জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

ইসলামি লোকপ্রশাসনের ক্রমবিকাশ (Development of Islamic Public Administration) – 205206, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২০

Abswer.com Abswer.com
21 September, 2026
৪৬ মিনিট পড়ার সময়
৮ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২০
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: ইসলামি লোকপ্রশাসনের ক্রমবিকাশ (Development of Islamic Public Administration)
বিষয় কোড: 205206 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০

২০২০ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষের ‘ইসলামি লোকপ্রশাসনের ক্রমবিকাশ’ (বিষয় কোড: 205206) পরীক্ষায় প্রাক-ইসলামি আরবের গোত্রব্যবস্থা থেকে শুরু করে নবুওয়তি রাষ্ট্রদর্শন, খোলাফায়ে রাশেদীনের জনকল্যাণমুখী সামরিক ও দেওয়ানি কাঠামো, উমাইয়া ও আব্বাসীয়দের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসন এবং উপমহাদেশে দিল্লি সালতানাত ও মুঘল প্রশাসনিক পদ্ধতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নিচে প্রতিটি প্রশ্নের সুশৃঙ্খল, তথ্যবহুল ও প্রমিত সমাধান তুলে ধরা হলো।

ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)

১। প্রাক-ইসলামি আরবের শাসনব্যবস্থা এবং ইসলামি লোকপ্রশাসনে এর প্রভাব আলোচনা কর।

[Discuss the pre-Islamic Arab administrative system and its influence on Islamic public administration.]

উত্তর:

ভূমিকা: প্রাক-ইসলামি আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগে আরবে কোনো সুসংগঠিত কেন্দ্রীয় সরকার, স্থায়ী লিখিত আইন বা আনুষ্ঠানিক বিচার বিভাগ ছিল না। মরুময় আরবের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে সেখানকার শাসনকাঠামো সম্পূর্ণভাবে রক্তসম্পর্কীয় গোত্রব্যবস্থা (Tribal System)-র ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর মহানবী (সা.) এই গোত্রীয় উপাদানের ইতিবাচক দিকগুলোকে সংস্কার করে এবং নেতিবাচক গোত্রীয় সংকীর্ণতা দূর করে একটি সর্বজনীন খিলাফত ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি করেন।

প্রাক-ইসলামি আরবের শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি:
১. গোত্রীয় সংগঠন ও শাইখ (Shaikh): আরব সমাজ বিভিন্ন স্বাধীন গোত্রে (কাবিলা) বিভক্ত ছিল। প্রতিটি গোত্রের প্রধানকে বলা হতো ‘শাইখ’। তিনি সাধারণত গোত্রের প্রবীণ, অভিজ্ঞ, সাহসী ও দানশীল ব্যক্তিদের মধ্য থেকে সাধারণ মতৈক্যের ভিত্তিতে নির্বাচিত হতেন। তবে শাইখের কোনো নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ছিল না; তিনি ছিলেন মূলত গোত্রের সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে প্রথম (Primus inter pares)।
২. মাজলিস বা পরামর্শক সভা: গোত্রের যুদ্ধ, শান্তি, সন্ধি ও বাণিজ্য সংক্রান্ত যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য গোত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি পরামর্শক সভা বা ‘মাজলিস’ বসত।
৩. দারুন নদওয়া (Council of Elders): মক্কার কুরাইশ গোত্রের জন্য কুসাই ইবনে কিলাব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘দারুন নদওয়া’ ছিল একটি সিটি কাউন্সিল বা পৌর সংসদের মতো। চল্লিশোর্ধ্ব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এখানে বসে মক্কার নিরাপত্তা ও কাফেলা বাণিজ্যের সিদ্ধান্ত নিতেন।
৪. আইন ও বিচার: আরবে কোনো লিখিত আইন ছিল না। প্রচলিত প্রাচীন সামাজিক প্রথা (উরফ/আদাত) এবং রক্তের বদলে রক্ত বা ‘কিসাস’ (Lex Talionis)-এর মাধ্যমে প্রতিশোধ গ্রহণ ছিল অপরাধ দমনের একমাত্র প্রচলিত প্রথা।

ইসলামি লোকপ্রশাসনে প্রাক-ইসলামি ব্যবস্থার প্রভাব:
মহানবী (সা.) প্রাক-ইসলামি রীতিনীতির আমূল সংস্কারসাধন করেন:
১. রক্তসম্পর্কের বদলে আদর্শিক ভ্রাতৃত্ব: জাহেলি যুগের সংকীর্ণ বংশগৌরব বা গোত্রবাদের (আসাবিয়্যাহ) পরিবর্তে ইসলাম ‘তাওহিদ’ ও ‘উম্মাহ’ (মুসলিম ভ্রাতৃত্ব)-র ধারণা প্রতিষ্ঠা করে। ফলে একটি অখণ্ড ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
২. মাজলিসের রূপান্তর — শুরা পদ্ধতি: জাহেলি গোত্রীয় পরামর্শ সভা ‘মাজলিস’-কে ইসলাম কুরআন নির্দেশিত ‘মাজলিসুশ শুরা’ (পরামর্শ পরিষদ)-তে রূপান্তর করে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা দান করে।
৩. দারুন নদওয়ার বিলুপ্তি ও মসজিদে নববীর প্রশাসনিক কেন্দ্র: মক্কার দারুন নদওয়ার অলিগার্কিক কাঠামোর বদলে মদিনায় মসজিদে নববীকে রাষ্ট্র পরিচালনা, কূটনীতি, সামরিক নির্দেশনা ও বিচারালয়ের মূল প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
৪. কিসাস ব্যবস্থার আইনি নিয়ন্ত্রণ: অনিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিগত রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় বিচারকের (কাজি) মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর অধীনে ‘কিসাস’ ও ‘দিয়াত’ (রক্তপণ)-কে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত করা হয়।

উপসংহার: ইসলাম প্রাক-ইসলামি আরবের বিশৃঙ্খল গোত্রীয় উপাদানগুলোকে উম্মাহর সর্বজনীন আদর্শ, লিখিত সংবিধান (মদিনা সনদ) এবং আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীনে এনে মানব ইতিহাসের প্রথম সার্থক জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রকাঠামো উপহার দিয়েছিল।

২। মহানবী (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সামরিক প্রশাসন ব্যবস্থার বিবরণ দাও।

[Give an account of the military administrative system of Prophet (S.) and the Khulafa-e-Rashideen.]

উত্তর:

ভূমিকা: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং পরবর্তীতে চার খলিফার (খোলাফায়ে রাশেদীন) আমলে মদিনা রাষ্ট্রকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা এবং ইসলামের বিশ্বব্যাপী প্রসারের জন্য যে সামরিক প্রশাসন গড়ে উঠেছিল, তা ছিল নৈতিক শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও সামরিক দক্ষতার এক অতুলনীয় সমন্বয়।

মহানবী (সা.)-এর সামরিক প্রশাসন:
১. সর্বাধিনায়ক হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.): তিনি স্বয়ং ছিলেন মদিনা ইসলামি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। প্রতিটি যুদ্ধাভিযানের পরিকল্পনা, সেনাপতি নিয়োগ এবং কূটনৈতিক দিকনির্দেশনা তিনি সরাসরি প্রদান করতেন। যে যুদ্ধে তিনি নিজে অংশগ্রহণ করতেন তাকে ‘গাজওয়া’ (মোট ২৭টি) এবং যে অভিযানে তিনি নিজে না গিয়ে কোনো সাহাবিকে সেনাপতি করে পাঠাতেন তাকে ‘সারিয়্যা’ (প্রায় ৬০টির অধিক) বলা হয়।
২. স্বেচ্ছাসেবী মোজাহিদ ও নৈতিক কোড অব কন্ডাক্ট: সে যুগে কোনো নিয়মিত বেতনভোগী বাহিনী ছিল না; আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাহাবায়ে কেরাম স্বেচ্ছায় জিহাদে অংশ নিতেন। যুদ্ধে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, পুরোহিত হত্যা নিষিদ্ধ ছিল; ফসলি জমি ও গাছপালা ধ্বংস এবং উপাসনালয় ভাঙচুর কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল।
৩. রণকৌশলের আধুনিকায়ন: বদর যুদ্ধে পানির কূপের দখল, উহুদ যুদ্ধে গিরিপথে তীরন্দাজ দল মোতায়েন এবং খন্দক যুদ্ধে পারস্যের বিখ্যাত পরিখা খনন কৌশল প্রয়োগ ছিল সামরিক প্রশাসনের অভাবনীয় উদ্ভাবন।

খোলাফায়ে রাশেদীনের সামরিক প্রশাসন (বিশেষত হযরত উমর রা.-এর সংস্কার):
১. নিয়মিত স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠন: হযরত উমর (রা.) সামরিক বাহিনীকে সাধারণ নাগরিক থেকে পৃথক করে বিশ্বের প্রথম সুসংগঠিত স্থায়ী জাতীয় সেনাবাহিনী (Standing Army) গঠন করেন।
২. ‘দিওয়ানুল জুন্দ’ (সামরিক বিভাগ) প্রতিষ্ঠা: সামরিক প্রশাসন পরিচালনার জন্য একটি পৃথক সেন্ট্রাল রেজিস্ট্রি বা সামরিক বিভাগ খোলা হয়, যেখানে সকল সৈনিকদের নাম, বংশপরিচয়, পদমর্যাদা ও তাদের পরিবারবর্গের সঠিক তালিকা লিপিবদ্ধ থাকত।
৩. নিয়মিত বেতন ও ভাতা প্রদান: যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনিমত)-এর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বায়তুল মাল থেকে নিয়মিত বেতন (আতা) ও মাসিক রেশন চালুর ব্যবস্থা করা হয়। একজন সাধারণ সেনার বার্ষিক ভাতা ৩০০ থেকে ৬০০ দিরহাম পর্যন্ত ছিল।
৪. সামরিক ছাউনি ও নতুন সেনানগরী নির্মাণ: বিজিত জনগণের সাথে সামরিক সংঘর্ষ এড়াতে এবং সেনাদের সার্বক্ষণিক যুদ্ধপ্রস্তুতির জন্য বিভিন্ন ফ্রন্টে সেনানগরী (আমসার) গড়ে তোলা হয়। যেমন: ইরাকে কুফা ও বসরা, মিশরে ফুসতাত।
৫. সেনাবাহিনীর পদমর্যাদা ও বিভাজন: সেনাদের দশজন (আরিফ), একশত জন (কায়েদ) এবং এক হাজার জন (আমির)-এর মতো সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক স্তরে ভাগ করা হয়। অশ্বারোহী, পদাতিক, তীরন্দাজ এবং পাথর নিক্ষেপক বিশেষ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৬. নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠা: হযরত উসমান (রা.)-এর আমলে সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া (রা.)-এর উদ্যোগে ভূমধ্যসাগরে প্রথম শক্তিশালী মুসলিম নৌবাহিনী গঠিত হয় এবং সাইপ্রাস বিজিত হয়।

উপসংহার: খোলাফায়ে রাশেদীনের সামরিক প্রশাসন ছিল একদিকে অদম্য সমরকুশলী এবং অন্যদিকে কঠোর নৈতিক অনুশাসনে বাঁধা, যা সমকালীন রোমান ও বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীকে হতবাক করে দিয়েছিল।

৩। উমাইয়া আমলের বিচার ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।

[Discuss the main features of the judicial system during the Umayyad period.]

উত্তর:

ভূমিকা: উমাইয়া খিলাফতকালে (৬৬১-৭৫০ খ্রি.) ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা স্পেন থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত বিস্তৃত হলে বিচার প্রশাসনকে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পর্যায়ে আরও সুসংহত এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কার্যপদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরের উদ্ভাবন ছিল উমাইয়া বিচার ব্যবস্থার অন্যতম সাফল্য।

উমাইয়া বিচার ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: কাজিদের খলিফা বা প্রাদেশিক গভর্নর নিয়োগ করলেও তারা ব্যক্তিগত রায় প্রদানে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন। গভর্নর বা প্রভাবশালী উমাইয়া রাজপুত্রদের বিরুদ্ধেও সাধারণ প্রজাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কাজিগণ সমন জারি করতেন এবং নিরপেক্ষ রায় দিতেন।
২. কাজিউল কুজাত (প্রধান বিচারপতি) পদের ভিত্তি: প্রাদেশিক বিচারকদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং রাজধানীতে জটিল বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য খলিফার দরবারে প্রধান কাজির অবস্থান স্পষ্ট হতে শুরু করে।
৩. কাজি নিয়োগের কঠোর যোগ্যতা: কাজি হিসেবে সেই ব্যক্তিকেই মনোনীত করা হতো যিনি ছিলেন কুরআন-হাদিসে গভীর পণ্ডিত, খোদাভীরু, ন্যায়পরায়ণ, স্বাধীন চিন্তার অধিকারী এবং উচ্চ সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন ফকিহ। কাজিদের যাতে ঘুষ বা দুর্নীতির প্রলোভন স্পর্শ করতে না পারে, সেজন্য বায়তুল মাল থেকে অত্যন্ত উচ্চ অঙ্কের সম্মানী ও বেতন প্রদান করা হতো।
৪. ‘মাজালিম’ আদালত (Board of Grievances / دیوان المظالم): উমাইয়া বিচার ব্যবস্থার এক ঐতিহাসিক উদ্ভাবন হলো ‘মাজালিম’ আদালত। উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী, সেনাপতি বা স্বয়ং খলিফার পরিবারের সদস্যদের অন্যায় বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকরা এখানে নালিশ করতে পারত। খলিফা আব্দুল মালিক ও দ্বিতীয় উমর স্বয়ং মাজালিম আদালতের এজলাসে বসে অভিযোগ শুনানি করতেন।
৫. হিসবাহ ও আল-মুহতাসিব: বাজারে ও সমাজে প্রতারণা রোধ, ওজন ও পরিমাপের সঠিকতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রকাশ্যে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ‘মুহতাসিব’ নিয়োগ করা হতো। তিনি ছিলেন ভ্রাম্যমাণ ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশি ক্ষমতার অধিকারী।
৬. অমুসলিমদের বিচারিক স্বায়ত্তশাসন: অমুসলিম জিম্মি (খ্রিস্টান ও ইহুদি) প্রজাদের তাদের নিজস্ব ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় আইন অনুযায়ী বিচার পরিচালনার জন্য নিজস্ব চার্চ বা সিনাগগ আদালতের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। তবে মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যকার ফৌজদারি বিরোধ কাজি আদালতে নিষ্পত্তি হতো।

উপসংহার: রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উমাইয়াদের একনায়কতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের বিবর্তন ঘটলেও বিচার বিভাগে তারা ইসলামি শরিয়াহর মৌলিক ন্যায়পরায়ণতা অক্ষুণ্ণ রাখতে সচেষ্ট ছিলেন।

৪। আব্বাসীয় কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনা কর।

[Discuss the central and provincial administration of the Abbasid period.]

উত্তর:

ভূমিকা: ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়াদের পতনের পর প্রতিষ্ঠিত আব্বাসীয় খিলাফত ইসলামি লোকপ্রশাসনে এক স্বর্ণযুগের সূচনা করে। দামেস্ক থেকে বাগদাদে রাজধানী স্থানান্তর এবং পারস্যের প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয়ে আব্বাসীয়রা একটি অত্যন্ত সুসংহত কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র এবং বিস্তৃত প্রাদেশিক কাঠামো গড়ে তোলে।

আব্বাসীয় কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার মূল উপাদানসমূহ:
১. খলিফা: রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কেন্দ্রবিন্দু। তিনি ছিলেন রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক ক্ষমতার সর্বাধিনায়ক এবং শরিয়াহর রক্ষক।
২. উজিরের পদ (The Wazirate): আব্বাসীয় কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সবচেয়ে বিপ্লবী উদ্ভাবন হলো ‘উজির’ পদের প্রবর্তন (বিশেষত বারমাকি পরিবারের অবদান)। উজির মূলত দুই প্রকার ছিলেন:
উজিরুল তাফবিদ (সম্পূর্ণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী): খলিফার প্রায় সকল প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতেন।
উজিরুল তানফিজ (বাস্তবায়নকারী উজির): কেবল খলিফার সিদ্ধান্ত ও আদেশ বাস্তবায়ন করতেন।
৩. কেন্দ্রীয় দিওয়ান বা মন্ত্রণালয়সমূহ:
দিওয়ানুল খারাজ (রাজস্ব অর্থ মন্ত্রণালয়): সাম্রাজ্যের জমিজমা, কর ও রাজস্বের প্রধান দপ্তর।
দিওয়ানুল জুন্দ (সামরিক মন্ত্রণালয়): সেনাবাহিনীর পদায়ন, বেতন ও সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণকারী দপ্তর।
দিওয়ানুর রাসায়েল বা ইনশা (পৌর ও রাজকীয় পত্র যোগাযোগ): সকল রাষ্ট্রীয় ফরমান ও সরকারি চিঠিপত্রের দপ্তর।
দিওয়ানুল বারীদ (ডাক ও গোয়েন্দা সংস্থা): অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সাম্রাজ্যের সংবাদ আদান-প্রদান এবং প্রাদেশিক গভর্নরদের ওপর নজরদারি করার আধুনিক ইনটেলিজেন্স সার্ভিস।
দিওয়ানুন নাফাকাত (ব্যয় নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়): রাজপ্রাসাদ ও সরকারি বাজেটের ব্যয় নিরীক্ষণ দপ্তর।

আব্বাসীয় প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থার রূপরেখা:
১. প্রাদেশিক গভর্নর বা ওয়ালি (Wali): সমগ্র সাম্রাজ্যকে মেসোপটেমিয়া, পারস্য, সিরিয়া, মিশর, হিজাজ ও ইয়েমেনের মতো বৃহৎ প্রদেশে ভাগ করা হতো। প্রতিটি প্রদেশের প্রধানকে বলা হতো ‘ওয়ালি’ বা ‘আমির’।
২. ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ও দিওয়ান ব্যবস্থা: প্রাদেশিক গভর্নরের পাশাপাশি খলিফা কর্তৃক সরাসরি স্বাধীন ‘আমিল’ (রাজস্ব কর্মকর্তা) এবং ‘কাজি’ (বিচারক) নিয়োগ দেওয়া হতো, যাতে গভর্নর অতিরিক্ত স্বেচ্ছাচারী হতে না পারেন।
৩. ডাক ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক: প্রাদেশিক বারীদ প্রধান (সাহিবুল বারীদ) সরাসরি বাগদাদে খলিফার নিকট প্রদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি এবং গভর্নরের আচরণের গোপন প্রতিবেদন পাঠাতেন।

কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক প্রশাসনের তুলনামূলক মূল্যায়ন:
আব্বাসীয় প্রাথমিক যুগে (মনসুর থেকে হারুনুর রশিদের আমল) কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এতই শক্তিশালী ছিল যে প্রাদেশিক গভর্নররা কেন্দ্রীয় উজির বা বারীদের অনুমতি ছাড়া কোনো বড় পদক্ষেপ নিতে পারতেন না। কিন্তু নবম শতাব্দীর পর তুর্কি দেহরক্ষীদের আধিপত্যে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দুর্বল হলে প্রাদেশিক গভর্নররা ক্রমশ স্বাধীন আমিরি প্রতিষ্ঠা করে (যেমন: মিশরে তুলুনি, পারস্যে সামানি ও তাহিরি রাজবংশ)। ফলে কেন্দ্রীয় আধিপত্য খর্ব হয়ে প্রদেশগুলোর স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি পায়।

উপসংহার: আব্বাসীয় কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক প্রশাসন ব্যবস্থা মধ্যযুগীয় প্রাচ্যের সর্বাপেক্ষা সুশৃঙ্খল আমলাতান্ত্রিক মডেল হিসেবে স্মরণীয়।

৫। দিল্লি সালতানাতের শাসনব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ পর্যালোচনা কর।

[Review the main features of the administrative system of the Delhi Sultanate.]

উত্তর:

ভূমিকা: ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে কুতুবুদ্দীন আইবেক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এবং মামলুক, খলজি, তুগলক, সাইয়্যিদ ও লোদি বংশের মাধ্যমে ১৫২৬ সাল পর্যন্ত পরিচালিত দিল্লি সালতানাত ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম লোকপ্রশাসনের এক স্থায়ী ভিত্তি স্থাপন করে। বিশাল অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সামরিক নিরাপত্তার তাগিদে এটি একটি সুসংহত আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক কাঠামো হিসেবে গড়ে ওঠে।

দিল্লি সালতানাতের শাসনব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

১. সুলতানের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও মর্যাদা: সুলতান ছিলেন রাষ্ট্রের অবিসংবাদিত সামরিক ও প্রশাসনিক প্রধান। গিয়াসউদ্দিন বলবন রাজতন্ত্রের মর্যাদা বৃদ্ধিতে পারস্যের অনুকরণে ‘সিজদা’ ও ‘পাইবস’ (পদচুম্বন) প্রথা চালু করেন এবং সুলতানকে ‘জিল্লুল্লাহ’ (আল্লাহর ছায়া) এবং ‘নিয়াবত-ই-খোদা’ হিসেবে ঘোষণা করেন।
২. মজলিস-ই-খালওয়াত (উপদেষ্টা পরিষদ): সুলতানের বিশ্বস্ত মন্ত্রী ও আমিরদের নিয়ে এই গোপন পরামর্শ সভা গঠিত হতো, যা নীতি নির্ধারণে সহায়তা করত।
৩. কেন্দ্রীয় চার প্রধান মন্ত্রণালয়:
দিওয়ান-ই-উজারত: উজিরের অধীন অর্থ ও রাজস্ব দপ্তর।
দিওয়ান-ই-আরিজ: আরিজ-ই-মামালিকের অধীন সামরিক দপ্তর, যা সৈন্য সংগ্রহ, পরিদর্শন ও বেতন বণ্টনের কাজ করত। আলাউদ্দীন খলজি এখানে ‘দাগ’ (ঘোড়ায় সিলমোহর) ও ‘হুলিয়া’ (সৈনিকের চেহারার বিবরণ) চালু করেন।
দিওয়ান-ই-ইনশা: রাজকীয় দলিল ও রাজকীয় চিঠিপত্র সংক্রান্ত দপ্তর।
দিওয়ান-ই-রিসালাত: ধর্মীয় বিষয়, বৈদেশিক কূটনৈতিক যোগাযোগ ও অনুদান সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়।
৪. ইকতা ব্যবস্থা (Iqta System): সাম্রাজ্যের বিশাল ভূখণ্ডকে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত করে সেনাধ্যক্ষ ও রাজকর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করা হতো, যাকে ‘ইকতা’ বলা হতো। ইকতার শাসককে বলা হতো ‘মুক্তা’ বা ‘ইকতাদার’। তারা স্থানীয় রাজস্ব আদায় করত এবং নির্দিষ্ট সৈন্যবাহিনী লালন-পালন করে সুলতানের প্রয়োজনে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত করত।
৫. বাজার দর নিয়ন্ত্রণ নীতি: আলাউদ্দীন খলজির দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং শাহনা-ই-মান্ডি ও বারীদ নিয়োগ ছিল অর্থনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার এক যুগান্তকারী প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
৬. বিচার ব্যবস্থা: সুলতানের পর প্রধান বিচারক ছিলেন ‘কাজি-উল-কুজাত’। শরিয়াহ আইন ফৌজদারি বিষয়ে কার্যকর হলেও হিন্দুদের দেওয়ানি বিষয়ে তাদের নিজস্ব পঞ্চায়েত প্রথা বহাল রাখা হয়েছিল।

উপসংহার: দিল্লি সালতানাত মধ্য এশিয়ার সামরিক অভিজ্ঞতা এবং ভারতীয় বাস্তবতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীতে মুঘলদের উন্নত শাসনব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে।

৬। মুঘল প্রশাসনিক কাঠামোতে উজিরদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the powers and responsibilities of the Viziers in the Mughal administrative structure.]

উত্তর:

ভূমিকা: ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্যের (১৫২৬-১৮৫৮ খ্রি.) সুদৃঢ় প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল প্রধানমন্ত্রীর পদ, যা মুঘল দরবারে ‘ওয়াকিল’ (Wakil) বা পরবর্তীতে প্রধানত ‘ওয়াজির’ (Wazir) বা ‘দেওয়ান-ই-আলা’ নামে পরিচিত ছিল। সম্রাট আকবরের সময় থেকে উজিরের দায়িত্ব ও ক্ষমতার এক অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ন ঘটে।

মুঘল উজিরের ক্ষমতা ও কার্যাবলির মূল্যায়ন:
১. ওয়াকিল থেকে উজিরের রূপান্তর: মুঘল সাম্রাজ্যের শুরুর দিকে বৈরাম খানের মতো অভিভাবক ও প্রধান উজিররা ‘ওয়াকিল-উস-সালতানাত’ হিসেবে সম্রাটের সমকক্ষ একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা ভোগ করতেন। কিন্তু আকবর সিংহাসনে বসে ওয়াকিলের রাজনৈতিক ক্ষমতা খর্ব করেন এবং প্রশাসনের আর্থিক ও নির্বাহী ক্ষমতা ‘দেওয়ান’ বা ‘উজির’-এর হাতে ন্যস্ত করে একটি কার্যকর চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স (নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য) ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
২. প্রধান রাজস্ব ও অর্থ কর্মকর্তা: উজির ছিলেন সাম্রাজ্যের প্রধান অর্থমন্ত্রী (Finance Minister)। সমগ্র সাম্রাজ্যের ভূমি রাজস্বের হার নির্ধারণ, জায়গির বরাদ্দ, রাজকোষের সার্বিক আয়-ব্যয় এবং বার্ষিক বাজেট নিয়ন্ত্রণ তার প্রত্যক্ষ দায়িত্বে পরিচালিত হতো। রাজা টোডরমল দেওয়ান বা উজির হিসেবে ‘জবতি ব্যবস্থা’ ও ‘আইন-ই-দহসালা’ প্রবর্তন করে ঐতিহাসিক খ্যাতি লাভ করেন।
৩. প্রশাসনিক সমন্বয় সাধন: মীর বখশী (সামরিক প্রধান), খান-ই-সামান (রাজপ্রাসাদ ও কারখানা নিয়ন্ত্রক) এবং প্রধান সদর (ধর্ম ও দান বিভাগ)-এর যাবতীয় আর্থিক হিসাব ও বিল উজিরের সিলমোহর ও অনুমোদন ছাড়া কার্যকর হতে পারত না।
৪. নিয়োগ ও পদোন্নতি সুপারিশ: সুবেদার, ফৌজদার, মনসবদার এবং দেওয়ানদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির প্রস্তাব উজিরের দপ্তর হয়ে সম্রাটের চূড়ান্ত স্বাক্ষরের জন্য পেশ করা হতো।
৫. সম্রাটের অনুপস্থিতিতে অভিভাবকত্ব: সম্রাট রাজধানী ত্যাগ করলে বা অসুস্থ হলে উজির ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে সরকারি নথিপত্র অনুমোদন করতেন এবং রাজকীয় সিলমোহর (উজুক) ব্যবহারের দায়িত্ব পালন করতেন।

উপসংহার: আসাফ খান, সাদুল্লাহ খান প্রমুখ খ্যাতিমান উজিরদের বিচক্ষণ পরিচালনায় মুঘল সাম্রাজ্য সমকালীন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও সুশাসিত সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। উজির ছিলেন মুঘল প্রশাসনিক রথের প্রধান পরিচালক।

খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)

৭। মদিনা সনদে মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা ও প্রশাসনিক অবস্থান।

[Status and administrative position of Prophet (S.) in the Charter of Medina.]

উত্তর:
৬২২ খ্রিস্টাব্দে হিজরতের পর মহানবী (সা.) মদিনার মুসলিম, ইহুদি ও পৌত্তলিক গোত্রগুলোর মধ্যে যে ঐতিহাসিক ৪৭ বা ৫৩ ধারার লিখিত চুক্তি সম্পাদন করেন, তাই ‘মদিনা সনদ’। এ সনদের মাধ্যমে মহানবী (সা.) কেবল একজন আধ্যাত্মিক প্রচারক থেকে মদিনা প্রজাতন্ত্রের সর্বসম্মত রাষ্ট্রপ্রধান, সর্বোচ্চ আইনপ্রণেতা এবং প্রধান বিচারপতি হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করেন। সনদের বিখ্যাত ২৩ ও ৪২ নম্বর ধারায় ঘোষণা করা হয়—মদিনার নাগরিকদের মধ্যে যেকোনো বিবাদ, রক্তক্ষয়ী সংঘাত বা বিরোধের সৃষ্টি হলে তার চূড়ান্ত ফায়সালা করবেন আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল মুহাম্মদ (সা.)। এর মাধ্যমে আরবের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একক কেন্দ্রীয় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

৮। হযরত উমর (রা.)-এর প্রবর্তিত ‘দিওয়ান’ ব্যবস্থার পরিচয় দাও।

[Introduce the ‘Diwan’ system introduced by Hazrat Umar (R.).]

উত্তর:
হযরত উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিজিত হলে রাজধানীতে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও রাজস্ব জমা হতে থাকে। এই বিপুল সম্পদ সুশৃঙ্খলভাবে বণ্টন ও সংরক্ষণের জন্য ১৫ হিজরি (৬৩৬ খ্রি.) সনে পারস্যের হিসাব ব্যবস্থার অনুকরণে তিনি ‘দিওয়ান’ (Diwan – Central Registry of Pensions) ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবারবর্গ, বদরি সাহাবি, মুহাজির, আনসার এবং সাধারণ মুসলিম মুজাহিদদের পরিবারভিত্তিক ক্রমানুসারে তালিকা তৈরি করে তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় বায়তুল মাল থেকে বার্ষিক পেনশন ও ভাতা নির্ধারণ করা হয়। এটি ছিল আধুনিক সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার স্টেট বা সমাজকল্যাণমূলক পেনশন ব্যবস্থার প্রথম ঐতিহাসিক নিদর্শন।

৯। খিলাফত সম্পর্কে খারেজীদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মতবাদ সংক্ষেপে লেখ।

[Write briefly about the Kharijite political and administrative doctrine on Caliphate.]

উত্তর:
সিফফিনের যুদ্ধের (৬৫৭ খ্রি.) পর সালিশি নিষ্পত্তির বিরোধিতায় হযরত আলী (রা.)-এর দল ত্যাগকারী উগ্র গোষ্ঠী ইতিহাসে ‘খারেজী’ (বহির্গত) নামে পরিচিত। খিলাফত সম্পর্কে তাদের মতবাদ ছিল চরম গণতান্ত্রিক কিন্তু উগ্র:
১. খলিফা হওয়ার জন্য কুরাইশ বা কোনো নির্দিষ্ট বংশের হওয়া আবশ্যক নয়; বরং সর্বাধিক পরহেজগার যেকোনো যোগ্য মুসলিম (এমনকি হাবশি ক্রীতদাস হলেও) খলিফা নির্বাচিত হতে পারেন।
২. খলিফা নির্বাচন জনগণের অবাধ সম্মতির ভিত্তিতে হতে হবে।
৩. কোনো খলিফা যদি কুরআন ও সুন্নাহর পথ থেকে সামান্যতম বিচ্যুত হন, তবে তাকে অবিলম্বে সিংহাসনচ্যুত বা হত্যা করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব।
৪. তাদের স্লোগান ছিল “লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ” (আল্লাহ ছাড়া কারও বিচার বা শাসন করার অধিকার নেই)।

১০। মুঘল আমলে ‘সুবেদার’-এর কার্যাবলী সংক্ষেপে আলোচনা কর।

[Briefly discuss the functions of the Subadar in the Mughal period.]

উত্তর:
মুঘল সাম্রাজ্যে প্রদেশের প্রধান শাসনকর্তা বা গভর্নরকে বলা হতো ‘সুবেদার’ বা ‘নাজিম’ (যেমন: সুবা-ই-বাঙ্গালাহর সুবেদার ইসলাম খান বা শায়েস্তা খান)। তার মূল কার্যাবলি ছিল:
১. প্রদেশে সার্বিক শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং যেকোনো অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করা।
২. প্রাদেশিক সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনা করা এবং সাম্রাজ্যের প্রয়োজনে সৈন্যদের সদা প্রস্তুত রাখা।
৩. প্রাদেশিক দেওয়ানের রাজস্ব আদায়ে প্রশাসনিক ও সামরিক সহায়তা প্রদান করা।
৪. ফৌজদারি আদালত পরিচালনা করা এবং প্রজাদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা।
৫. সড়ক, দুর্গ, সরাইখানা নির্মাণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান কোনটি?

উত্তর: ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক মদিনায় প্রণীত ‘মদিনা সনদ’ হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে পৃথিবীর সর্বপ্রথম লিখিত রাষ্ট্রীয় সংবিধান।

প্রশ্ন ২: হযরত উমর (রা.)-এর আমলের সামরিক দপ্তরকে কী বলা হতো?

উত্তর: হযরত উমর (রা.) প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীয় সামরিক রেজিস্ট্রি ও পেনশন সংক্রান্ত বিভাগকে ‘দিওয়ানুল জুন্দ’ (Diwan al-Jund) বলা হতো।

প্রশ্ন ৩: উমাইয়া আমলে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের বিচার কোন আদালতে হতো?

উত্তর: উমাইয়া আমলে খলিফা, গভর্নর ও প্রভাবশালী অমাত্যদের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ শুনানির জন্য বিশেষ ‘মাজালিম আদালত’ (Diwan al-Mazalim) গঠিত হয়েছিল।

প্রশ্ন ৪: আব্বাসীয় আমলে ‘সাহিবুল বারীদ’-এর কাজ কী ছিল?

উত্তর: সাহিবুল বারীদ সাম্রাজ্যের ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার তদারকির পাশাপাশি প্রদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তথ্য খলিফার নিকট প্রেরণের গোপন গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করতেন।

প্রশ্ন ৫: দিল্লি সালতানাতের সামরিক মন্ত্রণালয়ের নাম কী ছিল?

উত্তর: দিল্লি সালতানাতের কেন্দ্রীয় সামরিক দপ্তরকে ‘দিওয়ান-ই-আরিজ’ বলা হতো, যার প্রধান ছিলেন আরিজ-ই-মামালিক।

প্রশ্ন ৬: মুঘল সম্রাট আকবরের বিখ্যাত হিন্দু অর্থমন্ত্রীর নাম কী?

উত্তর: মুঘল সম্রাট আকবরের খ্যাতিমান দেওয়ান ও অর্থমন্ত্রীর নাম ছিল রাজা টোডরমল, যিনি জমি জরিপ ও ‘জবতি ব্যবস্থা’ প্রবর্তন করেন।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *