ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (Islamic History & Culture) — ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিষয়: উসমানীয় সাম্রাজ্য, পারস্য ও আফগানিস্তানের ইতিহাস (১২৫৮-১৯১৯ খ্রি.) | বিষয় কোড: 205205
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ক বিভাগ — রচনামূলক প্রশ্ন
(যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও | মান: ১৫ × ৪ = ৬০)
১। তুর্কি কারা? এশিয়া মাইনরে ওসমানীয় বংশ প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত বর্ণনা কর।
[Who are the Turks? Describe the founding history of Othoman dynasty in Asia Minor.]
উত্তরঃ
তুর্কিদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়:
তুর্কিরা হলো মধ্য এশিয়ার আলতাই পর্বতমালা ও স্টেপ তৃণভূমি অঞ্চলের এক দুর্ধর্ষ, যাযাবর ও যুদ্ধকুশলী অশ্বারোহী জাতি। নৃতাত্ত্বিকভাবে তারা ইউরাল-আলতাই মানবগোষ্ঠীর ওঘুজ (Ghuzz/Oghuz) উপজাতির অন্তর্ভুক্ত। অষ্টম থেকে দশম শতকে ইসলাম গ্রহণের পর তারা বীরত্ব, আনুগত্য এবং সামরিক নৈপুণ্যের কারণে ইসলামি বিশ্বের প্রধান সামরিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। পরবর্তীতে সেলজুক তুর্কিরা মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল সাম্রাজ্য কায়েম করে এবং সেলজুকদের পতনের পর তাদেরই একটি শাখা ‘উসমানীয় তুর্কি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিশ্ব ইতিহাস শাসন করে।
এশিয়া মাইনরে ওসমানীয় বংশ প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত:
- মঙ্গোল আক্রমণ ও আরতুগ্রুলের হিজরত: ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে চেঙ্গিস খানের দুর্ধর্ষ মঙ্গোল বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের মুখে ওঘুজ তুর্কিদের ‘কায়ি’ (Kayi) গোত্র প্রধান সুলাইমান শাহের নেতৃত্বে মাতৃভূমি ত্যাগ করে পশ্চিম দিকে হিজরত করে। সুলাইমান শাহের মৃত্যুর পর তার যোগ্য পুত্র আরতুগ্রুল গাজী চারশত অশ্বারোহী পরিবার নিয়ে এশিয়া মাইনরে (বর্তমান তুরস্কে) প্রবেশ করেন।
- সেলজুক সুলতানের সাহায্য ও জায়গির লাভ: এশিয়া মাইনরে তখন কোনিয়ার সেলজুক সাম্রাজ্য বাইজেন্টাইন ও মঙ্গোলদের চাপে বিপর্যস্ত ছিল। আরতুগ্রুল সেলজুক সুলতান আলাউদ্দীন কায়কোবাদের পক্ষে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিজয় এনে দেন। কৃতজ্ঞ সুলতান আরতুগ্রুলকে বাইজেন্টাইন সীমান্তের নিকটবর্তী ‘সোগুত’ (Sogut) ও এসকিশেহির অঞ্চলের পার্বত্য এলাকা জায়গির হিসেবে দান করেন।
- উসমান গাজীর উত্থান ও স্বাধীনতা ঘোষণা: ১২৮১ সালে আরতুগ্রুলের মৃত্যুর পর তার দূরদর্শী পুত্র উসমান গাজী (Osman I) গোত্রপ্রধান নির্বাচিত হন। তিনি বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্গ জয় করে সীমান্ত বিস্তার করতে থাকেন। ১২৯৯ খ্রিষ্টাব্দে মঙ্গোলদের হাতে কোনিয়ার সেলজুক সালতানাতের চূড়ান্ত পতন ঘটলে উসমান গাজী নিজ নামে খুতবা পাঠ ও মুদ্রা জারি করে এশিয়া মাইনরে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন সালতানাতের ঘোষণা দেন। এই প্রতিষ্ঠাতা উসমান গাজীর নামানুসারেই এই সুবিশাল সাম্রাজ্যের নাম হয় ‘উসমানীয় সাম্রাজ্য’ (Ottoman Empire)।
- সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব: উসমানীয় বংশ সুদীর্ঘ ছয় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে (১২৯৯-১৯২২ খ্রি.) অক্ষুণ্ণ থেকে তিনটি মহাদেশে (এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা) ইসলামি খিলাফতের পতাকা সমুন্নত রেখেছিল।
২। জানিসারি বাহিনীর বিশেষ উল্লেখপূর্বক ওরখানের সামরিক কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the military achievements of Orkhan with special reference to the Janissary force.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
উসমান গাজীর মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র সুলতান ওরখান (১৩২৬-১৩৫৯ খ্রি.) সিংহাসনে আরোহণ করেন। উসমান যেখানে একটি ক্ষুদ্র যাযাবর আমিরাত গড়ে তুলেছিলেন, ওরখান তাকে একটি সুসংগঠিত, শক্তিশালী ও স্থায়ী ইউরোপ-কাঁপানো সাম্রাজ্যে রূপান্তর করেন।
সুলতান ওরখানের সামরিক কৃতিত্ব:
- ১. বুরসা বিজয় ও নতুন রাজধানী: সিংহাসনে বসেই ওরখান বাইজেন্টাইনদের সুদৃঢ় নগরী ‘বুরসা’ (Bursa) অধিকার করেন এবং একে উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রথম গৌরবময় রাজধানীতে পরিণত করেন। এরপর তিনি নিকোমিডিয়া ও নিকিয়া (ইজনিক) দখল করে সমগ্র এশিয়া মাইনর থেকে বাইজেন্টাইনদের হটিয়ে দেন।
- ২. ইউরোপে উসমানীয়দের প্রথম পদার্পণ (গ্যালিপলি অভিযান): ১৩৫৪ সালে ওরখানের বীর পুত্র সুলাইমান পাশা দার্দানেলিস প্রণালী পার হয়ে ইউরোপীয় অংশের গ্যালিপলি উপদ্বীপের জিম্পে দুর্গ জয় করেন। এর ফলে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে উসমানীয়দের চিরস্থায়ী সামরিক অগ্রযাত্রার সিংহদ্বার উন্মোচিত হয়।
বিশ্বখ্যাত জানিসারি বাহিনী (Janissary Force) গঠন:
ওরখানের সামরিক সংস্কারের সর্বশ্রেষ্ঠ ও যুগান্তকারী কীর্তি হলো নিয়মিত স্থায়ী পদাতিক ‘জানিসারি বাহিনী’ গঠন। তুর্কি ভাষায় একে বলা হতো ‘ইয়েনি চেরি’ (Yeni Ceri), যার অর্থ ‘নতুন সৈন্য’ (New Soldiers)।
- গঠন প্রক্রিয়া (দেবশিরমে ব্যবস্থা): বলকান ও খ্রিস্টান প্রজাদের মধ্য থেকে প্রতিভাবান ও সুঠাম দেহের কিশোরদের ‘দেবশিরমে’ (Devshirme) ব্যবস্থার মাধ্যমে বাছাই করে আনা হতো। তাদের ইসলাম ধর্ম ও উন্নত নৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত করা হতো।
- কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ ও আনুগত্য: এই যুবকদের পরিবার ও সাধারণ সমাজ থেকে পৃথক করে বিশেষ ব্যারাকে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ, তীরন্দাজি, অসিযুদ্ধ ও পরবর্তীতে আধুনিক বন্দুক চালনায় পারদর্শী করা হতো। তারা সুলতানের ব্যক্তিগত রক্ষীবাহিনী হিসেবে কাজ করত এবং কেবল সুলতানের প্রতিই তাদের নিরঙ্কুশ আনুগত্য থাকত। তাদের বিয়ে করা ও ব্যবসা করা নিষিদ্ধ ছিল।
- যুদ্ধক্ষেত্রে ভূমিকা: জানিসারিরা ছিল সমকালীন বিশ্বের প্রথম পেশাদার স্থায়ী সেনাবাহিনী (Standing Army)। কনস্টান্টিনোপল বিজয়, কসোভোর যুদ্ধ এবং ইউরোপের প্রতিটি প্রধান রণাঙ্গনে জানিসারিদের অদম্য শৃঙ্খলা ও আত্মোৎসর্গকারী বীরত্বই উসমানীয়দের অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করেছিল।
৩। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ কর্তৃক কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের কারণসমূহ আলোচনা কর।
[Discuss the causes of the conquest of constantinople by Muhammad the second.]
উত্তরঃ
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
১৪৫৩ সালের ২৯ মে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ (মুহাম্মদ আল-ফাতিহ) দীর্ঘ ৫৩ দিন অবরোধের পর অভেদ্য রোমান নগরী কনস্টান্টিনোপল জয় করেন। এর মাধ্যমে সহস্রাব্দ প্রাচীন বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্যের চিরপতন ঘটে এবং মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটে আধুনিক যুগের সূচনা হয়।
কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের প্রধান কারণসমূহ:
- ১. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অর্জনের গভীর আকাঙ্ক্ষা: রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিস শরিফে ইরশাদ করেছিলেন: “অবশ্যই তোমরা কুসতুনতুনিয়া (কনস্টান্টিনোপল) বিজয় করবে; কতই না উত্তম সেই সেনাপতি এবং কতই না উত্তম সেই সৈন্যদল!” (মুসনাদে আহমাদ)। মুসলিম উম্মাহর আট শতাব্দীর এই পবিত্র স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই ছিল তরুণ সুলতান মুহাম্মদের প্রধান আধ্যাত্মিক প্রেরণা।
- ২. ভৌগোলিক ও কৌশলগত সংহতি: তৎকালীন উসমানীয় সাম্রাজ্যের এক অংশ ছিল এশিয়ায় এবং অপর অংশ বলকান অঞ্চলে (ইউরোপে)। কিন্তু এই দুই অংশের কেন্দ্রস্থলে বিষফোঁড়ার মতো অবস্থান করছিল খ্রিস্টান বাইজেন্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপল। ফলে উসমানীয়দের এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে সেনা ও রসদ পাঠাতে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে হতো। সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য এটি দখল ছিল অপরিহার্য।
- ৩. বৈরী ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু: বাইজেন্টাইন সম্রাটরা কনস্টান্টিনোপলে বসে উসমানীয় শাহজাদাদের আশ্রয় দিয়ে সিংহাসনের বিরুদ্ধে উসকানি দিত এবং ইউরোপীয় পোপ ও রাজাদের একত্রিত করে ক্রুসেড যুদ্ধ বাধানোর অবিরাম চক্রান্ত চালাত।
- ৪. আন্তর্জাতিক জলপথ ও বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ: কৃষ্ণসাগর ও ভূমধ্যসাগরের সংযোগকারী বসফরাস প্রণালীর মুখে অবস্থিত হওয়ায় কনস্টান্টিনোপল ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান স্বর্ণদ্বার। এর নিয়ন্ত্রণ উসমানীয় অর্থনীতিকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে।
- ৫. সুলতানের উন্নত সমরাস্ত্র ও সামরিক প্রস্তুতি: সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ বসফরাসের তীরে ‘রুমেলি হিসার’ দুর্গ নির্মাণ করেন, হাঙ্গেরীয় প্রকৌশলী আরবানকে দিয়ে বিশাল আকৃতির কামান ‘শাহি কামান’ (Great Turkish Bombard) তৈরি করান এবং এক রাতে স্থলপথ দিয়ে কাঠের ওপর চর্বি মেখে ৭০টি যুদ্ধজাহাজ গোল্ডেন হর্নের জলে নামিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
৪। সুলতান তৃতীয় সেলিমের বিভিন্ন সংস্কারসমূহ পর্যালোচনা কর।
[Discuss the various reform of Sultan Salim the Third.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার কাছে ধারাবাহিক পরাজয় এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির কারণে উসমানীয় সাম্রাজ্য যখন দ্রুত ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছিল, তখন ১৭৮৯ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন প্রগতিশীল সুলতান তৃতীয় সেলিম (১৭৮৯-১৮০৭ খ্রি.)। তিনিই প্রথম ইউরোপীয় ধাঁচে আধুনিক সংস্কারের সূচনা করেন, যা ইতিহাসে ‘নিজাম-ই-জাদিদ’ (Nizam-i-Jedid) বা ‘নতুন ব্যবস্থা’ নামে খ্যাত।
সুলতান তৃতীয় সেলিমের সংস্কারসমূহ:
- সামরিক সংস্কার (নিজাম-ই-জাদিদ সেনা গঠন): দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিদ্রোহপ্রবণ জানিসারি বাহিনীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তিনি ফরাসি সামরিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সম্পূর্ণ আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত, সুশৃঙ্খল ও ইউরোপীয় পোশাকে সজ্জিত নতুন পদাতিক বাহিনী ‘নিজাম-ই-জাদিদ’ গড়ে তোলেন। ১৮০১ সালে মিসরের আক্কায় এই বাহিনী নেপোলিয়নের ফরাসি সেনাবহরকে প্রতিহত করে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দেয়।
- নৌবাহিনী ও তোপখানার আধুনিকায়ন: তিনি আধুনিক তোপখানা (Tophane) সংস্কার করেন এবং সমকালীন প্রকৌশল বিদ্যা শিক্ষার জন্য ‘ইম্পেরিয়াল নৌ প্রকৌশল বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। নতুন যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করে নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করা হয়।
- অর্থনৈতিক সংস্কার: নতুন সামরিক সংস্কারের বিপুল ব্যয় নির্বাহের জন্য তিনি ‘ইরাদ-ই-জাদিদ’ (নতুন রাজস্ব তহবিল) গঠন করেন। অপ্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় ভাতা বন্ধ করেন এবং কর ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।
- কূটনৈতিক আধুনিকায়ন: প্রথমবারের মতো লন্ডন, প্যারিস, ভিয়েনা ও বার্লিনে উসমানীয় সাম্রাজ্যের স্থায়ী দূতাবাস স্থাপন করা হয়। তরুণ তুর্কি কর্মকর্তাদের ইউরোপীয় ভাষা ও কূটনীতি শেখার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়।
সংস্কারের পরিণতি: কট্টরপন্থী উলামা শ্রেণী এবং বিশেষ করে স্বার্থান্বেষী জানিসারি বাহিনী এই ইউরোপীয় সংস্কারকে তাদের স্বার্থের ওপর হুমকি মনে করে এক রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ (কাবাকচি মুস্তফা বিদ্রোহ) ঘটায়। ১৮০৭ সালে সুলতান সেলিমকে ক্ষমতাচ্যুত ও পরবর্তীতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তবে তার এই সংস্কারই পরবর্তীতে মাহমুদ ও তানজিমাত আন্দোলনের পথ উন্মুক্ত করেছিল।
৫। তানজিমাতের ধারণা দাও। এটি কীভাবে ওসমানীয় সালতানাতের সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থাকে প্রভাবিত করেছিল?
[Give an idea of Tanzimat. How did it effect the socio-political conditions of the Ottoman Sultanate?]
উত্তরঃ
তানজিমাত (Tanzimat)-এর ধারণা:
‘তানজিমাত’ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ ‘পুনর্গঠন’, ‘সংস্কার’ বা ‘পুনর্বিন্যাস’। উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন রোধ এবং ইউরোপীয় আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ১৮৩৯ থেকে ১৮৭৬ সাল পর্যন্ত প্রায় চার দশক ধরে সুলতান আবদুল মজিদ ও সুলতান আবদুল আজিজের আমলে উসমানীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা, আইন, বিচার ও প্রশাসনে যে প্রাতিষ্ঠানিক মহাবিপ্লব সাধিত হয়, তাকে উসমানীয় ইতিহাসে ‘তানজিমাত যুগ’ বলা হয়।
তানজিমাতের মূল ভিত্তি ছিল দুটি ঐতিহাসিক রাজকীয় ফরমান:
- ১. খত-ই-শরিফ গুলহানে (১৮৩৯): পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুস্তফা রশিদ পাশার উদ্যোগে ঘোষিত এই সনদে সাম্রাজ্যের সকল নাগরিকের—ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে—জানমাল, ইজ্জতের নিরাপত্তা এবং কর ব্যবস্থার সমতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়।
- ২. খত-ই-হুমায়ুন (১৮৫৬): ক্রিমিয়ার যুদ্ধের পর ইউরোপীয় শক্তির চাপে অমুসলিম খ্রিস্টান ও ইহুদি প্রজাদের মুসলিমদের সাথে সমমর্যাদা, সরকারি চাকরিতে প্রবেশ এবং ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণের অবাধ অধিকার প্রদান করা হয়।
সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ওপর তানজিমাতের প্রভাব:
- নাগরিক সমতা ও ধর্মনিরপেক্ষ আইনের সূচনা: প্রাচীন ‘মিল্লাত ব্যবস্থা’র পরিবর্তন ঘটে সমগ্র সাম্রাজ্যের সকল অধিবাসীকে ‘উসমানীয় নাগরিক’ (Ottoman Citizenship) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ইউরোপীয় ধাঁচে বাণিজ্যিক আইন ও ফৌজদারি আইন এবং ইসলামি দেওয়ানি বিধির সমন্বয়ে বিখ্যাত আইন সংকলন ‘মাজাল্লা’ (Mecelle) প্রণীত হয়।
- প্রশাসনিক ও বিচারিক আধুনিকায়ন: একটি পেশাদার আধুনিক আমলাতন্ত্র গড়ে ওঠে। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক মন্ত্রীপরিষদ ব্যবস্থা গঠিত হয় এবং সাধারণ আদালতের পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষ ‘নিজামিয়ে আদালত’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
- শিক্ষার ধর্মনিরপেক্ষ রূপান্তর: মাদরাসার পাশাপাশি আধুনিক ইউরোপীয় পাঠ্যক্রমের প্রাইমারি, মাধ্যমিক এবং ১৮৭০ সালে ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয় (দারুল ফুনুন) প্রতিষ্ঠিত হয়। চিকিৎসা ও প্রকৌশল শিক্ষার আধুনিকায়ন ঘটে।
- জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া ও অর্থনৈতিক ঋণগ্রস্ততা: তানজিমাতের ফলে ইউরোপীয় হস্তক্ষেপ হ্রাস পায়নি, উল্টো অমুসলিমরা স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে বলকান জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহ জোরদার করে। তাছাড়া অতিরিক্ত আধুনিকায়নের ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে উসমানীয় সাম্রাজ্য ইউরোপীয় ব্যাংকগুলোর কাছে বিপুল বৈদেশিক ঋণের ফাঁদে পড়ে ‘ইউরোপের রুগ্ণ মানুষ’ (Sick Man of Europe)-এ পরিণত হয়।
৬। যুব তুর্কি কারা? তুরস্কের যুব তুর্কি আন্দোলনের বিবরণ দাও।
[Who are the Young Turks? Give an account of the Young Turks movement in Turkey.]
উত্তরঃ
যুব তুর্কিদের পরিচয়:
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের কঠোর স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্র ও সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে আধুনিক ইউরোপীয় শিক্ষা ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত একদল তরুণ তুর্কি বুদ্ধিজীবী, সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যে রাজনৈতিক সংস্কারবাদী জোট গড়ে তোলে, ইতিহাসে তাদের ‘যুব তুর্কি’ (Young Turks) বলা হয়। তাদের প্রধান রাজনৈতিক সংগঠন ছিল ‘ইত্তিহাদ ভে তেরাক্কি’ (Committee of Union and Progress – CUP)।
যুব তুর্কি আন্দোলনের পটভূমি ও ক্রমবিকাশ:
- সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের স্বৈরাচার: ১৮৭৬ সালে মিদহাত পাশার প্রণীত প্রথম গণতান্ত্রিক সংবিধান এবং উসমানীয় সংসদ মাত্র দুই বছরের মাথায় সুলতান আবদুল হামিদ স্থগিত করেন এবং চরম পুলিশি গোয়েন্দা শাসন চালু করেন। এর বিরুদ্ধে প্যারিস ও জেনেভায় প্রবাসী তুর্কিরা যুব তুর্কি আন্দোলনের জন্ম দেয়।
- আন্দোলনের মূল দাবি: ১৮৭৬ সালের সংবিধান পুনঃপ্রবর্তন, সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সামরিক আধুনিকায়ন এবং সাম্রাজ্যের ঐক্য রক্ষা।
১৯০৮ সালের বিপ্লব ও সাফল্য:
১৯০৮ সালের জুলাই মাসে মেসিডোনিয়ায় অবস্থানরত তরুণ সেনা কর্মকর্তা আনোয়ার পাশা, নিয়াযি বে এবং তালাত পাশার নেতৃত্বে উসমানীয় ৩য় সেনাবাহিনী এক সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বিদ্রোহীরা ইস্তাম্বুল দখলের হুমকি দিলে কোণঠাসা সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন। ২৪ জুলাই তিনি ১৮৭৬ সালের সংবিধান পুনর্বহাল করেন এবং সংসদের নির্বাচন ঘোষণা করেন। এটিই ‘১৯০৮ সালের যুব তুর্কি বিপ্লব’ নামে খ্যাত।
সুলতানের অপসারণ ও ত্রয়ী একনায়কত্ব (Triumvirate):
১৯০৯ সালে প্রতিক্রিয়াশীলরা সুলতানের সমর্থনে পাল্টা বিপ্লব ঘটানোর চেষ্টা করলে যুব তুর্কিরা কঠোর হস্তে তা দমন করে এবং সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদকে সিংহাসনচ্যুত করে তার ভাই পঞ্চম মুহাম্মদ রশাদকে নামমাত্র পুতুল সুলতান বানায়। প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার চাবিকাঠি চলে যায় তিন যুব তুর্কি নেতার হাতে—আনোয়ার পাশা (যুদ্ধমন্ত্রী), তালাত পাশা (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) এবং জামাল পাশা (নৌমন্ত্রী)।
মূল্যায়ন: যুব তুর্কিরা তুর্কি জাতীয়তাবাদ ও আধুনিকীকরণে সফল হলেও তাদের কট্টর ‘তুর্কিকরণ নীতি’ অতুর্কি আরবদের বিদ্রোহে উসকানি দেয় এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পক্ষে তাদের অপরিণামদর্শী যোগদানের কারণেই উসমানীয় সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত বিলুপ্তি ত্বরান্বিত হয়।
৭। ইলখানি কারা? পারস্যের ইলখানি শাসন প্রতিষ্ঠায় হালাকু খানের ভূমিকা পর্যালোচনা কর।
[Who are the Elkhanides? Review the expansion of Halaku Khan of Elkhani role in Parsia.]
উত্তরঃ
ইলখানিদের পরিচয়:
‘ইলখান’ (Ilkhan) একটি মঙ্গোলীয় রাজকীয় উপাধি, যার অর্থ ‘অধীনস্থ খান’ বা ‘আঞ্চলিক শাসক’ (মঙ্গোলিয়ার প্রধান খাগানের অধীন)। চেঙ্গিস খানের পৌত্র এবং তুলুই খানের পুত্র হালাকু খান কর্তৃক ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে পারস্য (ইরান), মেসোপটেমিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত মঙ্গোলীয় মুসলিম সাম্রাজ্যকে ইলখানি সাম্রাজ্য (Ilkhanate) বলা হয়। পরবর্তীতে গাজান খানের আমলে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে এক অনন্য ইসলামি-পারসিক সভ্যতার জন্ম দেয়।
পারস্যে ইলখানি শাসন প্রতিষ্ঠায় হালাকু খানের সামরিক ভূমিকা:
- মঙ্গোলিয়ার প্রধান খাগানের নির্দেশ: ১২৫১ সালে মঙ্গোলিয়ার কারাকোরামের মহান খাগান মংকু খান তার অনুজ হালাকু খানকে মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি রাষ্ট্রসমূহ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে মঙ্গোল আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব অর্পণ করেন। ১২৫৩ সালে হালাকু খান ১ লক্ষ ২০ হাজার অশ্বারোহী সম্বলিত এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ মঙ্গোল বাহিনী নিয়ে পারস্যের দিকে যাত্রা করেন।
- ইসমাইলি হাশাশিনদের আলমাউত দুর্গ ধ্বংস (১২৫৬): পারস্যে প্রবেশের পথে হালাকু খানের প্রথম লক্ষ্য ছিল কাস্পিয়ান সাগরের দুর্গম পাহাড়ে অবস্থিত ইসমাইলি শিয়া ‘হাশাশিন’ (Assassins)-দের আস্তানা। রুখনুদ্দীন খুরশাহকে পরাস্ত করে হালাকু শতাব্দী প্রাচীন অপরাজেয় আলমাউত ও মাইমুনদিজ দুর্গ মাটির সাথে মিশিয়ে দেন এবং বিশ্ববিখ্যাত ইসমাইলি লাইব্রেরি পুড়িয়ে ছারখার করেন। এর মাধ্যমে উত্তর পারস্যে মঙ্গোলদের নিরঙ্কুশ শাসন কায়েম হয়।
- বাগদাদ ধ্বংস ও আব্বাসীয় খিলাফতের পতন (১২৫৮): ১২৫৮ সালে হালাকু বাগদাদ অবরোধ করেন। শেষ আব্বাসীয় খলিফা আল-মুসতাসিম বিল্লাহকে কার্পেটে মুড়িয়ে ঘোড়ার খুর দিয়ে পদদলিত করে হত্যা করা হয়। বাগদাদের ৮ লক্ষাধিক অধিবাসীকে কচুকাটা করা হয় এবং বাইতুল হিকমাহর অমূল্য কিতাবসমূহ দজলা নদীতে নিক্ষেপ করা হয়।
- তাবরিজে রাজধানী ও স্থায়ী সাম্রাজ্যের ভিত্তি: বাগদাদ ধ্বংসের পর হালাকু উত্তর-পশ্চিম পারস্যের (আজেরবাইজান) তাবরিজ এবং পরে মারাঘায় রাজধানী স্থাপন করে নিজেকে পারস্যের প্রথম ‘ইলখান’ ঘোষণা করেন। তিনি এক সুসংহত বিচার ও কর ব্যবস্থা চালু করেন। মহান মুসলিম জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক খাজা নাসিরুদ্দীন তুসিকে তার প্রধান উজির বানিয়ে মারাঘায় সমকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞান মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
৮। সাফাভী শাসন সুদৃঢ়করণে পারস্যের শাহ আব্বাসের গৃহীত পদক্ষেপগুলো মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the measures adopted by Shah Abbas the great of Persia for consolidation of Safavid rule.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
১৫০১ সালে শাহ ইসমাইল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত পারস্যের সাফাভী সাম্রাজ্য যখন উত্তর-পশ্চিমে উসমানীয় সাম্রাজ্য, উত্তর-পূর্বে উজবেক আক্রমণ এবং অভ্যন্তরীণ ‘কিজিলবাশ’ গোত্রীয় আমিরদের গৃহযুদ্ধে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন ১৫৮৭ সালে মাত্র ষোল বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেন প্রথম শাহ আব্বাস (১৫৮৭-১৬২৯ খ্রি.)। তার অনন্য প্রশাসনিক দূরদর্শিতা, সামরিক প্রতিভা ও শিল্পানুরাগের কারণে তাকে ‘শাহ আব্বাস দ্য গ্রেট’ (Shah Abbas the Great) বলা হয়।
সাফাভী সাম্রাজ্য সুদৃঢ়করণে শাহ আব্বাসের পদক্ষেপসমূহ:
- সামরিক সংস্কার ও নতুন স্থায়ী সেনাবাহিনী: অহংকারী কিজিলবাশ গোত্রীয় সর্দারদের প্রভাব খর্ব করতে শাহ আব্বাস তাদের ব্যক্তিগত বাহিনী ভেঙে দেন। ইংরেজ সামরিক উপদেষ্টা অ্যান্টনি ও রবার্ট শার্লির সহযোগিতায় তিনি ইউরোপীয় আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ৪০ হাজার সেনার তিনটি নিয়মিত স্থায়ী বাহিনী গঠন করেন:
- ঘোলাম বাহিনী (Ghulam): উসমানীয়দের জানিসারিদের অনুকরণে ককেশাস থেকে সংগৃহীত বিশ্বস্ত জর্জিয়ান ও আর্মেনীয় নওমুসলিম সৈন্যদের দিয়ে গঠিত ব্যক্তিগত বাহিনী।
- তুফাংচি (Tufangchi): আধুনিক বন্দুকধারী পদাতিক বাহিনী।
- তুপচি (Tupchi): শক্তিশালী ভ্রাম্যমাণ আধুনিক কামান বাহিনী।
- হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার: অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে শাহ আব্বাস প্রথমে পূর্ব সীমান্তে উজবেকদের পরাস্ত করে খোরাসান, হেরাত ও মাশহাদ পুনরুদ্ধার করেন। এরপর ১৬০৩ থেকে ১৬১২ সালের যুদ্ধে চিরবৈরী উসমানীয়দের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে তাবরিজ, আজারবাইজান, শিরভান, এবং ১৬২৩ সালে বাগদাদ ও ইরাক পুনর্দখল করেন।
- হরমুজ প্রণালী থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়ন (১৬২২): ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নৌ-সাহায্য নিয়ে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত হরমুজ বন্দর থেকে ঔপনিবেশিক পর্তুগিজদের বিতাড়িত করেন এবং সেখানে নতুন বাণিজ্য বন্দর ‘বন্দর আব্বাস’ স্থাপন করেন।
- ইসফাহানকে স্বর্ণালী রাজধানীতে রূপান্তর: তিনি রাজধানী কাজভিন থেকে পারস্যের কেন্দ্রস্থল ইসফাহানে স্থানান্তর করেন। অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর মাধ্যমে ইসফাহানকে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর নগরীতে রূপান্তর করেন। বিশ্বখ্যাত ‘নকশ-ই জাহান স্কয়ার’, ‘শাহ মসজিদ’, ‘আলি কাপু প্রাসাদ’ এবং ‘সি-ও-সে পল সেতু’ নির্মাণ করেন। তৎকালীন যুগে বিশ্বজুড়ে প্রবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল: “ইসফাহান নেসফ-ই জাহান” (ইসফাহান হলো অর্ধেক পৃথিবী)।
- অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও বাণিজ্য নিরাপত্তা: তিনি সাম্রাজ্যজুড়ে ৯৯৯টি সুরক্ষিত সরাইখানা নির্মাণ করেন। বিখ্যাত পার্সিয়ান কার্পেট ও রেশম শিল্পকে বিশ্বমঞ্চে বাণিজ্যিক রূপ দান করেন এবং ইউরোপীয় বণিকদের অবাধ বাণিজ্য সুবিধা প্রদান করেন।
খ বিভাগ — সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
(যে কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও | মান: ১০ × ২ = ২০)
৯। আনোয়ার পাশার পরিচয় দাও।
[Introduce Anower Pasha.]
উত্তরঃ
ইসমাইল আনোয়ার পাশা (১৮৮১-১৯২২):
ইসমাইল আনোয়ার পাশা ছিলেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ যুগের প্রখ্যাত সামরিক কমান্ডার, জাতীয়তাবাদী যুব তুর্কি আন্দোলনের প্রধান নেতা এবং ত্রয়ী একনায়কতন্ত্রের অন্যতম সদস্য।
রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা: ১৯০৮ সালের ঐতিহাসিক যুব তুর্কি বিপ্লবে তিনি প্রধান সামরিক ভূমিকা পালন করে জাতীয় বীর বা ‘স্বাধীনতার বীর’ (Hürriyet Kahramanı) খেতাব লাভ করেন। ১৯১৩ সালের বালকান যুদ্ধের পর তিনি এক দুঃসাহসী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে উসমানীয় সাম্রাজ্যের যুদ্ধমন্ত্রী (Minister of War) নিযুক্ত হন। তার প্ররোচনাতেই উসমানীয় সাম্রাজ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির সাথে গোপন সামরিক জোটে আবদ্ধ হয়ে যুদ্ধে প্রবেশ করে। ককেশাস ফ্রন্টে তার নেতৃত্বে সংঘটিত সারিকামিশের যুদ্ধে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে রাশিয়ার কাছে উসমানীয় বাহিনীর ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে। সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর তিনি পালিয়ে মধ্য এশিয়ায় চলে যান এবং সেখানে সোভিয়েত বলশেভিক লাল ফৌজের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ‘বাসমাচি বিদ্রোহ’ (Basmachi Movement)-এ নেতৃত্ব দেন। অবশেষে ১৯২২ সালের ৪ আগস্ট তাজিকিস্তানে সম্মুখযুদ্ধে বীরদর্পে শহীদ হন।
১০। অটোমান নৌ বাহিনী সম্পর্কে টীকা লেখ।
[Write a short note on Ottoman Naval Force.]
উত্তরঃ
উসমানীয় নৌবাহিনী (Ottoman Navy):
উসমানীয় নৌবাহিনী ছিল চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর, কৃষ্ণসাগর, লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগরে ত্রাস সৃষ্টিকারী সমকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ পরাক্রমশালী নৌবহর।
উত্থান ও সুবর্ণযুগ: চতুর্দশ শতকে কারেসি আমিরাত জয়ের মাধ্যমে উসমানীয়দের নৌযাত্রার সূচনা হয়। পরবর্তীতে সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ এবং দ্বিতীয় মুহাম্মদ একে আধুনিক রূপ দেন। সুলতান সুলাইমান কানুনির আমলে বিখ্যাত অ্যাডমিরাল খায়রুদ্দীন বারবারোসা উসমানীয় নৌবাহিনীর গ্র্যান্ড অ্যাডমিরাল (কাপ্তান পাশা) নিযুক্ত হলে উসমানীয় নৌ-আধিপত্যের স্বর্ণযুগ শুরু হয়। ১৫৩৮ সালে গ্রিসের উপকূলে সংঘটিত প্রিভেজার ঐতিহাসিক নৌযুদ্ধে (Battle of Preveza) বারবারোসা পোপ, স্পেন ও ভেনিসের সম্মিলিত অপরাজেয় যৌথ নৌবহরকে শোচনীয়ভাবে ধূলিসাৎ করে সমগ্র ভূমধ্যসাগরকে ‘উসমানীয় হ্রদে’ (Ottoman Lake) পরিণত করেন। লোহিত সাগরে তারা পর্তুগিজদের হটিয়ে মক্কা ও মদিনার সমুদ্রসীমা সুরক্ষিত রাখে। পরবর্তীতে ১৫৭১ সালে লেপান্তোর নৌযুদ্ধে খ্রিস্টানদের কাছে ধাক্কা খেলেও উসমানীয়রা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে কয়েক মাসের মধ্যে নতুন সুবিশাল নৌবহর গড়ে তুলে তিউনিসিয়া পুনর্দখল করেছিল।
১১। সমর রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মোস্তফা কামাল পাশাকে মূল্যায়ন কর।
[Evaluate Mustafa Kemal Pasha as a Military statesman.]
উত্তরঃ
মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক (১৮৮১-১৯৩৮):
মোস্তফা কামাল ছিলেন আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ও বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ সমর রাষ্ট্রনায়ক।
সমরনায়ক হিসেবে কৃতিত্ব: ১৯১৫ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় দার্দানেলিস প্রণালীর কাছে গ্যালিপলির ঐতিহাসিক যুদ্ধে (Battle of Gallipoli) তিনি পরাক্রমশালী ব্রিটিশ ও ফরাসি যৌথ সেনাবহরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে ইস্তাম্বুলকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করেন এবং জাতীয় বীরে পরিণত হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর ১৯২০ সালে মিত্রশক্তি যখন কুখ্যাত ‘সেভ্র চুক্তি’র মাধ্যমে তুরস্ককে বিভক্ত করে গ্রিক, ফরাসি ও ইতালীয়দের মধ্যে ভাগ করে দিচ্ছিল, তখন কামাল পাশা আনাতোলিয়ায় ‘জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ যুদ্ধ’ (Turkish War of Independence) শুরু করেন। সাকারিয়া ও দুমলুপিনারের যুদ্ধে তিনি গ্রিক সেনাবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দেন এবং ১৯২৩ সালে মর্যাদাপূর্ণ ‘লুজান চুক্তি’র মাধ্যমে আধুনিক তুরস্কের অখণ্ড ভৌগোলিক সীমানা ছিনিয়ে আনেন।
রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দূরদর্শিতা: তিনি ১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর তুরস্ক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন এবং খিলাফত ও সালতানাত চিরতরে বিলুপ্ত করে রোমান হরফ প্রবর্তন, পশ্চিমা পোশাক, নারী অধিকার এবং শিল্পায়ন নিশ্চিত করে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে একটি আধুনিক, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল তুর্কি জাতি গড়ে তোলেন। এজন্য তুর্কি জাতি তাকে ‘আতাতুর্ক’ (তুর্কিদের পিতা) উপাধিতে ভূষিত করে।
১২। বাদশাহ আমানুল্লাহর সংস্কার সম্পর্কে ধারণা দাও।
[Give an idea of King Amanullah’s reforms.]
উত্তরঃ
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
১৯১৯ সালে তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশদের পররাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে আফগানিস্তানের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনেন তরুণ সংস্কারক বাদশাহ আমানুল্লাহ খান (১৯১৯-১৯২৯ খ্রি.)। তুরস্কের মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের আধুনিকায়ন দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি আফগানিস্তানের ঐতিহ্যবাহী গোত্রীয় সমাজব্যবস্থাকে আধুনিক রূপ দিতে এক বৈপ্লবিক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেন।
বাদশাহ আমানুল্লাহর সংস্কারসমূহ:
- সাংবিধানিক ও সামাজিক সংস্কার: ১৯২৩ সালে তিনি আফগানিস্তানের প্রথম আধুনিক লিখিত সংবিধান (নিজামনামা) প্রবর্তন করেন। দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করেন, বহুগামিতা ও বাল্যবিবাহের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেন এবং নারীদের বাধ্যতামূলক পর্দা প্রথা শিথিল করে তাদের আধুনিক শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করেন। তার স্ত্রী রানি সুরাইয়া প্রকাশ্যে মুখাবরণ উন্মোচন করে নারীদের আদর্শ হিসেবে আবির্ভূত হন।
- শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন: কাবুলে বালক ও বালিকাদের জন্য আধুনিক স্কুল স্থাপন করেন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য তরুণ ছাত্র-ছাত্রীদের ফ্রান্সে ও জার্মানিতে বৃত্তি দিয়ে পাঠান।
- পোশাক ও বিচার সংস্কার: কাবুলের সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য ঐতিহ্যবাহী পোশাকের বদলে ইউরোপীয় স্যুট ও হ্যাট পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়। ধর্মীয় আদালতের বাইরে ধর্মনিরপেক্ষ বিচারালয় স্থাপন করা হয়।
সংস্কারের করুণ পরিণতি: আফগানিস্তানের কট্টরপন্থী মোল্লা ও গোত্রীয় সরদাররা এই দ্রুত পশ্চিমা সংস্কারকে ইসলাম ও আফগান সংস্কৃতির অবমাননা মনে করে দেশজুড়ে তীব্র সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১৯২৯ সালে বাচ্চায়ে সাক্কাওর নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা কাবুল দখল করলে বাদশাহ আমানুল্লাহ গৃহযুদ্ধ এড়াতে সিংহাসন ত্যাগ করে ইউরোপে নির্বাসনে চলে যেতে বাধ্য হন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
উত্তর: কায়ি গোত্রের আরতুগ্রুল গাজীর পুত্র উসমান গাজী (Osman I) ১২৯৯ খ্রিষ্টাব্দে উসমানীয় বংশ ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রশ্ন ২: কোন সুলতানের আমলে ঐতিহাসিক কনস্টান্টিনোপল বিজিত হয়?
উত্তর: উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ (মুহাম্মদ আল-ফাতিহ) ১৪৫৩ সালের ২৯ মে কনস্টান্টিনোপল জয় করেন।
প্রশ্ন ৩: উসমানীয় সাম্রাজ্যে ‘তানজিমাত’ যুগের সূচনা হয় কোন সনদের মাধ্যমে?
উত্তর: ১৮৩৯ সালের ৩ নভেম্বর ঘোষিত ঐতিহাসিক ‘খত-ই-শরিফ গুলহানে’ সনদের মাধ্যমে তানজিমাত বা সংস্কার যুগের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে।
প্রশ্ন ৪: পারস্যের বাগদাদ ধ্বংসকারী মঙ্গোল শাসকের নাম কী?
উত্তর: পারস্যের ইলখানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হালাকু খান ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদ নগরী ধ্বংস করেন এবং আব্বাসীয় খিলাফতের অবসান ঘটান।
প্রশ্ন ৫: কোন সাফাভী শাসক পারস্যের ইসফাহানকে তার রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন?
উত্তর: সাফাভী সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক প্রথম শাহ আব্বাস (শাহ আব্বাস দ্য গ্রেট) ইসফাহানকে তার স্বপ্নের রাজধানীতে রূপান্তর করেছিলেন।
প্রশ্ন ৬: তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধের মাধ্যমে আফগানিস্তানের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনকারী শাসকের নাম কী?
উত্তর: বাদশাহ আমানুল্লাহ খান ১৯১৯ সালে তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধে ব্রিটিশদের পরাস্ত করে আফগানিস্তানের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করেন।