জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

দিরাসাতু তাফসীরুল কুরআনিল কারীম (Dirasatu Tafsiril Quranil Karim) – 203809, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৭৪ মিনিট পড়ার সময়
১৫ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۳
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৩]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة تفسير القرآن الكريم
[দিরাসাতু তাফসীরিল কুরআনিল কারীম]
বিষয় কোড: ২০৩৮০৯ | পরীক্ষা কোড: ২০৪ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৩৭
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০


مجموعة (أ) – ক-বিভাগ (আয়াতসমূহের তরজমা, তাফসির ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলি)

١- الحمد لله رب العالمين- الرحمن الرحيم- مالك يوم الدين- اياك نعبد واياك نستعين- اهدنا الصراط المستقيم-

[১. যাবতীয় প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক। যিনি পরম দয়ালু, পরম করুণাময়। যিনি কর্মফল দিবসের মালিক। আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি এবং কেবল আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি। আমাদেরকে সরল-সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।]

আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির

সূরা আল-ফাতিহা হলো ‘উম্মুল কিতাব’ বা সমগ্র কুরআনের সারসংক্ষেপ। এতে আল্লাহ তা’আলার মহিমান্বিত নাম, সার্বভৌম কর্তৃত্ব, সার্বজনীন রবুবিয়্যাত এবং অসীম রহমতের প্রশংসা দ্বারা শুরু করা হয়েছে। এরপর মানুষের চরম গোলামি ও নিরঙ্কুশ তাওহীদের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে—ইবাদত ও সাহায্য একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। পরিশেষে মানবজাতির পরম সাফল্য তথা ‘সিরাতে মুস্তাকীম’-এর পথে অবিচল থাকার ঐশী প্রার্থনা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

(أ) هل التسمية آية من الفاتحة؟ اذكر أقوال العلماء فيه-

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম (التسمية) সূরা আল-ফাতিহার স্বতন্ত্র আয়াত কি না—এ বিষয়ে উম্মাহর ফুকাহায়ে কেরাম ও মুফাসসিরগণের মাঝে তিনটি প্রধান অভিমত রয়েছে:

  1. ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ও মক্কার ক্বারীগণের অভিমত: বিসমিল্লাহ হলো সূরা আল-ফাতিহার একটি অবিচ্ছেদ্য পূর্ণাঙ্গ আয়াত। তাই শাফেয়ী মাজহাবে নামাজে সূরা ফাতিহার শুরুতে উচ্চস্বরে (জেহরি) বিসমিল্লাহ পড়া ওয়াজিব। দলিল: উম্মে সালামা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বিসমিল্লাহকে ফাতিহার প্রথম আয়াত হিসেবে পাঠ করতেন (সুনানে দারা কুতনী)।
  2. ইমাম মালেক (রহ.) ও মদিনাবাসীদের অভিমত: বিসমিল্লাহ সূরা আল-ফাতিহা বা কুরআনের কোনো সূরারই আয়াত নয় (সূরা আন-নামলের ৩০ নম্বর আয়াত ব্যতীত)। এটি কেবল বরকত ও দুটি সূরার মাঝে পার্থক্য করার জন্য লেখা হয়। তাই মালেকি মাজহাবে ফরজ নামাজে বিসমিল্লাহ পাঠ করা মাকরূহ।
  3. ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমদ (রহ.)-এর অভিমত: বিসমিল্লাহ কুরআনের একটি পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র আয়াত, যা বরকত ও সূরার বিভাজনের জন্য প্রত্যেক সূরার শুরুতে অবতীর্ণ হয়েছে; তবে এটি কোনো সূরার অভ্যন্তরীণ অংশ নয়। হানাফি মাজহাবে নামাজে বিসমিল্লাহ নিঃশব্দে পাঠ করা সুন্নাত। দলিল: হযরত আনাস (রা.) বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ (সা.), আবু বকর ও ওমরের পেছনে সালাত আদায় করেছি; তাঁরা ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ দ্বারা কেরাত শুরু করতেন এবং বিসমিল্লাহ নিঃশব্দে পড়তেন।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।

(ب) ما الفرق بين الحمد والشكر؟ بين كما بين الزمخشري-

বিখ্যাত মুফাসসির আল্লামা আবুল কাসিম মাহমুদ আল-জামাখশারী (রহ.) তাঁর কালজয়ী তাফসির গ্রন্থ ‘আল-কাশশাফ’-এ ‘হামদ’ ও ‘শুকর’-এর ভাষাতাত্ত্বিক ও অর্থগত চমৎকার পার্থক্য নিরূপণ করেছেন:

  1. বিষয়ের ব্যপ্তির দিক থেকে (عموم وخصوص من حيث المتعلق):
    • হামদ (الحمد): এটি কোনো নেয়ামত পাওয়ার বিনিময়েও হতে পারে, আবার নেয়ামত পাওয়া ছাড়াও কেবল সত্তাগত সৌন্দর্য ও কামালিয়াতের প্রশংসায় হতে পারে। যেমন আমরা বলি: আল্লাহর সুন্দর সিফাতের জন্য হামদ।
    • শুকর (الشكر): এটি কেবল কোনো অর্জিত নেয়ামত বা উপকারের প্রতিদান হিসেবেই আদায় করা হয়। নিয়ামত ব্যতিরেকে শুকর হয় না। অতএব, সম্পর্কের দিক থেকে হামদ অধিক ব্যাপক (আম)।
  2. প্রকাশের মাধ্যমের দিক থেকে (عموم وخصوص من حيث الأداة):
    • হামদ: এটি কেবল মুখ ও জবানের প্রশংসাসূচক কথার মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়।
    • শুকর: এটি অন্তর (বিশ্বাস), জবান (প্রশংসা) এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ (আমল ও আনুগত্য)—এই তিন মাধ্যমেই আদায় করা হয়। আল্লাহ ইরশাদ করেন: “হে দাউদ পরিবার! তোমরা কর্মের মাধ্যমে শুকরিয়া আদায় করো।” (সূরা সাবা: ১৩)। অতএব, প্রকাশের মাধ্যমের দিক থেকে শুকর অধিক ব্যাপক (আম)।
  3. জামাখশারীর সারসংক্ষেপ: উভয়ের মাঝে ‘আম-খাস ওয়াজহী’ (সাধারণ ও বিশেষের তুলনামূলক) সম্পর্ক রয়েছে। আলহামদু লিল্লাহ শব্দটি সর্বোচ্চ সার্বজনীন প্রশংসার দাবিদার।

٢- يايها الذين أمنوا لا تقدموا بين يدى الله ورسوله واتقوا الله، إن الله سميع عليم- يايها الذين أمنوا لا ترفعوا أصواتكم فوق صوت النبي ولا تجهروا له بالقول كجهر بعضكم لبعض أن تحبط أعمالكم وأنتم لا تشعرون-

[২. হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশের অগ্রবর্তী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের সাথে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো তাঁর সাথে সেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো না; নতুবা তোমাদের সমস্ত আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে অথচ তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না।]

আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির

সূরা আল-হুজুরাতের প্রারম্ভিক এই আয়াতগুলোতে মুমিন বান্দাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর প্রতি চরম ভক্তি, আদব ও শিষ্টাচার প্রদর্শনের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও শরীয়তের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো ব্যক্তিগত অভিমত বা আইন উদ্ভাবন করা নিষিদ্ধ। পাশাপাশি রাসূল (সা.)-এর সম্মুখে সম্মানজনক নিচু স্বরে কথা বলা ঈমানের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

(أ) سبب نزول الآية الكريمة

ইমাম বুখারী (রহ.) সহীহ সনদে হযরত ইবনে আবি মুলাইকা থেকে বর্ণনা করেন: একবার বনু তামীম গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে আগমন করে। তাদের গোত্রপ্রধান কাকে নিযুক্ত করা হবে এ নিয়ে দুই শীর্ষ সাহাবী হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়।

  • আবু বকর (রা.) প্রস্তাব করলেন আল-কা’কা’ ইবনে মা’বাদের নাম।
  • উমর (রা.) প্রস্তাব করলেন আল-আকরা’ ইবনে হাবিসের নাম।
  • এ সময় উভয়ের মধ্যে তর্কাতর্কি ও মতবিনিময়কালে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উপস্থিতিতে তাঁদের কণ্ঠস্বর কিছুটা উচ্চ হয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা’আলা এই আয়াত দুটি নাজিল করেন।
  • আয়াত নাজিলের পর আবু বকর (রা.) প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি রাসূলের সামনে কানে কানে ফিসফিস করে কথা ছাড়া আর কখনো স্বাভাবিক কথাও বলবেন না। আর হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রা.)-এর কণ্ঠ প্রাকৃতিকভাবেই উচ্চ ছিল বলে তিনি ভয়ে নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে কান্না শুরু করেছিলেন এই ভেবে যে তাঁর আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে; পরবর্তীতে রাসূল (সা.) তাঁকে জান্নাতী হিসেবে সুসংবাদ দেন।

(ب) عظمة النبى صلى الله عليه وسلم بضوء سورة الحجرات

সূরা আল-হুজুরাতকে বলা হয় ‘সুরাতুল আদাব’ বা নবীজির মর্যাদার সনদ। এ সূরায় মহানবী (সা.)-এর যে অতুলনীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমা ফুটে উঠেছে:

  1. সকল সিদ্ধান্তের ওপর নবীজির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে এক পা এগিয়ে যাওয়া বা অগ্রবর্তী হওয়া নিষেধ; অর্থাৎ তাঁর সুন্নাহর ঊর্ধ্বে কারও ব্যক্তিগত রায় গ্রহণযোগ্য নয়।
  2. কণ্ঠস্বর উঁচু করলে আমল বরবাদ: সাধারণ মানুষের সাথে যে সুরে কথা বলা হয়, নবীজির সাথে সে সুরে কথা বললে অজান্তেই সমস্ত জীবনের নেক আমল নষ্ট হয়ে যায়। যা প্রমাণ করে নবীজির প্রতি সামান্যতম অমর্যাদাও কুফরির সমতুল্য।
  3. নাম ধরে ডাকায় নিষেধাজ্ঞা: সাধারণ মানুষের মতো ‘হে মুহাম্মদ’ বলে ডাকার বদলে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বা ‘ইয়া নাবীয়্যাল্লাহ’ সম্মানসূচক সম্বোধন বাধ্যতামূলক।
  4. মনের তাকওয়ার পরীক্ষা: যারা রাসূলের সামনে নিজেদের কণ্ঠ সংযত রাখে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য নিখাদ খাঁটি হিসেবে বাছাই করে নিয়েছেন (আয়াত ৩)।

٣- ولقد رآه نزلة أخرى- عند سدرة المنتهى- عندها جنة المأوى- إذ يغشى السدرة ما يغشى- ما زاغ البصر وما طغى- لقد رأى من آيات ربه الكبرى-

[৩. এবং অবশ্যই তিনি তাকে আরেকবার দেখেছিলেন। সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে। যার কাছে অবস্থিত জান্নাতুল মা’ওয়া। যখন বৃক্ষটিকে আচ্ছাদিত করেছিল যা আচ্ছাদিত করার ছিল। তাঁর দৃষ্টি বিভ্রান্তও হয়নি এবং লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। নিশ্চয়ই তিনি তাঁর প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলি প্রত্যক্ষ করেছিলেন।]

আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির

সূরা আন-নাজমের এই আয়াতগুলো বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ঐতিহাসিক অলৌকিক মিরাজের রাতের ঊর্ধ্বজগতের অবিস্মরণীয় দৃশ্যপট ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতার সাক্ষ্য দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) ষষ্ঠ ও সপ্তম আসমানের সীমানায় ‘সিদরাতুল মুনতাহা’র নিকটে হযরত জিবরাইল (আ.)-কে তাঁর আসল ছয়শত ডানাবিশিষ্ট রূপের দ্বিতীয়বারের মতো স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং আল্লাহর মহীয়ান কুদরত অবলোকন করেছিলেন।

(أ) المراد بـ ‘سدرة المنتهى’

‘সিদরাতুল মুনতাহা’ (سدرة المنتهى) হলো সপ্তম আসমানে আল্লাহর আরশের নিচে অবস্থিত একটি সুউচ্চ কুলগাছ বা বরই বৃক্ষ।
মুফাসসিরগণের ব্যাখ্যায় এর বৈশিষ্ট্য ও নামকরণের কারণ:

  1. সীমানার শেষ প্রান্ত (المنتهى): সহীহ মুসলিমে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে: “পৃথিবী থেকে যা কিছু ওপরে ওঠে তা এ বৃক্ষ পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয় এবং সেখান থেকে তা গ্রহণ করা হয়; আর ওপরে আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু নাজিল হয় তাও এখানে এসে থামে এবং এখান থেকে তা গ্রহণ করা হয়।” কোনো সৃষ্টি বা ফেরেশতার এর অতিক্রম করার অনুমতি নেই।
  2. অনুপম রূপ ও সৌন্দর্য: মিরাজের হাদিসে এসেছে, এর ফলগুলো ছিল ‘কুলালু হাজর’ (হাজর অঞ্চলের বিশালাকার কলসি)-এর ন্যায় এবং এর পাতাগুলো ছিল হাতির কানের মতো সুবিশাল। যখন আল্লাহর আদেশে আলোর নূর ও স্বর্ণের প্রজাপতি একে আচ্ছাদিত করে, তখন এর সৌন্দর্যের বর্ণনা কোনো সৃষ্টির পক্ষে দেওয়া অসম্ভব।

(ب) الواقعة المتعلقة بهذه الآيات (ঘটনার প্রেক্ষাপট)

এ আয়াতগুলো ঐতিহাসিক পবিত্র মিরাজুন্নবী (সা.)-এর ঘটনার সাথে সম্পর্কিত।
নবুওয়াতের একাদশ বর্ষে রজনীযোগে মহানবী (সা.) বোরাকে আরোহণ করে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় গমন করেন (ইসরা), অতঃপর সেখান থেকে সাত আসমান অতিক্রম করে সিদরাতুল মুনতাহায় উপনীত হন (মিরাজ)।
সেখানে হযরত জিবরাইল (আ.) থেমে গিয়ে বলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি এখান থেকে এক চুল পরিমাণও অগ্রসর হই, তবে আল্লাহর নূরের তাজাল্লিতে আমার পাখাগুলো ভস্মীভূত হয়ে যাবে।” অতঃপর রাসূল (সা.) একাকী ‘মাকামে ক্বাবা কাওসাইনে’ আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে গমন করেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মহিমান্বিত উপহার নিয়ে ফিরে আসেন। কুরাইশ কাফেররা মিরাজকে অস্বীকার করলে আল্লাহ তা’আলা এ আয়াতগুলো নাজিল করে নবীজির দর্শনের সত্যতা ঘোষণা করেন।


٤- اقرأ كتابك كفى بنفسك اليوم عليك حسيبا- من اهتدى فإنما يهتدى لنفسه ومن ضل فإنما يضل عليها، ولا تزر وازرة وزر أخرى، وما كنا معذبين حتى نبعث رسولا-

[৪. পাঠ করো তোমার কিতাব (আমলনামা), আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট। যে ব্যক্তি সৎপথ অবলম্বন করে সে নিজের মঙ্গলের জন্যই সৎপথ অবলম্বন করে, আর যে ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হয় সে নিজের ধ্বংসের জন্যই পথভ্রষ্ট হয়; এবং কোনো বহনকারী অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না; আর আমি কোনো রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি প্রদান করি না।]

আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির

সূরা বনী ইসরাঈলের এই আয়াতগুলোতে কিয়ামতের ময়দানে চূড়ান্ত জবাবদিহিতা ও ইনসাফের চিরন্তন নীতিমালা ঘোষিত হয়েছে। প্রত্যেক মানুষের পার্থিব জীবনের সমস্ত ভালো-মন্দ কর্মকাণ্ড পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আমলনামায় লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা কিয়ামতের দিন উন্মুক্ত করে তার সামনে তুলে ধরা হবে। সেখানে কারও ওপর জুলুম করা হবে না, ব্যক্তি নিজেই নিজের আমলের বিচারক হবে এবং ঐশী হেদায়েতের দলিল পৌঁছানো ছাড়া আল্লাহ কাউকে শাস্তি দেন না।

(أ) المراد بالكتاب في الآية المذكورة

উক্ত আয়াতে ‘কিতাব’ (كتابك) দ্বারা মানুষের আমলনামা (صحيفة الأعمال)-কে বোঝানো হয়েছে।
বিস্তারিত রূপরেখা:

  1. দুনিয়াতে মানুষের কাঁধে নিয়োজিত সম্মানিত দুই লেখক ফেরেশতা ‘কিরামান কাতিবীন’ মানুষের জীবনের প্রতিটি কথা, কাজ, দৃষ্টিপাত ও সংকল্প নিখুঁতভাবে লিখে রেখেছেন।
  2. কিয়ামতের দিন এই কিতাবটি প্রত্যেক মানুষের গলায় ঝুলন্ত অবস্থায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। মুমিনদের আমলনামা ডান হাতে এবং কাফের-পাপীদের আমলনামা বাম হাতে বা পিঠের পেছন থেকে দেওয়া হবে।
  3. পাপী ব্যক্তিরা সেই কিতাব দেখে আর্তনাদ করে বলবে: “হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! এটা কেমন কিতাব যা ছোট-বড় কোনো কিছুই বাদ দেয়নি, সবই গণনা করে রেখেছে!” (সূরা আল-কাহফ: ৪৯)। কোনো উকিল বা সাক্ষীর প্রয়োজন হবে না; নিজের চোখেই সে তার কর্ম দেখতে পাবে।

(ب) هل يعاقب أحد بذنوب أحد آخر؟ (কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে অন্যের পাপে কেউ শাস্তি পাবে কি না?)

কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য মূলনীতি হলো: কারও পাপের কারণে অন্য নিরপরাধ ব্যক্তিকে কখনো শাস্তি দেওয়া হবে না। প্রত্যেকে কেবল নিজের কৃতকর্মের দায় বহন করবে।
কুরআন ও সুন্নাহর দলিলসমূহ:

  1. কুরআনের নীতি: আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন: “ولا تزر وازرة وزر أخرى” (কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না)। সূরা আন-নাজমের ৩৮-৩৯ আয়াতেও বলা হয়েছে: “মানুষ যা চেষ্টা করে তা ছাড়া তার জন্য কিছুই নেই।”
  2. সুন্নাহর দলিল: বিদায় হজের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সা.) সমবেত উম্মাহকে লক্ষ্য করে ঘোষণা করেছিলেন: “জেনে রাখো! কোনো অপরাধীর অপরাধের দায় তার সন্তান বহন করবে না, আর কোনো সন্তানের অপরাধের দায় তার পিতার ওপর চাপানো হবে না।” (সুনানে তিরমিজি)।
  3. একটি সূক্ষ্ম ব্যাখ্যার সমন্বয়: যদি কোনো ব্যক্তি সমাজে কোনো পাপের পথ বা কুপ্রথা চালু করে এবং অন্যরা তার অনুসরণ করে, তবে পথপ্রদর্শক হিসেবে সে নিজ পাপের পাশাপাশি অন্যদের পথভ্রষ্ট করার অতিরিক্ত গুনাহের শাস্তি পাবে; তবে এটি অন্যের পাপ নিজের ওপর নেওয়া নয়, বরং এটি তার নিজেরই পাপের ফল।

٥- وإذا قيل لهم آمنوا كما آمن الناس قالوا أنؤمن كما آمن السفهاء، ألا إنهم هم السفهاء ولكن لا يعلمون- وإذا لقوا الذين آمنوا قالوا آمنا، وإذا خلوا إلى شياطينهم قالوا إنا معكم إنما نحن مستهزءون-

[৫. আর যখন তাদেরকে বলা হয়, লোকেরা (সাহাবীগণ) যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সেভাবে ঈমান আন; তারা বলে, আমরা কি নির্বোধদের মতো ঈমান আনব? জেনে রাখো! নিশ্চয়ই তারা নিজেরাই নির্বোধ কিন্তু তারা তা জানে না। আর যখন তারা মুমিনদের সাথে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি; আর যখন তারা তাদের শয়তানদের (নেতাদের) সাথে গোপনে মিলিত হয় তখন বলে, নিশ্চয়ই আমরা তো তোমাদের সাথেই আছি, আমরা কেবল তাদের সাথে উপহাস করছিলাম মাত্র।]

আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির

সূরা আল-বাকারার এই আয়াতগুলোতে মুনাফিকদের চরম ভণ্ডামি, অহংকার ও দ্বিমুখী মানসিকতার মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামের একনিষ্ঠ ও নিঃস্বার্থ ঈমানকে তারা দুনিয়াদারির দৃষ্টিতে ‘নির্বুদ্ধিতা’ আখ্যা দিত। কিন্তু আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন প্রকৃত নির্বোধ তারাই, যারা চিরস্থায়ী আখেরাতকে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার ধোঁকায় বিক্রি করে দিয়েছে। মুমিনদের সামনে তারা ইসলামের মিথ্যা দাবি করত আর কাফের নেতাদের সাথে মিলিত হয়ে উপহাস করত।

(أ) تعريف النفاق وصفات المنافقين بضوء الكتاب والسنة

নেফাকের সংজ্ঞা: অন্তরে কুফর, শিরক বা শত্রুতা গোপন রেখে বাহ্যিকভাবে নিজেকে মুসলিম হিসেবে প্রকাশ করার নামই ‘নেফাক’ (النفاق)।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুনাফিকদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  1. মিথ্যাচার ও দ্বিচারিতা: তাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোনো মিল থাকে না। আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন নিশ্চয়ই মুনাফিকরা ডাহা মিথ্যাবাদী।” (সূরা আল-মুনাফিকুন: ১)।
  2. রাসূলের হাদিসে বর্ণিত ৪টি লক্ষণ: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “যার মধ্যে চারটি স্বভাব থাকবে সে খাঁটি মুনাফিক—(১) কথা বললে মিথ্যা বলে, (২) ওয়াদা করলে খেলাফ করে, (৩) আমানত রাখলে খিয়ানত করে এবং (৪) বিবাদে জড়ালে অশ্লীল গালাগালি করে।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
  3. ইবাদতে অলসতা ও লোকদেখানো ভাব: আল্লাহ ইরশাদ করেন: “যখন তারা নামাজে দাঁড়ায় তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, কেবল মানুষকে দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে।” (সূরা আন-নিসা: ১৪২)।
  4. সাহাবায়ে কেরামের প্রতি হিংসা ও অবজ্ঞা: তারা মুখলিস সাহাবীদের দরিদ্রতাকে উপহাস করত।

(ب) سبب نزول الآية الكريمة

মুফাসসিরগণ বর্ণনা করেন, এই আয়াতগুলো মদিনার প্রধান মুনাফিক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল এবং তার অনুসারীদের প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে।
যখন তাদেরকে বলা হতো: হযরত আবু বকর, উমর, বেলাল, আম্মার ও সালমান ফারসী (রা.)-এর মতো খাঁটি অন্তরে ধনসম্পদ ও জীবন বিলিয়ে দিয়ে ঈমান আনো; তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই উপহাস করে বলত: “আমরা কি ওইসব দাস, গরিব ও নির্বোধদের মতো অন্ধ বিশ্বাস স্থাপন করব?” আল্লাহ তা’আলা তাদের এই দম্ভের জবাব দিয়ে ঘোষণা করলেন যে, আল্লাহর দৃষ্টিতে ও পরকালের আদালতে এই ধূর্ত মুনাফিকরাই প্রকৃতপক্ষে চরম নির্বোধ।


٦- وقضينا إلى بني اسرائيل في الكتاب لتفسدن في الأرض مرتين ولتعلن علوا كبيرا- فإذا جاء وعد أولهما بعثنا عليكم عبادا لنا أولى بأس شديد فجاسوا خلل الديار، وكان وعدا مفعولا- ثم رددنا لكم الكرة عليهم وامددنكم بأموال وبنين وجعلنكم اكثر نفيرا-

[৬. এবং আমি কিতাবে (তাওরাতে) বনী ইসরাঈলকে জানিয়ে দিয়েছিলাম যে, তোমরা অবশ্যই পৃথিবীতে দুইবার বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং অতিশয় অহংকার প্রদর্শন করবে। অতঃপর যখন সেই দুটির প্রথমটির নির্ধারিত সময় উপস্থিত হলো, তখন আমি তোমাদের বিরুদ্ধে আমার এমন বান্দাদের প্রেরণ করলাম যারা ছিল অত্যন্ত পরাক্রমশালী যোদ্ধা; ফলে তারা তোমাদের জনপদের আনাচে-কানাচে ঢুকে পড়ল; আর এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হওয়ারই ছিল। অতঃপর আমি তোমাদেরকে পুনরায় তাদের ওপর প্রাধান্য ফিরিয়ে দিলাম এবং তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি দিয়ে সাহায্য করলাম এবং তোমাদের সংখ্যাধিক্যে শ্রেষ্ঠতর করলাম।]

আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির

সূরা বনী ইসরাঈলের এই আয়াতগুলোতে ইহুদি জাতির ধারাবাহিক ঔদ্ধত্য, আল্লাহর নবীদের হত্যা, ঐশী বিধান লঙ্ঘন এবং তার ফলশ্রুতিতে তাদের ওপর নেমে আসা ভয়াবহ লাঞ্ছনা ও শাস্তির ঐতিহাসিক চিত্র বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাদের অপরাধের শাস্তিস্বরূপ পরাক্রমশালী বহিঃশত্রু দ্বারা তাদের বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংস করিয়েছিলেন, আবার তওবার পর তাদের সুযোগ দিয়েছিলেন।

(أ) توضيح قوله تعالى: ‘لتفسدن في الأرض مرتين’

আল্লাহ তা’আলা বনী ইসরাঈলকে তাদের আসমানী কিতাব তাওরাতে সতর্ক করেছিলেন যে, তারা ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে দুইবার মারাত্মক ফাসাদ, রক্তপাত ও মহাপাপ করবে:

  1. প্রথম বিপর্যয় (الفساد الأول): তারা তাওরাতের বিধান পরিত্যাগ করে শিরক ও পৌত্তলিকতায় লিপ্ত হয় এবং আল্লাহর প্রেরিত সম্মানিত নবী হযরত জাকারিয়া (আ.) ও অন্যান্য পয়গম্বরগণকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এর শাস্তিস্বরূপ বাবেল বা ব্যাবিলনের জালিম সম্রাট বখতে নসর (নেবুচাদনেজার) তাদের ওপর চড়াও হয়।
  2. দ্বিতীয় বিপর্যয় (الفساد الثاني): পুনরায় শক্তি ও স্বাধীনতা পাওয়ার পর তারা আবার অহংকারে মত্ত হয়, হযরত ইয়াহিয়া (আ.)-কে শিরশ্ছেদ করে হত্যা করে এবং হযরত ঈসা (আ.)-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। পরিশেষে খাতামুন্নাবিয়্যীন মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। ফলে রোমান সম্রাট তিতাস (Titus) ৭০ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেম পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় এবং ইহুদিদেরকে বিশ্বজুড়ে যাযাবর করে তাড়িয়ে দেয়।

(ب) تفسير ‘فإذا جاء وعد أولاهما’ كما فسر البغوي

ইমাম হুসাইন ইবনে মাসউদ আল-বাগাবী (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত তাফসির ‘মাআলিমুত তানজিল’-এ ‘ফা ইজা জা-আ ওয়া’দু উলাহুমা’র চমৎকার ব্যাখ্যায় লিখেছেন:

  • যখন বনী ইসরাঈলের প্রথম ফাসাদ ও পাপের শাস্তি প্রদানের নির্ধারিত সময় উপস্থিত হলো, তখন আল্লাহ বাবেল (ইরাক)-এর কাফের রাজা বখতে নসর (بختنصر – Nebuchadnezzar)-কে তাদের ওপর পরাক্রমশালী সেনাদল নিয়ে লেলিয়ে দেন।
  • বখতে নসর ও তার দুর্ধর্ষ সৈন্যরা জেরুজালেমে প্রবেশ করে সত্তর হাজার বনী ইসরাঈলকে হত্যা করে, সমগ্র তাওরাতের কপিগুলো পুড়িয়ে দেয়, সুলাইমান (আ.)-এর নির্মিত প্রথম পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় এবং দানিয়েল ও উজাইর (আ.)-সহ লক্ষাধিক ইহুদি নর-নারীকে গোলাম বানিয়ে বন্দি করে ব্যাবিলনে নিয়ে যায়।
  • দীর্ঘ ৭০ বছর বন্দিত্বের পর পারস্য সম্রাট খসরু বাবেল জয় করে ইহুদিদের মুক্তি দেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাস পুনর্নির্মাণের সুযোগ দেন—যার প্রতি ইঙ্গিত করে পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে: “সুম্মা রাদাদনা লাকুমুল কাররাতা আলাইহিম”

٧- والنجم إذا هوى- ما ضل صاحبكم وما غوى- وما ينطق عن الهوى- إن هو إلا وحى يوحى- علمه شديد القوى- ذو مرة فاستوى- وهو بالأفق الأعلى- ثم دنا فتدلى-

[৭. শপথ নক্ষত্রের যখন তা অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী (মুহাম্মদ সা.) বিভ্রান্ত হননি এবং বিপথগামীও হননি। এবং তিনি নিজের খেয়ালখুশিমতো কোনো কথাও বলেন না। এটি তো কেবল ওহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়। তাঁকে শিক্ষা দান করেছেন এক শক্তিশালী সত্তা (জিবরাইল)। প্রজ্ঞাসম্পন্ন, অতঃপর সে স্থির দাঁড়িয়েছিল। যখন সে ছিল ঊর্ধ্ব দিগন্তে। অতঃপর সে নিকটে এলো এবং আরও কাছাকাছি হলো।]

আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির

সূরা আন-নাজমের প্রারম্ভিক এই আয়াতগুলো ওহীর অকাট্য প্রামাণিকতা এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র নবুওয়াতের নিষ্কলুষতার অকাট্য দলিল। মক্কার কুরাইশরা যখন নবীজিকে কবি, গণক বা বিভ্রান্ত বলে অপবাদ দিচ্ছিল, তখন আল্লাহ তা’আলা আসমানের উজ্জ্বল নক্ষত্রের শপথ করে জানিয়ে দেন যে, তাঁর নবীর জবান থেকে নিঃসৃত প্রতিটি দ্বীনি বাণী হলো আল্লাহর ওহী। তাঁর শিক্ষক হলেন মহাশক্তিধর ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)।

(أ) أهمية الوحى وأقسامه

ওহীর গুরুত্ব: ওহী হলো সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যকার যোগাযোগের একমাত্র ঐশী মাধ্যম। মানুষের ইন্দ্রিয় ও বিবেক যেখানে গিয়ে থেমে যায়, সেখান থেকেই ওহীর জ্ঞানের শুরু। ওহী ছাড়া মানুষ কখনোই তার স্রষ্টার পরিচয়, সঠিক ইবাদত এবং পরকালের বিধান জানতে পারত না।
ওহীর প্রধান প্রকারভেদ:

  1. ওহী মাতলু (الوحي المتلو): যে ওহীর শব্দ ও অর্থ উভয়টিই সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং যা নামাজে তিলাওয়াত করা হয়। অর্থাৎ পবিত্র আল-কুরআনুল কারীম
  2. ওহী গায়রে মাতলু (الوحي غير المتلو): যে ওহীর মূল ভাব বা মর্ম আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্তরে দেওয়া হয়েছে কিন্তু শব্দ বা ভাষা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব। অর্থাৎ পবিত্র হাদীসে নববী

(ب) كم مرة رأى الرسول صلى الله عليه وسلم جبرائيل عليه السلام في صورته الأصلية؟

সহীহ হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত জিবরাইল (আ.)-কে তাঁর আসল ছয়শত ডানাবিশিষ্ট আসমান-জমিনব্যাপী রাজকীয় ফেরেশতারূপে মোট দুইবার স্বচক্ষে দেখেছিলেন:
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা ও ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে সহীহ বুখারী ও মুসলিমে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে:

  1. প্রথমবার মক্কায়: নবুওয়াতের প্রারম্ভে হেরা গুহার পর মক্কার জিয়াদ উপত্যকায় যখন জিবরাইল (আ.) দিগন্তজুড়ে একটি কুরসীর ওপর উপবিষ্ট ছিলেন এবং যার দিগন্তজোড়া ছয়শত ডানা আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী শূন্যস্থান পূর্ণ করে রেখেছিল।
  2. দ্বিতীয়বার ঊর্ধ্বাকাশে মিরাজের রজনীতে: সপ্তম আসমানের ওপরে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’র নিকটে (সূরা আন-নাজমের আলোচ্য আয়াতে যার উল্লেখ রয়েছে: ‘ওয়া লাকাদ রাআহু নাযলাতান উখরা, ইনদা সিদরাতিল মুনতাহা’)। অন্য সব সময় জিবরাইল (আ.) সাহাবী হযরত দিহয়াতুল কালবী (রা.)-এর মানব আকৃতিতে ওহী নিয়ে আগমন করতেন।

٨- إن الذين ينادونك من وراء الحجرات أكثرهم لا يعقلون- ولو أنهم صبروا حتى تخرج إليهم لكان خيرا لهم، والله غفور رحيم-

[৮. নিশ্চয়ই যারা হুজরাসমূহের (বাসগৃহের) পেছন থেকে আপনাকে উচ্চস্বরে ডাকে, তাদের অধিকাংশেরই বুদ্ধি-বিবেচনা নেই। আর যদি তারা আপনি নিজে বের হয়ে তাদের কাছে আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করত, তবে তা তাদের জন্য উত্তম হতো; এবং আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।]

আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির

নবীজির পারিবারিক প্রাইভেসী এবং বিশ্বনেতার সম্মানের প্রতি বেদুঈনদের গ্রাম্য অশোভন আচরণের কঠোর সংশোধন করা হয়েছে এই আয়াতে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রীদের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকা শিষ্টাচারবহির্ভূত অজ্ঞতা। দ্বীনের নবীকে সম্মান করা এবং তাঁর স্বস্তির সময় ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করাই ছিল মুমিনদের জন্য বরকতময় আচরণ।

(أ) سبب نزول الآية الكريمة

ইমাম আহমদ, তাবারী ও ইবনে কাসীর (রহ.) বর্ণনা করেন: নবম হিজরিতে ‘আমুল ওফুদ’ (প্রতিনিধিদলের বছর) বনু তামীম গোত্রের একদল বেদুঈন লোক মদিনায় আগমন করে।
তারা ঠিক দুপুরের বিশ্রামের সময় মসজিদে নববীতে এসে দেখে রাসূলুল্লাহ (সা.) উম্মাহাতুল মুমিনীনগণের হুজরায় বিশ্রাম নিচ্ছেন। বেদুঈনরা কোনো প্রকার শিষ্টাচারের তোয়াক্কা না করে ঘরের পেছনের দেয়ালের বাইরে দাঁড়িয়ে কর্কশ ও উচ্চস্বরে চিৎকার করতে থাকে: “ইয়া মুহাম্মদ! উখরুজ ইলাইনা” (হে মুহাম্মদ! আমাদের কাছে বের হয়ে আসুন)। তাদের এই বেয়াদবি ও রূঢ় আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আল্লাহ তা’আলা এই আয়াত নাজিল করেন এবং ঘোষণা করেন যে তাদের অধিকাংশেরই ন্যূনতম জ্ঞান ও বিবেক নেই।

(ب) إعراب ‘أكثرهم لا يعقلون’ (নাহবীয় বিশ্লেষণ)

  1. أَكْثَرُهُمْ (আকসারুহুম):
    • أكثرُ: মুবতাদা (مبتدأ), যা পেশযুক্ত (مرفوع بالضمة الظاهرة)। এটি মুদাফ (مضاف)।
    • هم: জমিরুল মুত্তাছিল (ضمير متصل مبني على السكون في محل جر بالإضافة) – মুদাফ ইলাইহি।
  2. لَا (লা): হরফে নফি (حرف نفي مبني على السكون لا عمل له) – না-বোধক অব্যয়।
  3. يَعْقِلُونَ (ইয়া’ক্বিলুন):
    • মুদারে মারফু (فعل مضارع مرفوع وعلامة رفعه ثبوت النون لأنه من الأفعال الخمسة) – পঞ্চ ক্রিয়াপদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় নূন বহাল থাকার মাধ্যমে মারফু।
    • الواو (ওয়াও): জমিরুল মুত্তাছিল ফায়েল (ضمير متصل مبني على السكون في محل رفع فاعل)।
  4. জুমলার অবস্থান: ‘লা ইয়া’ক্বিলূন’ ফেল ও ফায়েল মিলে জুমলায়ে ফেলিয়্যাহ হয়ে মুবতাদা ‘আকসারুহুম’-এর খবর (والجملة الفعلية في محل رفع خبر المبتدأ)। আর সম্পূর্ণ জুমলাটি ‘ইন্না’ (إن)-এর খবর হিসেবে মাহাল্লান মারফু।

٩- الم- ذلك الكتاب لا ريب فيه، هدى للمتقين- الذين يؤمنون بالغيب ويقيمون الصلاة ومما رزقناهم ينفقون- والذين يؤمنون بما أنزل إليك وما أنزل من قبلك وبالآخرة هم يوقنون-

[৯. আলিফ-লাম-মীম। এ সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; এটি মুত্তাকীদের জন্য পথপ্রদর্শক। যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপন করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যা রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। এবং যারা আপনার প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে তাতে এবং আপনার পূর্বে যা নাজিল করা হয়েছে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আখেরাতের ওপর সুদৃঢ় প্রত্যয় রাখে।]

আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির

সূরা আল-বাকারার সূচনা হয়েছে হরূফে মুকাত্তাআত দ্বারা, যা কুরআনের অলৌকিকতার স্মারক। এরপর মহাগ্রন্থ আল-কুরআনকে মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশক (হুদা) হিসেবে ঘোষণা করে বলা হয়েছে যে এটি সকল প্রকার ভুলভ্রান্তি ও সন্দেহের ঊর্ধ্বে। এই কুরআনের হেদায়েত কেবল তারাই গ্রহণ করতে পারে যাদের অন্তরে তাকওয়া রয়েছে। এরপর মুত্তাকী বান্দাদের পাঁচটি কালজয়ী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে।

(أ) توضيح قوله تعالى: ‘ذلك الكتاب لا ريب فيه’

  1. ذلك (দূরবর্তী ইঙ্গিতবাচক শব্দ): এখানে অতি নিকটে উপস্থিত কুরআনকে ‘জালিকা’ (দূরবর্তী ইশারা) দ্বারা ব্যক্ত করার কারণ হলো এর সম্মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের উচ্চতা প্রকাশ করা। অর্থাৎ এ কিতাব মর্যাদায় এত সুউচ্চ যেন তা ধরাছোঁয়ার বাইরে।
  2. الكتاب: আসমানী ওহীর পূর্ণাঙ্গ সংকলনগ্রন্থ।
  3. لا ريب فيه: ‘রাইব’ অর্থ এমন সন্দেহ যা অন্তরে দ্বিধাদ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। এ কিতাব আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত এতে কোনো সন্দেহ নেই, এর কোনো তথ্য ও বিধান মিথ্যা বা বাতিল হওয়ার ন্যূনতম কোনো অবকাশ নেই। কাফের ও নাস্তিকরা সন্দেহের রোগ অন্তরে পুষে রাখলেও বাস্তবতার মানদণ্ডে কুরআন সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন ও সন্দেহমুক্ত।

(ب) تعريف التقوى وأوصاف المتقين

তাকওয়ার পরিচয়: আল্লাহর ভয়ে তাঁর যাবতীয় আদেশ পালন করে এবং নিষেধসমূহ বর্জন করে জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা করার নাম তাকওয়া।
আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত মুত্তাকীদের ৫টি প্রধান বৈশিষ্ট্য (أوصاف المتقين):

  1. অদৃশ্যে বিশ্বাস (الإيمان بالغيب): যা মানবীয় ইন্দ্রিয়ের অগোচরে রয়েছে—যেমন আল্লাহ, ফেরেশতা, কবর, জান্নাত, জাহান্নাম ও তাকদিরে বিনাদ্বিধায় বিশ্বাস স্থাপন।
  2. নামাজ কায়েম করা (إقامة الصلاة): কেবল নামাজ পড়া নয়, বরং সময়মতো রুকু-সিজদা ও খুশু-খুজুর সাথে সুন্নাত তরিকায় সালাত প্রতিষ্ঠা করা।
  3. আল্লাহর পথে ব্যয় করা (الإنفاق في سبيل الله): আল্লাহ প্রদত্ত হালাল জীবিকা থেকে ফরজ জাকাত আদায় এবং দরিদ্র ও অসহায়দের জন্য উদারহস্তে সাদকা করা।
  4. সকল আসমানী কিতাবে বিশ্বাস: কুরআনের পাশাপাশি তাওরাত, ইঞ্জিল, জাবুর ও পূর্ববর্তী সকল নবীর ওপর অবতীর্ণ সহিফাগুলোর প্রতি সত্যতার স্বীকৃতি দেওয়া।
  5. আখেরাতে দৃঢ় প্রত্যয় (اليقين بالآخرة): কিয়ামতের হিসাব-নিকাশ, মিজান, পুলসিরাত এবং জান্নাত-জাহান্নামের প্রতিফলকে চিরন্তন সত্য জেনে নেক আমলের প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

١٠- يا أيها الذين آمنوا اجتنبوا كثيرا من الظن إن بعض الظن إثم ولا تجسسوا ولا يغتب بعضكم بعضا- أيحب أحدكم أن يأكل لحم أخيه ميتا فكرهتموه، واتقوا الله، إن الله تواب رحيم-

[১০. হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাকো, নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান পাপ; এবং তোমরা কারও গোপন ত্রুটি অনুসন্ধান করো না এবং তোমাদের কেউ যেন কারও গিবত (পরনিন্দা) না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা অপছন্দ করবে। এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।]

আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির

সূরা আল-হুজুরাতের এই ১২ নম্বর আয়াতটি একটি আদর্শ, মর্যাদাপূর্ণ ও শান্তিময় সমাজ বিনির্মাণের সর্বোচ্চ রক্ষাকবচ। এতে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ধ্বংসকারী তিনটি মারাত্মক সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক অপরাধকে অকাট্যভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে: (১) অপবাদমূলক অমূলক মন্দ ধারণা পোষণ করা, (২) অন্যের গোপন দোষ খুঁজে বেড়ানো এবং (৩) অসাক্ষাতে কারও পরনিন্দা বা গিবত করা। গিবতকে মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার মতো বীভৎস উপমার মাধ্যমে এর ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

(أ) معنى الغيبة ومضراتها

গিবতের অর্থ: সহীহ মুসলিমে রাসূলুল্লাহ (সা.) গিবতের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন: “গিবত হলো তোমার কোনো ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা শুনলে সে কষ্ট পায় বা অপছন্দ করে।” সাহাবীগণ বললেন: আমি যা বলছি তা যদি তার মধ্যে সত্যিই বিদ্যমান থাকে? তিনি বললেন: “তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে তবেই তা গিবত হলো; আর যদি তা তার মধ্যে না থাকে তবে তো তুমি তার ওপর অপবাদ (বুহতান) আরোপ করলে।”
গিবতের ভয়াবহ ক্ষতি ও পরিণতি (مضراتها):

  1. আমলনামা শূন্য হয়ে যাওয়া: গিবতকারীর নেক আমল যার গিবত করা হয়েছে তার আমলনামায় স্থানান্তর করে দেওয়া হয়।
  2. মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো জঘন্য পাপ: কুরআনের উপমা অনুযায়ী এটি চরম অমানবিক ও ঘৃণ্য মানসিকতা।
  3. কবরের ভয়াবহ আজাব: হাদিসে এসেছে, অধিকাংশ কবরের আজাব হয় দুটি কারণে—তার একটি হলো চোগলখুরি ও গিবত করা।
  4. সামাজিক অবিশ্বাস ও বিভেদ: গিবত মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসাকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়।

(ب) تعريف الظن والتجسس وأحكامهما

  1. আয-জান্ন (الظن – অনুমান):
    • সংজ্ঞা: কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও বাস্তবতা ছাড়াই কোনো মুমিনের ব্যাপারে অন্তরে মন্দ ধারণা পোষণ করা।
    • হুকুম: কোনো পরহেজগার মুমিনের প্রতি অপবাদমূলক কুধারণা পোষণ করা হারাম ও গুনাহ। রাসূল (সা.) বলেন: “তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে থাকো; কেননা ধারণা হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা।” (সহীহ বুখারী)। তবে কাফের বা প্রকাশ্য পাপাচারী ফাসেকের ক্ষতি থেকে বাঁচতে আত্মরক্ষামূলক সতর্কতামূলক ধারণা রাখা জায়েজ।
  2. আত-তাজাসসুস (التجسس – গোয়েন্দাগিরি ও গোপন দোষ খোঁজা):
    • সংজ্ঞা: কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনের লুকায়িত দুর্বলতা, ভুলত্রুটি বা ব্যক্তিগত গোপন বিষয় জানার জন্য তার পেছনে গোয়েন্দাগিরি করা।
    • হুকুম: সাধারণ মুসলমানদের গোপন ত্রুটি খোঁজা সর্বসম্মতভাবে হারাম ও কবিরা গুনাহ। রাসূল (সা.) বলেছেন: “যারা মানুষের গোপন দোষের পেছনে লাগে, আল্লাহ তাদের গোপন দোষ প্রকাশ করে দেন এবং তাকে নিজ ঘরের ভেতরেও লাঞ্ছিত করেন।” (সুনানে আবু দাউদ)। তবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে শত্রু বা অপরাধীদের শনাক্তকরণে ব্যতিক্রম জায়েজ।

مجموعة (ب) – খ-বিভাগ (তাফসির শাস্ত্রের গ্রন্থাবলি ও মূলনীতি)

١١- اذكر خصائص تفسير البيضاوى ومنهج المؤلف في تأليفه-

[১১. তাফসিরে বায়যাবীর বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং এটি রচনার ক্ষেত্রে লেখকের অনুসৃত পদ্ধতি আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামী তাফসির সাহিত্যের আকাশে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও যুগান্তকারী তাফসির গ্রন্থ হলো ‘আনওয়ারুত তানজিল ওয়া আসরারুত তা’উইল’ (أنوار التنزيل وأسرار التأويل), যা বিশ্বজুড়ে সংক্ষেপে ‘তাফসিরে বায়যাবী’ (تفسير البيضاوي) নামে খ্যাত। এর রচয়িতা হলেন হিজরি সপ্তম শতাব্দীর প্রখ্যাত ফকিহ, মুতাকাল্লিম ও কাযী ইমাম নাসিরুদ্দীন আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ ইবনে উমর আল-বায়যাবী আশ-শাফেয়ী (ওফাত: ৬৮৫ হিজরি / ১২৮৬ খ্রি.)। শতাব্দীর পর শতাব্দী এটি আল-আজহার ও উপমহাদেশের আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর উচ্চতর শ্রেণিতে মৌলিক পাঠ্য হিসেবে সমাদৃত।

তাফসিরে বায়যাবীর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص التفسير)

  1. সংক্ষিপ্ততা ও চমৎকার প্রাঞ্জলতা (الإيجاز والإعجاز): এটি বিশাল আকারের নয়, আবার অতি সংক্ষিপ্তও নয়; বরং অল্প কথায় অত্যন্ত গভীর ও বিস্তৃত অর্থ প্রকাশের জন্য এটি এক অতুলনীয় সাহিত্যকর্ম।
  2. আল-কাশশাফের মু’তাযিলা মুক্ত সংস্করণ: আল্লামা জামাখশারীর ‘আল-কাশশাফ’ গ্রন্থের চমৎকার আরবি সাহিত্যরীতি ও বালাগাতকে তিনি গ্রহণ করেছেন, কিন্তু জামাখশারীর মু’তাযিলা বিভ্রান্তিগুলোকে সতর্কতার সাথে বর্জন করে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদা অনুযায়ী তা সংশোধন করেছেন।
  3. ফিকহি মাসআলার নিরপেক্ষ পর্যালোচনা: তিনি নিজে শাফেয়ী মাজহাবের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও হানাফি ও অন্যান্য মাজহাবের দলিলসমূহ ইনসাফের সাথে উল্লেখ করেছেন।
  4. ক্বিরাআতের সূক্ষ্ম বৈচিত্র্য: সাব’আ (সাত) ও আশারাহ (দশ) ক্বিরাআতের পার্থক্য এবং তার ওপর অর্থের পরিবর্তন অত্যন্ত সুচারুভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
  5. সুফি ও আধ্যাত্মিক দিকদর্শন: আয়াতের বাহ্যিক অর্থের পাশাপাশি হৃদয়গ্রাহী আখলাকি ও আত্মিক নসিহত সংযোজন।

লেখক কর্তৃক অনুসৃত পদ্ধতি ও মানহাজ (منهج المؤلف في تأليفه)

  1. তাফসির বিল মা’ছুর ও বিল রায়-এর অপূর্ব মেলবন্ধন: তিনি সনদভিত্তিক রেওয়ায়েত এবং জ্ঞানভিত্তিক সূক্ষ্ম যুক্তির চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
  2. বালাগাত ও অলংকার শাস্ত্রের প্রয়োগ: ইলমে মায়ানী, ইলমে বায়ান ও ইলমে বদীর আলোকে কুরআনের অলৌকিক বাকশৈলীর রহস্য উন্মোচন করেছেন।
  3. ইসরাঈলী রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে সতর্কতা: অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি দুর্বল কিচ্ছা-কাহিনী বর্জন করেছেন, তবে কিছু সূরার ফজিলতে জঈফ হাদিস উদ্ধৃত করায় মুহাদ্দিসগণ সতর্ক করেছেন।
  4. উম্মাহর গ্রহণযোগ্যতা: এর গভীরতার কারণে পরবর্তীতে শেখজাদা, খাফাজী ও কুনাবীর মতো বিশ্বখ্যাত উলামাগণ এর ওপর শতাধিক সুবিশাল ব্যাখ্যাগ্রন্থ (হাশিয়া) রচনা করেছেন।

١٢- بين خصائص ‘تفسير المدارك للنسفى’ مع بيان منهجه في تأليفه-

[১২. ‘তাফসিরে মাদারিকুন তানজিল লিন-নাসাফী’-এর বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং রচনার ক্ষেত্রে লেখকের অনুসৃত পদ্ধতি বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

হানাফি মাযহাব ও মাতুরিদী আকিদার অনুসারীদের জন্য সবচেয়ে বিশ্বস্ত, সুসংহত ও প্রামাণ্য তাফসির গ্রন্থ হলো ‘মাদারিকুত তানজিল ওয়া হাকাইকুত তা’উইল’ (مدارك التنزيل وحقائق التأويل), যা সংক্ষেপে ‘তাফসিরে নাসাফী’ নামে পরিচিত। এ মহান গ্রন্থের প্রণেতা হলেন ইমাম আবুল বারাকাত আব্দুল্লাহ ইবনে আহমদ ইবনে মাহমুদ আন-নাসাফী আল-হানাফী (ওফাত: ৭১০ হিজরি / ১৩১০ খ্রি.)। তিনি একাধারে ফিকহ ও উসূল শাস্ত্রের অমর গ্রন্থ ‘কানজুদ্দাকায়িক’ ও ‘আল-মানার’-এরও লেখক ছিলেন।

তাফসিরে নাসাফীর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص التفسير)

  1. ইসরাঈলী রেওয়ায়েত ও কুসংস্কার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত: ইমাম নাসাফী শুরুতেই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি কোনো বানোয়াট কাহিনী বা ইহুদি কল্পকাহিনী (ইসরাঈলিয়াত) আনবেন না। ফলে তাঁর তাফসিরটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও সহীহ ধারায় সমৃদ্ধ।
  2. আহলুস সুন্নাহ ও মাতুরিদী আকিদার জোরালো প্রতিরক্ষা: মু’তাযিলা, জাহমিয়া ও বাতেনিয়াদের ভ্রান্ত যুক্তির দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে তিনি আহলুস সুন্নাহর আকিদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
  3. হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য উৎস: আহকাম সংক্রান্ত আয়াতে তিনি ফিকহে হানাফির দলিলসমূহ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে উপস্থাপন করেছেন এবং বিরুদ্ধবাদীদের যুক্তি খণ্ডন করেছেন।
  4. মধ্যম পন্থা ও সংক্ষিপ্ততা: অপ্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক কচকচানি পরিহার করে সাধারণ পাঠক ও শিক্ষার্থীদের বোধগম্য করে রচনা করেছেন।
  5. মুতাওয়াতির ক্বিরাআতের বর্ণনা: কেবল প্রসিদ্ধ ও মুতাওয়াতির ক্বিরাআতগুলোই এতে স্থান পেয়েছে, শায বা অপ্রমাণিত ক্বিরাআত তিনি বর্জন করেছেন।

লেখক কর্তৃক অনুসৃত পদ্ধতি ও মানহাজ (منهج المؤلف في تأليفه)

  1. তিনটি প্রধান উৎসের নির্যাস: ইমাম নাসাফী মূলত আল-বায়যাবীর তাফসির, জামাখশারীর আল-কাশশাফের বালাগাত অংশ এবং আবু মনসুর মাতুরিদীর তাফসিরের সারাংশ নিয়ে এ গ্রন্থটি সংকলন করেছেন।
  2. নাহব ও সরফের সূক্ষ্ম প্রয়োগ: কুরআনের জটিল বাক্যগঠন, হরফের তারকিব ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত সাবলীলভাবে সম্পন্ন করেছেন।
  3. কুরআন দ্বারা কুরআনের ব্যাখ্যা: এক আয়াতের ব্যাখ্যায় সংশ্লিষ্ট অন্য আয়াত ও সহীহ হাদিস দ্বারা সমন্বয় করেছেন।

উপসংহার

তাফসিরে মাদারিকুন তানজিল কুরআন অনুধাবনের এক অমূল্য রত্নভাণ্ডার। এর পরিচ্ছন্নতা ও শাস্ত্রীয় গভীরতা একে কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বে অমর করে রাখবে।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. দিরাসাতু তাফসিরিল কুরআনিল কারীম বিষয়ের প্রধান উদ্দেশ্য কী?

কুরআনের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ সূরা ও আয়াতের মূল আরবি পাঠ, বিশুদ্ধ তরজমা, শানে নুযুল, ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ এবং তাফসির শাস্ত্রের শীর্ষস্থানীয় ইমামগণের পদ্ধতি ও বৈশিষ্ট্য বিশদভাবে অধ্যয়ন করা।

২. সূরা আল-ফাতিহায় ‘বাসমালাহ’ কি সূরার স্বতন্ত্র আয়াত হিসেবে গণ্য?

ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে ‘বাসমালাহ’ সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াত; তবে ইমাম আবু হানিফা ও আহমদ (রহ.)-এর মতে এটি কুরআনের স্বতন্ত্র আয়াত যা সূরার বরকতের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে, কিন্তু ফাতিহার অংশ নয়।

৩. ইসলামে গিবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে কেন?

কারণ মৃত ব্যক্তি যেমন নিজের প্রতিরোধ করতে পারে না, তেমনি যার অনুপস্থিতিতে গিবত করা হয় সেও নিজের পক্ষ সমর্থন করতে পারে না; এটি চরম কাপুরুষোচিত ও ঘৃণ্য মানসিকতা।

৪. তাফসিরে বায়যাবীর মূল আকর্ষণ কী?

সংক্ষিপ্ত পরিসরে আরবি অলংকার শাস্ত্র (বালাগাত), ক্বিরাআতের সূক্ষ্মতম রহস্য এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদার অপূর্ব সমন্বয়।

৫. তাফসিরে নাসাফীর প্রধান স্বাতন্ত্র্য কী?

এ তাফসিরটি যাবতীয় ইসরাঈলী বানোয়াট রূপকথা ও দুর্বল রেওয়ায়েত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং হানাফি ফিকহের এক নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য দলিল।

৬. ওহী মাতলু ও ওহী গায়রে মাতলুর মাঝে পার্থক্য কী?

যে ওহীর ভাষা ও ভাব উভয়টিই সরাসরি আল্লাহর এবং যা নামাজে তিলাওয়াত করা হয় তা হলো ওহী মাতলু (আল-কুরআন); আর যে ওহীর মূল অর্থ আল্লাহর কিন্তু ভাষা রাসূলের নিজস্ব তা হলো ওহী গায়রে মাতলু (আল-হাদীস)।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *