ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিভাগ: দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: তারিখুদ দাওয়াহ আল-ইসলামিয়্যাহ (تاريخ الدعوة الإسلامية)
বিষয় কোড: ২০৩২০২
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
مجموعة (أ) – ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলী
١- تحديث عن تاريخ دعوة الرسول صلى الله عليه وسلم في المدينة المنورة-
[১. মদিনা মুনাওয়ারায় রসুল (স) এর দা’ওয়াতের ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
৬২২ খ্রিস্টাব্দে ঐতিহাসিক হিজরতের পর মদিনা মুনাওয়ারায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবনের যে দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়, তা ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল স্বর্ণালী অধ্যায়। মক্কার তেরো বছরের مظلوم অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মদিনায় ইসলামের দাওয়াত এক রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও বৈশ্বিক শক্তিতে রূপ লাভ করে।
১. মদিনায় দাওয়াতের প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন
- মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা: মদিনায় পৌঁছেই রাসূলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববী নির্মাণ করেন। এটি ছিল ইবাদতের পাশাপাশি দাওয়াতের মূল হেডকোয়ার্টার, পরামর্শ কেন্দ্র এবং ‘আসহাবুস্ সুফফাহ’র মাধ্যমে ইলম ও তারবিয়াতের কেন্দ্র।
- মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা: মক্কা থেকে রিক্তহস্তে আগত মুহাজিরদের পুনর্বাসনে স্থানীয় আনসারদের সাথে অভূতপূর্ব ঈমানী ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলেন।
- ঐতিহাসিক মদিনা সনদ প্রণয়ন: মদিনার মুসলিম, ইহুদি ও পৌত্তলিকদের সমন্বয়ে একটি বহুত্ববাদী সমাজে শান্তি ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে ৪৭টি ধারাবিশিষ্ট বিশ্বের প্রথম লিখিত নাগরিক সংবিধান প্রণয়ন করেন।
২. মদিনায় দাওয়াত সম্প্রসারণের কৌশল ও ধাপসমূহ
- পূর্ণাঙ্গ শরীয়তের বাস্তবায়ন: মদিনায় নামাযের পাশাপাশি যাকাত, সিয়াম, হজ, জিহাদ, পারিবারিক আইন, অর্থনৈতিক নীতিমালা ও অপরাধ দমনের হুদুদ কার্যকর হয়। ইসলামের এই সুবিচারপূর্ণ বাস্তব রূপ দেখে মানুষ দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করে।
- আত্মরক্ষা ও জিহাদের মাধ্যমে দাওয়াতের পথ উন্মুক্তকরণ: বদর, উহুদ, খন্দকসহ বিভিন্ন সামরিক অভিযানে কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের আগ্রাসন প্রতিহত করে ইসলামকে আরবের প্রধান শক্তিতে পরিণত করা হয়।
- হুদাইবিয়ার সন্ধি ও দাওয়াতের প্রসার: ষষ্ঠ হিজরিতে কুরাইশদের সাথে দশ বছরের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে পারস্পরিক অবাধ মেলামেশা ও আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়, যা ইসলাম গ্রহণের হার বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- বিশ্বনেতৃবৃন্দের কাছে আন্তর্জাতিক দাওয়াত প্রেরণ: সপ্তম হিজরিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) রোম, পারস্য, মিশর ও হাবশার সম্রাটসহ তৎকালীন বিশ্বনেতাদের কাছে পত্র মারফত আনুষ্ঠানিক দাওয়াত পৌঁছে দেন।
- রক্তপাতহীন মক্কা বিজয়: অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে আরবের প্রধান পৌত্তলিক ঘাঁটির পতন ঘটে এবং সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনের ফলে সমগ্র আরব উপদ্বীপে দাওয়াতের চূড়ান্ত বিজয় সূচিত হয়।
উপসংহার
মদিনার এই দশ বছরের সুপরিকল্পিত দাওয়াতি সংগ্রামের ফলেই জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকার বিদূরিত হয়ে তাওহীদের বিজয় নিশ্চিত হয়েছিল এবং মানবজাতি এক ইনসাফপূর্ণ ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার সন্ধান পেয়েছিল।
٢- عرف الصحابة- وما فضلهم؟ ثم بين مساهمتهم في نشر الدعوة الإسلامية-
[২. সাহাবিদের পরিচয় দাও। তাঁদের মর্যাদা কী? ইসলামি দা’ওয়াতের প্রচার ও প্রসারে তাঁদের অবদান বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ছিলেন নবুওয়াতি জ্যোতিতে সরাসরি আলোকিত মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবগোষ্ঠী। তাঁদের অপরিসীম ত্যাগ, অনমনীয় ঈমান ও রক্তের বিনিময়েই ইসলামের দাওয়াত বিশ্বব্যাপী বিজয় লাভ করেছিল।
১. সাহাবীর পারিভাষিক সংজ্ঞা (تعريف الصحابي)
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর সর্বসম্মত সংজ্ঞামতে: “الصَّحَابِيُّ مَنْ لَقِيَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُؤْمِنًا بِهِ، وَمَاتَ عَلَى الإِسْلامِ” অর্থাৎ, যে ব্যক্তি ঈমানী অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাক্ষুষ সাক্ষাৎ বা সাহচর্য লাভ করেছেন এবং ঈমানের ওপরই মৃত্যুবরণ করেছেন, তিনিই সাহাবী।
২. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সাহাবীদের মর্যাদা (فضل الصحابة)
- আল্লাহর সন্তুষ্টির সনদ: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্টির চিরন্তন ঘোষণা দিয়ে বলেন: “رَّضِيَ اللَّـهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ” (আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে—সূরা আত-তাওবাহ: ১০০)।
- উত্তম মানব প্রজন্ম: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ” (আমার যুগই হলো সর্বোত্তম যুগ, অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগ—সহীহ বুখারী)।
- সাহাবীদের গালমন্দ করার নিষেধাজ্ঞা: নবীজী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: “তোমরা আমার সাহাবীদের গালি দিও না; যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনাও আল্লাহর রাস্তায় দান করে, তবুও তাঁদের এক মুদ্দ (অর্ধ কেজি) বা অর্ধ মুদ্দ যবের সমপরিমাণ সওয়াবে পৌঁছাতে পারবে না” (সহীহ বুখারী)।
৩. দাওয়াত প্রচার ও প্রসারে সাহাবীদের অবদান
- কুরআন ও হাদিসের অবিকৃত সংরক্ষণ: ওহীর প্রতিটি শব্দ মুখস্থ ও লিখে রেখে এবং রাসূলের প্রতিটি সুন্নাহ ও কর্ম সংরক্ষণ করে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ঐতিহাসিক দায়িত্ব তাঁরাই পালন করেন।
- আরব উপদ্বীপের বাইরে দাওয়াতের বিস্তার: পারস্য, সিরিয়া, মিশর, উত্তর আফ্রিকা এমনকি চীন ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ডে তাঁরা দাওয়াতের আলো ছড়িয়ে দেন।
- সর্বস্ব ত্যাগ ও শাহাদাতের নজরানা: প্রায় এক লক্ষ চব্বিশ হাজার সাহাবীর মধ্যে মাত্র দশ-বারো হাজার ব্যতীত বাকি প্রায় লক্ষাধিক সাহাবী মক্কা-মদিনার বাইরে দূর-দূরান্তে দাওয়াত দিতে গিয়ে শাহাদাত বরণ করেন।
- চারিত্রিক মাধুর্য ও সততা: বিজিত অঞ্চলের প্রজাদের প্রতি সুবিচার, সততা ও মানবিক আচরণ প্রদর্শন করে কোটি কোটি মানুষকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আকৃষ্ট করেন।
উপসংহার
সাহাবায়ে কেরাম হলেন হিদায়েতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রতুল্য। তাঁদের ভালোবাসা ও পথানুসরণই উম্মতের নাজাতের একমাত্র পথ।
٣- اكتب نبذة عن حياة أبي بكر الصديق (رض) مع بيان خدماته في دعوة الإسلامية مختصرا-
[৩. হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) এর জীবনী আলোচনামূলক ইসলামি দা’ওয়াতে তাঁর অবদান সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ছিলেন আম্বিয়ায়ে কেরামের পর সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম পুরুষ মুসলমান, নবীজীর আজীবনের পরম বিশ্বস্ত সহচর এবং ইসলামের প্রথম খলিফা।
১. সংক্ষিপ্ত জীবন পরিচিতি
তিনি ৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে মক্কার কুরাইশ বংশের বনু তাইম শাখায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মূল নাম আব্দুল্লাহ, উপাধি ‘সিদ্দিক’ (সত্যনিষ্ঠ) ও ‘আতীক’ (পাপমুক্ত)। তিনি ছিলেন মক্কার সম্ভ্রান্ত, দানশীল, পরিচ্ছন্ন চরিত্রের ধনী ব্যবসায়ী এবং বংশবিদ্যায় অনন্য পণ্ডিত। মিরাজের ঘটনা দ্বিধাহীন চিত্তে বিশ্বাস করায় নবীজী তাঁকে ‘সিদ্দিক’ উপাধিতে ভূষিত করেন। হিজরতের ঐতিহাসিক সফরে তিনি সাওর গুহায় নবীজীর সঙ্গী ছিলেন।
২. ইসলামি দাওয়াতে তাঁর ঐতিহাসিক অবদানসমূহ
- অগ্রবর্তীদের ইসলামে দীক্ষিতকরণ: ইসলাম গ্রহণের পরপরই তিনি দাওয়াতি কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর দাওয়াতে তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব উসমান ইবনে আফফান, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ও তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রা.) ইসলাম কবুল করেন।
- সম্পদের নিঃস্বার্থ দান: দুর্বল ও নির্যাতিত দাস-দাসীদের মুক্ত করতে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেন (হযরত বিলাল ও খাব্বাব রা.-কে ক্রয় করে মুক্ত করেন)। তাবুক যুদ্ধে তিনি ঘরে যা ছিল তার শতভাগ আল্লাহর রাস্তায় এনে দেন।
- রিদ্দাহ ও ভণ্ড নবীদের দমন: নবীজীর ওফাতের পর ইসলামি রাষ্ট্রের ওপর নেমে আসা সংকট মোকাবিলা করে তিনি যাকাত অস্বীকারকারী ও মুসায়লামাতুল কাযযাবের মতো ভণ্ড নবীদের কঠোর হস্তে দমন করে দাওয়াতের ভিত্তি রক্ষা করেন।
- পবিত্র কুরআন সংকলন: ইয়ামামার যুদ্ধের পর তিনি হযরত যায়েদ ইবনে সাবিতের নেতৃত্বে কুরআনকে এক মলাটে গ্রন্থাকারে সংকলনের ঐতিহাসিক ব্যবস্থা করেন।
- আন্তর্জাতিক বিজয়ের সূচনা: রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যে দাওয়াত সম্প্রসারণের জন্য খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আবু উবাইদাহর নেতৃত্বে বাহিনী প্রেরণ করেন।
উপসংহার
হযরত আবু বকর (রা.)-এর প্রজ্ঞা, ঈমানী দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগের কারণেই ইসলামের প্রাথমিক অস্তিত্ব রক্ষা পেয়েছিল এবং বিশ্বব্যাপী দাওয়াতের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছিল।
٤- اكتب نبذة عن حياة معاوية (رض) مع بيان مهارته السياسية-
[৪. হযরত মুয়াবিয়া (রা) এর জীবনী সংক্ষেপে আলোচনামূলক তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতা আলোচনা কর।]
ভূমিকা
হযরত মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রা.) ছিলেন একজন জলিলুল কদর সাহাবী, কাতিবুল ওহী (ওহী লেখক) এবং উমাইয়া খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা। ইসলামের ইতিহাসে তিনি এক অনন্য প্রতিভাবান কূটনীতিবিদ, দক্ষ সমরনায়ক ও দূরদর্শী রাজনীতিবিদ হিসেবে চিরস্মরণীয়।
১. সংক্ষিপ্ত জীবন পরিচিতি
তিনি মক্কার কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ও হিন্দের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে বা তার পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওহী লিপিবদ্ধ করার সম্মানিত দায়িত্ব পালন করেন। খলিফা হযরত উমর ও উসমান (রা.)-এর আমলে তিনি দীর্ঘ প্রায় বিশ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৪১ হিজরিতে হযরত হাসান (রা.)-এর সাথে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির মাধ্যমে তিনি খলিফা হন এবং ৬০ হিজরি পর্যন্ত সুদীর্ঘ বিশ বছর দক্ষতার সাথে মুসলিম বিশ্ব শাসন করেন।
২. তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতা (مهارته السياسية)
- প্রথম ইসলামি নৌবাহিনী গঠন: হযরত উসমান (রা.)-এর আমলে তিনি ইসলামের প্রথম আধুনিক নৌবহর গড়ে তোলেন এবং রোমান নৌবাহিনীকে পরাজিত করে ভূমধ্যসাগরের সাইপ্রাস ও রোডস দ্বীপ জয় করেন।
- বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের আগ্রাসন প্রতিরোধ: রোমানদের আক্রমণ চিরতরে স্তব্ধ করতে তিনি নিয়মিত সীমান্ত অভিযান পরিচালনা করেন এবং কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেন।
- ‘হিলমে মুয়াবিয়া’ বা অনন্য কূটনৈতিক ধৈর্য: তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অন্যতম পরিচয় ছিল তাঁর প্রবাদতুল্য ধৈর্য ও পরমতসহিষ্ণুতা। তিনি বলতেন: “لو كان بيني وبين الناس شعرة ما انقطعت، إذا مدّوها رخيتها، وإذا رخوها مددتها” অর্থাৎ, “আমার ও জনগণের মাঝে যদি একটি চুলের মতো সূক্ষ্ম সম্পর্কও থাকে, তবে তা ছিঁড়বে না। তারা টানলে আমি ঢিল দিই, আর তারা ঢিল দিলে আমি টানি।”
- প্রশাসনিক আধুনিকায়ন: তিনি ডাক বিভাগ (বারিদ), রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী (শুহরাহ), দলিল সংরক্ষণের জন্য রেজিস্ট্রি অফিস এবং সীলমোহর প্রথা প্রবর্তন করেন।
উপসংহার
হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা মুসলিম সাম্রাজ্যকে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা থেকে উদ্ধার করে এক সংহত পরাশক্তিতে রূপ দিয়েছিল।
٥- تحدث عن إسلام خالد بن وليد (رض)- ثم بين مساهمته في الدعوة الإسلامية-
[৫. হযরত খালেদ বিন ওলিদ (রা) এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আলোচনা কর। অতঃপর ইসলামি দা’ওয়াতি কার্যক্রমে তাঁর অবদান সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের অপরাজেয় বীর সেনানী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় মুখে তাঁকে ‘সাইফুল্লাহ’ (سيف الله) বা আল্লাহর তরবারি উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। জীবনের কোনো যুদ্ধে তিনি কখনো পরাজিত হননি।
১. তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঐতিহাসিক ঘটনা
- প্রাথমিক জীবনে তিনি কুরাইশদের পক্ষ হয়ে উহুদের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পেছনে আক্রমণ করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছিলেন।
- ষষ্ঠ হিজরিতে হুদাইবিয়ার সন্ধির পর সপ্তম হিজরিতে ‘উমরাতুল কাযা’ আদায়ে নবীজী মক্কায় এলে খালিদের ভাই অলীদ ইবনে অলীদ খালিদের কাছে নবীজীর প্রশংসা সংবলিত চিঠি পাঠান। নবীজী বলেছিলেন: “খালিদের মতো বিচক্ষণ ব্যক্তি কীভাবে ইসলাম থেকে দূরে থাকে?”
- এই চিঠি খালিদের হৃদয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। তিনি উপলব্ধি করেন যে সত্যের বিজয় নিশ্চিত। অবশেষে অষ্টম হিজরির সফর মাসে তিনি প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ আমর ইবনুল আস ও উসমান ইবনে তালহাকে সাথে নিয়ে মদিনায় আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। নবীজী অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে তাঁর অতীত ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
২. ইসলামি দাওয়াতে তাঁর সামরিক ও রণকৌশলগত অবদান
- মুতার যুদ্ধ ও অলৌকিক নেতৃত্ব (৮ম হি.): তিন হাজার মুসলিম সৈন্যের বিরুদ্ধে দুই লক্ষ রোমান সেনার অসম যুদ্ধে তিন সেনাপতি শাহাদাত বরণ করলে খালিদ বিন ওয়ালিদ সেনাপতিত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর রণকৌশলে নয়টি তরবারি ভেঙে যায় এবং তিনি বাহিনীকে নিরাপদে মদিনায় ফিরিয়ে আনেন। নবীজী তাঁকে ‘সাইফুল্লাহ’ উপাধি দেন।
- ভণ্ড নবীদের সমূলে বিনাশ: খলিফা আবু বকর (রা.)-এর আমলে তিনি তুলাইহা আল-আসাদী এবং ইয়ামামার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ভণ্ড নবী মুসায়লামাতুল কাযযাবকে সম্পূর্ণ নির্মূল করে ইসলামের আকিদাগত ঐক্য রক্ষা করেন।
- পারস্য সাম্রাজ্য বিজয়: ইরাক ও পারস্য সীমান্তে জালেসের যুদ্ধ ও উবুল্লার যুদ্ধে পারসিক বাহিনীকে গুঁড়িয়ে দেন।
- ইয়ারমুকের ঐতিহাসিক বিজয় (১৩ হি.): সিরিয়ায় রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের আড়াই লক্ষ সেনার বিরুদ্ধে মাত্র চল্লিশ হাজার মুসলিম মুজাহিদ নিয়ে তিনি বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম সেরা রণকৌশল প্রদর্শন করে ইয়ারমুকের যুদ্ধে রোমান পরাশক্তিকে চিরতরে পর্যুদস্ত করেন। এর ফলে সমগ্র সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে ইসলামের দাওয়াত সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
উপসংহার
হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) ছিলেন এমন এক তরবারি, যাকে আল্লাহ ইসলাম ও সত্যের বিজয়ের জন্যই উন্মুক্ত করেছিলেন।
٦- عرف بأتباع التابعين؟ تحدث عن وسائل الدعوة الإسلامية في عهد أتباع التابعين-
[৬. তাবে তাবেয়িনদের পরিচয় দাও। তাঁদের যুগে ইসলামি দা’ওয়াতের মাধ্যমসমূহ সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামের সোনালী ইতিহাসের তৃতীয় শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম হলেন তাবে-তাবেয়ীগণ (أتباع التابعين)। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা অনুযায়ী: “সর্বোত্তম প্রজন্ম আমার যুগ, অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগ (তাবেয়ী), অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগ (তাবে-তাবেয়ী)।” হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকে তৃতীয় শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত তাঁদের কর্মকাল বিস্তৃত ছিল।
১. তাবে-তাবেয়ীদের সংজ্ঞা ও পরিচয়
শরীয়তের পরিভাষায়, যে সকল পুণ্যবান ব্যক্তি কোনো সাহাবীকে সরাসরি দেখার সুযোগ পাননি, তবে তাবেয়ীগণের সাথে মুমিন অবস্থায় সাক্ষাৎ ও দীর্ঘ সান্নিধ্য লাভ করেছেন এবং ঈমানের ওপর মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁদেরকে তাবে-তাবেয়ী বলা হয়।
প্রখ্যাত তাবে-তাবেয়ীগণ: ইমাম মালিক ইবনে আনাস, সুফিয়ান সাওরী, লাইস ইবনে সা’দ, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ফুযাইল ইবনে ইয়াজ এবং ইমাম শাফেয়ী (রহ.)।
২. তাবে-তাবেয়ীদের যুগে দাওয়াতের প্রধান মাধ্যমসমূহ
- ১. উলূম ও শাস্ত্রসমূহের সুসংহত সংকলন (تدوين العلوم):
এ যুগে দাওয়াতের প্রধান হাতিয়ার ছিল কিতাব সংকলন। হাদিস শাস্ত্র, উসূলে ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ ও তাফসীরের প্রামাণ্য গ্রন্থাবলী এ যুগেই সংকলিত হয়। ইমাম মালিক রচনা করেন বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ মুয়াত্তা ইমাম মালিক।
- ২. ইলমি হালক্বাহ ও মাদরাসা কেন্দ্রিক শিক্ষা:
মসজিদে নববী, কুফা, বসরা ও বাগদাদের জামে মসজিদগুলোতে বিশাল ইলমি মাহফিল ও হাদিসের দারস অনুষ্ঠিত হতো, যেখানে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী সমবেত হয়ে দ্বীন শিখত।
- ৩. ফিকহী মাযহাবসমূহের বিকাশ ও ইজতিহাদ:
মানবজীবনের নিত্যনতুন সমস্যার শরয়ী সমাধান দিতে ফিকহ শাস্ত্রের বিকাশ ঘটে। ফিকহে হানাফী, মালিকী ও শাফেয়ীর মূল কাঠামো এ যুগেই সুবিন্যস্ত হয়।
- ৪. সুফি-দরবেশদের তাকওয়া ও চারিত্রিক দাওয়াত:
ইব্রাহিম ইবনে আদহাম ও ফুযাইল ইবনে ইয়াজের মতো বুজুর্গদের আত্মশুদ্ধি ও জুহদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হৃদয় ইসলামের প্রতি নিবেদিত হয়।
- ৫. সীমান্ত পাহারা ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ:
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের মতো মনীষীগণ একদিকে হাদিসের শিক্ষকতা করতেন, অন্যদিকে রোমান সীমান্তে গিয়ে জিহাদে অংশ নিতেন।
উপসংহার
তাবে-তাবেয়ীদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও ইলমি বিপ্লবের ফলেই ইসলামের বিশুদ্ধ রূপ চিরকালের জন্য সুসংরক্ষিত হয়েছে।
٧- تحدث عن تاريخ الدعوة الإسلامية في شبه القارة الهندية-
[৭. ভারত উপমহাদেশে ইসলামি দা’ওয়াতের ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল ভূখণ্ড ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের আলো আগমন কোনো আকস্মিক সামরিক আধিপত্যের ফসল নয়; বরং তা ছিল আরব সাগরীয় প্রাচীন বাণিজ্য, ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়, এবং যুগ যুগ ধরে সুফি-সাধক ও ওলামায়ে কেরামের নিরবচ্ছিন্ন দাওয়াতি সংগ্রামের সুফল।
১. বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রাথমিক দাওয়াত
- ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ব থেকেই আরব বণিকদের ভারতের মালাবার ও গুজরাট উপকূলে বাণিজ্য ছিল।
- সপ্তম শতাব্দীতে মুসলিম বণিকদের সততা, উন্নত চরিত্র ও ইনসাফ দেখে মালাবারের রাজা চেরামান পেরুমল ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সেখানে চেরামান জুমা মসজিদ নির্মিত হয়।
২. রাজনৈতিক বিজয় ও দাওয়াতের ভিত্তি স্থাপন
- মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয় (৭১২ খ্রি.): রাজা দাহিরের জুলুমের অবসান ঘটিয়ে সিন্ধু ও মুলতানে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি স্থানীয় প্রজাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করেন, ফলে বিপুল সংখ্যক নিম্নবর্ণের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।
- সুলতানি আমল (১২০৬-১৫২৬ খ্রি.): শিহাবুদ্দীন ঘুরীর পর কুতুবুদ্দীন আইবেকের নেতৃত্বে দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সমগ্র উত্তর ও মধ্য ভারতে ইসলামি সভ্যতাকে সুদৃঢ় করে।
- মুঘল সাম্রাজ্য (১৫২৬-১৮৫৭ খ্রি.): বাবর থেকে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত সুবিশাল ভারতে ইসলামি শাসন, ন্যায়বিচার ও সংস্কৃতির অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে।
৩. সুফি-সাধকগণের আত্মিক বিপ্লব
উপমহাদেশে ইসলাম প্রসারের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন মহান সুফিগণ:
- আজমিরে খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.)-এর প্রেম ও মানবসেবা।
- দিল্লিতে হযরত নিযামুদ্দীন আউলিয়া ও কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহ.)।
- লাহোরে হযরত দাতা গঞ্জে বখশ আলী হুজবীরী (রহ.)।
- বাংলায় হযরত শাহজালাল ও খান জাহান আলী (রহ.)।
৪. সংস্কার আন্দোলনসমূহের ভূমিকা
অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে মুঘল পতনের পর শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.), সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ এবং হাজী শরীয়তুল্লাহর সংস্কার আন্দোলন উপমহাদেশীয় মুসলিমদের ঈমান ও স্বকীয়তা পুনরুজ্জীবিত করে।
উপসংহার
উপমহাদেশে ইসলাম ছিল মানবিক মর্যাদা ও মুক্তির দূত, যা শত শতাব্দীর প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আজও এ অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন।
٨- كيف انتشر الإسلام في منطقة شيتاغونغ؟ بين موضحا-
[৮. চট্টগ্রাম অঞ্চলে কীভাবে ইসলাম প্রচারিত হয়? বিশদভাবে বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
প্রাচীনকাল থেকেই চট্টগ্রাম ছিল আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের এক অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক প্রবেশদ্বার। বাংলাদেশে ইসলামের যে স্ফুলিঙ্গ প্রথম প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই চট্টগ্রাম। আরব বণিকদের সমুদ্রযাত্রা এবং অলী-আউলিয়াদের পদধূলিতে চট্টগ্রাম পরিণত হয় ‘বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি’তে।
১. আরব বণিকদের প্রাচীন আগমন (৮ম-৯ম শতাব্দী)
- আব্বাসীয় খিলাফতের যুগে আরব মুসলিম বণিকরা চীন ও ইন্দোনেশিয়ার সাথে মসলা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় চট্টগ্রাম বন্দরকে প্রধান যাত্রাবিরতি বা ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতেন।
- আরব ভূগোলবিদ আল-ইদ্রিসী ও সোলায়মান তাজেরের ভ্রমণবৃত্তান্তে চট্টগ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেক আরব বণিক এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং স্থানীয় নারীদের বিয়ে করে এক মিশ্র মুসলিম পরিবারের সূচনা করেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বহু আরবি শব্দের সংমিশ্রণ এরই ঐতিহাসিক প্রমাণ।
২. সুফি-সাধক ও ইসলাম প্রচারকদের অবদান
- সুলতানুল আরেফীন হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.): ঐতিহাসিক জনশ্রুতি ও ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী ৯ম শতাব্দীতে এই অঞ্চলে বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.)-এর আগমন ঘটেছিল অথবা তাঁর শিষ্যরা এসে আস্তানা গড়েছিলেন, যা চট্টগ্রামে দাওয়াতের ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলে।
- বদর পীর বা পীর বদরুদ্দীন আল্লামা (রহ.): চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে তিনি চট্টগ্রামে আগমন করেন। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, তিনি নিজ আধ্যাত্মিক সাধনায় চট্টগ্রামের তৎকালীন অন্ধকার ও জিন-পরীর উপদ্রবখ্যাত জঙ্গল দূর করে চাঁটি (মাটির প্রদীপ) জ্বালিয়ে আযান দেন, যা থেকে ‘চাঁটগাঁ’ বা চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
- হযরত শাহ আমানত (রহ.): অষ্টাদশ শতাব্দীতে চট্টগ্রামের আদালত ভবনে সামান্য চাকরি করার পাশাপাশি গভীর আধ্যাত্মিক সাধনা ও দাওয়াতি খেদমতের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে দ্বীনের পথে আনেন।
- বার আউলিয়ার অবদান: হযরত কাতাল পীর, বায়েজিদ বোস্তামী, মোহসেন আউলিয়া, গরীবুল্লাহ শাহসহ বহু আউলিয়ার ত্যাগ ও চারিত্রিক সৌন্দর্যে চট্টগ্রাম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে রূপ নেয়।
৩. ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের চট্টগ্রাম বিজয় (১৩৪০ খ্রি.)
১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁয়ের স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের সেনাপতি কদল খান গাজী চট্টগ্রাম জয় করে একে মুসলিম সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করেন। ফলে প্রশাসনিকভাবে দাওয়াতের পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়।
উপসংহার
বাণিজ্যিক সততা, আধ্যাত্মিক আউলিয়াদের সংস্কার এবং ইসলামি শাসনের সমন্বয়েই চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইসলামের বিজয় নিশ্চিত হয়েছিল।
مجموعة (ب) – খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্নাবলী
٩- اكتب نبذة عن حياة أم المؤمنين عائشة (رض) مختصرا-
[৯. উম্মুল মু’মেনিন হযরত আয়েশা (রা) এর জীবনী সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) ছিলেন উম্মুল মুমিনীন এবং ইসলামের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদুষী নারী। তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর কন্যা। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে মক্কায় তাঁর আকদ এবং দ্বিতীয় হিজরিতে মদিনায় বাসর অনুষ্ঠিত হয়। তিনি ছিলেন প্রখর মেধা, অসামান্য স্মৃতিশক্তি ও প্রজ্ঞার অধিকারী। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে তিনি ২,২১০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাফসীর, হাদিস, ফিকহ, আরবি সাহিত্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে তিনি পারদর্শী ছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম কোনো জটিল ফিকহী সমস্যায় পড়লে তাঁর কাছে গিয়ে সমাধান নিতেন। ৫৮ হিজরিতে তিনি মদিনায় ইন্তেকাল করেন এবং জান্নাতুল বাক্বীতে সমাহিত হন।
١٠- بين وسائل الدعوة الإسلام في عهد الصحابة مختصرا-
[১০. সাহাবিদের যুগে ইসলামের দা’ওয়াত প্রচারের মাধ্যমসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
সাহাবায়ে কেরামের যুগে দাওয়াতের প্রধান মাধ্যমগুলো ছিল:
- অনুপম চরিত্র ও আমল (القدوة الحسنة): লেনদেনে সততা ও ওয়াদা রক্ষার মাধ্যমে অমুসলিমদের আকৃষ্ট করা।
- ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আন্তরিক উপদেশ: মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দ্বীনের সৌন্দর্য তুলে ধরা।
- মুয়াল্লিম ও প্রতিনিধি দল প্রেরণ: বিভিন্ন অঞ্চলে সাহাবীদের কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষক হিসেবে পাঠানো।
- জুমার খুতবা ও সাধারণ মজলিস: মসজিদে সমবেত আলোচনার মাধ্যমে দ্বীনি দিকনির্দেশনা প্রদান।
- চিঠিপত্র ও চুক্তি সম্পাদন: বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাথে ন্যায়সঙ্গত চুক্তি করে দাওয়াতের সুযোগ তৈরি করা।
١١- تحدث عن أربعة من أشهر الدعاة من التابعين مختصرا-
[১১. চারজন বিখ্যাত তাবেয়ি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
- ১. সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব (রহ.): মদিনার সাত ফকীহের শীর্ষস্থানীয় তাবেয়ী। তিনি ছিলেন ইলম ও আপসহীন তাকওয়ার প্রতীক।
- ২. হাসান বসরী (রহ.): বসরার বিশ্ববিখ্যাত মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও ওয়ায়েজ। তাঁর হৃদয়স্পর্শী ওয়াজ ও আধ্যাত্মিক নসীহত হাজার হাজার পাপীকে খাঁটি মুমিনে পরিণত করত।
- ৩. উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহ.): উমাইয়া খলিফা, যিনি সুন্নাহ পুনরুজ্জীবিত করে এবং সুবিচার কায়েম করে পঞ্চম খলিফায়ে রাশেদ হিসেবে স্বীকৃতি পান।
- ৪. আতা ইবনে আবি রাবাহ (রহ.): মক্কার প্রখ্যাত তাবেয়ী ও হজের মাসায়েলের শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ। একজন মুক্তদাস হয়েও ইলমের বলে সমগ্র আরবের ইমাম হয়েছিলেন।
١٢- ما معنى الوعظ والنصيحة؟ وما تأثيرهما في المجتمع الاسلامي؟ بين مختصرا-
[১২. ওয়াজ ও নসিহত বলতে কী বোঝায়? ইসলামি সমাজে এ দুটির প্রভাব সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
অর্থ: ‘ওয়াজ’ (الوعظ) হলো জান্নাতের আশা ও জাহান্নামের ভয় প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয় ও আবেগ জাগ্রত করে কোমল ভাষায় উপদেশ দেওয়া। আর ‘নসীহত’ (النصيحة) হলো কারও সামগ্রিক কল্যাণ ও মঙ্গলের উদ্দেশ্যে আন্তরিকভাবে সঠিক পথ প্রদর্শন করা।
সমাজে প্রভাব: ওয়াজ ও নসীহত মুসলিম সমাজে আত্মশুদ্ধি জাগ্রত করে, পাপীদের তাওবার সুযোগ দেয়, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সততা সুদৃঢ় করে এবং সমাজকে জুলুম, ব্যভিচার ও অপরাধ থেকে মুক্ত রেখে এক পবিত্র পরিবেশ নিশ্চিত করে।
١٣- اكتب نبذة عن حياة الإمام محمد بن إدريس الشافعي (رح) مختصرا-
[১৩. ইমাম মুহাম্মদ ইবনু ইদ্রিস আশ-শাফেয়ি (রহ) এর জীবনী সংক্ষেপে লেখ।]
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ১৫০ হিজরিতে ফিলিস্তিনের গাজায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি এতিম হন এবং মক্কায় এসে পবিত্র কুরআন ও ইমাম মালিকের মুয়াত্তা মুখস্থ করেন। তিনি ছিলেন চার প্রসিদ্ধ মাজহাবের অন্যতম শাফেয়ী মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি উসূলে ফিকহের ওপর বিশ্বের প্রথম মৌলিক গ্রন্থ ‘আর-রিসালাহ’ এবং সুবিশাল ফিকহী গ্রন্থ ‘কিতাবুল উম্ম’ রচনা করেন। তিনি আহলুল হাদিস ও আহলুর রায়ের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় সাধন করেন। ২০৪ হিজরিতে তিনি মিশরে ইন্তেকাল করেন।
١٤- اكتب نبذة عن حياة قتيبة بن مسلم مع بيان خدماته في نشر الإسلام مختصرا-
[১৪. হযরত কোতায়বা বিন মুসলিম (রহ) এর জীবনী আলোচনামূলক ইসলাম প্রচারে তাঁর ভূমিকা সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
কোতায়বা ইবনে মুসলিম আল-বাহিলী (৪৯-৯৬ হি.) ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের এক অকুতোভয় সেনাপতি ও বিজয়ী দায়ী। ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের আমলে তিনি খোরাসানের গভর্নর নিযুক্ত হন। তিনি মধ্য এশিয়ার আমু দরিয়া নদী অতিক্রম করে বলখ, বুখারা, সমরখন্দ ও খাওয়ারিজম জয় করেন এবং চীনের সীমান্ত কাশগড় পর্যন্ত পৌঁছে যান। তিনি শুধু সামরিক বিজয়ই অর্জন করেননি, বরং প্রতিটি শহরে সুবিশাল মসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণ করে সেখানে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষক নিয়োগ করেন। তাঁর প্রচেষ্টাতেই মধ্য এশিয়া পরবর্তীতে ইমাম বুখারী ও ইমাম তিরমিযীর মতো জগৎবিখ্যাত মুহাদ্দিসদের জন্মভূমিতে পরিণত হয়েছিল।
١٥- كيف انتشر دعوة الإسلام في بنغلاديش؟ بين مختصرا-
[১৫. বাংলাদেশে কীভাবে ইসলাম প্রচার হয়? সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার মূলত তিনটি ঐতিহাসিক ধারায় বাস্তবায়িত হয়েছিল: প্রথমত, অষ্টম শতাব্দী থেকে চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় অঞ্চলে আরব ও পারসিক মুসলিম বণিকদের আগমন ও বাণিজ্যিক সততা; দ্বিতীয়ত, ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা; এবং তৃতীয় ও সবচেয়ে প্রধানত, হযরত শাহজালাল, খান জাহান আলী, শাহ পরান ও বাবা আদম শহীদের মতো শত শত আধ্যাত্মিক সুফি-দরবেশের নিঃস্বার্থ মানবপ্রেম, লঙ্গরখানা পরিচালনা এবং জাত-পাত ও বর্ণবাদের শিকার অবহেলিত সাধারণ মানুষকে কাছে টেনে নেওয়ার মাধ্যমে।
١٦- علق على اثنين مما يلي :
[১৬. নিম্নের বিষয়গুলোর ওপর সারগর্ভ টীকা:]
(ألف) الهجرة (হিজরত)
হিজরত অর্থ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পাপ ও শিরকের পরিবেশ ত্যাগ করে ঈমানের সুরক্ষায় নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর হওয়া। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় নবীজী ও সাহাবীদের ঐতিহাসিক হিজরত ছিল ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষা ও প্রথম সার্বভৌম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর।
(ب) وصية الخلفاء للأمراء (সেনাপতিদের প্রতি খলিফাদের উপদেশ)
খুলাফায়ে রাশেদীন যুদ্ধাভিযানে প্রেরণের পূর্বে সেনাপতিদের যে ঐতিহাসিক মানবিক নসীহত দিতেন তা বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন। হযরত আবু বকর (রা.) আদেশ দিতেন: “কোনো নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে হত্যা করবে না; ফলবান গাছ কাটবে না; ফসল পোড়াবে না; জনবসতি ধ্বংস করবে না; এবং গির্জার পুরোহিত ও উপাসকদের কোনো ক্ষতি করবে না।”
(ج) عمر بن عبد العزيز رحمه الله (উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ.)
তিনি ছিলেন উমাইয়া খলিফা (শাসনকাল: ৯৯-১০১ হি.)। খিলাফতে রাশেদার আদর্শে রাষ্ট্র পরিচালনা করায় তাঁকে পঞ্চম খলিফায়ে রাশেদ বলা হয়। তিনি রাজকীয় বিলাসিতা ত্যাগ করেন, নওমুসলিমদের ওপর আরোপিত অন্যায় জিজিয়া বাতিল করেন এবং এমন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনেন যে তাঁর আমলে যাকাত নেওয়ার মতো কোনো দরিদ্র লোক খুঁজে পাওয়া যেত না।
(د) الخطابة والرسائل (খুতবা ও পত্রাবলী)
আরবি বাগ্মিতা ও জুমার খুতবা ইসলামের প্রাথমিক যুগে জনমত গঠন, শিক্ষা ও দাওয়াতের প্রধান গণমাধ্যম হিসেবে কাজ করত। পাশাপাশি দূরবর্তী রাজা-বাদশাহদের কাছে প্রেরিত নবীজী ও খলিফাদের ঐতিহাসিক চিঠিপত্র বিশ্ব দরবারে ইসলামের আন্তর্জাতিক রূপ প্রতিষ্ঠা করেছিল।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ইসলামের প্রথম খলিফা কে ছিলেন?
উত্তর: হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), যিনি নবী করীম (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহর প্রথম খলিফা নির্বাচিত হন।
প্রশ্ন ২: ‘সাইফুল্লাহ’ বা আল্লাহর তরবারি উপাধি কার ছিল?
উত্তর: বিশ্বখ্যাত অপরাজিত সেনাপতি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-কে রাসূলুল্লাহ (সা.) এই উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
প্রশ্ন ৩: উসূলে ফিকহের প্রথম মৌলিক গ্রন্থ কোনটি এবং এর রচয়িতা কে?
উত্তর: ‘আর-রিসালাহ’, যা ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদ্রিস আশ-শাফেয়ী (রহ.) প্রণয়ন করেছিলেন।
প্রশ্ন ৪: মধ্য এশিয়ায় বুখারা ও সমরখন্দ বিজয়ে নেতৃত্ব দেন কে?
উত্তর: উমাইয়া যুগের বীর সেনাপতি হযরত কোতায়বা ইবনে মুসলিম আল-বাহিলী (রহ.)।
প্রশ্ন ৫: চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারে বিখ্যাত কোন সুফি সাধকের অবদান রয়েছে?
উত্তর: হযরত বদর পীর (রহ.), হযরত শাহ আমানত (রহ.) এবং হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত ভূমিকা।
প্রশ্ন ৬: ইসলামের পঞ্চম খলিফায়ে রাশেদ কাকে বলা হয়?
উত্তর: ন্যায়পরায়ণ উমাইয়া খলিফা হযরত উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহ.)-কে তাঁর ইনসাফপূর্ণ শাসনের জন্য পঞ্চম খলিফায়ে রাশেদ বলা হয়।