ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২০
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস (১৭৮৯ খ্রি. থেকে) (History of Modern Europe from 1789 A.D.)
বিষয় কোড: 205204 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
২০২০ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষের ‘আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস (১৭৮৯ খ্রি. থেকে)’ (বিষয় কোড: 205204) পরীক্ষায় ১৭৮৯ সালের বৈপ্লবিক ফরাসি জাগরণ, নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন, মেটারনিক ব্যবস্থা, ১৮৩০ সালের জুলাই বিপ্লব, জার্মানি ও ইতালির জাতীয়তাবাদী একত্রীকরণ এবং বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট সমন্বিত হয়েছে। নিচে শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির জন্য প্রশ্নগুলোর বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যসমৃদ্ধ সমাধান উপস্থাপন করা হলো।
ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)
১। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর।
[Discuss the causes and results of the French Revolution of 1789.]
উত্তর:
ভূমিকা: ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব ছিল আধুনিক মানবসভ্যতার রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী ঘটনা। ফ্রান্সে বুরবোঁ রাজতন্ত্রের চরম স্বৈরাচার, সামন্ততান্ত্রিক বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের বিরুদ্ধে ফরাসি বুর্জোয়া ও সাধারণ জনগণের এই রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ সমগ্র ইউরোপে ‘সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা’র অমর বাণী ছড়িয়ে দেয়।
ফরাসি বিপ্লবের প্রধান কারণসমূহ:
১. রাজনৈতিক কারণ: চতুর্দশ, পঞ্চদশ ও ষোড়শ লুইয়ের চরম স্বৈরাচারী ও আত্মকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা। চতুর্দশ লুইয়ের দম্ভোক্তি ছিল “আমিই রাষ্ট্র” (I am the State)। রাজারা ছিলেন ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতায় বিশ্বাসী এবং ১৭১৪ থেকে ১৭৮৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭৫ বছর জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সভা ‘এস্টেটস জেনারেল’ (States-General)-এর কোনো অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি। দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র এবং লেত্র দ্য ক্যাশে (Lettre de cachet) নামক পরোয়ানার মাধ্যমে বিনা বিচারে যেকোনো নাগরিককে বাস্তিল দুর্গে বন্দি করার কুপ্রথা জনরোষের সৃষ্টি করে।
২. সামাজিক বৈষম্য (এস্টেট ব্যবস্থা): ফরাসি সমাজ তিনটি অসম স্তরে বা এস্টেটে বিভক্ত ছিল:
– প্রথম এস্টেট (যাজক সম্প্রদায়): জনসংখ্যার মাত্র ১% হলেও তারা সমগ্র ফ্রান্সের এক-পঞ্চমাংশ ভূমির মালিক ছিল এবং টাইথ (Tithe) নামক ধর্মীয় কর আদায় করত, অথচ রাষ্ট্রকে কোনো কর দিত না।
– দ্বিতীয় এস্টেট (অভিজাত সম্প্রদায়): জনসংখ্যার প্রায় ২% ছিল অভিজাত, যারা উচ্চ সামরিক ও বেসামরিক পদ ভোগ করত এবং কর প্রদান থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল।
– তৃতীয় এস্টেট (সাধারণ নাগরিক): কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও ব্যবসায়ী সহ জনসংখ্যার ৯৭% ছিল এই স্তরে। তারা ‘ট্যালি’ (ভূমির কর), ‘ক্যাপিটেশন’ (মাথাপিছু কর), ‘গ্যাবেল’ (লবণ কর) সহ যাবতীয় রাষ্ট্রীয় করের গুরুভার বহন করত অথচ তাদের কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিল না।
৩. অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব: রাজপ্রাসাদ ভার্সাইয়ের অপরিমিত বিলাসিতা, রানি মেরি আঁতোয়ানেতের অপব্যয় এবং অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে (যেমন: সপ্তবর্ষীয় যুদ্ধ ও আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ) অংশগ্রহণের ফলে রাজকোষ সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে পড়ে। ১৭৮৮-৮৯ সালের ভয়াবহ ফসলহানি ও রুটির তীব্র সংকটে খাদ্য দাঙ্গা শুরু হয়।
৪. দার্শনিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান: রুশো, ভলতেয়ার এবং মন্টেস্কুর বিপ্লবী চিন্তা ফরাসি জনগণের চোখ খুলে দেয়। মন্টেস্কুর ‘ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি’, ভলতেয়ারের চার্চবিরোধী তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ এবং রুশোর ‘সামাজিক চুক্তি’ (Social Contract) তত্ত্বের “মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্রই সে শৃঙ্খলিত”—এই বাণী জনমনে চরম বিপ্লবের আগুন প্রজ্বলিত করে।
ফরাসি বিপ্লবের ঐতিহাসিক ফলাফল:
১. স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি: বুরবোঁ রাজবংশের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে এবং ষোড়শ লুই ও রানি মেরি আঁতোয়ানেতকে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ফ্রান্সে প্রথম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
২. সামন্ততন্ত্র ও যাজকীয় সুযোগ-সুবিধার বিনাশ: সামন্ত কর, বেগার খাটা এবং চার্চের যাবতীয় বিশেষ সুবিধাদি চিরতরে রদ করা হয়।
৩. মানব ও নাগরিক অধিকারের ঘোষণাপত্র: ১৭৮৯ সালের ২৬ আগস্ট গণপরিষদ ‘Declaration of the Rights of Man and of the Citizen’ গ্রহণ করে, যা আইনের দৃষ্টিতে সকল মানুষের সমতা নিশ্চিত করে।
৪. জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের বিস্তার: জাতীয়তাবাদী চেতনা সমগ্র ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে ১৯শ শতকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লব ও জাতীয় ঐক্যের জন্ম দেয়।
২। নেপোলিয়নের মহাদেশীয় ব্যবস্থা আলোচনা কর। এটি কিভাবে তার পতনের জন্য দায়ী ছিল?
[Discuss Napoleon’s Continental System. How was it responsible for his downfall?]
উত্তর:
ভূমিকা: ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সমগ্র ইউরোপীয় মহাদেশে সামরিক আধিপত্য বিস্তার করলেও অপরাজেয় নৌ-শক্তির অধিকারী গ্রেট ব্রিটেনকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হন। ১৮০৫ সালে ট্রাফালগারের নৌযুদ্ধে ব্রিটেনের নেলসনের কাছে ফরাসি নৌবাহিনী বিধ্বস্ত হলে নেপোলিয়ন সামরিক শক্তির বদলে অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে ব্রিটেনকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা নেন, যা ইতিহাসে ‘মহাদেশীয় ব্যবস্থা’ (Continental System) নামে পরিচিত।
মহাদেশীয় ব্যবস্থার বিবরণ:
নেপোলিয়নের লক্ষ্য ছিল ব্রিটেনের বৈদেশিক বাণিজ্য ধ্বংস করে তাকে অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা। এ লক্ষ্যে তিনি কয়েকটি বিখ্যাত ডিক্রি জারি করেন:
১. বার্লিন ডিক্রি (১৮০৬): সমগ্র ইউরোপীয় মহাদেশে ব্রিটিশ পণ্য প্রবেশ এবং ব্রিটিশ জাহাজের আগমন নিষিদ্ধ করা হয়।
২. মিলান ডিক্রি (১৮০৭): ঘোষণা করা হয় যে, যে নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ ব্রিটিশ বন্দরে ভিড়বে বা ব্রিটিশ শুল্ক দেবে, তাকে বাজেয়াপ্ত করা হবে।
এর জবাবে ব্রিটেন ‘অর্ডার ইন কাউন্সিল’ জারি করে ফরাসি নিয়ন্ত্রিত সকল বন্দরে পাল্টা সামুদ্রিক অবরোধ আরোপ করে।
মহাদেশীয় ব্যবস্থা নেপোলিয়নের পতনের জন্য কেন দায়ী ছিল?
মহাদেশীয় ব্যবস্থা ছিল নেপোলিয়নের রাজনৈতিক ও সামরিক জীবনের সবচেয়ে মারাত্মক ভুল (Blunder), যা নিম্নোক্ত উপায়ে তার পতন ডেকে আনে:
১. অর্থনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা: সমকালীন ইউরোপ দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্য, চিনি, কফি ও শিল্প কাঁচামালের জন্য ব্রিটেনের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল ছিল। ফ্রান্স মহাদেশের এই সুবিশাল চাহিদার বিকল্প জোগান দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ফলে সমগ্র ইউরোপে দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী হয় এবং সর্বত্র চোরাচালান শুরু হয়।
২. উপদ্বীপের যুদ্ধ (Peninsular War): পর্তুগাল মহাদেশীয় ব্যবস্থা মানতে অস্বীকৃতি জানালে নেপোলিয়ন ১৮০৭ সালে স্পেনের মধ্য দিয়ে পর্তুগাল আক্রমণ করেন এবং স্পেনের বৈধ বুরবোঁ রাজাকে হটিয়ে নিজের ভাই জোসেফ বোনাপার্টকে স্পেনের সিংহাসনে বসান। এর ফলে ক্ষুব্ধ স্প্যানিশ জনগণ গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে এবং ব্রিটিশ জেনারেল ওয়েলিংটন তাদের সহায়তা করেন। এই দীর্ঘ উপদ্বীপের যুদ্ধ নেপোলিয়নের সেরা ৩ লক্ষ সেনাকে নিঃশেষিত করে দেয়। নেপোলিয়ন নিজেই স্বীকার করেছিলেন, “স্পেনীয় ক্ষত আমাকে ধ্বংস করেছে।”
৩. মস্কো অভিযান (১৮১২) ও চরম বিপর্যয়: রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডার অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে মহাদেশীয় ব্যবস্থা ত্যাগ করলে ক্ষিপ্ত নেপোলিয়ন ৬ লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী (Grand Army) নিয়ে রাশিয়া আক্রমণ করেন। রাশিয়ার বিখ্যাত ‘পোড়ামাটি নীতি’ (Scorched Earth Policy) এবং রুশ শীতের ভয়াবহ তীব্রতায় নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়; মাত্র ২০-৩০ হাজার ভগ্নহৃদয় সৈন্য ফ্রান্সে ফিরতে সক্ষম হয়।
৪. মিত্রজোট গঠন ও চূড়ান্ত পতন: রাশিয়ায় বিপর্যয়ের পর ইউরোপীয় শক্তিবর্গ (প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া ও ব্রিটেন) সম্মিলিত মিত্রজোট গড়ে তোলে এবং ১৮১৩ সালে লাইপজিগের জাতিসমূহের যুদ্ধে এবং অবশেষে ১৮১৫ সালে ওয়াটারলুর যুদ্ধে নেপোলিয়নকে চিরতরে পরাজিত করে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত করে।
৩। ১৮৩০ সালের জুলাই বিপ্লবের কারণ ও তাৎপর্য মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the causes and significance of the July Revolution of 1830.]
উত্তর:
ভূমিকা: ১৮১৫ সালে ভিয়েনা কংগ্রেসের মাধ্যমে ফ্রান্সে বুরবোঁ বংশের অষ্টাদশ লুইকে পুনর্বাসিত করা হলেও ফরাসি জাতি বিপ্লবের চেতনা ভুলে যায়নি। ১৮২৪ সালে চরম প্রতিক্রিয়াশীল রাজা দশম চার্লস সিংহাসনে বসে বিপ্লবপূর্ব স্বৈরাচারী অভিজাততন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালালে ১৮৩০ সালের জুলাই মাসে ফ্রান্সে যে ত্রিদিবসীয় রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়, তাই ‘১৮৩০ সালের জুলাই বিপ্লব’ নামে পরিচিত।
১৮৩০ সালের জুলাই বিপ্লবের প্রধান কারণসমূহ:
১. দশম চার্লসের চরম প্রতিক্রিয়াশীল নীতি: তিনি ঘোষণা করেন, “প্রজাদের অধীনস্থ সাংবিধানিক রাজা হওয়ার চেয়ে কাঠ চেরাই করে জীবনধারণ করা শ্রেয়।” তিনি ক্ষতিপূরণ আইনের মাধ্যমে বিপ্লবে ক্ষতিগ্রস্ত অভিজাত ও চার্চকে ১০০ কোটি ফ্রাঁ ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন।
২. পোলিগনাকের কুশাসন ও ধর্মীয় গোঁড়ামি: চার্লস মধ্যপন্থী মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে চরম প্রতিক্রিয়াশীল যুবরাজ পোলিগনাককে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন, যিনি জনমতের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেন।
৩. জুলাই অর্ডিন্যান্স (July Ordinances): ১৮৩০ সালের ২৬ জুলাই দশম চার্লস চারটি স্বৈরাচারী অধ্যাদেশ জারি করেন: নবনির্বাচিত প্রতিনিধি সভা ভেঙে দেওয়া, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ, ভোটাধিকার নাটকীয়ভাবে সংকুচিত করা এবং নতুন নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়া। এটিই বিপ্লবের প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে কাজ করে।
৪. প্যারিসের প্রতিরোধ: সাংবাদিক অ্যাডলফ থিয়ার্স ও উদারপন্থীদের নেতৃত্বে জনতা প্যারিসের রাজপথে ব্যারিকেড গড়ে তোলে এবং মাত্র তিন দিন (২৭, ২৮ ও ২৯ জুলাই—যাকে ‘Three Glorious Days’ বলা হয়)-এর প্রতিরোধে দশম চার্লস পদত্যাগ করে ইংল্যান্ডে পলায়ন করেন।
জুলাই বিপ্লবের ঐতিহাসিক তাৎপর্য:
১. সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: বুরবোঁ বংশের পরিবর্তে অরলিয়েন্স বংশের লুই ফিলিপকে “ফরাসিদের রাজা” (King of the French) হিসেবে সিংহাসনে বসানো হয় এবং জনগণের সার্বভৌমিকতা স্বীকৃত হয়।
২. ভিয়েনা ব্যবস্থার ওপর প্রথম আঘাত: মেটারনিকের প্রতিষ্ঠিত স্থিতাবস্থা ও প্রতিক্রিয়াশীল নীতির ওপর এ বিপ্লব এক মারাত্মক আঘাত হানে।
৩. ইউরোপীয় দেশসমূহে প্রভাব: বেলজিয়াম নেদারল্যান্ডস থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে, পোল্যান্ড ও ইতালিতে জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটে।
৪। জার্মানির ঐক্য সাধনে বিসমার্কের ভূমিকা ও রক্ত ও লৌহ নীতি ব্যাখ্যা কর।
[Explain the role of Bismarck and Blood and Iron policy in the unification of Germany.]
উত্তর:
ভূমিকা: ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে খণ্ড-বিখণ্ড জার্মানিকে প্রুশিয়ার নেতৃত্বে একটি পরাক্রমশালী ঐক্যবদ্ধ জাতিরাষ্ট্রে পরিণত করার মহান স্থপতি ছিলেন অটো ফন বিসমার্ক (Otto von Bismarck)। তিনি ছিলেন এক বাস্তববাদী ও কূটনৈতিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিক (Realpolitik-এর জনক)।
‘রক্ত ও লৌহ নীতি’ (Blood and Iron Policy):
১৮৬২ সালে প্রুশিয়ার রাজা প্রথম উইলিয়াম বিসমার্ককে প্রধানমন্ত্রী (চ্যান্সেলর) নিযুক্ত করেন। পার্লামেন্টে বাজেট পাসের অচলাবস্থায় বিসমার্ক তার বিখ্যাত ভাষণে ঘোষণা করেন:
“সমসাময়িক যুগের মহান সমস্যাবলি কখনো বক্তৃতা বা সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রস্তাবের মাধ্যমে সমাধান হবে না—যা ছিল ১৮৪৮ ও ১৮৪৯ সালের মস্ত ভুল; বরং তা সমাধান হবে রক্ত ও লৌহ দিয়ে (by Blood and Iron)।”
‘রক্ত ও লৌহ নীতি’ বলতে বোঝায়—আদর্শবাদী আলোচনা বা গণতন্ত্রের বদলে সামরিক শক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ, নিখুঁত অস্ত্রসজ্জা এবং কূটনীতির সমন্বয়ে জাতীয় লক্ষ্য অর্জন করা।
জার্মানি ঐক্যে বিসমার্কের তিনটি সুপরিকল্পিত যুদ্ধ:
বিসমার্কের লক্ষ্য ছিল জার্মানি থেকে অস্ট্রিয়ার কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ বিতাড়িত করে প্রুশিয়ার অধীনে ঐক্য সম্পন্ন করা। এজন্য তিনি তিনটি সফল যুদ্ধ পরিচালনা করেন:
১. ডেনমার্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (১৮৬৪): শ্লেসউইগ ও হলস্টাইন নামক দুই জার্মান অধ্যুষিত ডাচির দখল নিয়ে বিসমার্ক চতুরতার সাথে অস্ট্রিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ডেনমার্ক পরাজিত হয় এবং গ্যাস্টিনের চুক্তি অনুযায়ী প্রুশিয়া লাভ করে শ্লেসউইগ এবং অস্ট্রিয়া পায় হলস্টাইন।
২. অস্ট্রো-প্রুশিয়ান যুদ্ধ বা স্যাডোয়ার যুদ্ধ (১৮৬৬): হলস্টাইনের প্রশাসনকে কেন্দ্র করে বিসমার্ক ইচ্ছা করেই অস্ট্রিয়ার সাথে বিরোধ বাধান। সাত সপ্তাহের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে জেনারেল ভন মল্টকের আধুনিক প্রুশিয়ান বাহিনী স্যাডোয়ার প্রান্তরে অস্ট্রিয়াকে চূর্ণবিচূর্ণ করে। প্রাগের চুক্তির মাধ্যমে জার্মানি থেকে অস্ট্রিয়া চিরতরে বহিষ্কৃত হয় এবং উত্তর জার্মান কনফেডারেশন গঠিত হয়।
৩. ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধ (১৮৭০-৭১): দক্ষিণ জার্মানির ক্যাথলিক রাজ্যগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল। বিসমার্ক ‘এমস টেলিগ্রাম’ বিকৃত করে ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নকে ক্ষিপ্ত করে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য করেন। ১৮৭০ সালে সেডানের যুদ্ধে ফরাসি বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং তৃতীয় নেপোলিয়ন বন্দি হন।
ফলাফল: ১৮৭১ সালের ১৮ জানুয়ারি পরাজিত ফ্রান্সের ভার্সাই রাজপ্রাসাদের বিখ্যাত ‘হল অব মিররস’-এ প্রুশিয়ার রাজা প্রথম উইলিয়ামকে ঐক্যবদ্ধ জার্মানির কায়জার (সম্রাট) ঘোষণা করা হয়। এভাবেই বিসমার্কের লৌহমুষ্টিতে আধুনিক জার্মানির ঐক্য সম্পন্ন হয়।
৫। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণসমূহ আলোচনা কর এবং এতে হিটলার কতটুকু দায়ী ছিলেন?
[Discuss the causes of the Second World War and how far was Hitler responsible for it?]
উত্তর:
ভূমিকা: ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী ও প্রাণঘাতী সামরিক সংঘাত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যায় ও একপেশে শর্তাবলি, উগ্র ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রত্যক্ষ ফসল ছিল এই বিশ্বযুদ্ধ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান কারণসমূহ:
১. ভার্সাই সন্ধির কঠোরতা ও জার্মানির অপমান: ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তিতে জার্মানিকে যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করে তার সমস্ত উপনিবেশ কেড়ে নেওয়া হয়, সামরিক শক্তি পঙ্গু করে দেওয়া হয় এবং অবাস্তব যুদ্ধক্ষতিপূরণ চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে জার্মান জাতির মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহা তীব্র হয়ে ওঠে।
২. লীগ অব নেশনসের ব্যর্থতা: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের কোনো নিজস্ব সৈন্যবাহিনী না থাকায় এটি জাপান কর্তৃক মাঞ্চুরিয়া দখল (১৯৩১) এবং ইতালি কর্তৃক আবিসিনিয়া আক্রমণ (১৯৩৫) থামাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
৩. তোষণ নীতি (Policy of Appeasement): ব্রিটেন ও ফ্রান্সের রক্ষণশীল সরকার কমিউনিস্ট ভীতি থেকে বাঁচার জন্য হিটলার ও মুসোলিনির একের পর এক অবৈধ রাজ্য দখলকে তোষণ বা নীরব সমর্থন দিয়ে প্রশ্রয় দেয় (যেমন: ১৯৩৮ সালের মিউনিখ চুক্তি)।
৪. উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সামরিক জোট: জার্মানি, ইতালি ও জাপানের মধ্যে ‘রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষচুক্তি’ (Axis Powers) গঠিত হয়।
হিটলারের একক দায়িত্ব ও ভূমিকা:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করার জন্য অ্যাডলফ হিটলার সিংহভাগ দায়ী ছিলেন। তার সুনির্দিষ্ট দায়িত্বগুলো নিম্নরূপ:
১. লেবেনস্রাউম (Lebensraum – Living Space) নীতি: হিটলার বিশ্বাস করতেন যে উচ্চতর আর্য জার্মান জাতির বেঁচে থাকার জন্য পূর্ব ইউরোপের স্লাভ ভূখণ্ড দখল করা জরুরি।
২. ভার্সাই চুক্তি পদদলিত করা: ১৯৩৫ সালে তিনি বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু করেন, ১৯৩৬ সালে রাইনল্যান্ডে সেনা মোতায়েন করেন এবং ১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়া দখল (Anschluss) করেন।
৩. চেকোস্লোভাকিয়া গ্রাস: মিউনিখ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে হিটলার সমগ্র চেকোস্লোভাকিয়া দখল করেন।
৪. নাৎসি-সোভিয়েত অনাক্রমণ চুক্তি ও পোল্যান্ড আক্রমণ: ১৯৩৯ সালের আগস্টে স্তালিনের সাথে পোল্যান্ড ভাগাভাগির গোপন চুক্তি করে হিটলার ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ পোল্যান্ড আক্রমণ করেন। এর জবাবে ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
উপসংহার: যদিও বিশ্বযুদ্ধের অনুকূল ক্ষেত্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী ভূরাজনীতি তৈরি করেছিল, কিন্তু হিটলারের দানবীয় যুদ্ধলিপ্সা, বর্ণবাদী অহমিকা এবং বিশ্বজয়ের উগ্র উন্মাদনাই বিশ্বকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের নরকাগ্নিতে নিক্ষেপ করেছিল।
৬। ইতালির ঐক্য আন্দোলনে ক্যাভুর ও গ্যারিবল্ডির অবদান আলোচনা কর।
[Discuss the contributions of Cavour and Garibaldi in the unification movement of Italy.]
উত্তর:
ভূমিকা: ভিয়েনা কংগ্রেসের পর ইতালি কেবল একটি “ভৌগোলিক সংজ্ঞা” (Geographical Expression)-তে পরিণত হয়েছিল। অগণিত ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ইতালিকে সার্ডিনিয়া-পিডমন্টের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করার পেছনে কাউন্ট ক্যামিলো ক্যাভুরের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং জুসেপ্পে গ্যারিবল্ডির অকুতোভয় সামরিক অভিযান ছিল মূল চালিকাশক্তি।
কাউন্ট ক্যাভুরের অবদান (The Brain of Italian Unification):
১. পিডমন্টের আধুনিকায়ন: প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্যাভুর পিডমন্টের অর্থনীতি, রেলপথ, শিল্প এবং সামরিক বাহিনীকে ইউরোপীয় মানে উন্নীত করেন।
২. ইতালি সমস্যার আন্তর্জাতিকীকরণ: তিনি উপলব্ধি করেন যে অস্ট্রিয়াকে পরাজিত না করে ইতালির ঐক্য অসম্ভব, আর একা পিডমন্টের পক্ষে অস্ট্রিয়াকে হারানো সম্ভব নয়। তাই ১৮৫৫ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের পক্ষে সৈন্য পাঠিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক সমর্থন ও প্যারিস শান্তি সম্মেলনে ইতালীয় সমস্যা আলোচনার টেবিলে আনেন।
৩. প্লমবিয়ার্সের গোপন চুক্তি (১৮৫৮): ক্যাভুর ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের সাথে চুক্তি করে নিস ও স্যাভয় ফ্রান্সকে প্রদানের বিনিময়ে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ফরাসি সামরিক সহায়তা নিশ্চিত করেন।
৪. উত্তর ও মধ্য ইতালির সংযুক্তি: ১৮৫৯ সালের যুদ্ধে অস্ট্রিয়া পরাজিত হয়ে লোম্বার্ডি পিডমন্টকে ছেড়ে দেয়। এরপর ক্যাভুর কূটনৈতিক কৌশলে পার্মা, মডেনা, টাসকানি ও রোমানিয়ায় গণভোটের আয়োজন করে তাদের পিডমন্টের সাথে যুক্ত করেন।
জুসেপ্পে গ্যারিবল্ডির অবদান (The Sword of Italian Unification):
১. রেড শার্ট বা লাল কুর্তা বাহিনী: গ্যারিবল্ডি ছিলেন এক ক্যারিশম্যাটিক বিপ্লবী গেরিলা যোদ্ধা। তিনি এক হাজার দেশপ্রেমিক তরুণকে নিয়ে গঠিত ‘রেড শার্ট’ বাহিনী নিয়ে ১৮৬০ সালে সিসিলি ও নেপলস (দক্ষিণ ইতালি) মুক্ত করতে অভিযান চালান।
২. সিসিলি ও নেপলস বিজয়: অভাবনীয় রণনৈপুণ্যে তিনি বুরবোঁ বাহিনীকে পরাস্ত করে সিসিলি এবং পরবর্তীতে নেপলস দখল করে নিজেকে সেখানকার একনায়ক ঘোষণা করেন।
৩. মহান দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ: গ্যারিবল্ডি নিজে ক্ষমতালোভী ছিলেন না। তিনি সমগ্র বিজিত দক্ষিণ ইতালিকে নিঃশর্তভাবে পিডমন্টের রাজা ভিক্টর ইমানুয়েলের হাতে সমর্পণ করেন এবং একটিমাত্র বস্তা শস্যদানা নিয়ে নিজ খামারে ফিরে যান। তার এই আত্মত্যাগ ইতিহাসে বিরল।
উপসংহার: ক্যাভুরের দূরদর্শী কূটনীতি এবং গ্যারিবল্ডির তরবারির সমন্বয়ে ১৮৬১ সালে ঐক্যবদ্ধ ইতালি রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ভিক্টর ইমানুয়েল ইতালির প্রথম রাজা ঘোষিত হন।
খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)
৭। মেটারনিক ব্যবস্থা (Metternich System) কী?
[What is Metternich System?]
উত্তর:
১৮১৫ থেকে ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর প্রিন্স মেটারনিক ইউরোপীয় রাজনীতিতে যে ঘোর রক্ষণশীল, বিপ্লববিরোধী ও স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার নীতি কার্যকর করেছিলেন, তাকে ‘মেটারনিক ব্যবস্থা’ (Metternich System) বলা হয়। তিনি ফরাসি বিপ্লবের সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার ধারণাকে “রোগবালাই” মনে করতেন। এ ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল: রাজতন্ত্র ও চার্চের অধিকার টিকিয়ে রাখা, সংবাদপত্রের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশি গুপ্তচর নিয়োগ এবং ইউরোপের কোথাও বিদ্রোহ দেখা দিলে সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তা কঠোরভাবে দমন করা।
৮। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পটভূমি সংক্ষেপে লেখ।
[Write briefly about the background of the establishment of the United Nations.]
উত্তর:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পটভূমিতে বিশ্বশান্তি রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের অভিশাপ থেকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ (UN) প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পটভূমি নির্মিত হয়েছিল মিত্রশক্তির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের মাধ্যমে: ১৯৪১ সালের ‘লন্ডন ঘোষণা’ ও চার্চিল-রুজভেল্টের ‘আটলান্টিক সনদ’, ১৯৪৩ সালের ‘মস্কো ও তেহরান সম্মেলন’, ১৯৪৪ সালের ‘ডাম্বার্টন ওকস সম্মেলন’ (যেখানে জাতিসংঘের রূপরেখা প্রণীত হয়) এবং ১৯৪৫ সালের ঐতিহাসিক ‘ইয়াল্টা সম্মেলন’। পরিশেষে ১৯৪৫ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে সানফ্রান্সিসকো সম্মেলনে ৫০টি দেশের প্রতিনিধিরা সনদ স্বাক্ষর করেন এবং ২৪ অক্টোবর ১৯৪৫ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের যাত্রা শুরু হয়।
৯। ভিয়েনা কংগ্রেসে গৃহীত প্রধান নীতিসমূহ কী ছিল?
[What were the main principles accepted in the Vienna Congress?]
উত্তর:
১৮১৫ সালে নেপোলিয়নের পতনের পর ইউরোপের পুনর্গঠনের জন্য অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক কংগ্রেসে তিনটি মূল নীতি গৃহীত হয়:
১. ন্যায্য অধিকারের নীতি (Principle of Legitimacy): বিপ্লবপূর্ব ইউরোপীয় বংশানুক্রমিক রাজপরিবারগুলোকে পুনরায় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করা (যেমন: ফ্রান্সে বুরবোঁদের পুনর্বাসন)।
২. ক্ষতিপূরণ নীতি (Principle of Compensation): নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মিত্রশক্তিগুলোর ভূখণ্ড ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা (যেমন: অস্ট্রিয়া কর্তৃক ভেনিস ও লোম্বার্ডি লাভ)।
৩. শক্তিসাম্য নীতি (Principle of Balance of Power): ফ্রান্স যেন ভবিষ্যতে পুনরায় আক্রমণাত্মক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে না পারে, সেজন্য তার চারপাশের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে শক্তিশালী করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সীমান্ত প্রাচীর তৈরি করা।
১০। কনসার্ট অব ইউরোপ (Concert of Europe) বলতে কী বোঝায়?
[What is meant by the Concert of Europe?]
উত্তর:
১৮১৫ সালের ভিয়েনা কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ইউরোপের প্রধান বৃহৎ শক্তিবর্গ—অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, প্রুশিয়া ও গ্রেট ব্রিটেন (পরবর্তীতে ফ্রান্সসহ)—ইউরোপীয় শান্তি, সীমানা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য যে যৌথ আন্তর্জাতিক পরামর্শ সভা বা জোট কাঠামো গড়ে তুলেছিল, তাকে ‘কনসার্ট অব ইউরোপ’ (Concert of Europe বা ইউরোপীয় শক্তি সমবায়) বলা হয়। এক্স-লা-শাপেল (১৮১৮), ট্রপো (১৮২০), লাইবাখ (১৮২১) ও ভেরোনা (১৮২২) সম্মেলনের মাধ্যমে এ সমবায় বিভিন্ন দেশে সংঘটিত উদারনৈতিক বিপ্লব সামরিক শক্তির সাহায্যে দমন করার নীতি পরিচালনা করত।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ফরাসি বিপ্লবের প্রধান স্লোগান কী ছিল?
উত্তর: ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের সর্বজনীন ও ঐতিহাসিক স্লোগান ছিল “সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা” (Liberty, Equality, Fraternity)।
প্রশ্ন ২: নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে কেন ‘বিপ্লবের সন্তান’ বলা হয়?
উত্তর: ১৭৮৯ সালের বিপ্লবোদ্ভুত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই এক সাধারণ কর্সিকান পরিবার থেকে নেপোলিয়নের সামরিক উত্থান ঘটে এবং তিনি বিপ্লবের বহু সংস্কারকে আইনি রূপ দিয়েছিলেন বলে তাকে বিপ্লবের সন্তান বলা হয়।
প্রশ্ন ৩: বিসমার্কের ‘রক্ত ও লৌহ নীতি’র মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: কোনো প্রকার তাত্ত্বিক আলোচনায় সময়ক্ষেপণ না করে উন্নত সামরিক অস্ত্রসজ্জা ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রুশিয়ার অধীনে জার্মান জাতির ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ঐক্য সম্পন্ন করাই ছিল এ নীতির উদ্দেশ্য।
প্রশ্ন ৪: ইতালির ঐক্যে গ্যারিবল্ডির বাহিনীর নাম কী ছিল?
উত্তর: গ্যারিবল্ডির নেতৃত্বে গঠিত বিপ্লবী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর নাম ছিল ‘লাল কুর্তা বাহিনী’ বা ‘রেড শার্টস’ (Red Shirts)।
প্রশ্ন ৫: হিটলারের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির পেছনে প্রধান মতাদর্শ কী ছিল?
উত্তর: আর্য জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা এবং পূর্ব ইউরোপে জার্মানদের জন্য বাসযোগ্য স্থান বা ‘লেবেনস্রাউম’ (Lebensraum) দখল করাই ছিল হিটলারের প্রধান মতাদর্শ।
প্রশ্ন ৬: ভিয়েনা কংগ্রেসের মধ্যমণি কে ছিলেন?
উত্তর: ১৮১৫ সালের ভিয়েনা কংগ্রেসের সভাপতি ও মধ্যমণি ছিলেন অস্ট্রিয়ার কূটকৌশলী ও রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স মেটারনিক।