জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

ইসলামি লোকপ্রশাসনের ক্রমবিকাশ (Development of Islamic Public Administration) – 205206, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
21 September, 2026
৫৫ মিনিট পড়ার সময়
৭ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (Islamic History & Culture) — ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিষয়: ইসলামি লোকপ্রশাসনের ক্রমবিকাশ [Development of Islamic Public Administration] | বিষয় কোড: 205206
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা

ক-বিভাগ — রচনামূলক প্রশ্ন

(যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও | মান: ১৫ × ৪ = ৬০)

১। মজলিস উস সুরার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ পর্যালোচনা কর।

[Review the origin and development of Majlis-Us-Sura.]

উত্তরঃ

‘মজলিস উস সুরা’ (Majlis al-Shura)-র ধারণা ও উৎপত্তি:
‘সুরা’ (Shura) একটি মৌলিক কুরআনিক পরিভাষা, যার অর্থ ‘পারস্পরিক পরামর্শ’ বা ‘পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ’। ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র বা বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের কোনো স্থান নেই; রাষ্ট্র পরিচালনায় পারস্পরিক পরামর্শ গ্রহণ করা কুরআনি নির্দেশনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: “এবং তাদের পারস্পরিক কাজ সম্পন্ন হয় পরামর্শের ভিত্তিতে” (সূরা আশ-শুরা: ৩৮) এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: “কাজকর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর” (সূরা আল ইমরান: ১৫৯)। এই ঐশী নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করেই ইসলামে মজলিস উস সুরা বা পরামর্শ সভার উৎপত্তি ঘটে।

ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ:

  1. নবী করীম (সা.)-এর যুগ: রাসুলুল্লাহ (সা.) রাষ্ট্র ও যুদ্ধের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণে বিশিষ্ট সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করতেন। ওহী ব্যতীত অন্যান্য জাগতিক বিষয়ে তিনি সাহাবিদের মতামতকে প্রাধান্য দিতেন। বদরের প্রান্তরে যুদ্ধশিবির স্থাপন, ওহুদের যুদ্ধে মদিনার বাইরে গিয়ে প্রতিরোধ, খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খনন (হযরত সালমান ফারসির পরামর্শ) এবং হুদাইবিয়ার সন্ধির ক্ষেত্রে তিনি বিশিষ্ট সাহাবিদের নিয়ে গঠিত অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ সভার সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছিলেন।
  2. খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ (সুবর্ণযুগ): খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে মজলিস উস সুরা একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সাংবিধানিক রূপ লাভ করে। বিশেষ করে দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর আমলে সুরা দুটি স্তরে বিভক্ত হয়:
    • মজলিস-ই-খাস (Cabinet/Core Council): শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞ সাহাবিদের (হযরত আলী, উসমান, তালহা, জুবাইর, আবদুর রহমান বিন আউফ প্রমুখ) নিয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের পরিষদ, যা প্রতিদিনের জরুরি রাষ্ট্রীয় নীতি, যুদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নিয়োগ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিত।
    • মজলিস-ই-আম (General Assembly): আনসার, মুহাজির এবং সাধারণ জনগণের প্রতিনিধিদের নিয়ে মসজিদে নববীতে অনুষ্ঠিত সাধারণ অধিবেশন, যেখানে ভূমি রাজস্ব সংস্কার, বৈদেশিক যুদ্ধ ও সার্বিক জাতীয় নীতি উন্মুক্তভাবে আলোচিত হতো। একজন সাধারণ নারীও এই অধিবেশনে খলিফা ওমরের মহর নীতিতে আপত্তি জানালে খলিফা তা বিনাবাক্যে মেনে নিয়েছিলেন। খলিফা ওমর দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছিলেন: “পরামর্শ (সুরা) ছাড়া কোনো খিলাফত চলতে পারে না।”
  3. উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগ: উমাইয়া আমলে মুয়াবিয়া (রা.) কর্তৃক রাজতন্ত্র প্রবর্তিত হলে মজলিস উস সুরার গণতান্ত্রিক ও উন্মুক্ত রূপ দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে আব্বাসীয় যুগে সুরার রূপ পরিবর্তিত হয়ে উজিরে আজমের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী মন্ত্রীপরিষদ ও আইনজ্ঞদের ‘দিওয়ানুল মজলিস’-এ রূপ নেয়।

২। মহানবি (সা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদীনা রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the characteristics of the Medina State established by Muhammad (Sm.).]

উত্তরঃ

ঐতিহাসিক পটভূমি:
৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রক্তক্ষয়ী গোত্রীয় কোন্দলে লিপ্ত আউস ও খাজরাজ এবং সেখানে বসবাসকারী ইহুদি ও মুসলিমদের একত্রিত করে বিশ্ব ইতিহাসের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধানসমৃদ্ধ বহু-ধর্মীয় কল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।

মদিনা রাষ্ট্রের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  1. বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান (মদিনা সনদ): ৪৭ বা ৫৩টি ধারায় বিভক্ত এই লিখিত সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হতো। আইনের শাসন ও সাংবিধানিক চুক্তিভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আদি অগ্রদূত এই মদিনা সনদ।
  2. উম্মাহর রাজনৈতিক ধারণা ও বহুত্ববাদ: মদিনা সনদে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয় যে, মুসলমানরা হবে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক জাতি বা ‘উম্মাহ’। একই সাথে মদিনার ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়কে তাদের নিজস্ব ধর্ম, উপাসনা ও সম্পত্তির পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করে নাগরিক হিসেবে সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়।
  3. সার্বভৌমত্ব ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণেতা আল্লাহ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান বিচারক ও নির্বাহী প্রধান। গোত্রীয় স্বজনপ্রীতি ও প্রতিশোধের বদলে আইনের সর্বজনীন শাসন কায়েম করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছিলেন: “আমার কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।”
  4. ভ্রাতৃত্বের অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা (মুয়াখাত): মক্কা থেকে সহায়-সম্বলহীন হয়ে আগত মুহাজিরদের পুনর্বাসনে স্থানীয় মদিনার আনসারদের সাথে অতুলনীয় ‘মুয়াখাত’ বা ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ব চুক্তি কায়েম করা হয়। কোনো প্রকার রক্তপাত ছাড়াই এটি ছিল মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শান্তিপূর্ণ পুনর্বাসন ও সম্পদ বণ্টন।
  5. যৌথ সামরিক প্রতিরক্ষা: সনদের অন্যতম মূল শর্ত ছিল—মদিনা আক্রান্ত হলে সকল সম্প্রদায় (মুসলিম ও অমুসলিম) ঐক্যবদ্ধভাবে সম্মিলিত সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং যুদ্ধের ব্যয়ভার যৌথভাবে বহন করবে।
  6. মানবকল্যাণ ও রক্তপাতের অবসান: সুদের অভিশাপ দূরীকরণ, দাসমুক্তিকে উৎসাহিত করা, নারী জাতির জানমাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সর্বপ্রকার অন্যায় হত্যাকাণ্ড নিষিদ্ধ করে শান্তির নগরী মদিনা কায়েম করা হয়।

৩। মুহাম্মদ (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের রাজস্ব ব্যবস্থা পর্যালোচনা কর।

[Review the revenue system of the Prophet (Sm.) and the Khulafa-e-Rashidin.]

উত্তরঃ

ভূমিকা:
রাসুলুল্লাহ (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে একটি ন্যায়ভিত্তিক, শোষণহীন ও জনকল্যাণমুখী ইসলামি রাজস্ব কাঠামো গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় যাবতীয় আয় একটি কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা হতো, যাকে ‘বায়তুল মাল’ (Bayt al-Mal) বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার বলা হয়।

রাজস্ব আয়ের প্রধান প্রধান উৎসসমূহ:

  • ১. যাকাত (Zakat): প্রাপ্তবয়স্ক নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রতিটি সচ্ছল মুসলিমের ওপর আবশ্যকীয় ২.৫% বা নির্ধারিত হারে প্রদেয় ধর্মীয় কর। পবিত্র কুরআনে নির্ধারিত আটটি সুনির্দিষ্ট খাতে (দরিদ্র, মিসকিন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত ইত্যাদি) যাকাতের অর্থ ব্যয় করা বাধ্যতামূলক ছিল। এটি অর্থনৈতিক বৈষম্য রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখত।
  • ২. উশর (Ushr): মুসলমানদের কৃষিজমির ফসলের ওপর ধার্যকৃত রাজস্ব। বৃষ্টি বা প্রাকৃতিকভাবে সেচকৃত ফসলের এক-দশমাংশ (১০%) এবং কৃত্রিম সেচকৃত ফসলের এক-বিংশতি অংশ (৫%) উশর হিসেবে আদায় করা হতো।
  • ৩. জিযিয়া (Jizya): ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসকারী সক্ষম অমুসলিম নাগরিকদের (জিম্মি) জীবন, সম্পদ ও ধর্মের নিরাপত্তার বিনিময়ে এবং সামরিক বাহিনীতে যুদ্ধ করার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির জন্য গৃহীত বার্ষিক মাথাপিছু নিরাপত্তা কর। নারী, শিশু, বৃদ্ধ, পুরোহিত ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে জিযিয়া সম্পূর্ণ মওকুফ ছিল।
  • ৪. খারাজ (Kharaj): বিজিত অঞ্চলের অমুসলিমদের কৃষিজমির ওপর ধার্যকৃত ভূমিকর। খলিফা ওমর (রা.) বিজিত ইরাক ও সিরিয়ার জমি মুসলিম যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন না করে স্থানীয় মূল মালিকদের কাছে রেখে তাদের ওপর ন্যায়সঙ্গত হারে বার্ষিক খারাজ নির্ধারণ করেন।
  • ৫. গানিমাত ও খুমুস (Ghanima & Khums): যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। এর চার-পঞ্চমাংশ (৮০%) অংশগ্রহণকারী মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করা হতো এবং এক-পঞ্চমাংশ (২০%) ‘খুমুস’ হিসেবে বায়তুল মালে জমা হতো যা ইয়াতীম, বিধবা ও জনকল্যাণে ব্যয় হতো।
  • ৬. আল-ফে (Al-Fay): যুদ্ধ ব্যতীত শান্তিপূর্ণভাবে চুক্তি বা সমঝোতার মাধ্যমে অর্জিত শত্রুর পরিত্যক্ত সম্পত্তি, যার সম্পূর্ণটাই বায়তুল মালের সাধারণ তহবিলে জমা হতো।
  • ৭. উশুর (Ushur): আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক শুল্ক। খলিফা ওমর (রা.) ইসলামি রাষ্ট্রের সীমান্ত অতিক্রমকারী বিদেশি বণিকদের ওপর শতকরা ১০% হারে এবং জিম্মিদের ওপর ৫% হারে আমদানি শুল্ক প্রবর্তন করেন।

বায়তুল মালের ব্যয় নীতি (দেওয়ান প্রথা): খলিফা ওমর (রা.) বায়তুল মালের উদ্বৃত্ত অর্থ জমিয়ে না রেখে ‘দিওয়ান’ রেজিস্টারের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবারবর্গ, বদরি সাহাবি, সাধারণ মুসলিম এবং শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য বৈষম্যহীন নিয়মিত বার্ষিক রাষ্ট্রীয় ভাতা ও পেনশন প্রবর্তন করেন।

৪। উমাইয়া আমলের বিচার ব্যবস্থা আলোচনা কর।

[Discuss the judicial system of the Umayyads period.]

উত্তরঃ

উমাইয়া বিচার ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমি:
মুয়াবিয়া (রা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত উমাইয়া খিলাফতে (৬৬১-৭৫০ খ্রি.) প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ ও রাজতন্ত্র প্রবর্তিত হলেও বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্বাধীন, ন্যায়পরায়ণ ও ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখার সর্বোচ্চ প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। উমাইয়া যুগে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক হয়ে একটি সুসংগঠিত রূপ ধারণ করে।

উমাইয়া বিচার ব্যবস্থার প্রধান প্রধান অঙ্গ ও বৈশিষ্ট্য:

  1. কাজী (Qadi) নিয়োগ ও মর্যাদা: খলিফারা প্রতিটি প্রদেশে একজন করে প্রধান কাজী নিয়োগ করতেন। প্রখ্যাত মুজতাহিদ, তাকওয়াবান আলেম ও আইনবিদদের কাজী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতো। খলিফা বা প্রাদেশিক গভর্নরও কাজীর সমন ও বিচারের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। বিচারকগণ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার আলোকে বিচার ফয়সালা করতেন।
  2. নাজর ফিল মাজালিম (Diwan al-Mazalim): এটি ছিল উমাইয়া বিচার ব্যবস্থার একটি বিশেষ আদালত বা বোর্ড অব গ্রিভেন্স। প্রাদেশিক গভর্নর, রাজপরিবারের সদস্য বা সরকারি ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের অবিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ প্রজাদের অভিযোগ সরাসরি শুনানির জন্য এই আদালত গঠিত হয়। খলিফা আবদুল মালিক এবং ন্যায়পরায়ণ খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ নিজেই ব্যক্তিগতভাবে মাজালিম আদালতের এজলাসে বসে স্বজনদের অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে মূল মালিকদের ফিরিয়ে দিতেন।
  3. মুহতাসিব ও হিসবাহ ব্যবস্থা (Al-Hisbah): সামাজিক ন্যায়বিচার ও পাবলিক শৃঙ্খলা রক্ষায় ‘মুহতাসিব’ নিয়োগ করা হতো। বাজারে ওজনে কারচুপি রোধ, খাদ্য দ্রব্যে ভেজাল প্রতিরোধ, পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি ঠেকানো এবং প্রকাশ্যে অনৈতিক কাজ দমন করা ছিল মুহতাসিবের দায়িত্ব।
  4. শরিয়াহ ও অমুসলিমদের নিজস্ব আদালত: মুসলিম নাগরিকদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচার ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী কাজী নিষ্পত্তি করতেন। তবে অমুসলিম প্রজাদের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় আইন অনুযায়ী নিজ নিজ ধর্মীয় প্রধানদের (বিশপ, র‍্যাবাই) মাধ্যমে পারিবারিক ও দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তির পূর্ণ স্বাধীনতা বজায় ছিল।
  5. শুরুত ও নথিপত্র সংরক্ষণ (Shurut): উমাইয়া আমলেই প্রথম বিচারিক রায়, দলিলের সত্যতা যাচাই এবং আদালতের কার্যাবলি সরকারি নথিতে লিপিবদ্ধ ও রেজিস্ট্রিভুক্ত করার পদ্ধতি চালু হয়।

৫। আব্বাসীয়দের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা পর্যালোচনা কর।

[Review the central administrative system of the Abbasid’s.]

উত্তরঃ

আব্বাসীয় কেন্দ্রীয় প্রশাসনের রূপরেখা:
৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়াদের পতনের পর প্রতিষ্ঠিত আব্বাসীয় খিলাফত ছিল একটি সুবিশাল বহুজাতিভিত্তিক সর্বজনীন ইসলামি সাম্রাজ্য। রাজধানী দামেস্ক থেকে বাগদাদে স্থানান্তরের ফলে আব্বাসীয় কেন্দ্রীয় প্রশাসনে প্রাচীন পারসিক শানশওকত ও ব্যুরোক্রেসির ব্যাপক প্রভাব পড়ে। খলিফা ছিলেন সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রধান।

প্রধান কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর বিবরণ:

  1. উজির পদ ও উজিরে আজম (The Wazirate): আব্বাসীয় কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি হলো ‘উজির’ (Wazir) পদের প্রবর্তন। খলিফার পর তিনিই ছিলেন রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্মকর্তা। বিখ্যাত বারমাকি বংশের উজিররা (যেমন খালিদ ও জাফর বারমাকি) অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রশাসন পরিচালনা করেন। উজির দুই ধরনের হতেন:
    • উজিরুত তাফভিদ (Wazir of Delegation): খলিফা কর্তৃক সমস্ত প্রশাসনিক ও সামরিক কর্তৃত্বপ্রাপ্ত অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন উজির।
    • উজিরুত তানফিজ (Wazir of Execution): কেবল খলিফার সিদ্ধান্ত ও আদেশ বাস্তবায়নকারী সীমিত ক্ষমতাসম্পন্ন উজির।
  2. হাজিব বা চেম্বারলেইন (The Hajib): খলিফা ও সাধারণ প্রজাদের মধ্যে সরাসরি সাক্ষাতের মধ্যস্থতাকারী রাজকীয় কর্মকর্তা। তিনিই আগত অতিথি, রাষ্ট্রদূত ও আবেদনকারীদের খলিফার দরবারে প্রটোকল অনুযায়ী উপস্থাপন করতেন।
  3. কেন্দ্রীয় দিওয়ানসমূহ (Government Ministries/Departments): বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা দিওয়ানের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সচিবালয় পরিচালিত হতো:
    • দিওয়ানুল জুনদ (Diwan al-Jund): সামরিক দপ্তর, যা সেনাবাহিনীর তালিকা, বেতন ও যুদ্ধাস্ত্র দেখাশোনা করত।
    • দিওয়ানুল খারাজ (Diwan al-Kharaj): অর্থ ও রাজস্ব মন্ত্রণালয়, যা সমগ্র সাম্রাজ্যের ভূমিকর ও রাষ্ট্রীয় কোষাগার নিয়ন্ত্রণ করত।
    • দিওয়ানুল বারীদ (Diwan al-Barid): ডাক ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। দ্রুতগামী ঘোড়া ও কবুতরের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গোপন সংবাদ খলিফার নিকট পৌঁছানো হতো।
    • দিওয়ানুর রাসায়েল ও খাতম (Diwan al-Rasail & Khatm): রাজকীয় ফরমান ও সরকারি চিঠিপত্র লিখন, মোহরাঙ্কন ও মহাফেজখানা।
    • দিওয়ানুল মাজালিম (Diwan al-Mazalim): উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক দুর্নীতির প্রতিকার আদালত।
  4. প্রধান কাজী (কাজীউল কুজাত): সমগ্র সাম্রাজ্যের বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘কাজীউল কুজাত’ বা প্রধান বিচারপতির পদ সৃষ্টি করা হয়। খলিফা হারুনুর রশিদের আমলে বিখ্যাত ফকিহ ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) প্রথম কাজীউল কুজাত নিযুক্ত হন।

৬। দিল্লী সালতানাতের কেন্দ্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যালোচনা কর।

[Evaluate the central administrative system of the Delhi Sultanate.]

উত্তরঃ

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে কুতুবউদ্দীন আইবেক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এবং সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ কর্তৃক সুসংহত দিল্লি সালতানাত (১২০৬-১৫২৬ খ্রি.) তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ভারতে এক শক্তিশালী ইসলামি কেন্দ্রীয় শাসন কায়েম রাখে।

দিল্লি সালতানাতের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর উপাদানসমূহ:

  1. সুলতানের পদ ও নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব: সুলতান ছিলেন রাষ্ট্রের অসীম সামরিক, রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রধান। যদিও তাত্ত্বিকভাবে তারা বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে নিজেদের মুদ্রায় খলিফার নাম অঙ্কন করতেন, বাস্তবে সুলতান ছিলেন একচ্ছত্র সার্বভৌম শাসক। তবে গিয়াসউদ্দীন বলবন ‘জিল্লুল্লাহ’ (আল্লাহর ছায়া) তত্ত্ব প্রবর্তন করে সুলতানের ক্ষমতাকে ঈশ্বরের অনুগ্রহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
  2. মজলিস-ই-খালওয়াত (পরামর্শ সভা): সুলতান রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশ্বস্ত উজির ও আমীরদের নিয়ে গঠিত গোপন পরামর্শ সভার সাহায্য নিতেন।
  3. চারটি প্রধান কেন্দ্রীয় স্তম্ভ (দিওয়ান):
    • ১. দিওয়ান-ই-ওয়াজিরাত (Diwan-i-Wizarat): প্রধানমন্ত্রী বা উজিরের নেতৃত্বাধীন অর্থ ও রাজস্ব মন্ত্রণালয়। তিনি সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, রাজস্ব আদায় ও বায়তুল মালের হিসাব নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাকে সাহায্য করতেন নায়েব উজির, মুশরফ-ই-মামালিক (হিসাবরক্ষক) এবং মুস্তাওফি-ই-মামালিক (নিরীক্ষক)।
    • ২. দিওয়ান-ই-আরিজ (Diwan-i-Ariz): সামরিক মন্ত্রণালয়। এর প্রধান কর্মকর্তা ‘আরিজ-ই-মামালিক’ সৈন্যদের নিয়োগ, বেতন, আধুনিক প্রশিক্ষণ, অশ্ব চিহ্নিতকরণ (দাগ ও হুলিয়া) এবং রসদ সরবরাহ পরিচালনা করতেন। আলাউদ্দীন খলজির আমলে এটি চরম আধুনিক রূপ পায়।
    • ৩. দিওয়ান-ই-ইনশা (Diwan-i-Insha): রাজকীয় পত্রালাপ ও পররাষ্ট্রীয় যোগাযোগ দপ্তর। এর প্রধান কর্মকর্তা ‘দবীর-ই-খাস’ সুলতানের গোপন ফরমান ও বৈদেশিক চুক্তিসমূহ তদারকি করতেন।
    • ৪. দিওয়ান-ই-রিসালাত (Diwan-i-Risalat): ধর্ম বিষয়ক, বৈদেশিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। রাষ্ট্রের ধর্মীয় অনুদান, মাদরাসা পরিচালনা এবং বিদেশি দূতদের আপ্যায়ন এই দপ্তরের অধীন ছিল।
  4. বিচার ও গোয়েন্দা বিভাগ: সুলতান স্বয়ং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারক হিসেবে কাজ করতেন। তার অনুপস্থিতিতে ‘সদর-উস-সুদুর’ এবং ‘কাজী-ই-মামালিক’ বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করতেন। সারা দেশের তথ্য সংগ্রহের জন্য ‘বারিদ-ই-মামালিক’ নামক গোয়েন্দা সংস্থা নিয়োজিত ছিল।

৭। শেরশাহের প্রশাসনিক সংস্কার বিশ্লেষণ কর।

[Analyze the administrative reforms of Sher Shah.]

উত্তরঃ

ভূমিকা:
মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে ১৫৪০ সালে দিল্লির সিংহাসন দখলকারী দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শেরশাহ সূরী (১৫৪০-১৫৪৫ খ্রি.) মাত্র পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত শাসনামলে শাসন, বিচার, রাজস্ব ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে এমন এক বিপ্লবী প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, যা তাকে মধ্যযুগীয় ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কারকের মর্যাদা দান করেছে। ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ যথার্থই বলেছেন: “শেরশাহ যদি আরও কয়েক বছর জীবিত থাকতেন, তবে ভারতীয় ইতিহাসের মঞ্চে মুঘলদের পুনরাগমনের কোনো সুযোগ ঘটত না।”

শেরশাহের যুগান্তকারী প্রশাসনিক সংস্কারসমূহ:

  1. প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা: শেরশাহ সমগ্র সাম্রাজ্যকে ৪৭টি ‘সরকার’ (জেলায়) বিভক্ত করেন। প্রতিটি সরকারে প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন ‘শিকদার-ই-শিকদারান’ এবং বিচারিক প্রধান ছিলেন ‘মুন্সেফ-ই-মুন্সেফান’। প্রতিটি সরকারকে আবার বহু ‘পরগণা’য় (থানা) ভাগ করা হয়, যেখানে শিকদার, আমিন (ভূমি পরিমাপক), ফোতদার (কোষাধ্যক্ষ) এবং কারকুন (লেখক) দায়িত্ব পালন করতেন। গ্রামীণ পর্যায়ে পাটোয়ারি ও মুকাদ্দমের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ণ রাখা হয়।
  2. অনবদ্য ভূমি রাজস্ব সংস্কার (পাট্টা ও কবুলিয়ত): জমির উর্বরতার ভিত্তিতে জমিকে উত্তম, মধ্যম ও অধম—এই তিন শ্রেণীতে ভাগ করে মোট উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ (৩৩.৩৩%) ন্যায্য রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়। কৃষকদের ভূমিস্বত্বের আইনগত অধিকারের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার ‘পাট্টা’ প্রদান করত এবং কৃষক নির্ধারিত কর প্রদানের অঙ্গীকার করে সরকারকে ‘কবুলিয়ত’ লিখে দিত। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণ চিরতরে বন্ধ হয়।
  3. যোগাযোগ ব্যবস্থার মহাবিপ্লব: শেরশাহ সাম্রাজ্যজুড়ে চারটি সুবিশাল পাকা মহাসড়ক নির্মাণ করেন। এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো ‘সড়ক-ই-আজম’ (গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড বা GT Road), যা বাংলার সোনারগাঁও থেকে শুরু হয়ে দিল্লি ও লাহোর পেরিয়ে আফগানিস্তানের পেশোয়ার পর্যন্ত সুদীর্ঘ ১৫০০ মাইল বিস্তৃত ছিল। রাস্তার দুধারে তিনি ছায়াঘেরা বৃক্ষ রোপণ, কূপ খনন এবং পথচারী ও ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতি দুই ক্রোশ (৪ মাইল) পর পর ১,৭০০টি সুরক্ষিত ‘সরাইখানা’ নির্মাণ করেন, যা ডাকচৌক হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
  4. মুদ্রা সংস্কার ও রূপিয়া: শেরশাহ পূর্বেকার মিশ্র ও অবমূল্যায়িত মুদ্রা বাতিল করে ১৭৮ গ্রেইন ওজনের খাঁটি রৌপ্যমুদ্রা ‘রূপিয়া’ (Rupiya) এবং তামার ‘দাম’ চালু করেন। এই রৌপ্য রূপিয়াই পরবর্তীকালে মুঘল, ব্রিটিশ ও আধুনিক ভারতের ও পাকিস্তানের সরকারি মুদ্রার (টাকা/রুপি) সরাসরি পূর্বপুরুষ।
  5. কঠোর পুলিশি ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ: কোনো এলাকায় চুরি বা ডাকাতি হলে স্থানীয় গ্রামের প্রধান (মুকাদ্দম) অপরাধীকে ধরতে ব্যর্থ হলে তাকেই সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হতো। ফলে সমগ্র সাম্রাজ্যে ব্যবসায়ীরা মুক্তহস্তে নির্বিঘ্নে মালামাল নিয়ে ভ্রমণ করতে পারত। তিনি আলাউদ্দীন খলজির ‘দাগ ও হুলিয়া’ প্রথা পুনর্বহাল করে শক্তিশালী স্থায়ী সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন।

৮। মুঘল প্রশাসনে উজিরদের দায়িত্ব ও কর্তব্য আলোচনা কর।

[Discuss the duties and responsibilities of Viziers in Mughal administration.]

উত্তরঃ

মুঘল উজির বা দিওয়ানের পদমর্যাদা:
মুঘল সাম্রাজ্যে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সম্রাট স্বয়ং। সম্রাটের পরেই প্রধানমন্ত্রীর সমমর্যাদাসম্পন্ন সর্বোচ্চ বেসামরিক প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন উজির (Wazir) বা দিওয়ান-ই-আলা (Diwan-i-Ala)। সম্রাট আকবরের পূর্ব পর্যন্ত এই পদটি ‘ওয়াকিল’ নামে পরিচিত ছিল। বৈরাম খানের পতনের পর আকবর এই পদের অত্যধিক ক্ষমতা খর্ব করে ‘ওয়াকিল’ থেকে সামরিক ও বিচারিক দায়িত্ব পৃথক করে অর্থ ও রাজস্বের সর্বময় দায়িত্ব উজিরের হাতে ন্যস্ত করেন।

মুঘল উজিরদের প্রধান দায়িত্ব ও কার্যাবলি:

  1. অর্থ ও রাজস্বের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক: উজির ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থমন্ত্রী ও প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা। সমগ্র সাম্রাজ্যের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব হার নির্ধারণ, এবং প্রাদেশিক দিওয়ানদের রাজস্ব কার্যক্রম তদারকি করা ছিল তার প্রধান কাজ।
  2. রাজকীয় আদেশ ও ফরমান কার্যকরীকরণ: সম্রাটের স্বাক্ষরযুক্ত সকল রাজকীয় অর্থনৈতিক ফরমান ও সনদ উজিরের কার্যালয় হয়ে তার সিলমোহরযুক্ত (Imperial Seal) হওয়ার পর চূড়ান্তভাবে কার্যকর হতো। উজিরের অনুমোদন ব্যতীত রাজকোষ থেকে এক মুদ্রাও খরচ করার এখতিয়ার কারও ছিল না।
  3. জাগির ও মনসবদারদের বেতন ব্যবস্থাপনা: মুঘল মনসবদার ও পদস্থ কর্মকর্তাদের নগদ বেতন অথবা ভূমি জায়গির (Jagir) বণ্টন ও স্থানান্তরের সমস্ত হিসাব উজিরের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হতো।
  4. প্রাদেশিক প্রশাসনের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ: প্রতিটি সুবাহে (প্রদেশে) নিয়োজিত ‘প্রাদেশিক দিওয়ান’ সরাসরি প্রাদেশিক সুবাদার বা গভর্নরের অধীন ছিলেন না, বরং তারা স্বাধীনভাবে কেন্দ্রের উজিরের নিকট জবাবদিহি করতেন। ফলে প্রাদেশিক পর্যায়েও অর্থ নিয়ে কোনো অনিয়ম করা সম্ভব ছিল না।
  5. সম্রাটের প্রধান নীতি উপদেষ্টা: যুদ্ধ, কূটনৈতিক সন্ধি, কর মওকুফ এবং দুর্ভিক্ষ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সম্রাটকে বাস্তবসম্মত আর্থিক ও প্রশাসনিক পরামর্শ প্রদান করতেন উজির। রাজা টোডরমল, খাজা মনসুর ও সাদুল্লাহ খানের মতো যোগ্য উজিরদের বিচক্ষণতার ফলেই মুঘল সাম্রাজ্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার শীর্ষে পৌঁছেছিল।

খ বিভাগ — সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন

(যে কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও | মান: ১০ × ২ = ২০)

৯। হিলফুল ফুজুল সম্পর্কে লেখ।

[Write about Hilf-al-Fudul.]

উত্তরঃ

হিলফুল ফুজুল (Hilf al-Fudul)-এর পরিচয়:
‘হিলফুল ফুজুল’ অর্থ ‘শান্তি চুক্তি’ বা ‘কল্যাণব্রতীদের ঐক্যজোট’। কুরাইশ ও কায়েস গোত্রের মধ্যে অন্যায় রক্তক্ষয়ী ‘হরবুল ফিজার’ (অবৈধ যুদ্ধ)-এর ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে ব্যথিত তরুণ মুহাম্মদ (সা.) তাঁর চাচা জুবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সহযোগিতায় মক্কার বিশিষ্ট যুবকদের সাথে নিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের বাড়িতে আনুমানিক ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে যে ঐতিহাসিক শান্তিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন, তাকে ইতিহাসে ‘হিলফুল ফুজুল’ বলা হয়।
আদর্শ ও লক্ষ্য: এই শান্তিসংঘের মূল অঙ্গীকার ছিল—মক্কায় রক্তপাত ও সন্ত্রাস দমন করা, পথচারী ও বিদেশি ব্যবসায়ীদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা, কোনো অত্যাচারীর জুলুম মেনে না নিয়ে দুর্বল ও মজলুমকে সাহায্য করা, এবং সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা। নবুওয়াত লাভের পরও রাসুলুল্লাহ (সা.) এই কল্যাণকামী চুক্তির প্রশংসা করে বলেছিলেন: “আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের গৃহে আমি এমন এক চুক্তিতে উপস্থিত ছিলাম, যার বিনিময়ে আমাকে লাল উট প্রদান করা হলেও আমি তা পছন্দ করতাম না; ইসলাম যুগেও যদি আমাকে এরূপ কোনো চুক্তির আহ্বান জানানো হয়, তবে আমি সানন্দে সাড়া দেব।”

১০। খিলাফত সম্পর্কে খারেজী মতবাদ সংক্ষেপে বর্ণনা কর।

[Describe briefly the Kharijite doctrine of Khilaphate.]

উত্তরঃ

খারেজীদের খিলাফত সংক্রান্ত রাজনৈতিক দর্শন:
৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সিফফিনের যুদ্ধে হযরত আলী (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে সালিশি (তাহকিম) চুক্তি মেনে নেওয়ার বিরোধিতা করে বারো হাজার সৈন্যের যে চরমপন্থী দল হযরত আলীর সৈন্যদল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাদের ‘খারেজী’ (বহির্গত) বলা হয়। তাদের মূল স্লোগান ছিল: ‘লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ’ (আল্লাহ ব্যতীত কারো বিধান দেওয়ার ক্ষমতা নেই)
খারেজী খিলাফত মতবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • কুরাইশ বংশের আবশ্যকতা অস্বীকার: সুন্নিদের বিপরীতে খারেজীরা বিশ্বাস করত খলিফা হওয়ার জন্য কুরাইশ বা কোনো বিশেষ গোত্রের সদস্য হওয়া শর্ত নয়। একজন যোগ্য, পরহেযগার ও তাকওয়াবান আবিসিনীয় ক্রীতদাসও মুসলিম জাহানের খলিফা হতে পারে।
  • গণতান্ত্রিক নির্বাচন: খলিফা কোনো বংশপরম্পরায় নির্বাচিত হবেন না; বরং মুসলিম জনসাধারণের অবাধ ও উন্মুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে মনোনীত হবেন।
  • খলিফাকে অপসারণ বা হত্যার বৈধতা: যদি খলিফা কখনো কুরআন ও সুন্নাহর পথ থেকে সামান্যতম বিচ্যুত হন বা কবিরা গুনাহে লিপ্ত হন, তবে তাকে সাথে সাথে ক্ষমতাচ্যুত করা ওয়াজিব এবং প্রয়োজনবোধে তাকে হত্যা করাও বৈধ। এই চরমপন্থী ভ্রান্ত মতবাদের কারণেই তারা খলিফা হযরত আলী (রা.)-কে নির্মমভাবে শহীদ করেছিল।

১১। ইসলামী রাষ্ট্রের রাজস্ব আয়ের উৎসসমূহ উল্লেখ কর।

[Mention the source of revenue in Islamic state.]

উত্তরঃ

ইসলামি রাষ্ট্রের রাজস্ব কাঠামোর উৎসসমূহ:
ইসলামি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সুবিচার নিশ্চিত করতে রাজস্ব আয়ের সুনির্দিষ্ট ও নীতিগত খাত নির্ধারিত রয়েছে। এর প্রধান প্রধান উৎস নিচে উল্লেখ করা হলো:

  1. যাকাত (Zakat): সচ্ছল মুসলমানদের উদ্ধৃত্ত সম্পদের ওপর বাৎসরিক ২.৫% বাধ্যতামূলক ধর্মীয় কর, যা বায়তুল মালের বিশেষ ফান্ডে জমা হয় এবং কেবল আটটি নির্দিষ্ট কল্যাণমূলক খাতে ব্যয় হয়।
  2. উশর (Ushr): মুসলিম কৃষকদের ভূমিতে উৎপাদিত ফসলের ওপর ধার্যকৃত ৫% বা ১০% প্রাকৃতিক ভূমিকর।
  3. জিযিয়া (Jizya): সামরিক দায়মুক্তির বিনিময়ে রাষ্ট্রে বসবাসরত সক্ষম অমুসলিম নাগরিকদের ওপর ধার্যকৃত বার্ষিক নিরাপত্তামূলক মাথাপিছু কর।
  4. খারাজ (Kharaj): অমুসলিমদের কৃষিজমির ওপর উৎপাদন ও চুক্তিভিত্তিক ভূমিকর।
  5. আল-খুমুস বা গনিমত (Khums): যুদ্ধলব্ধ বা খনিজ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ (২০%) যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় তহবিলে জমা হয়।
  6. আল-ফে (Al-Fay): যুদ্ধ ব্যতীত শত্রু কর্তৃক পরিত্যক্ত সম্পত্তি।
  7. উশুর (Ushur): বাণিজ্য শুল্ক বা কাস্টমস ডিউটি (মুসলিমদের ২.৫%, জিম্মিদের ৫% এবং বহিরাগতদের ১০%)।
  8. ওয়ারিশবিহীন সম্পত্তি (Tarkah): কোনো নাগরিক কোনো বৈধ ওয়ারিশ না রেখে মৃত্যুবরণ করলে তার পরিত্যক্ত সম্পদ বায়তুল মালের সম্পত্তিতে পরিণত হয়।

১২। ‘কবুলিয়ত’ ও ‘পাট্টা’ প্রথা বলতে কী বুঝ?

[What do you mean by ‘Kabuliat’ and ‘Patta’ system?]

উত্তরঃ

‘পাট্টা’ ও ‘কবুলিয়ত’-এর সংজ্ঞা ও তাৎপর্য:
ভারতের দূরদর্শী শাসক শেরশাহ সূরী কর্তৃক ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কৃষক ও সরকারের পারস্পরিক বিশ্বাস এবং ভূমিস্বত্বের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে প্রবর্তিত চুক্তিভিত্তিক আধুনিক প্রথাকে ‘পাট্টা ও কবুলিয়ত’ বলা হয়।

  • পাট্টা (Patta): সরকার বা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জমির পূর্ণ বিবরণ, জমির শ্রেণীবিভাগ (উত্তম, মধ্যম, অধম), সীমানা এবং কৃষককে বার্ষিক কী পরিমাণ কর সরকারকে দিতে হবে—তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে কৃষককে যে আনুষ্ঠানিক সরকারি দলিল বা ভূমিস্বত্বের প্রত্যয়নপত্র প্রদান করা হতো, তাকে ‘পাট্টা’ বলা হয়। এর মাধ্যমে জমি থেকে কৃষকের উচ্ছেদের ঝুঁকি চিরতরে বন্ধ হয়।
  • কবুলিয়ত (Kabuliat): সরকারের নিকট থেকে পাট্টা গ্রহণের পর কৃষক স্বেচ্ছায় পাট্টায় বর্ণিত শর্ত ও নির্ধারিত বার্ষিক খাজনা যথাসময়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে পরিশোধ করার লিখিত প্রতিশ্রুতি ও সম্মতিপত্র সরকারের নিকট স্বাক্ষর করে জমা দিত। এই কৃষকের সম্মতিপত্রকে বলা হতো ‘কবুলিয়ত’

এই যুগান্তকারী ব্যবস্থার ফলে জমিদারের মধ্যস্বত্ব শোষণ বন্ধ হয় এবং কৃষক সরাসরি সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নির্ভয়ে কৃষিকাজ পরিচালনার সুযোগ পায়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: ‘মজলিস উস সুরা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ কী?

উত্তর: মজলিস উস সুরা হলো একটি আরবি পরিভাষা, যার অর্থ ‘পরামর্শ সভা’ বা কাউন্সিল অব কনসালটেশন।

প্রশ্ন ২: কোন খলিফার আমলে সুরা ‘মজলিস-ই-খাস’ এবং ‘মজলিস-ই-আম’-এ বিভক্ত হয়?

উত্তর: ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খেলাফতকালে প্রশাসনিক প্রয়োজনে মজলিস উস সুরা এই দুটি প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে রূপ লাভ করে।

প্রশ্ন ৩: বিশ্বের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান কোনটি?

উত্তর: ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক প্রণীত ‘মদিনা সনদ’ হলো পৃথিবীর মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম লিখিত রাষ্ট্রীয় সংবিধান।

প্রশ্ন ৪: আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের প্রথম ‘কাজীউল কুজাত’ কে ছিলেন?

উত্তর: খলিফা হারুনুর রশিদের রাজত্বকালে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর বিশিষ্ট প্রধান শিষ্য ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) প্রথম কাজীউল কুজাত (প্রধান বিচারপতি) নিযুক্ত হন।

প্রশ্ন ৫: গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের (সড়ক-ই-আজম) নির্মাতা কে ছিলেন?

উত্তর: দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান শেরশাহ সূরী সোনারগাঁও থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত ১৫০০ মাইল দীর্ঘ ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নির্মাণ করেন।

প্রশ্ন ৬: ইসলামি রাজস্ব ব্যবস্থায় ‘উশর’ বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: উশর হলো মুসলিম কৃষকদের জমির ফসলের ওপর প্রদেয় বাধ্যতামূলক ১০% বা ৫% জাকাতভিত্তিক ভূমি রাজস্ব।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *