পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৫৫
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ (নবম পত্র)
[Modern Muslim States in South and South-East Asia (Paper IX)]
বিষয় কোড: ২০৫৮০৯
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
ক বিভাগ—রচনামূলক প্রশ্ন
[যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১৫: ১৫ × ৪ = ৬০]
১. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত ইসলাম বিস্তারের কারণ নির্ণয় কর।
[English: Trace the causes of rapid spreading of Islam in South-East Asia.]
ভূমিকা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া—বিশেষ করে আধুনিক ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, দক্ষিণ থাইল্যান্ড (পাটানি) এবং দক্ষিণ ফিলিপাইন (মিন্দানাও)—বর্তমান মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ও কৌশলগত অঞ্চল। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়া এই ভৌগোলিক বলয়েই অবস্থিত। কিন্তু ইসলামের অন্যান্য অঞ্চলের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলামের বিস্তার কোনো যুদ্ধবিগ্রহ, সামরিক অভিযান বা তলোয়ারের জোরে ঘটেনি; বরং এটি ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সুফি সাধকদের আধ্যাত্মিক পরশ, সামাজিক সাম্য এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে এক অপূর্ব সমন্বয়ের শান্তিময় ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত ইসলাম বিস্তারের প্রধান প্রধান কারণসমূহ
- ১. আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্য ও মুসলিম বণিকদের উন্নত চরিত্র:
মালাক্কা প্রণালী ছিল প্রাচীন ও মধ্যযুগে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আন্তর্জাতিক মসলা বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। আরব উপদ্বীপ, পারস্য উপসাগর, ভারতের গুজরাট, মালাবার ও বাংলা থেকে হাজার হাজার মুসলিম বণিক জাহাজ নিয়ে সুমাত্রা ও মালয়ে আসতেন। মনসুন বা মৌসুমি বায়ুর গতিপ্রকৃতির কারণে বিদেশি বণিকদের সেখানে কয়েক মাস অবস্থান করতে হতো। এই মুসলিম ব্যবসায়ীদের চারিত্রিক সততা, ওজনে সঠিক পরিমাপ, পরিচ্ছন্নতা, অমায়িক আচরণ এবং বাণিজ্যিক ন্যায়পরায়ণতা স্থানীয় সাধারণ মানুষকে ইসলামের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। - ২. সুফি সাধক ও প্রচারকদের আত্মত্যাগী আধ্যাত্মিক ভূমিকা:
সুফি মতবাদ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলাম বিস্তারের প্রধানতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। কাদিরিয়া, শাত্তারিয়া এবং নকশবন্দিয়া তরিকার সুফিরা স্থানীয় হিন্দু-বৌদ্ধ ও সর্বপ্রাণবাদী (Animist) সাংস্কৃতিক রীতিনীতিকে সরাসরি বর্জন না করে সেগুলোকে ইসলামি তাওহীদি রূপ দিয়েছিলেন। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে ‘ওয়ালী সঙ্গ’ (Wali Sanga বা নয়জন শ্রদ্ধেয় সুফি দরবেশ)-এর অবদান ছিল অতুলনীয়। উদাহরণস্বরূপ, সুসান কালিজাগা স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী ছায়ানাট্য বা ‘ওয়ায়াং কুলিত’ (Wayang Kulit)-এর কাহিনীতে ইসলামি আদর্শ ও তাওহীদের বার্তা সংযোজন করে লাখ লাখ মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে এসেছিলেন। - ৩. রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও স্থানীয় শাসকদের ইসলাম গ্রহণ:
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, যখনই কোনো স্থানীয় রাজা বা সুলতান ইসলাম গ্রহণ করতেন, তাঁর সমগ্র প্রজা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামে দীক্ষিত হতো। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলো ১৪১৪ খ্রিস্টাব্দে মালাক্কা সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা পরমেস্বরার ইসলাম গ্রহণ (সুলতান ইস্কান্দার শাহ নাম ধারণ)। মালাক্কার সুলতানরা ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন এবং সমগ্র দ্বীপপুঞ্জে ইসলামি আলেম ও প্রচারকদের সরকারি খরচে প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে উত্তর সুমাত্রার আচেহ সালতানাত, জাভার দেমাক, বানতেন ও মাত্তারাম সালতানাত সমগ্র অঞ্চলে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলাম বিস্তারকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে। - ৪. বৈবাহিক সম্পর্ক ও সামাজিক মেলবন্ধন (Inter-marriage):
আরব ও ভারতীয় মুসলিম বণিকরা ছিলেন অত্যন্ত ধনী ও মার্জিত। তাঁরা স্থানীয় আদিবাসী প্রধান ও রাজপরিবারের নারীদের বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হন। এই বৈবাহিক সম্পর্কের ফলে ইসলাম খুব দ্রুত স্থানীয় আভিজাত্য, রাজদরবার এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষস্তরে স্থায়ী ভিত্তি লাভ করে। - ৫. বর্ণাশ্রম ও সামাজিক বৈষম্যহীন ইসলামের সাম্যবাদ:
ইসলাম আগমনের পূর্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শ্রীবিজয়া ও মজাপহিতের মতো শক্তিশালী হিন্দু-বৌদ্ধ সাম্রাজ্য বিদ্যমান ছিল। সেখানে সমাজে কঠোর জাতপাত, বর্ণাশ্রম ও অর্থনৈতিক দাসপ্রথা সাধারণ কৃষকদের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। ইসলামে কোনো বর্ণভেদ নেই, রাজা ও প্রজা একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করে—এই সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও মানবিক সাম্যবাদী দর্শন শোষিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে দ্রুত ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিল। - ৬. পশ্চিমা পর্তুগিজ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও আদর্শিক ঢাল:
১৫১১ সালে পর্তুগিজরা মালাক্কা দখল করে চরম ধর্মীয় নির্যাতন শুরু করলে স্থানীয় মুসলিম সালতানাতসমূহ (বিশেষ করে আচেহ) পর্তুগিজ ও পরবর্তীতে ডাচদের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধের প্রধান আদর্শিক প্রতীক হিসেবে ইসলামকে গ্রহণ করে। ফলে ইসলাম হয়ে ওঠে উপনিবেশবিরোধী স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।
উপসংহার
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলামের বিস্তার মানব ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন। রক্তপাতহীনভাবে নৈতিক চরিত্র, অর্থনৈতিক সততা ও সুফি সাধনার মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সাংস্কৃতিক অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করে ইসলাম সেখানে চিরস্থায়ী শিকড় গেড়েছিল।
২. জাতীয়তাবাদ কী? মালয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনা উন্মেষের অন্তরায়সমূহ চিহ্নিত কর।
[English: What is nationalism? Identify the obstacles to the development of nationalist consciousness in Malaya.]
জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা ও স্বরূপ (Definition of Nationalism)
জাতীয়তাবাদ হলো একটি নির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি, যার মাধ্যমে তারা অভিন্ন ভাষা, সাহিত্য, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং ভৌগোলিক আবাসভূমির ভিত্তিতে নিজেদেরকে অন্যান্য মানবগোষ্ঠী থেকে স্বতন্ত্র মনে করে এবং নিজেদের সার্বভৌম ভাগ্য নির্ধারণের লক্ষ্যে একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র (Nation-State) গঠনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যান্স কোন (Hans Kohn)-এর মতে, “জাতীয়তাবাদ হলো এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তির আনুগত্য প্রধানত নিবেদিত থাকে জাতিরাষ্ট্রের প্রতি।”
মালয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনা উন্মেষের অন্তরায়সমূহ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশ (যেমন ইন্দোনেশিয়া বা ভিয়েতনাম)-এর তুলনায় ব্রিটিশ শাসনাধীন মালয় উপদ্বীপে (বর্তমান মালয়েশিয়ায়) একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয়তাবাদী চেতনা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত বিলম্বিত, ধীরগতিসম্পন্ন ও জটিল। এর নেপথ্যে যে সমস্ত কাঠামোগত ও সামাজিক অন্তরায় বিদ্যমান ছিল, তা নিচে চিহ্নিত করা হলো:
- ১. বহুজাতিভিত্তিক জনগোষ্ঠীর তীব্র বিভাজন (Plural Society):
ব্রিটিশরা তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থে রাবার বাগান ও টিনের খনিগুলোতে কাজ করানোর জন্য চীন ও ভারত থেকে লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিক মালয়ে নিয়ে আসে। ফলে ১৯৩১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেখা যায় যে, অভিবাসী চীনা ও ভারতীয়দের সম্মিলিত জনসংখ্যা স্থানীয় আদিবাসী মালয়দের (Bumiputera) সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। এই তিনটি প্রধান জনগোষ্ঠীর ধর্ম (ইসলাম, বৌদ্ধ/তাও এবং হিন্দু), ভাষা, রীতিনীতি ও সংস্কৃতির মধ্যে কোনো মেলবন্ধন ছিল না। তাদের আনুগত্য ছিল নিজ নিজ মাতৃভূমির প্রতি, ফলে একটি সমন্বিত ‘মালয়ান জাতীয়তাবাদ’ গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। - ২. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক খণ্ডবিখণ্ডতা (Feudal & Administrative Fragmentation):
ব্রিটিশরা সমগ্র মালয়কে একক কোনো প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে আনেনি; বরং তাদের কুখ্যাত ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতির অংশ হিসেবে তারা মালয়কে তিনটি ভিন্ন স্তরে বিভক্ত করে রেখেছিল:- স্ট্রেইটস সেটলমেন্টস (Straits Settlements): পেনাং, মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর—যা সরাসরি ব্রিটিশ ক্রাউন কলোনি ছিল।
- ফেডারেটেড মালয় স্টেটস (FMS): পেরাক, সেলাঙ্গর, নেগেরি সেমবিলান ও পাহাং—যেখানে ব্রিটিশ রেসিডেন্টের মাধ্যমে শাসন চলত।
- আনফেডারেটেড মালয় স্টেটস (UFMS): জোহর, কেদাহ, কেলান্তান, তেরেঙ্গানু ও পারলিস—যেখানে স্থানীয় সুলতানরা কিছুটা বেশি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতেন।
এই প্রশাসনিক বিভাজনের কারণে জনগণের মধ্যে কোনো একক সর্ব-মালয় জাতীয় অনুভূতির উন্মেষ ঘটতে পারেনি।
- ৩. স্থানীয় সুলতানদের প্রতি অন্ধ আনুগত্য (Assabiyyah to Sultans):
সাধারণ মালয় জনগোষ্ঠী কোনো অখণ্ড জাতীয়তাবাদী ধারণায় বিশ্বাসী ছিল না; তাদের সর্বোচ্চ আনুগত্য নিবেদিত ছিল তাদের নিজ নিজ স্থানীয় সুলতানের প্রতি। ফলে কেলান্তানের একজন মালয় নিজেকে পেরাকের মালয় থেকে ভিন্ন রাজ্যের নাগরিক মনে করত। - ৪. ব্রিটিশদের ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ এবং অর্থনৈতিক শ্রমবিভাজন:
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তিন জাতিকে তিনটি আলাদা অর্থনৈতিক গণ্ডিতে আবদ্ধ রেখেছিল। মালয়দের ঐতিহ্যবাহী ধান চাষ ও মৎস্য শিকারে সীমাবদ্ধ রাখা হয়; চীনাদের শহরের আধুনিক ব্যবসা ও টিন খনিতে এবং ভারতীয়দের দুর্গম রাবার বাগানে আলাদা রাখা হয়। এই পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা জাতিগত অবিশ্বাস ও সন্দেহকে দীর্ঘস্থায়ী করেছিল। - ৫. মালয় সমাজের চরম অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা:
ইংরেজি মাধ্যমে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা এবং আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্য মূলত চীনা ও ইউরোপীয়দের নিয়ন্ত্রণে ছিল। স্থানীয় মালয়রা ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকায় তাদের মধ্যে আধুনিক রাজনৈতিক অধিকার সচেতনতা ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটেছিল অনেক দেরিতে। - ৬. শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের অনুপস্থিতি:
ভারতের কংগ্রেস বা ইন্দোনেশিয়ার সারেকাত ইসলামের মতো মালয়ে বিংশ শতাব্দীর প্রথম চার দশকে কোনো সর্বভারতীয় বা সর্বজনীন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব ছিল না। একমাত্র ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশদের বৈষম্যমূলক ‘মালয়ান ইউনিয়ন’ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে নওয়াব অন বিন জাফরের নেতৃত্বে ইউএমএনও (UMNO) গঠিত হওয়ার পর মালয় জাতীয়তাবাদ প্রথম কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
উপসংহার
বহুজাতিভিত্তিক সমাজ ও ব্রিটিশদের বিভাজন নীতির কারণে মালয়ে জাতীয়তাবাদের পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি দখলদারিত্বের আঘাত এবং পরবর্তীতে টেংকু আব্দুর রহমানের মতো দূরদর্শী নেতার নেতৃত্বে তিন জাতির মধ্যে এক অনন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়া জাতীয় স্বাধীনতার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল।
৩. ১৫১১ সালে মালাক্কা সালতানাতের পতনের কারণসমূহ পর্যালোচনা কর।
[English: Review the causes of the downfall of Malacca Sultanate in 1511.]
ভূমিকা
১৪০০ খ্রিস্টাব্দে নির্বাসিত শ্রীবিজয়া রাজপুত্র পরমেস্বরা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মালাক্কা সালতানাত (Sultanate of Malacca) ছিল পঞ্চদশ শতাব্দীর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক শক্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের রাজধানী এবং সমগ্র মালয় বিশ্বের ইসলামের প্রধান প্রবেশদ্বার। কিন্তু গৌরবের চরম শিখরে থাকা অবস্থায় মাত্র এক শতাব্দীর ব্যবধানে ১৫১১ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ বিজেতা আলফনসো ডি আলবুকার্কের (Afonso de Albuquerque) আকস্মিক সামরিক আগ্রাসনে এই সুবিশাল ও সমৃদ্ধ সাম্রাজ্যের করুণ পতন ঘটে। এটি সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক আধিপত্যের সূচনা করেছিল।
১৫১১ সালে মালাক্কা সালতানাতের পতনের কারণসমূহ
- ১. কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চরম অদূরদর্শিতা ও নৈতিক অবক্ষয়:
পতনের সময় মালাক্কার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন সুলতান মাহমুদ শাহ (১৪৮৮-১৫১১ খ্রি.)। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিলাসী, অহংকারী, অপরিণামদর্শী এবং অলস প্রকৃতির শাসক। তিনি প্রজাদের সুখ-দুঃখের কোনো খবর রাখতেন না এবং রাজকীয় দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে রাজপ্রাসাদের আমোদপ্রমোদে নিমগ্ন থাকতেন। তাঁর অদক্ষতার কারণে দরবারের শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। - ২. অভ্যন্তরীণ প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও আত্মঘাতী সংঘাত:
মালাক্কার দরবার মূলত দুটি পরস্পরবিরোধী শক্তিশালী উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল—একদিকে আদিবাসী মালয় মুসলিম অভিজাত শ্রেণি এবং অন্যদিকে ধনী তামিল-ভারতীয় মুসলিম বণিক শ্রেণি। মাহমুদ শাহ এক মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল করে বসেন; তিনি গুজবের ওপর ভিত্তি করে কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাঁর অত্যন্ত বিজ্ঞ ও দক্ষ প্রধানমন্ত্রী (বেন্দাহারা) তুন মুতাহির (Tun Mutahir)-কে সপরিবারে হত্যা করেন। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ফলে সমগ্র সেনাবাহিনী ও নাগরিক সমাজে সুলতানের প্রতি চরম ক্ষোভ ও অনাস্থা তৈরি হয় এবং প্রশাসন নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। - ৩. বিদেশি বণিক সম্প্রদায়ের অসন্তোষ ও বিশ্বাসঘাতকতা:
মালাক্কার সমৃদ্ধির মূল উৎস ছিল বিদেশি বণিকরা। কিন্তু শেষ দিনগুলোতে মালাক্কার দুর্নীতিগ্রস্ত শুল্ক কর্মকর্তারা বিদেশি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত শুল্ক ও ঘুষ আদায় শুরু করে। বিশেষ করে চীনা এবং ভারতীয় হিন্দু বণিকরা স্থানীয় প্রশাসনের জুলুমে অতিষ্ঠ ছিল। ১৫১১ সালে আলবুকার্ক যখন মালাক্কা আক্রমণ করেন, তখন স্থানীয় জাভানিজ নেতা ও ভারতীয় হিন্দু ব্যবসায়ী নিনা চাথু (Nina Chatu) সুলতানের বিরুদ্ধে গিয়ে গোপনে পর্তুগিজদের রসদ, তথ্য ও গোপন পথ সরবরাহ করে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে। - ৪. সামরিক ও নৌ প্রযুক্তির মারাত্মক অসমতা:
মালাক্কার সামরিক বাহিনী প্রযুক্তিগত দিক থেকে পর্তুগিজদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল। মালাক্কার সৈন্যরা মূলত ঐতিহ্যবাহী বল্লম, তীর-ধনুক, তলোয়ার (ক্রিস) এবং বিষাক্ত ফুঁকনি (Blowpipes) দিয়ে যুদ্ধ করেছিল। বিপরীতে পর্তুগিজদের সাথে ছিল আধুনিক লোহার বর্ম, শক্তিশালী মাস্কেট রাইফেল, উন্নত কামান এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা যুদ্ধজাহাজ ‘ফ্লোর দে লা মার’ (Flor de la Mar)। পর্তুগিজ কামানের গোলার মুখে মালাক্কার কাঠের প্রাসাদ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে যায়। - ৫. আলবুকার্কের দূরদর্শী সামরিক কৌশল ও সেতু অবরোধ:
পর্তুগিজ ভাইসরয় আলবুকার্ক মালাক্কার ভৌগোলিক দুর্বলতা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করেছিলেন। মালাক্কা শহরটি একটি নদীর মাধ্যমে দুই ভাগে বিভক্ত ছিল এবং যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল একটি কৌশলগত কাঠের সেতু। ১৫১১ সালের ২৪ জুলাই ও ১০ আগস্ট আলবুকার্ক তাঁর সৈন্যদের নিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর সেই কেন্দ্রীয় সেতুটি দখল করে নেন। এর ফলে সুলতানের বাহিনী ও শহরের খাদ্য সরবরাহ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। - ৬. ভাড়াটে সৈন্যদের পলায়ন ও সংহতির অভাব:
মালাক্কার সৈন্যবাহিনীর একটি বড় অংশ ছিল জাভানিজ ও অন্যান্য দ্বীপের ভাড়াটে যোদ্ধা (Mercenaries)। যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে এবং সুলতানের দুর্বল নেতৃত্ব অনুধাবন করে জাভানিজ সেনাপতি উতিমুতিরাজা তাঁর হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেন। ফলে সুলতানের হাতে মাত্র অল্প কিছু বিশ্বস্ত অনুসারী অবশিষ্ট ছিল।
উপসংহার
১৫১১ সালের ২৪ আগস্ট মালাক্কার পতন ছিল প্রাচ্যের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক ইতিহাসের এক মহাবিপর্যয়। অভ্যন্তরীণ অনৈক্য, চরম দুর্নীতি এবং সামরিক আধুনিকায়নের চরম ব্যর্থতাই এই সমৃদ্ধ মুসলিম সালতানাতকে ইউরোপীয় পরাশক্তির কাছে বলি দিয়েছিল। মালাক্কার পতনের মধ্য দিয়েই সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইউরোপীয়দের চার শতাব্দীর অন্ধকার ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা হয়েছিল।
৪. টেংকু আব্দুর রহমানের পরিচয় দাও। মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনে তার অবদানকে তুমি কীভাবে মূল্যায়ন করবে?
[English: Introduce Tenku Abdur Rahman. How would you evaluate his contribution in the freedom movement of Malaysia?]
টেংকু আব্দুর রহমানের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
টেংকু আব্দুর রহমান পুত্রা আল-হাজ (১৯০৩-১৯৯০ খ্রি.) ছিলেন আধুনিক মালয়েশিয়ার মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা, মহান স্থপতি, স্বাধীন মালয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী (১৯৫৭-১৯৬৩) এবং পরবর্তীতে সম্প্রসারিত ফেডারেশন অব মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী (১৯৬৩-১৯৭০)। তিনি উত্তর মালয়েশিয়ার কেদাহ রাজ্যের রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইংল্যান্ডের বিখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে লন্ডনের ইনার টেম্পল থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন। মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা অর্জন এবং জাতি গঠনে তাঁর অনন্য অবদানের জন্য কৃতজ্ঞ জাতি তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে ‘বাপা মালয়েশিয়া’ (Father of Malaysia বা মালয়েশিয়ার জাতির পিতা) এবং ‘বাপা কেমরদেকান’ (Father of Independence) উপাধিতে ভূষিত করেছে।
মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনে টেংকু আব্দুর রহমানের ঐতিহাসিক অবদান
- ১. ইউএমএনও (UMNO)-র দায়িত্ব গ্রহণ ও পুনর্গঠন (১৯৫১):
১৯৫১ সালে যখন ইউনাইটেড মালয়েস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (UMNO)-এর প্রতিষ্ঠাতা নওয়াব অন বিন জাফর পদত্যাগ করেন, তখন দলটি গভীর অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। এই ক্রান্তিকালে টেংকু আব্দুর রহমান সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি দলকে একটি অভিজাত মালয় মঞ্চ থেকে মুক্ত করে সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও বুদ্ধিজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতা আন্দোলনের গণমুখী প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করেন। - ২. বহুজাতিভিত্তিক ‘অ্যালায়েন্স পার্টি’ (Alliance Party) গঠন:
টেংকু আব্দুর রহমানের জীবনের সবচেয়ে কালজয়ী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল এটি অনুধাবন করা যে, অভিবাসী চীনা ও ভারতীয়দের বাদ দিয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা আদায় করা সম্ভব নয়। তিনি ইউএমএনও (মালয়), মালয়ান চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশন (MCA – চীনা) এবং মালয়ান ইন্ডিয়ান কংগ্রেস (MIC – ভারতীয়)-এর শীর্ষ নেতাদের একত্রিত করে ১৯৫২ সালে ঐতিহাসিক ‘অ্যালায়েন্স পার্টি’ (জোট দল) গঠন করেন। ১৯৫৫ সালে মালয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে টেংকুর অ্যালায়েন্স পার্টি ৫২টি আসনের মধ্যে ৫১টিতেই একচেটিয়া ঐতিহাসিক ভূমিধস বিজয় লাভ করে প্রমাণ করে যে সকল জাতি টেংকুর নেতৃত্বের অধীনে ঐক্যবদ্ধ। - ৩. লন্ডনে ঐতিহাসিক আলোচনা ও স্বাধীনতার চুক্তি (১৯৫৬):
১৯৫৫ সালের নির্বাচনের পর টেংকু মালয়ার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৫৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি মালয় সুলতান ও সকল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সর্বদলীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়ে লন্ডনে যান। সেখানে তিনি ব্রিটিশ সরকারের সাথে অত্যন্ত দক্ষ, মার্জিত ও বাস্তববাদী কূটনৈতিক আলোচনা পরিচালনা করেন। ব্রিটিশরা উপলব্ধি করে যে টেংকুর মতো মধ্যপন্থী ও স্থিতিশীল নেতার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করাই সর্বোত্তম। ১৯৫৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে ঐতিহাসিক স্বাধীনতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। - ৪. ‘মেরদেকা’ ঘোষণা ও স্বাধীন মালয়া রাষ্ট্রের জন্ম (৩১ আগস্ট ১৯৫৭):
১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট কুয়ালালামপুরের নবনির্মিত মারদেকা স্টেডিয়ামে এক সুবিশাল ঐতিহাসিক জনসমাবেশে ডিউক অব গ্লুচেস্টারের কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করে টেংকু আব্দুর রহমান হাত উঁচিয়ে সাতবার বজ্রকণ্ঠে “মেরদেকা!” (Merdeka – স্বাধীনতা!) ধ্বনি উচ্চারণ করেন। এর মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘ফেডারেশন অব মালয়া’ (Persekutuan Tanah Melayu)-র অভ্যুদয় ঘটে। - ৫. মালয়েশিয়া ফেডারেশনের সম্প্রসারণ (১৯৬৩):
১৯৬১ সালে টেংকু এক যুগান্তকারী ভূরাজনৈতিক প্রস্তাব দেন। তিনি মালয়ার সাথে সিঙ্গাপুর, উত্তর বোর্নিও (বর্তমান সাবাহ) এবং সারাওয়াককে একত্রিত করে একটি অভিন্ন ফেডারেশন গঠনের উদ্যোগ নেন। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ণের চরম বিরোধিতা ও ফিলিপাইনের আপত্তি সত্ত্বেও টেংকুর অসামান্য কূটনীতির ফলে ১৯৬৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয় আধুনিক ‘ফেডারেশন অব মালয়েশিয়া’। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে রক্তপাতহীনভাবে তিনি সিঙ্গাপুরকে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার সুযোগ দিয়ে এক ভয়াবহ জাতিগত গৃহযুদ্ধের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করেছিলেন। - ৬. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবদান ও ওআইসি প্রতিষ্ঠা:
টেংকু ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক মাপের কূটনীতিক। তিনি ১৯৬৭ সালে ‘আসিয়ান’ (ASEAN) গঠনে অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া ১৯৭১ সালে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন’ (OIC)-এর প্রথম মহাসচিব (Secretary-General) নির্বাচিত হয়ে তিনি সমগ্র মুসলিম জাহানের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
মূল্যায়ন ও উপসংহার
টেংকু আব্দুর রহমান ছিলেন এক অনন্য দূরদর্শী, সহনশীল ও বাস্তববাদী রাষ্ট্রনায়ক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশে যখন স্বাধীনতার জন্য লাখ লাখ মানুষের রক্ত ঝরেছে, টেংকু সেখানে কোনো প্রকার রক্তপাত ছাড়াই অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ সাংবিধানিক আলোচনা ও বহুজাতিভিত্তিক সমঝোতার মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন। তাঁর অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের ওপর দাঁড়িয়েই আজকের আধুনিক ও সমৃদ্ধ মালয়েশিয়ার ভিত্তি রচিত হয়েছে।
৫. পূর্ব তিমুর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রচনা কর।
[English: Write an essay about the establishment of the state of East Timor.]
ভূমিকা
একবিংশ শতাব্দীর প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ২০০২ সালের ২০ মে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র পূর্ব তিমুর বা দাপ্তরিক ভাষায় ‘গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র তিমুর-লেস্তে’ (Democratic Republic of Timor-Leste)। দীর্ঘ সাড়ে চার শতাব্দীর পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসন এবং পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘ ২৪ বছরের নির্মম সামরিক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তিমুরের বীর জনগণের রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধ সংগ্রাম বিশ্ব রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন
ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে মসলা বাণিজ্যের সন্ধানে পর্তুগিজরা তিমুর দ্বীপে আগমন করে। পরবর্তীতে ১৮৫৯ সালের লিসবন চুক্তির মাধ্যমে দ্বীপটি বিভক্ত হয়—পশ্চিম তিমুর চলে যায় ডাচদের অধীনে (যা পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়) এবং পূর্ব তিমুর থাকে পর্তুগিজদের উপনিবেশ হিসেবে। পর্তুগিজরা স্থানীয় জনগণকে প্রধানত রোমান ক্যাথলিক ধর্মে ধর্মান্তরিত করে। দীর্ঘ সাড়ে চার শতাব্দী অবহেলার পর ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে লিসবনে সংঘটিত ঐতিহাসিক ‘কার্নেশন বিপ্লব’-এর মাধ্যমে পর্তুগালের স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটলে নতুন পর্তুগিজ সরকার তাদের সমস্ত উপনিবেশ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং পূর্ব তিমুর থেকে হঠাৎ করেই সেনা প্রত্যাহার করে।
স্বাধীনতা ঘোষণা ও ইন্দোনেশিয়ার সামরিক আগ্রাসন (১৯৭৫)
পর্তুগিজদের প্রস্থানের পর পূর্ব তিমুরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। এর মধ্যে প্রধান বামপন্থী দল ফ্রেলিতিন (FRETILIN) ১৯৭৫ সালের ২৮ নভেম্বর পূর্ব তিমুরকে স্বাধীন ঘোষণা করে। কিন্তু প্রতিবেশী ইন্দোনেশিয়ার স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট সুহার্তো এই বামপন্থী সরকারকে কমিউনিস্ট ভীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করেন। স্বাধীনতা ঘোষণার মাত্র ৯ দিন পর ৭ ডিসেম্বর ১৯৭৫ সালে ইন্দোনেশীয় সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সোরোজা’ (Operation Seroja)-র মাধ্যমে পূর্ব তিমুর আক্রমণ করে এবং একে ইন্দোনেশিয়ার ‘২৭তম প্রদেশ’ হিসেবে জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।
ইন্দোনেশীয় দখলদারিত্ব ও দীর্ঘ সশস্ত্র প্রতিরোধ (১৯৭৫-১৯৯৮)
ইন্দোনেশিয়ার এই অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে বীর তিমুরবাসী তাঁদের মুক্তি বাহিনী ফালিনতিল (FALINTIL)-এর মাধ্যমে দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন। এর প্রধান সেনাপতি ছিলেন ক্যারিশম্যাটিক নেতা জেনানা গুসমাও (Xanana Gusmão)। ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘ ২৪ বছরের দখলদারিত্বে ভয়াবহ গণহত্যা, অনাহার ও বাধ্যতামূলক নির্বাসনে প্রায় দুই লক্ষাধিক নিরীহ তিমুরবাসী (তৎকালীন মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) প্রাণ হারায়।
১৯৯১ সালের ১২ নভেম্বর দিলির সান্টাক্রুজ কবরস্থানে (Santa Cruz Massacre) ইন্দোনেশীয় সেনারা আড়াই শতাধিক নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালালে বিদেশি সাংবাদিকদের মাধ্যমে সেই ভয়াবহ গণহত্যার ফুটেজ বিশ্বজুড়ে প্রচারিত হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নড়েচড়ে বসে। পূর্ব তিমুরের পক্ষে শান্তিপূর্ণ অহিংস সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৬ সালে তিমুরের ক্যাথলিক বিশপ কার্লোস বেলো (Carlos Belo) এবং বিশিষ্ট কূটনীতিক হোসে রামোস হোর্তা (José Ramos-Horta)-কে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়, যা তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে বৈশ্বিক মর্যাদায় পৌঁছে দেয়।
ঐতিহাসিক গণভোট ও স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য (১৯৯৯-২০০২)
- সুহার্তোর পতন ও গণভোটের ঘোষণা: ১৯৯৮ সালে এশীয় অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর পতন ঘটলে নতুন প্রেসিডেন্ট বি. জে. হাবিবি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পূর্ব তিমুরে গণভোটের অনুমতি দেন।
- ১৯৯৯ সালের গণভোট (Referendum): ১৯৯৯ সালের ৩০ আগস্ট জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ইন্দোনেশীয় সেনা ও উগ্র মিলিশিয়াদের প্রাণনাশের হুমকি উপেক্ষা করে ৯৮% মানুষ ভোটকেন্দ্রে যায় এবং বিস্ময়করভাবে ৭৮.৫ শতাংশ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে।
- মিলিশিয়াদের পোড়ামাটি নীতি ও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ: গণভোটের ফলাফলে ক্ষুব্ধ হয়ে ইন্দোনেশীয় মিলিশিয়ারা সমগ্র পূর্ব তিমুরে নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, যার ফলে জাতিসংঘ দ্রুত অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্বে বহুজাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী (INTERFET) মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
- জাতিসংঘের অভিভাবকত্ব ও চূড়ান্ত স্বাধীনতা: এরপর জাতিসংঘ শান্তি মিশন (UNTAET) তিন বছর ধরে অবকাঠামো পুনর্গঠন ও সরকার পরিচালনা করে। অবশেষে ২০০২ সালের ২০ মে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানের উপস্থিতিতে পূর্ব তিমুর একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক জেনানা গুসমাও দেশটির প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন।
উপসংহার
পূর্ব তিমুর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস হলো পরাক্রমশালী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর অদম্য আত্মত্যাগ, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার কালজয়ী বিজয়। বিশ্ব মানচিত্রে তিমুর-লেস্তে আজ একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মর্যাদার সাথে টিকে আছে।
৬. পর্তুগিজ কারা? তাদের উত্থান ও পতনের ইতিহাস আলোচনা কর।
[English: Who are the Portuguese? Discuss the history of their rise and fall.]
পর্তুগিজদের পরিচয় (Who are the Portuguese?)
পর্তুগিজরা হলো ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত আইবেরিয়ান উপদ্বীপের আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলবর্তী প্রাচীন ও সমৃদ্ধ দেশ পর্তুগালের মূল অধিবাসী। ভৌগোলিক আবিষ্কারের যুগ (Age of Discovery)-এ পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে এই ক্ষুদ্র দেশটির নাবিক ও বণিকরাই সমগ্র বিশ্বের নতুন নতুন সমুদ্রপথ আবিষ্কার করে আটলান্টিক, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে প্রথম বৈশ্বিক ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সামুদ্রিক সাম্রাজ্যের (Maritime Empire) ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
পর্তুগিজদের উত্থানের ইতিহাস (Rise of the Portuguese)
- ১. প্রিন্স হেনরি দ্য নেভিগেটরের অগ্রণী ভূমিকা: পর্তুগিজদের উত্থানের মূল রূপকার ছিলেন পর্তুগালের রাজপুত্র প্রিন্স হেনরি (১৩৯৪-১৪৬০ খ্রি.)। তিনি সাগরেসে একটি উন্নত নৌবিদ্যা একাডেমি, মানচিত্র তৈরি কেন্দ্র এবং দ্রুতগামী জাহাজ ‘ক্যারাভেল’ (Caravel) তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। তিনি পর্তুগিজ নাবিকদের আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে নতুন সমুদ্রপথ অনুসন্ধানে পাঠাতে থাকেন।
- ২. উত্তমাশা অন্তরীপ ও নতুন নৌপথ আবিষ্কার: ১৪৮৮ সালে পর্তুগিজ নাবিক বার্থোলোমিউ দিয়াজ আফ্রিকার সর্বদক্ষিণ প্রান্ত ‘উত্তমাশা অন্তরীপ’ (Cape of Good Hope) আবিষ্কার করেন। এরপর ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত নাবিক ভাস্কো দা গামা এই পথ ঘুরে ভারতের কালিকট বন্দরে এসে পৌঁছান। এর ফলে মুসলিমদের স্থলপথের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে প্রাচ্যের সাথে ইউরোপের সরাসরি সামুদ্রিক বাণিজ্যের দুয়ার খুলে যায়।
- ৩. প্রাচ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার (আলমিডা ও আলবুকার্ক):
১৫০৫ সালে প্রথম ভাইসরয় ফ্রান্সিসকো ডি আলমিডা ‘নীল জল নীতি’ (Blue Water Policy)-র মাধ্যমে সাগরে আধিপত্য কায়েম করেন। পরবর্তীতে আলফনসো ডি আলবুকার্ক (১৫০৯-১৫১৫ খ্রি.) গোয়া (১৫১০), দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার মালাক্কা (১৫১১) এবং পারস্য উপসাগরের হরমুজ (১৫১৫) দখল করে সমগ্র ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যে পর্তুগিজদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া ১৫০০ সালে পেদ্রো আলভারেস ক্যাব্রাল দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল দেশ ব্রাজিল আবিষ্কার করে সেখানে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। - ৪. ‘কার্তাজ’ ব্যবস্থা ও মসলা বাণিজ্যের একচেটিয়া কর্তৃত্ব:
পর্তুগিজরা ভারত মহাসাগরে চলাচলকারী সমস্ত আরব ও এশীয় বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ‘কার্তাজ’ (Cartaz) নামক রাজকীয় ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করে। ছাড়পত্রহীন জাহাজ তারা জলদস্যুদের মতো ডুবিয়ে দিত। ফলে এক শতাব্দী ধরে তারা বিশ্বের মসলা বাণিজ্য একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ইউরোপের সবচেয়ে ধনী দেশে পরিণত হয়েছিল।
পর্তুগিজদের পতনের ইতিহাস ও কারণসমূহ (Fall of the Portuguese)
ষোড়শ শতকের শেষভাগ থেকেই পর্তুগিজদের এই তাসের ঘরের মতো সাম্রাজ্য দ্রুত ধসে পড়তে শুরু করে। তাদের পতনের প্রধান কারণসমূহ নিচে উল্লেখ করা হলো:
- সীমিত জনসংখ্যা ও অতিরিক্ত সাম্রাজ্য বিস্তার: পর্তুগাল ছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি দেশ, যার মোট জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১০ থেকে ১৫ লক্ষ। এত বিপুল বৈশ্বিক সাম্রাজ্য (ব্রাজিল, আফ্রিকা, ভারত, মালয় ও চীন) পাহারা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সেনা ও নৌবহর তাদের ছিল না। অতিরিক্ত বিস্তারের কারণেই তাদের প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে।
- চরম ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও ইনকুইজিশন (Inquisition): পর্তুগিজরা যেখানেই গিয়েছে, সেখানেই তাদের নিষ্ঠুর জেসুইট মিশনারিদের মাধ্যমে স্থানীয় হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিমদের বলপূর্বক খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করেছে এবং মসজিদ ও মন্দির ধ্বংস করেছে। গোয়ায় কুখ্যাত ‘ইনকুইজিশন’ আদালত স্থাপন করে তারা হাজার হাজার স্থানীয় মানুষকে নির্মমভাবে পুড়িয়ে হত্যা করে। এই বর্বরোচিত আচরণের কারণে তারা সমগ্র প্রাচ্যে চরম ঘৃণিত শত্রুতে পরিণত হয় এবং কোনো স্থানীয় মিত্র পায়নি।
- জলদস্যুতা ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন: পর্তুগিজ বণিকরা বাণিজ্যের পরিবর্তে প্রকাশ্য ডাকাতি, অপহরণ ও দাস ব্যবসায় (বিশেষ করে বাংলায় মগ-হার্মাদ দস্যুতা) লিপ্ত হয়েছিল। তাদের রাজকীয় কর্মকর্তারা সীমাহীন দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল। ফলে ১৬৩২ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের নির্দেশে সুবাদার কাসেম খান হুগলি থেকে পর্তুগিজদের চিরতরে বিতাড়িত করেন।
- স্পেনীয় মুকুটের অধীনে পরাধীনতা (১৫৮০-১৬৪০ খ্রি.): ১৫৮০ সালে উত্তরাধিকার সংকটের কারণে পর্তুগাল স্পেনের অধীনে চলে যায়। এর ফলে স্পেনের সমস্ত প্রধান শত্রু—বিশেষ করে ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস সরাসরি পর্তুগালের সমস্ত উপনিবেশ আক্রমণ করা শুরু করে।
- ডাচ ও ইংরেজ নৌবাহিনীর অপ্রতিরোধ্য উত্থান: সপ্তদশ শতাব্দীতে উন্নত সামরিক ও বাণিজ্য কৌশল নিয়ে মাঠে নামে ডাচদের ‘ভিওসি’ (VOC) এবং ব্রিটিশ ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’। ১৬৪১ সালে ডাচরা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পর্তুগিজদের কাছ থেকে মালাক্কা ছিনিয়ে নেয়। এছাড়া একে একে সিংহল, ওমান এবং ভারতের বহু অঞ্চল থেকে পর্তুগিজরা বিতাড়িত হয়। তাদের প্রভাব কেবল গোয়া, দমন, দিউ এবং ম্যাকাওতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
উপসংহার
পর্তুগিজরা সাহসিকতার সাথে বিশ্ব আবিষ্কারের দিগন্ত উন্মোচন করেছিল সত্য, কিন্তু ধর্মীয় অন্ধত্ব, সীমাহীন নিষ্ঠুরতা ও অদূরদর্শিতার কারণে তারা তাদের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে পারেনি। পরিশেষে তারা ব্রিটিশ ও ডাচ পরাশক্তির কাছে তাদের বৈশ্বিক আধিপত্য হারিয়ে পতনের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়।
৭. নগর রাষ্ট্র হিসেবে সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠা ও সমসাময়িক বিশ্ববাণিজ্যে এর প্রভাব আলোচনা কর।
[English: Discuss the establishment of Singapore as a city state and its impact on contemporary world trade.]
নগর রাষ্ট্র হিসেবে সিঙ্গাপুরের ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠা
সিঙ্গাপুর হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালীর দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত মাত্র ৭৩৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র। সমকালীন বিশ্বে এটি ভ্যাটিকান সিটি ও মোনাকোর পাশাপাশি বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ ও সফল নগর রাষ্ট্রের (City-State) অন্যতম শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত। এর প্রতিষ্ঠার ইতিহাস দুটি প্রধান পর্বে বিভক্ত:
- ১. ব্রিটিশদের বাণিজ্য ঘাঁটি হিসেবে প্রারম্ভিক প্রতিষ্ঠা (১৮১৯):
উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এটি ছিল একটি অনুন্নত জেলেপল্লী ও জলদস্যুদের আশ্রয়স্থল। ১৮১৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা স্যার স্ট্যামফোর্ড র্যাফেলস (Sir Stamford Raffles) জোহরের সুলতানের সাথে চুক্তি করে কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানে একটি মুক্ত বাণিজ্য বন্দর (Free Port) স্থাপন করেন। র্যাফেলসের মুক্ত বাণিজ্য নীতির কারণে এটি দ্রুত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌ ও বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়। - ২. আধুনিক স্বাধীন নগর রাষ্ট্র হিসেবে নাটকীয় জন্ম (৯ আগস্ট ১৯৬৫):
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৬৩ সালে সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়া ফেডারেশনের সাথে যুক্ত হয়। কিন্তু সিঙ্গাপুরের চীনা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী এবং মালয়েশিয়ার মালয় সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতৃত্বের মধ্যে তীব্র মতাদর্শিক ও জাতিগত দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সিঙ্গাপুরের তৎকালীন তরুণ প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ (Lee Kuan Yew)-এর ‘মালয়েশিয়ান মালয়েশিয়া’ (সকল জাতির সমান অধিকার) নীতির সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধ চূড়ান্ত রূপ নেয়। অবশেষে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট মালয়েশিয়ার পার্লামেন্ট একতরফাভাবে সিঙ্গাপুরকে ফেডারেশন থেকে বহিষ্কার করে। কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষিজমি বা সুপেয় পানীয় জলহীন একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ হিসেবে অত্যন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে অশ্রুসজল চোখে লি কুয়ান ইউ স্বাধীন ‘প্রজাতন্ত্রী সিঙ্গাপুর’-এর জন্ম ঘোষণা করেন।
সমসাময়িক বিশ্ববাণিজ্যে সিঙ্গাপুরের বৈশ্বিক প্রভাব
প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ-এর অনন্য নেতৃত্ব, দূরদর্শী নীতি এবং শূন্য-দুর্নীতি কাঠামোর ওপর ভর করে সিঙ্গাপুর একটি অনুন্নত তৃতীয় বিশ্বের দ্বীপ থেকে বিশ্বের অন্যতম ধনী ও উন্নত প্রথম বিশ্বের অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। বিশ্ববাণিজ্যে এর বহুমুখী প্রভাব নিম্নরূপ:
- বিশ্বের ব্যস্ততম সামুদ্রিক বন্দর ও ট্রান্সশিপমেন্টের রাজধানী:
সিঙ্গাপুর বন্দর বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম কন্টেইনার বন্দর। মালাক্কা প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশ এবং আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের অর্ধেক এই বন্দরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। এটি বিশ্বের প্রধান ‘ট্রান্সশিপমেন্ট হাব’ (Transshipment Hub); অর্থাৎ বিশ্বের বড় বড় বিশালাকার জাহাজ এখানে মাল খালাস করে এবং এখান থেকে ছোট জাহাজে করে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পৌঁছে দেওয়া হয়। - বিশ্ব বাণিজ্যের শীর্ষ জ্বালানি তেল সরবরাহ কেন্দ্র (Bunkering Capital):
সিঙ্গাপুর হলো বিশ্বের বৃহত্তম সামুদ্রিক জ্বালানি সরবরাহকারী (Marine Fuel/Bunkering) বন্দর। আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী বিশ্বের হাজার হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ সিঙ্গাপুরে এসে জ্বালানি তেল গ্রহণ করে। এছাড়া এটি বিশ্বের শীর্ষ তিনটি তেল শোধনাগার কেন্দ্রের অন্যতম। - শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক আর্থিক ও ব্যাংকিং কেন্দ্র:
নিউইয়র্ক, লন্ডন ও টোকিওর পাশাপাশি সিঙ্গাপুর আজ বিশ্বের শীর্ষ চারটি আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রের একটি। অত্যন্ত নিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থা, শক্তিশালী মুদ্রা আইন এবং করের সুবিধার কারণে এটি এশিয়ার ‘সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের শত শত বহুজাতিক ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের সদর দফতর এখানে অবস্থিত। - আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ ও লজিস্টিকসের প্রাণকেন্দ্র:
সিঙ্গাপুরের বিশ্বখ্যাত চাংগি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Changi Airport) বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিমানবন্দর হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের ৪০০টি শহরের সাথে সরাসরি আকাশপথে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন করে এটি বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান লজিস্টিকস গেটওয়ে হিসেবে কাজ করছে। - আন্তর্জাতিক মুক্ত বাণিজ্য ও বহুজাতিক কর্পোরেশনের হেডকোয়ার্টার:
বিশ্বের সবচেয়ে উন্মুক্ত ও ব্যবসাবান্ধব (Ease of Doing Business) পরিবেশ সিঙ্গাপুরে বিদ্যমান। গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট, অ্যাপলসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফরচুন ৫০০ বহুজাতিক প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক কোম্পানি তাদের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রধান কার্যালয় হিসেবে সিঙ্গাপুরকে বেছে নিয়েছে।
উপসংহার
নগর রাষ্ট্র হিসেবে সিঙ্গাপুরের উত্থান আধুনিক আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অপার বিস্ময়। কোনো নিজস্ব কাঁচামাল বা প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকা সত্ত্বেও কেবল কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, মেধা, প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো এবং সুশাসনের মাধ্যমে একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ কীভাবে সমগ্র বিশ্ববাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হতে পারে—সিঙ্গাপুর তারই এক ভাস্বর প্রতীক।
৮. আধুনিক মালদ্বীপের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণসমূহ ব্যাখ্যা কর।
[English: Explain the causes of the economic development of the modern Maldive.]
ভূমিকা
ভারত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ১,১৯২টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নয়নাভিরাম প্রবাল দ্বীপের (২৬টি প্রাকৃতিক অ্যাটল) সমন্বয়ে গঠিত ১০০% মুসলিম জনসংখ্যার দক্ষিণ এশীয় ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। ১৯৬৫ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ এবং পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে সালতানাত বিলুপ্ত করে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরের সময় দেশটি ছিল চরম দরিদ্র, বিচ্ছিন্ন ও একটি অনুন্নত মৎস্যজীবী সমাজ। কিন্তু গত চার দশকে সঠিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে মালদ্বীপ অভাবনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বর্তমানে মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে মালদ্বীপ দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ ধনী রাষ্ট্র (মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ১৪,০০০ মার্কিন ডলার)।
আধুনিক মালদ্বীপের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান প্রধান কারণসমূহ
- ১. বিশ্বমানের বিলাসবহুল পর্যটন শিল্প (Luxury Resort Tourism):
মালদ্বীপের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এবং মেরুদণ্ড হলো এর আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন খাত, যা দেশটির জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের শতকরা ৬০ ভাগের বেশি জোগান দেয়:- ‘এক দ্বীপ, এক রিসোর্ট’ নীতি (One Island, One Resort Policy): ১৯৭২ সালে ইতালি থেকে আসা প্রথম পর্যটক দলের মাধ্যমে ‘কুরুম্বা ভিলেজ’ রিসোর্ট দিয়ে এর সূচনা হয়। মালদ্বীপ সরকার অত্যন্ত দূরদর্শী হয়ে প্রতিটি বিচ্ছিন্ন জনহীন প্রবাল দ্বীপকে একটি করে একক ও বিলাসবহুল আন্তর্জাতিক রিসোর্টে রূপান্তরের অনুমতি দেয়। এর ফলে পর্যটকরা বিশ্বমানের নিরিবিলি পরিবেশ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (Privacy) উপভোগ করতে পারেন।
- ওয়াটার ভিলা ও পরিবেশবান্ধব ইকো-ট্যুরিজম: সমুদ্রের অগভীর ফিরোজা রঙের পানির ওপর সরাসরি কাঠ ও খড়ের তৈরি আধুনিক বিলাসবহুল কটেজ (Overwater Bungalows), পানির নিচের আন্ডারওয়াটার রেস্তোরাঁ ও স্কুবা ডাইভিং মালদ্বীপকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় হানিমুন ও অবসর যাপন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লক্ষাধিক আন্তর্জাতিক পর্যটক মালদ্বীপে ভ্রমণ করেন।
- ২. টেকসই মৎস্য শিল্প ও প্রিমিয়াম টুনা মাছ রপ্তানি:
পর্যটনের পরেই মালদ্বীপের দ্বিতীয় প্রধান অর্থনৈতিক স্তম্ভ হলো মৎস্য শিল্প। মালদ্বীপের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের জীবিকা এর সাথে জড়িত। মালদ্বীপের মৎস্যনীতির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো—তারা সমুদ্রে কোনো ক্ষতিকর জাল ব্যবহার করে না। তারা সম্পূর্ণ সনাতন ও পরিবেশবান্ধব ‘বর্শা ও বড়শি পদ্ধতি’ (Pole-and-Line Fishing) ব্যবহার করে টুনা মাছ শিকার করে। পরিবেশবান্ধব উপায়ে মাছ ধরার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের বাজারে মালদ্বীপের টুনা মাছ সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মূল্যে ‘ডলফিন-সেফ’ সার্টিফাইড প্রিমিয়াম ক্যানড খাদ্য হিসেবে উচ্চমূল্যে রপ্তানি হয়। - ৩. আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক রুটে কৌশলগত অবস্থান:
মালদ্বীপ পূর্ব ও পশ্চিমের প্রধান আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্য পথের একেবারে মধ্যস্থলে অবস্থিত। ফলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জাহাজকে মেরামত, ফুয়েলিং এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা লজিস্টিকস সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে দেশটি বিপুল বৈদেশিক রাজস্ব আয় করে। - ৪. মেগা অবকাঠামো উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ:
মালদ্বীপের বিভিন্ন সরকার রাজধানী মালে এবং আশেপাশের দ্বীপগুলোর অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়াতে যুগান্তকারী অবকাঠামো গড়ে তুলেছে:- সিনামালে সেতু (China-Maldives Friendship Bridge): ২০১৮ সালে চীনের সহায়তায় নির্মিত এই ঐতিহাসিক সেতু রাজধানী মালে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দ্বীপ হুলহুলে এবং কৃত্রিমভাবে নির্মিত আধুনিক পরিকল্পিত নগরী ‘হুলহুমালে’কে সরাসরি সংযুক্ত করেছে।
- ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ: বিশ্বের বৃহত্তম এয়ারবাস ও বোয়িং বিমান যাতে সরাসরি নামতে পারে, সে জন্য রানওয়ে সম্প্রসারণ ও নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছে।
- ৫. মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও অনুকূল বিনিয়োগ নীতি:
মালদ্বীপ সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত উদার ও আকর্ষণীয় নীতি গ্রহণ করেছে। দ্বীপে রিসোর্ট লিজ দেওয়া, মুনাফা অবাধে নিজ দেশে নিয়ে যাওয়ার সুবিধা এবং ব্যবসা করের সহজীকরণের ফলে বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক হোটেল চেইনগুলো (যেমন হিলটন, ফোর সিজনস, ম্যারিয়ট) মালদ্বীপে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। - ৬. জলবায়ু অভিযোজন ও কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ (হুলহুমালে প্রকল্প):
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি মোকাবিলায় মালদ্বীপ সরকার অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে মালে সংলগ্ন অগভীর লেগুনে বালি ভরাট করে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ মিটার উঁচু কৃত্রিম দ্বীপ ‘হুলহুমালে’ (Hulhumalé) গড়ে তুলেছে। একে ‘ভবিষ্যতের স্মার্ট সিটি’ বলা হয়, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছে।
উপসংহার
আধুনিক মালদ্বীপের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো ভৌগোলিক প্রতিকূলতাকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করার এক অসাধারণ সাফল্যগাঁথা। প্রাকৃতিক প্রবাল প্রাচীরের সৌন্দর্যকে বিশ্বমানের পর্যটনে রূপ দিয়ে এবং মৎস্য সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মালদ্বীপ আজ বিশ্বের বুকে একটি অনুকরণীয় ও সমৃদ্ধ দ্বীপরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
খ বিভাগ—সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন
[যে কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১০: ১০ × ২ = ২০]
৯. আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের জীবনধারা।
[English: The lifestyle of the Rohingya Muslims in Arakan.]
ঐতিহাসিক পরিচয় ও সমাজব্যবস্থা
বর্তমান মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন (ঐতিহাসিক আরাকান) রাজ্যের আদিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গা। সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে আরব, পারসিক ও মরক্কোর মুসলিম বণিকদের চট্টগ্রাম ও আরাকান উপকূলে আগমন এবং স্থানীয় জনগণের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এই জনগোষ্ঠীর উন্মেষ ঘটে। পরবর্তীতে পঞ্চদশ শতকে আরাকানের ম্রাউক-উ রাজবংশের আমলে (নরমেইখলার ইসলাম গ্রহণ ও সুলতান জালালুদ্দীন নাম ধারণ) বাংলা সাহিত্যের কবি আলাওল ও দৌলত কাজীর হাত ধরে আরাকান দরবারে মুসলিম সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ সূচিত হয়। রোহিঙ্গা সমাজের ভাষা মূলত চাটগাঁইয়া ও ইন্দো-আর্য ভাষার অতি ঘনিষ্ঠ এক স্বতন্ত্র রূপ।
ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ও জীবিকা
রোহিঙ্গারা অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ সুন্নি মুসলিম। তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। আরাকানের উর্বর কালাদান ও নাফ নদীর অববাহিকায় ধান চাষ, সমুদ্রে মাছ ধরা, লবণ উৎপাদন এবং বাঁশ ও কাঠের ব্যবসাই ছিল তাদের প্রধান অর্থনৈতিক জীবিকা। সমাজকাঠামো পরিচালিত হতো মসজিদ ও মাদ্রাসাভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী পঞ্চায়েতের মাধ্যমে। যৌথ পরিবার, ধর্মীয় অনুশাসন, পর্দা প্রথা এবং দানশীলতা ছিল তাদের সংস্কৃতির মূল অঙ্গ।
সামরিক জান্তার নিপীড়ন ও বর্তমান ট্র্যাজেডি
১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইনের সামরিক জান্তা মিয়ানমারের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন শুরু হয়। ১৯৮২ সালে প্রণীত কুখ্যাত নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মৌলিক নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়ে তাঁদের ‘রাষ্ট্রহীন’ (Stateless) করা হয়। তাঁদের জমিজমা বাজেয়াপ্ত, বিবাহ ও চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ এবং বাধ্যতামূলক বেগার শ্রম চাপিয়ে দিয়ে তাদের জীবনযাত্রাকে নরকে পরিণত করা হয়। পরিশেষে ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বর গণহত্যার মুখে প্রায় দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।
১০. ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন।
[English: The Nationalist Movement of Indonesia.]
আন্দোলনের সূচনা ও প্রেক্ষাপট
প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী (৩৫০ বছর) ধরে ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ কোম্পানির চরম অর্থনৈতিক শোষণ, ‘কালচার ব্যবস্থা’ ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইন্দোনেশিয়ায় আধুনিক সুসংগঠিত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা ঘটে। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ডাচদের গৃহীত তথাকথিত ‘নৈতিক নীতি’ (Ethical Policy)-র ফলে যে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাপ্রাপ্ত স্থানীয় বুদ্ধিজীবী শ্রেণির উদ্ভব ঘটেছিল, তাঁরাই এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
প্রধান প্রধান সংগঠন ও আন্দোলনের বিকাশ
- বুদি উতোমো (Budi Utomo, ১৯০৮): জাভার তরুণ চিকিৎসকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই সাংস্কৃতিক সংগঠনটিকে ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম শুভসূচনা হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০ মে ১৯০৮-কে ইন্দোনেশিয়ায় ‘জাতীয় জাগরণ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।
- সারেকাত ইসলাম (Sarekat Islam, ১৯১২): হাজী সামানহুদী ও ওমর সাঈদ চকরোমিনোতোর নেতৃত্বে গঠিত এই সংগঠনটি ইসলামি মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে প্রথম ইন্দোনেশিয়ার কোটি কোটি কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এক বিশাল গণআন্দোলনে রূপ দেয়।
- ইন্দোনেশিয়ান ন্যাশনাল পার্টি (PNI, ১৯২৭) ও সুকর্ণ: তরুণ প্রকৌশলী আহমেদ সুকর্ণ (Sukarno) পিএনআই প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ইসলাম, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের সমন্বয়ে পূর্ণ স্বাধীনতার (Merdeka) দাবি তোলেন।
- ঐতিহাসিক যুব শপথ (Sumpah Pemuda, ১৯২৮): ১৯২৮ সালের ২৮ অক্টোবর সারা দেশের তরুণরা জাকার্তায় মিলিত হয়ে এক ঐতিহাসিক শপথ নেন—“এক মাতৃভূমি (ইন্দোনেশিয়া), এক জাতি (ইন্দোনেশীয় জাতি), এবং এক ভাষা (বাহাসা ইন্দোনেশিয়া)”। এটি সমগ্র দ্বীপপুঞ্জকে ঐক্যবদ্ধ করে।
স্বাধীনতা ঘোষণা (১৯৪৫) ও স্বীকৃতি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানিদের হাতে ডাচদের পরাজয় আন্দোলনের গতি বাড়িয়ে দেয়। ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট জাপানের আত্মসমর্পণের পরপরই আহমেদ সুকর্ণ এবং মোহাম্মদ হাত্তা ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহাসিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর ডাচরা পুনরায় ফিরে এসে চার বছর ধরে রক্তক্ষয়ী সামরিক আক্রমণ চালালে ইন্দোনেশীয় গেরিলাদের প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক চাপে নতি স্বীকার করে ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে হেগ চুক্তির মাধ্যমে নেদারল্যান্ডস আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়।
১১. দ্বি-জাতি তত্ত্ব।
[English: Two Nation Theory.]
সংজ্ঞা ও মূল বক্তব্য
‘দ্বি-জাতি তত্ত্ব’ (Two-Nation Theory) হলো এমন একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও আদর্শিক মতবাদ, যার মূল কথা হলো—ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু ও মুসলমানরা নিছক দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায় নয়; বরং তারা ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি, বিশ্বাস ও জীবনদর্শনের দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পরস্পরবিপরীত দুটি পৃথক ‘জাতি’ (Two Distinct Nations)। সুতরাং গণতান্ত্রিক ভারতে মুসলমানদের অধিকার কেবল সংখ্যালঘু হিসেবে রক্ষা করা সম্ভব নয়; তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য একটি স্বতন্ত্র সার্বভৌম আবাসভূমি অপরিহার্য।
ঐতিহাসিক বিকাশ ও কায়েদে আযম জিন্নাহর রূপরেখা
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে স্যার সৈয়দ আহমদ খান প্রথম স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছিলেন যে, ভারতে ব্রিটিশ ধাঁচের সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী নির্বাচন চালু হলে মুসলমানরা স্থায়ীভাবে হিন্দুদের অধীনে চলে যাবে। পরবর্তীতে ১৯৩০ সালে এলাহাবাদে মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক অধিবেশনে মহান দার্শনিক কবি আল্লামা ড. মুহাম্মদ ইকবাল ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র স্বায়ত্তশাসিত মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেন।
১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ দ্বি-জাতি তত্ত্বের সবচেয়ে বলিষ্ঠ ও প্রামাণ্য ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন। তিনি তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন:
“হিন্দু ও মুসলমান দুটি ভিন্ন ধর্মীয় দর্শন, সামাজিক প্রথা ও সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। তারা কখনোই পরস্পরের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় না বা একত্রে ভোজন করে না। তাদের ইতিহাস, জাতীয় বীর এবং মহাকাব্য সম্পূর্ণ আলাদা। প্রায়শই একজনের নায়ক অন্যের খলনায়ক। এমন দুটি ভিন্ন জাতিকে একটি একক রাষ্ট্রের অধীন শাসনতন্ত্রে আবদ্ধ করার চেষ্টা ভারতীয় উপমহাদেশে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।”
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ফলাফল
এই দ্বি-জাতি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ঐতিহাসিক ‘লাহোর প্রস্তাব’ (১৯৪০) উত্থাপন করেন। এটি ভারতীয় মুসলমানদের মনোজগতে এক অভূতপূর্ব জাতীয়তাবাদী রূপান্তর ঘটায়। পরিশেষে দীর্ঘ সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর এই দ্বি-জাতি তত্ত্বের বাস্তব পরিণতি হিসেবেই ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট রক্তক্ষয়ী দেশভাগের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
১২. ফিলিপাইনে মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা।
[English: Political and Social position of the Muslim in Philippines.]
ঐতিহাসিক পরিচয় ও ‘মোরো’ উপাধি
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একমাত্র খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও দ্বীপ, সুলু দ্বীপপুঞ্জ এবং পালাওয়ান অঞ্চলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাসকারী প্রাচীন মুসলিম জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে ‘মোরো’ (Moro) নামে পরিচিত। ষোড়শ শতাব্দীতে স্প্যানিশরা যখন ফিলিপাইন দখল করতে আসে, তখন স্পেনের মুর (Moors) মুসলিমদের সাথে এদের সাহসিকতার তুলনা করে তাদের ‘মোরো’ আখ্যা দিয়েছিল। স্প্যানিশদের আগমনের বহু পূর্বেই পঞ্চদশ শতকে সেখানে স্বাধীন সুলু সালতানাত এবং মাগিন্দানাও সালতানাত অত্যন্ত শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
রাজনৈতিক অবস্থা ও দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম
১৮৯৮ সালে স্পেনের পর ফিলিপাইন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে চলে যায় এবং পরবর্তীতে স্বাধীন ফিলিপাইন সরকার উত্তরের বিপুল খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীকে দক্ষিণের মুসলিম অধ্যুষিত মিন্দানাওতে এনে পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসন করে। এর ফলে মুসলিমরা নিজ ভূমিতে সংখ্যালঘু ও ভূমিহীন হয়ে পড়ে। এই অন্যায় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সশস্ত্র প্রতিরোধের সূচনা ঘটে:
- সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৭০-এর দশকে নুরুল মিসুয়ারির নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘মোরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট’ (MNLF) এবং পরবর্তীতে হাশিম সালামাত ও মুরাদ ইব্রাহিমের নেতৃত্বে ‘মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট’ (MILF)। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে চলা এই যুদ্ধে লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারায়।
- বাংসামোরো স্বায়ত্তশাসন অর্জন (২০১৯): অবিরাম সংগ্রামের পর ফিলিপাইন সরকার শান্তি আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। ২০১৯ সালের ঐতিহাসিক গণভোটের মাধ্যমে গঠিত হয় ‘বাংসামোরো মুসলিম মিন্দানাও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল’ (BARMM)। বর্তমানে ফিলিপাইনের মুসলমানরা নিজস্ব সংসদ ও আঞ্চলিক সরকারের মাধ্যমে নিজেদের ভূখণ্ড শাসন করছে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা
সামাজিকভাবে মোরো মুসলমানরা অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী এবং ইসলামের অনুশাসনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। তারা ফিলিপাইনের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ। তারা নিজেদের পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে ইসলামি শরীয়াহ আইন এবং নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ‘আদাত’ (Adat) রীতি মেনে চলে। অর্থনৈতিক দিক থেকে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলার কারণে তারা ম্যানিলা ও অন্যান্য খ্রিস্টান অঞ্চলের তুলনায় কিছুটা অনুন্নত ও দারিদ্র্যপীড়িত। তবে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার পর হালাল খাদ্য শিল্প, ইসলামী ব্যাংকিং, ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং উপসাগরীয় মুসলিম দেশগুলোর সহায়তায় তাদের জীবনমান ও কর্মসংস্থানে দ্রুত ইতিবাচক রূপান্তর ঘটছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলাম বিস্তারে আরব ও সুফি বণিকদের ভূমিকা কী ছিল?
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান ছাড়াই বাণিজ্য করতে আসা আরব, পারসিক ও ভারতীয় মুসলিম বণিকদের সততা, পরিচ্ছন্নতা এবং সুফি সাধক (বিশেষ করে জাভার নয়জন সুফি ‘ওয়ালী সঙ্গ’)-দের আধ্যাত্মিক প্রচার ও সামাজিক সাম্যের আদর্শের মাধ্যমেই দ্রুত কোটি কোটি মানুষ স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
২. মালাক্কা সালতানাতকে কেন “মালয় বিশ্বের ইসলামের প্রবেশদ্বার” বলা হয়?
১৫ শতকে প্রতিষ্ঠিত মালাক্কা সালতানাতের প্রথম শাসক পরমেস্বরা ইসলাম গ্রহণ করার পর মালাক্কা সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান বাণিজ্য ও ইসলামি সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং এখান থেকেই সুমাত্রা, জাভা, ব্রুনাই ও ফিলিপাইনে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল।
৩. টেংকু আব্দুর রহমানকে কেন মালয়েশিয়ার ‘বাপা মালয়েশিয়া’ (জাতির পিতা) বলা হয়?
টেংকু আব্দুর রহমান ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রক্তপাতহীন নিয়মতান্ত্রিক আলোচনার মাধ্যমে মালয়, চীনা ও ভারতীয়—এই তিন বৃহৎ জাতিকে একত্রিত করে ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা এনে দেন এবং ১৯৬৩ সালে বৃহত্তর ‘মালয়েশিয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন বিধায় তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে ‘বাপা মালয়েশিয়া’ বা জাতির পিতা বলা হয়।
৪. ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর কেন মালয়েশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক নগর রাষ্ট্র হয়?
সিঙ্গাপুরের চীনা সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা লি কুয়ান ইউ-এর ‘সকলের জন্য সমান মালয়েশিয়া’ নীতির সাথে তৎকালীন কেন্দ্রীয় মালয় সরকারের নীতিগত সংঘাত এবং জাতিগত দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট মালয়েশিয়া পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তে সিঙ্গাপুর পৃথক স্বাধীন নগর রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
৫. আধুনিক মালদ্বীপের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি কোনটি?
আধুনিক মালদ্বীপের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হলো তাদের দূরদর্শী ‘এক দ্বীপ, এক রিসোর্ট’ ভিত্তিক বিশ্বমানের বিলাসবহুল পর্যটন শিল্প এবং সনাতন বর্শা ও বড়শি পদ্ধতিতে পরিবেশবান্ধব উপায়ে টুনা মাছ শিকার করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রিমিয়াম মূল্যে রপ্তানি করা।
৬. ফিলিপাইনের ‘মোরো’ (Moro) মুসলিমদের ঐতিহাসিক পরিচয় কী?
ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও ও সুলু দ্বীপপুঞ্জের প্রাচীন মুসলিম অধিবাসীদের স্প্যানিশ ঔপনিবেশিকরা ঐতিহাসিকভাবে ‘মোরো’ নামে অভিহিত করেছিল। দীর্ঘ কয়েক দশকের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ২০১৯ সালে তারা ফিলিপাইনের অধীনে ‘বাংসামোরো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা করেছে।