اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۳
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৩]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
الدعوة والدعاة في العصر الحديث
[আদ-দা’ওয়াতু ওয়াদ-দু’আতু ফিল আসরিল হাদীস]
বিষয় কোড: ২০৩৮০৪ | পরীক্ষা কোড: ২০৪ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৩২
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
مجموعة (أ) – ক-বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)
١- بين دور الدعاة الإسلامية في نشر الإسلام في بنغلاديش-
[১. বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে ইসলামি দায়িগণের ভূমিকা বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। এ ভূখণ্ডে ইসলামের আগমন ও বিস্তৃতি কোনো সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে ঘটেনি; বরং আরব ও পারস্য থেকে আগত একনিষ্ঠ সুফি-সাধক, আলেম ও ইসলামি দায়িগণের নিঃস্বার্থ ত্যাগ, অনুপম চরিত্রমাধুর্য এবং তাওহীদের সার্বজনীন বাণীর মাধ্যমেই এ অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল।
বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে দায়িগণের পর্যায়ক্রমিক ভূমিকা
- আরব বণিক ও প্রাথমিক দায়িগণের আগমন: সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় অঞ্চলে আরব মুসলিম বণিকদের আগমনের মাধ্যমে বাংলায় ইসলামের প্রাথমিক পদধ্বনি ঘটে। তাদের সততা, উন্নত বাণিজ্যিক নৈতিকতা এবং সত্যবাদিতা স্থানীয় জনগণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
- শাহ জালাল মুজাররাদ আল-ইয়ামানী (রহ.): চতুর্দশ শতাব্দীতে ৩৬০ জন আউলিয়া ও মুজাহিদ সমভিব্যাহারে সিলেটে আগমন করেন। স্থানীয় অত্যাচারী রাজা গৌরগোবিন্দের পতন ঘটিয়ে তিনি আসাম ও বৃহত্তর সুরমা উপত্যকায় তাওহীদের আলো প্রজ্জ্বলিত করেন। তাঁর মানবপ্রেম ও আত্মিক আকর্ষণ সর্বস্তরের মানুষকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে।
- হযরত শাহ পরান ও শাহ মাখদুম (রহ.): সিলেটে শাহ পরান (রহ.) এবং বরেন্দ্রভূমি রাজশাহীতে হযরত শাহ মাখদুম রূপোশ (রহ.) পৌত্তলিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে জ্ঞানালোক ছড়িয়ে দেন এবং অসংখ্য ধর্মীয় কেন্দ্র স্থাপন করেন।
- খান জাহান আলী (রহ.): দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল তথা বাগেরহাট ও সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় তিনি শুধু দাওয়াতই দেননি; বরং বিশাল অঞ্চলকে আবাদ করেন, শত শত মসজিদ (যেমন ষাট গম্বুজ মসজিদ) ও সুপেয় পানির জন্য সুবিশাল দীঘি খনন করে লোকসেবা ও দাওয়াতের অপূর্ব সমন্বয় ঘটান।
- বাবা আদম শহীদ ও শাহ সুলতান বলখী মাহিসাওয়ার (রহ.): বিক্রমপুরে বাবা আদম শহীদ (রহ.) এবং বগুড়ার মহাস্থানগড়ে শাহ সুলতান মাহিসাওয়ার (রহ.) ইসলামের প্রাথমিক দুর্গ নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
- সমাজসংস্কার ও বিদআত বর্জন: মধ্যযুগে স্থানীয় আচারের সংমিশ্রণে সমাজে যে শিরক-বিদআত প্রবেশ করেছিল, পরবর্তী যুগের দায়িগণ কিতাব ও সুন্নাহর ভিত্তিতে তা দূর করে বিশুদ্ধ দ্বীনি চেতনার পুনর্জাগরণ ঘটান।
উপসংহার
বাংলার উর্বর পলল ভূমিতে ইসলামকে শিকড়বদ্ধ করতে সুফি-দায়িগণ যে আত্মত্যাগ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তা ইতিহাসে অতুলনীয়। তাঁদের আধ্যাত্মিক সাধনা ও চরিত্রবলই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের মূল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি রচনা করেছে।
٢- بين أحوال الدعوة الإسلامية الراهنة في جزيرة العرب بيانا شافيا-
[২. জাজিরাতুল আরবে বর্তমান ইসলামি দাওয়াহ এর অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
জাজিরাতুল আরব (আরব উপদ্বীপ) ইসলামের উৎপত্তিস্থল ও পৃথিবীর সকল মুসলমানের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রভূমি। পবিত্র দুই হারামাইন শরিফাইন (মক্কা মুকাররমা ও মদিনা মুনাওয়ারা) এখানেই অবস্থিত। একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বায়নের অভিঘাত, ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে জাজিরাতুল আরবে ইসলামি দাওয়াহর দৃশ্যপটে নানাবিধ মৌলিক পরিবর্তন ও বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।
জাজিরাতুল আরবে দাওয়াহর বর্তমান সার্বিক চিত্র
- রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধান ও প্রাতিষ্ঠানিকায়ন: সৌদি আরবসহ আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমানে ইসলামি দাওয়াত সম্পূর্ণরূপে মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে (যেমন সৌদি আরবের ‘মন্ত্রণালয়ুল শুউনিল ইসলামিয়্যাহ ওয়াদ-দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদ’)। এর ফলে দাওয়াহ কার্যক্রম অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও বিশ্বমানের প্রযুক্তিনির্ভর রূপ লাভ করেছে।
- ডিজিটাল দাওয়াহ ও আধুনিক মিডিয়ার ব্যবহার: উপগ্রহ টেলিভিশন, ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং একাধিক ভাষায় অনূদিত অডিও-ভিডিও কন্টেন্টের মাধ্যমে আরব উপদ্বীপের বিদ্যাপীঠগুলো বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিচ্ছে। হারামাইন শরিফাইনের খুতবা তাৎক্ষণিকভাবে ডজনখানেক প্রধান আন্তর্জাতিক ভাষায় লাইভ অনুবাদ ও সম্প্রচার করা হচ্ছে।
