জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আল-মুসনাদ লিল ইমাম আবী হানীফা ওয়াশ শাফিঈ ওয়া আহমাদ (Al-Musnad) – ২০২৮০৩, আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
আপডেট: 21 September, 2026
১৬৫ মিনিট পড়ার সময়
১৬ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১২৯
اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۴
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
المسند لأبي حنيفة والشافعي وأحمد
[আল-মুসনাদ লি আবি হানিফা ওয়াশ শাফিয়ী ওয়া আহমাদ]
বিষয় কোড: ২০২৮০৩
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن اثنين من مجموعة (أ) وعن اثنين من مجموعة (ب) وعن اثنين من مجموعة (ج) وعن اثنين من مجموعة (د)- والأعداد بالهامش تدل على الدرجة الكاملة-
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রশ্নপত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী مجموعة (أ) থেকে ২টি, مجموعة (ب) থেকে ২টি, مجموعة (ج) থেকে ২টি এবং مجموعة (د) থেকে ২টি—মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ও রেফারেন্সভিত্তিক অনুশীলনের সুবিধার্থে এখানে প্রতিটি গ্রুপের সকল ১২টি প্রশ্নের প্রামাণ্য ও সুবিস্তৃত সমাধান উপস্থাপন করা হলো।]


مجموعة (أ) — مسند الإمام أبي حنيفة (রহ.)

[‘ক’ বিভাগ: মুসনাদুল ইমাম আবি হানিফা (রহ.) — পূর্ণমান: ১০ × ২ = ২০]
(ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها / হাদিসসমূহের অনুবাদ করো এবং তৎসংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও)

١- أبو حنيفة عن عبد الكريم بن أبي المخارق عن طائوس قال جاء رجل إلى ابن عمر فسأله فقال : يا أبا عبد الرحمن أرأيت الذين يكسرون أغلاقنا وينتهبون بيوتنا ويُغيرون على أمتعتنا- أكفروا؟ قال لا- قال أرأيت هؤلاء الذين يتأوّلون علينا ويسفكون دمائنا أكَفَرُوا؟ قال لا، حتى يجعلوا مع الله شيئا- قال وأنا أنظر إلى إصبع ابن عمر، وهو يحركها ويقول : سنة رسول الله صلى الله عليه وسلم-

[১. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বর্ণনা করেন—তিনি আব্দুল করিম ইবনে আবি আল-মুখারিক্ব থেকে, তিনি প্রখ্যাত তাবেয়ি তাউস (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: জনৈক ব্যক্তি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর নিকট আগমন করে তাঁকে জিজ্ঞাসা করল: ‘হে আবু আব্দুর রহমান! আপনি কি তাদের দেখেছেন যারা আমাদের তালা ভেঙে ফেলে, আমাদের ঘরবাড়ি লুণ্ঠন করে এবং আমাদের সহায়-সম্পদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়—তারা কি কাফের হয়ে গেছে?’ তিনি (ইবনে উমর রা.) উত্তর দিলেন: ‘না।’ লোকটি পুনরায় প্রশ্ন করল: ‘আপনি কি ঐসব লোকদের দেখেছেন যারা আমাদের বিরুদ্ধে ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দাঁড় করায় এবং আমাদের রক্ত প্রবাহিত করে—তারা কি কাফের হয়ে গেছে?’ তিনি বললেন: ‘না; যতক্ষণ না তারা আল্লাহর সাথে অন্য কোনো কিছুকে শরিক করে।’ তাউস (রহ.) বলেন: আমি ইবনে উমর (রা.)-এর পবিত্র আঙুলের দিকে তাকাচ্ছিলাম, তিনি তা নাড়াচ্ছিলেন এবং বলছিলেন: ‘এটাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ।’

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
أَغْلَاقَنَا আগল-ক্বানা اسم جمع، مفرده (غَلَقٌ)، مفعول به منصوب بالفتحة، و(نا) مضاف إليه। باب نصر। আমাদের তালাসমূহ / কপাটসমূহ
يَنْتَهِبُونَ ইয়ানতাহিদূন فعل مضارع مرفوع بثبوت النون، والواو فاعل، من باب افتعال (ن-ه-ب)। তারা লুণ্ঠন করে / ছিনিয়ে নেয়
يُغِيرُونَ ইউগীরূনা فعل مضارع، باب إفعال من الغارة (غ-و-ر)، والواو فاعل। তারা অতর্কিত আক্রমণ বা লুটপাট চালায়
أَمْتِعَتِنَا আমতি’আতিনি جمع قلة لـ (متاع)، مجرور بـ (على) بالكسرة، و(نا) ضمير مضاف إليه। আমাদের ধনসম্পদ ও মালপত্র
يَتَأَوَّلُونَ ইয়াতায়াআউয়ালূনা فعل مضارع، باب تفعل من الأوْل (أ-و-ل)، والواو فاعل। ভ্রান্ত ব্যাখ্যায় লিপ্ত হওয়া। তারা অপব্যাখ্যা করে / ভ্রান্ত তা’বিল করে
يَسْفِكُونَ ইয়াসফিকূনা فعل مضارع، من باب ضرب (س-ف-ك)، بمعنى إراقة الدم। তারা প্রবাহিত করে (রক্ত ঝরায়)

(أ) هل مرتكب الكبيرة كافر أم لا؟ بين المسئلة مدللا ومفصلا-

[কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি কি কাফের, নাকি কাফের নয়? দলিল-প্রমাণসহ বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: ইসলামি আকিদা ও ইলমুল কালামের ইতিহাসে ‘মুরতাকিবে কাবিরাহ’ (مرتكب الكبيرة) বা কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির ঈমানি মর্যাদা নিরূপণ একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও মৌলিক বিষয়। প্রাথমিক যুগে খারেজি ও মু’তাজিলাদের মতো বিভ্রান্ত ফিরকাগুলো এ বিষয়ে চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে উম্মাহর মধ্যে মারাত্মক ফিতনা ও রক্তপাতের সূচনা করেছিল। পক্ষান্তরে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত কুরআন ও সুন্নাহর ভারসাম্যপূর্ণ দলিলের আলোকে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছে। নিম্নে এ মাসআলাটির বিশদ শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ পেশ করা হলো।

১. বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও মাযহাব:

  1. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা: আহলুস সুন্নাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো—কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি যদি উক্ত গুনাহকে হালাল মনে না করে (حلال না জানে), তবে সে কখনো কাফের বা ইসলাম থেকে খারিজ হয় না। বরং সে একজন ‘ফাসেক মুমিন’ (مؤمن فاسق বা ناقص الإيمان)। তওবা ছাড়া মারা গেলে তার বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছার ওপর সমর্পিত (تحت مشيئة الله); আল্লাহ চাইলে স্বীয় অনুগ্রহে তাকে ক্ষমা করতে পারেন, অথবা গুনাহের পরিমাণ শাস্তি দিয়ে পরিশেষে জান্নাত দান করবেন। সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না।
  2. খারেজিদের (الخوارج) আকিদা: খারেজিদের মতে কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি সম্পূর্ণ কাফের, মুরতাদ এবং তার রক্ত ও সম্পদ হালাল। তারা মনে করে আমল ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সুতরাং যেকোনো একটি কবিরা গুনাহ সংঘটিত হলেই তার ঈমান পুরোপুরি বিনষ্ট হয়ে যায় এবং সে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে।
  3. মু’তাজিলাদের (المعتزلة) আকিদা: মু’তাজিলাদের মতে কবিরা গুনাহকারী ঈমান থেকে বের হয়ে যায়, তবে পুরোপুরি কুফরিতেও প্রবেশ করে না। তারা একে ‘আল-মানযিলাতু বায়নাল মানযিলাতাইন’ (المنزلة بين المنزلتين—দুই অবস্থানের মধ্যবর্তী অবস্থান) বলে আখ্যায়িত করে। তবে আখেরাতে তাদের মতেও সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে।

২. আহলুস সুন্নাহর সপক্ষে কুরআন ও হাদিসের অকাট্য দলিলসমূহ:

  • ১. কুরআনে হত্যাকারীকে মুমিন ভাই সম্বোধন: অন্যায়ভাবে হত্যা করা কবিরা গুনাহের মধ্যে অন্যতম জঘন্যতম অপরাধ। অথচ কিসাসের আয়াতে মহান আল্লাহ হত্যাকারী ও নিহতের অভিভাবককে পরস্পর ‘দ্বীনি ভাই’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন: فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ—’অতঃপর তার (হত্যাকারীর) ভাইয়ের পক্ষ থেকে যদি কিছু ক্ষমা করা হয়, তবে যেন সঙ্গত বিধিমোতাবেক তার অনুসরণ করা হয়।’ (সূরা আল-বাকারাহ: ১৭৮)। যদি হত্যার দ্বারা ঈমান বিনষ্ট হয়ে কাফের হয়ে যেত, তবে আল্লাহ তাকে মুমিনের ‘ভাই’ বলতেন না।
  • ২. যুদ্ধরত দুই মুসলিম দলকে মুমিন ঘোষণা: সূরা হুজুরাতে দুই মুসলিম দলের পরস্পরের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করার মতো চরম কবিরা গুনাহের পরও আল্লাহ তাদের মুমিন বলেছেন: وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا—’আর যদি মুমিনদের দুই দল পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তবে তাদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দাও।’ (সূরা আল-হুজুরাত: ৯)।
  • ৩. শিরক ব্যতীত সকল গুনাহ ক্ষমার ঐশী ঘোষণা: আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেন: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ—’নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না; এ ছাড়া অন্য যেকোনো অপরাধ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।’ (সূরা আন-নিসা: ৪৮)। এই আয়াত প্রমাণ করে শিরক ছাড়া কবিরা গুনাহকারী কাফের নয়, বরং আল্লাহর ক্ষমার আওতাধীন।
  • ৪. নবিজির শাফায়াতের সুস্পষ্ট ঘোষণা: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: شَفَاعَتِي لِأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي—’আমার শাফায়াত আমার উম্মতের কবিরা গুনাহকারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৩৯; তিরমিযী)। কাফেরদের জন্য কোনো শাফায়াত নেই; সুতরাং হাদিসটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে কবিরা গুনাহকারী উম্মতে মুহাম্মাদীর অন্তর্ভুক্ত মুমিন।

৩. কবিরা গুনাহকারীর হুকুমের তুলনামূলক পর্যালোচনামূলক ছক:

সম্প্রদায় দুনিয়াতে তার মর্যাদা আখেরাতে তার চূড়ান্ত পরিণতি
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত গুনাহগার মুমিন (ফাসেক); কাফের নয়। আল্লাহর ইচ্ছাধীন; শাস্তি পেলেও পরিশেষে জান্নাত লাভ করবে।
খারেজি সম্প্রদায় পুরোপুরি কাফের ও মুরতাদ; রক্ত হালাল। চিরস্থায়ী জাহান্নামী।
মু’তাজিলা সম্প্রদায় না মুমিন, না কাফের (মধ্যবর্তী অবস্থা)। চিরস্থায়ী জাহান্নামী (তবে কাফেরের চেয়ে শাস্তি কিছুটা লঘু)।

উপসংহার: অতএব, প্রশ্নে উল্লিখিত হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর ফতোয়াই হলো হক ও সুন্নাহর পথ—’যতক্ষণ না তারা আল্লাহর সাথে শিরক করবে, ততক্ষণ তারা কাফের হবে না।’ কবিরা গুনাহকারী ফাসেক হতে পারে কিন্তু সে ঈমানের গণ্ডি থেকে বহিষ্কৃত কাফের নয়।


٢- أبو حنيفة عن الهيثم عن نافع عن ابن عمر رضى الله عنهما قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : يجيئ قوم يقولون: لا قدر، ثم يخرجون منه إلى الزندقة، فإذا لقيتموهم فلا تسلموا عليهم وإن مرضوا فلا تعودوهم، وإن ماتوا فلا تشيعوهم- فإنهم شيعة الدجال ومجوس هذه الأمة، حق على الله أن يلحقهم بهم في النار-

[২. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বর্ণনা করেন—তিনি হাইসাম থেকে, তিনি নাফে’ থেকে এবং তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘অচিরেই এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা বলবে—তাকদির বলতে কিছু নেই। অতঃপর তারা এ মতবাদ থেকে বের হয়ে সরাসরি যিন্দিক্বিয়াতে (ধর্মহীনতা ও নাস্তিকতায়) পতিত হবে। অতএব তোমরা যখন তাদের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন তাদের সালাম দেবে না; তারা অসুস্থ হলে তাদের সেবা-শুশ্রূষা করতে যাবে না এবং তারা মারা গেলে তাদের জানাজায় শরিক হবে না। কেননা তারা হলো দাজ্জালের অনুসারী দল এবং এই উম্মতের অগ্নিপূজক (মাজুস)। আল্লাহর ওপর এটি অবধারিত হক যে, তিনি তাদেরকে তাদের সাথেই জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
لَا قَدَرَ লা ক্বাদারা (لا) نافية للجنس تعمل عمل إنّ، و(قدر) اسمها مبني على الفتح في محل نصب। কোনো পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য বা তাকদির নেই
الزَّنْدَقَةِ আয্-যান্দাক্বাহ্ اسم مجرور بمن، وهو لفظ معرب، أصله فارسي، يطلق على النفاق والطعن في الدين। যিন্দিক্বিয়াত / কপটতা ও ধর্মহীনতা
فَلَا تَعُودُوهُمْ ফালা তা’ঊদূহুম (لا) ناهية جازمة، والفعل مضارع مجزوم بحذف النون، والواو فاعل، وهم مفعول به। باب نصر (ع-و-د)। তোমরা তাদের দেখতে বা সেবা করতে যেও না
فَلَا تُشَيِّعُوهُمْ ফালা তুশায়্যি’ঊহুম فعل مضارع مجزوم بلا الناهية، باب تفعيل (ش-ي-ع)، والواو فاعل، وهم مفعول به। তোমরা তাদের জানাজার পেছনে যেও না
شِيعَةُ الدَّجَّالِ শী’আতুদ দাজ্জাল شيعة: خبر إنّ مرفوع بالضمة، وهو مضاف، والدجال: مضاف إليه مجرور بالكسرة। দাজ্জালের সমর্থক ও অনুসারী দল
مَجُوسُ মাজূসু معطوف على (شيعة) مرفوع بالضمة، وهم عبدة النار من الفرس। অগ্নিপূজক সম্প্রদায়

(أ) من القدرية؟ بين عقائدهم بالاختصار-

[কাদারিয়্যা কারা? সংক্ষেপে তাদের আকিদাসমূহ বর্ণনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: ইসলামি ইতিহাসের বিভ্রান্ত ফেরকাগুলোর মধ্যে ‘কাদারিয়্যা’ (القدرية) সম্প্রদায় অন্যতম। তাকদিরের অকাট্য বিধানকে অস্বীকার করে এরা মানব ইতিহাস ও ইসলামি আকিদায় চরম বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করে এদের সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। নিম্নে কাদারিয়্যাদের পরিচয় ও তাদের মূল আকিদাসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

১. কাদারিয়্যা সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক পরিচয়:

  • নামকরণ ও উৎপত্তি: বাহ্যিক দৃষ্টিতে ‘কাদারিয়্যা’ শব্দের অর্থ তাকদিরে বিশ্বাসী মনে হলেও ইসলামি পরিভাষায় যারা আল্লাহর সার্বভৌম ‘তাকদির’ বা পূর্বনির্ধারণকে সরাসরি অস্বীকার করে, তাদেরকেই কাদারিয়্যা বলা হয়। সাহাবিদের যুগের শেষভাগে প্রথম হিজরি শতাব্দীর শেষ দশকে ইরাকের বসরায় মা’বাদ আল-জুহানী (معبد الجهني) এবং পরবর্তীতে গায়লান আদ-দিমাশকী (غيلان الدمشقي) এই বিভ্রান্ত মতবাদ প্রচার শুরু করে।
  • মাজুস বা অগ্নিপূজক আখ্যাদানের কারণ: হাদিস শরিফে নবিজি (সা.) তাদের ‘মাজুসু হাযিহিল উম্মাহ’ (এই উম্মতের অগ্নিপূজক) বলেছেন। কারণ পারস্যের অগ্নিপূজকরা দুটি স্রষ্টায় বিশ্বাস করত—আলোর স্রষ্টা (ইয়াজদান) ও অন্ধকারের স্রষ্টা (আহরিমান)। তদ্রূপ কাদারিয়্যারাও দাবি করত যে, মানুষের ভালো-মন্দ কাজের স্রষ্টা স্বয়ং মানুষ, এতে আল্লাহর কোনো নিয়ন্ত্রণ বা পূর্বনির্ধারণ নেই। ফলে তারাও আল্লাহর পাশাপাশি মানুষকে স্বীয় কর্মের স্বাধীন স্রষ্টা বানিয়ে কার্যত মাজুসদের মতো দ্বৈত স্রষ্টাবাদে লিপ্ত হয়েছিল।

২. কাদারিয়্যাদের প্রধান প্রধান ভ্রান্ত আকিদাসমূহ:

  1. তাকদির বা পূর্বনির্ধারণ সম্পূর্ণ অস্বীকার: তাদের মূল দাবি হলো—আল্লাহ তাআলা কোনো মানুষের ভাগ্য পূর্বাহ্নে লিখে রাখেননি। ভালো বা মন্দ কোনো কিছুই আল্লাহর ফায়সালা অনুযায়ী হয় না।
  2. ‘আল-আমরু উনুফ’ (الأمر أُنُف) আকিদা: তারা বলত—আল্লাহ কোনো ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তা জানেন না; বরং ঘটনা যখন ঘটে কেবল তখনই আল্লাহ তা জানতে পারেন (নাউযুবিল্লাহ)। সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) যখন এই আকিদার কথা শুনলেন, তখন তিনি বলেছিলেন: ‘তোমরা তাদের বলে দিও যে, ইবনে উমরের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তাদের সাথেও ইবনে উমরের কোনো সম্পর্ক নেই।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮)।
  3. মানুষ স্বীয় কর্মের নিরঙ্কুশ ও স্বাধীন স্রষ্টা: তারা বিশ্বাস করে মানুষের ভালো-মন্দ সব কাজের নিরঙ্কুশ সৃষ্টিকর্তা মানুষ নিজেই। আল্লাহর কোনো ইরাদাহ (ইচ্ছা) বা কুদরত মানুষের কর্মের ওপর কার্যকর নয়।

৩. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান:

কাদারিয়্যাদের বিপরীতে আহলুস সুন্নাহর বিশুদ্ধ আকিদা হলো—মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমানের সবকিছুই সৃষ্টির পূর্বে জানতেন এবং তা লওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ রেখেছেন। মহাবিশ্বে আল্লাহর ইচ্ছা ও সৃষ্টি ব্যতিরেকে একটি গাছের পাতাও নড়ে না (وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ—’আল্লাহই তোমাদের এবং তোমাদের যাবতীয় কর্মকে সৃষ্টি করেছেন।’ সূরা আস-সাফফাত: ৯৬)। তবে আল্লাহ মানুষকে ‘কাসব’ (উপার্জন বা পছন্দের স্বাধীনতা) দিয়েছেন, যার ভিত্তিতে মানুষ তার কাজের জন্য জবাবদিহি করবে ও পুরস্কৃত বা তিরস্কৃত হবে।

উপসংহার: কাদারিয়্যাদের এই ভ্রান্ত মতবাদ আল্লাহর ইলমে কুল্লি ও সর্বময় সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করার শামিল, যার কারণেই হাদিসে তাদের সাথে সামাজিক ও ধর্মীয় সম্পর্কচ্ছেদ করার কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।


٣- أبو حنيفة عن محمد بن منصور بن أبي سليمان البلخي ومحمد بن عيسى ويزيد الطوسي عن القاسم بن أمية الحذاء العدوى عن نوح بن قيس عن يزيد الرقاشي عن أنس بن مالك (رض) قال: قلنا يا رسول الله! لِمَنْ تشفع يوم القيامة؟ قال لأهل الكبائر، وأهل العظائم، وأهل الدماء-

[৩. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বর্ণনা করেন—তিনি মুহাম্মদ ইবনে মানসুর ইবনে আবি সুলাইমান আল-বালখী, মুহাম্মদ ইবনে ঈসা এবং ইয়াযিদ আত-তুসী থেকে, তাঁরা কাসিম ইবনে উমাইয়া আল-হাদ্দা আল-আদাভী থেকে, তিনি নূহ ইবনে কায়েস থেকে, তিনি ইয়াযিদ আর-রাকাশী থেকে এবং তিনি প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমরা আরজ করলাম—’হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামতের দিন আপনি কার কার জন্য সুপারিশ (শাফায়াত) করবেন?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করলেন: ‘আমার উম্মতের কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের জন্য, মারাত্মক পাপে নিমজ্জিতদের জন্য এবং রক্তপাতজনিত গুরুতর অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের জন্য।’

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
تَشْفَعُ তাশফা’উ فعل مضارع، من باب فتح (ش-ف-ع)، والفاعل ضمير مستتر تقديره (أنت)। আপনি শাফায়াত বা সুপারিশ করবেন
الْكَبَائِرِ আল-কাবা’ইরি جمع كَبِيرَة، مضاف إليه مجرور بالكسرة، وهي الذنوب العظام كالقتل والزنا। কবিরা গুনাহসমূহ (বড় পাপসমূহ)
الْعَظَائِمِ আল-‘আজায়িম جمع عَظِيمَة، معطوف على الكبائر مجرور بالكسرة، والمراد الذنوب الشديدة। ভয়াবহ ও মারাত্মক অপরাধসমূহ
أَهْلِ الدِّمَاءِ আহলিদ দিমা’ই أهل: معطوف مجرور، والدماء: جمع دَمٍ، مضاف إليه مجرور। রক্তপাত ও হত্যার সাথে জড়িত ব্যক্তিরা

(أ) هل الشفاعة ثابتة؟ بين المسئلة مدللا-

[শাফায়াত কি শরিয়তে প্রমাণিত? দলিল-প্রমাণসহ বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: কিয়ামতের ময়দানে বিচারকার্য শুরু এবং পাপী মুমিনদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাতীদের মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আল্লাহর অনুমতিসাপেক্ষে নবি-রাসুল ও নেককার বান্দাগণ যে সুপারিশ করবেন, ইসলামি পরিভাষায় তাকে ‘শাফায়াত’ (الشفاعة) বলা হয়। খারেজি ও মু’তাজিলাদের মতো বিপথগামী সম্প্রদায় শাফায়াতকে অস্বীকার করলেও কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনের ইজমার অকাট্য দলিলের ভিত্তিতে শাফায়াত সুপ্রতিষ্ঠিত ও সত্য। নিম্নে দলিলের আলোকে বিষয়টি বিশদভাবে উপস্থাপন করা হলো।

১. শাফায়াতের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:

  • আভিধানিক অর্থ: ‘শাফা’আত’ (شفاعة) শব্দটি ‘শাফ’উন’ (شفع) মূলধাতু থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ জোড় করা, মধ্যস্থতা করা বা অন্যের উপকার সাধনের উদ্দেশ্যে সুপারিশ করা।
  • পারিভাষিক অর্থ: কিয়ামতের কঠিন দিবসে মহান আল্লাহর দরবারে কোনো অপরাধীর শাস্তি মওকুফ কিংবা কোনো মুমিনের মর্যাদা সমুন্নত করার নিমিত্তে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের পক্ষ থেকে নিবেদন বা সুপারিশ করাকে শাফায়াত বলে।

২. পবিত্র কুরআনের আলোকে শাফায়াতের প্রামাণিকতা:

পবিত্র কুরআনে মুশরিকদের মিথ্যা দেব-দেবীর সুপারিশকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে, কিন্তু আল্লাহর অনুমতিক্রমে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও মুমিনদের সত্য শাফায়াতকে শর্তসাপেক্ষে দ্ব্যর্থহীনভাবে সাব্যস্ত করা হয়েছে:

  1. আয়াতুল কুরসীর অকাট্য ঘোষণা: مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ—’কে সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত তাঁর দরবারে সুপারিশ করবে?’ (সূরা আল-বাকারাহ: ২৫৫)। এই আয়াতটি স্পষ্ট করে দেয় যে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ সুপারিশ করতে পারবে না; কিন্তু আল্লাহর অনুমতি নিয়ে তাঁর মনোনীত বান্দাগণ অবশ্যই সুপারিশ করবেন।
  2. আল্লাহর সন্তুষ্টির শর্তে শাফায়াত: وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَىٰ وَهُم مِّنْ خَشْيَتِهِ مُشْفِقُونَ—’এবং তারা কেবল তাদের জন্যই সুপারিশ করবে যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট রয়েছেন, আর তারা আল্লাহর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত।’ (সূরা আল-আম্বিয়া: ২৮)।
  3. মাকামে মাহমুদের অঙ্গীকার: সূরা বনী ইসরাইলে নবিজি (সা.)-কে লক্ষ্য করে আল্লাহ বলেন: عَسَىٰ أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا—’অচিরেই আপনার পালনকর্তা আপনাকে প্রশংসিত স্থানে (মাকামে মাহমুদ) প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ (সূরা বনী ইসরাইল: ৭৯)। সকল মুফাসসিরের ঐকমত্যে ‘মাকামে মাহমুদ’ হলো কিয়ামতের দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুমহান শাফায়াত (আশ-শাফা’আতুল কুবরা)-এর সুউচ্চ মর্যাদা।

৩. হাদিস শরিফের আলোকে শাফায়াতের অকাট্য প্রমাণ:

  • ১. শাফায়াতুল কুবরা বা হাশরের ময়দানে বিচার শুরু করার সুপারিশ: বুখারী ও মুসলিমের সুবিখ্যাত দীর্ঘ হাদিসে এসেছে—হাশরের ময়দানে অসহনীয় উত্তাপ ও বিপদে মানুষ হযরত আদম, নূহ, ইব্রাহিম, মুসা ও ঈসা (আ.)-এর কাছে যাবে। প্রত্যেকে অপারগতা প্রকাশ করলে মানুষ শেষ পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হবে। তখন তিনি বলবেন: أَنَا لَهَا، أَنَا لَهَا—’আমিই এ কাজের জন্য নির্ধারিত।’ অতঃপর তিনি আরশের নিচে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে মহান আল্লাহর এমন অনুপম প্রশংসা করবেন যা পূর্বে কেউ করেনি। তখন আল্লাহ বলবেন: يَا مُحَمَّدُ! ارْفَعْ رَأْسَكَ، وَسَلْ تُعْطَهْ، وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ—’হে মুহাম্মদ! আপনার মাথা উঠান, প্রার্থনা করুন দেওয়া হবে; সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ কবুল করা হবে।’ (সহিহ বুখারী, হাদিস: ৪৭১২; সহিহ মুসলিম)।
  • ২. জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার শাফায়াত: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ، وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا—’প্রত্যেক নবির জন্যই একটি বিশেষ দোয়া ছিল যা অবিলম্বে কবুল হয়েছে। আর আমি আমার সেই দোয়াটি কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফায়াতের জন্য সুরক্ষিত রেখেছি। আমার উম্মতের যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোনো কিছু শরিক না করে মারা যাবে, সে ইনশাআল্লাহ এই শাফায়াত লাভ করবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৯)।
  • ৩. কবিরা গুনাহগারদের শাফায়াত: আলোচ্য হাদিসে নবিজি (সা.) সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর শাফায়াত তাঁর উম্মতের কবিরা গুনাহকারী পাপীদের জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করার জন্য কার্যকর হবে।

৪. শাফায়াতের প্রধান প্রকারভেদসমূহ:

শাফায়াতের স্তর উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট সুপারিশকারীর মর্যাদা
১. আশ-শাফা’আতুল কুবরা হাশরের ময়দানে সমগ্র মানবজাতির বিচারকার্য শুরু করার সুপারিশ। শুধুমাত্র রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একক ও অনন্য বৈশিষ্ট্য।
২. বিনা হিসাবে জান্নাত নির্দিষ্ট দল বা সাহাবিদের বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশের সুপারিশ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ সম্মান।
৩. জাহান্নাম থেকে মুক্তি জাহান্নামের উপযুক্ত বা প্রবিষ্ট মুমিনদের জাহান্নাম থেকে উদ্ধার। রাসুলুল্লাহ (সা.), অন্যান্য নবিগণ, শুহাদা ও ওলিগণ।
৪. জান্নাতে মর্যাদা বৃদ্ধি জান্নাতীদের সুউচ্চ স্তর ও মর্যাদা উন্নীত করার সুপারিশ। নবি-রাসুল, সলিহীন ও পবিত্র কুরআন।

উপসংহার: কুরআন ও সুন্নাহর এই অগণিত অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে শাফায়াতে বিশ্বাস স্থাপন করা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মু’তাজিলাদের শাফায়াত অস্বীকারের দাবি স্পষ্ট গোমরাহি ও বাতুলতা।


مجموعة (ب) — مسند الإمام الشافعي (রহ.)

[‘খ’ বিভাগ: মুসনাদুল ইমাম আশ-শাফিয়ী (রহ.) — পূর্ণমান: ১০ × ২ = ২০]
(ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها / হাদিসসমূহের অনুবাদ করো এবং তৎসংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও)

٤- أخبرنا الشافعي (رح) قال أخبرنا مالك عن ابن شهاب عن ابن السباق أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: في جمعة من الجمع يا معشر المسلمين إن هذا يوم جعله الله عيدا للمسلمين فاغتسلوا، ومن كان عنده طيب فلا يضره أن يمس منه وعليكم بالسواك-

[৪. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

আমাদেরকে ইমাম আশ-শাফিয়ী (রহ.) সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন—আমাদেরকে ইমাম মালেক (রহ.) সংবাদ দিয়েছেন, তিনি ইবনে শিহাব আজ-জুহরী থেকে, তিনি উবায়দুল্লাহ ইবনুস সাব্বাক্ব থেকে বর্ণনা করেন যে, নবি করিম (সা.) কোনো এক জুমার দিনে ইরশাদ করেছিলেন: ‘হে মুসলিম সম্প্রদায়! নিশ্চয়ই এটি এমন একটি বরকতময় দিন, যাকে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য ঈদের দিন (উৎসবের দিন) হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। অতএব তোমরা এ দিনে গোসল করো; আর যার কাছে সুগন্ধি থাকে, সে যদি তা ব্যবহার করে তবে তাতে কোনো ক্ষতি নেই (বরং তা উত্তম); এবং তোমরা অবশ্যই মিসওয়াক ব্যবহার করবে।’

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
مَعْشَرَ মা’শারা منادى منصوب بالفتحة لأنه مضاف، وأداة النداء (يا) محذوفة أو مذكورة। মানবদল। হে সম্প্রদায় / হে দল
عِيدًا ‘ঈদাঁন مفعول به ثان للفعل (جعل) منصوب بالفتحة। আনন্দোৎসবের দিন। ঈদের দিন / উৎসবের দিন
فَاغْتَسِلُوا ফাগতাসিলূ الفاء رابطة لجواب الشرط، وفعل أمر مبني على حذف النون، والواو فاعل، باب افتعال। অতএব তোমরা গোসল করো
طِيبٌ তীবুন مبتدأ مؤخر مرفوع بالضمة، وخبره شبه الجملة (عنده) مقدم। সুবাসিত বস্তু। সুগন্ধি / আতর
فَلَا يَضُرُّهُ ফালা ইয়াদুররুহূ (لا) نافية، والفعل مضارع مرفوع بالضمة، والهاء مفعول به। مضاعف ثلاثي। তার কোনো ক্ষতি হবে না (উত্তম)
السِّوَاكِ আস-সিওয়াকি اسم مجرور بالباء، وهو اسم للآلة التي يُستاك بها لتنظيف الأسنان। মিসওয়াক / দাঁতন কাঠি

(أ) بين فضائل السواك وأهميته بالدلائل-

[মিসওয়াকের ফজিলত ও গুরুত্ব দলিলসহ বিশদভাবে আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: ইসলাম কেবল মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধি নিশ্চিত করে না, বরং দৈহিক পবিত্রতা, মুখগহ্বরের পরিচ্ছন্নতা ও সুস্থতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুখ ও দাঁত পরিষ্কারের জন্য যে প্রাকৃতিক পদ্ধতিকে আজীবন ধারণ করেছেন এবং উম্মতকে বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন, তা হলো ‘মিসওয়াক’ (السواك)। হাদিস বিজ্ঞানে মিসওয়াকের গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নে কুরআন, সুন্নাহ ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে মিসওয়াকের ফজিলত ও গুরুত্ব আলোচনা করা হলো।

১. মিসওয়াকের আভিধানিক ও শরয়ি ধারণা:

  • আভিধানিক অর্থ: ‘সিওয়াক’ (سواك) বা মিসওয়াক শব্দটি ঘষা, মাজা ও পরিষ্কার করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর দ্বারা পরিষ্কার করার যন্ত্র (গাছের ডাল বা কাঠি) এবং পরিষ্কার করার ক্রিয়া—উভয়কেই বোঝানো হয়। সাধারণত পিলু (আরাক), জয়তুন বা তিক্ত স্বাদের গাছের ডাল দিয়ে মিসওয়াক করা উত্তম।
  • শরয়ি হুকুম: জমহুর ফুকাহায়ে কেরামের মতে মিসওয়াক করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। বিশেষ করে ওজু, সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, নিদ্রা থেকে জাগ্রত হওয়া এবং জুমার দিনে মিসওয়াক করার গুরুত্ব সর্বাধিক।

২. হাদিস শরিফের আলোকে মিসওয়াকের সুমহান ফজিলত ও গুরুত্ব:

  1. আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মুখের পবিত্রতার মাধ্যম: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: السِّوَاكُ مَطْهَرَةٌ لِلْفَمِ مَرْضَاةٌ لِلرَّبِّ—’মিসওয়াক হলো মুখ পরিষ্কারকারী এবং রবের সন্তুষ্টি অর্জনকারী মাধ্যম।’ (সুনানে নাসাঈ, হাদিস: ৫; সহিহ ইবনে খুযাইমাহ)। হাদিসটি প্রমাণ করে মিসওয়াক একই সাথে পার্থিব পরিচ্ছন্নতা এবং আখেরাতের পরম সওয়াবের কারণ।
  2. প্রতি সালাতের পূর্বে মিসওয়াকের তাগিদ: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَىٰ أُمَّتِي لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ صَلَاةٍ—’যদি আমার উম্মতের ওপর কষ্টকর হওয়ার আশঙ্কা না থাকত, তবে আমি তাদের প্রতিটি নামাজের পূর্বে মিসওয়াক করার আবশ্যিক নির্দেশ (ফরজ) দিতাম।’ (সহিহ বুখারী, হাদিস: ৮৮৭; সহিহ মুসলিম)।
  3. নবিজির অন্তিম মুহূর্তের আমল: হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতকালে তাঁর মাথা আমার বুকে হেলান দেওয়া ছিল। এ সময় আব্দুর রহমান ইবনে আবি বকর হাতে মিসওয়াক নিয়ে প্রবেশ করলেন। নবিজি সেদিকে এমনভাবে তাকালেন যে আমি বুঝতে পারলাম তিনি মিসওয়াক করতে চান। আমি তা চিবিয়ে নরম করে নবিজিকে দিলে তিনি পরম তৃপ্তির সাথে শক্তভাবে মিসওয়াক করলেন। (সহিহ বুখারী: ৪৪৪৯)। এটি প্রমাণ করে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নবিজি মিসওয়াককে ত্যাগ করেননি।
  4. তাহাজ্জুদ ও রাতে ঘুম ভাঙার সুন্নাত: হযরত হুযাইফা (রা.) বলেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন রাতে তাহাজ্জুদের জন্য জাগ্রত হতেন, তখন স্বীয় মুখকে মিসওয়াক দ্বারা ভালোভাবে পরিষ্কার করতেন (সহিহ বুখারী: ২৪৫)।

৩. চিকিৎসা বিজ্ঞান ও আধুনিক স্বাস্থ্যবিদ্যার দৃষ্টিতে মিসওয়াকের উপকারিতা:

  • জীবাণুনাশক উপাদান: আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক আরাক কাঠে সিলিকা, ফ্লোরাইড, ট্যানিন, ভিটামিন সি এবং প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে, যা দাঁতের মাড়ি শক্ত করে এবং ক্যাভিটি ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে।
  • মুখের দুর্গন্ধ দূরীকরণ: দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকা বা ঘুমের কারণে মুখে যে ব্যাক্টেরিয়াল দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়, মিসওয়াক তা তাৎক্ষণিকভাবে দূর করে সুবাস সৃষ্টি করে।
  • দৃষ্টিশক্তি ও মস্তিষ্কের সজীবতা বৃদ্ধি: সালাফগণ উল্লেখ করেছেন যে, নিয়মিত মিসওয়াক দৃষ্টিশক্তি প্রখর করে, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে এবং বাক্য উচ্চারণে প্রাঞ্জলতা আনে।

৪. মিসওয়াকের ফজিলত ও ব্যবহারের সময়ের সারসংক্ষেপ ছক:

সময় / ক্ষেত্র হাদিসের বর্ণনা মূল হিকমত ও তাৎপর্য
ওজু ও সালাতের পূর্বে প্রতি নামাজের আগে মিসওয়াকের নবুওয়তি তাগিদ। পবিত্র মুখে আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত ও ইবাদতের একাগ্রতা।
জুমার দিন জুমার বিশেষ সুন্নাত হিসেবে মিসওয়াকের নির্দেশ। বৃহৎ মুসলিম জমাতে মুখের পূর্ণ পরিচ্ছন্নতা ও সুবাস নিশ্চিতকরণ।
ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নবিজি (সা.) রাতে তাহাজ্জুদে উঠেই মিসওয়াক করতেন। নিদ্রাকালীন মুখের অস্বস্তি ও দুর্গন্ধ দূর করে সতেজতা আনা।
ঘরে প্রবেশের সময় হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, নবিজি ঘরে ঢুকেই প্রথমে মিসওয়াক করতেন। পারিবারিক জীবনে পরিচ্ছন্নতা ও পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শন।

উপসংহার: মিসওয়াক হলো সুন্নাহর এক অপরূপ রত্ন, যা একদিকে আল্লাহর নৈকট্য ও অফুরন্ত সওয়াব অর্জনের সোপান এবং অন্যদিকে শারীরিক সুস্থতা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার এক অনন্য প্রাকৃতিক উপহার।


٥- حدثنا سفيان عن الزهري عن سعيد بن المسيب عن أبي هريرة (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إذا كان يوم الجمعة كان على كل باب من أبواب المسجد ملائكة يكتبون الناس على منازلهم الأول فالأول- فإذا خرج الإمام طويت الصحف واستمعوا الخطبة- والمهجر إلى الصلوة كالمهدى بدنة ثم الذي يليه كالمهدى بقرة ثم الذي يليه كالمهدى كبشا، حتى ذكر الدجاجة والبيضة-

[৫. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

আমাদেরকে সুফিয়ান ইবনে উয়ায়না বর্ণনা করেছেন, তিনি ইমাম ইবনে শিহাব আজ-জুহরী থেকে, তিনি সায়্যিদুত তাবেয়ীন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব থেকে এবং তিনি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘যখন জুমার দিন উপস্থিত হয়, তখন মসজিদের প্রতিটি দরজায় সম্মানিত ফেরেশতাগণ অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁরা মসজিদে আগমনকারী মানুষদের তাদের পর্যায়ানুসারে ক্রমান্বয়ে একের পর এক লিপিবদ্ধ করতে থাকেন। অতঃপর যখন ইমাম (খুতবার জন্য) বের হন, তখন তাঁরা তাঁদের খাতা গুটিয়ে ফেলেন এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শ্রবণ করেন। যে ব্যক্তি জুমার সালাতের জন্য সর্বাগ্রে মসজিদে উপস্থিত হয়, সে যেন একটি উট কোরবানি করল; অতঃপর যে তার পরে আসে, সে যেন একটি গরু কোরবানি করল; অতঃপর যে তার পরে আসে, সে যেন একটি শিংওয়ালা ভেড়া বা দুম্বা কোরবানি করল; এমনকি নবিজি মুরগি এবং ডিম সদকা করার কথাও উল্লেখ করলেন।’

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
طُوِيَتِ তুউইয়াত فعل ماض مبني للمجهول، من اللفيف المقرون (ط-و-ي)، والتاء للتأنيث। গুটিয়ে ফেলা হয় / বন্ধ করা হয়
الصُّحُفُ আস-সুহুফু نائب فاعل مرفوع بالضمة، وهو جمع (صحيفة) بمعنى كتاب الأعمال। আমলনামা / দফতরসমূহ
الْمُهَجِّرُ আল-মুহাজ্জিরু اسم فاعل من باب تفعيل (ه-ج-ر)، مبتدأ مرفوع، وهو المبكّر في أول الوقت। সর্বপ্রথম আগমনকারী / সকাল সকাল গমনকারী
بَدَنَةً বাদানাতান مفعول به لاسم الفاعل (المُهدي) منصوب بالفتحة، والمراد الناقة السمينة। একটি উট / হৃষ্টপুষ্ট উট
كَبْشًا কাবশান مفعول به منصوب، وهو الفحل من الضأن ذو القرنين। শিংওয়ালা দুম্বা। একটি মেষ / ভেড়া বা দুম্বা

(أ) اذكر شروط وجوب الجمعة وأدائها-

[জুমার নামাজ ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ এবং তা আদায়ের শর্তসমূহ উল্লেখ কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: জুমার নামাজ হলো ইসলামের অন্যতম প্রধান নিদর্শন ও সাপ্তাহিক ফরজ ইবাদত। কিন্তু শরিয়ত প্রণেতা জুমার সালাতকে সর্বাবস্থায় সবার জন্য একরকম করেননি; বরং এর জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত নির্ধারণ করেছেন। ফিকহের পরিভাষায় এই শর্তাবলিকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়: ১. জুমার নামাজ ওয়াজিব হওয়ার শর্ত (شروط الوجوب) এবং ২. জুমার নামাজ সহিহ বা শুদ্ধভাবে আদায় হওয়ার শর্ত (شروط الصحة أو الأداء)। নিম্নে এ দুটি প্রকার বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. জুমার নামাজ ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ (شروط وجوب الجمعة):

যেসব গুণ বা শর্ত কোনো ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান থাকলে তার ওপর জুমার নামাজ আদায় করা ব্যক্তিগতভাবে ফরজ হয়, সেগুলো হলো:

  1. ইসলাম (الإسلام): অমুসলিমের ওপর সালাত ফরজ নয়।
  2. প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া (البلوغ والعقل): অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ও পাগলের ওপর জুমা ফরজ নয়।
  3. পুরুষ হওয়া (الذكورة): নারীদের ওপর জুমার সালাত ফরজ নয়; তবে তারা মসজিদে এসে জামাতে শরিক হলে তাদের জুমার সালাত সহিহ হবে এবং যোহরের সালাত আদায় করতে হবে না।
  4. স্বাধীন হওয়া (الحرية): প্রাচীন যুগে ক্রীতদাসের ওপর জুমা ফরজ ছিল না।
  5. সুস্থতা বা রোগমুক্ত থাকা (الصحة): এমন মারাত্মক অসুস্থ ব্যক্তি যার মসজিদে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব বা রোগ বৃদ্ধির তীব্র আশঙ্কা থাকে, তার ওপর জুমা ফরজ নয়। সে সাধারণ যোহর আদায় করবে।
  6. মুকিম হওয়া (الإقامة): শরিয়তের দৃষ্টিতে মুসাফিরের ওপর জুমা ফরজ নয়। তবে মুসাফির কোনো স্থানীয় জামাতে শরিক হলে তা জুমার সালাত হিসেবে গণ্য হবে।
  7. শারীরিক সক্ষমতা ও দৃষ্টিশক্তি থাকা: অন্ধ ও পঙ্গু ব্যক্তির ওপর জুমা ফরজ নয়, যদি না তাকে মসজিদে পৌঁছে দেওয়ার মতো কোনো বিশ্বস্ত সাহায্যকারী থাকে।
  8. চরম ভয়ভীতি বা প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগমুক্ত থাকা (السلامة من الأعذار): জালেমের ভয়, শত্রুর আক্রমণ বা অতিবৃষ্টি-বন্যার কারণে মসজিদে যেতে না পারলে জুমা মওকুফ হয়।

২. জুমার নামাজ সহিহভাবে আদায় হওয়ার শর্তসমূহ (شروط صحة الجمعة / شروط الأداء):

ব্যক্তির ওপর ফরজ হওয়া ছাড়াও কোনো স্থানে জুমার নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য সমাজ ও পরিবেশগত নিম্নোক্ত শর্তাবলি বিদ্যমান থাকা বাধ্যতামূলক:

  1. শহর বা শহরের শহরতলি হওয়া (المصر أو فناء المصر): হানাফি মাজহাবের শর্তানুযায়ী এমন জনপদ বা শহর হতে হবে যেখানে স্থায়ী বিচারক, শাসক, বাজার ও নিয়মিত জনবসতি বিদ্যমান। নির্জন মরুভূমিতে জুমা সহিহ নয়। (শাফেয়ী ও হাম্বলিদের মতে স্থায়ী ৪০ জন মুকিম পুরুষ থাকলে যেকোনো গ্রামেও জুমা সহিহ)।
  2. যোহরের সময় উপস্থিত হওয়া (الوقت): জুমার নামাজ যোহরের ওয়াক্তের মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে। যোহরের ওয়াক্ত চলে গেলে জুমা আদায় করা যাবে না, তখন যোহরের কাজা পড়তে হবে।
  3. খুতবা প্রদান করা (الخطبة): সালাতের পূর্বে দুটি খুতবা প্রদান করা জুমার সহিহ হওয়ার মৌলিক শর্ত। জামাতের উপস্থিতিতে ন্যূনতম আল্লাহর জিকির ও নসিহত সংবলিত খুতবা পেশ করতে হবে।
  4. জামাত বা নুন্যতম মুসল্লির উপস্থিতি (الجماعة): জুমার নামাজ একাকী আদায় করা যায় না। ইমাম ছাড়া হানাফি মাজহাবে ন্যূনতম ৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মুসল্লি (মোট ৪ জন) উপস্থিত থাকতে হবে।
  5. আম অনুমতি বা উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার (الإذن العام): জুমার মসজিদ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে। কোনো সরকারি বা ব্যক্তিগত ভবনে সাধারণ মুসলিমদের প্রবেশে বাধা দিয়ে গোপনে জুমার জামাত কায়েম করলে তা সহিহ হবে না।

৩. জুমার শর্তসমূহের সমন্বিত ছক:

শর্তের শ্রেণি প্রধান শর্তসমূহ ব্যতিক্রম / যাদের ওপর প্রযোজ্য নয়
ওয়াজিব হওয়ার শর্ত
(شروط الوجوب)
ইসলাম, বালেগ, আকেল, পুরুষ, মুকিম, সুস্থ ও স্বাভাবিক চলাচলে সক্ষম হওয়া। নারী, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু, মুসাফির, গুরুতর রোগী ও বন্দি।
আদায় সহিহ হওয়ার শর্ত
(شروط الصحة)
শহর বা উপযুক্ত জনপদ, যোহরের ওয়াক্ত, সালাতের পূর্বে খুতবা, জামাত ও ইযনে আম। খুতবা ছাড়া নামাজ শুদ্ধ নয়; ব্যক্তিগত স্থানে তালাবদ্ধ জুমা বাতিল।

উপসংহার: জুমার নামাজ সামাজিক সংহতি ও সামষ্টিক আনুগত্যের প্রতীক। উপরিউক্ত শর্তাবলি পূরণ সাপেক্ষেই জুমার নামাজ তার কাঙ্ক্ষিত আধ্যাত্মিক ও শাস্ত্রীয় মর্যাদা লাভ করে।


٦- أخبرنا الشافعي قال أخبرنا سفيان عن عمرو بن دينار عن جابر بن عبد الله (رض) قال، دخل رجل يوم الجمعة المسجد والنبي صلى الله عليه وسلم يخطب فقال له أصليت؟ قال لا، قال فصل ركعتين-

[৬. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

আমাদেরকে ইমাম আশ-শাফিয়ী (রহ.) সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন—আমাদেরকে সুফিয়ান ইবনে উয়ায়না সংবাদ দিয়েছেন, তিনি আমর ইবনে দিনার থেকে এবং তিনি প্রখ্যাত সাহাবি হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: জুমার দিনে জনৈক ব্যক্তি (সুলাইক আল-গাতফানী রা.) মসজিদে নববীতে প্রবেশ করল, তখন নবি করিম (সা.) খুতবা প্রদান করছিলেন। নবিজি (সা.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তুমি কি নামাজ পড়েছ?’ সে বলল: ‘না।’ তখন নবিজি (সা.) ইরশাদ করলেন: ‘তাহলে দাঁড়িয়ে সংক্ষেপে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নাও।’

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
يَخْطُبُ ইয়াখতুবু جملة فعلية في محل نصب حال من فاعل الفعل (قال) বা النبى। باب نصر। তিনি খুতবা দিচ্ছিলেন
أَصَلَّيْتَ؟ আসাল্লাইতা? الهمزة للاستفهام، والفعل ماض، باب تفعيل (ص-ل-و)، والتاء ضمير فاعل। তুমি কি নামাজ আদায় করেছ?
فَصَلِّ ফাসাল্লি الفاء جوابية، وفعل أمر مبني على حذف حرف العلة (الياء)، والفاعل (أنت)। অতএব তুমি নামাজ পড়ো
رَكْعَتَيْنِ রাক’আতাইনি مفعول به منصوب بالياء لأنه مثنى، والمراد تحية المسجد خفيفتين। দুই রাকাত (নামাজ)

(أ) هل تجب الركعتان قبل الجمعة؟ كم ركعة يصلى قبل الجمعة وبعدها؟

[জুমার পূর্বে দুই রাকাত পড়া কি ওয়াজিব? জুমার পূর্বে ও পরে কত রাকাত নামাজ আদায় করতে হয়?]

উত্তর:

ভূমিকা: জুমার দিন খুতবা চলাকালীন তাহিয়্যাতুল মসজিদ পাঠের হুকুম এবং জুমার পূর্বে ও পরে সুন্নাত নামাজের রাকাত সংখ্যা ফিকহশাস্ত্রের অন্যতম সুপরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ক্ষেত্র। ফুকাহায়ে কেরাম হাদিসসমূহের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। নিম্নে এ মাসআলাটির ফিকহি বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

১. খুতবার সময় তাহিয়্যাতুল মসজিদের দুই রাকাত কি ওয়াজিব?

হাদিস বিশারদ ও চার মাজহাবের কোনো ফকিহর মতেই খুতবা চলাকালীন এই দুই রাকাত পড়া ‘ওয়াজিব’ নয়। বরং এটি সুন্নাত বা মুস্তাহাব। তবে খুতবা চলাকালে তা পড়া যাবে কি না এ নিয়ে ফুকাহাদের মধ্যে দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:

  • ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ (রহ.)-এর মত: আলোচ্য হাদিসের ওপর ভিত্তি করে তাঁদের মতে—খুতবা চলাকালীন কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে তার জন্য সংক্ষেপে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ে নেওয়া সুন্নাতে মুস্তাহাব্বা। নবিজি (সা.) সুলাইক আল-গাতফানীকে খুতবা বন্ধ রেখে নামাজ পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
  • ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালেক (রহ.)-এর মত: ইমাম খুতবার জন্য বের হলে এবং খুতবা শুরু করলে কোনো নফল নামাজ পড়া বা কথা বলা জায়েজ নেই; বরং নীরব থেকে মনোযোগ সহকারে খুতবা শোনা ওয়াজিব। তাঁরা কুরআনের আয়াত (وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا—সূরা আল-আ’রাফ: ২০৪) এবং নবিজির সাধারণ নিষেধাজ্ঞা (إِذَا خَرَجَ الْإِمَامُ فَلَا صَلَاةَ وَلَا كَلَامَ—’ইমাম বের হলে কোনো নামাজ ও কথা নেই’)-এর ওপর ভিত্তি করেন। সুলাইক আল-গাতফানী (রা.) অত্যন্ত নিঃস্ব ও ক্ষুধার্ত ছিলেন বিধায় নবিজি তাঁর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে সাহাবিদের সাদকা করার সুযোগ তৈরির জন্য এটি একটি বিশেষ ক্ষেত্র হিসেবে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

২. জুমার পূর্বে ও পরে কত রাকাত সুন্নাত নামাজ পড়তে হয়?

জুমার পূর্বাপর সুন্নাত নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে ফিকহি মাযহাবসমূহের সুনির্দিষ্ট বিবরণ নিম্নে তুলে ধরা হলো:

  1. জুমার পূর্বের নামাজ (قبل الجمعة):
    হানাফি মাজহাবের মতে: জুমার ফরজ নামাজের পূর্বে ৪ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ রয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে প্রমাণিত: أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُصَلِّي قَبْلَ الْجُمُعَةِ أَرْبَعًا لَا يَفْصِلُ بَيْنَهُنَّ—’রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার পূর্বে এক সালামে চার রাকাত নামাজ আদায় করতেন।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ; আত-তাবারানী)।
    শাফেয়ী ও অন্যান্য ফুকাহাদের মতে: জুমার পূর্বে ২ রাকাত বা ৪ রাকাত সুন্নাতে গায়রে মুয়াক্কাদাহ অথবা সাধারণ নফল হিসেবে যত ইচ্ছা পড়া যায়।
  2. জুমার পরের নামাজ (بعد الجمعة):
    জুমার ফরজ সালাতের পরে সুন্নাত নামাজ পড়ার ব্যাপারে একাধিক সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে:
    – সহিহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمُ الْجُمُعَةَ فَلْيُصَلِّ بَعْدَهَا أَرْبَعًا—’তোমাদের কেউ যখন জুমার নামাজ আদায় করবে, তখন সে যেন তার পর চার রাকাত নামাজ পড়ে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৮১)।
    – আবার সহিহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার পর স্বীয় গৃহে গিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন (সহিহ বুখারী: ৯৩৭)।
    ফুকাহাদের সমন্বয়:
    * হানাফি মাজহাব: জুমার পর ৪ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ এবং তার পর ২ রাকাত সুন্নাতে জায়েদাহ—মোট ৬ রাকাত পড়া উত্তম। (ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-এর ফতোয়া অনুযায়ী)।
    * ইমাম শাফেয়ী ও আহমাদ: মসজিদে পড়লে চার রাকাত এবং ঘরে পড়লে দুই রাকাত পড়া উত্তম।

৩. জুমার পূর্বাপর সুন্নাত সালাতের সারসংক্ষেপ ছক:

সময় হানাফি মাযহাব শাফেয়ী ও হাম্বলি মাযহাব
জুমার পূর্বে ৪ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ (এক সালামে)। ২ বা ৪ রাকাত সুন্নাত বা নফল।
জুমার পরে ৪ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ + ২ রাকাত সুন্নাত (মোট ৬ রাকাত)। মসজিদে ৪ রাকাত অথবা ঘরে ২ রাকাত।

উপসংহার: জুমার পূর্বাপর সুন্নাত সালাতসমূহ ফরজের অসম্পূর্ণতা দূর করে এবং জুমার দিনের অফুরন্ত রহমত ও বরকত লাভের পথ সুগম করে।


مجموعة (ج) — مسند الإمام أحمد بن حنبل (রহ.)

[‘গ’ বিভাগ: মুসনাদুল ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) — পূর্ণমান: ১০ × ২ = ২০]
(ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها / হাদিসসমূহের অনুবাদ করো এবং তৎসংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও)

٧- حدثنا عبد الله قال حدثني أبي قال حدثنا محمد بن جعفر قال حدثنا شعبة عن يزيد بن خُمير عن سليم بن عامر عن أوسط قال، خطبنا أبو بكر فقال، قام رسول الله صلى الله عليه وسلم مقامي هذا عام الأول- وبكى أبو بكر، فقال أبو بكر، سلوا الله المعافاة أو قال العافية- فلم يؤت أحد قط بعد اليقين أفضل من العافية أو المعافاة- عليكم بالصدق فإنه مع البر وهما في الجنة وإياكم والكذب فإنه مع الفجور وهما في النار- ولا تحاسدوا ولا تباغضوا ولا تقاطعوا ولا تدابروا وكونوا إخوانا كما أمركم الله تعالى-

[৭. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

আমাদেরকে আব্দুল্লাহ (ইমাম আহমাদের সুযোগ্য পুত্র) বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন—আমাকে আমার পিতা (ইমাম আহমাদ) বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন—আমাদেরকে মুহাম্মদ ইবনে জাফর বর্ণনা করেছেন, তিনি শু’বাহ থেকে, তিনি ইয়াযিদ ইবনে খুমাইর থেকে, তিনি সুলাইম ইবনে আমের থেকে এবং তিনি আওসাত্ব (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) আমাদের সামনে খুতবা দিলেন এবং বললেন: ‘গত বছর রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার এই দাঁড়ানোর স্থানে দাঁড়িয়েছিলেন।’ একথা বলেই আবু বকর (রা.) কেঁদে ফেললেন। অতঃপর তিনি বললেন: ‘তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা ও নিরাপত্তা (আফিয়াত) প্রার্থনা করো; কেননা ঈমান ও একিনের পর সুস্থতা ও নিরাপত্তার চেয়ে উত্তম আর কোনো নেয়ামত কাউকে প্রদান করা হয়নি। তোমরা সত্যবাদিতা অবলম্বন করো; কেননা সত্যবাদিতা পুণ্যের সাথে থাকে এবং তারা উভয়ই জান্নাতে যাবে। আর তোমরা মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকো; কেননা মিথ্যা পাপাচারের সাথে থাকে এবং তারা উভয়ই জাহান্নামে যাবে। তোমরা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অপরের প্রতি শত্রুতা রেখো না, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করো না এবং একে অপরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না; বরং তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও, যেমনটি আল্লাহ তাআলা তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন।’

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
سَلُوا সালূ فعل أمر مبني على حذف النون، والواو فاعل، من باب فتح (س-أ-ل)। তোমরা প্রার্থনা করো / চাও
الْعَافِيَةَ আল-‘আফিয়াতা مفعول به منصوب بالفتحة، وهو السلامة من الأسقام والبلايا والفتن। নিরাপত্তা / সুস্থতা ও কল্যাণ
الْبِرِّ আল-বিররি اسم مجرور بـ (مع) بالكسرة، وهو اسم جامع لكل خصال الخير والتقوى। পুণ্য / সৎকর্মসমূহ
الْفُجُورِ আল-ফুজূরি اسم مجرور بالكسرة، وهو الانبعاث في المعاصي والفسق، ضد البر। পাপাচার / অবাধ্যতা
لَا تَحَاسَدُوا লা তাহাসাদূ (لا) ناهية، وفعل مضارع مجزوم بحذف النون، أصله (تتحاسدوا)، باب تفاعل। পরস্পর হিংসা করো না
لَا تَدَابَرُوا লা তাদাবারূ فعل مضارع مجزوم بلا الناهية، باب تفاعل (د-ب-ر)، بمعنى الإعراض والمقاطعة। একে অপরের পিঠ দেখিয়ো না (সম্পর্ক ত্যাগ)

(أ) بين مناقب أبي بكر الصديق رضي الله عنه-

[হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর ফজিলত ও সুমহান মর্যাদাসমূহ আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: নবি-রাসুলদের পর সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী হলেন আমিরুল মুমিনীন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতের আজীবন বিশ্বস্ত সহচর, হিজরতের সঙ্গী, গুহার সাথী এবং উম্মতে মুহাম্মাদীর প্রথম খলিফা। কুরআনুল কারিমের বহু আয়াত এবং সহিহ হাদিসের অসংখ্য বাণীতে তাঁর সুউচ্চ মর্যাদা ও অতুলনীয় গুণাবলি বিধৃত হয়েছে। নিম্নে তাঁর অনন্য মানাকিব ও মর্যাদাসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. পবিত্র কুরআনের আলোকে আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর মর্যাদা:

  1. ‘ছানিয়াস নাইন’ বা গুহার দ্বিতীয় সঙ্গী: হিজরতের চরম সংকটময় মুহূর্তে সাওর পর্বতের গুহায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একমাত্র সঙ্গী ছিলেন আবু বকর (রা.)। মহাগ্রন্থ কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا—’যদি তোমরা তাকে সাহায্য না করো, তবে জেনে রাখো, আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফেররা তাকে বহিষ্কার করেছিল; তিনি ছিলেন দুজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা দুজন গুহার মধ্যে ছিলেন; যখন তিনি স্বীয় সঙ্গীকে বলছিলেন—চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।’ (সূরা আত-তাওবাহ: ৪০)। এখানে স্বয়ং আল্লাহ আবু বকর (রা.)-কে নবিজির ‘সাহাবী’ (সঙ্গী) হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
  2. ‘আল-আতক্বা’ (সর্বাধিক খোদাভীরু) উপাধি: সূরা আল-লাইলে আল্লাহ তাআলা আবু বকর (রা.)-এর অনন্য আর্থিক কোরবানির প্রশংসা করে বলেন: وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى ۝ الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّىٰ—’আর অচিরেই তা থেকে দূরে রাখা হবে পরম খোদাভীরু ব্যক্তিকে, যে আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে স্বীয় ধনসম্পদ দান করে।’ (সূরা আল-লাইল: ১৭-১৮)। মুফাসসিরগণের সর্বসম্মত মতে এই আয়াত হযরত আবু বকর (রা.)-এর শানে অবতীর্ণ হয়েছে।
  3. সত্যকে সত্যায়নকারী ‘আস-সিদ্দিক’: وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ—’আর যিনি সত্য নিয়ে আগমন করেছেন (রাসুলুল্লাহ সা.) এবং যিনি তা সত্যায়ন করেছেন (আবু বকর রা.), তারাই তো মুত্তাকী।’ (সূরা আয-যুমার: ৩৩)।

২. হাদিস শরিফের আলোকে আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর অনন্য মর্যাদা:

  • ১. পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ: নবিজি (সা.) যখনই নবুওয়াতের দাওয়াত পেশ করেছেন, তখনই একমাত্র আবু বকর (রা.) কোনো ধরনের দ্বিধা বা ইতস্ততবোধ ছাড়াই সঙ্গে সঙ্গে ঈমান আনেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘আমি যাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি তার মধ্যে কিছুটা দ্বিধা ছিল, কিন্তু আবু বকরকে যখনই বলেছি সে সামান্যতম দ্বিধাহীন চিত্তে তা গ্রহণ করেছে।’
  • ২. মিরাজের ঘটনায় ‘সিদ্দিক’ উপাধি লাভ: নবিজি যখন মিরাজের অলৌকিক ঘটনা ঘোষণা করলেন, কাফেররা উপহাস করতে লাগল। আবু বকর (রা.) শোনা মাত্রই বললেন: ‘তিনি যদি বলে থাকেন তবে তা সম্পূর্ণ সত্য।’ এই অটল বিশ্বাসের কারণে নবিজি তাঁকে ‘আস-সিদ্দিক’ (মহাসত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত করেন।
  • ৩. নবিজির পর মানবজাতির শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন: كُنَّا نُخَيِّرُ بَيْنَ النَّاسِ فِي زَمَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَنُخَيِّرُ أَبَا بَكْرٍ، ثُمَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ، ثُمَّ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانَ—’আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই সাহাবিদের মধ্যে তুলনা করতাম এবং সর্বসম্মতিক্রমে আবু বকরকে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ গণ্য করতাম, তারপর উমরকে, তারপর উসমানকে।’ (সহিহ বুখারী, হাদিস: ৩৬৫৫)।
  • ৪. জান্নাতের সকল দরজা দিয়ে আহ্বানের মর্যাদা: সহিহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে—রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন: ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে দুটি জিনিস দান করবে, তাকে জান্নাতের দরজাগুলো থেকে আহ্বান করা হবে।’ আবু বকর (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন: ‘হে আল্লাহর রাসুল! এমন কেউ কি আছে যাকে জান্নাতের সকল দরজা থেকে ডাকা হবে?’ নবিজি বললেন: ‘হ্যাঁ, এবং আমি আশা করি তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সহিহ বুখারী: ১৮৯৭)।
  • ৫. তাবুক যুদ্ধে সর্বস্ব দান: তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতিতে হযরত উমর (রা.) স্বীয় সম্পদের অর্ধেক নিয়ে এলেন। কিন্তু আবু বকর (রা.) ঘরের যাবতীয় সম্পদ হাজির করলেন। নবিজি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘পরিবারের জন্য কী রেখে এলে?’ তিনি বললেন: ‘তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রেখে এসেছি।’
  • ৬. সালাতের ইমামতির মাধ্যমে খেলাফতের স্পষ্ট ইঙ্গিত: রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বীয় অন্তিম অসুস্থতার সময় সাহাবিদের ইমামতির জন্য একমাত্র আবু বকর (রা.)-কে নির্দেশ দেন: مُرُوا أَبَا بَكْرٍ فَلْيُصَلِّ بِالنَّاسِ—’তোমরা আবু বকরকে বলো, সে যেন মানুষের সালাতে ইমামতি করে।’ (সহিহ বুখারী: ৬৮৩)। সাহাবায়ে কেরাম বলেছিলেন: ‘নবিজি যাকে আমাদের দ্বীনের জন্য পছন্দ করেছেন, আমরা কেন আমাদের দুনিয়ার (খেলাফতের) জন্য তাকে পছন্দ করব না?’

৩. আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর অনন্য বৈশিষ্ট্যের সারসংক্ষেপ ছক:

ক্ষেত্র অতুলনীয় ফজিলত ও মর্যাদা
ইসলাম গ্রহণ প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীন পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী।
কুরআনি স্বীকৃতি ‘গুহার দ্বিতীয়জন’ (ثاني اثنين) এবং ‘সর্বাধিক মুত্তাকী’ (الأتقی) হিসেবে কুরআনে বর্ণিত।
নবিজির অন্তিম ভালোবাসা রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছিলেন: ‘যদি আমি কাউকে খলিল (পরম বন্ধু) বানাতাম তবে আবু বকরকে বানাতাম।’
উম্মাহর নেতৃত্ব নবিজির নির্দেশে জীবদ্দশাতেই মসজিদে নববীতে ১৭ ওয়াক্ত সালাতের একক ইমামতি।

উপসংহার: হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ছিলেন সততা, আত্মত্যাগ, ঈমানি অবিচলতা ও সুন্নাহর অনুসরণের জীবন্ত প্রতীক, যাঁকে ভালোবাসাই ঈমানের লক্ষণ এবং যাঁর মর্যাদা মুসলিম উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ।


٨- حدثنا عبد الله قال حدثني أبي، حدثنا محمد بن ميسر أبو سعد الصاغاني المكفوف حدثنا هشام بن عروة عن أبيه عن عائشة قالت، إن أبا بكر لما حضرته الوفاة قال: أي يوم هذا، قالوا يوم الأثنين- قال، فإن مِتُّ من ليلتي فلا تنتظروا بي الغد- فإن أحب الأيام والليالي إلىّ أقربها من رسول الله صلى الله عليه وسلم-

[৮. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

আমাদেরকে আব্দুল্লাহ (রহ.) বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন—আমাকে আমার পিতা (ইমাম আহমাদ রহ.) বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন—আমাদেরকে মুহাম্মদ ইবনে মুয়াসসার আবু সা’দ আস-সাগানী আল-মাকফূফ বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন—আমাদেরকে হিশাম ইবনে উরওয়াহ স্বীয় পিতা (উরওয়াহ ইবনুয যুবাইর) থেকে এবং তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: নিশ্চয়ই আবু বকর (রা.)-এর যখন অন্তিম সময় (ওফাতের মুহূর্ত) ঘনিয়ে এল, তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘আজ কোন্ দিন?’ উপস্থিত লোকেরা বলল: ‘আজ সোমবার।’ তিনি বললেন: ‘আমি যদি আজকের এই রাত্রেই মৃত্যুবরণ করি, তবে (আমার দাফনের জন্য) তোমরা আগামীকালের অপেক্ষা করবে না। কেননা দিন ও রাতের মধ্যে আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্যের সবচেয়ে নিকটবর্তী সময়টি।’

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
حَضَرَتْهُ হাদারাতহু فعل ماض، والتاء للتأنيث، والهاء مفعول به مقدم، و(الوفاة) فاعل مؤخر। তাঁর নিকট উপস্থিত হলো / ঘনিয়ে এল
الْوَفَاةُ আল-ওয়াফাতু فاعل مؤخر مرفوع بالضمة، وهو الموت وانتقال الروح إلى باريها। মৃত্যু / ইন্তেকাল
مِتُّ মিততু فعل ماض مبني على السكون لاتصاله بضمير الرفع المتحرك (التاء)، باب نصر (م-و-ت)। আমি যদি মৃত্যুবরণ করি
لَا تَنْتَظِرُوا লা তানতাযিরূ (لا) ناهية جازمة، والفعل مضارع مجزوم بحذف النون، والواو فاعل، باب افتعال। তোমরা অপেক্ষা করো না
أَقْرَبُهَا আক্বরাবুহা اسم تفضيل، خبر المبتدأ (أحب) مرفوع بالضمة، والهاء مضاف إليه। তার মধ্যে সর্বাধিক নিকটবর্তী

(أ) اكتب خدمات أبي بكر رضي الله عنه للإسلام بعد أن تولى الخلافة-

[খেলাফত লাভের পর ইসলামের জন্য হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর ঐতিহাসিক খিদমতসমূহ আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাত ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্ত। নবিজির বিয়োগব্যথায় মদিনার সাহাবিগণ যখন স্তব্ধ ও শোকাতুর, ঠিক তখনই গোটা আরব উপদ্বীপে রিদ্দার (স্বধর্মত্যাগ) মহাতাণ্ডব, ভন্ড নবিদের বিদ্রোহ এবং যাকাত অস্বীকারের মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় উম্মতের প্রথম খলিফা হিসেবে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) যে অভূতপূর্ব হিম্মত, প্রজ্ঞা ও ঈমানি দৃঢ়তা প্রদর্শন করে ইসলামকে রক্ষা করেছিলেন, তার ফলেই দ্বীন ইসলাম চিরদিনের জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। নিম্নে খেলাফত পরবর্তীকালে তাঁর ঐতিহাসিক খিদমতসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. উসামা ইবনে যায়েদ (রা.)-এর বাহিনী প্রেরণ (إنفاذ جيش أسامة):

রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুর পূর্বে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য হযরত উসামা (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি সেনাদল প্রস্তুত করেছিলেন। নবিজির ওফাতের পর আরবের চতুর্দিকে বিদ্রোহ দেখে বিশিষ্ট সাহাবিগণ মদিনার নিরাপত্তার স্বার্থে এই অভিযান স্থগিত করার পরামর্শ দেন। কিন্তু আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন: وَاللَّهِ لَا أَحُلُّ عُقْدَةً عَقَدَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلَوْ أَنَّ الطَّيْرَ تَخَطَّفَتْنَا، وَالسِّبَاعَ مِنْ حَوْلِ الْمَدِينَةِ—’আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ (সা.) যে পতাকা বেঁধেছেন আমি তা খুলব না; এমনকি যদি পাখি এসে আমাদের ছিনিয়ে নিয়ে যায় এবং হিংস্র পশু মদিনার চারপাশে ঘিরে ফেলে তবুও উসামার বাহিনী রওনা হবে।’ এই সিদ্ধান্তের ফলে রোমান ও আরব গোত্রগুলো মনে করল মুসলমানদের শক্তি এখনো অটুট রয়েছে এবং এতে মদিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

২. মুরতাদ ও ভন্ড নবিদের মূলোৎপাটন (حروب الردة):

নবিজির ইন্তেকালের পর মুসায়লিমা কাযযাব, আসওয়াদ আনসী, তুলায়হা ইবনে খুওয়াইলিদ এবং সাজাহ নামক ভন্ড নবিরা বিপুল অনুসারী নিয়ে নবুওয়াতের মিথ্যা দাবি তোলে। আবু বকর (রা.) আরবের ১১টি অঞ্চলে ১১টি সুসজ্জিত সেনাদল প্রেরণ করেন (যার প্রধান সেনাপতি ছিলেন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.)। ইয়ামামার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুসায়লিমা কাযযাব নিহত হয় এবং আরবের জমিন থেকে ভন্ড নবি ও মুরতাদদের মূলোৎপাটন করে তাওহিদের ঝাণ্ডা সমুন্নত করা হয়।

৩. যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে আপসহীন জিহাদ (قتال مانعي الزكاة):

কিছু আরব গোত্র নামাজ পড়তে রাজি হলেও নবগঠিত ইসলামি খেলাফতকে যাকাত দিতে অস্বীকার করে। এমনকি কিছু সাহাবি প্রাথমিক অবস্থায় রক্তপাত এড়াতে তাদের বিষয়ে কিছুটা নমনীয় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন: وَاللَّهِ لَأُقَاتِلَنَّ مَنْ فَرَّقَ بَيْنَ الصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ، فَإِنَّ الزَّكَاةَ حَقُّ الْمَالِ، وَاللَّهِ لَوْ مَنَعُونِي عِقَالًا كَانُوا يُؤَدُّونَهُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ لَقَاتَلْتُهُمْ عَلَى مَنْعِهِ—’আল্লাহর কসম! যে ব্যক্তি সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে আমি তার বিরুদ্ধে অবশ্যই যুদ্ধ করব। কারণ যাকাত হলো সম্পদের হক। আল্লাহর কসম! তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে যে উটের রশিটি দিত, তা দিতেও যদি অস্বীকার করে তবে আমি তাদের বিরুদ্ধে তলোয়ার ধরব।’ তাঁর এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে শরিয়তের একটি ফরজ বিধান বিলুপ্তির হাত থেকে চিরতরে রক্ষা পায়।

৪. পবিত্র কুরআন সংকলন ও সংরক্ষণ (جمع القرآن الكريم):

ইয়ামামার যুদ্ধে প্রায় সত্তরজন বিশিষ্ট হাফেজে সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন। এতে হযরত উমর (রা.) কুরআন বিলুপ্তির আশঙ্কায় তা গ্রন্থাকারে সংকলনের প্রস্তাব দেন। আবু বকর (রা.) প্রথমে বলেছিলেন: ‘রাসুলুল্লাহ যা করেননি আমি তা কীভাবে করব?’ কিন্তু উমর (রা.) এর কল্যাণ বুঝিয়ে দিলে আল্লাহ আবু বকর (রা.)-এর বক্ষ উন্মুক্ত করে দেন। তিনি কাতিবে ওহী হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে প্রধান করে কঠোর অনুসন্ধানের মাধ্যমে পাতা, চামড়া ও সাহাবিদের সিনায় সংরক্ষিত কুরআনের আয়াতসমূহ যাচাই-বাছাই করে সর্বপ্রথম একটি বাঁধাইকৃত মুসহাফে (মুসহাফে সিদ্দিকী) পূর্ণাঙ্গ কুরআন একত্র করেন, যা উম্মাহর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ।

৫. আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান ও ইসলামি সাম্রাজ্যের সূচনা (الفتوحات الإسلامية):

অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনের পর আবু বকর (রা.) ইসলামের দাওয়াতকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে তৎকালীন দুই পরাশক্তি পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্য এবং রোমের বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দিকে অভিযান প্রেরণ করেন। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ ও মুসান্না ইবনে হারিসার নেতৃত্বে ইরাক বিজয় এবং আবু উবায়দাহ ও শুরাহবিল ইবনে হাসানার নেতৃত্বে শাম (সিরিয়া) বিজয়ের সূচনা হয়। তাঁর সংক্ষিপ্ত দুই বছর তিন মাসের খেলাফতকালেই ইসলাম একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত হয়।

৬. আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর ঐতিহাসিক অবদানের সারসংক্ষেপ ছক:

খিদমতের ক্ষেত্র প্রধান কার্যক্রম ঐতিহাসিক ফলাফল
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা উসামা বাহিনী প্রেরণ ও রিদ্দার বিদ্রোহ দমন। মদিনার সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ভন্ড নবিদের বিনাশ।
শরয়ি বিধান রক্ষা যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান। ইসলামের মৌলিক ফরজ স্তম্ভের চিরস্থায়ী সুরক্ষা।
কিতাবুল্লাহর সুরক্ষা যায়েদ বিন সাবিতের মাধ্যমে প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুসহাফ সংকলন। কুরআনুল কারিমের প্রামাণিক লিখিত রূপ সংরক্ষণ।
বৈশ্বিক বিস্তৃতি ইরাক ও সিরিয়া জয়ের মাধ্যমে পরাশক্তি রোম-পারস্যের ওপর বিজয় সূচনা। বিশ্বমঞ্চে ইসলামি খেলাফতের দিগ্বিজয়ী প্রতিষ্ঠা।

উপসংহার: প্রখ্যাত আলেমগণ যথার্থই বলেছেন: ‘আল্লাহ তাআলা ইসলামকে দুজন ব্যক্তির মাধ্যমে রক্ষা করেছেন—রিদ্দার যুদ্ধের দিনে আবু বকর (রা.)-এর মাধ্যমে এবং খালকে কুরআনের ফিতনার দিনে আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মাধ্যমে।’ আবু বকর (রা.)-এর অনন্য খিদমতের ফলেই ইসলাম নবজীবন লাভ করেছিল।


٩- حدثنا عبد الله، حدثني أبي، حدثنا قتيبة بن سعيد حدثنا أبي لهيعة عن أبي النضر عن أبي سلمة عن ابن عمر (رض) أنه قال: رأيت سعد بن أبي وقاص يمسح على خفيه بالعراق حين يتوضأ فأنكرتُ ذلك عليه- قال فلما اجتمعنا عند عمر بن الخطاب قال لي سل أباك عما أنكرت على من مسح الخفين- قال: فذكرت ذلك له، فقال: إذا حدثك سعد بشيء فلا ترد عليه فإن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يمسح على الخفين-

[৯. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

আমাদেরকে আব্দুল্লাহ (রহ.) বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন—আমাকে আমার পিতা (ইমাম আহমাদ রহ.) বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন—আমাদেরকে কুতায়বা ইবনে সাঈদ বর্ণনা করেছেন, তিনি ইবনে লাহিয়াহ থেকে, তিনি আবুল নাজর থেকে, তিনি আবু সালামা থেকে এবং তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: ‘আমি ইরাকে ওজু করার সময় হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-কে তাঁর উভয় মোযাহর (খুফফাইন) ওপর মাসেহ করতে দেখলাম। ফলে আমি তাঁর এই আমলের ওপর আপত্তি জানালাম (কেননা আমি ভেবেছিলাম ওজুতে পা ধৌত করাই আবশ্যক)। সা’দ (রা.) বললেন: আমরা যখন (মদিনায়) হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কাছে একত্র হলাম, তখন তিনি আমাকে বললেন—মোযাহর ওপর মাসেহ করার ব্যাপারে তুমি যার ওপর আপত্তি করেছিলে, সে সম্পর্কে তোমার পিতাকেই জিজ্ঞাসা করো। ইবনে উমর বলেন: অতঃপর আমি বিষয়টি আমার পিতার নিকট উল্লেখ করলাম। তখন উমর (রা.) বললেন: যখন সা’দ তোমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে কোনো হাদিস বর্ণনা করে, তখন তুমি তার কথার ওপর কোনো প্রতিবাদ করবে না; কেননা নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং তাঁর মোযাহদ্বয়ের ওপর মাসেহ করতেন।’

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
يَمْسَحُ ইয়ামসাহু فعل مضارع مرفوع، والفاعل ضمير مستتر (هو)، باب فتح (م-س-ح)। সে মাসেহ করছিল / হাত বুলিয়ে নিচ্ছিল
خُفَّيْهِ খুফফাইহি تثنية (خُفّ)، مفعول به مجرور بـ (على) بالياء، وحذفت النون للإضافة، والهاء مضاف إليه। চামড়ার মোজা। তাঁর উভয় মোযাহর ওপর
فَأَنْكَرْتُ ফা-আনকারতু الفاء عاطفة، وفعل ماض مبني على السكون، والتاء فاعل، باب إفعال (ن-ك-ر)। অতঃপর আমি আপত্তি প্রকাশ করলাম
سَلْ সাল فعل أمر مبني على السكون، حذفت همزته للتخفيف، والفاعل مستتر (أنت)। باب فتح। তুমি জিজ্ঞাসা করো
فَلَا تَرُدَّ ফালা তারুদ্দা (لا) ناهية جازمة، والفعل مضارع مجزوم وحرك بالفتح للتخفيف لأنه مضعف (ر-د-د)। অতএব তুমি প্রত্যাখ্যান বা প্রতিবাদ কোরো না

(أ) بين حكم المسح على الخفين مع مدته-

[মোযাহর ওপর মাসেহ করার শরয়ি বিধান এবং এর সময়সীমা বিস্তারিত আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: ইসলাম একটি সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। ওজু করার ক্ষেত্রে সাধারণ অবস্থায় পা ধৌত করা ফরজ হলেও মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের কষ্ট লাঘবে শরিয়ত চামড়ার তৈরি মোযাহর (খুফফাইন) ওপর মাসেহ করার বিশেষ অনুমতি (রুখসত) প্রদান করেছে। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন ও চার মাজহাবের ইমামগণের সর্বসম্মতিক্রমে মোযাহর ওপর মাসেহ করা সুন্নাত ও মুতাওয়াতীর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। নিম্নে এর হুকুম, সময়সীমা ও সংশ্লিষ্ট শর্তাবলি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. মোযাহর ওপর মাসেহ করার শরয়ি হুকুম:

  • সুন্নাতে মুতাওয়াতিরাহ ও রুখসত: জমহুর আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মতে পবিত্র অবস্থায় পরিহিত মোযাহর ওপর ওজুর সময় পা ধোয়ার পরিবর্তে মাসেহ করা একটি শরিয়তসম্মত বৈধ বিধান (রুখসত)। ইমাম হাসান বসরী (রহ.) বলেন: ‘আমি সত্তরজন বদরী সাহাবির সাথে সাক্ষাৎ করেছি, তাঁরা প্রত্যেকেই মোযাহর ওপর মাসেহ করাকে বৈধ মনে করতেন।’
  • আকিদার অন্তর্ভুক্ত বিষয়: শিয়া ও কিছু বিপথগামী সম্প্রদায় মোযাহর ওপর মাসেহকে অস্বীকার করে। এ কারণে ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আহমাদ ও সালাফে সালেহীন মোযাহর ওপর মাসেহতে বিশ্বাস করাকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদার অংশ হিসেবে গণ্য করেছেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: مَا قُلْتُ بِالْمَسْحِ حَتَّى جَاءَنِي فِيهِ مِثْلُ ضَوْءِ النَّهَارِ—’মোযাহর ওপর মাসেহের ব্যাপারে দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট দলিল না আসা পর্যন্ত আমি এর পক্ষে মত দিইনি।’

২. মোযাহর ওপর মাসেহের সময়সীমা (مدة المسح):

হযরত আলী (রা.), শুরাইহ ইবনে হানি এবং সফওয়ান ইবনে আসসাল (রা.) বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদিস অনুযায়ী মাসেহের নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারিত রয়েছে:

  1. মুকিম ব্যক্তির জন্য (للمقيم): যিনি নিজ এলাকায় অবস্থান করছেন, তিনি মোযাহ পরার পর একবার ওজু ভঙ্গ হলে সেই সময় থেকে পরবর্তী এক দিন এক রাত অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত মোযাহর ওপর মাসেহ করতে পারবেন।
  2. মুসাফির ব্যক্তির জন্য (للمسافر): শরিয়তের দৃষ্টিতে সফরকারী ব্যক্তি ওজু ভঙ্গের সময় থেকে পরবর্তী তিন দিন তিন রাত অর্থাৎ ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত মোযাহর ওপর মাসেহ করতে পারবেন।
  3. হাদিসের দলিল: হযরত আলী (রা.) বলেন: جَعَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَلَيَالِيَهُنَّ لِلْمُسَافِرِ، وَيَوْمًا وَلَيْلَةً لِلْمُقِيمِ، يَعْنِي فِي الْمَسْحِ عَلَى الْخُفَّيْنِ—’রাসুলুল্লাহ (সা.) মোযাহর ওপর মাসেহের জন্য মুসাফিরের জন্য তিন দিন তিন রাত এবং মুকিমের জন্য এক দিন এক রাত নির্ধারণ করে দিয়েছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৬)।

৩. মোযাহর ওপর মাসেহ শুদ্ধ হওয়ার আবশ্যকীয় শর্তাবলি:

  • ১. পূর্ণাঙ্গ পবিত্র অবস্থায় (ওজু বা গোসল সম্পন্ন করে পা ধোয়ার পর) মোযাহ পরিধান করতে হবে।
  • ২. মোযাহ এমন চামড়া বা উপাদানের হতে হবে যা পায়ের গোড়ালি বা টাখনুসহ পূর্ণ ঢেকে রাখে।
  • ৩. মোযাহ এমন পুরু ও টেকসই হতে হবে যাতে তা পরে অন্তত এক ফারসাখ (প্রায় ৩ মাইল) হাঁটা যায় এবং তা ফেটে বা ছিঁড়ে না যায়।
  • ৪. মোযাহটি পায়ে কোনো ফিতা দিয়ে শক্তভাবে বাঁধা ছাড়াই নিজে নিজে দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্ত হতে হবে এবং তা পানি প্রতিরোধক হতে হবে।
  • ৫. মোযাহতে বড় ধরনের কোনো ছিদ্র থাকা চলবে না (হানাফি মাজহাবের মতে পায়ের ক্ষুদ্র ৩টি আঙুলের পরিমাণ উন্মুক্ত থাকলে মাসেহ জায়েজ হবে না)।
  • ৬. মাসেহ শুধুমাত্র ছোট নাপাকি (ওজু ভঙ্গ) অবস্থায় প্রযোজ্য; কিন্তু গোসল ফরজ হলে (বড় নাপাকিতে) মোযাহ খুলে পূর্ণ শরীর ধৌত করা ফরজ।

৪. মাসেহ ভঙ্গের কারণসমূহ (নওয়াকিদুল মাসহ):

  1. সাধারণ যেসব কারণে ওজু ভঙ্গ হয়, সেসব কারণে মাসেহও ভঙ্গ হয়।
  2. মাসেহের নির্ধারিত মেয়াদ (মুকিমের ২৪ ঘণ্টা ও মুসাফিরের ৭২ ঘণ্টা) সমাপ্ত হওয়া।
  3. মোযাহ পা থেকে খুলে ফেলা বা খুলে যাওয়া।
  4. গোসল ফরজ হওয়া।

৫. মোযাহর ওপর মাসেহের বিধানাবলির সারসংক্ষেপ ছক:

অবস্থা সময়সীমা শুরু হওয়ার সময় গণনা
মুকিম (স্থানীয় ব্যক্তি) ১ দিন ১ রাত (২৪ ঘণ্টা) পবিত্র অবস্থায় মোজা পরার পর প্রথম ওজু ভঙ্গের মুহূর্ত থেকে।
মুসাফির (সফরকারী) ৩ দিন ৩ রাত (৭২ ঘণ্টা) পবিত্র অবস্থায় মোজা পরার পর প্রথম ওজু ভঙ্গের মুহূর্ত থেকে।

উপসংহার: মোযাহর ওপর মাসেহ করা সুন্নাহর এক প্রামাণ্য বরকত ও সহজ বিধান, যা মুসলিম জীবনে কষ্ট লাঘব করে শরিয়তের সৌন্দর্যকে প্রস্ফুটিত করে।


مجموعة (د) — حياة الأئمة وخدماتهم في الحديث

[‘ঘ’ বিভাগ: ইমামগণের জীবনী ও হাদিসশাস্ত্রে অবদান — পূর্ণমান: ১০ × ২ = ২০]
(রচনামূলক প্রশ্ন – যে কোনো ২টি প্রশ্নের উত্তর দাও)

١٠- اكتب نبذة من حياة الإمام أبي حنيفة رحمه الله ثم بين خدماته في علم الحديث-

[১০. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ এবং হাদিসশাস্ত্রে তাঁর অবদান আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে ইমামুল আযম আবু হানিফা নোমান ইবনে সাবিত আল-কুফী (রহ.) এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। তিনি ছিলেন চার মাজহাবের প্রথম ও সর্বজ্যেষ্ঠ ইমাম এবং তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত তাবেয়ি। পরবর্তী যুগে কিছু অজ্ঞ ব্যক্তি তাঁর ওপর কেবল ‘রায়’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক কিয়াসের অপবাদ আরোপ করতে চাইলেও নিরপেক্ষ ইতিহাস ও হাদিস বিশারদদের গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন হাদিস শাস্ত্রের এক প্রবাদপ্রতিম হাফেজ ও সংকলক। নিম্নে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং উলুমুল হাদিসে তাঁর অবিস্মরণীয় খিদমত আলোচনা করা হলো।

১. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:

  • নাম, উপনাম ও বংশ পরিচয়: তাঁর নাম নোমান, উপনাম আবু হানিফা এবং লকব ‘ইমামুল আযম’ (সর্বশ্রেষ্ঠ ইমাম)। পিতার নাম সাবিত। পূর্ণ নসবনামা: নোমান ইবনে সাবিত ইবনে যুতা আল-কুফী। তিনি মূলত পারস্যের এক সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত ছিলেন।
  • জন্ম ও তাবেয়িয়্যাতের মর্যাদা: তিনি হিজরি ৮০ সনে (উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিকের শাসনামলে) তৎকালীন জ্ঞানকেন্দ্র ইরাকের কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে তিনি একজন ‘তাবেয়ি’ ছিলেন। তিনি সাহাবি হযরত আনাস ইবনে মালিক, আব্দুল্লাহ ইবনে আবি আওফা ও সাহল ইবনে সা’দ (রা.)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন এবং তাঁদের থেকে হাদিস বর্ণনা করেছিলেন।
  • জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষকবৃন্দ: শৈশবে রেশম কাপড়ের সফল ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি তিনি জ্ঞানার্জনে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর কুফার প্রধান ফকিহ ও মুহাদ্দিস হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমানের সান্নিধ্যে থেকে ইলম অর্জন করেন। এ ছাড়া তিনি আতা ইবনে আবি রাবাহ, ইকরিমা, নাফে’ মাওলা ইবনে উমর, ইমাম বাকির এবং ইমাম জাফর আস-সাদিকের নিকট থেকে হাদিস শ্রবণ করেন। তিনি জীবনের প্রায় ৫৫ বার হজ পালন করে মক্কা ও মদিনার মুহাদ্দিসদের সান্নিধ্য লাভ করেন।
  • উল্লেখযোগ্য ছাত্রবৃন্দ: ইমাম আবু হানিফার দরসে সে যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমগণ সমবেত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন—কাজী আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী, ইমাম যুফার, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ওয়াকী ইবনুল জাররাহ এবং ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান।
  • নৈতিকতা ও আপসহীনতা: তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরহেযগার, রাতের তাহাজ্জুদগুজার এবং দানশীল। খলিফা মনসুর তাঁকে প্রধান বিচারপতির (কাযিউল কুযাত) পদ গ্রহণের চাপ দিলে তিনি শরিয়তের সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলে তাঁকে কারারুদ্ধ ও বিষ প্রয়োগ করা হয়।
  • ওফাত: হিজরি ১৫০ সনে ৭০ বছর বয়সে এই মহান ইমাম বাগদাদে শাহাদাত বরণ করেন। জানাজায় এত বিপুল মানুষের সমাবেশ ঘটেছিল যে, পরপর ছয়বার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

২. হাদিসশাস্ত্রে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর অনন্য খিদমত ও অবদান:

হাদিস সংরক্ষণ, যাচাই ও ফিকহি প্রয়োগে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন:

  1. মুহাদ্দিসদের স্বীকৃতি: তৎকালীন শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদগণ ইমাম আবু হানিফার হাদিস বিষয়ক গভীর জ্ঞানের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। ইমাম মাক্কী ইবনে ইব্রাহিম (যিনি ইমাম বুখারীর প্রধান উস্তাদ) বলেন: ‘আবু হানিফা তাঁর যুগের সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন।’ ইমাম শু’বা ইবনুল হাজ্জাজ বলেন: ‘আবু হানিফা হাদিস বোঝার ক্ষেত্রে এক অনন্য পর্বত ছিলেন।’ হাফেজ আয-যাহাবী তাঁর ‘তাযকিরাতুল হুফফাজ’-এ ইমাম আবু হানিফাকে প্রথম সারির হাফেজে হাদিস হিসেবে গণ্য করেছেন।
  2. হাদিস গ্রহণে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও কঠোর শর্ত: তিনি ইরাকে অবস্থান করার কারণে (যেখানে শিয়া ও বিভিন্ন বাতিল ফিরকার হাদিস জালকরণের প্রবণতা ছিল) হাদিস গ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিলেন। তিনি কেবল সেসকল হাদিসই গ্রহণ করতেন যা রাবী শোনার মুহূর্ত থেকে বর্ণনা পর্যন্ত হুবহু স্মরণে রেখেছেন এবং যা কুরআনের সুস্পষ্ট মূলনীতি বা সুন্নাহে মাশহুরার বিপরীত নয়।
  3. ফিকহের মাধ্যমে সুন্নাহর প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগ: তিনি ৪০ জন শীর্ষস্থানীয় আলেম ও মুহাদ্দিস সমন্বয়ে গঠিত একটি একাডেমিক বোর্ড (মজলিসে শুরা)-এর মাধ্যমে প্রায় তিরাশি হাজার মাসআলা সমাধান করেছিলেন। প্রতিটি মাসআলার সমাধানে তিনি কুরআনের পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস ও সাহাবিদের আসারকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
  4. মুসনাদে আবি হানিফা (مسند أبي حنيفة) সংকলন: ইমাম আবু হানিফা স্বীয় সংকলিত হাদিসগুলো দ্বারা দরস দিতেন। পরবর্তীকালে তাঁর সুযোগ্য ছাত্রগণ সেই হাদিসসমূহকে বিভিন্ন সংস্করণে গ্রন্থবদ্ধ করেন। যেমন: ইমাম মুহাম্মদ সংকলিত ‘কিতাবুল আসার’, ইমাম আবু ইউসুফের ‘কিতাবুল আসার’ এবং পরবর্তীতে হাফেজ আবুল কাসিম আত-তালহাকী ও খাওয়ারেযমী ১৭টি তুরুক থেকে ‘জামি’উ মাসানিদে আবি হানিফা’ সংকলন করেন।
  5. উচ্চ সনদের মর্যাদা: তাবেয়ি হওয়ার কারণে ইমাম আবু হানিফার হাদিসের সনদ ছিল অত্যন্ত উঁচু মানের (আলীউস সানাদ)। তাঁর সূত্রে বর্ণিত বহু ‘সুলাসিয়াত’ (নবিজি ও ইমামের মাঝে মাত্র ৩ জন রাবী) হাদিস হাদিস ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

৩. হাদিসশাস্ত্রে ইমাম আবু হানিফার খিদমতের সারসংক্ষেপ ছক:

অবদানের ক্ষেত্র ইমাম আবু হানিফার কার্যক্রম ঐতিহাসিক ফলাফল
হাদিস যাচাই ও শর্ত জাল হাদিসের অনুপ্রবেশ রোধে কঠোর দ্বাবত ও মুতাওয়াতির নীতি নির্ধারণ। বিশুদ্ধ সুন্নাহর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।
মুসনাদ সংকলন স্বীয় দরসে হাদিসের রিওয়ায়াত ও ‘কিতাবুল আসার’ প্রণয়ন। ‘মুসনাদে আবি হানিফা’র বিশ্বজোড়া বিস্তৃতি।
ফিকহুস সুন্নাহ হাদিসের মূল মতন ও মর্মার্থ উদ্ঘাটনে শুরাভিত্তিক ইজতিহাদ। ইসলামি আইনের সর্ববৃহৎ ফিকহি কাঠামো বিনির্মাণ।

উপসংহার: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কেবল যুক্তিবাদী ফকিহ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সুন্নাহর এক মহান ধারক ও হাদিসের শীর্ষস্থানীয় ইমাম।


١١- من هو الإمام الشافعي (رح)؟ اكتب مزايا مسنده ومكانته بين كتب الحديث-

[১১. ইমাম শাফেয়ী (রহ.) কে? তাঁর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যাবলি এবং হাদিসগ্রন্থসমূহের মাঝে এর মর্যাদা আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: ইসলামি ফিকহ ও উসুলুল হাদিসের ইতিহাসে ‘নাসিরুস সুন্নাহ’ (সুন্নাহর সাহায্যকারী) উপাধিতে ভূষিত মহান ব্যক্তিত্ব হলেন ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী (রহ.)। তিনি ছিলেন হিজাজের ‘আহলে হাদিস’ এবং ইরাকের ‘আহলে রায়’-এর মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় সাধনকারী ইমাম। উলুমুল হাদিসের মূলনীতি প্রণয়ন এবং হাদিসের প্রামাণিকতা সুরক্ষায় তিনি যে বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছেন তা চিরভাস্বর। তাঁর সংকলিত হাদিসসমূহের সংগ্রহ ‘মুসনাদুশ শাফেয়ী’ নামে সমাদৃত। নিম্নে তাঁর পরিচয়, মুসনাদ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য এবং হাদিসশাস্ত্রে এর মর্যাদা আলোচনা করা হলো।

১. ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

  • নাম ও বংশমর্যাদা: তাঁর নাম মুহাম্মদ, উপনাম আবু আব্দুল্লাহ এবং উপাধি ‘নাসিরুস সুন্নাহ’ ও ‘ইমামুল কুরাইশ’। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বংশধারা কুরাইশের মুত্তালিবী শাখার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। পূর্ণ নসবনামা: মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস ইবনুল আব্বাস ইবনে উসমান ইবনে শাফে’ আল-মুত্তালিবী আল-কুরাশী।
  • জন্ম ও জ্ঞানার্জন: তিনি হিজরি ১৫০ সনে (যে বছর ইমাম আবু হানিফা রহ. ইন্তেকাল করেন) ফিলিস্তিনের গাজ্জায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি মক্কায় চলে আসেন এবং সাত বছর বয়সে কুরআন হিফয করেন। দশ বছর বয়সে ইমাম মালিকের ‘মুওয়াত্তা’ মুখস্থ করেন। অতঃপর মদিনায় গিয়ে ইমাম মালিকের প্রত্যক্ষ ছাত্রত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি বাগদাদে গিয়ে ইমাম মুহাম্মদের নিকট হানাফি ফিকহ অধ্যয়ন করেন এবং পরিশেষে মিসরে গমন করেন।
  • রচনাবলি: তিনি উসুলুল ফিকহের প্রথম গ্রন্থ ‘আর-রিসালাহ’ এবং স্বীয় ফিকহের কালজয়ী গ্রন্থ ‘কিতাবুল উম্ম’ রচনা করেন। এ ছাড়া ‘ইখতিলাফুল হাদিস’ গ্রন্থে হাদিসের আপাত বৈপরীত্য নিরসনের বৈজ্ঞানিক নিয়ম আবিষ্কার করেন।
  • ওফাত: হিজরি ২০৪ সনের রজব মাসে ৫৪ বছর বয়সে মিসরের কায়রোতে তিনি ওফাত বরণ করেন।

২. ‘মুসনাদুশ শাফেয়ী’ (مسند الشافعي)-এর বৈশিষ্ট্যসমূহ (مزايا مسنده):

‘মুসনাদুশ শাফেয়ী’ ইমাম শাফেয়ী নিজে বর্তমান আকারে গ্রন্থবদ্ধ করেননি; বরং তাঁর সুযোগ্য ছাত্র ও রাবী আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে মাতার আল-আসিমী এবং আল-আসাম্ম তাঁর মৌলিক গ্রন্থ ‘কিতাবুল উম্ম’ ও ‘আল-মাবসূত’ থেকে ইমাম শাফেয়ী কর্তৃক বর্ণিত মারফু ও মাওকুফ হাদিসগুলোকে একত্র করে এই মুসনাদের রূপ দিয়েছেন। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  1. স্বর্ণালী সনদ (سلسلة الذهب): ইমাম শাফেয়ীর মুসনাদে হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে বিশ্বের সর্বাধিক বিশুদ্ধ সনদ ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে: الشافعي عن مالك عن نافع عن ابن عمر (শাফেয়ী—মালিক থেকে—নাফে’ থেকে—ইবনে উমর রা. থেকে)। হাদিস বিশারদদের মতে এই সনদটি হলো ‘সিলসিলাতুয যাহাব’ বা স্বর্ণালী সনদ।
  2. ফিকহি অধ্যায়ন ও তারতীব: সাধারণ মুসনাদ গ্রন্থগুলোর মতো এটি কেবল সাহাবিদের নামের ওপর সাজানো নয়; বরং ফিকহি অধ্যায় ক্রমানুসারে (তাহারাত, সালাত, যাকাত, হজ, বাই ইত্যাদি) সুন্দরভাবে বিন্যস্ত।
  3. সাহাবি ও তাবেয়িদের আসার সমন্বয়: মারফু হাদিসের পাশাপাশি ফিকহি মাসআলা প্রমাণের জন্য সাহাবিদের আসার ও তাবেয়িদের সিদ্ধান্ত চমৎকারভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
  4. হাদিসের সংখ্যা ও সংক্ষিপ্ততা: এতে বিভিন্ন তুরুকসহ প্রায় ১,৮০০ থেকে ২,০০০ হাদিস সংকলিত হয়েছে, যার সিংহভাগই বিশুদ্ধতার সর্বোচ্চ স্তরে উত্তীর্ণ।
  5. মতন ও সনদের গভীর বিশ্লেষণ: হাদিস বর্ণনার পর ইমাম শাফেয়ী অনেক স্থানে হাদিসের ফিকহি মর্ম ও শব্দগত তাৎপর্য আলোচনা করেছেন।

৩. হাদিসগ্রন্থসমূহের মধ্যে মুসনাদুশ শাফেয়ীর মর্যাদা (مكانته بين كتب الحديث):

  • কুতুবে সিত্তার পূর্বসূরি আকর গ্রন্থ: ইমাম বুখারী, মুসলিম ও আবু দাউদের মতো যুগশ্রেষ্ঠ ইমামগণ ইমাম শাফেয়ীর বর্ণিত হাদিস ও উসুলুল হাদিসের নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে স্বীয় কিতাব সংকলন করেছেন। ফলে এটি সিহাহ সিত্তার পূর্ববর্তী এক পরম প্রামাণ্য ভিত্তি।
  • শাফেয়ী মাজহাবের মৌলিক দলিল: শাফেয়ী ফিকহের যাবতীয় মাসআলার মূল সনদী প্রমাণপত্র এই মুসনাদ থেকেই উৎসারিত।
  • সুন্নাহর প্রামাণিকতার দুর্গ: এই কিতাবের মাধ্যমে ইমাম শাফেয়ী প্রমাণ করেছেন যে, সহিহ হাদিস পেলে অন্য কোনো যুক্তি বা কিয়াসের কোনো মূল্য নেই। তিনি বলতেন: إِذَا صَحَّ الْحَدِيثُ فَهُوَ مَذْهَبِي—’হাদিস যখন সহিহ প্রমাণিত হবে, জেনো সেটাই আমার মাযহাব।’

৪. মুসনাদুশ শাফেয়ীর বৈশিষ্ট্যের সারসংক্ষেপ ছক:

দিক বিবরণ
সংকলক ও প্রেক্ষাপট ইমাম শাফেয়ীর ছাত্র আল-আসাম্ম কর্তৃক ‘কিতাবুল উম্ম’ থেকে সংকলিত।
সনদের মর্যাদা সর্বোচ্চ বিশুদ্ধ ‘স্বর্ণালী সনদ’ (সিলসিলাতুয যাহাব)-এর প্রাচুর্য।
বিন্যাস পদ্ধতি মুসনাদ নামে পরিচিত হলেও এটি ফিকহি অধ্যায়ের ক্রমানুসারে বিন্যস্ত।
হাদিসশাস্ত্রে স্থান ফিকহুস সুন্নাহ ও উসুলুল হাদিসের ইতিহাসে এক অবিসংবাদিত প্রামাণ্য গ্রন্থ।

উপসংহার: ‘মুসনাদুশ শাফেয়ী’ কেবল একটি হাদিস সংকলন নয়, বরং তা ফিকহ ও হাদিসের যুগলবন্দির এক অনন্য শাস্ত্রীয় নিদর্শন।


١٢- اكتب نبذة من حياة الإمام أحمد بن حنبل (رح) ثم تحدث عن خدماته في علم الحديث-

[১২. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ এবং হাদিসশাস্ত্রে তাঁর অবদান বিশদভাবে আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সুদৃঢ় ঐক্যের প্রতীক, মুহাদ্দিসদের শিরোমণি এবং চার মাজহাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হলেন ইমামু আহলিস সুন্নাহ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল আশ-শাইবানী (রহ.)। হাদিসের বিশুদ্ধতা রক্ষা, লাখ লাখ হাদিস মুখস্থকরণ এবং সুন্নাহর পক্ষে আপসহীন জিহাদের মাধ্যমে তিনি যে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত চিরভাস্বর থাকবে। নিম্নে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং উলুমুল হাদিসে তাঁর ঐতিহাসিক খিদমত বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:

  • নাম ও বংশ পরিচয়: তাঁর নাম আহমাদ, উপনাম আবু আব্দুল্লাহ এবং উপাধি ‘ইমামু আহলিস সুন্নাহ’। পূর্ণ নসবনামা: আহমাদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হাম্বল ইবনে হিলাল আশ-শাইবানী আল-বাগদাদী। তিনি আরবের বিখ্যাত বনু শায়বান গোত্রের সন্তান ছিলেন।
  • জন্ম ও সাধনা: তিনি হিজরি ১৬৪ সনে আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। অল্প বয়সেই পিতৃহারা হয়ে মাতার তত্ত্বাবধানে কুরআন হিফয করেন। ষোলো বছর বয়সে তিনি হাদিস অন্বেষণে যাত্রা শুরু করেন। তিনি পায়ে হেঁটে হিজাজ, ইয়েমেন, কুফা, বসরা ও সিরিয়া সফর করেন। ইয়েমেনের আব্দুর রাজ্জাক আস-সান’আনীর সান্নিধ্য পেতে তিনি আর্থিক অনটনের মাঝেও দীর্ঘ পথ পদব্রজে পাড়ি দিয়েছিলেন।
  • উস্তাদ ও ছাত্রবৃন্দ: তাঁর প্রধান উস্তাদ ছিলেন—ইমাম শাফেয়ী, সুফিয়ান ইবনে উয়ায়না, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান এবং আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী। পক্ষান্তরে সিহাহ সিত্তার সকল ইমামই (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিযী) তাঁর ছাত্র ছিলেন।
  • খালকে কুরআন ফিতনায় অবিচলতা: খলিফা মামুন, মু’তাসিম ও ওয়াসিকের আমলে মু’তাজিলাদের কুরআন সৃষ্টির ভ্রান্ত মতবাদ প্রত্যাখ্যান করে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেন: ‘কুরআন আল্লাহর কালাম, তা সৃষ্টি নয়।’ এর কারণে তাঁকে দীর্ঘ ২৮ মাস অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি রেখে চাবুক মারা হয়। কিন্তু তিনি সুন্নাহর পথ থেকে একচুলও নড়েননি।
  • ওফাত: হিজরি ২৪১ সনের ১২ রবিউল আউয়াল বাগদাদে ৭৭ বছর বয়সে তিনি ওফাত বরণ করেন। তাঁর জানাজায় প্রায় দশ লক্ষাধিক মানুষের অভূতপূর্ব সমাগম ঘটেছিল।

২. হাদিসশাস্ত্রে ইমাম আহমাদের অনন্য খিদমত ও অবদান:

ইলমে হাদিসের সংরক্ষণে ইমাম আহমাদের অবদান অপরিসীম:

  1. অতুলনীয় হিফয ও স্মৃতিশক্তি: আবু জুরাহ আর-রাযী বলেন: ‘ইমাম আহমাদ দশ লক্ষ (এক মিলিয়ন) হাদিস সনদসহ মুখস্থ রাখতেন।’ সে যুগে সনদের চুলচেরা যাচাই ও হাদিসের মুখস্থবিদ্যায় তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না।
  2. ‘আল-মুসনাদ’ বিশ্বকোষ সংকলন: ইমাম আহমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো তাঁর অমর গ্রন্থ ‘মুসনাদে আহমাদ’। সাত লক্ষাধিক হাদিস থেকে বাছাই করে তিনি প্রায় ২৭,০০০ থেকে ৩০,০০০ হাদিস সংবলিত এই সুবিশাল বিশ্বকোষ রচনা করেন। এতে প্রায় ৯০০ জন সাহাবির সূত্রে বর্ণিত হাদিস সংকলিত হয়েছে, যা সুন্নাহর সর্ববৃহৎ আকর গ্রন্থ।
  3. ইলালুল হাদিস ও জারহ-তা’দীলে শীর্ষ নেতৃত্ব: সনদের লুকায়িত সূক্ষ্ম ত্রুটি (علل الحديث) উদ্ঘাটন এবং বর্ণনাকারীদের চরিত্র ও স্মৃতিশক্তি যাচাইয়ে (الجرح والتعديل) তিনি ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম। তাঁর রচিত ‘কিতাবুল ইলাল ওয়া মা’রিফাতির রিজাল’ হাদিস সমালোচনার মূল ভিত্তি।
  4. যুহদ ও আমলের মাধ্যমে সুন্নাহর বাস্তবায়ন: তিনি কেবল হাদিস পড়াতেন না, বরং হাদিসের প্রতিটি সুন্নাত নিজের জীবনে আমল করতেন। তিনি বলতেন: ‘আমি এমন কোনো হাদিস লিখিনি যার ওপর অন্তত একবার হলেও আমল করিনি।’ তাঁর সংকলিত ‘কিতাবুজ যুহদ’ সালাফদের তাকওয়া ও সুন্নাহ অনুসরণের এক অনন্য প্রামাণ্য গ্রন্থ।
  5. সুন্নাহর বিশুদ্ধতা রক্ষায় আপসহীন সংগ্রাম: বিদআত ও বাতিল আকিদার মোকাবেলায় তিনি সুন্নাহকে বিজয়ী করেছিলেন। তাঁর এই অবিচলতার ফলেই মুসলিম উম্মাহ মু’তাজিলা ও জাহমিয়াদের সর্বগ্রাসী আগ্রাসন থেকে নিজেদের ঈমান রক্ষা করতে পেরেছিল।

৩. হাদিসশাস্ত্রে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের অবদানের সারসংক্ষেপ ছক:

ক্ষেত্র ইমাম আহমাদের অবদান ঐতিহাসিক প্রভাব
হাদিস সংরক্ষণ ১০ লক্ষ হাদিসের হিফয ও মুসনাদে আহমাদের সংকলন। সুন্নাহর সর্ববৃহৎ বিশ্বকোষ সৃষ্টি।
রিজাল ও ইলাল শাস্ত্র বর্ণনাকারীদের পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই ও ইলাল উদ্ঘাটন। সহিহ ও জয়িফ হাদিসের নিখুঁত পার্থক্যকরণ।
সুন্নাহর প্রতিরোধ মিহনাতু খালকিল কুরআনে কারাবরণ ও চাবুকের আঘাত সহ্য। ‘ইমামু আহলিস সুন্নাহ’ হিসেবে আকিদার চিরস্থায়ী সুরক্ষা।

উপসংহার: ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ছিলেন হাদিস আকাশের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, যাঁর অটল সংগ্রাম ও সুবিশাল সংকলনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সুন্নাতে নববীর শাশ্বত সৌধ।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ‘আল-মুসনাদ’ বলতে হাদিসশাস্ত্রের পরিভাষায় কী বোঝায়?

উত্তর: ‘মুসনাদ’ (المسند) হলো হাদিস সংকলনের এমন একটি পদ্ধতি বা গ্রন্থ, যাতে হাদিসসমূহকে ফিকহি বিষয় বা অধ্যায় ক্রমানুসারে না সাজিয়ে বর্ণনাকারী সাহাবিদের নামের ক্রমানুসারে সংকলন করা হয়। যেমন: হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বর্ণিত সকল হাদিস এক স্থানে, অতঃপর হযরত উমর (রা.) বর্ণিত সকল হাদিস এক স্থানে—এভাবে বর্ণনানুসারে সাজানো গ্রন্থকে মুসনাদ বলা হয় (যেমন: মুসনাদে আহমাদ)।

২. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর কি নিজস্ব কোনো মুসনাদ রয়েছে?

উত্তর: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) স্বয়ং আজকের প্রচলিত গ্রন্থের আকারে ‘মুসনাদ’ নামে একক কোনো কিতাব লিখে যাননি; বরং তিনি স্বীয় দরসে যেসব হাদিস বর্ণনা করেছিলেন, তাঁর সুযোগ্য ছাত্রগণ (যেমন: ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ.) তা ‘কিতাবুল আসার’ নামে সংকলন করেন। পরবর্তীকালে প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণ সেই রেওয়ায়েতগুলোকে একত্র করে ‘মুসনাদে আবি হানিফা’ নামে গ্রন্থবদ্ধ করেছেন।

৩. ‘সিলসিলাতুয যাহাব’ বা স্বর্ণালী সনদ কাকে বলে?

উত্তর: হাদিস বিশারদদের মতে যে সনদের প্রত্যেক বর্ণনাকারী সততা, বিশ্বস্ততা ও প্রখর স্মৃতিশক্তিতে সর্বোচ্চ স্তরের এবং যাঁর মাঝে কোনো ত্রুটি নেই, তাকে ‘সিলসিলাতুয যাহাব’ বা স্বর্ণালী সনদ বলা হয়। এর সর্বাধিক প্রসিদ্ধ উদাহরণ হলো: الشافعي عن مالك عن نافع عن ابن عمر (ইমাম শাফেয়ী—ইমাম মালিক থেকে—নাফে’ থেকে—ইবনে উমর রা. থেকে)।

৪. মোযাহর ওপর মাসেহ করার শরয়ি সময়সীমা কতটুকু?

উত্তর: সহিহ হাদিসের বিধান অনুযায়ী পবিত্র অবস্থায় মোযাহ পরিধান করার পর ওজু ভঙ্গ হলে—মুকিম বা স্থানীয় ব্যক্তির জন্য এক দিন এক রাত (২৪ ঘণ্টা) এবং মুসাফির বা সফরকারী ব্যক্তির জন্য তিন দিন তিন রাত (৭২ ঘণ্টা) পর্যন্ত মোযাহর ওপর মাসেহ করা জায়েজ রয়েছে। গোসল ফরজ হলে মোযাহ খুলে গোসল করা বাধ্যতামূলক।

৫. জুমার নামাজের প্রধান প্রধান ফরজ ও ওয়াজিব শর্তগুলো কী কী?

উত্তর: জুমার নামাজ ওয়াজিব হওয়ার শর্ত হলো: স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও মুকিম পুরুষ হওয়া। আর জুমা শুদ্ধভাবে আদায় হওয়ার জন্য মূল শর্ত হলো: শহর বা স্থায়ী জনপদ হওয়া, যোহরের ওয়াক্ত বিদ্যমান থাকা, সালাতের পূর্বে খুতবা প্রদান করা, ন্যূনতম মুসল্লির জামাত উপস্থিত থাকা এবং সর্বসাধারণের জন্য মসজিদে প্রবেশের উন্মুক্ত অনুমতি (ইযনে আম) থাকা।

৬. কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আকিদা কী?

উত্তর: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকিদা হলো—কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি যদি গুনাহকে হালাল মনে না করে, তবে সে কাফের হয় না; বরং সে ফাসেক মুমিন। তওবা ব্যতীত মারা গেলে তার বিষয় আল্লাহর ইচ্ছার ওপর সমর্পিত। আল্লাহ চাইলে তাকে মাফ করতে পারেন, অথবা শাস্তি দিয়ে পরবর্তীতে জান্নাত দান করবেন; সে কাফেরদের মতো চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন