জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

বাংলার ইতিহাস (১৫৭৬ খ্রি. পর্যন্ত) (History of Bengal up to 1576 A.D.) – 205203, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২০

Abswer.com Abswer.com
21 September, 2026
৪৮ মিনিট পড়ার সময়
৯ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২০
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: বাংলার ইতিহাস (১৫৭৬ খ্রি. পর্যন্ত) (History of Bengal up to 1576 A.D.)
বিষয় কোড: 205203 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০

২০২০ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষের ‘বাংলার ইতিহাস (১৫৭৬ খ্রি. পর্যন্ত)’ (বিষয় কোড: 205203) পরীক্ষায় প্রাচীন জনপদ থেকে শুরু করে পাল, সেন, স্বাধীন মুসলিম সালতানাত এবং মুঘল আগ্রাসনপূর্ব বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের গভীর বিশ্লেষণাত্মক প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নিচে পরীক্ষার্থীদের উপযোগী করে প্রতিটি প্রশ্নের বস্তুনিষ্ঠ, তথ্যবহুল ও প্রমিত ঐতিহাসিক সমাধান লিপিবদ্ধ করা হলো।

ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)

১। মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাসের উৎসসমূহ আলোচনা কর।

[Discuss the sources of the history of medieval Bengal.]

উত্তর:

ভূমিকা: মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাস মূলত ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে সূচনা লাভ করে এবং ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মুঘল শাসনের সূত্রপাতে পরিসমাপ্তি ঘটে। এই সুদীর্ঘ সাড়ে তিন শতকের ইতিহাস পুনর্নির্মাণের জন্য ঐতিহাসিকগণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বহুবিধ উপাদানের ওপর নির্ভর করেছেন।

মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাসের প্রধান উৎসসমূহ:
বাংলার ইতিহাসের উৎসসমূহকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা যায়: (ক) সাহিত্যিক বা বিবরণমূলক উৎস এবং (খ) প্রত্নতাত্ত্বিক উৎস।

(ক) সাহিত্যিক ও বিবরণমূলক উৎস:
১. ফার্সি ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলি:
মিনহাজ-ই-সিরাজের ‘তাবাকাত-ই-নাসিরি’: বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয় এবং প্রারম্ভিক তুর্কি গভর্নরদের শাসনকালের এটিই একমাত্র প্রত্যক্ষ ও নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক দলিল। মিনহাজ ১২৪২-৪৪ খ্রিস্টাব্দে স্বয়ং বাংলায় অবস্থান করে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন।
জিয়াউদ্দিন বারানীর ‘তারিখ-ই-ফিরোজশাহী’: গিয়াসউদ্দিন বলবনের বাংলা অভিযান এবং তুঘরিল খানের বিদ্রোহের বিশদ বিবরণ দেয়।
শামস-ই-সিরাজ আফিফের ‘তারিখ-ই-ফিরোজশাহী’: ইলিয়াস শাহ ও সিকান্দার শাহের বিরুদ্ধে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলকের বাংলা অভিযানের নির্ভরযোগ্য দলিল।
গোলাম হোসেন সেলিমের ‘রিয়াজ-উস-সালাতিন’ (১৭৮৮): বাংলার পূর্ণাঙ্গ ধারাক্রমিক মুসলিম ইতিহাস গ্রন্থের প্রথম প্রয়াস।

২. বৈদেশিক পর্যটকদের ভ্রমণবৃত্তান্ত:
ইবনে বতুতার ‘রিহলা’: মরক্কোর পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের রাজত্বকালে বাংলায় আগমন করেন। তিনি বাংলার অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য, সস্তাদরের প্রাচুর্য, নদ-নদীর বৈচিত্র্য এবং কামরূপ ও সিলেট ভ্রমণপূর্বক হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সাথে সাক্ষাতের অনবদ্য বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন।
চীনা ভ্রমণকারীদের বিবরণী: পঞ্চদশ শতকে ইলিয়াস শাহী ও রাজা গণেশের আমলে মা হুয়ান, ফেই শিন প্রমুখ চীনা দূত বাংলায় আসেন এবং এখানকার রেশম শিল্প, সামাজিক বিনোদন ও রাজকীয় আতিথেয়তার অমূল্য তথ্য দেন।
ইউরোপীয় বিবরণ: পর্তুগিজ পর্যটক বার্বোসা ও সিজার ফ্রেডরিকের বিবরণীতে চট্টগ্রাম ও সপ্তগ্রামের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিচয় পাওয়া যায়।

৩. স্থানীয় দেশীয় সাহিত্য:
চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির বৈষ্ণব পদাবলী, বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্যভাগবত’, বিজয়গুপ্তের ‘মনসামঙ্গল’ এবং শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ-জোলেখা’ সমকালীন সমাজ, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সুলতানদের সাহিত্য পৃষ্ঠপোষকতার প্রামাণ্য চিত্র তুলে ধরে।

(খ) প্রত্নতাত্ত্বিক উৎস:
১. মুদ্রাতাত্ত্বিক সাক্ষ্য (Numismatic Evidence): মধ্যযুগীয় বাংলার সালতানাত যুগের সঠিক কালানুক্রম, সুলতানদের উপাধি এবং প্রাদেশিক টাকশালের (যেমন: লখনৌতি, সোনারগাঁও, চাটগাঁও, ফিরোজাবাদ) তথ্য জানতে মুদ্রা এক অপরিহার্য উৎস।
২. শিলালিপি (Epigraphy): মসজিদ, মাদ্রাসা, সেতু ও দুর্গের দেওয়ালে উৎকীর্ণ আরবি ও ফার্সি শিলালিপি প্রশাসনিক কাঠামো ও নির্মাণের নির্ভুল সন-তারিখ প্রকাশ করে।
৩. স্থাপত্য নিদর্শন: আদিনা মসজিদ, দাখিল দরওয়াজা, ছোট সোনা মসজিদ, ষাটগম্বুজ মসজিদ সমকালীন শিল্পরীতি ও নগরজীবনের সাক্ষী।

উপসংহার: যদিও মধ্যযুগীয় বাংলার নিজস্ব ধারাবাহিক রাজকীয় ইতিবৃত্তকার সুলভ ছিল না, তথাপি দেশি-বিদেশি সাহিত্যিক বিবরণ ও সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের যৌথ পর্যালোচনার মাধ্যমেই আজ বাংলার মধ্যযুগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

২। পাল রাজা রামপালের কৃতিত্ব এবং কৈবর্ত বিদ্রোহ দমন আলোচনা কর।

[Discuss the achievements of Pala King Rampala and the suppression of the Kaivarta revolt.]

উত্তর:

ভূমিকা: একাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পাল সাম্রাজ্যের চরম অবক্ষয় ও গৃহবিবাদের সুযোগে বরেন্দ্র অঞ্চলে সংগঠিত কৈবর্ত বিদ্রোহ পাল শাসনের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছিল। এই চরম সংকটময় মুহূর্তে দ্বিতীয় মহীপালের ভ্রাতা রামপাল (১০৮২-১১২৪ খ্রি.) সিংহাসনে আরোহণ করে অসীম কূটনীতি ও সামরিক বিচক্ষণতায় বিদ্রোহ দমন করেন এবং পাল সাম্রাজ্যের শেষ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় পুনরুজ্জীবিত করেন।

কৈবর্ত বিদ্রোহের পটভূমি:
পাল সম্রাট দ্বিতীয় মহীপালের দুর্বল, অত্যাচারী ও দূরদৃষ্টিহীন শাসনের ফলে প্রজাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এই সুযোগে বরেন্দ্রের দিব্বোক বা দিব্য নামক এক স্থানীয় সামন্তের নেতৃত্বে কৈবর্ত জাতি প্রকাশ্য সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যুদ্ধে দ্বিতীয় মহীপাল নিহত হন এবং বরেন্দ্রভূমিতে দিব্য, রুদ্যোক ও পরবর্তীতে ভীমের নেতৃত্বে স্বাধীন কৈবর্ত শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। রামপাল প্রাণভয়ে মগধে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

রামপাল কর্তৃক সামন্তচক্র গঠন ও বিদ্রোহ দমন:
রামপাল উপলব্ধি করেন যে একাকী দুর্বল রাজকীয় বাহিনী নিয়ে শক্তিশালী ভীমকে পরাস্ত করা অসম্ভব। তাই তিনি রাজনৈতিক কূটনীতির আশ্রয় নেন:
১. সামন্ত জোট গঠন: রামপাল ব্যক্তিগতভাবে বাংলার বিভিন্ন শক্তিশালী সামন্ত নেতাদের দ্বারে দ্বারে গমন করেন এবং বিপুল অর্থ, হস্তী ও ভূমি প্রদানের আশ্বাসে এক অপরাজেয় সামন্ত মিত্রবাহিনী গড়ে তোলেন (সন্ধাকর নন্দীর ‘রামচরিতম’ কাব্যে এ মিত্রজোটের বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে)।
২. গঙ্গা পার হয়ে বরেন্দ্র আক্রমণ: রামপালের সেনাপতি ও মাতুলপুত্র শিবরাজ এক নৌ-সেতু তৈরি করে গঙ্গা নদী অতিক্রম করেন এবং বরেন্দ্রে ভীমের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ পরিচালনা করেন।
৩. ভীমের পরাজয় ও বন্দিদশা: চূড়ান্ত যুদ্ধে কৈবর্ত নেতা ভীম সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেও বন্দি হন। পরবর্তীতে ভীমের এক সহযোগী হরি পুনরায় বিদ্রোহ সংগঠিত করার চেষ্টা করলে তাকেও সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করা হয় এবং ভীমকে সপরিবারে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে কৈবর্ত বিদ্রোহের অবসান ঘটানো হয়।

রামপালের অন্যান্য ঐতিহাসিক কৃতিত্ব:
১. রামাবতী নগরী প্রতিষ্ঠা: বরেন্দ্রের গৌরব পুনরুদ্ধারের পর তিনি করতোয়া ও গঙ্গার মিলনস্থলে ‘রামাবতী’ নামক এক অপরূপ নতুন রাজধানী স্থাপন করেন।
২. জগদ্দল মহাবিহার নির্মাণ: বৌদ্ধ সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনে রামাবতীতে সুবিখ্যাত ‘জগদ্দল মহাবিহার’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ শিক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
৩. সাম্রাজ্য বিস্তার: তিনি কামরূপ (আসাম) এবং উৎকল (উড়িষ্যা) অঞ্চলে পাল আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং দক্ষিণাত্যের চোল ও চালুক্য আক্রমণ সফলভাবে প্রতিহত করেন।
৪. জনকল্যাণমূলক কাজ: বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণের জন্য বিশাল ‘রামপালের দীঘি’ সহ বহু জলাশয় খনন করান।

উপসংহার: রামপাল ছিলেন পাল বংশের সর্বশেষ শক্তিশালী ও দূরদর্শী সম্রাট। তার মৃত্যুর পরপরই অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পাল বংশ চিরতরে নিঃশেষিত হয়ে বাংলায় সেন বংশের উত্থান ঘটে।

৩। ইবনে বতুতার বিবরণ অবলম্বনে সমকালীন বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার বিবরণ দাও।

[Give an account of the socio-economic condition of contemporary Bengal based on Ibn Battuta’s description.]

উত্তর:

ভূমিকা: বিশ্বখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুগলকের শাসনামলে বাংলা পরিভ্রমণ করেন। তখন ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ সোনারগাঁওয়ে স্বাধীনভাবে শাসন করছিলেন। ইবনে বতুতার বিখ্যাত ভ্রমণগ্রন্থ ‘তুহফাতুন নুজজার ফি গারায়িবিল আমসার ওয়া আজায়িবিল আসফার’ (যা সংক্ষেপে ‘রিহলা’ নামে খ্যাত)-এ চতুর্দশ শতাব্দীর বাংলার সমাজ ও অর্থনীতির এক জীবন্ত প্রামাণ্য দলিল ফুটে উঠেছে।

সমকালীন বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা:
১. অবিশ্বাস্য প্রাচুর্য ও দ্রব্যমূল্যের সস্তা দর: ইবনে বতুতা বাংলাকে অঢেল খাদ্যশস্য ও গৃহপালিত পশুর দেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি লেখেন, “আমি পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করেছি, কিন্তু এমন সস্তাদরের দেশ আর কোথাও দেখিনি।” সমকালীন মূল্যের বর্ণনায় তিনি উল্লেখ করেন:
– এক রূপার দিনারে আটটি স্বাস্থ্যবান মোটা মুরগি পাওয়া যেত।
– এক দিরহামে পনেরটি কবুতর বা এক মণ ধান/চাল কেনা যেত।
– মাত্র এক স্বর্ণমুদ্রায় একটি দুগ্ধবতী উৎকৃষ্ট গাভী কেনা সম্ভব ছিল।
– এক দিনারে উৎকৃষ্ট সুতি কাপড়ের বিশাল থান পাওয়া যেত।

২. কৃষি ও নদীর ভূমিকা: নদীমাতৃক বাংলার দিগন্তবিস্তৃত ফসলি জমি, ধানক্ষেত এবং পানির অপরিসীম প্রাচুর্য দেখে তিনি মুগ্ধ হন। তিনি বাংলাকে নীল নদের অববাহিকার সাথে তুলনা করেছেন।

৩. নৌ-বাণিজ্য ও যোগাযোগ: অভ্যন্তরীণ পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা। অসংখ্য ছোট-বড় নৌযান নদীপথে খাদ্যশস্য, সুতিবস্ত্র ও মসলা বহন করে এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে নিয়ে যেত। সোনারগাঁও ও চট্টগ্রাম ছিল আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের ব্যস্ত কেন্দ্র।

৪. ‘দোযখ-ই-পুর নিয়ামত’ উপাধি: ইবনে বতুতা উল্লেখ করেন যে, বহিরাগত ভ্রমণকারী ও ব্যবসায়ীরা বাংলার অপরিসীম প্রাচুর্যের কারণে একে বলতেন ‘নিয়ামতপূর্ণ দেশ’, তবে এখানকার অতিরিক্ত আর্দ্র আবহাওয়া ও জলাভূমির ভ্যাপসা গরমের জন্য একে বলতেন ‘দোযখ-ই-পুর নিয়ামত’ (নিয়ামতে পরিপূর্ণ নরক)।

সমকালীন বাংলার সামাজিক অবস্থা:
১. ধর্মীয় পরিবেশ ও দরবেশদের প্রভাব: ইবনে বতুতা সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি সুফি সাধকদের আধ্যাত্মিক প্রভাব, সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁদের স্নেহ এবং গরিবদের মধ্যে লঙ্গরখানা পরিচালনার চিত্র বিশদভাবে তুলে ধরেন।
২. সামাজিক নিরাপত্তা ও আতিথেয়তা: বিদেশি পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের জন্য সমাজ ছিল নিরাপদ ও পরম আতিথেয়তাপূর্ণ। নদীপথে ভ্রমণের সময় বিনামূল্যে খাদ্য ও আশ্রয় পাওয়ার সুব্যবস্থা ছিল।
৩. দাসপ্রথা: সমাজে পারিবারিক কাজে ক্রীতদাস-দাসী রাখার প্রথা চালু ছিল। এক দিনারে অত্যন্ত অল্প মূল্যে পরিচ্ছন্ন পরিচারক পাওয়া যেত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
৪. হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক: মুসলিম সুলতান ও সুফিদের আধিপত্য সত্ত্বেও হিন্দু সম্প্রদায় তাদের পূজা-অর্চনা ও ধর্মীয় রীতিনীতি স্বাধীনভাবে পালন করত।

উপসংহার: ইবনে বতুতার ‘রিহলা’ চতুর্দশ শতাব্দীর বাংলার সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, বাণিজ্য প্রাচুর্য এবং সাধারণ মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাত্রার এক নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক প্রতিচ্ছবি।

৪। স্বাধীন সুলতানি আমলের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the achievements of Sultan Shamsuddin Ilyas Shah as the real founder of the independent Sultanate.]

উত্তর:

ভূমিকা: ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ সোনারগাঁওয়ে স্বাধীনতার সূচনা করলেও সমগ্র বাংলাকে একটি ঐক্যবদ্ধ ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও জাতীয় কাঠামোর অধীনে এনে সুদৃঢ় স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৮ খ্রি.)। ঐতিহাসিকদের মতে, তিনিই হলেন স্বাধীন সুলতানি বাংলার প্রকৃত ও অবিসংবাদিত প্রতিষ্ঠাতা।

ইলিয়াস শাহের প্রধান ঐতিহাসিক কৃতিত্বসমূহ:

১. সমগ্র বাংলার রাজনৈতিক একত্রীকরণ:
ইলিয়াস শাহের পূর্বে বাংলা লখনৌতি, সোনারগাঁও ও সাতগাঁও—এই তিন স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ইউনিটে বিভক্ত ছিল এবং পরস্পরের মধ্যে সংঘাত লেগেই থাকত। ইলিয়াস শাহ ১৩৪২ সালে লখনৌতির ক্ষমতা গ্রহণ করেন, ১৩৫২ সালে সোনারগাঁও জয় করেন এবং সাতগাঁও অধিকার করে সমগ্র বাংলাকে একটি মাত্র রাজদণ্ডের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করেন।

২. ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ ও ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবোধের উন্মেষ:
সমগ্র বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ (বাংলার সুলতান) এবং ‘সুলতান-ই-বাঙালিয়ান’ উপাধি ধারণ করেন। এর মাধ্যমে লখনৌতি বা গৌড়ের আঞ্চলিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সমগ্র ভূখণ্ডের অধিবাসীরা ‘বাঙালি’ এবং দেশ ‘বাঙ্গালাহ’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। তিনিই বাঙালি সংহতির প্রথম রূপকার।

৩. দিল্লির ফিরোজ শাহ তুগলকের আক্রমণ প্রতিহতকরণ:
১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির প্রবল প্রতাপশালী সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক বাংলাকে দিল্লির পদানত করার উদ্দেশ্যে বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করেন। দূরদর্শী ইলিয়াস শাহ উন্মুক্ত ময়দানে যুদ্ধ না করে কৌশলগতভাবে জলবেষ্টিত দুর্ভেদ্য ‘একডালা দুর্গে’ অবস্থান নেন। দিল্লির দীর্ঘ অবরোধ সত্ত্বেও দুর্গের পতন ঘটাতে না পেরে বর্ষার আগমন ঘটলে ফিরোজ শাহ তুগলক ইলিয়াস শাহের স্বাধীনতা স্বীকার করে নিয়ে দিল্লিতে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হন।

৪. আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বহিঃঅভিযান:
ইলিয়াস শাহ কেবল আত্মরক্ষাই করেননি, বরং বাংলার সীমানা বহুদূর বিস্তৃত করেন। তিনি উড়িষ্যা, চম্পারণ, গোরক্ষপুর জয় করেন এবং নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করে বিপুল ধনরত্ন ও খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি দিল্লির সুলতানের সাথে সমমর্যাদার ভিত্তিতে কূটনৈতিক দূত বিনিময় করেন।

৫. প্রশাসনিক সংস্কার ও স্থাপত্য বিকাশ:
তিনি রাজধানীতে শান্তি-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, মুদ্রা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করেন এবং ফিরোজাবাদ (পান্ডুয়া) নগরীকে নতুন রূপ দেন। পান্ডুয়ায় তিনি একাধিক সুরম্য মসজিদ ও জনহিতকর দিঘি খনন করান।

উপসংহার: শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের ইস্পাতকঠিন নেতৃত্বেই বাংলায় দুইশত বছরের স্বাধীন সুলতানি যুগের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। তিনি সমগ্র বাংলার ভৌগোলিক ও ভাষাগত সীমানা চিহ্নিত করে বাঙালির রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন।

৫। রাজা গণেশ কে ছিলেন? সমকালীন বাংলার রাজনীতিতে তার প্রভাব আলোচনা কর।

[Who was Raja Ganesh? Discuss his influence in the contemporary politics of Bengal.]

উত্তর:

ভূমিকা: পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মধ্যযুগীয় বাংলার স্বাধীন সালতানাতের ইতিহাসে ‘রাজা গণেশ’-এর উত্থান একটি অত্যন্ত নাটকীয় ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। প্রায় দুই শতাব্দীর মুসলিম শাসনের ধারাবাহিকতায় তিনিই একমাত্র হিন্দু শাসক যিনি দিল্লির কোনো সহায়তা ছাড়া স্থানীয় রাজদরবারের নিয়ন্ত্রণ দখল করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।

রাজা গণেশের পরিচয়:
রাজা গণেশ ছিলেন উত্তরবঙ্গের ভাতুড়িয়া (দিনাজপুর অঞ্চল)-এর এক প্রভাবশালী হিন্দু জমিদার ও সামন্ত রাজপুত্র। সমকালীন ইলিয়াস শাহী সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ এবং সাইফুদ্দীন হামজা শাহের আমলে তিনি রাজদরবারে উচ্চ রাজকর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। পরবর্তীতে দুর্বল সুলতানদের অভ্যন্তরীণ অন্তর্বিরোধকে কাজে লাগিয়ে তিনি রাজদরবারের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।

সমকালীন রাজনীতিতে রাজা গণেশের প্রভাব:
১. ইলিয়াস শাহী বংশের পতন ও ক্ষমতা দখল:
সুলতান হামজা শাহের পর শিহাবুদ্দীন বায়োজিদ শাহের নামমাত্র রাজত্বকালে প্রকৃত শাসনক্ষমতা গণেশের হস্তগত হয়। অবশেষে ১৪১৪-১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি শেষ ইলিয়াস শাহী পুতুল শাসক আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহকে অপসারণ করে প্রত্যক্ষভাবে বাংলার রাজদণ্ড গ্রহণ করেন।

২. মুসলিম উলামা ও সুফিদের সাথে সংঘাত:
গণেশের ক্ষমতা দখলের ফলে বাংলায় মুসলিম শাসন বিলুপ্তির আশঙ্কা দেখা দেয়। বিশেষ করে সমকালীন প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত নূর কুতুবুল আলম (রহ.) গণেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। গণেশ প্রশাসন থেকে অনেক মুসলিম কর্মচারীকে বরখাস্ত করেন এবং উলামাদের ওপর চড়াও হন।

৩. জৌনপুরের ইব্রাহিম শর্কীর আক্রমণ:
মুসলিম শাসনের অস্তিত্ব রক্ষার্থে হযরত নূর কুতুবুল আলম (রহ.) জৌনপুরের শক্তিশালী শাসক সুলতান ইব্রাহিম শর্কীকে বাংলা আক্রমণের উদাত্ত আহ্বান জানান। ইব্রাহিম শর্কী বিশাল বাহিনী নিয়ে পান্ডুয়ার উপকণ্ঠে উপস্থিত হলে ভীত হয়ে রাজা গণেশ সাধক নূর কুতুবুল আলমের শরণাপন্ন হন এবং শর্তহীন আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেন।

৪. আপস মীমাংসা ও যদুনারায়ণের ইসলাম গ্রহণ:
নূর কুতুবুল আলমের মধ্যস্থতায় একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, রাজা গণেশের ১২ বছর বয়সী পুত্র যদু বা যদুনারায়ণ স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তার নাম রাখা হয় জালালুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ। ইব্রাহিম শর্কী জৌনপুরে ফিরে যান এবং কিশোর জালালুদ্দীন বাংলার সিংহাসনে বসেন।

৫. পুনরায় গণেশের ক্ষমতা ও ধর্মান্তরের ব্যর্থ প্রয়াস:
ইব্রাহিম শর্কী চলে যাওয়ার পর গণেশ পুনরায় পুত্রের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেন এবং যদুকে ‘স্বর্ণধেনু’ প্রায়শ্চিত্ত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনার ব্যর্থ চেষ্টা চালান। গণেশ নিজে ‘দনুজমর্দনদেব’ উপাধি নিয়ে কিছুকাল শাসন পরিচালনা করেন। ১৪১৮ সালে গণেশের মৃত্যুর পর তার পুত্র জালালুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ পুনরায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে দৃঢ়তার সাথে বাংলায় শাসনভার গ্রহণ করেন।

উপসংহার: রাজা গণেশের শাসন ছিল ক্ষণস্থায়ী কিন্তু অত্যন্ত প্রভাববিস্তারী। তবে তার বংশধর শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করে পুনরায় এক গৌরবোজ্জ্বল মুসলিম অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন।

৬। হুসেন শাহী আমলকে বাংলার ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলা হয় কেন? আলোচনা কর।

[Why is the Hussain Shahi period called the golden age in the history of Bengal? Discuss.]

উত্তর:

ভূমিকা: মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাসে সুলতান আলাউদ্দীন হুসেন শাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হুসেন শাহী রাজবংশের (১৪৯৩-১৫৩৮ খ্রি.) রাজত্বকাল এক অবিস্মরণীয় গৌরবময় অধ্যায়। হাবশি শাসকদের অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে এ বংশ বাংলার রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সাহিত্য এবং শিল্পকলায় যে বহুমুখী সমৃদ্ধি আনয়ন করে, তার কারণে ঐতিহাসিকগণ সর্বসম্মতিক্রমে একে ‘বাংলার স্বর্ণযুগ’ (The Golden Age of Bengal) বলে আখ্যায়িত করেছেন।

হুসেন শাহী আমলকে স্বর্ণযুগ বলার কারণসমূহ:

১. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সাম্রাজ্য বিস্তার:
আলাউদ্দীন হুসেন শাহ সিংহাসনে আরোহণ করে উশৃঙ্খল পাইক ও হাবশি সৈন্যদের কঠোর হস্তে দমন করে রাজ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তিনি কামরূপ ও কমতা জয় করেন, উড়িষ্যার গজপতি রাজাকে প্রতিহত করেন এবং আরাকানীদের হটিয়ে চট্টগ্রাম পুনরুদ্ধার করেন। বিহারের কিছু অংশও তার সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত হয়।

২. অভূতপূর্ব ধর্মীয় সম্প্রীতি ও উদার নীতি:
হুসেন শাহী সুলতানগণ ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মেধার ভিত্তিতে প্রশাসন পরিচালনা করেন। বহু উচ্চ রাজপদে যোগ্য হিন্দু পণ্ডিত ও কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। যেমন:
– রূপ গোস্বামী ছিলেন সুলতানের প্রধান সচিব (সাকির মল্লিক)।
– সনাতন গোস্বামী ছিলেন ব্যক্তিগত সচিব ও মন্ত্রী (দবীর-ই-খাস)।
– গোপীনাথ বসু (পুরন্দর খান) ছিলেন নৌবাহিনীর প্রধান।
সুলতান শ্রীচৈতন্যদেবের বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদর্শন করেন।

৩. বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নবজাগরণ:
হুসেন শাহী সুলতানদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সাহিত্যের চরম বিকাশ ঘটে। ইতিপূর্বে সংস্কৃতের আধিপত্যে অবহেলিত বাংলা ভাষা রাজদরবারে সমাদৃত হয়:
– যশোরাজ খান, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপিলাই প্রমুখ কবি সাহিত্য রচনা করেন।
– সেনাপতি পরাগল খানের আদেশে কবীন্দ্র পরমেশ্বর মহাভারতের প্রথমাংশের বাংলা অনুবাদ ‘পাণ্ডববিজয়’ রচনা করেন।
– ছুটি খানের পৃষ্ঠপোষকতায় শ্রীকর নন্দী মহাভারতের অশ্বমেধ পর্বের অনুবাদ করেন।
সুলতানের সাহিত্যসেবার কারণে হিন্দু প্রজাগণ তাকে ‘নৃপতি-তিলক’ ও ‘জগৎভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত করে।

৪. ইসলামি শিক্ষার প্রসার ও সুফি সংস্কৃতির বিকাশ:
হুসেন শাহ ও তার উত্তরসূরি নসরত শাহ বহু মাদ্রাসা ও খানকাহ নির্মাণ করেন। পান্ডুয়া ও গৌড়ে পণ্ডিতদের জন্য রাষ্ট্রীয় বৃত্তি বরাদ্দ করা হয়।

৫. স্থাপত্য ও ললিতকলার চরম উৎকর্ষ:
এ যুগে বাংলার নিজস্ব ইট ও টেরাকোটা স্থাপত্যরীতির স্বর্ণশিখর স্পর্শ করে। গৌড়ের বিশ্বখ্যাত ছোট সোনা মসজিদ, বড় সোনা মসজিদ (বারোদুয়ারী), কদম রসুল ভবন এবং রাজশাহীর বাঘা মসজিদ এই আমলের অদ্বিতীয় স্থাপত্য কীর্তি।

উপসংহার: সার্বিক রাজনৈতিক নিরাপত্তা, অসাধারণ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে সাম্প্রদায়িক মৈত্রী এবং বাংলা সাহিত্যের অভূতপূর্ব পৃষ্ঠপোষকতার কারণে হুসেন শাহী আমল নিঃসংকোচে বাংলার মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ স্বর্ণযুগ।

খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)

৭। প্রাক-মুসলিম যুগে বাংলার সামাজিক অবস্থা কেমন ছিল?

[What was the social condition of Bengal in the pre-Muslim era?]

উত্তর:
মুসলিম বিজয়ের পূর্বে (বিশেষ করে সেন আমলে) বাংলার সমাজব্যবস্থা ছিল চরম বর্ণভেদ ও রক্ষণশীলতায় জর্জরিত। সমাজ প্রধানত চার বর্ণে বিভক্ত ছিল: ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। ব্রাহ্মণদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল এবং শূদ্র বা অন্ত্যজ শ্রেণির নিম্নবর্ণের হিন্দুরা অস্পৃশ্য বিবেচিত হতো; ধর্মীয় শাস্ত্র পাঠ বা উচ্চ শিক্ষায় তাদের কোনো অধিকার ছিল না। বাল্যবিবাহ, কৌলীন্য প্রথা এবং সতীদাহ প্রথার মতো কুসংস্কার সমাজে ব্যাপকভাবে জেঁকে বসেছিল। পাল আমলের উদার বৌদ্ধ সমাজকাঠামোকে সেন রাজারা কঠোর ব্রাহ্মণ্য অনুশাসনে সংকুচিত করে ফেলেছিলেন। ফলে অবহেলিত ও নিপীড়িত সাধারণ নিম্নবর্ণের মানুষ মুক্তির প্রতীক্ষায় ছিল, যার ফলেই পরবর্তীতে মুসলিমদের সাম্যবাদী আগমনকে সাধারণ জনগণ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছিল।

৮। বারোভুঁইয়া কারা ছিলেন?

[Who were the Bara Bhuiyans?]

উত্তর:
১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট আকবর কররানী সুলতান দাউদ খানকে পরাজিত করে বাংলা বিজয়ের দাবি করলেও সমগ্র ভাটি বা নদীমাতৃক পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলায় মুঘল আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। সে সময় বাংলার স্বাধীনচেতা দেশপ্রেমিক যে বারোজন শক্তিশালী জমিদার বা সামন্ত নেতা মুঘল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, ইতিহাসে তারা ‘বারোভুঁইয়া’ নামে খ্যাত। এদের প্রধান নেতা ছিলেন সোনারগাঁওয়ের খিজিরপুর দুর্গের অধিপতি ঈসা খাঁ এবং তার পুত্র মুসা খাঁ। উল্লেখযোগ্য বারোভুঁইয়াদের মধ্যে ছিলেন চাঁদ রায়, কেদার রায়, ওসমান খান লোহানী, প্রতাপাদিত্য এবং খাজা সোলায়মান। অবশেষে সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সুবেদার ইসলাম খান চিশতী তাদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন।

৯। আকবরের বাংলা বিজয়ের ফলাফল বর্ণনা কর।

[Describe the results of Akbar’s conquest of Bengal.]

উত্তর:
সম্রাট আকবরের সেনাপতি খান জাহান ও রাজা মানসিংহের নেতৃত্বে ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে শেষ স্বাধীন আফগান সুলতান দাউদ খান কররানীকে পরাজিত করার মাধ্যমে বাংলা বিজয়ের সূচনা হয়। এর সুদূরপ্রসারী ফলাফলগুলো হলো:
১. প্রায় সাড়ে তিনশত বছরের স্বাধীন সুলতানি শাসনের চিরতরে অবসান ঘটে এবং বাংলা দিল্লির কেন্দ্রীয় মুঘল সাম্রাজ্যের সুবায় (সুবা-ই-বাঙ্গালাহ) পরিণত হয়।
২. দিল্লির কেন্দ্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থা, সুবেদারি ও দেওয়ানি প্রশাসন কাঠামো বাংলায় প্রবর্তিত হয়।
৩. বহিরাগত মুঘল অভিজাতদের আগমনে পার্সি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে এবং উত্তর ভারতের সাথে বাংলার প্রত্যক্ষ স্থল ও নৌ-বাণিজ্যিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়।
৪. আফগান শক্তির মেরুদণ্ড ভেঙে যায় এবং মুঘলদের বিরুদ্ধে স্থানীয় বারোভুঁইয়াদের এক দীর্ঘস্থায়ী স্বাধীনতা সংগ্রাম সূচিত হয়।

১০। বাংলায় বলবনী শাসন সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখ।

[Write briefly about Balbani rule in Bengal.]

উত্তর:
দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন ১২৭৯-৮২ খ্রিস্টাব্দে বাংলার বিদ্রোহী গভর্নর মুগিসউদ্দিন তুঘরিল খানকে কঠোরভাবে দমন করার পর তার দ্বিতীয় পুত্র বুগরা খানকে বাংলার গভর্নর পদে নিযুক্ত করেন। এর মাধ্যমেই বাংলায় বলবনী রাজবংশের (১২৮১-১৩২৮ খ্রি.) শাসনের সূচনা হয়। দিল্লির সিংহাসনে বুগরা খানের পুত্র কায়কোবাদ বসলেও বুগরা খান বাংলাতেই স্বাধীন সুলতান হিসেবে শাসন অব্যাহত রাখেন। পরবর্তীতে বুগরা খানের পুত্র শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৩০১-১২২২ খ্রি.) বাংলার বলবনী বংশের শ্রেষ্ঠ সুলতান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার আমলেই সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সহযোগিতায় ১৩০৩ সালে সিলেট বিজিত হয় এবং ময়মনসিংহ ও সোনারগাঁও অঞ্চলে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে ‘মিনহাজ-ই-সিরাজ’-এর গুরুত্ব কী?

উত্তর: মিনহাজ-ই-সিরাজের রচিত ‘তাবাকাত-ই-নাসিরি’ গ্রন্থটি বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয় এবং প্রারম্ভিক তুর্কি মুসলিম শাসনের একমাত্র নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক প্রত্যক্ষ দলিল।

প্রশ্ন ২: কৈবর্ত বিদ্রোহের প্রধান কারণ কী ছিল?

উত্তর: পাল সম্রাট দ্বিতীয় মহীপালের অপশাসন, সামন্তদের ওপর অত্যাচার এবং অর্থনৈতিক অসন্তোষের সুযোগে বরেন্দ্র অঞ্চলের দিব্বোকের নেতৃত্বে স্থানীয় কৈবর্ত জনগোষ্ঠী এ বিদ্রোহ সংগঠিত করেছিল।

প্রশ্ন ৩: শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহকে কেন ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ বলা হয়?

উত্তর: তিনিই সর্বপ্রথম লখনৌতি, সোনারগাঁও ও সাতগাঁওকে একক রাজদণ্ডে ঐক্যবদ্ধ করে সমগ্র ভূখণ্ডের সার্বভৌম অধিপতি হিসেবে নিজেকে ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ বা বাংলার সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন।

প্রশ্ন ৪: ইবনে বতুতা বাংলাকে কেন ‘দোযখ-ই-পুর নিয়ামত’ বলেছেন?

উত্তর: প্রচুর খাদ্যশস্য ও পণ্যের অভাবনীয় সস্তা দরের কারণে ‘নিয়ামতপূর্ণ’ এবং একই সাথে অতিরিক্ত জলাভূমি ও ভ্যাপসা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার কারণে তিনি ও বিদেশি বণিকরা বাংলাকে ‘দোযখ-ই-পুর নিয়ামত’ বলতেন।

প্রশ্ন ৫: রাজা গণেশ কীভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন?

উত্তর: দুর্বল ইলিয়াস শাহী সুলতানদের রাজদরবারে উচ্চ পদমর্যাদা ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত রাজপরিবারকে উৎখাত করে নিজে সিংহাসনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন।

প্রশ্ন ৬: হুসেন শাহী আমলকে বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ বলা হয় কেন?

উত্তর: এ আমলে মুসলিম সুলতান ও তাদের অমাত্যদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় সংস্কৃতের বদলে প্রথমবার রাজকীয় মর্যাদায় মহাভারত, ভগবত এবং শ্রীকৃষ্ণবিজয় সহ বহু গ্রন্থ বাংলায় অনূদিত হয়।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *