জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ (Modern Muslim States in South and South-East Asia) – 205409, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
১০৫ মিনিট পড়ার সময়
১১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০৪ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৯১
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ (নবম পত্র)
[Modern Muslim States in South and South-East Asia (Paper IX)]
বিষয় কোড: ২০৫৪০৯
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০


রচনামূলক প্রশ্ন

[দ্রষ্টব্য: যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১৫: ১৫ × ৪ = ৬০]

১. পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে ডাচ সরকার প্রবর্তিত ‘কালচার ব্যবস্থা’র বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।

[English: Discuss the characteristics of the ‘Culture system’ introduced by the Dutch Government in the East-Indies.]

ভূমিকা

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসে ঔপনিবেশিক শোষণের অন্যতম নিষ্ঠুর ও সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল ডাচদের প্রবর্তিত ‘কালচার ব্যবস্থা’ বা ‘কালচুরস্টেলসেল’ (Cultuurstelsel / Cultivation System)। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে নেদারল্যান্ডস সরকার তার দেউলিয়াত্ব রোধ এবং ঔপনিবেশিক খাজনা সর্বোচ্চ করার উদ্দেশ্যে পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে (বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার জাভায়) এই জবরদস্তিমূলক কৃষি ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়। এটি জাভার গ্রামীণ অর্থনীতিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে এবং নেদারল্যান্ডসের জন্য বিপুল পুঁজি আহরণের পথ তৈরি করে।

কালচার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পটভূমি

১৮৩০ সালে ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের গভর্নর জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হন জোহানেস ভ্যান ডেন বোশ (Johannes van den Bosch)। এই ব্যবস্থা চালুর মূল কারণগুলো ছিল:

  • জাভা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ (১৮২৫-১৮৩০ খ্রি.): প্রিন্স দিপোনেগোরোর নেতৃত্বে সংগঠিত রক্তক্ষয়ী জাভা যুদ্ধে ডাচ সরকারের প্রায় দুই কোটি গিল্ডার অর্থক্ষয় হয় এবং বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিহত হয়।
  • বেলজিয়াম বিপ্লব (১৮৩০ খ্রি.): নেদারল্যান্ডস থেকে বেলজিয়াম বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ডাচ অর্থনীতি চরম আর্থিক বিপর্যয় ও ঋণের মুখে পড়ে।
  • ঔপনিবেশিক লাভের আকাঙ্ক্ষা: পূর্ববর্তী উন্মুক্ত বাণিজ্য নীতি ব্যর্থ হওয়ায় কৃষকদের সরাসরি রাষ্ট্রীয় নির্দেশে রপ্তানিযোগ্য ফসল চাষে বাধ্য করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কালচার ব্যবস্থার প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

ভ্যান ডেন বোশ প্রবর্তিত কালচার ব্যবস্থার আইনগত কাঠামো এবং এর নির্মম বাস্তব রূপের বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:

১. বাধ্যতামূলক বাণিজ্যিক ফসল চাষ

এই আইনের প্রধান বিধান ছিল, জাভার প্রতিটি গ্রামের কৃষকদের তাদের চাষযোগ্য জমির অন্তত এক-পঞ্চমাংশ (২০%) জমিতে ইউরোপীয় বাজারে চাহিদাসম্পন্ন রপ্তানিমুখী ফসল চাষ করতে হবে। এর মধ্যে প্রধান ছিল—চিনি (ইক্ষু), কফি, নীল (Indigo), চা, তামাক, গোলমরিচ এবং দারুচিনি।

২. ঐতিহ্যবাহী কর মওকুফের শর্ত ও দ্বৈত শোষণ

আইনে বলা হয়েছিল, যেসব গ্রাম সরকার নির্ধারিত বাণিজ্যিক ফসল উৎপাদন করবে, তাদের প্রচলিত বার্ষিক ভূমিকর (Land rent) মাফ করা হবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে ডাচ কর্মকর্তা ও স্থানীয় মোড়লরা অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে কৃষকদের ওপর ভূমির খাজনা এবং ফসল উৎপাদন—উভয় ব্যবস্থাই সমান্তরালভাবে চাপিয়ে দিয়েছিল।

৩. এক-পঞ্চমাংশ জমির সীমানা লঙ্ঘন

আইনে জমির ২০ শতাংশ ব্যবহারের কথা থাকলেও ডাচরা সবচেয়ে উর্বর জমিগুলো দখল করত এবং অনেক ক্ষেত্রে গ্রামের ৫০% থেকে শতভাগ উর্বর জমিতে খাদ্যশস্যের (ধান) পরিবর্তে বলপূর্বক নীল ও ইক্ষু চাষে বাধ্য করত।

৪. বিনামূল্যে শ্রম বা বেগার প্রথা (Corvée Labor)

জমিতে চাষাবাদ করার পাশাপাশি কৃষকদের বছরে ৬৬ দিন বিনামূল্যে সরকারি কাজে শ্রম দিতে হতো। এই শ্রমের অধীনে চিনি প্রক্রিয়াকরণ কারখানা তৈরি, পাহাড়ি অঞ্চলে কফি পরিবহনের রাস্তাঘাট নির্মাণ, খাল খনন এবং বন্দরে পণ্য পরিবহনে কৃষকদের অমানবিক খাটুনি খাটানো হতো। বাস্তবে এই শ্রমের সময়সীমা অনেক সময় ৯০ থেকে ১২০ দিনে পৌঁছে যেত।

৫. স্থানীয় সামন্তপ্রভুদের কমিশন প্রদান (Cultuurprocenten)

ডাচরা তাদের শাসন সহজ করতে জাভার স্থানীয় অভিজাত ও সর্দারদের (Priyayi বা Regents) সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করত। উৎপাদনের পরিমাণের ওপর স্থানীয় রিজেন্ট ও ডাচ সুপারভাইজারদের লোভনীয় আর্থিক পার্সেন্টেজ বা কমিশন দেওয়া হতো। ফলে বেশি কমিশন পাওয়ার লোভে স্থানীয় শাসকরা প্রজাদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালিয়ে নির্ধারিত সময়ের চেয়েও বেশি কাজ আদায় করত।

৬. ফসলের ঝুঁকি ও ক্ষতিপূরণের প্রতারণা

সরকারি নীতিমালায় বলা হয়েছিল, প্রাকৃতিক কারণে ফসল নষ্ট হলে তার দায় সরকার নেবে। কিন্তু বাস্তবে বন্যা, খরা বা পোকার আক্রমণে ফসলহানি ঘটলে সমস্ত ক্ষতিপূরণের দায় কৃষকদের ওপর চাপানো হতো এবং তাদের অন্য জমি থেকে ঘাটতি পূরণ করতে বাধ্য করা হতো।

৭. খাদ্য সংকট ও মন্বন্তর

উর্বর ধানি জমি বাণিজ্যিক ফসলের দখলে চলে যাওয়ায় এবং কৃষকরা দিনরাত ডাচদের জমিতে ব্যস্ত থাকায় খাদ্যশস্য উৎপাদনের মারাত্মক সংকট দেখা দেয়। এর ফলে ১৮৪০-এর দশকে মধ্য জাভার ডেমাক (Demak) এবং গ্রোবোগানে (Grobogan) ভয়াবহ কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। অনাহার ও মহামারীতে কয়েক লাখ নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারায়।

কালচার ব্যবস্থার ফলাফল

  • নেদারল্যান্ডসের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি (Batig Slot): ১৮৩১ থেকে ১৮৭৭ সালের মধ্যে ডাচ রাজকোষে প্রায় ৮৩ কোটি গিল্ডার মুনাফা জমা হয়। এই অর্থ দিয়ে নেদারল্যান্ডসে নতুন জাতীয় রেলপথ নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়, রাষ্ট্রীয় ঋণ পরিশোধ করা হয় এবং দেশের কর হ্রাস করা হয়।
  • জাভার চরম দারিদ্র্য ও সামাজিক অবক্ষয়: জাভার সাধারণ মানুষ সর্বস্বান্ত ও ভূমিদাসে পরিণত হয়।
  • আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও মুলতাতুলির উপন্যাস: সাবেক ডাচ কর্মকর্তা এডুয়ার্ড ডাউস ডেকার (ছদ্মনাম মুলতাতুলি) ১৮৬০ সালে ‘ম্যাক্স হাভেলার’ (Max Havelaar) নামক যুগান্তকারী রাজনৈতিক উপন্যাস রচনা করেন। এতে কালচার ব্যবস্থার অমানবিক নৃশংসতা ইউরোপের সামনে উন্মোচিত হয় এবং তীব্র প্রতিবাদের মুখে ১৮৭০ সাল থেকে এই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বাতিল করে মুক্ত বাণিজ্য ও পরবর্তীতে ‘নৈতিক নীতি’ (Ethical Policy, ১৯০১) গ্রহণ করা হয়।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে প্রবর্তিত কালচার ব্যবস্থা ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এক প্রাতিষ্ঠানিক লুণ্ঠন। এটি ইন্দোনেশিয়ার জনগণকে নিদারুণ ভোগান্তির মুখে ঠেলে দিয়েছিল, যার ধ্বংসাবশেষ থেকে পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ইন্দোনেশীয় জাতীয়তাবাদী মুক্তি আন্দোলনের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল।


২. ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর উত্থান ও পতনের ইতিহাস বর্ণনা কর।

[English: Narrate the history of the rise and downfall of President Suharto in the politics of Indonesia.]

ভূমিকা

আধুনিক ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে জেনারেল সুহার্তো (Suharto) এক অত্যন্ত প্রভাবশালী, বিতর্কিত ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যক্তিত্ব। ১৯৬৫ সালের এক নাটকীয় ও রক্তক্ষয়ী পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ করেন এবং টানা ৩২ বছর (১৯৬৬-১৯৯৮ খ্রি.) ‘অরবা’ বা ‘নতুন ব্যবস্থা’ (Orba / New Order)-র মাধ্যমে লৌহমুষ্টিতে দেশ শাসন করেন। তাঁর আমলে একদিকে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধিত হলেও অন্যদিকে চরম স্বৈরতন্ত্র, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে শেষ পর্যন্ত এক গণবিস্ফোরণে তাঁর নাটকীয় পতন ঘটে।

সুহার্তোর ক্ষমতার উত্থানের ইতিহাস

সুহার্তোর ক্ষমতা দখলের পটভূমি ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম রহস্যময় ও রক্তভেজা রাজনৈতিক অধ্যায়:

১. সুকর্ণোর পতনের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক ত্রিভুজ

১৯৬০-এর দশকের শুরুতে ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতিতে তিনটি প্রধান শক্তির মধ্যে সূক্ষ্ম ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছিল: প্রথম প্রেসিডেন্ট সুকর্ণো (তাঁর নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র ও নাসাকোম নীতি), শক্তিশালী ইন্দোনেশীয় কমিউনিস্ট পার্টি (PKI) এবং ইসলামপন্থীদের সমর্থনে পুষ্ট ডানপন্থী সামরিক বাহিনী। তৎকালীন তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীতি রাজনৈতিক উত্তেজনাকে চরমে পৌঁছে দেয়।

২. ৩০ সেপ্টেম্বরের রহস্যময় অভ্যুত্থান (G30S – ১৯৬৫ খ্রি.)

১৯৬৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে এক আকস্মিক সামরিক অভ্যুত্থানে ইন্দোনেশীয় সেনাবাহিনীর ছয়জন শীর্ষ জেনারেলকে তাদের বাসভবন থেকে অপহরণ করে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তৎকালীন কৌশলগত সেনা কমান্ডের (Kostrad) প্রধান মেজর জেনারেল সুহার্তো সৌভাগ্যবশত বেঁচে যান। সুহার্তো কালবিলম্ব না করে এই হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ দায় কমিউনিস্ট পার্টি (PKI)-এর ওপর চাপিয়ে দেন এবং সামরিক বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন।

৩. কমিউনিস্ট নিধনযজ্ঞ ও রাজনৈতিক মাঠ খালি করা

সুহার্তোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতৃত্বে ১৯৬৫ সালের শেষভাগ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সমগ্র ইন্দোনেশিয়ায় এক ভয়াবহ কমিউনিস্ট বিরোধী শুদ্ধি অভিযান পরিচালিত হয়। এতে আনুমানিক পাঁচ লক্ষাধিক কমিউনিস্ট নেতাকর্মী, বামপন্থী সমর্থক এবং চীনা বংশোদ্ভূত মানুষকে হত্যা করা হয়। এর মাধ্যমে সুহার্তো তাঁর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেন।

৪. সুপেরসেমার ফরমান (Supersemar – ১১ মার্চ ১৯৬৬ খ্রি.)

সামরিক বাহিনীর তীব্র চাপ ও ছাত্রবিক্ষোভের মুখে কোণঠাসা হয়ে প্রেসিডেন্ট সুকর্ণো ১৯৬৬ সালের ১১ মার্চ একটি বিশেষ রাষ্ট্রপতির নির্দেশনায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন, যা সংক্ষেপে ‘সুপেরসেমার’ (Surat Perintah Sebelas Maret) নামে পরিচিত। এই আদেশের মাধ্যমে সুকর্ণো দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ক্ষমতা সুহার্তোর হাতে ন্যস্ত করেন। এই ফরমানকে ব্যবহার করে সুহার্তো কার্যত রাষ্ট্রক্ষমতার একক নিয়ন্তায় পরিণত হন।

৫. আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতিত্ব গ্রহণ

১৯৬৭ সালের মার্চে গণপরিষদ (MPRS) সুকর্ণোকে পদচ্যুত করে সুহার্তোকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে এবং ১৯৬৮ সালের ২৭ মার্চ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

সুহার্তোর ‘নতুন ব্যবস্থা’ (New Order)-র মূল স্তম্ভসমূহ

  • রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও পঞ্চশীলা: জাতীয় আদর্শ ‘পঞ্চশীলা’ (Pancasila)-কে একমাত্র রাষ্ট্রীয় দর্শন হিসেবে চাপিয়ে দিয়ে সমস্ত রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় সংগঠনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
  • সামরিক বাহিনীর দ্বিবিধ ভূমিকা (Dwifungsi): সামরিক বাহিনীকে কেবল প্রতিরক্ষা নয়, প্রশাসন, পার্লামেন্ট ও বিচার বিভাগের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করা হয়।
  • গোলকার দলের আধিপত্য: রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘গোলকার’ (Golkar)-কে ব্যবহার করে প্রতিটি নির্বাচনে একচেটিয়া বিজয় নিশ্চিত করা হয়।
  • অর্থনৈতিক উন্নয়ন: পশ্চিমা দেশগুলো ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) সহায়তায় ব্যাপক বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং তেল রপ্তানির মাধ্যমে দেশকে দারিদ্র্য থেকে টেনে তোলার কারণে তাঁকে ‘উন্নয়নের পিতা’ (Bapak Pembangunan) আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।

সুহার্তোর পতনের ইতিহাস ও কারণসমূহ

দীর্ঘ তিন দশকের একচ্ছত্র আধিপত্যের পর ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে সুহার্তোর দুর্গে চিড় ধরে। নিম্নোক্ত কারণসমূহের সমন্বয়ে তাঁর ক্ষমতার পতন ত্বরান্বিত হয়:

১. সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি (KKN – Korupsi, Kolusi, dan Nepotisme)

সুহার্তোর পরিবার ও ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের সীমাহীন লোভ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। সুহার্তোর ছয় সন্তান এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা পেট্রোলিয়াম, বিদ্যুৎ, টোল রোড, বিমান ও মিডিয়া খাতের একচ্ছত্র একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের মাধ্যমে সুহার্তো পরিবার বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী পরিবারে পরিণত হয়।

২. ১৯৯৭ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকট (Asian Financial Crisis)

১৯৯৭ সালের মাঝামাঝি থাইল্যান্ডে শুরু হওয়া মুদ্রা সংকট পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে ইন্দোনেশিয়া সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইন্দোনেশীয় মুদ্রা ‘রূপিয়া’র (Rupiah) মান এক ডলার = ২৫০০ রূপিয়া থেকে নাটকীয়ভাবে ধসে ১৭,০০০ রূপিয়ায় নেমে আসে। ব্যাংক ও শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, বেকারের সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে যায় এবং চাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম ৩০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

৩. দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলন ও সংস্কারের দাবি (Reformasi)

১৯৯৮ সালের শুরু থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। তারা সুহার্তোর পদত্যাগ এবং শাসন ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের (Gerakan Reformasi) ডাক দেয়। সাধারণ জনগণ, সুশীল সমাজ ও পেশাজীবীরা ছাত্রদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে।

৪. ট্রিসক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ড ও মে ১৯৯৮-এর ভয়াবহ দাঙ্গা

১৯৯৮ সালের ১২ মে জাকার্তার ট্রিসক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী ছাত্রদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে চারজন ছাত্র নিহত হন। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৩-১৫ মে সমগ্র জাকার্তায় ভয়াবহতম দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে চীনা বংশোদ্ভূত নাগরিকদের ওপর পৈশাচিক হামলা চালানো হয়, যাতে হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

৫. সেনাবাহিনী ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সমর্থন প্রত্যাহার

জনগণের ক্ষোভ দেখে পার্লামেন্ট স্পিকার এবং সুহার্তোর একসময়ের অনুগত হারমোকো তাঁকে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেন। ১৪ জন ক্যাবিনেট মন্ত্রী নতুন সরকারে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। সর্বশেষ সেনাপ্রধান জেনারেল উইরানতো সুহার্তোকে রক্ষার জন্য জনগণের ওপর ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।

পদত্যাগ ও ক্ষমতার অবসান (২১ মে ১৯৯৮ খ্রি.)

কোনো বিকল্প না দেখে ১৯৯৮ সালের ২১ মে সকালে মেরদেকা প্রাসাদে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত টেলিভিশন ভাষণে প্রেসিডেন্ট সুহার্তো জাতির উদ্দেশ্যে বলেন—\”আমি ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।\” এর সাথে সাথে তিনি সংবিধান অনুযায়ী উপ-রাষ্ট্রপতি বি. জে. হাবিবির (B. J. Habibie) হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

উপসংহার

সুহার্তোর উত্থান ঘটেছিল বন্দুকের নলে এক রক্তক্ষয়ী নাটকের মধ্য দিয়ে, আর তাঁর পতন ঘটেছিল অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও জনতার প্রবল প্রতিরোধের মুখে। সুহার্তোর পতনের মধ্য দিয়েই ইন্দোনেশিয়া স্বৈরতন্ত্রের অন্ধকার কাটিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হওয়ার নতুন যুগে প্রবেশ করে।


৩. মালয় অঞ্চলে ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বিবৃত কর।

[English: Narrate the history of the foundation of British colony in the Malaya region.]

ভূমিকা

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার কেবল ইউরোপীয় বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান নৌপথ ‘মালাক্কা প্রণালী’ এবং মালয়ের অফুরন্ত খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যন্ত অত্যন্ত চাতুর্যপূর্ণ কূটনৈতিক চুক্তি, সামরিক চাপ ও ধাপে ধাপে প্রশাসনিক অনুপ্রবেশের মাধ্যমে ব্রিটিশরা সমগ্র মালয় উপদ্বীপে তাদের পূর্ণ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল।

ব্রিটিশদের আগমনের প্রেক্ষাপট ও কৌশলগত স্বার্থ

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তিনটি প্রধান উদ্দেশ্যে মালয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারে আগ্রহী হয়:

  • চীন বাণিজ্যের নিরাপত্তা: ভারত ও চীনের মধ্যকার অত্যন্ত লাভজনক চা, আফিম ও রেশম বাণিজ্যের জাহাজ চলাচলের জন্য মালাক্কা প্রণালীতে একটি নিরাপদ ঘাঁটি ও নৌ-মর্যাদাপূর্ণ বন্দর স্থাপন।
  • ফরাসি ও ডাচ প্রতিদ্বন্দ্বিতা রোধ: নেপোলিয়নীয় যুদ্ধ ও ডাচদের বাণিজ্যে আধিপত্য খর্ব করে এই অঞ্চলে ব্রিটিশ নৌ-আধিপত্য নিশ্চিত করা।
  • প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন: মালয়ের সমৃদ্ধ টিন (Tin) খনি এবং উনবিংশ শতকের শেষভাগে মোটরগাড়ি শিল্পের জন্য অপরিহার্য প্রাকৃতিক রবার (Rubber)-এর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

মালয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পর্যায়ক্রম

মালয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের ইতিহাসকে প্রধানত তিনটি সুনির্দিষ্ট ধাপে বিভক্ত করে আলোচনা করা যায়:

প্রথম পর্যায়: স্ট্রেটস সেটেলমেন্টস গঠন (Straits Settlements: ১৭৮৬–১৮২৬ খ্রি.)

ব্রিটিশরা শুরুতে সরাসরি ভূখণ্ড দখলের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বন্দরগুলো কব্জা করার নীতি গ্রহণ করে:

  • পেনাং অধিগ্রহণ (১৭৮৬ খ্রি.): ক্যাপ্টেন ফ্রান্সিস লাইট কেদাহর সুলতানকে শ্যামদেশ (থাইল্যান্ড) ও বার্মিজ আক্রমণের বিরুদ্ধে সামরিক সুরক্ষার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে পেনাং দ্বীপটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যের জন্য ইজারা নেন। পরবর্তীতে ১৮০০ সালে মূল ভূখণ্ডের ‘প্রোভিন্স ওয়েলেসলি’ অংশও কেদাহ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়।
  • সিঙ্গাপুর প্রতিষ্ঠা (১৮১৯ খ্রি.): স্যার থমাস স্ট্যামফোর্ড র‍্যাফেলস জোহোর সালতানাতের উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে নির্বাসিত যুবরাজ হুসাইনকে সুলতান হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং ১৮১৯ সালে সিঙ্গাপুর দ্বীপে একটি কারখানা ও বন্দর স্থাপনের চুক্তি করেন। ১৮২৪ সালের মধ্যে পুরো সিঙ্গাপুর ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ দখলে চলে আসে এবং এটি একটি শুল্কমুক্ত মুক্তবন্দর (Free Port) হিসেবে বিশ্ববাণিজ্যের শীর্ষে পৌঁছায়।
  • মালাক্কা হস্তান্তর ও ১৮২৪ সালের অ্যাংলো-ডাচ চুক্তি: ১৮২৪ সালের ঐতিহাসিক লন্ডন চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ ও ডাচদের মধ্যে প্রভাববলয় নির্ধারিত হয়। ব্রিটিশরা ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় অবস্থিত তাদের বেনকুলেন বন্দর ডাচদের ছেড়ে দেয় এবং পরিবর্তে মালাক্কার ওপর ডাচ দাবি ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
  • স্ট্রেটস সেটেলমেন্টস গঠন (১৮২৬ খ্রি.): পেনাং, সিঙ্গাপুর ও মালাক্কা—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরকে একত্রিত করে গঠিত হয় ‘স্ট্রেটস সেটেলমেন্টস’। ১৮৬৭ সালে এটি ব্রিটিশ রানীর প্রত্যক্ষ উপনিবেশে (Crown Colony) রূপান্তরিত হয়।

দ্বিতীয় পর্যায়: অভ্যন্তরীণ মালয় রাজ্য ও রেসিডেন্ট প্রথা (১৮৭৪–১৮৯৫ খ্রি.)

১৮৭০-এর দশকে ব্রিটিশ সরকার ‘অ-হস্তক্ষেপ নীতি’ ত্যাগ করে মালয় উপদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলোতে সরাসরি হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেয়। এর প্রধান মাধ্যম ছিল ‘রেসিডেন্ট প্রথা’ (Resident System):

  • পাংকর চুক্তি (Pangkor Treaty – ১৮৭৪ খ্রি.): সমৃদ্ধ টিনসমৃদ্ধ রাজ্য পেরাকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার যুদ্ধ এবং চীনা গোপন সমিতিগুলোর (Ghee Hin ও Hai San) সংঘাত বন্ধের অজুহাতে ব্রিটিশ গভর্নর স্যার অ্যান্ড্রু ক্লার্ক হস্তক্ষেপ করেন। ১৮৭৪ সালের ২০ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত পাংকর চুক্তির মাধ্যমে রাজা আবদুল্লাহকে সুলতান ঘোষণা করা হয় এবং সুলতান একজন ব্রিটিশ ‘রেসিডেন্ট’ গ্রহণ করতে বাধ্য হন। চুক্তির শর্ত ছিল—\”ইসলাম ধর্ম ও মালয় প্রথা ব্যতীত সকল প্রশাসনিক, রাজস্ব ও সামরিক বিষয়ে রেসিডেন্টের পরামর্শ গ্রহণ করা সুলতানের জন্য বাধ্যতামূলক হইবে।\” এর মাধ্যমে সুলতানের সমস্ত বাস্তব ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়।
  • অন্যান্য রাজ্যে বিস্তার: একে একে সেলানগর (১৮৭৪), নেগরি সেম্বিলান (১৮৮৭) এবং পাহাং (১৮৮৮) রাজ্যে একই কৌশলে ব্রিটিশ রেসিডেন্ট চাপিয়ে দিয়ে রাজ্যগুলোর সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেওয়া হয়।

তৃতীয় পর্যায়: ফেডারেটেড ও আন-ফেডারেটেড মালয় স্টেটস (১৮৯৬–১৯১৪ খ্রি.)

প্রশাসনের সুবিধার জন্য ব্রিটিশরা পুরো মালয় অঞ্চলকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনে:

  • ফেডারেটেড মালয় স্টেটস (FMS – ১৮৯৬ খ্রি.): পেরাক, সেলানগর, নেগরি সেম্বিলান ও পাহাং—এই চারটি সমৃদ্ধ রাজ্যকে একত্র করে গঠন করা হয় ‘ফেডারেটেড মালয় স্টেটস’। ফ্রাঙ্ক সুইটেনহ্যাম প্রথম রেসিডেন্ট-জেনারেল নিযুক্ত হন এবং কুয়ালালামপুরকে এর রাজধানী করা হয়।
  • ব্যাংকক চুক্তি (১৯০৯ খ্রি.) ও আন-ফেডারেটেড মালয় স্টেটস (NFMS): শ্যামদেশের (থাইল্যান্ড) সাথে স্বাক্ষরিত ব্যাংকক চুক্তির মাধ্যমে শ্যামরাজ মালয় উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চলীয় চারটি মুসলিম রাজ্য—কেদাহ, পারলিস, কেলান্তান ও তেরেঙ্গানুর ওপর থেকে দাবি প্রত্যাহার করে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেয়। পরবর্তীতে ১৯১৪ সালে কৌশলগত জোহোর রাজ্যও একজন ব্রিটিশ জেনারেল অ্যাডভাইজার গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এই পাঁচটি রাজ্যকে বলা হতো ‘আন-ফেডারেটেড মালয় স্টেটস’।

উপনিবেশিক অর্থনৈতিক শোষণ ও জনমিতির পরিবর্তন

মালয়ে উপনিবেশ কায়েম করে ব্রিটিশরা তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে দুটি প্রধান খাতকে রূপান্তর করে:

  • টিন ও রবার অর্থনীতি: আধুনিক রেলওয়ে ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে খনিজ টিন ও ব্রাজিলিয়ান রবার চাষের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের কলকারখানায় কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।
  • অভিবাসী নীতি ও বহুজাতিক সমাজ গঠন: খনির কঠোর পরিশ্রমের জন্য চীন থেকে লাখ লাখ চীনা এবং রবার বাগানের জন্য দক্ষিণ ভারত (তামিলনাড়ু) থেকে সস্তা তামিল শ্রমিকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়ে আসা হয়। ফলে মালয় মুসলিম অধ্যুষিত দেশে স্থানীয় মালয়, চীনা ও ভারতীয়দের এক সংবেদনশীল বহুজাতিক সমাজের জন্ম হয়, যা দেশটির আধুনিক রাজনীতিকে স্থায়ীভাবে প্রভাবিত করে।

উপসংহার

কৌশলগত বাণিজ্য ঘাঁটি থেকে শুরু করে স্থানীয় সুলতানদের দুর্বলতা ও গৃহযুদ্ধকে পুঁজি করে ব্রিটিশরা যেভাবে মালয় উপদ্বীপে তাদের থাবা বিস্তার করেছিল, তা ছিল ধ্রুপদী ব্রিটিশ কূটনীতির এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ভেঙে দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট মালয় ফেডারেশন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।


৪. আধুনিক মালয়েশিয়া প্রতিষ্ঠায় মাহাথির মুহাম্মদ-এর অবদান মূল্যায়ন কর।

[English: Evaluate the contribution of Mahathir Muhammad to the establishment of modern Malaysia.]

ভূমিকা

আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার, স্থপতি ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ড. মাহাথির মুহাম্মদ (Tun Dr. Mahathir Mohamad) বিশ্বরাজনীতিতে এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর এবং পরবর্তীতে ৯২ বছর বয়সে ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি একটি অনগ্রসর, কৃষিনির্ভর ও সংঘাতপ্রবণ বহুজাতিক দেশকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অর্থনৈতিক পরাশক্তি ও আধুনিক শিল্পোন্নত দেশে রূপান্তরিত করেছেন। প্রাচ্যের স্বকীয়তা ও আত্মমর্যাদাবোধ বজায় রেখে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক অনন্য পথপ্রদর্শক।

মাহাথির মুহাম্মদের প্রাথমিক রাজনৈতিক দর্শন ও ‘মালয় ডিলেমা’

পেশায় চিকিৎসক মাহাথির ছিলেন তীব্র স্বদেশপ্রেমিক ও সমাজ সংস্কারক। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘দ্য মালয় ডিলেমা’ (The Malay Dilemma)-তে তিনি মালয় মুসলিমদের (ভূমিপুত্র) চরম অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা, ঔপনিবেশিক বঞ্চনা এবং চীনা জনগোষ্ঠীর সাথে বৈষম্যের কারণ বিশ্লেষণ করেন। তাঁর এই দর্শন মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে ‘নিউ ইকোনমিক পলিসি’ (NEP)-এর কার্যকর বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত করে, যার মাধ্যমে ভূমিপুত্রদের ব্যবসা, উচ্চশিক্ষা ও শিল্পায়নে সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়।

আধুনিক মালয়েশিয়া বিনির্মাণে মাহাথির মুহাম্মদের প্রধান অবদানসমূহ

ড. মাহাথির মুহাম্মদের যুগান্তকারী অবদানসমূহকে নিম্নোক্ত প্রধান ক্ষেত্রগুলোতে বিশ্লেষণ করা যায়:

১. ‘লুক ইস্ট’ নীতি (Look East Policy – ১৯৮২ খ্রি.)

দায়িত্ব গ্রহণের পরই মাহাথির পশ্চিমা অন্ধ অনুকরণের বিপরীতে এক ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা ঘোষণা করেন, যা ‘লুক ইস্ট পলিসি’ (Look East Policy) নামে খ্যাত। তিনি পশ্চিমা বস্তুবাদী ও অহংকারী সংস্কৃতির পরিবর্তে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কঠোর পরিশ্রম, ব্যবসায়িক সততা, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিপ্রেম এবং জাতীয় শৃঙ্খলাকে মালয়েশিয়ার শিল্পায়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করেন।

২. ‘ভিশন ২০২০’ (Wawasan 2020)

১৯৯১ সালে মাহাথির তাঁর বিখ্যাত রূপকল্প ‘ভিশন ২০২০’ ঘোষণা করেন। এর লক্ষ্য ছিল—২০২০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়াকে দারিদ্র্যমুক্ত, আত্মমর্যাদাশীল, প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর এবং সকল জাতিগোষ্ঠীর সমান সুযোগ সম্বলিত একটি ‘সম্পূর্ণ উন্নত রাষ্ট্রে’ (Fully Developed Nation) উন্নীত করা। তাঁর সমস্ত অর্থনৈতিক ও শিক্ষানীতি এই ভিশনকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়েছিল।

৩. ভারী শিল্পায়ন ও জাতীয় ব্র্যান্ড গঠন (প্রোটন সাগা)

মাহাথির বিশ্বাস করতেন, কেবল কাঁচামাল রপ্তানি করে কোনো জাতি উন্নত হতে পারে না। তাই তিনি মালয়েশিয়াকে গাড়ি প্রস্তুতকারক দেশে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেন:

  • প্রোটন (Proton): ১৯৮৩ সালে তিনি ভারী শিল্প করপোরেশন (HICOM) গঠন করে ১৯৮৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম দেশীয় গাড়ি ‘প্রোটন সাগা’ (Proton Saga) বাজারে আনেন। এটি মালয়েশিয়ার জাতীয় গর্ব ও প্রকৌশল আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠে।
  • ইস্পাত, সিমেন্ট ও ভারী রাসায়নিক শিল্পের ভিত্তি স্থাপন করে মালয়েশিয়াকে বিশ্বমানের ইলেকট্রনিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেন।

৪. মেগা অবকাঠামোগত বিপ্লব

মাহাথিরের আমল ছিল আকাশচুম্বী মেগা প্রকল্পের স্বর্ণযুগ, যা কুয়ালালামপুরকে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় শহরে রূপান্তর করে:

  • পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার্স (Petronas Twin Towers): ৮৮ তলাবিশিষ্ট এই ইসলামিক স্থাপত্যরীতি সংবলিত টুইন টাওয়ার একসময় বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন ছিল এবং আজও এটি মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থানের বিশ্বমানের প্রতীক।
  • পুত্রজায়া ও সাইবারজায়া: প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে তিনি সম্পূর্ণ নতুন ও সুপরিকল্পিত সবুজ প্রশাসনিক রাজধানী ‘পুত্রজায়া’ এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের জন্য ‘মাল্টিমিডিয়া সুপার করিডোর’ (MSC)-এর অংশ হিসেবে ‘সাইবারজায়া’ গড়ে তোলেন।
  • কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (KLIA): বিশ্বমানের যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে অত্যাধুনিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং উত্তর-দক্ষিণ এক্সপ্রেসওয়ে (North-South Expressway) নির্মাণ।

৫. ১৯৯৭ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ঐতিহাসিক দূরদর্শিতা

১৯৯৭ সালে এশীয় মুদ্রা সংকটে যখন থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া ভেঙে পড়েছিল এবং আইএমএফ (IMF)-এর কঠোর শর্ত মেনে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন মাহাথির অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন:

  • তিনি আইএমএফ-এর ঋণ ও শর্তাবলি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
  • তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা জল্পনাকারীদের (George Soros প্রমুখ) বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে মালয়েশিয়ার মুদ্রা রিংগিতের মান মার্কিন ডলারের বিপরীতে নির্দিষ্ট করে দেন (১ ডলার = ৩.৮০ রিংগিত) এবং পুঁজিবাজারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন।
  • পশ্চিমা অর্থনীতিবিদরা এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করলেও মাত্র দুই বছরের মধ্যে কোনো বিদেশি ঋণ ছাড়াই মালয়েশিয়া এশিয়ার সংকট থেকে সবচেয়ে দ্রুত ও সফলভাবে বেরিয়ে আসে।

৬. ইসলামী মূল্যবোধের আধুনিকায়ন ও ব্যাংক ইসলাম

মাহাথির প্রমাণ করেন যে ইসলাম এবং আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি পরস্পরের পরিপন্থী নয়:

  • তিনি মালয়েশিয়ায় শক্তিশালী ‘ইসলামিক ব্যাংকিং ও সুকুক (ইসলামিক বন্ড)’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, যার ফলে আজ মালয়েশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম ইসলামিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
  • ১৯৮৩ সালে তিনি আন্তর্জাতিক ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া (IIUM) প্রতিষ্ঠা করেন, যা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য আধুনিক ও ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বিত উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত।

৭. মুসলিম বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক ফোরামে বলিষ্ঠ ভূমিকা

মাহাথির ছিলেন তৃতীয় বিশ্ব ও মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে নির্ভীক ও স্পষ্টভাষী কণ্ঠস্বর। তিনি জাতিসংঘ, ন্যাম (NAM) এবং ওআইসি (OIC)-তে দাঁড়িয়ে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর একচোখা নীতি, ইরাক যুদ্ধ, বসনিয়ার মুসলিম গণহত্যা এবং ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বর্বরতার বিরুদ্ধে আপসহীন ভাষায় কথা বলতেন। তিনি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং ডলারের পরিবর্তে ‘ইসলামিক গোল্ড দিনার’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

মূল্যায়ন ও উপসংহার

ড. মাহাথির মুহাম্মদ কেবল একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন আধুনিক মুসলিম পথপ্রদর্শক। স্বৈরতান্ত্রিক কিছু সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও তাঁর অদম্য সংকল্প, জাতীয়তাবাদী চেতনা ও অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা মালয়েশিয়াকে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছে। আধুনিক মালয়েশিয়ার ইতিহাসের প্রতিটি ইটে ড. মাহাথির মুহাম্মদের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা থাকবে।


৫. ব্রুনাই সালতানাত প্রতিষ্ঠার পটভূমি পর্যালোচনা কর।

[English: Review the background of the establishment of Brunei Sultanate.]

ভূমিকা

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমৃদ্ধ বোর্নিও দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত ক্ষুদ্র অথচ তেল-সম্পদে ঐশ্বর্যশালী এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ‘ব্রুনাই দারুসসালাম’ (Brunei Darussalam)। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও নিরবচ্ছিন্ন টিকে থাকা ইসলামি সালতানাতগুলোর অন্যতম। চতুর্দশ শতাব্দীতে হিন্দু-বৌদ্ধ প্রভাব কাটিয়ে একটি ক্ষুদ্র উপকূলীয় বাণিজ্য রাজ্য থেকে কীভাবে একটি শক্তিশালী ইসলামি সালতানাত গড়ে উঠেছিল, তার ঐতিহাসিক পটভূমি অত্যন্ত চমকপ্রদ ও তাৎপর্যপূর্ণ।

ব্রুনাইয়ের আদি বা প্রাক-ইসলামি পটভূমি

ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ব্রুনাইয়ের আদি রূপ ও অস্তিত্ব বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিতে পাওয়া যায়:

  • চীনা নথিতে ‘পো-নি’ (Po-ni / Boni): ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীর চীনা তাং ও সং রাজবংশের প্রাচীন নথিতে বোর্নিওর উপকূলে ‘পো-নি’ নামক একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্য নগরীর উল্লেখ রয়েছে। এখান থেকে সুগন্ধি কাঠ (কর্পূর), হাতির দাঁত ও পাখির বাসা চীনে রপ্তানি করা হতো।
  • শ্রীবিজয় ও মজপহিত সাম্রাজ্যের অধীনতা: চতুর্দশ শতাব্দীর জাভানিজ মহাকাব্য ‘নগরকৃতাগম’ (Nagarakretagama, ১৩৬৫ খ্রি.)-এ ব্রুনাইকে শক্তিশালী হিন্দু মজপহিত সাম্রাজ্যের একটি করদ রাজ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রুনাই নদী অববাহিকার এই অঞ্চলটি প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত থাকায় এটি ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ব্রুনাই সালতানাত প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পর্যায়ক্রম

ব্রুনাইয়ের ইসলামি সালতানাত প্রতিষ্ঠার পটভূমিকে তিনটি প্রধান সন্ধিক্ষণে পর্যালোচনা করা যায়:

১. আওয়াহ আলাক বেতাতার ও ইসলাম গ্রহণ (প্রথম সুলতান মুহাম্মদ শাহ)

ব্রুনাইয়ের রাজকীয় ইতিহাসগ্রন্থ ‘সিলাসিলাহ রাজা-রাজা ব্রুনাই’ (Silsilah Raja-Raja Brunei) অনুসারে, ব্রুনাইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আওয়াং আলাক বেতাতার (Awang Alak Betatar)। চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে (আনুমানিক ১৩৬৩-১৩৬৮ খ্রি.) তিনি ব্রুনাই নদীর তীরের কামপং আয়ের (Kampong Ayer – পানির ওপর ভাসমান গ্রাম) অঞ্চলে তাঁর শাসন সুসংহত করেন।

পার্শ্ববর্তী শক্তিশালী মুসলিম বাণিজ্য রাজ্য জোহোর বা তেমাসিক (সিঙ্গাপুর)-এর রাজকন্যাকে বিয়ে করার সূত্রে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামি নাম ধারণ করেন সুলতান মুহাম্মদ শাহ (Sultan Muhammad Shah, রাজত্ব: আনু. ১৩৬৩–১৪০২ খ্রি.)। তাঁর ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়েই ব্রুনাইয়ে আনুষ্ঠানিক ইসলামি সালতানাতের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

২. শরিফ আলী ও ইসলামি ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ন

ব্রুনাই সালতানাতকে একটি পূর্ণাঙ্গ থিওক্র্যাটিক ইসলামি রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক শক্তিতে পরিণত করার কৃতিত্ব তৃতীয় সুলতান শরীফ আলী (Sultan Sharif Ali, ১৪২৫-১৪৩২ খ্রি.)-এর।

  • আহলে বায়াতের আগমন: শরীফ আলী ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হাসান (রা.)-এর বংশধর। তিনি সুদূর হেজাজের তায়েফ নগরী থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ব্রুনাইতে আসেন এবং দ্বিতীয় সুলতান আহমদ শাহের কন্যা রত্না কেসুমাকে বিয়ে করেন।
  • আইন ও মসজিদ নির্মাণ: তিনি ব্রুনাইতে প্রথম জামে মসজিদ নির্মাণ করেন, দৃঢ়ভাবে ইসলামি শরীয়াহ আইন জারি করেন এবং একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষামূলক পাথরের শহর (Kota Batu) গড়ে তোলেন।
  • উপাধি ধারণ: তাঁর ন্যায়পরায়ণতা ও ধর্মীয় নিষ্ঠার কারণে তাঁকে ‘সুলতান বারাকাত’ (বরকতময় সুলতান) বলা হতো। ব্রুনাইয়ের বর্তমান রাজপরিবার সরাসরি শরীফ আলীর পবিত্র বংশধারার সাথে সম্পর্কিত।

৩. মালাক্কার পতন ও ব্রুনাইয়ের স্বর্ণযুগ (পঞ্চদশ-ষোড়শ শতক)

১৫১১ সালে পর্তুগিজরা কৌশলগত মুসলিম বাণিজ্য কেন্দ্র মালাক্কা দখল করলে মুসলিম বণিক, আলেম ও পণ্ডিতরা মালাক্কা ছেড়ে ব্রুনাইতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এর ফলে ব্রুনাই রাতারাতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় ইসলামি বাণিজ্য কেন্দ্র ও নৌ-শক্তিতে পরিণত হয়।

  • সুলতান বলকিয়াহর রাজত্ব (পঞ্চম সুলতান, ১৪৮৫-১৫২৪ খ্রি.): তিনি ছিলেন ব্রুনাইয়ের শ্রেষ্ঠ বিজেতা ও পরাক্রমশালী সুলতান। তিনি ‘নাহোদা রাগাম’ (গান গাওয়া নাবিক) নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর নৌবাহিনী সমগ্র বোর্নিও দ্বীপ জয় করে এবং উত্তর ফিলিপাইনের সুলু দ্বীপপুঞ্জ ও ম্যানিলা (সেলুদং) পর্যন্ত ব্রুনাই সালতানাতের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
  • সুলতান হাসান ও শাসনতান্ত্রিক রূপরেখা (নবম সুলতান): তিনি ‘কানুন ব্রুনাই’ নামক ইসলামি সংবিধান ও আদালত ব্যবস্থা চালু করেন, যা সালতানাতকে প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব দান করে।

পরবর্তী সংকট ও টিকে থাকার সংগ্রাম

ষোড়শ শতকের শেষভাগে স্প্যানিশদের সাথে ‘ক্যাস্টিলিয়ান যুদ্ধ’ (Castilian War, ১৫৭৮ খ্রি.) এবং সপ্তদশ শতকে অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধের কারণে ব্রুনাইয়ের শক্তি ক্ষয় হতে থাকে। উনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ অ্যাডভেঞ্চারার জেমস ব্রুক (James Brooke) সারওয়াক দখল করে নিলে ব্রুনাইয়ের আয়তন ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়। অবশেষে ১৮৮৮ সালে ব্রিটিশ সুরক্ষাধীন রাষ্ট্রে (Protectorate) পরিণত হয়ে ব্রুনাই নিজস্ব সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখে।

উপসংহার

১৯৮৪ সালের ১ জানুয়ারি ২৯তম সুলতান হাসানাল বলকিয়াহর নেতৃত্বে ব্রুনাই দারুসসালাম ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করে। আজকের ব্রুনাই সেই চতুর্দশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি সালতানাত এবং ‘মালয় ইসলামি রাজতন্ত্র’ (MIB – Melayu Islam Beraja) দর্শনের এক সমৃদ্ধ ও অবিচল প্রতীক।


৬. রোহিঙ্গাদের পরিচয় দাও। রোহিঙ্গা সংকটের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।

[English: Introduce the Rohingya. Discuss the historical development of the Rohingya crisis.]

ভূমিকা

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত, অধিকারবঞ্চিত ও ভাগ্যহীন জনগোষ্ঠীর নাম ‘রোহিঙ্গা’। নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাস করা সত্ত্বেও সামরিক জান্তার পদ্ধতিগত বর্ণবাদ, জাতিগত নিধনযজ্ঞ এবং রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার শিকার হয়ে আজ তারা নিজ দেশে পরবাসী এবং বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় গ্রহণ করে মানবিক সংকটের এক চরম বাস্তবতা তৈরি করেছে।

রোহিঙ্গাদের নৃ-তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়

রোহিঙ্গারা হলো পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন (ঐতিহাসিক আরাকান) রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে (মংডু, বুথিডং ও রাথিডং) বসবাসকারী একটি সুপ্রাচীন সুন্নি মুসলিম জাতিগোষ্ঠী:

  • নামকরণ ও ব্যুৎপত্তি: ঐতিহাসিকদের মতে, আরাকানের প্রাচীন আঞ্চলিক ও আরবি নাম ছিল ‘রোহাং’ (Rohang) বা ‘রোসাং’ (Roshang)। এই রোহাং অঞ্চলের আদি অধিবাসীদের স্বাভাবিকভাবেই ‘রোহিঙ্গা’ বলা হয়। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে কবি আলাওল ও দৌলত কাজী আরাকানকে ‘রোসাঙ্গ দেশ’ হিসেবেই উল্লেখ করেছেন।
  • নৃ-তাত্ত্বিক সংমিশ্রণ: অষ্টম শতাব্দী থেকে আরব, পারস্য, তুর্কি, মুর এবং মধ্যযুগীয় বাংলা থেকে আগত মুসলিম ব্যবসায়ী, ধর্মপ্রচারক ও যোদ্ধারা আরাকানের স্থানীয় তিব্বতি-বর্মি জনগোষ্ঠীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এক স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মিশ্রণে আজকের রোহিঙ্গা জাতির জন্ম দেয়।
  • ভাষা ও সংস্কৃতি: রোহিঙ্গাদের ভাষা হলো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ‘রোহিঙ্গালিশ’—যার সাথে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার গভীর সাদৃশ্য রয়েছে এবং এতে প্রচুর আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দের সংমিশ্রণ রয়েছে।
  • আরাকানের মুসলিম ইতিহাস: ১৪৩০ সালে আরাকানের বৌদ্ধ রাজা নরামিখলা (মিন সো মন) গৌড়ের সুলতান জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহের সামরিক সহায়তায় সিংহাসন ফিরে পান এবং ইসলাম গ্রহণ করে সোলায়মান শাহ নাম ধারণ করেন। পরবর্তী দুই শতাব্দীরও বেশি সময় আরাকানের বৌদ্ধ রাজারাও মুসলিম উপাধি ধারণ করতেন এবং আরবি-ফারসি মুদ্রা জারি করতেন। এই সময়ে আরাকান রাজদরবারে সৈয়দ আলাওল ও দৌলত কাজীর মতো বিখ্যাত বাঙালি মুসলিম কবিরা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ (যেমন: পদ্মাবতী) রচনা করেছিলেন।

রোহিঙ্গা সংকটের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ

রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফল:

১. বর্মি আগ্রাসন ও আরাকান বিজয় (১৭৮৪ খ্রি.)

১৭৮৪ সালে উগ্র বর্মি বৌদ্ধ রাজা বোধপায়া (Bodawpaya) স্বাধীন আরাকান রাজ্য আক্রমণ করে দখল করেন। বর্মি সৈন্যরা আরাকানের ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করে, হাজার হাজার মুসলিম ও রাখাইনকে হত্যা করে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষকে দাস হিসেবে মধ্য বার্মায় নিয়ে যায়। নির্যাতিত হয়ে তৎকালীন সময়েই প্রায় দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা ব্রিটিশ ভারতের চট্টগ্রামে পালিয়ে আসে।

২. ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল ও বিভাজন (১৮২৪-১৯৪৮ খ্রি.)

১৮২৪-২৬ সালের প্রথম অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের পর আরাকান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মিজ ও রাখাইন বৌদ্ধরা জাপানি বাহিনীর সাথে হাত মেলায়, অন্যদিকে রোহিঙ্গারা ব্রিটিশ মিত্রবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করে। ১৯৪২ সালের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রায় লক্ষাধিক নিরীহ রোহিঙ্গা মুসলিমকে রাখাইন চরমপন্থীরা হত্যা করে। এর ফলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চিরস্থায়ী অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়।

৩. মিয়ানমারের স্বাধীনতা ও সামরিক জান্তার উত্থান (১৯৪৮ ও ১৯৬২ খ্রি.)

১৯৪৮ সালে বার্মার স্বাধীনতার প্রাথমিক পর্যায়ে রোহিঙ্গারা সমান নাগরিক মর্যাদা ভোগ করত। দেশটির প্রথম সংবিধানে তাদের অন্যতম আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধি ও মন্ত্রী (এম এ গফুর, সুলতান মাহমুদ) ছিলেন এবং রেডিও রেঙ্গুনে রোহিঙ্গা ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হতো। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করার পর বার্মিজ উগ্র জাতীয়তাবাদ ও চরমপন্থী বৌদ্ধ আধিপত্যবাদকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং রোহিঙ্গাদের বহিরাগত ‘বাঙালি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করার কুৎসিত চক্রান্ত শুরু হয়।

৪. অপারেশন নাগামিন বা কিং ড্রাগন অপারেশন (১৯৭৮ খ্রি.)

১৯৭৮ সালে জেনারেল নে উইনের সামরিক জান্তা রাখাইনে তথাকথিত অবৈধ অভিবাসী বিতাড়নের নামে ‘অপারেশন নাগামিন’ (Operation Dragon King) পরিচালনা করে। হত্যা, ধর্ষণ ও গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিলে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। পরবর্তীতে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে অধিকাংশ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়া হলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি।

৫. ১৯৮২ সালের বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন (1982 Citizenship Law)

রোহিঙ্গা নিপীড়নের সবচেয়ে কালো ও প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার ছিল সামরিক জান্তা প্রবর্তিত ১৯৮২ সালের বার্মিজ নাগরিকত্ব আইন। এই আইনে ১৮২৩ সালের (প্রথম ব্রিটিশ যুদ্ধের পূর্ববর্তী) পূর্বে বার্মায় বসবাসকারী ১৩৫টি নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গাদের এই তালিকা থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দেওয়া হয়। রাতারাতি একটি প্রাচীন জাতিকে নিজ ভূমিতে ‘রাষ্ট্রহীন’ (Stateless) এবং অবৈধ অভিবাসী বানিয়ে দেওয়া হয়। তাদের অবাধ চলাচল, বিবাহ, সন্তান গ্রহণ, উচ্চশিক্ষা ও ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।

৬. অপারেশন পিয়া থায়া (১৯৯১-১৯৯২ খ্রি.)

মিয়ানমার সামরিক জান্তা পুনরায় রোহিঙ্গাদের ওপর চরম নির্যাতন শুরু করলে ১৯৯১-৯২ সালে দ্বিতীয় দফায় প্রায় আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এই দফাতেও কিছু রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হলেও সংকট জিইয়ে রাখা হয়।

৭. ২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও প্রাতিষ্ঠানিক বন্দিশিবির

২০১২ সালে রাখাইন চরমপন্থী ও সামরিক জান্তার যোগসাজশে এক রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানো হয়। লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে রাখাইনের ভেতরেই উন্মুক্ত বন্দিশিবিরে (IDP Camps) অমানবিক অবস্থায় আটকে রাখা হয়।

৮. ২০১৭ সালের পরিকল্পিত জাতিগত নিধনযজ্ঞ (Ethnic Cleansing & Genocide)

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (ARSA)-র পুলিশ চৌকিতে কথিত হামলার অজুহাতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও স্থানীয় সশস্ত্র মগ মিলিশিয়ারা রোহিঙ্গাদের ওপর শতাব্দীর সবচেয়ে পৈশাচিক পরিকল্পিত গণহত্যা পরিচালনা করে। হাজার হাজার শিশুকে আগুনে নিক্ষেপ, নারীদের গণধর্ষণ এবং শত শত গ্রাম সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। জাতিসংঘ এই অভিযানকে ‘জাতিগত নিধনের পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ (Textbook example of ethnic cleansing) হিসেবে আখ্যায়িত করে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাড়ে সাত লক্ষাধিক নিঃস্ব রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

বর্তমান সংকট ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরে ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা এক অনিশ্চিত মানবিক সংকটে দিনাতিপাত করছে। ২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (OIC)-র পক্ষে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) গণহত্যার মামলা দায়ের করে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারসহ রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিচ্ছে, কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক জান্তার অনীহা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে সংকট সমাধান এখনো সুদূরপরাহত।

উপসংহার

রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবতাবোধের এক জ্বলন্ত ট্র্যাজেডি। রাখাইনে তাদের জন্মগত নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা ব্যতীত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা কখনোই সম্ভব নয়।


সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন

[দ্রষ্টব্য: যেকোনো দুইটি প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১০: ১০ × ২ = ২০]

৭. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভৌগোলিক পরিচিতি উল্লেখ কর।

[English: Point out the geographical introduction of South-East Asia.]

ভূমিকা

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিশ্ব মানচিত্রে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল, প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মহাসড়কে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এটি এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশে এবং ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত।

ভৌগোলিক সীমারেখা ও অবস্থান

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া উত্তরে চীন, পশ্চিমে ভারত ও বঙ্গোপসাগর, পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগর এবং দক্ষিণে অস্ট্রেলিয়া ও ভারত মহাসাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত। প্রায় ৪৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চলটি ১১টি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত। ভৌগোলিক গঠনের ওপর ভিত্তি করে সমগ্র অঞ্চলকে দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা হয়:

  • ১. মূল ভূখণ্ড বা ইন্দোচীন অঞ্চল (Mainland South-East Asia): এশিয়া মহাদেশের সাথে সরাসরি সংযুক্ত পাহাড়ি ও নদী অববাহিকাপূর্ণ অঞ্চল। এর মধ্যে রয়েছে—মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়ার পশ্চিমাংশ (উপদ্বীপীয় মালয়েশিয়া)। এই অঞ্চলের প্রধান নদীগুলো হলো মেকং, ইরাবতী, সালউইন ও চাও ফ্রায়া।
  • ২. সামুদ্রিক দ্বীপপুঞ্জ (Maritime South-East Asia / Malay Archipelago): বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত, যা হাজার হাজার ছোট-বড় দ্বীপে বিভক্ত। এর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো হলো—ইন্দোনেশিয়া (বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপরাষ্ট্র, ১৭ হাজারের বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত), মালয়েশিয়ার পূর্বাংশ (সাবাহ ও সারওয়াক), ব্রুনাই দারুসসালাম, ফিলিপাইন (৭ হাজারের বেশি দ্বীপ), সিঙ্গাপুর এবং পূর্ব তিমুর।

ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব

  • মালাক্কা প্রণালী (Strait of Malacca): মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মাঝে অবস্থিত এই সরু জলপথটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্য করিডোর। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেল চীন ও পূর্ব এশিয়ায় যাওয়ার প্রধান পথ এটি।
  • আবহাওয়া ও অর্থনীতি: অঞ্চলটি নিরক্ষীয় ও মৌসুমি জলবায়ুর অন্তর্গত, যা সারা বছর বৃষ্টিপাত ও উর্বর কৃষিজমির নিশ্চয়তা দেয়। এটি প্রাকৃতিক রবার, পাম অয়েল, টিন, পেট্রোলিয়াম এবং চাল উৎপাদনের শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্র। এই অঞ্চলের রাষ্ট্রসমূহ ‘আসিয়ান’ (ASEAN) জোটের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সুসংহত।

৮. ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ‘ইসলামি নবজাগরণ’ এ ধারাটি ব্যাখ্যা কর।

[English: Explain the term ‘Islamic Renaissance’ in Indonesian Nationalist Movement.]

ভূমিকা

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ডাচ ঔপনিবেশিক শাসনের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে ইন্দোনেশিয়ার জনগণের মুক্তি চেতনায় সবচেয়ে শক্তিশালী ও অনুপ্রেরণাদায়ী অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল ‘ইসলামি নবজাগরণ’ (Islamic Renaissance)। হাজার হাজার দ্বীপে বিভক্ত ইন্দোনেশিয়ার বহুধা বিভক্ত জনগোষ্ঠীকে একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করার প্রথম সর্বজনীন পরিচয় ছিল ইসলাম।

ইসলামি নবজাগরণের প্রধান রূপ ও সংগঠনসমূহ

ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামি নবজাগরণ ও জাতীয়তাবাদী জাগরণ প্রধানত কয়েকটি প্রভাবশালী ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছিল:

  • সারেকাত ইসলাম (Sarekat Islam – ১৯১২ খ্রি.): পূর্বে ১৯০৫ সালে গঠিত সারেকাত দাগাং ইসলামের ওপর ভিত্তি করে প্রখ্যাত জাতীয়তাবাদী নেতা ওমর সাঈদ চকরামিনোতো (H.O.S. Tjokroaminoto)-র নেতৃত্বে ১৯১২ সালে সারেকাত ইসলাম পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। এটি ছিল ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসের প্রথম সফল গণআন্দোলন। কয়েক লাখ সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীকে একত্র করে এটি ডাচ অর্থনৈতিক শোষণ এবং ঔপনিবেশিক অবিচারের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে প্রতিবাদ জানায়। পরবর্তীতে সুকর্ণো এই চকরামিনোতোর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেই রাজনীতিতে এসেছিলেন।
  • মুহাম্মাদিয়া (Muhammadiyah – ১৯১২ খ্রি.): কিয়াহী হাজি আহমদ দাহলান কর্তৃক যোগজাকার্তায় প্রতিষ্ঠিত একটি শক্তিশালী আধুনিক সংস্কারবাদী ইসলামি আন্দোলন। মিসরের মুহাম্মদ আবদুহ ও রশীদ রিদার চিন্তাধারা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এই আন্দোলন কুসংস্কার, শিরক ও বেদায়াত দূর করে ইসলামি শিক্ষার আধুনিকায়ন, হাসপাতাল ও আধুনিক স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতিকে স্বাবলম্বী করে তোলে।
  • নাহদাতুল ওলামা (Nahdlatul Ulama / NU – ১৯২৬ খ্রি.): সনাতনী আলেমদের নেতৃত্বে হাশিম আশয়ারী (Hasyim Asy’ari) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। এটি গ্রামীণ এলাকায় ইসলামিক বোর্ডিং স্কুল (Pesantren)-এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং উপনিবেশবিরোধী জিহাদের চেতনা জাগ্রত করে। ১৯৪৫ সালে হাশিম আশয়ারীর ঘোষিত ‘জিহাদ রেজোলিউশন’ ডাচ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ যুদ্ধে ইন্দোনেশিয়ার জনগণকে অনুপ্রাণিত করেছিল।

তাৎপর্য

ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম নিছক একটি আচারসর্বস্ব ধর্ম ছিল না; বরং তা ছিল জাতীয় আত্মপরিচয় রক্ষার ঢাল। ইসলামি নবজাগরণই সর্বপ্রথম সাধারণ ইন্দোনেশীয়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করেছিল, যা পরবর্তীতে ১৯৪৫ সালে জাতীয় স্বাধীনতার রূপরেখা বাস্তবায়নে সর্বাধিক ভূমিকা রেখেছিল।


৯. ফিলিপাইনে मुसलमानों বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণ কর।

[English: Analyze the present political and social position of the Muslims in Philippines.]

ভূমিকা

ফিলিপাইনের মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু অংশ হলো মুসলিম জনগোষ্ঠী, যারা ঐতিহাসিকভাবে ‘মোরো’ (Moro) নামে পরিচিত। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও দ্বীপ এবং সুলু ও তাওয়ি-তাওয়ি দ্বীপপুঞ্জে এদের প্রধান বসতি। স্প্যানিশ ও আমেরিকান ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে ফিলিপাইন সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘ পাঁচ দশকের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিপাইনের মুসলিম সমাজে এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর সূচিত হয়েছে।

বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা ও ‘বার্ম’ (BARMM) প্রতিষ্ঠা

  • বাংসামোরো স্বায়ত্তশাসন (BARMM): ফিলিপাইন সরকার এবং সবচেয়ে বড় মুসলিম প্রতিরোধ দল মরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (MILF)-এর মধ্যে দীর্ঘ শান্তি আলোচনার পর ২০১৮ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘বাংসামোরো অর্গানিক ল’ (BOL)-এর ভিত্তিতে ২০১৯ সালে ‘বাংসামোরো স্বায়ত্তশাসিত মুসলিম মিন্দানাও অঞ্চল’ (Bangsamoro Autonomous Region in Muslim Mindanao – BARMM) আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
  • স্বশাসিত সংসদ ও ক্ষমতা: মরো মুসলিমরা বর্তমানে নিজস্ব সংসদীয় ব্যবস্থা, নিজস্ব পতাকা, প্রতীক ও বাজেটের মাধ্যমে তাদের ভূখণ্ড পরিচালনা করছে। এমআইএলএফ চেয়ারম্যান মুরাদ ইব্রাহিম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিচার ব্যবস্থায় শরীয়াহ আদালতের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
  • অস্ত্র সমর্পণ ও মূলধারার রাজনীতি: শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে হাজার হাজার সাবেক মুজাহিদ তাদের অস্ত্র সমর্পণ করে বেসামরিক জীবনে ফিরে এসেছে এবং পুলিশ ও প্রশাসনে যুক্ত হচ্ছে।
  • চরমপন্থার চ্যালেঞ্জ: মূলধারার শান্তির বাইরে কিছু উগ্র উপদল (যেমন আবু সায়াফ, বিআইএফএফ বা দাউলাহ ইসলামিয়া)—যারা ২০১৭ সালে মারায়ি শহর দখল করেছিল—তাদের উগ্র তৎপরতা এখনও মাঝে মাঝে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা

  • অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও পুনর্গঠন: দশকের পর দশক যুদ্ধের কারণে মিন্দানাও অঞ্চলটি এখনও ফিলিপাইনের সবচেয়ে দরিদ্রতম এলাকা। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আধুনিক প্রযুক্তির সুযোগ সেখানে সীমিত। তবে স্বায়ত্তশাসন লাভের পর অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট, স্কুল ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সরকারি বিনিয়োগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
  • শিক্ষা ও মাদ্রাসা ব্যবস্থা: জাতীয় কারিকুলামের পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামি পাঠ্যক্রম চালুর ফলে মুসলিম তরুণদের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
  • সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা: ক্রিশ্চিয়ান অধ্যুষিত ফিলিপাইনে পূর্বে যেখানে মোরোদের হেয় চোখে দেখা হতো, সেখানে বর্তমান সংবিধানে ও সমাজে তাদের বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস ও মুসলিম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য জাতীয় মর্যাদায় স্বীকৃত হচ্ছে।

উপসংহার

সারসংক্ষেপে বলা যায়, ফিলিপাইনের মুসলিমরা বর্তমানে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সংঘাতময় অতীত পেরিয়ে এক নতুন গণতান্ত্রিক ও স্বায়ত্তশাসিত রাজনৈতিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং পারস্পরিক আস্থাই এই শান্তিকে চিরস্থায়ী রূপ দিতে পারে।


১০. থাকসিন সিনাওয়াত্রা সরকারের আমলে থাই মুসলিমদের প্রতি সরকারের নীতি আলোচনা কর।

[English: Discuss the government policies towards Thai Muslims during Thaksin Shinawatra’s government.]

ভূমিকা

বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ থাইল্যান্ডের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত তিনটি মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশ—পত্তানি (Pattani), ইয়ালা (Yala) এবং নারাথিওয়াত (Narathiwat)—ঐতিহাসিকভাবে স্বাধীন মালয় মুসলিম ‘পাতানি সালতানাত’-এর অংশ ছিল। ১৯০৯ সালে ব্রিটিশ ও শ্যামদেশের চুক্তির মাধ্যমে এটি থাইল্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে থাকসিন সিনাওয়াত্রা (Thaksin Shinawatra) সরকারের চরম আগ্রাসী ও দমনমূলক নীতি এই অঞ্চলে দশকব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও গভীর ক্ষোভের সূচনা করেছিল।

থাকসিন সরকারের বিতর্কিত ও দমনমূলক নীতিসমূহ

থাকসিন সিনাওয়াত্রা দক্ষিণ থাইল্যান্ডের সংবেদনশীল জাতিগত ও ধর্মীয় ইতিহাসকে উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ ভুল সামরিক কৌশল গ্রহণ করেন:

১. ‘লৌহমুষ্টি নীতি’ ও শান্তি সংস্থার বিলুপ্তি

দায়িত্ব গ্রহণের পরই ২০০২ সালে থাকসিন পূর্ববর্তী সরকারগুলোর প্রতিষ্ঠিত ‘সাউদার্ন বর্ডার প্রভিন্সেস অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সেন্টার’ (SBPAC) নামক বেসামরিক সমন্বয় ও যোগাযোগ সংস্থাটি ভেঙে দেন। তিনি মুসলিমদের ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভ ও অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা হিসেবে না দেখে নিছক ‘ডাকাত ও চরমপন্থী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন এবং সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলকে সামরিকীকরণ করেন।

২. যুদ্ধাপরাধতুল্য বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম

থাকসিনের কুখ্যাত ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ (War on Drugs – ২০০৩ খ্রি.)-এর সুযোগ নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীকে অবারিত ক্ষমতা দেওয়া হয়। শত শত নিরীহ মুসলিম যুবক, মাদ্রাসা শিক্ষক এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই আটক, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়। বিশেষ করে মানবাধিকার আইনজীবী সোমচাই নীলাপাইজিত (Somchai Neelapaijit)—যিনি নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষে আইনি লড়াই করছিলেন—২০০৪ সালে পুলিশ কর্তৃক অপহৃত ও গুম হন, যা মুসলিম সমাজে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করে।

৩. ক্রু সে মসজিদ ট্র্যাজেডি (Krue Se Mosque Incident – ২৮ এপ্রিল ২০০৪ খ্রি.)

২০০৪ সালের ২৮ এপ্রিল ভোরে বিচ্ছিন্নতাবাদী হামলার পর কিছু তরুণ পত্তানির ঐতিহাসিক ও পবিত্র ‘ক্রু সে মসজিদ’-এ আশ্রয় নেয়। সেনাবাহিনী কোনো আলোচনার সুযোগ না দিয়ে ভারি অস্ত্র, রকেট ও স্নাইপার দিয়ে মসজিদে নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে ভেতরে অবস্থানরত ৩২ জন মুসলিমকে হত্যা করে। এই পবিত্র মসজিদে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার ঘটনা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়।

৪. তাক বাই ট্র্যাজেডি (Tak Bai Incident – ২৫ অক্টোবর ২০০৪ খ্রি.)

এটি ছিল আধুনিক থাইল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম নির্মম ও অমানবিক বর্বরতা। নারাথিওয়াতের তাক বাই থানায় ছয়জন গ্রামবাসীর মুক্তির দাবিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী প্রায় দেড় হাজার মুসলিম জনতার ওপর পুলিশ ও সেনাবাহিনী গুলিবর্ষণ করে প্রথমে ৭ জনকে হত্যা করে। এরপর গ্রেপ্তারকৃত প্রায় তেরো শত মুসলিমকে হাত-পা বেঁধে মাছের মতো স্তরে স্তরে সামরিক ট্রাকে গাদাগাদি করে পাঁচ ঘণ্টার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর দেখা যায়, ট্রাকের ভেতরে শ্বাসরোধে ও থেঁতলে গিয়ে ৭৮ জন নিরপরাধ মুসলিম যুবক মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেছে

থাকসিন সরকারের নীতির বিষময় প্রতিক্রিয়া

থাকসিন সিনাওয়াত্রার এই অবিবেচনাপ্রসূত ও নিষ্ঠুর দমননীতির ফলে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে উল্টো বিস্ফোরণ ঘটে। আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ‘বারিসান রেভোলুসি ন্যাশনাল’ (BRN)-এর মতো সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো পুনরায় প্রাণ ফিরে পায়। প্রতিদিন বোমা হামলা, সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষকদের ওপর আক্রমণ এবং উভয়পক্ষের সংঘাতে পরবর্তী কয়েক বছরে সাত সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

উপসংহার

পরবর্তীতে ২০০৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থাকসিন সিনাওয়াত্রা নিজে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, দক্ষিণাঞ্চলের মুসলিমদের প্রতি তাঁর ‘লৌহমুষ্টি নীতি’ ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় ঐতিহাসিক বিপর্যয় ও মারাত্মক ভুল।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: ডাচ ‘কালচার ব্যবস্থা’র মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: ১৮৩০ সালে গভর্নর জেনারেল ভ্যান ডেন বোশ কর্তৃক জাভায় প্রবর্তিত কালচার ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপীয় বাজারে চাহিদাসম্পন্ন অর্থকরী ফসল (কফি, চিনি, নীল ইত্যাদি) কৃষকদের দিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে চাষ করিয়ে নেদারল্যান্ডসের দেউলিয়াত্ব দূর করা এবং ডাচ রাজকোষের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক মুনাফা আহরণ করা।

প্রশ্ন ২: ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর শাসনামলকে কী বলা হতো এবং এর ভিত্তি কী ছিল?

উত্তর: প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর দীর্ঘ ৩২ বছরের (১৯৬৬-১৯৯৮ খ্রি.) শাসনকালকে ‘নতুন ব্যবস্থা’ বা ‘অরবা’ (Orba / New Order) বলা হতো। এর মূল ভিত্তি ছিল সামরিক বাহিনীর দ্বিবিধ ভূমিকা (Dwifungsi), জাতীয় দর্শন পঞ্চশীলার একচ্ছত্র ব্যবহার, গোলকার দলের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তীব্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন।

প্রশ্ন ৩: ‘পাংকর চুক্তি’র ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?

উত্তর: ১৮৭৪ সালে পেরাকের সুলতান ও ব্রিটিশদের মধ্যে স্বাক্ষরিত পাংকর চুক্তি (Pangkor Treaty)-র মাধ্যমে মালয় অঞ্চলে প্রথমবারের মতো ‘ব্রিটিশ রেসিডেন্ট প্রথা’ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। এর মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম ও মালয় প্রথা ব্যতীত সমস্ত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্রিটিশ রেসিডেন্টের হাতে ন্যস্ত হয় এবং মালয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশের সূচনা হয়।

প্রশ্ন ৪: ড. মাহাথির মুহাম্মদের ‘লুক ইস্ট’ নীতি কী ছিল?

উত্তর: ১৯৮২ সালে ঘোষিত মাহাথির মুহাম্মদের ‘লুক ইস্ট পলিসি’ (Look East Policy)-র মূল বক্তব্য ছিল পাশ্চাত্য দেশগুলোর অন্ধ অনুকরণ পরিহার করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, উৎপাদনশীলতা, ব্যবসায়িক সততা এবং কঠোর কর্মশৃঙ্খলাকে মালয়েশিয়ার শিল্পায়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করা।

প্রশ্ন ৫: ব্রুনাই সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

উত্তর: ব্রুনাই সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চতুর্দশ শতাব্দীর শাসক আওয়াং আলাক বেতাতার (Awang Alak Betatar), যিনি ইসলাম গ্রহণের পর ‘সুলতান মুহাম্মদ শাহ’ (রাজত্ব: আনু. ১৩৬৩-১৪০২ খ্রি.) নাম ধারণ করেন। পরবর্তীতে তৃতীয় সুলতান শরীফ আলীর আমলে ব্রুনাই একটি পূর্ণাঙ্গ শক্তিশালী ইসলামি সালতানাতে রূপ লাভ করে।

প্রশ্ন ৬: ১৯৮২ সালের বার্মিজ নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের কীভাবে অধিকারবঞ্চিত করা হয়?

উত্তর: ১৯৮২ সালের বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে মিয়ানমারের ১৩৫টি স্বীকৃত জাতীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকা থেকে রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দেওয়া হয়। ফলে বংশপরম্পরায় আরাকানে বসবাস করা সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা রাতারাতি নিজ ভূখণ্ডে ‘রাষ্ট্রহীন’ (Stateless) জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয় এবং তাদের মৌলিক মানবিক ও নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *