ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (Islamic History & Culture) — ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিষয়: বাংলার ইতিহাস (১৫৭৬ খ্রি. পর্যন্ত) [History of Bengal up to 1576] | বিষয় কোড: 205203
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ক বিভাগ — রচনামূলক প্রশ্ন
(যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও | মান: ১৫ × ৪ = ৬০)
১। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস পুনর্গঠনে প্রাথমিক ও দ্বিতীয়িক উৎস সমূহের গুরুত্ব নিরূপণ কর।
[Determine the importance of primary and secondary sources in reconstructing the history of ancient Bengal.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
ইতিহাস হলো অতীতের মানব কর্মকাণ্ডের প্রামাণ্য ও বস্তুনিষ্ঠ আখ্যান। প্রাচীন বাংলার ধারাবাহিক ও সামগ্রিক লিখিত ইতিহাসগ্রন্থ অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় ইতিহাস গবেষকদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক উৎসের ওপর নির্ভর করে প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট পুনর্গঠন করতে হয়।
প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের প্রাথমিক উৎসসমূহ (Primary Sources):
- ১. প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও খননকাজ: মহাস্থানগড় (পুন্ড্রনগর), ওয়ারী-বটেশ্বর, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ময়নামতী প্রভৃতি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে প্রাপ্ত দুর্গপ্রাচীর, পোড়ামাটির ফলক, মৃৎপাত্র এবং ভাস্কর্য প্রাচীন বাংলার নগর পরিকল্পনা, শিল্পকলা ও জীবনধারার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেয়।
- ২. শিলালিপি ও তাম্রশাসন: মৌর্য যুগের মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপি, শশাঙ্কের তাম্রশাসন, পাল রাজাদের খলিমপুর তাম্রশাসন এবং সেন রাজাদের দেওপাড়া প্রশস্তি প্রাচীন বাংলার কালানুক্রমিক রাজবংশের শাসনকাল, ভূমিনীতি এবং ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতার অমূল্য দলিল।
- ৩. প্রাচীন মুদ্রা: গুপ্ত আমল, শশাঙ্ক ও পরবর্তীতে বিভিন্ন মুসলিম সুলতানদের স্বর্ণ, রৌপ্য ও তাম্র মুদ্রা থেকে রাজাদের উপাধি, বিজিত অঞ্চল, ধাতুর বিশুদ্ধতা এবং সমকালীন বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।
- ৪. প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ও পর্যটক ভ্রমণবৃত্তান্ত: গ্রিক ভূগোলবিদ মেগাস্থিনিস, টলেমি, চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাং, ইৎ সিং এবং আরব পরিব্রাজক সুলাইমান ও ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্ত প্রাথমিক উৎস হিসেবে সমাজ ও অর্থনীতির জীবন্ত চিত্র তুলে ধরে।
দ্বিতীয়িক উৎসসমূহের গুরুত্ব (Secondary Sources):
- ১. সমকালীন ও পরবর্তী সাহিত্যকর্ম: সন্ধাকর নন্দীর রামচরিতম্, কলহনের রাজতরঙ্গিণী, মিনহাজ-ই-সিরাজের তাবাকাত-ই-নাসিরী, এবং আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরী দ্বিতীয়িক উৎস হলেও প্রাথমিক উপাত্ত সমন্বয় করে ইতিহাস রচনায় দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে।
- ২. আধুনিক ইতিহাসবিদদের গবেষণাকর্ম: স্যার যদুনাথ সরকার, রমেশচন্দ্র মজুমদার (History of Bengal), ড. আবদুল করিম (Social History of the Muslims in Bengal) এবং ড. মুহাম্মদ মোহর আলীর প্রামাণ্য গবেষণাকর্ম প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় উপাদানসমূহের বস্তুনিষ্ঠ ও তুলনামূলক পর্যালোচনা উপস্থাপনে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।
২। প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর ধারণা দাও।
[Give an idea of Janapadas of ancient Bengal.]
উত্তরঃ
জনপদের ধারণা:
প্রাচীনকালে সমগ্র বাংলা আজকের মতো কোনো একক রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ ছিল না। বাংলার বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল নদী, বনভূমি ও প্রাকৃতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বতন্ত্র ও স্বাধীন অঞ্চলে শাসিত হতো। প্রাচীন শিলালিপি ও সাহিত্যে উল্লেখিত এইসব রাজনৈতিক-ভৌগোলিক এককগুলোকে জনপদ বলা হয়।
প্রধান প্রধান প্রাচীন জনপদের বিবরণ:
- ১. পুণ্ড্র (Pundra): এটি প্রাচীন বাংলার সর্বাপেক্ষা সমৃদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। বর্তমান বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলা নিয়ে পুণ্ড্র জনপদ গঠিত ছিল। এর রাজধানী ছিল পুণ্ড্রনগর (বর্তমান বগুড়ার মহাস্থানগড়)। এখানে মৌর্য ও গুপ্ত যুগের অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
- ২. বঙ্গ (Vanga): বর্তমান বৃহত্তর ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, বরিশাল ও পটুয়াখালীর জলাভূমি নিয়ে প্রাচীন বঙ্গ জনপদ গঠিত ছিল। এই ‘বঙ্গ’ থেকেই পরবর্তীতে সমগ্র জাতির নাম হয় ‘বাঙালি’ এবং দেশটির নাম হয় ‘বাংলাদেশ’।
- ৩. গৌড় (Gauda): পশ্চিম বাংলার মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং বীরভূমসহ বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চল গৌড়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সপ্তম শতকে রাজা শশাঙ্ক গৌড়কে একটি পরাক্রমশালী স্বাধীন সাম্রাজ্যে পরিণত করেন এবং কর্ণসুবর্ণে রাজধানী স্থাপন করেন।
- ৪. রাঢ় (Radha): ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরের অঞ্চল, যা আধুনিক বর্ধমান, হুগলি ও মেদিনীপুর নিয়ে বিস্তৃত ছিল। এটি উত্তর রাঢ় ও দক্ষিণ রাঢ় নামে বিভক্ত ছিল।
- ৫. সমতট (Samatata): মেঘনা নদীর পূর্ব তীরের অঞ্চল, অর্থাৎ বর্তমান বৃহত্তর কুমিল্লা, চাঁদপুর ও নোয়াখালী অঞ্চল নিয়ে সমতট গঠিত ছিল। এর কেন্দ্র ছিল লালমাই-ময়নামতী অঞ্চল। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং সমতটকে বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
- ৬. হরিকেল (Harikela): সমতটের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বে অবস্থিত জনপদ, যা বর্তমান চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত ছিল। এখানে প্রাচীনকালে উন্নত নৌ-বাণিজ্যিক বন্দর ছিল।
- ৭. বরেন্দ্র (Varendra): গঙ্গা ও করতোয়া নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল নিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চল গঠিত ছিল। বগুড়া, রাজশাহী ও পাবনা জেলার অংশবিশেষ বরেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
- ৮. তাম্রলিপ্ত (Tamralipta): বর্তমান মেদিনীপুর জেলার তমলুক অঞ্চল। প্রাচীনকালে এটি বাংলার প্রধান আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বন্দর ছিল, যেখান থেকে সিংহল, সুমাত্রা ও মালয় উপদ্বীপে বাণিজ্য জাহাজ চলাচল করত।
৩। পাল সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারে প্রথম মহীপালের ভূমিকা মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the role of Mohipala the first in restoring the Pala empire.]
উত্তরঃ
ঐতিহাসিক পটভূমি:
ধর্মপাল ও দেবপালের স্বর্ণযুগের পর দুর্বল উত্তরসূরিদের আমলে পাল সাম্রাজ্য চরম অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও বহিঃশত্রুর আক্রমণে ধসে পড়ে। উত্তর ও পশ্চিম বাংলা কম্বোজ রাজাদের দখলে চলে যায় এবং পাল শাসন কেবল সীমিত অঞ্চলের মধ্যে সংকুচিত হয়। এই ঘোর দুর্যোগের সময় দশম শতকের শেষভাগে (আনুমানিক ৯৮৮ খ্রি.) দ্বিতীয় বিগ্রহপালের পুত্র প্রথম মহীপাল সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং পাল সাম্রাজ্য পুনরুজ্জীবিত করেন। একারণে তাকে পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।
প্রথম মহীপালের গৌরবময় কৃতিত্ব:
- পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধার: সিংহাসনে বসেই মহীপাল উত্তর ও পূর্ব বাংলার দখলদার কম্বোজ রাজাদের পরাজিত করেন এবং বরেন্দ্র ও গৌড় পুনরুদ্ধার করে পাল বংশের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। বাণগড় তাম্রশাসনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, তিনি বাহুবলে অনধিকারীদের বিতাড়িত করে পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধার করেছিলেন।
- সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ: মহীপাল কেবল বাংলাতেই থেমে থাকেননি, তিনি সমগ্র বিহার, কাশী (বারাণসী) এবং চম্পারণ পর্যন্ত সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটিয়েছিলেন। নালন্দা ও সারনাথে আবিষ্কৃত বিভিন্ন শিলালিপি তার এই ব্যাপক সাম্রাজ্যিক আধিপত্যের অকাট্য প্রমাণ দেয়।
- চোল ও কলচুরি আক্রমণ প্রতিরোধ: ১০২১-১০২৩ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ ভারতের পরাক্রমশালী চোল রাজেন্দ্র চোল বাংলা আক্রমণ করে গঙ্গা তীর পর্যন্ত অগ্রসর হন। মহীপাল কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও সামরিক কৌশলে চোল বাহিনীকে প্রতিহত করেন এবং বাংলার অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখেন।
- ধর্মীয় ও স্থাপত্যিক পুনর্জাগরণ: নিষ্ঠাবান বৌদ্ধ অনুসারী হিসেবে মহীপাল নালন্দা, বিক্রমশীলা ও সারনাথের বৌদ্ধ মহাবিহারসমূহ সংস্কার করেন। তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্ম পুনরুজ্জীবনে তিনি বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করকে প্রেরণে অনুপ্রেরণা জোগান।
- জনকল্যাণমূলক কার্যাবলি: তিনি প্রজাদের সুবিধার্থে উত্তরবঙ্গে অসংখ্য সুবিশাল দিঘি ও জলাশয় খনন করেন, যার মধ্যে দিনাজপুরের ‘মহীপাল দিঘি’ এবং মুর্শিদাবাদের ‘মহীপাল নগর’ আজও তার স্মৃতি বহন করছে।
৪। মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে বাংলার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা কর।
[Review the socio-economic and political conditions of Bengal on the eve of the Muslim conquest.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে (১২০৪-১২০৫ খ্রি.) ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের প্রাক্কালে রাজা লক্ষণ সেনের শাসনামলে বাংলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবন এক চরম সংকটকাল অতিক্রম করছিল।
১. রাজনৈতিক অবস্থা:
রাজনৈতিকভাবে সেন শাসন ছিল অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও দুর্বলতায় জর্জরিত। রাজা লক্ষণ সেন ছিলেন বার্ধক্যগ্রস্ত ও প্রশাসনিকভাবে নিষ্ক্রিয়। তিনি রাজ্য পরিচালনার মূল কেন্দ্র নদীয়া বা নবদ্বীপে রেখে রাজকীয় আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত ছিলেন। কেন্দ্রীয় শাসনের শিথিলতার সুযোগে সামন্ত রাজারা স্বাধীন আচরণ করছিল। সর্বোপরি, লক্ষণ সেনের দরবারে জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণী—যে তুর্কি সৈন্য বাংলা দখল করবে—সেন বাহিনীর মনোবল সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দিয়েছিল। বখতিয়ার খলজীর মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহীর ক্ষিপ্র আক্রমণের মুখে কোনো প্রকার সামরিক প্রতিরোধ গড়ে না তুলে লক্ষণ সেনের নৌকাযোগে বিক্রমপুরে পলায়ন প্রমাণ করে সেন প্রশাসনের চরম সামরিক অপ্রস্তুতি ও নেতৃত্বের দৈন্যদশা।
২. সামাজিক অবস্থা:
সেন রাজারা ছিলেন দক্ষিণ ভারত থেকে আগত কট্টর সনাতন ব্রাহ্মণপন্থী। তাদের আমলে বাংলায় বর্ণাশ্রম প্রথা কঠোরভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। সমাজ প্রধানত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এই চার বর্ণে এবং বহু উপবর্ণে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সমাজের নিম্নবর্ণের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ (কৈবর্ত, ব্যাধ, চর্মকার ইত্যাদি) ব্রাহ্মণ্যবাদের চরম বৈষম্য, নির্যাতন ও অস্পৃশ্যতার শিকার ছিল। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর তীব্র সামাজিক উৎপীড়ন চালানো হয়। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রজাসাধারণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি কোনো আনুগত্য অবশিষ্ট ছিল না।
৩. অর্থনৈতিক অবস্থা:
সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সমস্ত ভূমির মালিকানা ছিল রাজা, পুরোহিত ও সামন্ত প্রভুদের হাতে। সাধারণ কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ ছিল চড়া করের বোঝায় নিষ্পেষিত। আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্য মূলত তাম্রলিপ্ত বন্দরের পতনের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছিল এবং কড়ির ব্যবহার মুদ্রার প্রচলনকে ম্লান করেছিল। ফলে জনসাধারণের অর্থনৈতিক জীবন ছিল স্থবির ও শোষণপীড়িত।
উপসংহার: এই সামাজিক শোষণ, বর্ণবৈষম্য এবং রাজনৈতিক স্থবিরতার কারণেই বখতিয়ার খলজীর ক্ষিপ্র আগমনকে বাংলার নির্যাতিত বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের সাধারণ মানুষ এক প্রকার মুক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিল, যা বাংলায় মুসলিম শাসনের দ্রুত প্রসারের পথ প্রশস্ত করে।
৫। গিয়াসউদ্দীন ইওয়াজ খলজীর প্রশাসনিক ব্যবস্থা মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the administrative system of Giyasuddin Iwaz Khalji.]
উত্তরঃ
ভূমিকা:
বখতিয়ার খলজীর মৃত্যুর পর বাংলায় মুসলিম শাসনের অস্তিত্ব যখন অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিপন্ন, তখন গিয়াসউদ্দীন ইওয়াজ খলজী (১২১২-১২২৭ খ্রি.) বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে নবীন মুসলিম সালতানাতকে এক সুদৃঢ় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন।
গিয়াসউদ্দীন ইওয়াজ খলজীর প্রশাসনিক ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- রাজধানী স্থানান্তর ও ভৌগোলিক সুরক্ষা: ইওয়াজ খলজী রাজধানী দেবকোট থেকে ‘লখনৌতি’ বা গৌড়ে স্থানান্তর করেন। লখনৌতির ভৌগোলিক গুরুত্ব ও নদীবেষ্টিত অবস্থান বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিহত করতে অত্যন্ত কার্যকর ছিল।
- ‘হিসন-ই-লখনৌতি’ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: তিনি সমগ্র রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে এবং সামরিক চলাচলের সুবিধার্থে দশ দিনের পথব্যাপী এক সুবিশাল রাজপথ ও বাঁধ নির্মাণ করেন। এটি বর্ষাকালে প্রজাদের যোগাযোগ সচল রাখত এবং পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনীর দ্রুত চলাচলে সহায়তা করত।
- শক্তিশালী নৌবাহিনী গঠন: বাংলায় সফল রাজ্য পরিচালনার জন্য যে নৌ-শক্তির অপরিহার্য প্রয়োজন, তা গিয়াসউদ্দীন ইওয়াজ খলজীই প্রথম উপলব্ধি করেন। তিনি এক সুবিশাল রণতরী ও নৌবহর গড়ে তোলেন, যা বাংলার নদীপথে সামরিক আধিপত্য বিস্তারে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে।
- স্বতন্ত্র মুদ্রানীতি ও খলিফার স্বীকৃতি: তিনি স্বাধীন সুলতান হিসেবে নিজের নামে মুদ্রা জারি করেন এবং আব্বাসীয় খলিফা আন-নাসির লি-দিনিল্লাহর নামে খুতবা পাঠ ও মুদ্রা অঙ্কন করে নিজের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতা অর্জন করেন।
- শিক্ষা, ধর্ম ও জনকল্যাণ: তিনি লখনৌতিতে বহু মসজিদ, মাদ্রাসা ও সরাইখানা প্রতিষ্ঠা করেন। মধ্য এশিয়া থেকে বহু আলেম ও সুফি সাধক তার পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলায় আগমন করে ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রচার ঘটান।
৬। বাংলার সমকালীন রাজনীতিতে রাজা গণেশের ভূমিকা নিরূপণ কর।
[Determine the role of Raja Ganesh in the contemporary politics of Bengal.]
উত্তরঃ
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
ইলিয়াস শাহী বংশের দুর্বল সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের মৃত্যুর পর বাংলার রাজনীতিতে গভীর অস্থিরতা দেখা দেয়। এই সুযোগে উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরের ভাতুড়িয়া পরগণার হিন্দু জমিদার রাজা গণেশ রাজদরবারে প্রভাব বিস্তার করে অত্যন্ত প্রভাবশালী আমাত্যে পরিণত হন এবং একপর্যায়ে ইলিয়াস শাহী সুলতানদের ক্ষমতাচ্যুত করে চতুর্দশ শতকের শুরুতে (১৪১৫ খ্রি.) বাংলার সিংহাসন দখল করেন।
সমকালীন রাজনীতিতে রাজা গণেশের প্রভাব ও মূল্যায়ন:
- ক্ষমতা দখল ও মুসলিম আধিপত্যের পতন: বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই শতাব্দী পর রাজা গণেশই একমাত্র অমুসলিম শাসক যিনি সালতানাতের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। তিনি দরবার ও প্রশাসনে হিন্দু কর্মকর্তাদের উচ্চপদে নিয়োগ দান করেন।
- হযরত নূর কুতুবুল আলমের প্রতিক্রিয়া ও জৌনপুরের আক্রমণ: রাজা গণেশের ক্ষমতা গ্রহণ এবং তৎকালীন মুসলিম আলেম ও সুফিদের ওপর দমনপীড়নের আশঙ্কায় পাণ্ডুয়ার প্রখ্যাত সুফি হযরত নূর কুতুবুল আলম (রহ.) জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শারকিকে বাংলা আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান। ইব্রাহিম শারকি সুবিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে বাংলার সীমান্তে উপস্থিত হলে গণেশ মারাত্মক রাজনৈতিক সংকটে পড়েন।
- রাজনৈতিক সমঝোতা ও পুত্র যদুকে ইসলাম গ্রহণ: উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গণেশ নতি স্বীকার করেন এবং হযরত নূর কুতুবুল আলমের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতায় পৌঁছান। চুক্তি অনুযায়ী গণেশ সিংহাসন ত্যাগ করেন এবং তার বারো বছর বয়সী জ্যেষ্ঠ পুত্র যদু ইসলাম গ্রহণ করে ‘জালালউদ্দীন মুহাম্মদ শাহ’ নাম ধারণ করে বাংলার সুলতান হিসেবে অধিষ্ঠিত হন।
- পুনরায় ক্ষমতা দখল ও মৃত্যু: শারকি বাহিনী বাংলা ত্যাগ করার পর সুযোগ বুঝে গণেশ পুনরায় ক্ষমতা দখল করেন এবং যদুকে হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন (সুবর্ণধেনু যজ্ঞের মাধ্যমে)। কিন্তু তার মৃত্যুর পর জালালউদ্দীন পুনরায় ইসলামে ফিরে যান এবং অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এক দীর্ঘ ও পরাক্রমশালী মুসলিম শাসন কায়েম করেন।
৭। ইবনে বতুতা কে ছিলেন? তাঁর বর্ণনার আলোকে চতুর্দশ শতকের বাংলার আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে একটি লিপিচিত্র অঙ্কন কর।
[Who was Ibn Battuta? Draw a pen-picture about the socio-economic conditions of Bengal during the fourteenth century in the light of his description.]
উত্তরঃ
ইবনে বতুতার পরিচয়:
আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বতুতা (১৩০৪-১৩৬৮ খ্রি.) ছিলেন মধ্যযুগের বিশ্বখ্যাত মুসলিম পর্যটক, পরিব্রাজক ও আইনবিদ। তিনি উত্তর আফ্রিকার মরক্কোর তাঞ্জিয়ার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। দীর্ঘ প্রায় ত্রিশ বছর ধরে তিনি আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সুবিশাল অঞ্চল ভ্রমণ করেন। চতুর্দশ শতকে সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহের আমলে (১৩৪৬ খ্রি.) তিনি বিখ্যাত সুফি হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে বাংলায় আগমন করেন। তার ভ্রমণগ্রন্থ ‘তুহফাতুন নুজ্জার ফি গারায়িবিল আমসার ওয়া আজায়িবিল আসফার’ (কিতাবুর রেহলা) মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল।
ইবনে বতুতার বর্ণনায় চতুর্দশ শতকের বাংলার আর্থ-সামাজিক চিত্র:
- প্রাচুর্যের দেশ ও সস্তা দ্রব্যমূল্য: ইবনে বতুতা বাংলাকে বিপুল ঐশ্বর্য এবং তুলনাহীন সস্তা দ্রব্যমূল্যের দেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, পৃথিবীর আর কোথাও এমন সস্তায় খাদ্যসামগ্রী পাওয়া যেত না। যেমন:
- ১ দিনারে ২৫ রতল (প্রায় ৩৫ কেজি) চাল পাওয়া যেত।
- মাত্র ২ দিরহামে একটি হৃষ্টপুষ্ট ভেড়া বা ছাগল এবং ১ দিনারে ৮টি মোটাতাজা মুরগি বিক্রি হতো।
- ১ দিনারে একটি কমবয়সী সুন্দর দাসী বা খাদেম পাওয়া যেত।
- ‘দোযখপুর নি’আমত’ (Dozakh-i-Pur Nimat): বাংলার আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত আর্দ্র ও কুয়াশাচ্ছন্ন, যা বহিরাগতদের স্বাস্থ্যের অনুকূল ছিল না। স্যাঁতসেঁতে জলবায়ু অথচ অফুরন্ত ধন-সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে পারসিক বণিকরা বাংলাকে আখ্যায়িত করেছিল “দোযখপুর নি’আমত” অর্থাৎ ‘নেয়ামতে ভরপুর দোজখ’।
- নদীপথ ও নৌ-যোগাযোগ: ইবনে বতুতা মেঘনা ও সুরমা নদীর মধ্য দিয়ে নৌকায় ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি নদীমাতৃক বাংলার নয়নাভিরাম রূপ, নদীর দুপাশের শস্যশ্যামল বাজার ও সমৃদ্ধ গ্রাম দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
- সুফি ও ইসলাম প্রচার: তিনি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর খানকাহ্ পরিদর্শন করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, হযরত শাহজালাল ছিলেন অত্যন্ত পরহেযগার, আজীবন রোজাদার এবং তার আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে অগণিত মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
- সামাজিক আতিথেয়তা ও নিরাপত্তা: বাংলার সাধারণ মানুষ ও মুসলিম সমাজ বিদেশি ফকির, আলেম ও পর্যটকদের অত্যন্ত সম্মান ও মুক্তহস্তে আতিথেয়তা প্রদান করত।
৮। বাংলার স্বাধীন সুলতান হিসেবে ফখরুদ্দীন মোবারক শাহের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the achievements of Fakhruddin Mubarak Shah as an independent sultan of Bengal.]
উত্তরঃ
ঐতিহাসিক তাৎপর্য:
১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির তুঘলক সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের অধীনতা অস্বীকার করে সোনারগাঁয়ের সিলাহদার ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনিই বাংলায় দীর্ঘ দুইশত বছরের গৌরবময় স্বাধীন সুলতানি আমলের (১৩৩৮-১৫৩৮ খ্রি.) শুভসূচনা করেন।
ফখরুদ্দীন মোবারক শাহের অনন্য কৃতিত্বসমূহ:
- সোনারগাঁয়ে স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর: ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ দিল্লির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে নিজের নামে ‘সুলতান’ উপাধি গ্রহণ করেন, মুদ্রা চালু করেন এবং খুতবা পাঠ করান। দিল্লির সৈন্যদের আক্রমণ পরাহত করে তিনি সোনারগাঁয়ের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখেন।
- চট্টগ্রাম বিজয়: ফখরুদ্দীনের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক কীর্তি হলো ত্রিপুরা ও আরাকানিদের হাত থেকে চট্টগ্রাম বন্দর বিজয়। তিনি চট্টগ্রামকে সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করে সেখানে শক্তিশালী নৌঘাঁটি স্থাপন করেন এবং একে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপান্তর করেন।
- নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন: সমুদ্র ও নদীপথে চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তিনি একটি আধুনিক ও শক্তিশালী নৌবাহিনী গঠন করেন। ইবনে বতুতা তার ভ্রমণবৃত্তান্তে ফখরুদ্দীনের পরাক্রমশালী নৌবাহিনীর ভুয়সী প্রশংসা করেছেন।
- অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: তিনি রাজধানী সোনারগাঁও থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত দীর্ঘ সৈন্য চলাচলের বাঁধ ও সড়ক নির্মাণ করেন। চাঁদপুরে নির্মিত ট্রাঙ্ক রোড এবং অসংখ্য সরাইখানা তার দূরদর্শী নগর ভাবনার পরিচয় দেয়।
- মুদ্রা ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা: তার আমলে চালুকৃত রৌপ্যমুদ্রা অত্যন্ত বিশুদ্ধ ছিল। তিনি রাজ্যে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সর্বসাধারণ ও বিদেশি বণিকদের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন।
খ বিভাগ — সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
(যে কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও | মান: ১০ × ২ = ২০)
৯। প্রাচীন বাংলার ভৌগোলিক পরিচয় দাও।
[Give the geographical identity of ancient Bengal.]
উত্তরঃ
ভৌগোলিক সীমানা ও বৈশিষ্ট্য:
প্রাচীন বাংলা মূলত হিমালয় পর্বতমালার দক্ষিণে এবং বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশে অবস্থিত একটি সুবিশাল নদীবিধৌত বদ্বীপ অঞ্চল। উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা ও নেপাল-ভুটানের পাদদেশ, দক্ষিণে নীল জলরাশির বঙ্গোপসাগর, পূর্বে মনিপুর ও বার্মার (মায়ানমার) লুসাই ও আরাকান পর্বতশ্রেণি এবং পশ্চিমে ছোটনাগপুর ও রাজমহল পাহাড় প্রাচীন বাংলার প্রাকৃতিক সীমানা নির্ধারণ করেছিল।
পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, ভাগীরথী, করতোয়া ও মহানন্দা নদীর পলি দ্বারা গঠিত এই অঞ্চলটি ছিল পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা উর্বর কৃষি অঞ্চল। নদীগুলোর গতিপথ প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে কাজ করায় বহিরাগত শত্রুরা সহজে বাংলায় সামরিক আধিপত্য বিস্তার করতে পারত না, যা বাংলাকে দীর্ঘকাল স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ধরে রাখতে সহায়তা করেছিল।
১০। মাৎসন্যায় ব্যাখ্যা কর।
[Explain the Matsyanyaya.]
উত্তরঃ
মাৎসন্যায় (Matsyanyaya)-এর ধারণা:
‘মাৎসন্যায়’ হলো একটি সংস্কৃত পরিভাষা, যার শাব্দিক অর্থ ‘মাছের ন্যায় অবস্থা’। পুকুরে যেমন বড় মাছ ছোট মাছকে ধরে গিলে খায়, ঠিক তেমনি কোনো রাষ্ট্রে যখন কেন্দ্রীয় শাসন ও বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে এবং শক্তিমান বা সবল ব্যক্তিরা দুর্বল মানুষের ওপর যথেচ্ছ অত্যাচার ও সম্পদ লুণ্ঠন চালায়—সেই চরম নৈরাজ্যময় অরাজক অবস্থাকে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র ও তারানাথের ইতিহাসে ‘মাৎসন্যায়’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
বাংলার প্রেক্ষাপট: রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর সপ্তম শতকের মাঝামাঝি থেকে অষ্টম শতকের মাঝামাঝি (আনুমানিক ৬৫০-৭৫০ খ্রি.) প্রায় একশত বছর বাংলায় কোনো যোগ্য কেন্দ্রীয় শাসক ছিল না। বাংলার সামন্ত প্রভুরা পরস্পরের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিল। অবশেষে আনুমানিক ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সর্বসাধারণ ও প্রধান অমাত্যবর্গ ঐক্যবদ্ধ হয়ে গোপাল নামক এক যোগ্য ও জনপ্রিয় সামন্তকে বাংলার রাজা নির্বাচিত করেন, যার মাধ্যমে দীর্ঘ মাৎসন্যায়ের অবসান ঘটে এবং সুসংহত পাল সাম্রাজ্যের শুভসূচনা হয়।
১১। সম্রাট আকবর কর্তৃক বাংলা বিজয়ের ফলাফল লেখ।
[Write the results of the conquests of Bengal by emperor Akbar.]
উত্তরঃ
১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দের রাজমহলের যুদ্ধ ও ফলাফল:
১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজমহলের যুদ্ধে মুঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি খান জাহান ও রাজা টোডরমলের হাতে বাংলার শেষ কররানী সুলতান দাউদ খান কররানী পরাজিত ও নিহত হন। এর মধ্য দিয়ে বাংলায় আড়াই শতাব্দীর স্বাধীন সুলতানি শাসনের চিরসমাপ্তি ঘটে।
প্রধান ফলাফলসমূহ:
- মুঘল সুবাহ হিসেবে অন্তর্ভুক্তি: বাংলা দিল্লির মুঘল সাম্রাজ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য প্রদেশে (সুবাহ বাংলা) পরিণত হয়।
- রাজনৈতিক সংহতি: দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনের আওতায় পুরো অঞ্চলে সুসংহত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
- বার ভূঁইয়াদের তীব্র প্রতিরোধ: আকবর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা জয় করলেও পূর্ব বাংলার বার ভূঁইয়াদের প্রধান ঈসা খাঁ মুঘলদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী ও সফল প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যান।
- টোডরমলের রাজস্ব নীতি: রাজা টোডরমলের বিখ্যাত ‘জবতি’ ও ‘জব্দ’ পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলার জমির পরিমাপ ও রাজস্ব নির্ধারণ আধুনিক রূপ লাভ করে।
১২। বাংলার বার ভূঁইয়াদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
[Give a short account of the Bara Bhuiyan in Bengal.]
উত্তরঃ
বার ভূঁইয়াদের পরিচয়:
১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে মুঘলরা পশ্চিম বাংলা দখল করলেও ভাটি অঞ্চল বা পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলার বিস্তীর্ণ নদীমাতৃক অঞ্চলে শক্তিশালী ও স্বাধীনচেতা কিছু জমিদার ও সামন্ত সর্দার দিল্লির মুঘল আধিপত্য মেনে নেননি। এই দেশপ্রেমিক বীর প্রতিরোধকারীদের ইতিহাসে ‘বার ভূঁইয়া’ (Bara Bhuiyans) বলা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে ‘বার’ সংখ্যাটি মূলত অনির্দিষ্ট সংখ্যক স্বাধীন জমিদারদের প্রতীকী প্রকাশ।
প্রধান প্রধান বার ভূঁইয়া ও তাদের নেতা:
বার ভূঁইয়াদের সর্বপ্রধান নেতা ছিলেন সোনারগাঁয়ের ঈসা খাঁ এবং পরবর্তীতে তার সুযোগ্য পুত্র মুসা খাঁ। অন্যান্য প্রধান ভূঁইয়াদের মধ্যে ছিলেন চাঁদ রায় ও কেদার রায় (শ্রীপুর), কন্দর্প নারায়ণ ও রামচন্দ্র (বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ), খাজা উসমান (বোকাইনগর ও উসমানপুর), প্রতাপাদিত্য (যশোর) এবং মুকন্দরাম (ভূষণা)।
ঐতিহাসিক ভূমিকা: বার ভূঁইয়ারা নিজেদের উন্নত রণতরী ও কামানের সাহায্যে সম্রাট আকবরের আমলে মুঘল সেনাপতি মানসিংহকে বহুবার পরাজিত করেন। পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সুবাদার ইসলাম খান চিশতি ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে বার ভূঁইয়াদের একে একে দমন করে ঢাকাকে ‘জাহাঙ্গীরনগর’ নাম দিয়ে বাংলার স্থায়ী মুঘল রাজধানী স্থাপন করেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: প্রাচীন বাংলায় ‘মাৎসন্যায়’ যুগের অবসান কীভাবে ঘটেছিল?
উত্তর: আনুমানিক ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার বিশিষ্ট অমাত্য ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ একমত হয়ে গোপালকে বাংলার সিংহাসনে নির্বাচিত করার মাধ্যমে মাৎসন্যায়ের অবসান ঘটান।
প্রশ্ন ২: পাল বংশের ‘দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে কাকে অভিহিত করা হয়?
উত্তর: প্রথম মহীপালকে পাল বংশের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়, কারণ তিনি ধ্বংসোন্মুখ পাল সাম্রাজ্যকে কম্বোজদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার ও সুসংহত করেছিলেন।
প্রশ্ন ৩: ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী কোন শতাব্দীতে বাংলা জয় করেন?
উত্তর: ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে (১২০৪-১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে) বখতিয়ার খলজী নদীয়া জয়ের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন।
প্রশ্ন ৪: ইবনে বতুতা কোন সুলতানের রাজত্বকালে বাংলায় এসেছিলেন?
উত্তর: বিশ্বখ্যাত মরক্কোর পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দে সোনারগাঁয়ের স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহের রাজত্বকালে বাংলা ভ্রমণ করেন।
প্রশ্ন ৫: কোন যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলায় স্বাধীন সুলতানি শাসনের অবসান ঘটে?
উত্তর: ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জুলাই সংঘটিত রাজমহলের যুদ্ধে দাউদ খান কররানীর পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলায় স্বাধীন সুলতানি আমলের অবসান ঘটে।
প্রশ্ন ৬: বাংলার বার ভূঁইয়াদের প্রধান নেতা কে ছিলেন?
উত্তর: বার ভূঁইয়াদের প্রধান নেতা ছিলেন সোনারগাঁয়ের জমিদার ঈসা খাঁ (মসনদ-ই-আলা) এবং তার মৃত্যুর পর তার পুত্র মুসা খাঁ।