জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সভ্যতার ইতিহাস (History of Ancient and Medieval Civilization) – 205803, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
১০৩ মিনিট পড়ার সময়
১১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৪৯
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সভ্যতার ইতিহাস (তৃতীয় পত্র)
[History of Ancient and Medieval Civilization (Paper III)]
বিষয় কোড: ২০৫৮০৩
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০


ক-বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্ন

[দ্রষ্টব্য: যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১৫: ১৫ × ৪ = ৬০]

১. সভ্যতার উৎপত্তি সম্পর্কিত বিভিন্ন তত্ত্ব সংক্ষেপে বর্ণনা কর।

[English: Describe briefly the various theories regarding the origin of civilization.]

ভূমিকা

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও জটিল বিবর্তনীয় অগ্রযাত্রার নাম ‘সভ্যতা’ (Civilization)। অরণ্যচারী বন্য দশা ও যাযাবর শিকারী জীবন পেরিয়ে মানুষ কীভাবে সংগঠিত নগর, সুশৃঙ্খল আইন, রাষ্ট্রযন্ত্র এবং লিপিকলার এক অনন্য উচ্চতায় পদার্পণ করল—তা অনুসন্ধানে ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গবেষণা চালিয়েছেন। সভ্যতার এই নাটকীয় উন্মেষের কারণ ব্যাখ্যায় বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে।

সভ্যতার উৎপত্তি সম্পর্কিত প্রধান প্রধান তত্ত্বসমূহ

সভ্যতার উৎপত্তি ব্যাখ্যায় বিশ্বখ্যাত পণ্ডিতদের উপস্থাপিত তত্ত্বসমূহকে নিম্নোক্ত প্রধান ধারায় বিভক্ত করে আলোচনা করা যায়:

১. ভৌগোলিক ও পরিবেশগত তত্ত্ব (Environmental / Climatic Theory)

এই তত্ত্বের মূল কথা হলো অনুকূল ও অনুপ্রেরণাদায়ী ভৌগোলিক পরিবেশই সভ্যতার জন্ম দেয়:

  • এলসওয়ার্থ হান্টিংটন ও বাকল: তাঁদের মতে, পরিমিত নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু মানুষের কর্মশক্তি, মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীলতাকে সর্বাধিক উদ্দীপিত করে। চরম ঠাণ্ডা বা চরম গরম অঞ্চলে সভ্যতার বিকাশ ঘটে না।
  • আর্নল্ড জে. টয়েনবির ‘চ্যালেঞ্জ ও রেসপন্স’ তত্ত্ব (Challenge and Response Theory): ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘A Study of History’-এ উল্লেখ করেন যে, সভ্যতা কোনো সহজ বা আয়েসী পরিবেশে জন্মায় না; বরং কঠোর প্রাকৃতিক বা সামাজিক প্রতিকূলতার (Challenge) সফল ও সৃজনশীল মোকাবিলার (Response) মাধ্যমেই সভ্যতার উত্থান ঘটে। যেমন—মিশরীয়রা নীল নদের বার্ষিক বন্যা ও মরুভূমির রুক্ষতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাঁধ ও সেচ খাল কেটে মিশরীয় সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

২. নদীমাতৃক বা হাইড্রোলিক তত্ত্ব (Hydraulic Civilization Theory)

জার্মান-আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী কার্ল এ. উইটফোগেল (Karl A. Wittfogel) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Oriental Despotism’-এ এই তত্ত্ব উপস্থাপন করেন:

  • প্রাচীন বিশ্বের প্রধান চারটি আদি সভ্যতা—মেসোপটেমিয়ার টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস, মিশরের নীল নদ, ভারতের সিন্ধু এবং চীনের হোয়াংহো নদী অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল।
  • উইটফোগেল দেখান যে, নদীর ভয়াবহ বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সুদূরপ্রসারী বাঁধ নির্মাণ এবং লক্ষ লক্ষ কৃষিজমিতে সেচ প্রদানের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ কোনো একক ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র গোত্রের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এর জন্য প্রয়োজন হয়েছিল একটি সুসংহত ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার, দক্ষ আমলাতন্ত্র এবং প্রকৌশল জ্ঞানের। এই সেচ ব্যবস্থার ব্যবস্থাপনা থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্র ও নগর সভ্যতার উৎপত্তি ঘটে।

৩. অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত ও নগর বিপ্লব তত্ত্ব (Economic Surplus & Urban Revolution)

প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ভি. গর্ডন চাইল্ড (V. Gordon Childe) মানব সভ্যতার উৎপত্তিকে একটি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর হিসেবে দেখেছেন:

  • নব্যপ্রস্তর যুগে কৃষিপদ্ধতির আবিষ্কার এবং চাকা ও লাঙলের উদ্ভাবনের ফলে মানুষ প্রথমবারের মতো প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফসল (Economic Surplus) উৎপাদন করতে সক্ষম হয়।
  • এই উদ্বৃত্ত খাদ্য সমাজের একটি অংশকে খাদ্য উৎপাদনের কাজ থেকে অব্যাহতি দেয়। ফলে সমাজ বিভক্ত হয় ছুতার, কামার, মৃৎশিল্পী, রাজমিস্ত্রি, বণিক, সৈন্য ও শাসকে। এই শ্রমবিভাগ (Division of Labour) এবং উদ্বৃত্ত ফসল সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা থেকেই খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দে প্রাচীন সুমেরে প্রথম ‘নগর বিপ্লব’ ঘটে এবং সভ্যতার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

৪. সমাজতাত্ত্বিক সংঘাত ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার তত্ত্ব (Conflict / Integration Theory)

সমাজবিজ্ঞানী ওপারহেইমার ও রবার্ট কার্নিরো (Robert Carneiro)-র মতে, উর্বর জমির সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাচীন মানবগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত সৃষ্টি হয়। বিজয়ী গোষ্ঠী পরাজিতদের পদানত করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সামরিক দুর্গ, সৈন্যবাহিনী ও বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যা প্রাতিষ্ঠানিক সভ্যতার রূপ ধারণ করে। এর পূর্বে চতুর্দশ শতাব্দীতে মুসলিম সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত ‘মুকাদ্দিমাহ’ গ্রন্থে যাযাবর উপজাতিদের ঐক্যচেতনা বা ‘আসাবিয়াহ’ (Asabiyyah)-র মাধ্যমে সভ্যতার উত্থান ও পতনের অকাট্য সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্ব তুলে ধরেছিলেন।

৫. ধর্মীয় ও প্রতীকী তত্ত্ব (Religious / Ideational Theory)

অনেক নৃতাত্ত্বিকের মতে, সভ্যতার প্রথম কেন্দ্রগুলো বাজার বা সামরিক দুর্গ ছিল না, বরং ছিল মন্দির (যেমন—সুমেরের জিগুরাত বা মিশরের পিরামিড)। প্রকৃতির অজানা শক্তিকে তুষ্ট করার ধর্মীয় ব্যাকুলতা থেকেই মানুষ পুরোহিত শ্রেণীর নির্দেশনায় সংগঠিত হতে শুরু করে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও দেবোত্তর সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার হিসাব সংরক্ষণের তাগিদ থেকেই লিপি বা বর্ণমালার জন্ম হয়, যা সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য শর্ত।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, সভ্যতার উৎপত্তি কোনো একক কারণে ঘটেনি। বরং অনুকূল ভূগোল, কৃষির অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত, নদী ব্যবস্থাপনার রাজনৈতিক সমন্বয় এবং মানুষের আধ্যাত্মিক আকাঙ্খার এক সম্মিলিত ঐতিহাসিক মিথস্ক্রিয়াতেই অন্ধকার থেকে মানব সভ্যতার আলোর যাত্রা শুরু হয়েছিল।


২. হাম্মুরাবী কারা? ব্যাবিলনের ‘হাম্মুরাবী আইন সংহিতা’র একটি বিবরণ দাও।

[English: Who were the Hammurabi? Give an account of the ‘Code of Hammurabi’ in Babylon.]

ভূমিকা

প্রাচীন পৃথিবীর আইন ও শাসন ব্যবস্থার ইতিহাসে ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য এক অবিস্মরণীয় নাম। আর এই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে উজ্জ্বল হয়ে আছেন এর প্রাতঃস্মরণীয় ষষ্ঠ রাজা হাম্মুরাবী। খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টাদশ শতাব্দীতে তিনি মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম ও সর্বাধিক সুসংহত লিখিত আইন সংহিতা প্রবর্তন করেন, যা ‘কোড অব হাম্মুরাবী’ নামে বিশ্বখ্যাত। এটি বিচার ব্যবস্থার প্রাচীন আদিম বর্বরতা দূর করে রাষ্ট্রীয় বিচারিক শৃঙ্খলার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

হাম্মুরাবীর পরিচয়

হাম্মুরাবী ছিলেন প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) ব্যাবিলনের প্রথম রাজবংশের (অ্যামোরাইট বংশীয়) সর্বশ্রেষ্ঠ ও ষষ্ঠ রাজা। তিনি আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১৭৯২ থেকে ১৭৫০ অব্দ পর্যন্ত প্রায় ৪২ বছর অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে রাজত্ব করেন।

তিনি উত্তর ও দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন যুদ্ধরত নগররাষ্ট্রগুলোকে (সুমের, আক্কাদ, মারি, লারসা) পরাজিত করে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত প্রথম ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কেবল একজন অপরাজেয় বিজেতাই ছিলেন না, বরং ছিলেন এক মহান দূরদর্শী সংস্কারক, সেচ ব্যবস্থার রূপকার এবং ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আইনদাতা।

হাম্মুরাবী আইন সংহিতা আবিষ্কারের ইতিহাস

১৯০১-১৯০২ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক জ্যাক দ্য মর্গান (Jacques de Morgan) এবং ফাদার জিন-ভিনসেন্ট শেইল প্রাচীন এলাম রাজ্যের রাজধানী সুসা নগরী (বর্তমান দক্ষিণ-পশ্চিম ইরান) থেকে একটি কালো ব্যাসল্ট বা ডায়োরাইট পাথরের বিশালাকার স্তম্ভ আবিষ্কার করেন। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতকে এলামের এক রাজা ব্যাবিলন আক্রমণ করে এই স্মারকস্তম্ভটি লুণ্ঠন করে নিয়ে গিয়েছিলেন। বর্তমানে এই অমূল্য ঐতিহাসিক নিদর্শনটি প্যারিসের লুভর মিউজিয়ামে (Louvre Museum) সংরক্ষিত রয়েছে।

আইন স্তম্ভের শৈল্পিক রূপ

প্রায় ৮ ফুট উঁচু এই মসৃণ পাথরের স্তম্ভের শীর্ষদেশে একটি অসাধারণ ভাস্কর্য খোদাই করা রয়েছে। এতে দেখা যায়, ন্যায়বিচারের দেবতা ও সূর্যদেব শামাশ (Shamash) সিংহাসনে বসে আছেন এবং রাজা হাম্মুরাবী অত্যন্ত বিনীতভাবে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে দেবদূতের ন্যায় আইন ও রাজদণ্ড গ্রহণ করছেন। এর মাধ্যমে হাম্মুরাবী বুঝিয়েছেন যে, তাঁর আইনগুলো কোনো মানুষের মনগড়া বিধান নয়, বরং তা ঐশ্বরিক ন্যায়ের প্রতীক। স্তম্ভের নিচের অংশে সুষম কিউনিফর্ম বা কীলকাকার লিপিতে সমগ্র আইনমালা খোদাই করা রয়েছে।

আইন সংহিতার মূল বৈশিষ্ট্য ও প্রধান প্রধান ধারা

হাম্মুরাবী আইন সংহিতাটি একটি ভূমিকা (Prologue), মূল ২৮২টি সুনির্দিষ্ট ধারা বা অনুচ্ছেদ এবং একটি উপসংহার (Epilogue)-এ বিভক্ত। এর প্রধান প্রধান দিকগুলো নিম্নরূপ:

১. সমতা ও প্রতিশোধমূলক শাস্তি (Lex Talionis)

এই আইনের সবচেয়ে আলোচিত মূলনীতি ছিল—“চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত এবং হাড়ের বদলে হাড়” (‘An eye for an eye, and a tooth for a tooth’)। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অপর কোনো মুক্ত নাগরিকের শরীরের অঙ্গহানি ঘটালে তার নিজেরও সেই অঙ্গ কেটে নেওয়া হতো।

২. শ্রেণিভেদভিত্তিক বৈষম্যমূলক বিচার

আইনে অপরাধের শাস্তি সমাজের তিনটি প্রধান শ্রেণির ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন হতো:

  • আওয়িলু (Awilu): উচ্চশ্রেণির অভিজাত ও পুরোহিত।
  • মুশকেনু (Mushkenu): সাধারণ মুক্ত নাগরিক, কৃষক ও কারিগর।
  • ওয়ার্দু (Wardu): যুদ্ধবন্দী বা দেনার দায়ে বিক্রি হওয়া ক্রীতদাস।

অভিজাত ব্যক্তির চোখের বদলে চোখ তোলার বিধান থাকলেও, কোনো অভিজাত ব্যক্তি একজন দাসের চোখ নষ্ট করলে বা দাসকে হত্যা করলে তাকে কেবল দাসের আর্থিক মূল্যের অর্ধেক মালিককে জরিমানা দিলেই মুক্তি পেত।

৩. পারিবারিক আইন ও নারীর অধিকার

হাম্মুরাবীর কোডে পরিবারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিবাহ অবশ্যই লিখিত চুক্তির মাধ্যমে হতে হতো (ধারা ১২৮)। যৌতুক ও দেনমোহরের সুনির্দিষ্ট আইন ছিল। স্বামী স্ত্রীকে অবহেলা করলে স্ত্রী বাবার বাড়ি ফিরে যেতে পারত। তবে কোনো নারী ব্যভিচারে লিপ্ত হলে তাকে এবং তার পরপুরুষকে হাত-পা বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান ছিল।

৪. সম্পত্তি, কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার দায়বদ্ধতা

কৃষকদের অবহেলার কারণে বাঁধ ভেঙে পার্শ্ববর্তী কৃষকদের জমি প্লাবিত হলে ক্ষতিপূরণকারী কৃষককে সমস্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হতো; ব্যর্থ হলে তার জমি ও সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হতো। চুরিকৃত পণ্য উদ্ধার করতে না পারলে স্থানীয় প্রশাসনকে চুরির ক্ষতিপূরণ দিতে হতো।

৫. চিকিৎসা ও বাণিজ্যিক পেশাদারিত্ব

চিকিৎসক যদি সফলভাবে ব্রোঞ্জের ছুরি দিয়ে চোখের অস্ত্রোপচার করত, তবে সে নির্ধারিত রৌপ্যমুদ্রা পারিশ্রমিক পেত। কিন্তু চিকিৎসকের ভুলের কারণে যদি কোনো অভিজাত রোগীর চোখ নষ্ট হতো বা মৃত্যু হতো, তবে চিকিৎসকের হাত কেটে ফেলার বিধান ছিল।

৬. গৃহনির্মাণ ও প্রকৌশলীদের দায়

যদি কোনো রাজমিস্ত্রির দুর্বল নির্মাণের কারণে বাড়ি ধসে পড়ে বাড়ির মালিকের মৃত্যু হতো, তবে সেই নির্মাতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। আর যদি মালিকের পুত্রের মৃত্যু হতো, তবে নির্মাতার পুত্রকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো (ধারা ২২৯-২৩০)।

আইন সংহিতার ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও মূল্যায়ন

  • ব্যক্তিগত প্রতিশোধের অবসান: আদিম যুগের গোত্রীয় রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধ করে বিচারকে রাষ্ট্রের একক দায়িত্বে আনা হয়।
  • লিখিত আইনের মর্যাদা: শাসকের খেয়ালখুশির পরিবর্তে পাথরে খোদাই করা আইন সর্বত্র উন্মুক্ত রেখে আইনের শাসনের প্রাথমিক ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
  • ‘নির্দোষের অনুমান’ (Presumption of Innocence): প্রমাণ ছাড়া কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল এবং মিথ্যা সাক্ষ্যদাতার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছিল।

উপসংহার

আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাম্মুরাবীর কিছু বিধানকে অত্যন্ত কঠোর মনে হলেও, প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে এক সংঘাতময় অন্ধকার যুগে সমগ্র সাম্রাজ্যে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে হাম্মুরাবী আইন সংহিতা ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও অবিস্মরণীয় মাইলফলক।


৩. সুমেরীয়দের পরিচয় দাও। তাদের সরকার পদ্ধতি সম্পর্কে একটি নিবন্ধ রচনা কর।

[English: Introduce the Sumerians. Write an essay about their government system.]

ভূমিকা

মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে অঞ্চলটিকে ‘সভ্যতার সূতিকাগার’ (Cradle of Civilization) বলা হয়, সেই মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দে পৃথিবীর প্রাচীনতম সংগঠিত নগর সভ্যতার উন্মেষ ঘটিয়েছিল এক রহস্যময় ও ক্ষণজন্মা জাতি, যাদের নাম ‘সুমেরীয়’। চাকার আবিষ্কার, প্রথম লিপি (কিউনিফর্ম), বিদ্যালয় ব্যবস্থা, উন্নত সেচ খাল এবং আইনের প্রথম বীজ বপন করে সুমেরীয়রা বিশ্বসভ্যতার ভিত রচনা করেছিল। তাদের সরকার ও শাসন ব্যবস্থা ছিল পরবর্তী মানব ইতিহাসের রাজনৈতিক কাঠামোর আদি রূপ।

সুমেরীয়দের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় ও আগমন

সুমেরীয়দের আদি উৎস আজও প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এক সমাধানহীন রহস্য:

  • ভৌগোলিক অবস্থান: বর্তমান দক্ষিণ ইরাকের টাইগ্রিস (দজলা) ও ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদীর অববাহিকায় পারস্য উপসাগরের মোহনায় তারা সুমের নামক সমৃদ্ধ অঞ্চল গড়ে তোলে।
  • অ-সেমেটিক ও অনার্য পরিচয়: সুমেরীয়রা পার্শ্ববর্তী সেমেটিক জাতিগোষ্ঠীর (আরব, হিব্রু, ব্যাবিলনীয়) অন্তর্ভুক্ত ছিল না এবং তারা ইন্দো-ইউরোপীয় আর্যও ছিল না। তাদের ভাষা ছিল একটি ‘অ্যাกลুটিনেটিভ’ (Agglutinative) ভাষা, যার কোনো আত্মীয় ভাষা আধুনিক বিশ্বে টিকে নেই। ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৪০০০ অব্দে তারা মধ্য এশিয়ার কাস্পিয়ান সাগরের কোনো পার্বত্য অঞ্চল থেকে এসে উর্বর মেসোপটেমিয়ায় বসতি স্থাপন করেছিল।
  • প্রধান প্রধান নগররাষ্ট্র: সুমের কোনো একটি একক অখণ্ড রাষ্ট্র ছিল না, বরং তা ছিল বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ও প্রাচীরঘেরা স্বাধীন নগররাষ্ট্রের (City-State) সমষ্টি। এর মধ্যে উর (Ur), উরুক (Uruk), লাগাশ (Lagash), নিপ্পুর (Nippur), কিশ (Kish) এবং এরিদু (Eridu) ছিল শীর্ষস্থানীয়।

সুমেরীয়দের সরকার পদ্ধতি (Government System of the Sumerians)

সুমেরীয়দের শাসন ব্যবস্থা ছিল আদিম উপজাতীয় গণতন্ত্র থেকে ধাপে ধাপে ধর্মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রে উত্তরণের এক অনন্য রূপরেখা। নিম্নে তাদের সরকার ব্যবস্থার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

১. ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা (Theocracy)

সুমেরীয়দের সমগ্র রাষ্ট্রদর্শনের মূল ভিত্তি ছিল ধর্ম। তারা বিশ্বাস করত যে প্রতিটি নগররাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক কোনো মানুষ নয়, বরং সেই নগরের পৃষ্ঠপোষক দেবতা। যেমন—উর নগরের মালিক ছিলেন চন্দ্রদেব ‘নান্না’ এবং নিপ্পুর নগরের মালিক ছিলেন বায়ুর দেবতা ‘এনলিল’। রাষ্ট্রের মানব শাসকরা ছিলেন দেবতাদের আজ্ঞাবহ প্রতিনিধি বা ট্রাস্টি মাত্র। দেবতাদের তুষ্ট রাখা এবং তাঁদের ইচ্ছা অনুযায়ী নগর পরিচালনা করাই ছিল সরকারের একমাত্র দায়িত্ব।

২. প্রারম্ভিক ‘আদিম গণতন্ত্র’ (Primitive Democracy)

বিখ্যাত সুমেরীয় পণ্ডিত থরকিল্ড জ্যাকবসেন (Thorkild Jacobsen) প্রমাণ করেছেন যে, একনায়কতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে সুমেরীয় নগরগুলোতে এক ধরণের প্রাথমিক গণতন্ত্র চালু ছিল। নগরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দুটি আইনসভা বা পরিষদ ছিল:

  • প্রবীণদের পরিষদ (Council of Elders): অভিজ্ঞ বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চকক্ষ।
  • তরুণদের সাধারণ সভা (Assembly of Warriors): অস্ত্র বহনে সক্ষম সাধারণ যুবকদের নিয়ে গঠিত নিম্নকক্ষ। যুদ্ধের সময় এই উভয় সভার অনুমোদনে একজন সাময়িক সেনাপতি নির্বাচন করা হতো।

৩. ‘এনসি’ থেকে ‘লুগাল’-এ রূপান্তর (রাজতন্ত্রের বিকাশ)

সময়ের বিবর্তনে এবং পার্শ্ববর্তী নগররাষ্ট্রগুলোর সাথে অবিরাম যুদ্ধের ফলে সুমেরীয় সরকার পদ্ধতিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদমর্যাদার বিকাশ ঘটে:

  • এনসি বা পাত্তেসি (Ensi / Patesi): প্রাথমিক যুগে নগরপ্রধানকে বলা হতো এনসি। তিনি ছিলেন প্রধান পুরোহিত এবং একই সাথে শহরের প্রধান প্রশাসক। তিনি জিগুরাতে বসে ধর্ম ও কর আদায় পরিচালনা করতেন।
  • লুগাল (Lugal – আক্ষরিক অর্থ ‘মহান ব্যক্তি’ বা রাজা): বহিরাগত আক্রমণ ও আন্তঃনগর যুদ্ধের সংকটকালে পরিষদ কর্তৃক একজন পরাক্রমশালী সামরিক সেনাপতিকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়া হতো, যাঁকে লুগাল বলা হতো। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে লুগালরা পদ ত্যাগ না করে নিজেদের আজীবন ও বংশানুক্রমিক স্বাধীন রাজায় রূপান্তরিত করেন। এভাবে সুমেরীয় সমাজে গণতান্ত্রিক পরিষদের ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

৪. জিগুরাত: সুমেরীয় সরকারের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সচিবালয়

সুমেরীয় প্রতিটি নগরের কেন্দ্রবিন্দুতে গড়ে উঠেছিল আকাশচুম্বী পিরামিডসদৃশ বহুস্তরীয় মন্দির, যাকে ‘জিগুরাত’ (Ziggurat) বলা হতো। এই জিগুরাত কেবল উপাসনালয় ছিল না, এটি ছিল সুমেরীয় সরকারের প্রাণকেন্দ্র:

  • এখানে সরকারের কেন্দ্রীয় শস্যভাণ্ডার, কর আদায় দপ্তর ও ট্রেজারি অবস্থিত ছিল।
  • জিগুরাতের পুরোহিতরা (Priests) ছিলেন সরকারের শীর্ষ আমলা ও হিসাবরক্ষক।
  • জিগুরাতের মাধ্যমে কৃষকদের বীজ ও সেচের জল ঋণ দেওয়া হতো, যা আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আদি রূপ।

৫. পৃথিবীর প্রাচীনতম লিখিত আইন ও বিচার ব্যবস্থা

সুমেরীয় সরকার ব্যবস্থা কোনো অন্ধ খেয়ালখুশিতে চলত না, বরং লিখিত আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। খ্রিষ্টপূর্ব ২১০০ অব্দে উর নগরের রাজা উর-নাম্মু কর্তৃক প্রবর্তিত ‘উর-নাম্মু আইন সংহিতা’ (Code of Ur-Nammu) হলো মানব সভ্যতার প্রাচীনতম লিখিত আইন (যা হাম্মুরাবীর কোডেরও ৩০০ বছর পূর্বের)। সুমেরীয় আইনে প্রাণদণ্ডের চেয়ে অপরাধের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও জরিমানা নির্ধারণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।

৬. স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনী

রাজা বা লুগালকে সহায়তার জন্য একটি সুসংগঠিত আমলাতন্ত্র ছিল। লিপিকাররা (Scribes) ছিল প্রশাসনের মেরুদণ্ড, যারা মাটির চাকতিতে কিউনিফর্ম লিপিতে সমস্ত কর, জমি ও বাণিজ্যিক লেনদেন নথিভুক্ত করত। সামরিক বাহিনীতে ছিল ব্রোঞ্জের বর্শা ও চামড়ার বর্ম পরিহিত পদাতিক সৈন্য এবং চার চাকার যুদ্ধরথ।

উপসংহার

সুমেরীয় সরকার পদ্ধতি ছিল মানব জাতির রাজনৈতিক বিবর্তনের এক অপূর্ব প্রাথমিক মডেল। ধর্মীয় বিশ্বাসকে সামাজিক শৃঙ্খলায় রূপ দিয়ে এবং লিখিত আইন ও আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে নগর পরিচালনার যে কাঠামো সুমেরীয়রা আবিষ্কার করেছিল, তা পরবর্তী ব্যবিলনীয়, অ্যাসিরীয় এবং এমনকি আধুনিক পশ্চিমা রাষ্ট্রচিন্তাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।


৪. জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রাচীন মিশরীয়দের অবদান নিরূপণ কর।

[English: Determine the contribution of the ancient Egyptians to learning and science.]

ভূমিকা

প্রাচীন প্রাচ্যের অনন্য বিস্ময় মিশরীয় সভ্যতা কেবল পিরামিডের সুবিশাল পাথরের স্মৃতিস্তম্ভেই সীমাবদ্ধ ছিল না; জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা এবং লিখন পদ্ধতির ক্ষেত্রে প্রাচীন মিশরীয়দের উদ্ভাবনী প্রতিভা আধুনিক মানব সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রার ভিত্তি রচনা করেছিল। বিখ্যাত গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস যথার্থই বলেছেন—“মিশর হলো নীল নদের দান।” নীল নদের বার্ষিক বন্যা ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে বশ করার প্রক্রিয়ায় মিশরীয়রা জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যে যুগান্তকারী অগ্রগতি অর্জন করেছিল, তা আজও বিশ্বকে চমৎকৃত করে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় প্রাচীন মিশরীয়দের অবদানসমূহ

১. জ্যোতির্বিদ্যা ও সৌর পঞ্জিকার উদ্ভাবন (Astronomy and Calendar)

প্রাচীন মিশরীয়দের সর্বশ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কীর্তি হলো বিশ্বের প্রথম সৌর পঞ্জিকা (Solar Calendar) আবিষ্কার:

  • লুব্ধক তারার পর্যবেক্ষণ: তারা রাতের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র ‘সিরিয়াস’ বা লুব্ধকের (মিশরীয় নাম সোথিস) উদয় এবং নীল নদের বার্ষিক বন্যার চক্র নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করত। তারা লক্ষ্য করে যে লুব্ধকের ঠিক ৩৬৫ দিন পর পর পুনরাবির্ভাব ঘটে এবং বন্যা শুরু হয়।
  • ৩৬৫ দিনের বছর গণনা: এর ভিত্তিতে তারা এক বছরকে ৩৬৫ দিনে এবং ১২টি মাসে বিভক্ত করে। প্রতিটি মাস ছিল ৩০ দিনের। অবশিষ্ট ৫ দিনকে তারা অতিরিক্ত দিন হিসেবে বছরের শেষে বিভিন্ন দেবদেবীর জন্মোৎসব উপলক্ষে আনন্দ উদযাপনে বরাদ্দ রাখত।
  • দিন-রাতের বিভাজন: মিশরীয়রাই প্রথম দিন ও রাতকে ১২ ঘণ্টা করে মোট ২৪ ঘণ্টার মাপে বিভক্ত করার পদ্ধতি চালু করে এবং সময় মাপার জন্য জলঘড়ি (Clepsydra)সূর্যঘড়ি (Sundial / Shadow clock) উদ্ভাবন করে।

২. গণিত ও জ্যামিতিশাস্ত্র (Mathematics and Geometry)

ব্যবহারিক প্রয়োজনেই মিশরীয় গণিত ও জ্যামিতির চরম বিকাশ ঘটেছিল:

  • জ্যামিতির আবিষ্কার: নীল নদের বন্যায় প্রতি বছর কৃষিজমির সীমানা মুছে যেত। বন্যা নেমে যাওয়ার পর কৃষকদের জমির সঠিক সীমানা চিহ্নিত করতে গিয়ে মিশরীয়রা ব্যবহারিক জ্যামিতির উদ্ভাবন করে।
  • পিরামিড নির্মাণে ত্রিকোণমিতি: গিজার বিশাল পিরামিডগুলোর নির্ভুল কোণ, বর্গাকার ভিত্তি এবং ঢাল তৈরিতে তারা অত্যন্ত সূক্ষ্ম জ্যামিতিক হিসাব ব্যবহার করেছিল। তারা বৃত্তের ক্ষেত্রফল ও শঙ্কুর আয়তন নির্ণয়ের সূত্র জানত এবং পাই (π)-এর মান ৩.১৬ নির্ধারণ করেছিল, যা আধুনিক মানের অত্যন্ত কাছাকাছি।
  • দশমিক গণনা পদ্ধতি: প্রাচীন মিশরীয়রা ১০-এর গুণিতকভিত্তিক দশমিক গণনা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিল। ১, ১০, ১০০, ১০০০ ইত্যাদি সংখ্যার জন্য তাদের পৃথক চিত্রপ্রতীক ছিল।

৩. চিকিৎসাবিদ্যা ও শল্যচিকিৎসা (Medicine and Surgery)

প্রাচীন বিশ্বে মিশরীয়দের চিকিৎসাবিদ্যা ছিল সর্বাধিক উন্নত ও সুসংহত। গ্রিক ও রোমানরা তাদের চিকিৎসাজ্ঞান মিশর থেকেই ধার করেছিল:

  • মমি তৈরির মাধ্যমে অ্যানাটমি জ্ঞান: পরকালের বিশ্বাসের কারণে মৃতদেহকে অবিকৃত রাখতে মমি তৈরির প্রক্রিয়া তাদের মানবদেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, রক্তনালী, ফুসফুস ও হৃদপিণ্ডের গঠন সম্পর্কে গভীর ব্যবচ্ছেদবিদ্যা বা অ্যানাটমির বাস্তব জ্ঞান দান করেছিল।
  • চিকিৎসা প্যাপিরাসসমূহ: বিখ্যাত ‘এডউইন স্মিথ প্যাপিরাস’ (Edwin Smith Papyrus) হলো বিশ্বের প্রাচীনতম শল্যচিকিৎসা গ্রন্থ। এতে ৪৮টি জটিল ট্রমা কেস, মস্তিষ্কের খুলির ফ্র্যাকচার, মেরুদণ্ডের আঘাত এবং সেলাইয়ের স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি উল্লেখ আছে। অপর বিখ্যাত ‘এবার্স প্যাপিরাস’ (Ebers Papyrus)-এ ৮০০-র বেশি প্রেসক্রিপশন, চোখের ড্রপ এবং হৃদপিণ্ডকে সমগ্র দেহের রক্ত চলাচলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
  • বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক: মিশরে চোখ, দাঁত, পেট ও মাথার জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকতেন। প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসক ইমহোটেপ (Imhotep)-কে আধুনিক গবেষকগণ মানব ইতিহাসের প্রথম প্রকৃত চিকিৎসক ও প্রকৌশলী হিসেবে গণ্য করেন।

৪. রসায়ন ও মমিফিকেশন (Chemistry)

ইংরেজি ‘Chemistry’ শব্দটি মিশরের প্রাচীন নাম ‘কেমেট’ (Kemet – কালো মাটি) থেকে উদ্ভূত হয়েছে বলে অনেক ভাষাবিদ মনে করেন:

  • মমিফিকেশনের রাসায়নিক প্রয়োগ: মৃতদেহকে শুকানোর জন্য ‘ন্যাট্রন লবণ’ (সোডিয়াম কার্বনেট ও বাইকার্বনেটের প্রাকৃতিক মিশ্রণ), সুগন্ধি রজন, আলকাতরা এবং বিভিন্ন ভেষজ তেলের রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া তারা নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করত।
  • কাচ তৈরি, তামার আকরিক গলানো, কাচ ও পাথরে এনামেলের প্রলেপ এবং বস্ত্রের জন্য স্থায়ী রঙিন রঞ্জক তৈরি ছিল তাদের রসায়নবিদ্যার অন্যতম সেরা নিদর্শন।

৫. লিখন পদ্ধতি ও প্যাপিরাস কাগজের আবিষ্কার

তথ্য সংরক্ষণ ও শিক্ষার বিস্তারে মিশরীয়দের অবদান অতুলনীয়:

  • হাইরোগ্লিফিক লিপি (Hieroglyphics): খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে তারা ‘হাইরোগ্লিফিক’ বা পবিত্র চিত্রলিপি উদ্ভাবন করে। এতে মানুষ, পশুপাখি, চোখ ও প্রকৃতির প্রায় এক সহস্রাধিক প্রতীক দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করা হতো। পরবর্তীতে দ্রুত লেখার জন্য ‘হায়রাটিক’ এবং সাধারণ কাজের জন্য ‘ডেমোটিক’ লিপির জন্ম হয়। ফরাসি পণ্ডিত জাঁ ফ্রাঁসোয়া শাঁপোলিয়ন ১৮২২ সালে রোসেটা পাথরের (Rosetta Stone) পাঠোদ্ধার করে এই প্রাচীন লিপির রহস্য উন্মোচন করেন।
  • প্যাপিরাস কাগজ: নীল নদের তীরে জন্মানো ‘প্যাপিরাস’ (Papyrus) নামক নলখাগড়ার কান্ডের আঁশ শুকিয়ে তারা বিশ্বের প্রথম কাগজ তৈরি করে (যা থেকে আধুনিক ‘Paper’ শব্দের উৎপত্তি)। এ ছাড়া তারা ভুসি কালি এবং সরু নলখাগড়ার কলম উদ্ভাবন করে।

উপসংহার

প্রাচীন মিশরীয়দের এই জ্ঞানচর্চা কোনো কল্পকাহিনী ছিল না, বরং তা ছিল গভীর পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বাস্তব প্রয়োগের এক অনুপম ফসল। প্রাচীন মিশরের এই বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকারই পরবর্তী গ্রিক, রোমান ও ইসলামী সভ্যতার মধ্য দিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছে।


৫. জরাথুস্ত্রবাদ বলতে কী বুঝায়? এর বৈশিষ্ট্যসমূহ ব্যাখ্যা কর।

[English: What does Zoroastrianism mean? Explain its features.]

ভূমিকা

প্রাচীন পারস্যের (বর্তমান ইরান) রুক্ষ ও পাহাড়ি উপত্যকায় এক মহান ধর্মতাত্ত্বিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী ধর্ম ‘জরাথুস্ত্রবাদ’ (Zoroastrianism)-এর আবির্ভাব ঘটেছিল। এর প্রচারক ছিলেন মহর্ষি জরাথুস্ত্র বা জোরোস্টার। খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে প্রচলিত বহুদেববাদী প্রকৃতিপূজা ও রক্তক্ষয়ী পশুবলির বিপরীতে জরাথুস্ত্রবাদ এক পরম আধ্যাত্মিক নৈতিক দর্শন প্রচার করে। পরবর্তীতে হাখামানেশীয়, পার্থিয়ান এবং বিশেষ করে সাসানীয় সাম্রাজ্যের আমলে এটি পারস্যের সরকারি রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা লাভ করে।

জরাথুস্ত্রবাদের অর্থ ও উৎপত্তি

জরাথুস্ত্রবাদ হলো পারস্যের প্রাচীন পয়গম্বর জরাথুস্ত্র (Zarathustra বা গ্রিক ভাষায় Zoroaster) কর্তৃক প্রচারিত একেশ্বরবাদী ও দ্বৈতবাদী নৈতিক ধর্মের নাম। অনুসারীদের কাছে এটি ‘মাজদাবাদ’ (Mazdaism) বা ‘দ্বীনে মাজদায়াসনা’ নামেও পরিচিত।

জরাথুস্ত্রের সময়কাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে; অধিকাংশের মতে তিনি আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব দশম থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যে উত্তর-পূর্ব ইরানে (ব্যাকট্রিয়া) জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিরিশ বছর বয়সে তিনি আমু দরিয়া নদীর তীরে পরম সত্যের প্রত্যাদেশ লাভ করেন এবং পারস্যের রাজা বিস্তাস্প (Vishtaspa)-কে দীক্ষিত করার মাধ্যমে এই ধর্মের রাষ্ট্রীয় প্রচার শুরু করেন।

জরাথুস্ত্রবাদের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি

জরাথুস্ত্রবাদের ধর্মতাত্ত্বিক ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:

১. মহাজাগতিক দ্বৈতবাদ (Cosmic Dualism): ভালো ও মন্দের সংঘাত

জরাথুস্ত্রবাদের সবচেয়ে মৌলিক ভিত্তি হলো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আলো ও অন্ধকারের অবিরত মহাজাগতিক দ্বন্দ্ব। এই ধর্মে দুটি বিপরীতমুখী শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়েছে:

  • আহুরা মাজদা (Ahura Mazda): একমাত্র পরম স্রষ্টা, যিনি প্রজ্ঞা, আলো, পবিত্রতা ও অনন্ত মঙ্গলের অধিপতি। তিনিই একমাত্র উপাসনার যোগ্য।
  • আংরা মাইনিয়ু বা আহরিমান (Angra Mainyu / Ahriman): অন্ধকার, মিথ্যা, ধ্বংস, রোগ-ব্যাধি ও অশুভের প্রতীক শয়তানি শক্তি।

মানুষের আত্মা হলো এই ভালো ও মন্দের প্রধান রণক্ষেত্র। মানুষকে তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়ে আহুরা মাজদার পক্ষ বেছে নিতে হয়।

২. পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘আভেস্তা’ (Zend-Avesta)

জরাথুস্ত্রবাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হলো প্রাচীন পাহলভি ও আভেস্তান ভাষায় রচিত ‘জেন্দ-আভেস্তা’। এর মধ্যে সর্বাধিক প্রামাণ্য অংশ হলো জরাথুস্ত্রের স্বরচিত ১৭টি আধ্যাত্মিক প্রার্থনাসংগীত, যা ‘গাথা’ (Gathas) নামে পরিচিত। এতে আহুরা মাজদার স্তুতি এবং সত্যের পথে চলার আকুল আহ্বান রয়েছে।

৩. পবিত্র অগ্নির উপাসনা ও অগ্নিমন্দির (Fire Temples / আতশগাহ)

জরাথুস্ত্রীয়দের ভুলবশত ‘অগ্নিপূজক’ (Fire-worshippers) বলা হলেও তারা অগ্নিকে স্রষ্টা মনে করে না। তাদের বিশ্বাসে, পবিত্র আগুন ও আলো হলো আহুরা মাজদার পরম পবিত্রতা, নূর এবং ঐশ্বরিক ন্যায়ের দৃশ্যমান প্রতীক। তারা তাঁদের বিশেষ উপাসনালয় ‘আতশগাহ’ (Fire Temple)-এ কাঠের আগুনকে অহর্নিশি প্রজ্বলিত রাখত এবং সেই পবিত্র আগুনের শিখার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আহুরা মাজদার প্রার্থনা করত।

৪. মৌলিক নৈতিক ত্রিমুখী অনুশাসন (Threefold Moral Path)

জরাথুস্ত্রবাদের সমগ্র নীতিশাস্ত্র মাত্র তিনটি সোনালী বাক্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত:

  • হু মাতা (Humata): সৎ চিন্তা বা শুভ চিন্তা।
  • হু উখতা (Hukhta): সৎ বাক্য বা সত্য ভাষণ।
  • হু ভরশত (Hvarshta): সৎ কর্ম বা মানবহিতৈষী আচরণ।

এই তিনটি গুণ অনুশীলন করাই একজন প্রকৃত পারসিকের চরম ধর্মীয় কর্তব্য। মিথ্যা বলাকে এই ধর্মে সবচেয়ে মারাত্মক পাপাচার হিসেবে গণ্য করা হতো।

৫. পরকাল, বিচার দিবস ও চিনভাৎ সেতু (Chinvat Bridge)

জরাথুস্ত্রবাদেই প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক পরকাল ও শেষ বিচারের ধারণা স্পষ্ট রূপ লাভ করে:

  • মানুষের মৃত্যুর পর চতুর্থ দিনে তার সমস্ত সৎকর্ম ও পাপকর্মের হিসাব নেওয়া হয়।
  • অতঃপর আত্মাকে ‘চিনভাৎ সেতু’ (Chinvat Bridge – বিচার সেতু) পার হতে হয়। পুণ্যবানদের জন্য এই সেতুটি চওড়া ও মসৃণ হয়ে যায় এবং তারা অনন্ত সুখের স্বর্গ (প্যারাডাইস)-এ প্রবেশ করে। আর পাপীদের জন্য এই সেতুটি ক্ষুরের চেয়েও ধারালো ও সরু হয়ে যায় এবং তারা নিচের অন্ধকারের নরকে নিক্ষিপ্ত হয়।
  • ইতিহাসের শেষলগ্নে মঙ্গলের চূড়ান্ত বিজয় হবে এবং অশুভ আহরিমান চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে, যাকে ‘ফ্রাশোকেরেতি’ (Frashokereti) বা মহাজাগতিক রূপান্তর বলা হয়।

৬. মৃতদেহের স্বতন্ত্র সৎকার পদ্ধতি: নীরবতার স্তম্ভ (Tower of Silence / দাখমা)

জরাথুস্ত্রীয়রা বিশ্বাস করত যে মাটি, পানি ও আগুন হলো আহুরা মাজদার অত্যন্ত পবিত্র সৃষ্টি। মৃতদেহ যেহেতু অপবিত্র ও পচনশীল, তাই মৃতদেহকে মাটিতে কবর দিলে মাটি অপবিত্র হবে, নদীতে ভাসালে পানি দূষিত হবে এবং আগুনে পোড়ালে পবিত্র অগ্নি অপবিত্র হবে। তাই তারা শহরের বাইরে উঁচু পাহাড়ের ওপর বৃত্তাকার উন্মুক্ত পাথরের চাতাল বা ‘দাখমা’ (Tower of Silence) নির্মাণ করত এবং মৃতদেহ সেখানে রেখে দিত, যাতে শকুন ও শিকারী পাখিরা মাংস খেয়ে হাড়গুলোকে রৌদ্রে শুকিয়ে পবিত্র করে দেয়।

উপসংহার

সপ্তম শতাব্দীতে মুসলিম বিজয়ের পর পারস্যে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটলে জরাথুস্ত্রবাদের অনুসারীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ ভারতে আশ্রয় নেয়, যারা আজ ‘পার্সি’ (Parsi) সম্প্রদায় নামে পরিচিত। স্বর্গ-নরক, শয়তানের অস্তিত্ব, শেষ বিচার ও নৈতিক দায়িত্ববোধের যে ধারণা জরাথুস্ত্রবাদ প্রচার করেছিল, তা পরবর্তীকালের প্রধান প্রধান একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোর ওপরও সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক প্রভাব বিস্তার করেছে।


৬. জাজিরাতুল আরবের পরিচিতি উল্লেখ কর। ইসলাম-পূর্ব আরব জনগোষ্ঠীর পরিচয় দাও।

[English: Mention the identity of Jazirat al Arab. Give an account of the peoples of Pre-Islamic Arabia.]

ভূমিকা

যে পুণ্যভূমিতে মানবতার মুক্তির দূত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র শুভলগ্নে ইসলামের সূর্য উদিত হয়েছিল, তার ভৌগোলিক মঞ্চ হলো ‘জাজিরাতুল আরব’ বা আরব উপদ্বীপ। বাইরের বিশ্বের কাছে দুর্গম মরুভূমি মনে হলেও এর বিশেষ ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাই আরবদের দীর্ঘকাল বিজাতীয় পরাশক্তির রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত রেখেছিল এবং একটি সাহসী, নির্ভীক ও আত্মমর্যাদাশীল জনগোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছিল।

জাজিরাতুল আরবের ভৌগোলিক পরিচিতি ও সীমারেখা

আরবি ‘জাজিরা’ (جَزِيرَة) শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘দ্বীপ’। তবে আরব ভূখণ্ডটি সম্পূর্ণ দ্বীপ নয়, বরং তিন দিকে জলরাশি এবং একদিকে স্থলভাগ দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি বিশাল উপদ্বীপ (Peninsula)। এটি এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত প্রায় ৩০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার আয়তনের পৃথিবীর বৃহত্তম উপদ্বীপ।

এর চারপাশের প্রাকৃতিক সীমারেখা নিম্নরূপ:

  • পূর্বে: পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগর।
  • পশ্চিমে: লোহিত সাগর (Red Sea)।
  • দক্ষিণে: আরব সাগর এবং ভারত মহাসাগর।
  • উত্তরে: সিরিয়া মরুভূমি এবং মেসোপটেমিয়ার (ইরাক) উর্বর উপত্যকা।

আরব উপদ্বীপের প্রধান ভৌগোলিক অঞ্চলসমূহ

জলবায়ু ও ভূ-প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে জাজিরাতুল আরবকে পাঁচটি প্রধান ঐতিহাসিক ভাগে বিভক্ত করা যায়:

  1. হিজাজ (Al-Hijaz): লোহিত সাগরের সমান্তরাল পর্বতমালা। হিজাজ অর্থ ‘বাধা’ বা বিভাজক। এটি ছিল বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র এবং এখানেই অবস্থিত ইসলামের দুই পবিত্র তীর্থভূমি—মক্কা মুকাররমা ও মদিনা মুনাওয়ারা।
  2. নজদ (Najd): উপদ্বীপের কেন্দ্রে অবস্থিত সুবিশাল শুষ্ক উচ্চ মালভূমি, যা যাযাবর বেদুইনদের চারণভূমি।
  3. আল-ইয়ামান (Al-Yaman / উর্বর আরব): উপদ্বীপের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত সুজলা-সুফলা ও বৃষ্টিবহুল অঞ্চল। রোমানরা একে বলত ‘Arabia Felix’ বা সুখী ও সমৃদ্ধ আরব। এখানে প্রাচীন সাবা ও হিময়ারি সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল।
  4. তিহামাহ (Tihamah): লোহিত সাগরের তীরবর্তী নিচু, উষ্ণ ও আর্দ্র উপকূলীয় সমভূমি।
  5. আল-আরুজ (Al-Arud): পূর্ব আরবের ওমান ও বাহরাইন উপকূলীয় অঞ্চল।

ইসলাম-পূর্ব আরব জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক পরিচয়

নৃতাত্ত্বিক ও বংশলতিকার ভিত্তিতে ইসলাম-পূর্ব আরবের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে তিনটি প্রধান ঐতিহাসিক ধারায় বিভক্ত করা হয়:

১. আল-আরব আল-বায়িদা (The Extinct Arabs / বিলুপ্ত আরব)

এরা হলো প্রাচীনতম প্রাগৈতিহাসিক আরব জাতিগোষ্ঠী, যারা মহানবী (সা.)-এর আবির্ভাবের বহু শতাব্দী পূর্বেই পাপাচার ও অবাধ্যতার কারণে আল্লাহর ঐশ্বরিক গজবে পৃথিবীর বুক থেকে সমূলে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পবিত্র কুরআনে এদের করুণ ধ্বংসকাহিনী বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। এদের মধ্যে প্রধান জাতিগুলো হলো—কওমে আদ (হযরত হুদ আ.-এর জাতি), কওমে সামুদ (হযরত সালেহ আ.-এর জাতি), তাসম, জাদিস, আমালিকা এবং উমাইম।

২. আল-আরব আল-আরিবা (The Pure Arabs / আসল বা খাঁটি আরব)

এরা হলো ইয়েমেনের কাহতানের বংশধর, যাদেরকে ‘কাহতানী আরব’ বা আসল আরব বলা হয়। আরবের প্রাচীনতম সুসভ্য ও নগরবাসী অংশ ছিল এরা:

  • এদের আদি বাসস্থান ছিল দক্ষিণ আরবের উর্বর ইয়েমেনে। এরা সাবা ও হিময়ার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল।
  • খ্রিষ্টপূর্ব যুগে মারিবের বিখ্যাত বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর (সায়লুল আরিম) এরা উত্তর আরবের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। মদিনার সুখ্যাত আউস ও খাজরাজ গোত্র এবং সিরিয়া ও ইরাকের সীমান্তে গড়ে ওঠা গাসসানী ও লাখমী রাজবংশ মূলত এই কাহতানী আরিবা বংশোদ্ভূত ছিল।

৩. আল-আরব আল-মুস্তা’রিবা (The Arabized Arabs / আরবায়িত আরব)

এরা হলো হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধর। এদের আদি পিতা ইব্রাহিম (আ.) বংশগতভাবে ব্যবিলন ও হিব্রু বংশোদ্ভূত হওয়ায় তাঁর সন্তান ইসমাইল (আ.) মক্কায় এসে ইয়েমেনের কাহতানী গোত্র ‘বনু জুরহুম’-এর সাথে বসবাস করে তাঁদের কাছ থেকে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা ও সংস্কৃতি রপ্ত করেন। তাই তাঁদের ‘মুস্তা’রিবা’ (আরবায়িত আরব) বা তাঁদের অন্যতম পূর্বপুরুষ আদনানের নামানুসারে ‘আদনানী আরব’ বলা হয়।

এই আদনানী বংশেই জন্ম নিয়েছিল বিখ্যাত কুরাইশ গোত্র এবং এই মহান কুরাইশ বংশের বনু হাশিম শাখায় শুভাগমন করেছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।

সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস: বেদুইন বনাম হাদারী

জীবনযাত্রার নিরিখে প্রাচীন আরবরা দুই ভাগে বিভক্ত ছিল:

  • বেদুইন (Beduin): মরুভূমির যাযাবর। তারা তাঁবুতে বাস করত, উটের কাফেলা পরিচালনা করত এবং এক কূপ থেকে অন্য কূপে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াত। তাদের মধ্যে ছিল তীব্র গোত্রপ্রীতি (আসাবিয়াহ) ও যুদ্ধের উন্মাদনা।
  • হাদারী (Town-dwellers): মক্কা, মদিনা ও তায়েফের স্থায়ী নগরবাসী। তারা প্রধানত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিল।

উপসংহার

জাজিরাতুল আরবের এই প্রাকৃতিক রুক্ষতা এবং আরবদের অদম্য শারীরিক সহনশীলতা ও ভাষাগত বাগ্মিতাই তাদেরকে পরবর্তীকালে বিশ্বজয়ের জন্য এক অনন্য ও অপরাজেয় জাতিতে পরিণত করেছিল।


৭. মানব সভ্যতার বিকাশে সাসানীয়দের অবদান পর্যালোচনা কর।

[English: Review the contribution of the Sassanid to the development of human civilization.]

ভূমিকা

প্রাচীন পারস্যের ইতিহাসে সাসানীয় সাম্রাজ্য (২২৪–৬৫১ খ্রি.) ছিল জাতীয় গৌরব ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণের দ্বিতীয় স্বর্ণযুগ। পার্থিয়ানদের দুর্বল শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজা আরদাশির প্রথম (Ardashir I) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই সাম্রাজ্য টানা চার শতাধিক বছর রোমান ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সমকক্ষ বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে রাজত্ব করেছিল। সুসংহত প্রশাসনিক কাঠামো, অনুপম স্থাপত্যকলা, দর্শন ও বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধন হিসেবে মানব সভ্যতার বিকাশে সাসানীয়দের অবদান অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।

মানব সভ্যতার বিকাশে সাসানীয়দের প্রধান অবদানসমূহ

১. বিজ্ঞানচর্চা ও গুন্দিশাপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Academy of Gondeshapur)

সাসানীয়দের সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক কীর্তি ছিল রাজা প্রথম শাপুর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এবং সম্রাট প্রথম খসরু আনুশিরওয়ান (৫৩১–৫৭৯ খ্রি.) কর্তৃক উৎকর্ষে পৌঁছানো ‘গুন্দিশাপুর বিশ্ববিদ্যালয়’ (Gondeshapur):

  • এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বৌদ্ধিক মিলনকেন্দ্র। ৫২৯ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ান এথেন্সের দর্শন একাডেমি বন্ধ করে দিলে বিতাড়িত গ্রিক নিও-প্লেটোনিক পণ্ডিতরা গুন্দিশাপুরে আশ্রয় নেন।
  • এখানে গ্রিক চিকিৎসাবিদ্যা (হিপোক্রেটিস ও গ্যালেন), ভারতীয় আয়ুর্বেদ ও গণিত এবং পারসিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক অভাবনীয় মিলন ঘটে। সম্রাট খসরু সংস্কৃত পঞ্চতন্ত্রকে পাহলভি ভাষায় ‘কালিলা ওয়া দিমনা’ হিসেবে অনুবাদ করান।
  • গুন্দিশাপুরে বিশ্বের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষণ হাসপাতাল (Teaching Hospital) ও মেডিকেল স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীতে আব্বাসীয় যুগের ‘বায়তুল হিকমাহ’ ও আধুনিক মেডিকেল কলেজের আদি কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে।

২. স্থাপত্যকলা ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময়

সাসানীয় স্থাপত্যরীতি পরবর্তী ইসলামী স্থাপত্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল:

  • আইওয়ান বা বিশাল তোরণ (Iwan): তাদের রাজধানী তিসফুনে (বাগদাদের কাছে মদাইন) নির্মিত ‘তাক-ই খসরু’ (Taq Kasra) বা খসরুর তোরণ হলো প্রাচীন প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য বিস্ময়। এটি কোনো প্রকার ভেতরের স্তম্ভ ছাড়াই বিশ্বের বৃহত্তম একক স্প্যানের খোলা ইটের তৈরি খিলান (দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৭ মিটার এবং প্রস্থ ২৬ মিটার), যা আজ দেড় হাজার বছর পরেও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে।
  • গম্বুজ নির্মাণ কৌশল (Squinch): চারকোনা ঘরের ওপর গোলাকার গম্বুজ বসানোর জন্য কোণায় ত্রিভুজাকার বা অর্ধবৃত্তাকার খিলান তৈরি করার যে প্রযুক্তি (Squinch technique) সাসানীয়রা আবিষ্কার করে, তা পরবর্তীকালে মুসলিম বিশ্বের সকল মসজিদের গম্বুজ নির্মাণের মূল নীতিতে পরিণত হয়।

৩. টেক্সটাইল, গালিচা ও ধাতব শিল্পকলা

  • সাসানীয় রেশম ও বস্ত্র: সাসানীয় শিল্পীদের বোনা রেশমি কাপড় (Sassanid Silk) এত সূক্ষ্ম ও চমৎকার ছিল যে বাইজেন্টাইন সম্রাটরা এবং ইউরোপের রাজারা তা অত্যন্ত চড়া দামে সংগ্রহ করতেন এবং খ্রিস্টান চার্চে পবিত্র বস্তুর আবরণে তা ব্যবহার করতেন। কাপড়ের ওপর গোলাকার মেডেলিয়নে ডানাযুক্ত ঘোড়া, সিংহ শিকার ও ময়ূরের মোটিফ ছিল এদের বৈশিষ্ট্য।
  • পারস্যের বিখ্যাত গালিচা: সম্রাট খসরু আনুশিরওয়ানের রাজপ্রাসাদে বিছানো ‘বসন্তকালীন গালিচা’ (Baharestan Carpet) ছিল সোনা, রূপা ও রত্নখচিত এক মহাকাব্যিক শিল্পকর্ম।
  • রৌপ্যপাত্র (Sassanid Silverware): সোনা ও রূপার সুদৃশ্য থালা, পেয়ালা ও পানপাত্রে রাজকীয় শিকারদৃশ্যের নিখুঁত খোদাইকর্ম তাদের ধাতুশিল্পের অনন্য দক্ষতার প্রমাণ বহন করে।

৪. সুসংহত প্রশাসনিক কাঠামো ও বিচার ব্যবস্থা

সাসানীয় সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক শৃঙ্খলার খ্যাতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল:

  • সম্রাট খসরু আনুশিরওয়ানকে তাঁর নিরপেক্ষ ও কঠোর ন্যায়বিচারের জন্য ‘আদিল’ (নওশেরওয়ান-ই আদিল বা ন্যায়পরায়ণ খসরু) বলা হতো। এমনকি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জন্মকাল নির্দেশ করতে গিয়ে বলেছিলেন—“আমি ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ নওশেরওয়ানের রাজত্বকালে জন্মগ্রহণ করেছি।”
  • তারা জমি জরিপ করে সুনির্দিষ্ট কর নির্ধারণ এবং রাজস্ব আদায়ের সুবিন্যস্ত পদ্ধতি চালু করে। পরবর্তীতে আব্বাসীয় খলিফাগণ (বিশেষ করে খলিফা আল-মনসুর ও হারুনুর রশীদ) উজির পদ, দেওয়ান ব্যবস্থা এবং দরবারী আদব-কায়দা অবিকল এই সাসানীয় প্রশাসনিক মডেল থেকেই গ্রহণ করেছিলেন।

৫. সংগীত ও খেলাধুলার আন্তর্জাতিক রূপায়ণ

  • সাসানীয় দরবারে বরবদ (Barbad)-এর মতো বিশ্বমানের সংগীতজ্ঞের আবির্ভাব ঘটে, যিনি সুরের রাগ ও সংগীততত্ত্বকে সুসংহত করেন এবং পারসিক ল্যুট বা ‘বারবাত’ (যা থেকে আধুনিক উদ ও গিটারের জন্ম) জনপ্রিয় করেন।
  • ভারত থেকে উদ্ভাবিত দাবা খেলাকে (Chaturanga) সাসানীয়রাই প্রথম সুসংহত নিয়মে রূপ দিয়ে ‘শাতরঞ্জ’ (Shatranj) নামে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দান করে এবং তাদের হাত ধরেই এটি আরব হয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাচীন পোলো খেলাও (চওগান) তাদের অন্যতম রাজকীয় খেলা ছিল।

উপসংহার

সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতন রাজনৈতিকভাবে ঘটলেও তাদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য কখনো ধ্বংস হয়নি। বরং তা ইসলামী সভ্যতার পরিমণ্ডলে আত্মস্থ হয়ে নতুন রূপে বিশ্বসভ্যতার পুনর্জাগরণে অমূল্য জ্বালানি জুগিয়েছিল।


৮. অর্ধ ‘উর্বর অর্ধ-চন্দ্র’ ভূমি বলতে কী বুঝায়? একে সভ্যতার লীলাভূমি বলা হয় কেন?

[English: What do you mean by the land of ‘fertile crescent’? Why is it called the Cradle of Civilization?]

ভূমিকা

বিশ্ব ইতিহাসের ভৌগোলিক মানচিত্রে মানব সভ্যতার শৈশব ও প্রথম সূচনালগ্ন যে বিশেষ ভূখণ্ডের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে, তা হলো ‘উর্বর অর্ধ-চন্দ্র’ ভূমি বা ‘ফারটাইল ক্রিসেন্ট’ (Fertile Crescent)। প্রতিকূল মরুভূমি ও পর্বতমালার মাঝে অর্ধচন্দ্রাকারে বিস্তৃত এই প্রাকৃতিক অঞ্চলটি এককালে প্রাচুর্য, উর্বরতা ও সৃজনশীলতার স্বর্গরাজ্য ছিল। মানুষের বন্য যাযাবর জীবন থেকে সুসভ্য নাগরিক জীবনে পদার্পণের সমস্ত প্রাথমিক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ এই ভূমিতেই প্রথম গৃহীত হয়েছিল।

‘উর্বর অর্ধ-চন্দ্র’ ভূমির সংজ্ঞা ও ভৌগোলিক অবস্থান

১৯০৬ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক জেমস হেনরি ব্রেস্টেড (James Henry Breasted) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Ancient Records of Egypt’-এ প্রথমবারের মতো এই ভৌগোলিক পরিভাষাটি ব্যবহার করেন।

ভৌগোলিক মানচিত্রে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, পারস্য উপসাগরের উত্তর প্রান্ত থেকে শুরু করে একটি বাঁকানো ধনুক বা নতুন চাঁদের (Crescent) মতো অঞ্চলটি বিস্তৃত হয়েছে। এর ভৌগোলিক বিস্তার নিম্নরূপ:

  • পূর্বাংশ: মেসোপটেমিয়ার সমভূমি—টাইগ্রিস (দজলা) ও ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদী উপত্যকা (বর্তমান ইরাক ও দক্ষিণ-পশ্চিম ইরান)।
  • মধ্যাংশ: উত্তর মেসোপটেমিয়া হয়ে আধুনিক সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান এবং ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল অঞ্চল।
  • পশ্চিমাংশ: সিনাই উপদ্বীপ অতিক্রম করে মিশরের উর্বর নীল নদ উপত্যকা।

এই অঞ্চলের উভয় পাশে রয়েছে একদিকে শুষ্ক আরব মরুভূমি এবং অন্যদিকে আনাতোলিয়া ও জাগরোসের দুর্গম পর্বতমালা। এর মাঝে অবস্থিত এই উপত্যকাটি নদীবিধৌত পলিমাটি এবং পর্যাপ্ত মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে অবিশ্বাস্য রকমের উর্বর ছিল বলে একে ‘উর্বর অর্ধ-চন্দ্র’ (Fertile Crescent) বলা হয়।

একে ‘সভ্যতার লীলাভূমি বা সূতিকাগার’ (Cradle of Civilization) বলা হয় কেন?

মানব সভ্যতার ইতিহাসে এই অঞ্চলটিকে সভ্যতার লীলাভূমি বা সূতিকাগার আখ্যা দেওয়ার পেছনে নিম্নোক্ত ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক সত্যসমূহ বিদ্যমান:

১. কৃষিকাজ ও পশুপালনের প্রথম সূচনা (নব্যপ্রস্তরযুগীয় বিপ্লব)

আজ থেকে প্রায় দশ-বারো হাজার বছর পূর্বে মানুষ যখন প্রথম খাদ্য সংগ্রাহকের স্তর থেকে খাদ্য উৎপাদকের স্তরে উন্নীত হয়, সেই ‘কৃষি বিপ্লব’ প্রথম ঘটেছিল এই ফারটাইল ক্রিসেন্ট অঞ্চলে। এখানেই প্রথমবারের মতো বুনো গম ও বার্লি চাষ করা হয় এবং ভেড়া, ছাগল, গরু ও শূকরকে গৃহপালিত পশুতে রূপান্তর করা হয়।

২. বিশ্বের প্রাচীনতম স্থায়ী বসতি ও নগররাষ্ট্রের জন্ম

বিশ্বের প্রাচীনতম প্রাচীরঘেরা শহর জেরিকো (Jericho – ফিলিস্তিনে, আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৯০০০ অব্দ) এবং ক্যাটালহুইয়ুক এই অঞ্চলেই গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দে সুমেরীয়দের হাত ধরে উর, উরুক, লাগাশ ও ব্যাবিলনের মতো পূর্ণাঙ্গ প্রথম নগর সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল এই ভূমিতেই।

৩. মানব ইতিহাসের প্রথম লিখন পদ্ধতির উদ্ভাবন

ভাষা ও মনের ভাব স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য মানব ইতিহাসের প্রাচীন দুটি প্রথম লিপি—সুমেরীয়দের ‘কিউনিফর্ম’ (Cuneiform) এবং মিশরীয়দের ‘হাইরোগ্লিফিক’ (Hieroglyphic) লিপি—উভয়টিই ফারটাইল ক্রিসেন্টের দুই প্রান্তে উদ্ভাবিত হয়। পরবর্তীতে খ্রিষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতকে এই অঞ্চলেরই ফিনিশীয়রা (লেবানন) আধুনিক বর্ণমালার (Alphabet) ভিত্তি স্থাপন করে।

৪. চাকা, তামা ও ব্রোঞ্জের প্রথম প্রযুক্তিগত বিপ্লব

পরিবহন ও মৃৎশিল্পের যুগান্তকারী বাহন ‘চাকা’ খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে এই মেসোপটেমিয়া অঞ্চলেই প্রথম আবিষ্কৃত হয়। পাথরের যুগ অতিক্রম করে তামা ও ব্রোঞ্জের ধাতুবিদ্যা এবং লাঙলের ব্যবহার এই ভূখণ্ডেই মানুষের উৎপাদন ক্ষমতা হাজার গুণ বাড়িয়ে দেয়।

৫. প্রথম আইন সংহিতা ও সংগঠিত বিচার ব্যবস্থা

ব্যক্তির খেয়ালখুশির পরিবর্তে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিশ্বের প্রাচীনতম লিখিত আইনসমূহ—যেমন ‘উর-নাম্মুর কোড’ এবং ব্যাবিলনের বিখ্যাত ‘হাম্মুরাবী আইন সংহিতা’—এই ফারটাইল ক্রিসেন্টেই রচিত হয়েছিল।

৬. প্রধান প্রধান বিশ্বধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার জন্মপীঠ

ফারটাইল ক্রিসেন্ট কেবল বস্তুগত সভ্যতার নয়, মানবাত্মার আলোর কেন্দ্র। বিশ্বের তিনটি প্রধান সেমেটিক ও একেশ্বরবাদী ধর্ম—ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম এবং শান্তির ধর্ম ইসলাম—এই পবিত্র ভূখণ্ডেই আত্মপ্রকাশ করেছে। জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) এই ফারটাইল ক্রিসেন্টের উর নগরী থেকেই তাঁর সত্যের প্রচার শুরু করে কেনান (ফিলিস্তিন) ও মক্কায় হিজরত করেছিলেন।

উপসংহার

সার্বিক বিশ্লেষণে এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, আইন, বিজ্ঞান, ধর্ম, সাহিত্য ও কৃষির যে আলোয় আজ আধুনিক মানব সভ্যতা উদ্ভাসিত, তার প্রতিটি স্ফুলিঙ্গ এই ‘উর্বর অর্ধ-চন্দ্র’ ভূমিতেই প্রথম প্রজ্বলিত হয়েছিল। তাই এই অঞ্চলকে ‘সভ্যতার লীলাভূমি’ বলা সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত ও যথার্থ।


খ-বিভাগ: সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন

[দ্রষ্টব্য: যেকোনো দুইটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১০: ১০ × ২ = ২০]

৯. মিশরীয়দের পিরামিড।

[English: The Pyramids of the Egyptians.]

ভূমিকা

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার সবচেয়ে বিস্ময়কর, রাজকীয় ও টেকসই স্থাপত্যিক কীর্তি হলো ‘পিরামিড’। প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে একমাত্র পিরামিডই চার সহস্রাধিক বছর ধরে প্রায় অক্ষত অবস্থায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

পিরামিড নির্মাণের পটভূমি ও উদ্দেশ্য

মিশরীয়রা পরকালে এবং আত্মার পুনর্জন্মে (বা ও কা) গভীরভাবে বিশ্বাস করত। তাদের বিশ্বাস ছিল, ফারাও বা সম্রাটরা মৃত্যুর পর পরকালের দেবতা ওসিরিসের সাথে মিলিত হন এবং পরলোক থেকে মিশরকে সুরক্ষিত রাখেন। তাই ফারাওদের মৃতদেহকে মমি করে সুরক্ষিত রাখা এবং তাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের ধনসম্পদ, খাদ্য ও অস্ত্র অক্ষত সংরক্ষণের জন্য চতুষ্কোণ ভিত্তিবিশিষ্ট সুবিশাল ত্রিভুজাকার পাথরের সমাধি বা পিরামিড নির্মাণ করা হতো।

গিজার মহা পিরামিড (The Great Pyramid of Giza)

মিশরের রাজধানী কায়রোর কাছে গিজা মালভূমিতে অবস্থিত চতুর্থ রাজবংশের ফারাও খুফু (Khufu / Cheops)-এর পিরামিডটি বিশ্বের বৃহত্তম পিরামিড (খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২৫৬০ অব্দে নির্মিত):

  • এটি তৈরিতে আনুমানিক ২৩ লক্ষ বিশালাকার চুনাপাথর ও গ্রানাইট পাথরের ব্লক ব্যবহার করা হয়েছে, যার প্রতিটি ব্লকের গড় ওজন আড়াই টন থেকে পনেরো টন।
  • এর আদি উচ্চতা ছিল প্রায় ৪৮১ ফুট (১৪৬.৬ মিটার), যা টানা ৩,৮০০ বছর ধরে বিশ্বের সর্বোচ্চ মানবনির্মিত স্থাপনা ছিল।
  • আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া কেবল মানব শ্রম ও স্লেজগাড়ির মাধ্যমে পাথরের খণ্ডগুলোকে এমন নিখুঁতভাবে জোড়া লাগানো হয়েছে যে দুটি পাথরের সংযোগস্থলে একটি ব্লেডের পাতও প্রবেশ করানো যায় না।

উপসংহার

পিরামিড কেবল একটি সমাধিস্তম্ভ নয়, এটি প্রাচীন মিশরীয়দের গণিত, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা এবং প্রকৌশলবিদ্যার এক অলৌকিক ও চিরন্তন স্মারক।


১০. দক্ষিণ আরবের সাবীয় রাজ্য।

[English: The Sabean Kingdom of South Arabia.]

ভূমিকা

ইসলাম-পূর্ব যুগে দক্ষিণ আরবের সুজলা-সুফলা ইয়েমেনে যে কয়টি প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল, তার মধ্যে ‘সাবীয় রাজ্য’ (Kingdom of Saba / Sheba) সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও শক্তিশালী ছিল। বাইবেল ও পবিত্র কুরআনে এই রাজ্যের সমৃদ্ধি ও ঐতিহাসিক ঘটনার সুস্পষ্ট বিবরণ রয়েছে।

ঐতিহাসিক বিকাশ ও রাজধানী

খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে (আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব দশম থেকে দ্বিতীয় শতক) সাবীয়রা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করে। তাদের রাজধানী ছিল মারিব (Ma’rib) নগরী। সাবীয়রা ভারত মহাসাগর, ভারত ও পূর্ব আফ্রিকা থেকে আগত মসলা, কর্পূর, লোবান ও সুগন্ধি স্থলপথে মিসর, সিরিয়া ও রোমান সাম্রাজ্যে সরবরাহের একচেটিয়া বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত।

মারিবের ঐতিহাসিক বাঁধ (Ma’rib Dam)

সাবীয়দের ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিভার শ্রেষ্ঠ কীর্তি ছিল মারিবের বিশাল পাথরের বাঁধ। এটি দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী বালায়ক উপত্যকায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য নির্মিত হয়েছিল। এই বাঁধের মাধ্যমে জটিল সেচ খালের নেটওয়ার্ক তৈরি করে তারা মরুভূমির শুষ্ক অঞ্চলকে এক সবুজ উদ্যান ও শস্যশ্যামল ভূস্বর্গে পরিণত করেছিল।

রানি বিলকিস ও সায়লুল আরিম

  • রানি বিলকিস: হযরত সোলায়মান (আ.)-এর সমসাময়িক সাবা রাজ্যের প্রজ্ঞাবান রানি ছিলেন বিলকিস (পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নামলে এ ঘটনা বর্ণিত)। তিনি সোলায়মান (আ.)-এর নবুওয়াত ও আল্লাহর কুদরত প্রত্যক্ষ করে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
  • বাঁধের পতন ও সায়লুল আরিম: পরবর্তীতে সাবীয়রা অকৃতজ্ঞ ও পাপাচারী হয়ে উঠলে মারিবের বাঁধ ভয়াবহ বন্যায় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, যাকে কুরআনের ভাষায় ‘সায়লুল আরিম’ (প্লাবন বন্যা) বলা হয়েছে (সূরা সাবা: ১৫-১৭)। এর ফলে তাদের শস্যখেত ধ্বংস হয় এবং সাবা রাজ্যের পতন ঘটে।

১১. হিব্রু সভ্যতা।

[English: Hebrew Civilization.]

ভূমিকা

প্রাচীন নিকট প্রাচ্যের ছোট ছোট জাতিগুলোর মধ্যে ‘হিব্রু’ (Hebrew) বা বনি ইসরাইল জাতি কোনো বিশাল সামরিক সাম্রাজ্য বা চোখধাঁধানো স্থাপত্য গড়ে তুলতে না পারলেও, বিশ্ব ধর্ম ও নৈতিক চিন্তার ইতিহাসে তারা এক সুদূরপ্রসারী বিপ্লবী ভূমিকা রেখে গেছে। প্রাচীন বিশ্বের বহুদেববাদী অন্ধকারের মাঝে বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদ (Monotheism)-এর পতাকা ওড়ানোই ছিল হিব্রু সভ্যতার প্রধানতম অবদান।

হিব্রু জাতির ঐতিহাসিক বিবর্তন

  • হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও কেনান গমন: খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ১৯০০ অব্দে হিব্রুদের আদি পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) মেসোপটেমিয়ার উর নগরী থেকে আল্লাহর নির্দেশে কেনান (ফিলিস্তিন) ভূমিতে আগমন করেন। তাঁর পৌত্র হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর অপর নাম ছিল ‘ইসরাইল’, যাঁর বারো পুত্রের মাধ্যমে বনি ইসরাইলের বারোটি বংশধারার জন্ম হয়।
  • মিসর থেকে মুক্তি (Exodus) ও হযরত মুসা (আ.): চার শতাব্দী মিসরে দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ থাকার পর খ্রিষ্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতকে হযরত মুসা (আ.)-এর নেতৃত্বে হিব্রুরা অলৌকিকভাবে লোহিত সাগর পার হয়ে ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক প্রস্থান (Exodus) সম্পন্ন করে। সিনাই পর্বতে মুসা (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে লাভ করেন পবিত্র ধর্মগ্রন্থ তাওরাত এবং সুবিখ্যাত ‘দশ আজ্ঞা’ (Ten Commandments)—যা পাশ্চাত্য নীতিশাস্ত্র ও আইনের অন্যতম ভিত্তি।
  • স্বর্ণযুগ: খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকে হযরত দাউদ (আ.) এবং তাঁর পুত্র হযরত সোলায়মান (আ.)-এর আমলে ঐক্যবদ্ধ ইসরাইল রাজ্যের চরম সমৃদ্ধি ঘটে। সোলায়মান (আ.) জেরুজালেমে প্রথম পবিত্র মন্দির (First Temple / বায়তুল মুকাদ্দাস) নির্মাণ করেন।

হিব্রু সভ্যতার মূল অবদান

হিব্রুদের মূল অবদান কোনো পাথর বা মূর্তিতে নয়; তাদের অবদান ছিল চিন্তা ও আদর্শে—একমাত্র ন্যায়পরায়ণ ঈশ্বর ‘ইয়াহওয়েহ’ বা আল্লাহর উপাসনা, সমতাভিত্তিক নৈতিক অনুশাসন এবং ন্যায়বিচারের শাশ্বত ধারণা। তাদের এই ঐতিহ্য থেকেই পরবর্তীতে খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়েছে।


১২. মিশরীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাস।

[English: The religious beliefs of Egyptians.]

ভূমিকা

প্রাচীন মিশরীয়দের সমগ্র জীবন, শিল্পকলা, সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে তাদের গভীর ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আবর্তিত ছিল। প্রাচীন বিশ্বের কোনো জাতিই মিশরীয়দের মতো ধর্মপরায়ণ এবং পরকালের চিন্তায় এতটা নিমগ্ন ছিল না।

মিশরীয় ধর্মবিশ্বাসের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

১. বহুদেববাদ ও প্রকৃতিপূজা (Polytheism)

মিশরীয়রা প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির ওপর ভিত্তি করে বহু দেব-দেবীর পূজা করত। তাদের প্রধান দেবতারা ছিলেন:

  • আমন-রা (Amon-Ra): সূর্যদেব ও দেবতাদের রাজা। তিনি প্রতিদিন আকাশে সোনার রথে চড়ে আলো বিলান।
  • ওসিরিস (Osiris): মৃত্যু, পাতালপুরী এবং পরকালের পরম বিচারক দেবতা।
  • আইসিস (Isis): ওসিরিসের স্ত্রী ও মাতৃত্ব ও ভালোবাসার দেবী।
  • হোরাস (Horus): ওসিরিস ও আইসিসের পুত্র, যিনি বাজপাখির মাথার রূপ ধারণ করেন। ফারাওরা নিজেদের হোরাসের মূর্ত প্রতীক মনে করতেন।
  • আনুবিস (Anubis): শেয়ালমুখী দেবতা, যিনি মমি তৈরির প্রক্রিয়া এবং পরকালের পথপ্রদর্শক হিসেবে পূজিত হতেন।

২. পরকাল ও পুনর্জন্মে অবিচল বিশ্বাস

মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল মৃত্যুর পর আত্মা বিনষ্ট হয় না। মানুষের ভেতর দুটি আত্মিক সত্তা থাকে—‘কা’ (Ka – ব্যক্তির অবিকল আত্মিক প্রতিচ্ছবি) এবং ‘বা’ (Ba – পাখির মতো আত্মা)। মৃত্যুর পর কা ও বা পুনরায় দেহে ফিরে আসতে চায়। এ কারণেই তারা মৃতদেহকে পচন থেকে রক্ষা করার জন্য মমি তৈরি করত এবং সমাধিতে খাবার, আসবাবপত্র ও অলংকার রেখে দিত।

৩. শেষ বিচার ও হৃদয়ের ওজন পরিমাপ (Weighing of the Heart)

মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে মৃত্যুর পর আত্মাকে ওসিরিসের আদালতে ৪২ জন বিচারকের সামনে হাজির হতে হয়। সেখানে সত্য ও ন্যায়ের দেবী ‘মাআত’ (Ma’at)-এর পালক রাখা হতো একটি পাল্লায় এবং অপর পাল্লায় রাখা হতো মৃত ব্যক্তির হৃদয়। যদি ব্যক্তির সৎকর্মের কারণে হৃদয় পালকের চেয়ে হালকা হতো, তবে সে অনন্ত স্বর্গে (Aaru) প্রবেশ করত। আর যদি পাপের কারণে হৃদয় ভারী হতো, তবে এক দানব (Ammut) সেই হৃদয় খেয়ে ফেলত এবং তার দ্বিতীয় মৃত্যু ঘটত।

৪. ‘বুক অব দ্য ডেড’ (Book of the Dead)

পরকালের জটিল পথ ও দানবদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মিশরীয়রা প্যাপিরাসে লিখিত জাদুমন্ত্র ও প্রার্থনার সংকলন ‘বুক অব দ্য ডেড’ মমির কফিনে রেখে দিত, যা আত্মাকে নিরাপদে ওসিরিসের দরবারে পৌঁছাতে সাহায্য করত।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: কার্ল উইটফোগেলের ‘হাইড্রোলিক তত্ত্ব’ কী?

উত্তর: কার্ল উইটফোগেল প্রবর্তিত হাইড্রোলিক তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো—প্রাচীন নদীমাতৃক অঞ্চলে নদীর ভয়াবহ বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বাঁধ নির্মাণ এবং কৃষিতে ব্যাপক সেচ খাল ব্যবস্থাপনার জন্য যে বৃহৎ সামাজিক শ্রম ও সংগঠনের প্রয়োজন হয়েছিল, সেই সম্মিলিত সেচ ব্যবস্থাপনার তাগিদ থেকেই বিশ্বে রাষ্ট্রযন্ত্র, কেন্দ্রীয় শাসন ও নগর সভ্যতার উৎপত্তি ঘটেছিল।

প্রশ্ন ২: হাম্মুরাবী কে ছিলেন এবং তাঁর আইন সংহিতা কবে আবিষ্কৃত হয়?

উত্তর: হাম্মুরাবী ছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের প্রথম রাজবংশের সর্বশ্রেষ্ঠ ষষ্ঠ রাজা। তাঁর বিখ্যাত ২৮২টি ধারা সংবলিত কালো পাথরের আইন স্তম্ভটি ১৯০১-১৯০২ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক জ্যাক দ্য মর্গান প্রাচীন সুসা নগরী থেকে আবিষ্কার করেন।

প্রশ্ন ৩: সুমেরীয় শাসন ব্যবস্থায় ‘জিগুরাত’-এর ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর: সুমেরীয় নগরগুলোর কেন্দ্রে অবস্থিত বহুস্তরীয় আকাশচুম্বী পিরামিডসদৃশ মন্দিরকে ‘জিগুরাত’ বলা হতো। এটি কেবল উপাসনালয় ছিল না, বরং ছিল সরকারের মূল সচিবালয়, খাদ্য ও শস্যভাণ্ডার, কর আদায় দপ্তর, ব্যাংক এবং প্রধান বিচারালয়।

প্রশ্ন ৪: জরাথুস্ত্রবাদের প্রধান ধর্মীয় নীতিবাক্য কী ছিল?

উত্তর: জরাথুস্ত্রবাদের সমগ্র নৈতিক দর্শন তিনটি সোনালী মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল—’হু মাতা’ (সৎ চিন্তা), ‘হু উখতা’ (সৎ বাক্য) এবং ‘হু ভরশত’ (সৎ কর্ম)।

প্রশ্ন ৫: ‘ফারটাইল ক্রিসেন্ট’ বা উর্বর অর্ধ-চন্দ্র পরিভাষাটি কে প্রথম ব্যবহার করেন?

উত্তর: মার্কিন প্রত্নতাত্ত্বিক ও প্রাচ্যবিদ জেমস হেনরি ব্রেস্টেড ১৯০৬ সালে মেসোপটেমিয়া থেকে শুরু করে সিরিয়া, ফিলিস্তিন হয়ে মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত উর্বর কৃষিবলয়কে প্রথম ‘উর্বর অর্ধ-চন্দ্র’ (Fertile Crescent) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন।

প্রশ্ন ৬: প্রাচীন মিশরীয়দের পঞ্জিকার বৈশিষ্ট্য কী ছিল?

উত্তর: মিশরীয়রা লুব্ধক তারার উদয় পর্যবেক্ষণ করে বিশ্বের প্রথম ৩৬৫ দিনের সৌর পঞ্জিকা উদ্ভাবন করে। তারা বছরকে ১২টি মাসে এবং প্রতিটি মাসকে ৩০ দিনে ভাগ করত এবং অবশিষ্ট ৫ দিনকে ধর্মীয় উৎসব হিসেবে বছরের শেষে উদযাপন করত।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *