ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২০
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: উসমানীয় সাম্রাজ্য, পারস্য ও আফগানিস্তানের ইতিহাস (History of Ottoman Empire, Persia and Afghanistan)
বিষয় কোড: 205205 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
২০২০ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষের ‘উসমানীয় সাম্রাজ্য, পারস্য ও আফগানিস্তানের ইতিহাস’ (বিষয় কোড: 205205) পরীক্ষায় উসমানীয় সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্প্রসারণকারী সুলতানদের কৃতিত্ব, দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের প্যান-ইসলামিজম, তরুণ তুর্কি আন্দোলন, পারস্যের ইলখানি ও সাফাভী রাজবংশের শাসন এবং আধুনিক আফগানিস্তানের অভ্যুদয় সংক্রান্ত প্রশ্নসমূহ স্থান পেয়েছে। নিম্নে প্রতিটি প্রশ্নের প্রমিত ঐতিহাসিক ও তথ্যবহুল সমাধান প্রদান করা হলো।
ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)
১। উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিস্তার ও সুদৃঢ়করণে সুলতান প্রথম মুরাদের অবদান আলোচনা কর।
[Discuss the contribution of Sultan Murad I in the expansion and consolidation of the Ottoman Empire.]
উত্তর:
ভূমিকা: উসমানীয় সালতানাতের আদি প্রতিষ্ঠাতা উসমান এবং ওরখানের পর সাম্রাজ্যকে এশিয়া মাইনরের ক্ষুদ্র সীমান্ত রাষ্ট্র থেকে ইউরোপের বুকে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তিতে রূপান্তরের মূল কারিগর ছিলেন সুলতান প্রথম মুরাদ (১৩৫৯-১৩৮৯ খ্রি.)। তিনি ছিলেন একাধারে দক্ষ সমরনায়ক, বিচক্ষণ কূটনীতিক এবং উসমানীয় রাজবংশের প্রথম শাসক যিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সুলতান’ উপাধি গ্রহণ করেন।
প্রথম মুরাদের প্রধান ঐতিহাসিক অবদানসমূহ:
১. ইউরোপের বলকান অঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তার:
মুরাদ এশিয়া মাইনর অপেক্ষা ইউরোপীয় ফ্রন্টে সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেন। ১৩৬১ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান সুরক্ষিত নগরী এড্রিয়ানোপল (আধুনিক এদিরনে) জয় করেন এবং ১৩৬৫ সালে উসমানীয় রাজধানী এশিয়া মাইনরের বুরসা থেকে এদিরনেতে স্থানান্তর করেন। এর ফলে সমগ্র বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও বলকান ইউরোপের ওপর প্রত্যক্ষ উসমানীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
২. মারিৎসার যুদ্ধ (১৩৭১ খ্রি.):
মুরাদের বিজয়ে ভীত হয়ে সার্বিয়া, বসনিয়া, হাঙ্গেরি ও ওয়ালাচিয়া সম্মিলিত খ্রিস্টান বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলে মারিৎসা নদীর তীরে উসমানীয় সেনাপতি লালা শাহিনের নৈশ আক্রমণে মিত্রবাহিনী শোচনীয়ভাবে বিধ্বস্ত হয়। এ বিজয়ের ফলে সার্বিয়া ও মেসিডোনিয়া উসমানীয় করদ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
৩. ইয়েনিসেরী (Janissary) বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ:
প্রথম মুরাদের সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক সংস্কার হলো ‘ইয়েনিসেরী’ (নতুন সৈন্য) বাহিনীর সুসংগঠিত রূপদান। বলকান অঞ্চলের বিজিত খ্রিস্টান প্রজাদের মধ্য থেকে দেবশিরমে (Devshirme) পদ্ধতির মাধ্যমে কিশোরদের নির্বাচন করে কঠোর ইসলামি শিক্ষা ও অনুশাসনে প্রশিক্ষিত করে এই এলিট অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী গড়ে তোলা হয়। তারা প্রত্যক্ষভাবে সুলতানের প্রতি অনুগত থাকত এবং উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিশ্বজয়ের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
৪. ঐতিহাসিক কসোভোর যুদ্ধ (১৩৮৯ খ্রি.):
সার্বিয়ার রাজা লাজার উসমানীয় আধিপত্য ধ্বংসের জন্য বলকানের এক বিশাল যৌথ ক্রুসেডার বাহিনী গঠন করেন। ১৩৮৯ সালের ১৫ জুন কসোভোর প্রান্তরে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রথম মুরাদ সার্ব বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে ধূলিসাৎ করে দেন। সার্বিয়ার রাজা লাজার যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন। যুদ্ধের পর ময়দান পরিদর্শনের সময় এক আহত সার্ব সেনা (মিলোশ ওবিলিচ) কপট আত্মসমর্পণের ছলে বিষাক্ত ছুরিকাঘাতে সুলতান মুরাদকে শাহাদাতবরণ করায়।
উপসংহার: প্রথম মুরাদের ত্রিশ বছরের অবিশ্রান্ত সামরিক অভিযান ও প্রজ্ঞাবান প্রশাসনিক সংস্কারের ফলেই উসমানীয়রা ইউরোপের স্থায়ী পরাশক্তিতে উন্নীত হয় এবং কসোভোর বিজয় ভবিষ্যতের কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পথ সুগম করে দেয়।
২। সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ এবং প্যান-ইসলামিজম (ইসলামিক ঐক্য আন্দোলন) সম্পর্কে আলোচনা কর।
[Discuss Sultan Abdul Hamid II and Pan-Islamism.]
উত্তর:
ভূমিকা: উসমানীয় সাম্রাজ্যের চরম সংকটময় ও অবক্ষয়কালীন মুহূর্তে সিংহাসনে আরোহণ করেন সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ (১৮৭৬-১৯০৯ খ্রি.)। পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ যখন উসমানীয় সাম্রাজ্যকে ‘ইউরোপের রুগ্ণ মানুষ’ (Sick Man of Europe) আখ্যা দিয়ে ছিন্নভিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, তখন তিনি সাম্রাজ্যের সংহতি রক্ষা এবং বিশ্ব মুসলিমের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য ‘প্যান-ইসলামিজম’ (Pan-Islamism বা ইত্তেহাদ-ই-ইসলাম) নীতিকে রাষ্ট্রীয় প্রধান পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে গ্রহণ করেন।
প্যান-ইসলামিজমের ধারণা ও পটভূমি:
প্যান-ইসলামিজম হলো বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত সকল মুসলিম জাতি ও দেশকে একটি অভিন্ন বিশ্বাস, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং সর্বজনীন উসমানীয় খিলাফতের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করার রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক মতবাদ। প্রখ্যাত সংস্কারক সাইয়্যিদ জামালুদ্দীন আল-আফগানির চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ একে কার্যকর রূপ দেন।
সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ:
১. খলিফা হিসেবে আধ্যাত্মিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার: পূর্বে উসমানীয় সুলতানরা নিজেদের মূলত সামরিক সাম্রাজ্যের অধিপতি ভাবতেন। কিন্তু আব্দুল হামিদ নিজেকে সমগ্র মুসলিম জাহানের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ‘খলিফা’ হিসেবে জোরেশোরে তুলে ধরেন। তিনি ভারত, মধ্য এশিয়া, চীন ও আফ্রিকার মুসলিম জনগণের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং তাদের পক্ষে ব্রিটিশ, রুশ ও ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বার্তা পাঠান।
২. হিজাজ রেলওয়ে নির্মাণ (১৯০০-১৯০৮): প্যান-ইসলামিজমের বাস্তব স্মারক ছিল দামেস্ক থেকে পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারা পর্যন্ত দীর্ঘ সুবিশাল ‘হিজাজ রেলওয়ে’ নির্মাণ। সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমাদের কোনো ঋণ বা অনুদান গ্রহণ না করে সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের চাঁদা ও অনুদানে এই রেলওয়ে নির্মিত হয়। এটি মুসলিমদের হজের যাত্রা সহজতর করে এবং বিশ্ব মুসলিম সংহতির অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
৩. মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও আলেমদের সমবেতকরণ: তিনি ইস্তাম্বুলে বিশ্ব মুসলিম পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানান, আরবি প্রেস স্থাপন করেন এবং বিভিন্ন ভাষায় ইসলামি সাময়িকী প্রকাশ করে মুসলিম বিশ্বে পাঠিয়ে খিলাফতের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
৪. জায়নবাদী চক্রান্ত প্রতিহতকরণ: জায়নবাদের জনক থিওডোর হার্জেল সুলতানের রাজকোষের যাবতীয় বিপুল বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বিনিময়ে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য বসতি ও ভূমি দাবি করলে দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “আমি আমার সাম্রাজ্যের এক ইঞ্চি ভূমিও বিক্রি করতে পারি না; কারণ এই ভূমি আমার নয়, আমার মুসলিম উম্মাহর, যারা রক্ত দিয়ে এটি অর্জন করেছে।”
উপসংহার: যদিও পশ্চিমা অপপ্রচার ও অভ্যন্তরীণ ধর্মনিরপেক্ষ তরুণ তুর্কিদের বিদ্রোহে ১৯০৯ সালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, কিন্তু দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের প্যান-ইসলামিক নীতি বিশ্ব মুসলিম জাগরণ এবং ঔপনিবেশিকতাবিরোধী চেতনার চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে।
৩। তুরস্কে তরুণ তুর্কি আন্দোলনের (Young Turks Movement) কারণ ও ফলাফল মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the causes and results of the Young Turks Movement in Turkey.]
উত্তর:
ভূমিকা: বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এক আমূল রূপান্তর ঘটায় ‘তরুণ তুর্কি আন্দোলন’ (Young Turks Movement)। পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী, সামরিক কর্মকর্তা এবং ‘কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রগ্রেস’ (İttihat ve Terakki)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্দোলন ১৯০৮ সালে তুরস্কে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সাংবিধানিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
তরুণ তুর্কি আন্দোলনের প্রধান কারণসমূহ:
১. ১৮৭৬ সালের সংবিধান স্থগিতকরণ: সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ ক্ষমতায় এসে ১৮৭৬ সালে মিদহাত পাশা প্রণীত প্রগতিশীল সংবিধান স্থগিত করেন এবং পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে একক কর্তৃত্ববাদী শাসন জারি করেন, যা শিক্ষিত তুর্কি যুবকদের বিক্ষুব্ধ করে।
২. পশ্চিমিকরণ ও আধুনিক রাষ্ট্রচেতনা: প্যারিস ও জেনেভায় নির্বাসিত তুর্কি শিক্ষার্থীরা ফরাসি বিপ্লবের গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও সাংবিধানিক স্বাধীনতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বদেশে সংস্কার দাবি করে।
৩. সামরিক অফিসারদের অসন্তোষ: মেসিডোনিয়া ও বলকান ফ্রন্টে নিয়োজিত তরুণ সামরিক অফিসারগণ (যেমন: আনোয়ার পাশা, নিয়াযি বে) সৈন্যদের বেতন বকেয়া এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন।
৪. রেভাল সাক্ষাৎকারের ভীতি (১৯০৮): রাশিয়ার জার ও ব্রিটেনের রাজার মধ্যে রেভাল বৈঠকে মেসিডোনিয়া বিভাজনের গোপন আলোচনার খবর ফাঁস হলে তুর্কি জাতীয়তাবাদীরা সাম্রাজ্য রক্ষার স্বার্থে তাৎক্ষণিক অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত নেয়।
আন্দোলনের ঘটনাক্রম ও ১৯০৮ সালের বিপ্লব:
১৯০৮ সালের জুলাই মাসে মেজর আহমদ নিয়াযি ও আনোয়ার পাশা মেসিডোনিয়ার রেসেনে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তৃতীয় সেনা কোর বিদ্রোহীদের সমর্থন জানালে এবং রাজধানী অভিমুখে অগ্রসর হলে দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ নতিস্বীকার করতে বাধ্য হন এবং ২৪ জুলাই ১৯০৮ সংবিধানে পুনরায় স্বাক্ষর করে পার্লামেন্ট অধিবেশন আহ্বান করেন।
তরুণ তুর্কি আন্দোলনের ঐতিহাসিক ফলাফল:
১. সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের পতন: ১৯০৯ সালে রক্ষণশীলদের এক ব্যর্থ প্রতিবিপ্লবের পর তরুণ তুর্কিরা দ্বিতীয় আব্দুল হামিদকে সম্পূর্ণরূপে সিংহাসনচ্যুত করে তার ভাই পঞ্চম মুহাম্মদ রশাদকে নামমাত্র পুতুল সুলতান বানায়।
২. তিন পাশার একনায়কতন্ত্র: ক্ষমতা চলে যায় তরুণ তুর্কি দলের তিন প্রভাবশালী নেতা—আনোয়ার পাশা (যুদ্ধমন্ত্রী), তালাত পাশা (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) এবং জামাল পাশা (নৌমন্ত্রী)-এর হাতে।
৩. উগ্র তুর্কিকরণ নীতি (Turkification): প্যান-ইসলামিজমের বিপরীতে তারা উগ্র ধর্মনিরপেক্ষ তুর্কি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেয়। ফলে আরব ও অন্যান্য অতুর্কি মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয় এবং আরব জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়।
৪. প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান ও সাম্রাজ্যের পতন: তরুণ তুর্কিদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে উসমানীয়রা জার্মানির পক্ষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয়, যার করুণ পরিণতিতে ছয়শত বছরের সুবিশাল উসমানীয় খেলাফত সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়।
৪। পারস্যে ইলখানি বংশের প্রতিষ্ঠা এবং হালাকু খানের ভূমিকা আলোচনা কর।
[Discuss the establishment of the Ilkhanid dynasty in Persia and the role of Halaku Khan.]
উত্তর:
ভূমিকা: ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে চেঙ্গিস খানের পৌত্র এবং মনগু খানের ভ্রাতা হালাকু খান (১২৫৬-১২৬৫ খ্রি.) পারস্য ও মধ্যপ্রাচ্যে যে বিধ্বংসী সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন, তার ওপর ভিত্তি করেই পারস্যে মঙ্গোলদের উপশাখা হিসেবে ‘ইলখানি রাজবংশ’ (Ilkhanid Dynasty) প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘ইলখান’ শব্দের অর্থ অধীনস্থ বা প্রাদেশিক খান, যা মঙ্গোলিয়ার প্রধান খাগানের প্রতি আনুষ্ঠানিক আনুগত্য নির্দেশ করত।
হালাকু খানের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও ইলখানি বংশ প্রতিষ্ঠা:
১. ইসমাইলি হাশাশিনদের দুর্গ ধ্বংস (১২৫৬ খ্রি.):
হালাকু খানের প্রথম লক্ষ্য ছিল কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণাঞ্চলে আলমুত দুর্গে অবস্থিত ইসমাইলি হাশাশিন (Assassins) সম্প্রদায়ের দুর্ভেদ্য আস্তানা নির্মূল করা। তিনি অসাধারণ সামরিক দক্ষতায় রুকনুদ্দীন খুরশাহকে বন্দি করেন এবং পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত আলমুত দুর্গ মাটির সাথে মিশিয়ে দেন।
২. বাগদাদ ধ্বংস ও আব্বাসীয় খিলাফতের পতন (১২৫৮ খ্রি.):
হালাকু খানের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও নারকীয় কীর্তি হলো ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের ঐতিহ্যবাহী রাজধানী বাগদাদ অবরোধ ও ধ্বংসসাধন। আব্বাসীয় শেষ খলিফা আল-মুস্তাসিম বিল্লাহকে কার্পেটে মুড়িয়ে ঘোড়ার খুর দিয়ে পিষ্ট করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বাগদাদের সুবিখ্যাত বায়তুল হিকমাহ ও অগণিত লাইব্রেরির কিতাব দজলা নদীতে ফেলে নদী কালো কালিতে রূপান্তর করা হয় এবং কয়েক লক্ষ নিরীহ নাগরিককে হত্যা করা হয়। এর মাধ্যমে পাঁচশত বছরের আব্বাসীয় খিলাফতের চির অবসান ঘটে।
৩. সিরিয়া অভিযান ও আইন জালুতের যুদ্ধ (১২৬০ খ্রি.):
বাগদাদ পতনের পর হালাকু খান আলেপ্পো ও দামেস্ক জয় করেন। তবে ১২৬০ সালে ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক ‘আইন জালুত’-এর যুদ্ধে মামলুক সুলতান কুতুজ ও সেনাপতি বাইবার্স মঙ্গোল বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে অপরাজেয় মঙ্গোল অগ্রযাত্রা চিরতরে থামিয়ে দেন।
৪. পারস্যে সাম্রাজ্য সংহতকরণ ও রাজধানী স্থাপন:
আইন জালুতের পর হালাকু খান পারস্যে ফিরে আসেন এবং মারায়া (Maragha) এবং পরবর্তীতে তাবরিজকে রাজধানী করে স্থায়ী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বিখ্যাত মুসলিম জ্যোতির্বিদ নাসিরুদ্দীন তুসিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে মারায়ায় এক বিশ্বমানের মানমন্দির (Observatory) নির্মাণ করিয়ে দেন।
ইলখানি বংশের ইসলাম গ্রহণ ও সমৃদ্ধি:
হালাকু খান নিজে বৌদ্ধ ও পৌত্তলিক ছিলেন, কিন্তু তার পরবর্তী বংশধর সুলতান মাহমুদ গাজান খান (১২৯৫-১৩০৪ খ্রি.) সুফি সাধকদের সংস্পর্শে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এর ফলে পারস্যের ইলখানি সাম্রাজ্য একটি পূর্ণাঙ্গ সমৃদ্ধ মুসলিম সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত হয় এবং ইরানি শিল্প, সাহিত্য ও ক্ষুদ্রচিত্রকলা (Miniature painting)-র বিকাশ ঘটে।
৫। সাফাভী সাম্রাজ্যের সুদৃঢ়করণে শাহ আব্বাস দ্য গ্রেট-এর কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the achievements of Shah Abbas the Great in consolidating the Safavid Empire.]
উত্তর:
ভূমিকা: ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে পারস্যে প্রতিষ্ঠিত সাফাভী সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে সফল সম্রাট ছিলেন প্রথম শাহ আব্বাস (১৫৮৭-১৬২৯ খ্রি.), যিনি ইতিহাসে ‘শাহ আব্বাস দ্য গ্রেট’ নামে খ্যাতি লাভ করেছেন। তার সিংহাসনারোহণের সময় সাফাভী সাম্রাজ্য একদিকে উসমানীয়দের আক্রমণ এবং অন্যদিকে পূর্ব দিক থেকে উজবেকদের আগ্রাসনে খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অসীম বীরত্ব ও সংস্কারের মাধ্যমে তিনি সাফাভী সাম্রাজ্যকে বিশ্ব দরবারে শীর্ষ চূড়ায় আসীন করেন।
শাহ আব্বাসের প্রধান ঐতিহাসিক কৃতিত্বসমূহ:
১. সামরিক সংস্কার ও নতুন স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠন:
পূর্বে সাফাভী সেনাবাহিনী উদ্ধত ‘কিজিলবাশ’ (Qizilbash) উপজাতীয়দের ওপর নির্ভরশীল ছিল, যারা রাজাকে জিম্মি করে রাখত। শাহ আব্বাস ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ও অ্যান্থনি শার্লির সহায়তায় আধুনিক ইউরোপীয় প্রযুক্তির কামান ও মাস্কেটে সজ্জিত ৪০,০০০ সৈন্যের নিয়মিত পদাতিক বাহিনী (ঘুলাম) গড়ে তোলেন। এতে কিজিলবাশদের ক্ষমতা চূর্ণ হয়।
২. উজবেক ও উসমানীয়দের বিরুদ্ধে সামরিক বিজয়:
– ১৫৯৮ সালে হেরাত ও খোরাসান থেকে উজবেকদের সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত করে পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত নিরাপদ করেন।
– ১৬০৩ থেকে ১৬১৮ সালের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে তিনি চিরশত্রু উসমানীয় বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে আজারবাইজান, তাবরিজ, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া, এমনকি বাগদাদ ও কারবালা পুনরুদ্ধার করেন।
৩. হরমুজ প্রণালী থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়ন:
১৬২২ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নৌবাহিনীর সহায়তায় শাহ আব্বাস পারস্য উপসাগরের কৌশলগত হরমুজ বন্দর থেকে ঔপনিবেশিক পর্তুগিজদের বহিষ্কার করেন এবং সেখানে নিজস্ব ‘বন্দর আব্বাস’ গড়ে তোলেন।
৪. নতুন রাজধানী ইসফাহান ও স্থাপত্য শিল্পের চরম বিকাশ:
তিনি কাজভিন থেকে ইসফাহান-এ রাজধানী স্থানান্তর করেন এবং নগরটিকে এমন এক চোখ ধাঁধানো সুরম্য রূপ দেন যে সমকালে প্রবাদ প্রচলিত হয়—”ইসফাহান নিসফে জাহান” (ইসফাহান পৃথিবীর অর্ধেক)। তার নির্মিত ‘নকশে জাহান চত্বর’, ‘মসজিদে শাহ’, ‘মসজিদে শেখ লুৎফুল্লাহ’ এবং ‘আলী কাপু প্রাসাদ’ পারস্য স্থাপত্যকলার অবিসংবাদিত বিস্ময়।
৫. অর্থনীতি ও ধর্মীয় সহনশীলতা:
তিনি সমগ্র দেশে চমৎকার সড়ক ও বহু সরাইখানা নির্মাণ করেন। বিদেশি খ্রিস্টান বণিক ও আর্মেনীয় কারিগরদের পূর্ণ নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করেন, ফলে পারস্যের রেশম ও গালিচা শিল্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শীর্ষস্থান দখল করে।
উপসংহার: শাহ আব্বাস দ্য গ্রেটের বহুমুখী সামরিক প্রতিভা ও শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতায় পারস্যের সাফাভী রাজবংশ ইসলামি রেনেসাঁসের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।
৬। স্বাধীন আফগানিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আহমদ শাহ আবদালীর অবদান আলোচনা কর।
[Discuss the contribution of Ahmad Shah Abdali as the founder of independent Afghanistan.]
উত্তর:
ভূমিকা: অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে একসময়ের খণ্ডবিখণ্ড ও বহিরাগত শক্তির পদানত উপজাতীয় অঞ্চলকে একটি আধুনিক ঐক্যবদ্ধ জাতিরাষ্ট্রে রূপদান করেন আহমদ শাহ আবদালী (১৭৪৭-১৭৭২ খ্রি.)। তিনি আফগান জাতির কাছে পরম শ্রদ্ধায় ‘বাবা-ই-আফগান’ (Father of the Afghan Nation) বা ‘আহমদ শাহ দুররানী’ হিসেবে স্বীকৃত।
আহমদ শাহ আবদালীর উত্থান ও আফগান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা:
পারস্যের শাসক নাদির শাহের সেনাবাহিনীতে আহমদ শাহ আবদালী মাত্র ২৫ বছর বয়সে চার হাজার দক্ষ আফগান অশ্বারোহী বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন। ১৭৪৭ সালে নাদির শাহ নিহত হলে তিনি অনুগত সৈন্যদের নিয়ে কান্দাহারে ফিরে আসেন এবং সেখানে সকল প্রধান পশতুন উপজাতি নেতাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ‘লোয়া জিরগা’ (ঐতিহাসিক জাতীয় সম্মেলন)-এ সর্বসম্মতিক্রমে আফগানিস্তানের স্বাধীন বাদশাহ নির্বাচিত হন। তিনি তার বংশের নাম ‘দুররানী’ (মুক্তার মতো শ্রেষ্ঠ) রাখেন এবং নিজেকে ‘দুরর-ই-দুররান’ (মুক্তাদের মুক্তা) উপাধিতে ভূষিত করেন।
আহমদ শাহ আবদালীর প্রধান কৃতিত্বসমূহ:
১. আফগান জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ঐক্য: শতাব্দীকাল ধরে পরস্পরের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত পশতুন, তাজিক, হাজারা ও উজবেক উপজাতিদের তিনি একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের পতাকাতলে আনয়ন করেন।
২. পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ (১৭৬১ খ্রি.):
আহমদ শাহ আবদালীর সামরিক জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরবোজ্জ্বল কীর্তি হলো ১৭৬১ সালের ১৪ জানুয়ারি সংঘটিত ঐতিহাসিক পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ। তৎকালীন ভারতে উগ্র মারাঠা শক্তি যখন সমগ্র উত্তর ভারত পদানত করে দিল্লি অধিকার করে এবং মুসলিম শাসনের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তোলে, তখন দিল্লির শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.)-এর আমন্ত্রণে আবদালী ভারত অভিযান পরিচালনা করেন। পানিপথের ময়দানে আবদালীর রণকৌশল ও জাম্বুরাক (উটের পিঠে বসানো হালকা কামান)-এর তোপে লক্ষাধিক সৈন্যের মারাঠা বাহিনী সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এর ফলে ভারতে মারাঠা সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন চিরতরে ধূলিসাৎ হয়।
৩. বিশাল দুররানী সাম্রাজ্য গঠন: আবদালী কাবুল, হিরাত, খোরাসান, কাশ্মীর, পাঞ্জাব ও সিন্ধু জয় করে পশ্চিমে পারস্যের সীমানা থেকে পূর্বে যমুনা নদী পর্যন্ত এক সুবিশাল আফগান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা সমকালে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পরেই মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সাম্রাজ্য ছিল।
৪. কান্দাহার নগরীর উন্নয়ন: তিনি কান্দাহারকে পুনর্গঠন করে এর নাম রাখেন ‘আশরাফুল বিলাদ’ (শ্রেষ্ঠতম নগরী) এবং সেখানে সুরম্য প্রাসাদ ও ঐতিহাসিক জামে মসজিদ নির্মাণ করেন।
উপসংহার: আহমদ শাহ আবদালী ছিলেন এক অসাধারণ সামরিক জিনিয়াস ও জাতীয় স্থপতি, যার হাতেই আধুনিক স্বাধীন আফগানিস্তানের মানচিত্র অঙ্কিত হয়েছিল।
খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)
৭। ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের তাৎপর্য সংক্ষেপে লেখ।
[Write briefly about the significance of the conquest of Constantinople in 1453.]
উত্তর:
১৪৫৩ সালের ২৯ মে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ (মুহাম্মদ আল-ফাতিহ) কর্তৃক দুর্ভেদ্য কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের বিশ্বৈতিহাসিক তাৎপর্য নিম্নরূপ:
১. এক হাজার একশত বছরের প্রাচীন ও পরাক্রমশালী খ্রিস্টান বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক পতন ঘটে।
২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র ভবিষ্যদ্বাণী—”তোমরা অবশ্যই কনস্টান্টিনোপল জয় করবে, সেই সেনাপতি কতই না উত্তম এবং সেই সৈন্যবাহিনী কতই না উত্তম”—বাস্তবায়িত হয়।
৩. উসমানীয়রা এশিয়ার সীমানা পেরিয়ে ইউরোপীয় মূল ভূখণ্ডের অপ্রতিদ্বন্দ্বী অধিপতিতে পরিণত হয় এবং ইস্তাম্বুল তাদের স্থায়ী রাজধানীতে রূপ নেয়।
৪. প্রাচ্যের বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইউরোপীয়রা বিকল্প জলপথ আবিষ্কারে বাধ্য হয়, যা কলম্বাস কর্তৃক আমেরিকা এবং ভাস্কো দা গামা কর্তৃক ভারত আবিষ্কার ও বৈশ্বিক রেনেসাঁসের পথ খুলে দেয়।
৮। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয়দের ভূমিকা সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ লেখ।
[Write a short note on the role of Ottomans in the First World War.]
উত্তর:
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তৎকালীন তরুণ তুর্কি নেতা আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে উসমানীয় সাম্রাজ্য জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার নেতৃত্বাধীন ‘কেন্দ্রীয় শক্তি’ (Central Powers)-র পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করে। এ যুদ্ধে উসমানীয়রা বহুমুখী ফ্রন্টে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চালায়। ১৯১৫ সালে গ্যালিপলির যুদ্ধে (Battle of Gallipoli) মোস্তফা কামালের বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বে ব্রিটিশ ও ফরাসি যৌথ নৌ-অভিযানকে শোচনীয়ভাবে প্রতিহত করে এক ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে উসমানীয়রা। কুত আল-আমারার যুদ্ধেও ব্রিটিশ বাহিনীকে বন্দি করা হয়। তবে চার বছরের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, রাশিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র শীতে ককেশাস ফ্রন্টের পরাজয় এবং ব্রিটেনের ষড়যন্ত্রে মক্কার শরিফ হুসাইনের নেতৃত্বে সংগঠিত ‘আরব বিদ্রোহ’ উসমানীয়দের প্রতিরোধ ভেঙে দেয়। ১৯১৮ সালে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হয় এবং পরিশেষে সেভ্র চুক্তি (১৯২০)-র মাধ্যমে বিশাল উসমানীয় সাম্রাজ্যকে ইউরোপীয় শক্তিবর্গ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।
৯। নাদির শাহ কর্তৃক আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পটভূমি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা কর।
[Briefly explain the background of Nadir Shah’s seizure of power in Afghanistan.]
উত্তর:
অষ্টাদশ শতকের শুরুতে মীর ওয়াইস হোতাকের নেতৃত্বে কান্দাহারের ঘিলজাই পশতুনরা সাফাভী পারস্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন হোতাক রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৭২২ সালে তাদের নেতা মাহমুদ পারস্যের রাজধানী ইসফাহান দখল করে বসেন। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে পারস্যের মহান জাতীয় সেনাপতি নাদির কুলী বেগ (পরবর্তীতে নাদির শাহ) আফগানদের পারস্য থেকে সমূলে বিতাড়িত করেন। এরপর তিনি আফগান ভূখণ্ডে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং পূর্ব সীমান্তে মুঘল আক্রমণের ঝুঁকি দূর করার উদ্দেশ্যে ১৭৩৮ সালে কান্দাহার ও কাবুল আক্রমণ করেন। দীর্ঘ নয় মাস অবরোধের পর কান্দাহারের পতন ঘটে। নাদির শাহ স্থানীয় আফগান উপজাতিগুলোকে দমন করার পরিবর্তে তাদের যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দিয়ে রাজকীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেন, যা পরবর্তীতে আহমদ শাহ আবদালীর উত্থানের পটভূমি রচনা করে।
১০। মধ্যযুগীয় বিজেতাদের মধ্যে তৈমুর লং-এর অবস্থান মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the position of Timur Lang among medieval conquerors.]
উত্তর:
মধ্যযুগীয় বিশ্ব ইতিহাসে চতুর্দশ শতাব্দীর দুর্ধর্ষ সামরিক বিজেতা হিসেবে তৈমুর লং (১৩৩৬-১৪০৫ খ্রি.) এক ত্রাস ও বিস্ময়ের প্রতীক। তিনি নিজেকে চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরি দাবি করে সমরকন্দকে রাজধানী করে এক সুবিশাল তিমুরীয় সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। তার অবস্থান দ্বিমুখী বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত:
১. অপরাজেয় সেনাপতি ও ধ্বংসলীলা: সমরনায়ক হিসেবে তিনি জীবনে একটি যুদ্ধেও পরাজিত হননি। পারস্য, রাশিয়া (গোল্ডেন হোর্ড), মেসোপটেমিয়া, দিল্লি সালতানাত (১৩৯৮) এবং অটোমান সুলতান প্রথম বায়েজিদকে আঙ্কারার যুদ্ধে (১৪০২) শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন। তবে তার বিজয়ের সাথে জড়িত ছিল নগর ধ্বংস ও সাধারণ মানুষের খুলির মিনার নির্মাণের রক্তক্ষয়ী নৃশংসতা।
২. শিল্প ও স্থাপত্যের সমঝদার: বিস্ময়করভাবে তিনি পণ্ডিত, স্থপতি ও সুফিদের সম্মান করতেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে শ্রেষ্ঠ কারিগর এনে রাজধানী সমরকন্দকে সুরম্য মসজিদ ও মাদ্রাসা দিয়ে সাজিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মধ্যযুগের সবচেয়ে রণদক্ষ কিন্তু সবচেয়ে ভীতিকর বিজেতা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: প্রথম মুরাদ কর্তৃক গঠিত বিখ্যাত উসমানীয় এলিট সামরিক বাহিনীর নাম কী?
উত্তর: প্রথম মুরাদ কর্তৃক নবীন খ্রিস্টান যুবকদের নিয়ে গঠিত সুশৃঙ্খল ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী এলিট সামরিক বাহিনীর নাম ছিল ‘ইয়েনিসেরী’ (Janissary) বাহিনী।
প্রশ্ন ২: হিজাজ রেলওয়ে কোন দুই শহরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছিল?
উত্তর: সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ কর্তৃক নির্মিত ঐতিহাসিক হিজাজ রেলওয়ে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক থেকে মদিনা মুনাওয়ারা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
প্রশ্ন ৩: তরুণ তুর্কিদের প্রধান রাজনৈতিক দলের নাম কী ছিল?
উত্তর: তরুণ তুর্কিদের প্রধান রাজনৈতিক সংগঠনের নাম ছিল ‘কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রগ্রেস’ বা ‘ইত্তিহাদ ভে তেরাক্কি’ (İttihat ve Terakki)।
প্রশ্ন ৪: হালাকু খান কোন সালে ঐতিহাসিক বাগদাদ নগরী ধ্বংস করেন?
উত্তর: হালাকু খান ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে আব্বাসীয় রাজধানী বাগদাদ অবরোধ করে ধ্বংসসাধন করেন।
প্রশ্ন ৫: আধুনিক আফগানিস্তানের জাতির জনক কাকে বলা হয়?
উত্তর: আহমদ শাহ আবদালী (আহমদ শাহ দুররানী)-কে আধুনিক স্বাধীন আফগানিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও জাতির জনক (বাবা-ই-আফগান) বলা হয়।
প্রশ্ন ৬: সাফাভী সম্রাট শাহ আব্বাসের রাজধানী কোন নগরী ছিল?
উত্তর: শাহ আব্বাস দ্য গ্রেটের রাজধানী ছিল সুরম্য ঐতিহাসিক নগরী ‘ইসফাহান’।