- প্রবাসী ও অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াত: আরব দেশগুলোতে কর্মরত লাখ লাখ অমুসলিম বিদেশি শ্রমিক ও পেশাজীবীদের জন্য বিশেষায়িত ‘মাকতাবুল জালিয়াত’ (দাওয়াহ সেন্টার) প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। হিকমাহ ও মানবিক সেবার মাধ্যমে প্রতি বছর হাজার হাজার অমুসলিম এখানে ইসলাম গ্রহণ করছে।
- মধ্যপন্থার দিকে রূপান্তর (الإسلام الوسطي): সৌদি আরবে ‘ভিশন ২০৩০’ গ্রহণের পর থেকে পূর্ববর্তী কঠোর সালাফি ভাবাদর্শের পরিবর্তে সহনশীলতা, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও চরমপন্থা প্রতিরোধের ওপর রাষ্ট্রীয়ভাবে জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি অতিরিক্ত বিনোদনমূলক সংস্কৃতির বিস্তার ঐতিহ্যবাহী দাওয়াতি বলয়ে একধরনের নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
- কুয়েত ও কাতারের বৈশ্বিক মানবিক দাওয়াহ: কুয়েত ও কাতারের দাতব্য সংস্থাসমূহ (যেমন জামইয়াতুল ইসলাহ, কাতার চ্যারিটি) ত্রাণ, মসজিদ নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এতিমখানার মাধ্যমে আফ্রিকা ও এশিয়াজুড়ে কার্যকর সামাজিক দাওয়াত পরিচালনা করছে।
- ইয়েমেনের যুদ্ধজনিত বিপর্যয়: রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের কারণে জাজিরাতুল আরবের অন্যতম প্রাচীন মুসলিম জনপদ ইয়েমেনে দাওয়াতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে, যা দাওয়াতি অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
উপসংহার
জাজিরাতুল আরবে বর্তমান দাওয়াহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারে যেমন এগিয়ে রয়েছে, তেমনি পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও ধর্মনিরপেক্ষমুখী সামাজিক সংস্কারের মাঝে খাঁটি ইসলামী মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখাই এখানকার বর্তমান দায়িগণের প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
٣- اذكر الأحوال الراهنة للدعوة الإسلامية في اندونيسين مفصلا-
[৩. ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান ইসলামি দাওয়ার অবস্থা বিস্তারিত বর্ণনা দাও।]
ভূমিকা
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের সর্বাধিক মুসলিম জনসংখ্যার দেশ (প্রায় ২৩ কোটি মুসলমান)। প্রায় সতেরো হাজার দ্বীপের এই দেশে ইসলামের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল ঐতিহাসিক সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং শান্তিময় সুফি-দাওয়াতের মাধ্যমে। আধুনিক যুগে ইন্দোনেশিয়ার ইসলামি দাওয়াহ তার বহুমুখী সামাজিক সংগঠন, শিক্ষামূলক পরিকাঠামো ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়ধর্মী রূপের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
ইন্দোনেশিয়ায় বর্তমান ইসলামি দাওয়াহর প্রধান বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা
- শক্তিশালী সামাজিক ও দ্বীনি সংগঠনের নেতৃত্ব:
- মুহাম্মাদিয়া (Muhammadiyah): ১৯১২ সালে আহমাদ দাহলান প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থাটি শিক্ষা, হাসপাতাল ও সমাজসেবাকে দাওয়াতের মূল হাতিয়ার বানিয়েছে। দেশজুড়ে তাদের হাজার হাজার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে।
- নাহদাতুল উলামা (Nahdlatul Ulama – NU): ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের বৃহত্তম এ এনজিওটি গ্রামীণ ও ঐতিহ্যবাহী সমাজে সুফিধারা এবং শাফেয়ী ফিকহের ভিত্তিতে দাওয়াত পরিচালনা করে। তাদের ‘ইসলাম নুসানতারা’ (দ্বীপীয় ইসলাম) ধারণা স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাওয়াতকে উৎসাহিত করে।
- পেসানত্রেন (Pesantren) শিক্ষাব্যবস্থা: ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব আবাসিক মাদ্রাসা ব্যবস্থাকে ‘পেসানত্রেন’ বলা হয়। দেশজুড়ে প্রায় ৩০ হাজার পেসানত্রেন রয়েছে, যা থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ আলেম ও দায়ি তৈরি হয়ে সমাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
- ইসলামি অর্থনীতি ও হালাল শিল্প: ইন্দোনেশিয়ার দাওয়াতে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা একটি বড় স্তম্ভ। জাকাত ও ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন এবং গ্লোবাল হালাল হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে দাওয়াতকে প্রায়োগিক জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শরিয়াহ প্রভাব: রাষ্ট্রীয়ভাবে পঞ্চশীল (প্যানকাসিলা) নীতির অধীনে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক কাঠামো থাকলেও আচেহ প্রদেশে পূর্ণ শরিয়াহ আইন কার্যকর রয়েছে এবং জাতীয় পর্যায়েও কুরআন তিলাওয়াত প্রতিযোগিতা (MTQ) রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হয়।
- উগ্রপন্থা বনাম মধ্যপন্থা: অতীতকালে কিছু বিচ্ছিন্ন চরমপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটলেও বর্তমানে ব্যাপক সরকারি ও সামাজিক নজরদারির মাধ্যমে সহনশীল ও মধ্যপন্থী দাওয়াহকে প্রধান স্রোতধারা হিসেবে পুনপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
উপসংহার
বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে কীভাবে নিজস্ব ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে শিক্ষা ও সমাজকল্যাণের মাধ্যমে দাওয়াহ পরিচালনা করতে হয়, সমসাময়িক বিশ্বে ইন্দোনেশিয়া তার এক অনুপম বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
٤- اكتب نبذة حياة شاه جمال الدين الأفغاني- ثم بين مساهمته في مناهج دعوته-
[৪. শায়খ জামাল উদ্দিন আফগানীর জীবনী সংক্ষেপে লেখ। অতঃপর তাঁর অবদানসমূহ ও দাওয়াতের পদ্ধতি বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
সৈয়দ জামালুদ্দীন আফগানী (১৮৩৮-১৮৯৭ খ্রি.) ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর মুসলিম বিশ্বের এক কিংবদন্তিতুল্য সংস্কারক, দূরদর্শী বুদ্ধিজীবী এবং প্যান-ইসলামিজম (ইসলামী ঐক্যবাদ)-এর মহান স্বপ্নদ্রষ্টা। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ ও সচেতন করতে তিনি এক বৈপ্লবিক বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সংক্ষিপ্ত জীবনী
জন্ম ও পরিচয়: তিনি ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে আফগানিস্তানের আসাদাবাদে (মতান্তরে ইরানের আসাদাবাদে এক সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবারে) জন্মগ্রহণ করেন। অসাধারণ প্রতিভাধর আফগানী শৈশবেই কুরআন, হাদিস, দর্শন, গণিত ও তর্কশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
কর্মময় জীবন ও বিশ্বভ্রমণ: তিনি ভারত, মক্কা, মিসর, তুরস্ক, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও রাশিয়া সফর করেন। যেখানেই তিনি গিয়েছেন, সেখানেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আগুন জ্বালিয়েছেন এবং তরুণ সমাজকে মুক্তিকামী চেতনায় উজ্জীবিত করেছেন। তিনি ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ইস্তাম্বুলে ইন্তেকাল করেন।
দাওয়াতের পদ্ধতি ও কৌশল (مناهج دعوته)
- মুসলিম ঐক্যের ডাক (جامعة الإسلامية): তাঁর দাওয়াতের কেন্দ্রীয় মর্মবাণী ছিল শিয়া-সুন্নি, আরব-অনারব ও জাতিগত বিভেদ ভুলে বিশ্ব মুসলিমের এক পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। উসমানীয় খিলাফতকে কেন্দ্র করে একটি বৈশ্বিক ইসলামী কনফেডারেশন গড়ে তোলা ছিল তাঁর লক্ষ্য।
- পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বৌদ্ধিক প্রতিরোধ: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কুফল ও আগ্রাসী শোষণের বিরুদ্ধে তিনি মুসলিম জনগণকে জাগিয়ে তোলেন। তিনিই প্রথম আধুনিক পরিভাষায় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক জিহাদের ডাক দেন।
- পত্র-পত্রিকা ও সাংবাদিকতা: প্যারিস থেকে তাঁর সুযোগ্য শিষ্য মুহাম্মদ আবদুহুর সহযোগিতায় প্রকাশিত আরবি সাপ্তাহিক ‘আল-উরওয়াতুল উসকা’ (العروة الوثقى) ছিল মুসলিম বিশ্বে বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের অগ্রদূত।
- শিক্ষা ও যুক্তিবাদ: তিনি মুসলিম সমাজকে অন্ধানুকরণ ও জড়তা ত্যাগ করে বিজ্ঞান, আধুনিক দর্শন ও প্রযুক্তি আয়ত্ত করার আহ্বান জানান। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আর-রাদ্দ আলাদ দাহরিয়্যীন’ (নাস্তিকদের জবাব)-এ তিনি বস্তুবাদের জোরালো খণ্ডন করেন।
- যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টি: সরাসরি রাজদরবারের চেয়ে জনপদ ও তরুণদের মধ্যে পাঠচক্রের মাধ্যমে তিনি মিশরে মুহাম্মদ আবদুহু, সা’দ জাগলুল এবং তিউনিসিয়ার খায়রুদ্দিন পাশার মতো শীর্ষ সারির আধুনিক সংস্কারক তৈরি করেছিলেন।
উপসংহার
সৈয়দ জামালুদ্দীন আফগানী ছিলেন আধুনিক যুগের মুসলিম জাগরণের প্রদীপ্ত মশাল। তাঁর সংগ্রামী চেতনা ও ঐক্যবদ্ধ দাওয়াতি দর্শন পরবর্তীকালে গোটা মুসলিম জাহানের স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের মূল অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
٥- اكتب مقالة على الحركة الإسلامية في بنغلاديش-
[৫. বাংলাদেশে ইসলামি আন্দোলনের উপর একটি নিবন্ধ লেখ।]
ভূমিকা
বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ইসলামি আন্দোলন কোনো সাম্প্রতিক প্রক্রিয়া নয়; বরং ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রাম থেকে শুরু করে বর্তমান কাল পর্যন্ত এটি দ্বীন কায়েম, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের এক অবিরাম সাধনা। বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে এই আন্দোলন বহুমুখী সামাজিক, শিক্ষামূলক ও রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করেছে।
বাংলাদেশে ইসলামি আন্দোলনের প্রধান ধারা ও পর্যায়সমূহ
- ঐতিহাসিক পটভূমি: সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার সংগ্রাম এবং হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলায় ইসলামি সমাজ সংস্কারের প্রত্যক্ষ সূচনা হয়, যা মুসলিম জনতাকে নিজেদের আত্মমর্যাদা ও ধর্মীয় কর্তব্য সম্পর্কে জাগ্রত করেছিল।
- কওমি মাদ্রাসা ও উলামাভিত্তিক ধারা: দারুল উলুম দেওবন্দের অনুসরণে প্রতিষ্ঠিত হাটহাজারী মাদ্রাসা (১৯০১) এবং দেশব্যাপী বিস্তৃত কওমি মাদ্রাসাসমূহ এদেশের ইসলামি আন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তিস্তম্ভ। তারা ঈমান-আকিদা সংরক্ষণ, খতমে নবুওয়াত আন্দোলন, নাস্তিকতাবিরোধী প্রতিরোধ এবং ইসলামি অনুশাসন বাস্তবায়নে অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে।
