ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (Islamic History & Culture) — ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিষয়: আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস (১৭৮৯ খ্রি. থেকে) [History of Modern Europe from 1789 A.D.] | বিষয় কোড: 205204
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ক-বিভাগ — রচনামূলক প্রশ্ন
(যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও | মান: ১৫ × ৪ = ৬০)
১। ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে ফ্রান্সের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থার বিবরণ দাও।
[Give an account of the Socio-Economic, Political and Religious conditions of France on the eve of the French Revolution.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব ছিল আধুনিক মানব ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। এটি মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক ঘুণেধরা প্রাচীন ব্যবস্থা (Ancien Régime)-র মূলে কুঠারাঘাত করে ইউরোপে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার বাণী প্রচার করে। বিপ্লবপূর্ব ফ্রান্সে বিদ্যমান তীব্র শোষণ ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাপনাই এই মহাবিপ্লবের জমিন তৈরি করেছিল।
১. রাজনৈতিক অবস্থা:
অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সে বুরবোঁ রাজাদের নিরঙ্কুশ ও স্বেচ্ছাচারী রাজতন্ত্র কায়েম ছিল। রাজা চতুর্দশ লুই গর্বভরে ঘোষণা করতেন, “আমিই রাষ্ট্র” (I am the State)। ষোড়শ লুই ছিলেন চরিত্রগতভাবে দুর্বল, অযোগ্য এবং তার অদূরদর্শী অহংকারী রানি মারি আঁতোয়ানেতের ক্রীড়নক। রাজকীয় ফরম্যান বা ‘লেত্রে দ্য ক্যাশে’ (Lettres de Cachet)-এর মাধ্যমে যেকোনো নাগরিককে বিনা বিচারে আজীবন বাস্তিল দুর্গে বন্দি রাখা যেত। রাজার ইচ্ছা বা খেয়ালখুশিই ছিল দেশের আইন। কোনো কার্যকর সংসদ বা পার্লামেন্ট ছিল না; জনপ্রতিনিধিত্বমূলক ‘স্টেটস জেনারেল’-এর অধিবেশন সুদীর্ঘ ১৭৫ বছর ধরে স্থগিত রাখা হয়েছিল।
২. সামাজিক অবস্থা:
ফ্রান্সের সমাজ প্রধানত তিনটি সম্প্রদায়ে বা ‘এস্টেট’ (Estates)-এ বিভক্ত ছিল:
- প্রথম সম্প্রদায় (যাজক সম্প্রদায় বা First Estate): দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১% হলেও দেশের এক-পঞ্চমাংশ উর্বর জমির মালিক ছিল তারা। তারা কোনো রাষ্ট্রীয় কর দিত না, উল্টো প্রজাদের কাছ থেকে ‘তিত’ (Tithe) নামক ধর্মীয় কর আদায় করত।
- দ্বিতীয় সম্প্রদায় (অভিজাত সম্প্রদায় বা Second Estate): জনসংখ্যার ১.৫% অভিজাতরা বিশাল ভূসম্পত্তি ভোগ করত এবং সমস্ত কর প্রদান থেকে মুক্ত ছিল। রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের সমস্ত শীর্ষ পদ তাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
- তৃতীয় সম্প্রদায় (Third Estate): অবশিষ্ট ৯৭% এর অধিক জনগোষ্ঠী—যাদের মধ্যে কৃষক, দিনমজুর, কারিগর এবং উদীয়মান শিক্ষিত বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণী (ডাক্তার, আইনজীবী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী) অন্তর্ভুক্ত ছিল। সমস্ত করের বোঝা এই শ্রেণীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, অথচ তাদের কোনো রাজনৈতিক অধিকার বা সামাজিক মর্যাদা ছিল না। দার্শনিক আবে সিয়েস যথার্থই লিখেছিলেন: “তৃতীয় সম্প্রদায় কী? সবকিছু। এ যাবত তারা কী ছিল? কিছুই না। তারা কী হতে চায়? কিছু একটা।”
৩. অর্থনৈতিক অবস্থা:
বিপ্লবপূর্ব ফ্রান্সের অর্থনীতি ছিল চরম বৈষম্য ও দেউলিয়াত্বে নিমজ্জিত। কৃষকদের তাদের আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ কর হিসেবে দিতে হতো—যার মধ্যে ছিল ভূমিকর (Taille), আয়কর (Vingtième), লবণের ওপর কর (Gabelle), এবং বাধ্যতামূলক বেগার শ্রম (Corvée)। অন্যদিকে ভোগবিলাসী রাজপ্রাসাদ ভার্সাইয়ের অমিতব্যয়িতা এবং আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ফ্রান্সের অংশগ্রহণের ফলে রাজকোষ সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে যায়। ১৭৮৮ সালের প্রচণ্ড খরা ও শিলাবৃষ্টিতে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বিপর্যয় ঘটলে প্যারিসে রুটির দাম আকাশচুম্বী হয় এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। অর্থনীতিবিদরা একে ‘অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও দেউলিয়াত্ব’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
৪. ধর্মীয় অবস্থা:
ক্যাথলিক চার্চ ছিল একটি শক্তিশালী সমান্তরাল রাষ্ট্রের মতো। উচ্চপদস্থ বিশপ ও আর্চবিশপরা ধর্মীয় অনুশাসনের তোয়াক্কা না করে বিলাসবহুল রাজসিক জীবনযাপন করতেন। নিম্নশ্রেণীর সাধারণ পাদ্রিরা দারিদ্র্যে জর্জরিত ছিলেন এবং চার্চের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিলেন। চার্চ বাকস্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধির চিন্তাকে কঠোরভাবে দমন করত।
২। মহাদেশীয় ব্যবস্থা কী? নেপোলিয়ন বোনাপার্টের পতনের জন্য এ ব্যবস্থা কতটুকু দায়ী ছিল? আলোচনা কর।
[What is the Continental System? How far was it responsible for the downfall of Napoleon Bonaparte? Discuss.]
উত্তরঃ
মহাদেশীয় ব্যবস্থা (Continental System)-এর ধারণা:
১৮০৫ সালে ট্রাফালগারের নৌযুদ্ধে ইংল্যান্ডের নৌবাহিনীর কাছে ফ্রান্সের শোচনীয় পরাজয়ের পর নেপোলিয়ন বোনাপার্ট অনুধাবন করেন যে, অপরাজেয় ব্রিটিশ নৌবহরকে সামরিকভাবে ধ্বংস করা অসম্ভব। তাই তিনি অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে ইংল্যান্ডকে পরাভূত করার এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে ব্রিটেনের যাবতীয় বাণিজ্যিক পণ্য ও জাহাজ প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে ইংল্যান্ডের অর্থনীতিকে ধ্বংস করার এই অর্থনৈতিক রণকৌশলই ইতিহাসে ‘মহাদেশীয় ব্যবস্থা’ (Continental System) বা মহাদেশীয় অবরোধ নামে পরিচিত।
নেপোলিয়ন ১৮০৬ সালের বার্লিন ডিক্রি, ১৮০৭ সালের মিলান ডিক্রি এবং ফন্টেনব্লু ডিক্রির মাধ্যমে ইউরোপের মিত্র ও অধীনস্থ সকল রাষ্ট্রের জন্য ব্রিটিশ পণ্য বর্জন বাধ্যতামূলক করেন। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ব্রিটেন ‘অর্ডার্স ইন কাউন্সিল’ (Orders in Council) জারি করে ফরাসি উপকূলে পাল্টা নৌ-অবরোধ ঘোষণা করে।
নেপোলিয়নের পতনে মহাদেশীয় ব্যবস্থার ভূমিকা ও দায়:
- ইউরোপীয়দের মৌলিক পণ্যের সংকট: ব্রিটেন ছিল শিল্পবিপ্লবের দেশ। চিনি, কফি, চা, আধুনিক সুতি বস্ত্র ও কলকারখানার যন্ত্রাংশের জন্য ইউরোপ সম্পূর্ণরূপে ব্রিটেনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফ্রান্স বিকল্প পণ্য সরবরাহ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ায় সমগ্র ইউরোপের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে।
- চোরাচালান ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা: দীর্ঘ ইউরোপীয় উপকূল পাহারা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত শক্তিশালী নৌবাহিনী নেপোলিয়নের ছিল না। ফলে সর্বত্র ব্যাপক আকারে ব্রিটিশ পণ্যের চোরাচালান শুরু হয়, যা বন্ধ করতে নেপোলিয়ন কঠোর পুলিশি দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনপ্রিয়তা হারান।
- পোপের সাথে বিরোধ: রোমের পোপ সপ্তম পিউস নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্রিটিশ পণ্য বর্জনে অস্বীকৃতি জানালে নেপোলিয়ন পোপ রাজ্য দখল করেন এবং পোপকে কারারুদ্ধ করেন। এতে ইউরোপের কোটি কোটি ক্যাথলিক খ্রিস্টান নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে চরম শত্রুতে পরিণত হয়।
- উপদ্বীপের যুদ্ধ (Peninsular War): পর্তুগাল মহাদেশীয় ব্যবস্থা মানতে অস্বীকৃতি জানালে নেপোলিয়ন স্পেন হয়ে পর্তুগাল আক্রমণ করেন এবং স্পেনের রাজাকে অপসারিত করে নিজের ভাই জোসেফ বোনাপার্টকে স্পেনের রাজা বানান। স্প্যানিশ জনগণ এর বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। এই উপদ্বীপীয় যুদ্ধে নেপোলিয়নের ৩ লক্ষ দক্ষ সৈন্য নিহত হয়। নেপোলিয়ন নিজেই আক্ষেপ করে বলেছিলেন: “স্প্যানিশ ক্ষত আমাকে ধ্বংস করেছে” (The Spanish ulcer ruined me)।
- মস্কো অভিযান (১৮১২): রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডার মহাদেশীয় ব্যবস্থা ত্যাগ করে ব্রিটিশ বাণিজ্যের জন্য রাশিয়ার বন্দর উন্মুক্ত করে দিলে ক্রুদ্ধ নেপোলিয়ন ৬ লক্ষ সৈন্যের সুবিশাল ‘গ্র্যান্ড আর্মি’ নিয়ে রাশিয়া আক্রমণ করেন। রাশিয়ার ‘পোড়ামাটি নীতি’ এবং প্রচণ্ড শীতের কবলে পড়ে তার ৫ লক্ষাধিক সৈন্য ধ্বংস হয়। এটিই নেপোলিয়নের সামরিক ক্ষমতার মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
উপসংহার: মহাদেশীয় ব্যবস্থা ছিল একটি অবাস্তব ও অর্থনৈতিকভাবে আত্মঘাতী পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়ন করতে গিয়েই নেপোলিয়ন একের পর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এবং অবশেষে ওয়াটারলুর প্রান্তরে তার সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে।
৩। ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত নীতিমালা কী ছিল? এসব নীতি কি সর্বক্ষেত্রে সমভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল?
[What were the accepted principles in Vienna Congress? Were these principles applied equally in everywhere?]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
১৮১৫ সালে ওয়াটারলুর যুদ্ধে নেপোলিয়নের চূড়ান্ত পতনের পর ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্বিন্যাস, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বিপ্লবোত্তর বিশৃঙ্খলা দূর করার উদ্দেশ্যে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহ্বান করা হয়। অস্ট্রিয়ার দূরদর্শী চ্যান্সেলর প্রিন্স মেটারনিখ ছিলেন এই সম্মেলনের মধ্যমণি ও সভাপতি।
ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত তিনটি মূল নীতি:
- ১. ন্যায্য অধিকার নীতি (Principle of Legitimacy): ফরাসি বিপ্লবপূর্ব (১৭৮৯ সালের পূর্ববর্তী) বৈধ রাজবংশগুলোকে পুনরায় তাদের পূর্বের সিংহাসন ও ভূখণ্ড ফিরিয়ে দেওয়া। এই নীতি অনুসারে ফ্রান্সে বুরবোঁ বংশের অষ্টাদশ লুইকে, স্পেনে বুরবোঁ রাজাকে এবং নেপলস ও হল্যান্ডের প্রাচীন রাজপরিবারকে পুনরায় সিংহাসনে বসানো হয়।
- ২. ক্ষতিপূরণ নীতি (Principle of Compensation): নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিজয়ী পরাশক্তিগুলোর যুদ্ধের ব্যয় ও ত্যাগ স্বীকারের জন্য ভূখণ্ড প্রদানের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা। যেমন: অস্ট্রিয়া ক্ষতিপূরণ হিসেবে ইতালির ভেনিস ও লোম্বার্ডি লাভ করে; রাশিয়া পোল্যান্ডের সিংহভাগ পায়; প্রুশিয়া লাভ করে রাইন উপত্যকা ও স্যাক্সনির অংশবিশেষ; এবং ব্রিটেন গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি যেমন মাল্টা, সিলন ও কেপ কলোনি লাভ করে।
- ৩. শক্তিসাম্য নীতি (Principle of Balance of Power): ইউরোপে যাতে ভবিষ্যতে কোনো একক দেশ (বিশেষ করে ফ্রান্স) আগ্রাসী হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য ফ্রান্সের চতুর্দিকে শক্তিশালী বাফার স্টেট (Buffer States) বা প্রতিরোধ বলয় গড়ে তোলা।
এসব নীতির সমপ্রয়োগ বিশ্লেষণ (নীতিমালা কি সর্বত্র সমভাবে প্রয়োগ হয়েছিল?):
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত নীতিমালা কোনোভাবেই সর্বক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বা সমভাবে প্রয়োগ করা হয়নি; বরং এটি ছিল বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থপর আপস ও লিপ্সার প্রতিফলন:
- স্বার্থপর সুবিধাবাদ: ন্যায্য অধিকার নীতি কেবল তখনই প্রয়োগ করা হয়েছিল যখন তা পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের অনুকূল ছিল। কিন্তু ছোট রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে তা অবলীলায় লঙ্ঘন করা হয়। যেমন: প্রাচীন ভেনিস ও জেনোয়া প্রজাতন্ত্রের বৈধ স্বাতন্ত্র্য ফিরিয়ে না দিয়ে যথাক্রমে অস্ট্রিয়া ও সার্ডিনিয়ার সাথে জোরপূর্বক জুড়ে দেওয়া হয়।
- পোল্যান্ড ও স্যাক্সনি সংকট: ন্যায্য অধিকার নীতির বুলি আওড়ালেও পোল্যান্ডের স্বাধীনতা পদদলিত করে রাশিয়া, প্রুশিয়া ও অস্ট্রিয়া তা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।
- জাতীয়তাবাদী আকাঙ্খার উপেক্ষা: ইতালি ও জার্মানির জনগণের ঐক্য ও জাতীয়তাবাদী চেতনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ইতালিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে বিভক্ত করে অস্ট্রিয়ার তাঁবেদারে পরিণত করা হয় এবং বেলজিয়ামকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ডাচদের অধীনস্থ নেদারল্যান্ডসের সাথে জুড়ে দেওয়া হয় (যা ১৮৩০ সালে তীব্র বিদ্রোহের জন্ম দেয়)।
৪। ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কারণ ও তাৎপর্য আলোচনা কর।
[Discuss the causes and significance of the February Revolution of 1848.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফ্রান্সে রাজা লুই ফিলিপের মধ্যপন্থী বুর্জোয়া রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থান ইতিহাসে ‘১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব’ নামে খ্যাত। এই বিপ্লবের ঢেউ সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল, যার ফলে ১৮৪৮ সালকে ইউরোপের ইতিহাসে ‘বিপ্লবের বছর’ (Year of Revolutions) বা ‘জনগণের বসন্ত’ (Spring of Nations) বলা হয়।
ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কারণসমূহ:
- ১. লুই ফিলিপের বুর্জোয়া পক্ষপাতিত্ব ও জনবিচ্ছিন্নতা: ১৮৩০ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা ‘নাগরিক রাজা’ লুই ফিলিপ কেবল ধনী পুঁজিপতি ও উচ্চ-বুর্জোয়াদের স্বার্থ রক্ষা করতেন। সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার ছিল না; মাত্র দুই লক্ষ ধনী ব্যক্তি ভোটাধিকার পেত।
- ২. প্রধানমন্ত্রী গিজোর প্রতিক্রিয়াশীল নীতি: প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া গিজো সংস্কারের চরম বিরোধী ছিলেন। ভোটাধিকার সম্প্রসারণের গণদাবি উঠলে তিনি ব্যঙ্গ করে দরিদ্র জনগণকে বলেছিলেন: “পরিশ্রম কর, সম্পদশালী হও, তবেই তোমরা ভোট দিতে পারবে!” (Enrichissez-vous)।
- ৩. সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার প্রসার ও শ্রমিক অসন্তোষ: ফ্রান্সে দ্রুত শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট কারখানার শ্রমিক শ্রেণী তীব্র শোষণ, স্বল্প মজুরি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানবেতর জীবনযাপন করছিল। লুই ব্লাঙ্ক ও সেন্ট সাইমনের সমাজতান্ত্রিক লেখনী শ্রমিকদের সংগঠিত করে তাদের মধ্যে কর্মের অধিকার ও মজুরি বৃদ্ধির দাবি জাগ্রত করে।
- ৪. জাতীয়তাবাদী গৌরবের অভাব: ফরাসি জনগণ বীরত্ব ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা ভালোবাসত। কিন্তু লুই ফিলিপ পররাষ্ট্রনীতিতে ব্রিটিশদের সাথে আপসকামিতা ও ভীরু নীতি গ্রহণ করায় ফরাসি জাতীয়তাবাদীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
- ৫. ভোজসভা আন্দোলন ও প্রত্যক্ষ স্ফুলিঙ্গ: রাজনৈতিক সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকায় বিরোধীরা ‘ভোজসভা’ (Banquet Campaign)-র ছদ্মবেশে সংস্কারের প্রচার চালাচ্ছিল। ১৮৪৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্যারিসে একটি বিশাল সংস্কারকামী ভোজসভা সরকার নিষিদ্ধ করলে শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও জনতা ব্যারিকেড তৈরি করে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বাধ্য হয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি লুই ফিলিপ সিংহাসন ত্যাগ করে ইংল্যান্ডে পলায়ন করেন।
ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের তাৎপর্য:
- দ্বিতীয় ফরাসি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: রাজতন্ত্র চিরতরে বিলুপ্ত করে ফ্রান্সে ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ (Second Republic) ঘোষণা করা হয় এবং প্রাপ্তবয়স্ক সকল পুরুষের সর্বজনীন ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়।
- শ্রমিক অধিকার ও জাতীয় কর্মশালা: সমাজতন্ত্রী নেতা লুই ব্লাঙ্কের প্রস্তাবনায় বেকারত্ব নিরসনে ‘জাতীয় কর্মশালা’ (National Workshops) স্থাপন করা হয়, যা আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ভিত্তি রচনা করে।
- ইউরোপজুড়ে মেটারনিখ ব্যবস্থার পতন: ভিয়েনায় গণবিদ্রোহের মুখে পরাক্রমশালী রক্ষণশীল রাজনীতির বরপুত্র মেটারনিখ ছদ্মবেশে ইংল্যান্ডে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। অস্ট্রিয়ার সাম্রাজ্যিক আধিপত্য চূর্ণবিচূর্ণ হয়।
- ইতালি ও জার্মানির জাতীয় জাগরণ: এই বিপ্লবের ধাক্কায় প্রুশিয়া, হাঙ্গেরি, বোহেমিয়া ও ইতালীয় রাজ্যগুলোতে উদারনৈতিক সংবিধান গৃহীত হয় এবং জার্মানি ও ইতালি একত্রীকরণের চূড়ান্ত পথ উন্মুক্ত হয়।
৫। কাউন্ট ক্যাভুর ও গ্যারিবন্ডির অবদান উল্লেখপূর্বক ইতালি একত্রীকরণের বিভিন্ন ধাপ পর্যালোচনা কর।
[Review the various phases of the Unification of Italy with reference to the contribution of Count Cavour and Garibaldi.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মেটারনিখের ভাষায় ইতালি ছিল কেবল একটি ‘ভৌগোলিক অভিব্যক্তি’ (Geographical Expression)। অগণিত ক্ষুদ্র সামন্ত রাজ্যে বিভক্ত এবং উত্তর ইতালি অস্ট্রিয়ার প্রত্যক্ষ শিকলে বন্দি ছিল। ইতালির জাতীয় জাগরণ বা ‘রিসরজিমেন্টো’ (Risorgimento)-র মাধ্যমে তিন মহানায়কের অবদানে ইতালি ঐক্যবদ্ধ হয়: মাৎসিনি (ইতালির আত্মা), ক্যাভুর (ইতালির মস্তিষ্ক) এবং গ্যারিবন্ডি (ইতালির তরবারি)। পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার রাজা ভিক্টর ইমানুয়েল ছিলেন এর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক।
কাউন্ট ক্যামিলো ক্যাভুরের অনন্য অবদান:
পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী কাউন্ট ক্যাভুর বাস্তববাদী রাজনীতি (Realpolitik)-র মাধ্যমে অনুধাবন করেন যে, বিদেশি শক্তির সামরিক সাহায্য ছাড়া কেবল আবেগী অভ্যুত্থান দিয়ে অস্ট্রিয়াকে ইতালি থেকে বিতাড়িত করা সম্ভব নয়।
- আন্তর্জাতিক কূটনীতি: ১৮৫৫ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের পক্ষে সৈন্য পাঠিয়ে ক্যাভুর ১৮৫৬ সালের প্যারিস শান্তি সম্মেলনে ইতালীয় মুক্তির প্রশ্নটিকে প্রথম আন্তর্জাতিক ইস্যুতে রূপান্তর করেন।
- প্লম্বিয়ার্সের গোপন চুক্তি (১৮৫৮): তিনি ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের সাথে গোপন চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী ফ্রান্স পিডমন্টকে সামরিক সহায়তা দেয় এবং ১৮৫৯ সালে অস্ট্রিয়াকে পরাজিত করে লোম্বার্ডি মুক্ত করে সার্ডিনিয়ার সাথে যুক্ত করা হয়।
- মধ্য ইতালির অন্তর্ভুক্তি: ১৮৬০ সালে পারমা, মোদেনা, টাস্কানি ও রোমানিয়ায় গণভোটের আয়োজন করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সেগুলোকে সার্ডিনিয়ার সাথে একীভূত করেন।
জোসেফ গ্যারিবন্ডির রোমাঞ্চকর সামরিক অবদান:
গ্যারিবন্ডি ছিলেন নির্ভীক দেশপ্রেমিক ও গেরিলা যুদ্ধের মহানায়ক। ১৮৬০ সালে তিনি তার বিশ্বখ্যাত ‘হাজার লাল কুর্তা বাহিনী’ (Red Shirts) নিয়ে এক অবিস্মরণীয় অভিযানে বের হন।
- মাত্র এক হাজার স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে তিনি সিসিলি দ্বীপে অবতরণ করেন এবং সেখানকার প্রতিক্রিয়াশীল বুরবোঁ রাজাকে উৎখাত করে সমগ্র সিসিলি জয় করেন।
- এরপর তিনি বীরদর্পে মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করে নেপলস জয় করেন। ব্যক্তিগত ক্ষমতার কোনো মোহ না দেখিয়ে এক নিঃস্বার্থ ত্যাগের নজির স্থাপন করে গ্যারিবন্ডি রাজা দ্বিতীয় ভিক্টর ইমানুয়েলকে সমগ্র দক্ষিণ ইতালির শাসনভার সমর্পণ করেন।
ইতালি একত্রীকরণের চূড়ান্ত ধাপসমূহ:
- ভেনিসিয়া লাভ (১৮৬৬): প্রুশিয়া ও অস্ট্রিয়ার যুদ্ধে (সাদোয়ার যুদ্ধ) ইতালি প্রুশিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়ে অস্ট্রিয়া থেকে ভেনিসিয়া পুনরুদ্ধার করে।
- রোম পুনরুদ্ধার ও পূর্ণ ঐক্য (১৮৭০): ১৮৭০ সালে ফ্রাঙ্কো-প্রুশীয় যুদ্ধ শুরু হলে তৃতীয় নেপোলিয়ন পোপের সুরক্ষায় নিয়োজিত ফরাসি সৈন্য রোম থেকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। সাথে সাথে ইতালীয় জাতীয় বাহিনী রোমে প্রবেশ করে এবং রোমকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐক্যবদ্ধ ইতালির রাজধানী ঘোষণা করা হয়।
৬। জার্মানির একত্রীকরণে বিসমার্কের অবদান মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the contributions of Bismark to unification of Germany.]
উত্তরঃ
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে জার্মানি ৩৯টি স্বাধীন ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। অস্ট্রো-প্রুশীয় দ্বন্দ্বের কারণে জার্মানির ঐক্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। ১৮৬২ সালে প্রুশিয়ার রাজা প্রথম উইলিয়াম অটো ফন বিসমার্ককে প্রুশিয়ার প্রধানমন্ত্রী (চ্যান্সেলর) পদে নিযুক্ত করেন। বিসমার্ক অনুধাবন করেছিলেন যে, বক্তৃতা বা সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রস্তাব দিয়ে নয়, বরং বাস্তব সামরিক শক্তিবলেই জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব। প্রুশিয়ার পার্লামেন্টে তিনি তার অবিস্মরণীয় ঘোষণা দেন: “সমকালীন যুগের মহৎ সমস্যাসমূহ বক্তৃতা বা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটাভুটিতে মীমাংসা হবে না, তা সমাধান করতে হবে রক্ত ও লৌহ দিয়ে” (Not by speeches and votes, but by Blood and Iron)।
বিসমার্কের ‘রক্ত ও লৌহ নীতি’ এবং তিনটি পরিকল্পিত যুদ্ধের মাধ্যমে জার্মানির ঐক্য:
- ডেনমার্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (১৮৬৪): শ্লেসউইগ ও হলস্টাইন ডাচিদুটিকে কেন্দ্র করে বিসমার্ক কূটকৌশলে অস্ট্রিয়াকে মিত্র বানিয়ে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে যৌথ যুদ্ধ ঘোষণা করেন। যুদ্ধে ডেনমার্ক পরাজিত হয় এবং গ্যাস্টিনের চুক্তি অনুযায়ী প্রুশিয়া লাভ করে শ্লেসউইগ এবং অস্ট্রিয়া পায় হলস্টাইন। এই বন্দোবস্তের মাধ্যমেই বিসমার্ক অস্ট্রিয়ার সাথে পরবর্তী যুদ্ধের বীজ বপন করেন।
- অস্ট্রো-প্রুশীয় যুদ্ধ বা সাদোয়ার যুদ্ধ (১৮৬৬): রাশিয়া, ফ্রান্স ও ইতালিকে কূটনৈতিক কৌশলে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ রেখে বিসমার্ক হলস্টাইনের অধিকার নিয়ে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। মাত্র সাত সপ্তাহের মধ্যে ১৮৬৬ সালের ৩ জুলাই সাদোয়ার যুদ্ধে প্রুশিয়ার আধুনিক বাহিনী অস্ট্রিয়াকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে। প্রাগের সন্ধির মাধ্যমে জার্মানি থেকে অস্ট্রিয়াকে চিরতরে বহিষ্কার করা হয় এবং প্রুশিয়ার নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘উত্তর জার্মান কনফেডারেশন’ (North German Confederation)।
- ফ্রাঙ্কো-প্রুশীয় যুদ্ধ (১৮৭০-১৮৭১): দক্ষিণ জার্মানির ক্যাথলিক রাজ্যগুলোকে একত্রিত করতে ফ্রান্সের সাথে একটি জাতীয়তাবাদী যুদ্ধের অপরিহার্য প্রয়োজন ছিল। বিসমার্ক স্প্যানিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত ‘এমস টেলিগ্রাম’ (Ems Telegram)-এর ভাষা চতুরতার সাথে বিকৃত করে সংবাদপত্রে প্রকাশ করেন, যা ফরাসিদের জাতীয় অহমিকায় আঘাত হানে। ক্ষুব্ধ ফ্রান্স ১৮৭০ সালে প্রুশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সেডানের যুদ্ধে ফরাসি বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন বন্দি হন।
চূড়ান্ত ফলাফল ও জার্মান সাম্রাজ্য ঘোষণা:
১৮৭১ সালের ১৮ জানুয়ারি পরাজিত ফ্রান্সের মাটিতে—প্যারিসের রাজপ্রাসাদ ভার্সাইয়ের ঐতিহাসিক ‘দর্পণ কক্ষে’ (Hall of Mirrors)—প্রুশিয়ার রাজা প্রথম উইলিয়ামকে অখণ্ড জার্মান সাম্রাজ্যের প্রথম কায়সার (সম্রাট) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ফ্রাঙ্কফুর্টের সন্ধির মাধ্যমে ফ্রান্স আলসাস ও লোরেন প্রদেশ জার্মানিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। বিসমার্কের অসাধারণ কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও লৌহদৃঢ় সংকল্পের ফলেই বিশ্ব মানচিত্রে পরাক্রমশালী আধুনিক জার্মানির জন্ম হয়।
৭। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর।
[Discuss the causes and consequences of the First World War.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত সমগ্র ইউরোপ ও বিশ্বজুড়ে যে ভয়াবহ সর্বগ্রাসী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তা মানব ইতিহাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বা ‘মহাযুদ্ধ’ (The Great War) নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে এক পক্ষে ছিল মিত্রশক্তি (ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইতালি ও পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) এবং অপর পক্ষে ছিল অক্ষশক্তি বা কেন্দ্রীয় পরাশক্তি (জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, অটোমান সাম্রাজ্য ও বুলগেরিয়া)।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রধান কারণসমূহ:
- ১. গোপন সামরিক চুক্তি ও জোটবদ্ধতা: বিসমার্কের আমল থেকেই ইউরোপে আত্মঘাতী জোট রাজনীতির সূত্রপাত হয়। একদিকে জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইতালির ‘ত্রিশক্তি চুক্তি’ (Triple Alliance – 1882); অন্যদিকে তার পাল্টায় ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার ‘ত্রিশক্তি আঁতাত’ (Triple Entente – 1907)। এর ফলে যেকোনো দুটি দেশের বিরোধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেওয়ার ফাঁদ তৈরি করে।
- ২. উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সামরিক প্রতিযোগিতা: প্যান-স্লাভ আন্দোলন, প্যান-জার্মান আন্দোলন এবং ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্ধ অহমিকা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে কায়সার দ্বিতীয় উইলিয়ামের আমলে জার্মানির বিশ্বব্যাপী আধিপত্যের উচ্চাকাঙ্ক্ষা (Weltpolitik) এবং ব্রিটিশ নৌ-আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে জার্মান নৌবহর সম্প্রসারণের প্রতিযোগিতা যুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে।
- ৩. সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক কাড়াকাড়ি: আফ্রিকা ও এশিয়ার কাঁচামাল ও বাজার দখলের সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা (মরক্কো সংকট, বলকান সংকট) পরাশক্তিগুলোর মধ্যে চরম অবিশ্বাস তৈরি করে।
- ৪. প্রত্যক্ষ কারণ (সেরাজেভো হত্যাকাণ্ড): ১৯১৪ সালের ২৮ জুন অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্দ এবং তার পত্নী সোফিয়া বসনিয়ার রাজধানী সেরাজেভো পরিদর্শনে গেলে সার্বিয়ার চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী সংগঠন ‘ব্ল্যাক হ্যান্ড’-এর সদস্য গ্যাভ্রিলো প্রিন্সিপ কর্তৃক গুলিতে নিহত হন। অস্ট্রিয়া সার্বিয়াকে দায়ী করে চরমপত্র দেয় এবং এক মাসের মাথায় ২৮ জুলাই সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। রাশিয়া সার্বিয়ার সাহায্যে সৈন্য সমাবেশ করলে জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে এবং ক্রমান্বয়ে সমগ্র ইউরোপ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সুদূরপ্রসারী ফলাফল:
- চারটি সুবিশাল সাম্রাজ্যের পতন: এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ আঘাতে রাশিয়ার রোমানভ সাম্রাজ্য, জার্মানির হোহেনজোলার্ন সাম্রাজ্য, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্য এবং তুরস্কের উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্যের চিরপতন ঘটে।
- অগণিত প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি: প্রায় ২ কোটি সামরিক ও বেসামরিক মানুষ নিহত হয় এবং ২ কোটির বেশি আহত ও পঙ্গু হয়। ইউরোপের শত শত বছরের অর্জিত সম্পদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
- ভার্সাই সন্ধি ও জার্মানির অপমান: ১৯১৯ সালের অপমানজনক ভার্সাই সন্ধির মাধ্যমে জার্মানির ওপর একক যুদ্ধাপরাধের বোঝা চাপানো হয়, তাদের ভূখণ্ড কেড়ে নেওয়া হয় এবং আকাশচুম্বী ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়, যা পরবর্তীতে হিটলারের উত্থান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ বপন করে।
- বিশ্বশক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন ও লিগ অব নেশনস: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর আধিপত্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। বিশ্বশান্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে ১৯২০ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে ‘লিগ অব নেশনস’ (League of Nations) প্রতিষ্ঠিত হয়।
৮। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার বিশেষ উল্লেখপূর্বক রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের (১৯১৭) তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর।
[Explain the significance of the Russian Socialist Revolution (1917) with special reference to the Five Year Plan.]
উত্তরঃ
রুশ বিপ্লবের ঐতিহাসিক তাৎপর্য:
১৯১৭ সালের নভেম্বরে (রুশ পুরনো ক্যালেন্ডারে অক্টোবর) ভি. আই. লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক দল রাশিয়ার তিন শতাব্দীর স্বৈরাচারী জারতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটিয়ে বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র (সোভিয়েত ইউনিয়ন) প্রতিষ্ঠা করে। এটি ছিল কার্ল মার্ক্সের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রথম বাস্তবায়ন, যা বিশ্বের শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণীকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করে। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক মুক্তির সংগ্রামে এই বিপ্লব অপ্রতিরোধ্য অনুপ্রেরণা জোগায়।
জোসেফ স্ট্যালিনের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (Five-Year Plans) ও অর্থনৈতিক সাফল্য:
লেনিনের মৃত্যুর পর ১৯২৮ সালে সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্ট্যালিন একটি পশ্চাৎপদ, কৃষিপ্রধান ও যুদ্ধবিধ্বস্ত রাশিয়াকে দ্রুততম সময়ে আধুনিক শিল্পোন্নত পরাশক্তিতে রূপান্তরের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (পিয়াতিলেতকা) প্রবর্তন করেন।
- ১. ভারী শিল্পের আধুনিকায়ন: প্রথম (১৯২৮-১৯৩২) ও দ্বিতীয় (১৯৩৩-১৯৩৭) পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় লোহা, ইস্পাত, কয়লা, বিদ্যুৎ ও রেলওয়ে অবকাঠামোর অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটানো হয়। ইউরোপের বৃহত্তম ড্যানিপার বাঁধ ও ম্যাগনিটোগর্স্ক ইস্পাত নগরী গড়ে ওঠে। মাত্র এক দশকের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন শিল্পোৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয় পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
- ২. যৌথ খামার ব্যবস্থা (Collectivization): কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক যান্ত্রিকীকরণ ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যক্তিগত জোতদারি খামারের অবসান ঘটিয়ে হাজার হাজার সমবায় যৌথ খামার (Kolkhoz) এবং রাষ্ট্রীয় খামার (Sovkhoz) প্রতিষ্ঠা করা হয়। কুলক বা ধনী কৃষকদের জমি বাজেয়াপ্ত করে শত শত আধুনিক ট্র্যাক্টর সরবরাহ করা হয়।
- ৩. বেকারত্ব দূরীকরণ ও শিক্ষার মহাবিপ্লব: যখন ১৯২৯ সালে ইউরোপ ও আমেরিকার পুঁজিবাদী বিশ্ব ভয়াবহ অর্থনৈতিক মহামন্দায় (Great Depression) নিমজ্জিত এবং কোটি কোটি মানুষ বেকার, তখন সোভিয়েত ইউনিয়নে কোনো বেকারত্ব ছিল না। প্রতিটি নাগরিকের খাদ্য, কর্মসংস্থান, অবৈতনিক আধুনিক শিক্ষা ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা অর্জিত হয়।
- ৪. সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: ভারী শিল্পের আত্মনির্ভরশীলতার কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসি জার্মানির বর্বর আক্রমণ প্রতিহত করে লাল ফৌজ বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল।
উপসংহার: রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং এর পরিকল্পিত অর্থনৈতিক নীতি প্রমাণ করেছিল যে, পুঁজিবাদের বাইরে রাষ্ট্রায়ত্ত পরিকল্পিত অর্থনীতির মাধ্যমে একটি অনুন্নত দেশও অত্যন্ত স্বল্পতম সময়ে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
খ বিভাগ — সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
(যে কোনো দুইটি প্রশ্নের উত্তর দাও | মান: ১০ × ২ = ২০)
৯। ফ্রান্সের ‘ত্রাসের রাজত্ব’ সম্পর্কে ধারণা দাও।
[Give an idea about the ‘Reign of Terror’ in France.]
উত্তরঃ
‘ত্রাসের রাজত্ব’ (Reign of Terror)-এর প্রেক্ষাপট:
১৭৮৯ সালের বিপ্লবের পর ১৭৯৩ সালে ফ্রান্স যখন একাধারে ইউরোপের সম্মিলিত রাজতান্ত্রিক শক্তির বৈদেশিক আক্রমণ এবং দেশের অভ্যন্তরে রাজতন্ত্রী ও প্রতিবিপ্লবীদের ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন, তখন প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করার চরম অজুহাতে জ্যাকোবিন নেতা ম্যাক্সিমিলিয়ান রোবসপিয়ারের নেতৃত্বে ১৭৯৩ সালের জুন থেকে ১৭৯৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ফ্রান্সে যে চরম দমনমূলক শাসন কায়েম করা হয়, তাকে ইতিহাসে ‘ত্রাসের রাজত্ব’ (Reign of Terror) বলা হয়।
মূল বৈশিষ্ট্য ও পরিসমাপ্তি: রোবসপিয়ার ‘জননিরাপত্তা কমিটি’ (Committee of Public Safety)-র মাধ্যমে সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। ‘সন্দেহভাজনদের আইন’ পাস করে যেকোনো ভিন্নমতাবলম্বীকে প্রতিবিপ্লবী আখ্যা দিয়ে বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হতো। সুদীর্ঘ ১৪ মাসে রানি মারি আঁতোয়ানেত এবং উদারপন্থী দাঁতোসহ প্রায় ৪০,০০০ নিরপরাধ মানুষকে গিলোটিনে শিরশ্ছেদ করে হত্যা করা হয়। অবশেষে রোবসপিয়ারের চরমপন্থী উন্মাদনায় ভীত হয়ে আইনসভা তাকেই বন্দি করে এবং ১৭৯৪ সালের ২৮ জুলাই রোবসপিয়ারকে গিলোটিনে হত্যা করার মধ্য দিয়ে এই বিভীষিকাময় ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটে।
১০। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের পরিচয় দাও।
[Introduce Florence Nightingale.]
উত্তরঃ
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল (১৮২০-১৯১০):
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ছিলেন আধুনিক নার্সিং বা সেবাব্রতের প্রবাদপ্রতিম অগ্রদূত, সমাজ সংস্কারক ও পরিসংখ্যানবিদ। তিনি ১৮২০ সালের ১২ মে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে এক সম্ভ্রান্ত ব্রিটিশ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
ঐতিহাসিক অবদান: ১৮৫৩-১৮৫৬ সালে সংঘটিত ক্রিমিয়ার যুদ্ধে আহত ব্রিটিশ সৈন্যদের মানবেতর চিকিৎসার কথা শুনে তিনি ৩৮ জন সেবিকার একটি দল নিয়ে তুরস্কের স্কুটারির সামরিক হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে নোংরা পরিবেশ, সংক্রমণ ও খাদ্য সংকটের মধ্যে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি হাসপাতালের স্বাস্থ্যবিধি আমূল পরিবর্তন করেন, যার ফলে আহত সৈন্যদের মৃত্যুর হার ৪২% থেকে মাত্র ২%-এ নেমে আসে। গভীর রাতে হাতে লণ্ঠন নিয়ে তিনি হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে ঘুরে ঘুরে অসুস্থ সৈনিকদের সেবা ও সান্ত্বনা দিতেন। একারণে সৈনিকরা তাকে ভালোবেসে ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ (The Lady with the Lamp) উপাধিতে ভূষিত করে। যুদ্ধশেষে তিনি লন্ডনে ‘নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল ফর নার্সেস’ প্রতিষ্ঠা করে নার্সিংকে একটি বৈজ্ঞানিক ও সম্মানিত পেশায় উন্নীত করেন। তার জন্মদিনটি বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক নার্স দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
১১। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বিবৃত কর।
[Narrate the history of the establishment of the United Nations.]
উত্তরঃ
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পটভূমি:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত ‘লিগ অব নেশনস’-এর ব্যর্থতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহাবিপর্যয় সংঘটিত হলে বিশ্বনেতারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের তাগিদ অনুভব করেন।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক পদক্ষেপ:
- লন্ডন ঘোষণা (১৯৪১): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিরুদ্ধে পারস্পরিক সহযোগিতা ও স্থায়ী শান্তির অঙ্গীকার।
- আটলান্টিক সনদ (১৯৪১): মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল যুদ্ধোত্তর ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার ঐতিহাসিক আটলান্টিক সনদে স্বাক্ষর করেন।
- জাতিসংঘ ঘোষণা (১৯৪২): ওয়াশিংটন সম্মেলনে ২৬টি মিত্র রাষ্ট্র কর্তৃক প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ‘United Nations’ (জাতিসংঘ) নামটি ব্যবহার করা হয়, যার প্রস্তাবক ছিলেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট।
- তেহরান ও ডাম্বারটন ওকস সম্মেলন (১৯৪৩-১৯৪৪): বৃহৎ চার পরাশক্তি (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন) মিলে ভবিষ্যৎ জাতিসংঘের রূপরেখা ও নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো চূড়ান্ত করে।
- ইয়ান্টা সম্মেলন (১৯৪৫): বৃহৎ শক্তিগুলোর জন্য নিরাপত্তা পরিষদে ‘ভেটো ক্ষমতা’ (Veto Power) প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
- সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলন ও চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৫ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত সান ফ্রান্সিসকোয় ৫০টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের মূল চার্টার প্রণয়ন করেন। অবশেষে পোল্যান্ডসহ ৫১টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পর ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ (United Nations) আত্মপ্রকাশ করে। একারণে প্রতি বছর ২৪ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী ‘জাতিসংঘ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
১২। টীকা লিখ: (ক) কোড নেপোলিয়ন; (খ) বেনিতো মুসোলিনী।
[Write short notes: (a) The Code Napoleon; (b) Benito Mussolini.]
উত্তরঃ
(ক) কোড নেপোলিয়ন (The Code Napoleon):
নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক স্থায়ী সংস্কার হলো ১৮০৪ সালে প্রবর্তিত তার বেসামরিক আইনবিধি বা ‘কোড নেপোলিয়ন’। বিপ্লবের পূর্বে ফ্রান্সে প্রায় ৪০০ ধরনের প্রাচীন ও পরস্পরবিরোধী সামন্ত আইন প্রচলিত ছিল। নেপোলিয়ন বিজ্ঞ আইনবিদদের সমন্বয়ে গঠিত কমিশনের মাধ্যমে সমগ্র ফ্রান্সের জন্য একটি সমন্বিত, সংক্ষিপ্ত ও আধুনিক আইনবিধি প্রণয়ন করেন, যা ২,২৮১টি ধারায় বিভক্ত ছিল। এর মূল নীতি ছিল: আইনের চোখে সকল নাগরিকের সমান অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি, এবং সামন্ততান্ত্রিক বিশেষ সুবিধার বিলোপ। নেপোলিয়ন সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত অবস্থায় যথার্থই বলেছিলেন: “আমার চল্লিশটি সামরিক বিজয়ের গৌরব ওয়াটারলু ধুয়ে মুছে দেবে, কিন্তু যা চিরকাল বেঁচে থাকবে তা হলো আমার সিভিল কোড।”
(খ) বেনিতো মুসোলিনী (Benito Mussolini):
বেনিতো মুসোলিনী (১৮৮৩-১৯৪৫) ছিলেন ইতালির কুখ্যাত ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং কমিউনিস্ট বিপ্লবের জুজুকে কাজে লাগিয়ে তিনি ১৯১৯ সালে মিলানে ‘ফ্যাসিস্ট পার্টি’ প্রতিষ্ঠা করেন। তার আধা-সামরিক ‘কালো কুর্তা বাহিনী’ (Black Shirts) দেশজুড়ে বিরোধী দল ও শ্রমিক আন্দোলনকে নির্মমভাবে দমন করে। ১৯২২ সালের অক্টোবরে তিনি হাজার হাজার সশস্ত্র ফ্যাসিস্ট নিয়ে রোম অভিমুখে ঐতিহাসিক পদযাত্রা (March on Rome) করেন। দুর্বল রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইমানুয়েল ভীত হয়ে মুসোলিনীকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। ক্ষমতায় বসে তিনি সমস্ত রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে ‘ইল দুচে’ (Il Duce বা সর্বাধিনায়ক) উপাধি নিয়ে একচ্ছত্র একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের মিত্র হিসেবে যোগ দেন এবং অক্ষশক্তির পরাজয়ের মুখে ১৯৪৫ সালের ২৮ এপ্রিল ইতালীয় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের হাতে নিহত হন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ফরাসি বিপ্লব কোন সালে সংঘটিত হয় এবং এর মূল স্লোগান কী ছিল?
উত্তর: ফরাসি বিপ্লব ১৭৮৯ সালে সংঘটিত হয় এবং এর অবিস্মরণীয় মূল স্লোগান ছিল—’সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা’ (Liberty, Equality, Fraternity)।
প্রশ্ন ২: মহাদেশীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের পেছনে নেপোলিয়নের মূল লক্ষ্য কী ছিল?
উত্তর: সামরিক নৌযুদ্ধে অপরাজয়ী ব্রিটেনের ওপর সমগ্র ইউরোপীয় মূল ভূখণ্ডের বাণিজ্য অবরোধ চাপিয়ে অর্থনৈতিকভাবে ব্রিটেনকে পর্যুদস্ত করা।
প্রশ্ন ৩: ইউরোপীয় ইতিহাসের কোন বছরকে ‘বিপ্লবের বছর’ বলা হয়?
উত্তর: ১৮৪৮ সালকে ‘বিপ্লবের বছর’ (Year of Revolutions) বলা হয়, কারণ এ বছর ফ্রান্সের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের প্রভাবে সমগ্র ইউরোপজুড়ে গণঅভ্যুত্থান ছড়িয়ে পড়েছিল।
প্রশ্ন ৪: জার্মানির একত্রীকরণে অটো ফন বিসমার্কের অনুসৃত বিখ্যাত নীতির নাম কী?
উত্তর: বিসমার্কের অনুসৃত বিখ্যাত নীতির নাম ছিল ‘রক্ত ও লৌহ নীতি’ (Blood and Iron Policy)।
প্রশ্ন ৫: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ (স্ফুলিঙ্গ) কোনটি ছিল?
উত্তর: ১৯১৪ সালের ২৮ জুন বসনিয়ার সেরাজেভো শহরে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্দ এবং তার স্ত্রীর হত্যাকাণ্ড ছিল যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ।
প্রশ্ন ৬: ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল কোন যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন?
উত্তর: ১৮৫৩-১৮৫৬ সালের ক্রিমিয়ার যুদ্ধে আহত সৈন্যদের নিঃস্বার্থ নার্সিং সেবার মাধ্যমে তিনি ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।