পরীক্ষা কোড: ২০৪ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৮৫
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সভ্যতার ইতিহাস (তৃতীয় পত্র)
[History of Ancient and Medieval Civilization (Paper III)]
বিষয় কোড: ২০৫৪০৩
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্ন
[দ্রষ্টব্য: যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১৫: ১৫ × ৪ = ৬০]
১. সভ্যতা বলতে কী বুঝ? মিশরীয় সভ্যতার ধর্মীয় উপাদানসমূহ আলোচনা কর।
[English: What do you mean by Civilization? Discuss the religious elements of the Egyptian Civilization.]
ভূমিকা
মানবজাতির আদিম বর্বরোচিত ও যাযাবর জীবন থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান, কলা-সংস্কৃতি, আইন ও প্রযুক্তির সুসংহত বিকাশই হলো সভ্যতা। প্রাচীন প্রাচ্যের নীল নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর অধ্যায়, যার প্রতিটি স্তর পরিচালিত হতো তাদের গভীর ও জটিল ধর্মীয় বিশ্বাসের দ্বারা।
সভ্যতার ধারণা ও সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ইংরেজি ‘Civilization’ শব্দটি লাতিন শব্দ ‘Civis’ (নাগরিক) এবং ‘Civitas’ (নগর রাষ্ট্র) থেকে উদ্ভূত হয়েছে। অর্থাৎ, নগরকেন্দ্রিক উন্নত জীবনব্যবস্থাই হলো সভ্যতা। বাংলায় ‘সভ্যতা’ শব্দটি ‘সভা’ বা সুসংহত সমাজবদ্ধতা থেকে এসেছে।
পারিভাষিক সংজ্ঞা:
- ঐতিহাসিক আর্নল্ড টয়েনবি (Arnold Toynbee)-এর মতে, “সভ্যতা হলো প্রতিকূল পরিবেশের চ্যালেঞ্জের মুখে মানুষের সফল সৃজনশীল প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ।”
- উইল ডুরান্ট (Will Durant)-এর ভাষায়, “সভ্যতা হলো এমন একটি সামাজিক শৃঙ্খলা, যা মানুষের সাংস্কৃতিক সৃষ্টিশীলতাকে উদ্দীপিত করে। এর চারটি মৌলিক উপাদান রয়েছে: অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সংগঠন, নৈতিক ঐতিহ্য এবং জ্ঞান ও শিল্পের অন্বেষণ।”
- সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভারের মতে, “সংস্কৃতি হলো আমরা যা, আর সভ্যতা হলো আমাদের যা আছে (যন্ত্রপাতি, দালানকোঠা, প্রযুক্তি)।”
মিশরীয় সভ্যতার ধর্মীয় উপাদানসমূহ
গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস মিশরকে ‘নীল নদের দান’ বলেছেন। মিশরীয়দের সমগ্র জীবন, চিন্তা ও শিল্পকলা আবর্তিত হতো ধর্মকে কেন্দ্র করে। এর প্রধান ধর্মীয় উপাদানগুলো নিম্নরূপ:
- বহুদেববাদ ও প্রকৃতিপূজা: মিশরীয়রা ছিল ঘোর বহুদেবতাবাদী (Polytheist)। তারা প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তিকে দেবতা মনে করত:
- সূর্য দেবতা (আমোন-রা / রে): তিনি ছিলেন প্রধান ও সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা, আলোর উৎস এবং জগতের স্রষ্টা।
- ওসিরিস (Osiris): শস্য, উর্বরতা ও পরকালের বিচারক দেবতা।
- আইসিস (Isis): ওসিরিসের স্ত্রী এবং মাতৃরূপী দেবী।
- হোরাস (Horus): আকাশ ও ন্যায়বিচারের দেবতা, ফারাওরা নিজেদের হোরাসের পার্থিব রূপ মনে করতেন।
- আনুবিস (Anubis): শেয়ালমুখী দেবতা, যিনি মৃতদেহ সংরক্ষণ ও পরকালের পথপ্রদর্শক ছিলেন।
- ফারাওদের দেবত্ব দাবি: মিশরের শাসক বা ফারাওরা (Pharaoh) কেবল রাজনৈতিক শাসক ছিলেন না, বরং তারা জীবন্ত দেবতা হিসেবে পূজিত হতেন। প্রজারা বিশ্বাস করত যে ফারাও হলেন সূর্য দেবতার সন্তান।
- পরকাল ও পুনর্জন্মে অবিচল বিশ্বাস: প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে মৃত্যুর পর মানুষের আত্মার পুনর্জন্ম হয়। তারা আত্মাকে দুটি ভাগে বিভক্ত করত: ‘কা’ (Ka – দেহের ছায়াসঙ্গী) এবং ‘বা’ (Ba – স্বর্গীয় আত্মা)। মৃত্যুর পর পুনরায় আত্মা যাতে দেহে প্রবেশ করতে পারে, সেজন্য দেহকে অক্ষত রাখা তাদের ধর্মীয় কর্তব্য ছিল।
- মমি তৈরি ও পিরামিড নির্মাণ: দেহকে পচন থেকে রক্ষা করতে তারা উন্নত রাসায়নিক প্রলেপ দিয়ে ‘মমি’ (Mummy) তৈরি করত। ফারাওদের মমি নিরাপদ রাখতে এবং পরকালে তাদের ব্যবহারের জন্য রথ, স্বর্ণালঙ্কার, খাদ্য ও দাসদাসীর মূর্তিসহ বিশাল পাথরের সমাধিসৌধ—’পিরামিড’ (Pyramid) নির্মাণ করা হতো। গিজার গ্রেট পিরামিড এর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
- ‘বুক অব দ্য ডেড’ (Book of the Dead) ও পাপ-পুণ্যের বিচার: মিশরীয় ধর্মীয় গ্রন্থ ‘বুক অব দ্য ডেড’-এ পরকালের বিচারের বিবরণ রয়েছে। দেবতা ওসিরিসের আদালতে মৃতের হৃৎপিণ্ডকে একটি দাঁড়িপাল্লায় সত্যের প্রতীক পালকের বিপরীতে ওজন করা হতো। পুণ্যবানরা চিরসুখের জান্নাতে যেত এবং পাপীদের একটি পৌরাণিক হিংস্র পশু ভক্ষণ করত।
- ইখনাটোনের একেশ্বরবাদী বিপ্লব: ফারাও চতুর্থ আমেনহোতেপ (আখেনাটেন বা ইখনাটোন) বহুতর দেবদেবী ও পুরোহিতদের আধিপত্য বাতিল করে কেবল সূর্যদেবতা ‘আতেন’ (Aten)-এর একক উপাসনা প্রবর্তন করেন। এটি ছিল মানব ইতিহাসে একেশ্বরবাদের অন্যতম প্রাচীন প্রয়াস, যদিও তাঁর মৃত্যুর পর পুরোহিতরা পুনরায় বহুদেববাদ ফিরিয়ে আনে।
উপসংহার
মিশরীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাস কেবল আধ্যাত্মিক ছিল না, বরং তা মিশরের জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যশিল্পের বিকাশে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
২. ফিনিশীয়দের পরিচয় দাও। বিশ্ব সভ্যতায় ফিনিশীয়দের অবদান মূল্যায়ন কর।
[English: Introduce the Phoenicians. Evaluate the contribution of the Phoenicians to the world civilizations.]
ভূমিকা
প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের এক অনন্য সমুদ্রচারী ও বাণিজ্যিক জাতি ছিল ফিনিশীয়রা। সাম্রাজ্য বিস্তারের সামরিক অভিযান না চালিয়েও তারা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, নৌ-প্রযুক্তি এবং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবন ‘বর্ণমালা’র মাধ্যমে বিশ্ব সভ্যতার অগ্রযাত্রায় যুগান্তকারী অবদান রেখে গেছে।
ফিনিশীয়দের পরিচয় ও ভৌগোলিক অবস্থান
- জাতিগত উৎস: ফিনিশীয়রা ছিল সেমেটিক (Semitic) বংশোদ্ভূত একটি জাতিগোষ্ঠী। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দে তারা পারস্য উপসাগরের তীর থেকে লেবানন ও সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে।
- ভৌগোলিক পরিবেশ: বর্তমান লেবানন ও উত্তর ইসরায়েল-সিরিয়ার উপকূলবর্তী একটি সংকীর্ণ উপত্যকায় তাদের বসবাস ছিল। একদিকে উত্তাল ভূমধ্যসাগর এবং অন্যদিকে দুর্গম লেবানন পর্বতমালা। উর্বর কৃষিজমির অভাবে এবং পর্বতের বিখ্যাত ‘সিডার কাঠ’ (Cedar tree)-এর প্রাচুর্যের কারণে তারা অনন্য দক্ষ নাবিক ও আন্তর্জাতিক বণিকে পরিণত হয়।
- বিখ্যাত নগররাষ্ট্র: ফিনিশিয়া কোনো একক কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্য ছিল না, বরং স্বায়ত্তশাসিত কয়েকটি নগররাষ্ট্রের সমষ্টি ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল টায়ার (Tyre), সিডন (Sidon), বাইব্লোস (Byblos) এবং উত্তর আফ্রিকায় তাদের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বখ্যাত উপনিবেশ কার্থেজ (Carthage)।
বিশ্ব সভ্যতায় ফিনিশীয়দের ঐতিহাসিক অবদান
- বর্ণমালার উদ্ভাবন (সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান):
ফিনিশীয়দের সর্বশ্রেষ্ঠ ও অমর অবদান হলো ধ্বনিভিত্তিক বর্ণমালা (Alphabet) উদ্ভাবন। মিশরীয় জটিল চিত্রলিপি (হায়ারোগ্লিফিক) ও মেসোপটেমিয়ার কিউনিফর্ম লিপির বদলে তারা হিসাবরক্ষণের সুবিধার্থে ২২টি ব্যঞ্জনবর্ণ সম্বলিত একটি সরল বর্ণমালা তৈরি করে। ফিনিশীয় এই বর্ণমালা থেকেই পরবর্তীতে গ্রিকরা স্বরবর্ণ যুক্ত করে গ্রিক বর্ণমালা তৈরি করে, যা থেকে রোমান (লাতিন), সিরিয়াক, আরবি এবং আধুনিক ইংরেজি বর্ণমালার জন্ম হয়।
- নৌ-প্রযুক্তি ও সমুদ্র অভিযান: তারা জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বৈপ্লবিক উন্নতি সাধন করে। মজবুত সিডার কাঠ দিয়ে তারা দ্বি-স্তর ও ত্রি-স্তর বৈঠাবিশিষ্ট যুদ্ধজাহাজ ও পণ্যবাহী জাহাজ নির্মাণ করে। তারা ছিল প্রথম জাতি যারা রাতে ধ্রুবতারা (North Star) দেখে গভীর সমুদ্রে দিকনির্ণয় করত, যাকে গ্রিকরা ‘ফিনিশীয় তারা’ বলত। তারা প্রথম জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে আটলান্টিক মহাসাগরে পাড়ি জমায় এবং সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশ জলপথে প্রদক্ষিণ করে।
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উপনিবেশ স্থাপন: ফিনিশীয়রা ছিল প্রাচীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সওদাগর। ভূমধ্যসাগরের তীরে তীরে তারা বাণিজ্যকুঠি ও উপনিবেশ গড়ে তোলে। তামা, টিন, সোনা, রূপা ও মসলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তারা একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করত।
- রং ও বস্ত্রশিল্প (টায়ারীয় বেগুনী রং): তারা এক বিশেষ প্রজাতির সামুদ্রিক শামুক (Murex) থেকে একটি স্থায়ী ও দুর্লভ উজ্জ্বল লালচে-বেগুনী (Royal Purple) রং তৈরি করত। এই রঙের কাপড় এত মূল্যবান ছিল যে তা কেবল রাজা ও সম্রাটেরা পরিধান করতেন, যা ‘টায়ারীয় বেগুনী’ নামে খ্যাত ছিল।
- কাচ ও ধাতুশিল্প: ফিনিশীয় কারিগররা উপকূলের সূক্ষ্ম বালুকা দিয়ে অত্যন্ত স্বচ্ছ ও উন্নতমানের কাচ এবং কাচের তৈজসপত্র তৈরি করতে পারত। তারা ব্রোঞ্জ ও লোহার কারুকাজেও পারদর্শী ছিল।
উপসংহার
ফিনিশীয়রা ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির সেতুবন্ধন। তাদের উদ্ভাবিত বর্ণমালা মানবজাতির জ্ঞান সংরক্ষণ ও শিক্ষার প্রসারে সর্বকালের সবচেয়ে ফলপ্রসূ চাবিকাঠি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
৩. আসিরিয় কারা? মানব সভ্যতায় তাদের ভূমিকা উল্লেখ কর।
[English: Who are the Assyrians? Mention their role to human civilization.]
ভূমিকা
প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার উত্তরাঞ্চলে টাইগ্রিস (দজলা) নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এক দুর্ধর্ষ, যুদ্ধবাজ অথচ সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত দক্ষ জাতি ছিল আসিরিয়রা। তারা প্রাচীন বিশ্বের প্রথম সুসংহত সামরিক সাম্রাজ্য এবং উন্নত প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিল।
আসিরিয়দের পরিচয়
আসিরিয়রা ছিল সেমেটিক বংশোদ্ভূত জাতি। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে তারা টাইগ্রিস নদীর তীরে আশুর (Ashur) নামক দেবতার নামানুসারে একটি নগররাষ্ট্র গড়ে তোলে। পরবর্তীতে খ্রিস্টপূর্ব নবম থেকে সপ্তম শতকে তারা একটি বিশাল পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। তাদের রাজধানী ছিল আসুর এবং পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত নিনেভে (Nineveh)। বিখ্যাত শাসকদের মধ্যে ছিলেন দ্বিতীয় সারগন, সেন্নাকেরিব এবং আশুরবানিপাল।
মানব সভ্যতায় আসিরিয়দের ভূমিকা ও অবদান
- বিশ্বের প্রথম পেশাদার সামরিক সংগঠন:
আসিরিয়রাই মানব ইতিহাসে প্রথম সার্বক্ষণিক বেতনভুক্ত সুশৃঙ্খল জাতীয় সেনাবাহিনী গঠন করে। তারা যুদ্ধে সর্বপ্রথম ঢালাওভাবে লোহার অস্ত্রশস্ত্র (তরবারি, বর্শা, শিরস্ত্রাণ) এবং ঘোড়ায় টানা হালকা ও দ্রুতগতির রথ ব্যবহার করে। দুর্গ ধ্বংস করার জন্য তারা ‘ব্যাটারিং র্যাম’ (Battering Ram) ও ভ্রাম্যমাণ আক্রমণ টাওয়ারের মতো আধুনিক সামরিক কৌশল উদ্ভাবন করে।
- সুসংহত সাম্রাজ্য ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা: তারা বিশাল সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত করে গভর্নর নিয়োগ করত। সম্রাটদের আদেশ দ্রুত দূরদূরান্তে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তারা প্রথম সাম্রাজ্যব্যাপী রাজকীয় যোগাযোগ ও ঘোড়ায় টানা ডাকব্যবস্থা (Pony Express) চালু করে।
- আশুরবানিপালের রাজকীয় গ্রন্থাগার: আসিরিয়দের সাংস্কৃতিক অবদানের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো রাজধানী নিনেভেতে সম্রাট আশুরবানিপাল (Ashurbanipal) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিশাল রাজকীয় পাঠাগার। এতে প্রাচীন সুমেরীয়, ব্যবিলনীয় ও আসিরীয় সাহিত্যের প্রায় ৩০,০০০ মাটির চাকতি (Clay Tablets) সংগৃহীত ছিল। মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম মহাকাব্য ‘গিলগামেশের উপাখ্যান’ এই পাঠাগারের ধ্বংসাবশেষ থেকেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
- ভাস্কর্য ও স্থাপত্যকলা: আসিরীয় রাজপ্রাসাদগুলো ছিল অসাধারণ পাথরের রিলিফে খোদাই করা। বিশেষ করে মানুষের মুখ, ঈগলের ডানা এবং ষাঁড় বা সিংহের শরীরবিশিষ্ট দানবাকৃতির দ্বারপাল মূর্তি—’লামাসু’ (Lamassu) আসিরীয় স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। এছাড়া প্রাসাদের দেয়ালে শিকার ও যুদ্ধের রোমাঞ্চকর দৃশ্য খোদাই করা থাকত।
- জলসেচ ও নগর পরিকল্পনা: সম্রাট সেন্নাকেরিব নিনেভে নগরীকে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য ৫০ কিলোমিটার দূর থেকে পাথরের তৈরি উন্নত কৃত্রিম খাল ও জলসেতু (Aqueduct) নির্মাণ করেছিলেন।
উপসংহার
যদিও আসিরিয়দের চরম নিষ্ঠুরতা ও বর্বর নির্যাতন তাদের সাম্রাজ্যের দ্রুত পতন ডেকে এনেছিল, তবুও তাদের সামরিক প্রকৌশল, ডাকব্যবস্থা এবং জ্ঞানচর্চার সংরক্ষণাগার মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
৪. কালদীয় কারা? বিশ্ব সভ্যতায় তাদের কি কোনো অবদান ছিল?
[English: Who were the Chaldeans? Was their any contributions to the world civilizations?]
ভূমিকা
আসিরীয়দের নিষ্ঠুর শাসনের পতন ঘটিয়ে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় যে নতুন শক্তি দ্বিতীয় ব্যবিলনীয় সাম্রাজ্য বা নব-ব্যবিলনীয় সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করে, তারাই কালদীয় নামে পরিচিত। স্বল্পস্থায়ী হলেও জ্ঞান-বিজ্ঞান, বিশেষ করে জ্যোতির্বিদ্যা ও স্থাপত্যবিদ্যায় তারা কালজয়ী স্বাক্ষর রেখে গেছে।
কালদীয়দের পরিচয়
কালদীয়রা (Chaldeans) ছিল দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার আরবীয় উপকূলীয় অঞ্চলের একটি সেমেটিক যাযাবর উপজাতি। খ্রিস্টপূর্ব ৬২৬ অব্দে কালদীয় নেতা নাবোপোলাসার আসিরীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং মিডীয়দের সাথে যৌথভাবে আসিরিয়ার রাজধানী নিনেভে ধ্বংস করেন। এরপর তাঁর পুত্র বিখ্যাত সম্রাট দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার (Nebuchadnezzar II, খ্রি.পূ. ৬০৫-৫৬২) প্রাচীন ব্যবিলনকে নতুন করে গড়ে তোলেন এবং কালদীয় সাম্রাজ্যকে ক্ষমতার শীর্ষে নিয়ে যান।
বিশ্ব সভ্যতায় কালদীয়দের অবদান
কালদীয়রা সামরিক শক্তির চেয়েও সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক অর্জনের জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে:
- ব্যবিলনের ঝুলন্ত বাগান (Hanging Gardens of Babylon):
সম্রাট নেবুচাদনেজার তাঁর মিডিয়া রাজকন্যা ও সম্রাজ্ঞী অ্যামিটিসের জন্মভূমির পাহাড়ি স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিতে ব্যবিলনের রাজপ্রাসাদের ছাদে কৃত্রিম পাহাড় ও সোপানযুক্ত মনোরম বাগান তৈরি করেন। ইউফ্রেটিস নদী থেকে পাইপ ও কপিকলের সাহায্যে উঁচুতে পানি তুলে গাছপালায় সেচ দেওয়া হতো। এটি প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম হিসেবে স্বীকৃত।
- জ্যোতির্বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব বিকাশ (সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান):
কালদীয়রা ছিল প্রাচীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিদ। তাদের অবদানসমূহ আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিল:
- রাশিচক্রের আবিষ্কার: তারা আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জকে পর্যবেক্ষণ করে ১২টি রাশিতে (Zodiac Signs) বিভক্ত করে।
- সপ্তাহের সাত দিনের নামকরণ: তারা আকাশে দৃশ্যমান সাতটি উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক (সূর্য, চাঁদ, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনি)-এর নামে সপ্তাহের সাত দিনের নামকরণ করে, যা আজ পর্যন্ত বিশ্বে প্রচলিত।
- দিন ও রাতের সময় গণনা: তারা দিন-রাতকে ২৪ ঘণ্টায়, প্রতি ঘণ্টাকে ৬০ মিনিটে এবং প্রতি মিনিটকে ৬০ সেকেন্ডে বিভক্ত করার কালজয়ী পদ্ধতি উদ্ভাবন করে।
- গ্রহণ পূর্বাভাস: তারা নিখুঁত হিসাবের মাধ্যমে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের সঠিক সময় গণনা করতে সক্ষম হয়েছিল।
- স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনা: নেবুচাদনেজার ব্যবিলনকে প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত ও সুন্দর নগরীতে রূপান্তর করেন। নগরীর চারপাশে তিনটি সুবিশাল প্রতিরক্ষা প্রাচীর এবং দেবী ইশতারের সম্মানে নীল চকচকে টালিতে মোড়ানো জাঁকজমকপূর্ণ ‘ইশতার গেট’ (Ishtar Gate) নির্মাণ করেন। এছাড়া নির্মিত হয় সুবিশাল সাততলা ‘জিগুরাত’ (যা ইতিহাসে বাবেল টাওয়ার নামে খ্যাত)।
- চিকিৎসা ও বিজ্ঞান: তারা বিভিন্ন রোগের লক্ষণ বিশ্লেষণ এবং ভেষজ উদ্ভিদের ঔষধ তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করেছিল।
উপসংহার
কালদীয় সাম্রাজ্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি এবং খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯ অব্দে পারস্যের সাইরাস ব্যবিলন দখল করেন। কিন্তু তাদের উদ্ভাবিত সময় গণনা, সপ্তাহের সাত দিন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের অমূল্য জ্ঞান আজও মানবজাতি প্রতিদিন ব্যবহার করছে।
৫. প্রাচীন পারসিক সভ্যতার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও। পরবর্তী মুসলিম সভ্যতায় এর প্রভাব নিরূপণ কর।
[English: Give a brief description of the Ancient Persian civilization. Determine its impact on the subsequent Muslim civilization.]
ভূমিকা
প্রাচীন প্রাচ্যের অন্যতম বিশাল ও সুশৃঙ্খল সাম্রাজ্য ছিল পারসিক বা পারস্য সাম্রাজ্য (বর্তমান ইরান)। মহান সাইরাস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হাখামানেশীয় (Achaemenid) এবং পরবর্তীতে সাসানীয় (Sasanian) সাম্রাজ্য এক বিশাল এলাকা জুড়ে প্রশাসনিক দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক ঔজ্জ্বল্য প্রদর্শন করেছিল। সপ্তম শতকে পারস্যে ইসলামের বিজয়ের পর এই সমৃদ্ধ পারসিক ঐতিহ্য পরবর্তী মুসলিম সভ্যতাকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে।
প্রাচীন পারসিক সভ্যতার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
- সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ও সাইরাস দ্য গ্রেট: খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৯ অব্দে মহান সাইরাস পারস্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন এক দূরদর্শী ও পরধর্মসহিষ্ণু শাসক। ব্যবিলন জয়ের পর তিনি বন্দি ইহুদিদের মুক্ত করে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দেন। তাঁর ‘সাইরাস সিলিন্ডার’-কে বিশ্বের প্রথম মানবাধিকার সনদ হিসেবে গণ্য করা হয়। পরবর্তীতে প্রথম দারিয়ুস ও জারক্সেস সাম্রাজ্যকে সিন্ধু নদ থেকে দানিয়ুব নদী পর্যন্ত বিস্তৃত করেন।
- স্যাট্রাপ প্রশাসনিক ব্যবস্থা: দারিয়ুস সমগ্র সাম্রাজ্যকে ২০টিরও বেশি প্রদেশে (Satrapy) বিভক্ত করেন এবং প্রতিটি প্রদেশের জন্য বেসামরিক শাসক ‘স্যাট্রাপ’ এবং সামরিক কমান্ডার নিয়োগ করেন। সম্রাটকে তথ্য দেওয়ার জন্য ‘রাজার চোখ ও কান’ নামে স্বাধীন গোয়েন্দা সংস্থা ছিল।
- রয়েল রোড ও ডাক ব্যবস্থা: পারস্যের সুসা থেকে এশিয়া মাইনরের সার্ডিস পর্যন্ত প্রায় ২,৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাকা ‘রয়েল রোড’ (Royal Road) নির্মাণ করা হয়। সেখানে নির্দিষ্ট দূরত্বে সরাইখানা ও দ্রুতগামী অশ্বারোহী ডাকবাহিনী সর্বদা প্রস্তুত থাকত।
- জরথুস্ত্রবাদ (ধর্ম): পারসিকদের প্রধান ধর্ম ছিল জরথুস্ত্র প্রবর্তিত ধর্ম (Zoroastrianism)। এতে আলোর দেবতা ‘আহুর মাজদা’ এবং অন্ধকারের অপশক্তি ‘আহরিমান’-এর মধ্যে চিরন্তন দ্বৈরথের ধারণা ছিল। তাদের পবিত্র গ্রন্থের নাম ‘আবেস্তা’ (Avesta)।
- স্থাপত্যকলা: দারিয়ুস ও জারক্সেস নির্মিত রাজধানী ‘পার্সেপোলিস’ (Persepolis)-এর রাজপ্রাসাদ, আপাদানা হল এবং বিশাল পাথরের স্তম্ভ পারসিক শিল্পকলার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
পরবর্তী মুসলিম সভ্যতায় পারসিক সভ্যতার প্রভাব
খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে কাদিসিয়া ও নেহাওয়ান্দের যুদ্ধের মাধ্যমে সাসানীয় পারস্য মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীতে বিশেষ করে আব্বাসীয় খিলাফত যুগে মুসলিম সভ্যতায় পারসিক প্রভাব ব্যাপক রূপ ধারণ করে:
- রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও দরবার সংস্কৃতি: উমাইয়াদের আরব জাতীয়তাবাদের পতনের পর আব্বাসীয় খিলাফত মূলত পারসিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। খলিফাকে ‘যিললুল্লাহ’ (আল্লাহর ছায়া) মনে করার ধারণা, জাঁকজমকপূর্ণ রাজদরবার, সিংহাসন, স্বর্ণখচিত পোশাক এবং পদচুম্বনের মতো দরবারী শিষ্টাচার পারস্য থেকেই গৃহীত হয়।
- উজির পদ ও শাসনকাঠামো: মুসলিম প্রশাসনে সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্মকর্তা ‘উজির’ (وزير) পদের প্রবর্তন সাসানীয় অনুকরণেই হয়। বিখ্যাত পারসিক বারমাকী পরিবার (ইয়াহইয়া বারমাকী ও জাফর বারমাকী) আব্বাসীয় প্রশাসনে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছিল। এছাড়া ‘দিওয়ান’ (মন্ত্রণালয়) ব্যবস্থার পরিমার্জন ঘটে।
- জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শন চর্চা: বাগদাদের বায়তুল হিকমায় গ্রিক দর্শনের পাশাপাশি অসংখ্য পাহলভি (প্রাচীন ফারসি) গ্রন্থ আরবিতে অনূদিত হয়। ইবনে আল-মুক্বাফ্ফা বিখ্যাত নীতিগল্প ‘কালিলা ওয়া দিমনা’ ফারসি থেকে আরবিতে অনুবাদ করেন। চিকিৎসা ও বিজ্ঞানে ইবনে সিনা (আভিসেনা), আল-বিরুনী, আল-রাজী, উমর খৈয়ামের মতো বিশ্বখ্যাত পণ্ডিতরা পারস্যের আলোকেই মুসলিম বিশ্বকে আলোকিত করেন।
- ইতিহাস ও সাহিত্য: মুসলিম ইতিহাসচর্চায় পারসিক কালানুক্রমিক ধারা প্রভাব বিস্তার করে। ইতিহাসবিদ আল-তাবারী এবং মহাকবি ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’, সাদী, হাফিজ ও রুমীর কাব্য মুসলিম সাহিত্যের অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত হয়।
- স্থাপত্যকলা: মুসলিম স্থাপত্যে গম্বুজ, সুউচ্চ খিলান (ইওয়ান), জ্যামিতিক নকশার টালি ও চারবাগ গার্ডেনের ধারণা প্রাচীন পারসিক স্থাপত্যের গভীর প্রভাব বহন করে।
উপসংহার
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক লেনপুলের মতে, “আরবরা পারস্য জয় করেছিল সামরিকভাবে, কিন্তু পারসিকরা তাদের উন্নত সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা দিয়ে জয় করেছিল আরবদের।” ফলে উভয়ের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছিল এক অপূর্ব সার্বজনীন ইসলামী সভ্যতা।
৬. বাইজান্টাইন সভ্যতার বৈশিষ্ট্যসমূহ পর্যালোচনা কর। মুসলিম সভ্যতায় এর কী প্রভাব ছিল?
[English: Review the characteristics of the Byzantine civilization. What were its impact on the Muslim civilization?]
ভূমিকা
রোমান সাম্রাজ্য বিভক্ত হওয়ার পর পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য ইতিহাসে ‘বাইজান্টাইন সভ্যতা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন প্রাচীন বাইজান্টিয়াম নগরীতে নতুন রাজধানী স্থাপন করে এর নাম দেন কনস্টান্টিনোপল। গ্রিক সংস্কৃতি, রোমান আইন এবং খ্রিস্টধর্মের অপূর্ব ত্রিবেণী সঙ্গমে এই সভ্যতা এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় টিকে ছিল।
বাইজান্টাইন সভ্যতার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
- খ্রিস্টধর্মের কেন্দ্র ও অর্থোডক্স চার্চ: বাইজান্টাইন সভ্যতা ছিল ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। সম্রাট ছিলেন একাধারে রাজনৈতিক নেতা এবং চার্চের প্রধান (Caesaropapism)। ১০৫৪ খ্রিস্টাব্দে রোমের পোপের সাথে মতভেদের কারণে ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স চার্চের স্থায়ী বিভাজন ঘটে।
- রোমান আইনের সংকলন (জাস্টিনিয়ান কোড): সম্রাট জাস্টিনিয়ান (Justinian, ৫২৭-৫৬৫ খ্রি.) প্রাচীন ও জটিল রোমান আইনগুলোকে একত্রিত ও পরিমার্জন করে ‘কর্পাস জুরিস সিভিলিস’ (Corpus Juris Civilis) প্রণয়ন করেন। এটি পরবর্তী ইউরোপীয় এবং বিশ্ব আইনের মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়।
- অতুলনীয় স্থাপত্য ও শিল্পকলা: তাদের স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো কনস্টান্টিনোপলের ‘হাগিয়া সোফিয়া’ (Hagia Sophia) গির্জা, যা বিশাল কেন্দ্রীয় গম্বুজ, রঙিন মোজাইক ও মার্বেল পাথরের অলঙ্করণে সজ্জিত। তাদের আইকন (Icon) চিত্রশিল্প অত্যন্ত খ্যাতি লাভ করেছিল।
- গ্রিক ভাষার আধিপত্য: যদিও এটি ছিল রোমান সাম্রাজ্য, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ল্যাটিনের পরিবর্তে গ্রিক ভাষা রাষ্ট্রভাষা ও সংস্কৃতির প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়। ফলে প্রাচীন ক্লাসিক্যাল গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞান বাইজান্টাইনদের মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকে।
- কূটনীতি ও গ্রিক ফায়ার: সামরিক শক্তির পাশাপাশি তারা অর্থোডক্স ধর্মান্তরকরণ এবং প্রতিপক্ষকে বিভক্ত রাখার কূটনীতিতে দক্ষ ছিল। তাদের নৌবাহিনীতে ‘গ্রিক ফায়ার’ (Greek Fire) নামক এক ধরনের রাসায়নিক অগ্নির ব্যবহার শত্রুজাহাজে ভীতি সঞ্চার করত, যা পানিতেও জ্বলত।
মুসলিম সভ্যতায় বাইজান্টাইন সভ্যতার প্রভাব
সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও মিশর বিজয়ের মাধ্যমে মুসলমানরা বাইজান্টাইন ভূখণ্ড ও সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসে:
- প্রশাসনিক পদ্ধতি ও মুদ্রা ব্যবস্থা: প্রাথমিক উমাইয়া খিলাফতের সময় দামেস্কে বাইজান্টাইন আমলা ও গ্রিক হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। খলিফা আব্দুল মালিকের পূর্ব পর্যন্ত বাইজান্টাইন স্বর্ণমুদ্রা ‘দিনার’ (Denarius)-এর অনুকরণেই লেনদেন চলত। পরবর্তীতে ৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে আরবি দিনার চালু হয়।
- স্থাপত্যকলা ও মোজাইক শিল্প: প্রারম্ভিক মুসলিম স্থাপত্য বাইজান্টাইন কারিগর ও স্থাপত্যশৈলী দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়।
- জেরুজালেমের ‘কুব্বাতুস সাখরা’ (Dome of the Rock – ৬৯১ খ্রি.): এর অষ্টভুজাকৃতির গঠন, বিশাল সোনালী গম্বুজ এবং অভ্যন্তরীণ মোজাইক সজ্জা বাইজান্টাইন মার্তাইরিয়াম স্থাপত্যের আদলে নির্মিত।
- দামেস্কের ‘উমাইয়া জামে মসজিদ’: একটি প্রাচীন বাইজান্টাইন ব্যাসিলিকার ওপর নির্মিত, যার খিলান, মার্বেল স্তম্ভ ও দেয়ালচিত্র বাইজান্টাইন শিল্পীদের সহযোগিতায় তৈরি।
- জ্ঞান-বিজ্ঞান ও চিকিৎসা শাস্ত্র: বাইজান্টাইন লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত প্রাচীন গ্রিক পণ্ডিত এরিস্টটল, প্লেটো, গ্যালেন ও হিপোক্রেটিসের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গণিতের পাণ্ডুলিপিগুলো মুসলমানরা সংগ্রহ করে আরবিতে অনুবাদ করেন। বাগদাদের অনুবাদ আন্দোলনে বাইজান্টাইন খ্রিস্টান পণ্ডিতরা (যেমন: হুনাইন ইবনে ইসহাক) প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
- সামরিক কৌশল ও নগর প্রতিরক্ষা: মুসলমানরা বাইজান্টাইনদের উন্নত দুর্গ নির্মাণ কৌশল, নগর প্রাচীর এবং সমুদ্রযুদ্ধে বিশেষ নৌ-প্রযুক্তি গ্রহণ করে উমাইয়া ও পরবর্তীতে উসমানীয় যুগে বিশাল নৌবহর গড়ে তোলে।
উপসংহার
বাইজান্টাইন সভ্যতা মুসলিমদের কেবল প্রতিপক্ষ ছিল না, বরং তাদের প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও স্থাপত্যের বহু ইতিবাচক উপাদান মুসলমানরা ইসলামীকরণ করে একটি সমৃদ্ধ মধ্যযুগীয় ইসলামী রেনেসাঁয় রূপান্তরিত করেছিল।
খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন
[দ্রষ্টব্য: যেকোনো দুইটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১০: ১০ × ২ = ২০]
৭. হিব্রু সভ্যতার পরিচয় দাও।
[English: Introduce the Hebrew civilization.]
উত্তর:
পরিচয় ও উৎপত্তি: হিব্রু (Hebrew) একটি প্রাচীন সেমেটিক জাতিগোষ্ঠী, যারা ইতিহাসে বনী ইসরাঈল বা ইহুদি জাতি হিসেবে পরিচিত। তাদের আদি পিতা ছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.), যিনি মেসোপটেমিয়ার ঊর নগরী থেকে আল্লাহর নির্দেশে কেনানে (বর্তমান ফিলিস্তিন) হিজরত করেন। তাঁর পৌত্র হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর অপর নাম ছিল ‘ইসরাঈল’, যা থেকে তাদের বারোটি বংশধারার সৃষ্টি হয়।
ঐতিহাসিক রূপরেখা:
- মিশরে বন্দিত্ব ও মূসা (আ.): দুর্ভিক্ষের কারণে তারা মিশরে যায় এবং পরবর্তীতে ফারাওদের দাসে পরিণত হয়। হযরত মূসা (আ.) তাদেরকে ফারাওয়ের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে সিনাই প্রান্তরে নিয়ে আসেন এবং সেখানে ঐতিহাসিক ‘দশ প্রত্যাদেশ’ (Ten Commandments) লাভ করেন।
- স্বর্ণযুগ: ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তনের পর হযরত দাউদ (আ.) এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র হযরত সুলাইমান (আ.)-এর রাজত্বকালে (খ্রিস্টপূর্ব ১০ম শতক) হিব্রু রাজত্ব ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছায়। সুলাইমান (আ.) জেরুজালেমে বিশ্ববিখ্যাত ‘বাইতুল মুকাদ্দাস’ (প্রথম মন্দির) নির্মাণ করেন।
- বিভাজন ও নির্বাসন: সুলাইমান (আ.)-এর মৃত্যুর পর রাজ্যটি উত্তরে ‘ইসরায়েল’ এবং দক্ষিণে ‘যিহূদা’ নামে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে আসিরিয়রা ইসরায়েল এবং কালদীয় সম্রাট নেবুচাদনেজার যিহূদা ধ্বংস করে ইহুদিদের ব্যবিলনে দাস হিসেবে নির্বাসিত করেন।
সভ্যতায় প্রধান অবদান: হিব্রুদের প্রধান অবদান হলো তাদের কঠোর ‘একেশ্বরবাদ’ (Monotheism)। চারপাশের চরম বহুদেবতাবাদের যুগে তারা এক ও অদ্বিতীয় স্রষ্টা (ইয়াহওয়েহ/আল্লাহ)-র আরাধনা এবং নৈতিক ন্যায়পরায়ণতার বার্তা প্রচার করে, যা পরবর্তীতে খ্রিস্টধর্ম ও বিশ্ব সভ্যতায় নৈতিকতার ভিত্তি স্থাপন করে।
৮. কোড হাম্মুরাবি কী?
[English: What is the Code Hammurabi?]
উত্তর:
সংজ্ঞা ও পটভূমি: ‘কোড হাম্মুরাবি’ (Code of Hammurabi) হলো মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম ও সর্বাধিক সুসংরক্ষিত লিখিত আইনের সংকলন। প্রাচীন ব্যবিলনীয় সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট হাম্মুরাবি (খ্রিস্টপূর্ব ১৭৯২-১৭৫০) তাঁর সুবিশাল সাম্রাজ্যে শান্তি, ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই আইনবিধি প্রণয়ন করেন। ১৯০১ সালে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক দল ইরানের সুসা নগরীর ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রায় আট ফুট উঁচু কালো ডায়োরাইট পাথরে খোদাই করা এই আইনের মূল ফলকটি আবিষ্কার করে, যা বর্তমানে প্যারিসের লুভর মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।
আইনবিধির গঠন ও বৈশিষ্ট্য:
- ফলকটির শীর্ষে খোদাই করা চিত্রে দেখা যায়, সূর্য ও ন্যায়বিচারের দেবতা ‘শামাশ’ স্বয়ং সম্রাট হাম্মুরাবিকে রাজদণ্ড ও আইন তুলে দিচ্ছেন, যা আইনের প্রতি জনগণের ধর্মীয় আনুগত্য নিশ্চিত করত।
- এতে একটি ভূমিকা, একটি উপসংহার এবং মোট **২৮২টি ধারা** ছিল, যা প্রাচীন কিউনিফর্ম (Cuneiform) লিপিতে লিখিত।
- বিষয়বস্তু: এতে দেওয়ানি, ফৌজদারি, পারিবারিক আইন (বিবাহ, তালাক, যৌতুক), ব্যবসা-বাণিজ্য, চুক্তি, দাসপ্রথা, ঋণ ও সুদ, চিকিৎসা এবং কৃষিজমি ও সেচ সংক্রান্ত আইনের নিখুঁত বিবরণ ছিল।
- লেক্স ট্যালিয়নিস (Lex Talionis): এই আইনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ‘চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত’ নীতি। তবে অপরাধীর শাস্তি সমাজের সামাজিক শ্রেণি (স্বাধীন মানুষ, সাধারণ প্রজা, দাস) ভেদে ভিন্ন হতো।
তাৎপর্য: কোড হাম্মুরাবি প্রমাণ করে যে রাজার খেয়ালখুশি নয়, বরং একটি রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া উচিত লিখিত ও পূর্বনির্ধারিত সুনির্দিষ্ট আইনের ভিত্তিতে।
৯. যিশু খ্রিস্টের উপর একটি সংক্ষিপ্ত টীকা লিখ।
[English: Write a short note on Jesus Christ.]
উত্তর:
পরিচয় ও অলৌকিক জন্ম: যিশু খ্রিস্ট (যাঁকে কুরআনে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বলা হয়েছে) হলেন বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্ম খ্রিস্টধর্মের প্রবক্তা এবং ইসলামের একজন মহান উলুল আযম পয়গম্বর। রোমান সম্রাট অগাস্টাসের শাসনামলে (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪ অব্দে) ফিলিস্তিনের বেথলেহেমে কোনো মানব পিতার স্পর্শ ছাড়াই কুমারী মাতা মরিয়ম (মেরি)-এর গর্ভে আল্লাহর অলৌকিক কুদরতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
ধর্মপ্রচার ও শিক্ষা:
- ত্রিশ বছর বয়সে তিনি জর্ডান নদীতে বাপ্তিস্ম লাভের পর গালীল ও জুদিয়ায় দ্বীন প্রচার শুরু করেন। আল্লাহ তাঁকে আসমানী কিতাব ‘ইঞ্জিল’ (Gospel) প্রদান করেন।
- তিনি প্রচলিত ইহুদি পুরোহিতদের অন্ধ আনুষ্ঠানিকতা ও ভণ্ডামির কঠোর সমালোচনা করেন এবং মানবপ্রেম, অহিংসা, ক্ষমাশীলতা ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের বাণী প্রচার করেন। তাঁর বিখ্যাত ‘পাহাড়ে উপদেশ’ (Sermon on the Mount) নীতিশাস্ত্রের এক অনন্য দলিল।
- আল্লাহর কুদরতে তিনি বহু অলৌকিক কাজ (মুজিজা) দেখাতেন—যেমন কুষ্ঠরোগী ভালো করা, জন্মান্ধকে দৃষ্টিদান এবং মৃতকে জীবিত করা।
বিরোধিতা ও প্রস্থান: তাঁর দ্রুত জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে গোঁড়া ইহুদি পুরোহিতরা তাঁর বিরুদ্ধে রোমান সরকারের কাছে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মিথ্যা অভিযোগ আনে। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস মতে রোমান গভর্নর পন্তীয় পীলাতের নির্দেশে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয় এবং তিন দিন পর তিনি পুনরুত্থিত হয়ে স্বর্গে আরোহণ করেন। পক্ষান্তরে, পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহ তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ হওয়া থেকে রক্ষা করে সশরীরে আসমানে তুলে নেন এবং শেষ জমানায় তিনি পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করবেন। যিশুর প্রচারিত মানবপ্রেমের বাণী আজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের নৈতিক জীবনের প্রেরণা।
১০. সভ্যতার উপাদানগুলো কী?
[English: What are the elements of Civilizations?]
উত্তর:
একটি আদিম মানবসমাজ যখন কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি উন্নত ও সুসংহত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্তরে উপনীত হয়, তখন তাকে সভ্যতা বলা হয়। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও নৃবিজ্ঞানীদের মতে একটি সভ্যতার প্রধান উপাদানগুলো নিম্নরূপ:
- স্থায়ী বসতি ও নগরকেন্দ্রিকতা: কৃষিকাজের উদ্বৃত্ত উৎপাদনের ফলে যাযাবর জীবনের অবসান ঘটে এবং সুসংহত নগর ও পৌরব্যবস্থার সৃষ্টি হয়।
- সুসংহত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংগঠন: সমাজ পরিচালনা, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক সরকার, বিচারব্যবস্থা ও সামরিক বাহিনী অপরিহার্য।
- শ্রমবিভাগ ও সামাজিক স্তরবিন্যাস: সমাজের বিভিন্ন পেশাজীবী দল—যেমন কৃষক, কারিগর, সওদাগর, সৈনিক, পুরোহিত ও আমলাদের মধ্যে কাজের সুনির্দিষ্ট বণ্টন এবং পেশাভিত্তিক সামাজিক স্তর তৈরি হয়।
- ধর্ম ও নৈতিক অনুশাসন: মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব ও নৈতিক অনুশাসন নিয়ন্ত্রণের জন্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, পুরোহিততন্ত্র ও মন্দিরের বিকাশ ঘটে, যা সামাজিক ঐক্যের প্রধান বন্ধন হিসেবে কাজ করে।
- লিপি ও লিখন পদ্ধতির উদ্ভাবন: ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব সংরক্ষণ, রাজকীয় আইন লিপিবদ্ধকরণ এবং জ্ঞান সংরক্ষণের জন্য লিখনরীতি ও লিপিমালার আবিষ্কার সভ্যতার অন্যতম প্রধান মানদণ্ড।
- স্মারক স্থাপত্য ও উন্নত প্রযুক্তি: ধাতুর ব্যবহার (ব্রোঞ্জ, লোহা), চাকা, সেচব্যবস্থা, জাহাজ নির্মাণ এবং প্রাসাদ, পিরামিড বা মন্দিরের মতো মহিমান্বিত স্থাপত্যের নিদর্শন।
- বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক আদান-প্রদান: স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দূরদূরান্তের দেশগুলোর সাথে কাঁচামাল ও বিলাসপণ্যের সুসংহত বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সভ্যতার ইতিহাস (২০৫৪০৩) পত্রের মূল গুরুত্ব কী?
উত্তর: এই পত্রটি অধ্যয়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রাচীন মিশরীয়, মেসোপটেমীয়, পারসিক, গ্রিক, রোমান ও বাইজান্টাইন সভ্যতার উত্থান-পতন এবং পরবর্তীকালে মুসলিম সভ্যতায় এগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান লাভ করতে পারে।
২. ফিনিশীয়দের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক অবদান কোনটি?
উত্তর: ফিনিশীয়দের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক অবদান হলো ২২টি ব্যঞ্জনবর্ণ সম্বলিত সরল ধ্বনিভিত্তিক বর্ণমালার আবিষ্কার, যা থেকে বর্তমান বিশ্বের গ্রিক, লাতিন ও আধুনিক ইংরেজি বর্ণমালার উৎপত্তি হয়েছে।
৩. কোড হাম্মুরাবিকে কেন বিশ্ব ইতিহাসের মাইলফলক বলা হয়?
উত্তর: এটি বিশ্বের প্রাচীনতম সুসংরক্ষিত লিখিত আইনবিধি, যার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে সমাজ কোনো শাসকের ব্যক্তিগত খেয়ালখুশিতে নয়, বরং পূর্বনির্ধারিত লিখিত আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত।
৪. কালদীয়দের জ্যোতির্বিজ্ঞানের কোন অবদানটি আমরা আজও প্রতিদিন ব্যবহার করি?
উত্তর: কালদীয়দের উদ্ভাবিত সপ্তাহের সাত দিনের নামকরণ, ২৪ ঘণ্টায় একদিন, ৬০ মিনিটে এক ঘণ্টা এবং ৬০ সেকেন্ডে এক মিনিটের সময় গণনা পদ্ধতি আমরা আধুনিক যুগেও প্রতিদিন ব্যবহার করছি।
৫. মুসলিম স্থাপত্য ও প্রশাসনে বাইজান্টাইন ও পারসিক প্রভাব কীভাবে পরিলক্ষিত হয়?
উত্তর: আব্বাসীয় যুগে পারসিক উজির পদ ও দরবারী শিষ্টাচার এবং উমাইয়া যুগে বাইজান্টাইন মুদ্রা, কুব্বাতুস সাখরা ও দামেস্ক মসজিদের গম্বুজ ও মোজাইক শিল্পে এই দুই সভ্যতার সুস্পষ্ট প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে।
৬. পরীক্ষায় প্রাচীন সভ্যতার প্রশ্নোত্তরে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার কৌশল কী?
উত্তর: সভ্যতার ভৌগোলিক অবস্থান, বিখ্যাত শাসক, তাদের সুনির্দিষ্ট আবিষ্কার (যেমন: পিরামিড, ঝুলন্ত বাগান, আসিরীয় সেনাবাহিনী, জাস্টিনিয়ান কোড) পয়েন্ট আকারে তুলে ধরে মুসলিম সভ্যতায় তার প্রভাব বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করতে হবে।