পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৫৩
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: আধুনিক উত্তর আফ্রিকার মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ (সপ্তম পত্র)
[North African Muslim States in Modern Times (Paper VII)]
বিষয় কোড: ২০৫৮০৭
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
ক বিভাগ—রচনামূলক প্রশ্ন
[যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১৫: ১৫ × ৪ = ৬০]
১. আধুনিক উত্তর আফ্রিকার সংক্ষিপ্ত ভৌগোলিক বিবরণ দাও। উসমানীয় তুর্কীদের বিজয় ও উত্তর আফ্রিকায় ইউরোপীয় অনুপ্রবেশের ইতিহাস উপস্থাপন কর।
[English: Give a short geographical account of modern North Africa. Bring out the history of the conquest of the Ottoman Turks and European penetration in North Africa.]
আধুনিক উত্তর আফ্রিকার সংক্ষিপ্ত ভৌগোলিক বিবরণ
ভৌগোলিক দিক থেকে উত্তর আফ্রিকা হলো ভূমধ্যসাগরের সমগ্র দক্ষিণ উপকূল এবং বিশ্বের বৃহত্তম উত্তপ্ত মরুভূমি সাহারার উত্তরাংশ জুড়ে বিস্তৃত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত অঞ্চল। আধুনিক রাজনৈতিক মানচিত্রে প্রধানত ছয়টি মুসলিম রাষ্ট্র এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত—মিশর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো এবং সুদান ও মৌরিতানিয়া। মিশর ব্যতীত পশ্চিমের তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া ও মরক্কো—এই তিনটি রাষ্ট্রকে ঐতিহাসিকভাবে একত্রে ‘মাগরেব’ (Maghreb বা আরবিতে আল-মাগরিব আল-আরাবী—যার অর্থ ‘যেখানে সূর্য অস্ত যায়’) বলা হয়।
ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে উত্তর আফ্রিকাকে প্রধানত তিনটি সমান্তরাল অঞ্চলে ভাগ করা যায়:
- উর্বর উপকূলীয় অঞ্চল (টেল বা Tell): ভূমধ্যসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত সংকীর্ণ অথচ অত্যন্ত উর্বর কৃষি বলয়, যেখানে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয় এবং জলবায়ু মনোরম ভূমধ্যসাগরীয়। গম, জলপাই, আঙ্গুর ও সাইট্রাস ফলের প্রাচুর্যের কারণে এটি প্রাচীনকাল থেকেই ঘনবসতিপূর্ণ।
- অ্যাটলাস পর্বতমালা ও মালভূমি (Atlas Mountains): মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়া জুড়ে বিস্তৃত সুউচ্চ অ্যাটলাস পর্বতশ্রেণী। এই পর্বতমালা উপকূলীয় অঞ্চলকে সাহারার শুষ্ক মরুঝড় থেকে রক্ষা করে। এটি মূলত আমাজিগ বা বারবার (Berber) জনগোষ্ঠীর মূল ঐতিহাসিক আবাসস্থল।
- সাহারা মরুভূমি (The Sahara Desert): দক্ষিণাংশের সুবিশাল বালুকাময় ও পাথুরে মরুভূমি। এটি রুক্ষ ও প্রতিকূল হলেও আধুনিক যুগে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, ইউরেনিয়াম ও ফসফেটের মতো খনিজ সম্পদের অপার ভাণ্ডার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া পূর্ব প্রান্তে নীলনদ অববাহিকা মিশরের জীবনরেখা হিসেবে প্রবাহিত।
উসমানীয় তুর্কীদের বিজয় (Ottoman Conquest)
ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে স্পেনের উগ্র খ্রিস্টান রিকনকুইস্টা অভিযানের ফলে স্পেনীয় নৌবাহিনী উত্তর আফ্রিকার মুসলিম বন্দরগুলোতে ক্রমাগত আক্রমণ চালাতে শুরু করে। স্পেনীয় আগ্রাসন প্রতিহত করতে স্থানীয় মুসলিমরা অটোমানদের সহায়তা প্রার্থনা করে। এ সময় দুই বীর অটোমান ভাই—ওরুজ বারবারোসা (Oruc Reis) এবং হায়রুদ্দীন বারবারোসা (Khair ad-Din Barbarossa) উত্তর আফ্রিকার ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন:
- আলজেরিয়া বিজয় (১৫১৬-১৫২৯): ১৫১৬ সালে বারবারোসা ভাইয়েরা আলজিয়ার্স মুক্ত করেন। ১৫২৯ সালে হায়রুদ্দীন বারবারোসা স্পেনীয়দের মূল নৌঘাঁটি দখল করে আলজেরিয়াকে সরাসরি উসমানীয় সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত করেন এবং প্রথম ‘বেইলারবেয়ী’ (গভর্নর জেনারেল) নিযুক্ত হন।
- মিশর বিজয় (১৫১৭): উসমানীয় সুলতান সেলিম প্রথম ১৫১৭ সালে রিদানিয়ার যুদ্ধে মামলুকদের পরাজিত করে মিশর ও হেজাজ দখল করেন এবং উসমানীয় খিলাফতের সূচনা করেন।
- লিবিয়া ও তিউনিসিয়া বিজয় (১৫৫১-১৫৭৪): ১৫৫১ সালে উসমানীয় নৌসেনাপতি তুরগুত রইস খ্রিস্টান নাইটদের হাত থেকে ত্রিপোলি (লিবিয়া) উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে ১৫৭৪ সালে সিনান পাশা স্পেনীয়দের হাত থেকে তিউনিস জয় করেন। ফলে কেবল মরক্কো (যা স্থানীয় সাদী ও আলাউই শরিফি রাজবংশের অধীনে স্বাধীন ছিল) ব্যতীত সমগ্র উত্তর আফ্রিকা উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে।
উত্তর আফ্রিকায় ইউরোপীয় অনুপ্রবেশের ইতিহাস (European Penetration)
অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে অটোমান সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো উত্তর আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক আগ্রাসন শুরু করে:
- মিশরে ফরাসি ও ব্রিটিশ অনুপ্রবেশ: ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মিশর আক্রমণের মাধ্যমে আধুনিক ইউরোপীয় অনুপ্রবেশের সূচনা ঘটে। যদিও ফরাসিরা টিকতে পারেনি, কিন্তু ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল খননের পর খালের ঋণের ফাঁদে ফেলে ১৮৮২ সালে ব্রিটিশরা প্রত্যক্ষ সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে মিশরকে তাদের অনানুষ্ঠানিক কলোনিতে পরিণত করে।
- আলজেরিয়ায় ফ্রান্সের আগ্রাসন (১৮৩০): ১৮৩০ সালে ফরাসি রাজা দশম চার্লস বিশাল সামরিক বহর পাঠিয়ে আলজেরিয়া দখল করেন এবং একে ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডের সাথে অঙ্গীভূত করার রক্তক্ষয়ী প্রক্রিয়া শুরু করেন।
- তিউনিসিয়ায় ফরাসি প্রটেক্টরেট (১৮৮১): বারদো চুক্তির (Treaty of Bardo 1881) মাধ্যমে ফ্রান্স তিউনিসিয়ার স্বাধীনতা হরণ করে নিজেদের প্রটেক্টরেট প্রতিষ্ঠা করে।
- লিবিয়ায় ইতালির উপনিবেশ (১৯১১): ১৯১১ সালে ইতালি উসমানীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ত্রিপোলি ও সাইরেনাইকা দখল করে নেয় এবং উশি চুক্তির (১৯১২) মাধ্যমে লিবিয়া ইতালির অধীনে চলে যায়।
- মরক্কোর বিভাজন (১৯১২): ১৯১২ সালের ফেজ চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্স ও স্পেন যৌথভাবে ঐতিহাসিক মরক্কোকে বিভক্ত করে ফ্রান্সের মূল প্রটেক্টরেট এবং উত্তরাঞ্চলে স্পেনীয় মরক্কো প্রতিষ্ঠা করে।
উপসংহার
উত্তর আফ্রিকা ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরাশক্তিগুলোর সংঘাতের কেন্দ্রস্থল ছিল। উসমানীয়রা যেখানে ধর্মীয় সংহতি ও অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে শাসন করেছিল, সেখানে ইউরোপীয়রা চরম সাংস্কৃতিক নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক লুণ্ঠন কায়েম করেছিল, যা পরবর্তীকালে বিশ শতকে এক রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্ম দেয়।
২. ইতালি কর্তৃক লিবিয়া দখলের পটভূমি আলোচনা কর। এর ফলাফল কী হয়েছিল?
[English: Explain the background to Italy’s occupation of Libya. What were its effects?]
ভূমিকা
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপের নবগঠিত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ইতালি কর্তৃক উত্তর আফ্রিকার উসমানীয় শাসনাধীন ত্রিপোলিতানিয়া ও সাইরেনাইকা (বর্তমান লিবিয়া) দখল ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ১৯১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইতালি উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার যৌক্তিক কারণ ছাড়াই যুদ্ধ ঘোষণা করে লিবিয়া আক্রমণ করে। এই অন্যায় আগ্রাসনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় উসমানীয় আধিপত্যের অবসান চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।
ইতালি কর্তৃক লিবিয়া দখলের পটভূমি
- ১. ইতালীয় একীকরণ ও সাম্রাজ্যবাদী ক্ষুধা:
১৮৬১ থেকে ১৮৭০ সালে কাউন্ট ক্যাভুর ও গ্যারিবল্ডির নেতৃত্বে একীভূত হওয়ার পর ইতালি ইউরোপের ‘ষষ্ঠ মহান শক্তি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু ততদিনে ব্রিটেন ও ফ্রান্স সমগ্র আফ্রিকা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিল। নবীন ইতালি বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও “সূর্যের নিচে একটি নিজস্ব জায়গা” (A Place in the Sun) পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। - ২. তিউনিসিয়া হাতছাড়া হওয়ার গভীর ক্ষোভ:
ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে ইতালি দীর্ঘকাল প্রতিবেশী তিউনিসিয়া দখলের পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু ১৮৮১ সালে ফ্রান্স অপ্রত্যাশিতভাবে দ্রুত তিউনিসিয়া দখল করে ফরাসি প্রটেক্টরেট কায়েম করলে ইতালি চরম অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে লিবিয়াকে তারা নিজেদের একমাত্র সম্ভাব্য শিকার হিসেবে নির্ধারণ করে। - ৩. প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের স্মৃতি রোমন্থন:
ইতালীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী ও পরবর্তীতে ফ্যাসিস্টরা লিবিয়াকে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের ‘চতুর্থ উপকূল’ (Fourth Shore) বলে প্রচার শুরু করে। তাদের দাবি ছিল—ইতিহাসের দাবি মেটাতেই প্রাচীন রোমান ঐতিহ্যবাহী লিবিয়ায় ইতালির কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। - ৪. অতিরিক্ত জনসংখ্যার পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা:
তৎকালীন সময়ে দক্ষিণ ইতালিতে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা, দারিদ্র্য ও জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ বিদ্যমান ছিল। প্রতি বছর লাখ লাখ ইতালীয় বাধ্য হয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমাচ্ছিল। ইতালীয় রাজনীতিবিদরা প্রচার করলেন যে লিবিয়া এক উর্বর ভূস্বর্গ, সেখানে অন্তত তিন লাখ ইতালীয় কৃষকের স্থায়ী পুনর্বাসন সম্ভব হবে। - ৫. গোপন ইউরোপীয় কূটনীতি ও পরাশক্তিদের সবুজ সংকেত:
ইতালি সরাসরি যুদ্ধের পূর্বে অত্যন্ত চতুরতার সাথে প্রতিটি ইউরোপীয় পরাশক্তির কাছ থেকে গোপন সম্মতি আদায় করে:- ফ্রান্সের সাথে ১৯০২ সালের চুক্তি: মরক্কোয় ফ্রান্সের আধিপত্য মেনে নেওয়ার বিনিময়ে ফ্রান্স লিবিয়ায় ইতালির প্রভাব মেনে নেয়।
- রাশিয়ার সাথে ১৯০৯ সালের রাকনিগির চুক্তি: বসফরাস প্রণালীতে রাশিয়ার নৌ চলাচলের অধিকারের সমর্থনে রাশিয়া লিবিয়ায় ইতালির দাবি সমর্থন করে।
- ব্রিটেনের আশ্বাস: সুয়েজ খালের নিরাপত্তা স্বার্থে মিশর সীমান্তে ব্রিটিশরা দুর্বল ইতালিকে উসমানীয়দের চেয়ে বেশি পছন্দ করে।
- ৬. আগ্রাসন ও যুদ্ধ ঘোষণা (১৯১১):
১৯১১ সালে মরক্কোর দ্বিতীয় সংকট (আগাদির সংকট) চলাকালে যখন সব দেশ ব্যস্ত, তখন ইতালি কোনো অজুহাত না পেয়ে অভিযোগ তোলে যে ত্রিপোলিতে তুর্কি ও লিবীয়রা ইতালীয় নাগরিকদের অপমান করছে। কোনো জবাবের অপেক্ষা না করেই ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯১১ সালে ইতালি যুদ্ধ ঘোষণা করে।
ইতালি কর্তৃক লিবিয়া দখলের ফলাফল
- ১. উশি বা প্রথম লোজান শান্তি চুক্তি (১৯১২):
১৯১২ সালের ১৮ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের উশিতে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে উসমানীয় সাম্রাজ্য লিবিয়ার দাবি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। বলকান যুদ্ধের মারাত্মক বিপদের কারণে তুরস্ক লিবিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে এবং ইতালি আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রিপোলি ও সাইরেনাইকার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। - ২. লিবীয় জনগণের রক্তক্ষয়ী জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ:
তুর্কিদের বিদায়ের পর লিবিয়ার বীর সেনানী শায়খ আহমদ আশ-শরীফ এবং অমর শায়খ ওমর আল-মুখতারের নেতৃত্বে সানুসিয়া তরিকা ইতালীয় দখলদারদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক গেরিলা জিহাদ শুরু করে। ফলে দীর্ঘ দুই দশক ধরে ইতালি কেবল উপকূলীয় কয়েকটি শহরে অবরুদ্ধ হয়ে থাকতে বাধ্য হয়। - ৩. মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট বর্বরতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ:
১৯২২ সালে মুসোলিনি ক্ষমতায় এসে প্রতিরোধ চূর্ণ করতে জেনারেল রোদোলফো গ্রাৎসিয়ানিকে পাঠান। গ্রাৎসিয়ানি সমগ্র সাইরেনাইকায় লাখ লাখ মানুষকে খোলা কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে আটকে রাখে, কুয়ায় বিষ ঢালে, রাসায়নিক বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করে এবং মিশর সীমান্তে ৩০০ কিলোমিটার কাঁটাতারের প্রাচীর নির্মাণ করে। এই নির্মম গণহত্যায় প্রায় এক লক্ষাধিক লিবীয় শহীদ হন। ১৯৩১ সালে ওমর আল-মুখতারকে ফাঁসি দেওয়া হয়। - ৪. প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর প্রভাব:
ইতালি-তুর্কি যুদ্ধের ফলেই উসমানীয়দের চরম দুর্বলতা প্রকাশ পায়, যা তাৎক্ষণিকভাবে প্রথম বলকান যুদ্ধ (১৯১২) এবং পরিশেষে ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ত্বরান্বিত করে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লিবিয়ার মরুভূমি মিত্রশক্তি ও অক্ষশক্তির সবচেয়ে বড় যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। - ৫. স্বাধীন লিবিয়া রাজ্যের অভ্যুদয় (১৯৫১):
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালির শোচনীয় পরাজয়ের পর জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ১৯৫১ সালের ২৪ ডিসেম্বর সানুসী নেতা সাইয়্যিদ মুহাম্মদ ইদ্রিসকে বাদশাহ করে পৃথিবীর মানচিত্রে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম যুক্তরাজ্য লিবিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়।
উপসংহার
ইতালির লিবিয়া দখল ছিল নির্লজ্জ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের এক চরম দৃষ্টান্ত। তবে লিবিয়ার অকুতোভয় জনগণের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ এবং ওমর আল-মুখতারের আত্মত্যাগ বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত মুসলিম জাতির জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা সংগ্রামের এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে রয়েছে।
৩. ফ্রান্স কর্তৃক আলজেরিয়া দখল উল্লেখপূর্বক এর বিরুদ্ধে আলজেরীয়দের প্রতিক্রিয়া আলোচনা কর।
[English: Discuss the reaction of Algerians against the occupation of Algeria by France with reference to it.]
ফ্রান্স কর্তৃক আলজেরিয়া দখল (১৮৩০)
১৮৩০ সালের জুন মাসে ফ্রান্স কর্তৃক আলজেরিয়ায় সামরিক আগ্রাসন ও দখল ছিল উত্তর আফ্রিকার আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও সুদূরপ্রসারী ঘটনা। তৎকালীন সময়ে ফ্রান্সে বুরবোঁ রাজবংশের প্রতিক্রিয়াশীল রাজা দশম চার্লস জনবিক্ষোভের মুখে সিংহাসন বাঁচাতে জনগণের নজর অন্যদিকে ঘোরাতে এবং গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য একটি বৈদেশিক সামরিক বিজয়ের পরিকল্পনা করেন।
দখলের অজুহাত ও ‘পাখা মারার ঘটনা’ (Fly Whisk Incident): ফরাসি বিপ্লবের সময় (১৭৯৩-১৭৯৮) এবং নেপোলিয়নের মিশর অভিযানের সময় ফ্রান্স আলজেরিয়ার দুই বিশিষ্ট ইহুদি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে আলজেরিয়ার দে (Dey বা উসমানীয় গভর্নর)-এর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য ও গম বাকিতে ক্রয় করেছিল। বহু বছর অতিবাহিত হলেও ফ্রান্স এই বিশাল ঋণ পরিশোধ করেনি। ১৮২৭ সালের ২৯ এপ্রিল আলজিয়ার্সের দে হুসাইন ফরাসি কনসাল পিয়ের দেভালকে তাঁর প্রাসাদে ডেকে ঋণের অর্থ পরিশোধের দাবি জানান। দেভাল অত্যন্ত অবজ্ঞাসূচক ও অপমানজনক উত্তর দিলে ক্রুদ্ধ দে হুসাইন তাঁর হাতের ময়ূরপাখার হাতপাখা (Fly Whisk) দিয়ে দেভালের মুখমণ্ডলে মৃদু আঘাত বা স্পর্শ করেন। ফ্রান্স এই ঘটনাকে ‘জাতীয় অপমানের চরম’ আখ্যা দিয়ে আলজিয়ার্স বন্দর অবরোধ করে এবং পরিশেষে ১৪ জুন ১৮৩০ সালে ৩৭ হাজার সৈন্যের এক সুবিশাল নৌবাহিনী নিয়ে আলজিয়ার্সের সিদি ফেরুশে অবতরণ করে। ৫ জুলাই ১৮৩০ সালে আলজিয়ার্স আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং দে হুসাইনকে নির্বাসনে পাঠানো হয়।
ফ্রান্সের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আলজেরীয়দের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধ
ফরাসি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার আপামর জনতা কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, বরং ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অভূতপূর্ব প্রতিরোধ গড়ে তোলে:
- ১. আমির আব্দুল কাদিরের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ (১৮৩২-১৮৪৭):
আলজেরিয়ার পশ্চিম অঞ্চলে ফরাসি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এক তরুণ আধ্যাত্মিক সুফি সাধক ও সমরনায়ক আমির আব্দুল কাদির আল-জাযায়েরী (Amir Abdelkader)। স্থানীয় গোত্রগুলো তাঁকে ‘আমিরুল মুমিনীন’ উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি অত্যন্ত সুসংগঠিত একটি আধুনিক রাষ্ট্র ও নিয়মিত সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং ফরাসিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে দুর্ধর্ষ গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তিনি একাধিক যুদ্ধে ফরাসি বাহিনীকে পরাস্ত করে দেসমিশেল চুক্তি (১৮৩৪) ও তাফনা চুক্তি (১৮৩৭) স্বাক্ষরে ফ্রান্সকে বাধ্য করেছিলেন। ফরাসি জেনারেল বুগাদ ‘পোড়ামাটি নীতি’ ও গণহত্যা চালিয়ে ১৮৪৭ সালে মরক্কোর সীমান্তে তাঁকে অবরুদ্ধ করতে সক্ষম হয়। আমির আব্দুল কাদিরকে ‘আধুনিক আলজেরিয়ার জাতির পিতা’ হিসেবে গণ্য করা হয়। - ২. কাবাইল পর্বতের প্রতিরোধ ও লালা ফাতেমা এনসুমার (১৮৫৪-১৮৫৭):
আমির আব্দুল কাদিরের পর বারবার অধ্যুষিত দুর্গম কাবাইল অঞ্চলে এক তেজস্বী নারী যোদ্ধা লালা ফাতেমা এনসুমার (Lalla Fatma N’Soumer)-এর নেতৃত্বে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ফরাসিরা তাঁকে আলজেরিয়ার ‘জোয়ান অব আর্ক’ আখ্যা দিয়েছিল। তিনি ফরাসি জেনারেলদের একাধিক আক্রমণ প্রতিহত করেন এবং পরিশেষে ১৮৫৭ সালে বন্দি হন। - ৩. ১৮৭১ সালের মুকরানি মহাবিদ্রোহ (Mokrani Revolt):
১৮৭০ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে ফ্রান্স পরাজিত হলে আলজেরিয়ার শেখ মোহাম্মদ আল-মুকরানি প্রায় আড়াই লক্ষাধিক যোদ্ধা নিয়ে সমগ্র পূর্ব আলজেরিয়ায় এক ঐতিহাসিক গণবিদ্রোহ পরিচালনা করেন। ফরাসিরা এই বিদ্রোহ অত্যন্ত নির্মমভাবে রক্তগঙ্গায় ডুবিয়ে দেয় এবং শাস্তিস্বরূপ আলজেরীয়দের সাড়ে চার লাখ হেক্টর উর্বর কৃষিজমি বাজেয়াপ্ত করে ফরাসি বসতি স্থাপনকারীদের বিলিয়ে দেয়। - ৪. ‘ফরাসিকরণ’ নীতির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিরোধ:
১৮৪৮ সালে ফ্রান্স আলজেরিয়াকে কোনো উপনিবেশ না বলে ফ্রান্সের সরাসরি তিনটি প্রশাসনিক ডিপার্টমেন্ট (বিভাগ) ঘোষণা করে। হাজার হাজার ফরাসি, স্প্যানিশ ও ইতালীয় শ্বেতাঙ্গ বসতি স্থাপনকারী (যাদের ‘কলন’ বা ‘পিয়ে-নোয়ার’ বলা হতো) আলজেরিয়ার সমস্ত জমি ও সম্পদ দখল করে নেয়। আরবি ভাষাকে সরকারি দপ্তর ও স্কুল থেকে নিষিদ্ধ করে ‘বিদেশি ভাষা’ ঘোষণা করা হয় এবং প্রাচীন ঐতিহাসিক মসজিদগুলোকে গির্জায় রূপান্তর করা হয়। এর বিরুদ্ধে শেখ আব্দুল হামিদ বিন বাদিস ১৯৩১ সালে গঠন করেন ‘আলজেরীয় মুসলিম ওলামা সমিতি’। তাঁদের কালজয়ী মূলমন্ত্র ছিল—“ইসলাম আমাদের ধর্ম, আরবি আমাদের ভাষা, আলজেরিয়া আমাদের পিতৃভূমি।” - ৫. সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ ও FLN-এর আত্মপ্রকাশ (১৯৫৪-১৯৬২):
১৯৪৫ সালের ৮ মে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজয়ের দিনে আলজেরিয়ার সেতিফ ও গেলমাতে ফরাসিরা শান্তিপূর্ণ মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে প্রায় ৪৫ হাজার আলজেরীয়কে হত্যা করে (সেতিফ গণহত্যা)। এই গণহত্যার পর তরুণ আলজেরীয়রা বুঝতে পারে অহিংস আলোচনার দিন শেষ। ১৯৫৪ সালের ১ নভেম্বর আহমদ বেন বেল্লা, হুয়ারি বুমেদিন প্রমুখের নেতৃত্বে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (FLN) সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করে। দীর্ঘ আট বছরের এক অসম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রায় ১৫ লক্ষ আলজেরীয় শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৬২ সালের এভিয়ান চুক্তির মাধ্যমে আলজেরিয়া দীর্ঘ ১৩২ বছরের ফরাসি দাসত্ব থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করে।
উপসংহার
ফ্রান্সের আলজেরিয়া দখল ছিল মানবতার বিরুদ্ধে এক চরম অপকর্ম। ফ্রান্স আলজেরিয়াকে চিরতরে ফরাসি ভূখণ্ড বানাতে চেয়েছিল, কিন্তু আলজেরিয়ার ধর্মপ্রাণ ও দেশপ্রেমিক জনগণের দেড় শতকের রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগ প্রমাণ করেছে যে কোনো পরাশক্তিই একটি স্বাধীনতাকামী জাতির আত্মপরিচয় মুছে দিতে পারে না।
৪. সবুজ বিপ্লবের উল্লেখপূর্বক লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফীর সংস্কারসমূহ আলোচনা কর।
[English: Discuss the reforms of President Muammer Gaddafi of Libya with reference to his Green Revolution.]
ভূমিকা
১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৭ বছর বয়সী এক তরুণ জাতীয়তাবাদী সামরিক কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে কর্নেল) মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফি রক্তপাতহীন এক সামরিক অভ্যুত্থানের (আল-ফাতাহ বিপ্লব) মাধ্যমে পশ্চিমাদের অনুগত লিবিয়ার পুতুল রাজতন্ত্র (বাদশাহ প্রথম ইদ্রিস)-এর পতন ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। পরবর্তী চার দশক ধরে তিনি লিবিয়াকে আধুনিক আরব জাহানের অন্যতম ধনী, সমৃদ্ধ ও সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে বহুমুখী বৈপ্লবিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন।
গাদ্দাফির ‘সবুজ বিপ্লব’ (The Green Revolution)
লিবিয়া ভৌগোলিকভাবে ৯৫ শতাংশেরও বেশি মরুভূমিপ্রধান অঞ্চল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খাদ্য ও পানির জন্য লিবিয়া ছিল আমদানিনির্ভর ও চরম পশ্চাৎপদ। গাদ্দাফি ক্ষমতায় এসেই উপলব্ধি করেন যে, খাদ্য ও কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জন ব্যতীত প্রকৃত জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা অসম্ভব। এই উদ্দেশ্যে তিনি যে ঐতিহাসিক কৃষি ও পরিবেশগত রূপান্তর কর্মসূচি গ্রহণ করেন, তা ‘সবুজ বিপ্লব’ নামে পরিচিত:
- ১. গ্রেট ম্যান-মেড রিভার প্রকল্প (Great Man-Made River – GMR):
সবুজ বিপ্লবের প্রধানতম স্তম্ভ এবং গাদ্দাফির জীবনের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক কীর্তি হলো ‘গ্রেট ম্যান-মেড রিভার’। দক্ষিণ লিবিয়ার সাহারা মরুভূমির মাটির গভীরের নুবিয়ান স্যান্ডস্টোন জলস্তর (Aquifer) থেকে বিশালাকার ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনের মাধ্যমে বিশুদ্ধ জীবাশ্ম পানি (Fossil Water) ৪,০০০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় শহর ত্রিপোলি, বেনগাজি ও সির্তেতে পৌঁছে দেওয়া হয়। চার মিটার ব্যাসের এই বিশাল কংক্রিট পাইপলাইন নেটওয়ার্কটিকে আন্তর্জাতিক প্রকৌশলবিদরা “বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য” (Eighth Wonder of the World) বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এর ফলে লিবিয়ার কোটি কোটি মানুষ বিশুদ্ধ মিষ্টি পানি ও সেচের সুবিধা পায়। - ২. মরুদ্যানে আধুনিক কৃষি ও খামার প্রতিষ্ঠা:
কুফরা ও সারির মরুদ্যানে বিশাল বৃত্তাকার সেচ ব্যবস্থা (Center-Pivot Irrigation) স্থাপন করে মরুভূমির বালিয়াড়িতে হাজার হাজার হেক্টর আধুনিক গম, যব ও আলুর সফল চাষাবাদ শুরু করা হয়। - ৩. কৃষকদের ব্যাপক প্রণোদনা ও জমি বিতরণ:
গাদ্দাফি সরকার প্রতিটি আগ্রহী লিবীয় পরিবারকে বিনামূল্যে জমি, সুসজ্জিত আধুনিক ফার্মহাউস, ট্র্যাক্টর, বীজ, সার এবং সেচ সুবিধা প্রদান করে। কৃষি ঋণের ওপর সমস্ত সুদ বাতিল করা হয়। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে লিবিয়া ফলমূল, শাকসবজি ও দুগ্ধজাত খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে।
প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফীর অন্যান্য যুগান্তকারী সংস্কারসমূহ
- ১. রাজনৈতিক দর্শন ও প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র (‘জামাহিরিয়া’ প্রতিষ্ঠা):
গাদ্দাফি তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাধারা তিন খণ্ডে প্রকাশিত কালজয়ী ‘সবুজ গ্রন্থ’ (The Green Book বা কিতাব আল-আখদার)-এ লিপিবদ্ধ করেন। এটি পুঁজিবাদ ও সোভিয়েত সাম্যবাদের বিপরীতে ‘তৃতীয় সার্বজনীন তত্ত্ব’ (Third Universal Theory) নামে পরিচিত। ১৯৭৭ সালে তিনি লিবিয়াকে সংসদীয় ব্যবস্থার বদলে ‘জনগণের প্রত্যক্ষ রাষ্ট্র’ বা ‘সমাজতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী লিবীয় জামাহিরিয়া’ (Jamahiriya) ঘোষণা করেন। সমস্ত প্রথাগত রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে তৃণমূল স্তরে ‘বেসিক পিপলস কংগ্রেস’ (Basic People’s Congress)-এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের রূপরেখা দেন। - ২. তেল সম্পদ জাতীয়করণ ও সার্বভৌম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি:
ক্ষমতায় এসেই তিনি পশ্চিমা বহুজাতিক তেল কোম্পানিগুলোর সাথে পূর্বে সম্পাদিত সমস্ত বৈষম্যমূলক চুক্তি বাতিল করে লিবিয়ার তেল সম্পদ জাতীয়করণ করেন এবং ব্যারেল প্রতি তেলের ন্যায্য মূল্য আদায় করেন। তেলের এই বিপুল উদ্বৃত্ত রাজস্ব দিয়ে তিনি লিবিয়াকে আফ্রিকার সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশে পরিণত করেন এবং লিবিয়া সম্পূর্ণ বৈদেশিক ঋণমুক্ত দেশে রূপান্তরিত হয়। - ৩. বিশ্বমানের বিনামূল্যে সামাজিক সুরক্ষা ও জনকল্যাণ:
গাদ্দাফির শাসনামলে লিবিয়ায় সমাজকল্যাণের স্বর্ণযুগ সূচিত হয়েছিল:- শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা এবং বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ প্রতিটি নাগরিকের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিশ্চিত করা হয়। দেশীয় চিকিৎসা সম্ভব না হলে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল।
- আবাসন অধিকার: গাদ্দাফির দর্শন ছিল—”বাড়ি হলো মানুষের মৌলিক অধিকার, কোনো মানুষ অন্যের বাড়িতে ভাড়াটিয়া থাকতে পারে না।” তিনি হাজার হাজার আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করে অত্যন্ত নামমাত্র কিস্তিতে বা ফ্রিতে গৃহহীনদের বিতরণ করেন।
- সামাজিক অনুদান: প্রতিটি নবদম্পতির সংসার শুরু করার জন্য ৫০ হাজার ডলার সমমূল্যের সরকারি অনুদান, বিদ্যুৎ বিলে শতভাগ সরকারি ভর্তুকি এবং মৌলিক খাদ্যদ্রব্যে বিপুল ভর্তুকি প্রদান করা হতো।
- ৪. নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক আধুনিকায়ন:
গাদ্দাফি ঐতিহ্যবাহী পিতৃতান্ত্রিক কুসংস্কারের অবসান ঘটিয়ে নারীদের উচ্চশিক্ষা, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং সরকারি প্রশাসনে কাজ করার সমান অধিকার নিশ্চিত করেন। তাঁর ব্যক্তিগত সুরক্ষায় নারী কমান্ডো ব্যাটালিয়ন নিয়োগ দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে চমক সৃষ্টি করেছিলেন। - ৫. আফ্রিকান ও প্যান-আরব নেতৃত্ব:
তিনি আফ্রিকান ইউনিয়ন (AU) গঠনে প্রধান অর্থদাতা ও রূপকার ছিলেন। তিনি আফ্রিকার জন্য একক স্বাধীন মুদ্রা ‘স্বর্ণ দিনার’ (Gold Dinar) চালুর পরিকল্পনা করেছিলেন, যা পশ্চিমা মুদ্রা ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছিল।
উপসংহার
কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসনামলে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন ও কিছু একনায়কতান্ত্রিক ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও, লিবিয়ার কৃষি, অবকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তাঁর সবুজ বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক সংস্কার ছিল আফ্রিকার ইতিহাসে অনন্য ও অবিস্মরণীয়। ২০১১ সালে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর আগ্রাসনে তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর লিবিয়া আজ যে বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধে নিপতিত হয়েছে, তা গাদ্দাফির উন্নয়নের মূল্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
৫. আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আহমেদ বেন বেল্লার কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর। তিনি কেন ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন?
[English: Evaluate the achievements of Ahmed Ben Bellah as the President of Algeria. Why was he dethroned?]
ভূমিকা
আহমেদ বেন বেল্লা (১৯১৬-২০১২ খ্রি.) ছিলেন আলজেরিয়ার রক্তক্ষয়ী জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় ঐতিহাসিক বিপ্লবী নেতা (বিপ্লবের ঐতিহাসিক নয়জন প্রতিষ্ঠাতার অন্যতম), ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (FLN)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৬২ সালের জুলাই মাসে রক্তস্নাত স্বাধীন আলজেরিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। দীর্ঘ ১৩২ বছরের ফরাসি ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন ও আট বছরের প্রলয়ংকারী যুদ্ধের পর ছাইভস্ম থেকে স্বাধীন আলজেরিয়া রাষ্ট্র পুনর্গঠনে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছিলেন।
আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেন বেল্লার প্রধান প্রধান কৃতিত্বসমূহ
- ১. যুদ্ধবিধ্বস্ত আলজেরিয়া পুনর্গঠন ও শরণার্থী পুনর্বাসন:
স্বাধীনতা লাভের সময় আলজেরিয়ার অবস্থা ছিল ভয়াবহ। আট বছরের যুদ্ধে ১৫ লক্ষ মানুষ নিহত, ২০ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত এবং সমগ্র অর্থনীতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। বেন বেল্লা দ্রুত জরুরি খাদ্য বিতরণ, গৃহহীনদের আশ্রয় প্রদান এবং প্রতিবেশী তিউনিসিয়া ও মরক্কো থেকে লাখ লাখ আলজেরীয় শরণার্থীকে নিজ ভূমিতে পুনর্বাসনের সফল নেতৃত্ব দেন। - ২. ‘অটো-জেস্তিয়ন’ বা শ্রমিকদের স্বশাসন কর্মসূচি (Autogestion):
বেন বেল্লার অর্থনৈতিক সংস্কারের সবচেয়ে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ছিল ‘অটো-জেস্তিয়ন’ বা শ্রমিক-কৃষকদের গণতান্ত্রিক স্বশাসন। স্বাধীনতার সাথে সাথে প্রায় ১০ লক্ষ ইউরোপীয় ফরাসি বসতি স্থাপনকারী (Colons) তাদের বিশাল বিশাল কৃষিজমি, বহুতল ভবন, হাসপাতাল ও কলকারখানা ফেলে ফ্রান্সে পালিয়ে যায়। বেন বেল্লা এসব পরিত্যক্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত ঘোষণা করেন এবং কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় না গিয়ে সরাসরি স্থানীয় কৃষক ও শ্রমিকদের সমবায় কমিটির হাতে এগুলো পরিচালনার দায়িত্ব দেন। এই পদক্ষেপ গ্রামীণ অর্থনীতিকে তাৎক্ষণিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছিল। - ৩. শিক্ষা ব্যবস্থার দ্রুত ‘আরবীকরণ’ (Arabization):
ফরাসি শাসনামলে আলজেরিয়ার ওপর যে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালানো হয়েছিল, তা মুছে ফেলে জাতিকে তার ইসলামি ও আরবি আত্মপরিচয়ে ফিরিয়ে আনতে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন এবং আরবিকে একমাত্র সরকারি শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষক সংকট দূর করতে তিনি মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দেল নাসেরের সহায়তায় মিশর থেকে হাজার হাজার দক্ষ শিক্ষক আলজেরিয়ায় নিয়ে আসেন। - ৪. স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও বিশ্ব বিপ্লবী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু:
বেন বেল্লা আলজেরিয়াকে বিশ্বের নির্যাতিত ও মুক্তিকামী মানুষের তীর্থক্ষেত্রে পরিণত করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল—“আলজেরিয়া হলো সকল বিপ্লবীর মুক্তাঞ্চল।” তিনি নেলসন ম্যান্ডেলার এএনসি (ANC), ফিলিস্তিনের পিএলও (PLO), কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো এবং ভিয়েতনামের স্বাধীনতাকামী বাহিনীকে সামরিক প্রশিক্ষণ ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে (NAM) আলজেরিয়ার নেতৃত্বকে শীর্ষস্থানে নিয়ে যান। - ৫. প্রথম সংবিধান ও প্রজাতান্ত্রিক কাঠামো প্রণয়ন:
১৯৬৩ সালে তিনি স্বাধীন আলজেরিয়ার প্রথম গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করেন, যার মাধ্যমে আলজেরিয়াকে একটি সমাজতান্ত্রিক ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বেন বেল্লার ক্ষমতাচ্যুতির কারণসমূহ (১৯৬৫ সালের ১৯ জুন)
বেন বেল্লা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচণ্ড জনপ্রিয় হলেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ১৯৬৫ সালের ১৯ জুন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী কর্নেল হুয়ারি বুমেদিনের নেতৃত্বে এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বেন বেল্লাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এর প্রধান কারণগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
- সামরিক বাহিনীর সাথে তীব্র ক্ষমতার দ্বন্দ্ব: আলজেরিয়ার স্বাধীনতার মূল চালিকাশক্তি ছিল সেনাবাহিনী (ALN)। বেন বেল্লা ছিলেন মূলত রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিক, আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুয়ারি বুমেদিন ছিলেন বাস্তববাদী সামরিক প্রধান। বেন বেল্লা সেনাবাহিনীর ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য স্থানীয় মিলিশিয়া বাহিনীকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন, যা বুমেদিন ও সামরিক কমান্ড কাউন্সিলকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করে তোলে।
- অতিমাত্রায় ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ ও স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা: বেন বেল্লা ধীরে ধীরে সমস্ত ক্ষমতা এককভাবে নিজের হাতে কুক্ষিগত করেন। তিনি একাধারে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং ক্ষমতাসীন একমাত্র দল FLN-এর মহাসচিবের দায়িত্ব নিজের হাতে নেন। সহকর্মী বর্ষীয়ান বিপ্লবী নেতাদের (যেমন খিদির, ফেরহাত আব্বাস প্রমুখ) কোণঠাসা করায় দলীয় নেতৃত্ব তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়।
- অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও অব্যবস্থাপনা: সমাজতান্ত্রিক ‘অটো-জেস্তিয়ন’ ব্যবস্থা প্রাথমিক উৎসাহের পর অব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব এবং দুর্নীতির কারণে চরম সংকটে পড়ে। জাতীয় শিল্পোৎপাদন হ্রাস পায়, বেকারত্ব বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক মোহভঙ্গ ঘটে।
- আসন্ন আলজিয়ার্স শীর্ষ সম্মেলন ও বুমেদিনের দ্রুত পদক্ষেপ: বেন বেল্লা ১৯৬৫ সালের জুনের শেষের দিকে আলজিয়ার্সে আফ্রো-এশীয় শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। বুমেদিন বুঝতে পেরেছিলেন যে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন সফল হলে বেন বেল্লাকে ক্ষমতা থেকে সরানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই সম্মেলনের ঠিক পূর্বে ১৯ জুন ১৯৬৫ সালের ভোরে ট্যাংকের সাহায্যে প্রেসিডেন্সিয়াল বাসভবন ঘিরে ফেলে বেন বেল্লাকে বন্দি করা হয়।
উপসংহার
আহমেদ বেন বেল্লা ছিলেন একজন নিখাদ দেশপ্রেমিক, স্বপ্নদর্শী আন্তর্জাতিকতাবাদী এবং আলজেরিয়ার স্বাধীনতার অবিনাশী প্রতীক। তবে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি, একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা লিপ্সা এবং সামরিক বাহিনীর শক্তিকে খাটো করে দেখার রাজনৈতিক ভুলের কারণে তাঁকে ক্ষমতা হারাতে হয় এবং প্রায় দেড় দশক গৃহবন্দী জীবন কাটাতে হয়।
৬. সুদানে মাহদী বিপ্লবের গতি ও প্রকৃতি আলোচনা কর।
[English: Discuss the movement and nature of the Mahdi Revolution in Sudan.]
ভূমিকা
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে (১৮৮১-১৮৯৮ খ্রি.) পূর্ব আফ্রিকার মুসলিম দেশ সুদানে ইউরোপীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের দোসর তুর্কি-মিশরীয় খেদিভদের অন্যায় ও নির্মম শোষণের বিরুদ্ধে মুহাম্মদ আহমদ আল-মাহদী (১৮৪৪-১৮৮৫ খ্রি.)-র নেতৃত্বে যে ঐতিহাসিক সশস্ত্র ও আধ্যাত্মিক গণবিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, তা ইতিহাসে ‘সুদানের মাহদী বিপ্লব’ (The Mahdist Revolution in Sudan) নামে খ্যাত। এটি ছিল আধুনিক যুগে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আফ্রিকার বুকে প্রথম সফল স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
মাহদী বিপ্লবের গতি ও ধারাবাহিক বিকাশ (The Movement and Trajectory)
- ১. মাহদী দাবি ও বিপ্লবের সূচনা (১৮৮১):
সুদানের দাঙ্গোলা অঞ্চলে এক দরিদ্র নৌকা প্রস্তুতকারক পরিবারে জন্মগ্রহণকারী মুহাম্মদ আহমদ ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও সামানিয়া সুফি তরিকার একজন আধ্যাত্মিক সাধক। ১৮৮১ সালের ২৯ জুন শ্বেত নীলনদের ‘আব্বা দ্বীপে’ তিনি নিজেকে শেষ জামানার প্রতিশ্রুত সংস্কারক ‘ইমাম মাহদী’ (The Guided One) ঘোষণা করেন। তিনি ঘোষণা দেন যে তাঁর লক্ষ্য হলো পৃথিবীতে ইসলামের আদি ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা করা এবং বিদেশি অপশাসন দূর করা। তাঁর ভক্ত অনুসারীদের বলা হতো ‘আনসার’ (Ansar বা সাহায্যকারী)। - ২. কুর্দুফান ও পশ্চিম সুদানে সামরিক সাফল্য (১৮৮২-১৮৮৩):
তুর্কি-মিশরীয় সরকার আব্বা দ্বীপে সৈন্য পাঠালে মাহদীর অনুসারীরা সাধারণ লাঠিসোঁটা ও বল্লম দিয়ে তাদের পরাস্ত করে। এরপর মাহদী পশ্চিম সুদানের কুর্দুফানের পার্বত্য অঞ্চলে হিজরত করেন। ১৮৮৩ সালে এল-ওবেইদ শহর মাহদীবাহিনীর দখলে আসে। ১৮৮৩ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ জেনারেল উইলিয়াম হিকসের নেতৃত্বে ১০ হাজার সুপ্রশিক্ষিত মিশরীয় বাহিনীকে শায়কান প্রান্তরে (Battle of Shaykan) মাহদীর আনসাররা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে সমগ্র পশ্চিম ও মধ্য সুদান মাহদিয়াহ রাষ্ট্রের অধীনে চলে আসে। - ৩. ঐতিহাসিক খার্তুম অবরোধ ও জেনারেল গর্ডনের পতন (১৮৮৪-১৮৮৫):
সুদানের শোচনীয় পরিস্থিতি দেখে ব্রিটিশ সরকার তাদের বিখ্যাত সমরনায়ক জেনারেল চার্লস গর্ডনকে (Gordon of Khartoum) সুদানের গভর্নর জেনারেল করে খার্তুমে পাঠায়। মাহদী গর্ডনকে ইসলাম গ্রহণের অথবা খার্তুম ত্যাগ করার প্রস্তাব দেন। গর্ডন তা প্রত্যাখ্যান করলে মাহদীর আনসার বাহিনী ১৮৮৪ সালের মার্চ থেকে দীর্ঘ ১০ মাস ধরে দুর্ভেদ্য খার্তুম শহর অবরুদ্ধ করে রাখে। পরিশেষে ১৮৮৫ সালের ২৬ জানুয়ারি আনসাররা প্রাচীর ভেঙে খার্তুম দুর্গে প্রবেশ করে এবং গভর্নর প্রাসাদের সিঁড়িতে জেনারেল গর্ডন নিহত হন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এই চরম পরাজয় সমগ্র ইউরোপে শোক ও আতঙ্কের ছায়া ফেলেছিল। - ৪. মাহদিয়াহ রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও খলিফা আব্দুল্লাহ (১৮৮৫-১৮৯৮):
খার্তুম বিজয়ের মাত্র পাঁচ মাস পর ২২ জুন ১৮৮৫ সালে ইমাম মাহদী আকস্মিক জ্বরে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর যোগ্যতম সেনাপতি খলিফা আব্দুল্লাহ আল-তায়িশী-কে তাঁর উত্তরসূরি মনোনীত করে যান। খলিফা আব্দুল্লাহ ওমদুরমানে রাজধানী স্থানান্তর করে দীর্ঘ তের বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে স্বাধীন মাহদিয়াহ রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। তিনি নিজস্ব মুদ্রা চালু করেন, রাজস্ব সংস্কার করেন এবং সুদানকে ব্রিটিশ ও ইথিওপীয় আগ্রাসন থেকে রক্ষা করেন। - ৫. ওমদুরমানের যুদ্ধ ও বিপ্লবের পরিসমাপ্তি (১৮৯৮):
জেনারেল গর্ডনের হত্যার প্রতিশোধ নিতে এবং নীলনদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৮৯৮ সালে লর্ড কিচেনারের নেতৃত্বে সর্বাধুনিক ম্যাক্সিম মেশিনগান, আধুনিক কামান ও গানবোটে সজ্জিত এক বিশাল ইঙ্গ-মিশরীয় যৌথ বাহিনী পাঠায়। ১৮৯৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর ওমদুরমানের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বীর আনসার বাহিনী অসম সাহসিকতার সাথে প্রাণ বিসর্জন দেয় (এক দিনেই প্রায় ১১ হাজার আনসার শহীদ হন)। এর মাধ্যমে স্বাধীন মাহদী রাষ্ট্রের পতন ঘটে এবং সুদান ১৮৯৯ সালে ‘ইঙ্গ-মিশরীয় যৌথ শাসন’ (Condominium)-এর পরাধীনতায় আবদ্ধ হয়।
মাহদী বিপ্লবের বহুমুখী প্রকৃতি (Nature of the Revolution)
- ধর্মীয় ও মিলেনারিয়ান প্রকৃতি (Millenarian Islamic Character): এই বিপ্লবের মূল ভিত্তি ছিল বিশুদ্ধ ইসলামি বিশ্বাসের পুনরুজ্জীবন। মাহদী কুরআন ও সুন্নাহকে দেশের একমাত্র সংবিধান ঘোষণা করেছিলেন এবং চারটি প্রথাগত মাজহাবের অন্ধ তাকলিদ রহিত করে ইজতিহাদের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মদ, জুয়া, ধূমপান এবং বিলাসবহুল জীবন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
- ঔপনিবেশিকতাবিরোধী ও জাতীয়তাবাদী মুক্তি সংগ্রাম: বাহ্যিকভাবে এটি একটি ধর্মীয় আন্দোলন মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত মূল কারণ ছিল চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ। তুর্কি ও মিশরীয় কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত করের বোঝা এবং ব্রিটিশ খ্রিস্টানদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে এটি ছিল সুদানের নির্যাতিত জনগণের প্রথম ঐক্যবদ্ধ জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ।
- সাম্যবাদী ও গণমুখী রূপ: মাহদী সমাজে প্রচলিত আভিজাত্য, গোত্রপ্রথা ও বর্ণবৈষম্য ভেঙে দিয়ে সকল মুসলমানকে ভাই ভাই হিসেবে ‘আনসার’ পরিচয়ে আবদ্ধ করেছিলেন। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলকে একই ধরনের সাদা তালি দেওয়া জুব্বা (Jubba) পরতে বাধ্য করা হতো, যা ছিল আত্মত্যাগ ও কৃচ্ছ্রসাধনের অনন্য প্রতীক।
উপসংহার
সুদানের মাহদী বিপ্লব ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আফ্রিকার মাটিতে সংঘটিত এক অভাবনীয় ইতিহাস। ব্রিটিশদের সামরিক প্রযুক্তির কারণে বিপ্লবটি দীর্ঘস্থায়ী হতে না পারলেও, এটি সুদানী জাতির মধ্যে যে আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার আগুন জ্বেলেছিল, তারই ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে সুদান পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করেছিল।
৭. তিউনিসিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনে হাবীব বারগুইবার ভূমিকা মূল্যায়ন কর। এ আন্দোলন কি সফল হয়েছিল?
[English: Evaluate the role of Habib Berguiba in the struggle for independence of Tunisia. Is this movement succeed?]
ভূমিকা
উত্তর আফ্রিকার ক্ষুদ্র অথচ ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ মুসলিম রাষ্ট্র তিউনিসিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের মহান স্থপতি এবং আধুনিক তিউনিসিয়া প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হাবীব বারগুইবা (১৯০৩-২০০০ খ্রি.)। দীর্ঘ ৭৫ বছরের ফরাসি ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে জাতিকে মুক্ত করে একটি আধুনিক, সার্বভৌম ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে তাঁর দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আপসহীন কূটনীতি এবং গণসংগ্রামের অবদান বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। তাঁকে তিউনিসিয়ার ‘সুপ্রিম কমব্যাটেন্ট’ (Supreme Combatant বা সর্বোচ্চ মুজাহিদ) বলা হয়।
স্বাধীনতা আন্দোলনে হাবীব বারগুইবার ভূমিকা
- ১. ‘নব্য দস্তুর পার্টি’ প্রতিষ্ঠা (Neo-Destour Party, 1934):
প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী তরুণ বারগুইবা দেশে ফিরে তিউনিসিয়ার প্রাচীন জাতীয়তাবাদী দল ‘দস্তুর পার্টি’র সাথে যুক্ত হন। কিন্তু তিনি লক্ষ্য করেন যে প্রাচীন বুর্জোয়া নেতারা নিছক আবেদন-নিবেদনের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ। তাই ১৯৩৪ সালের ২ মার্চ কাসার হেলালে তিনি তরুণ বুদ্ধিজীবী, কৃষক ও শ্রমিকদের সংগঠিত করে ঐতিহাসিক ‘নব্য দস্তুর পার্টি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে তিউনিসিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলন একটি এলিট শ্রেণির বৈঠকখানা থেকে বের হয়ে তৃণমূলের গণআন্দোলনে পরিণত হয়। - ২. বাস্তববাদী ও যুগান্তকারী কৌশলগত নীতি (Bourguibism):
বারগুইবার রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ‘বাস্তববাদ ও পর্যায়ক্রমিক অগ্রগতি’ (Bourguibism)। তিনি আলজেরিয়ার মতো অন্ধ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে না গিয়ে ফরাসিদের সাথে দরকষাকষির নীতি গ্রহণ করেন। তিনি বলতেন—“আন্দোলন চালিয়ে যাও, যতটুকু পাও গ্রহণ কর এবং পরবর্তী দাবির জন্য প্রস্তুত হও।” এই কৌশলের মাধ্যমে তিনি ফ্রান্সের কাছ থেকে প্রথমে অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন এবং পরবর্তীতে পূর্ণ স্বাধীনতা আদায় করেন। - ৩. দীর্ঘ কারাবরণ ও নির্ভীক নেতৃত্ব:
ফরাসি সরকার তাঁর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় শঙ্কিত হয়ে ১৯৩৮ সালে নব্য দস্তুর পার্টিকে নিষিদ্ধ করে এবং বারগুইবাকে গ্রেফতার করে ফ্রান্সের দুর্গম কারাগারে পাঠায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত তিনি কারারুদ্ধ ছিলেন। কিন্তু কোনো প্রকার প্রলোভন বা নিপীড়ন তাঁকে স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। কারামুক্ত হয়ে তিনি মিসর, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘে ভ্রমণ করে তিউনিসিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলেন। - ৪. সশস্ত্র প্রতিরোধ ও কূটনৈতিক চাপের সমন্বয়:
১৯৫২ সালে ফরাসিরা পুনরায় তাঁকে গ্রেফতার করলে তিউনিসিয়ার শহর ও গ্রামাঞ্চলে ফরাসিদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান এবং গোপন সশস্ত্র গেরিলা দল ‘ফালাগা’ (Fellagha)-র প্রতিরোধ শুরু হয়। বারগুইবা বন্দি থেকেই এই আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দেন। ফরাসিরা বুঝতে পারে বারগুইবাকে মুক্ত করে ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া তিউনিসিয়ায় শান্তি ফিরবে না।
এ আন্দোলন কি সফল হয়েছিল?
হ্যাঁ, হাবীব বারগুইবার নেতৃত্বে পরিচালিত তিউনিসিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলন পরিপূর্ণভাবে সফল হয়েছিল। তাঁর রাজনৈতিক সাফল্য ও পরবর্তী পদক্ষেপসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:
- স্বাধীনতা অর্জন (১৯৫৬): আলজেরিয়ায় যখন ফরাসিদের যুদ্ধ মারাত্মক রূপ নিচ্ছিল, তখন বারগুইবার ক্রমাগত চাপে নতি স্বীকার করে ১৯৫৬ সালের ২০ মার্চ ফ্রান্স তিউনিসিয়াকে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
- প্রজাতন্ত্র ঘোষণা ও রাজতন্ত্রের অবসান (১৯৫৭): স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৫৭ সালের ২৫ জুলাই বারগুইবা তিউনিসিয়ার প্রাচীন ও অযোগ্য হুসাইনী বংশীয় ‘বে’ (Bey) রাজতন্ত্র চিরতরে বিলুপ্ত করে তিউনিসিয়াকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন এবং দেশটির প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
- বিজার্তে থেকে ফরাসিদের চূড়ান্ত বিতাড়ন (১৯৬৩): স্বাধীনতার পরেও ফ্রান্স তিউনিসিয়ার কৌশলগত বিজার্তে (Bizerte) নৌঘাঁটি দখল করে রেখেছিল। বারগুইবার নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী বিজার্তে সংকটের পর ১৯৬৩ সালের অক্টোবরে সর্বশেষ ফরাসি সৈন্য তিউনিসিয়ার মাটি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
- আধুনিক সামাজিক ও আইনি সংস্কার: রাষ্ট্রপতি হিসেবে বারগুইবা তিউনিসিয়ায় বৈপ্লবিক সামাজিক রূপান্তর ঘটান। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রণয়ন করেন ‘কোড অব পার্সোনাল স্ট্যাটাস’ (CPS)। এর মাধ্যমে তিনি বহুবিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন, নারীদের ভোটাধিকার ও তালাকের সমঅধিকার নিশ্চিত করেন এবং বাল্যবিয়ে রদ করেন। তিউনিসিয়া সমগ্র আরব জাহানের অন্যতম আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
উপসংহার
হাবীব বারগুইবা ছিলেন একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী কূটনীতিবিদ ও জাতির পিতা। তাঁর প্রজ্ঞা, বাস্তববাদী দূরদর্শিতা ও অনমনীয় দেশপ্রেমের মাধ্যমেই তিউনিসিয়া কোনো প্রকার গৃহযুদ্ধ বা স্থায়ী ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই স্বাধীনতা ও আধুনিক সভ্যতার স্বর্ণদুয়ারে প্রবেশ করতে পেরেছিল।
৮. মরক্কোতে ফ্রান্সের বর্বর নীতি পর্যালোচনা কর। এর বিরুদ্ধে আরবদের কীরূপ প্রতিক্রিয়া ছিল?
[English: Review the Berber policy of the France in Morocco. What was the reaction of the Arabs against it?]
ভূমিকা ও পটভূমি
১৯১২ সালের ৩০ মার্চ ফেজ চুক্তির (Treaty of Fez) মাধ্যমে ঐতিহাসিক মরক্কো সালতানাতের ওপর ফরাসি প্রটেক্টরেট কায়েম হওয়ার পর ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসকরা দেশটিতে নিজেদের আধিপত্য দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য চিরন্তন সাম্রাজ্যবাদী ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ (Divide and Rule) নীতি প্রয়োগ করে। এই কুটিল কূটকৌশলের সবচেয়ে নগ্ন ও বিপজ্জনক প্রকাশ ছিল মরক্কোর আদিবাসী আমাজিগ বা বারবার (Berber) এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্থায়ী কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে গৃহীত ‘ফরাসি বর্বর নীতি’ (French Berber Policy)।
ফরাসিদের বর্বর নীতির মূল রূপরেখা ও ‘বর্বর দাহির’ (The Berber Dahir of 1930)
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ও ঔপনিবেশিক প্রশাসকরা প্রচার করতে শুরু করেন যে মরক্কোর পার্বত্য অঞ্চলের বারবাররা খাঁটি মুসলমান নয়; তাদের ইসলামি রীতিনীতি অগভীর এবং তারা প্রাক-ইসলামিক ইউরোপীয় সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠ। এই মিথ্যা তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ফরাসি কর্তৃপক্ষ ১৯৩০ সালের ১৬ মে মরক্কোর নামমাত্র সুলতান পঞ্চম মুহাম্মদকে বাধ্য করে একটি ঐতিহাসিক কুখ্যাত রাজকীয় ফরমান বা ‘বর্বর দাহির’ (Dahir Berbère) জারি করায়। এর প্রধান ধারাসমূহ ছিল:
- শরীয়াহ আদালতের বিচারিক ক্ষমতা বিলোপ: বারবার অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রচলিত কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক ইসলামি শরীয়াহ আদালত ও কাজীর বিচার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করা হয়।
- উপজাতীয় প্রথাগত আইনের প্রতিষ্ঠা: শরীয়াহর পরিবর্তে ফরাসি নিয়ন্ত্রিত উপজাতীয় আঞ্চলিক প্রথাগত রীতিনীতি (Customary Law বা উরফ)-কে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের প্রধান উৎস ঘোষণা করা হয়।
- ফরাসি ফৌজদারি আদালতের কর্তৃত্ব: গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারকাজ সরাসরি ফরাসি ফৌজদারি আদালতের অধীনে ন্যস্ত করা হয়।
- সাংস্কৃতিক ফরাসিকরণ ও খ্রিস্টধর্ম প্রচার: বারবার অঞ্চলে আরবি ভাষার পরিবর্তে ফরাসি ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয় এবং বারবারদের ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন করে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার জন্য ফরাসি ক্যাথলিক মিশনারিদের অবাধ সুযোগ দেওয়া হয়।
ফরাসি বর্বর নীতির বিরুদ্ধে আরব ও বারবারদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
ফরাসি সাম্রাজ্যবাদীরা ভেবেছিল এই নীতির মাধ্যমে তারা বারবারদের নিজেদের অনুগত বানিয়ে আরবদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে। কিন্তু তাদের এই হিসাব সম্পূর্ণ উল্টো প্রমাণিত হয়। এটি মরক্কোর জনগণের ধর্মীয় ও জাতীয় অনুভূতিতে এমন এক মারাত্মক আঘাত হানে, যার ফলে আরব ও বারবাররা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহে ফেটে পড়ে:
- মসজিদগুলোতে ‘দোয়া লতিফ’ পাঠের গণআন্দোলন: ১৯৩০ সালের মে মাসের শেষ শুক্রবার থেকে মরক্কোর ফেজ, রাবাত, কাসাব্লাঙ্কা, মারাকেশ ও তিতোয়ানের প্রধান প্রধান মসজিদে বিশেষ করে ঐতিহাসিক কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের জামে মসজিদে হাজার হাজার মুসলিম সমবেত হয়ে আল্লাহর দরবারে বিশেষ প্রার্থনা ‘দোয়া লতিফ’ (يا لطيف نسألك اللطف فيما جرت به المقادير – হে পরম দয়ালু আল্লাহ, তোমার ফায়সালার এই কঠিন দুর্যোগ থেকে আমাদের রক্ষা কর) পাঠ শুরু করে। এই ধর্মীয় প্রার্থনা দ্রুত ফরাসি বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিরোধ আন্দোলনের স্লোগানে রূপ নেয়।
- আধুনিক মরক্কো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্ম: বারবার দাহিরের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়ায় আল্লামা আল্লাল আল-ফাসী (Allal al-Fassi), মুহাম্মদ বিন হাসান আল-ওয়াজ্জানি এবং আহমেদ বালাফরেজের মতো তরুণ মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে আধুনিক মরক্কোর স্বাধীনতা আন্দোলন। তাঁরা গঠন করেন ‘কাতিবাত আল-আমাল আল-ওয়াতানি’ (মরক্কো অ্যাকশন কমিটি) যা পরবর্তীতে শক্তিশালী ‘ইস্তিকলাল পার্টি’ (Istiqlal Party বা স্বাধীনতা দল)-এ রূপান্তরিত হয়।
- বারবারদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যাখ্যান: ফরাসিরা যাদের জন্য এই আইন করেছিল, সেই অকুতোভয় বারবার উপজাতিরা এই আইনকে নিজেদের ধর্মের ওপর কুফরি হস্তক্ষেপ আখ্যা দিয়ে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। তারা প্রকাশ্য জনসভায় নিজেদের মুসলিম পরিচয়ের পক্ষে স্লোগান তোলে এবং ইসলামি শরীয়াহ আদালতের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে।
- আন্তর্জাতিক মুসলিম জাহানের গর্জন: মরক্কোর বর্বর নীতির খবর আন্তর্জাতিক বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ ইসলামি চিন্তাবিদ আমির শাকীব আরসালান জেনেভায় বসে ফরাসিদের এই ইসলামবিদ্বেষী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী কলম ধরেন। মিশর, সিরিয়া, তিউনিসিয়া এমনকি অবিভক্ত ভারতের মুসলিমরাও ফরাসি দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
- ফরাসিদের লজ্জাজনক পশ্চাদপসরণ (১৯৩৪): অবিরাম গণআন্দোলন, ধর্মঘট ও আন্তর্জাতিক নিন্দার মুখে ফরাসি সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ১৯৩৪ সালের ৮ এপ্রিল এক নতুন ফরমানের মাধ্যমে ফরাসিরা বিতর্কিত বারবার দাহিরের বিচারিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনমূলক ধারাগুলো বাতিল ও প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
উপসংহার
মরক্কোতে ফ্রান্সের বর্বর নীতি ছিল ঔপনিবেশিক সাম্প্রদায়িক কূটকৌশলের এক চরম ব্যর্থতা। যে নীতি মরক্কোর মানুষকে খণ্ডবিখণ্ড করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, সেই নীতিই মরক্কোর আরব ও বারবারদের এক অভিন্ন ইসলামি ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় চিরতরে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে মরক্কোর পূর্ণ স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল।
খ বিভাগ—সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
[যে কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১০: ১০ × ২ = ২০]
৯. সবুজ বিপ্লব।
[English: Green Revolution.]
ধারণা ও প্রেক্ষাপট
লিবিয়ার আধুনিক ইতিহাসে ‘সবুজ বিপ্লব’ বলতে বোঝায় ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে কর্নেল মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফির সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় দর্শনের আলোকে অনুর্বর মরুভূমিপ্রধান লিবিয়াকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও উর্বর কৃষি রাষ্ট্রে রূপান্তরের বহুমুখী বৈপ্লবিক পরিকল্পনা। লিবিয়ার ভৌগোলিক ভূখণ্ডের শতকরা ৯৫ ভাগেরও বেশি এলাকা ছিল বৃষ্টিহীন রুক্ষ সাহারা মরুভূমি। আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে খাদ্যে জাতীয় নিরাপত্তা অর্জন করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
গ্রেট ম্যান-মেড রিভার ও প্রধান পদক্ষেপ
সবুজ বিপ্লবের প্রধান ভিত্তি ছিল গাদ্দাফির ঐতিহাসিক ‘গ্রেট ম্যান-মেড রিভার’ (Great Man-Made River – GMR) প্রকল্প। দক্ষিণ লিবিয়ার মরুভূমির ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির বিশাল স্তর থেকে ৪ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ কংক্রিট পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের সমস্ত শহর ও কৃষিক্ষেত্রে পানি সরবরাহ করা হয়। এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে কুফরা ও সারির মরুদ্যানে বৃত্তাকার আধুনিক স্প্রিংকলার সেচ ব্যবস্থার সাহায্যে মরুভূমির বালিয়াড়িতে হাজার হাজার টন গম ও বার্লি উৎপাদন শুরু হয়। গাদ্দাফি প্রতিটি কৃষক পরিবারকে বিনামূল্যে বাড়ি, জমি, ট্রাক্টর ও বীজ বিতরণ করেন এবং সমস্ত কৃষি ঋণ সুদহীন ঘোষণা করেন। এর ফলে লিবিয়া ডিম, দুগ্ধজাত খাদ্য, শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছিল।
১০. আগাদির সংকট।
[English: Agadir Crisis.]
ঘটনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯১১ সালের জুলাই মাসে মরক্কোর আটলান্টিক উপকূলবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আগাদিরে (Agadir) ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে সংঘটিত ভয়াবহ কূটনৈতিক ও সামরিক সংঘাতই ইতিহাসে ‘আগাদির সংকট’ বা ‘দ্বিতীয় মরক্কো সংকট’ নামে পরিচিত। ১৯১১ সালে মরক্কোর ফেজ শহরে সুলতান আব্দুল হাফিজের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের বিদ্রোহ দেখা দিলে ফরাসি সরকার মরক্কোয় সৈন্য পাঠায়। জার্মানির কায়জার দ্বিতীয় উইলহেম এই ফরাসি সামরিক আগ্রাসনের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং দাবি করেন যে ফ্রান্স ১৯০৬ সালের আলজেসিরাস সম্মেলন লঙ্ঘন করেছে।
প্যান্থার গানবোট ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনা
জার্মানি নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে ১ জুলাই ১৯১১ সালে আগাদির বন্দরে ‘এসএমএস প্যান্থার’ (SMS Panther) নামক একটি ভারী গানবোট বা যুদ্ধজাহাজ পাঠায় (যা ‘প্যান্থার স্প্রিং’ নামে খ্যাত)। জার্মানির এই আগ্রাসী পদক্ষেপে সমগ্র ইউরোপে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। ব্রিটেন দ্রুত ফ্রান্সের পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করে এবং ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ তাঁর বিখ্যাত ‘ম্যানশন হাউস স্পিচ’-এ জার্মানিকে স্পষ্ট যুদ্ধের হুমকি দেন।
ফলাফল ও তাৎপর্য
ব্রিটিশদের নৌবহর প্রস্তুত দেখে জার্মানি শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। ৪ নভেম্বর ১৯১১ সালে ফ্রাঙ্কো-জার্মান কনভেনশন স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্স জার্মানিকে মধ্য আফ্রিকার ফরাসি কঙ্গোর প্রায় আড়াই লাখ বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড প্রদান করে এবং এর বিনিময়ে জার্মানি মরক্কোয় ফ্রান্সের একচ্ছত্র অধিকার মেনে নেয়। এই পথ ধরেই ১৯১২ সালে মরক্কোয় ফরাসি প্রটেক্টরেট কায়েম হয় এবং ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক শত্রুতা বৃদ্ধি পেয়ে ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
১১. হুয়ারি বুমেদিন।
[English: Houari Boumedine.]
পরিচিতি ও স্বাধীনতা যুদ্ধ
হুয়ারি বুমেদিন (মূল নাম: মোহাম্মদ ইব্রাহিম বুখারুবা, ১৯৩২-১৯৭৮ খ্রি.) ছিলেন আধুনিক আলজেরিয়ার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক বিপ্লবী, মহান রাষ্ট্রনায়ক এবং দেশটির দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি (১৯৬৫-১৯৭৮ খ্রি.)। আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি বিপ্লবী ‘ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি’ (ALN)-এর সুপ্রিম চিফ অব স্টাফ হিসেবে অসামান্য রণকৌশল প্রদর্শন করেন এবং স্বাধীনতা অর্জনের পর আলজেরিয়ার প্রথম প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হন।
ক্ষমতায় আরোহণ ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ
১৯৬৫ সালের ১৯ জুন এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি প্রথম রাষ্ট্রপতি আহমেদ বেন বেল্লাকে ক্ষমতাচ্যুত করে আলজেরিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি আলজেরিয়াকে আফ্রিকার অন্যতম শিল্পোন্নত দেশে রূপান্তরের এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণ থেকে আলজেরিয়ার সমস্ত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদ এবং হাইড্রোকার্বন শিল্প (সোয়াতরাক) জাতীয়করণ করেন। তেলের অর্থে তিনি দেশব্যাপী ইস্পাত কারখানা, পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট এবং কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে আলজেরিয়ার সার্বভৌমিক অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি স্থাপন করেন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও মূল্যায়ন
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি ছিলেন জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM) এবং তৃতীয় বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভীক কণ্ঠস্বর। ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে ঐতিহাসিক চতুর্থ ন্যাম শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজক ছিলেন তিনি। সেখানে তিনি বৈশ্বিক বৈষম্য দূর করতে জাতিসংঘে ‘নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ (NIEO)-এর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রাম ও পশ্চিম সাহারার আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের কট্টর সমর্থক ছিলেন। ১৯৭৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর এক বিরল রক্তরোগে এই মহান বিপ্লবী নেতার অকাল প্রয়াণ ঘটে।
১২. সুয়েজ খাল।
[English: Suez Canal.]
ভৌগোলিক অবস্থান ও নির্মাণ ইতিহাস
সুয়েজ খাল হলো মিশরের সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত ১৯৩ কিলোমিটার (১২০ মাইল) দীর্ঘ একটি মানবসৃষ্ট আন্তর্জাতিক সমুদ্র খাল, যা উত্তরে ভূমধ্যসাগরকে দক্ষিণে লোহিত সাগরের সাথে সরাসরি সংযুক্ত করেছে। ফরাসি প্রকৌশলী ও কূটনীতিক ফার্দিনান্দ দে লেসেপসের (Ferdinand de Lesseps) পরিকল্পনায় দীর্ঘ দশ বছর (১৮৫৯-১৮৬৯ খ্রি.) কঠোর পরিশ্রমে লাখ লাখ মিশরীয় শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে এই খাল খনন করা হয়। ১৮৬৯ সালের ১৭ নভেম্বর এক জমকালো আন্তর্জাতিক উৎসবের মাধ্যমে এটি বিশ্ব নৌ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এই খাল ইউরোপ থেকে এশিয়ায় যাওয়ার নৌপথকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘোরার তুলনায় প্রায় ৭,০০০ থেকে ৯,০০০ কিলোমিটার কমিয়ে দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যে বিপ্লব ঘটায়।
ব্রিটিশ দখল ও জাতীয়করণ
১৮৭৫ সালে মিশরের অপব্যয়ী শাসক খেদিভ ইসমাইল চরম আর্থিক দেউলিয়াত্বের মুখে সুয়েজ খালের ৪৪ শতাংশ শেয়ার ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিজরেইলির কাছে বিক্রি করে দেন। এর মাধ্যমে সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশ ও ফরাসিদের হাতে চলে যায় এবং পরিশেষে ১৮৮২ সালে ব্রিটিশরা সুয়েজ খালের নিরাপত্তার অজুহাতে সমগ্র মিশর দখল করে নেয়।
সুয়েজ সংকট ও জাতীয় বিজয় (১৯৫৬)
১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই মিশরের অবিসংবাদিত জাতীয়তাবাদী নেতা প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দেল নাসের আসওয়ান উচ্চ বাঁধ নির্মাণের অর্থ জোগাড়ের লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক বেতার ভাষণে সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৫৬ সালের অক্টোবরে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইসরায়েল যৌথভাবে মিশরে সামরিক আগ্রাসন চালায়, যা ইতিহাসে ‘সুয়েজ সংকট’ (Suez Crisis) নামে খ্যাত। কিন্তু মিশরীয় জনগণের তীব্র প্রতিরোধ এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের চরম কূটনৈতিক চাপে আগ্রাসী তিন দেশ অপমানজনকভাবে সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। সুয়েজ খালের ওপর মিশরের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ছিল আরব জাতীয়তাবাদের এক মহাকাব্যিক বিজয়। বর্তমানে এটি মিশরের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান জাতীয় উৎস।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. উত্তর আফ্রিকাকে ঐতিহাসিকভাবে ‘মাগরেব’ (Maghreb) বলা হয় কেন?
‘মাগরেব’ একটি আরবি শব্দ (المغرب), যার শাব্দিক অর্থ হলো “যেখানে সূর্য অস্ত যায়” বা “পশ্চিম দিক”। ভৌগোলিকভাবে এটি আরব উপদ্বীপ ও মধ্যপ্রাচ্যের পশ্চিমে অবস্থিত হওয়ায় উত্তর আফ্রিকার তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো, লিবিয়া ও মৌরিতানিয়াকে ঐতিহাসিকভাবে মাগরেব অঞ্চল বলা হয়।
২. ইতালি কেন ১৯১১ সালে লিবিয়া আক্রমণ ও দখল করেছিল?
একীভূত হওয়ার পর ইউরোপের নবীন পরাশক্তি ইতালি তার আন্তর্জাতিক প্রতিপত্তি বৃদ্ধি, ১৮৮১ সালে ফ্রান্স কর্তৃক তিউনিসিয়া দখলের ক্ষোভ মেটানো, দক্ষিণ ইতালির অতিরিক্ত জনসংখ্যা পুনর্বাসন এবং প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের উগ্র সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষায় ১৯১১ সালে লিবিয়া দখল করেছিল।
৩. আলজেরিয়াকে কেন “মিলিয়ন শহীদের দেশ” (Country of a Million Martyrs) বলা হয়?
১৮৩০ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৩২ বছরের ফরাসি উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আলজেরীয়দের ধারাবাহিক প্রতিরোধ এবং বিশেষ করে ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ সালের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রায় ১৫ লক্ষ (দেড় মিলিয়ন) নিরীহ আলজেরীয় স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন বলে আলজেরিয়াকে ‘মিলিয়ন শহীদের দেশ’ বলা হয়।
৪. মুয়াম্মার গাদ্দাফির ‘সবুজ গ্রন্থ’ (Green Book) ও তৃতীয় সার্বজনীন তত্ত্ব কী?
কর্নেল গাদ্দাফি পুঁজিবাদী গণতন্ত্র ও সোভিয়েত সাম্যবাদ উভয়কে বাতিল করে প্রত্যক্ষ সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে যে রাজনৈতিক দর্শন প্রচার করেছিলেন, তাকে ‘তৃতীয় সার্বজনীন তত্ত্ব’ বলা হয়। এই তত্ত্বের মূল নীতিগুলো তিনি তিন খণ্ডে রচিত তাঁর বিখ্যাত ‘সবুজ গ্রন্থ’-এ লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
৫. সুদানের মাহদী বিপ্লবের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
সুদানের মাহদী বিপ্লবের মূল উদ্দেশ্য ছিল সুদানে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতিগ্রস্ত তুর্কি-মিশরীয় খেদিভদের শাসন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের খ্রিস্টান আধিপত্য উচ্ছেদ করা এবং সমাজে কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ ইসলামি অনুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
৬. ১৯১১ সালের ‘আগাদির সংকট’ (Agadir Crisis)-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী ছিল?
মরক্কোয় ফরাসি কর্তৃত্বের বিরোধিতা করে জার্মানি আগাদির বন্দরে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। এই সংকটে ব্রিটেন ফ্রান্সের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়ায় জার্মানি পিছু হটে, যা পরবর্তীতে ১৯১২ সালে মরক্কোয় ফরাসি প্রটেক্টরেট প্রতিষ্ঠা এবং ইউরোপের বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করেছিল।