পরীক্ষা কোড: 204 | প্রশ্নপত্র কোড: 170
اختبار السنة الرابعة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ٢٠٢١
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
المذاهب الفقهية
[আল-মাযাহিব আল-ফিকহিয়্যাহ]
বিষয় কোড: 203406
الوقت: ٤ ساعات [সময়: ৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة: ٨٠ [পূর্ণমান: ৮০]
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য : (الف) অংশ থেকে চারটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (الف) [বিভাগ ‘ক’ – রচনামূলক প্রশ্নাবলী]
মান: ১৫ × ৪ = ৬০
١- عرف علم الفقه- ثم بيّن نشأته وتطوره ومصادره مفصلا-
[১. ‘ইলমুল ফিকহ’ এর পরিচয় দাও। অতঃপর এর উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ও উৎসসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলাম একটি বাস্তবসম্মত ও জীবনমুখী জীবনব্যবস্থা। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের আমল, ইবাদত, মুয়ামালাত ও লেনদেনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি মোতাবেক পরিচালনা করার জন্য যে শাস্ত্রটি নির্দেশিকা প্রদান করে, তা হলো ‘ইলমুল ফিকহ’ (علم الفقه)। কুরআন ও সুন্নাহর অতল সমুদ্র থেকে আহরিত বিধানাবলীর সুশৃঙ্খল বিন্যাসই হলো ফিকহ শাস্ত্র।
ইলমুল ফিকহ-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়
আভিধানিক অর্থ: ‘ফিকহ’ (الفقه) একটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো—গভীর উপলব্ধি (الفهم الدقيق), সূক্ষ্ম প্রজ্ঞা বা অন্তর্দৃষ্টি। সাধারণ বোঝাকে ফাহম বলা হলেও কোনো বিষয়ের অন্তর্নিহিত রহস্য ও সূক্ষ্ম অর্থ গভীরভাবে জানাকে ফিকহ বলা হয়। পবিত্র কুরআনে এসেছে:
قَالُوا يَا شُعَيْبُ مَا نَفْقَهُ كَثِيرًا مِمَّا تَقُولُ
“তারা বলল: হে শুআইব! আপনি যা বলেন তার অনেক কথাই আমরা বুঝি (নাফকাহু) না।” (সূরা হূদ: ৯১)
পারিভাষিক অর্থ: উসুলে ফিকহের পরিভাষায়—
العِلْمُ بِالأَحْكَامِ الشَّرْعِيَّةِ العَمَلِيَّةِ المُكْتَسَبَةِ مِنْ أَدِلَّتِهَا التَّفْصِيلِيَّةِ
“বিস্তারিত দলীল-প্রমাণ থেকে আহরিত ব্যবহারিক জীবনের শরয়ী হুকুম-আহকাম সংক্রান্ত জ্ঞানকে ইলমুল ফিকহ বলে।”
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ফিকহের ব্যাপক সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন: “مَعْرِفَةُ النَّفْسِ مَا لَهَا وَمَا عَلَيْهَا” (নিজের জন্য কোনটি কল্যাণকর এবং কোনটি ক্ষতিকর—তা জানা)।
ফিকহ শাস্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ঐতিহাসিক পর্যায়সমূহ
ফিকহ শাস্ত্রের বিবর্তন প্রধানত পাঁচটি যুগে বিভক্ত:
- নবুওয়তের স্বর্ণযুগ (عصر الرسالة): ফিকহের প্রথম যুগ ছিল ওহী নির্ভর। রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন একমাত্র আইনদাতা ও সমাধানকারী। কোনো সমস্যা দেখা দিলে জিবরিল (আ.)-এর মাধ্যমে ওহী নাযিল হতো অথবা নবীজি সরাসরি ফয়সালা দিতেন। এ যুগে কোনো মাযহাব বা ইজতিহাদের শাস্ত্রীয় সংকলনের প্রয়োজন ছিল না।
- খোলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবায়ে কেরামের যুগ (عصر الصحابة): নবীজির ওফাতের পর ইসলামি সাম্রাজ্য ইরান, সিরিয়া ও মিসরে বিস্তৃত হয় এবং নতুন নতুন অভূতপূর্ব সমস্যার সৃষ্টি হয়। তখন সাহাবিগণ কুরআনের পর সুন্নাহ অনুসন্ধান করতেন; আর কোনো সুস্পষ্ট সমাধান না পেলে পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে ‘ইজমা’ (ঐকমত্য) ও ‘কিয়াস’ (যৌক্তিক সাদৃশ্য)-এর আশ্রয় নিতেন। এ যুগে বিশিষ্ট ফকিহ ছিলেন হযরত উমর, আলী, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও আয়েশা (রা.)।
- তাবেঈনদের যুগ ও দুটি প্রধান ঘরানার উদ্ভব: এ যুগে ফিকহ চর্চায় দুটি ভিন্ন ধারা বিকাশ লাভ করে:
- মাদরাসাতুল হাদিস (হিজাজ/মদিনা): সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ও আতা ইবনে আবী রাবাহ প্রমুখের নেতৃত্বে যারা হাদিস ও আছারের ওপর সর্বাধিক নির্ভর করতেন।
- মাদরাসাতুল রায় (ইরাক/কুফা): আলকামা ও ইবরাহিম নাখয়ী প্রমুখের নেতৃত্বে যারা হাদিসের পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি ও ফিকহি অনুমানে প্রাধান্য দিতেন।
- আইম্মা-ই-মুজতাহিদিন ও সংকলনের স্বর্ণযুগ (عصر الأئمة الأربعة): দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরি শতকে চার মহান ইমাম—আবু হানীফা, মালিক, শাফেয়ী ও আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর নেতৃত্বে ফিকহ শাস্ত্রের নিয়মকানুন, উসুল এবং শাখা-প্রশাখার পূর্ণাঙ্গ রূপায়ন ও কিতাব আকারে সংকলন সম্পন্ন হয়।
- তাকলিদ ও মাযহাবি স্থিতিশীলতার যুগ: পরবর্তীকালে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি এড়াতে চার মাযহাবের যেকোনো একটিকে সুসংহতভাবে অনুসরণ করা উম্মাহর সর্বসম্মত নীতি হিসেবে গৃহীত হয়।
ফিকহ শাস্ত্রের প্রধান উৎসসমূহ (مصادر الفقه الإسلامي)
ফিকহের উৎস মূলত দুই প্রকার:
ক. মৌলিক ও সর্বসম্মত উৎস (المصادر الأصلية المتفق عليها):
- ১. কুরআনুল কারীম (القرآن الكريم): শরীয়তের প্রধান ও অলঙ্ঘনীয় প্রথম উৎস। এর প্রতিটি শব্দ আল্লাহর বাণী।
- ২. সুন্নাহ বা হাদিস (السنة النبوية): কুরআনের ব্যাখ্যা ও দ্বিতীয় অপরিহার্য উৎস।
- ৩. ইজমা (الإجماع): রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর কোনো যুগে শরয়ী বিধানে মুসলিম মুজতাহিদগণের ঐকমত্য।
- ৪. কিয়াস (القياس): মূল বিধানের (নস) অন্তর্নিহিত কারণ বা ইল্লত (علة) বিদ্যমান থাকার কারণে নতুন কোনো সমস্যার সমাধান পূর্ববর্তী বিধানে প্রয়োগ করা।
খ. শাখাগত ও সহযোগী উৎস (المصادر الفرعية المختلفة فيها):
- ইস্তিহসান (জনকল্যাণে সূক্ষ্ম যুক্তি প্রয়োগ), মাসলাহাতে মুরসালাহ (উন্মুক্ত জনকল্যাণ), উরফ বা প্রথা, কাওলুস সাহাবি (সাহাবির উক্তি), এবং সাদদুয যারায়ে (পাপের পথ বন্ধ করা)।
উপসংহার
ইলমুল ফিকহ হলো মুসলিম জাতির সংবিধান ও জীবন পরিচালনার কম্পাস। এ শাস্ত্রের গভীর জ্ঞান ব্যতিরেকে ইসলামের শাশ্বত সৌন্দর্যকে জীবনে বাস্তবায়ন করা অসম্ভব।
٢- ما هو التقليد وكم قسما له؟ متى بدأ عصر التقليد؟ بين مفصلا-
[২. তাকলীদ কাকে বলে? তাকলীদ কত প্রকার? তাকলীদের যুগ কখন শুরু হয়েছে? সবিস্তারে বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি শরীয়তের বিশাল পরিমণ্ডলে সাধারণ মানুষের পক্ষে সরাসরি কুরআন ও হাদিস গবেষণা করে শরয়ী হুকুম বের করা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে এবং শরীয়তের নিরাপদ অনুসরণের জন্য যে বিধানটি ইসলামে স্বীকৃত, তা হলো ‘তাকলীদ’ (التقليد)। তাকলীদ উম্মাহর ঐক্য রক্ষা ও বিশৃঙ্খলা রোধে এক কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে।
তাকলীদের পরিচয়
আভিধানিক অর্থ: ‘তাকলীদ’ (التقليد) শব্দটি আরবি ق-ل-د ধাতু থেকে নির্গত বাবে তাফঈল-এর মাসদার। এর আভিধানিক অর্থ হলো—কারও গলায় হার বা রশি পরিয়ে দেওয়া (قلادة), অন্ধ আনুগত্য করা বা কোনো দায়িত্ব অন্যের ওপর ন্যস্ত করা।
পারিভাষিক অর্থ: উসুলে ফিকহের পরিভাষায়—
عَمَلُ الْعَامِّيِّ بِقَوْلِ الْمُجْتَهِدِ مِنْ غَيْرِ مَعْرِفَةِ دَلِيلِهِ التَّفْصِيلِيِّ
“বিস্তারিত দলীল-প্রমাণ যাচাই-বাছাই করার সামর্থ্য ছাড়া কোনো প্রামাণ্য মুজতাহিদ ইমামের মতকে শরীয়তের বিধান হিসেবে গ্রহণ করে আমল করাকে তাকলীদ বলে।”
তাকলীদের প্রকারভেদ (أقسام التقليد)
শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে তাকলীদ প্রধানত দুই প্রকার:
- প্রশংসনীয় ও ওয়াজিব তাকলীদ (التقليد المحمود বা التقليد المشروع):
সাধারণ অশিক্ষিত বা অপ্রশিক্ষিত মুসলিমদের (আম্মি) জন্য কোনো মুত্তাকী ও নির্ভরযোগ্য মুজতাহিদ আলেমের ফতোয়া মেনে চলা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন:فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
“যদি তোমরা না জানো, তবে জ্ঞানীদের নিকট জিজ্ঞেস করো।” (সূরা আন-নাহল: ৪৩)
এ ছাড়া কোনো একজন নির্দিষ্ট ইমামের মাযহাব আঁকড়ে ধরাকে ‘তাকলীদে শাখসী’ (التقليد الشخصي) বলা হয়, যা ফেতনা ও প্রবৃত্তিপূজা রোধে পরবর্তী যুগে উলামায়ে কেরাম ওয়াজিব ফতোয়া দিয়েছেন। - নিন্দনীয় ও নিষিদ্ধ তাকলীদ (التقليد المذموم):
- স্পষ্ট ও সহিহ দলীল সামনে আসার পরও গোঁড়ামির বশবর্তী হয়ে কোনো ব্যক্তির ভুল মতের ওপর জেদ ধরে থাকা।
- যে ব্যক্তির ইলম নেই বা যে ফাসেক, তার অনুসরণ করা।
- আহলুল কিতাব ও কাফিরদের ন্যায় পূর্বপুরুষদের ধর্মের অন্ধ অনুকরণ করা (সূরা আল-বাকারা: ১৭০)।
- একজন মুজতাহিদ যিনি নিজে সরাসরি গবেষণার যোগ্যতা রাখেন, তাঁর পক্ষে অন্যের তাকলীদ করা অনুচিত।
তাকলীদের যুগ কখন শুরু হয়েছে? (متى بدأ عصر التقليد)
তাকলীদের যুগ শুরু হওয়ার পেছনে সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে:
- সূচনা পর্ব (চতুর্থ হিজরি শতক): হিজরি চতুর্থ শতকের প্রথমার্ধে (প্রায় ৩৫০ হিজরির পর) তাকলীদের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ শুরু হয়। এ সময় চার মাযহাবের (হানাফি, মালিকি, শাফেয়ী, হাম্বলি) মূল ফিকহি কাঠামো পূর্ণতা পায় এবং মুতলাক মুজতাহিদদের সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে।
- বাগদাদের পতন ও চূড়ান্ত স্থিতিশীলতা (সপ্তম হিজরি শতক – ১২৫৮ খ্রি.): তাতারীদের দ্বারা বাগদাদ ধ্বংসের পর তৎকালীন উম্মাহর শীর্ষ আলেমগণ অনুভব করেন যে, অযোগ্য লোকেরা ইজতিহাদের দাবি করে দ্বীনের মাঝে নৈরাজ্য ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই তাঁরা স্বাধীন বা মুতলাক ইজতিহাদের দরজা বন্ধ বলে ঘোষণা করেন এবং চার মাযহাবের ভেতর থেকে ইজতিহাদ ও ফতোয়া দানের নিয়ম বাধ্যতামূলক করেন।
তাকলীদের ঐতিহাসিক কারণ ও প্রয়োজনীয়তা
- আরবি ভাষা ও দ্বীনি জ্ঞানের মান কমে যাওয়া।
- স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিদের দ্বীনের অপব্যাখ্যার অপচেষ্টা ঠেকানো।
- ইসলামি আদালতের কাজকর্মে বিচারিক সমতা বজায় রাখা।
উপসংহার
তাকলীদ কোনো অন্ধ কুসংস্কার নয়; বরং চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন মেনে ওষুধ সেবন করার মতো এটি একটি যৌক্তিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমেই উম্মাহ শত শত বছর ধরে নিজেদের ধর্মীয় বিশুদ্ধতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
٣- ما المراد بالمذهب؟ وما حكم اتباعه؟ بيّن حاجته ونشأته وتطوره مفصلا-
[৩. মাযহাব বলতে কী বুঝায়? এর অনুসরণের হুকুম কী? মাযহাবের প্রয়োজনীয়তা, উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
মুসলিম সমাজে ‘মাযহাব’ একটি অত্যন্ত বহুল ব্যবহৃত ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিভাষা। মাযহাব কোনো নতুন ধর্ম বা দ্বীনের বিকল্প নয়; বরং এটি হলো কুরআন ও সুন্নাহর বিধানাবলিকে সঠিকভাবে অনুধাবন ও পালনের বিজ্ঞানসম্মত সুবিন্যস্ত রাজপথ। মাযহাবের মাধ্যমেই উম্মাহ জটিল শরয়ী সমস্যার সহজ ও প্রামাণ্য সমাধান লাভ করে থাকে।
মাযহাব (المذهب)-এর পরিচয়
আভিধানিক অর্থ: ‘মাযহাব’ শব্দটি আরবি ذ-ه-ب ধাতু থেকে উৎপন্ন ইসমে জারফ বা স্থানবাচক বিশেষ্য। এর আভিধানিক অর্থ হলো—চলার পথ, মতবাদ, অভিমত, দৃষ্টিভঙ্গি বা পন্থা।
পারিভাষিক অর্থ: ইসলামি ফিকহের পরিভাষায়—কুরআন ও সুন্নাহর সূক্ষ্ম নসসমূহ থেকে কোনো মুজতাহিদ ইমাম নির্দিষ্ট উসুল ও নীতিমালার আলোকে যে সুসংহত ফিকহি নিয়মাবলী ও সমাধান পদ্ধতি প্রণয়ন করেছেন, তাকে মাযহাব বলে। সহজ কথায়, কোনো নির্দিষ্ট ইমামের ফিকহি ধারা বা গবেষণালব্ধ রায়ই হলো তাঁর মাযহাব।
মাযহাব অনুসরণের শরয়ী হুকুম
মানুষের যোগ্যতাভেদে মাযহাব অনুসরণের বিধান দুই প্রকার:
- সাধারণ মুসলিমদের ক্ষেত্রে: যে ব্যক্তি কুরআন, হাদিস, আরবি ব্যাকরণ ও উসুলে ফিকহে পারদর্শী নন এবং সরাসরি নস থেকে বিধান উদ্ভাবন করতে অক্ষম, তার জন্য যেকোনো একটি গ্রহণযোগ্য মাযহাব অনুসরণ করা শরীয়তের দৃষ্টিতে ওয়াজিব বা অপরিহার্য। কুরআনের নির্দেশ: “জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো যদি তোমরা না জানো।” (সূরা আম্বিয়া: ৭)
- মুজতাহিদে মুতলাকের ক্ষেত্রে: যিনি কুরআন-হাদিসের অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী এবং ইজতিহাদের সকল শর্ত পূরণ করেছেন, তাঁর জন্য অন্যের মাযহাব অন্ধভাবে অনুসরণ করা জায়েজ নয়; বরং তিনি নিজের গবেষণা অনুযায়ী আমল করবেন।
মাযহাবের প্রয়োজনীয়তা
- বিভ্রান্তি ও স্বেচ্ছাচারিতা রোধ: যে যার খুশিমতো কুরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যা করলে ইসলাম হাজারো দলে বিভক্ত হয়ে পড়ত। মাযহাব মানুষকে আত্মপূজা থেকে রক্ষা করে শৃঙ্খলার মধ্যে আনে।
- সহজ ও সুসংহত সমাধান: একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে হাজার হাজার হাদিসের সহিহ-জয়িফ যাচাই, নাসিখ-মানসুখ বিশ্লেষণ করা অসম্ভব। আইম্মা-ই-কেরাম সেই পরিশ্রম সম্পন্ন করে সহজ ফতোয়া উপস্থাপন করেছেন।
- আমলের সমন্বয় রক্ষা: মাযহাব মানলে নামাজ, রোজা ইত্যাদি ইবাদতে কোনো স্ববিরোধী আমল (তালাফ্ফুক) ঘটে না।
মাযহাবের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস
হিজরি দ্বিতীয় শতকের প্রথমার্ধে আব্বাসীয় খেলাফতের সূচনায় ফিকহি মাযহাবের সূচনা হয়। সাহাবায়ে কেরামের বিভিন্ন শহরের ফতোয়ার ওপর ভিত্তি করে চারজন ক্ষণজন্মা ইমামের মাযহাব বিশ্বময় খ্যাতি ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে:
- মাযহাবে হানাফি: ইমাম আবু হানীফা (রহ.) (৮০–১৫০ হিজরি) কুফায় প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ আশ-শায়বানীর মাধ্যমে তা লিখিত রূপ নেয়।
- মাযহাবে মালিকি: ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) (৯৩–১৭৯ হিজরি) মদিনা মুনাওয়ারায় প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মুয়াত্তা ইমাম মালিক’ এবং মদিনাবাসীদের আমল (আমালু আহলিল মাদিনাহ) ছিল এর প্রধান ভিত্তি।
- মাযহাবে শাফেয়ী: ইমাম মুহাম্মদ ইদ্রিস আশ-শাফেয়ী (রহ.) (১৫০–২০৪ হিজরি) মক্কা, ইরাক ও মিসরে এটি সুসংগঠিত করেন। তিনি সর্বপ্রথম ‘আর-রিসালাহ’ লিখে উসুলে ফিকহ সংকলন করেন।
- মাযহাবে হাম্বলি: ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) (১৬৪–২৪১ হিজরি) বাগদাদে হাদিস ও সুন্নাহর কঠোর অনুসরণের ভিত্তিতে এ মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সংকলিত ‘মুসনাদে আহমদ’ হাদিসের বিশাল আধার।
উপসংহার
চার মাযহাবের প্রত্যেকেই হক এবং কুরআন-সুন্নাহর অনুসারী। তাদের মধ্যকার মতভেদ হলো ব্যাখ্যামূলক ও রহমতস্বরূপ। মাযহাবের ছায়াতলে থেকেই মুসলিম উম্মাহ যুগ যুগ ধরে নিজেদের দ্বীনি সংহতি রক্ষা করে এসেছে।
٤- اذكر نبذة من سيرة الإمام ابى حنيفة (رح) و مساهمته في الفقه- ثم اذكر بعض المزايا الفقه الحنفي بالاختصار-
[৪. ইমাম আবু হানীফা (রহ) এর জীবনী এবং ফিকহ শাস্ত্রে তাঁর অবদান আলোচনা কর। অতঃপর ফিকহে হানাফীর কতিপয় বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে উল্লেখ কর।]
ভূমিকা
ফিকহ শাস্ত্রের মুকুটহীন সম্রাট, ইমামুল আযম আবু হানীফা নোমান ইবনে সাবিত (রহ.) ছিলেন ইসলামি ফিকহের প্রথম প্রণয়নকারী ও সংকলক। তাঁর অনন্য মেধা, গভীর প্রজ্ঞা ও উদ্ভাবনী শক্তির কারণে খোদ ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ঘোষণা করেছিলেন: “مَنْ أَرَادَ أَنْ يَتَبَحَّرَ فِي الفِقْهِ فَهُوَ عِيَالٌ عَلَى أَبِي حَنِيفَةَ” (যে ব্যক্তি ফিকহে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করতে চায়, সে আবু হানীফার মুখাপেক্ষী)।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
- নাম ও বংশপরিচয়: তাঁর নাম নোমান, পিতার নাম সাবিত। উপনাম আবু হানীফা এবং উপাধি ‘ইমামুল আযম’ (সর্বশ্রেষ্ঠ ইমাম)।
- জন্ম ও তাবেঈ হওয়ার গৌরব: তিনি ৮০ হিজরিতে (৬৯৯ খ্রি.) ইরাকের কুফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কয়েকজন সাহাবির (যেমন হযরত আনাস ইবনে মালিক রা.) সাক্ষাৎ লাভ করায় তিনি সর্বসম্মতভাবে একজন সম্মানিত তাবেঈ ছিলেন।
- শিক্ষা ও দীক্ষা: তিনি রেশম কাপড়ের সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। প্রখ্যাত আলেম ইমাম শাবী (রহ.)-এর পরামর্শে ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মাঝেও ইলম অর্জনে ব্রতী হন। তিনি কুফার প্রধান ফকিহ ইমাম হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান (রহ.)-এর সান্নিধ্যে দীর্ঘ ১৮ বছর একনিষ্ঠভাবে ফিকহ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। এ ছাড়া মক্কা ও মদিনায় গিয়ে তাবেঈনদের কাছ থেকে হাদিস সংগ্রহ করেন।
- চরিত্র ও সততা: তিনি ছিলেন অত্যন্ত মুত্তাকী, খোদাভীরু ও দানশীল। কথিত আছে, তিনি চল্লিশ বছর এশার ওজু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছিলেন। খলিফা মনসুর কর্তৃক প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণের প্রস্তাব তিনি সরকারি অন্যায়ে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে প্রত্যাখ্যান করেন, যার ফলে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়।
- ইন্তেকাল: ১৫০ হিজরিতে ৭০ বছর বয়সে বাগদাদের কারাগারে বিষপ্রয়োগে তিনি শাহাদাতবরণ করেন।
ফিকহ শাস্ত্রে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর অবিস্মরণীয় অবদান
- ফিকহ একাডেমি প্রতিষ্ঠা ও দলীয় পরামর্শের মাধ্যমে সমাধান: তিনি একা সিদ্ধান্ত নিতেন না; বরং কুফায় তাঁর ৪০ জন শ্রেষ্ঠ ছাত্রকে (যাঁদের মধ্যে মুহাদ্দিস, ভাষাবিদ ও বিচারক ছিলেন) নিয়ে একটি ফিকহ একাডেমি গঠন করেন। কোনো মাসআলা উঠলে সবাই দীর্ঘ বাহাস করতেন, এরপর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ হতো।
- ফিকহের সর্বপ্রথম সুশৃঙ্খল অধ্যায়ভিত্তিক সংকলন: তিনিই সর্বপ্রথম পবিত্রতা (তাহারাত), নামাজ, রোজা, হজ, ক্রয়-বিক্রয় (বুয়ূ) ইত্যাদি অধ্যায়ে ফিকহকে কিতাব আকারে লিপিবদ্ধ করার রূপরেখা প্রণয়ন করেন।
- তাকদিরি বা কাল্পনিক ফিকহের প্রবর্তন (الفقه التقديري): ভবিষ্যতে কী কী সমস্যা ঘটতে পারে তা আগে থেকেই অনুমান করে তিনি হাজার হাজার জটিল মাসআলার সমাধান তৈরি করে রেখে যান, যা আধুনিক আইনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
ফিকহে হানাফীর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
- ইস্তিহসানের প্রয়োগ: প্রকাশ্য কিয়াসের চেয়ে জনস্বার্থে সূক্ষ্ম যৌক্তিক অগ্রাধিকার দেওয়া।
- জনগণের সহজতা ও উরফ (প্রথা)-এর মূল্যায়ন: শরিয়তের সাথে বিরোধহীন প্রচলিত ন্যায়সঙ্গত সামাজিক প্রথাকে ফতোয়ার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা।
- খবরে ওয়াহিদ গ্রহণে অতিরিক্ত সতর্কতা: সাধারণ একক হাদিস দ্বারা কুরআন বা মশহুর সুন্নাহর সাধারণ বিধানকে পরিবর্তন না করা।
- ব্যক্তিগত স্বাধীনতার স্বীকৃতি: প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীন নারীকে নিজের অভিভাবক ছাড়া বৈধ কুফু বা সমতায় বিবাহের অধিকার প্রদান।
উপসংহার
ইমাম আবু হানীফার ফিকহি প্রজ্ঞাই বিশ্বের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি মুসলিমকে সহজ ও সুন্দরভাবে দ্বীন পালনের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের এক চিরভাস্বর আলোকবর্তিকা।
٥- وازن بين الفقه الحنفي والفقه الشافعي بالنظر إلى التأسيس والتفريع-
[৫. ফিকহে হানাফী ও ফিকহে শাফেয়ী এর মাঝে মৌলিক ও শাখাভাষ্যগত দিক তুলনামূলক আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি ফিকহের দুই প্রধানতম ও প্রভাবশালী ধারা হলো হানাফি ও শাফেয়ী মাযহাব। হানাফি ফিকহের উদ্ভব ঘটে ইরাকের কুফায়, যা যৌক্তিক বিশ্লেষণ ও ‘আসহাবুর রায়’-এর বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর; অপরদিকে শাফেয়ী ফিকহ হিজাজ ও মিসরে পরিপুষ্ট হয়ে হাদিসের সাথে সূক্ষ্ম ভাষাগত নীতিমালার এক চমৎকার সমন্বয় সাধন করেছে। উভয় মাযহাবের উসুল (ভিত্তি) ও ফুরু’ (শাখা)-তে গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।
ক. মৌলিক বা নীতিগত দিক থেকে তুলনা (من حيث التأسيس والأصول)
- উসুলে ফিকহ প্রণয়নের পদ্ধতি:
- হানাফি পদ্ধতি (طريقة الفقهاء): হানাফিগণ আগে উসুলের কোনো বিমূর্ত থিওরি তৈরি করেননি; বরং ইমাম আবু হানীফা ও তাঁর ছাত্রদের দেওয়া বাস্তব ফতোয়া ও শাখা বিধানগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সেখান থেকে মূল নীতি ও উসুল তৈরি করেছেন।
- শাফেয়ী পদ্ধতি (طريقة المتكلمين): ইমাম শাফেয়ী সর্বপ্রথম তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আর-রিসালাহ’-তে যুক্তিবাদী ও ভাষাতাত্ত্বিক কায়েদা প্রণয়ন করেন, এরপর সেই কায়েদা অনুযায়ী শাখা মাসআলাগুলো যাচাই করেন।
- কুরআনের সাধারণ বিধান (الخاص والعام)-এর অবস্থান:
- হানাফিদের মতে কুরআনের সাধারণ শব্দও সুনির্দিষ্ট শব্দের মতোই অকাট্য (কাতঈ)। তাই কোনো একক দুর্বল বা খবরে ওয়াহিদ হাদিস দ্বারা কুরআনের সাধারণ বিধানকে শর্তযুক্ত বা খাস করা যায় না।
- শাফেয়ীদের মতে কুরআনের সাধারণ বিধান অনুমিত (জান্নী)। তাই সহিহ খবরে ওয়াহিদ হাদিস দিয়ে কুরআনের সাধারণ নির্দেশকে খাস বা নির্দিষ্ট করা সম্পূর্ণ বৈধ।
- ফরজ ও ওয়াজিবের মধ্যে পার্থক্য:
- হানাফি ফিকহে অকাট্য দলীল (কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদিস) দ্বারা প্রমাণিত বিধানকে ‘ফরজ’ এবং প্রবল ধারণাপ্রসূত দলীল দ্বারা প্রমাণিত বিধানকে ‘ওয়াজিব’ বলা হয়। যেমন বিতর নামাজ হানাফিদের নিকট ওয়াজিব।
- শাফেয়ী ফিকহে ফরজ ও ওয়াজিবের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই; উভয়ই এক ও অভিন্ন (হজ ব্যতীত)।
- ইস্তিহসান বনাম কিয়াস:
হানাফি ফিকহে প্রয়োজনে কিয়াসের চেয়ে ‘ইস্তিহসান’ (সূক্ষ্ম যুক্তি)-কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ইমাম শাফেয়ী কঠোরভাবে ইস্তিহসানের বিরোধিতা করে বলেন: “مَنِ اسْتَحْسَنَ فَقَدْ شَرَّعَ” (যে ব্যক্তি ইস্তিহসান করল, সে যেন নিজের ইচ্ছামতো নতুন শরীয়ত বানাল)।
খ. শাখাভাষ্যগত বা প্রায়োগিক দিক থেকে তুলনা (من حيث الفروع والمسائل)
| বিষয় | হানাফি মাযহাব | শাফেয়ী মাযহাব |
|---|---|---|
| ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পাঠ | সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও মাকরূহে তাহরীমী (ইমামের কিরাত মুক্তাদির কিরাত)। | ফরজ/রুকন; ইমামের পেছনে মুক্তাদিকে অবশ্যই ফাতিহা পড়তে হবে। |
| রুকুতে যাওয়া ও উঠার সময় রফউল ইয়াদাইন | সুন্নত নয়; কেবল তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত তুলতে হয়। | সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ; রুকুতে যাওয়ার সময় ও উঠার সময় হাত তুলতে হবে। |
| নারীর অঙ্গস্পর্শে অজু ভঙ্গের বিধান | কেবল স্পর্শ করলেই অজু ভাঙে না (কামভাব ব্যতীত)। | বেগানা কোনো নারীর চামড়া স্পর্শ করলেই অজু ভেঙে যাবে। |
| বিবাহে অভিভাবকের সম্মতি | প্রাপ্তবয়স্ক নারী অভিভাবক ছাড়াও সমতায় নিজে বিবাহ সম্পন্ন করতে পারে। | অভিভাবক (ওলী) ছাড়া কোনো নারীর বিবাহ বৈধ নয়। |
উপসংহার
উভয় মাযহাবই শরীয়তের সহিহ দলীলের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাদের এই মতভেদ মূলত নসের ব্যাখ্যা ও পদ্ধতিগত ভিন্নতার ফল, যা ইসলামি আইনের বিশাল বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধি প্রমাণ করে।
٦- بيّن أسماء أجلة الفقهاء من أصحاب ابي حنيفة (رح) والكتب المشهورة للمذهب الحنفي مفصلا-
[৬. ইমাম আবু হানীফা (রহ) এর প্রসিদ্ধ ফকীহ ছাত্রগণ এবং হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহের নাম বিস্তারিত লেখ।]
ভূমিকা
একটি মাযহাব তখনই কালজয়ী হয় যখন তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি ও শক্তিশালী শাস্ত্রীয় গ্রন্থাবলী থাকে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর ফিকহি চিন্তা-দর্শন বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে তাঁর যুগশ্রেষ্ঠ ছাত্রবৃন্দ এবং তাঁদের সংকলিত কালজয়ী কিতাবসমূহের অবদান অবিস্মরণীয়।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর বিশিষ্ট ফকিহ ছাত্রবৃন্দ (أجلة أصحابه)
- ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) (১১৩–১৮২ হিজরি): তাঁর প্রকৃত নাম ইয়াকুব ইবনে ইব্রাহিম আল-আনসারী। তিনি ছিলেন আব্বাসীয় খিলাফতের সর্বপ্রথম প্রধান বিচারপতি (কাজীউল কুজাত)। তিনি হানাফি ফিকহকে রাষ্ট্রীয় আইনে রূপান্তর করেন। খলিফা হারুনুর রশিদের অনুরোধে তিনি রাজস্ব ও বিচার ব্যবস্থার ওপর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাবুল খারাজ’ (كتاب الخراج) রচনা করেন।
- ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রহ.) (১৩১–১৮৯ হিজরি): তিনি হানাফি ফিকহের প্রধান সংকলক ও গ্রন্থকার। ইমাম শাফেয়ীও তাঁর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন। হানাফি মাযহাবের মৌলিক ছয়টি কিতাব (জাহিরুর রেওয়ায়াত) তিনিই রচনা করে মাযহাবকে সংরক্ষিত করেন।
- ইমাম জুফার ইবনুল হুযাইল (রহ.) (১১০–১৫৮ হিজরি): তিনি ছিলেন কিয়াসের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার ছাত্রদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী ছিলেন এবং গভীর গবেষণার দৃষ্টান্ত রেখে যান।
- ইমাম হাসান ইবনে জিয়াদ আল-লুলুই (রহ.) (মৃত্যু: ২০৪ হিজরি): তিনি ছিলেন হাদিসের বিশেষজ্ঞ ফকিহ এবং কূফার বিশিষ্ট বিচারক। তিনি ইমাম আবু হানীফার ফতোয়া ও মতামত বহু কিতাবে বর্ণনা করেছেন।
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহ
হানাফি মাযহাবের কিতাবগুলোকে প্রামাণিকতার দিক থেকে তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়:
১. জাহিরুর রেওয়ায়াত (মাসায়িলুল উসুল – মূল ৬টি কিতাব):
ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) কর্তৃক সংকলিত নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত ছয়টি কিতাব:
- আল-মাবসুত (বা আল-আসল)
- আল-জামেউল কাবীর
- আল-জামেউস সাগীর
- আস-সিয়ারুল কাবীর
- আস-সিয়ারুস সাগীর
- আয-যিয়াদাত
২. চার মূল পাঠ্য বা মুতূনে আরবাআহ (المتون الأربعة):
পরবর্তী যুগের ফতোয়া ও দারসুল নিজামির সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য চারটি সংক্ষিপ্ত মূল কিতাব:
- মুখতাসারুল কুদুরী – ইমাম আবুল হাসান আল-কুদূরী (রহ.)।
- আল-মুখতার – ইমাম আবুল ফজল আল-মাওসিলী (রহ.)।
- কানযুদ্ দাকায়িক – ইমাম হাফিজুদ্দীন আন-নাসাফী (রহ.)।
- বিকায়াতুর রেওয়ায়াহ – ইমাম তাজুল শারীয়াহ মাহমুদ (রহ.)।
৩. সুবিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ও ফতোয়ার বিশ্বকোষ:
- আল-হিদায়াহ (الهداية): ইমাম আলী ইবনে আবু বকর আল-মারগিনানী (রহ.)। এটি হানাফি ফিকহের সর্বাধিক আলোচিত ও গ্রহণযোগ্য প্রামাণ্য গ্রন্থ।
- আল-মাবসূত: ইমাম শামসুল আইম্মা আস-সারাখসী (রহ.)। ত্রিশ খণ্ডের সুবিশাল ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
- বাদায়েউস সানায়ে: ইমাম আলাউদ্দীন আল-কাসানী (রহ.)।
- ফাতহুল কাদীর: আল্লামা কামালুদ্দীন ইবনুল হুমাম (রহ.)।
- ফাতাওয়া আশ-শামী (রাদ্দুল মুহতার): আল্লামা ইবনে আবেদীন আশ-শামী (রহ.)। হানাফি ফতোয়ার সর্বশেষ প্রামাণ্য নির্ভরযোগ্য দলিল।
- ফাতাওয়া-ই-আলমগীরী: মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের নির্দেশে শত শত শীর্ষ আলেমের যৌথ গবেষণায় রচিত বিশাল বিশ্বকোষ।
উপসংহার
ইমাম আবু হানীফার ছাত্রদের নিরলস সাধনা ও এই অমূল্য কিতাবসমূহের কারণেই হানাফি মাযহাব শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে উসমানীয় ও মুঘল সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় বিচারিক আইন হিসেবে মানবজাতিকে সেবা দিয়ে এসেছে।
مجموعة (ب) [বিভাগ ‘খ’ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী]
মান: ৫ × ৪ = ২০
٧- ما حكم قراءة الفاتحة خلف الإمام؟ بين مفصلا-
[৭. ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পড়ার হুকুম কী? বিস্তারিত লেখ।]
উত্তর:
ইমামের পেছনে জামায়াতে নামাজ পড়ার সময় মুক্তাদির সূরা ফাতিহা পাঠের বিষয়ে আইম্মা-ই-কেরামের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে:
- হানাফি মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি:
হানাফিদের মতে, মুক্তাদির জন্য ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা বা অন্য কোনো সূরা পাঠ করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ এবং মাকরূহে তাহরীমী (ওয়াজিব ত্যাগের সমতুল্য গুনাহ)। চাই নামাজটি জাহরি (উচ্চস্বরে কিরাত যেমন ফজর, মাগরিব, এশা) হোক কিংবা সিররি (নীরব কিরাত যেমন জোহর, আসর) হোক।
দলীল:- আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ: “وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ” (যখন কুরআন পাঠ করা হয় তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং চুপ থাকো)। (সূরা আল-আ’রাফ: ২০৪) মুফাসসিরদের মতে এ আয়াত নামাজের কিরাত প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ فَقِرَاءَةُ الْإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ” (যে ব্যক্তির কোনো ইমাম রয়েছে, ইমামের কিরাত তার নিজের কিরাত হিসেবে গণ্য হবে)। (মুসনাদে আহমদ ও সুনানে ইবনে মাজাহ)
- শাফেয়ী মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি:
শাফেয়ীদের মতে, ইমাম-মুক্তাদি নির্বিশেষে যেকোনো নামাজে প্রত্যেক মুসল্লির জন্য সূরা ফাতিহা পাঠ করা ফরজ ও নামাজের রুকন।
দলীল: বুখারির হাদিস: “لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ” (যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পড়ল না তার নামাজ হয় না)। - মালিকি ও হাম্বলি মাযহাবের সমন্বয়:
নীরব কিরাতের নামাজে মুক্তাদি ফাতিহা পড়বে, কিন্তু উচ্চস্বরে কিরাতের নামাজে ইমামের কিরাত শুনবে এবং নিজে পড়বে না।
উপসংহার: হানাফিদের দলিল অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও কুরআনের আয়াতভিত্তিক হওয়ায় ইমামের পেছনে পূর্ণ নীরবতা বজায় রেখে ইমামের কিরাতকে নিজের বলে গণ্য করাই হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য আমল।
٨- بين اختلاف العلماء في رفع اليدين عند الركوع وعند الرفع من الركوع مدللا-
[৮. রুকুতে যাওয়ার ও রুকু থেকে মাথা উঠানোর সময় رفع اليدين করা সম্পর্কে আলেমগণের মতভেদ দলিলসহ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
নামাজে রুকুতে যাওয়ার পূর্বে এবং রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সময় দুই হাত কাঁধ বা কান পর্যন্ত উঠানোকে ‘রফউল ইয়াদাইন’ (رفع اليدين) বলা হয়। এ বিষয়ে আলেমদের দুটি সুপ্রসিদ্ধ অভিমত রয়েছে:
- প্রথম মত (হানাফি ও অধিকাংশ সাহাবির আমল):
নামাজে কেবল প্রথম তাকবীরে তাহরীমার সময়ই হাত উঠানো সুন্নত। এর বাইরে রুকুতে যাওয়ার সময় বা রুকু থেকে উঠার সময় হাত উঠানো সুন্নত নয়, বরং তা বর্জনীয়।
দলীলসমূহ:- হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন: “أَلَا أُصَلِّي بِكُمْ صَلَاةَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَصَلَّى فَلَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ إِلَّا فِي أَوَّلِ مَرَّةٍ” (আমি কি তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সা.-এর নামাজ পড়ে দেখাব না? অতঃপর তিনি নামাজ পড়লেন এবং প্রথমবার ছাড়া আর হাত উঠালেন না)। (সুনানে তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ; ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান বলেছেন)।
- হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মসজিদে এসে বললেন: “مَالِي أَرَاكُمْ رَافِعِي أَيْدِيكُمْ كَأَنَّهَا أَذْنَابُ خَيْلٍ شُمْسٍ؟ اسْكُنُوا فِي الصَّلَاةِ” (ব্যাপার কী! আমি তোমাদেরকে এমনভাবে হাত তুলতে দেখছি যেন অবাধ্য চঞ্চল ঘোড়ার লেজ নাড়াচাড়া করছে? তোমরা নামাজে স্থিরতা অবলম্বন করো)। (সহিহ মুসলিম: ৪৩০)
- খুলাফায়ে রাশেদীন (হযরত আবু বকর, উমর ও আলী রা.) তাকবীরে তাহরীমা ছাড়া রফউল ইয়াদাইন করতেন না।
- দ্বিতীয় মত (শাফেয়ী ও হাম্বলি মাযহাব):
রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে উঠার সময় হাত তোলা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।
দলীল: হযরত ইবনে উমর (রা.) বর্ণিত সহিহ বুখারির হাদিস, যেখানে নবীজির রফউল ইয়াদাইনের বর্ণনা এসেছে।
সমন্বয়: হানাফি আলেমগণের মতে, ইসলামের প্রথম যুগে রফউল ইয়াদাইনের বিধান থাকলেও পরবর্তীতে নামাজে স্থিরতা (খুশু) রক্ষার স্বার্থে তা মানসুখ বা রহিত হয়ে এক তাকবীরের বিধানে স্থিতিশীল হয়।
٩- ما الاختلاف بين الإائمة في اعتبار اختلاف المطالع؟ بين مع الأدلة ما هو الراجح عندك؟
[৯. اختلاف المطالع আমলে নেয়ার ক্ষেত্রে ইমামদের মাঝে কী মতপার্থক্য রয়েছে? দলিলসহ তোমার নিকট কোনটি অগ্রগণ্য তার বর্ণনা দাও।]
উত্তর:
ইখতিলাফুল মাতালি’ (اختلاف المطالع)-এর অর্থ: ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বিভিন্ন দেশে বা অঞ্চলে নতুন চাঁদ উদিত হওয়ার সময় ও দিগন্তের তারতম্য ঘটাকে ইখতিলাফুল মাতালি’ বলে। এক দেশে চাঁদ দেখা গেলে অন্য দেশে তা প্রযোজ্য হবে কি না—এ নিয়ে ইমামদের দুটি প্রধান মত রয়েছে:
- প্রথম মত: মাতলা’র ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য নয় (اتحاد المطالع / বিশ্বব্যাপী অভিন্ন দৃষ্টি):
হানাফি, মালিকি ও হাম্বলি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মতানুসারে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে চাঁদ ওঠার নির্ভরযোগ্য সংবাদ পাওয়া গেলে বিশ্বের সকল মুসলিমের ওপর রোজা রাখা বা ঈদ পালন করা ফরজ হবে।
দলীল: রাসূলুল্লাহ (সা.) সার্বজনীনভাবে নির্দেশ দিয়েছেন:صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ
“তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ভঙ্গ করো।” (সহিহ বুখারি) এখানে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা সীমানা উল্লেখ করা হয়নি।
- দ্বিতীয় মত: মাতলা’র ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য (اختلاف المطالع / আঞ্চলিক দৃষ্টি):
শাফেয়ী মাযহাবের মতে, প্রতিটি দেশের নিজস্ব মাতলা রয়েছে। সুদূর অঞ্চলের চাঁদ দেখার সংবাদ অন্য অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য নয়।
দলীল: কুরাইব (রহ.)-এর হাদিস: দামেস্কে মুয়াবিয়া (রা.) শুক্রবার চাঁদ দেখে রোজা শুরু করেছিলেন; কিন্তু মদিনায় ইবনে আব্বাস (রা.) শনিবার চাঁদ দেখেছিলেন। ইবনে আব্বাস বললেন: আমরা মদিনায় যতদিন না চাঁদ দেখব ততদিন রোজা চালিয়ে যাব, সিরিয়ার দেখা আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তিনি বললেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ মুসলিম: ১০৮৭)
আমার নিকট অগ্রগণ্য বা রাজেহ মত (الرأي الراجح):
বর্তমান যুগে বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক ও সময়ের বিশাল ব্যবধানের কারণে আঞ্চলিকভাবে নিজ নিজ দেশের দিগন্তে চাঁদ দেখা (বা সরকারি জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত) অনুসরণ করাই সর্বাধিক যুক্তিসঙ্গত ও বিভ্রান্তিমুক্ত। যদি বৈশ্বিকভাবে কোনো একক খিলাফত ও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ না থাকে, তবে স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখে রোজা ও ঈদ করলেই সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও বিভেদ এড়ানো সম্ভব হয়। এটিই কুরাইব (রহ.) বর্ণিত সহিহ হাদিসের বাস্তবায়ন।
١٠- بين أقوال العلماء، في زيارة القبور وزيارة روضة النبى صلى الله عليه وسلم-
[১০. কবর যিয়ারত ও নবি কারীম (স) এর রওজা যিয়ারত প্রসঙ্গে আলেমগণের অভিমতসমূহ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
কবর জিয়ারত এবং বিশেষ করে প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র রওজা শরিফ জিয়ারতের শরয়ী বিধান নিম্নরূপ:
১. সাধারণ কবর জিয়ারতের বিধান:
সকল মাযহাবের আলেমদের সর্বসম্মত ঐকমত্যে কবর জিয়ারত করা মুস্তাহাব ও সুন্নাত। এটি আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং দুনিয়ার মোহ দূর করে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ القُبُورِ، فَزُورُوهَا؛ فَإِنَّهَا تُذَكِّرُكُمُ الآخِرَةَ
“আমি পূর্বে তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম; এখন তোমরা কবর জিয়ারত করো, কেননা এটি আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।” (সহিহ মুসলিম: ৯৭৭)
তবে কবরে সিজদা করা, তওয়াফ করা, মৃত ব্যক্তির কাছে সরাসরি কিছু চাওয়া হারাম ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
২. নবী করীম (সা.)-এর পবিত্র রওজা মুবারক জিয়ারতের হুকুম:
চার মাযহাবের আইম্মা-ই-কেরামের ঐকমত্যে নবীজির রওজা মোবারক জিয়ারত করা সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ নেক আমল এবং সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ (অনেকের মতে ওয়াজিবের কাছাকাছি)।
দলীলসমূহ:
- রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “مَنْ زَارَ قَبْرِي وَجَبَتْ لَهُ شَفَاعَتِي” (যে ব্যক্তি আমার কবর জিয়ারত করল, তার জন্য আমার সুপারিশ ওয়াজিব হয়ে গেল)। (সুনানে দারা কুতনী ও বায়হাকী)
- তিনি আরও বলেন: “مَنْ حَجَّ فَلَمْ يَزُرْنِي فَقَدْ جَفَانِي” (যে ব্যক্তি হজ করল অথচ আমার জিয়ারত করল না, সে আমার প্রতি অবিচার করল)।
- মসজিদে নববীর বিশেষ মর্যাদা: নবীজির মিম্বর ও হুজরার মধ্যবর্তী স্থানকে জান্নাতের টুকরো ঘোষণা করা হয়েছে: “مَا بَيْنَ بَيْتِي وَمِنْبَرِي رَوْضَةٌ مِنْ رِيَاضِ الجَنَّةِ” (সহিহ বুখারি)।
অতএব, মদিনা মুনাওয়ারায় সফর করে অত্যন্ত আদব ও ভক্তির সাথে সালাম ও দরূদ পেশ করা প্রতিটি আশেকে রাসূলের পরম সৌভাগ্য ও ঈমানি দায়িত্ব।
١١- هل تجب الزكوة في مال الصبي؟ فصل بالأদلة-
[১১. বালক বা শিশুর সম্পদে যাকাত ওয়াজিব হবে কি না? দলিলসহ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু (সবী) অথবা পাগলের মালিকানায় যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তবে তাতে জাকাত ওয়াজিব হবে কি না—এ বিষয়ে ফকিহগণের মাঝে দুটি ভিন্ন মত রয়েছে:
- জমহুর ফকিহগণের মত (ইমাম শাফেয়ী, মালিক ও আহমদ ইবনে হাম্বল):
শিশুর সম্পদেও জাকাত দেওয়া ফরজ ও ওয়াজিব। শিশুর অভিভাবক (পিতা বা অভিভাবক ওলী) শিশুর সম্পদ থেকে হিসাব করে জাকাত প্রদান করবেন।
দলীল:- কুরআনের সাধারণ নির্দেশ: “خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ” (তাদের ধন-সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন)। (সূরা আত-তাওবাহ: ১০৩) এখানে বড় বা শিশুর কোনো পার্থক্য করা হয়নি; জাকাত হলো সম্পদের হক (حق في المال)।
- হাদিস শরিফ: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “ابْتَغُوا فِي أَمْوَالِ الْيَتَامَى لَا تَأْكُلُهَا الصَّدَقَةُ” (তোমরা এতিমদের সম্পদ ব্যবসায় খাটাও, যেন জাকাতে তা খেয়ে নিঃশেষ না করে ফেলে)। (সুনানে তিরমিজি) এটি প্রমাণ করে শিশুর সম্পদে জাকাত ওয়াজিব।
- হানাফি মাযহাবের মত:
হানাফিদের মতে, শিশুর সম্পদে জাকাত ওয়াজিব নয়।
দলীল:- জাকাত হলো একটি শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত, যার জন্য প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, জ্ঞান থাকা এবং শরয়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত (মুকাল্লাফ) হওয়া পূর্বশর্ত।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ…” (তিন ব্যক্তি থেকে বিধানের কলম উঠিয়ে রাখা হয়েছে: অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু যে পর্যন্ত না সে বালেগ হয়…)। (সুনানে আবু দাউদ) তাই শিশুর ওপর কোনো ইবাদতের বাধ্যবাধকতা নেই।
উপসংহার: হানাফি মাযহাবের দৃষ্টিতে শিশুর সম্পদ সংরক্ষিত থাকবে এবং সে বালেগ হওয়ার পর থেকে নিজের জাকাত নিজে আদায় করবে।
١٢- هل يجوز خروج المرأة للحج بدون الزوج أو ذى محرم؟ بين مدللا-
[১২. স্বামী কিংবা যুমাহরাম সাথে না নিয়ে হজের উদ্দেশ্যে কোনো মহিলা বের হওয়া কি বৈধ? দলিলসহ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
কোনো মহিলার হজে গমনের ক্ষেত্রে স্বামী বা মাহরাম পুরুষের উপস্থিতি আবশ্যক কি না, এ বিষয়ে ফকিহগণের সুনির্দিষ্ট ফতোয়া বিদ্যমান:
- হানাফি ও হাম্বলি মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি:
স্বামী অথবা স্থায়ী মাহরাম পুরুষ (যাদের সাথে বিবাহ চিরতরে হারাম; যেমন পিতা, ভাই, পুত্র) সাথে থাকা ব্যতীত কোনো মহিলার জন্য হজের উদ্দেশ্যে একাকী সফর করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম। যদি কোনো মহিলার অগাধ ধনসম্পদ থাকে কিন্তু সাথে যাওয়ার মতো কোনো মাহরাম না থাকে, তবে হানাফিদের মতে তার নিজের ওপর ব্যক্তিগতভাবে হজে যাওয়া ফরজ নয়; বরং সে বদলি হজের অসিয়ত করে যাবে।
দলীল:- রাসূলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন: “لَا تُسَافِرُ الْمَرْأَةُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ” (কোনো নারী যেন তিন দিনের দূরত্বের পথ মাহরাম ছাড়া সফর না করে)। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
- এক ব্যক্তি এসে রাসূল (সা.)-কে বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল! আমি অমুক যুদ্ধে আমার নাম লিখিয়েছি, অথচ আমার স্ত্রী হজের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।” নবীজি (সা.) তাকে নির্দেশ দিলেন: “ارْجِعْ فَحُجَّ مَعَ امْرَأَتِكَ” (যুদ্ধে যাওয়া বাদ দিয়ে ফিরে যাও এবং তোমার স্ত্রীর সাথে হজ করো)। (সহিহ বুখারি: ১৮৬২)
- শাফেয়ী ও মালিকি মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি:
যদি পথ সম্পূর্ণ নিরাপদ হয় এবং নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত নারী কাফেলা (رفقة مأمونة) সাথে থাকে, তবে ফরজ হজের ক্ষেত্রে মাহরাম ছাড়াও মহিলা হজে গমন করতে পারবে।
দলীল: হযরত আদি ইবনে হাতিম (রা.)-এর হাদিস, যেখানে নবীজি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন: এমন যুগ আসবে যখন একাকী একজন নারী হীরা থেকে মক্কা পর্যন্ত ভ্রমণ করবে, সে আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করবে না। (সহিহ বুখারি)
সতর্কতা: নফল হজের ক্ষেত্রে সকল ইমাম একমত যে মহিলার জন্য মাহরাম ব্যতীত সফর করা কিছুতেই জায়েজ নেই। হানাফি মাযহাবের অনুসারীদের জন্য ফরজ হজেও মাহরাম থাকা অপরিহার্য শর্ত।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ‘আল-মাযাহিব আল-ফিকহিয়্যাহ’ বিষয়ের মূল গুরুত্ব কী?
চার প্রসিদ্ধ সুন্নি মাযহাবের উৎপত্তি, মৌলিক উসুল, ইমামগণের অবদান এবং তুলনামূলক মাসআলার দলিল ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করা।
২. চার মাযহাবের যেকোনো একটি অনুসরণ করা কেন জরুরি?
সাধারণ মানুষের পক্ষে সরাসরি কুরআন-হাদিসের অগাধ শাস্ত্র ঘেঁটে সঠিক বিধান বের করা অসম্ভব হওয়ায় বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে একজন প্রামাণ্য মুজতাহিদ ইমামের মাযহাব অনুসরণ করা ওয়াজিব।
৩. হানাফি ফিকহে ‘ইস্তিহসান’ বলতে কী বুঝায়?
প্রকাশ্য সাদৃশ্যের কিয়াস পরিত্যাগ করে কোনো শক্তিশালী দলীল, জনকল্যাণ বা জরুরতের ভিত্তিতে অধিকতর শক্তিশালী ও সূক্ষ্ম কিয়াসকে প্রাধান্য দেওয়া।
৪. হানাফি মাযহাবের মৌলিক কিতাব ‘জাহিরুর রেওয়ায়াত’ কার সংকলন?
ইমাম আবু হানীফার প্রখ্যাত ছাত্র ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রহ.)-এর সংকলিত মৌলিক ছয়টি কিতাবকে জাহিরুর রেওয়ায়াত বলা হয়।
৫. ইমামের পেছনে কিরাত না পড়ার পক্ষে হানাফিদের মূল দলিল কী?
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আ’রাফের ২০৪ নম্বর আয়াত (“যখন কুরআন পাঠ করা হয় তখন মনোযোগ দিয়ে শোনো ও চুপ থাকো”) এবং সহিহ হাদিস (“ইমামের কিরাত মুক্তাদির কিরাত”)।
৬. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের ফিকহ পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার কৌশল কী?
প্রতিটি মাসআলায় মতভেদের সাথে সাথে আরবি আয়াত ও হাদিসের মূল টেক্সট নির্ভুলভাবে উল্লেখ করা এবং হানাফি মাযহাবের যুক্তি ও দলীলগুলো পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তোলা।