পরীক্ষা কোড: 204 | প্রশ্নপত্র কোড: 139
اختبار السنة الرابعة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ۲۰۲۳
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৩]
اللغة العربية وآدابها
[আরবি ভাষা ও সাহিত্য]
المذاهب الفقهية
[আল-মাযাহিব আল-ফিকহিয়্যাহ]
বিষয় কোড: 204402
الوقت — ٤ ساعات | الدرجة الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (أ) وعن أربعة من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য: (أ) অংশ থেকে চারটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) : الأسئلة المقالية (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)
الدرجات — ١٥ × ٤ = ٦٠
١- عرف علم الفقه؟ ثم بين نشأته وتطوره مفصلا-
[১. ইলমে ফিকহের সংজ্ঞা দাও। ইলমে ফিকহের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা:
ইসলামী জীবনব্যবস্থার ব্যবহারিক দিকনির্দেশনার নাম হলো ‘ইলমুল ফিকহ’ (علم الفقه)। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক জীবনের যাবতীয় সমস্যার শরিয়তসম্মত সমাধান উদ্ভাবনে ফিকহ শাস্ত্রের কোনো বিকল্প নেই।
১. ইলমে ফিকহের পরিচয় (مفهوم علم الفقه):
আভিধানিক অর্থ: ‘আল-ফিকহ’ (الفقه) শব্দের মূল আভিধানিক অর্থ হলো: الفهم الدقيق والفطنة (গভীর প্রজ্ঞা ও সূক্ষ্ম উপলব্ধি)। সাধারণ বোঝাকে ফাহম এবং সূক্ষ্ম তাৎপর্য অনুধাবনকে ফিকহ বলে। আল্লাহ তাআলা শুআইব (আ.)-এর কওমের বক্তব্য উল্লেখ করেন: {قَالُوا يَا شُعَيْبُ مَا نَفْقَهُ كَثِيرًا مِّمَّا تَقُولُ} (তারা বলল: হে শুআইব! তুমি যা বল তার অনেক কথাই আমরা বুঝি না)। রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মতের কল্যাণের দোয়া করতে গিয়ে বলেন: “مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ” (আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা বা ফিকহ দান করেন) [সহীহ বুখারী]।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ফকীহ ও উসূলবিদদের মতে ফিকহের প্রামাণ্য সংজ্ঞা হলো:
“العلم بالأحكام الشرعية العملية المكتسبة من أدلتها التفصيلية.”
অর্থাৎ বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট দলিল-প্রমাণ (কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস) হতে গবেষণার মাধ্যমে আহরিত মানবজীবনের ব্যবহারিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত বিধানাবলির সুশৃঙ্খল জ্ঞানকেই ইলমে ফিকহ বলে।
২. ইলমে ফিকহের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ঐতিহাসিক পর্যায়সমূহ (نشأة الفقه وتطوره):
ফিকহ শাস্ত্রের বিকাশ সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ছয়টি মৌলিক যুগে রূপ লাভ করেছে:
- ১. নবুওয়াতের যুগ (عصر النبوة والرسالة):
এটি ফিকহের বীজ বপনের যুগ। এ যুগে বিধান প্রণেতা ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা এবং শিক্ষক ছিলেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ ﷺ। কোনো সমস্যা দেখা দিলে ওহীর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ফয়সালা হতো। এ যুগে ইজতিহাদের দ্বার উন্মুক্ত ছিল বিশেষ ক্ষেত্রে (যেমন মুআয ইবনে জাবাল রা.-এর ইয়েমেন গমন)। - ২. খুলাফায়ে রাশিদীন ও সাহাবায়ে কেরামের যুগ (عصر الخلفاء الراشدين وكبار الصحابة):
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাত ও ওহী বন্ধ হওয়ার পর নতুন নতুন ভূখণ্ড বিজিত হলে অভূতপূর্ব সমস্যার সৃষ্টি হয়। সাহাবায়ে কেরাম কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে সমাধান দিতেন। কোনো স্পষ্ট দলিল না পেলে সম্মিলিত পরামর্শ (শূরা)-এর মাধ্যমে ইজমা ও কিয়াসের প্রয়োগ করতেন। খোলাফায়ে রাশেদীন, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আয়েশা ও যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) ছিলেন এ যুগের প্রধান ফকীহ সাহাবী। - ৩. তাবেঈন ও ফিকহী পাঠশালার যুগ (عصر التابعين ومدرستي الحديث والرأي):
তাবেঈদের যুগে ফিকহ দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত হয়ে স্বতন্ত্র রূপ পায়:- মাদরাসাতুল হাদীস বা হিজাজ পাঠশালা: মদিনা কেন্দ্রিক এই ধারার নেতৃত্ব দেন মদিনার সাত ফকীহ (ফুক্বাহায়ে সাব’আহ) এবং ইমাম সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব। তাঁরা হাদীস ও আসার অনুসরণে নিবেদিত ছিলেন।
- মাদরাসাতুর রায় বা কুফা পাঠশালা: ইরাক কেন্দ্রিক এই ধারার নেতৃত্ব দেন আলক্বামাহ, আসওয়াদ ও ইবরাহীম আন-নাখয়ী। জটিল নাগরিক সমাজে তাঁরা দলিলের মূল কারণ (ইল্লত) অনুসন্ধান ও যুক্তিভিত্তিক ইজতিহাদে অগ্রণী ছিলেন।
- ৪. মুজতাহিদ ইমামগণের যুগ ও ফিকহের স্বর্ণযুগ (عصر الأئمة المجتهدين والتدوين):
হিজরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে ফিকহ একটি সুশৃঙ্খল বিজ্ঞান হিসেবে সংকলিত হয়। এ যুগে চার মাজহাবের চার মহামানব— ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) আগমন করেন। উসূলে ফিকহ বা বিধান উদ্ভাবনের বৈজ্ঞানিক নিয়মাবলী প্রণীত হয়। - ৫. স্থবিরতা ও তাক্বলীদ যুগ (عصر الاستقرار والتقليد):
চতুর্থ হিজরি শতক থেকে শুরু হয়ে উসমানীয় যুগের শেষ অবধি চলে। নতুন মুজতাহিদ না হয়ে পূর্ববর্তী ইমামদের গ্রন্থের ব্যাখ্যা, টিকা, ফতোয়া ও সংক্ষিপ্তকরণে আলেমগণ মনোনিবেশ করেন। - ৬. আধুনিক যুগ ও সামষ্টিক ইজতিহাদ (العصر الحديث والاجتهاد الجماعي):
আধুনিক যুগে ব্যাংক-বীমা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, কৃত্রিম প্রজনন ও শেয়ারবাজার ইত্যাদি আধুনিক জটিল মাসয়ালা নিরসনে ‘মাজমাউল ফিকহিল ইসলামী’ (আন্তর্জাতিক ইসলামিক ফিকহ একাডেমি) ইত্যাদির মাধ্যমে যৌথ ইজতিহাদের বিকাশ ঘটেছে।
٢- ما المذهب وكم عددها؟ ما الحكم فى اتباع المذهب؟ اكتب اصول المذهب الحنفى مفصلا-
[২. মাযহাব কী ও কয়টি? মাযহাব মানার হুকুম কী? হানাফী মাযহাবের মূলনীতিসমূহ বিস্তারিত লেখ।]
উত্তর:
১. মাযহাবের পরিচয় ও সংখ্যা (مفهوم المذهب وعدده):
শাব্দিক অর্থ: ‘মাযহাব’ (المذهب) শব্দটি ذهب – يذهب (গমন করা) থেকে একটি ইসমে জারফ বা মাসদার মীমি, যার অর্থ যাওয়ার পথ, পথচলা বা মতবাদ।
পারিভাষিক অর্থ: শরিয়তের কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক গৌণ ও শাখাগত বিধানাবলি উদঘাটনে কোনো স্বীকৃত মুজতাহিদ ইমামের উদ্ভাবিত সামগ্রিক গবেষণা পদ্ধতি ও মতামতসমূহকে ‘মাযহাব’ বলে।
মাযহাবের সংখ্যা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত নির্ভরযোগ্য ও লিপিবদ্ধ মাযহাব হলো চারটি:
- হানাফী মাযহাব (ইমাম আবু হানিফা রহ. ৮০-১৫০ হি.)
- মালিকী মাযহাব (ইমাম মালিক ইবনে আনাস রহ. ৯৩-১৭৯ হি.)
- শাফেয়ী মাযহাব (ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী রহ. ১৫০-২০৪ হি.)
- হাম্বলী মাযহাব (ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. ১৬৪-২৪১ হি.)
২. মাযহাব অনুসরণের বিধান (حكم اتباع المذهب):
ইসলামী শরিয়তে সাধারণ মুসলিম জনসাধারণের জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট নির্ভরযোগ্য মাযহাব অনুসরণ করা (তাক্বলীদে শাখসী) ওয়াজিব বা অপরিহার্য।
দলিলসমূহ:
- আল্লাহ তাআলা কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন: {فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} (তোমরা যদি নিজেরা না জানো, তবে আহলে জিকর তথা বিজ্ঞ আলেমদের জিজ্ঞেস কর) [সূরা আন-নাহল: ৪৩]। সাধারণ মানুষের পক্ষে সরাসরি কুরআন-হাদীস থেকে শত শত শর্ত পূরণ করে মাসয়ালা বের করা অসম্ভব।
- ইমামদের মাযহাব অনুসরণ না করলে সমাজে স্বেচ্ছাচারিতা, সুবিধাবাদ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। যে ব্যক্তি নিজের পছন্দমত এক এক মাযহাবের হালকা ফতোয়া তালাশ করবে, সে দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়ে ফাসেক পরিণত হবে।
৩. হানাফী মাযহাবের মূলনীতিসমূহ (أصول المذهب الحنفي):
ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ.) স্বয়ং তাঁর ফিকহী ইজতিহাদের মূলনীতি বর্ণনা করে বলেন:
“إني آخذ بكتاب الله، فإن لم أجد فبسنة رسول الله ﷺ، فإن لم أجد أخذت بقول أصحابه، آخذ بقول من شئت منهم وأدع من شئت، ولا أخرج عن قولهم إلى قول غيرهم، فإذا انتهى الأمر إلى إبراهيم والشعبي والحسن وابن سيرين، فلي أن أجتهد كما اجتهدوا.”
হানাফী মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত মৌলিক উসূলগুলো নিম্নরূপ:
- কিতাবুল্লাহ (পবিত্র কুরআন): এটি শরিয়তের সর্বপ্রথম ও অকাট্য উৎস। কুরআনের আম (সার্বজনীন) নির্দেশ قطعي (সুনিশ্চিত) হিসেবে গণ্য হয়।
- সুন্নাতে রাসূল (হাদীস শরিফ): মুতাওয়াতির ও মাশহুর হাদীসকে কিতাবুল্লাহর ন্যায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আর খবরে ওয়াহিদ (একক সূত্রে বর্ণিত হাদীস) যদি প্রতিষ্ঠিত মূলনীতির বিরোধী না হয় এবং বর্ণনাকারী স্বয়ং এর বিপরীত আমল না করেন, তবে তা গ্রহণ করা হয়।
- ইজমা (الإجماع – সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত): সাহাবা ও মুজতাহিদ আলেমদের ঐকমত্য শরিয়তের তৃতীয় অকাট্য দলিল।
- কিয়াস (القياس – যৌক্তিক সাদৃশ্যকরণ): কুরআন-সুন্নাহে সরাসরি সমাধান না থাকলে ইল্লত বা সমজাতীয় কারণের ভিত্তিতে নতুন বিষয়ের সমাধান দেওয়া। ইমাম আবু হানিফা কিয়াসের সূক্ষ্ম প্রয়োগে ছিলেন অনন্য।
- ইস্তিহসান (الاستحسان – কল্যাণমূলক অগ্রাধিকার): প্রকাশ্য কিয়াসের চেয়ে জনকল্যাণ বা বিশেষ দলিলের ভিত্তিতে কোনো সূক্ষ্মতর যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া।
- উরফ ও সাধারণ রীতি (العرف والعادة): যে প্রচলিত সামাজিক প্রথা ও রীতিনীতি কুরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক নয়, তা হানাফী ফিকহে দলিলের মর্যাদা লাভ করে। (القاعدة: الثابت بالعرف كالثابت بالنص)।
- আক্বওয়ালুস সাহাবাহ (اقوال الصحابة): কোনো বিষয়ে কিয়াসের চেয়ে সাহাবীর আমল ও বক্তব্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
٣- ما التقليد وكم قسما له؟ وما الفرق بين التقليد والاتباع؟ بين-
[৩. التقليد কী এবং তা কত প্রকার? التقليد এবং الاتباع এর মধ্যে পার্থক্য কী? বর্ণনা কর।]
উত্তর:
১. তাক্বলীদ-এর পরিচয় (مفهوم التقليد):
শাব্দিক অর্থ: ‘তাক্বলীদ’ (التقليد) শব্দটি قلادة (গলায় হার বা বেড়ি পরানো) থেকে এসেছে। যেন কোনো ব্যক্তি অন্য কারো মতামতের রশি নিজের গলায় বরণ করে নিল।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলবিদদের মতে:
“التقليد: قبول قول الغير من غير حجة أو من غير معرفة دليله.”
অর্থাৎ কোনো মুজতাহিদের গবেষণা ও সিদ্ধান্তের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে তাঁর দলিল-প্রমাণের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ না জেনেও তাঁর ফতোয়া অনুযায়ী আমল করাকে তাক্বলীদ বলে।
২. তাক্বলীদের প্রকারভেদ (أقسام التقليد):
শরয়ী মানদণ্ডে তাক্বলীদ প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত:
- ক. তাক্বলীদে মামনূ’ বা হারাম তাক্বলীদ (التقليد المحرم والمذموم):
- মৌলিক আকিদা ও ঈমানের বিষয়ে কাউকে অন্ধভাবে তাক্বলীদ করা। ঈমান হতে হবে দৃঢ় বিশ্বাসের ভিত্তিতে।
- পূর্বপুরুষদের ভ্রান্ত মতামতের অন্ধ অনুকরণ করা, যেমনটি মুশরিকরা করত: {إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَىٰ أُمَّةٍ}।
- কুরআন ও সুন্নাহর দ্ব্যর্থহীন অকাট্য দলিলের স্পষ্ট বিরোধিতা করে কারো ব্যক্তিমতের অন্ধ অনুকরণ করা।
- খ. তাক্বলীদে জায়েয ও ওয়াজিব (التقليد الواجب والمشروع):
- সাধারণ মানুষের জন্য তাক্বলীদ (تقليد العامي): যে ব্যক্তি আরবি ভাষা, উসূলে ফিকহ, নাসিখ-মানসূখ ইত্যাদির জ্ঞান রাখে না, তার জন্য কোনো মুত্তাকী মুজতাহিদ আলেমের তাক্বলীদ করা ওয়াজিব।
- নির্দিষ্ট ইমামের তাক্বলীদ (التقليد الشخصي): দ্বীনি ফেতনা ও প্রবৃত্তিপূজা থেকে বাঁচার জন্য চার মাযহাবের যেকোনো একটি নির্দিষ্ট মাযহাবের ওপর আমল করা।
৩. তাক্বলীদ ও ইত্তিবা’-এর মধ্যকার পার্থক্য (الفرق بين التقليد والاتباع):
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম ও উসূলবিদদের গবেষণার আলোকে তাক্বলীদ ও ইত্তিবা’-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে:
| আল-ইত্তিবা’ (الاتباع) | আত-তাক্বলীদ (التقليد) |
|---|---|
| ১. দলিল ও প্রমাণের ভিত্তি জেনে মুজতাহিদ বা রাসূলের মতামত অনুসরণ করা। | ১. দলিল-প্রমাণের অন্বেষণ ব্যতিরেকেই কেবল আলেমের ওপর বিশ্বাস রেখে তাঁর কথা মেনে নেওয়া। |
| ২. এটি মূলত রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবিদের অনুসরণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। | ২. এটি অ-নবী তথা সাধারণ মুজতাহিদ ফকীহগণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। |
| ৩. এটি জ্ঞানীদের স্তর, যাঁরা দলিল বুঝতে সক্ষম। | ৩. এটি সাধারণ মুসলিম জনতার জন্য প্রযোজ্য, যাঁরা দলিলের বিচার-বিশ্লেষণে অক্ষম। |
| ৪. কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইত্তিবা’ করার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন: {اتَّبِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ}। | ৪. তাক্বলীদের বৈধতা পরোক্ষভাবে অজ্ঞতার প্রেক্ষিতে স্বীকৃত হয়েছে: {فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ}। |
٤- وازن بين الفقه الحنفى والفقه الحنبلى مفصلا-
[৪. ফিকহে হানাফী ও ফিকহে হাম্বলী এর মাঝে তুলনামূলক আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা:
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের চার মাযহাবের মধ্যে হানাফী মাযহাব হলো ‘আসহাবুর রায়’ বা যৌক্তিক চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্বকারী এবং হাম্বলী মাযহাব হলো ‘আসহাবুল হাদীস’ বা বিশুদ্ধ টেক্সট ও আছারমুখী চিন্তাধারার অগ্রদূত। নিম্নে এ দুই মাযহাবের তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো:
১. প্রতিষ্ঠাতা ইমামদ্বয়ের দৃষ্টিভঙ্গি:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.): তিনি ছিলেন প্রখর বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণাধর্মী ফকীহ। তিনি নাগরিক কুফা নগরীতে অবস্থান করে বাস্তবের পাশাপাশি সম্ভাব্য ভবিষ্যতের সমস্যা নিয়েও আগাম সমাধান (الفقه التقديري والافتراضي) উদ্ভাবন করতেন।
- ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.): তিনি ছিলেন মূলত এক বিশাল হাদীস বিশারদ (মুহাদ্দিস)। তিনি অপ্রয়োজনীয় অনুমান বা কাল্পনিক বিষয়ের চেয়ে কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীসের সরাসরি প্রয়োগকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতেন এবং ফিকহে তাক্বদীরীকে অপছন্দ করতেন।
২. দলিলের প্রাধান্য ও মূলনীতির ক্ষেত্রে তুলনা:
- খবরে ওয়াহিদ ও কিয়াসের অগ্রাধিকার:
- হানাফী মাযহাব: খবরে ওয়াহিদ যদি কুরআনের বাহ্যিক সাধারণ বিধান (আম) বা প্রতিষ্ঠিত সার্বিক উসূলের পরিপন্থী হয়, তবে তা গ্রহণে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করে কিয়াসকে প্রাধান্য দেয়।
- হাম্বলী মাযহাব: খবরে ওয়াহিদ এমনকি জঈফ (দুর্বল) হাদীসকেও কিয়াসের চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রাধান্য দেয়। ইমাম আহমদের মতে: “ضعيف الحديث أحب إليّ من رأي الرجال” (দুর্বল হাদীসও মানুষের ব্যক্তিগত যুক্তির চেয়ে আমার কাছে প্রিয়)।
- ইস্তিহসান বনাম ইস্তিসহাব:
- হানাফী ফিকহ ইস্তিহসান (সূক্ষ্ম যৌক্তিক অগ্রাধিকার) এবং সমাজের কল্যাণধর্মী ‘উরফ’-কে ব্যাপকভাবে দলিলের ভিত্তি বানায়।
- হাম্বলী ফিকহ ‘ইস্তিসহাব’ (মূল অবস্থার ধারাবাহিকতা বহাল রাখা) এবং ‘সাদ্দে যারায়ে’ (মন্দ পথ রুদ্ধকরণ)-এর ওপর গভীর জোর দেয়।
- চুক্তি ও শর্তাবলির স্বাধীনতা (الشروط في العقود):
- হানাফী ফিকহে লেনদেন ও চুক্তিতে এমন কোনো নতুন শর্ত যুক্ত করা মাকরূহ যা মূল চুক্তির স্বাভাবিক দাবির অতিরিক্ত।
- হাম্বলী ফিকহে চুক্তির ক্ষেত্রে চরম উদারতা প্রদর্শন করা হয়েছে। তাঁদের মূলনীতি হলো: “الأصل في الشروط الإباحة والصحة” (শরিয়তের সরাসরি নিষিদ্ধ বিষয় না হলে পক্ষদ্বয়ের যেকোনো শর্তই বৈধ ও কার্যকর)।
৩. ফিকহী প্রয়োগের ক্ষেত্রে কয়েকটি বাস্তব পার্থক্য:
| হানাফী মাযহাব | হাম্বলী মাযহাব |
|---|---|
| ১. ইমামের পেছনে কিরাত পড়া নিষিদ্ধ ও মাকরূহে তাহরীমী। | ১. জাহরী নামাজে ইমামের কিরাত শুনলে পড়া লাগবে না, তবে সিররি নামাজে পড়বে। |
| ২. নামাজে কেবল তাকবীরে তাহরীমায় হাত তুলবে (রফউল ইয়াদাইন নেই)। | ২. তাকবীরে তাহরীমা, রুকূতে যাওয়া এবং রুকূ হতে ওঠার সময় রফউল ইয়াদাইন সুন্নত। |
| ৩. বিতরের নামাজ তিন রাকাত এক সালামে মাগরিবের ন্যায় ওয়াজিব। | ৩. বিতর এক রাকাতও হতে পারে এবং তিন রাকাত পড়লে দুই সালামে পড়া উত্তম। |
| ৪. প্রাপ্তবয়স্কা স্বাধীন নারী অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াও নিজে বিবাহ করতে পারে। | ৪. ওলী বা অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া নারীর বিবাহ বাতিল। |
٥- اذكر نبذة عن حياة الامام الشافعى (رح) مع بيان خدماته فى علم الفقه-
[৫. ইমাম শাফেয়ী (রহ) এর জীবনী উল্লেখপূর্বক ফিকহ শাস্ত্রে তাঁর অবদান আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা:
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের তৃতীয় মহান ইমাম হলেন ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী (রহ.)। তিনি ছিলেন হিজাজের হাদীসমুখী ফিকহ এবং ইরাকের যুক্তিমুখী ফিকহের সফল সমন্বয়কারী মহামনীষী।
১. ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (ترجمته):
- নাম ও বংশপরিচয়: তাঁর নাম মুহাম্মদ, উপনাম আবু আব্দুল্লাহ। পিতার নাম ইদরীস। তিনি কুরাইশ বংশের বনু মুত্তালিব শাখায় জন্মগ্রহণ করেন, ফলে তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দূরবর্তী বংশধর।
- জন্ম ও শিক্ষাজীবন: তিনি ১৫০ হিজরি সনে ফিলিস্তিনের গাজায় জন্মগ্রহণ করেন (যে বছর ইমাম আবু হানিফা রহ. ইন্তেকাল করেন)। মাত্র দুই বছর বয়সে পিতৃহীন হয়ে তিনি মায়ের সাথে মক্কায় আসেন। শৈশবেই তিনি মক্কার মরুভূমিতে বেদুইনদের সাথে থেকে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা আয়ত্ত করেন এবং মাত্র সাত বছর বয়সে কুরআন হিফজ করেন। দশ বছর বয়সে তিনি ইমাম মালিকের বিখ্যাত হাদীসগ্রন্থ ‘আল-মুয়াত্তা’ মুখস্থ করেন।
- উস্তাদবৃন্দ: মক্কায় মুফতি মুসলিম ইবনে খালিদ আজ-জাঞ্জীর তত্ত্বাবধানে জ্ঞানার্জন করেন যিনি তাঁকে ১৫ বছর বয়সেই ফতোয়া প্রদানের অনুমতি দেন। এরপর তিনি মদিনায় গিয়ে ইমাম মালিক (রহ.)-এর সান্নিধ্যে দীর্ঘ সময় কাটান। পরবর্তীতে বাগদাদে এসে ইমাম আবু হানিফার প্রধান ছাত্র ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শাইবানী (রহ.)-এর নিকট হানাফী ফিকহ গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন।
- ইন্তেকাল: জীবনের শেষ ভাগে তিনি মিসরে হিজরত করেন এবং ২০৪ হিজরি সনের জুমাদাল আখিরা মাসে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে কায়রোতে ইন্তেকাল করেন।
২. ফিকহ শাস্ত্রে ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর ঐতিহাসিক অবদান (خدماته في علم الفقه):
- উসূলে ফিকহের জনক ও ‘আর-রিসালাহ’ রচনা:
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) হলেন পৃথিবীর সর্বপ্রথম উসূলে ফিকহ (ফিকহের মূলনীতি শাস্ত্র)-এর সংকলক। আব্দুর রহমান ইবনে মাহদীর অনুরোধে তিনি তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘আর-রিসালাহ’ (الرسالة) রচনা করেন। এতে তিনি নাসিখ-মানসূখ, আম-খাছ, মুজমাল-মুফাসসাল, খবরে ওয়াহিদের প্রামাণিকতা এবং কিয়াসের বিজ্ঞানসম্মত শর্তাবলি সর্বপ্রথম লিপিবদ্ধ করেন। - হাদীস ও যুক্তির অপূর্ব মেলবন্ধন:
তিনি যখন বাগদাদে আসেন, তখন হাদীসবিদ ও যুক্তিবিদদের মাঝে তীব্র মতবিরোধ ছিল। ইমাম শাফেয়ী উভয় দলের জ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রমাণ করেন যে বিশুদ্ধ হাদীসের সাথে খাঁটি কিয়াসের কোনো বিরোধ নেই। এ জন্য বাগদাদের আলেমগণ তাঁকে ‘নাসিরুস সুন্নাহ’ (সুন্নাহর সাহায্যকারী) উপাধিতে ভূষিত করেন। - ‘আল-উম্ম’ (كتاب الأم) গ্রন্থ প্রণয়ন:
তিনি তাঁর বিখ্যাত ফিকহী বিশ্বকোষ ‘কিতাবুল উম্ম’ রচনা করেন, যা তুলনামূলক ফিকহ ও শাফেয়ী মাযহাবের প্রধান আকরগ্রন্থ হিসেবে চিরকাল সমাদৃত। - মাযহাবে ক্বাদীম ও মাযহাবে জাদীদ (المذهب القديم والجديد):
তিনি ইরাকে অবস্থানকালে যে ফতোয়াসমূহ প্রণয়ন করেছিলেন তাকে ‘মাযহাবে ক্বাদীম’ (প্রাচীন মত) বলা হয়। পরবর্তীতে মিসরে গিয়ে সেখানকার সমাজ ও নতুন হাদীসের আলোকে কিছু মাসয়ালায় পরিবর্তন আনেন, যাকে ‘মাযহাবে জাদীদ’ (নতুন মত) বলা হয়। এটি তাঁর বৈজ্ঞানিক সততা ও গতিশীল চিন্তার প্রমাণ।
٦- تحدث عن حكم قرأة الفاتحة خلف الأمام بالادلة-
[৬. ইমামের পিছনে সুরা ফাতিহা পড়ার হুকুম দলিলসহ আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা:
জামাতে নামাজের ক্ষেত্রে ইমামের পেছনে মুক্তাদীর সূরা ফাতিহা পাঠ করা নিয়ে ফকীহ ও ইমামগণের মধ্যে দীর্ঘ পর্যালোচনা ও মতভেদ রয়েছে। নিম্নে দলিলের আলোকে মাযহাবসমূহের মতামত বিশ্লেষণ করা হলো:
১. হানাফী মাযহাবের মত ও দলিল (مذهب الحنفية):
বিধান: হানাফী মাযহাব মতে, ইমামের পেছনে মুক্তাদীর সূরা ফাতিহা বা অন্য কোনো কিরাত পড়া জায়েয নেই; বরং তা মাকরূহে তাহরীমী (হারামের নিকটবর্তী)। নামাজ নিঃশব্দে (সিররি) হোক বা উচ্চৈঃস্বরে (জাহরি) হোক, সর্বাবস্থায় মুক্তাদী চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে।
দলিলসমূহ:
- কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন: {وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ} (যখন কুরআন পড়া হয়, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং নিশ্চুপ থাকো) [আল-আ’রাফ: ২০৪]। ইবনে মাসউদ ও মুফাসসিরদের মতে এই আয়াত নামাজের কিরাত সম্পর্কিত।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীস: “مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ فَقِرَاءَةُ الإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ” (যার ইমাম রয়েছে, ইমামের কিরাতই তার কিরাত হিসেবে গণ্য হবে) [মুয়াত্তা মুহাম্মদ, ইবনে মাজাহ, আহমাদ]।
- হাদীস শরিফে আরও এসেছে: “যখন ইমাম তাকবীর বলে তোমরা তাকবীর বল, আর যখন ইমাম কিরাত পড়ে তখন তোমরা চুপ থাকো” [সহীহ মুসলিম]।
২. শাফেয়ী মাযহাবের মত ও দলিল (مذهب الشافعية):
বিধান: ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে, সূরা ফাতিহা পাঠ করা নামাজের রুকন। তাই ইমাম, মুক্তাদী, একাকী নামাজী— সকলের জন্যই সিররি ও জাহরি সর্বপ্রকার নামাজে সূরা ফাতিহা পড়া ফরজ বা ওয়াজিব।
দলিলসমূহ:
- রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সর্বজনীন ঘোষণা: “لا صَلاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الكِتَابِ” (যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করে না, তার নামাজই হয় না) [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]।
- উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূল ﷺ ফজরের নামাজ শেষে বললেন: সম্ভবত তোমরা তোমাদের ইমামের পেছনে কিছু পড়? আমরা বললাম: হ্যাঁ। তিনি বললেন: “সূরা ফাতিহা ছাড়া অন্য কিছু পড়বে না, কারণ যে ব্যক্তি তা পড়ে না তার নামাজ হয় না” [আবু দাউদ]।
৩. মালিকী ও হাম্বলী মাযহাবের মধ্যপন্থী মত:
ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ (রহ.)-এর মতে, জোহর ও আসরের ন্যায় সিররি (নিঃশব্দ) নামাজে মুক্তাদীর সূরা ফাতিহা পড়া মুস্তাহাব। কিন্তু মাগরিব, এশা ও ফজরের ন্যায় জাহরি নামাজে যদি মুক্তাদী ইমামের কিরাত শুনতে পায়, তবে তার জন্য পড়া নিষিদ্ধ এবং তাকে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।
٧- كم ركعة لصلاة التراويح؟ بين بالأدلة مفصلا-
[৭. তারাবীহের নামাজ কত রাকাত? দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা:
পবিত্র মাহে রমজানের রাতে এশার নামাজের পর বিতরের পূর্বে জামাতের সাথে যে সুন্নত নামাজ আদায় করা হয় তাকে ‘সালাতুত তারাবীহ’ (صلاة التراويح) বলে। চার রাকাত পর পর বিশ্রাম নেওয়ার কারণে একে তারাবীহ বলা হয়।
১. তারাবীহের রাকাত সংখ্যা ও জমহুর উম্মাহর ঐকমত্য:
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের চার মাযহাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকীহ (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমদ এবং ইমাম মালিকের এক বর্ণনা মতে)— সকলের সর্বসম্মত ফতোয়া হলো: তারাবীহের নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ এবং তা ২০ (বিশ) রাকাত। যুগ যুগ ধরে মক্কা মুকাররমার মসজিদুল হারাম ও মদিনা মুনাওয়ারার মসজিদে নববীতে ২০ রাকাত তারাবীহ জামাতের সাথে পড়া হচ্ছে।
২. বিশ রাকাতের প্রামাণ্য দলিলসমূহ (الأدلة على العشرين ركعة):
- সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মত ইজমা (إجماع الصحابة):
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খেলাফতকালে ১৪ হিজরিতে তিনি উবাই ইবনে কা’ব ও তামীম আদ-দারী (রা.)-এর ইমামতিতে সকল সাহাবাকে ২০ রাকাত তারাবীহের ওপর সমবেত করেন।
ইমাম বায়হাকী তাঁর আস-সুনানুল কুবরায় সহীহ সনদে সাইব ইবনে ইয়াযিদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন:
“كَانُوا يَقُومُونَ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً”
(সাহাবায়ে কেরাম উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর যুগে রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবীহ নামাজ আদায় করতেন)। কোনো একজন সাহাবীও এর বিরোধিতা করেননি, ফলে এটি সাহাবিদের ‘ইজমায়ে সুকূতী’-তে পরিণত হয়। - খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাত অনুসরণের নির্দেশ:
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ”
(তোমাদের ওপর আমার সুন্নাত এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাত আঁকড়ে ধরা অপরিহার্য; একে দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরে রাখো) [আবু দাউদ ও তিরমিযী]। হযরত উমর, উসমান ও আলী (রা.)— সকলেই বিশ রাকাত তারাবীহের আমল জারি রেখেছেন। - ইমামগণের চূড়ান্ত ফতোয়া:
ইমাম তিরমিযী (রহ.) বলেন: “অধিকাংশ আলেম বিশ রাকাতের অভিমত দিয়েছেন, যা উমর ও আলী (রা.) থেকে বর্ণিত। সুফিয়ান সাওরী, ইবনুল মুবারক ও ইমাম শাফেয়ী এ মতই গ্রহণ করেছেন। শাফেয়ী বলেন: আমি মক্কাবাসীকে বিশ রাকাত পড়তে দেখেছি।”
৩. আট রাকাত দাবিকারীদের বিভ্রান্তি নিরসন:
যাঁরা আট রাকাতকে তারাবীহ বলেন, তাঁরা মূলত সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হযরত আয়েশা (রা.)-এর একটি হাদীস প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন, যেখানে বলা হয়েছে: “রাসূল ﷺ রমজানে ও রমজানের বাইরে এগার রাকাতের বেশি পড়তেন না।” মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করেছেন যে, এটি ছিল রাসূল ﷺ-এর তাহাজ্জুদ নামাজের বিবরণ (যা রমজান ও গায়রে রমজানে সমান ছিল); পক্ষান্তরে তারাবীহের নামাজ কেবল রমজানের সাথেই খাস। স্বয়ং ইমাম বুখারী উক্ত হাদীসটিকে ‘বাবু ক্বিয়ামিল লাইল’ (তাহাজ্জুদ অধ্যায়ে) এনেছেন, তারাবীহ অধ্যায়ে আনেননি।
٨- اذكر مصارف الزكاة مع ذكر زكاة الزروع والثمار-
[৮. যাকাতের খাতসমূহ উল্লেখপূর্বক ফসল ও ফলের যাকাত আলোচনা কর।]
উত্তর:
১. যাকাতের আটটি খাত (مصارف الزكاة الثمانية):
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে যাকাত বণ্টনের আটটি খাত সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন:
{إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ}
- আল-ফুক্বারা (الفقراء – অভাবগ্রস্ত): যার নিকট কিছু সম্পদ আছে কিন্তু তা নেসাব পরিমাণ নয় এবং নিজের মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারে না।
- আল-মাসাকীন (المساكين – নিঃস্ব): যার কাছে একেবারেই কোনো সম্পদ নেই, যে অন্যের কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়।
- আল-‘আমিলীনা ‘আলাইহা (العاملين عليها – যাকাত আদায়কারী কর্মচারী): ইসলামি রাষ্ট্র কর্তৃক যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পারিশ্রমিক।
- আল-মুআল্লাফাতু কুলূবুহুম (المؤلفة قلوبهم – চিত্তাকর্ষণার্থে): ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য বা মুসলিমদের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য কোনো ব্যক্তিকে দেওয়া (তবে হানাফী মতে বর্তমানে এটি স্থগিত)।
- ফির-রিক্বাব (في الرقاب – দাসমুক্তি): দাস-দাসীদের মুক্তির অর্থ পরিশোধের জন্য।
- আল-গারিমীন (الغارمين – ঋণগ্রস্ত): যে ব্যক্তি সৎকাজে ঋণগ্রস্ত হয়ে ঋণের ভারে জর্জরিত এবং তা পরিশোধে সম্পূর্ণ অক্ষম।
- ফী সাবীলিল্লাহ (في سبيل الله – আল্লাহর পথে): আল্লাহর দ্বীন রক্ষা ও প্রসারে জিহাদকারী মুজাহিদ অথবা নিঃস্ব জ্ঞানান্বেষী তলেবে ইলম।
- ইবনুস সাবীল (ابن السبيل – মুসাফির): নিজ দেশে সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও সফরে এসে কোনো ব্যক্তি নিঃস্ব হয়ে পড়লে তাকে দেশে ফেরার উপযোগী পরিমাণ দেওয়া।
২. ফসল ও ফলের যাকাত বা উশর (زكاة الزروع والثمار):
জমিতে উৎপাদিত ফসল ও ফলের ওপর প্রদত্ত যাকাতকে ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ‘উশর’ (العُشر) বা অর্ধ-উশর (نصف العشر) বলা হয়।
কুরআনের নির্দেশ: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الْأَرْضِ} [আল-বাক্বারাহ: ২৬৭] এবং {وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ} [আল-আন’আম: ১৪১]।
উশরের পরিমাণ নির্ধারণ: রাসূলুল্লাহ ﷺ সুস্পষ্টভাবে বিধান দিয়েছেন:
“فِيمَا سَقَتِ السَّمَاءُ وَالْعُيُونُ أَوْ كَانَ عَثَرِيًّا الْعُشْرُ، وَمَا سُقِيَ بِالنَّضْحِ نِصْفُ الْعُشْرِ”
(বৃষ্টির পানিতে, ঝর্ণা বা নদীর পানিতে প্রাকৃতিকভাবে বিনা খরচে সেচকৃত ফসলে পূর্ণ দশভাগের একভাগ অর্থাৎ ১০% (উশর) ফরজ হবে; আর কৃত্রিমভাবে শ্রম ও খরচে কূপ বা সেচযন্ত্রের মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলে বিশ ভাগের একভাগ অর্থাৎ ৫% (অর্ধ-উশর) প্রদান করতে হবে) [সহীহ বুখারী]।
নেসাব: জমহুর ফকীহগণের মতে ফসলের নেসাব হলো ৫ ওসাক্ব (প্রায় ৬৫৩ কেজি)। তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে মাটি থেকে যা কিছু উৎপাদিত হয় (অল্প হোক বা বেশি হোক) সর্বাবস্থায়ই উশর আদায় করা ফরজ।
مجموعة (ب) : الأسئلة الموجزة (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)
الدرجات — ٥ × ٤ = ٢٠
٩- ما الاختلاف بين الأئمة في رفع اليدين في الصلاة؟ بين-
[৯. নামাজে رفع اليدين সম্পর্কে ইমামদের মাঝে মত পার্থক্য কী? আলোচনা কর।]
উত্তর:
নামাজে তাকবীরে তাহরীমা ছাড়া রুকূতে যাওয়া এবং রুকূ থেকে ওঠার সময় উভয় হাত ওঠানোকে ‘রফউল ইয়াদাইন’ বলে। এ বিষয়ে ইমামগণের দুটি প্রধান মত রয়েছে:
- ১. হানাফী মাযহাবের মত: নামাজে কেবল শুরুতে তাকবীরে তাহরীমার সময়ই হাত ওঠানো হবে, রুকূতে যাওয়া বা ওঠার সময় হাত তোলা হবে না।
দলিল: প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন: “আমি কি তোমাদের রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামাজ পড়ে দেখাব না? অতঃপর তিনি নামাজ পড়লেন এবং প্রথম তাকবীর ছাড়া আর কোথাও হাত ওঠালেন না” [তিরমিযী, নাসাঈ]। সাহাবী বারা ইবনে আযিব (রা.) থেকেও অনুরূপ বর্ণিত রয়েছে। - ২. শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের মত: তাকবীরে তাহরীমা ছাড়াও রুকূতে যাওয়ার সময়, রুকূ থেকে ওঠার সময় এবং প্রথম তাশাহহুদের পর তৃতীয় রাকাতে দাঁড়ানোর সময় রফউল ইয়াদাইন করা সুন্নত।
দলিল: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণিত সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীস।
١٠- كم ركعة لصلاة الوتر؟ وما الاختلاف فيه بين الائمة؟ بين بالأدلة-
[১০. বিতরের নামাজ কত রাকাত? এ সম্পর্কে ইমামদের মতভেদ কী? দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
উত্তর:
বিতর নামাজের রাকাত সংখ্যা ও আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে ইমামগণের মতভেদ নিম্নরূপ:
- হানাফী মাযহাব: বিতরের নামাজ তিন রাকাত এবং তা মাগরিবের নামাজের ন্যায় এক সালামে ও দুই তাশাহহুদের সাথে আদায় করা ওয়াজিব। তৃতীয় রাকাতে কিরাতের পর তাকবীর বলে হাত তুলে রুকূর পূর্বে কুনূতে নাযেলা পড়তে হয়।
দলিল: আয়েশা (রা.) বলেন: “রাসূল ﷺ তিন রাকাত বিতর পড়তেন এবং শেষ রাকাত ছাড়া সালাম ফিরাতেন না” [নাসাঈ]। হাসান বসরী (রহ.) বলেন: মুসলিমদের সর্বসম্মত আমল হলো বিতর তিন রাকাত। - শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব: বিতরের সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো এক রাকাত এবং সর্বোচ্চ এগার রাকাত। সাধারণ নিয়ম হলো দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে পৃথকভাবে এক রাকাত পড়া।
দলিল: হাদীস: “রাতের নামাজ দুই রাকাত দুই রাকাত, অতঃপর তোমাদের কেউ ভোরের আশঙ্কা করলে এক রাকাত পড়ে নেবে যা তার পূর্বেকার নামাজকে বেজোড় বানিয়ে দেবে” [সহীহ বুখারী]।
١١- ما حكم خروج المرأة للحج والعمرة بدون الزوج أو المحرم؟ بين-
[১১. স্বামী কিংবা মুহরিম ব্যতিত মহিলাদের হজ ও ওমরাতে গমনের বিধান কী? আলোচনা কর।]
উত্তর:
মুহরিম ব্যতিরেকে নারীদের সফর সম্পর্কে ফকীহগণের দুটি প্রসিদ্ধ অভিমত রয়েছে:
- ১. হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের বিধান: কোনো নারীর ওপর হজ ফরজ হলেও তার সাথে স্বামী বা এমন কোনো স্থায়ী মুহরিম পুরুষ (যাঁর সাথে বিবাহ চিরতরে হারাম) থাকা বাধ্যতামূলক, যার সাথে সে নিরাপদে সফর করতে পারে। মুহরিম না থাকলে নারীর জন্য সফর করা সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ।
দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “لا يَحِلُّ لامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ” (যে নারী আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তার জন্য কোনো মুহরিম ছাড়া একদিন এক রাতের দূরত্বে সফর করা হালাল নয়) [সহীহ বুখারী]। - ২. শাফেয়ী ও মালিকী মাযহাবের বিধান: যদি পথ নিরাপদ হয় এবং কোনো বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য নারী কাফেলা থাকে, তবে নারীর জন্য জীবনের প্রথম ফরজ হজে মুহরিম ছাড়াও যাওয়া জায়েয। তবে নফল হজ বা ওমরার জন্য মুহরিম আবশ্যক।
١٢- بين مذاهب العلماء فى عدد تكبيرات العيدين-
[১২. দুই ঈদের নামাজের তাকবিরের সংখ্যায় আলেমগণের মাযহাব বর্ণনা কর।]
উত্তর:
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজে অতিরিক্ত তাকবীর (تكبيرات الزوائد) নিয়ে আলেমদের তিনটি মাযহাব রয়েছে:
- হানাফী মাযহাব: অতিরিক্ত তাকবীর মোট ৬ (ছয়) টি। প্রথম রাকাতে সানা পড়ার পর কিরাতের পূর্বে ৩টি অতিরিক্ত তাকবীর; আর দ্বিতীয় রাকাতে কিরাতের পর রুকূর পূর্বে ৩টি অতিরিক্ত তাকবীর (চতুর্থ তাকবীরে রুকূতে যাবে)। এটি ইবনে মাসউদ (রা.) ও কূফাবাসী সাহাবিদের আমল।
- শাফেয়ী মাযহাব: অতিরিক্ত তাকবীর মোট ১২টি। প্রথম রাকাতে তাকবীরে তাহরীমা ছাড়া কিরাতের পূর্বে ৭টি তাকবীর; এবং দ্বিতীয় রাকাতে কিরাতের পূর্বে ৫টি তাকবীর।
- মালিকী ও হাম্বলী মাযহাব: মোট ১১ বা ১২টি। প্রথম রাকাতে তাকবীরে তাহরীমাসহ ৭টি এবং দ্বিতীয় রাকাতে কিরাতের পূর্বে ৫টি তাকবীর।
١٣- ما حكم خروج النساء الى المسجد فى زماننا الحاضر؟ بين-
[১৩. বর্তমানে মহিলাদের জন্য মসজিদের নামাজের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার হুকুম কী? আলোচনা কর।]
উত্তর:
১. প্রাথমিক যুগের প্রেক্ষাপট: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে মহিলারা পূর্ণ পর্দা বজায় রেখে ও সুগন্ধি বর্জন করে মসজিদে নববীর পেছনের কাতারে এসে জামাতে শরিক হতেন। রাসূল ﷺ বলেছিলেন: “তোমরা আল্লাহর বান্দীদের আল্লাহর মসজিদে আসতে নিষেধ করো না।”
২. সাহাবায়ে কেরাম ও আয়েশা (রা.)-এর ঐতিহাসিক ফতোয়া: রাসূল ﷺ-এর ওফাতের পরপরই সমাজে পরিবেশের পরিবর্তন দেখে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) বলেন:
“لَوْ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَأَى مَا أَحْدَثَ النِّسَاءُ لَمَنَعَهُنَّ الْمَسْجِدَ كَمَا مُنِعَتْ نِسَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ”
(রাসূলুল্লাহ ﷺ যদি দেখতেন নারীরা পরবর্তীতে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটিয়েছে, তবে তিনি নিশ্চয় তাদেরকে মসজিদে আসতে নিষেধ করতেন যেমন বনী ইসরাঈলের নারীদের নিষেধ করা হয়েছিল) [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]। হযরত উমর (রা.) নারীদের মসজিদে আসায় কড়াকড়ি আরোপ করেন।
৩. বর্তমান যুগের হুকুম: হানাফী ফকীহগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো: বর্তমান ফেতনা-ফ্যাসাদ, পর্দাহীনতা ও পাপাচারের যুগে যুবতী বা বয়স্কা কোনো নারীর জন্যই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বা জুমার উদ্দেশ্যে মসজিদে যাওয়া মাকরূহে তাহরীমী। মহিলাদের জন্য ঘরে নামাজ পড়া মসজিদের চেয়ে শতগুণ শ্রেষ্ঠ ও অধিক সওয়াবের কাজ। তবে যদি কোনো স্থানে নারীদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক প্রবেশপথ, পূর্ণ শরিয়তসম্মত পর্দা এবং ফিতনামুক্ত নিরাপদ পরিবেশে ইসলামি জ্ঞান অর্জনের ব্যবস্থা থাকে, তবে সেখানে দ্বীনি তালিম গ্রহণের অনুমতি রয়েছে।
١٤- ما الاختلاف بين الأئمة في القرأة فى صَلَوٰةِ الْجِنَازَةِ؟ بين-
[১৪. صَلَوٰةِ الْجِنَازَةِ এর ভিতরে সূরা পড়া নিয়ে ইমামদের মাঝে মতভেদ কী? আলোচনা কর।]
উত্তর:
জানাযার নামাজ মূলত মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা। জানাযায় সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত নিয়ে ফকীহগণের মধ্যে দুটি মত রয়েছে:
- ১. হানাফী ও মালিকী মাযহাব: জানাযার নামাজে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করা আবশ্যক বা সুন্নত নয়। জানাযা মূলত দোয়ার নাম। প্রথম তাকবীরের পর আল্লাহর প্রশংসা (ছানা), দ্বিতীয় তাকবীরে দুরুদ শরিফ, তৃতীয় তাকবীরে মৃত ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত দোয়া এবং চতুর্থ তাকবীরে সালাম ফিরানো সুন্নত। তবে যদি কেউ সূরা ফাতিহাকে কিরাতের নিয়তে না পড়ে বরং দোয়া ও আল্লাহর প্রশংসার নিয়তে পাঠ করে, তবে তা জায়েয।
- ২. শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব: জানাযার নামাজে প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা পাঠ করা নামাজের অন্যতম রুকন বা ওয়াজিব।
দলিল: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) জানাযার নামাজে সূরা ফাতিহা উচ্চৈঃস্বরে পড়লেন এবং বললেন: “আমি এজন্য পড়েছি যাতে তোমরা জানতে পার যে এটি সুন্নত” [সহীহ বুখারী]।
١٥- هل يمكن أن يصام رمضان فى يوم واحد فى العالم كله؟ بين آراء الأئمة فيه-
[১৫. সারা পৃথিবীতে একই দিনে রমযানের রোজা রাখা কি সম্ভব? এ বিষয়ে ইমামদের মতামত বর্ণনা কর।]
উত্তর:
১. ভৌগোলিক বাস্তবতা ও বৈজ্ঞানিক সত্য:
আধুনিক ভূগোল ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোকে সমগ্র বিশ্বে একই দিনে একসাথে রোজা শুরু করা বা ঈদ উদযাপন করা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ পৃথিবী গোল এবং নিজ অক্ষে আবর্তিত হওয়ার ফলে বিভিন্ন দেশে দিন ও রাতের সময়ের ব্যবধান প্রায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত হয়ে থাকে। যখন আমেরিকায় সূর্য অস্ত যায়, তখন এশিয়ায় পরবর্তী দিনের দুপুর বা বিকেল।
২. ফিকহী দিক থেকে ‘ইখতিলাফুল মাত্বালি’ (চাঁদের উদয়স্থল ভিন্ন হওয়া):
- ইত্তিহাদুল মাত্বালি’ (উদয়স্থল এক হওয়া): প্রাচীন যুগের কিছু ফকীহ মনে করতেন পৃথিবীর কোথাও চাঁদ দেখা গেলে সকল মুসলিমের জন্য রোজা রাখা ওয়াজিব। তবে এটি কেবল নিকটবর্তী অঞ্চলসমূহের জন্য প্রযোজ্য ছিল।
- ইখতিলাফুল মাত্বালি’ (উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য হওয়া): জমহুর গবেষক ও আধুনিক ফিকহ একাডেমিগুলোর মতে, দূরত্ব ও উদয়স্থলের ভিন্নতা সম্পূর্ণ প্রামাণ্য। সহীহ মুসলিমে কুরাইব (রহ.) থেকে বর্ণিত: সিরিয়াবাসী জুমার দিন চাঁদ দেখে রোজা রেখেছিল, কিন্তু মদিনায় ইবনে আব্বাস (রা.) শনিবার চাঁদ দেখে রোজা শুরু করেন। কুরাইব জিজ্ঞাসা করলেন: মুআবিয়া (রা.)-এর দেখা কি আপনার জন্য যথেষ্ট নয়? ইবনে আব্বাস বললেন: “না, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন।”
উপসংহার: রাসূল ﷺ বলেছেন: “তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ এবং চাঁদ দেখে রোজা ভঙ্গ কর।” সুতরাং যে দেশে যখন চাঁদ দেখা যাবে, সে দেশ অনুযায়ী আমল করাই সহীহ সুন্নাহর বিধান।
١٦- الاقامة شفع أو وتر؟ بين بالدلائل-
[১৬. ইকামাতের শব্দাবলি জোড় না বিজোড়? দলিলসহ আলোচনা কর।]
উত্তর:
নামাজের পূর্বে ইকামত প্রদানের শব্দাবলি জোড় (শাফ’ع) নাকি বিজোড় (উইত্র) হবে, এ নিয়ে ইমামগণের দুটি প্রামাণ্য মত রয়েছে:
- হানাফী মাযহাব (ইকামত জোড় বা শাফ’ع):
হানাফী মাযহাব মতে ইকামতের শব্দাবলি আযানের ন্যায় জোড় (দুই দুই বার করে) মোট ১৭টি বাক্য হবে। কেবল ‘ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ’ দুইবার অতিরিক্ত যুক্ত হবে।
দলিল: আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.)-এর স্বপ্নে পাওয়া আযানের বিখ্যাত হাদীসে এসেছে, আযান ও ইকামত উভয়টিতে বাক্যগুলো দুই দুই বার করে শেখানো হয়েছিল [আবু দাউদ, তিরমিযী]। এছাড়া সাহাবী আবু মাহযূরাহ (রা.)-কে রাসূল ﷺ আযান ও ইকামত উভয়টিই জোড় জোড় করে শিখিয়েছিলেন। - শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব (ইকামত বিজোড় বা উইত্র):
শাফেয়ী ও হাম্বলীগণের মতে, ইকামত হলো বিজোড় (একবার করে) মোট ১১টি বাক্য। কেবল তাকবীর শুরুতে দুইবার ও শেষে দুইবার এবং ‘ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ’ দুইবার হবে; বাকি বাক্যগুলো একবার করে।
দলিল: হযরত আনাস (রা.) বলেন:
“أُمِرَ بِلالٌ أَنْ يَشْفَعَ الأَذَانَ وَأَنْ يُوتِرَ الإِقَامَةَ إِلا الإِقَامَةَ”
(হযরত বিলাল রা.-কে আযানের বাক্য জোড় জোড় এবং ইকামতের বাক্য বিজোড় বিজোড় বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তবে ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ ছাড়া) [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: চার মাযহাবের যেকোনো একটি অনুসরণ করা কেন জরুরি?
উত্তর: সাধারণ মুসলমানদের পক্ষে সরাসরি কুরআন-হাদীস থেকে জটিল বিধান বের করা সম্ভব নয়। তাই দ্বীনে বিশৃঙ্খলা ও মনগড়া মতবাদ পরিহার করে সুসংহত চার মাযহাবের যেকোনো একটি অনুসরণ করা উম্মাহর ঐক্যের জন্য অপরিহার্য।
প্রশ্ন ২: হানাফী মাযহাবের উদ্ভাবক কে এবং এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: হানাফী মাযহাবের উদ্ভাবক হলেন ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ.)। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে গভীর যুক্তিপ্রয়োগ, কিয়াস ও ইস্তিহসানের মাধ্যমে বাস্তব ও ভবিষ্যৎ সমস্যার সুদূরপ্রসারী সমাধান।
প্রশ্ন ৩: তারাবীহের নামাজ কত রাকাত হওয়া প্রামাণ্য?
উত্তর: হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর যুগ থেকে শুরু করে চার মাযহাবের ঐকমত্য এবং পবিত্র হারামাইন শরিফাইনের অবিচ্ছিন্ন আমল অনুযায়ী তারাবীহের নামাজ বিশ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।
প্রশ্ন ৪: উশর কী এবং কখন তা ফরজ হয়?
উত্তর: উশর হলো কৃষিজমির ফসল ও ফলের যাকাত। প্রাকৃতিকভাবে সেচকৃত ফসলে ১০% এবং কৃত্রিম খরচে সেচকৃত ফসলে ৫% ফসল কাটার দিনই উশর হিসেবে আদায় করা ফরজ।
প্রশ্ন ৫: তাক্বলীদ ও ইত্তিবা’-এর পার্থক্য কী?
উত্তর: দলিল জানা ছাড়া আলেমদের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমল করাকে তাক্বলীদ বলে; আর দলিলের সত্যতা জেনে রাসূলুল্লাহ ও মুজতাহিদের অনুসরণ করাকে ইত্তিবা’ বলে।
প্রশ্ন ৬: ফাজিল ৪র্থ বর্ষের ২০৪৪০২ পরীক্ষার জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে?
উত্তর: আল-মাযাহিব আল-ফিকহিয়্যাহ পত্রে ভালো ফলের জন্য চার মাযহাবের মৌলিক উসূল ও তুলনামূলক মাসয়ালাগুলোর কুরআন ও হাদীস ভিত্তিক দলিল আরবি এবারতসহ মুখস্থ করে অনুশীলন করা অত্যন্ত জরুরি।