ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: উসমানীয় সাম্রাজ্য, পারস্য ও আফগানিস্তানের ইতিহাস (History of Ottoman Empire, Persia and Afghanistan)
বিষয় কোড: 205205 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
২০২১ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষের ‘উসমানীয় সাম্রাজ্য, পারস্য ও আফগানিস্তানের ইতিহাস’ (বিষয় কোড: 205205) পরীক্ষায় উসমানীয়দের আদি উৎপত্তি ও উসমানের অবদান, বায়েজিদ ও তৈমুরের সংঘর্ষ, প্রথম সেলিমের মিশর ও সিরিয়া জয়, মহামতি সুলাইমানের বৈশ্বিক শাসন, ক্রিমিয়ার যুদ্ধ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয়দের ভূমিকা, হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ ধ্বংস, সাফাভী শাহ ইসমাইল, আহমদ শাহ আবদালী এবং আমির হাবিবুল্লাহর সংস্কার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন স্থান পেয়েছে। নিম্নে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি প্রশ্নের প্রমিত ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান উপস্থাপন করা হলো।
ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)
১। উসমানীয় তুর্কী কারা? উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উসমানের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।
[Who were the Ottoman Turks? Evaluate the achievements of Uthman as the founder of the Ottoman empire.]
উত্তর:
উসমানীয় তুর্কিদের পরিচয়:
উসমানীয় তুর্কিরা ছিল মূলত মধ্য এশিয়ার তুর্কমেনদের ‘ওঘুজ’ (Oghuz) গোত্রভুক্ত ‘কায়ি’ (Kayi) উপজাতির বংশধর। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বাধীন রক্তপিপাসু মঙ্গোলদের বর্বর আক্রমণে মধ্য এশিয়া বিধ্বস্ত হলে কায়ি উপজাতির দলপতি সুলেইমান শাহ তার অনুসারীদের নিয়ে পশ্চিম দিকে হিজরত করেন। পরবর্তীতে তার পুত্র আরতুগ্রুল গাজীর নেতৃত্বে তারা আনাতোলিয়ায় (এশিয়া মাইনর) আগমন করেন। তৎকালীন রুমের সেলজুক সুলতান আলাউদ্দীন কায়কোবাদ মঙ্গোল ও বাইজেন্টাইন আক্রমণ প্রতিহতে আরতুগ্রুলের বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে তাকে বাইজেন্টাইন সীমান্তের সুগুত (Sogut) ও দমিনিক অঞ্চলের জায়গির প্রদান করেন। আরতুগ্রুলের মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র উসমান গাজীর নামানুসারেই এই রাজবংশ ও জাতি ইতিহাসে ‘উসমানীয় তুর্কি’ বা ‘অটোমান’ (Osmanli / Ottomans) নামে পরিচিত হয়।
উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রথম উসমানের (১২৮১-১৩২৬ খ্রি.) কৃতিত্ব:
১. স্বাধীন উসমানীয় আমিরাত প্রতিষ্ঠা (১২৯৯ খ্রি.): ১২৯৯ খ্রিস্টাব্দে মঙ্গোলদের আক্রমণে রুমের সেলজুক সালতানাত সম্পূর্ণ ভেঙে পড়লে উসমান গাজী সুগুত কেন্দ্রিক নিজস্ব স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজের নামে খুতবা পাঠ এবং রৌপ্যমুদ্রা জারির মাধ্যমে স্বাধীন উসমানীয় রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেন।
২. গাজী আদর্শ ও আধ্যাত্মিক সংযোগ: উসমান নিজেকে একজন ‘গাজী’ (ইসলামের সীমান্ত যোদ্ধা) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। বিখ্যাত সুফি সাধক শেখ এদেবালির সাথে আধ্যাত্মিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে তিনি তার কন্যা বালাকে বিবাহ করেন। শেখ এদেবালি তাকে যে ঐতিহাসিক তরবারি পরিয়ে দিয়েছিলেন (Sword of Osman), তা পরবর্তী ছয়শত বছর উসমানীয় সুলতানদের সিংহাসনারোহণের প্রতীক হিসেবে অনুসৃত হয়।
৩. বাইজেন্টাইন দুর্গ জয় ও সাম্রাজ্য বিস্তার: উসমান অত্যন্ত চতুরতার সাথে ক্ষুদ্র মুসলিম রাজ্যগুলোর সাথে বিবাদে না জড়িয়ে খ্রিস্টান বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালান। ১৩০২ সালে ঐতিহাসিক বাফিয়াসের যুদ্ধে বাইজেন্টাইন রাজকীয় বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে তিনি নিজের রণকৌশল প্রমাণ করেন। তিনি ইয়েনিশেহির ও কারাহিসার জয় করেন।
৪. বুরসা অবরোধ: জীবনের শেষভাগে তিনি সুরক্ষিত বাণিজ্যিক নগরী বুরসা (Prusa) অবরোধ করেন। ১৩২৬ সালে তার মৃত্যুর সামান্য পূর্বে তার পুত্র ওরখানের নেতৃত্বে বুরসার ঐতিহাসিক পতন ঘটে এবং তা উসমানীয়দের প্রথম সুরম্য রাজধানীতে পরিণত হয়।
৫. উদার শাসননীতি ও ইনসাফ: উসমান বিজিত খ্রিস্টান প্রজাদের ওপর কোনো জোরপূর্বক ধর্মান্তর চাপিয়ে দেননি; বরং তাদের জীবন, সম্পদ ও ধর্মের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় হাজার হাজার অমুসলিম প্রজা স্বেচ্ছায় উসমানীয় শাসনের আনুগত্য স্বীকার করে।
উপসংহার: উসমান গাজী ছিলেন এক স্বপ্নদ্রষ্টা সমরনায়ক ও ন্যায়পরায়ণ শাসক, যিনি সুগুতের ক্ষুদ্র পাহাড় থেকে যে সাম্রাজ্যের বীজ রোপণ করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে তিন মহাদেশব্যাপী সুবিশাল বিশ্বজয়ের মহীরুহে পরিণত হয়েছিল।
২। প্রথম বায়েজীদ ও তৈমুরের সংঘর্ষের কারণ আলোচনা কর। এর ফলাফল কী হয়েছিল?
[Discuss the causes of the conflict between Bayazid 1 and Timur. What were its results?]
উত্তর:
ভূমিকা: পঞ্চদশ শতাব্দীর সূচনা লগ্নে মুসলিম জাহানের দুই অপরাজেয় পরাক্রমশালী সমরনায়ক—উসমানীয় সুলতান প্রথম বায়েজিদ ইলদিরিম (বজ্র বিদ্যুৎ) এবং সমরকন্দের তিমুরীয় শাসক তৈমুর লং-এর মধ্যকার সংঘর্ষ মধ্যযুগীয় সামরিক ইতিহাসের এক চরম নাটকীয় রক্তক্ষয়ী সংঘাত। ১৪০২ সালে সংঘটিত আঙ্কারার যুদ্ধ উসমানীয় সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎকে সাময়িকভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
সংঘর্ষের মূল কারণসমূহ:
১. সাম্রাজ্যবাদী অহমিকা ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব: সুলতান বায়েজিদ নিকোপোলিসের ক্রুসেডারদের চূর্ণ করে বলকান ও আনাতোলিয়ার অপ্রতিদ্বন্দ্বী অধিপতি হয়েছিলেন; অপরদিকে তৈমুর পারস্য, মেসোপটেমিয়া ও ভারত জয় করে নিজেকে বিশ্ববিজেতা ভাবতেন। দুই উচ্চাভিলাষী শক্তির সীমানা আনাতোলিয়া-পারস্য সীমান্তে মুখোমুখি হলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।
২. বিদ্রোহী ও আশ্রয়প্রার্থীদের উসকানি: তৈমুর কর্তৃক বিতাড়িত বাগদাদের সুলতান আহমদ জালাইর এবং কারা ইউসুফ উসমানীয় সুলতান বায়েজিদের দরবারে আশ্রয় নেন। অপরদিকে বায়েজিদ কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত আনাতোলিয়ার স্থানীয় তুর্কমেন আমিররা তৈমুরের দরবারে গিয়ে বায়েজিদের বিরুদ্ধে নালিশ করে এবং তৈমুরকে আনাতোলিয়া আক্রমণের আমন্ত্রণ জানায়।
৩. আশ্রয়প্রার্থী হস্তান্তরে অস্বীকৃতি ও শিবাশ ধ্বংস: তৈমুর বায়েজিদকে তার শত্রুদের ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিলে স্বাধীনচেতা বায়েজিদ তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এর জবাবে তৈমুর ১৪০০ সালে উসমানীয় সীমান্ত শহর শিবাশ (Sivas) আক্রমণ করে রক্তক্ষয়ী গণহত্যা চালায় এবং বায়েজিদের প্রিয় পুত্র আরতুগ্রুলকে হত্যা করে।
৪. উদ্ধত ও অপমানজনক পত্র বিনিময়: তৈমুর ও বায়েজিদের মধ্যে যে ঐতিহাসিক পত্রবিনিময় হয়, তাতে উভয় শাসক পরস্পরকে চরম অবমাননাকর ও অপমানসূচক ভাষায় আক্রমণ করেন। তৈমুর বায়েজিদকে তুচ্ছ ‘তুর্কমেন ছাগলপালক’ বলে কটাক্ষ করলে বায়েজিদ তৈমুরের স্ত্রীদের জড়িয়ে চরম অসম্মানজনক প্রত্যুত্তর পাঠান, যা তৈমুরকে ক্ষিপ্ত করে।
আঙ্কারার যুদ্ধ (১৪০২ খ্রি.) ও এর ফলাফল:
১৪০২ সালের ২০ জুলাই আঙ্কারার প্রান্তরে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। বায়েজিদের সার্বীয় অশ্বারোহীরা বীরত্ব দেখালেও যুদ্ধের মোক্ষম মুহূর্তে উসমানীয় বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত তাতারি ও তুর্কমেন সৈন্যরা পক্ষ ত্যাগ করে তৈমুরের সাথে যোগ দেয়। বায়েজিদ সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেও পরাজিত ও বন্দি হন।
ফলাফল:
– সুলতান বায়েজিদ তৈমুরের বন্দিশালাতেই ১৪০৩ সালে ভগ্নহৃদয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
– তৈমুর সমগ্র আনাতোলিয়া পদানত করে পুরনো তুর্কমেন আমিরাতগুলোকে পুনরায় স্বাধীন করে দেন এবং উসমানীয় রাজপুত্রদের মধ্যে রাজ্য ভাগ করে দেন।
– উসমানীয় সাম্রাজ্যে শুরু হয় দীর্ঘ এগারো বছরের আত্মঘাতী ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ, যা ইতিহাসে ‘উসমানীয় অন্তর্বর্তীকালীন যুগ’ (Ottoman Interregnum – ১৪০২-১৪১৩ খ্রি.) নামে খ্যাত।
– তবে এ যুদ্ধের ফলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সাময়িকভাবে আরও পঞ্চাশ বছর বেঁচে থাকার সুযোগ পায়। পরবর্তীতে সুলতান প্রথম মুহাম্মদ পুনরায় উসমানীয় সাম্রাজ্যকে ঐক্যবদ্ধ করেন।
৩। সুলতান প্রথম সেলিমের সিরিয়া ও মিশর বিজয়ের গুরুত্ব নির্ধারণ কর।
[Trace the importance of the conquest of Syria and Egypt by Sultan Salim 1.]
উত্তর:
ভূমিকা: উসমানীয় সুলতান প্রথম সেলিম (১৫১২-১৫২০ খ্রি.), যিনি তার ক্ষিপ্রতা ও অদম্য সামরিক সংকল্পের কারণে ‘ইয়াভুজ’ (দমনকারী / কঠোর) নামে পরিচিত ছিলেন, মাত্র আট বছরের সংক্ষিপ্ত শাসনামলে উসমানীয় সালতানাতের ভৌগোলিক রূপরেখাকে দ্বিগুণ করেন। ইউরোপের পরিবর্তে প্রাচ্যের দিকে দৃষ্টি দিয়ে তিনি মামলুক সালতানাতের হাত থেকে সিরিয়া ও মিশর জয় করেন, যা উসমানীয় খিলাফতের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিল।
সিরিয়া ও মিশর বিজয়ের সামরিক পটভূমি:
১৫১৪ সালে চালদিরানের যুদ্ধে সাফাভী পারস্যের শাহ ইসমাইলকে পরাস্ত করার পর প্রথম সেলিম মামলুকদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন, যারা পারস্যের সাথে গোপন আঁতাত করেছিল।
১. মারজ দাবিকের যুদ্ধ (১৫১৬ খ্রি.): আলেপ্পোর অদূরে মারজ দাবিকের যুদ্ধে সেলিমের উন্নত উসমানীয় কামান ও মাস্কেটের সামনে মামলুক অশ্বারোহী বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং বৃদ্ধ মামলুক সুলতান কানসুহ আল-ঘোরি নিহত হন। সেলিম অনায়াসে দামেস্ক, আলেপ্পো ও সমগ্র সিরিয়া এবং ফিলিস্তিন জয় করেন।
২. রায়দানিয়ার যুদ্ধ (১৫১৭ খ্রি.): কায়রোর উপকণ্ঠে রায়দানিয়ার যুদ্ধে সেলিম শেষ মামলুক সুলতান তুমান বেকে পরাজিত করেন এবং জানুয়ারি ১৫১৭ সালে ঐতিহাসিক কায়রো নগরী দখল করেন।
সিরিয়া ও মিশর বিজয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
১. মামলুক সালতানাতের বিলুপ্তি: আড়াইশত বছরের ঐতিহ্যবাহী মামলুক শাসনের অবসান ঘটে এবং সিরিয়া ও মিশর উসমানীয় সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধ প্রদেশে পরিণত হয়।
২. পবিত্র হারামাইন শরিফাইনের অভিভাবকত্ব: মিশর বিজয়ের পর মক্কার শরিফ বারাকাত স্বয়ং কায়রোতে এসে কাবা ও মদিনার চাবি সেলিমের হাতে সমর্পণ করেন। সেলিম পরম বিনয়ে ঘোষণা করেন—তিনি হারামাইনের মালিক নন, বরং ‘খাদিমুল হারামাইন আশ-শরিফাইন’ (পবিত্র দুই মসজিদের সেবক)। এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে উসমানীয়দের মর্যাদা সর্বোচ্চ শিখরে উন্নীত হয়।
৩. উসমানীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠা: কায়রোতে অবস্থানরত নামমাত্র আব্বাসীয় বংশের শেষ খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র চাদর (বোরদা), তরবারি এবং খিলাফতের যাবতীয় রাজকীয় প্রতীক সুলতান প্রথম সেলিমের হাতে অর্পণ করেন। এর মাধ্যমে খিলাফত আরবদের হাত থেকে তুর্কি উসমানীয়দের হাতে হস্তান্তরিত হয় এবং সেলিম হন প্রথম উসমানীয় খলিফা।
৪. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ: মিশরের নীলনদ অববাহিকার বিপুল কৃষি রাজস্ব এবং লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরীয় আন্তর্জাতিক মসলা বাণিজ্যের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ উসমানীয়দের হস্তগত হয়।
উপসংহার: প্রথম সেলিমের সিরিয়া ও মিশর জয়ের ফলেই উসমানীয় সাম্রাজ্য একটি মূলত ইউরোপীয় আঞ্চলিক শক্তি থেকে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর কেন্দ্রীয় খিলাফত ও সুপারপাওয়ারে রূপান্তরিত হয়েছিল।
৪। শাসক হিসেবে মহামতি সুলাইমানের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the achievements of Sulaiman, the magnificent, as a rular.]
উত্তর:
ভূমিকা: উসমানীয় সাম্রাজ্যের দশম সুলতান প্রথম সুলাইমান (১৫২০-১৫৬৬ খ্রি.) ছিলেন রাজবংশের সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বাধিক সফল ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান শাসক। পাশ্চাত্যে তিনি তার অপরূপ জাঁকজমক ও শৌর্যের কারণে ‘সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট’ (Suleiman the Magnificent) এবং প্রাচ্যে তার নিখুঁত ন্যায়বিচার ও আইনি সংস্কারের জন্য ‘সুলাইমান কানুনী’ (আইনপ্রণেতা) নামে বিশ্ববিশ্রুত।
শাসক হিসেবে সুলাইমানের বহুমুখী কৃতিত্বসমূহ:
১. ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরে সামরিক দিগ্বিজয়:
– ১৫২১ সালে তিনি মধ্য ইউরোপের প্রধান প্রবেশদ্বার অত্যন্ত সুরক্ষিত বেলগ্রেড জয় করেন।
– ১৫২২ সালে খ্রিস্টান নাইটদের দুর্ভেদ্য রোডস দ্বীপ দখল করে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।
– ১৫২৬ সালে ঐতিহাসিক মোহাকসের যুদ্ধে (Battle of Mohacs) মাত্র দুই ঘণ্টার তীব্র রণকৌশলে হাঙ্গেরির রাজা দ্বিতীয় লুইকে পরাস্ত করে নিহত করেন এবং হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট দখল করেন।
– ১৫২৯ সালে তিনি হাবসবার্গ অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা অবরোধ করেন।
– অ্যাডমিরাল খায়রুদ্দীন বারবারোসার নেতৃত্বে উসমানীয় নৌবাহিনী ভূমধ্যসাগরকে কার্যত একটি ‘অটোমান হ্রদে’ পরিণত করে এবং ১৫৩৮ সালে প্রিভেজার নৌযুদ্ধে সম্মিলিত ইউরোপীয় হলি লিগকে পরাস্ত করে।
২. আইনি সংস্কার ও ‘কানুননামা’ প্রণয়ন:
সুলাইমানের সবচেয়ে অমর কীর্তি হলো সাম্রাজ্যের শত শত প্রচলিত ফরমান ও প্রথাকে শরিয়াহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে এক যুগান্তকারী ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রশাসনিক আইন সংহিতা ‘কানুন-ই-উসমানী’ (Kanunname) প্রণয়ন করা। তিনি করব্যবস্থাকে সহজ করেন, কৃষকদের ওপর সামন্ত অত্যাচার নিষিদ্ধ করেন এবং প্রজাদের নাগরিক অধিকার সুরক্ষা করেন।
৩. অর্থনৈতিক প্রাচুর্য ও ন্যায়বিচার:
তার সুশাসনে সাম্রাজ্যের বাণিজ্য ও রাজস্ব আকাশচুম্বী হয়। আদালতে ধনী-দরিদ্র এবং মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে কঠোর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হয়। তিনি ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সুরক্ষায় বিশেষ ফরমান জারি করেছিলেন।
৪. স্থাপত্য ও শিল্পকলার স্বর্ণযুগ:
বিশ্ববিখ্যাত প্রধান রাজকীয় স্থপতি মিমার সিনান (Mimar Sinan)-এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সুলাইমান। সিনানের অমর সৃষ্টি ইস্তাম্বুলের সুরম্য ‘সুলাইমানিয়া মসজিদ’, এদিরনের ‘সেলিমিয়া মসজিদ’ এবং জেরুজালেমের প্রাচীন দেওয়ালের পুনর্নির্মাণ সমকালীন পৃথিবীর স্থাপত্যের চূড়ান্তর নিদর্শন। সুলাইমান নিজেও ‘মুহিব্বি’ ছদ্মনামে উৎকৃষ্ট আরবি, ফার্সি ও তুর্কি ভাষায় কবিতা রচনা করতেন।
উপসংহার: সুলাইমান কানুনীর ৪৬ বছরের গৌরবময় রাজত্বকাল ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের শীর্ষ শিখর।
৫। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের কারণসমূহ লিপিবদ্ধ কর। উসমানীয় সাম্রাজ্যের ওপর এ যুদ্ধের প্রভাব আলোচনা কর।
[Write down the causes of the Crimean War. Discuss the impact of effects of this war on the Ottoman.]
উত্তর:
ভূমিকা: ১৮৫৩ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত কৃষ্ণসাগর উপদ্বীপে রাশিয়ার বিরুদ্ধে একদিকে উসমানীয় সাম্রাজ্য এবং তার মিত্রশক্তি গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স ও সার্ডিনিয়ার মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী আন্তর্জাতিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়, তাই ইতিহাসে ‘ক্রিমিয়ার যুদ্ধ’ (Crimean War) নামে পরিচিত। আধুনিক সমরাস্ত্র, টেলিগ্রাফ ও ফিল্ড হাসপাতালের সমন্বয়ে এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের প্রথম শিল্পভিত্তিক যুদ্ধ।
ক্রিমিয়ার যুদ্ধের প্রধান কারণসমূহ:
১. রাশিয়ার উষ্ণ জলসীমা নীতি ও প্রাচ্য সমস্যা (Eastern Question): জার প্রথম নিকোলাস উসমানীয় সাম্রাজ্যকে ‘ইউরোপের রুগ্ণ মানুষ’ আখ্যা দিয়ে এটি ভেঙে কৃষ্ণসাগর ও বসফরাস প্রণালী দিয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশের দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যবাদী স্বপ্ন দেখছিলেন।
২. ধর্মীয় স্থানসমূহের চাবি নিয়ে বিরোধ: ফিলিস্তিনের বেথলেহেম ও জেরুজালেমের পবিত্র গির্জাগুলোর অভিভাবকত্ব নিয়ে রোমান ক্যাথলিক (যাদের পেছনে ছিল ফ্রান্সের তৃতীয় নেপোলিয়ন) এবং গ্রিক অর্থোডক্স (যাদের পেছনে ছিল রাশিয়া)-দের মধ্যে তীব্র সংঘাত বাধে। সুলতান আব্দুল মজিদ ক্যাথলিকদের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিলে জার ক্ষুব্ধ হন।
৩. মেঞ্চিকফ মিশন ও জারের চরম দাবি: ১৮৫৩ সালে রাশিয়ার রাজকীয় দূত প্রিন্স মেঞ্চিকফ ইস্তাম্বুলে এসে দাবি জানান যে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ১ কোটি ২০ লক্ষ অর্থোডক্স খ্রিস্টান প্রজার নিরাপত্তা রক্ষার একচ্ছত্র দায়িত্ব রাশিয়াকে দিতে হবে। এটি উসমানীয় সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হওয়ায় সুলতান ব্রিটিশ ও ফরাসি সমর্থনে তা প্রত্যাখ্যান করেন।
৪. দানিয়ুবিয়ান প্রিন্সিপালিটি দখল ও সিনোপের যুদ্ধ: রাশিয়া উসমানীয়দের মলদাভিয়া ও ওয়ালাচিয়া দখল করে এবং ১৮৫৩ সালের নভেম্বরে সিনোপের নৌযুদ্ধে উসমানীয় নৌবহর ধ্বংস করে দেয়। এর জবাবে ব্রিটেন ও ফ্রান্স সরাসরি উসমানীয়দের পক্ষে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
উসমানীয় সাম্রাজ্যের ওপর ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব:
১. প্যারিস শান্তি চুক্তি (১৮৫৬) ও ইউরোপীয় কনসার্টে অন্তর্ভুক্তি: যুদ্ধে রাশিয়া সেবাস্তোপোলের পতনের পর শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। ১৮৫৬ সালের প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে উসমানীয় সাম্রাজ্যের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি লাভ করে এবং উসমানীয় সাম্রাজ্য প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ইউরোপীয় কনসার্ট’-এর সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কৃষ্ণসাগরকে অসামরিকায়ন করা হয়।
২. বৈদেশিক ঋণের ফাঁদে পতন: যুদ্ধের বিশাল সামরিক ব্যয়ভার বহনের জন্য উসমানীয় সরকার প্রথমবারের মতো ১৮৫৪ সালে লন্ডন ও প্যারিসের ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করে। পরবর্তী দুই দশকে এই ঋণ উসমানীয় রাজকোষকে সম্পূর্ণ দেউলিয়া করে দেয় এবং ইউরোপীয় শক্তিবর্গ উসমানীয় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ শুরু করে (Public Debt Administration)।
৩. তানযিমাত সংস্কারের বিস্তার (হাত্ত-ই-হুমায়ুন ১৮৫৬): পশ্চিমা মিত্রদের চাপে সুলতান ১৮৫৬ সালে রাজকীয় ফরমান জারি করে অমুসলিম প্রজাদের পূর্ণ নাগরিক ও ধর্মীয় সমতা প্রদান করতে বাধ্য হন, যা রক্ষণশীল মুসলিম উলামাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
উপসংহার: ক্রিমিয়ার যুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্য সামরিকভাবে জয়ী হলেও অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে পশ্চিমা ব্যাংকারদের ওপর পরাভরসাশীল হয়ে নিজের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করেছিল।
৬। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্য জার্মানির পক্ষাবলম্বন করেছিল কেন? এর ফলাফল কী হয়েছিল?
[Why was the Ottoman empire in favour of Germany in World War 1? What were its results?]
উত্তর:
ভূমিকা: ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে দীর্ঘ ছয়শত বছরের উসমানীয় সাম্রাজ্য তার জীবনের সবচেয়ে মারাত্মক ও অন্তিম জুয়াটি খেলেছিল। তৎকালীন তরুণ তুর্কি শাসকগোষ্ঠীর হঠকারী সিদ্ধান্তে সাম্রাজ্য জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার নেতৃত্বাধীন ‘অক্ষশক্তি’ বা ‘কেন্দ্রীয় শক্তি’-র পক্ষে মিত্রশক্তির (ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া) বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয়।
জার্মানির পক্ষাবলম্বনের কারণসমূহ:
১. রাশিয়ার চিরন্তন আগ্রাসন ভীতি: রাশিয়ার জার দীর্ঘদিন ধরে ইস্তাম্বুল ও দার্দানেলিস প্রণালী দখলের জন্য উসমানীয় সাম্রাজ্যের পেছনে লেগে ছিল। মিত্রশক্তি ব্রিটেন ও ফ্রান্স রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় উসমানীয়রা মিত্রশক্তির কাছে নিজেদের নিরাপদ মনে করেনি।
২. আনোয়ার পাশার প্রো-জার্মান মোহ: তরুণ তুর্কি তিন পাশার মূল নিয়ন্ত্রক যুদ্ধমন্ত্রী আনোয়ার পাশা ছিলেন বার্লিনে সামরিক অ্যাটাচে। তিনি জার্মান সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, অস্ত্রপ্রযুক্তি ও শৃঙ্খলায় অন্ধ বিশ্বাসী ছিলেন এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন জার্মানি এ যুদ্ধে জয়লাভ করবে।
৩. হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন: ১৯১২-১৩ সালের বলকান যুদ্ধে উসমানীয়রা তাদের প্রায় সমগ্র ইউরোপীয় সাম্রাজ্য হারিয়েছিল। তারা ভেবেছিল জার্মানির সহায়তায় বলকান ও ককেশাস অঞ্চল পুনরায় দখল করা সম্ভব হবে।
৪. ‘গোবেন’ ও ‘ব্রেসলাউ’ যুদ্ধজাহাজের নাটকীয়তা: ভূমধ্যসাগরে ব্রিটিশ নৌবহর দ্বারা তাড়া খেয়ে দুটি জার্মান আধুনিক ক্রুজার জাহাজ (Goeben এবং Breslau) বসফরাসে আশ্রয় নেয়। উসমানীয়রা জাহাজ দুটি ক্রয় করেছে দাবি করে সেগুলোতে অটোমান পতাকা উড়িয়ে কৃষ্ণসাগরে পাঠায়। উক্ত যুদ্ধজাহাজগুলো জার্মান অ্যাডমিরাল সুশনের আদেশে রাশিয়ার ওদেসা ও সেভাস্তোপোল বন্দরে বোমা বর্ষণ করে উসমানীয়দের অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুদ্ধে টেনে নামায়।
যুদ্ধে অংশগ্রহণের করুণ ও ঐতিহাসিক ফলাফল:
১. বহুমুখী সামরিক ফ্রন্ট ও বিপর্যয়: উসমানীয়রা সুয়েজ খাল, মেসোপটেমিয়া, ককেশাস ও গ্যালিপলিতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে। গ্যালিপলিতে মোস্তফা কামালের বীরত্বে ব্রিটিশদের হটালেও ককেশাস ও মধ্যপ্রাচ্যে উসমানীয়রা শোচনীয়ভাবে ভেঙে পড়ে।
২. আরব বিদ্রোহ ও ব্রিটেনের বিশ্বাসঘাতকতা: ব্রিটিশ গোয়েন্দা লরেন্স অব অ্যারাবিয়ার প্ররোচনায় মক্কার শরিফ হুসাইন খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে উসমানীয় সেনাদের পেছনে ছুরিকাঘাত করেন। ফলে হেজাজ, ফিলিস্তিন ও দামেস্ক বেদখল হয়ে যায়।
৩. সাম্রাজ্যের সামগ্রিক বিলুপ্তি ও সেভার্স চুক্তি (১৯২০): ১৯১৮ সালে মুদরোসের যুদ্ধবিরতিতে উসমানীয়রা আত্মসমর্পণ করে। সেভার্স চুক্তির মাধ্যমে উসমানীয় সাম্রাজ্যকে সম্পূর্ণ ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হয়।
৪. খিলাফতের চির অবসান ও নতুন তুরস্কের অভ্যুদয়: সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করে ১৯২৩ সালে ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামি খিলাফত বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।
খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)
৭। হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ ধ্বংসের কারণ এবং এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল আলোচনা কর।
[Discuss the causes and its far-reaching effects of the sack of Bagdad by Halaku Khan.]
উত্তর:
১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে চেঙ্গিস খানের পৌত্র হালাকু খান আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ অবরোধ করে ধূলিসাৎ করেন।
কারণ: শেষ আব্বাসীয় খলিফা আল-মুস্তাসিম বিল্লাহর দুর্বলতা ও সামরিক প্রস্তুতিহীনতা, শিয়া উজির ইবনুল আলকামীর বিশ্বাসঘাতকতা এবং খলিফা কর্তৃক মঙ্গোল বশ্যতা স্বীকার ও সামরিক সহায়তা প্রদানে অস্বীকৃতি জানানোর অহমিকা।
সুদূরপ্রসারী ফলাফল:
১. পাঁচশত বছরের গৌরবময় আব্বাসীয় খিলাফতের চির অবসান ঘটে।
২. তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানবিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র ‘বায়তুল হিকমাহ’ ও শত শত সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ধ্বংস হয়ে ইসলামি স্বর্ণযুগের বৌদ্ধিক ধারায় অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়।
৩. কয়েক লক্ষ নিরীহ নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং ইসলামের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু বাগদাদ থেকে পরবর্তীতে কায়রো ও অবশেষে ইস্তাম্বুলে স্থানান্তরিত হয়।
৮। সাফাভী বংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে শাহ ইসমাইলের অবদান মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the contributions of Shah Ismail as the founder of Safavid dynasty.]
উত্তর:
শাহ ইসমাইল (১৫০১-১৫২৪ খ্রি.) ছিলেন পারস্যের বিখ্যাত সাফাভী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। সুফি সাধক শেখ সাফি উদ্দিনের বংশধর ইসমাইল মাত্র ১৪ বছর বয়সে তার অনুগত ভক্ত ‘কিজিলবাশ’ (লাল টুপি পরিহিত) তুর্কমেন যোদ্ধাদের সমবেত করে আক-কোয়ুনলু শাসকদের পরাস্ত করেন এবং ১৫০২ সালে তাবরিজে নিজেকে পারস্যের শাহ ঘোষণা করেন। তিনি সমগ্র পারস্যকে এক শতাব্দীর পর একটি শক্তিশালী অখণ্ড সাম্রাজ্যে ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি পারস্যের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে দ্বাদশী শিয়া মতবাদকে বাধ্যতামূলক করেন, যা পারস্যকে পার্শ্ববর্তী সুন্নি উসমানীয় ও উজবেকদের থেকে এক স্বতন্ত্র জাতীয় ও ধর্মীয় পরিচয়ে রূপ দেয়। ১৫১৪ সালে চালদিরানের যুদ্ধে উসমানীয় সুলতান সেলিমের কাছে পরাজিত হলেও তিনি আধুনিক ইরানি জাতীয়তাবাদের চিরস্থায়ী ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছিলেন।
৯। স্বাধীন আফগানিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আহমদ শাহ আবদালীর কৃতিত্ব পর্যালোচনা কর।
[Review the achievements of Ahmad Shah Abdali as the founder of independent Afghanistan.]
উত্তর:
আহমদ শাহ আবদালী (১৭৪৭-১৭৭২ খ্রি.) ছিলেন আধুনিক স্বাধীন ও সার্বভৌম আফগান জাতিরাষ্ট্রের অবিসংবাদিত স্থপতি। নাদির শাহের মৃত্যুর পর ১৭৪৭ সালে কান্দাহারে পশতুন উপজাতিদের ‘লোয়া জিরগা’ সম্মেলনে তিনি বাদশাহ নির্বাচিত হয়ে ‘দুররানী সাম্রাজ্য’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি পরস্পর বিবদমান আফগান উপজাতিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করেন, কান্দাহারকে রাজধানী বানান এবং কাশ্মীর, পাঞ্জাব ও সিন্ধু জয় করে একটি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। তার সবচেয়ে ঐতিহাসিক গৌরবময় সাফল্য হলো ১৭৬১ সালে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে দিল্লির শাহ ওয়ালিউল্লাহর আমন্ত্রণে আগত হয়ে ভারতে মারাঠাদের অগ্রযাত্রা চূর্ণ করে দিয়ে মুসলিমদের অস্তিত্ব রক্ষা করা। এজন্য আফগানরা তাকে পরম শ্রদ্ধায় ‘বাবা-ই-আফগান’ বলে স্মরণ করে।
১০। আফগানিস্তানে আমীর হাবিবুল্লাহ প্রবর্তিত সংস্কারসমূহের বিবরণ দাও।
[Give an account of the reforms introduced by Amir Habibullah in Afghanistan.]
উত্তর:
আমির আবদুর রহমান খানের মৃত্যুর পর তার পুত্র আমির হাবিবুল্লাহ খান (১৯০১-১৯১৯ খ্রি.) আফগানিস্তানের সিংহাসনে আরোহণ করে দেশকে আধুনিকায়ন ও সংস্কারের পথে এগিয়ে নেন। তার প্রধান সংস্কারগুলো হলো:
১. শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কার: ১৯০৩ সালে কাবুলে আধুনিক পশ্চিমা ধাঁচের প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘হাবিবিয়া কলেজ’ স্থাপন করেন এবং একটি সামরিক একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। সাংবাদিক মাহমুদ তারজির ঐতিহাসিক প্রগতিশীল পত্রিকা ‘সিরাজুল আখবার’ প্রকাশে পৃষ্ঠপোষকতা দেন।
২. প্রযুক্তি ও অবকাঠামো: তিনি আফগানিস্তানে প্রথমবারের মতো মোটরগাড়ি, টেলিফোন, আধুনিক টেলিগ্রাফ ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেন। কাবুলে আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ করেন।
৩. পররাষ্ট্রনীতি: তিনি বিচক্ষণতার সাথে ব্রিটিশ ও রুশদের সাথে ভারসাম্য বজায় রাখেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে শত প্ররোচনা সত্ত্বেও আফগানিস্তানকে কঠোরভাবে নিরপেক্ষ রেখে দেশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: উসমানীয় সাম্রাজ্যের আদি প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
উত্তর: কায়ি তুর্কি উপজাতির দলপতি আরতুগ্রুল গাজীর পুত্র উসমান গাজী (প্রথম উসমান) ১২৯৯ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন উসমানীয় সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রশ্ন ২: আঙ্কারার যুদ্ধ কত সালে সংঘটিত হয়েছিল?
উত্তর: সুলতান প্রথম বায়েজিদ এবং সমরকন্দের বিজেতা তৈমুর লং-এর মধ্যে ১৪০২ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুলাই আঙ্কারার ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
প্রশ্ন ৩: প্রথম উসমানীয় সুলতান যিনি খলিফা উপাধি লাভ করেন তিনি কে?
উত্তর: সুলতান প্রথম সেলিম (ইয়াভুজ সুলতান সেলিম) ১৫১৭ সালে মিশর বিজয়ের পর সর্বশেষ আব্বাসীয় খলিফার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
প্রশ্ন ৪: ‘সুলাইমান কানুনী’ কাকে বলা হয় এবং কেন?
উত্তর: সুলতান প্রথম সুলাইমানকে ‘সুলাইমান কানুনী’ বলা হয়, কারণ তিনি সমগ্র উসমানীয় সাম্রাজ্যের জন্য এক সর্বজনীন ও প্রগতিশীল দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন সংহিতা (কানুননামা) প্রণয়ন করেছিলেন।
প্রশ্ন ৫: ক্রিমিয়ার যুদ্ধে রাশিয়ার প্রতিপক্ষ মূল অক্ষ কারা ছিল?
উত্তর: ক্রিমিয়ার যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্য, গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং সার্ডিনিয়া যৌথ মিত্রজোট গঠন করে যুদ্ধ করেছিল।
প্রশ্ন ৬: হালাকু খান কোন শতাব্দীতে বাগদাদ ধ্বংস করেন?
উত্তর: হালাকু খান ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, অর্থাৎ ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় রাজধানী বাগদাদ অবরোধ ও ধ্বংসসাধন করেন।