জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

উলূমুল কুরআন (Ulumul Quran) – ২০২২০৫, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
21 September, 2026
৭২ মিনিট পড়ার সময়
১৩ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: উলূমুল কুরআন (Ulumul Quran)
বিষয় কোড: ২০২২০৫
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা

ক বিভাগ (القسم الأول) – পূর্ণাঙ্গ প্রশ্ন সমাধান

١. عرف الوحى ثم بين أهميته وضرورته وأقسامه مفصلا-

[১. অহির সংজ্ঞা দাও। অহির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও প্রকারভেদ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামী জীবনব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো আসমানী অহি। স্রষ্টার পক্ষ থেকে সৃষ্টির হেদায়াতের জন্য প্রেরিত নির্ভুল ঐশী বাণীই হলো অহি, যার ওপর ভিত্তি করেই সমস্ত আসমানী কিতাব ও শরীয়ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১. অহির আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা

আভিধানিক অর্থ: ‘অহি’ (الوحي) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো গোপনে দ্রুত ইঙ্গিত করা (الإشارة السريعة في خفاء), গোপনে কোনো কথা অন্তরে প্রবিষ্ট করে দেওয়া (الإلقاء في الروع) বা গোপন বার্তা প্রেরণ।

পারিভাষিক অর্থ: “هو كلام الله تعالى المنزل على نبي من أنبيائه لتبليغ أحكامه وهداية البشرية بواسطة أو بغير واسطة” অর্থাৎ, “আল্লাহ তাআলা তাঁর কোনো নবীর ওপর স্বীয় আহকাম প্রচার ও মানবজাতির হেদায়াতের উদ্দেশ্যে মাধ্যমসহ (যেমন জিবরাঈল আ.) বা মাধ্যম ছাড়া যে খোদায়ী বাণী বা নির্দেশনা অবতীর্ণ করেন, তাকে অহি বলে।”

২. মানবজীবনে অহির গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা

  1. জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দূরীকরণ: মানুষের পঞ্চেন্দ্রিয় ও বুদ্ধি সীমিত। বুদ্ধি কেবল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু নিয়ে চিন্তা করতে পারে; কিন্তু রূহ, আখেরাত, হাশর-নশর, জান্নাত-জাহান্নাম এবং আল্লাহর জাত ও সিফাত সম্পর্কে বুদ্ধি কোনো নিশ্চিত জ্ঞান দিতে পারে না। অহি মানুষকে এই অদৃশ্য বিষয়ের নির্ভুল জ্ঞান দান করে।
  2. জীবন চলার অভ্রান্ত পথপ্রদর্শক: মানবজাতি প্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সত্য-মিথ্যা ও হালাল-হারামের চূড়ান্ত মানদণ্ড নির্ধারণে আসমানী অহি অপরিহার্য।
  3. ন্যায়বিচার ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ: মানুষের তৈরি আইন ব্যক্তিস্বার্থ ও সীমাবদ্ধতায় দুষ্ট। একমাত্র অহির বিধানই পক্ষপাতহীন ও সার্বজনীন ইনসাফ নিশ্চিত করতে পারে।

৩. কুরআনের আলোকে অহির প্রকারভেদ

পবিত্র কুরআনের সুরা আশ-শুরার ৫১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নবীদের কাছে অহি প্রেরণের তিনটি মাধ্যম সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন:

“وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَن يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ ۚ إِنَّهُ عَلِيٌّ حَكِيمٌ”

  1. ইলহাম বা অন্তরে নিক্ষেপ (وحيا): জাগ্রত অবস্থায় নবীর অন্তরে সরাসরি কোনো সন্দেহাতীত ধারণা বা জ্ঞান ঢেলে দেওয়া অথবা সত্য স্বপ্নের (الرؤيا الصادقة) মাধ্যমে নির্দেশনা দেওয়া। যেমন: হযরত ইবরাহীম (আ.)-কে স্বপ্নে পুত্র কুরবানীর নির্দেশ প্রদান।
  2. পর্দার অন্তরাল থেকে বাক্যালাপ (من وراء حجاب): আল্লাহ তাআলা কোনো মাধ্যম ছাড়াই নিজ কুদরতে সরাসরি নবীর সাথে কথা বলেন, যেখানে নবী আল্লাহর বাণী শোনেন কিন্তু আল্লাহকে দেখেন না। যেমন: তূর পাহাড়ে হযরত মূসা (আ.)-এর সাথে আল্লাহর কথোপকথন এবং মিরাজের রজনীতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে কথোপকথন।
  3. ফেরেশতার মাধ্যমে অহি প্রেরণ (يرسل رسولا): প্রধান ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে দূত হিসেবে প্রেরণ করা। এটি মূলত দুইভাবে হতো:
    • ঘণ্টাধ্বনির মতো আওয়াজ (مثل صلصلة الجرس): এটি ছিল নবীর জন্য সবচেয়ে কষ্টদায়ক ও ভারী অবস্থা। প্রচণ্ড শীতেও রাসুল (সা.)-এর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরত। এ অবস্থায় অহির ভাবার্থ সম্পূর্ণ মুখস্থ হয়ে যেত।
    • মানুষের আকৃতিতে ফেরেশতার আগমন: হযরত জিবরাঈল (আ.) কখনো সাহাবী দাহিয়াতুল কালবী (রা.)-এর বেশে বা অজ্ঞাত যুবকের বেশে এসে কথা বলতেন (যেমন হাদিসে জিবরাঈল)।
    • আসল আকৃতিতে দর্শন: রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে তাঁর নিজস্ব মূল ছয়শত ডানাবিশিষ্ট দিগন্তব্যাপী রূপেও দুবার প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

৪. শরীয়তের দৃষ্টিতে অহির প্রকারভেদ

  • অহি মাতলূ (وحي متلو): যে অহির শব্দ ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং যা নামাযে তিলাওয়াত করা ফরজ ও যার একটি হরফ পাঠে ১০টি নেকি অর্জিত হয়। এটি হলো পবিত্র কুরআন মাজীদ
  • অহি গায়রে মাতলূ (وحي غير متلو): যার ভাবার্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে অহির মাধ্যমে অবতীর্ণ কিন্তু ভাষা ও শব্দ স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব। এটি হলো পবিত্র হাদিস ও সুন্নাহ

উপসংহার

অহি হলো আল্লাহর সাথে মানবের যোগাযোগের একমাত্র ঐশী সেতু। অহির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করাই ইসলামের ঈমানের মূল সোপান।


٢. زعم الجاهليون قديما وحديثا “أن محمدا قد تلقى العلوم القرآنية على يد بشر” فند شبهتهم هذه بالحجج الدامغة-

[২. প্রাচীন ও আধুনিককালের জাহিলী পন্থীরা বলে যে, “একজন মানুষের কাছ থেকে মুহাম্মাদ কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করেছে” তাদের এই সন্দেহ অকাট্য দলিল দ্বারা খণ্ডন কর।]

ভূমিকা

পবিত্র কুরআনের অতুলনীয় সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্ব, বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা এবং আধ্যাত্মিক প্রভাবের সামনে পরাস্ত হয়ে প্রাচীন মক্কার মুশরিক এবং আধুনিক যুগের প্রাচ্যবিদরা (ওরিয়েন্টালিস্টরা) একটি ভিত্তিহীন অপবাদ আরোপ করতে চেয়েছিল যে—মুহাম্মদ (সা.) কোনো মানুষের (যেমন কোনো খ্রিষ্টান পাদ্রী বা গোলামের) কাছ থেকে কুরআন শিখেছেন। পবিত্র কুরআন ও ঐতিহাসিক অকাট্য যুক্তি দ্বারা এই দাবি সম্পূর্ণ অসার প্রমাণিত হয়েছে।

১. কাফেরদের দাবির ঐতিহাসিক পটভূমি ও পবিত্র কুরআনের দাঁতভাঙা জবাব

মক্কার মুশরিকরা দেখল যে মক্কায় জাবর বা ইয়াইশ নামের একজন রোমক খ্রিষ্টান গোলাম ছিল, যে তৌরাত ও ইঞ্জিল সম্পর্কে কিছুটা জানত। তারা রটিয়ে দিল যে, মুহাম্মদ (সা.) তার কাছ থেকেই এসব ইতিহাস ও বিধান শুনে কুরআন বানিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এই নির্বোধ দাবিকে এক আয়াতেই সমূলে ধূলিসাৎ করে দেন:

“وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ ۗ لِّسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهَٰذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُّبِينٌ”

“আমি খুব ভালো করেই জানি তারা বলে যে, তাকে একজন মানুষে শিক্ষা দেয়। অথচ তারা যার দিকে ইঙ্গিত করে তার ভাষা তো অনারবি (আজমী), আর এই কুরআন হলো সুস্পষ্ট, প্রাঞ্জল আরবি ভাষা!” (সুরা আন-নাহল: ১০৩)।

২. সন্দেহ খণ্ডনে অকাট্য যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণসমূহ

  1. ভাষাগত অসম্ভবতা (التناقض اللغوي): যে রোমক গোলাম বা পাদ্রীর প্রতি তারা ইঙ্গিত করেছিল, সে ভাঙা ভাঙা আরবি বলত এবং তার মাতৃভাষা ছিল অনারবি। এমন একজন অনারবি ব্যক্তি কীভাবে এমন এক মহাবিশ্বখ্যাত অলৌকিক আরবি কিতাব রচনা করতে পারে, যার মাত্র একটি সুরার মতো রচনা করতে সমগ্র আরবের শীর্ষ কবি-সাহিত্যিকরা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল?
  2. নবী করীম (সা.)-এর উম্মী বা নিরক্ষর হওয়া: রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো বিদ্যালয়ে যাননি এবং জীবনে কখনো কোনো বই পড়েননি বা লেখেননি। আল্লাহ বলেন: “وَمَا كُنتَ تَتْلُو مِن قَبْلِهِ مِن كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ ۖ إِذًا لَّارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ” (আপনি এর পূর্বে কোনো কিতাব পাঠ করেননি এবং নিজ হাতে তা লেখেননি; তাহলে বাতিলপন্থীরা সন্দেহ করতে পারত – সুরা আনকাবুত: ৪৮)।
  3. বুহাইরা ও ওয়ারাকা ইবনে নাওফালের সাথে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ: প্রাচ্যবিদরা দাবি করে যে, কিশোর বয়সে সিরিয়া সফরের সময় পাদ্রী বুহাইরার সাথে সাক্ষাতে নবীজী জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। এটি চরম হাস্যকর; কারণ বুহাইরার সাথে মাত্র কয়েক মিনিটের সংক্ষিপ্ত মুসাফাহা ও কাফেলার মধ্যাহ্নভোজ হয়েছিল, যেখানে কোনো দ্বীনি তত্ত্ব শিক্ষার কোনো সুযোগই ছিল না। আর ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল নবুওয়াত লাভের মাত্র কয়েকদিন পরই ইনতিকাল করেছিলেন, অথচ কুরআন দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে নাযিল হয়েছে।
  4. পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবের বিকৃতি সংশোধন: বাইবেল ও তাওরাতে বহু নবী সম্পর্কে জঘন্য মিথ্যা অপবাদ (যেমন মদ্যপান, ব্যভিচার ও মূর্তিপূজার অপবাদ) দেওয়া হয়েছে। যদি রাসুল (সা.) তাদের কাছ থেকে শিখতেন, তবে কুরআনেও সেই বিকৃত বিষয়গুলো স্থান পেত। অথচ কুরআন সেগুলোকে পরিশুদ্ধ করে নবীদের নিষ্পাপ চরিত্রের সত্যায়ন করেছে।
  5. ভবিষ্যদ্বাণী ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক সত্যতা: ভ্রূণতত্ত্ব, সমুদ্রবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং রোমানদের বিজয়ের যে ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী কুরআনে রয়েছে, তা তৎকালীন কোনো মানুষের পক্ষে জানা কল্পনাও করা যেত না।

উপসংহার

সুতরাং সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, পবিত্র কুরআন কোনো মানবের সৃষ্টি নয়; এটি নিখিল বিশ্বের পালনকর্তা মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ চিরন্তন অলৌকিক মোজেজা।


٣. عرف الآية، وهل ترتيب الآيات توقيفى؟ بين بالأدلة-

[৩. الآية এর সংজ্ঞা দাও। আয়াতের বিন্যাস কি তাওকিফি? দলিলসহ বর্ণনা কর।]

১. আয়াত (الآية)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়

আভিধানিক অর্থ: নিদর্শন বা আলামত (العلامة), অলৌকিক মোজেজা (المعجزة), শিক্ষণীয় বিষয় (العبرة) এবং দল বা সমষ্টি (الجماعة)।

পারিভাষিক অর্থ: “هي طائفة ذات مطلع ومقطع مندرجة في سورة من سور القرآن الكريم، مفصولة عما قبلها وما بعدها بفاصلة” অর্থাৎ, “কুরআন মাজীদের কোনো সুরার অন্তর্ভুক্ত এমন একটি সুনির্দিষ্ট বাক্য বা বাক্যাংশ, যার সূচনা ও সমাপ্তি রয়েছে এবং যা পূর্বাপর বাক্য থেকে সুস্পষ্ট বিরতিচিহ্ন (ফাসিলাহ) দ্বারা পৃথক করা থাকে, তাকে আয়াত বলে।”

২. কুরআনের আয়াতের বিন্যাস কি তাওকিফী?

তাওকিফী (توقيفي)-এর অর্থ: যে বিষয়ের বিন্যাস মানুষের বুদ্ধি, ইজতিহাদ বা গবেষণার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং যা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুলের প্রত্যক্ষ ঐশী আদেশের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে, তাকে ‘তাওকিফী’ বলে।

সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত: জমহুর মুসলিম উম্মাহ, সাহাবায়ে কিরাম এবং মুফাসসিরগণের ঐকমত্য (ইজমা) অনুযায়ী—পবিত্র কুরআনের প্রত্যেকটি সুরার অন্তর্গত আয়াতসমূহের বিন্যাস ও ক্রম শতভাগ তাওকিফী (توقيفي بإجماع الأمة)। এতে কোনো সাহাবী বা সংকলকের বিন্দুমাত্র নিজস্ব মতামতের অবকাশ ছিল না।

৩. আয়াত বিন্যাস তাওকিফী হওয়ার পক্ষে অকাট্য দলিলসমূহ

  1. জিবরাঈল (আ.)-এর প্রত্যক্ষ নির্দেশ: হযরত উসমান ইবনে আবিল আস (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট বসা ছিলেন, এমন সময় নবীজী চোখ তুলে বললেন: “জিবরাঈল আমার কাছে এসেছিলেন এবং আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমি অমুক আয়াতটি অমুক সুরার অমুক স্থানে স্থাপন করি।” (মুসনাদে আহমদ)।
  2. হযরত উসমান (রা.)-এর অকাট্য সাক্ষ্য: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) যখন হযরত উসমান (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, বিধবাদের ভরণপোষণ সংক্রান্ত আয়াতটি নাসেখ (রহিতকারী) আয়াত হওয়া সত্ত্বেও কেন পূর্ববর্তী আয়াতের পাশাপাশি রাখা হলো? তখন হযরত উসমান (রা.) পরিষ্কার ভাষায় উত্তর দেন: “হে আমার ভাতিজা! আমি কুরআনের কোনো আয়াতের স্থান তার নির্ধারিত স্থান থেকে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করতে পারি না।” (সহীহ বুখারী)।
  3. রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায় সুনির্দিষ্ট তিলাওয়াত: রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রমযানে জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে বর্তমান বিন্যাস অনুযায়ী পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করতেন (দাওর করতেন) এবং নামাযে সাহাবীদের নিয়ে যে সমস্ত সুরা তিলাওয়াত করতেন, সাহাবীগণ সেই অবিকল ধারাবাহিকতা মুখস্থ করে রাখতেন। সুরা বাকারাহ, আলে ইমরান, সুরা কাহাফের প্রথম ও শেষ দশ আয়াতের ক্রম রাসুল (সা.)-এর মুখ থেকেই অবিকল শুনে সাহাবীগণ লিপিবদ্ধ করেছেন।

উপসংহার

পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহের বর্তমান বিন্যাস স্বয়ং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এবং লওহে মাহফুজের অবিকল অনুরূপ। এতে কোনো প্রকার পরিবর্তন বা পরিমার্জনের সুযোগ নেই।


٤. عرف السورة- وكم سورة في القرآن؟ اكتب خصائص السور المدنية-

[৪. السورة এর সংজ্ঞা দাও। কুরআনে সুরার সংখ্যা কত? মাদানি সুরার বৈশিষ্ট্য লেখ।]

১. সুরা (السورة)-এর পরিচয়

আভিধানিক অর্থ: প্রাচীর বা সীমানা প্রাচীর (سور المدينة), উচ্চ মর্যাদা (المنزلة الرفيعة), অথবা পূর্ণাঙ্গ অংশ। শহর রক্ষা করার প্রাচীরকে যেমন ‘সূর’ বলা হয়, তেমনি সুরাও তার ভেতরের আয়াতসমূহকে সুসংহতভাবে ঘিরে রাখে।

পারিভাষিক অর্থ: “هي طائفة مستقلة من آيات القرآن الكريم، ذات مطلع ومقطع، تشتمل على ثلاث آيات فأكثر، ولها اسم خاص بتوقيف” অর্থাৎ, “পবিত্র কুরআনের এমন একটি স্বতন্ত্র ও সুনির্দিষ্ট অধ্যায়, যার প্রারম্ভ ও সমাপ্তি রয়েছে, যা কমপক্ষে তিনটি আয়াত ধারণ করে এবং যার একটি সুনির্দিষ্ট তাওকিফী নাম রয়েছে, তাকে সুরা বলে।”

২. পবিত্র কুরআনে মোট সুরার সংখ্যা

সর্বসম্মত ও সুপ্রসিদ্ধ মতানুযায়ী পবিত্র কুরআনে মোট সুরার সংখ্যা ১১৪টি (مائة وأربع عشرة سورة)। এর মধ্যে দীর্ঘতম সুরা হলো ‘সুরা আল-বাকারাহ’ (২৮৬ আয়াত) এবং ক্ষুদ্রতম সুরা হলো ‘সুরা আল-কাউসার’ (৩ আয়াত)।

৩. মাদানী সুরার পরিচয় ও বৈশিষ্ট্যসমূহ

মাদানী সুরার সংজ্ঞা: বিশুদ্ধতম মত অনুযায়ী—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদিনায় ঐতিহাসিক হিজরতের পর নাযিলকৃত সমস্ত সুরা ও আয়াতকে ‘মাদানী’ বলা হয়, চাই তা মদিনার অভ্যন্তরে নাযিল হোক কিংবা মক্কার বিজয়ের পর মক্কায় বা বিদায় হজের সফরে নাযিল হোক। কুরআনে মাদানী সুরার সংখ্যা ২৮টি (মতান্তরে ২০ বা ২৯টি)।

মাদানী সুরার প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি:

  1. পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আইনের বর্ণনা: মাদানী সুরায় ইবাদতের পাশাপাশি বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার সম্পদ বন্টন (ফারায়িয), হদ ও কিসাসের দণ্ডবিধি এবং রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতির বিস্তারিত হুকুম-আহকাম বর্ণিত হয়েছে।
  2. জিহাদ ও যুদ্ধের অনুমতি ও বিধান: জিহাদের অনুমতি, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গণিমত) বন্টন, যুদ্ধবন্দীদের বিধান এবং কাফেরদের সাথে সন্ধি সংক্রান্ত আয়াত মাদানী সুরায় স্থান পেয়েছে (যেমন: সুরা বাকারাহ, আনফাল, তাওবা)।
  3. মুনাফিকদের চরিত্র উন্মোচন: মক্কায় কোনো মুনাফিক ছিল না, মদিনায় এসেই মুনাফিকের সৃষ্টি হয়। সুতরাং যে সকল সুরায় মুনাফিকদের কপটতা, ষড়যন্ত্র ও মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে মাদানী সুরা (যেমন: সুরা আল-মুনাফিকুন)।
  4. আহলে কিতাবদের (ইহুদি ও খ্রিষ্টান) সাথে বিতর্ক ও সংলাপ: মদিনায় ইহুদিদের আধিপত্য থাকায় মাদানী সুরায় আহলে কিতাবদের বিভ্রান্তি সংশোধন, তাদের বিকৃত আকিদার খণ্ডন এবং তাওহীদের প্রতি তাদের আহ্বান জানানো হয়েছে।
  5. সম্বোধনের বিশিষ্ট শৈলী: অধিকাংশ মাদানী সুরায় মুমিনদের সম্বোধন করতে “يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا” (হে ঈমানদারগণ!) ব্যবহার করা হয়েছে।
  6. দীর্ঘায়িত সুরা ও প্রামাণ্য বিধান: মাদানী সুরাগুলো সাধারণত দীর্ঘ, আইনভিত্তিক এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যামূলক শৈলীতে অবতীর্ণ হয়েছে।

٥. تحدث عن آخر ما نزل من القرآن ثم بين فوائد معرفة زمن النزول-

[৫. কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ সম্পর্কে আলোচনা কর এবং কুরআন অবতরণের সময় জানা থাকার উপকারিতা বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

পবিত্র কুরআন সুদীর্ঘ তেইশ বছর ধরে মানবজাতির বাস্তব প্রয়োজন ও ঘটনার প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে। কুরআনের কোন আয়াতটি সর্বশেষ অবতীর্ণ হয়েছিল, তা উলূমুল কুরআনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়।

১. কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত বা সুরা সম্পর্কিত আলোচনা

মুফাসসির ও সাহাবায়ে কিরামের বর্ণনায় সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত সম্পর্কে কয়েকটি অভিমত পাওয়া যায়:

  1. সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য মত (সুরা বাকারাহ: ২৮১): হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বিশুদ্ধ বর্ণনানুযায়ী কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত হলো:

    “وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ۖ ثُمَّ تُوَفَّىٰ كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ”

    “আর তোমরা সেই দিনকে ভয় কর, যে দিন তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে; অতঃপর প্রত্যেককে তার অর্জিত কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে এবং কারও প্রতি জুলুম করা হবে না।” (সুরা বাকারাহ: ২৮১)। এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মাত্র ৯ দিন (মতান্তরে ৭ বা ২১ দিন) জীবিত ছিলেন।
  2. সূদ সংক্রান্ত আয়াত (সুরা বাকারাহ: ২৭৮): হযরত উমর (রা.) বলেন, সূদ নিষিদ্ধের আয়াত (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا) অন্যতম সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত।
  3. কালালাহ সংক্রান্ত আয়াত (সুরা নিসা: ১৭৬): হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.)-এর মতে মিরাস সংক্রান্ত শেষ আয়াত “يَسْتَفْتُونَكَ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ فِي الْكَلَالَةِ”
  4. পূর্ণাঙ্গ সুরা হিসেবে শেষ সুরা: পূর্ণাঙ্গ সুরা হিসেবে সর্বশেষ অবতীর্ণ হয়েছে সুরা আন-নাসর (إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ)।
  5. দ্বীনের পূর্ণতার আয়াত (সুরা মায়েদা: ৩): আরাফাতের ময়দানে বিদায় হজে নাযিল হওয়া আয়াত “الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ” আহকাম ও দ্বীনের বিধিবিধান পূর্ণ হওয়ার দিক থেকে শেষ; কিন্তু সার্বিক কুরআন হিসেবে সুরা বাকারার ২৮১ নং আয়াতই সর্বশেষ।

২. কুরআন অবতীর্ণের সময়কাল (মক্কী ও মাদানী) জানার উপকারিতা

  1. নাসেখ ও মানসুখ (রহিতকারী ও রহিত) বিধান নির্ণয়: দুটি পরস্পরবিরোধী বিধানের ক্ষেত্রে যদি জানা যায় কোনটি পূর্বে অবতীর্ণ এবং কোনটি পরে, তবে নিশ্চিতভাবে পরবর্তী অবতীর্ণ আয়াতটিকে নাসেখ হিসেবে গ্রহণ করা যায়।
  2. ইসলামী শরীয়তের ক্রমবিকাশ অনুধাবন (التدرج في التشريع): আল্লাহ কীভাবে ধাপে ধাপে মদ্যপান নিষিদ্ধ করেছেন এবং প্রাথমিক যুগে আকিদা গঠনের পর কীভাবে কঠোর বিধান আরোপ করেছেন—তার প্রজ্ঞাময় রহস্য জানা যায়।
  3. সঠিক তাফসীর ও শানে নুযুল অনুধাবন: আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক সময়কাল জানলে আয়াতের প্রকৃত উদ্দেশ্য নির্ভুলভাবে অনুধাবন করা যায়।
  4. দাওয়াতী পদ্ধতির দিকনির্দেশনা: ইসলাম প্রচারকদের জন্য মক্কী ও মাদানী সময়কালের জ্ঞান এক অনন্য কৌশল শিক্ষা দেয় যে, অমুসলিমদের মাঝে প্রথমে তাওহীদ ও আখেরাতের দাওয়াত দিতে হবে, তারপর আহকাম প্রয়োগ করতে হবে।
  5. কুরআনের অবিকৃত সুরক্ষার অকাট্য প্রমাণ: প্রতিটি আয়াতের সময়কাল সাহাবায়ে কিরামের মুখস্থ থাকার বিষয়টি প্রমাণ করে যে, কুরআন সংরক্ষণ কতটা সূক্ষ্ম ও নিখুঁত ছিল।

٦. ما خلفية جمع القرآن في عهد أبى بكر وعثمان رضى الله عنهما؟ وما الفرق بين الجمعين؟ بين مفصلا-

[৬. আবু বকর (রা) ও উসমান (রা) এর যুগে কুরআন একত্রীকরণের প্রেক্ষাপট কী ছিল? উভয় কাজের পার্থক্য কী? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় কুরআন সম্পূর্ণ লিপিবদ্ধ ছিল কিন্তু তা একটি বাঁধাইকৃত কিতাব আকারে একত্রিত ছিল না। খেলাফতে রাশেদার যুগে মুসলিম উম্মাহর চরম প্রয়োজনের মুহূর্তে হযরত আবু বকর (রা.) এবং পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা.) যে ঐতিহাসিক কুরআন সংকলনের পদক্ষেপ নেন, তা উম্মাহকে চিরন্তন বিভক্তির হাত থেকে রক্ষা করেছে।

১. হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর যুগে সংকলনের প্রেক্ষাপট

কারণ: রাসুল (সা.)-এর ওফাতের পর ভণ্ড নবী মুসাইলামা কাযযাবের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী ‘ইয়ামামার যুদ্ধ’ (১২ হি.) সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে প্রায় সাতশত (৭০) শীর্ষ হাফিজে সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন।
উমর (রা.)-এর দূরদর্শিতা: হযরত উমর (রা.) শঙ্কিত হয়ে খলিফা আবু বকর (রা.)-কে বললেন, “যদি এভাবে বিভিন্ন যুদ্ধে হাফিজগণ শহীদ হতে থাকেন, তবে কুরআনের অনেক অংশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতএব আপনি কুরআন একত্রিত করার নির্দেশ দিন।”
সংকলন প্রক্রিয়া: আবু বকর (রা.) প্রধান অহির লেখক হযরত যায়দ ইবনে সাবিত (রা.)-কে প্রধান করে সংকলন বোর্ড গঠন করেন। যায়দ (রা.) কঠোর যাচাই-বাছাই ও দুজন চাক্ষুষ সাক্ষীর উপস্থিতিতে লিখিত পাণ্ডুলিপি ও হাফিজদের স্মৃতি মিলিয়ে সর্বপ্রথম একটি মূল বাঁধাইকৃত খণ্ডে পূর্ণ কুরআন সংকলন করেন, যাকে ‘মুসহাফ’ বলা হয়। এটি আবু বকর (রা.), অতঃপর উমর (রা.) এবং পরে উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা.)-এর হেফাজতে ছিল।

২. হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে সংকলনের প্রেক্ষাপট

কারণ: ২৫ হিজরিতে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান অভিযানে সিরিয়া ও ইরাকের সৈন্যরা একসাথে জিহাদে অংশ নেয়। সেখানে তারা লক্ষ্য করে যে, বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন উপভাষায় (ক্বিরাআতে) কুরআন পড়ছে এবং পরস্পরের ক্বিরাআতকে ভুল বলে কাফের আখ্যা দিচ্ছে।
হুযায়ফা (রা.)-এর ফরিয়াদ: সাহাবী হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) মদিনায় ছুটে এসে খলিফা উসমান (রা.)-কে বললেন: “হে আমিরুল মুমিনীন! ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মতো কিতাব নিয়ে মতভেদ করার পূর্বেই আপনি এই উম্মতকে রক্ষা করুন!”
উসমানের পদক্ষেপ: হযরত উসমান (রা.) হযরত হাফসা (রা.)-এর নিকট রক্ষিত মূল মুসহাফটি আনয়ন করেন এবং যায়দ ইবনে সাবিত, আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের, সাঈদ ইবনুল আস ও আব্দুর রহমান ইবনুল হারিস (রা.)-এর সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে কুরাইশদের কেন্দ্রীয় প্রমিত উচ্চারণে হুবহু ৭টি কপি তৈরি করান। এরপর সেই কপিগুলো প্রধান প্রধান প্রদেশে (মক্কা, কুফা, বসরা, শাম, ইয়েমেন, বাহরাইন ও মদিনা) পাঠিয়ে দেন এবং অবশিষ্ট সকল ব্যক্তিগত পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়ে উম্মাহকে এক মুসহাফের ওপর ঐক্যবদ্ধ করেন। এজন্য তাঁকে ‘জামি’উল কুরআন’ (কুরআন একত্রকারী) বলা হয়।

৩. উভয় সংকলনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যসমূহ

তুলনার বিষয় আবু বকর (রা.)-এর সংকলন উসমান (রা.)-এর সংকলন
মূল উদ্দেশ্য হাফিজদের শাহাদাতের পর কুরআন যেন বিলুপ্ত না হয়, তা সংরক্ষণ করা। ক্বিরাআতের মতপার্থক্য দূর করে উম্মাহকে এক অভিন্ন ক্বিরাআত ও হরফে ঐক্যবদ্ধ করা।
পদ্ধতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লিখিত উপকরণ থেকে একটি একক বাঁধাইকৃত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা। মূল পাণ্ডুলিপি থেকে প্রমিত রসমুল খত অনুযায়ী একাধিক অনুলিপি (কপি) প্রস্তুত করা।
কপির সংখ্যা কেবলমাত্র একটি মূল মাস্টার কপি (মুসহাফ) তৈরি করা হয়েছিল। ৭টি (মতান্তরে ৪ বা ৫টি) পূর্ণাঙ্গ কপি তৈরি করে বিভিন্ন প্রদেশে পাঠানো হয়।
উপভাষা (আহরুফ) সাতটি উপভাষার (আহরাফে সাব’আহ) অবকাশ রেখে সংকলিত হয়েছিল। কুরাইশদের কেন্দ্রীয় প্রমিত উপভাষাকে মূলভিত্তি করে সার্বজনীন হরফে সংকলিত হয়।

উপসংহার

হযরত আবু বকর (রা.) কুরআনকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন, আর হযরত উসমান (রা.) কুরআনকে বিকৃতি ও গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। উভয়ের অবদানই মুসলিম উম্মাহর ওপর অপরিশোধ্য খোদায়ী নিয়ামত।


٧. عرف التفسير لغة واصطلاحا ثم بين أهمية التفسير وشرفه وآداب المفسر موضحا-

[৭. التفسير এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা দাও। তাফসির এর গুরুত্ব, মর্যাদা ও মুফাসসির এর আদাব বিশদভাবে বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

পবিত্র কুরআন মানবজাতির হেদায়াতগ্রন্থ। কিন্তু এই মহিমান্বিত কিতাবের নিগূঢ় রহস্য, আদেশ-নিষেধ ও তাৎপর্য সঠিকভাবে অনুধাবন করার চাবিকাঠি হলো ‘ইলমুত তাফসীর’। এটি ইসলামী জ্ঞানমণ্ডলীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ শাখা।

১. তাফসীরের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা

আভিধানিক অর্থ: ‘তাফসীর’ (التفسير) শব্দটি বাবে তাফঈল-এর মাসদার, যার মূল ধাতু ف-س-ر (ফাসর)। এর আভিধানিক অর্থ হলো উন্মোচন করা (الكشف), স্পষ্ট করা (الإيضاح), ব্যাখ্যা করা বা আবৃত বস্তুর আবরণ খুলে দৃশ্যমান করা।

পারিভাষিক অর্থ: ইমাম যারকাশী (রহ.)-এর মতে— “علم يُفهم به كتاب الله المنزل على نبيه محمد صلى الله عليه وسلم، وبيان معانيه، واستخراج أحكامه وحكمه” অর্থাৎ, “যে শাস্ত্রের সাহায্যে নবী করীম (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ আল্লাহর কিতাবের সঠিক মর্ম অনুধাবন করা যায়, তার অন্তর্নিহিত অর্থ স্পষ্ট হয় এবং তার থেকে শারঈ আহকাম ও হিকমতসমূহ উদ্ঘাটন করা যায়, তাকে ইলমুত তাফসীর বলে।”

২. ইলমুত তাফসীরের গুরুত্ব ও সুউচ্চ মর্যাদা

  1. জ্ঞানের মর্যাদা বিষয়ের মর্যাদার ওপর নির্ভরশীল (شرف العلم بشرف معلومه): যেকোনো শাস্ত্রের মর্যাদা নির্ভর করে সে শাস্ত্রের আলোচ্য বিষয়ের ওপর। যেহেতু তাফসীর শাস্ত্রের আলোচ্য বিষয় স্বয়ং আল্লাহ তাআলার কালাম, তাই সমস্ত পার্থিব ও দ্বীনি বিজ্ঞানের মধ্যে ইলমুত তাফসীর হলো শ্রেষ্ঠতম ও সর্বাপেক্ষা মর্যাদাপূর্ণ জ্ঞান।
  2. কুরআনের দাবি পূরণ: আল্লাহ তাআলা কুরআন অবতীর্ণ করেছেন গভীর অনুধাবনের জন্য: “كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ” (এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীর গবেষণা করে – সুরা সাদ: ২৯)। আর তাফসীর ছাড়া তাদাব্বুর অসম্ভব।
  3. শরীয়তের বিধানাবলির মূল উৎস: সালাত, যাকাত, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা তাফসীরের সাহায্যেই সাব্যস্ত হয়।

৩. একজন যোগ্য মুফাসসিরের আবশ্যকীয় আদাব ও গুণাবলি

পবিত্র কুরআনের মতো ঐশী কিতাবের তাফসীর করার জন্য মুফাসসিরের মধ্যে নিম্নোক্ত শর্ত ও আদাব থাকা অপরিহার্য:

  • বিশুদ্ধ আকিদা ও ইখলাস: বিদআত ও বিভ্রান্ত আকিদা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা এবং কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাফসীর করা।
  • আরবি ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্য: আরবি ব্যাকরণ (নাহু), রূপতত্ত্ব (সরফ), ব্যুৎপত্তি (ইশতিকাক) এবং বালাগাত (মা’আনী, বায়ান, বাদী’) শাস্ত্রে পূর্ণ ব্যুৎপত্তি থাকা।
  • উলূমুল কুরআনে পূর্ণ দখল: আসবাবুন নুযুল (শানে নুযুল), মাক্কী-মাদানী, নাসেখ-মানসুখ, মুহকাম-মুতাশাবিহ ইত্যাদি জানা।
  • হাদিস ও আসার সম্পর্কে গভীর জ্ঞান: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস এবং সাহাবা ও তাবেঈদের ব্যাখ্যার পূর্ণ জ্ঞান রাখা। নিজস্ব মনগড়া মতামত (তাফসীর বির রায় আল-মযমুম) থেকে বেঁচে থাকা।
  • ফিকহ ও উসূলে ফিকহের জ্ঞান: আহকাম সংক্রান্ত আয়াত থেকে মাসআলা উদ্ঘাটনের যোগ্যতা রাখা।
  • তাকওয়া ও আমল: খোদাভীতি ও চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করা, কারণ তাকওয়া হৃদয়ে ফুরকান বা নূর সৃষ্টি করে।

উপসংহার

ইলমুত তাফসীর হলো কুরআন সাগরের তলদেশ থেকে রত্নরাজী আহরণের বিদ্যা। একজন মুফাসসির এই সুমহান দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে উম্মাহকে পথপ্রদর্শন করেন।


٨. عرف علم تجويد القرآن مع بيان أهميته ثم تحدث عن المد وأقسامه مفصلا-

[৮. علم تجويد القرآن এর সংজ্ঞা ও গুরুত্ব বর্ণনা কর। المد ও তার প্রকার বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

কুরআন মাজীদকে নির্ভুল ও শ্রুতিমধুরভাবে তিলাওয়াত করার খোদায়ী বিধানই হলো ‘ইলমুত তাজবীদ’। মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন: “وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا” (এবং আপনি ধীরস্থির ও বিশুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত করুন – সুরা মুযযাম্মিল: ৪)।

১. ইলমুত তাজবীদের সংজ্ঞা ও গুরুত্ব

আভিধানিক অর্থ: ‘তাজবীদ’ (تجويد) শব্দের অর্থ সুন্দর করা, অলংকৃত করা বা উত্তমরূপে সম্পন্ন করা (التحسين والتحسين)।

পারিভাষিক অর্থ: “هو إعطاء كل حرف حقه ومستحقه من مخارجه وصفاته من غير تكلف ولا تعسف” অর্থাৎ, “আরবি প্রতিটি হরফকে তার নির্দিষ্ট মাখরাজ (উচ্চারণস্থল) থেকে সমস্ত সিফাতসহ (স্থায়ী ও অস্থায়ী গুণাবলি) বিন্দুমাত্র কৃত্রিমতা ছাড়াই বিশুদ্ধভাবে আদায় করাকে তাজবীদ বলে।”

গুরুত্ব: তাজবীদের তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করা ফরযে কেফায়া, কিন্তু কুরআন পাঠ করার সময় তাজবীদের নিয়ম রক্ষা করে তিলাওয়াত করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরযে আইন। ইমাম ইবনুল জাযারী (রহ.) বলেন: “والأخذ بالتجويد حتم لازم * من لم يجود القرآن آثم” (তাজবীদ অনুযায়ী কুরআন তিলাওয়াত করা আবশ্যক, যে তাজবীদ ছাড়া কুরআন পড়বে সে গুনাহগার হবে)। কারণ তাজবীদ ছাড়া পড়লে হরফের অর্থ বিকৃত হয়ে নামায নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

২. মাদ্দ (المد)-এর পরিচয় ও হরফসমূহ

আভিধানিক অর্থ: দীর্ঘ করা, বাড়ানো বা প্রলম্বিত করা (الزيادة والمط)।

পারিভাষিক অর্থ: মাদ্দের হরফের সাহায্যে ধ্বনিকে দীর্ঘ করে পাঠ করাকে মাদ্দ বলে।

মাদ্দের হরফ ৩টি:

  1. যবরের পর খালি আলিফ (ا)। যেমন: بَا।
  2. পেশের পর জযমযুক্ত ওয়াও (وْ)। যেমন: بُو।
  3. যেরের পর জযমযুক্ত ইয়া (يْ)। যেমন: بِي।

এই তিনটি হরফকে সংক্ষেপে ‘نُوحِيهَا’ শব্দে একত্রিত করা হয়েছে।

৩. মাদ্দের প্রকারভেদ

মাদ্দ প্রধানত দুই প্রকার: (১) মাদ্দে আসলী (المد الأصلي বা المد الطبيعي), এবং (২) মাদ্দে ফার’ঈ (المد الفرعي)।

(ক) মাদ্দে আসলী বা তাবাঈ (১ আলিফ পরিমাণ):

যে মাদ্দ কোনো কারণ (হামযা বা সুকুন) ছাড়াই হরফের মূল গঠনের দাবিতে এক আলিফ পরিমাণ প্রলম্বিত করে পড়তে হয়। যেমন: قَالَ، يَقُولُ، قِيلَ।

(খ) মাদ্দে ফার’ঈ (শাখা মাদ্দ):

মাদ্দের হরফের পর হামযা (ء) অথবা সুকুন/তাশদীদ ( ْ / ّ ) আসার কারণে যা অতিরিক্ত দীর্ঘ করে পড়তে হয়। এটি প্রধানত ৫ প্রকার:

  1. মাদ্দে মুত্তাসিল (المد المتصل): একই শব্দের মধ্যে মাদ্দের হরফের পরপরই হামযা আসলে। একে ৪ বা ৫ আলিফ টানতে হয়। যেমন: جَاءَ، السَّمَاءِ।
  2. মাদ্দে মুনফাসিল (المد المنفصل): প্রথম শব্দের শেষে মাদ্দের হরফ এবং পরবর্তী শব্দের শুরুতে হামযা আসলে। এটি ৩ বা ৪ আলিফ টানতে হয়। যেমন: إِنَّا أَنزَلْنَاهُ، يَا أَيُّهَا।
  3. মাদ্দে লাযিম (المد اللازم): মাদ্দের হরফের পর আসল সুকুন বা তাশদীদ আসলে। এটি সর্বাবস্থায় দীর্ঘ ৬ হরকত বা ৩ আলিফ টেনে পড়া আবশ্যক (লাযিম)। যেমন: الحَاقَّةُ، الضَّالِّينَ، الم।
  4. মাদ্দে আ’রিদ লিস্ সুকুন (المد العارض للسكون): মাদ্দের হরফের পরের অক্ষরে ওয়াকফ করার কারণে অস্থায়ী সুকুন তৈরি হলে। এটি ১, ২ বা ৩ আলিফ টানা যায়। যেমন: الرَّحِيمْ، تَعْلَمُونَ।
  5. মাদ্দে লীন (مد اللين): যবরের পর জযমযুক্ত ওয়াও বা ইয়া আসার পর ওয়াকফের কারণে পরের অক্ষর সাকিন হলে। যেমন: قُرَيْشٍ، خَوْفٍ।

খ বিভাগ (القسم الثاني) – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন সমাধান

٩. ما الفرق بين الحديث النبوى والحديث القدسى-

[৯. হাদিস নাবভি ও হাদিস কুদসির মধ্যে পার্থক্য কী?]

হাদিস কুদসী (الحديث القدسي): যার অর্থ ও ভাব সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুল (সা.)-এর অন্তরে অবতীর্ণ হয়েছে, কিন্তু ভাষা ও শব্দের রূপদান করেছেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)। নবীজী এতে বলেন: “আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন…”
হাদিস নাববী (الحديث النبوي): যার ভাব ও ভাষা উভয়টিই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব কথা, কাজ বা অনুমোদন।
প্রধান পার্থক্যসমূহ:

  1. হাদিস কুদসীর শব্দ আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়; আর হাদিস নাববীর শব্দ সরাসরি নবীর দিকে সম্পৃক্ত থাকে।
  2. হাদিস কুদসীর মূল বিষয়বস্তু সাধারণত আল্লাহর মহত্ত্ব, দয়া, আখলাক ও আধ্যাত্মিক নসীহত; অপরদিকে হাদিস নাববীতে শরীয়তের হালাল-হারাম ও দৈনন্দিন আহকামের বিবরণ বেশি থাকে।
  3. উভয় প্রকার হাদিসই অহি গায়রে মাতলূ এবং কোনোটিই নামাযে তিলাওয়াত করা যায় না।

١٠. بين بعض فوائد نزول القرآن بالتدريج-

[১০. ধীরে ধীরে কুরআন নাযিল হওয়ার কতিপয় উপকারিতা বর্ণনা কর।]

পবিত্র কুরআন একবারে অবতীর্ণ না হয়ে দীর্ঘ ২৩ বছরে ধীরে ধীরে নাযিল হওয়ার প্রধান উপকারিতাসমূহ:

  1. নবীর হৃদয়কে সুদৃঢ় করা (تثبيت فؤاد النبي): কাফেরদের নির্যাতন ও সংকটের মুহূর্তে বারংবার জিবরাঈল (আ.)-এর আগমনে রাসুল (সা.) সান্ত্বনা ও শক্তি লাভ করতেন (সুরা ফুরকান: ৩২)।
  2. সহজে মুখস্থ ও হৃদয়ঙ্গমকরণ: তৎকালীন উম্মী আরবদের জন্য অল্প অল্প করে আয়াত নাযিল হওয়ার কারণে তা সহজে মুখস্থ ও অনুধাবন করা সম্ভব হয়েছিল।
  3. বিধানের পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন (التدرج في التشريع): জাহিলি সমাজে হঠাৎ কঠিন আইন চাপিয়ে না দিয়ে প্রথমে আকিদা সংস্কার করা হয়, এরপর পর্যায়ক্রমে নামায, রোজা, মদ্যপান নিষিদ্ধ ও পর্দা ফরজ করা হয়।
  4. ঘটনা ও প্রশ্নের তাৎক্ষণিক সমাধান: সাহাবী ও কাফেরদের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক ঐশী সমাধান দিয়ে সত্যের বিজয় নিশ্চিত করা হতো।

١١. ما هى طرق معرفة الناسخ والمنسوخ؟ فصل-

[১১. الناسخ والمنسوخ বোঝার উপায় কী? সবিস্তার আলোচনা কর।]

নাসেখ (রহিতকারী) ও মানসুখ (রহিত) কেবল অনুমানের ওপর নির্ভর করে জানা যায় না। এটি জানার অকাট্য উপায়সমূহ:

  1. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুস্পষ্ট ঘোষণা (النقل الصريح عن النبي): যেমন রাসুল (সা.) বলেছেন: “আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা কবর জিয়ারত কর।”
  2. সাহাবায়ে কিরামের অকাট্য সাক্ষ্য (إخبار الصحابي الجليل): কোনো সাহাবী যদি স্পষ্ট বলেন যে, অমুক আয়াতটি পূর্বে নাযিল হয়েছিল এবং পরবর্তীতে অমুক আয়াত এসে তার বিধান রহিত করেছে।
  3. ঐতিহাসিক অবতীর্ণের কালক্রম জানা (معرفة التاريخ): অকাট্য সূত্রে যদি জানা যায় দুটি বিধানের মধ্যে একটি মক্কী যুগে এবং অপরটি মদিনার শেষভাগে অবতীর্ণ হয়েছে, তবে পরবর্তী বিধানটি পূর্বের বিধানকে রহিত করবে।
  4. ইজমায়ে উম্মত (الإجماع): কোনো আয়াতের বিধান রহিত হওয়ার ওপর উম্মতের ফকীহগণের সর্বসম্মত ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া।

١٢. ما القدر المعجز من القرآن؟ اكتب موضحا-

[১২. কুরআনের কতটুকু অংশ ই’জাযের অন্তর্ভুক্ত? সবিস্তারে লেখ।]

ই’জাযের অর্থ: মানুষকে অপারগ ও অক্ষম করে দেওয়া অলৌকিক ক্ষমতা।
আলেমগণের অভিমত: কুরআনের কতটুকু অংশ চ্যালেঞ্জ ও মোজেজার অন্তর্ভুক্ত, এ ব্যাপারে প্রধান মতসমূহ নিম্নরূপ:

  • জমহুর মুহাদ্দিস ও মুতাকাল্লিমীনের মত: কুরআনের ক্ষুদ্রতম একটি সুরা (যেমন সুরা আল-কাউসার – ৩ আয়াত) অথবা ক্ষুদ্রতম সুরার সমপরিমাণ অংশই মানুষকে অক্ষমকারী পরিপূর্ণ মোজেজা। কারণ আল্লাহ চ্যালেঞ্জ করেছেন: “فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ” (তোমরা এর মতো একটি সুরা নিয়ে আস – সুরা বাকারাহ: ২৩)।
  • ইমাম বাকেল্লানীর মত: যেকোনো পূর্ণাঙ্গ সুরা অথবা সুরার অংশবিশেষ যা অর্থ ও অলংকারের দিক থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য প্রকাশ করে, তাই ই’জাযের আওতাভুক্ত।
  • সার্বিক সিদ্ধান্ত: কেবল কুরআনের অলৌকিক ছন্দ ও শৈলীই নয়; কুরআনের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য এবং প্রতিটি বিষয়বস্তুই মানব ক্ষমতার সম্পূর্ণ অতীত ও ঐশী মোজেজা।

١٣. ما اللحن وما اقسامه؟ بين-

[১৩. اللحن কী এর প্রকারগুলো কী কী? বর্ণনা কর।]

লাহন (اللحن)-এর সংজ্ঞা: কুরআন তিলাওয়াতে তাজবীদের নিয়ম লঙ্ঘন করে ভুল উচ্চারণ করা বা শব্দের বিশুদ্ধতা নষ্ট করাকে ‘লাহন’ বলে।
লাহনের প্রকারভেদ: লাহন প্রধানত দুই প্রকার:

  1. লাহনে জালী (اللحن الجلي – প্রকাশ্য মারাত্মক ভুল): যে ভুলে আরবি ভাষার ব্যাকরণগত হরকত বা হরফ পরিবর্তন হয়ে যায়। যেমন: পেশের জায়গায় যের পড়া (أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ-এর স্থলে أَنْعَمْتُ পড়া), কিংবা ‘তা’ (ت)-এর জায়গায় ‘ত্বা’ (ط) উচ্চারণ করা। এটি করা হারাম ও কবিরা গুনাহ এবং এর দ্বারা নামায ফাসেদ হয়ে যায়।
  2. লাহনে খাফী (اللحن الخفي – সূক্ষ্ম অপ্রকাশ্য ভুল): সাধারণ মানুষ যা ধরতে পারে না, কেবল অভিজ্ঞ কারীগণ বুঝতে পারেন। যেমন: গুন্নাহ না করা, ইখফা বা ইক্বলাব সঠিকভাবে আদায় না করা, কিংবা মাদ্দের পরিমাণের চেয়ে কম বা বেশি টানা। এটি করা মাকরূহ, তবে এতে নামায ভঙ্গ হয় না।

١٤. ما الترقيق والتفخيم؟ بين بالأمثلة-

[১৪. الترقيق ও التفخيم কী? উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]

তাফখীম (التفخيم – মোটা করে পড়া): হরফ উচ্চারণের সময় মুখমণ্ডল পূর্ণ করে গম্ভীর ও ভারী আওয়াজে উচ্চারণ করাকে তাফখীম বলে। একে ‘ইস্তিলা’ (استعلاء)-এর হরফও বলা হয়। হরফ ৭টি: خ، ص، ض، غ، ط، ق، ظ (সংক্ষেপে خُصَّ ضَغْطٍ قِظْ)। যেমন: خَالِدِينَ، الصَّابِرِينَ।
তারক্বীক্ব (الترقيق – পাতলা ও চিকন করে পড়া): হরফ উচ্চারণের সময় জিহ্বাকে সমতল রেখে পাতলা ও চিকন আওয়াজে উচ্চারণ করাকে তারক্বীক্ব বলে। তাফখীমের ৭টি হরফ ছাড়া বাকি সমস্ত হরফ মূলগতভাবে তারক্বীক্ব। যেমন: بِسْمِ اللهِ।
লাম ও রা-এর বিশেষ বিধান: ‘লাম’ (ل) ও ‘রা’ (ر) কখনো মোটা আবার কখনো পাতলা হয়। যেমন: রা-এর ওপর যবর বা পেশ থাকলে মোটা (رَحْمَةٌ), যের থাকলে পাতলা (رِزْقًا) হয়।


١٥. اكتب خمس علامات للوقف مع شرحها-

[১৫. ব্যাখ্যাসহ ওয়াকফের পাঁচটি আলামত লেখ।]

কুরআন তিলাওয়াতকালে অর্থের বিশুদ্ধতা রক্ষায় বিরতি নেওয়ার জন্য মুসহাফে নির্দিষ্ট আলামত ব্যবহৃত হয়। পাঁচটি প্রধান আলামত নিম্নরূপ:

  1. (مـ) ওয়াকফে লাযিম (الوقف اللازم): এখানে থামা আবশ্যক (ওয়াজিব)। না থামলে অর্থের মারাত্মক বিকৃতি ঘটে। যেমন: إِنَّمَا يَسْتَجِيبُ الَّذِينَ يَسْمَعُونَ ۘ
  2. (ط) ওয়াকফে মুতলাক (الوقف المطلق): এখানে থামা উত্তম ও প্রশংসনীয়। কারণ এখানে বাক্যের ভাবার্থ পূর্ণ হয়েছে।
  3. (ج) ওয়াকফে জায়েয (الوقف الجائز): এখানে থামা এবং মিলিয়ে পড়া উভয়টিই সমানভাবে জায়েয।
  4. (ز) ওয়াকফে মুজাওয়ায (الوقف المجوز): এখানে না থেমে মিলিয়ে পড়া উত্তম, তবে থামাও জায়েয।
  5. (لا) ওয়াকফে মামনূ’ (لا تقف): এখানে থামা নিষেধ। কারণ বাক্য এখনো অসম্পূর্ণ। তবে আয়াতের শেষ প্রান্তে (فاصلة) হলে রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর ভিত্তিতে থামা জায়েয।

١٦. اكتب من حفظك سورة مما يلى: (ألف) سورة القارعة؛ (ب) سورة العاديات؛ (ج) سورة الضحى-

[১৬. মুখস্থ সুরা লিখন (এখানে শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে তিনটি সুরাই অর্থসহ পূর্ণাঙ্গরূপে দেওয়া হলো):]

(ألف) سورة القارعة (সুরা আল-ক্বারি’আহ – মক্কী, আয়াত ১১)

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
١. الْقَارِعَةُ
٢. مَا الْقَارِعَةُ
٣. وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْقَارِعَةُ
٤. يَوْمَ يَكُونُ النَّاسُ كَالْفَرَاشِ الْمَبْثُوثِ
٥. وَتَكُونُ الْجِبَالُ كَالْعِهْنِ الْمَنفُوشِ
٦. فَأَمَّا مَن ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ
٧. فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَّاضِيَةٍ
٨. وَأَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ
٩. فَأُمُّهُ هَاوِيَةٌ
١٠. وَمَا أَدْرَاكَ مَا هِيَهْ
١١. نَارٌ حَامِيَةٌ

সারসংক্ষেপ তরজমা: করাঘাতকারী মহাবিপদ (কিয়ামত)! কী সেই করাঘাতকারী বিপদ? আপনি কি জানেন তা কী? সেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো এবং পর্বতমালা হবে ধুনিত রঙিন পশমের মতো। যার পাল্লা ভারী হবে সে সন্তোষজনক জীবনে থাকবে, আর যার পাল্লা হালকা হবে তার আশ্রয় হবে হাবিয়া। আপনি কি জানেন তা কী? তা প্রজ্বলিত অগ্নি!

(ب) سورة العاديات (সুরা আল-আদিয়াত – মক্কী, আয়াত ১১)

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
١. وَالْعَادِيَاتِ ضَبْحًا
٢. فَالْمُورِيَاتِ قَدْحًا
٣. فَالْمُغِيرَاتِ صُبْحًا
٤. فَأَثَرْنَ بِهِ نَقْعًا
٥. فَوَسَطْنَ بِهِ جَمْعًا
٦. إِنَّ الْإِنسَانَ لِرَبِّهِ لَكَنُودٌ
٧. وَإِنَّهُ عَلَىٰ ذَٰلِكَ لَشَهِيدٌ
٨. وَإِنَّهُ لِحُبِّ الْخَيْرِ لَشَدِيدٌ
٩. أَفَلَا يَعْلَمُ إِذَا بُعْثِرَ مَا فِي الْقُبُورِ
١٠. وَحُصِّلَ مَا فِي الصُّدُورِ
١١. إِنَّ رَبَّهُم بِهِمْ يَوْمَئِذٍ لَّخَبِيرٌ

(ج) سورة الضحى (সুরা আদ-দুহা – মক্কী, আয়াত ১১)

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
١. وَالضُّحَىٰ
٢. وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَىٰ
٣. مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَىٰ
٤. وَلَلْآخِرَةُ خَيْرٌ لَّكَ مِنَ الْأُولَىٰ
٥. وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَىٰ
٦. أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَىٰ
٧. وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَىٰ
٨. وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَىٰ
٩. فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ
١٠. وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ
١১. وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. অহি কাকে বলে?

আল্লাহ তাআলা তাঁর কোনো নবীর ওপর মানবজাতির হেদায়াত ও শরীয়তের হুকুম প্রচারের জন্য মাধ্যমসহ বা মাধ্যম ছাড়া যে বাণী অবতীর্ণ করেন তাকে অহি বলে।

২. পবিত্র কুরআনের আয়াত বিন্যাস কি তাওকিফী?

হ্যাঁ, উম্মতের সর্বসম্মত ঐকমত্য অনুযায়ী কুরআনের প্রতিটি সুরার ভেতর আয়াতসমূহের বিন্যাস ও ক্রম শতভাগ তাওকিফী, যা স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) ও জিবরাঈল (আ.)-এর নির্দেশে নির্ধারিত।

৩. মাদানী সুরার প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?

মাদানী সুরায় পারিবারিক, সামাজিক, বিচার ও রাষ্ট্রীয় আইনকানুন, জিহাদের বিধান, মুনাফিকদের চরিত্র উন্মোচন এবং আহলে কিতাবদের সাথে সংলাপ স্থান পেয়েছে।

৪. আবু বকর (রা.) ও উসমান (রা.)-এর কুরআন সংকলনের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?

আবু বকর (রা.) হাফিজদের শাহাদাতের পর কুরআন বিলুপ্তির আশঙ্কায় একটি একক বাঁধাইকৃত মুসহাফ তৈরি করেছিলেন, আর উসমান (রা.) ক্বিরাআতের বিভেদ দূর করতে প্রমিত কুরাইশ উপভাষায় একাধিক অনুলিপি তৈরি করে উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।

৫. কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত কোনটি?

সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী সুরা বাকারার ২৮১ নং আয়াত (وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ) কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত।

৬. তাজবীদের সাথে কুরআন পাঠ করা কেন জরুরি?

তাজবীদ অনুযায়ী সঠিক মাখরাজ ও সিফাত বজায় রেখে কুরআন তিলাওয়াত করা ফরযে আইন, কারণ তাজবীদ ছাড়া পড়লে হরফের উচ্চারণ বিকৃত হয়ে অর্থের পরিবর্তন ঘটে এবং নামায নষ্ট হতে পারে।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *