ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা – ২০২০
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আল-ইসরাঈলিয়াত ওয়াদ-দাখীল ফিত তাফসীর (الإسرائيليات والدخيل في التفسير)
বিষয় কোড: ৪০৯ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৬৫ | পরীক্ষা কোড: ২০৪
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
নির্দেশনা: পরীক্ষায় মোট ৮টি প্রশ্ন থেকে যে কোনো ৫টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক প্রস্তুতি ও সর্বোচ্চ সাফল্যের সুবিধার্থে নিম্নে সকল প্রশ্নের তাহকীকভিত্তিক, প্রামাণ্য ও সবিস্তার সমাধান তুলে ধরা হলো।
١- ما المراد بالإسرائيليات؟ وما حكم روايتها؟ وما الفرق بينها وبين الدخيل؟ بين موضحا-
‘আল-ইসরাঈলিয়াত’ (الإسرائيليات) বলতে কী বোঝায়? এটি বর্ণনা করার শরয়ী হুকুম কী? ‘ইসরাঈলিয়াত’ ও ‘দাখীল’ (الدخيل)-এর মধ্যকার পার্থক্য কী? বিশদভাবে আলোচনা কর।
ভূমিকা
পবিত্র কুরআন মানবজাতির হেদায়াতের জন্য অবতীর্ণ আল্লাহর চিরন্তন বাণী। কুরআন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ উসূল ও মূলনীতির অনুসরণ অপরিহার্য। কিন্তু বিভিন্ন যুগে তাফসীর শাস্ত্রে এমন কিছু বাহ্যিক ও অপ্রমাণিত বর্ণনা প্রবেশ করেছে যা কুরআনের পবিত্রতা ও মূল মর্মকে আচ্ছন্ন করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। এর মধ্যে প্রধান হলো ‘ইসরাঈলিয়াত’ ও ‘দাখীল’।
(ক) الإسرائيليات-এর পরিচয়
- শাব্দিক অর্থ: ‘ইসরাঈলিয়াত’ শব্দটি ‘ইসরাঈল’ (إسرائيل)-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত বহুবচন রূপ। ‘ইসরাঈল’ হলো হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর অপর নাম। হিব্রু ভাষায় এর অর্থ ‘আব্দুল্লাহ’ বা আল্লাহর বান্দা। অতএব, বনী ইসরাঈল তথা ইহুদি ও খ্রিস্টান ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত যেকোনো বর্ণনাকে শাব্দিক অর্থে ‘ইসরাঈলিয়াত’ বলা হয়।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: তাফসীর ও উলূমুল কুরআনের পরিভাষায় ড. মুহাম্মদ হুসাইন আয-যাহাবী (রহ.) তাঁর আল-ইসরাঈলিয়াত ফিত তাফসীর ওয়াল হাদীস গ্রন্থে বলেন:
«الإِسْرَائِيلِيَّاتُ فِي اصْطِلَاحِ عُلَمَاءِ التَّفْسِيرِ وَالْحَدِيثِ: هِيَ كُلُّ مَا تَسَرَّبَ إِلَى التَّفْسِيرِ وَالْحَدِيثِ مِنْ أَخْبَارٍ وَأَسَاطِيرَ مَنْسُوبَةٍ إِلَى مَصَادِرَ يَهُودِيَّةٍ أَوْ نَصْرَانِيَّةٍ»
(তাফসীর ও হাদীস বিশারদদের পরিভাষায়—ইহুদি, খ্রিস্টান ও আহলে কিতাবদের ধর্মীয় গ্রন্থ, তালমুদ ও পৌরাণিক লোকগাথা থেকে যা কিছু তাফসীর ও হাদীসের কিতাবে অনুপ্রবেশ করেছে, তাকে ‘ইসরাঈলিয়াত’ বলা হয়)।
(খ) حكم رواية الإسرائيليات (ইসরাঈলিয়াত বর্ণনার শরয়ী হুকুম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) আহলে কিতাবদের বর্ণনার ব্যাপারে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মূলনীতি ঘোষণা করেছেন:
«بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً، وَحَدِّثُوا عَنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَا حَرَجَ، وَمَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ» (আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও। আর বনী ইসরাঈল থেকে বর্ণনা কর, এতে কোনো দোষ নেই। তবে যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়—সহীহ বুখারী: ৩৪৬১)।
অন্য হাদীসে তিনি বলেন: «لَا تُصَدِّقُوا أَهْلَ الْكِتَابِ وَلَا تُكَذِّبُوهُمْ، وَقُولُوا: آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا» (তোমরা আহলে কিতাবদের অন্ধভাবে বিশ্বাসও করো না, আবার সরাসরি মিথ্যাও বলো না; বরং বল: আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর ওপর এবং যা আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে—সহীহ বুখারী: ৪৪৮৫)।
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ এবং হাফেয ইবনে কাসীর (রহ.)-এর তাহকীক অনুযায়ী ইসরাঈলী বর্ণনাকে শরীয়তের মানদণ্ডের ভিত্তিতে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়:
| প্রকারভেদ | বিবরণ ও মানদণ্ড | শরয়ী হুকুম ও উদাহরণ |
|---|---|---|
| ১. মাকবূল বা গ্রহণযোগ্য (ما وافق شرعنا) |
যেসব ইসরাঈলী বর্ণনা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর বক্তব্যের সাথে হুবহু মিলে যায়। | হুকুম: গ্রহণযোগ্য ও সত্য। তবে এর গ্রহণযোগ্যতা কুরআন-সুন্নাহর সমর্থনের কারণে, ইসরাঈলী উৎসের কারণে নয়। যেমন: হযরত মূসা (আ.) ও ফিরাউনের ঐতিহাসিক মূল কাহিনী। |
| ২. মারদূদ বা বর্জনীয় (ما خالف شرعنا) |
যেসব বর্ণনা কুরআন, সহীহ হাদীস, ইসলামী আকীদা কিংবা সুস্থ বিবেকের পরিপন্থী। বিশেষ করে নবীদের নিষ্পাপতায় (ইসমাতুল আম্বিয়া) আঘাতকারী কাহিনী। | হুকুম: সম্পূর্ণ হারাম ও পরিত্যাজ্য। এটি বিশ্বাস করা নাজায়েজ এবং এর অসাড়তা ও মিথ্যা খণ্ডনের উদ্দেশ্য ছাড়া তা সাধারণ্যে প্রচার করা নিষিদ্ধ। যেমন: হযরত সুলাইমান (আ.)-এর আংটি চুরি ও মূর্তিপূজার অপবাদ, হারূত-মারূতের ব্যভিচারের গল্প। |
| ৩. মাসকূত আনহু বা নিরপেক্ষ (ما سكت عنه شرعنا) |
যেসব বিষয়ে ইসলামী শরীয়ত কোনো সমর্থনও দেয়নি, আবার সরাসরি বিরোধিতাও করেনি। যা সাধারণত অপ্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি বিবরণ সংবলিত। | হুকুম: তাওয়াক্কুফ (নীরবতা) পালন করা। একে নিশ্চিত সত্য মনে করা যাবে না, আবার মিথ্যাও বলা যাবে না। কেবল ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে শর্তসাপেক্ষে উদ্ধৃত করা জায়েয, তবে দ্বীনি দিক থেকে এতে কোনো ফায়দা নেই। যেমন: আসহাবে কাহাফের কুকুরের গায়ের রঙ, ইউনুস (আ.)-এর মাছের প্রকারভেদ। |
(গ) الفرق بين الإسرائيليات والدخيل (ইসরাঈলিয়াত ও দাখীল-এর মধ্যকার পার্থক্য)
ইসলামী গবেষণা ও উলূমুত তাফসীরে ‘ইসরাঈলিয়াত’ ও ‘দাখীল’ দুটি অত্যন্ত সুপরিচিত পরিভাষা। এদের সম্পর্ক হলো আম্ম ও খাছ মুত্বলাক্ব (العموم والخصوص المطلق)। অর্থাৎ দাখীল একটি ব্যাপক অর্থবোধক পরিভাষা, আর ইসরাঈলিয়াত হলো তার একটি বিশেষ অংশ।
| তুলনার বিষয় | ইসরাঈলিয়াত (الإسرائيليات) | দাখীল (الدخيل في التفسير) |
|---|---|---|
| উৎস ও পরিধি | এর উৎস সুনির্দিষ্ট—শুধুমাত্র ইহুদি ও খ্রিস্টান (আহলে কিতাব) ধর্মগ্রন্থ, সংস্কৃতি ও লোকগাথা। | এর পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। এতে আহলে কিতাবের বর্ণনা ছাড়াও জাল ও বানোয়াট হাদীস, শী’আ ও মু’তাযিলাদের বাতিল আকিদা, ভণ্ড সুফিদের অমূলক রূপক এবং গ্রিক দর্শনের অনুপ্রবেশ শামিল। |
| গ্রহণযোগ্যতার সম্ভাবনা | এর কিছু অংশ সত্য হতে পারে (যদি তা কুরআন-হাদীস সমর্থিত হয়)। | দাখীল সর্বদাই অসত্য, ভিত্তিহীন ও বর্জনীয়; কারণ তা কুরআনের অপব্যাখ্যার জন্য বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। |
| সম্পর্ক | প্রতিটি ইসরাঈলিয়াতই বৃহত্তর অর্থে ‘দাখীল’। | প্রতিটি দাখীল ইসরাঈলিয়াত নয় (যেমন মাওদূ’ হাদীস দাখীল, কিন্তু তা ইসরাঈলিয়াত নয়)। |
উপসংহার
ইসরাঈলিয়াত ও দাখীলের যথাযথ স্বরূপ ও পার্থক্য জানা একজন গবেষক ও মুফাসসিরের জন্য অতীব জরুরি। এর মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধতা রক্ষা পায় এবং অপ্রমাণিত কুসংস্কার থেকে দ্বীনকে মুক্ত রাখা সম্ভব হয়।
٢- تحدث عن أسباب تسرب الإسرائيليات في التفسير مفصلا-
তাফসীর শাস্ত্রে ইসরাঈলিয়্যাতের অনুপ্রবেশের কারণসমূহ সবিস্তারে আলোচনা কর।
ভূমিকা
রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কিরামের যুগে তাফসীর শাস্ত্র ছিল বিশুদ্ধ ও সুসংহত। কিন্তু পরবর্তী যুগে ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সামাজিক কারণে তাফসীরের ভেতর ইসরাঈলী বর্ণনার প্রবল অনুপ্রবেশ ঘটে। এই অনুপ্রবেশ আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না; বরং এর পেছনে বহুবিধ ঐতিহাসিক, মনস্তাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা সক্রিয় ছিল।
তাফসীরে ইসরাঈলিয়াত অনুপ্রবেশের প্রধান কারণসমূহ (أسباب التسرب)
১. জাহেলী যুগে আরব ও আহলে কিতাবদের সামাজিক সহাবস্থান
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবরা ছিল নিরক্ষর (উম্মী)। মদীনা, খায়বার, ফাদাক ও তায়মায় ইহুদিদের বসতি ছিল এবং ইয়েমেনে ইহুদি ও খ্রিস্টান সংস্কৃতির প্রভাব ছিল। আরবরা ধর্মীয় ইতিহাস ও সৃষ্টিতত্ত্বের বিষয়ে আহলে কিতাবদের পণ্ডিত মনে করত এবং জটিল বিষয়ে তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করত। এই মানসিকতা ইসলাম গ্রহণের পরও কিছু মানুষের অবচেতনে রয়ে যায়।
২. বিপুল সংখ্যক আহলে কিতাবের ইসলাম গ্রহণ
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলে বহু ইহুদি ও খ্রিস্টান পণ্ডিত ইসলাম গ্রহণ করেন (যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম, কা’ব আল-আহবার, ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ প্রমুখ)। যদিও তাঁরা খাঁটি মুসলিম ছিলেন, কিন্তু তাঁদের স্মৃতিতে পূর্ববর্তী তৌরাত, তালমুদ ও মিদ্রাশের অগাধ গল্পগাথা জমা ছিল। সাহাবা ও তাবেঈগণ কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপট জানতে চাইলে তাঁরা পূর্ববর্তী ধর্মীয় কিতাবের আলোকে তা বর্ণনা করতেন।
৩. কুরআনের সংক্ষেপণ ও মানুষের অপ্রয়োজনীয় কৌতূহল (إبهام القرآن وفضول المعرفة)
পবিত্র কুরআন কেবল হেদায়াতের কিতাব। এটি কোনো ঐতিহাসিক উপন্যাসের মতো অপ্রয়োজনীয় নাম, স্থান, তারিখ, আকার বা বংশলতিকার বিশদ বিবরণ দেয় না। যেমন:
- আসহাবে কাহাফের যুবকদের সংখ্যা কত ছিল? তাঁদের কুকুরের গায়ের রঙ কী ছিল?
- হযরত মূসা (আ.)-এর লাঠিটি কোন গাছের তৈরি ছিল?
- সূরা আল-বাক্বারায় নিহত ব্যক্তিকে গরুর কোন অংশ দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল?
কুরআন এই বিবরণগুলো উহ্য রেখেছে কারণ হেদায়াতের জন্য তা মোটেও জরুরি নয়। কিন্তু মানবীয় সাধারণ কৌতূহলবশত পরবর্তী যুগের মানুষ এসব অন্বেষণ করতে গিয়ে আহলে কিতাবদের পৌরাণিক গল্পের শরণাপন্ন হয়।
৪. তাফসীর সংকলকদের অসচেতনতা ও সনদসর্বস্বতা
তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈদের যুগে যখন তাফসীর সংকলন শুরু হয়, তখন প্রাথমিক মুফাসসিরদের মূল লক্ষ্য ছিল সমকালে প্রচলিত সকল বর্ণনাকে সনদসহ একত্রিত করা। তাঁরা মনে করেছিলেন সনদ উল্লেখ করে দিলেই দায়িত্ব শেষ, সত্য-মিথ্যার যাচাই পরবর্তী গবেষকরা করবেন। কিন্তু সাধারণ পাঠক সনদ যাচাই না করেই গল্পগুলোকে সত্য বলে গ্রহণ করতে শুরু করে।
৫. ইসলামবিদ্বেষী যিন্দীক্বদের চক্রান্ত ও অনুপ্রবেশ
ইসলামের রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত বিজয়ে ঈর্ষান্বিত হয়ে কিছু কপট ইহুদি, পারসিক ও যিন্দীক্ব মুসলিমদের বেশ ধরে ইসলামে প্রবেশ করে। তারা পবিত্র কুরআনের আভিজাত্য নষ্ট করতে এবং নবীদের চরিত্র কলঙ্কিত করতে ইচ্ছাকৃতভাবে উদ্ভট ও কুৎসিত গল্পগাথা ছড়িয়ে দেয় (যেমন ইবনে কুতাইবাহ ও আল্লামা সুয়ূতী উল্লেখ করেছেন)।
৬. গল্পকারদের (القُصَّاص) বাণিজ্যিক ও চটকদার প্রবণতা
উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে মসজিদে মসজিদে সাধারণ মানুষের সমাবেশ ঘটিয়ে গল্পকাররা (কুস্সাস) ওয়াজ করত। সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ ও হাদিয়া লাভের জন্য তারা চটকদার, অলৌকিক ও রোমাঞ্চকর ইসরাঈলী কাহিনীর আশ্রয় নিত। এই গল্পগুলো লোকমুখে ছড়িয়ে একসময় তাফসীরের টিকায় স্থান পেয়ে যায়।
উপসংহার
এই নানাবিধ কারণে তাফসীর শাস্ত্রে ইসরাঈলিয়াত ঢুকে পড়ে। তবে মুসলিম উম্মাহর মহান মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণ কালক্রমে তাহকীক ও আসমাউর রিজালের মাধ্যমে এসব ভেজাল ছেঁকে ফেলে কুরআনের মূল শিক্ষাকে চিরভাস্বর রেখেছেন।
٣- ماذا تعرف عن موقف ابن كثير في رواية الإسرائيليات؟ بين مفصلا-
ইসরাঈলী বর্ণনা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে ইমাম হাফেয ইবনে কাসীর (রহ.)-এর অবস্থান সম্পর্কে কী জান? বিশদভাবে আলোচনা কর।
ভূমিকা
অষ্টম শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, ঐতিহাসিক ও মুফাসসির আল্লামা আবুল ফিদা ইমাদুদ্দীন ইবনে কাসীর আশ-শাফিয়ী (৭০১-৭৭৪ হি.) রচিত «تفسير القرآن العظيم» (যা তাফসীরে ইবনে কাসীর নামে সমধিক খ্যাত) তাফসীর বিন-মা’সুরের এক অনন্য মাইলফলক। তাফসীর থেকে ইসরাঈলিয়াত ও ভিত্তিহীন দাখীল বর্জনের ক্ষেত্রে ইবনে কাসীরের অবস্থান ছিল এক বৈপ্লবিক সংস্কারকের মতো।
ইবনে কাসীর (রহ.)-এর তাফসীরী মূলনীতি ও উস্তাদের প্রভাব
হাফেয ইবনে কাসীর ছিলেন শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.)-এর বিশিষ্ট ও প্রিয়তম ছাত্র। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রচিত «مقدمة في أصول التفسير» (মুকাদ্দিমাহ ফী উসূলিত তাফসীর)-এর বৈজ্ঞানিক ও হাদীসভিত্তিক মূলনীতিকে ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীর গ্রন্থে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করেছেন। তাঁর প্রধান নীতি ছিল:
- কুরআন দিয়ে কুরআনের তাফসীর করা।
- সহীহ সুন্নাহ ও হাদীস দিয়ে তাফসীর করা।
- সাহাবায়ে কিরামের আছার দিয়ে ব্যাখ্যা করা।
- তাবেঈদের বিশুদ্ধ বক্তব্য তুলে ধরা।
ইসরাঈলিয়াত সম্পর্কে ইবনে কাসীরের সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও কর্মপদ্ধতি
১. ইসরাঈলী বর্ণনার শ্রেণিবিভাগ ও কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ
ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীরের ভূমিকায় স্পষ্ট ঘোষণা করেন যে, ইসরাঈলী বর্ণনা তিন ভাগে বিভক্ত: (ক) শরীয়ত সমর্থিত—যা সত্য; (খ) শরীয়ত বিরোধী—যা সরাসরি বাতিল; এবং (গ) নিরপেক্ষ—যা গ্রহণ বা বর্জন কোনোটাই নিশ্চিত নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, তৃতীয় প্রকারটি কেবল তথ্য হিসেবে ছাড়া দ্বীনের কোনো দলিলে ব্যবহৃত হতে পারে না।
২. ইসরাঈলিয়াত উল্লেখ করে তাৎক্ষণিক খণ্ডন ও সমালোচনা (نقد الروايات وتزييفها)
ইমাম ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীরে অনেক স্থানে পূর্ববর্তী তাফসীরকারদের (যেমন ইমাম তাবারী, সা’লাবী, বাগাভী) সূত্রে ইসরাঈলী বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন; কিন্তু তিনি তা উদ্ধৃত করেই ক্ষান্ত হননি, বরং সাথে সাথে কঠোর ভাষায় তার অসাড়তা ও মিথ্যা প্রমাণ করেছেন। তিনি প্রায়ই লিখতেন:
«وَهَذَا مِنْ خُرَافَاتِ بَنِي إِسْرَائِيلَ الَّتِي لَا أَصْلَ لَهَا» (এটি বনী ইসরাঈলের ভিত্তিহীন অলীক রূপকথা বৈ কিছু নয়)।
কিংবা বলতেন: «وَالظَّاهِرُ أَنَّهَا مِمَّا تَلَقَّاهُ كَعْبُ الْأَحْبَارِ عَنْ كُتُبِهِمُ الْمُحَرَّفَةِ» (স্পষ্টতই এটি কা’ব আল-আহবার তাদের বিকৃত কিতাবসমূহ থেকে গ্রহণ করেছেন)।
৩. আম্বিয়ায়ে কিরামের পবিত্রতা ও ইসমতের অটল প্রতিরক্ষা
যেসব ইসরাঈলী বর্ণনায় নবীদের চরিত্রে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, ইবনে কাসীর সেখানে বজ্রকণ্ঠে তার প্রতিবাদ করেছেন:
- হযরত সুলাইমান (আ.)-এর আংটি চুরি: শয়তান সুলাইমান (আ.)-এর আংটি চুরি করে চল্লিশ দিন রাজ্য শাসন করেছিল এবং তাঁর ঘরে মূর্তিপূজা হয়েছিল—এই জঘন্য ইসরাঈলী বর্ণনাকে ইবনে কাসীর তীব্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করে ‘মুনকার ও বাতিল’ ঘোষণা করেছেন।
- হযরত দাউদ (আ.) ও উরিয়ার স্ত্রীর ঘটনা: সূরা ছোয়াদে দাউদ (আ.)-এর কাছে দুই বিবাদীর আগমনের ঘটনায় তৌরাতের বিকৃত রূপকথা উল্লেখ করে বলা হয়েছিল দাউদ (আ.) তাঁর সেনাপতির স্ত্রীকে ছিনিয়ে নেওয়ার চক্রান্ত করেছিলেন। ইবনে কাসীর এই নোংরা ইসরাঈলী কাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং আম্বিয়াদের পবিত্রতা রক্ষা করেছেন।
- হযরত আইয়ূব (আ.)-এর রোগব্যাধি: আইয়ূব (আ.)-এর দেহে পোকা জন্মেছিল এবং দুর্গন্ধে মানুষ তাঁকে আবর্জনার স্তূপে ফেলে দিয়েছিল—এই বর্ণনাকে ইবনে কাসীর ভিত্তিহীন ও নবীদের মর্যাদাহানিকর বলে রদ করেছেন।
৪. অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক খুঁটিনাটি বর্ণনার তীব্র বিরোধিতা
কুরআন যেখানে বিস্তারিত বিবরণ দেয়নি, সেখানে কৃত্রিম অনুসন্ধিৎসাকে তিনি কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন। যেমন সূরা আল-কাহফের আসহাবে কাহাফের কুকুরটির রঙ ও জাত সম্পর্কে দীর্ঘ ইসরাঈলী বর্ণনার পর তিনি মন্তব্য করেন:
«وَلَا طَائِلَ تَحْتَ مَعْرِفَةِ ذَلِكَ، وَلَا حَاجَةَ إِلَيْهِ، إِذْ لَوْ كَانَ فِيهِ مَصْلَحَةٌ لَبَيَّنَهُ اللَّهُ لَنَا»
(এই কাল্পনিক তথ্য জানার পেছনে কোনো লাভ নেই এবং এর কোনো প্রয়োজনও নেই; কেননা এতে যদি দ্বীনি কোনো ফায়দা থাকত তবে আল্লাহ তা’আলা নিজেই তা আমাদের কাছে স্পষ্ট করে দিতেন)।
উপসংহার
ইসরাঈলী বর্ণনার অন্ধ অনুকরণের যুগে হাফেয ইবনে কাসীর ছিলেন এক সতর্ক প্রহরীর মতো। তাঁর এই আপসহীন হাদীসভিত্তিক ও যুক্তিনির্ভর তাহকীক তাফসীর শাস্ত্রকে কলুষমুক্ত করতে সর্বকালের সেরা অবদান রেখেছে।
٤- تحدث عن الإسرائيليات في قصة ذي القرنين مفصلا-
হযরত যুল কারনাইন (ذو القرنين)-এর কাহিনীতে অনুপ্রবেশকারী ইসরাঈলী বর্ণনাসমূহ সবিস্তারে আলোচনা কর।
ভূমিকা
সূরা আল-কাহফের ৮৩ থেকে ৯৮ নম্বর আয়াতে এক মহান, একত্ববাদী ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ‘যুল কারনাইন’-এর ঐতিহাসিক দিগ্বিজয়, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে অভিযান এবং ইয়াজুজ-মাজুজের পথ রোধে প্রাচীর নির্মাণের বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। কিন্তু এই মহিমান্বিত কুরআনী কাহিনীর ছায়ায় আহলে কিতাব ও প্রাচীন পৌরাণিক লোকগাথা থেকে বহু আজগুবি ও অবাস্তব ইসরাঈলিয়াত তাফসীরের কিতাবে অনুপ্রবেশ করেছে।
(ক) যুল কারনাইন সম্পর্কিত কুরআনী মূল তথ্য
মক্কার কুরাইশরা মদীনার ইহুদি পণ্ডিতদের পরামর্শে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তিনটি প্রশ্ন করেছিল, যার একটি ছিল যুল কারনাইন সম্পর্কে। কুরআন স্পষ্ট জানায়—তিনি ছিলেন একজন মুমিন, পরাক্রমশালী শাসক, যাঁকে আল্লাহ জমিনে শাসনক্ষমতা ও উপায়-উপকরণ দিয়েছিলেন। তিনি পূর্ব ও পশ্চিমে সফর করে মজলুমদের উদ্ধার করেন এবং এক প্রান্তে তামা ও লোহা গলিয়ে দুর্ভেদ্য প্রাচীর নির্মাণ করেন।
(খ) যুল কারনাইন কাহিনীতে অনুপ্রবেশকারী প্রধান প্রধান ইসরাঈলিয়াত
১. যুল কারনাইনের পরিচয় ও আলেকজান্ডারের সাথে সংমিশ্রণ
ইসরাঈলী ও গ্রিক রূপকথার প্রভাবে বহু মুফাসসির ভুলবশত যুল কারনাইনকে মেসিডোনিয়ার বিখ্যাত গ্রিক দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট (Alexander the Great) বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তাহকীক ও খণ্ডন:
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ ও হাফেয ইবনে কাসীর প্রমাণ করেছেন যে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ছিলেন একজন মুশরিক, মূর্তিপূজক এবং অ্যারিস্টটলের ছাত্র, যিনি খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৩৩০ অব্দে বেঁচে ছিলেন। পক্ষান্তরে কুরআনের যুল কারনাইন ছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সমকালীন একনিষ্ঠ তাওহীদবাদী মুমিন শাসক। উভয়ের মাঝে প্রায় দুই হাজার বছরের ব্যবধান। এই বিকৃতিটি ছিল সরাসরি গ্রিক ও ইহুদি পৌরাণিক সংমিশ্রণ।
২. ‘যুল কারনাইন’ নামকরণের আজগুবি পৌরাণিক ব্যাখ্যা
কুরআনে তাঁকে ‘যুল কারনাইন’ (দুই শিং বা দুই প্রান্তের অধিকারী) বলা হয়েছে কারণ তিনি পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন (قرنا الشمس)। কিন্তু ইসরাঈলী বর্ণনায় বলা হয়েছে:
- তাঁর মাথায় সত্যিই প্রাণীর মতো দুটি শারীরিক শিং ছিল, যা তিনি পাগড়ি দিয়ে ঢেকে রাখতেন!
- কিংবা তাঁকে যুদ্ধে মাথায় আঘাত করে এক শিং কাটা হয়েছিল, পরে তিনি পুনরুজ্জীবিত হয়ে আবার আঘাত পেয়েছিলেন!
এই সমস্ত বর্ণনা স্পষ্টতই আহলে কিতাবের রূপকথা এবং সুস্থ বিবেক ও শরীয়ত বিরোধী।
৩. ‘আবে হায়াত’ (অমরত্বের ঝর্ণা) ও হযরত খিজির (আ.)-এর অভিযান
তাফসীরের কিছু কিতাবে সুদীর্ঘ ইসরাঈলী গল্প আনা হয়েছে যে, যুল কারনাইন অন্ধকার জগতে (যুলুমাত) গিয়ে এমন এক পানির ঝর্ণা খুঁজেছিলেন যার পানি পান করলে মানুষ অমর হয়ে যায়। তাঁর সঙ্গী হিসেবে হযরত খিজির (আ.) সেই পানি পান করে অমর হয়ে যান, কিন্তু যুল কারনাইন তা পান করতে পারেননি!
তাহকীক: ইমাম ইবনে কাসীর বলেন—এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কাহিনী। আল্লাহ ছাড়া কেউই অমর নয় (﴿وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ مِنْ قَبْلِكَ الْخُلْدَ﴾—সূরা আল-আম্বিয়া: ৩৪)।
৪. ইয়াজুজ-মাজুজের আকৃতি নিয়ে অতিপ্রাকৃতিক কল্পকাহিনী
যুল কারনাইনের প্রাচীর নির্মাণের বর্ণনায় ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায়ের শারীরিক গঠন নিয়ে ইসরাঈলিয়াত প্রবেশ করেছে:
- তাদের একেকজনের উচ্চতা এক বিঘত বা অতি দীর্ঘ গাছের সমান।
- তাদের একটি কান এত বিশাল যে তা মাটিতে বিছিয়ে বিছানা বানায় এবং অপর কানটি দিয়ে শরীর ঢেকে চাদরের মতো ঘুমায়!
- তারা প্রতিদিন পাহাড় চেটে শেষ করে ফেলে ইত্যাদি।
তাহকীক: সহীহ হাদীস অনুযায়ী ইয়াজুজ-মাজুজ সাধারণ আদম সন্তান ও মানবজাতির অংশ (হযরত নূহ আ.-এর পুত্র ইয়াফিসের বংশধর)। তাদের এই দানবীয় শারীরিক বর্ণনা আহলে কিতাবদের বিকৃত কল্পনার ফসল।
উপসংহার
যুল কারনাইনের কুরআনী ঘটনা হলো একজন ন্যায়পরায়ণ তাওহীদবাদী শাসকের অনুপম আদর্শ। ইসরাঈলী পৌরাণিক কল্পকাহিনী বাদ দিয়ে কুরআনের মূল বক্তব্য ও সহীহ হাদীসের ওপর নির্ভর করাই হলো বিশুদ্ধ তাফসীরের একমাত্র পথ।
٥- ما هي المرويات الإسرائيلية في خلق أدم عليه السلام؟ بين موضحا-
হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টির ঘটনা সংশ্লিষ্ট ইসরাঈলী বর্ণনাগুলো কী কী? বিশদভাবে আলোচনা কর।
ভূমিকা
মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি ছিল মহাবিশ্বের ইতিহাসে এক মহাবিস্ময়কর অধ্যায়। পবিত্র কুরআনের বহু সূরায় (যেমন আল-বাক্বারাহ, আল-আ’রাফ, আল-হিজর, ছোয়াদ) আদমের সৃষ্টি, তাঁকে সিজদা করার নির্দেশ, ইবলীসের অহংকার এবং জান্নাতে অবস্থানের মর্যাদাপূর্ণ বিবরণ এসেছে। তবে তৌরাত ও তালমুদের বিকৃত বর্ণনা থেকে আদম (আ.)-এর সৃষ্টির বিষয়ে বহু বিভ্রান্তিকর ইসরাঈলিয়াত তাফসীরের পাতায় স্থান পেয়েছে।
আদম (আ.) সৃষ্টির ঘটনা সংশ্লিষ্ট প্রধান ইসরাঈলী বর্ণনাসমূহ
১. মহাবিশ্ব ও আদম সৃষ্টির সময়কাল এবং ‘ঈশ্বরের বিশ্রামের’ কুফরী ধারণা
বর্তমান বাইবেলের বুক অব জেনেসিস (Genesis)-এর বিকৃত বর্ণনা অনুযায়ী ঈশ্বর মহাবিশ্ব ৬ দিনে সৃষ্টি করে ক্লান্ত হয়ে ৭ম দিনে (শনিবার) বিশ্রাম নেন (নাউযুবিল্লাহ)। অতঃপর আদমকে সৃষ্টি করা হয়।
কুরআনী খণ্ডন: আল্লাহ তা’আলা স্পষ্ট ভাষায় এই ইহুদি মিথ্যাচার খণ্ডন করে বলেন:
﴿وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَمَا مَسَّنَا مِنْ لُغُوبٍ﴾
“আর নিশ্চয়ই আমি আসমানসমূহ ও পৃথিবী এবং উভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছি এবং কোনো ক্লান্তি আমাকে স্পর্শ করেনি।” (সূরা ক্বাফ: ৩৮)।
২. মাটি সংগ্রহের ক্ষেত্রে আজগুবি রূপক ও মাটির বিভাজন
তাফসীরের কিছু কিতাবে তৌরাতের বর্ণনায় এসেছে যে, আল্লাহ যখন জিবরীল, মীকাঈল ও ইসরাফিলকে মাটি আনতে পাঠালেন তখন পৃথিবী তাঁদের কাছে দোহাই দিল। পরে মালাকুল মাউত জোরপূর্বক বিভিন্ন রঙের মাটি এনে আদমকে বানালেন। যদিও সহীহ হাদীসে বিভিন্ন রঙের মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টির কথা রয়েছে (তিরমিযী: ২৯৫৫), কিন্তু ইসরাঈলিয়াতের মধ্যে আদমের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ পৃথিবীর কোন কোন নির্দিষ্ট স্থানের মাটি থেকে তৈরি (যেমন মাথা বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে, বক্ষ কা’বা থেকে, পা বাবিল থেকে ইত্যাদি) এমন সব ভিত্তিহীন বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে যার কোনো সনদ নেই।
৩. হাওয়া (আ.)-এর সৃষ্টি ও নারীর প্রতি অসম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি
তৌরাতের অনুকরণে ইসরাঈলী বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, আদম যখন গভীর ঘুমে অচেতন ছিলেন, তখন ঈশ্বর তাঁর বাম পাঁজরের হাড় কেটে মাংস দিয়ে স্থানটি পূরণ করেন এবং হাওয়াকে বানান। এই বিবরণ দিতে গিয়ে কিছু বর্ণনায় হাওয়া (আ.)-কে বক্র স্বভাবের ও পাপের মূল কারণ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি: ইসলাম হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টির ক্ষেত্রে নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেনি। রাসূলুল্লাহ (সা.) পাঁজরের হাড়ের উপমা দিয়ে মূলত নারীর প্রতি কোমল ও যত্নবান আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁদের হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য নয়।
৪. শয়তানের জান্নাতে প্রবেশের অদ্ভুত পৌরাণিক গল্প (সাপ ও ময়ূরের ভূমিকা)
আদম ও হাওয়াকে প্রলুব্ধ করতে ইবলীস কীভাবে নিষিদ্ধ জান্নাতে প্রবেশ করেছিল—তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাফসীরে সা’লাবী ও তাবারীতে কুৎসিত ইসরাঈলিয়াত আনা হয়েছে:
রূপকথা: ময়ূর পাখি পাহারা দিত। ইবলীস জান্নাতের প্রহরীদের ফাঁকি দিতে বিষাক্ত সাপের মুখের ভেতরে বা পেটে লুকিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করে এবং হাওয়াকে প্রলুব্ধ করে। ফলে আল্লাহ ক্ষুব্ধ হয়ে ময়ূরের সুন্দর পা কুৎসিত করে দেন এবং সাপের পা কেটে বুকে ভর দিয়ে চলার অভিশাপ দেন!
তাহকীক ও খণ্ডন: আল্লামা ইবনে কাসীর এই গল্পকে চরমভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এটি ইহুদিদের মনগড়া কল্পকাহিনী। কুরআন স্পষ্ট জানায় ইবলীস জান্নাতের বাইরে থেকেই দূর থেকে ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা দিয়েছিল (﴿فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ﴾)। কোনো সাপ বা ময়ূরের সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না।
৫. নিষিদ্ধ ফল ও ‘আদি পাপ’ (Original Sin)-এর বিকৃত ধারণা
ইসরাঈলী বর্ণনায় নিষিদ্ধ ফলটিকে ‘জ্ঞানবৃক্ষ’ (Tree of Knowledge) বা গম/আঙুর ইত্যাদি বলা হয়েছে এবং দাবি করা হয়েছে যে ফল খাওয়ার পর তাদের চোখ খুলেছিল এবং ঈশ্বর ভয় পেয়েছিলেন যে মানুষ তাঁর সমকক্ষ হয়ে যাবে (নাউযুবিল্লাহ)!
কুরআনী সত্য: আদম ও হাওয়া কোনো জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাননি; তাঁরা আল্লাহর একটি পরীক্ষা ও সতর্কতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কুরআন খ্রিস্টধর্মের মতো আদমের পাপের বোঝা বংশপরম্পরায় চাপিয়ে দেয়নি; বরং আল্লাহ বলেন, আদম তাঁর রবের কাছে তাওবা করেছিলেন এবং আল্লাহ তাঁকে মাফ করে সম্মানিত নবীরূপে দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন (সূরা আল-বাক্বারাহ: ৩৭)।
উপসংহার
আদম (আ.) সৃষ্টির ঘটনা আল্লাহর পরম কুদরত ও ভালোবাসার নিদর্শন। ইসরাঈলিয়াতের বিষাক্ত প্রভাবমুক্ত হয়ে কুরআনের মূল বিবরণ অনুধাবন করলেই মানব সৃষ্টির আদি মর্যাদা উপলব্ধি করা সম্ভব।
٦- تحدث عن الإسرائيليات المتعلقة بعمر الدنيا وبدء الخلق-
পৃথিবীর বয়স ও সৃষ্টিজগতের সূচনা সংশ্লিষ্ট ইসরাঈলী বর্ণনাসমূহ সবিস্তারে আলোচনা কর।
ভূমিকা
মহাবিশ্ব সৃষ্টির সূচনা কীভাবে হয়েছিল এবং পৃথিবী কত বছর ধরে টিকে থাকবে—এ নিয়ে প্রাচীন যুগ থেকেই মানুষ নানা জল্পনা-কল্পনা করে এসেছে। বিশেষ করে ইহুদি ও খ্রিস্টান পণ্ডিতদের তালমুদী সাহিত্যে পৃথিবীর সুনির্দিষ্ট বয়স ও সৃষ্টির দিনক্ষণ নিয়ে বহু অবাস্তব বর্ণনা ছিল, যা পরবর্তীতে ইসলামী সাহিত্যের বিভিন্ন প্রাচীন ইতিহাস ও তাফসীর গ্রন্থে স্থান পায়।
(ক) পৃথিবীর বয়স সম্পর্কিত প্রধান ইসরাঈলী বর্ণনাসমূহ
১. পৃথিবীর বয়স মাত্র ৭০০০ বছর হওয়ার আখ্যান
তৌরাতের বিকৃত বংশলতিকা এবং রাব্বাইদের গণনার ওপর ভিত্তি করে ইসরাঈলিয়াত দাবি করে যে, পৃথিবীর মোট বয়স মাত্র ৭,০০০ (সাত হাজার) বছর।
- তাদের মতে, আদম (আ.) থেকে মূসা (আ.) পর্যন্ত সময়ের সুনির্দিষ্ট বছর রয়েছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত মোট সময়কাল হলো সাত দিন বা সাত সহস্রাব্দ।
- সপ্তম সহস্রাব্দে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। কিছু বর্ণনায় একে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি মিথ্যারোপ করে হাদীস হিসেবে চালানোর অপচেষ্টা করা হয়েছিল (যেমন: «الدُّنْيَا سَبْعَةُ آلَافِ سَنَةٍ، وَأَنَا فِي آخِرِهَا أَلْفًا»)।
২. সৃষ্টির সপ্তাহের প্রতিটি দিনের কাল্পনিক বরাদ্দ
ইসরাঈলী বর্ণনায় সপ্তাহের দিনগুলোতে কোন দিন কী সৃষ্টি হয়েছে তার অদ্ভুত তালিকা দেওয়া হয়েছে; যেমন: রবিবারে আলো ও অন্ধকার, সোমবারে আকাশ, মঙ্গলবারে গাছপালা, বুধবারে গ্রহ-নক্ষত্র, বৃহস্পতিবারে জলচর প্রাণী, শুক্রবারে আদম এবং শনিবারে বিশ্রাম।
(খ) ইসলামী তাহকীক ও কুরআনিক-বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ
১. মুহাদ্দিসীনদের দ্বারা ৭০০০ বছরের বর্ণনার অকাট্য খণ্ডন
ইমাম ইবনুল জাওযী তাঁর «الموضوعات» (আল-মাওদূ’আত) গ্রন্থে এবং আল্লামা ইবনে কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ তাঁর «المنار المنيف» গ্রন্থে পৃথিবীর বয়স নির্ধারণকারী সকল বর্ণনাকে সম্পূর্ণ জাল, বানোয়াট ও ইসরাঈলী প্রসূত ঘোষণা করেছেন। ইবনে কায়্যিম বলেন:
«كُلُّ حَدِيثٍ فِيهِ تَقْدِيرُ عُمْرِ الدُّنْيَا وَتَحْدِيدُ وَقْتِ قِيَامِ السَّاعَةِ فَهُوَ كَذِبٌ مُخْتَلَقٌ»
(যেসব বর্ণনায় পৃথিবীর বয়সের নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে বা কেয়ামতের দিনক্ষণ নির্দিষ্ট করা হয়েছে, তার প্রতিটি বর্ণনাই ডাহা মিথ্যা ও মনগড়া)।
২. কুরআনের ‘আইয়্যাম’ (ছয় দিন)-এর প্রকৃত বৈজ্ঞানিক অর্থ
পবিত্র কুরআন ঘোষণা করে যে আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীকে ‘সিত্তাতু আইয়্যাম’ (ছয় দিনে) সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু কুরআনের এই ‘ইয়াওম’ (দিন) আমাদের পার্থিব ২৪ ঘণ্টার দিন নয়; কারণ তখন সূর্য বা পৃথিবীর আবর্তনই সৃষ্টি হয়নি! কুরআনেই আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন:
﴿وَإِنَّ يَوْمًا عِنْدَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِمَّا تَعُدُّونَ﴾ (আর নিশ্চয়ই আপনার প্রতিপালকের কাছে একদিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান—সূরা আল-হাজ্জ: ৪৭)।
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে: ﴿فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ﴾ (পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান একদিনে—সূরা আল-মা’আরিজ: ৪)।
অতএব, কুরআনের ছয় দিন অর্থ হলো সৃষ্টির ছয়টি বিশাল মহাজাগতিক যুগ (Six Cosmic Epochs/Eras)।
৩. আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূতত্ত্ব প্রমাণ করেছে যে পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর এবং মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। ইসরাঈলিয়াতের সংকীর্ণ ৭০০০ বছরের দাবি আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণার কাছে সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়েছে। পক্ষান্তরে কুরআনের কোনো বক্তব্য আধুনিক বিজ্ঞানের প্রমাণিত সত্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।
উপসংহার
কেয়ামত কবে হবে এবং পৃথিবীর প্রকৃত আয়ুষ্কাল কত—তা একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কারও জানা নেই (﴿إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّي﴾)। ইসরাঈলী ৭০০০ বছরের ধারণা ইসলামী আকীদা ও আধুনিক বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ বিপরীত এক বানোয়াট কুসংস্কার।
٧- ماذا تعرف عن هاروت وماروت؟ وما الروايات الإسرائيلية المتعلقة بهما؟ بين-
হারূত ও মারূত (هاروت وماروت) সম্পর্কে তুমি কী জান? তাঁদের সম্পর্কিত ইসরাঈলী বর্ণনাসমূহ কী? বিশদভাবে আলোচনা কর।
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাক্বারার ১০২ নম্বর আয়াতে সুলাইমান (আ.)-এর যুগে শয়তানদের জাদুচর্চা এবং বাবেল শহরে হারূত ও মারূত নামক দুই ফেরেশতার অবতরণের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। তৎকালীন সময়ে মানুষকে জাদুর ফেতনা থেকে রক্ষা ও পরীক্ষার জন্য আল্লাহ তাঁদের পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এই পবিত্র কুরআনী আয়াতের অপব্যাখ্যা করে আহলে কিতাবের বিকৃত রূপকথা মুসলিম তাফসীর শাস্ত্রে এমনভাবে প্রবিষ্ট হয়েছে, যা ফেরেশতাদের নিষ্পাপত্বের মূল ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়ার উপক্রম করেছিল।
(ক) হারূত ও মারূত সম্পর্কে কুরআনের বিশুদ্ধ বক্তব্য
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা স্পষ্ট ভাষায় বলেন:
﴿وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَٰكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ وَمَا أُنْزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ ۚ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ﴾
“সুলাইমান কুফরি করেননি; বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল, তারা মানুষকে জাদু শিক্ষা দিত। আর বাবেলে হারূত ও মারূত নামক দুই ফেরেশতার ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছিল তাও শেখাত। অথচ তাঁরা উভয়ে কাউকে কিছু শেখাতেন না যতক্ষণ না বলতেন: আমরা তো কেবল পরীক্ষার জন্য প্রেরিত হয়েছি, অতএব তোমরা কুফরি করো না।” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১০২)।
বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা: তাঁরা ছিলেন আল্লাহর অনুগত ফেরেশতা। মানুষকে জাদুর স্বরূপ চিনিয়ে সতর্ক করার জন্য তাঁদের পাঠানো হয়েছিল যাতে মানুষ জাদুকরদের ভেলকিবাজিতে বিভ্রান্ত না হয়।
(খ) প্রচলিত কুৎসিত ইসরাঈলী রূপকথা (الروايات الإسرائيلية الباطلة)
তাফসীরে তাবারী ও অন্যান্য কিছু গ্রন্থে বনী ইসরাঈলের সূত্রে হারূত-মারূতের এক অদ্ভুত ও ভিত্তিহীন গল্প আনা হয়েছে:
- ফেরেশতাদের চ্যালেঞ্জ: আদম সন্তানরা যখন জমিনে পাপে লিপ্ত হলো, তখন ফেরেশতারা তাদের নিন্দা করে। আল্লাহ বললেন: তাদের ভেতর যে প্রবৃত্তি ও কামভাব দেওয়া হয়েছে তা যদি তোমাদের দেওয়া হতো তবে তোমরাও পাপ করতে। ফেরেশতারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে হারূত ও মারূতকে মনোনীত করল।
- দুনিয়ায় অবতরণ ও কামভাবের শিকার: আল্লাহ তাঁদের মানবদেহ ও প্রবৃত্তি দিয়ে জমিনে বিচারপতি হিসেবে পাঠালেন। বাবেলে ‘যোহরা’ (الزهرة) নামী এক অতি রূপবতী মহিলা বিচারের জন্য তাঁদের কাছে আসে।
- ব্যভিচার, শিরক ও হত্যাকাণ্ড: উভয়ে সেই মহিলার রূপে মুগ্ধ হয়ে কুপ্রস্তাব দেয়। মহিলা বলল: তোমরা যদি আমার মূর্তিপূজা কর, মদ পান কর এবং এই শিশুটিকে হত্যা কর তবে আমি সম্মতি দেব। তাঁরা ভাবলেন মদ খাওয়া অপেক্ষাকৃত ছোট অপরাধ। মদ পানের পর মাতাল অবস্থায় তাঁরা ব্যভিচার করলেন, মূর্তিপূজা করলেন এবং সাক্ষী এক নিরপরাধ শিশুকে হত্যা করলেন!
- ইসমুল আযম ও শুক্র গ্রহে রূপান্তর: মহিলা তাঁদের কাছ থেকে আকাশে ওঠার ‘ইসমুল আযম’ জেনে আকাশে উঠে যায় এবং আল্লাহ তাকে ‘যোহরা’ (ভেনাস বা শুক্র গ্রহ)-এ রূপান্তরিত করেন! আর হারূত ও মারূতকে বাবেলের এক অন্ধকার কূপে কেয়ামত পর্যন্ত উল্টো ঝুলিয়ে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে!
(গ) উলামায়ে কিরাম কর্তৃক এই কাহিনীর অকাট্য খণ্ডন
হাফেয ইবনে কাসীর, কাযী ইয়াজ, ইমাম কুরতুবী, ইবনে হাযম এবং আল্লামা শানকীতীসহ জমহুর উলামায়ে কিরাম এই গল্পকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, বাতিল ও কুফরী ইসরাঈলিয়াত বলে ফতোয়া দিয়েছেন:
| খণ্ডনের ভিত্তি | কুরআনী দলিল ও যৌক্তিক প্রমাণ |
|---|---|
| ১. ফেরেশতাদের নিষ্পাপত্ব (عصمة الملائكة) |
ফেরেশতারা স্বভাবগতভাবেই পাপমুক্ত, তাঁদের কোনো জৈবিক প্রবৃত্তি নেই। আল্লাহ বলেন: ﴿لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ﴾ (আল্লাহ তাদের যা আদেশ করেন তারা তার অবাধ্য হয় না এবং যা নির্দেশিত হয় তা-ই করে—সূরা আত-তাহরীম: ৬)। সুতরাং তাঁদের ব্যভিচার বা মদ্যপান অসম্ভব। |
| ২. সনদের দুর্বলতা | ইমাম আহমদ ও তাবারীর সনদে বর্ণিত এই সংক্রান্ত হাদীসগুলো মারফূ’ নয়; বরং তা কা’ব আল-আহবার ও ইহুদিদের বর্ণনা থেকে এসেছে (মওকূফ)। ইবনে কাসীর বলেন: এর সকল সূত্রই দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য। |
| ৩. মহাজাগতিক অসঙ্গতি | শুক্র গ্রহ (যোহরা) মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় থেকেই আকাশে বিদ্যমান। কোনো পাপাচারী মহিলা আকাশে উঠে গ্রহ হয়ে যাওয়া পৌরাণিক রূপকথা ছাড়া কিছু নয়। |
উপসংহার
হারূত ও মারূত ছিলেন আল্লাহর অনুগত নিষ্পাপ দূত। তাঁদের ওপর আরোপিত ব্যভিচার ও হত্যাকাণ্ডের রূপকথা ইহুদি ও পারসিক ধর্মের মিশ্রিত বিষবাষ্প, যা একজন মুমিনের পক্ষে বিশ্বাস করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ।
٨- علق على اثنين من الموضوعات التالية:
নিম্নের যে কোনো দুটি বিষয়ে সারগর্ভ টীকা লেখ। (শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক সুবিধার স্বার্থে নিম্নে চারটি বিষয়েরই বিস্তারিত প্রামাণ্য আলোচনা পেশ করা হলো):
(أ) أنواع الدخيل وأماراته (দাখীলের প্রকারভেদ ও আলামতসমূহ)
১. দাখীল (الدخيل)-এর প্রকারভেদ:
তাফসীর শাস্ত্রে অনুপ্রবেশকারী দাখীল প্রধানত দুই প্রকারের হয়ে থাকে:
- (ক) রেওয়ায়েতভিত্তিক দাখীল (الدخيل في المأثور): যা ভুল সনদে রাসূলুল্লাহ (সা.) বা সাহাবাদের নামে চালানো হয়েছে। এর অন্তর্ভুক্ত হলো: (১) বাতিল ও জাল (মাওদূ’) হাদীস, (২) চরম দুর্বল ও পরিত্যক্ত বর্ণনা, এবং (৩) কুৎসিত ইসরাঈলিয়াত যা শরীয়ত বিরোধী।
- (খ) রায় বা বিবেকভিত্তিক দাখীল (الدخيل في الرأي): যা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিকৃতি ঘটায়। এর অন্তর্ভুক্ত হলো: (১) মু’তাযিলা, জাহমিয়্যা ও শী’আদের মনগড়া বিদ’আতী তাফসীর, (২) চরমপন্থী বাতেনী ও সুফিদের অলীক কল্পিত তাফসীর (তাফসীরুল ইশারী আল-ফাসিদ), এবং (৩) কুরআনকে জোরপূর্বক পশ্চিমা দর্শন বা অনড় বিজ্ঞানের সাথে মেলানোর অপচেষ্টা।
২. দাখীলের আলামত বা লক্ষণসমূহ (أمارات الدخيل):
গবেষক উলামাগণ তাফসীরে দাখীল চেনার বেশ কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন:
- কুরআনের সুস্পষ্ট নসের বা সহীহ সুন্নাহর সাথে প্রকাশ্য বৈপরীত্য থাকা।
- ইসলামের অকাট্য আকীদা ও তাওহীদের পরিপন্থী হওয়া।
- আম্বিয়ায়ে কিরামের পবিত্রতা ও ইসমতের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়া।
- বর্ণনার ভাষা আরব্য ফাসাহাত ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাচনভঙ্গির বিপরীত হওয়া।
- সনদে কোনো মিথ্যুক, রাফেযী, যিন্দীক্ব বা চরম দুর্বল রাবীর উপস্থিতি থাকা।
(ب) نشأة الدخيل في التفسير (তাফসীরে দাখীলের উৎপত্তি ও বিকাশ)
১. প্রাথমিক সূচনা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ পর্যন্ত তাফসীর ছিল সম্পূর্ণ নির্ভেজাল। কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর এবং সিফফীন ও জাবালের যুদ্ধের পর মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যখন রাজনৈতিক বিভেদ সৃষ্টি হয়, তখনই দাখীলের বীজ রোপিত হয়। শী’আ, খাওয়ায়েরিজ ও মু’তাযিলা দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক মতবাদ প্রমাণ করতে কুরআনের অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়।
২. উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে বিস্তার:
উমাইয়া যুগের শেষভাগে গল্পকারদের (কুস্সাস) উদ্ভব ঘটে। অন্যদিকে বহু অনারব ও আহলে কিতাব লোক ইসলাম গ্রহণ করায় তাদের প্রাচীন সংস্কৃতি তাফসীরে প্রবেশ করতে থাকে। আব্বাসীয় যুগে যখন গ্রিক দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও চিকিৎসাবিজ্ঞান আরবিতে অনূদিত হয়, তখন একদল চিন্তাবিদ কুরআনের আয়াতকে অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর দর্শনের আলোকে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে, যা তাফসীরে বুদ্ধিবৃত্তিক দাখীলের পথ সুগম করে।
৩. সংকলন ও সংস্কারের যুগ:
পরবর্তীতে ইমাম বুখারী, মুসলিম, ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনে কাসীর ও সুয়ূতী প্রমুখ মনীষীগণ কঠোর তাহকীক চালিয়ে তাফসীর থেকে দাখীল উপাদানসমূহ চিহ্নিত ও পৃথক করার ঐতিহাসিক আন্দোলন পরিচালনা করেন।
(ج) نماذج من الدخيل في التفسير (তাফসীরে দাখীলের কয়েকটি দৃষ্টান্ত)
মুফাসসিরগণ তাফসীরের কিতাবগুলোতে যেসব মারাত্মক দাখীল চিহ্নিত করেছেন, তার কয়েকটি সুনির্দিষ্ট নমুনা নিম্নরূপ:
- গারানীক্বের ঘটনা (قصة الغرانيق): সূরা আল-হাজ্জের ৫২ নম্বর আয়াতের মনগড়া তাফসীরে কিছু বর্ণনা আনা হয় যে, রাসূল (সা.) নাকি সূরা আন-নাজম তিলাওয়াতকালে মক্কার মূর্তিদের প্রশংসা করে শয়তানের বাক্য মুখে এনেছিলেন (নাউযুবিল্লাহ)! কাযী ইয়াজ ও ইবনে কাসীর প্রমাণ করেছেন এটি যিন্দীক্বদের তৈরি এক জঘন্য দাখীল ও জাল বর্ণনা।
- যয়নব (রা.) ও যায়েদ (রা.)-এর বিয়ে সংক্রান্ত মিথ্যাচার: সূরা আল-আহযাবের ৩৭ নম্বর আয়াতের তাফসীরে বাইবেলের অনুকরণে গল্প বানানো হয়েছে যে নবীজি যয়নবকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন! অথচ সত্য হলো জাহেলী যুগের পালক পুত্রের প্রথা ভাঙতে স্বয়ং আল্লাহর হুকুমে এই বিয়ে হয়েছিল।
- বাতেনী ও শী’আদের মনগড়া তাফসীর: যেমন সূরা আল-বাক্বারার ৬৭ নম্বর আয়াতে «إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تَذْبَحُوا بَقَرَةً» (আল্লাহ তোমাদের একটি গাভী জবাইয়ের আদেশ দিচ্ছেন)-এর তাফসীরে চরমপন্থী শী’আরা লিখেছে ‘গাভী’ দ্বারা হযরত আয়েশা (রা.) উদ্দেশ্য (নাউযুবিল্লাহ)! এটি নিকৃষ্টতম দাখীল।
(د) كعب الأحبار (কা’ব আল-আহবার)
১. সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
তাঁর পূর্ণ নাম আবু ইসহাক কা’ব ইবনে মাতি’ আল-হিময়ারী। তিনি ছিলেন ইয়েমেনের হিময়ার গোত্রের একজন শীর্ষস্থানীয় ইহুদি মহাপণ্ডিত (হিব্রু ভাষায় ‘আহবার’ অর্থ বড় আলেম)। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় ইয়েমেনে ছিলেন, তবে হযরত আবু বকর (রা.) অথবা হযরত উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে মদিনায় এসে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি সিরিয়ায় বসবাস করেন এবং ৩২ হিজরীতে হিমসে ইন্তেকাল করেন।
২. সাহাবায়ে কিরামের কাছে তাঁর অবস্থান:
হযরত উমর, মু’আবিয়া এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) তাঁর প্রশংসা করেছেন। ইমাম মু’আবিয়া (রা.) তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন: «إِنْ كَانَ كَعْبُ الْأَحْبَارِ لَأَحَدَ الصَّادِقِينَ» (কা’ব আল-আহবার ছিলেন নিশ্চিতভাবেই সত্যবাদীদের একজন)। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে মুখলিস মুমিন ও সত্যবাদী ছিলেন।
৩. তাফসীরে তাঁর বর্ণনার মূল্যায়ন:
ব্যক্তি হিসেবে তিনি খাঁটি মুমিন ও সত্যবাদী হলেও, তৌরাত ও তালমুদের বিশাল ভাণ্ডার তাঁর স্মৃতিতে সংরক্ষিত ছিল। সাহাবা বা তাবেঈগণ অতীত জাতিদের ইতিহাস জানতে চাইলে তিনি তাঁর স্মৃতি থেকে ইহুদি বর্ণনা শোনাতেন। ফলে পরবর্তী বর্ণনাকারীরা সেগুলোকে তাফসীরে সংমিশ্রিত করে ফেলে। তাই আধুনিক মুহাদ্দিসগণের সিদ্ধান্ত হলো—কা’ব আল-আহবার কোনো চক্রান্তকারী ছিলেন না, তবে তাঁর বর্ণিত ইসরাঈলী বর্ণনাগুলোকে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর নিক্তিতে মেপে বিচার করতে হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ইসরাঈলিয়াত বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: পবিত্র কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যার প্রসঙ্গে ইহুদি, খ্রিস্টান ও অন্যান্য আহলে কিতাবের ধর্মগ্রন্থ, তালমুদ ও পৌরাণিক লোকগাথা থেকে যেসব বর্ণনা ইসলামী সাহিত্যে স্থান পেয়েছে, তাকে ‘ইসরাঈলিয়াত’ বলা হয়।
২. ইসরাঈলী বর্ণনা গ্রহণ করার সাধারণ শরয়ী মূলনীতি কী?
উত্তর: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীসের ভিত্তিতে মূলনীতি হলো: যা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর সাথে মিলে তা গ্রহণযোগ্য; যা শরীয়তের পরিপন্থী তা সম্পূর্ণ বর্জনীয়; এবং যার সত্যতা বা অসত্যতার কোনো দলিল নেই সে ব্যাপারে নীরবতা (তাওয়াক্কুফ) পালন করতে হবে।
৩. হাফেয ইবনে কাসীর কেন ইসরাঈলিয়াত বর্জনে এত সোচ্চার ছিলেন?
উত্তর: কারণ তিনি তাঁর উস্তাদ ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহর অনুসরণে কুরআনকে কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা ব্যাখ্যার বিশুদ্ধ পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন এবং নবীদের পবিত্রতা ও ইসলামী আকীদাকে ইহুদি রূপকথার দূষণ থেকে রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন।
৪. হারূত ও মারূত কি সত্যিই কোনো পাপে লিপ্ত হয়েছিলেন?
উত্তর: কক্ষনই নয়। পবিত্র কুরআনের আয়াত ও ইসলামী আকীদার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো ফেরেশতারা সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও মা’সূম। হারূত ও মারূতের ব্যভিচার বা মূর্তিপূজার প্রচলিত কাহিনীগুলো শতভাগ বাতিল, মিথ্যা ও বানোয়াট ইসরাঈলী অপপ্রচার।
৫. ‘দাখীল’ ও ‘ইসরাঈলিয়াত’-এর মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: ‘দাখীল’ হলো একটি ব্যাপক পরিভাষা যার মধ্যে ইসরাঈলিয়াত ছাড়াও জাল হাদীস, বিদ’আতী সম্প্রদায়ের মনগড়া তাফসীর ও কুফরী দর্শন অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে ‘ইসরাঈলিয়াত’ হলো শুধুমাত্র আহলে কিতাবের ধর্মীয় উৎস থেকে আগত বর্ণনা।
৬. কা’ব আল-আহবার কি ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামে মিথ্যা বর্ণনা ছড়াতেন?
উত্তর: না, মুহাদ্দিসীনদের নির্ভরযোগ্য তাহকীক অনুযায়ী কা’ব আল-আহবার ব্যক্তিগতভাবে একজন খাঁটি ও সত্যবাদী মুসলিম ছিলেন। তবে পূর্ববর্তী তৌরাত ও ইহুদি সাহিত্যের অগাধ জ্ঞানের কারণে তিনি অতীত ইতিহাসের বর্ণনায় সেসব স্মৃতিচারণ করতেন, যা পরবর্তী রাবীরা অসতর্কতাবশত তাফসীরের অংশে পরিণত করে ফেলে।