হযরত ইসমাঈল (আ.) যখন পিতার সাথে দৌড়াদৌড়ি ও কাজকর্ম করার বয়সে পৌঁছলেন, তখন ইবরাহীম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হলেন প্রিয় পুত্রকে কুরবানী করতে। তিনি পুত্রকে বললেন:
«يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَىٰ فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَىٰ»
অর্থ: “হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখছি যে তোমাকে যবাই করছি, অতএব ভেবে দেখো তোমার মতামত কী?”
- পুত্রের অনন্য আনুগত্য:
বালক ইসমাঈল কোনো দ্বিধা না করে পিতার আত্মত্যাগের পথে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে বললেন:
«قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ ۖ سَتَجِدُنِي إِن شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ»
অর্থ: “তিনি বললেন: হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তা পালন করুন; ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।”
- আত্মসমর্পণ ও অলৌকিক নিষ্কৃতি:
মিনায় পিতা পুত্রকে কাত করে শোয়ালেন এবং গলায় ছুরি চালালেন। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে ছুরি কাটল না। আল্লাহ তাআলা আকাশ থেকে ঘোষণা করলেন:
«وَنَادَيْنَاهُ أَن يَا إِبْرَاهِيمُ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا ۚ إِنَّا كَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ إِنَّ هَٰذَا لَهُوَ الْبَلاءُ الْمُبِينُ وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ»
অর্থ: “আমি তাকে ডেকে বললাম: হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! নিশ্চয়ই আমি সৎকর্মশীলদের এভাবেই প্রতিদান দিই। নিশ্চয়ই এটি ছিল এক সুস্পষ্ট কঠিন পরীক্ষা। আর আমি তার বিনিময়ে এক মহান কুরবানীর ব্যবস্থা করলাম।” (সূরা আস-সাফফাত: ১০৪-১০৭)।
আল্লাহ তাআলা জান্নাত থেকে একটি দুম্বা পাঠিয়ে ইসমাঈল (আ.)-কে মুক্ত করেন। এ ঘটনাই মুসলিম উম্মাহর জন্য ঈদুল আযহার কুরবানী হিসেবে অনন্তকাল ধরে পালিত হয়ে আসছে।
١٥- تحدث عن ‘فتح مبين’- اذكر اثاره فى دعوة سيدنا محمد صلى الله عليه وسلم-
فتح مبين সম্পর্কে আলোচনা কর। রসুলুল্লাহ (স) এর দা’ওয়াতের ক্ষেত্রে এর প্রভাব উল্লেখ কর।
উত্তর
পবিত্র কুরআনে সূরা আল-ফাতহের প্রথম আয়াতেই আল্লাহ তাআলা যে ঐতিহাসিক ঘটনাকে ‘ফাতহুম মুবীন’ (فتح مبين – সুস্পষ্ট বিজয়) বলে ঘোষণা করেছেন, তা হলো ষষ্ঠ হিজরীর হুদায়বিয়ার সন্ধি (صلح الحديبية)।
ইরশাদ হয়েছে: «إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا» (নিশ্চয়ই আমি আপনার জন্য এক সুস্পষ্ট বিজয় উন্মোচন করেছি)। বাহ্যিকভাবে সন্ধির শর্তগুলো মুসলিমদের প্রতিকূলে মনে হওয়ায় হযরত উমর (রা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! এটি কি বিজয়?” রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন: “হ্যাঁ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ, এটিই সুস্পষ্ট বিজয়।”
ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে ফাতহুম মুবীনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব
- যুদ্ধবিরতি ও খোলামেলা মেলামেশার সুযোগ:
দশ বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির ফলে কুরাইশ ও মুসলিমদের মধ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতার অবসান ঘটে। কাফিররা মদীনায় অবাধে যাতায়াত শুরু করে এবং সাহাবীদের চারিত্রিক মাধুর্য ও কুরআনের বাণী শুনে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে।
- দাওয়াতের অভাবনীয় গণজোয়ার:
ইমাম যুহরী (রহ.) বলেন: হুদায়বিয়ার পর দুই বছরে যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তা ইসলামের পূর্ববর্তী ১৯ বছরের মোট মুসলিম সংখ্যার চেয়েও বেশি ছিল। হুদায়বিয়ায় মুসলিম সেনাদল ছিল ১৪০০ জন, অথচ মাত্র দুই বছর পর মক্কা বিজয়ে এই সংখ্যা ১০,০০০-এ উন্নীত হয়।
- শীর্ষস্থানীয় কুরাইশ বীরদের ইসলাম গ্রহণ:
এ সন্ধির শান্তিময় পরিবেশে ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করে আরবের শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ এবং প্রখ্যাত কূটনীতিবিদ আমর ইবনুল আস (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন।
- বিশ্বনেতৃবৃন্দের কাছে আন্তর্জাতিক দাওয়াত প্রেরণ:
কুরাইশদের সীমান্ত নিরাপদ হওয়ায় রাসূল (সা.) দাওয়াতকে আন্তর্জাতিক রূপ দেন। তিনি রোমের সম্রাট হিরাক্লিয়াস, পারস্যের খসরু পারভেজ, মিসরের মুকাউকিস এবং আবিসিনিয়ার নাজ্জাশীর কাছে ইসলামের দাওয়াতনামা প্রেরণ করেন।
- মক্কা বিজয়ের রাজপথ উন্মোচন:
হুদায়বিয়ার সন্ধিই ছিল অষ্টম হিজরীর রক্তপাতহীন ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের মূল ভিত্তিপ্রস্তর।
١٦- علق المصطلحات الاتية : سِيَر ، الأنبياء ، مناهج ، دعوة ، القرآن-
নিচের পরিভাষাগুলোর উপর টীকা লেখ: سِيَر ، الأنبياء ، مناهج ، دعوة ، القرآن-
উত্তর
প্রশ্নোল্লিখিত পাঁচটি মৌলিক শাস্ত্রীয় পরিভাষার সারগর্ভ টীকা নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:
- সিয়ার (سِيَر):
‘সিয়ার’ শব্দটি ‘সীরাত’ (السيرة)-এর বহুবচন। আভিধানিক অর্থ পথ, চালচলন, অবস্থা, আচরণ বা জীবনপদ্ধতি (الطريقة والسلوك)। ইসলামী পরিভাষায়: নবী-রাসূল ও মহামানবদের জন্ম থেকে ওফাত পর্যন্ত সার্বিক জীবনচরিত, তাঁদের নৈতিক গুণাবলি, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং যুদ্ধবিগ্রহের (মাগাযী) সুবিন্যস্ত ঐতিহাসিক শাস্ত্রকে ‘ইলমুস সিয়ার’ বা সীরাত শাস্ত্র বলা হয়।
- আল-আম্বিয়া (الأنبياء):
‘আল-আম্বিয়া’ শব্দটি ‘নবী’ (النبي)-এর বহুবচন। এটি ‘নাবা’ (النبأ – সংবাদ) থেকে উদ্ভূত, অর্থাৎ যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে গায়েব ও ওহীর সংবাদ দেন; অথবা ‘নাবাওয়াহ’ (উচ্চ স্থান) থেকে উদ্ভূত, অর্থাৎ যাঁর মর্যাদা সুউচ্চ। পরিভাষায়: এমন মনোনীত পুরুষ ব্যক্তিত্ব, যাঁর প্রতি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নাযিল হয়েছে মানবজাতিকে সৎপথ প্রদর্শনের জন্য।
- মানাহিজ (مناهج):
‘মানাহিজ’ শব্দটি ‘মিনহাজ’ (المنهاج)-এর বহুবচন। আভিধানিক অর্থ উন্মুক্ত ও সুস্পষ্ট রাজপথ (الطريق الواضح)। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: «لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا» (সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৮)। একাডেমিক পরিভাষায়: কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য অনুসৃত সুশৃঙ্খল বৈজ্ঞানিক কর্মপদ্ধতি ও কার্যপ্রণালীকে (Methodology) ‘মিনহাজ’ বা মানাহিজ বলে।
- দাওয়াহ (دعوة):
‘দাওয়াহ’ শব্দের মূল ধাতু হলো دعا – يدعو, যার অর্থ ডাকা, আহ্বান জানানো বা নিমন্ত্রণ করা। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়: মানবজাতিকে শিরক, কুফর ও গোমরাহী থেকে মুক্ত করে মহান আল্লাহর একত্ববাদ, আনুগত্য ও শরীয়তের সুমহান আদর্শের দিকে প্রজ্ঞাপূর্ণ আহ্বান জানানোর প্রক্রিয়াকে ‘দাওয়াত’ বলা হয়।
- আল-কুরআন (القرآن):
‘কুরআন’ শব্দটি ‘ক্বিরাআত’ (পড়া বা আবৃত্তি করা) থেকে উদ্ভূত, অর্থাৎ যা সর্বাধিক পঠিত কিতাব। পারিভাষিক সংজ্ঞায়:
«هُوَ كَلاَمُ اللَّهِ تَعَالَى، المُنَزَّلُ عَلَى نَبِيِّهِ مُحَمَّدٍ ﷺ بِاللَّفْظِ العَرَبِيِّ، المَنْقُولُ إِلَيْنَا بِالتَّوَاتُرِ، المُتَعَبَّدُ بِتِلاَوَتِهِ، المُعْجِزُ بِأَقْصَرِ سُورَةٍ مِنْهُ، المَكْتُوبُ فِي المَصَاحِفِ»
অর্থ: “পবিত্র কুরআন হলো মহান আল্লাহর সেই কালাম বা বাণী, যা আরবি ভাষায় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ, যা আমাদের নিকট তাওয়াতুরের সাথে বর্ণিত, যার তিলাওয়াত ইবাদত, যার ক্ষুদ্রতম সূরা দিয়েও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়েছে এবং যা মুসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ।”
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের “সিয়ারুল আম্বিয়া ওয়া মানাহিজু দাওয়াতিহিম ফিল কুরআন” (কোড: ২০১8০৯) কোর্সের মূল উদ্দেশ্য কী?
এ কোর্সের মূল লক্ষ্য হলো পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবী ও রাসূলগণের বর্ণাঢ্য জীবনসংগ্রাম, তাঁদের দাওয়াতী কৌশল ও মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি গভীরভাবে অনুধাবন করা এবং সমকালীন যুগে ইসলাম প্রচার ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে সেই নবুওয়াতী পদ্ধতি বাস্তবায়নের যোগ্যতা অর্জন করা।
২. পবিত্র কুরআনে কতজন নবী ও রাসূলের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে?
পবিত্র কুরআনে নাম উল্লেখ করে মোট ২৫ জন নবী ও রাসূলের কথা বলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে হযরত আদম, নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা এবং সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) অন্তর্ভুক্ত।
৩. নবী (نبي) এবং রাসূল (رسول)-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
প্রত্যেক রাসূলই নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসূল নন। রাসূলকে আল্লাহ তাআলা নতুন আসমানী কিতাব বা স্বতন্ত্র শরীয়ত দান করেন এবং তিনি অবিশ্বাসী কাফির জাতির কাছে প্রেরিত হন। পক্ষান্তরে নবী পূর্ববর্তী রাসূলের কিতাব ও শরীয়ত প্রচার ও পুনরুজ্জীবিত করেন।
৪. মু’জিযা (معجزة) ও কারামাত (كرامة)-এর মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
মু’জিযা কেবল নবী ও রাসূলগণের মাধ্যমে নবুওয়াতের দাবির সত্যতা প্রমাণের জন্য চ্যালেঞ্জসহকারে প্রকাশিত হয়। পক্ষান্তরে কারামাত হলো নবুওয়াতের দাবি ছাড়া আল্লাহ তাআলার কোনো নেককার ওলী বা খাঁটি পরহেযগার মুমিনের মাধ্যমে প্রকাশিত অলৌকিক ঘটনা।
৫. হুদায়বিয়ার সন্ধিকে কেন কুরআনে ‘ফাতহুম মুবীন’ (সুস্পষ্ট বিজয়) বলা হয়েছে?
হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলে আরবে দশ বছরের শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, যার ফলে কুরাইশরা মুসলিমদের পৃথক স্বাধীন শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। মানুষ নির্ভয়ে মেলামেশা করে ইসলামের সৌন্দর্য দেখে পরবর্তী দুই বছরে পূর্ববর্তী ১৯ বছরের চেয়েও বিপুল সংখ্যায় ইসলাম গ্রহণ করে, যা মক্কা বিজয়ের পথ সুগম করেছিল।
৬. আল-কুরআনের আলোকে দাওয়াতের সর্বপ্রধান তিনটি মৌলিক পদ্ধতি কী কী?
সূরা আন-নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াত অনুযায়ী দাওয়াতের মূল তিনটি স্তর হলো: ১. হিকমত (বুদ্ধিবৃত্তিক ও অকাট্য প্রজ্ঞা), ২. মাওইযায়ে হাসানাহ (সুন্দর ও হৃদয়স্পর্শী উপদেশ), এবং ৩. মুজাদালাহ বিল্লাতী হিয়া আহসান (সর্বোত্তম ও শালীন পন্থায় যুক্তিখণ্ডন ও বিতর্ক)।