জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

দিরাসাতুল হাদীস-৩ (Dirasatul Hadith-3) – ২০২৮০৯, আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
১৫২ মিনিট পড়ার সময়
১৯ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৩৫
اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۴
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة الحديث-٣
[দিরাসাতুল হাদীস-৩]
বিষয় কোড: ২০২৮০৯
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن اثنين من مجموعة (أ) وعن اثنين من مجموعة (ب) وعن اثنين من مجموعة (ج) وعن اثنين من مجموعة (د)- الأعداد بالهامش تدل على الدرجات كاملة-
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিটি বিভাগ থেকে ২টি করে মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার নিয়ম থাকলেও শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ ও সমৃদ্ধ একাডেমিক প্রস্তুতির লক্ষ্যে নিম্নে প্রশ্নপত্রের চারটি বিভাগের মোট ১২টি প্রশ্নেরই গভীর তাত্ত্বিক ও রেফারেন্সভিত্তিক নির্ভুল সমাধান উপস্থাপন করা হলো।]


مجموعة (أ) — مصنف عبد الرزاق (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (ترجم الأحاديث الآتية ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)


١- عَنْ مَعْمَرٍ عَنْ قَتَادَةَ أَنَّ ابْنَ مَسْعُودٍ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ) كَانَ يُصَلِّي قَبْلَ الْجُمُعَةِ أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ وَبَعْدَهَا أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ- قَالَ أَبُو إِسْحَاقَ وَكَانَ عَلِيٌّ يُصَلِّي بَعْدَ الْجُمُعَةِ سِتَّ رَكَعَاتٍ وَبِهِ يَأْخُذُ عَبْدُ الرَّزَّاقِ-

[১. হযরত মা’মার হযরত কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জুমার পূর্বে চার রাকাত এবং জুমার পরে চার রাকাত সালাত আদায় করতেন। আবু ইসহাক বলেন, হযরত আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জুমার পরে ছয় রাকাত সালাত আদায় করতেন এবং ইমাম আব্দুর রাযযাকও এই মতটিই গ্রহণ করতেন।]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: হযরত মা’মার (রহ.) প্রখ্যাত তাবে’ঈ হযরত কাতাদাহ (রহ.) থেকে রেওয়ায়াত করেন যে, জলীলুল কদর সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জুমার সালাতের পূর্বে চার রাকাত (সুন্নাত) এবং জুমার সালাতের পরে চার রাকাত (সুন্নাত) আদায় করতেন। বর্ণনাকারী আবু ইসহাক আস-সাবীঈ (রহ.) বলেন, চতুর্থ খলীফা আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জুমার সালাতের পরে ছয় রাকাত সালাত আদায় করতেন; এবং হাদীসের সংকলক ইমাম আব্দুর রাযযাক আস-সান’আনী (রহ.) এই আমলটিই গ্রহণ করতেন ও তদনুযায়ী ফতোয়া দিতেন।

সনদ ও বর্ণনাকারী (রাবী) পরিচিতি:

  • ইমাম আব্দুর রাযযাক আস-সান’আনী (রহ.): হাদিস সংকলক, প্রখ্যাত হাফিযে হাদিস আবু বকর আব্দুর রাযযাক ইবনে হুমাম আস-সান’আনী (১২৬-২১১ হি.)। তিনি ইয়ামেনের সান’আর অধিবাসী এবং ‘মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক’-এর প্রণেতা। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ও ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র।
  • মা’মার ইবনে রাশিদ আল-আযদী (রহ.): বসরার অন্যতম শীর্ষ হাফিযে হাদিস ও বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী (৯৬-১৫৩ হি.)। তিনি ইমাম যুহরীর বিশিষ্ট শাগরিদ এবং ইয়ামেনে হাদিস প্রচারের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
  • কাতাদাহ ইবনে দি’আমাহ আস-সাদূসী (রহ.): বসরার মহান তাবে’ঈ, তাফসীর ও হাদিসের প্রখ্যাত ইমাম (৬০-১১৮ হি.)। তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি প্রবাদতুল্য ছিল।
  • হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.): আস-সাবিকূনাল আউয়ালূনের অন্যতম, ফিকহুস সাহাবার শীর্ষ ইমাম এবং কূফার ইলমি মারকাযের প্রতিষ্ঠাতা।
  • আবু ইসহাক আস-সাবীঈ (রহ.): আমর ইবনে আব্দুল্লাহ আল-হামদানী আল-কূফী (৩৩-১২৭ হি.), কূফার সুবিখ্যাত তাবে’ঈ ও নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস।
  • আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (রা.): খোলাফায়ে রাশেদীনের চতুর্থ খলীফা, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জামাতা এবং উম্মতের অন্যতম শীর্ষ ফকীহ ও বিচারক।

হাদীসের ফিকহি বিশ্লেষণ (জুমার পূর্বাপর সুন্নাত):

  • জুমার পূর্বের সুন্নাত: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এই আমল দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, জুমার পূর্বে চার রাকাত সুন্নাত সালাত আদায় করা সালাফদের সর্বসম্মত আমল ছিল। ইমাম আবু হানীফা (রহ.), ইমাম মুহাম্মদ এবং ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর একটি রেওয়ায়াত অনুযায়ী জুমার ফরজের পূর্বে চার রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।
  • জুমার পরের সুন্নাত: জুমার পরে হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) চার রাকাত পড়তেন, পক্ষান্তরে হযরত আলী (রা.) ছয় রাকাত পড়তেন (প্রথমে চার রাকাত, অতঃপর দুই রাকাত)। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) উভয় সাহাবীর আমল সমন্বয় করে জুমার পরে চার রাকাত, অতঃপর দুই রাকাত অর্থাৎ মোট ছয় রাকাত আদায় করাকে উত্তম বলেছেন, যা ইমাম আব্দুর রাযযাকও গ্রহণ করেছেন। ইমাম শাফেয়ী ও আহমাদ (রহ.) চার রাকাত সুন্নাত আদায়ের মত পোষণ করেছেন।

(أ) بين فضائل يوم الجمعة في ضوء القرآن والسنة-

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জুমার দিনের সুমহান ফযিলত:

ইসলামী শরীয়তে জুমার দিন হলো সপ্তাহের সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বাধিক বরকতময় ও পুণ্যময় দিন। একে ‘সাইয়্যিদুল আইয়্যাম’ (দিনসমূহের সর্দার) ও মুমিনদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। নিম্নে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জুমার দিনের অনন্য ফযিলতসমূহ বিস্তারিত উল্লেখ করা হলো:

১. পবিত্র কুরআনের আলোকে জুমার দিনের গুরুত্ব:

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে জুমার দিনের নামে একটি স্বতন্ত্র সূরা নাযিল করেছেন এবং জুমার সালাতের জন্য বিশেষ নির্দেশ জারি করেছেন। ইরশাদ হয়েছে:

«يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ»

অর্থ: “হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন সালাতের জন্য আহবান (আযান) করা হয়, তখন তোমরা দ্রুত আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় বর্জন করো। এটিই তোমাদের জন্য পরম কল্যাণকর, যদি তোমরা উপলব্ধি করো।” (সূরা আল-জুমুআহ: ৯)। এই আয়াত দ্বারা জুমার দিনের গুরুত্ব এবং আযানের পর পার্থিব ব্যস্ততা পরিত্যাগ করে মসজিদে যাওয়া ওয়াজিব সাব্যস্ত হয়েছে।

২. হাদিস শরীফের আলোকে দিনসমূহের শ্রেষ্ঠ দিন (সাইয়্যিদুল আইয়্যাম):

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

«خَيْرُ يَوْمٍ طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ يَوْمُ الْجُمُعَةِ، فِيهِ خُلِقَ آدَمُ، وَفِيهِ أُدْخِلَ الْجَنَّةَ، وَفِيهِ أُخْرِجَ مِنْهَا، وَلَا تَقُومُ السَّاعَةُ إِلَّا فِي يَوْمِ الْجُمُعَةِ»

অর্থ: “সূর্য উদিত হওয়া দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছিল, এই দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছিল এবং এই দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে (পৃথিবীতে খিলাফতের দায়িত্ব দিয়ে) নামানো হয়েছিল। আর এই জুমার দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।” (সহীহ মুসলিম: ৮৫৪)।

৩. দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত (সা’আতুল ইজাবাহ):

জুমার দিনে এমন একটি বরকতময় মুহূর্ত রয়েছে, যাতে কোনো বান্দা আল্লাহর নিকট কল্যাণকর কিছু প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

«إِنَّ فِي الْجُمُعَةِ لَسَاعَةً، لَا يُوَافِقُهَا عَبْدٌ مُسْلِمٌ، وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي، يَسْأَلُ اللَّهَ شَيْئًا، إِلَّا أَعْطَاهُ إِيَّاهُ»

অর্থ: “নিশ্চয়ই জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, কোনো মুসলিম বান্দা যদি সে সময় সালাতরত অবস্থায় আল্লাহর নিকট কোনো কিছু প্রার্থনা করে, তবে আল্লাহ অবশ্যই তাকে তা দান করেন।” (সহীহ বুখারী: ৯৩৫, সহীহ মুসলিম: ৮৫২)। উলামায়ে কিরামের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী এই বিশেষ মুহূর্তটি হলো আসরের পর থেকে মাগরিবের পূর্ব পর্যন্ত সময় अथवा ইমামের মিম্বরে বসা থেকে সালাত সমাপ্তি পর্যন্ত সময়।

৪. এক সপ্তাহের গুনাহের কাফফারা:

হযরত সালমান ফারসী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন উত্তমরূপে গোসল করে, যথাসম্ভব পবিত্রতা অর্জন করে, তেল বা সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে যায়, দুই মুসল্লির মাঝে ফাঁক না করে সাধ্যানুযায়ী নফল সালাত আদায় করে এবং ইমামের খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনে, আল্লাহ তা’আলা তার এই জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত যাবতীয় সগীরা গুনাহ ক্ষমা করে দেন (সহীহ বুখারী: ৮৮৩)।

৫. প্রতি পদক্ষেপে এক বছরের নফল রোজা ও তাহাজ্জুদের সাওয়াব:

হযরত আওস ইবনে আওস আস-সাকাফী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

«مَنْ غَسَّلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَاغْتَسَلَ، ثُمَّ بَكَّرَ وَابْتَكَرَ، وَمَشَى وَلَمْ يَرْكَبْ، وَدَنَا مِنَ الْإِمَامِ فَاسْتَمَعَ وَلَمْ يَلْغُ، كَانَ لَهُ بِكُلِّ خُطْوَةٍ عَمَلُ سَنَةٍ؛ أَجْرُ صِيَامِهَا وَقِيَامِهَا»

অর্থ: “যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করাবে ও নিজে গোসল করবে, অতি প্রত্যুষে পায়ে হেঁটে মসজিদে যাবে (কোনো বাহনে চড়বে না), ইমামের নিকটে বসবে, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনবে এবং কোনো অনর্থক কাজ করবে না— সে মসজিদে যাওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে এক বছরের নফল রোজা এবং এক বছরের নফল তাহাজ্জুদের সাওয়াব লাভ করবে।” (সুনানে আবু দাউদ: ৩৪৫, জামে তিরমিযী: ৪৯৬ – সনদ সহীহ)।

৬. দরূদ পাঠের বিশেষ ফযিলত:

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিনটি সর্বোত্তম। অতএব এই দিনে তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করো; কারণ তোমাদের দরূদ আমার দরবারে পেশ করা হয়।” (সুনানে আবু দাউদ: ১০৪৭)।

৭. সূরা আল-কাহাফ তিলাওয়াতের নূর:

হাদীস শরীফে এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিনে সূরা আল-কাহাফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় নূর দ্বারা আলোকিত করে দেওয়া হবে (মুস্তাদরাকে হাকিম: ৩৩৯২, সহীহ জামে)।


٢- عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ عَنْ حَبِيبِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَنْ حَفْصِ بْنِ عَاصِمٍ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ) أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَا بَيْنَ بَيْتِي وَبَيْنَ مِنْبَرِي رَوْضَةٌ مِنْ رِيَاضِ الْجَنَّةِ، وَمِنْبَرِي عَلَى حَوْضِي»-

[২. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর হযরত হাবীব ইবনে আব্দুর রহমান থেকে, তিনি হাফস ইবনে আসিম থেকে, তিনি হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “আমার ঘর এবং আমার মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটি জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান; আর আমার মিম্বরটি আমার হাউজের উপরে অবস্থিত।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “আমার ঘর (যেখানে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর হুজরা এবং বর্তমানে রওজা মুবারক অবস্থিত) এবং আমার মিম্বর— এ দুয়ের মধ্যবর্তী বরকতময় স্থানটি জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান; আর কিয়ামতের ময়দানে আমার মিম্বরটি আমার হাউজে কাউসারের উপরে স্থাপিত থাকবে।”

সনদ ও বর্ণনাকারী পর্যালোচনা:

  • আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রহ.): আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে হাফস আল-উমরী আল-মাদানী, মদীনার সুপরিচিত নির্ভরযোগ্য আলেম ও বর্ণনাকারী।
  • হাবীব ইবনে আব্দুর রহমান আল-আনসারী: মদীনার খ্যাতনামা বিশ্বস্ত তাবে’ঈ (মৃত্যু ১৩২ হি.)।
  • হাফস ইবনে আসিম ইবনে উমর ইবনুল খাত্তাব: মদীনার শীর্ষ তাবে’ঈ ফকীহ, আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা.)-এর পৌত্র।
  • হযরত আবু হুরায়রা (রা.): সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী জলীলুল কদর সাহাবী।

হাদীসের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা (রওজাতুম মির রিয়াযিল জান্নাহ):

মুহাদ্দিসীনে কিরাম ‘রওজাতুম মির রিয়াযিল জান্নাহ’ এর ব্যাখ্যায় তিনটি মূল দিক তুলে ধরেছেন:

  1. বাস্তব অর্থ (হাকীকত): এই পবিত্র ভূমিখণ্ডটি হুবহু জান্নাত থেকেই দুনিয়াতে অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং কিয়ামতের দিন এটি পুনরায় জান্নাতে স্থানান্তরিত হবে।
  2. ইবাদতের প্রতিফল: এই বরকতময় স্থানে নামায, তিলাওয়াত, যিকির ও ইবাদত সম্পাদন বান্দাকে জান্নাতের সুশীতল উদ্যানে পৌঁছে দেওয়ার অসিলা হয়।
  3. রহমত ও বরকতের প্রাচুর্য: যেমন জান্নাতের বাগানে প্রশান্তি ও রহমত বিরাজ করে, তেমনি এই পবিত্র স্থানে সর্বক্ষণ আল্লাহর বিশেষ সাকীনা ও রহমত বর্ষিত হতে থাকে।

(أ) ما معنى الكوثر؟ بين أوصاف الحوض في ضوء الحديث-

কাউসারের অর্থ এবং হাদিসের আলোকে হাউজের বৈশিষ্ট্যাবলী:

১. ‘আল-কাউসার’ (الْكَوْثَرُ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:

  • আভিধানিক অর্থ: ‘আল-কাউসার’ শব্দটি আরবি ‘কাসরাহ’ (الْكَثْرَةُ) ধাতু থেকে ‘ফাও’আল’ (فَوْعَلٌ) ওজনে গঠিত একটি আধিক্যবোধক বিশেষ্য (ইসমে মুবালাগা)। এর আভিধানিক অর্থ হলো— প্রচুর, অবারিত, সীমাহীন এবং অফুরন্ত কল্যাণ ও অনুগ্রহ (الْخَيْرُ الْكَثِيرُ)। আরবীতে অতি দানশীল ব্যক্তিকে ‘রাজুলুন কাউসার’ বলা হয়।
  • পারিভাষিক অর্থ: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ‘আল-কাউসার’ হলো সেই নহর বা বিশেষ প্রসবণ, যা মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিবসে তাঁর প্রিয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জান্নাতে উপহার হিসেবে দান করবেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: «إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ» অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাউসার (অফুরন্ত কল্যাণ ও জান্নাতী নহর) দান করেছি” (সূরা আল-কাওসার: ১)। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, কাউসার হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে প্রদত্ত সমস্ত মহাকল্যাণ, আর হাশরের ময়দানের ‘হাওয’ হলো জান্নাতী কাউসার নহরেরই একটি শাখা।

২. হাদীস শরীফের আলোকে হাউজে কাউসারের বিবরণ ও বৈশিষ্ট্যাবলী (أوصاف الحوض):

সহীহ হাদীসসমূহে কিয়ামতের কঠিন তৃষ্ণার্ত দিবসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের জন্য নির্ধারিত ‘হাউজে কাউসার’-এর চমকপ্রদ ও বিস্তৃত বিবরণ বর্ণিত হয়েছে:

  • ১. হাউজের আয়তন ও বিস্তৃতি: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «حَوْضِي مَسِيرَةُ شَهْرٍ، وَزَوَايَاهُ سَوَاءٌ» অর্থাৎ “আমার হাউজের দৈর্ঘ্য এক মাসের পথ এবং এর প্রস্থও এক মাসের পথ, এর চার কোণ সমান বিস্তৃত” (সহীহ বুখারী: ৬৫৭৯)। অর্থাৎ এটি সুবিশাল এক চতুষ্কোণ জলাধার।
  • ২. পানির শুভ্রতা ও শীতলতা: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «مَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنَ اللَّبَنِ (وفي رواية: وَأَبْرَدُ مِنَ الثَّلْجِ)» অর্থাৎ “এর পানি দুধের চেয়েও অধিক শুভ্র এবং বরফের চেয়েও অধিক শীতল ও স্নিগ্ধ” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
  • ৩. সুবাস ও সৌরভ: হাদীসে এসেছে: «وَرِيحُهُ أَطْيَبُ مِنَ الْمِسْكِ» অর্থাৎ “এর পানির সুগন্ধি খাঁটি কস্তুরীর (মিশক) সুবাসের চেয়েও অধিক মনমাতানো ও পবিত্র” (সহীহ মুসলিম: ২২৯২)।
  • ৪. পানির মিষ্টতা ও স্বাদ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: «وَأَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ» অর্থাৎ “এর স্বাদ খাঁটি মধুর চেয়েও অধিক সুমিষ্ট ও সুস্বাদু” (জামে তিরমিযী: ২৪৪৩)।
  • ৫. পানপাত্রের সংখ্যা ও রূপ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: «وَكِيزَانُهُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ كَثْرَةً وَضِيَاءً» অর্থাৎ “হাউজের পানপাত্রগুলো উজ্জ্বলতা ও সংখ্যার দিক থেকে আকাশের নক্ষত্ররাজির মতো অগণিত” (সহীহ মুসলিম)। অপর বর্ণনায় এসেছে, তা স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈরি।
  • ৬. চিরন্তন তৃপ্তি: হাউজের পানির সবচেয়ে বড় মু’জিযা হলো: «مَنْ شَرِبَ مِنْهُ شَرْبَةً لَمْ يَظْمَأْ بَعْدَهَا أَبَدًا» অর্থাৎ “যে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি এই হাউজ থেকে মাত্র একবার পানি পান করবে, সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না; এমনকি জান্নাতে প্রবেশের পরও সে তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করবে না” (সহীহ বুখারী: ৬৫৭৯)।
  • ৭. হাউজের মূল উৎস: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, জান্নাতুল ফিরদাউস থেকে দুটি নালার মাধ্যমে কাউসারের পানি এই হাউজে অবিরাম প্রবাহিত হতে থাকবে; যার একটি স্বর্ণের এবং অপরটি রৌপ্যের তৈরি।
  • ৮. হাউজ থেকে বিতাড়িত হতভাগাগণ: রাসূলুল্লাহ (সা.) হাউজের পাড়ে উপস্থিত থেকে উম্মতকে পানি পান করাবেন। কিন্তু কিছু লোককে ফেরেশতারা সেখান থেকে তাড়িয়ে দেবে। রাসূল (সা.) বলবেন: ‘এরা তো আমার উম্মত!’ উত্তরে বলা হবে: ‘আপনি জানেন না, আপনার ওফাতের পর এরা দ্বীনের মধ্যে কী নতুন বিদ’আত সৃষ্টি করেছিল এবং ধর্মে পরিবর্তন এনেছিল!’ তখন নবীজী বলবেন: «سُحْقًا سُحْقًا لِمَنْ غَيَّرَ بَعْدِي» অর্থাৎ “দূর হোক, ধ্বংস হোক তারা, যারা আমার পর দ্বীনকে বিকৃত করেছিল!” (সহীহ বুখারী: ৬৫৭৬)।

٣- أَخْبَرَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ قَالَ أَخْبَرَنَا مَعْمَرٌ عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ عَنْ أَبِي عَمْرٍو الشَّيْبَانِيِّ أَنَّهُ رَأَى ابْنَ مَسْعُودٍ يُخْرِجُ النِّسَاءَ مِنَ الْمَسْجِدِ وَيَقُولُ: «اخْرُجْنَ إِلَى بُيُوتِكُنَّ خَيْرٌ لَكُنَّ»-

[৩. ইমাম আব্দুর রাযযাক আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন মা’মার আমাদের সংবাদ দিয়েছেন আবু ইসহাক থেকে, তিনি আবু আমর আশ-শায়বানী থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে মসজিদ থেকে নারীদের বের করে দিতে দেখেছেন এবং তিনি বলছিলেন: “তোমরা তোমাদের ঘরসমূহের দিকে বের হয়ে যাও, তোমাদের ঘরই তোমাদের জন্য অধিক কল্যাণকর।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: আবু আমর আশ-শায়বানী (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন যে, জলীলুল কদর সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মসজিদ থেকে নারীদেরকে বের করে দিচ্ছিলেন এবং তাগিদ দিয়ে বলছিলেন: “তোমরা তোমাদের নিজ নিজ বাসগৃহে ফিরে যাও; কারণ মসজিদে আসার চেয়ে তোমাদের ঘরসমূহেই অবস্থান করা এবং সেখানে নামায আদায় করা তোমাদের জন্য অধিক উত্তম ও কল্যাণকর।”

সনদ ও বর্ণনাকারী পর্যালোচনা:

  • ইমাম আব্দুর রাযযাক আস-সান’আনী: মুসান্নাফ গ্রন্থের সংকলক ও সুবিখ্যাত হাফিযে হাদীস।
  • মা’মার ইবনে রাশিদ: নির্ভরযোগ্য শীর্ষ তাবে’ঈ হাদীস বিশারদ।
  • আবু ইসহাক আস-সাবীঈ: কূফার প্রখ্যাত বিশ্বস্ত হাফিয।
  • আবু আমর আশ-শায়বানী (রহ.): সা’দ ইবনে ইয়াস, কূফার বিশ্বস্ত তাবে’ঈ (মৃত্যু ৯৫ হি.)। তিনি জাহেলিয়াত ও ইসলাম উভয় যুগ প্রত্যক্ষ করেছেন।
  • হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.): প্রখ্যাত সাহাবী ও মুফাসসিরে কুরআন।

(أ) ما حكم خروج النساء إلى المساجد لصلاة الجمعة والصلوات الخمس؟ أوضح هذه المسئلة مدللا-

জুমার সালাত ও পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে নারীদের মসজিদে যাওয়ার হুকুম (দলীলভিত্তিক বিশদ পর্যালোচনা):

১. প্রাথমিক যুগে নববী বিধান ও সাধারণ অনুমতি:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় মদীনার প্রাথমিক যুগে নারীদের মসজিদে গিয়ে জামাতে শরীক হওয়ার অনুমতি ছিল। তবে সেই অনুমতি ছিল কঠোর শর্তসাপেক্ষ এবং তখনই ঘরে নামায পড়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:

«لَا تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللَّهِ مَسَاجِدَ اللَّهِ، وَبُيُوتُهُنَّ خَيْرٌ لَهُنَّ»

অর্থ: “তোমরা আল্লাহর বান্দীদের (নারীদের) আল্লাহর মসজিদে যেতে নিষেধ করো না; তবে তাদের ঘরই তাদের জন্য অধিক উত্তম।” (সুনানে আবু দাউদ: ৫৬৭)।

অন্য হাদীসে সুগন্ধি বর্জনের শর্ত দিয়ে বলা হয়েছে: «وَإِنْ خَرَجْنَ فَلْيَخْرُجْنَ تَفِلَاتٍ» অর্থাৎ “যদি তারা মসজিদে যায়, তবে যেন সুগন্ধি ছাড়া সাদাসিধে পোশাকে বের হয়” (আবু দাউদ: ৫৬৫)।

২. সাহাবায়ে কিরামের যুগ ও প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন (ফিতনার আশঙ্কায় নিষেধাজ্ঞা):

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাত পরবর্তী সময়ে সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন এবং মানুষের তাকওয়ায় ভাটা পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে সাহাবায়ে কিরাম নারীদের মসজিদে গমন কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত ও নিষেধ করেন।

  • উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঐতিহাসিক ফতোয়া: তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন:

    «لَوْ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى مَا أَحْدَثَ النِّسَاءُ لَمَنَعَهُنَّ الْمَسْجِدَ كَمَا مُنِعَتْ نِسَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ»

    অর্থ: “নারীরা বর্তমানে পোশাক-পরিচ্ছদ ও চালচলনে যে নতুন অবস্থার সৃষ্টি করেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যদি তা দেখতেন, তবে তিনি নিশ্চিতভাবেই তাদেরকে মসজিদে আসা নিষিদ্ধ করতেন; যেমন বনী ইসরাঈলের নারীদের জন্য মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।” (সহীহ বুখারী: ৮৬৯, সহীহ মুসলিম: ৪৪৫)।

  • হযরত উমর ও ইবনে মাসউদ (রা.)-এর আমল: হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নারীদের মসজিদে যাওয়া পছন্দ করতেন না এবং হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) জুমার দিনে নারীদের মসজিদ থেকে বের করে দিয়ে নিজ গৃহে নামায পড়ার নির্দেশ দিতেন (যেমনটি আলোচ্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে)।

৩. ফিকহি মাযহাবসমূহের সুনির্দিষ্ট ফতোয়া ও অবস্থান:

  • হানাফী মাযহাবের সিদ্ধান্ত:
    • ফিতনার আশঙ্কায় যুবতী নারীদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, জুমা ও ঈদের জামাতে মসজিদে গমন সর্বসম্মতিক্রমে ‘মাকরূহে তাহরীমী’ (হারামের নিকটবর্তী)।
    • ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর প্রাথমিক যুগে বৃদ্ধা নারীদের জন্য ফজর, মাগরিব ও এশার সালাতে অনুমতির কথা বলা হলেও পরবর্তী ফকীহগণ (মুতাআখখিরীন) এবং ফতোয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যামানার ফিতনা ও দুর্নীতির ব্যাপকতার কারণে যুবতী ও বৃদ্ধা সকল নারীর জন্য সকল সালাতেই মসজিদে গমন মাকরূহে তাহরীমী ঘোষণা করেছেন (রদ্দুল মুহতার, আল-হিদায়াহ)।
    • জুমার সালাত নারীদের ওপর ফরয নয়। হাদীসে এসেছে: «الْجُمُعَةُ حَقٌّ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ فِي جَمَاعَةٍ إِلَّا أَرْبَعَةً: عَبْدٌ مَمْلُوكٌ، أَوِ امْرَأَةٌ، أَوْ صَبِيٌّ، أَوْ مَرِيضٌ» অর্থাৎ “চার ব্যক্তি ব্যতীত প্রত্যেক মুসলমানের ওপর জামাতে জুমার সালাত আদায় করা ওয়াজিব: ক্রীতদাস, নারী, অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক ও অসুস্থ ব্যক্তি” (সুনানে আবু দাউদ: ১০৬৭)।
  • অন্যান্য মাযহাবের (শাফেয়ী, মালিকী ও হাম্বলী) অভিমত: যুবতী নারীদের জন্য মসজিদে যাওয়া মাকরূহ। যদি কোনো নারী শালীনতা রক্ষা করে, সুগন্ধি পরিহার করে, পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশে মসজিদে যায়, তবে বৃদ্ধাদের জন্য জাযেয বলা হয়েছে; তবে সর্বাবস্থায় নারীদের জন্য নিজ ঘরে সালাত আদায় করাই সর্বাধিক সওয়াব ও মর্যাদাপূর্ণ।

৪. নারীদের নিজ ঘরে সালাতের অনন্য মর্যাদা ও ফযিলত:

হযরত উম্মে হুমাইদ আস-সা’ইদিয়্যাহ (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট এসে বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার সাথে মসজিদে নামায পড়তে অত্যন্ত ভালোবাসি।” উত্তরে রাহমাতুল্লিল আলামীন (সা.) ইরশাদ করলেন:

«قَدْ عَلِمْتُ أَنَّكِ تُحِبِّينَ الصَّلَاةَ مَعِي، وَصَلَاتُكِ فِي بَيْتِكِ خَيْرٌ لَكِ مِنْ صَلَاتِكِ فِي حُجْرَتِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي حُجْرَتِكِ خَيْرٌ لَكِ مِنْ صَلَاتِكِ فِي دَارِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي دَارِكِ خَيْرٌ لَكِ مِنْ صَلَاتِكِ فِي مَسْجِدِ قَوْمِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي مَسْجِدِ قَوْمِكِ خَيْرٌ لَكِ مِنْ صَلَاتِكِ فِي مَسْجِدِي»

অর্থ: “আমি জানি তুমি আমার সাথে নামায পড়তে ভালোবাস। কিন্তু তোমার ভেতরের কামরায় সালাত আদায় করা তোমার ঘরের সাধারণ কক্ষে সালাত আদায়ের চেয়ে উত্তম; ঘরের কক্ষে সালাত আদায় বাড়ির উন্মুক্ত আঙ্গিনায় সালাত আদায়ের চেয়ে উত্তম; বাড়ির আঙ্গিনায় সালাত আদায় তোমার পাড়ার মসজিদে সালাত আদায়ের চেয়ে উত্তম; আর তোমার পাড়ার মসজিদে সালাত আদায় আমার এই (মসজিদে নববী)-তে সালাত আদায়ের চেয়েও অধিক উত্তম!” (মুসনাদে আহমাদ: ২৬৫৫৬, সহীহ ইবনে খুযায়মাহ: ১৬৮৯ – সহীহ সনদ)।

সারসংক্ষেপ: শরীয়তের মূল মাকাসিদ ও ফিতনা প্রতিরোধের মূলনীতির আলোকে নারীদের জন্য নিজ বাসগৃহের নির্জন স্থানে সালাত আদায় করাই সর্বোত্তম এবং মসজিদের জামাতে গমন অনুচিত ও নিরুৎসাহিত।


مجموعة (ب) — مصنف ابن أبي شيبة (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (ترجم الأحاديث التالية ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)


٤- حَدَّثَنَا شَرِيكٌ عَنْ عَاصِمٍ عَنْ أَبِي صَالِحٍ يَرْفَعُهُ إِلَى عِيسَى بْنِ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالَ: قَالَ لِأَصْحَابِهِ: «اتَّخِذُوا الْمَسَاجِدَ مَسَاكِنَ، وَاتَّخِذُوا الْبُيُوتَ مَنَازِلَ، وَانْجُوا مِنَ الدُّنْيَا بِسَلَامٍ، وَكُلُوا مِنْ بَقْلِ الْبَرِّيَّةِ»، قَالَ وَزَادَ فِيهِ الْأَعْمَشُ: «وَاشْرَبُوا مِنَ الْمَاءِ الْقَرَاحِ»-

[৪. শারীক আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন আসিম থেকে, তিনি আবু সালিহ থেকে, তিনি এটিকে মারফূ সূত্রে হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আলাইহিস সালাম)-এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেন; তিনি বলেন: হযরত ঈসা (আ.) তাঁর হাওয়ারী (সঙ্গী)-দের লক্ষ্য করে বললেন: “তোমরা মসজিদসমূহকে আবাসস্থল বানাও এবং ঘরসমূহকে ক্ষণস্থায়ী পান্থশালা বানাও, আর পার্থিব জগত থেকে শান্তিতে মুক্তি লাভ করো এবং বনের শাকসবজি আহার করো।” বর্ণনাকারী বলেন, আ’মাশ এতে আরো বাড়িয়ে বর্ণনা করেছেন: “এবং তোমরা স্বচ্ছ নির্মল পানি পান করো।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: হযরত শারীক (রহ.) হযরত আসিম (রহ.) থেকে, তিনি প্রখ্যাত তাবে’ঈ আবু সালিহ আস-সাম্মান (রহ.) থেকে মারফূ সূত্রে রেওয়ায়াত করেন যে, আল্লাহর বিশিষ্ট নবী হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আলাইহিস সালাম) তাঁর সঙ্গী হাওয়ারীগণকে উদ্দেশ্য করে উপদেশ দিয়েছিলেন: “তোমরা মসজিদসমূহকে তোমাদের স্থায়ী আবাসস্থলে পরিণত করো (অর্থাৎ সর্বদা আল্লাহর ঘরে ইবাদতে মগ্ন থাকো), আর পার্থিব ঘরবাড়িকে ক্ষণস্থায়ী পান্থশালা মনে করো; পার্থিব মায়া-মোহ থেকে নিরাপদে পরিত্রাণ অর্জন করো এবং বনের লতাপাতা ও শাকসবজি খেয়ে জীবন ধারণ করো।” বর্ণনাকারী উল্লেখ করেন যে, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল-আ’মাশ (রহ.) এই বর্ণনায় আরো বৃদ্ধি করেছেন: “এবং তোমরা স্বচ্ছ-নির্মল সুপেয় পানি পান করো।”

সনদ ও বর্ণনাকারী পর্যালোচনা:

  • ইমাম ইবনে আবী শায়বাহ (রহ.): কিতাবের সংকলক, প্রখ্যাত হাফিযে হাদীস আবু বকর আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবী শায়বাহ আল-কূফী (১৫৯-২৩৫ হি.)। তিনি ইমাম বুখারী ও মুসলিমের অন্যতম প্রধান উস্তাদ।
  • শারীক ইবনে আব্দুল্লাহ আন-নাখ’ঈ আল-কাযী: কূফার সুপ্রসিদ্ধ ফকীহ ও বিচারক (৯৫-১৭৭ হি.)। তিনি অত্যন্ত পরহেযগার ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন।
  • আসিম ইবনে বাহদালাহ (ইবনে আবিন নাজূদ): কূফার বিখ্যাত কারী ও মুহাদ্দিস (মৃত্যু ১২৭ হি.), যাঁর কিরাত বিশ্বে সর্বাধিক পঠিত।
  • আবু সালিহ আস-সাম্মান: যাকওয়ান আল-মাদানী, হযরত আবু হুরায়রা ও আয়েশা (রা.)-এর বিশিষ্ট শাগরিদ (মৃত্যু ১০১ হি.)।
  • হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আলাইহিস সালাম): উলুল আযম পয়গম্বর, যাঁর জীবন ছিল যুহদ ও পার্থিব অনাসক্তির অনন্য প্রতীক।
  • সুলাইমান ইবনে মিহরান আল-আ’মাশ: কূফার অবিসংবাদিত ইমাম ও হাফিযে হাদীস (৬১-১৪৮ হি.)।

হাদীসের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষা:

  • মসজিদকে আবাস বানানো: এর মর্মার্থ হলো পার্থিব ব্যস্ততা কমিয়ে হৃদয়ের সম্পর্ক মসজিদের সাথে জুড়ে রাখা। যেমন হাদীসে আরশের ছায়াতলে আশ্রয়প্রাপ্ত সাত শ্রেণির অন্যতম হলো: «وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي الْمَسَاجِدِ» (যার হৃদয় মসজিদের সাথে ঝুলন্ত থাকে)।
  • ঘরকে পান্থশালা জ্ঞান করা: মানুষ যেমন সরাইখানায় স্থায়ীভাবে বসবাসের চিন্তা করে না, তদ্রূপ দুনিয়ার বাসস্থানকেও চিরস্থায়ী মনে না করা।
  • স্বল্পে তুষ্টি (ক্বানা’আত): বনের সাধারণ শাকসবজি ও বিশুদ্ধ পানিতে সন্তুষ্ট থেকে বিলাসিতা বর্জন করা।

(أ) ما معنى الزهد؟ وما مراتبه؟

যুহদ (الزهد)-এর পরিচয় এবং এর স্তরসমূহ:

১. যুহদ-এর আভিধানিক অর্থ:

‘যুহদ’ (الزُّهْدُ) একটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো— অনীহা, অনাসক্তি, নির্মোহতা, বর্জন করা, তুচ্ছ মনে করা এবং অপ্রয়োজনীয় বস্তু থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। কোনোকিছুর প্রতি আসক্তি না থাকাকে আরবীতে ‘যাহাদা ফীহি’ (زَهِدَ فِيهِ) বলা হয়।

২. যুহদ-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা:

ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় যুহদ হলো— অন্তরকে পার্থিব মোহ, ভোগবিলাস এবং ধন-সম্পদের লোভ-লালসা থেকে মুক্ত রেখে আখেরাতমুখী করা এবং কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে নিমগ্ন থাকা। উলামায়ে কিরাম ও সালাফে সালেহীনের দৃষ্টিতে যুহদের চমৎকার কিছু সংজ্ঞা নিম্নরূপ:

  • ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.): যুহদ হলো মানুষের কাছে যা আছে তা থেকে নিরাশ হওয়া এবং পার্থিব অতিরিক্ত আসক্তি বর্জন করা।
  • হাসান বসরী (রহ.): যুহদ বলতে হালাল জিনিসকে হারাম করা বা সম্পদ ধ্বংস করা বোঝায় না; বরং যুহদ হলো— নিজের হাতের চেয়ে আল্লাহর কুদরতের ওপর অধিক ভরসা রাখা এবং কোনো বিপদে পড়লে তার সাওয়াবের আশা রাখা।
  • ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.): যুহদ হলো এমন প্রতিটি বস্তু পরিত্যাগ করা, যা আখেরাতে কোনো উপকারে আসবে না (تَرْكُ مَا لَا يَنْفَعُ فِي الْآخِرَةِ)।
  • জুনাইদ বাগদাদী (রহ.): যুহদ হলো— হৃদয়কে এমনভাবে দুনিয়ামুক্ত রাখা যাতে তোমার হাত ধনসম্পদে পূর্ণ হলেও অন্তরে তার কোনো প্রভাব না পড়ে। অর্থাৎ ধন থাকা দোষের নয়, ধনের মোহ অন্তরে স্থান পাওয়াই দোষণীয়।

৩. যুহদ-এর স্তর ও প্রকারভেদ (مراتبه):

মুহাক্কিক আলেমগণ এবং বিশেষ করে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম গাযালী (রহ.) যুহদকে প্রধানত তিনটি স্তরে বিন্যস্ত করেছেন:

  • প্রথম স্তর — সাধারণ মুমিনদের যুহদ (زهد العوام / الزهد الواجب):

    হারাম ও শরীয়ত নিষিদ্ধ যাবতীয় বস্তু এবং কবিরা গুনাহ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত রাখা। এটি প্রতিটি মুসলিমের জন্য ‘ফরযে আইন’ বা ওয়াজিব। এই স্তরের যুহদ ব্যতীত কোনো ব্যক্তি প্রকৃত মুসলিম বা মুমিন হতে পারে না।

  • দ্বিতীয় স্তর — মুত্তাকী ও পরহেযগারদের যুহদ (زهد الخواص / الزهد المستحب):

    হারামের পাশাপাশি সন্দেহযুক্ত বিষয়াবলী (মুশাব্বাহাত) এবং প্রয়োজনাতিরিক্ত হালাল ভোগবিলাস ও আরাম-আয়েশ পরিত্যাগ করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ» অর্থাৎ “যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন ও সম্মানকে নিষ্কলুষ রাখল” (সহীহ বুখারী)। এটি মুস্তাহাব ও তাকওয়ার উন্নত স্তর।

  • তৃতীয় স্তর — সিদ্দীক ও আরিফীনদের যুহদ (زهد خواص الخواص / الزهد في كل ما يشغل عن الله):

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার স্মরণ ও সন্তুষ্টি থেকে বিচ্যুত করে এমন প্রতিটি পার্থিব আকর্ষণ ও মোহ থেকে হৃদয়কে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা। এই স্তরে বান্দা কেবল নিজের সত্ত্বা ও পার্থিব অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে পুরোপুরি মাওলার প্রেমে সমর্পিত হয়। হযরত ফুযাইল ইবনে ইয়ায (রহ.) বলেন: “সমগ্র দুনিয়া যদি কোনো মুমিনের জন্য হালাল উপায়ে পেশ করা হয়, তবুও সে তা থেকে বেঁচে থাকবে ঠিক যেমন মানুষ মৃত জন্তুর লাশের দুর্গন্ধ থেকে বেঁচে থাকে।”


٥- عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: أَخَذَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِي أَوْ بَعْضِ جَسَدِي فَقَالَ لِي: «يَا عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ! كُنْ فِي الدُّنْيَا غَرِيبًا أَوْ عَابِرَ سَبِيلٍ، وَعُدَّ نَفْسَكَ فِي أَهْلِ الْقُبُورِ»-

[৫. হযরত ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার হাত অথবা শরীরের কোনো অংশ ধরে বললেন: “হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর! দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন অপরিচিত মুসাফির অথবা পথচারী পথিক; আর নিজেকে সর্বদা কবরবাসীদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করো।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত স্নেহভরে আমার হাত কিংবা আমার শরীরের কোনো অঙ্গ (কাঁধ) আঁকড়ে ধরলেন, অতঃপর আমাকে লক্ষ্য করে বললেন: “হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর! এই নশ্বর পৃথিবীতে তুমি একজন নিঃসঙ্গ ভিনদেশী পরবাসীর মতো কিংবা একজন পথচারী মুসাফিরের মতো জীবনযাপন করো; আর নিজেকে সর্বদা কবরবাসীদের একজন বলেই গণ্য করো।”

হাদীসের রাবী ও পটভূমি:

  • হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.): উম্মতের অন্যতম শীর্ষ সুন্নাহর অনুসারী সাহাবী ও ফকীহ। কিশোর বয়সে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে এই অমূল্য নসীহত প্রদান করেন।
  • ইমাম বুখারী (রহ.) তাঁর সহীহ গ্রন্থে (হাদীস নং ৬৪১৬) ‘কিতাবুর রিক্বাক্ব’-এ এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং সেখানে ইবনে উমর (রা.)-এর এই উক্তি সংযোজিত রয়েছে: «إِذَا أَمْسَيْتَ فَلَا تَنْتَظِرِ الصَّبَاحَ، وَإِذَا أَصْبَحْتَ فَلَا تَنْتَظِرِ الْمَسَاءَ» অর্থাৎ “যখন সন্ধ্যায় উপনীত হও তখন সকালের আশা করো না, আর যখন সকালে উপনীত হও তখন সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষা করো না।”

(أ) حلل الكلمات الآتية: كُنْ، القبور، عُدَّ، أَخَذَ-

প্রদত্ত শব্দাবলীর ব্যাকরণিক ও আভিধানিক বিশদ বিশ্লেষণ (تحليل الكلمات):

১. كُنْ (কুন):

  • সীগাহ ও বাহাস: ওয়াহেদ মুযাক্কার হাযির (امر حاضر معروف – নির্দেশের সীগাহ)।
  • বাব: নাসারা-ইয়ানসুরু (নাক্বিস / كَانَ – يَكُونُ – كَوْنًا)।
  • মাদ্দা (ধাতুমূল): ك – و – ن (কাফ-ওয়াও-নূন)।
  • জিনস (প্রকার): মু’তাল্লে আইন / আজওয়াফে ওয়াওয়ী (الأجوف الواوي)।
  • তালীলের বিশ্লেষণ: মূল শব্দ ছিল ‘কূন্’ (كُوْنْ)। এখানে ওয়াও হরফে ইল্লতের ওপর জযম এবং শেষ বর্ণ নূনের ওপর ওয়াকফ/আমর-এর কারণে জযম হয়। এভাবে দুটি সাকিন বর্ণ একত্র হওয়ায় (ইলতিক্বায়ে সাকিনাইন) নিয়মানুযায়ী দুর্বল হরফে ইল্লত ‘ওয়াও’ বিলুপ্ত হয়ে ‘কুন’ (كُنْ) রূপ লাভ করে।
  • নাহভী (বাক্যতাত্ত্বিক) অবস্থান: এটি ‘ফেইলে নাক্বিস’ (فعل ناقص)। এর ‘ইসিম’ হলো ভেতরে প্রচ্ছন্ন সর্বনাম ‘আনতা’ (أَنْتَ), আর এর ‘খবর’ হলো পরবর্তী শব্দ ‘গারীবান’ (غَرِيبًا)।
  • অর্থ: তুমি হও, তুমি অবস্থান করো।

২. الْقُبُورُ (আল-কুবূর):

  • সীগাহ ও গঠন: জমা মুকাচ্ছার (جمع تكسير – বহুবচন), এটি ‘ফু’ঊল’ (فُعُولٌ) ওজনে গঠিত। এর একবচন হলো ‘ক্বাবর’ (قَبْرٌ)।
  • মাদ্দা: ق – ب – ر (ক্বাফ-বা-রা)।
  • জিনস: সহীহ (যাতে কোনো হরফে ইল্লত, হামযাহ বা দ্বিত্ব বর্ণ নেই)।
  • নাহভী অবস্থান: এটি ‘মুদাফ ইলাইহ’ (مضاف إليه), পূর্বে ‘আহল’ (أَهْلِ) শব্দ মুদাফ হওয়ায় এটি কাসরাহ বা যারযুক্ত হয়েছে। আলিফ-লাম যুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট (মা’রিফাহ) রূপ পরিগ্রহ করেছে।
  • অর্থ: কবরসমূহ, সমাধিভূমি বা কবরবাসী মৃত ব্যক্তিগণ।

৩. عُدَّ (উদ্দ):

  • সীগাহ ও বাহাস: ওয়াহেদ মুযাক্কার হাযির (امر حاضر معروف – নির্দেশবাচক ক্রিয়া)।
  • বাব: নাসারা-ইয়ানসুরু (عَدَّ – يَعُدُّ – عَدًّا)।
  • মাদ্দা: ع – د – د (আইন-দাল-দাল)।
  • জিনস: মুদা’আফে সুলাসী (المضاعف الثلاثي – একই অক্ষরের দ্বিত্ব)।
  • তালীলের বিশ্লেষণ: শব্দটি মূলত ছিল ‘উ’দুদ’ (اُعْدُدْ)। প্রথম দালের হরকত পূর্ববর্তী সাকিন বর্ণ আইনে স্থানান্তর করা হয়, অতঃপর দুটি দালকে একত্র করে তাশদীদের মাধ্যমে ইদগাম করা হয় এবং আমরের শেষে যবর দিয়ে ‘উদ্দা’ (عُدَّ) গঠিত হয়েছে।
  • নাহভী অবস্থান: এটি ‘ফেইলে আমর’ (فعل أمر)। এর ফা’ইল (কর্তা) হলো উহ্য ‘আনতা’ (أَنْتَ), এবং ‘নাফছাকা’ (نَفْسَكَ) হলো এর প্রথম মাফ’ঊলে বিহী (مفعول به)।
  • অর্থ: তুমি গণনা করো, গণ্য করো, অন্তর্ভুক্ত মনে করো।

৪. أَخَذَ (আখাযা):

  • সীগাহ ও বাহাস: ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব (بحث فعل ماضٍ معروف – অতীতকালীন সকর্মক ক্রিয়া)।
  • বাব: নাসারা-ইয়ানসুরু (أَخَذَ – يَأْخُذُ – أَخْذًا)।
  • মাদ্দা: أ – خ – ذ (হামযাহ-খা-যাল)।
  • জিনস: মাহমূযুল ফা (المهموز الفاء – ফা কালিমায় হামযাহ)।
  • নাহভী অবস্থান: এটি ‘ফেইলে মাযী’ (فعل ماض)। এর ফা’ইল হলো ‘আন-নাবিয়্যু’ (النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ), এবং ‘বিইয়াদী’ (بِيَدِي) জার-মাজরুর মিলে এর সাথে সম্পৃক্ত (মুতাআল্লিক্ব)।
  • অর্থ: তিনি আঁকড়ে ধরলেন, ধারণ করলেন, স্পর্শ করলেন।

٦- حَدَّثَنَا وَكِيعٌ قَالَ حَدَّثَنَا مِسْعَرٌ عَنْ زَيْدٍ الْعَمِّيِّ عَنْ أَبِي الصِّدِّيقِ النَّاجِيِّ إِنَّ سُلَيْمَانَ بْنَ دَاوُدَ خَرَجَ بِالنَّاسِ يَسْتَسْقِي فَمَرَّ عَلَى نَمْلَةٍ مُسْتَلْقِيَةٍ عَلَى قَفَاهَا رَافِعَةٍ قَوَائِمَهَا إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ تَقُولُ: «اللَّهُمَّ إِنَّا خَلْقٌ مِنْ خَلْقِكَ لَيْسَ لَنَا غِنًى عَنْ رِزْقِكَ، فَإِمَّا أَنْ تَسْقِيَنَا وَإِمَّا أَنْ تُهْلِكَنَا»، فَقَالَ سُلَيْمَانُ لِلنَّاسِ: «ارْجِعُوا فَقَدْ سُقِيتُمْ بِدَعْوَةِ غَيْرِكُمْ»-

[৬. ওয়াকী’ আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন মিস’আর আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন যায়দ আল-আম্মী থেকে, তিনি আবুস সিদ্দীক আন-নাজী থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত সুলাইমান ইবনে দাউদ (আলাইহিস সালাম) লোকদের নিয়ে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা (ইস্তিসকা) করতে বের হলেন। পথিমধ্যে তিনি একটি পিপীলিকার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, যা চিৎ হয়ে পিঠের ওপর শুয়ে আকাশের দিকে তার পাগুলো তুলে ধরে বলছিল: “হে আল্লাহ! আমরা আপনার সৃষ্টির একটি ক্ষুদ্র সৃষ্টি, আপনার রিযিক ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই; হয় আপনি আমাদের পানি পান করান, নতুবা আমাদের ধ্বংস করে দিন।” তখন হযরত সুলাইমান (আ.) লোকদের বললেন: “তোমরা ফিরে যাও, তোমাদের ভিন্ন অন্য এক সৃষ্টির দোয়ার বরকতে তোমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হয়েছে।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ওয়াকী’ (রহ.) মিস’আর থেকে, তিনি যায়দ আল-আম্মী থেকে, তিনি আবুস সিদ্দীক আন-নাজী (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর নবী হযরত সুলাইমান ইবনে দাউদ (আলাইহিস সালাম) তাঁর কওমের লোকদের সঙ্গে নিয়ে অনাবৃষ্টির কারণে বৃষ্টির প্রার্থনায় (সালাতুল ইস্তিসক্বা) মাঠে বের হলেন। পথিমধ্যে তিনি দেখতে পেলেন একটি পিপীলিকা চিৎ হয়ে জমিনে শুয়ে আছে এবং তার পাগুলো আসমানের দিকে তুলে অত্যন্ত আকুলভাবে দোয়া করছে: “হে আল্লাহ! আমরা তো আপনার সৃষ্টির একটি সামান্য সৃষ্টি মাত্র। আপনার রিযিক ও অনুগ্রহের মুখাপেক্ষিতা থেকে আমরা কোনোভাবেই অমুখাপেক্ষী নই। অতএব আপনি দয়া করে আমাদের বৃষ্টি দান করুন, অন্যথায় তো পিপাসায় আমরা ধ্বংস হয়ে যাব!” এ দৃশ্য দেখে ভাষাজ্ঞানী পয়গম্বর সুলাইমান (আ.) তাঁর লোকদের বললেন: “তোমরা সবাই বাড়ি ফিরে যাও; কারণ তোমাদের দোয়া ছাড়াও অন্য একটি ক্ষুদ্র সৃষ্টির (পিপীলিকার) আকুল প্রার্থনার উসিলায় তোমাদের ওপর বৃষ্টির ফায়সালা করা হয়েছে!”

সনদ ও বর্ণনাকারী পরিচিতি:

  • ইমাম ওয়াকী’ ইবনুল জাররাহ (রহ.): কূফার শ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদ ও হাফিয (১২৮-১৯৭ হি.), ইমাম শাফেয়ী ও আহমাদ ইবনে হাম্বলের উস্তাদ।
  • মিস’আর ইবনে কিদাম: কূফার বিশ্বস্ত ও ন্যায়নিষ্ঠ মুহাদ্দিস, যাঁকে হাদীস বর্ণনায় নির্ভুলতার কারণে ‘মুসহাফ’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল।
  • যায়দ ইবনে হাওয়ারী আল-আম্মী: বসরার একজন প্রসিদ্ধ আবেদ ও বর্ণনাকারী।
  • আবুস সিদ্দীক আন-নাজী (রহ.): বকর ইবনে আমর আল-বাসরী, নির্ভরযোগ্য তাবে’ঈ (মৃত্যু ১০০ হি.)।
  • হযরত সুলাইমান (আ.): বনী ইসরাঈলের নবী ও বাদশাহ, যাঁকে আল্লাহ পশু-পাখি ও কীট-পতঙ্গের ভাষা বোঝার অলৌকিক ক্ষমতা দান করেছিলেন।

হাদীসের মূল শিক্ষা ও তাত্ত্বিক হিকমত:

  1. আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টিই তাঁর তাসবীহ পাঠ করে এবং তাঁর নিকট প্রার্থনা জানায়। ইরশাদ হয়েছে: «وَإِن مِّن شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ» (সূরা বনী ইসরাঈল: ৪৪)।
  2. পিপীলিকা পা ওপরের দিকে তুলে আসমানের রবের দিকে মুখাপেক্ষী হয়েছিল, যা আল্লাহর উলূউ (আকাশমণ্ডল ও আরশের ওপর মহান রবের শ্রেষ্ঠত্ব) এবং দুআয় হাত তোলার স্বাভাবিক ফিতরাত প্রমাণ করে।
  3. দুর্বল ও অসহায় প্রাণীদের ওপর আল্লাহর বিশেষ দয়া বর্ষিত হয় এবং তাদের দোয়ার উসিলায় বড় বড় বিপদ ও খরা দূর হয়।

(أ) ما معنى الدعاء وما أدابه؟ ما حكم الدعاء الجماعي عقب الصلوة المفروضة؟ بين-

দোয়ার অর্থ, আদবসমূহ এবং ফরয সালাত পরবর্তী সম্মিলিত মোনাজাতের শরয়ী বিধান:

১. দোয়ার আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়:

  • আভিধানিক অর্থ: ‘আদ-দু’আ’ (الدُّعَاءُ) আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো— ডাকা, আহবান করা, সাহায্য প্রার্থনা করা, আকুল আবেদন জানানো এবং কোনো কিছু তলব করা।
  • পারিভাষিক অর্থ: চরম বিনয়, দীনতা ও অসীম মুখাপেক্ষিতা প্রকাশের মাধ্যমে একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকট স্বীয় কল্যাণ কামনা করা এবং অকল্যাণ ও বিপদাপদ থেকে পরিত্রাণের জন্য আকুতি পেশ করাকে শরীয়তের পরিভাষায় ‘দোয়া’ বলা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ» অর্থাৎ “দোয়াই হলো মূল ইবাদত” (সুনানে তিরমিযী: ২৯৬৯)।

২. দোয়ার গুরুত্বপূর্ণ আদবসমূহ (آداب الدعاء):

আল্লাহর দরবারে দোয়া গৃহীত হওয়ার জন্য হাদীস ও ফিকহবিদগণ কতিপয় অপরিহার্য আদব নির্ধারণ করেছেন:

  1. হালাল উপার্জন ও খাদ্যভক্ষণ: দোয়ার পূর্বে খাদ্য, পানীয় ও পোশাক হালাল হতে হবে। হারাম খেলে দোয়া কবুল হয় না।
  2. ইখলাস ও আন্তরিকতা: লোকদেখানো মানসিকতা পরিহার করে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দোয়া করা।
  3. আল্লাহর প্রশংসা ও নবীর ওপর দরূদ: দোয়ার শুরুতে আল্লাহর হামদ ও সানা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরূদ শরীফ পাঠ করা এবং শেষেও দরূদ পড়া। কারণ দুই দরূদের মধ্যবর্তী দোয়া আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না।
  4. কাকুতি-মিনতি ও বিনয় (খুশু-খুযু): নিজের পাপ ও অক্ষমতার স্বীকৃতি দিয়ে ভয় ও আশার সমন্বয়ে বিনীতভাবে দোয়া করা।
  5. কেবলামুখী হয়ে হাত তোলা: উভয় হাত সিনা বরাবর তুলে এবং দুই হাতের তালু আসমানের দিকে রেখে দোয়া করা সুন্নাত। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন: “নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক চিরঞ্জীব ও পরম দয়ালু; কোনো বান্দা যখন তাঁর দরবারে দুহাত তোলে, তখন তিনি তা খালি ও ব্যর্থ অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন” (আবু দাউদ: ১৪৮৮)।
  6. দৃঢ় প্রত্যয় ও নিশ্চয়তা: দোয়ায় কোনো দ্বিধা না রাখা; বরং কবুল হওয়ার পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে চাওয়া।
  7. তাড়াহুড়ো না করা: দোয়া করেই ‘কবুল হলো না’ বলে ধৈর্যহারা না হওয়া।
  8. দোয়ার শেষে ‘আমীন’ বলা এবং মুখে হাত মুছে নেওয়া।

৩. ফরয সালাত পরবর্তী সম্মিলিত দোয়ার হুকুম (حكم الدعاء الجماعي عقب الصلوات المفروضة):

পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাতের পর ইমাম ও মুক্তাদী মিলে সম্মিলিতভাবে হাত তুলে মোনাজাত করার শরয়ী হুকুম নিয়ে ইসলামী ফিকাহে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে:

  • ১. ফরয সালাত পরবর্তী সময় দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত:

    হযরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে আরজ করা হলো: হে আল্লাহর রাসূল! কোন সময়ের দোয়া সর্বাধিক কবুল হয়? তিনি উত্তরে ইরশাদ করলেন:

    «جَوْفَ اللَّيْلِ الْآخِرِ، وَدُبُرَ الصَّلَوَاتِ الْمَكْتُوبَاتِ»

    অর্থ: “রাতের শেষভাগে এবং ফরয সালাতসমূহের সমাপ্তির ঠিক পরপরই।” (জামে তিরমিযী: ৩৪৯৯ – হাসান হাদীস)।

  • ২. জামাতবদ্ধ দোয়ার ফযিলত:

    হাদীস শরীফে সম্মিলিত দোয়ার বিশেষ প্রভাব প্রমাণিত। হযরত হাবীব ইবনে মাসলামাহ আল-ফিহরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

    «لَا يَجْتَمِعُ مَلَأٌ فَيَدْعُو بَعْضُهُمْ وَيُؤَمِّنُ سَائِرُهُمْ، إِلَّا أَجَابَهُمُ اللَّهُ»

    অর্থ: “যখন কোনো জামাতে কিছু মানুষ একত্রিত হয়ে একজন দোয়া করে এবং অন্যরা ‘আমীন’ ‘আমীন’ বলে, আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই তাদের সেই সম্মিলিত দোয়া কবুল করে নেন।” (মুস্তাদরাকে হাকিম: ৩/৩৪৭, তাবারানী)।

  • ৩. ফুকাহায়ে কিরামের সার্বিক সিদ্ধান্ত ও হুকুম:
    • জমহুর উলামা ও হানাফী মাযহাব: পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাতের পর (যে সালাতের পর সুন্নাত নেই যেমন ফজর ও আসর সেখানে ফরজের পর, আর যার পর সুন্নাত আছে যেমন যোহর, মাগরিব ও এশা সেখানে সংক্ষেপে সুন্নাত সালাত আদায়ের পর) ইমাম-মুক্তাদী সম্মিলিতভাবে হাত তুলে দোয়া করা একটি ‘মুস্তাহাব’ (উত্তম) ও প্রশংসনীয় আমল (সুন্নাতে মুস্তাহাসসানাহ)। এটি রাসূল (সা.), সাহাবা ও সালাফদের সাধারণ আমল ও দোয়ার ব্যাপক নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত।
    • সতর্কতা ও মধ্যমপন্থা: এই সম্মিলিত মোনাজাতকে নামাযেরই অবিচ্ছেদ্য বা ফরয অঙ্গ মনে করা যাবে না। যদি কেউ কোনো কারণে একাকী দোয়া করে কিংবা দ্রুত উঠে চলে যায়, তবে তাকে তিরস্কার করা যাবে না। কোনো কোনো মুহাদ্দিস (যেমন শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ প্রমুখ) সার্বক্ষণিকভাবে ইমাম-মুক্তাদীর সম্মিলিত মোনাজাতকে জরুরি বানিয়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে মত দিয়েছেন। অতএব, এটিকে সালাতের শর্ত না বানিয়ে স্বাভাবিক সুন্নাত ও আদব হিসেবে পালন করাই শরীয়তের ভারসাম্যপূর্ণ বিধান।

مجموعة (ج) — سنن الدارمي (সুনানে আদ-দারেমী)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (ترجم الأحاديث التالية ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)


٧- عَنْ عَائِشَةَ (رَضِيَ اللهُ عَنْهَا) أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَأْكُلُ طَعَامًا فِي سِتَّةِ نَفَرٍ مِنْ أَصْحَابِهِ، فَجَاءَ أَعْرَابِيٌّ فَأَكَلَهُ بِلُقْمَتَيْنِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَمَا إِنَّهُ لَوْ ذَكَرَ اسْمَ اللهِ لَكَفَاكُمْ، فَإِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَذْكُرِ اسْمَ اللهِ، فَإِنْ نَسِيَ أَنْ يَذْكُرَ فِي أَوَّلِهِ فَلْيَقُلْ: بِسْمِ اللهِ أَوَّلَهُ وَآخِرَهُ»-

[৭. উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীগণের মধ্যকার ছয়জন লোকের সাথে খাবার খাচ্ছিলেন। এমন সময় এক বেদুইন এসে দুই লোকমায় সব খাবার খেয়ে ফেলল। তখন নবী করীম (সা.) ইরশাদ করলেন: “জেনে রেখো, সে যদি আল্লাহর নাম স্মরণ করত (বিসমিল্লাহ বলত), তবে এ খাবার তোমাদের সকলের জন্য যথেষ্ট হতো। অতএব যখন তোমাদের কেউ খাবার গ্রহণ করে, সে যেন আল্লাহর নাম স্মরণ করে। আর যদি শুরুতে আল্লাহর নাম নিতে ভুলে যায়, তবে সে যেন বলে: ‘বিসমিল্লাহি আউওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু’ (আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু ও শেষে)।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সম্মানিত সাহাবীগণের মধ্য থেকে ছয়জন বিশিষ্ট ব্যক্তির সাথে একত্রে খাবার গ্রহণ করছিলেন। ইত্যবসরে জনৈক গ্রাম্য বেদুইন লোক সেখানে এসে মাত্র দুই গ্রাস বা দুই লোকমায় পুরো খাবার সাবাড় করে ফেলল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত সাহাবীদের সান্ত্বনা ও শিক্ষা দিয়ে ইরশাদ করলেন: “তোমরা জেনে রেখো! এই লোকটি যদি খাবার গ্রহণের পূর্বে আল্লাহর নাম স্মরণ করত (বিসমিল্লাহ বলত), তবে এই খাদ্য বরকতময় হয়ে তোমাদের সকলের জন্যই যথেষ্ট হয়ে যেত! অতএব তোমাদের কেউ যখন খাবার খেতে বসে, সে যেন অবশ্যই শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে। আর যদি সে ভুলে গিয়ে খাওয়ার শুরুতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ না করে, তবে যখনই স্মরণ হবে তখন সে যেন বলে: ‘বিসমিল্লাহি আউওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু’ (অর্থাৎ আল্লাহর নাম নিয়ে আমি এর শুরু ও শেষ বরকতমণ্ডিত করছি)।”

সনদ ও হাদীস সংকলক পর্যালোচনা:

  • ইমাম আদ-দারেমী (রহ.): হাদিসের সংকলক, বিশ্ববিখ্যাত হাফিযে হাদীস আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান আদ-দারেমী আস-সামারকান্দী (১৮১-২৫৫ হি.)। তিনি তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘সুনানে আদ-দারেমী’ (কিতাবুল আত’ইমাহ)-এ এই সহীহ হাদীসটি সংকলন করেছেন।
  • উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.): সিদ্দীকে আকবর হযরত আবু বকর (রা.)-এর বিদুষী কন্যা এবং উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ফকীহা নারী সাহাবী।
  • হাদীসটি অন্যান্য হাদীসগ্রন্থেও বর্ণিত হয়েছে: জামে তিরমিযী (১৮৫৮), সুনানে আবু দাউদ (৩৭৬৭), সুনানে ইবনে মাজাহ (৩২৬৪) এবং মুসনাদে আহমাদ। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে ‘হাসান সহীহ’ আখ্যা দিয়েছেন।

হাদীসের মূল শিক্ষা ও ফিকহি বিধান:

  1. খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলার হুকুম: জমহুর উলামায়ে কিরামের মতে খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ’ এবং কোনো কোনো আলেমের মতে ওয়াজিব। কারণ আল্লাহর নাম বর্জন করলে খাবারে বরকত উঠে যায় এবং শয়তান তাতে অংশীদার হয়।
  2. শুরুতে ভুলে গেলে করণীয়: শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়তে ভুলে গেলে খাবারের যেকোনো পর্যায়ে মনে পড়ামাত্র «بِسْمِ اللَّهِ أَوَّلَهُ وَآخِرَهُ» (বিসমিল্লাহি আউওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু) বলা সুন্নাত। হাদীসে এসেছে, এটি পাঠ করা মাত্র শয়তান যা খেয়েছিল তা বমি করে ফেলে দেয়।
  3. একত্রে আহারে বরকত: জামাতবদ্ধ হয়ে সকলে মিলে এক পাত্রে আহার করলে খাবারে অলৌকিক বরকত সৃষ্টি হয়।

(أ) اذكر نبذة من حياة عائشة رضى الله عنها-

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:

১. জন্ম ও বংশপরিচয়:

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর কন্যা। তাঁর মাতার নাম উম্মে রূমান যয়নব বিনতে আমের (রা.)। তিনি কুরাইশ বংশের সুপ্রসিদ্ধ তায়ম গোত্রে নবুওয়াতের চতুর্থ অথবা পঞ্চম বর্ষে মক্কা মুকাররমায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর উপাধি ছিল ‘সিদ্দীক্বা’ (পরম সত্যবাদিনী) ও ‘হুমায়রা’ এবং কুনিয়াত ছিল ‘উম্মে আব্দুল্লাহ’ (ভাগ্নে আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবায়েরের নামে)।

২. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে শুভ বিবাহ ও দাম্পত্য জীবন:

হযরত খাদীজা (রা.)-এর ওফাতের পর আল্লাহর প্রত্যক্ষ নির্দেশে ও প্রত্যাদেশের মাধ্যমে শাওয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে তাঁর শুভ নিকাহ অনুষ্ঠিত হয়। হিজরতের পর মদীনা মুনাওয়ারায় শাওয়াল মাসেই তাঁর বাসর উদযাপিত হয়। উম্মুল মুমিনীনদের মধ্যে একমাত্র হযরত আয়েশা (রা.)-ই ছিলেন অবিবাহিতা ও কুমারী। তিনি ছিলেন নবী করীম (সা.)-এর সর্বাধিক প্রিয়তমা সহধর্মিণী। রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “মানুষের মধ্যে আপনার নিকট সর্বাধিক প্রিয় কে?” তিনি নিঃসঙ্কোচে উত্তর দিয়েছিলেন: “আয়েশা!”

৩. পবিত্রতা ও নিষ্পাপতার আসমানী ঘোষণা (ইফকের ঘটনা):

বনু মুস্তালিক্ব যুদ্ধের পর মুনাফিকরা তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও জঘন্য অপবাদ (হাদিসুল ইফক) রটনা করেছিল। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর নিষ্পাপতা, পবিত্রতা ও সততা প্রমাণে সূরা আন-নূরে আকাশ থেকে একাদিক্রমে ১০টি পবিত্র আয়াত (১১-২০) নাযিল করে তাঁকে কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মুমিন উম্মতের আদর্শ ও পুণ্যবতী হিসেবে ঘোষণা করেন।

৪. ইলমে হাদীস, তাফসীর ও ফিকাহে অতুলনীয় অবদান:

হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নারী আলিমা ও ফকীহা। তাঁর অসাধারণ মেধা, প্রখর স্মৃতিশক্তি ও অনুসন্ধিৎসু মননের কারণে তিনি শরীয়তের নিগূঢ় রহস্যের আধার ছিলেন।

  • হাদীস বর্ণনা: তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে মোট ২,২১০টি হাদীস রেওয়ায়াত করেছেন। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী শীর্ষ মুকসিরীনদের মাঝে তাঁর অবস্থান চতুর্থ।
  • ফিকাহ ও ফতোয়া: তিনি মদীনার প্রধান মুফতিদের অন্যতম ছিলেন। বড় বড় জলীলুল কদর সাহাবীগণ যখনই কোনো জটিল ফিকহি বা তাফসীরি মাসআলায় মতবিরোধ করতেন, তাঁরা হযরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরায় এসে সমাধান নিতেন। প্রখ্যাত তাবে’ঈ উরওয়াহ ইবনুয যুবায়ের (রহ.) বলেন: “আমি কুরআন, ফারায়েয (উত্তরাধিকার আইন), হালাল-হারাম, চিকিৎসাশাস্ত্র ও আরবী কাব্যে আয়েশা (রা.)-এর চেয়ে অধিক জ্ঞানী আর কাউকেই দেখিনি।”

৫. ওফাত ও চিরবিদায়:

এই মহান মহীয়সী উম্মুল মুমিনীন ৫৮ হিজরীর ১৭ই রমজান মুবারক মঙ্গলবার রাতে প্রায় ৬৬ বছর বয়সে মদীনা মুনাওয়ারায় ওফাত লাভ করেন। তাঁর ওসিয়ত মোতাবেক হযরত আবু হুরায়রা (রা.) জানাজার নামাযে ইমামতি করেন এবং সাহাবা ও তাবে’ঈদের অশ্রুসজল উপস্থিতিতে গভীর রাতে মদীনার ঐতিহাসিক জান্নাতুল বাক্বী গোরস্তানে তাঁকে দাফন করা হয়।


٨- عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَأْكُلْ بِيَمِينِهِ وَلْيَشْرَبْ بِيَمِينِهِ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْكُلُ بِشِمَالِهِ وَيَشْرَبُ بِشِمَالِهِ»-

[৮. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, সে যেন ডান হাত দিয়ে খায়; এবং যখন পান করে, সে যেন ডান হাত দিয়ে পান করে। কেননা শয়তান বাম হাত দিয়ে খায় এবং বাম হাত দিয়েই পান করে।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেছেন: “যখন তোমাদের কেউ খাদ্য গ্রহণ করে, সে যেন অবশ্যই তার ডান হাত দিয়ে খায়; এবং যখন পানি বা পানীয় গ্রহণ করে, সে যেন অবশ্যই তার ডান হাত দিয়ে পান করে। কেননা শয়তান বাম হাত দিয়ে আহার করে এবং বাম হাত দিয়েই পান করে।”

সনদ ও বর্ণনাকারী পর্যালোচনা:

  • ইমাম আদ-দারেমী (রহ.): তিনি সুনানের ‘কিতাবুল আত’ইমাহ’-তে সহীহ সনদে এটি উদ্ধৃত করেছেন। এছাড়া ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে (হাদীস নং ২০২০) ইমাম যুহরী সূত্রে এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
  • হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.): রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ হুবহু অনুসরণের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় আদর্শ।

হাদীসের ফিকহি হুকুম ও তাত্পর্য:

  • ডান হাত ব্যবহারের হুকুম: জমহুর ফকীহগণের মতে বিনা ওজরে ডান হাত দিয়ে খাওয়া ও পান করা ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ’ এবং অনেক মুহাদ্দিস ও জাহেরী আলেমদের মতে এটি সরাসরি ‘ওয়াজিব’। বাম হাত দিয়ে খাওয়া মাকরূহে তাহরীমী। তবে ডান হাতে কোনো ক্ষত বা শারীরিক অক্ষমতা থাকলে বাম হাতে খাওয়া সম্পূর্ণ বৈধ।
  • শয়তানের অনুকরণ বর্জন: ইসলামে শয়তান ও পাপাচারীদের সাদৃশ্য গ্রহণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ডান হাত হলো সম্মান, পবিত্রতা ও বরকতের প্রতীক; আর বাম হাত হলো অপবিত্রতা দূরীকরণ ও শৌচকার্যের জন্য নির্ধারিত।

(أ) ما هي سنن المأدبة؟ بيّن في ضوء السنة-

সুন্নাহর আলোকে ভোজন ও খাবারের সুন্নাত ও শিষ্টাচারসমূহ (سنن المأدبة):

‘আল-মায়দুবাহ’ (الْمَأْدُبَةُ) অর্থ হলো ভোজ, আহার ও খাবারের দস্তরখান। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আহার গ্রহণকে কেবল জৈবিক ক্ষুধা নিবৃত্তির মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং একে আল্লাহর শুকরিয়া ও মহামূল্যবান ইবাদতে রূপান্তরিত করেছেন। সুন্নাহর আলোকে খাবারের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত ও আদবসমূহ নিম্নরূপ:

১. খাবার গ্রহণের পূর্ববর্তী সুন্নাতসমূহ:

  • উভয় হাত ধৌত করা: আহারের পূর্বে কবজি পর্যন্ত উভয় হাত উত্তমরূপে ধুয়ে পরিষ্কার করা সুন্নাত (সুনানে আবু দাউদ: ৩৭৬১)।
  • মাটিতে দস্তরখান বিছানো: উঁচু টেবিল বা অহংকারের আসবাব পরিহার করে মাটিতে পরিষ্কার দস্তরখান বিছিয়ে আহার করা বিনম্রতার সুন্নাত (সহীহ বুখারী: ৫৩৮৬)।
  • সুন্নাহসম্মত উপায়ে বসা: অহংকারী ভঙ্গিমায় হেলান দিয়ে বসা নিষিদ্ধ। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন: «لَا آكُلُ مُتَّكِئًا» অর্থাৎ “আমি হেলান দিয়ে বসে খাই না” (সহীহ বুখারী)। বসার সুন্নাহ পদ্ধতি হলো: মাটিতে দুই হাঁটু গেড়ে বসা অথবা ডান হাঁটু খাড়া রেখে বাম উরুর ওপর বসা।
  • খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা: রাসূল (সা.) বলেন: «سَمِّ اللَّهَ» অর্থাৎ “আল্লাহর নাম নাও” (সহীহ বুখারী: ৫৩৭৬)।

২. খাবার গ্রহণকালীন সুন্নাতসমূহ:

  • ডান হাত দিয়ে আহার করা: সর্বাবস্থায় ডান হাত দিয়ে খাওয়া ও পান করা আবশ্যক।
  • নিজের সম্মুখভাগ থেকে খাওয়া: এক পাত্রে আহারের সময় নিজের সামনে থেকে খাওয়া সুন্নাত। রাসূল (সা.) হযরত উমর ইবনে আবি সালামাহ (রা.)-কে বলেছিলেন: «وَكُلْ مِمَّا يَلِيكَ» অর্থাৎ “এবং তোমার নিকটবর্তী সম্মুখভাগ থেকে খাও” (সহীহ বুখারী)। তবে ফলমূল বা বিভিন্ন পদের খাবার হলে পাত্রের বিভিন্ন স্থান থেকে নেওয়া যায়।
  • তিন আঙুল ব্যবহার করা: বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনী ও মধ্যমা— এই তিন আঙুল দিয়ে আহার করা সুন্নাত (সহীহ মুসলিম: ২০৩২)।
  • খাবারের কোনো দোষ না ধরা: খাদ্যের নিন্দা বা খুঁত ধরা সুন্নাহ পরিপন্থী। রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো কোনো খাবারের দোষ ধরতেন না; রুচি হলে খেতেন, অপছন্দ হলে চুপচাপ রেখে দিতেন (সহীহ বুখারী: ৫৪০৯)।
  • অতিরিক্ত গরম খাবার পরিহার ও ফুঁ না দেওয়া: খুব গরম খাদ্য বর্জন করা এবং খাবারে বা পানীয়তে ফুঁ দেওয়া নিষিদ্ধ (মুসনাদে আহমাদ)।
  • খাবারের অপচয় রোধ ও পড়ে যাওয়া লোকমা খাওয়া: লোকমা বা খাবারের দানা মাটিতে পড়ে গেলে ময়লা পরিষ্কার করে তা খেয়ে ফেলা সুন্নাত, শয়তানের জন্য ফেলে রাখা যাবে না (সহীহ মুসলিম: ২০৩৪)।

৩. খাবার সমাপ্তির সুন্নাতসমূহ:

  • আঙুল ও পাত্র চেটে পরিষ্কার করা: খাওয়ার শেষে আঙুলগুলো চেটে পরিষ্কার করা এবং পাত্র মুছে খাওয়া সুন্নাত। কারণ খাদ্যের কোন অংশে আল্লাহর বরকত নিহিত রয়েছে তা বান্দা জানে না (সহীহ মুসলিম: ২০৩৩)।
  • আল্লাহর শোকর আদায় ও দো’আ পাঠ: আহার শেষে মাওলার দরবারে শুকরিয়া জানিয়ে দো’আ পড়া সুন্নাত:

    «الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنَا وَسَقَانَا وَجَعَلَنَا مُسْلِمِينَ»

    অর্থ: “সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আমাদের আহার করালেন, পান করালেন এবং আমাদের মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করলেন।” (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫০)।

  • খাওয়ার পর কুলি করা ও হাত ধোয়া।

٩- عَنْ أَبِي ذَرٍّ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ) قَالَ: أَوْصَانِي خَلِيلِي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «إِذَا طَبَخْتَ مَرَقَةً فَأَكْثِرْ مَاءَهَا، ثُمَّ انْظُرْ أَهْلَ بَيْتٍ مِنْ جِيرَانِكَ فَأَغْرِفْ لَهُمْ مِنْهَا»-

[৯. হযরত আবু যর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমার পরম বন্ধু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ওসিয়ত করে ইরশাদ করেছেন: “যখন তুমি ঝোলওয়ালা তরকারি রান্না করো, তখন তাতে পানির পরিমাণ বাড়িয়ে দাও; অতঃপর তোমার প্রতিবেশীদের পরিবারের খোঁজখবর নাও এবং তাদের জন্য তা থেকে সদ্ব্যবহারস্বরূপ কিছু অংশ তুলে পাঠিয়ে দাও।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: জলীলুল কদর সাহাবী হযরত আবু যর আল-গিফারী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: আমার পরম প্রিয় বন্ধু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বিশেষ উপদেশ দিয়ে নির্দেশ করেছেন: “হে আবু যর! যখন তুমি নিজের জন্য গোশত বা কোনো তরকারির ঝোল রান্না করবে, তখন তাতে কিছুটা অতিরিক্ত পানি বাড়িয়ে ঝোল বেশি করো; অতঃপর তোমার প্রতিবেশীর পরিবারের প্রতি লক্ষ্য রাখো এবং তাদের জন্য সেই রান্না থেকে সম্মানজনকভাবে একটি অংশ তুলে পাঠিয়ে দাও।”

সনদ ও বর্ণনাকারী পরিচিতি:

  • ইমাম আদ-দারেমী (রহ.): তিনি সুনানের কিতাবুল আত’ইমাহ-তে এটি সংকলন করেছেন। এছাড়াও ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে (হাদীস নং ২৬২৫) ‘কিতাবুল বির্রি ওয়াস সিলাহ’-তে এটি সংকলন করেছেন।
  • হযরত আবু যর আল-গিফারী (রা.): আস-সাবিকূনাল আউয়ালূনের অন্যতম, যাঁর নাম জুনদুব ইবনে জুনাদাহ। তিনি চরম যুহদ, সততা ও দরিদ্রবান্ধব চরিত্রের জন্য প্রখ্যাত ছিলেন। রাসূল (সা.) তাঁর সততার প্রশংসা করে বলেছিলেন: “আবু যরের চেয়ে অধিক সত্যবাদী কাউকে এই আকাশ ছায়া দেয়নি এবং মাটি ধারণ করেনি।”

হাদীসের অন্তর্নিহিত মহিমা ও সামাজিক শিক্ষা:

  • প্রতিবেশীর প্রতি সহানুভূতি: রান্নার সুবাস প্রতিবেশীর ঘরে পৌঁছে তাদেরকে ব্যথিত করতে পারে। তাই সাধ্য সীমিত হলেও ঝোল বাড়িয়ে হলেও প্রতিবেশীকে শরিক করা সামাজিক ভ্রাতৃত্বের অনন্য নিদর্শন।
  • তুচ্ছ উপঢৌকনকে ছোট মনে না করা: সামর্থ্যবান না হলেও আন্তরিকতার সাথে সামান্য ঝোল পাঠিয়েও ভালোবাসার আদান-প্রদান করা যায়।

(أ) بيّن حقوق الجيران في ضوء القرآن والسنة-

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রতিবেশীর অধিকারসমূহ (حقوق الجيران):

ইসলামী সমাজব্যবস্থায় প্রতিবেশীর অধিকার অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও সংবেদনশীল। ইসলাম পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে প্রতিবেশীর হককে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েছে। নিম্নে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তা বিস্তারিত বর্ণনা করা হলো:

১. পবিত্র কুরআনের অকাট্য নির্দেশ:

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজের তাওহীদের পর পিতামাতার সাথে ভালো ব্যবহারের পাশাপাশি প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন:

«وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ»

অর্থ: “তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না; পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো এবং নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী এবং সঙ্গী-সাথীদের প্রতি সদয় আচরণ করো।” (সূরা আন-নিসা: ৩৬)। এখানে ‘নিকট প্রতিবেশী’ (আল-জারু যিল কুরবা) এবং ‘দূর প্রতিবেশী’ (আল-জারুল জুনুব)— উভয়ের অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে।

২. হাদীস শরীফে প্রতিবেশীর অধিকার ও ওয়ারিশ হওয়ার আশঙ্কা:

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা ও হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

«مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ، حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ»

অর্থ: “জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে এত বেশি অবিরাম তাগিদ দিচ্ছিলেন যে, আমার মনে হচ্ছিল তিনি হয়তো অচিরেই প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী (ওয়ারিশ) বানিয়ে দেবেন!” (সহীহ বুখারী: ৬০১৪, সহীহ মুসলিম: ২৬২৪)।

৩. প্রতিবেশীর কষ্ট দেওয়াকে ঈমানহীনতার লক্ষণ ঘোষণা:

হযরত আবু শুরায়হ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) তিনবার শপথ করে বললেন: «وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ!» অর্থাৎ “আল্লাহর কসম সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম সে মুমিন নয়!” সাহাবীগণ আরজ করলেন: কে সেই ব্যক্তি, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি ইরশাদ করলেন: «الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ» অর্থাৎ “যার অনিষ্ট ও উৎপাত থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না!” (সহীহ বুখারী: ৬০১৬)।

৪. শরীয়তের আলোকে প্রতিবেশীর তিন প্রকার ও তাদের হকের স্তর:

মুহাদ্দিসীনে কিরাম প্রতিবেশীকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করেছেন:

  • ১. তিন হকের অধিকারী প্রতিবেশী: যে ব্যক্তি মুসলিম, নিকটাত্মীয় এবং প্রতিবেশী। সে প্রতিবেশীর হক, ইসলামের ভ্রাতৃত্বের হক এবং আত্মীয়তার হক— এই তিনটি হক পাওয়ার অধিকারী।
  • ২. দুই হকের অধিকারী প্রতিবেশী: যে ব্যক্তি মুসলিম কিন্তু আত্মীয় নয়। সে ইসলামের ভ্রাতৃত্বের হক এবং প্রতিবেশীর হক— এই দুটি হক পাবে।
  • ৩. এক হকের অধিকারী প্রতিবেশী: অমুসলিম প্রতিবেশী। সে ধর্মের ভিন্নতা সত্ত্বেও ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজে ‘প্রতিবেশীর মৌলিক অধিকার’ লাভের সম্পূর্ণ হকদার।

৫. প্রতিবেশীর বাস্তব অধিকারসমূহ:

  1. ক্ষুধার্ত প্রতিবেশীর খাবারের দায়িত্ব: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন: “সে ব্যক্তি আমার প্রতি প্রকৃত ঈমান আনেনি, যে নিজে পেট ভরে তৃপ্ত হয়ে রাত কাটায় অথচ তার পাশেই তার প্রতিবেশী অনাহারে ক্ষুধার্ত থাকে এবং সে তা জানে!” (তাবারানী, সহীহুল জামে: ৫৫৩২)।
  2. উপহার বিনিময় ও হৃদ্যতা সৃষ্টি: হাদিয়া আদান-প্রদান করা। রাসূল (সা.) নারী সাহাবীদের লক্ষ্য করে বলেন: কোনো নারী যেন প্রতিবেশীর সামান্য উপহারকে তুচ্ছ না ভাবে, তা যদি একটি বকরির খুরও হয় (সহীহ বুখারী)।
  3. সুখ-দুঃখ ও বিপদে পাশে দাঁড়ানো: প্রতিবেশী ঋণ চাইলে সাধ্যমতো ঋণ দেওয়া, অসুস্থ হলে সেবা করা, বিপদে সান্ত্বনা দেওয়া, সুসংবাদে মোবারকবাদ জানানো এবং ইন্তেকাল করলে জানাজায় শরিক হওয়া।
  4. প্রতিবেশীর গোপনীয়তা ও সম্ভ্রম রক্ষা: প্রতিবেশীর ঘরে উঁকি না দেওয়া, তাদের দোষত্রুটি গোপন রাখা এবং জান-মালের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

مجموعة (د) — الأسئلة العامة (সাধারণ প্রশ্নাবলি ও গ্রন্থ-সংকলক পরিচিতি)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (أجب عن سؤالين فقط)


١٠- بَيِّنْ خَصَائِصَ مُصَنَّفِ عَبْدِ الرَّزَّاقِ وَمَكَانَتَهُ بَيْنَ كُتُبِ الْحَدِيثِ-

[১০. মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং হাদীস গ্রন্থসমূহের মাঝে এর মর্যাদা ও স্থান বিশদভাবে আলোচনা করো।]

ভূমিকা:

ইসলামী জ্ঞানের ইতিহাসে দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরী শতাব্দী ছিল হাদীস সংকলন ও বিন্যাসের স্বর্ণযুগ। এই যুগে ‘মুসান্নাফ’ (المصنف) সংকলনরীতির বিকাশ ঘটে, যেখানে কেবল মারফূ হাদীসই নয়; বরং সাহাবায়ে কিরামের ফতোয়া (মাওকূফ) এবং তাবে’ঈগণের সিদ্ধান্ত ও আসার (মাক্বতূ) ফিকহি অধ্যায়ভিত্তিক বিন্যস্ত করা হতো। এই ধারার সর্বপ্রাচীন ও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মৌলিক আকর গ্রন্থ হলো ইমাম আবু বকর আব্দুর রাযযাক আস-সান’আনী (রহ.)-এর সংকলিত ‘আল-মুসান্নাফ’ (المصنف لعبد الرزاق)। গ্রন্থটি ইসলামী ফিকাহের উৎস সন্ধান এবং প্রাথমিক যুগের আমল ও আছারের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিশ্বজুড়ে অবিসংবাদিত মর্যাদায় অভিষিক্ত।

গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

মুসান্নাফ-এর সংকলক হলেন প্রখ্যাত হাফিযে হাদীস ইমাম আবু বকর আব্দুর রাযযাক ইবনে হুমাম ইবনে নাফে আল-হিময়ারী আস-সান’আনী (১২৬-২১১ হিজরী)। তিনি ইয়ামেনের সান’আ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি মা’মার ইবনে রাশিদ, ইবনে জুরাইজ, সুফিয়ান সাওরী, আওযাঈ এবং মালেক ইবনে আনাস (রহ.)-এর মতো যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসগণের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাঁর ছাত্র তালিকায় রয়েছেন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন এবং আলী ইবনুল মাদীনীর মতো হাদীস শাস্ত্রের স্তম্ভতুল্য ইমামগণ।

মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক গ্রন্থের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص المصنف):

‘মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক’ গ্রন্থটি অন্যান্য হাদীস সংকলন থেকে বেশ কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্যে স্বকীয় ও সমুজ্জ্বল:

  1. ১. ফিকহি তারতীব ও বিষয়ভিত্তিক বিন্যাস: গ্রন্থটি তৎকালীন ফিকাহবিদদের চর্চানুযায়ী ফিকহি অধ্যায়ে সুবিন্যস্ত। কিতাবুত তাহারাত, কিতাবুছ ছালাত, কিতাবুয যাকাত, কিতাবুল মাগাযী, কিতাবুত তাফসীরসহ মোট ৩১টি মূল কিতাব এবং শত শত অনুচ্ছেদে (আবওয়াব) এটি বিন্যস্ত।
  2. ২. হাদিস, আসার ও ফতোয়ার সুবিশাল মিলনমেলা: মুসান্নাফ পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো এতে একই সাথে তিনটি স্তরের বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছে:
    • হাদীসে মারফূ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত বাণী ও আমল।
    • হাদীসে মাওকূফ: সাহাবায়ে কিরামের আমল, ব্যাখ্যা ও ফতোয়া।
    • হাদীসে মাক্বতূ: তাবে’ঈ ও তাবে-তাবে’ঈগণের ইজতিহাদ ও ফতোয়া।

    মুহাদ্দিস হাবীবুর রহমান আল-আ’যমী (রহ.)-এর তাহকিককৃত সংস্করণে এতে মোট ২১,০৩৩টি বর্ণনা রয়েছে।

  3. ৩. ইয়ামেন ও হেজাযের প্রাচীনতম সনদের সংরক্ষণ: মা’মার ইবনে রাশিদ (রহ.) এবং ইবনে জুরাইজ (রহ.)-এর মাধ্যমে বসরী, মাক্কী ও সান’আনীর প্রাচীনতম ও বিশুদ্ধ সনদের এক সুবিশাল ভাণ্ডার এই গ্রন্থে সংরক্ষিত হয়েছে, যা অন্য কোনো গ্রন্থে এত ব্যাপকভাবে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে মা’মার সূত্রে ইমাম যুহরীর বর্ণনাসমূহের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভাণ্ডার হলো এই গ্রন্থ।
  4. ৪. সালাফদের ফিকহি মতপার্থক্য (ইখতিলাফুল ফুকাহা)-এর জীবন্ত ইতিহাস: বিভিন্ন মাসআলায় সাহাবা ও তাবে’ঈদের মধ্যে যে মতভেদ ছিল, তার প্রামাণ্য উৎস হলো মুসান্নাফ। ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর ফিকহি সিদ্ধান্তের শিকড় বুঝতে এই গ্রন্থটি অপরিহার্য।
  5. ৫. সনদের উচ্চ মান ও সংক্ষিপ্ততা (আল-উলুউ ফিস সানাদ): হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সংকলিত হওয়ায় ইমাম আব্দুর রাযযাক ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাঝে মাত্র ২/৩ জনের মধ্যবর্তী বর্ণনাকারী রয়েছেন (যেমন: আব্দুর রাযযাক -> মা’মার -> যুহরী -> আনাস রা.)। এই ধরনের উচ্চ ও সংক্ষিপ্ত সনদ মুহাদ্দিসদের নিকট অতীব মূল্যবান।
  6. ৬. ঐতিহাসিক ও মাগাযী তথ্যের প্রাচুর্য: কিতাবুল মাগাযী ও সীরাত অংশে রাসূল (সা.)-এর যুদ্ধবিগ্রহ ও প্রাথমিক ইতিহাসের বহু দুর্লভ বর্ণনা এতে উদ্ধৃত হয়েছে যা সীরাত বিশেষজ্ঞদের প্রধান অবলম্বন।

হাদীস শাস্ত্র ও গ্রন্থসমূহের মাঝে এর মর্যাদা ও স্থান (مكانته بين كتب الحديث):

মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাকের স্থান হাদীস শাস্ত্রে অনন্য উচ্চতায় অবস্থিত:

  • ১. মুহাদ্দিস ও ইমামগণের মূল্যায়ন:
    • ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.): তিনি ইলমে হাদীস অন্বেষণের জন্য বাগদাদ থেকে সুদূর ইয়ামেনে পায়ে হেঁটে সফর করেছিলেন শুধুমাত্র আব্দুর রাযযাকের মুসান্নাফ শোনার জন্য। তিনি বলতেন: “আব্দুর রাযযাকের হাদীসের চেয়ে বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হাদিস ইয়ামেনে আর কারও কাছে নেই।”
    • ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ (রহ.): তিনি আব্দুর রাযযাককে সনদের বিশ্বস্ততার অনন্য প্রতীক মনে করতেন।
    • ইবনে আদী (রহ.): “হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে আব্দুর রাযযাকের মতো এত বিপুল পরিমাণ বর্ণনা অন্য কেউ সংকলন করতে সক্ষম হননি।”
  • ২. কুতুবে সিত্তাহর ভিত্তিপ্রস্তর: ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমসহ কুতুবে সিত্তাহর প্রায় সকল রচয়িতা মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাকের রেওয়ায়াতকে তাঁদের সহীহ গ্রন্থসমূহের অন্যতম মৌলিক সনদ ও ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইমাম বুখারী ও মুসলিম উভয়েই আব্দুর রাযযাকের সনদে শত শত হাদীস তাঁদের কিতাবে উদ্ধৃত করেছেন।
  • ৩. ফিকাহ শাস্ত্রের আকর গ্রন্থ: হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী— চার মাযহাবের উসূলবিদ ও ফকীহগণের নিকট মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক হলো সাহাবা ও তাবে’ঈদের আমল জানার এক নম্বর সনদভিত্তিক দলিল।
  • ৪. আধুনিক যুগে গ্রন্থটির পুনর্জাগরণ: দীর্ঘকাল পাণ্ডুলিপি আকারে বিলুপ্তপ্রায় থাকার পর বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ হাদীস গবেষক আল্লামা হাবীবুর রহমান আল-আ’যমী (রহ.) অক্লান্ত পরিশ্রমে বিভিন্ন দেশের দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে ১১ খণ্ডে গ্রন্থটি তাহকিক ও প্রকাশ করেন, যা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ইলমি অঙ্গনে এক অবিস্মরণীয় বিপ্লব সৃষ্টি করে।

উপসংহার:

মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক কেবল একটি হাদীস গ্রন্থই নয়; বরং এটি ইসলামের প্রথম দুই শতাব্দীর সুন্নাহ ও সালাফদের জীবন্ত আমলের এক ঐতিহাসিক প্রামাণ্য মহাকোষ। হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের জন্য এই গ্রন্থের অধ্যয়ন অপরিহার্য ও দিগদর্শনতুল্য।


١١- اكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاةِ الْإِمَامِ ابْنِ أَبِي شَيْبَةَ، ثُمَّ بَيِّنْ مَكَانَتَهُ فِي عِلْمِ الْحَدِيثِ-

[১১. ইমাম ইবনে আবী শায়বাহ (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখ এবং ইলমে হাদীসে তাঁর অনন্য স্থান ও মর্যাদা বিশদভাবে বর্ণনা করো।]

ভূমিকা:

ইলমে হাদীসের সুবিশাল আসমানে যে কয়জন মহান ইমাম তাঁদের পাহাড়সম স্মৃতিশক্তি, তীক্ষ্ণ মেধা এবং হাদীস সংরক্ষণে অনন্য অবদানের জন্য চিরভাস্বর হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব হলেন আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীস ইমাম আবু বকর ইবনে আবী শায়বাহ (রহ.)। তিনি ছিলেন হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর মুহাদ্দিসকুলের মধ্যমণি এবং বিশ্ববিখ্যাত ‘মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ’ গ্রন্থের প্রণেতা।

ইমাম ইবনে আবী শায়বাহ (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (نبذة من حياته):

  • ১. নাম, উপাধি ও বংশপরিচয়:

    তাঁর নাম আব্দুল্লাহ, কুনিয়াত আবু বকর। পিতার নাম মুহাম্মদ, দাদার নাম ইব্রাহীম (আবু শায়বাহ)। তাঁর পূর্ণ নসবনামা হলো: আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবী শায়বাহ ইব্রাহীম ইবনে উসমান আল-আবসী আল-কূফী। তিনি কূফার বিখ্যাত বনু আবস গোত্রের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে তাঁকে ‘আল-আবসী’ বলা হয়।

  • ২. ইলমি পরিবার ও ঐতিহ্য:

    ইমাম ইবনে আবী শায়বাহ একটি ঐতিহ্যবাহী বিদগ্ধ হাদীস পরিবারে লালিত-পালিত হন। তাঁর দাদা আবু শায়বাহ ইব্রাহীম ছিলেন ওয়াসিতের কাযী বা প্রধান বিচারক। তাঁর সহোদর দুই ভাই— উসমান ইবনে আবী শায়বাহ এবং কাসেম ইবনে আবী শায়বাহ— উভয়েই ছিলেন হাদীস শাস্ত্রের প্রখ্যাত হাফিয। বিশেষ করে তাঁর ভাই উসমান ইবনে আবী শায়বাহও ইমাম বুখারী ও মুসলিমের অন্যতম শীর্ষ উস্তাদ ছিলেন।

  • ৩. জন্ম ও শিক্ষাজীবন:

    তিনি ১৫৯ হিজরীতে তদানীন্তন ইলমের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মারকায ইরাকের কূফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি পবিত্র কুরআন হিফয করেন এবং তৎকালীন কূফার শীর্ষ মুহাদ্দিসগণের দরবারে হাদীস শ্রবণ শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি হাদীস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বসরা, বাগদাদ, হেজাজ ও অন্যান্য ইলমি মারকাযে ব্যাপক সফর (আর-রিহলাহ ফী তালাবিল হাদীস) করেন।

  • ৪. উস্তাদ ও শায়খবৃন্দ:

    তিনি তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠতম হাদীস বিশারদদের কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন। তাঁর প্রসিদ্ধ উস্তাদগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ওয়াকী’ ইবনুল জাররাহ, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান, হুশাইম ইবনে বাশীর, আলী ইবনে মুসহির, জারীর ইবনে আব্দুল হামীদ, এবং আবু আহওয়াস সালাম ইবনে সুলাইম (রহিমাহুমুল্লাহ)।

  • ৫. বিশিষ্ট ছাত্রবৃন্দ:

    হাদীসের ইতিহাসে ইমাম ইবনে আবী শায়বাহর শ্রেষ্ঠতম গৌরব হলো— সিহাহ সিত্তাহ বা কুতুবে সিত্তাহর রচয়িতাদের সিংহভাগই তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র ছিলেন! তাঁর প্রধান শাগরিদদের মধ্যে রয়েছেন:

    • আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীস ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারী (রহ.)
    • ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আন-নিশাপুরী (রহ.) — যিনি সহীহ মুসলিমে ইবনে আবী শায়বাহ থেকে সর্বাধিক ১,৫৪০টিরও বেশি হাদীস বর্ণনা করেছেন!
    • ইমাম আবু দাউদ আস-সিজিস্তানী (রহ.)
    • ইমাম ইবনে মাজাহ আল-কাযভীনি (রহ.)
    • ইমাম আবু জুরা’আ আর-রাযী ও ইমাম আবু হাতিম আর-রাযী (রহ.)
  • ৬. ওফাত:

    হাদীসের এই মহান সাধক ২৩৫ হিজরীর মুহাররম মাসের প্রথম প্রহরে (বৃহস্পতিবার) কূফা নগরীতে প্রায় ৭৬ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

ইলমে হাদীসে ইমাম ইবনে আবী শায়বাহর স্থান ও মর্যাদা (مكانته في علم الحديث):

হাদীস বিশারদগণের নিকট ইমাম আবু বকর ইবনে আবী শায়বাহ এক অনন্য উচ্চতায় সমাসীন ছিলেন:

  1. ১. সমসাময়িক ইমামগণের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন:
    • আবু জুরা’আ আর-রাযী (রহ.): «مَا رَأَيْتُ أَحْفَظَ مِنْ أَبِي بَكْرِ بْنِ أَبِي شَيْبَةَ» অর্থাৎ “আমি আবু বকর ইবনে আবী শায়বাহর চেয়ে অধিক বড় হাফিযে হাদীস দুনিয়াতে আর কাউকেই দেখিনি!”
    • ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.): তিনি ইবনে আবী শায়বাহকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁকে সত্যবাদিতা ও হাদীস সংরক্ষণের প্রতীক আখ্যায়িত করেছিলেন।
    • ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী (রহ.): “আমাদের যুগে ইলমের শীর্ষ সংরক্ষক চারজন: কূফায় আবু বকর ইবনে আবী শায়বাহ, বসরায় আলী ইবনুল মাদীনী, বাগদাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং নিশাপুরে ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন।”
    • ইমাম আল-ইজলী (রহ.): “তিনি ছিলেন ছিক্বাহ (সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য), হাফিযে হাদীস এবং কূফার হাদীস জগতের প্রধান স্তম্ভ।”
  2. ২. অমর কীর্তি ‘আল-মুসান্নাফ’ (المصنف):

    ইমাম ইবনে আবী শায়বাহর নাম চিরস্মরণীয় করে রেখেছে তাঁর কালজয়ী সংকলন ‘মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ’। এটি ৩৭,০০০-এরও অধিক হাদীস ও আসারের এক অতল সমুদ্র। এতে ফিকহি তারতিব অনুযায়ী রাসূলে কারীম (সা.)-এর হাদীস, খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবায়ে কিরামের ফতোয়া এবং তাবে’ঈদের আসার সন্নিবেশিত হয়েছে। হানাফী ফিকাহসহ সমগ্র ফিকাহ শাস্ত্রের দলীল হিসেবে এই গ্রন্থের কোনো বিকল্প নেই।

  3. ৩. অন্যান্য গ্রন্থাবলী:

    মুসান্নাফ ছাড়াও তিনি হাদীস ও উলূমুল হাদীসে বহু অমূল্য কিতাব রচনা করেছেন; যেমন: ‘কিতাবুল ঈমান’, ‘কিতাবুত তারিখ’, ‘কিতাবুস সুনান ফিল ফিক্বহ’, ‘কিতাবুল আদাব’, এবং ‘কিতাবুয যুহদ’।

উপসংহার:

ইমাম ইবনে আবী শায়বাহ ছিলেন এমন এক মহান মহীরূহ, যাঁর হাদীস ভাণ্ডার ছাড়া সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও সুনান গ্রন্থসমূহের সংকলন অপূর্ণ থেকে যেত। হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষা ও সালাফদের আমল সংরক্ষণে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদান কিয়ামত পর্যন্ত চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।


١٢- اكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاةِ الْإِمَامِ الدَّارِمِيِّ مَعَ ذِكْرِ خِدْمَاتِهِ فِي عِلْمِ الْحَدِيثِ-

[১২. ইমাম আদ-দারেমী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখ এবং ইলমে হাদীসে তাঁর বহুমুখী খেদমত ও অবদান বিস্তারিত উল্লেখ করো।]

ভূমিকা:

মধ্য এশিয়ার সুবিশাল ভূখণ্ডে ইলমে হাদীসের যে পুণ্যময় জ্যোতি বিকশিত হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান আলোকবর্তিকা ছিলেন ইমাম আবু মুহাম্মদ আদ-দারেমী আস-সামারকান্দী (রহ.)। তিনি ছিলেন হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর অবিসংবাদিত মুহাদ্দিস, যুগশ্রেষ্ঠ ফকীহ এবং সহীহ সুন্নাহর অতন্দ্র প্রহরী। তাঁর রচিত ‘সুনানে আদ-দারেমী’ উম্মতের নিকট কুতুবে সিত্তাহর সমপর্যায়ের এক অতীব নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।

ইমাম আদ-দারেমী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (نبذة من حياته):

  • ১. নাম, নসব ও উপাধি:

    তাঁর নাম আব্দুল্লাহ, কুনিয়াত আবু মুহাম্মদ। পিতার নাম আব্দুর রহমান। তাঁর পূর্ণ বংশপরম্পরা হলো: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনুল ফাদল ইবনে বাহরাম ইবনে আব্দুস সামাদ আত-তামীমী আদ-দারেমী আস-সামারকান্দী। আরবের বিখ্যাত বনু তামীম গোত্রের একটি শাখা ‘দারেম ইবনে মালেক’-এর দিকে সম্বন্ধ করে তাঁকে ‘আদ-দারেমী’ এবং তাঁর জন্মস্থান সমরকন্দের দিকে সম্বন্ধ করে ‘আস-সামারকান্দী’ বলা হয়।

  • ২. জন্ম ও প্রাথমিক জীবন:

    তিনি ১৮১ হিজরীতে ঐতিহাসিক সমরকন্দ নগরীতে (বর্তমান উজবেকিস্তান) জন্মগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, এই বছরই ইমাম বুখারী (রহ.)-এর জন্মের প্রায় ১৩ বছর পূর্বে ইমাম দারেমীর জন্ম হয়। শৈশবেই তিনি কুরআন ও প্রাথমিক দ্বীনি জ্ঞানে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।

  • ৩. ইলমি সফর (আর-রিহলাহ):

    সমরকন্দের সীমানা ছাড়িয়ে তিনি হাদীস সংগ্রহের জন্য সে যুগের প্রায় সমস্ত প্রধান ইলমি মারকাযে সফর করেন। তিনি খোরাসান, ইরাক (কূফা ও বসরা), বাগদাদ, হেজাজ (মক্কা ও মদীনা), শাম (সিরিয়া) এবং মিশরের সুবিখ্যাত উলামাদের মজলিসে উপস্থিত হয়ে হাদীসের গভীর জ্ঞান ও সনদ আহরণ করেন।

  • ৪. উস্তাদ ও মাশায়েখবৃন্দ:

    তিনি তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসগণের শিষ্যত্ব লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত হলেন:
    নযর ইবনে শুমাইল, ইয়াযীদ ইবনে হারূন, ওয়াহব ইবনে জারীর, জা’ফর ইবনে আউন, আবু নু’আইম ফাদল ইবনে দুক্বাইন, ক্বা’নাবী (ইমাম মালেকের মুয়াত্তার রাবী), সুলাইমান ইবনে হারব, এবং সাঈদ ইবনে আমের আদ-দুব্বাঈ (রহিমাহুমুল্লাহ)।

  • ৫. প্রখ্যাত ছাত্রবৃন্দ:

    ইমাম আদ-দারেমীর ইলমি মর্যাদা এতটাই উচ্চ ছিল যে, কুতুবে সিত্তাহর চারজন মহান ইমাম সরাসরি তাঁর ছাত্র হয়ে তাঁর কাছ থেকে হাদীস শ্রবণ ও বর্ণনা করেছেন:

    • ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আন-নিশাপুরী (রহ.) — সহীহ মুসলিমে তাঁর বর্ণিত হাদীস স্থান পেয়েছে।
    • ইমাম আবু দাউদ আস-সিজিস্তানী (রহ.)।
    • ইমাম আবু ঈসা আত-তিরমিযী (রহ.)।
    • ইমাম আহমদ ইবনে শুআইব আন-নাসাঈ (রহ.)।
    • এছাড়াও প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আবু জুরা’আ ও আবু হাতিম আর-রাযী তাঁর বিশিষ্ট শাগরিদ ছিলেন।
  • ৬. ন্যায়পরায়ণতা, তাকওয়া ও বিচারক পদ:

    তিনি অত্যন্ত পরহেযগার, দুনিয়াবিমুখ ও সত্যের প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন। সমরকন্দের সুলতান ও জনগণ তাঁকে বিচারক (কাযী) নিযুক্ত করার জন্য বারবার অনুরোধ করলে তিনি তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে জবরদস্তিমূলকভাবে তাঁকে বিচারক পদে বসানো হলে তিনি মাত্র একটি মামলার ফয়সালা করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে আত্মগোপন করেন।

  • ৭. ওফাত:

    এই মহান ইমাম ২৫৫ হিজরীর ৮ই যিলহজ (ইয়াওমুত তারবিয়াহ) বৃহস্পতিবার ৭৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। পরদিন ৯ই যিলহজ জুমার দিনে তাঁকে সমরকন্দে দাফন করা হয়। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ইমাম বুখারী (রহ.) শোকে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং অত্যন্ত মর্মস্পর্শী একটি শোকগাথা কবিতা আবৃত্তি করেন।

ইলমে হাদীসে ইমাম আদ-দারেমীর খেদমত ও অবদান (خدماته في علم الحديث):

ইলমে হাদীসের সংরক্ষণ, প্রচার ও তাত্ত্বিক বিন্যাসে ইমাম আদ-দারেমী (রহ.)-এর অবদান অবিস্মরণীয়:

  1. ১. ‘সুনানে আদ-দারেমী’ (المسند الجامع المعروف بسنن الدارمي):

    এটি ইমাম আদ-দারেমীর শ্রেষ্ঠতম অমর কীর্তি। গ্রন্থটি ৩,৫০০-এর অধিক হাদীস সমৃদ্ধ একটি পূর্ণাঙ্গ হাদীস কোষ। ফিকহি তারতিব অনুযায়ী রচিত হলেও সনদের উচ্চ মান এবং বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতার কারণে উলামায়ে কিরাম একে অতীব সমীহ করেন।

  2. ২. কুতুবে সিত্তাহর ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে মর্যাদা লাভ:

    মুহাদ্দিসীনে কিরামের এক বিশাল জামাত— যাঁদের মধ্যে হাফিয ইবনুস সালাহ, হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী, হাফিয ইরাকী এবং ইমাম আলায়ী (রহ.) রয়েছেন— সুস্পষ্ট মত প্রকাশ করেছেন যে, সুনানে ইবনে মাজাহর পরিবর্তে ‘সুনানে আদ-দারেমী’-কে সিহাহ সিত্তাহ বা কুতুবে সিত্তাহর ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করা অধিক যুক্তিযুক্ত ও শ্রেয়। কারণ ইবনে মাজাহতে কিছু দুর্বল ও মুনকার বর্ণনা থাকলেও সুনানে আদ-দারেমীতে জয়ীফ বর্ণনার সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য এবং এর সনদসমূহ অত্যন্ত উচ্চ ও মজবুত।

  3. ৩. মুকাদ্দিমাতুস সুনান (সুনানের অনন্য ভূমিকা):

    ইমাম আদ-দারেমী তাঁর সুনান গ্রন্থের শুরুতে যে দীর্ঘ ভূমিকা বা মুকাদ্দিমাহ সংযোজন করেছেন, তা উলূমুল হাদীসের ইতিহাসে এক অনন্য মাস্টারপিস। এতে সুন্নাহ অনুসরণের অপরিহার্যতা, ইলম অর্জনের আদব, ফতোয়া প্রদানে সতর্কতা, বিদ’আত বর্জন এবং সালাফদের আদর্শ অত্যন্ত প্রামাণ্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

  4. ৪. সুন্নাহর সংরক্ষণ ও বিদ’আতের বিরুদ্ধে আপসহীন ভূমিকা:

    তাঁর যুগে জাহমিয়্যাহ, মু’তাযিলাহসহ বিভ্রান্ত দলসমূহের অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেলে তিনি সুন্নাহর সহীহ নস ও আছারের আলোকে তাদের বিভ্রান্তি খণ্ডন করেন। তিনি ‘কিতাবুর রদ্দ আলাল জাহমিয়্যাহ’ রচনা করে সহীহ আক্বীদা সংরক্ষণে ঐতিহাসিক অবদান রাখেন।

উপসংহার:

ইমাম আদ-দারেমী (রহ.) ছিলেন ইলমে হাদীসের এক আলোকোজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর প্রখর মেধা, নিরপেক্ষ তাহকিক এবং সংকলিত সুন্নাহর ভাণ্ডার মুসলিম উম্মাহর জন্য এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা হয়ে পথ প্রদর্শন করে চলেছে।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১. মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক গ্রন্থের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী এবং এতে মোট কতটি হাদীস রয়েছে?

উত্তর: ‘মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক’ হলো হাদীস শাস্ত্রের প্রাচীনতম মৌলিক সংকলনগুলোর অন্যতম, যা ফিকহি অধ্যায় অনুযায়ী সাজানো। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো— এতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মারফূ হাদীসের পাশাপাশি সাহাবায়ে কিরামের মাওকূফ ফতোয়া এবং তাবে’ঈগণের মাক্বতূ আছার সুবিন্যস্তভাবে সংকলিত হয়েছে। আল্লামা হাবীবুর রহমান আল-আ’যমী (রহ.)-এর তাহকিককৃত সংস্করণে এতে মোট ২১,০৩৩টি হাদীস ও আছার সংরক্ষিত রয়েছে।

প্রশ্ন ২. জুমার দিনে দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্তটি কখন?

উত্তর: সহীহ হাদীসে জুমার দিনে এমন একটি বিশেষ সময়ের (সা’আতুল ইজাবাহ) কথা বলা হয়েছে যাতে দোয়া নিশ্চিতভাবে কবুল হয়। জমহুর উলামায়ে কিরাম ও সহীহ হাদীসের সবচেয়ে শক্তিশালী বর্ণনা অনুযায়ী এই সময়টি হলো— জুমার দিন আসরের পর থেকে মাগরিবের পূর্ব পর্যন্ত সময়। এছাড়া অপর একটি সহীহ বর্ণনায় ইমামের মিম্বরে বসা থেকে জুমার সালাত সমাপ্তি পর্যন্ত সময়টিকেও দোয়া কবুলের মুহূর্ত বলা হয়েছে।

প্রশ্ন ৩. নারীদের জন্য মসজিদে গিয়ে জুমার ও পাঁচ ওয়াক্তের জামাতে সালাত আদায়ের শরয়ী হুকুম কী?

উত্তর: প্রাথমিক ইসলামে বিশেষ শর্তসাপেক্ষে নারীদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি থাকলেও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল যে— নারীদের জন্য তাদের নিজ ঘরের ভেতরে সালাত আদায় করা মসজিদে নববীতে সালাত আদায়ের চেয়েও উত্তম। পরবর্তীতে ফিতনার আশঙ্কায় উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) ও সাহাবায়ে কিরামের ফতোয়ার ভিত্তিতে হানাফী ফিকাহসহ জমহুর ফকীহগণ নারীদের মসজিদে গিয়ে জামাতে সালাত আদায়কে মাকরূহে তাহরীমী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং নিজ গৃহে সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রশ্ন ৪. ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে ‘যুহদ’ বলতে কী বোঝায় এবং এর স্তর কয়টি?

উত্তর: আভিধানিক অর্থে যুহদ হলো অনাসক্তি বা নির্মোহতা। শরীয়তের পরিভাষায় যুহদ হলো— হৃদয়কে পার্থিব মোহ, লোভ-লালসা ও বিলাসিতা থেকে মুক্ত রেখে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখেরাতের কল্যাণে সমর্পিত রাখা। মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের মতে যুহদের তিনটি স্তর রয়েছে: প্রথমত, হারাম ও নিষিদ্ধ বস্তু বর্জন করা (সাধারণ মুমিনদের ওয়াজিব যুহদ); দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত হালাল ও সন্দেহযুক্ত বিষয় বর্জন করা (মুত্তাকীদের মুস্তাহাব যুহদ); এবং তৃতীয়ত, যা কিছু আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে তা ত্যাগ করা (আরিফীন ও সিদ্দীকীনদের সর্বোচ্চ যুহদ)।

প্রশ্ন ৫. পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাতের পর সম্মিলিত মোনাজাত করার শরয়ী বিধান কী?

উত্তর: হাদীস শরীফে ফরয সালাত পরবর্তী সময়কে দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত বলা হয়েছে। জমহুর উলামায়ে কিরাম ও হানাফী মাযহাবের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফরয সালাতের পর ইমাম-মুক্তাদী সম্মিলিতভাবে হাত তুলে মোনাজাত করা একটি মুস্তাহাব (উত্তম) ও প্রশংসনীয় আমল। তবে এটিকে সালাতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বা ফরয মনে করা যাবে না এবং কেউ একাকী দোয়া করলে বা দোয়া না করে চলে গেলে তাকে ভর্ৎসনা করা অনুচিত।

প্রশ্ন ৬. ইমাম আদ-দারেমীর ‘সুনান’ গ্রন্থটিকে কেন অনেকে সিহাহ সিত্তাহর ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করেন?

উত্তর: হাফিয ইবনুস সালাহ, হাফিয ইবনে হাজার আসকালানীসহ বহু শীর্ষ মুহাদ্দিস সুনানে ইবনে মাজাহর পরিবর্তে ‘সুনানে আদ-দারেমী’-কে সিহাহ সিত্তাহর ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করাকে উত্তম বলেছেন। এর কারণ হলো— সুনানে ইবনে মাজাহতে কিছু দুর্বল ও মুনকার বর্ণনা রয়েছে; পক্ষান্তরে সুনানে আদ-দারেমীতে দুর্বল হাদীসের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, এর সনদের মান অত্যন্ত উচ্চ ও নির্ভরযোগ্য এবং এর মুকাদ্দিমাহটি হাদীস শাস্ত্রের এক অনন্য আকর দলিল।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন