ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (Islamic History & Culture) — ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিষয়: বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতি [Society and Culture of Bangladesh] | বিষয় কোড: 205207
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ক-বিভাগ — রচনামূলক প্রশ্ন
(যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও | মান: ১৫ × ৪ = ৬০)
১। বাংলাদেশের গ্রামীণ রাজনীতিতে জ্ঞাতিত্ব সম্পর্কের প্রভাব আলোচনা কর।
[Discuss the impact of Kinship in rural politics of Bangladesh.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
রক্তের সম্পর্ক, বৈবাহিক বন্ধন এবং বংশমর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মানুষের পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্কই হলো জ্ঞাতিত্ব সম্পর্ক (Kinship)। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় জ্ঞাতিত্ব সম্পর্ক কেবল পারিবারিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি গ্রামীণ রাজনীতি, ক্ষমতা কাঠামো, নির্বাচনী জয়-পরাজয় এবং সামাজিক সংহতির অন্যতম প্রধান নির্ণায়ক হিসেবে কাজ করে।
গ্রামীণ রাজনীতিতে জ্ঞাতিত্ব সম্পর্কের বহুমুখী প্রভাব:
- গোষ্ঠী ও খান্দানের আধিপত্য: প্রতিটি গ্রামে বিভিন্ন ‘গুষ্টি’ বা ‘খান্দান’ (বংশ) থাকে (যেমন: শিকদার বংশ, তালুকদার বংশ, মল্লিক বংশ ইত্যাদি)। কোনো বংশের সদস্য সংখ্যা যত বেশি এবং তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান যত সচ্ছল হয়, গ্রামীণ রাজনীতিতে সেই বংশের প্রভাব তত বেশি শক্তিশালী থাকে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা মূলত আন্তঃগোষ্ঠী দ্বন্দ্বে রূপ নেয়।
- স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটব্যাংক: ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বা উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদপ্রার্থীদের জয়ের প্রধান ভিত্তি হলো স্বগোত্রের ভোটব্যাংক। সাধারণত একই বংশের সকল সদস্য দলীয় আদর্শ নির্বিশেষে নিজ গোত্রের প্রার্থীকে দলবদ্ধভাবে ভোট প্রদান করে। এমনকি বংশের বৃহৎ স্বার্থে নির্বাচনী প্রচারণায় সমগ্র জ্ঞাতিগোষ্ঠী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।
- গ্রাম্য শালিস ও মাতব্বর প্রথা: গ্রামীণ শালিস বা বিচার ব্যবস্থায় প্রধান বিচারকের ভূমিকা পালন করেন বংশীয় ‘মাতব্বর’ বা সমাজপ্রধানগণ। যে গোষ্ঠীর জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক প্রভাব বেশি, শালিসের রায়ে তাদের মতামতই সাধারণত প্রাধান্য পায়। দুর্বল বংশের মানুষ যেকোনো সমস্যায় শক্তিশালী জ্ঞাতিগোষ্ঠীর ছত্রচ্ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে।
- দলাদলি ও উপদলীয় কোন্দল (Factionalism): গ্রামীণ সমাজ মূলত ‘পাড়া’ এবং ‘দল’ বা উপদলে বিভক্ত। জ্ঞাতি সম্পর্কের বন্ধনেই এই দলগুলো গড়ে ওঠে। এক বংশের সাথে অন্য বংশের বিরোধ দশকের পর দশক ধরে গ্রামীণ আদালত, মামলা-মোকদ্দমা এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামায় রূপ নেয়।
- বৈবাহিক সম্পর্কের রাজনৈতিক ব্যবহার: গ্রামে রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বাড়াতে এক প্রভাবশালী বংশ অন্য শক্তিশালী বংশের সাথে বৈবাহিক বন্ধন তৈরি করে। এর ফলে তাদের যৌথ রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
উপসংহার: যদিও আধুনিকায়ন, প্রবাসী রেমিট্যান্স এবং দলীয় রাজনীতির প্রভাবে জ্ঞাতিত্ব সম্পর্কের চিরাচরিত প্রভাবে কিছুটা পরিবর্তন আসছে, তবুও এখনও বাংলাদেশের গ্রামীণ রাজনীতির মূল স্নায়ুকেন্দ্র হলো রক্ত ও বংশের অটুট বন্ধন।
২। বাংলাদেশের কৃষি কাঠামো বর্ণনা কর।
[Narrate the agrarian structure of Bangladesh.]
উত্তরঃ
কৃষি কাঠামোর সংজ্ঞা:
কৃষি কাঠামো (Agrarian Structure) বলতে একটি দেশের কৃষিক্ষেত্রে ভূমির মালিকানা বণ্টন, উৎপাদনের সম্পর্ক, কৃষক শ্রেণীর স্তরবিন্যাস, জমির খণ্ড-বিখণ্ডতা এবং কৃষি শ্রমিকদের উৎপাদনশীল কাঠামোগত বিন্যাসকে বোঝায়। বাংলাদেশ একটি ঐতিহ্যবাহী নদীমাতৃক কৃষিপ্রধান দেশ, যার অর্থনীতি ও সমাজ বহুলাংশে কৃষি কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের কৃষি কাঠামোর প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- জমির মালিকানার চরম অসম বণ্টন: বাংলাদেশের কৃষি সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ভূমির মালিকানায় তীব্র বৈষম্য। সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের গবেষণায় দেখা যায়, দেশের শীর্ষ ১০% ধনী জোতদার বা ভূস্বামী প্রায় ৫০% এর বেশি কৃষিজমি নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষকের কোনো নিজস্ব জমি নেই অথবা নামমাত্র জমি রয়েছে।
- কৃষক শ্রেণীর স্তরবিন্যাস:
- ধনী কৃষক (Rich Peasants): বিপুল জমির মালিক, যারা নিজেরা মাঠে হালচাষ করেন না; বরং বর্গাচাষী ও দিনমজুরদের মাধ্যমে জমি চাষ করান।
- মধ্যম কৃষক (Middle Peasants): নিজস্ব জমি রয়েছে এবং পারিবারিক শ্রমের মাধ্যমে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।
- ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক (Small/Marginal Peasants): ১ থেকে ২ একরের কম জমি রয়েছে, যা দিয়ে সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
- ভূমিহীন কৃষক (Landless Laborers): মোট গ্রামীণ জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষ সম্পূর্ণ ভূমিহীন, যারা অন্যের জমিতে দিনমজুরি বা বর্গা চাষ করে মানবেতর জীবনযাপন করে।
- বর্গা চাষ ব্যবস্থা (Sharecropping/Tehbaga): কৃষিজমির একটি বড় অংশ বর্গা বা আধিয়ার পদ্ধতিতে চাষ হয়। সনাতন পদ্ধতিতে মোট উৎপাদনের ৫০% জমির মালিককে দিতে হতো। তবে আধুনিক ‘বর্গা আইন’ অনুসারে উৎপাদনের তিন ভাগের দুই ভাগ প্রকৃত চাষীর পাওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে এখনো নানা বৈষম্য বিরাজমান।
- জমির ক্ষুদ্রায়তন ও খণ্ড-বিখণ্ডতা (Fragmentation of Land): মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের কারণে পিতার মৃত্যুর পর জমি সন্তানদের মধ্যে ভাগ হতে হতে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরোয় পরিণত হয়। ফলে আধুনিক বৃহৎ কৃষিযন্ত্র (যেমন কম্বাইন হারভেস্টার) ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
- কৃষিতে আধুনিকায়ন ও সবুজ বিপ্লব: উচ্চ ফলনশীল (HYV) বীজ, কৃত্রিম সেচ (শ্যালু টিউবওয়েল), রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কৃষি অর্থনীতিতে পুঁজির গুরুত্ব বৃদ্ধি করেছে।
৩। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও নগর জীবনের মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনা কর।
[Review comparatively between urban and rural life of Bangladesh.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা মূলত দুটি স্বতন্ত্র পরিবেশে বিভক্ত: ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ জীবন এবং আধুনিক নগর জীবন। ভৌগোলিক দূরত্ব, পেশা, জীবনযাত্রার মান এবং সামাজিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে এই দুই জীবনের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান।
গ্রামীণ ও নগর জীবনের তুলনামূলক পর্যালোচনা:
| তুলনার ক্ষেত্র | বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন | বাংলাদেশের নগর জীবন |
|---|---|---|
| ১. পেশাগত কাঠামো | কৃষি, মৎস্য শিকার, হাঁস-মুরগি পালন এবং ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। | শিল্প-কারখানা, বহুজাতিক করপোরেট চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষকতা ও প্রযুক্তি সেবাখাত। |
| ২. সামাজিক সম্পর্ক | মুখোমুখি ও গভীর আন্তরিক সম্পর্ক (Primary Group)। জ্ঞাতিগোষ্ঠী, পাড়া ও সমাজের সকলের সাথে সকলের ব্যক্তিগত পরিচয় ও সহমর্মিতা থাকে। | আনুষ্ঠানিক, কৃত্রিম ও স্বার্থনির্ভর সম্পর্ক (Secondary Group)। পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীর সাথেও অনেক সময় কোনো পরিচয় থাকে না। |
| ৩. পরিবার ব্যবস্থা | এখনও তুলনামূলকভাবে যৌথ পরিবার ও বর্ধিত পরিবারের প্রাধান্য বিদ্যমান। মুরব্বিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত। | প্রধানত ক্ষুদ্র একক পরিবার (Nuclear Family)। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই কর্মজীবী হওয়ায় সন্তান ডে-কেয়ারে বড় হয়। |
| ৪. পরিবেশ ও স্বাস্থ্য | উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ, দূষণমুক্ত বিশুদ্ধ বাতাস এবং সবুজ শ্যামল প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য। | ঘনবসতিপূর্ণ, কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়ায় বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ এবং অপরিকল্পিত বস্তি সমস্যা। |
| ৫. নাগরিক সুযোগ-সুবিধা | উন্নত হাসপাতাল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং উচ্চশিক্ষার পর্যাপ্ত সুবিধা এখনো সীমিত। | আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, বিনোদন কেন্দ্র ও ইন্টারনেট সুবিধার প্রাচুর্য। |
| ৬. সামাজিক নিয়ন্ত্রণ | গ্রাম্য শালিস, মুরব্বিদের সামাজিক শাসন, লোকধর্ম এবং সামাজিক লোকলজ্জার মাধ্যমে সমাজ নিয়ন্ত্রিত হয়। | পুলিশ, আইন-আদালত, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং লিখিত আনুষ্ঠানিক আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সাধিত হয়। |
৪। উন্নয়নশীল দেশের গণতান্ত্রিকায়নে সুশীল সমাজের ভূমিকা নিরূপণ কর।
[Determine the role of civil society in the democratization of developing countries.]
উত্তরঃ
সুশীল সমাজ (Civil Society)-এর সংজ্ঞা:
রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণমুক্ত এমন এক স্বাধীন সামাজিক পরিসর—যেখানে সচেতন নাগরিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহ একত্রিত হয়ে জনস্বার্থে নীতি নির্ধারণে চাপ সৃষ্টি করে—তাকে সুশীল সমাজ বলা হয়।
উন্নয়নশীল দেশের গণতান্ত্রিকায়নে সুশীল সমাজের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা:
- ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সরকার সহজেই স্বৈরাচারী ও দমনমূলক হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখায়। সুশীল সমাজ সরকারের জনবিরোধী নীতি, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জোরালো সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে সাংবিধানিক সীমার মধ্যে পরিচালিত হতে বাধ্য করে।
- অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে জনমত গঠন: নাগরিক সমাজের সংগঠনসমূহ (যেমন সুজন – সুশাসনের জন্য নাগরিক) নির্বাচনী অনিয়ম পর্যবেক্ষণ করে, ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করে এবং কালোটাকা ও পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের দাবি তোলে।
- আইনের শাসন ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষা: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা, গুম-খুন ও বিনা বিচারে আটকের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই (PIL – Public Interest Litigation) পরিচালনা করে সুশীল সমাজ নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করে।
- প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর: সমাজের সুবিধাবঞ্চিত নারী, শিশু, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ে নীতি-নির্ধারকদের ওপর অ্যাডভোকেসি ও লবিং চালায়।
- মুক্ত গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: একটি সচল গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। সুশীল সমাজ সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার রোধ এবং তথ্যের অধিকার নিশ্চিতকরণে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেয়।
৫। বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নে বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the steps are taken by the present government for rural development of Bangladesh.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
বাংলাদেশের সার্বিক জাতীয় উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো পল্লী অঞ্চলের সমৃদ্ধি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গ্রামে বাস করায় পল্লী অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচন, আধুনিক নাগরিক সুবিধার সম্প্রসারণ এবং কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সরকার সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
পল্লী উন্নয়নে গৃহীত প্রধান পদক্ষেপসমূহ:
- ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ মেগাপ্রকল্প: শহরের আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা গ্রামীণ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এক যুগান্তকারী দর্শন। এর আওতায় প্রতিটি গ্রামে পাকা রাস্তা, শতভাগ বিদ্যুৎ সংযোগ, নিরাপদ সুপেয় পানি সরবরাহ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ইন্টারনেট সংযোগ সম্প্রসারিত হচ্ছে।
- ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ (আমার বাড়ি আমার খামার): ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও সমবায়ের মাধ্যমে গ্রামীণ অতিদরিদ্র পরিবারের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের প্রকল্প। এর মাধ্যমে কৃষকদের হাঁস-মুরগি পালন, গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ ও মৎস্য চাষে সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
- আশ্রয়ণ প্রকল্প ও ‘ঘরে ফেরা’: ভূমিহীন ও গৃহহীন অসহায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য দুই শতক জমিসহ সেমিপাকা বাড়ি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক মানুষের স্থায়ী ঠিকানা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত হয়েছে।
- সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Safety Net): বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা এবং ভিজিডি/ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে গ্রামীণ হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
- কৃষি ভর্তুকি ও যান্ত্রিকীকরণ: কৃষকদের সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সারের ভর্তুকি প্রদান, ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ, বিদ্যুৎ চালিত সেচে রিবেট এবং ৫০% থেকে ৭০% ভর্তুকিতে কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার মেশিন সরবরাহ গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
- গ্রামীণ অবকাঠামো ও ডিজিটাল সেন্টার: এলজিইডি (LGED)-র মাধ্যমে গ্রাম-গঞ্জের হাজার হাজার কিলোমিটার সড়ক ও কালভার্ট পাকা করা হয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ‘ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার’ (UDC) স্থাপন করে গ্রামের মানুষকে ডিজিটাল নাগরিক সেবায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
৬। বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নে (NGO) এনজিও এর ভূমিকা মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the role of NGO’s in the social development of Bangladesh.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্বাসন ও আর্তমানবতার সেবায় বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা এনজিও (Non-Governmental Organization)-সমূহের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ব্র্যাক (BRAC), গ্রামীণ ব্যাংক, আশা (ASA), প্রশিকা প্রভৃতি দেশীয় এনজিও বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে সামাজিক উন্নয়নের রোল মডেলে রূপান্তর করতে সরকারের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে।
সামাজিক উন্নয়নে এনজিওদের যুগান্তকারী ভূমিকা:
- ক্ষুদ্রঋণ ও দারিদ্র্য বিমোচন (Microcredit): ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ মডেল বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ মহিলাদের সরাসরি ঋণ দিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা, হাঁস-মুরগি পালন ও হস্তশিল্পে সম্পৃক্ত করে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের করে আনা হয়েছে।
- প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা: সুবিধাবঞ্চিত ও স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের জন্য ব্র্যাকের ‘ওয়ান-রুম স্কুল’ মডেল প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক বিপ্লব ঘটিয়েছিল। শত শত প্রত্যন্ত অঞ্চলে বয়স্ক শিক্ষা ও প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করেছে এনজিওগুলো।
- নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা: এনজিওর সমিতিগুলোর মাধ্যমে নারীরা নিজেদের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাদের মধ্যে বাল্যবিবাহ রোধ, যৌতুক বিরোধী সচেতনতা এবং পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধের মনোবল বৃদ্ধি পেয়েছে।
- শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য রক্ষা (ওরস্যালাইন বিপ্লব): ব্র্যাকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঘরে তৈরি ‘লবণ-গুড়ের ওরস্যালাইন’ শেখানোর কার্যক্রম ডায়রিয়াজনিত শিশুমৃত্যু প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছিল। টিকাদান (EPI), স্যানিটেশন (স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ব্যবহার) এবং পুষ্টি সচেতনতায় এনজিওদের অবদান অবিস্মরণীয়।
- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীলতা: বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজ, শুকনো খাবার বিতরণ এবং পরবর্তী পুনর্বাসনে এনজিওগুলো অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।
৭। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো আলোচনা কর।
[Discuss the step taken by the present government for the empowerment of women in Bangladesh.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারীকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত না করে কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের বিধান কার্যকর করতে বাংলাদেশ সরকার বহুমুখী যুগান্তকারী নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে।
নারীর ক্ষমতায়নে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ:
- রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৫০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। স্থানীয় সরকারে (ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ) সরাসরি ভোটে সংরক্ষিত নারী সদস্য ও ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচনের বিধান চালু রয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্ব যেমন প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, সংসদ উপনেতা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নারীদের সফল পদায়ন ঘটেছে।
- শিক্ষা ও মেধার বিকাশ: দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান, অবৈতনিক শিক্ষা, এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে বর্তমানে ছাত্রের চেয়ে ছাত্রীদের সংখ্যা বেশি।
- আইনগত সুরক্ষা ও পারিবারিক অধিকার: নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর ‘পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন ২০১০’, ‘যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮’ এবং ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’ প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারি অফিসে যৌন হয়রানি রোধে উচ্চ আদালতের নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
- চাকরি ও পেশাগত অংশগ্রহণ: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে নারীদের জন্য ৬০% কোটা সংরক্ষণ করা হয়েছে। বিসিএস প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীতে (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) নারীদের জন্য কমান্ডিং পজিশন উন্মুক্ত করা হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৪০ লক্ষ নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থান জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে।
- অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও উদ্যোক্তা তৈরি: বাংলাদেশ ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা প্রদান করছে। জয়িতা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
৮। ইসলামি শিক্ষা কী? ইসলামি শিক্ষা ও সেকুলার শিক্ষা এর মধ্যে তুলনামূলক ব্যাখ্যা কর।
[What is Islamic Education? Analyze comparatively between Islamic educations and secular education.]
উত্তরঃ
ইসলামি শিক্ষার সংজ্ঞা:
যে শিক্ষাব্যবস্থা পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর ঐশী নির্দেশনার আলোকে মানুষের আত্মিক, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও জাগতিক জীবনের সুষম বিকাশ সাধন করে তাকে আল্লাহর একনিষ্ঠ খলিফা (প্রতিনিধি) হিসেবে সৎকর্মশীল ও চরিত্রবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে, তাকে ইসলামি শিক্ষা বলা হয়। ইসলামে শিক্ষার প্রথম নির্দেশই হলো: “পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন” (সূরা আলাক: ১)।
ইসলামি শিক্ষা ও সেকুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) শিক্ষার তুলনামূলক পার্থক্য:
| তুলনার বিষয় | ইসলামি শিক্ষা (Islamic Education) | সেকুলার/জাগতিক শিক্ষা (Secular Education) |
|---|---|---|
| ১. উৎস ও ভিত্তি | আল্লাহর ওহী (কুরআন) এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ হলো এর পরম সত্য ও চূড়ান্ত ভিত্তি। | মানবীয় যুক্তি, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জাগতিক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো এর মূল ভিত্তি। |
| ২. শিক্ষার উদ্দেশ্য | আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, ইহকালীন কল্যাণ এবং পরকালীন চিরস্থায়ী মুক্তি (নাজাত) লাভ। | মূলত ইহজাগতিক সাফল্য, ক্যারিয়ার গঠন, অর্থনৈতিক মুনাফা ও সামাজিক মর্যাদা অর্জন। |
| ৩. নীতি ও মূল্যবোধ | আল্লাহর ভয় (তাকওয়া), পরকালমুখীনতা ও চিরন্তন ঐশী নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। | মনুষ্যনির্মিত সামাজিক উপযোগিতা ও আইনের অনুশাসনের ওপর নির্ভরশীল; পরকালের কোনো স্থান নেই। |
| ৪. জ্ঞানের পরিধি | ইহলৌকিক বিজ্ঞান, গণিত ও প্রযুক্তির সাথে আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক জ্ঞানের এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করে। | জ্ঞানকে মূলত বস্তুবাদী ও দৃশ্যমান জাগতিক জগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে। |
| ৫. দৃষ্টিভঙ্গি | মানুষকে আল্লাহর সৃষ্টি এবং তার কাছে প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এই ভাব জাগ্রত করে। | মানুষকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও জৈবিক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে। |
খ বিভাগ — সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
(যে কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও | মান: ১০ × ২ = ২০)
৯। বাংলাদেশে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গড়ে ওঠার কারণসমূহ সংক্ষেপে লেখ।
[Write briefly the causes of the breakdown of joint families into nuclear families in Bangladesh.]
উত্তরঃ
যৌথ পরিবার ভাঙনের প্রধান কারণসমূহ:
ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা ছিল একান্নবর্তী বা যৌথ পরিবারকেন্দ্রিক। তবে আধুনিক যুগে নানাবিধ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে যৌথ পরিবার ভেঙে দ্রুত ক্ষুদ্র ‘একক পরিবার’ (Nuclear Family) গড়ে উঠছে। এর প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
- শিল্পায়ন ও দ্রুত নগরায়ণ: শহরকেন্দ্রিক কলকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় গ্রামীণ তরুণরা কাজের খোঁজে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। ফলে তারা গ্রামে পিতা-মাতার সাথে না থেকে শহরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পৃথক একক সংসার শুরু করছে।
- ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধের বিকাশ: আধুনিক শিক্ষা ও পশ্চিমা মিডিয়ার প্রভাবে ব্যক্তি স্বাধীনতা, নিজস্ব গোপনীয়তা (Privacy) এবং আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কর্তৃত্ব মেনে নিতে তরুণ প্রজন্ম অনীহা প্রকাশ করছে।
- অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও আয় বৈষম্য: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির যুগে একান্নবর্তী পরিবারের বিপুল ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। তাছাড়া পরিবারের ভাইদের মধ্যে আয়ের বৈষম্য তৈরি হলে পারস্পরিক অসন্তোষ ও সম্পদ বণ্টন নিয়ে কোন্দল দেখা দেয়, যা যৌথ পরিবার ভেঙে দেয়।
- মহিলাদের কর্মসংস্থান: নারীরা চাকরি ও স্বাধীন পেশায় যুক্ত হওয়ার ফলে গৃহস্থালি কাজের যৌথ দায়িত্বের বাইরে নিজস্ব পারিবারিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে আগ্রহী হচ্ছে।
১০। সামাজিক স্তরবিন্যাস বলতে কী বোঝায়?
[What is meant by social stratification?]
উত্তরঃ
সামাজিক স্তরবিন্যাস (Social Stratification)-এর ধারণা:
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ভূ-তত্ত্বের শিলাস্তরের মতো একটি সমাজের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে যখন সম্পদ, ক্ষমতা, মর্যাদা, বংশমর্যাদা, শিক্ষা ও পেশার ভিত্তিতে উচ্চ-নিচ বিভিন্ন স্তরে শ্রেণীবদ্ধ বা বিন্যস্ত করা হয়, তখন তাকে সামাজিক স্তরবিন্যাস বলা হয়।
প্রধান প্রকারভেদ: সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের মতে সামাজিক স্তরবিন্যাস প্রধানত তিনটি ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠে:
- শ্রেণী (Class): অর্থনৈতিক অবস্থান ও সম্পত্তির মালিকানা (উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত)।
- মর্যাদা (Status): সমাজে একজন ব্যক্তির সম্মান ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা।
- ক্ষমতা (Power): অন্যদের ওপর নিজের ইচ্ছা বা প্রভাব কার্যকর করার রাজনৈতিক সক্ষমতা।
মানব ইতিহাসে দাসপ্রথা, ভারতের বর্ণপ্রথা (Caste System), মধ্যযুগীয় এস্টেট ব্যবস্থা এবং আধুনিক সামাজিক শ্রেণী ব্যবস্থা হলো সামাজিক স্তরবিন্যাসের প্রধান ঐতিহাসিক রূপ।
১১। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে লোকসংস্কৃতির গুরুত্ব আলোচনা কর।
[Discuss the importance of folk culture in Bangladeshi culture.]
উত্তরঃ
লোকসংস্কৃতির গুরুত্ব:
লোকসংস্কৃতি হলো আবহমান বাংলার সাধারণ গ্রামীণ মানুষের মাটি ও মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে মিশে থাকা স্বতঃস্ফূর্ত সাংস্কৃতিক প্রকাশ। এটি বাঙালি সংস্কৃতির আদি উৎস ও প্রাণের স্পন্দন।
গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও তাৎপর্য:
- লোকসঙ্গীতের আধ্যাত্মিক সুর: বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদি, মারফতি এবং লালন শাহ ও হাছন রাজার গান মানুষের হৃদয়ে অহিংসা, মানবিক প্রেম ও পরম স্রষ্টার প্রতি আত্মনিবেদনের সুর জাগিয়ে তোলে। নদীমাতৃক বাংলার মাঝি-মাল্লা ও কৃষকের আনন্দ-বেদনার আশ্রয় এই লোকসঙ্গীত।
- লোকশিল্প ও কারুশিল্প: নকশিকাঁথা, জামদানি শাড়ি, মাটির মৃৎপাত্র, টেপাপুতুল এবং বাঁশ-বেতের সামগ্রী বাঙালির শিল্পচেতনার এক অনুপম ঐতিহ্য। নকশিকাঁথার প্রতিটি সুতোয় গাঁথা থাকে বাঙালি নারীর সুখ-দুঃখের জীবন্ত কাব্য।
- ঐতিহ্যবাহী উৎসব ও মেলা: বৈশাখী মেলা, নবান্ন উৎসব, পৌষ মেলা এবং পুণ্যাহ গ্রামীণ মানুষের মধ্যে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক অসাধারণ সামাজিক সম্প্রীতি ও মিলনের আবহ সৃষ্টি করে।
১২। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর (উপজাতি) সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
[Give a brief account of the cultural characteristics of the ethnic minorities in Bangladesh.]
উত্তরঃ
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিচয় ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য:
বাংলাদেশে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতল অঞ্চলে প্রায় পঞ্চাশটিরও বেশি বৈচিত্র্যময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসী সম্প্রদায় বাস করে। যেমন: চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল, খাসিয়া, রাখাইন ইত্যাদি।
তাদের প্রধান সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- ১. ভিন্ন পরিবার কাঠামো: অধিকাংশ উপজাতি পিতৃতান্ত্রিক হলেও গারো ও খাসিয়াদের পরিবার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ মাতৃতান্ত্রিক। এদের পরিবারের সকল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় কনিষ্ঠ কন্যা এবং মা-ই পরিবারের প্রধান।
- ২. বৈচিত্র্যময় উৎসব: পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের সবচেয়ে বড় উৎসব হলো ‘বৈসাবি’ (বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজু)। মারমাদের ঐতিহ্যবাহী জলকেলি বা পানিখেলা এবং গারোদের নবান্ন উৎসব ‘ওয়ানগালা’ অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়।
- ৩. খাদ্য ও পোশাকের স্বাতন্ত্র্য: তারা নিজস্ব তাঁতে বোনা রঙিন পোশাক (চাকমাদের পিনোন-হাদি, মারমাদের থামি) পরিধান করে। জুম চাষের আঠালো চাল এবং পাহাড়ের বাঁশকোড়ল তাদের অন্যতম প্রিয় ঐতিহ্যবাহী খাবার।
- ৪. নিজস্ব ভাষা ও ধর্ম: তাদের অধিকাংশের নিজস্ব কথ্য ভাষা ও লিপি রয়েছে। চাকমা ও মারমারা মূলত থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী; ত্রিপুরারা সনাতন হিন্দু ধর্মের; গারো ও সাঁওতালদের অনেকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেও তাদের ঐতিহ্যবাহী প্রকৃতির উপাসনার বহু রীতি এখনো ধারণ করে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: বাংলাদেশের কোন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে মাতৃতান্ত্রিক পরিবার ব্যবস্থা প্রচলিত?
উত্তর: বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের মধ্যে গারো এবং খাসিয়া সম্প্রদায়ে মাতৃতান্ত্রিক পরিবার কাঠামো প্রচলিত।
প্রশ্ন ২: ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য কী?
উত্তর: শহরের আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা (পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা) প্রতিটি গ্রামে পৌঁছে দেওয়া।
প্রশ্ন ৩: গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা কে এবং এর মূল বিশেষত্ব কী?
উত্তর: নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা; এর মূল বিশেষত্ব হলো গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ প্রদান।
প্রশ্ন ৪: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে নারীদের কোটা কত শতাংশ?
উত্তর: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য ৬০ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রশ্ন ৫: ম্যাক্স ওয়েবারের মতে সামাজিক স্তরবিন্যাসের তিনটি মূল স্তম্ভ কী কী?
উত্তর: ম্যাক্স ওয়েবারের মতে সামাজিক স্তরবিন্যাসের তিনটি ভিত্তি হলো—অর্থনৈতিক শ্রেণী (Class), সামাজিক মর্যাদা (Status) এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা (Power)।
প্রশ্ন ৬: পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী যৌথ উৎসবের নাম কী?
উত্তর: চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের যৌথ ঐতিহ্যবাহী প্রধান বর্ষবরণ উৎসবের নাম ‘বৈসাবি’ (বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজু)।