- রাজনৈতিক দল ও গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা: জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিসসহ বহু ইসলামী দল দেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলামি অনুশাসন প্রবর্তন, কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী আইন প্রতিরোধ এবং ইনসাফপূর্ণ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
- দাওয়াত ও তাবলিগের নীরব বিপ্লব: তাবলিগ জামাত অরাজনৈতিকভাবে তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষকে মসজিদের সাথে যুক্ত করা, নামাজি বানানো এবং আখলাক সংশোধনের ক্ষেত্রে বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি লাভ করেছে। টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা তার উজ্জ্বল নিদর্শন।
- অর্থনৈতিক ও মিডিয়া ময়দানে সক্রিয়তা: ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা, করজে হাসানা এবং ব্যাপক ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পাশাপাশি আধুনিক মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক বলয় সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়
মতাদর্শগত অনৈক্য, পারস্পরিক মতভেদ, রাষ্ট্রীয় প্রতিকূলতা এবং বস্তুবাদী পাশ্চাত্য শিক্ষার আধিপত্য বর্তমান ইসলামি আন্দোলনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। একটি সুনির্দিষ্ট অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে উলামা-মাশায়েখ ও আধুনিক শিক্ষিত ইসলামি চিন্তাবিদদের সমন্বিত উদ্যোগই কেবল এ আন্দোলনকে চূড়ান্ত সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে পারে।
উপসংহার
বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে ইসলামি আন্দোলন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ত্যাগ, খোদাভীতি ও আধুনিক জ্ঞানসমৃদ্ধ কৌশল নিয়ে এগোলে এ আন্দোলন দেশের সার্বভৌমত্ব ও সার্বিক মুক্তির রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
٦- اكتب مقالة على الحركات الإسلامية في السودان-
[৬. সুদানে ইসলামি আন্দোলনের উপর একটি নিবন্ধ লেখ।]
ভূমিকা
পূর্ব আফ্রিকার মুসলিম প্রধান দেশ সুদান ইসলামি দাওয়াহ ও আন্দোলনের এক অনন্য উর্বর ভূমি। ভৌগোলিকভাবে আরব ও কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকার সংযোগস্থলে অবস্থিত এ দেশটির ইতিহাস ঐতিহ্যবাহী সুফি তরিকা এবং আধুনিক পুনর্জাগরণবাদী ইসলামি রাজনৈতিক আন্দোলনের যুগলবন্দীতে রচিত।
সুদানে ইসলামি আন্দোলনের বিকাশ ও রূপরেখা
- মাহদিয়া আন্দোলন (الحركة المهدية): ঊনবিংশ শতাব্দীতে মুহাম্মদ আহমাদ আল-মাহদী (১৮৪৪-১৮৮৫ খ্রি.) ব্রিটিশ-মিশরীয় দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ ঘোষণা করেন। ১৮৮৫ সালে খার্তুমে জেনারেল গর্ডনকে পরাজিত করে তিনি সুদানে স্বাধীন ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা সুদানি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রেরণা।
- সুফি তরিকার প্রভাব: খাতমিয়া (Khatmiyya) এবং আনসার (Ansar) তরিকা সুদানের তৃণমূল সমাজে গভীর প্রভাব বিস্তার করে রাখে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণে অগ্রণী ভূমিকা রাখে।
- ইখওয়ানুল মুসলিমুন ও হাসান আল-তুরাবী: বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সুদানে মুসলিম ব্রাদারহুডের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ড. হাসান আল-তুরাবীর (১৯৩২-২০১৬ খ্রি.) নেতৃত্বে এ আন্দোলন ‘ইসলামিক চার্টার ফ্রন্ট’ ও ‘ন্যাশনাল ইসলামিক ফ্রন্ট’ (NIF)-এ রূপান্তরিত হয়। তুরাবীর মৌলিক চিন্তাধারা ও আধুনিক ফিকহি ইজতিহাদ সুদানের শিক্ষিত তরুণ ও সামরিক বাহিনীকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে।
- ওমর আল-বশিরের শাসন ও শরিয়াহ প্রয়োগ (১৯৮৯-২০১৯): ১৯৮৯ সালে জেনারেল ওমর আল-বশিরের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইসলামি আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। সুদানে শরিয়াহ ভিত্তিক আইন, ইসলামি ব্যাংক ব্যবস্থা এবং সংবিধান চালু করা হয়।
- অভ্যন্তরীণ ফাটল ও দক্ষিণ সুদানের বিচ্ছিন্নতা: ১৯৯৯ সালে প্রেসিডেন্ট বশির ও তাত্ত্বিক নেতা তুরাবীর মধ্যে দ্বন্দ্বে আন্দোলন বিভক্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর ২০১১ সালে অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণ সুদান স্বাধীন হয়ে যায়, যা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ধাক্কা তৈরি করে।
- ২০১৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও বর্তমান সংকট: ২০১৯ সালে গণআন্দোলনে বশিরের পতনের পর ধর্মনিরপেক্ষ সামরিক গোষ্ঠী শরিয়াহ আইন শিথিল করার উদ্যোগ নেয়। বর্তমানে চলমান সামরিক সংঘাতের মধ্যেও সুদানের ইসলামি শক্তিগুলো তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক উপস্থিতি বজায় রাখতে সচেষ্ট রয়েছে।
উপসংহার
সুদানের ইসলামি আন্দোলন আধুনিক যুগে রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে ইসলামি বিধান বাস্তবায়নের এক বাস্তব পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছিল। এর নানাবিধ সাফল্য ও ভুলত্রুটি বর্তমান মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রচিন্তাবিদদের জন্য এক তাৎপর্যপূর্ণ পাঠ্য বিষয়।
٧- اذكر الأحوال الراهنة للدعوة الإسلامية في تونس-
[৭. তিউনিশিয়ায় বর্তমান ইসলামি দাওয়াহ এর অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় দেশ তিউনিসিয়া প্রাচীনকাল থেকেই কায়রোয়ান জামে মসজিদ ও জামিয়া আল-জাইতুনার মাধ্যমে মালিকি ফিকহ ও ইসলামি দাওয়াহর বিশ্ববিখ্যাত কেন্দ্র ছিল। তবে বিংশ শতাব্দীতে চরম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের পর ২০১১ সালের ‘জেসমিন বিপ্লব’ তিউনিসিয়ার ইসলামি দাওয়াতি বাস্তবতায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন বয়ে আনে।
তিউনিশিয়ায় দাওয়াহর বর্তমান অবস্থা ও গতিপ্রকৃতি
- জাইতুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাগরণ: স্বৈরশাসক হাবিব বোরগুইবা ও জাইনুল আবেদিন বেন আলীর আমলে প্রাচীন জামিয়া আল-জাইতুনার প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। বিপ্লবোত্তর যুগে জাইতুনা পুনরায় স্বাধীনভাবে চালু হয়ে ঐতিহ্যবাহী মালিকি আলেম ও দায়ি তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে।
- আন-নাহদা আন্দোলন (حركة النهضة): শায়খ রশিদ আল-গান্নুশীর নেতৃত্বে আন-নাহদা দীর্ঘ নির্বাসন ও কারাবরণ শেষে মুক্ত রাজনৈতিক ময়দানে ফিরে আসে। গান্নুশী ইসলাম ও গণতন্ত্রের সমন্বয়ধর্মী ‘মুসলিম ডেমোক্র্যাট’ ধারণা প্রবর্তন করেন এবং ২০১৬ সালে দলটিকে সরাসরি রাজনৈতিক ও দাওয়াতি দুই ভাগে পৃথক করার ঘোষণা দেন।
- মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: অতীতে মসজিদে নামাজ পড়ার কারণে নাগরিকদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হতো। বর্তমানে সেই চরম দমননীতি না থাকলেও ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে খতিব নিয়োগ ও খুতবা মনিটরিংয়ের মতো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কিছুটা বজায় রয়েছে।
- নাগরিক সমাজের ধর্মীয় স্বাধীনতা: হিজাব ও পর্দার ওপর থেকে সকল আইনি নিষেধাজ্ঞা অপসারিত হয়েছে। কুরআন শিক্ষার বৃত্ত, ইসলামিক বইমেলা ও দাওয়াতি কনফারেন্সে তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণ বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
- সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকট (কাইস সাঈদ যুগ): ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদ সংসদ ভেঙে দিয়ে একচ্ছত্র ক্ষমতা গ্রহণ করলে আন-নাহদাসহ গণতান্ত্রিক ও ইসলামি শক্তিগুলো ফের রাজনৈতিক কোণঠাসা ও কারারুদ্ধতার শিকার হয়। তবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দাওয়াহ তার নিজস্ব গতিতে তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় রয়েছে।
উপসংহার
উগ্র ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহাসিক ক্ষত কাটিয়ে তিউনিসিয়ার মুসলিম সমাজ নিজস্ব ইসলামী পরিচিতিকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। বুদ্ধিবৃত্তিক সংযম ও মধ্যপন্থাই তিউনিসিয়ার বর্তমান ইসলামি দাওয়াহর প্রধান মূলধন।
٨- اكتب مقالة على الحركات الإسلامية والمؤسسات في الهند مفصلا-
[৮. ভারতে ইসলামি আন্দোলন ও সংগঠন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ভারত প্রায় বিশ কোটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল, যা বিশ্বের কোনো একক দেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম সমাজ। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর প্রতিকূল ধর্মনিরপেক্ষ ও সংখ্যালঘু পরিবেশে ভারতীয় মুসলমানরা তাদের দ্বীন, শরিয়ত ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বহু প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠান ও আন্দোলন গড়ে তুলেছে।
ভারতে প্রধান ইসলামি আন্দোলন ও প্রতিষ্ঠানসমূহ
- দারুল উলুম দেওবন্দ (১৮৬৬ খ্রি.): মাওলানা মুহাম্মদ কাসিম নানুতবী (রহ.) প্রতিষ্ঠিত এ ঐতিহাসিক বিদ্যাপীঠ ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামি শিক্ষা, ঐতিহ্যবাহী সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের সর্ববৃহৎ কেন্দ্র। ভারতজুড়ে হাজার হাজার শাখা মাদ্রাসার মাধ্যমে দেওবন্দ কোটি কোটি মুসলমানের ধর্মীয় চেতনার সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।
- জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ (১৯১৯ খ্রি.): শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী ও সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) প্রতিষ্ঠিত এ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মটি ভারতীয় মুসলমানদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে আসছে।
- জামায়াতে ইসলামী হিন্দ (১৯৪৮ খ্রি.): মাওলানা আবুল আলা মওদূদীর চিন্তাধারায় বিশ্বাসী হলেও দেশভাগের পর ভারতে এটি সম্পূর্ণ অহিংস, গণতান্ত্রিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাওয়াতি সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। অমুসলিমদের কাছে ইসলামের পরিচিতি তুলে ধরা এবং ছাত্র সংগঠন ‘এসআইও’ (SIO)-এর মাধ্যমে তরুণদের চরিত্র গঠনে তারা নিয়োজিত।
- নাদওয়াতুল উলামা, লখনউ (১৮৯৪ খ্রি.): আধুনিক যুগোপযোগী আরবি ভাষা, ইসলামি সাহিত্য ও দাঈ গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত নাদওয়া বিশ্বজোড়া সুখ্যাতি লাভ করেছে। আল্লামা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.)-এর সুযোগ্য নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের মুসলমানদের মুখপত্র হয়ে ওঠে।
- অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড (AIMPLB): ১৯৭৩ সালে গঠিত এ বোর্ডটি ভারতের সকল মাজহাব ও দলের আলেমদের সমন্বয়ে গঠিত শীর্ষ আইনি অভিভাবক সংস্থা, যা মুসলিম পারিবারিক আইন ও শরিয়াহর বিরুদ্ধে যেকোনো রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ প্রতিহত করতে আইনি লড়াই চালায়।
- তাবলিগ জামাত: হযরতজি মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ.) কর্তৃক মেওয়াত থেকে সূচিত এ আন্দোলনটি ভারতের প্রতিটি জনপদে দাওয়াতের মেহনতের মাধ্যমে সাধারণ মুসলমানদের ইবাদত ও সুন্নাহমুখী জীবন উপহার দিয়েছে।
উপসংহার
বর্তমান ভারতে হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের মুখে ভারতীয় ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও আন্দোলনসমূহ প্রজ্ঞা, আইনি লড়াই ও ঐক্যের মাধ্যমে তাদের ঈমানি অস্তিত্ব রক্ষা করে চলছে।
مجموعة (ب) – খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)
٩- تحدث عن دور المؤسسة الإسلامية بنغلاديش في نشر الإسلام مختصرا-
[৯. ইসলাম প্রচারে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর ভূমিকা সংক্ষেপে লেখ।]
উত্তর
১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠিত ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ (IFB) ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি শীর্ষ স্বায়ত্তশাসিত দ্বীনি গবেষণা ও সেবা সংস্থা। ইসলাম প্রচার ও গবেষণায় এর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিম্নরূপ:
- পবিত্র কুরআন ও হাদিস অনুবাদ এবং প্রকাশনা: আল-কুরআনের পূর্ণাঙ্গ তাফসির, সিহাহ সিত্তাহসহ প্রধান প্রধান হাদিস গ্রন্থ এবং সুবিশাল ‘ইসলামী বিশ্বকোষ’ (২৮ খণ্ড) প্রণয়ন ও প্রকাশ করে সাধারণ পাঠকের দ্বীনি জ্ঞানের পিপাসা মেটানো হয়েছে।
- মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম: দেশব্যাপী লক্ষাধিক মসজিদ মক্তবের মাধ্যমে প্রতি বছর লাখ লাখ কোমলমতি শিশুকে বিনামূল্যে কুরআন শিক্ষা, সাক্ষরতা ও প্রাথমিক নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে।
- ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি: দেশের হাজার হাজার মসজিদের খতিব ও ইমামদেরকে ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসা, বৃক্ষরোপণ ও সমাজসেবামূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ সমাজ সংস্কারক হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
- বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ ও দ্বীনি সেমিনার: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কেরাত সম্মেলন, সিরাত মাহফিল এবং চাঁদ দেখার সমন্বয়সহ রাষ্ট্রীয় দ্বীনি আয়োজন পরিচালনা করে থাকে।
١٠- من الحاجي شريعة الله؟ تحدث عن حركته الفرائضية-
[১০. হাজী শরীয়তুল্লাহ কে? তাঁর ফরায়েজী আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা কর।]
উত্তর
হাজী শরীয়তুল্লাহর পরিচয়: হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০ খ্রি.) ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মাদারীপুরের এক ক্ষণজন্মা বিপ্লবী সংস্কারক। তিনি দীর্ঘ বিশ বছর মক্কা মুকাররমায় অবস্থান করে কুরআন-হাদিস ও ইসলামি আইনশাস্ত্র অধ্যয়ন শেষে ১৮১৮ সালে বাংলায় ফিরে আসেন এবং কুসংস্কারমুক্ত খাঁটি ইসলাম কায়েমের লক্ষ্যে ঐতিহাসিক ‘ফরায়েজী আন্দোলন’ (التحريك الفرائضي) সূচনা করেন।
ফরায়েজী আন্দোলন:
- ফরজ আমলের ওপর গুরুত্ব: ‘ফরায়েজ’ শব্দটি ‘ফরজ’ এর বহুবচন। তিনি মুসলমানদের অনৈসলামিক কুসংস্কার ও পৌত্তলিক রীতি পরিহার করে ইসলামের মৌলিক ফরজ কার্যাবলি (যেমন নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত) কঠোরভাবে পালনের নির্দেশ দেন।
- তওবা ও আত্মশুদ্ধি: মুরিদদেরকে তিনি ‘শাগরেদ’ সম্বোধন করতেন এবং তাদেরকে অতীতের গুনাহ ও পীরপূজা থেকে খাঁটি তওবার শপথ পাঠ করাতেন।
- জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ: ব্রিটিশ বেনিয়া নীলকর এবং হিন্দু জমিদারদের অন্যায় কর (যেমন দাড়ি রাখার ওপর কর) আদায়ের বিরুদ্ধে নির্যাতিত মুসলিম কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে এক অপরাজেয় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
١١- من الأستاذ السيد ابو الحسن علي الندوي (رح)- ثم اذكر خدماته في نشر الدعوة-
[১১. সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী কে? দাওয়াহ সম্প্রসারণে তাঁর অবদানসমূহ আলোচনা কর।]
উত্তর
পরিচয়: শায়খ সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী হাসানী নদভী (১৯১৪-১৯৯৯ খ্রি.), যিনি সারাবিশ্বে ‘আলী মিয়া নদভী’ নামে পরিচিত, ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুসলিম চিন্তাবিদ, বিশ্ববরেণ্য দাঈ এবং দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামার দীর্ঘকালীন রেক্টর ও রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
দাওয়াতে তাঁর অবদানসমূহ:
- কালজয়ী সাহিত্যকর্ম: তাঁর অমর গ্রন্থ ‘মা যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমীন’ (ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين – মুসলমানদের পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো) আধুনিক বিশ্বে ইসলামী পুনর্জাগরণের এক ঐতিহাসিক ইশতেহার হিসেবে বিবেচিত হয়।
- পয়ামে ইনসানিয়াত (মানবতার বার্তা): তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের দাওয়াত পৌঁছে দিতে ভারতজুড়ে এ অরাজনৈতিক অহিংস আন্দোলন পরিচালনা করেন।
- আরব ও অনারব বিশ্বের সেতুবন্ধন: চমৎকার আরবি ভাষায় বক্তৃতা ও রচনার মাধ্যমে তিনি বস্তুবাদী চিন্তা থেকে ফিরে এসে কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য আরব নেতৃবৃন্দ ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতি কার্যকর আহ্বান জানান।
١٢- اكتب نبذة عن حياة الصوفى نور محمد نظامبوری (رح) مختصرا-
[১২. সুফী নূর মোহাম্মদ নিজামপুরীর জীবনী সংক্ষেপে লেখ।]
উত্তর
জন্ম ও বংশ: হযরত সুফী নূর মোহাম্মদ নিজামপুরী (রহ.) আনুমানিক ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার নিজামপুর পরগণার মোল্লাপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক দীক্ষা: তিনি স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনের পর তৎকালীন কলকাতার বিখ্যাত আলিয়া মাদ্রাসায় উচ্চতর ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি উনবিংশ শতাব্দীর মহান মুজাদ্দিদ সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ ব্রেলভী (রহ.)-এর শীর্ষ খলিফা মাওলানা নূর মুহাম্মদ ঝাঝনবী (রহ.)-এর কাছে বাইআত গ্রহণ করে চিশতিয়া ও নকশবন্দিয়া তরিকার সর্বোচ্চ খিলাফত লাভ করেন।
দাওয়াতি ও সংস্কারমূলক কাজ: তিনি তৎকালীন চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলে প্রচলিত শিরক, বিদআত ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই করেন। তাঁরই প্রত্যক্ষ আধ্যাত্মিক সোহবতে তৈরি হয়েছিলেন শামসুল উলামা হযরত মাওলানা আব্দুল ওয়াহহাব (রহ.) এবং কওমি মাদ্রাসার অন্যতম স্থপতি শায়খুল ইসলাম আজিজুল হক (রহ.)। তিনি ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।
١٣- اكتب خدمات مولانا عبد الرحيم في الدعوة الإسلام في بنغلاديش-
[১৩. বাংলাদেশে ইসলামের দাওয়াতে মাওলানা আব্দুর রহীমের অবদান লেখ।]
উত্তর
সংক্ষিপ্ত পরিচয়: মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম (১৯১৮-১৯৮৭ খ্রি.) ছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক ইসলামি আন্দোলনের পথিকৃৎ, প্রখ্যাত মুফাসসির, চিন্তাবিদ এবং গবেষক। পিরোজপুর জেলায় জন্মগ্রহণকারী এই আলেম আলিয়া মাদ্রাসা থেকে সর্বোচ্চ এফ.এম ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।
দাওয়াতি অবদানসমূহ:
- বাংলা ভাষায় সমৃদ্ধ ইসলামি সাহিত্য সৃষ্টি: তিনিই প্রথম আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার মাধ্যমে বাংলায় সমৃদ্ধ ইসলামী কিতাবাদি রচনা ও অনুবাদ করেন। তাঁর রচিত ‘আল-কুরআনের আলোকে উন্নত জীবনের আদর্শ’, ‘সুন্নাত ও বিদআত’ এবং সুবিশাল তাফসির গ্রন্থ ‘তাওহীদুল কুরআন’ বাংলাভাষী পাঠকদের মাঝে দ্বীনি বিপ্লব ঘটায়।
- ইসলামিক রিসার্চ একাডেমি প্রতিষ্ঠা: ঢাকায় উচ্চতর গবেষণার জন্য তিনি এই একাডেমি গড়ে তোলেন, যা থেকে বহু আধুনিক শিক্ষিত তরুণ বুদ্ধিজীবী ইসলামি গবেষণায় উদ্বুদ্ধ হন।
- সাংগঠনিক নেতৃত্ব: তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আমির হিসেবে কাজ করেন এবং পরবর্তীতে ‘ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ’ (আইডিএল)-এর মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় অসামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন।
١٤- اكتب نبذة من حياة العلامة إقبال (رح)- ثم اذكر خدماته في الدعوة مختصرا-
[১৪. আল্লামা ইকবাল (রহ) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ। অতঃপর দাওয়াতে তার অবদানসমূহ সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা কর।]
উত্তর
সংক্ষিপ্ত জীবনী: ড. আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮ খ্রি.) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের এক কালজয়ী দার্শনিক, কবি ও মুসলিম জাতীয়তাবাদের রূপকার। তিনি পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। লাহোরে সরকারি কলেজে অধ্যাপনার পর তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি এবং পিএইচডি লাভ করেন।
দাওয়াতে অবদান:
- খুদি (আত্মশক্তি)-র দর্শন: তিনি পাশ্চাত্য জড়বাদের অন্ধ অনুকরণের বিপরীতে মুসলমানদের নিজস্ব আত্মমর্যাদাবোধ ও ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার আহ্বান জানান।
- বিপ্লবী উর্দু ও ফারসি কবিতা: ‘শিকওয়া’ ও ‘জওয়াব-ই-শিকওয়া’, ‘আসরার-ই-খুদি’ ও ‘পয়াম-ই-মাশরিক’-এর মতো কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি নিদ্রিত মুসলিম তরুণদের মধ্যে নবজাগরণের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দেন।
- ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা: ১৯৩০ সালে এলাহাবাদ অধিবেশনে তিনি মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির প্রস্তাব করেন, যা পরবর্তীতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের তাত্ত্বিক ভিত্তি রচনা করে।
١٥- من الحاجي امداد الله مهاجر المكى (رح)- ثم اذكر خدماته في علم الحديث-
[১৫. হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.) কে? অতঃপর হাদিস শাস্ত্রে তাঁর অবদানসমূহ আলোচনা কর।]
উত্তর
পরিচয়: হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (১৮১৭-১৮৯৯ খ্রি.) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের উলামায়ে কেরামের সর্বজনশ্রদ্ধেয় আধ্যাত্মিক রাহবার ও শায়খুল মাশায়েখ। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে শামেলীর ময়দানে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের পর তিনি পবিত্র মক্কায় হিজরত করেন এবং আমৃত্যু সেখানে ইলম ও তাসাউফের নূর বিতরণ করেন।
হাদিস শাস্ত্রে তাঁর অনন্য খেদমত:
- মুহাদ্দিসগণের আধ্যাত্মিক অভিভাবকত্ব: তিনি যদিও মূলত সুফি ও শায়খ ছিলেন, কিন্তু তাঁর প্রত্যক্ষ হাতে গড়া শিষ্যরাই ছিলেন উপমহাদেশের হাদিস শাস্ত্রের প্রাণপুরুষ। হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা কাসিম নানুতবী (রহ.) এবং ফকিহুল মিল্লাত মাওলানা রশীদ আহমদ গাংগুহী (রহ.) তাঁরই সান্নিধ্যে থেকে ইলমে হাদিসের গভীর রুহানি দ্যোতনা লাভ করেছিলেন।
- মক্কা মুকাররমায় দারসে হাদিস: মক্কার হারাম শরিফের সন্নিকটে তাঁর বাসভবন ছিল সারাবিশ্বের শীর্ষ মুহাদ্দিসগণের মিলনমেলা। সেখান থেকে হাদিসের উচ্চতর সনদ ও সনাতন ইসনাদ বিতরণ করা হতো।
- হাদিস ও সুন্নাহর আলোকে তাসাউফ সংশোধন: তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ফয়সালায়ে হাফত মাসআলা’ এবং ‘জিয়াউল কুলুব’-এ প্রমাণ করেন যে, খাঁটি হাদিস ও সুন্নাহর আনুগত্য ছাড়া তাসাউফের কোনো অস্তিত্ব নেই।
١٦- اكتب نبذة من حياة العلامة حسين أحمد المدنى (رح)- ثم أذكر مساهمته في نشر الإسلام مختصرا-
[১৬. আল্লামা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ। অতঃপর ইসলাম প্রসারে তার ভূমিকা আলোচনা কর।]
উত্তর
সংক্ষিপ্ত জীবনী: শায়খুল ইসলাম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী (১৮৭৯-১৯৫৭ খ্রি.) ছিলেন ভারতের উত্তর প্রদেশের বাঙ্গারমউয়ে জন্ম নেওয়া এক অবিসংবাদিত স্বাধীনতা সংগ্রামী ও শীর্ষ মুহাদ্দিস। তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর পবিত্র মসজিদে নববীতে হাদিসের প্রধান উস্তাদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় ‘মাদানী’ উপাধিতে ভূষিত হন। পরবর্তীতে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের সদরুল মুদাররিসীন (প্রধান অধ্যাপক) হিসেবে দীর্ঘকাল ইলমে হাদিসের খেদমত করেন।
ইসলাম প্রসারে ভূমিকা:
- বুখারী শরিফের যুগান্তকারী দারস: দেওবন্দে তাঁর বুখারীর দরবারে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভিড় জমাতো। তাঁর বিখ্যাত লেকচার সমগ্র ‘তাকরির-ই তিরমিজি’ হাদিস শিক্ষার্থীদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ।
- রেশমি রুমাল আন্দোলন ও মাল্টায় বন্দিত্ব: শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দীর সাথে মিলে ব্রিটিশবিরোধী আজাদী সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন এবং মাল্টা দ্বীপে মর্মান্তিক নির্বাসন ও নির্যাতন ভোগ করেন।
- আসাম ও বাংলায় দাওয়াতি সফর: তিনি প্রতি বছর আসাম ও সিলেট অঞ্চলে দীর্ঘ সফর করতেন। তাঁর দাওয়াতে লাখ লাখ মানুষ তওবা করে দ্বীনের পথে আসে এবং অঞ্চলে অসংখ্য মাদ্রাসা ও মক্তব গড়ে ওঠে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. আধুনিক যুগে দাওয়াহ ও দাঈ বিষয়ের মূল আলোচ্য বিষয় কী?
এ বিষয়ের মূল লক্ষ্য হলো সমসাময়িক বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে (যেমন আরব উপদ্বীপ, সুদান, ইন্দোনেশিয়া, তিউনিসিয়া, ভারত ও বাংলাদেশ) ইসলামের বিস্তার, দাওয়াতি আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি এবং বিশিষ্ট সংস্কারক ও মুবাল্লিগগণের জীবন ও অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করা।
২. বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে সুফিগণের মূল কৌশল কী ছিল?
সুফিগণ কোনো বলপ্রয়োগ না করে উন্নত চরিত্রমাধুর্য, নিঃস্বার্থ সমাজসেবা, মানবপ্রেম ও আধ্যাত্মিক আকর্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় অহিন্দু ও অনার্য নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে ইসলামের ভ্রাতৃত্বের ছায়াতলে এনেছিলেন।
৩. ফরায়েজী আন্দোলনের প্রধান সংস্কার কী ছিল?
ফরায়েজী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের সমস্ত বেদাত ও অনৈসলামিক কুসংস্কারমুক্ত করে কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক মৌলিক ফরজ ও ওয়াজিব আমল পালনে নিষ্ঠাবান করা এবং অন্যায় নীলকর ও জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
৪. সৈয়দ জামালুদ্দীন আফগানীর প্যান-ইসলামিজম কী?
প্যান-ইসলামিজম বা ‘আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়্যাহ’ হলো পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সকল ভৌগোলিক ও জাতিগত ভেদাভেদ ভুলে বিশ্বের সমগ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ ও সংহত করার মতাদর্শ।
৫. ইন্দোনেশিয়ায় মুহাম্মাদিয়া ও নাহদাতুল উলামার মাঝে মূল পার্থক্য কী?
মুহাম্মাদিয়া মূলত আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও সমাজসেবামূলক সংস্কারের মাধ্যমে দাওয়াত চালায়; পক্ষান্তরে নাহদাতুল উলামা ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ পেসানত্রেন মাদ্রাসা ব্যবস্থা ও সুফি সংস্কৃতির আলোকে শাফেয়ী ফিকহের চর্চাকে অগ্রাধিকার দেয়।
৬. আধুনিক যুগে ইসলামি দাওয়াতে মিডিয়ার গুরুত্ব কতটুকু?
আধুনিক যুগে ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও তথ্যপ্রযুক্তি হলো স্থান-কালের সীমানা ছাড়িয়ে কোটি কোটি অমুসলিম ও যুবসমাজের কাছে ইসলামের বিশ্বজনীন ও কল্যাণময় রূপ তুলে ধরার সবচেয়ে শক্তিশালী ও অপরিহার্য মাধ্যম।