পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৩২
اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ٢٠٢٤
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة الحديث-١
[দিরাসাতুল হাদিস-১]
বিষয় কোড: ২০২৮০৬
الوقت — ٤ ساعات | الدرجة الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة: أجب عن اثنين من مجموعة (أ) وعن اثنين من مجموعة (ب) وعن اثنين من مجموعة (ج) وعن اثنين من مجموعة (د)- والأعداد بالهامش تدل على الدرجة الكاملة-
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রশ্নপত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি বিভাগ থেকে ২টি করে মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক প্রস্তুতি ও গভীর রেফারেন্সভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুবিধার্থে এখানে চারটি বিভাগের সকল ১২টি প্রশ্নেরই বিস্তারিত, প্রামাণ্য ও তথ্যবহুল সমাধান উপস্থাপন করা হলো।]
مجموعة (أ) — الموطأ للإمام مالك (মুওয়াত্তা ইমাম মালিক)
الدرجة — ١٠ × ٢ = ٢٠
(ترجم الأحاديث التالية ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها) — নিম্নোক্ত হাদীসসমূহের অনুবাদ কর অতঃপর সংশ্লিষ্ট প্রশ্নসমূহের উত্তর দাও।
١- عن مالك أنه بلغه أن عمر بن عبد العزيز كتب إلى عامل من عماله أنه بلغنا أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان إذا بعث سرية يقول لهم: “اغزوا باسم الله، في سبيل الله تقاتلون من كفر بالله، لا تغلوا ولا تغدروا ولا تمثلوا ولا تقتلوا وليدًا”. وقل ذلك لجيوشك وسراياك إن شاء الله والسلام عليك-
[১. হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.) কর্তৃক স্বীয় গভর্নরের নিকট লিখিত পত্র, যুদ্ধকালীন মহানবীর দিকনির্দেশনা এবং জিহাদের পরিচয়, বিধান, শর্তাবলী ও যুদ্ধ-নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ।]
মূল হাদীস (النص الحديثي)
عَنْ مَالِكٍ أَنَّهُ بَلَغَهُ أَنَّ عُمَرَ بْنَ عَبْدِ الْعَزِيزِ كَتَبَ إِلَى عَامِلٍ مِنْ عُمَّالِهِ أَنَّهُ بَلَغَنَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا بَعَثَ سَرِيَّةً يَقُولُ لَهُمْ: «اغْزُوا بِاسْمِ اللَّهِ، فِي سَبِيلِ اللَّهِ تُقَاتِلُونَ مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ، لَا تَغُلُّوا وَلَا تَغْدِرُوا وَلَا تَمْثُلُوا وَلَا تَقْتُلُوا وَلِيدًا». وَقُلْ ذَلِكَ لِجُيُوشِكَ وَسَرَايَاكَ إِنْ شَاءَ اللَّهُ، وَالسَّلَامُ عَلَيْكَ-
অনুবাদ
ইমাম মালিক (রহ.) হতে বর্ণিত যে, তাঁর নিকট এ মর্মে সংবাদ পৌঁছেছে যে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.) স্বীয় এক গভর্নরের নিকট লিখে পাঠালেন: “আমাদের নিকট এ তথ্য পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো ক্ষুদ্র সেনাদল (সারিয়্যাহ) অভিযানে প্রেরণ করতেন, তখন তাদেরকে বলতেন: ‘তোমরা আল্লাহর নামে, আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে বের হও; যারা আল্লাহর সাথে কুফরী করেছে তাদের বিরুদ্ধে তোমরা লড়াই করবে। কিন্তু সাবধান! তোমরা গনীমতের মালে খিয়ানত করবে না, কোনো অঙ্গীকার ভঙ্গ বা বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, কারো অঙ্গচ্ছেদ বা বিকৃত করবে না এবং কোনো শিশুকে হত্যা করবে না।’ অতএব, তুমিও ইনশাআল্লাহ তোমার অধীনস্থ সেনাবাহিনী ও সেনাদলসমূহকে এই নির্দেশ প্রদান করবে। তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।”
হাদীসের শাব্দিক তাহকীক ও বিশ্লেষণ
- بَلَغَهُ (বালাজাহু): এটি ইমাম মালিক (রহ.)-এর ‘বালাগাত’ (بلاغات مالك)-এর অন্তর্ভুক্ত। বাহ্যত এটি মুনকাতে’ মনে হলেও মুহাদ্দিসগণের ঐকমত্য অনুযায়ী ইমাম মালিকের বালাগাত অন্য সনদে মুত্তাসিল বা সংযুক্ত। হাফেয ইবনে আব্দুল বার (রহ.) ‘আত-তামহীদ’ গ্রন্থে এর মুত্তাসিল সনদ বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিমও তাঁর সহীহ গ্রন্থে হযরত বুরাইদাহ (রা.) সূত্রে এই মর্মে সহীহ মারফূ’ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
- سَرِيَّةً (সারিয়্যাহ): এমন ক্ষুদ্র সামরিক বাহিনী বা অগ্রবর্তী সেনাদল, যাতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সশরীরে অংশগ্রহণ করেননি, বরং কোনো সাহাবীকে সেনাপতি মনোনীত করে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। সচরাচর এতে ৫ জন থেকে ৪০০ জন পর্যন্ত যোদ্ধা থাকতেন। আর যে অভিযানে নবীজী নিজে উপস্থিত ছিলেন তাকে ‘গাযওয়াহ’ (غزوة) বলা হয়।
- لَا تَغُلُّوا (লা তাগুল্লূ): ‘গুলূল’ (الغلول) করোনা; অর্থাৎ গনীমতের সম্পদ যথাযথ বণ্টনের পূর্বে গোপনে তা থেকে কিছু আত্মসাৎ করবে না।
- وَلَا تَغْدِرُوا (লা তাগদিরূ): ‘গাদর’ (الغدر) বা অঙ্গীকার ভঙ্গ ও চুক্তি লঙ্ঘন করবে না। শত্রুর সাথে শান্তিচুক্তি বা নিরাপত্তা বিধান (আমান) থাকলে বিশ্বাসঘাতকতা করা সম্পূর্ণ হারাম।
- وَلَا تَمْثُلُوا (লা তামছুলূ): ‘মুছলাহ’ (المثلة) বা মৃত বা জীবিত শত্রুর নাক, কান, চোখ বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকৃত ও কর্তন করবে না।
- وَلَا تَقْتُلُوا وَلِيدًا (লা তাক্বতুলূ ওয়ালীদান): ‘ওয়ালীদ’ অর্থ নাবালক শিশু। যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে না, তাদের হত্যা করা ইসলামের সমরবিধানে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
(أ) ما معنى الجهاد لغة وشرعًا؟ بين حكمه وشروطه وآدابه-
[উপ-প্রশ্ন (أ): জিহাদের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? এর শরয়ী বিধান (হুকুম), আবশ্যকীয় শর্তাবলী এবং যুদ্ধের আদবসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা কর।]
১. জিহাদের আভিধানিক অর্থ (معنى الجهاد لغة)
‘জিহাদ’ (الْجِهَادُ) শব্দটি আরবি الجهد (জুহদ বা জাহদ) মূলধাতু থেকে উৎসারিত ‘ফি’আল’ (فِعَال) ওজনে গঠিত বাবে মুফা’আলার মাসদার বা ক্রিয়ামূল। এর আভিধানিক অর্থ হলো: সাধ্যের সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত চেষ্টা করা, কঠিন শ্রম স্বীকার করা, কষ্ট সহ্য করা এবং কোনো লক্ষ্য অর্জনে পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করা।
ইমাম রাগিব আসফাহানী (রহ.) ‘মুফরাদাতু আলফাযিল কুরআন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
«الْجِهَادُ وَالْمُجَاهَدَةُ: اسْتِفْرَاغُ الْوُسْعِ فِي مُدَافَعَةِ الْعَدُوِّ»
“শত্রুর আক্রমণ ও ক্ষতি প্রতিহত করার লক্ষ্যে সাধ্যের শেষ বিন্দু পর্যন্ত সর্বশক্তি নিয়োগ করাকে জিহাদ বলা হয়।”
২. জিহাদের পারিভাষিক অর্থ (معنى الجهاد شرعًا)
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় জিহাদ হলো: সত্যের বাণীকে সমুন্নত করার জন্য, দ্বীন রক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এবং বাতিলের আগ্রাসন প্রতিহত করতে জান, মাল, জবান ও কলম দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে পরিচালিত সার্বিক সংগ্রাম ও যুদ্ধ।
ফিকহী পরিভাষায় চার মাযহাবের ইমাম ও উসূলবিদগণ জিহাদের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা প্রদান করেছেন:
- হানাফী মাযহাব: ফাতাওয়া শামী ও আল-ইনায়াহ গ্রন্থে বলা হয়েছে:
«بَذْلُ الْوُسْعِ وَالطَّاقَةِ فِي الْقِتَالِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ تَعَالَى نَفْسًا وَمَالًا وَلِسَانًا أَوْ غَيْرَ ذَلِكَ وَإِعْلَاءً لِكَلِمَةِ اللَّهِ تَعَالَى»
অর্থাৎ আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে আল্লাহর রাস্তায় জান, মাল, জবান কিংবা অন্য কোনো উপায়ে যুদ্ধ করার জন্য নিজের সর্বশক্তি ও সামর্থ্য বিলিয়ে দেওয়া। - মালিকী মাযহাব: ইমাম ইবনে আরাফাহ আল-মালিকী বলেন:
«قِتَالُ مُسْلِمٍ كَافِرًا غَيْرَ ذِي عَهْدٍ لإِعْلاءِ كَلِمَةِ اللَّهِ تَعَالَى»
অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত করার লক্ষ্যে কোনো মুসলিম কর্তৃক এমন কাফিরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করা যার সাথে কোনো শান্তিচুক্তি নেই। - শাফেয়ী মাযহাব: ইমাম খাতীব শিরবীনী বলেন:
«قِتَالُ الْكُفَّارِ لِنُصْرَةِ الإِسْلامِ»
অর্থাৎ ইসলাম ও মুসলমানদের সাহায্য-সহযোগিতা ও নিরাপত্তার নিমিত্তে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। - হাম্বলী মাযহাব: ইমাম ইবনে কুদামাহ আল-মাকদিসী বলেন:
«قِتَالُ الْكُفَّارِ وَهُوَ فَرْضُ كِفَايَةٍ»
অর্থাৎ দ্বীনের সুরক্ষায় শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করা।
৩. জিহাদের শরয়ী হুকুম (حكم الجهاد)
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে জিহাদের হুকুম পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভরশীল। এটি মূলত দুটি মূল অবস্থায় বিভক্ত:
- ফরযে কিফায়াহ (فرض كفاية): স্বাভাবিক ও শান্তিকালীন অবস্থায় মুসলিম রাষ্ট্রের জন্য বহিরাগত কুফরী শক্তির বিরুদ্ধে দ্বীনের দাওয়াত সম্প্রসারণ ও ইসলামের সীমানা সুরক্ষার উদ্দেশ্যে সামরিক প্রস্তুতি রাখা ও অভিযান পরিচালনা করা ফরযে কিফায়াহ। মুসলিম উম্মাহর মধ্য থেকে রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাদল বা কোনো দল এ দায়িত্ব পালন করলে সমগ্র মুসলিম সমাজ গুনাহ থেকে দায়মুক্ত হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
﴿وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنفِرُوا كَافَّةً فَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ﴾
“আর মুমিনদের সকলের জন্য একসাথে অভিযানে বের হওয়া সমীচীন নয়। অতএব তাদের প্রত্যেক দল থেকে কেন একটি ক্ষুদ্র অংশ বের হয় না, যাতে তারা দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা অর্জন করতে পারে?” (সূরা আত-তাওবাহ: ১২২)। - ফরযে আইন (فرض عين): নিম্নোক্ত তিনটি বিশেষ পরিস্থিতিতে জিহাদ প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর নামায-রোযার মতো ব্যক্তিগত ফরজ বা ‘ফরযে আইন’ হিসেবে কার্যকর হয়:
- ক. শত্রুর অতর্কিত আক্রমণ ঘটলে (هجوم العدو): শত্রু যদি মুসলিম দেশে আক্রমণ চালায় বা কোনো জনপদ দখল করে নেয়, তবে সেই জনপদের এবং পার্শ্ববর্তী সকল নারী-পুরুষের ওপর নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলা ফরযে আইন।
- খ. যুদ্ধের ময়দানে মুখোমুখি অবস্থান নিলে (حضور الصف): কোনো ব্যক্তি যখন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করে শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন রণক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা কবিরা গুনাহ এবং দৃঢ়পদ থাকা ফরযে আইন।
- গ. রাষ্ট্রপ্রধান বা আমীরের সার্বিক সাধারণ আহ্বান (النفير العام): বৈধ মুসলিম শাসক যদি কোনো জাতীয় বা ইসলামী প্রতিরক্ষার তাগিদে দেশের সর্বস্তরের জনগণকে যুদ্ধে বের হওয়ার নির্দেশ দেন, তবে তা মেনে চলা ফরযে আইন। নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: «وَإِذَا اسْتُنْفِرْتُمْ فَانْفِرُوا» — “যখন তোমাদেরকে অভিযানে বের হওয়ার আহ্বান জানানো হয়, তখন বের হও।” (সহীহ বুখারী: ২৭৮৩)।
৪. জিহাদ ফরয হওয়ার শর্তাবলী (شروط وجوب الجهاد)
ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী কারো ওপর জিহাদ ফরয হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত সাতটি শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক:
- ইসলাম (الإسلام): অমুসলিমের ওপর ইসলামী জিহাদ বাধ্যতামূলক নয়, তবে মুসলিম রাষ্ট্রে নাগরিক হিসেবে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব থাকতে পারে।
- বালেগ হওয়া (البلوغ): অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের ওপর যুদ্ধ ফরয নয়। যেমন উহুদ যুদ্ধে ইবনে উমর (রা.)-কে চৌদ্দ বছর বয়সে অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় ফেরত পাঠানো হয়েছিল এবং খন্দকের যুদ্ধে পনের বছর পূর্ণ হলে গ্রহণ করা হয়েছিল।
- সুস্থ মস্তিষ্ক (العقل): উন্মাদ ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীনের ওপর কোনো শরয়ী দায়িত্ব কার্যকর হয় না।
- পুরুষ হওয়া (الذكورة): নারীদের ওপর সশস্ত্র যুদ্ধ ফরয নয়। আয়েশা (রা.) নবীজী (সা.)-কে জিহাদের অনুমতি চাইলে তিনি বলেন: «لَكُنَّ أَحْسَنُ الْجِهَادِ وَأَجْمَلُهُ: الْحَجُّ، حَجٌّ مَبْرُورٌ» — “তোমাদের (নারীদের) সর্বোত্তম জিহাদ হলো কবুল হজ।” (সহীহ বুখারী: ১৮৬১)। তবে সেবাদান ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে নারীদের সহায়তা প্রশংসিত।
- শারীরিক সুস্থতা ও সামর্থ্য (الصحة والسلامة): অন্ধ, খোঁড়া বা গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তির ওপর যুদ্ধ ফরয নয়। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: «لَّيْسَ عَلَى الْأَعْمَىٰ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ» (সূরা আন-নূর: ৬১)।
- অর্থনৈতিক ও আর্থিক সক্ষমতা (القدرة المالية والنفقة): যুদ্ধাস্ত্র, পাথেয় ও পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সূরা তাওবায় নিঃস্ব সাহাবীদের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে, যারা খরচের অর্থ না পেয়ে অশ্রুসজল নয়নে ফিরে গিয়েছিলেন (আয়াত: ৯২)।
- পিতামাতার অনুমতি (إذن الوالدين): ফরযে কিফায়াহ অবস্থায় পিতামাতা জীবিত ও মুখাপেক্ষী থাকলে তাঁদের অনুমতি গ্রহণ করা ওয়াজিব। এক ব্যক্তি জিহাদে যেতে চাইলে নবীজী (সা.) জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “তোমার কি পিতামাতা জীবিত আছেন?” সে বলল: হ্যাঁ। নবীজী বললেন: «فَفِيهِمَا فَجَاهِدْ» — “তবে তাঁদের সেবায় জিহাদ করো।” (সহীহ বুখারী: ৩০০৪)।
৫. ইসলামী যুদ্ধের আদব ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-নীতিমালা (آداب الجهاد)
বর্তমান আন্তর্জাতিক জেনেভা কনভেনশনের শত শত বছর পূর্বে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং খুলাফায়ে রাশেদীন যুদ্ধের যে অনন্য মানবিক নীতিমালা প্রবর্তন করেছেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক নজিরবিহীন মাইলফলক। আলোচ্য হাদীস ও অন্যান্য প্রামাণ্য দলীল থেকে যুদ্ধের প্রধান আদবসমূহ নিম্নরূপ:
- ইখলাস ও একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি (الإخلاص): খ্যাতি, লুণ্ঠন বা বীরত্ব প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নয়; বরং কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই লড়াই করা আবশ্যক।
- যুদ্ধ শুরুর পূর্বে দাওয়াত প্রদান (الدعوة قبل القتال): শত্রুদের নিকট প্রথমে ইসলামের সৌন্দর্য ও তাওহীদের আহ্বান পৌঁছে দিতে হবে। তারা তা প্রত্যাখ্যান করলে জিজিয়া প্রদানপূর্বক নিরাপত্তার প্রস্তাব দিতে হবে। উভয়টি প্রত্যাখ্যান করলেই কেবল যুদ্ধ শুরু হবে।
- অঙ্গীকার ও চুক্তির প্রতি বিশ্বস্ততা (الوفاء بالعهود): শত্রু আত্মসমর্পণ করলে বা কোনো চুক্তি সম্পাদিত হলে তা বিন্দুমাত্র ভঙ্গ করা যাবে না। প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা (الغدر) ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
- নিরপরাধ ও অ-যোদ্ধাদের নিরাপত্তা (حرمة قتل غير المقاتلين): যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ না করা ব্যক্তি যেমন: শিশু, নারী, অতিবৃদ্ধ, উপাসনালয়ের পুরোহিত বা সন্ন্যাসী, অন্ধ ও প্রতিবন্ধীদের হত্যা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- অঙ্গচ্ছেদ বা বিকৃতি নিষিদ্ধ (تحريم المثلة): নিহত বা বন্দি শত্রুর নাক, কান কেটে বিকৃত করা সম্পূর্ণ হারাম।
- পরিবেশ ও বেসামরিক সম্পদের সুরক্ষা: অহেতুক ফলবান বৃক্ষ নিধন করা, শস্যক্ষেত্র জ্বালিয়ে দেওয়া, পানির কূপ বিষাক্ত করা, জনবসতি ধ্বংস করা এবং গবাদিপশু হত্যা করা থেকে বিরত থাকার জন্য খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সেনাপতিদের কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।
- যুদ্ধবন্দিদের প্রতি সদাচরণ (الإحسان إلى الأسرى): বন্দিদের সাথে মানবিক আচরণ করা, উপযুক্ত খাদ্য ও বস্ত্র প্রদান করা এবং কোনো প্রকার নির্যাতন না করা ইসলামী যুদ্ধের অলঙ্ঘনীয় শিষ্টাচার।
٢- عن يحيى بن سعيد عن محمد بن يحيى بن حبان أن زيد بن خالد الجهني قال: توفي رجل يوم خيبر وإنهم ذكروه لرسول الله صلى الله عليه وسلم، فزعم زيد أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: صلوا على صاحبكم، فتغيرت وجوه الناس لذلك، فزعم زيد أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: إن صاحبكم قد غل في سبيل الله، قال: ففتحنا متاعه، فوجدنا خرزات من خرزات يهود ما تساوين درهمين-
[২. খায়বার যুদ্ধে গনীমতের মালে আত্মসাৎকারীর পরিণতি, নবীজী (সা.) কর্তৃক জানাযা বর্জন এবং গুলূল-এর সংজ্ঞা, শরয়ী বিধান ও আত্মসাৎকৃত মাল থেকে সদকা করার বিধান।]
মূল হাদীস (النص الحديثي)
عَنْ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ يَحْيَى بْنِ حَبَّانَ أَنَّ زَيْدَ بْنَ خَالِدٍ الْجُهَنِيَّ قَالَ: تُوُفِّيَ رَجُلٌ يَوْمَ خَيْبَرَ وَإِنَّهُمْ ذَكَرُوهُ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَزَعَمَ زَيْدٌ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «صَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ»، فَتَغَيَّرَتْ وُجُوهُ النَّاسِ لِذَلِكَ، فَزَعَمَ زَيْدٌ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ صَاحِبَكُمْ قَدْ غَلَّ فِي سَبِيلِ اللَّهِ»، قَالَ: فَفَتَحْنَا مَتَاعَهُ، فَوَجَدْنَا خَرَزَاتٍ مِنْ خَرَزَاتِ يَهُودَ مَا تُسَاوِينَ دِرْهَمَيْنِ-
অনুবাদ
ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে হিব্বান থেকে বর্ণনা করেন যে, বিশিষ্ট সাহাবী হযরত যায়েদ ইবনে খালিদ আল-জুহানী (রা.) বলেন: খায়বার যুদ্ধের দিন এক ব্যক্তি মারা গেল। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তার মৃত্যুর সংবাদ উল্লেখ করলেন। যায়েদ (রা.) বলেন: অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন: “তোমাদের সঙ্গীর জানাযার নামায তোমরাই আদায় করে নাও।” নবীজীর এই কথা শুনে লোকজনের মুখমণ্ডল মলিন ও বিবর্ণ হয়ে গেল (যেহেতু খোদ নবীজী তার জানাযায় ইমামতি করলেন না)। তখন যায়েদ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কারণ ব্যাখ্যা করে বললেন: “তোমাদের এই সঙ্গী আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধলব্ধ গনীমতের সম্পদে খিয়ানত (গুলূল) করেছে।” যায়েদ (রা.) বলেন: অতঃপর আমরা তার মালপত্র খুলে তল্লাশি করলাম এবং তার মাঝে ইয়াহূদীদের ব্যবহৃত কিছু পুঁতি পেলাম, যার মূল্য দুই দিরহামের সমানও ছিল না!
হাদীসের প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য
খায়বার যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গনীমত হিসেবে অর্জিত হয়েছিল। ইসলামী সমরবিধানে গনীমতের সম্পদ হলো রাষ্ট্রীয় ও যৌথ মালিকানাধীন সম্পদ। রাষ্ট্রপ্রধান বা সেনাপতি কর্তৃক এক-পঞ্চমাংশ (খুমুস) বায়তুলমালে জমা রেখে অবশিষ্ট চার-পঞ্চমাংশ সমভাবে বণ্টন করার পূর্বে কোনো যোদ্ধার জন্য একটি সুতা বা সুই পর্যন্ত গোপনে নিজের কাছে রেখে দেওয়া হারাম। আলোচ্য হাদীসে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তি জিহাদে অংশ নিয়ে মারা যাওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত সামান্য মূল্যের (মাত্র দুই দিরহামের চেয়েও কম মূল্যের পুতির মালা) বস্তু আত্মসাৎ করার কারণে চরম লাঞ্ছনার শিকার হয়। উম্মতকে রাষ্ট্রীয় ও যৌথ সম্পদের পবিত্রতা রক্ষার চরম শিক্ষা দেওয়ার জন্য স্বয়ং রহমাতুল্লিল আলামীন নবীজী (সা.) তার জানাযা পড়ানো বর্জন করেছিলেন, যদিও সাহাবীদেরকে তার জানাযা পড়ার অনুমতি দিয়েছিলেন—যা প্রমাণ করে সে গুনাহগার হলেও ঈমানহারা বা কাফির হয়ে যায়নি।
(أ) عرف الغلول- ثم بين حكمه وحكم التصدق منه بضوء القرآن والسنة-
[উপ-প্রশ্ন (أ): গুলূল-এর পরিচয় দাও। অতঃপর কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর বিধান এবং খিয়ানতকৃত মাল থেকে সদকা করার শরয়ী হুকুম বিশ্লেষণ কর।]
১. গুলূল-এর সংজ্ঞা (تعريف الغلول)
- আভিধানিক সংজ্ঞা (الغلول لغة): ‘আল-গুলূল’ (الْغُلُولُ) শব্দটি আরবি غَلَّ – يَغُلُّ (গাল্লা-ইয়াগুল্লু) ক্রিয়ামূল থেকে নিষ্পন্ন। এর মূল আভিধানিক অর্থ হলো: কোনো কিছু গোপনে নেওয়া, ভেতরে লুকিয়ে রাখা, খেয়ানত করা, অথবা রাষ্ট্রীয় আমানত আত্মসাৎ করা। যেমন বলা হয়: «غَلَّ فِي الْمَغْنَمِ يَغُلُّ غُلُولاً» অর্থাৎ সে গনীমতের মালে খিয়ানত করল।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা (الغلول اصطلاحا): ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় গুলূল বলতে মূলত যুদ্ধলব্ধ গনীমতের মাল রাষ্ট্রীয়ভাবে বণ্টন করার পূর্বে গোপনে তা থেকে যেকোনো পরিমাণ সম্পদ আত্মসাৎ করাকে বোঝায়।
ইমাম ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.) বলেন:
«الْغُلُولُ: الْخِيَانَةُ فِي الْمَغْنَمِ وَالسَّرِقَةُ مِنْهُ قَبْلَ الْقِسْمَةِ»
অর্থাৎ বণ্টনের পূর্বে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে কোনো কিছু চুরি বা আত্মসাৎ করাকে গুলূল বলা হয়।
পরবর্তীতে ফকীহগণের ঐকমত্যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, বায়তুলমালের অর্থ, জনগণের যৌথ আমানত এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অর্পিত আমানত থেকে অবৈধ উপায়ে গৃহীত অর্থ-সম্পদ ও উৎকোচও গুলূলের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
২. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে গুলূল-এর শরয়ী বিধান (حكم الغلول)
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে গুলূল বা গণসম্পদ আত্মসাৎ করা অত্যন্ত মারাত্মক কবিরা গুনাহ (من كبائر الذنوب) এবং জাহান্নামে প্রবেশের কারণ। কুরআন ও সুন্নাহে এর বিরুদ্ধে কঠোর ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে:
কুরআনুল কারীমের আলোকে:
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
﴿وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَن يَغُلَّ ۚ وَمَن يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۚ ثُمَّ تُوَفَّىٰ كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ﴾
“কোনো নবীর পক্ষে সম্ভব নয় যে তিনি খিয়ানত করবেন। আর যে ব্যক্তি খিয়ানত (গুলূল) করবে, সে কিয়ামতের দিন সেই খিয়ানতকৃত বস্তু সাথে নিয়ে উপস্থিত হবে। অতঃপর প্রত্যেকে তার উপার্জনের পূর্ণ প্রতিদান পাবে এবং তাদের প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না।” (সূরা আলে ইমরান: ১৬১)।
হাদীস শরীফের আলোকে:
- কিয়ামতের দিন চরম লাঞ্ছনা: সহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “আমি যেন কিয়ামতের দিন তোমাদের কাউকে এমন অবস্থায় না দেখি যে, সে তার ঘাড়ে চিৎকাররত উট বহন করছে, অথবা ঘাড়ে ছাগল বা ঘোড়া বহন করছে এবং আমার কাছে এসে ফরিয়াদ করছে—হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে সাহায্য করুন! তখন আমি বলব: আমি তোমার জন্য আল্লাহর নিকট বিন্দুমাত্র ক্ষমতা রাখি না, আমি তো তোমার কাছে দ্বীনের বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলাম।”
- শহীদ হওয়া সত্ত্বেও জাহান্নামের আগুন: খায়বারের দিন এক গোলাম নিহত হলে সাহাবীগণ বলতে লাগলেন: অমুক ব্যক্তি শহীদ! রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: «كَلَّا، إِنِّي رَأَيْتُهُ فِي النَّارِ فِي بُرْدَةٍ غَلَّهَا أَوْ عَبَاءَةٍ» — “কখনো নয়! আমি তাকে জাহান্নামের আগুনে দাউদাউ করে জ্বলতে দেখেছি এমন একটি চাদরের কারণে, যা সে গনীমতের মাল বণ্টনের পূর্বে আত্মসাৎ করেছিল।” (সহীহ মুসলিম: ১১৫)।
- দোয়া ও সদকা প্রত্যাখ্যাত: নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: «لَا تُقْبَلُ صَلَاةٌ بِغَيْرِ طُهُورٍ وَلَا صَدَقَةٌ مِنْ غُلُولٍ» — “পবিত্রতা ব্যতীত কোনো সালাত কবুল হয় না এবং আত্মসাৎকৃত (হারাম) মাল থেকে কোনো সদকা কবুল হয় না।” (সহীহ মুসলিম: ২২৪)।
৩. গুলূল বা আত্মসাৎকৃত মাল থেকে সদকা করার বিধান (حكم التصدق من الغلول)
কোনো ব্যক্তি যদি গুলূল বা আত্মসাতের মাধ্যমে কোনো সম্পদ গ্রহণ করে, অতঃপর তা থেকে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কিংবা সাওয়াবের আশায় সদকা করে, তবে এর শরয়ী বিধান নিম্নরূপ:
- সাওয়াবের নিয়তে সদকা করা সম্পূর্ণ বাতিল ও হারাম: খিয়ানতকৃত বা হারাম সম্পদ মূল মালিকের অধিকার (হক্কুল ইবাদ)। এই সম্পদ সদকা করে সাওয়াব প্রত্যাশা করা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন:
«إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا»
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ব্যতীত কোনো কিছুই কবুল করেন না।” (সহীহ মুসলিম: ১০১৫)।
অতএব, গুলূলের মাল দান করলে দাতার কোনো সাওয়াব হবে না। এমনকি কোনো আলেম এও বলেছেন যে, কেউ যদি জেনে-শুনে হারাম সম্পদকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করে এবং এর জন্য আল্লাহর কাছে সাওয়াব আশা করে তবে তা কুফরীর নিকটবর্তী। - তওবার অনিবার্য শর্ত হলো সম্পদ ফেরত প্রদান: গুলূলের অপরাধ থেকে খাঁটি তওবা (التوبة النصوح) করার প্রধান শর্ত হলো আত্মসাৎকৃত সম্পদ অবিলম্বে তার প্রকৃত হকদার বা বায়তুলমালে ফেরত দেওয়া। সৈন্যবাহিনী উপস্থিত থাকলে সেনাপতি বা আমীরের নিকট তা ফেরত দিতে হবে।
- মালিকের সন্ধান না পাওয়া গেলে দায়মুক্তির উদ্দেশ্যে সদকা: যদি অনেক কাল অতিক্রান্ত হয় এবং খিয়ানতকারী ব্যক্তি তওবা করতে চায়, কিন্তু সংশ্লিষ্ট যোদ্ধাদের বা মালিকদের খুঁজে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব না হয়, তবে ফুকাহায়ে কিরামের সিদ্ধান্ত হলো:
খিয়ানতকারী ব্যক্তি উক্ত সম্পদ নিজের কাছে রাখতে পারবে না। বরং সে কোনো ব্যক্তিগত সাওয়াবের আশা ছাড়া কেবল নিজের অপরাধ ও গলায় ঝুলন্ত দায় থেকে নিষ্কৃতি (براءة الذمة والتخلص من الحرام) লাভের উদ্দেশ্যে উক্ত সম্পদ বা তার সমমূল্যের অর্থ মুসলিম সমাজের সামগ্রিক কল্যাণমূলক কাজে বা নিঃস্ব ফকীর-মিসকীনদের মাঝে বিলিয়ে দেবে এবং এর সাওয়াব মূল মালিকদের জন্য নিয়ত করবে। এর ফলে মূল মালিকরা কিয়ামতের দিন এর বিনিময় পাবে এবং খিয়ানতকারী ব্যক্তি দায়মুক্ত হওয়ার আশা করতে পারে।
٣- عن أبي هريرة (رض) أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: لولا أن أشق على أمتي لأحببت أن لا أتخلف عن سرية تخرج في سبيل الله ولكني لا أجد ما أحملهم عليه ولا يجدون ما يتحملون عليه فيخرجون ويشق عليهم أن يتخلفوا بعدي، فوددت أني أقاتل في سبيل الله فأقتل ثم أحيا فأقتل ثم أحيا فأقتل-
[৩. শাহাদাতের অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষা ও ফযিলত এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সত্তা হওয়া সত্ত্বেও নবীজী (সা.) কর্তৃক শাহাদাতের অনন্য মর্যাদা কামনার হিকমত ও তাৎপর্য।]
মূল হাদীস (النص الحديثي)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي لَأَحْبَبْتُ أَنْ لَا أَتَخَلَّفَ عَنْ سَرِيَّةٍ تَخْرُجُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَلَكِنِّي لَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُهُمْ عَلَيْهِ، وَلَا يَجِدُونَ مَا يَتَحَمَّلُونَ عَلَيْهِ فَيَخْرُجُونَ، وَيَشُقُّ عَلَيْهِمْ أَنْ يَتَخَلَّفُوا بَعْدِي، فَوَدِدْتُ أَنِّي أُقَاتِلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَأُقْتَلَ، ثُمَّ أُحْيَا فَأُقْتَلَ، ثُمَّ أُحْيَا فَأُقْتَلَ»-
অনুবাদ
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “আমার উম্মতের উপর যদি কষ্টসাধ্য হওয়ার আশঙ্কা না থাকত, তবে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হওয়া কোনো ক্ষুদ্র সেনাদল থেকেই আমি পেছনে থেকে যাওয়া পছন্দ করতাম না। কিন্তু আমি তাদেরকে আরোহণ করানোর মতো বাহন জোগাড় করতে পারি না এবং তারাও এমন বাহন পায় না যার ওপর সওয়ার হয়ে অভিযানে বের হতে পারে। আর আমার পেছনে তাদের মদীনায় থেকে যাওয়া তাদের অন্তরে অত্যন্ত কঠিন বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (অতএব আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের কী যে অফুরন্ত মর্যাদা!) আমার অন্তরের ঐকান্তিক বাসনা এই যে—আমি আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করি এবং শহীদ হই; অতঃপর আমাকে জীবিত করা হোক, আমি পুনরায় শহীদ হই; অতঃপর আমাকে জীবিত করা হোক এবং আমি পুনরায় শহীদ হই!”
হাদীসের ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য
এই হাদীসটিতে উম্মতের প্রতি দয়ার সাগর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপরিসীম রহমত ও মমত্ববোধের পাশাপাশি শাহাদাতের অতুলনীয় উচ্চ মর্যাদার সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। নবীজী নিজে প্রত্যেকটি সামরিক অভিযানে গেলে সকল সাহাবীর জন্যও যাওয়া আবশ্যক হতো। কিন্তু তৎকালীন আর্থিক সংকটের কারণে সকল মুজাহিদের জন্য প্রয়োজনীয় ঘোড়া, উট ও অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল না। যাদের বাহন মিলত না, রাসূলের বিরহ ও জিহাদ থেকে বঞ্চিত হওয়ার বেদনায় তাদের চোখ দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হতো (যেমন সূরা তাওবায় বর্ণিত হয়েছে)। উম্মতের এই বাস্তব কষ্ট ও অসহায়ত্বের প্রতি লক্ষ্য রেখে নবীজী মদীনায় অবস্থান করতেন এবং ক্ষুদ্র সেনাদল বা সারিয়্যাহ পাঠাতেন। এরপরও আল্লাহর রাস্তায় রক্তদানের যে পরম মর্যাদা, তার প্রতি উম্মতকে সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসাহ প্রদানের জন্য তিনি বারবার শহীদ হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।
(أ) عرف الشهادة ثم بين فضلها مع ذكر سبب تمنى رسول الله صلى الله عليه وسلم منصب الشهداء مع أنه أفضل منهم-
[উপ-প্রশ্ন (أ): শাহাদাতের পরিচয় দাও এবং এর ফযিলত বর্ণনা কর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শহীদগণের চেয়েও বহুগুণ শ্রেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও কেন তিনি শাহাদাতের মর্যাদা কামনা করেছিলেন তার অন্তর্নিহিত কারণসমূহ উল্লেখ কর।]
১. শাহাদাতের পরিচয় (تعريف الشهادة)
- আভিধানিক অর্থ (معنى الشهادة لغة): ‘আশ-শাহাদাহ’ (الشَّهَادَةُ) শব্দটি আরবি شَهِدَ – يَشْهَدُ (শাহিদা-ইয়াশহাদু) মূল থেকে আগত। এর আভিধানিক অর্থ হলো: উপস্থিত থাকা (الحضور), প্রত্যক্ষ দর্শন করা (المعاينة), সাক্ষ্য প্রদান করা (الإخبار بما علم) ইত্যাদি। যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জীবন বিলিয়ে দেয় তাকে ‘শহীদ’ বলা হয়; কারণ মৃত্যুর সাথে সাথে রহমতের ফেরেশতাগণ তার কাছে উপস্থিত হন, অথবা সে জান্নাতের নেয়ামত সচক্ষে প্রত্যক্ষ করে, কিংবা সে আল্লাহর তাওহীদ ও দ্বীনের সত্যতার ওপর নিজের রক্ত দিয়ে চূড়ান্ত সাক্ষ্য প্রদান করে যায়।
- পারিভাষিক অর্থ (معنى الشهادة شرعًا): ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় কেবল মহান আল্লাহর দ্বীন ও ন্যায়কে সমুন্নত রাখার উদ্দেশ্যে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে আত্মোৎসর্গ করাকে শাহাদাত বলা হয়।
ফুকাহায়ে কিরাম শহীদকে প্রধানত তিনটি স্তরে বিভক্ত করেছেন:- শহীদে দুনিয়া ও আখেরাত (শহীদে কামিল): যে ব্যক্তি খাঁটি নিয়তে কাফির বা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে রণক্ষেত্রে নিহত হয় এবং মৃত্যুর পূর্বে কোনো দুনিয়াবী সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেনি। শরীয়তের বিধানে তাকে গোসল দেওয়া হয় না এবং রক্তমাখা পোশাকেই জানাযা পড়ে দাফন করা হয়।
- শহীদে আখেরাত (শহীদে হুকমী): যারা যুদ্ধের ময়দানে নিহত হয়নি, কিন্তু কোনো বিশেষ কষ্টকর কারণে মারা গেছে। যেমন: মহামারীতে মৃত, পেটের রোগে মৃত, পানিতে ডুবে মৃত, আগুনে পুড়ে মৃত, প্রসববেদনায় মৃত নারী ইত্যাদি। দুনিয়াতে তাদের সাধারণ নিয়মে গোসল ও কাফন দেওয়া হয়, তবে আখেরাতে তারা শহীদের সওয়াব লাভ করবে।
- শহীদে দুনিয়া: যে ব্যক্তি কেবল রিয়া (লোক দেখানো), প্রশংসা বা গনীমতের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে নিহত হয়েছে। দুনিয়ায় তার সাথে শহীদের মতো আচরণ করা হলেও আখেরাতে সে কোনো সাওয়াব পাবে না।
২. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে শাহাদাতের ফযিলত (فضل الشهادة)
ইসলামের দৃষ্টিতে শাহাদাতের মর্যাদা জান্নাত লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সোপান। এর ফযিলত সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত ও হাদীস বর্ণিত হয়েছে:
পবিত্র কুরআনের সাক্ষ্য:
- শহীদগণ চিরঞ্জীব: আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
﴿وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا ۚ بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ﴾
“আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছে তাদেরকে কিছুতেই মৃত মনে করো না; বরং তারা তাদের রবের নিকট চিরঞ্জীব, তাদেরকে রিজিক প্রদান করা হয়।” (সূরা আলে ইমরান: ১৬৯)। - গুনাহ মাফ ও চিরস্থায়ী জান্নাত: সূরা আত-তাওবার ১১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জান ও মাল জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
হাদীস শরীফের প্রামাণ্য বর্ণনা:
- রক্তের প্রথম ফোঁটায় ক্ষমা: মিকদাদ ইবনে মাদিকারিব (রা.) সূত্রে নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: “আল্লাহর নিকট শহীদের জন্য ছয়টি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে: রক্তের প্রথম ফোঁটা পড়ার সাথে সাথে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয় এবং জান্নাতে তার আবাসস্থল দেখিয়ে দেওয়া হয়; কবরের আযাব থেকে সে নিরাপদ থাকে; কিয়ামতের মহাত্রাস থেকে সে নির্ভয় থাকবে; তার মাথায় সম্মানের এমন মুকুট পরানো হবে যার একটি ইয়াকুত পাথর গোটা দুনিয়া ও তার মধ্যকার সবকিছুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ; বাহাত্তর জন ডাগরচোখা হূরের সাথে তার বিবাহ দেওয়া হবে এবং তার নিকটাত্মীয়দের মধ্য থেকে সত্তর জনের জন্য তার শাফাআত কবুল করা হবে।” (জামে তিরমিযী: ১৬৬৩)।
- পুনরায় দুনিয়ায় আসার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা: আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: “জান্নাতে প্রবেশের পর কোনো ব্যক্তিই পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে আসতে চাইবে না, যদিও গোটা পৃথিবীর সবকিছু তাকে দিয়ে দেওয়া হয়; একমাত্র শহীদ ব্যতীত। কারণ সে শাহাদাতের অতুলনীয় সম্মান ও সাওয়াব প্রত্যক্ষ করার পর কামনা করবে—যদি তাকে দশবার দুনিয়ায় ফেরত পাঠানো হতো এবং সে প্রতিবারই আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হতে পারত!” (সহীহ বুখারী: ২৮১৭; সহীহ মুসলিম: ১৮৭৭)।
৩. নবীজী (সা.) কর্তৃক শাহাদাতের মর্যাদা কামনার হিকমত ও তাৎপর্য
একটি মৌলিক কালামী ও আক্বীদাগত প্রশ্ন হলো: হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন কুল কায়েনাত ও সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ মানব (সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন)। নবুওয়াত ও রিসালাতের মাক্বাম নিঃসন্দেহে শাহাদাত ও সিদ্দীকিয়্যাতের চেয়ে বহু ঊর্ধ্বে। তাহলে নবীজী কেন বললেন: “আমি আকাঙ্ক্ষা করি যে আমি আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করি এবং শহীদ হই, অতঃপর জীবিত হই এবং পুনরায় শহীদ হই”?
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী, ইমাম নববী এবং আল্লামা কুরতুবী (রহ.) সহ শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণ এর নিম্নোক্ত গভীর হিকমতসমূহ ব্যাখ্যা করেছেন:
- উম্মতকে চরম আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধকরণ (حث الأمة وترغيبهم في الشهادة): রাসূলুল্লাহ (সা.) হলেন সমগ্র উম্মতের অনুকরণীয় আদর্শ। তিনি যদি শাহাদাত লাভের এমন ঐকান্তিক তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ না করতেন, তবে উম্মত কখনোই শাহাদাতের প্রকৃত মর্যাদা ও গুরুত্ব হৃদয়ঙ্গম করতে পারত না। উম্মতকে আল্লাহর রাস্তায় জান কোরবান করার ব্যাপারে সর্বোচ্চ স্তরে অনুপ্রাণিত করতেই তিনি এই আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন।
- শাহাদাতের বিশেষ সম্মান ও নৈকট্য অর্জন (نيل فضيلة الشهادة وكرامتها): যদিও নবুওয়াতের সামগ্রিক মর্যাদা শাহাদাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তবুও কোনো কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে শাহাদাতের এমন কিছু অনুপম বৈশিষ্ট্য ও আল্লাহর নৈকট্যের প্রকাশ রয়েছে যা কেবল রক্তদানের মাধ্যমেই দৃশ্যমান হয়। যেমন: আল্লাহর ভালোবাসায় সরাসরি নিজের প্রাণ উৎসর্গ করা এবং বারবার জীবন দান করার পরম তৃপ্তি। নবীজী সেই অনন্য বৈশিষ্ট্যের স্বাদ আস্বাদন করতে চেয়েছিলেন।
- সর্বোচ্চ মাক্বামসমূহের সামগ্রিক পূর্ণতা লাভ: কুরআন মাজীদে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের চারটি স্তরের কথা এসেছে: “নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ এবং সালেহীনগণ” (সূরা আন-নিসা: ৬৯)। রাসূলুল্লাহ (সা.) চাইলেন যেন তাঁর মাঝে নবুওয়াত, রিসালাত ও সিদ্দীকিয়্যাতের সাথে সাথে শাহাদাতের মাক্বামও একত্রিত হয়ে পূর্ণতা পায়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলা নবীজীকে ওফাতের সময় শাহাদাতেরও মর্যাদা দান করেছেন। খায়বারের বিষমিশ্রিত গোশতের বিষক্রিয়া তাঁর ওফাতের সময় পুনরুদ্দীপ্ত হয়েছিল, যার ফলে উম্মতের ইমামগণের মতে তিনি একাধারে নবী ও শহীদ হিসেবে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছেছেন।
- সর্বোচ্চ আনুগত্য ও বিনম্র দাসত্বের প্রকাশ (كمال العبودية لله): একজন প্রকৃত আশিক ও পরম বান্দার চূড়ান্ত তৃপ্তি হলো স্বীয় মা’বূদের জন্য নিজের প্রিয়তম সত্তা বিলিয়ে দেওয়া। বারবার জীবিত হয়ে বারবার আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রক্ত ঝরানোর আকাঙ্ক্ষা হলো আল্লাহর প্রতি বান্দা হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরিপূর্ণ দাসত্ব ও সীমাহীন আত্মনিবেদনের সর্বোত্তম বহিঃপ্রকাশ।
مجموعة (ب) — الموطأ للإمام محمد بن الحسن (মুওয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ)
الدرجة — ١٠ × ٢ = ٢٠
(ترجم الأحاديث التالية ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها) — নিম্নোক্ত হাদীসসমূহের অনুবাদ কর অতঃপর সংশ্লিষ্ট প্রশ্নসমূহের উত্তর দাও।
٤- عن مالك بن أبي عامر الأنصاري أن عثمان بن عفان كان يقول في خطبته: إذا قامت الصلاة فاعدلوا الصفوف، وحاذوا بالمناكب- فإن اعتدال الصفوف من تمام الصلاة- ثم لا يكبر حتى يأتيه رجال قد وكلهم بتسوية الصفوف، فيخبرونه أن قد استوت فيكبر-
[৪. খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত উসমান (রা.)-এর কাতার সোজা করার নির্দেশ, নামাযে কাতার সোজা করার বিধান এবং ইকামতের সময় ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়ানোর সঠিক সময়।]
মূল হাদীস (النص الحديثي)
عَنْ مَالِكِ بْنِ أَبِي عَامِرٍ الْأَنْصَارِيِّ أَنَّ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانَ كَانَ يَقُولُ فِي خُطْبَتِهِ: «إِذَا قَامَتِ الصَّلَاةُ فَاعْدِلُوا الصُّفُوفَ، وَحَاذُوا بِالْمَنَاكِبِ، فَإِنَّ اعْتِدَالَ الصُّفُوفِ مِنْ تَمَامِ الصَّلَاةِ». ثُمَّ لَا يُكَبِّرُ حَتَّى يَأْتِيَهُ رِجَالٌ قَدْ وَكَّلَهُمْ بِتَسْوِيَةِ الصُّفُوفِ، فَيُخْبِرُونَهُ أَنْ قَدِ اسْتَوَتْ فَيُكَبِّرُ-
অনুবাদ
হযরত মালিক ইবনে আবি আমির আল-আনসারী (রহ.) হতে বর্ণিত যে, খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) স্বীয় জুমার খুৎবায় বলতেন: “যখন নামাযের ইকামত দেওয়া হয়, তখন তোমরা নামাযের কাতারসমূহকে সোজা করো এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াও। কেননা কাতার সোজা ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা সালাত পূর্ণাঙ্গ হওয়ার অন্যতম অপরিহার্য অংশ।” অতঃপর তিনি নিজে (তাকবীরে তাহরীমার মাধ্যমে) সালাত শুরু করতেন না যে পর্যন্ত না তাঁর নিকট এমন কিছু ব্যক্তি ফিরে আসতেন যাদেরকে তিনি কাতার সোজা করার তদারকির জন্য দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন; তাঁরা এসে যখন তাঁকে জানাতেন যে কাতারগুলো সম্পূর্ণরূপে সোজা হয়েছে, তখন তিনি তাকবীর বলে সালাত শুরু করতেন।
হাদীসের প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা
এই প্রামাণ্য বর্ণনাটি খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলে জামায়াতের শৃংখলা ও কাতার সোজা করার গুরুত্বের অকাট্য প্রমাণ। হযরত উমর ফারুক (রা.) এবং হযরত উসমান গণী (রা.) উভয়েই মসজিদে নববীতে কাতার সোজা ও নিখুঁত করার জন্য কতিপয় বিশ্বস্ত সাহাবীকে দায়িত্বপ্রাপ্ত তদারককারী হিসেবে মোতায়েন করতেন। তাঁরা কাতারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে গিয়ে সোজা করতেন এবং ফিরে এসে নিশ্চয়তা দিলেই কেবল খলিফা সালাতের তাকবীরে তাহরীমা বলতেন। জামায়াতের ঐক্য, কাতারবদ্ধতার শৃঙ্খলা এবং আত্মিক একাগ্রতা কাতার সোজা করার সাথে গভীরভাবে জড়িত।
(أ) ما حكم تسوية الصفوف في الصلاة؟ ومتى يقوم الإمام والمأموم عند الإقامة؟ فصل-
[উপ-প্রশ্ন (أ): সালাতে কাতার সোজা করার শরয়ী হুকুম কী? এবং ইকামতের সময় ইমাম ও মুক্তাদী কখন দাঁড়াবে? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
১. সালাতে কাতার সোজা করার শরয়ী হুকুম (حكم تسوية الصفوف)
জামায়াতে সালাত আদায়কালে কাতার সোজা, সুশৃঙ্খল ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফাঁক বন্ধ করে দাঁড়ানোর গুরুত্ব অপরিসীম। এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কিরামের অভিমত নিম্নরূপ:
- জমহুর ফুকাহায়ে কিরামের অভিমত (হানাফী, মালেকী ও শাফেয়ী মাযহাব): অধিকাংশ আলেমের মতে জামায়াতের কাতার সোজা করা ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ’ (سنة مؤكدة), যা প্রায় ওয়াজিবের সমতুল্য গুরুত্ব বহন করে। কাতার সোজা না করে নামায পড়লে নামায আদায় হয়ে যাবে বটে, তবে তা মাকরূহ তাহরীমী হবে এবং জামায়াতের পূর্ণ সাওয়াব ক্ষুণ্ন হবে। কারণ হাদীসে এসেছে: «تَسْوِيَةُ الصُّفُوفِ مِنْ تَمَامِ الصَّلَاةِ» — “কাতার সোজা করা নামাযের পূর্ণতার অন্তর্ভুক্ত।”
- ইমাম বুখারী, ইবনে হাযম ও কতক সালাফী আলেমের অভিমত: তাঁদের মতে কাতার সোজা করা ওয়াজিব (فرض/واجب)। কারণ কাতার বাঁকা রাখা বা ফাঁকা রাখার ব্যাপারে হাদীস শরীফে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। হযরত নু’মান ইবনে বাশীর (রা.) হতে বর্ণিত, নবীজী (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«لَتُسَوُّنَّ صُفُوفَكُمْ أَوْ لَيُخَالِفَنَّ اللَّهُ بَيْنَ وُجُوهِكُمْ»
“তোমরা অবশ্যই তোমাদের কাতারসমূহ সোজা করবে, অন্যথায় আল্লাহ তাআলা তোমাদের অন্তরের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে দেবেন।” (সহীহ বুখারী: ৭১৭; সহীহ মুসলিম: ৪৩৬)। - কাতার সোজা করার সুন্নাতসম্মত রূপরেখা:
- কাঁধে কাঁধ এবং পায়ের গোড়ালির সাথে গোড়ালি সমান করে দাঁড়ানো।
- কাতারের মধ্যবর্তী অপ্রয়োজনীয় ফাঁকা স্থান বন্ধ করা, যাতে শয়তান প্রবেশ করতে না পারে। নবীজী (সা.) বলেছেন: “তোমরা কাতার সোজা করো, কাঁধগুলো সমান করো, ফাঁকা স্থান বন্ধ করো… আল্লাহর শপথ! আমি দেখতে পাই শয়তান ছোট ছোট কালো বকরির বাচ্চার মতো কাতারের ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করছে।” (সুনানে আবু দাউদ: ৬৬৭)।
- পূর্ববর্তী কাতার সম্পূর্ণ না করে নতুন কাতার শুরু না করা।
- ইমামের ঠিক পেছনে জ্ঞানবান ও বিজ্ঞ ব্যক্তিদের দাঁড়ানো।
২. ইকামতের সময় ইমাম ও মুক্তাদীর দাঁড়ানোর সঠিক সময় (وقت قيام الإمام والمأموم عند الإقامة)
মুয়াজ্জিন যখন ইকামত শুরু করে, তখন ইমাম ও মুক্তাদী কখন দাঁড়াবে—এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ফিকহী নীতিমালা রয়েছে:
- হানাফী মাযহাবের সিদ্ধান্ত:
- ইমাম ও মুক্তাদী পূর্ব থেকেই মসজিদে উপবিষ্ট থাকলে: হানাফী ফিকহগ্রন্থ ‘আল-হিদায়াহ’, ‘ফাতহুল কাদীর’ এবং ‘মারাক্বিউল ফালাহ’ অনুসারে মুয়াজ্জিন যখন ইকামতের বাক্য «حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ» (হাইয়া আলাল ফালাহ)-এ পৌঁছাবে, তখন ইমাম ও মুক্তাদী সকলের জন্য দাঁড়ানো মুস্তাহাব। কারণ এর অর্থ হলো “কল্যাণের দিকে এসো”, সুতরাং আহ্বানের সাথে সাথেই দাঁড়িয়ে সাড়া দেওয়া উত্তম। আবার কোনো কোনো হানাফী ফকীহের মতে «قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ» (ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ) বলার সময় দাঁড়ানোও মুস্তাহাব।
- ইমাম যদি বাইরে থেকে মসজিদে প্রবেশ করেন: ইমাম যদি মেহরাবের পেছনের দরজা বা বাইরে থেকে আসেন, তবে ইমাম যে কাতারের পাশ দিয়ে অতিক্রম করবেন সেই কাতারের মুসল্লিরা দাঁড়াবে। ইমামকে দেখে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে যাওয়া সুন্নাত পরিপন্থী নয়।
- শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের সিদ্ধান্ত:
শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহগণের মতে, মুয়াজ্জিন সম্পূর্ণ ইকামত শেষ করার পর তাকবীরে তাহরীমা শুরু করার প্রাক্কালে দাঁড়ানো মুস্তাহাব। ইকামত চলাকালীন বসে থাকা এবং ইকামত সমাপ্ত হলে একসাথে দাঁড়িয়ে যাওয়া তাদের মতে উত্তম। - মালিকী মাযহাবের সিদ্ধান্ত:
ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতে, দাঁড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট কোনো একক বাক্য নির্ধারিত নেই। মুসল্লিরা নিজ নিজ শারীরিক সামর্থ্য ও সুবিধা অনুযায়ী ইকামতের যেকোনো পর্যায়ে দাঁড়াতে পারেন। বৃদ্ধ বা দুর্বল ব্যক্তি চাইলে শুরুতে বা কিছুটা দেরিতে দাঁড়াতে পারেন, এতে কোনো অসুবিধা নেই।
٥- أخبرني أبو النضر أن أبا مرة مولى عقيل أنه سمع أم هانئ بنت أبي طالب تحدث أنها ذهبت إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم عام الفتح- فوجدته يغتسل وفاطمة ابنته تستره بثوب- قال: فسلمت وذلك ضحى- فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: من هذا؟ فقلت: أنا أم هانئ بنت أبي طالب، قال: مرحبًا بأم هانئ- فلما فرغ من غسله قام فصلى ثماني ركعات ملتحفًا في ثوب، ثم انصرف-
[৫. মক্কা বিজয়ের দিন নবীজী (সা.)-এর চাশতের সালাত আদায়, নামাযীর জন্য পোষাকের সংখ্যা এবং সালাতে পুরুষ ও নারীর সতর আবৃতকরণের শরয়ী বিধান।]
মূল হাদীস (النص الحديثي)
أَخْبَرَنِي أَبُو النَّضْرِ أَنَّ أَبَا مُرَّةَ مَوْلَى عَقِيلٍ أَنَّهُ سَمِعَ أُمَّ هَانِئٍ بِنْتَ أَبِي طَالِبٍ تُحَدِّثُ أَنَّهَا ذَهَبَتْ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ الْفَتْحِ، فَوَجَدَتْهُ يَغْتَسِلُ وَفَاطِمَةُ ابْنَتُهُ تَسْتُرُهُ بِثَوْبٍ، قَالَ: فَسَلَّمْتُ وَذَلِكَ ضُحًى، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ هَذَا؟» فَقُلْتُ: أَنَا أُمُّ هَانِئٍ بِنْتُ أَبِي طَالِبٍ، قَالَ: «مَرْحَبًا بِأُمِّ هَانِئٍ». فَلَمَّا فَرَغَ مِنْ غُسْلِهِ قَامَ فَصَلَّى ثَمَانِيَ رَكَعَاتٍ مُلْتَحِفًا فِي ثَوْبٍ، ثُمَّ انْصَرَفَ-
অনুবাদ
আবু নযর (রহ.) বর্ণনা করেন যে, আক্বীলের আযাদকৃত গোলাম আবু মুররাহ তাকে জানিয়েছেন যে, তিনি হযরত আবু তালিবের কন্যা উম্মে হানী (রা.)-কে বলতে শুনেছেন: তিনি (উম্মে হানী) মক্কা বিজয়ের বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হলেন। তিনি দেখলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোসল করছেন এবং তাঁর কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.) একটি কাপড় দিয়ে তাঁকে আড়াল (পর্দা) করে রেখেছেন। উম্মে হানী বলেন: আমি সালাম প্রদান করলাম, আর তখন ছিল চাশতের সময় (পূর্বাহ্ণ)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন: “কে ইনি?” আমি বললাম: আমি আবু তালিবের কন্যা উম্মে হানী। তখন নবীজী বললেন: “উম্মে হানীকে স্বাগতম (মারহাবা)!” অতঃপর যখন তিনি গোসল সম্পন্ন করলেন, তখন তিনি দাঁড়িয়ে একটি মাত্র কাপড় গায়ে জড়িয়ে আট রাকাত সালাত আদায় করলেন; এরপর নামায সমাপ্ত করে ফিরে আসলেন।
হাদীসের শিক্ষা ও তাৎপর্য
হাদীসটি বহুবিধ শারঈ বিধান ও শিষ্টাচারের আধার:
১. মক্কা বিজয়ের মতো ঐতিহাসিক বিজয়ের দিনে অহংকার নয়, বরং শুকরিয়াস্বরূপ আল্লাহর দরবারে সালাতুল ফাতহ (বিজয়ের সালাত) বা সালাতুদ দুহা আদায় করা সুন্নাত।
২. গোসল করার সময় সতর আবৃত করা বা আড়াল ব্যবহার করা নবীজীর সার্বক্ষণিক শিষ্টাচার।
৩. আগন্তুককে “মারহাবা” বলে অভ্যর্থনা জানানো সুন্নাত।
৪. এক কাপড়ে সালাত আদায় করার বৈধতা প্রমাণিত হয়, যদি তা দ্বারা শরীরের সতর সম্পূর্ণরূপে আবৃত থাকে।
(أ) كم ثوبًا يستحب للمصلي أن يصلي فيه؟ بين حكم ستر العورة في الصلاة للرجال والنساء-
[উপ-প্রশ্ন (أ): নামাযীর জন্য কয়টি পোশাকে সালাত আদায় করা মুস্তাহাব? পুরুষ ও মহিলার জন্য নামাযে সতর ঢাকার শরয়ী বিধান ও সীমারেখা বিশ্লেষণ কর।]
১. নামাযীর জন্য পোশাকের সংখ্যা ও মুস্তাহাব পরিচ্ছদ (عدد الثياب المستحبة في الصلاة)
পোশাকের সংখ্যার ব্যাপারে ফুকাহায়ে কিরামের নীতিমালা নিম্নরূপ:
- এক কাপড়ে নামাযের হুকুম (جواز الصلاة في ثوب واحد): যদি কারো কাছে একটিমাত্র প্রশস্ত কাপড় থাকে এবং তা দিয়ে যদি নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত সতর সম্পূর্ণরূপে আবৃত করা সম্ভব হয়, তবে এক কাপড়ে সালাত আদায় করা সম্পূর্ণরূপে জায়েয। যেমন আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) এক কাপড়ে চাদর মুড়ি দিয়ে আট রাকাত নামায পড়েছেন।
- মুস্তাহাব ও উত্তম পোশাকের সংখ্যা (الثياب المستحبة): সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য দুটি বা তিনটি শালীন পোশাকে সালাত আদায় করা মুস্তাহাব ও সুন্নাত।
- পুরুষের জন্য: কমপক্ষে দুটি কাপড়—একটি কুর্তা/জামা এবং একটি পায়জামা/লুঙ্গি। সাথে চাদর জড়ানো এবং টুপি বা পাগড়ী পরিধান করা মুস্তাহাব। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন:
﴿يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ﴾
“হে বনী আদম! তোমরা প্রত্যেক সালাতের সময় তোমাদের সুন্দর পোশাক গ্রহণ করো।” (সূরা আল-আ’রাফ: ৩১)। হযরত উমর (রা.) বলেন: “যখন আল্লাহ তোমাদের প্রাচুর্য দিয়েছেন, তখন তোমরাও পোশাকে প্রাচুর্য প্রদর্শন করো; একজন ব্যক্তি যেন নিজ জামা ও চাদর, পায়জামা ও কোর্তা পরে নামায পড়ে।” - নারীর জন্য: নারীদের জন্য তিনটি পোশাকে সালাত আদায় করা মুস্তাহাব: একটি প্রশস্ত কামিজ/জামা (যা পায়ের উপরিভাগ পর্যন্ত ঢেকে রাখে), একটি ওড়না বা খিমার (যা মাথা, চুল ও গ্রীবা ঢেকে বক্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে) এবং একটি প্রশস্ত চাদর বা মিলহাফাহ (যা সম্পূর্ণ দেহকে ঢেকে রাখে)।
- পুরুষের জন্য: কমপক্ষে দুটি কাপড়—একটি কুর্তা/জামা এবং একটি পায়জামা/লুঙ্গি। সাথে চাদর জড়ানো এবং টুপি বা পাগড়ী পরিধান করা মুস্তাহাব। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন:
২. নামাযে সতর ঢাকার শরয়ী হুকুম (حكم ستر العورة في الصلاة)
ইসলামী শরীয়তের সর্বসম্মত ফায়সালা অনুযায়ী, নামায সহীহ হওয়ার জন্য সতর আবৃত করা অন্যতম প্রধান অপরিহার্য পূর্বশর্ত (شرط من شروط صحة الصلاة)। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি কারো সতরের কোনো অংশ প্রকাশ্য থাকে, তবে তার সালাত বাতিল (বাতেল/ফাসিদ) হয়ে যাবে।
হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
«لَا يَقْبَلُ اللَّهُ صَلَاةَ حَائِضٍ إِلَّا بِخِمَارٍ»
“কোনো প্রাপ্তবয়স্কা নারীর সালাত ওড়না (মাথা ও সতর আবৃতকারী বস্ত্র) ব্যতীত আল্লাহ কবুল করেন না।” (জামে তিরমিযী: ৩৭৭; আবু দাউদ: ৬৪১)।
৩. পুরুষ ও মহিলার সতরের শরয়ী সীমারেখা (حدود عورة الرجل والمرأة في الصلاة)
নামাযের মধ্যে পুরুষ ও মহিলার সতরের ক্ষেত্রে শরীয়তের সুস্পষ্ট সীমারেখা নিম্নরূপ:
- পুরুষের সতরের সীমারেখা:
- পুরুষের সতর হলো নাভির নিচ থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত (ما بين السرة إلى الركبة)।
- হাঁটু সতরের অন্তর্ভুক্ত কি না: ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে হাঁটু সতরের অন্তর্ভুক্ত, নাভি সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়। পক্ষান্তরে ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম মালিকের মতে নাভি ও হাঁটু উভয়ের মধ্যবর্তী অংশ সতর, স্বয়ং হাঁটু সতরের বাইরে। তবে সতর্কতামূলকভাবে হাঁটু আবৃত রাখাই উত্তম।
- হানাফী ফিকহ অনুসারে পুরুষের সতরের কোনো অঙ্গের এক-চতুর্থাংশ (১/৪) বা তার বেশি অংশ যদি এক রুকন পরিমাণ সময় খোলা থাকে, তবে নামায নষ্ট হয়ে যাবে।
- মহিলার সতরের সীমারেখা:
- নামাযের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কা নারীর সমগ্র দেহই সতর (عورة), কেবল তিনটি অঙ্গ ব্যতীত:
- মুখমণ্ডল (الوجه): নামাযের সময় মুখ খোলা রাখা সর্বসম্মতভাবে জায়েয।
- উভয় হাতের কব্জি পর্যন্ত (الكفان): হাতের পাতা খোলা রাখা সর্বসম্মতভাবে জায়েয।
- উভয় পায়ের পাতা (القدمان): ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর বিশুদ্ধতম বর্ণনা অনুযায়ী নারীদের পায়ের পাতা সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়; ফলে তা অনাবৃত থাকলে নামায সহীহ হবে। তবে অন্যান্য তিন মাযহাবের (শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী) মতে পায়ের পাতাও সতরের অন্তর্ভুক্ত, তাই পা ঢেকে নামায পড়া অধিক সতর্কতামূলক।
- মাথার চুল, কান, গলা, ঘাড় বা বাহুর সামান্য অংশও যদি নামাযের মধ্যে এক রুকন পরিমাণ সময় অনাবৃত হয়ে পড়ে, তবে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী নামায ফাসিদ হয়ে যাবে। সুতরাং মহিলাদের জন্য সতর্কতার সাথে ঢিলেঢালা পোশাকে সালাত আদায় করা ওয়াজিব।
- নামাযের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কা নারীর সমগ্র দেহই সতর (عورة), কেবল তিনটি অঙ্গ ব্যতীত:
٦- عن أبي عبيد مولى عبد الرحمن قال: شهدت العيد مع عمر بن الخطاب فصلى ثم انصرف فخطب فقال: إن هذين اليومين نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن صيامهما، يوم فطركم من صيامكم- والآخر يوم تأكلون من لحوم نسككم- قال: ثم شهدت العيد مع عثمان بن عفان فصلى، ثم انصرف فخطب فقال: إن قد اجتمع لكم في يومكم هذا عيدان- فمن أحب من أهل العالية أن ينتظر الجمعة فلينتظرها، ومن أحب أن يرجع- فقد أذنت له- فقال: ثم شهدت العيد مع علي وعثمان محصور فصلى ثم انصرف فخطب-
[৬. দুই ঈদের দিনে সিয়াম পালনের নিষেধাজ্ঞা, খুলাফায়ে রাশেদীনের ঈদ উদযাপন এবং একই দিনে ঈদ ও জুমার জামায়াত একত্রিত হওয়ার সমন্বিত ফিকহী বিধান।]
মূল হাদীস (النص الحديثي)
عَنْ أَبِي عُبَيْدٍ مَوْلَى عَبْدِ الرَّحْمَنِ قَالَ: شَهِدْتُ الْعِيدَ مَعَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فَصَلَّى ثُمَّ انْصَرَفَ فَخَطَبَ فَقَالَ: «إِنَّ هَذَيْنِ الْيَوْمَيْنِ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ صِيَامِهِمَا: يَوْمُ فِطْرِكُمْ مِنْ صِيَامِكُمْ، وَالْآخَرُ يَوْمٌ تَأْكُلُونَ مِنْ لُحُومِ نُسُكِكُمْ». قَالَ: ثُمَّ شَهِدْتُ الْعِيدَ مَعَ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ فَصَلَّى، ثُمَّ انْصَرَفَ فَخَطَبَ فَقَالَ: «إِنَّهُ قَدِ اجْتَمَعَ لَكُمْ فِي يَوْمِكُمْ هَذَا عِيدَانِ، فَمَنْ أَحَبَّ مِنْ أَهْلِ الْعَالِيَةِ أَنْ يَنْتَظِرَ الْجُمُعَةَ فَلْيَنْتَظِرْهَا، وَمَنْ أَحَبَّ أَنْ يَرْجِعَ فَقَدْ أَذِنْتُ لَهُ». قَالَ: ثُمَّ شَهِدْتُ الْعِيدَ مَعَ عَلِيٍّ وَعُثْمَانُ مَحْصُورٌ، فَصَلَّى ثُمَّ انْصَرَفَ فَخَطَبَ-
অনুবাদ
আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর আযাদকৃত গোলাম আবু উবাইদ (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সাথে ঈদের জামায়াতে উপস্থিত হলাম। তিনি প্রথমে নামায আদায় করলেন, অতঃপর নামায শেষে খুৎবা প্রদান করলেন এবং বললেন: “নিশ্চয়ই এই দুটি দিনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন: একটি হলো তোমাদের সিয়াম সমাপনান্তে রোযা ভাঙার দিন (ঈদুল ফিতর), আর অপরটি হলো যেদিন তোমরা তোমাদের কুরবানীর পশুর গোশত আহার করো (ঈদুল আজহা)।”
আবু উবাইদ বলেন: অতঃপর আমি হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর সাথে ঈদের সালাতে অংশ নিলাম। তিনিও প্রথমে নামায আদায় করলেন, এরপর ফিরে দাঁড়িয়ে খুৎবা দিলেন এবং বললেন: “তোমাদের আজকের এই বিশেষ দিনে দুটি ঈদ (ঈদের দিন ও জুমার দিন) একত্রিত হয়েছে। অতএব, দূরবর্তী উচ্চভূমির অধিবাসীদের (আহলে আলিয়াহ) মধ্য থেকে যে ব্যক্তি জুমার নামাযের জন্য শহরে অপেক্ষা করতে চায় সে যেন অপেক্ষা করে; আর যে ব্যক্তি নিজ পরিবারের কাছে ফিরে যেতে চায়, আমি তাকে (ফিরে যাওয়ার) অনুমতি দিলাম।”
আবু উবাইদ বলেন: অতঃপর আমি হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর সাথেও ঈদের নামাযে শরিক হয়েছিলাম যখন হযরত উসমান (রা.) স্বীয় বাসভবনে অবরুদ্ধ ছিলেন। তিনি (আলী রা.)ও প্রথমে সালাত আদায় করলেন, অতঃপর ফিরে দাঁড়িয়ে খুৎবা প্রদান করলেন।
হাদীসের শিক্ষা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
- ঈদের দিনে রোযা রাখা হারাম বা তাহরীমী মাকরূহ। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত আপ্যায়নের দিন।
- খুলাফায়ে রাশেদীন সকলেই ঈদের নামায খুৎবার পূর্বে আদায় করেছেন—যা প্রমাণ করে ঈদের সালাতে প্রথমে নামায এবং পরে খুৎবা প্রদান করা সুন্নাত।
- হযরত উসমান (রা.) দূরবর্তী অঞ্চলের গ্রামবাসীদের জন্য জুমার নামাযের সাধারণ বাধ্যবাধকতায় বিশেষ ছাড় প্রদান করেছিলেন, যা ফিকহী ইজতিহাদের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
(أ) ما حكم صلاة العيد وصلاة الجمعة وما حكمهما إذا اجتمعا في يوم واحد؟
[উপ-প্রশ্ন (أ): ঈদের সালাত ও জুমার সালাতের শরয়ী হুকুম কী? এবং এই দুটি সালাত যদি একই দিনে একত্রিত হয়, তবে উভয়ের সমন্বিত শরয়ী বিধান কী? আলোচনা কর।]
১. ঈদের সালাতের শরয়ী হুকুম (حكم صلاة العيد)
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাযের হুকুমের ক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কিরামের মাযহাবসমূহের মধ্যে নিম্নোক্ত মতপার্থক্য রয়েছে:
- হানাফী মাযহাব: হানাফী ফকীহগণের নিকট ঈদের সালাত আদায় করা ‘ওয়াজিব’ (واجب عيني)। যাদের ওপর জুমার নামায ফরয, তাদের ওপর ঈদের নামায পড়াও ওয়াজিব।
- শাফেয়ী ও মালিকী মাযহাব: তাঁদের মতে ঈদের নামায আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ (سنة مؤكدة)। শাফেয়ী মাযহাবের কোনো কোনো আলেম একে সুন্নাতু কিফায়াহও বলেছেন।
- হাম্বলী মাযহাব: ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে ঈদের সালাত হলো ‘ফরযে কিফায়াহ’ (فرض كفاية)। সমাজের একদল লোক আদায় করলে অন্যরা দায়মুক্ত হবে, কিন্তু কেউ আদায় না করলে সবাই গুনাহগার হবে।
২. জুমার সালাতের শরয়ী হুকুম (حكم صلاة الجمعة)
জুমার সালাত প্রত্যেক বালেগ, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, স্বাধীন, মুকীম (অনাবাসী) মুসলিম পুরুষের ওপর সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিগত ফরয বা ‘ফরযে আইন’ (فرض عين)। পবিত্র কুরআন, সহীহ সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা এর ফরযিয়াত অকাট্যভাবে প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ﴾
“হে ঈমানদারগণ! জুমার দিনে যখন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ করো।” (সূরা আল-জুমুআহ: ৯)।
৩. একই দিনে ঈদ ও জুমা একত্রিত হলে শরয়ী বিধান (حكم اجتماعهما في يوم واحد)
যদি জুমার দিনে ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হয়, তবে সে ক্ষেত্রে নামাযীদের ওপর কী বিধান প্রযোজ্য হবে, এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মধ্যে প্রধানত দুটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান:
১. হানাফী ও মালিকী মাযহাবের সিদ্ধান্ত (জমহুর উলামায়ে কিরাম):
- শহরের বাসিন্দাদের ওপর উভয়টিই আবশ্যক: শহরের স্থায়ী বাসিন্দা যাদের ওপর সাধারণ অবস্থায় জুমা ফরয, তারা ঈদের নামায পড়ার কারণে জুমার ফরযিয়াত কখনোই রহিত (সাক্বিত) হয় না। তাদের জন্য ঈদের নামায ওয়াজিব এবং জুমার নামায পৃথকভাবে ফরযে আইন। একটি ওয়াজিব আদায় করার কারণে আরেকটি অকাট্য ফরয রহিত হতে পারে না।
- গ্রাম ও দূরবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য বিশেষ অবকাশ: আলোচ্য হাদীসে হযরত উসমান (রা.) যে ছাড় দিয়েছিলেন—«فَمَنْ أَحَبَّ مِنْ أَهْلِ الْعَالِيَةِ أَنْ يَنْتَظِرَ الْجُمُعَةَ فَلْيَنْتَظِرْهَا، وَمَنْ أَحَبَّ أَنْ يَرْجِعَ فَقَدْ أَذِنْتُ لَهُ»—তার ব্যাখ্যায় ইমাম আবু হানীফা ও মালিকী ফকীহগণ বলেন: এটি কেবল ‘আহলে আলিয়াহ’ অর্থাৎ মদীনার বাইরে কয়েক মাইল দূরবর্তী গ্রামের লোকদের জন্য প্রযোজ্য ছিল। কারণ তারা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কষ্ট করে সকালে ঈদের নামায পড়তে এসেছিল। দুপুর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তাদের শহরে অপেক্ষা করা অথবা গ্রামে ফিরে গিয়ে পুনরায় জুমার জন্য হেঁটে আসা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তাই খলিফা উসমান (রা.) তাঁদেরকে অনুমতি দিয়েছিলেন যে, তারা চাইলে গ্রামে ফিরে গিয়ে জুমার পরিবর্তে নিজ নিজ স্থানে যোহরের চার রাকাত পড়ে নিতে পারে। কিন্তু শহরের বাসিন্দাদের জন্য জুমার কোনো বিকল্প নেই।
২. হাম্বলী মাযহাবের সিদ্ধান্ত:
- ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে, কোনো ব্যক্তি যদি সকালে ঈদের নামায আদায় করে, তবে তার জন্য জুমার জামায়াতে উপস্থিত না হওয়ার অবকাশ সৃষ্টি হয়। সে মসজিদে জুমায় না এসে নিজ ঘরে বা কর্মস্থলে যোহরের সালাত আদায় করে নিলেই যথেষ্ট হবে। তবে জুমার জামায়াতে উপস্থিত হওয়া তার জন্য অধিক উত্তম ও সাওয়াবের কাজ।
- তবে হাম্বলী মাযহাবেও ইমাম বা খতীবের ওপর মসজিদে জুমার জামায়াত কায়েম রাখা ফরযে কিফায়াহ। যারা জুমায় আসবে তাদেরকে নিয়ে ইমাম অবশ্যই জুমার নামায কায়েম করবেন।
সমন্বিত সিদ্ধান্ত ও সতর্কতামূলক আমল:
মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ইবাদতের পরিপূর্ণ নিরাপত্তার স্বার্থে সবচেয়ে প্রামাণ্য ও নিরাপদ সিদ্ধান্ত হলো—যে ব্যক্তি সকালে ঈদের সালাত আদায় করবে, সে দুপুরে জুমার সালাতেও শরিক হবে। কারণ ফরযে আইন নামায কোনো সাধারণ ওযর ছাড়া পরিত্যাগ করা উম্মতের অধিকাংশ মুজতাহিদ ইমামদের মতে বৈধ নয়।
مجموعة (ج) — شعب الإيمان للبيهقي (শুআবুল ঈমান লিল-বায়হাকী)
الدرجة — ١٠ × ٢ = ٢٠
(ترجم الأحاديث التالية ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها) — নিম্নোক্ত হাদীসসমূহের অনুবাদ কর অতঃপর সংশ্লিষ্ট প্রশ্নসমূহের উত্তর দাও।
٧- عن أبي هريرة رضي الله عنه قال؛ قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: أمرت أن أقاتل الناس حتى يقولوا لا إله إلا الله- فإذا قالوها منعوا مني دماءهم وأموالهم إلا بحقها وحسابهم على الله عز وجل-
[৭. তাওহীদের ঘোষণার মাধ্যমে জান-মালের নিরাপত্তা, ঈমানের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা এবং ঈমান ও ইসলামের মধ্যকার গভীর সম্পর্ক ও পার্থক্য।]
মূল হাদীস (النص الحديثي)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَإِذَا قَالُوهَا مَنَعُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّهَا، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ»-
অনুবাদ
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “আমি মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই পরিচালনা করার জন্য (আল্লাহর পক্ষ থেকে) নির্দেশিত হয়েছি যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে—‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই’। অতএব, যখন তারা এ ঘোষণা প্রদান করবে, তখন তারা আমার থেকে তাদের রক্ত (জীবন) ও ধন-সম্পদকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুরক্ষিত করে নিল; তবে ইসলামের কোনো অবধারিত হকের কারণে (যদি শাস্তি বা আর্থিক জরিমানা আরোপিত হয়) ব্যতীত। আর তাদের অন্তরের গোপন হিসাব-নিকাশ একমাত্র পরাক্রমশালী মহান আল্লাহর নিকট সোপর্দ।”
হাদীসের তাহকীক ও মূল শিক্ষা
- «أُمِرْتُ» (উমিরতু): অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা আমাকে এই নির্দেশ প্রদান করেছেন।
- «حَتَّى يَقُولُوا لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ»: বাহ্যিকভাবে কেবল তাওহীদের স্বীকৃতি দিলেই একজন ব্যক্তি মুসলিম হিসেবে পরিগণিত হবে এবং তার রক্ত ও ধন-সম্পদ হরণ করা সম্পূর্ণ হারাম হবে। হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) এক কাফিরকে মৃত্যুর মুখে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা সত্ত্বেও হত্যা করেছিলেন। নবীজী তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছিলেন: «أَفَلَا شَقَقْتَ عَنْ قَلْبِهِ حَتَّى تَعْلَمَ أَقَالَهَا أَمْ لَا؟» — “তুমি কি তার অন্তর চিরে দেখেছিলে যে সে অন্তর থেকে বলেছিল কি না?!” (সহীহ মুসলিম: ৯৬)।
- «إِلَّا بِحَقِّهَا» (ইল্লা বি-হাক্বক্বিহা): ইসলামের হকের কারণে জান-মালের সুরক্ষা ব্যাহত হতে পারে। যেমন: মুরতাদ হয়ে যাওয়া, বিবাহিত অবস্থায় ব্যভিচার করা, ইচ্ছাকৃত কাউকে হত্যা করা (ক্বিসাস), অথবা যাকাত দিতে অস্বীকার করা। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এই হাদীসের দলীল দিয়েই যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।
- «وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ»: পার্থিব জীবনে ইসলাম বাহ্যিক স্বীকৃতির ওপর ভিত্তি করে ফয়সালা করে; কারো অন্তরে মুনাফেক্বী আছে কি না তার বিচারের দায়িত্ব কেবল আল্লাহর।
(أ) عرف الإيمان لغة وشرعًا- ثم بين الفرق بينه وبين الإسلام-
[উপ-প্রশ্ন (أ): ঈমানের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা দাও। অতঃপর ঈমান ও ইসলামের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও পার্থক্য বিশদভাবে উপস্থাপন কর।]
১. ঈমানের পরিচয় (تعريف الإيمان)
- আভিধানিক অর্থ (الإيمان لغة): ‘আল-ঈমান’ (الْإِيمَانُ) শব্দটি আরবি أَمِنَ – يَأْمَنُ (আমিনা-ইয়া’মানু) মূলধাতু থেকে উৎসারিত ‘ইফ’আল’ (إِفْعَال) বাবের মাসদার। এর আভিধানিক অর্থ হলো: নিঃশর্ত সত্যায়ন করা (التَّصْدِيقُ المُطْلَقُ), আস্থা স্থাপন করা, নিরাপত্তা দান করা এবং স্বীকার করে নেওয়া। পবিত্র কুরআনে হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের বক্তব্যে এই আভিধানিক অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে:
﴿وَمَا أَنتَ بِمُؤْمِنٍ لَّنَا وَلَوْ كُنَّا صَادِقِينَ﴾
“আর আপনি তো আমাদের বিশ্বাস করবেন না (সত্যায়নকারী হবেন না), যদিও আমরা সত্যবাদী হই।” (সূরা ইউসুফ: ১৭)। - পারিভাষিক অর্থ (الإيمان شرعًا): ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ঈমান বলতে বোঝায়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সমস্ত বিধিবিধান ও আক্বীদা নিয়ে এসেছেন, সেগুলোকে আন্তরিকভাবে সত্য বলে বিশ্বাস করা এবং মৌখিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া।
মুহাদ্দিসীন ও ফকীহগণের দৃষ্টিভঙ্গি:- জমহুর মুহাদ্দিসীন ও ইমামগণের অভিমত:
«الإِيمَانُ: تَصْدِيقٌ بِالْجَنَانِ، وَإِقْرَارٌ بِاللِّسَانِ، وَعَمَلٌ بِالأَرْكَانِ، يَزِيدُ بِالطَّاعَةِ وَيَنْقُصُ بِالْمَعْصِيَةِ»
অর্থাৎ ঈমান হলো অন্তরে বিশ্বাস স্থাপন করা, মুখে স্বীকৃতি প্রদান করা এবং শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে আমল করা; নেক আমলের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহের কারণে ঈমান হ্রাস পায়। - ইমাম আবু হানীফা ও জমহুর মুতাকাল্লিমীন (আশ’আরী ও মাতুরিদী)-এর অভিমত:
«الإِيمَانُ هُوَ التَّصْدِيقُ بِالْقَلْبِ وَالإِقْرَارُ بِاللِّسَانِ»
তাঁদের মতে ঈমানের মূল সত্তা ও রুকন হলো অন্তরের তাসদীক্ব (দৃঢ় প্রত্যয় ও বিশ্বাস) এবং মুখে ইকরার (স্বীকৃতি)। আমল হলো ঈমানের পূর্ণাঙ্গতা (কমালিয়াত) ও সৌন্দর্য; আমল বিনষ্ট হলে ব্যক্তি ফাসিক্ব হবে কিন্তু ঈমানহারা বা কাফির হবে না।
- জমহুর মুহাদ্দিসীন ও ইমামগণের অভিমত:
২. ইসলামের পরিচয় (تعريف الإسلام)
- আভিধানিক অর্থ (الإسلام لغة): ‘আল-ইসলাম’ (الْإِسْلَامُ) অর্থ আত্মসমর্পণ করা (الاستسلام), আনুগত্য করা (الانقياد), মাথা নত করা (الخضوع) এবং শান্তি স্থাপন করা।
- পারিভাষিক অর্থ (الإسلام شرعًا): মহান আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে তাঁর যাবতীয় আদেশ-নিষেধের সামনে নিঃশর্তভাবে নিজেকে সমর্পণ করা এবং প্রকাশ্য শারীরিক ইবাদতসমূহের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করা।
৩. ঈমান ও ইসলামের মধ্যকার সম্পর্ক ও পার্থক্য (الفرق بين الإيمان والإسلام)
ইসলামী কালামশাস্ত্র ও উসূলে দ্বীনের দৃষ্টিতে ঈমান ও ইসলামের সম্পর্ক এক গভীর দার্শনিক ও তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয়। মুহাদ্দিসীন ও ফকীহগণের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের মধ্যকার সম্পর্ক নিম্নরূপ:
- «إِذَا اجْتَمَعَا افْتَرَقَا، وَإِذَا افْتَرَقَا اجْتَمَعَا» (যখন একত্রিত হয় তখন পৃথক অর্থ দেয়, আর যখন পৃথকভাবে ব্যবহৃত হয় তখন একই অর্থ প্রকাশ করে):
- পৃথকভাবে ব্যবহৃত হলে (عند الانفراد): যখন কোনো স্থানে শুধু ‘ঈমান’ অথবা শুধু ‘ইসলাম’ শব্দটি উল্লেখিত হয়, তখন তা সমগ্র দ্বীনকে অন্তর্ভুক্ত করে। অর্থাৎ প্রতিটি খাঁটি মুমিনই মুসলিম এবং প্রতিটি প্রকৃত মুসলিমই মুমিন।
- একত্রে পাশাপাশি উল্লেখিত হলে (عند الاقتران): যখন একই সাথে ঈমান ও ইসলাম দুটি শব্দ পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়, তখন তাদের মধ্যে সূক্ষ্ম অর্থগত পার্থক্য সৃষ্টি হয়:
- ঈমান হলো অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস (الأعمال الباطنة): যেমন আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, পরকাল ও তকদীরের প্রতি অন্তরের অটল বিশ্বাস ও প্রত্যয়।
- ইসলাম হলো প্রকাশ্য ও বাহ্যিক আমল (الأعمال الظاهرة): যেমন নামায কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রোযা রাখা, হজ করা এবং মুখের স্বীকৃতি।
- হাদীসে জিবরীলের সুস্পষ্ট দলীল: সহীহ মুসলিমের প্রথম হাদীসে হযরত জিবরীল (আ.) যখন নবীজী (সা.)-কে প্রশ্ন করলেন: “ইসলাম কী?” তখন নবীজী বাহ্যিক পাঁচটি ফরয স্তম্ভ (কালেমা, সালাত, যাকাত, সিয়াম ও হজ)-এর কথা উল্লেখ করলেন। আর যখন জিজ্ঞাসা করলেন: “ঈমান কী?” তখন নবীজী অন্তরের ছয়টি অদৃশ্য বিশ্বাসের কথা বর্ণনা করলেন।
- পবিত্র কুরআনের আয়াত: সূরা আল-হুজুরাতে বেদুইনদের প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা এই পার্থক্যের কথাই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন:
﴿قَالَتِ الْأَعْرَابُ آمَنَّا ۖ قُل لَّمْ تُؤْمِنُوا وَلَٰكِن قُولُوا أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيمَانُ فِي قُلُوبِكُمْ﴾
“মরুবাসীরা বলে: ‘আমরা ঈমান এনেছি’। বলুন: তোমরা ঈমান আনোনি; বরং তোমরা বলো: ‘আমরা আত্মসমর্পণ (ইসলাম গ্রহণ) করেছি’; কারণ ঈমান এখনও তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৪)।
٨- عن أبي العالية عن أبي بن كعب أن المشركين قالوا: يا محمد! انسب لنا ربك- فأنزل الله عز وجل (قل هو الله أحد- الله الصمد) قال: الصمد الذي لم يلد ولم يولد ولم يكن له كفوا أحد- لأنه ليس شيئ يولد إلا سيموت وليس شيئ يموت إلا سيورث- وأن الله تبارك وتعالى لا يموت ولا يورث ولم يكن له كفوا أحد- لم يكن له شبيه ولا عدل وليس كمثله شئ-
[৮. মুশরিকদের প্রশ্নের জবাবে সূরা আল-ইখলাসের অবতরণ, মহান আল্লাহর সত্তা ও সিফাতের বৈশিষ্ট্য, রবের সিফাতে ঈমানের পরিচয় এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সিফাত সংক্রান্ত মূলনীতিসমূহ।]
মূল হাদীস (النص الحديثي)
عَنْ أَبِي الْعَالِيَةِ عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ أَنَّ الْمُشْرِكِينَ قَالُوا: يَا مُحَمَّدُ! انْسُبْ لَنَا رَبَّكَ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: ﴿قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ، اللَّهُ الصَّمَدُ﴾، قَالَ: «الصَّمَدُ: الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ، لِأَنَّهُ لَيْسَ شَيْءٌ يُولَدُ إِلَّا سَيَمُوتُ، وَلَيْسَ شَيْءٌ يَمُوتُ إِلَّا سَيُوَرَّثُ، وَإِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى لَا يَمُوتُ وَلَا يُورَثُ، وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ: لَمْ يَكُنْ لَهُ شَبِيهٌ وَلَا عِدْلٌ، وَلَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ»-
অনুবাদ
হযরত আবুল আলিয়াহ (রহ.) সূত্রে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) হতে বর্ণিত যে, মক্কার মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিল: “হে মুহাম্মদ! আমাদের কাছে আপনার রবের বংশপরিচয় (নসবনামা) বর্ণনা করুন (তিনি কি সোনা, রূপা নাকি অন্য কোনো বস্তু দিয়ে তৈরি?)।” তখন পরাক্রমশালী মহান আল্লাহ সূরা আল-ইখলাস নাযিল করলেন: «বলুন: তিনিই আল্লাহ, একক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী (আস-সামাদ)»। বর্ণনাকারী বলেন: ‘আস-সামাদ’ হলেন সেই সত্তা যিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কারো থেকে জন্ম গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সমকক্ষ কেউই নেই। কেননা এমন কোনো বস্তু নেই যা জন্ম গ্রহণ করেছে অথচ সে মারা যাবে না; আর এমন কোনো বস্তু নেই যা মারা যাবে অথচ তার উত্তরাধিকারী ছেড়ে যাবে না। অথচ মহান বরকতময় আল্লাহ কখনোই মৃত্যুবরণ করবেন না এবং তাঁর কোনো উত্তরাধিকারীও হবে না। আর ‘তাঁর সমকক্ষ কেউই নেই’—এর অর্থ হলো: তাঁর কোনো সাদৃশ্য নেই, কোনো সমকক্ষ বা প্রতিদ্বন্দী নেই এবং কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়!
হাদীসের তাৎপর্য ও কালামী গুরুত্ব
সূরা আল-ইখলাস হলো তাওহীদের নির্যাস ও বিশুদ্ধতম দলিল। মুশরিক ও বাতিল ধর্মাবলম্বীরা যুগে যুগে তাদের উপাস্যদের জন্য পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও বংশধারা কল্পনা করত। এই হাদীসে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) কুরআনী আয়াতের এমন এক গভীর যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন যা খোদ নাস্তিক্যবাদ ও বহুঈশ্বরবাদের মূল উৎপাটন করে দেয়। সৃষ্টিজগতে যার জন্ম হয় সে মরণশীল ও ধ্বংসশীল; কিন্তু আল্লাহ তাআলা হলেন চিরঞ্জীব (الحي) ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রক (القيوم)।
(أ) ما المراد بالإيمان بصفة الرب؟ اكتب قواعد الإيمان بصفة الله عز وجل-
[উপ-প্রশ্ন (أ): রবের গুণাবলীতে (সিফাত) ঈমান বলতে কী বোঝায়? মহান আল্লাহর সিফাতসমূহের প্রতি ঈমান আনার আবশ্যকীয় মূলনীতিসমূহ (ক্বাওয়া’ইদ) লিপিবদ্ধ কর।]
১. রবের সিফাতসমূহের প্রতি ঈমানের পরিচয় (المراد بالإيمان بصفات الرب)
আল্লাহর সিফাতে ঈমান বলতে বোঝায়—মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনুল কারীমে এবং তাঁর সত্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহীহ হাদীসে মহান আল্লাহর পবিত্র সত্তার জন্য যেসব সুন্দরতম নাম (আসমাউল হুসনা) এবং অনন্ত ও শাশ্বত গুণাবলী (সিফাতে কামিলাহ) সাব্যস্ত করেছেন, কোনো প্রকার বিকৃতি, অস্বীকার, ধরণ নির্ধারণ বা সৃষ্টির সাথে তুলনা ব্যতিরেকে সেগুলোর প্রতি অকুণ্ঠ চিত্তে বিশ্বাস স্থাপন করা।
যেমন: আল্লাহর হায়াত (জীবন), ইলম (জ্ঞান), কুদরত (ক্ষমতা), ইরাদাহ (ইচ্ছা), সামা’ (শ্রবণ), বাসার (দর্শন), কালাম (কথা), যুলাল ও রিদা (ক্রোধ ও সন্তুষ্টি), রহমত এবং কিতাব ও সুন্নাহে বর্ণিত যাবতীয় সিফাতে খালাবিয়া ও সিফাতে যাতীয়ার প্রতি বিশুদ্ধ ঈমান পোষণ করা।
২. আল্লাহর সিফাতের প্রতি ঈমানের মূলনীতিসমূহ (قواعد الإيمان بصفات الله عز وجل)
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আক্বীদা বিশারদ ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমাদ এবং ইমাম বাইহাকী (রহ.) সহ সালাফে সালেহীনের সর্বসম্মত নীতিমালা নিম্নোক্ত চারটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত:
- ১. সাদৃশ্যহীনভাবে সাব্যস্তকরণ (الإثبات بلا تمثيل ولا تشبيه):
কুরআন ও হাদীসে আল্লাহর যেসব গুণাবলী উল্লেখিত হয়েছে সেগুলোকে রূপক বা শূন্য অর্থহীন না করে সত্যিকার অর্থে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করতে হবে। তবে কোনোভাবেই তা সৃষ্টির কোনো গুণের সাথে মেলানো বা তুলনা করা যাবে না।
পবিত্র কুরআনের মূলনীতি হলো:
﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ﴾
“কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়; আর তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা আশ-শূরা: ১১)।
এখানে আয়াতের প্রথম অংশ দ্বারা সমস্ত সাদৃশ্য খণ্ডন (তানযীহ) করা হয়েছে এবং শেষ অংশ দ্বারা শ্রবণ ও দর্শনের বাস্তব সিফাতকে সাব্যস্ত (ইছবাত) করা হয়েছে। - ২. অস্বীকৃতি ও বিকৃতিহীনভাবে পবিত্র ঘোষণা (التنزيه بلا تعطيل ولا تحريف):
আল্লাহর কোনো গুণ মানুষের সীমাবদ্ধ বুদ্ধিতে বোধগম্য না হওয়ার অজুহাতে মু’তাযিলাদের মতো সিফাত অস্বীকার (তা’তীল) করা যাবে না এবং জাহমিয়াদের মতো মনগড়া ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে মূল অর্থ পাল্টে দেওয়া (তাহরীফ) যাবে না। আল্লাহ নিজেকে যে গুণে ভূষিত করেছেন তা হুবহু স্বীকার করাই ঈমানের দাবী। - ৩. ধরণ ও প্রকৃতি নির্ধারণ বর্জন (نفي التكييف):
আল্লাহর সিফাতের হাকীকত ও স্বরূপ কেমন—তা জানার চেষ্টা করা মানব মস্তিষ্কের সাধ্যের অতীত। ইমাম মালিক (রহ.)-কে যখন আল্লাহর আরশের ওপর ‘ইস্তিওয়া’ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি সেই অমর মূলনীতি ব্যক্ত করেছিলেন:
«الِاسْتِوَاءُ مَعْلُومٌ، وَالْكَيْفُ مَجْهُولٌ، وَالإِيمَانُ بِهِ وَاجِبٌ، وَالسُّؤَالُ عَنْهُ بِدْعَةٌ»
“ইস্তিওয়া (আরশের ওপর সমুন্নত হওয়া)-এর অর্থ সুস্পষ্ট ও সুবিদিত, কিন্তু এর প্রকৃতি ও ধরণ মানুষের কাছে অজ্ঞাত; এর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব এবং এর ধরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা বিদআত।” - ৪. সিফাতের জ্ঞান সম্পূর্ণ তাওক্বীফিয়্যাহ (الأسماء والصفات توقيفية):
আল্লাহর নাম ও সিফাতের পরিধি কেবল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর ভাষ্যের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তি বা অনুমানের ভিত্তিতে আল্লাহর এমন কোনো নাম বা সিফাত উদ্ভাবন করা বৈধ নয় যা অহীর দলীলে বর্ণিত হয়নি।
٩- عن أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: كل إنسان تلده أمه على الفطرة- وأبواه يهودانه أو ينصرانه أو يمجسانه- فإن كان مسلمين فمسلم- كل إنسان تلده أمه يلكزه الشيطان في حضنه إلا مريم وابنها-
[৯. ফিতরাতের ওপর মানবজাতির জন্ম, পরিবেশের প্রভাব, শয়তানের স্পর্শ থেকে মরিয়ম ও ঈসার অলৌকিক সুরক্ষা এবং মুশরিকদের মৃত শিশুদের পরকালীন পরিণতি।]
মূল হাদীস (النص الحديثي)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «كُلُّ إِنْسَانٍ تَلِدُهُ أُمُّهُ عَلَى الْفِطْرَةِ، وَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ، فَإِنْ كَانَ مُسْلِمَيْنِ فَمُسْلِمٌ، كُلُّ إِنْسَانٍ تَلِدُهُ أُمُّهُ يَلْكُزُهُ الشَّيْطَانُ فِي حِضْنِهِ إِلَّا مَرْيَمَ وَابْنَهَا»-
অনুবাদ
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “প্রত্যেক মানব সন্তানকেই তার মা স্বভাবজাত নির্মল প্রকৃতির (আল-ফিতরাত বা ইসলামের সহজ-স্বাভাবিক তাওহীদী চেতনার) ওপর জন্মদান করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহূদী বানায়, অথবা তাকে খ্রিস্টান বানায়, অথবা তাকে অগ্নিপূজক বানায়। আর যদি পিতা-মাতা উভয়ই মুসলিম হয় তবে সন্তানও মুসলিম হয়। আর প্রতিটি মানুষকেই যখন তার মা প্রসব করে, তখন শয়তান তার পার্শ্বদেশে খোঁচা দেয় (যার ফলে শিশু চিৎকার করে কেঁদে ওঠে); কেবল মরিয়ম এবং তাঁর পুত্র (হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম) ব্যতীত।”
হাদীসের পর্যালোচনা ও শিক্ষা
- মানুষ জন্মগতভাবে পাপী নয়: খ্রিস্টীয় ধর্মে বিশ্বাস করা হয় যে মানুষ আদি পাপ (Original Sin) নিয়ে জন্মায়। কিন্তু ইসলাম দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করে যে, প্রতিটি মানবশিশু সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও নিষ্কলুষ স্বভাব নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।
- পরিবার ও সমাজের প্রভাব: শিশুর সঠিক লালন-পালন ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে পিতামাতা ও পরিবেশ প্রধান ভূমিকা পালন করে।
- মরিয়ম ও ঈসা (আ.)-এর বিশেষ সম্মান: হযরত মরিয়মের পুণ্যবতী মা আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছিলেন:
﴿وَإِنِّي أُعِيذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ﴾
“আর নিশ্চয়ই আমি তাঁকে এবং তাঁর বংশধরকে বিতাড়িত শয়তানের হাত থেকে আপনার আশ্রয়ে সোপর্দ করছি।” (সূরা আলে ইমরান: ৩৬)। আল্লাহ তাআলা সেই দোয়ার বরকতে মরিয়ম ও ঈসা (আ.)-কে শয়তানের স্পর্শ ও খোঁচা থেকে অলৌকিকভাবে সুরক্ষিত রেখেছিলেন।
(أ) ما المراد بالفطرة؟ وما مصير ذراري المشركين إذا ماتوا صغارًا؟
[উপ-প্রশ্ন (أ): ফিতরাত বলতে কী বোঝায়? এবং মুশরিকদের নাবালক সন্তানরা শৈশবে মৃত্যুবরণ করলে পরকালে তাদের পরিণতি কী হবে? কুরআন ও হাদীসের আলোকে পর্যালোচনা কর।]
১. ফিতরাতের অর্থ ও তাৎপর্য (المراد بالفطرة)
- আভিধানিক অর্থ (معنى الفطرة لغة): ‘আল-ফিতরাত’ (الْفِطْرَةُ) শব্দটি فَطَرَ (ফাতারা) ধাতু থেকে আগত, যার অর্থ: কোনো কিছু প্রথম সৃষ্টি করা, উন্মেষ ঘটানো বা উদ্ভাবন করা। যেমন আল্লাহ তাআলাকে বলা হয় ‘ফাতিরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ’ (নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের আদি স্রষ্টা)।
- পারিভাষিক অর্থ (معنى الفطرة شرعًا): ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ফিতরাত হলো সেই জন্মগত ও স্বভাবজাত তাওহীদী বোধ, যা মহান আল্লাহ প্রতিটি মানুষের রুহ ও চেতনায় খোদাই করে দিয়েছেন। অর্থাৎ কোনো বাহ্যিক ভ্রান্ত প্রভাব না থাকলে একজন সুস্থ মানুষ স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি দিয়েই একমাত্র আল্লাহর একত্ববাদকে উপলব্ধি করতে সক্ষম।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
﴿فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا ۚ فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا ۚ لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ﴾
“অতএব আপনি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আল্লাহর সেই স্বভাবজাত দ্বীন (ফিতরাত), যার ওপর তিনি সমস্ত মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই; এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য দ্বীন।” (সূরা আর-রূম: ৩০)।
২. মুশরিকদের নাবালক সন্তানরা শৈশবে মারা গেলে তাদের পরকালীন পরিণতি (مصير ذراري المشركين)
যেসব শিশু বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বে এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য করার আগেই মৃত্যুবরণ করে, তাদের পরকালীন পরিণতি নিয়ে উম্মতের ইমাম ও মুহাদ্দিসগণের মাঝে গভীর গবেষণা রয়েছে। বিশেষ করে মুশরিকদের সন্তানদের ব্যাপারে প্রধানত নিম্নোক্ত মতামতসমূহ পাওয়া যায়:
- তারা জান্নাতী হবে (أَنَّهُمْ فِي الْجَنَّةِ):
ইমাম নববী, হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী, ইমাম কুরতুবী এবং অধিকাংশ মুহাক্কিক আলেমের মতে এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ, সুদৃঢ় ও গ্রহণযোগ্য মত। এর পক্ষে প্রধান দলিলসমূহ হলো:- আল্লাহর ইনসাফ ও কুরআনী নীতি: শিশু বয়সে কারো ওপর শরীয়তের কোনো দায়িত্ব বা হুকুম আরোপিত হয় না। আল্লাহ তাআলা কোনো অপরাধ ছাড়াই কাউকে শাস্তি দিতে পারেন না। ইরশাদ হয়েছে:
﴿وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا﴾
“আর আমি কোনো রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেই না।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ১৫)। শিশুরা যেহেতু কোনো বিধানের দাওয়াত পাওয়ার আগেই মারা গেছে, তাই তারা নির্দোষ। - সহীহ বুখারীর প্রত্যক্ষ বর্ণনা: হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) বর্ণিত সুদীর্ঘ স্বপ্নের হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতের এক সুউচ্চ উদ্যানে হযরত ইবরাহীম (আ.)-কে দেখলেন এবং তাঁর চারিপাশে বিপুল সংখ্যক শিশুকে দেখলেন যারা ফিতরাতের ওপর মৃত্যুবরণ করেছে। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের সন্তানরাও কি সেখানে রয়েছে?” নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বললেন: «وَأَوْلَادُ الْمُشْرِكِينَ» — “হ্যাঁ, মুশরিকদের সন্তানরাও তাদের সাথে সেখানে রয়েছে!” (সহীহ বুখারী: ৭০৪৭)।
- আল্লাহর ইনসাফ ও কুরআনী নীতি: শিশু বয়সে কারো ওপর শরীয়তের কোনো দায়িত্ব বা হুকুম আরোপিত হয় না। আল্লাহ তাআলা কোনো অপরাধ ছাড়াই কাউকে শাস্তি দিতে পারেন না। ইরশাদ হয়েছে:
- কিয়ামতের দিন তাদের পরীক্ষা নেওয়া হবে (يُمْتَحَنُونَ فِي عَرَصَاتِ الْقِيَامَةِ):
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম এবং হাফেয ইবনে কাসীর (রহ.) সহ অনেক সালাফী আলেম এই মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। বেশ কিছু হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী, যাদের কাছে দুনিয়ায় দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছেনি এবং যারা অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় মারা গেছে, কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহ তাআলা তাদের সামনে একজন দূত পাঠিয়ে আনুগত্যের নির্দেশ দেবেন। যারা আনুগত্য করবে তারা জান্নাতে যাবে, আর যারা অবাধ্য হবে তারা জাহান্নামে যাবে। - «اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا كَانُوا عَامِلِينَ» (আল্লাহই ভালো জানেন তারা জীবিত থাকলে কী করত):
কোনো কোনো সাহাবী ও তাবেয়ী এই বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট মন্তব্য না করে মৌনতা অবলম্বন (তওয়াক্কুফ) করেছেন। কারণ এক হাদীসে নবীজীকে মুশরিকদের শিশুদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন: “তারা বেঁচে থাকলে কী আমল করত তা আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত।” তবে ইমাম নববী (রহ.) স্পষ্ট করেছেন যে, এই হাদীসটি ছিল পূর্ববর্তী হুকুম, পরবর্তীতে জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ সম্বলিত আয়াত ও হাদীসের মাধ্যমে উম্মতের ওপর বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে।
সারসংক্ষেপ: মহান আল্লাহর অসীম রহমত, ক্ষমা এবং ইনসাফের দাবি অনুযায়ী মুশরিকদের নাবালক শিশুরা কোনো পাপ না করায় তারা আল্লাহর রহমতে জান্নাত লাভ করবে—এটাই জমহুর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সুদৃঢ় ফয়সালা।
مجموعة (د) — الأسئلة العامة / التراجم والمصنفات (সাধারণ প্রশ্নাবলী: জীবনী ও গ্রন্থ পরিচিতি)
الدرجة — ١٠ × ٢ = ٢٠
(أجب عن سؤالين فقط من هذه المجموعة) — পরীক্ষার্থীদের এই বিভাগ থেকে যে কোনো ২টি প্রশ্নের উত্তর প্রদানের বাধ্যবাধকতা থাকলেও শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ ও গভীর তাত্ত্বিক প্রস্তুতির সুবিধার্থে নিম্নে ৩টি প্রশ্নেরই পূর্ণাঙ্গ সমাধান উপস্থাপন করা হলো।
١٠- اكتب ترجمة الإمام مالك بن أنس مع ذكر بعض خصائص كتابه “الموطأ”-
[১০. ইমামু দারিল হিজরাহ হযরত ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.)-এর প্রামাণ্য জীবনী এবং তাঁর অমর হাদীস সংকলন ‘আল-মুওয়াত্তা’-এর অনন্য বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব।]
ভূমিকা
ইসলামী শরীয়তের দ্বিতীয় উৎস পবিত্র সুন্নাহ সংরক্ষণ এবং ফিকহী ইজতিহাদের ইতিহাসে যে চারজন মহান মুজতাহিদ ইমাম আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে দ্বিতীয় হলেন ‘ইমামু দারিল হিজরাহ’ (মদীনার ইমাম) হযরত ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.)। তিনি ছিলেন এমন এক অমর প্রতিভা, যাঁর দরবারে সমবেত হতেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের হাজারো জ্ঞানপিপাসু। তাঁর রচিত ‘আল-মুওয়াত্তা’ হলো মুসলিম উম্মাহর সর্বপ্রথম প্রামাণ্য হাদীস ও ফিকহের সুবিন্যস্ত সংকলন। নিম্নে তাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবনী এবং তাঁর রচিত ‘আল-মুওয়াত্তা’ গ্রন্থের অনুপম বৈশিষ্ট্যসমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
১. নাম, বংশ ও জন্ম
তাঁর নাম ‘মালিক’, কুনিয়াত বা উপনাম ‘আবু আব্দুল্লাহ’। তাঁর পূর্ণ বংশধারা হলো: মালিক ইবনে আনাস ইবনে মালিক ইবনে আবি আমির ইবনে আমর আল-আসবাহী আল-হিময়ারী আল-মাদানী। তিনি আরবের সম্ভ্রান্ত ‘বনু কাহতান’ গোত্রের অন্যতম শাখা ‘যু আসবাহ’ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রপিতামহ আবু আমির (রা.) ছিলেন একজন জলিলুল ক্বদর সাহাবী এবং তাঁর পিতামহ মালিক ইবনে আবি আমির ছিলেন বিশিষ্ট তাবেয়ী। ইমাম মালিক ৯৩ হিজরীতে (৭১২ খ্রিষ্টাব্দে) ইসলামের পবিত্র কেন্দ্র মদীনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন।
২. শৈশব ও ইলম অর্জন
ইমাম মালিক একটি বিশুদ্ধ দ্বীনি ও ইলমী পরিবেশে প্রতিপালিত হন। বাল্যকালেই তিনি পবিত্র কুরআন হেফজ করেন। তাঁর শ্রদ্ধেয়া মাতা তাঁকে উত্তম পোশাকে সুসজ্জিত করে এবং মাথায় পাগড়ী পরিয়ে বলতেন: “তুমি ইমাম রবি’আতুর রা’য়ীর মজলিসে যাও এবং তাঁর ইলম অর্জনের পূর্বে তাঁর আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা করো।” তিনি তৎকালীন মদীনার শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের নিকট ইলম অর্জন করেন। তাঁর প্রধান উস্তাদগণের মধ্যে রয়েছেন:
- নাফে’ মাওলা ইবনে উমর (রহ.): হযরত ইবনে উমরের বিশিষ্ট ছাত্র।
- ইমাম ইবনে শিহাব আয-যুহরী (রহ.): হাদীস সংকলনের প্রধান স্থপতি।
- রবি’আতুর রা’য়ী (রহ.): মদীনার প্রখ্যাত যুক্তিবাদী ফকীহ।
- আব্দুর রহমান ইবনে হুরমুয (রহ.): যাঁর সান্নিধ্যে তিনি একটানা সাত-আট বছর ইলম চর্চা করেছেন।
- ইমাম জাফর আস-সাদিক ও আয়েশা বিনতে সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)।
৩. ফতোয়া ও অধ্যাপনার আসন গ্রহণ
ইমাম মালিক (রহ.) অত্যন্ত আত্মসচেতন ও সতর্ক ছিলেন। তিনি নিজে বর্ণনা করেন: “আমি মসজিদে নববীতে বসে ফতোয়া প্রদান ও হাদীসের দরস শুরু করিনি যে পর্যন্ত না মদীনার সত্তর জন শীর্ষস্থানীয় আলিম ও মুফতী একবাক্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে—আমি এই পদের জন্য সম্পূর্ণ যোগ্য ও উপযোগী।” অতঃপর তিনি মসজিদে নববীতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মেহরাব ও মিম্বরের নিকটে বসে দরস প্রদান শুরু করেন। তাঁর ইলমী মজলিসে খলিফা, সেনাপতি, মুজতাহিদ ফকীহ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ গভীর সম্ভ্রমের সাথে বসতেন।
৪. হাদীস বর্ণনায় অসাধারণ আদব ও তাকওয়া
হাদীসে নববীর প্রতি ইমাম মালিকের সম্মানবোধ ছিল ইতিহাসে বিরল। তিনি কখনো সাধারণ পোশাকে বা পথ চলতে চলতে হাদীস বর্ণনা করতেন না। হাদীস বর্ণনার পূর্বে তিনি গোসল করতেন, উত্তম পোশাক পরতেন, দাড়ি আঁচড়াতেন এবং সুগন্ধি লাগাতেন। দরস চলাকালীন সম্পূর্ণ পিনপতন নীরবতা বজায় থাকত। একবার দরস প্রদানকালে একটি বিচ্ছু তাঁর পায়ে ষোলোবার দংশন করেছিল, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাদীসের সম্মানার্থে তিনি নড়াচড়া করেননি বা দরস বন্ধ করেননি!
৫. রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও সত্যের ওপর অবিচলতা
আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর আল-মানসুরের শাসনামলে মদীনার গভর্নর জাফর ইবনে সুলাইমান তাঁকে বাধ্য করতে চেয়েছিল যেন তিনি এই ফতোয়া প্রত্যাহার করেন যে—”জোরপূর্বক গৃহীত তালাক বা আনুগত্যের শপথ কার্যকর হয় না” (ليس على مستكره طلاق)। কিন্তু ইমাম মালিক বাতিলের সাথে আপস করেননি। ফলে তাঁকে চাবুক মেরে চরম নির্যাতন করা হয় এবং তাঁর কাঁধের হাড় স্থানচ্যুত করে দেওয়া হয়। তিনি হাসিমুখে এই নির্যাতন সহ্য করেন কিন্তু শরীয়তের সত্য বাণী গোপন করেননি।
৬. ওফাত
এই মহান ইমাম সুদীর্ঘ প্রায় ৮৬ বছর বয়সে ১৭৯ হিজরীর ১৪ই রবিউল আউয়াল মদীনা মুনাওয়ারায় ওফাত লাভ করেন। মদীনার জান্নাতুল বাক্বী কবরস্থানে উম্মাহাতুল মুমিনীন ও আহলে বাইতের সান্নিধ্যে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
‘আল-মুওয়াত্তা’ (الموطأ) গ্রন্থের পরিচিতি ও ঐতিহাসিক পটভূমি
‘মুওয়াত্তা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো: এমন বস্তু যাকে প্রস্তুত, সুবিন্যস্ত ও সহজীকরণ করা হয়েছে (الممهد والمهيأ) অথবা যা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ইমাম মালিক (রহ.) নিজেই এর নামকরণের রহস্য উন্মোচন করে বলেন: “আমি এই গ্রন্থটি সংকলন করার পর মদীনার সত্তর জন বিজ্ঞ ফকীহর সামনে উপস্থাপন করেছিলাম। তাঁদের প্রত্যেকেই গ্রন্থটির সাথে পূর্ণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন এবং এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন (واطأني عليه سبعون فقيها); তাই আমি এর নাম রেখেছি ‘আল-মুওয়াত্তা’।”
সংকলনের ঐতিহাসিক পটভূমি: খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর ১৪৮ হিজরীতে হজ পালনকালে ইমাম মালিককে অনুরোধ করেন: “হে আবু আব্দুল্লাহ! আপনি উম্মতের জন্য এমন একটি গ্রন্থ সংকলন করুন যাতে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের কঠোরতা থাকবে না, আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের অতি-সতর্কতা থাকবে না এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের সুবিধাজনক রুখসাত থাকবে না; বরং তা হবে মধ্যমপন্থী ও রাসূলুল্লাহর প্রামাণ্য সুন্নাহভিত্তিক।” ইমাম মালিক সুদীর্ঘ চল্লিশ বছর গভীর নিষ্ঠা ও তাহকীক সহকারে এই গ্রন্থটি প্রস্তুত ও পরিমার্জন করেন।
‘আল-মুওয়াত্তা’ গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص موطأ مالك)
- উম্মতের সর্বপ্রথম সুবিন্যস্ত হাদীস ও ফিকহ গ্রন্থ: এটি ইসলামের ইতিহাসে বিষয়ভিত্তিক অধ্যায়ে সাজানো সর্বপ্রথম প্রামাণ্য হাদীস সংকলন। পবিত্রতাহীনতা, নামায, রোযা, যাকাত, হজ, জিহাদ, ক্রয়-বিক্রয় থেকে শুরু করে মানবজীবনের প্রতিটি দিকের হাদীস ও ফিকহী নীতিমালা এতে স্থান পেয়েছে।
- বিশুদ্ধতম সনদ ‘সিলসিলাতুয যাহাব’-এর আধার: ইলমুল হাদীসের পরিভাষায় যে সনদকে ‘স্বর্ণালী সনদ’ বা স্বর্ণের শিকল বলা হয়—তা হলো: «مَالِكٌ عَنْ نَافِعٍ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ» (ইমাম মালিক সূত্রে নাফে’ থেকে এবং নাফে’ সূত্রে হযরত ইবনে উমর থেকে)। মুওয়াত্তার একটি বিশাল অংশ এই সোনালী সনদে সমৃদ্ধ।
- ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর ঐতিহাসিক স্বীকৃতি: ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী (রহ.) মুওয়াত্তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন:
«مَا عَلَى ظَهْرِ الأَرْضِ كِتَابٌ بَعْدَ كِتَابِ اللَّهِ أَصَحُّ مِنْ كِتَابِ مَالِكٍ»
“আল্লাহর পবিত্র কিতাবের পর ভূপৃষ্ঠে ইমাম মালিকের কিতাব (মুওয়াত্তা)-এর চেয়ে অধিক বিশুদ্ধ ও নির্ভুল কোনো গ্রন্থ নেই।” (যদিও এটি সহীহ বুখারী ও মুসলিম সংকলনের পূর্ববর্তী যুগের মূল্যায়ন, তবুও কিতাবটির গ্রহণযোগ্যতা প্রকাশে এটি চিরস্মরণীয়)। - ‘আমালু আহলিল মাদীনাহ’-এর প্রামাণ্য দলিল: ইমাম মালিকের ফিকহের অন্যতম প্রধান উৎস হলো মদীনাবাসীদের অবিচ্ছিন্ন কর্মধারা। সাহাবা ও তাবেয়ীনদের প্রত্যক্ষ কর্মপদ্ধতির যে বাস্তব ধারা মদীনায় বিদ্যমান ছিল, মুওয়াত্তা হলো তার জীবন্ত দলিল।
- হাদীস, আসার ও ফতোয়ার অপূর্ব সমন্বয়: মুওয়াত্তা কেবল মারফূ’ হাদীসের সংকলন নয়; এতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীসের পাশাপাশি সাহাবায়ে কেরামের আসার (আকীকা, রায়) এবং তাবেয়ীগণের ফিকহী ফতোয়া স্থান পেয়েছে। ফলে এটি একাধারে হাদীস ও ফিকহের বিশ্বকোষ।
- বালাগাত ও মুরসাল হাদীসের প্রামাণিকতা: ইমাম মালিকের মুওয়াত্তায় কিছু হাদীস রয়েছে যা তিনি ‘বালাগাত’ (بلغني – আমার কাছে পৌঁছেছে) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। বাহ্যত সনদহীন মনে হলেও পরবর্তীকালে হাফেয ইবনে আব্দুল বার ‘আত-তামহীদ’ গ্রন্থে প্রমাণ করেছেন যে, মাত্র চারটি হাদীস ব্যতীত মুওয়াত্তার সকল বালাগাত ও মুরসাল হাদীস অন্যান্য সহীহ সূত্রে মুত্তাসিল বা সংযুক্ত।
١١- اذكر نبذة من حياة الإمام محمد بن الحسن مع بيان بعض مميزات كتابه “الموطأ”-
[১১. ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত এবং তাঁর সংকলিত ‘মুওয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ’-এর বৈশিষ্ট্য ও তুলনামূলক ফিকহী তাৎপর্য।]
ভূমিকা
ফিকহে হানাফীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকলক, তুলনামূলক আইনশাস্ত্রের অগ্রদূত এবং ইসলামী ফিকহ ও হাদীসের মহামিলনের প্রতীক হলেন ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রহ.)। তিনি ছিলেন একদিকে ইমামে আযম আবু হানীফা (রহ.)-এর অন্যতম শীর্ষ ছাত্র এবং অন্যদিকে ইমামু দারিল হিজরাহ মালিক ইবনে আনাস (রহ.)-এর বিশিষ্ট শাগরেদ। এই দুই মহান কেন্দ্রের ইলমকে ধারণ করে তিনি যে অনন্য জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলেন, তারই এক উজ্জ্বল স্মারক হলো ‘মুওয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ’। নিম্নে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত এবং তাঁর মুওয়াত্তার বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশদভাবে উপস্থাপন করা হলো।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রহ.)-এর জীবনচরিত
১. নাম, জন্ম ও বংশ পরিচয়
তাঁর নাম ‘মুহাম্মদ’, কুনিয়াত বা উপনাম ‘আবু আব্দুল্লাহ’। তাঁর পিতার নাম হাসান। পুরো বংশধারা: মুহাম্মদ ইবনুল হাসান ইবনে ফারক্বাদক্ব আশ-শায়বানী। তিনি ১৩২ হিজরীতে (৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দে) ইরাকের ওয়াসিত নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন সিরিয়ার অধিবাসী, যিনি পরবর্তীতে ইরাকে হিজরত করেন। ইমাম মুহাম্মদ শৈশবেই কুফায় স্থানান্তরিত হন এবং সেখানেই লালিত-পালিত হন।
২. ইলম অন্বেষণ ও উস্তাদবৃন্দ
ইমাম মুহাম্মদ ছিলেন প্রখর মেধা ও অতুলনীয় স্মৃতিশক্তির অধিকারী। তিনি অল্প বয়সেই ইলম অন্বেষণে আত্মনিয়োগ করেন:
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.): চতুর্দশ বর্ষ বয়সে তিনি ইমাম আবু হানীফার ফিকহী মজলিসে প্রবেশ করেন এবং একটানা চার বছর ইমামে আযমের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে থেকে ফিকহী যুক্তি ও মূলনীতি আয়ত্ত করেন।
- ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.): ১৫০ হিজরীতে ইমাম আবু হানীফার ইন্তেকালের পর তিনি ইমাম আবু ইউসুফের প্রধান ছাত্রে পরিণত হন এবং তাঁর নিকট ফিকহে হানাফীর অবশিষ্ট পাঠ সমাপ্ত করেন।
- ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.): কুফার ইলম সমাপনান্তে তিনি মদীনা মুনাওয়ারায় গমন করেন এবং ইমাম মালিকের দরবারে দীর্ঘ তিন বছরের অধিক সময় অবস্থান করেন। তিনি সরাসরি ইমাম মালিকের নিকট থেকে ৭০০-এর অধিক হাদীস সম্বলিত ‘আল-মুওয়াত্তা’ শ্রবণ ও অধ্যয়ন করেন।
- অন্যান্য উস্তাদবৃন্দ: সুফিয়ান সাওরী, আওযাঈ, মিস’আর ইবনে কিদাম প্রমুখ প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণের নিকট থেকেও তিনি হাদীস শিক্ষা গ্রহণ করেন।
৩. ফিকহে হানাফীর প্রধান স্থপতি
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর ফিকহ মূলত মৌখিক আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল। ইমাম মুহাম্মদ স্বীয় অসাধারণ লেখনী শক্তির মাধ্যমে হানাফী মাযহাবকে কিতাবী রূপ দান করেন। তিনি হানাফী মাযহাবের মূল ভিত্তিগ্রন্থ ‘জাহিরুর রিওয়ায়াত’ (ظاهر الرواية)-এর ছয়টি অমর গ্রন্থ রচনা করেন:
- আল-মাবসূত (المبسوط) বা আল-আসল
- আল-জামি’উস সগীর (الجامع الصغير)
- আল-জামি’উল কাবীর (الجامع الكبير)
- আস-সিয়ারুস সগীর (السير الصغير)
- আস-সিয়ারুল কাবীর (السير الكبير) — যা আন্তর্জাতিক আইনের সর্বপ্রথম কিতাব
- আয-যিয়াদাত (الزيادات)
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন: “আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের সুন্নাহ সম্পর্কে মুহাম্মদ ইবনুল হাসানের চেয়ে অধিক বিজ্ঞ ব্যক্তি আমি আর কাউকে দেখিনি। তাঁর গ্রন্থাবলী অধ্যয়ন করেই আমি ইলমের সাগরে অবগাহন করেছি।”
৪. বিচারপতির দায়িত্ব ও ওফাত
আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশীদের শাসনামলে তিনি পূর্বাঞ্চলীয় রাজধানী রিক্বাহ-র প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৯ হিজরীতে খলিফা হারুনুর রশীদের সাথে খোরাসান সফরকালে পারস্যের ‘রায়’ (বর্তমান তেহরানের নিকটবর্তী) শহরে এই মহান ইমাম ওফাত লাভ করেন। একই দিনে প্রখ্যাত আরবী ব্যাকরণবিদ ইমাম কিসাঈও সেখানে ইন্তেকাল করেছিলেন। খলিফা হারুনুর রশীদ অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে বলেছিলেন: “আজ আমরা রায় নগরে ফিকহ ও আরবী ভাষাতত্ত্ব উভয়কেই দাফন করলাম!”
‘মুওয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ’ গ্রন্থের পরিচয় ও পটভূমি
‘মুওয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ’ হলো ইমাম মালিকের মূল মুওয়াত্তার একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রামাণ্য রেওয়ায়েত (রিওয়ায়াহ)। ইমাম মুহাম্মদ মদীনায় ইমাম মালিকের কাছ থেকে সরাসরি যে পাঠ গ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তীতে তিনি কুফায় ফিরে এসে সেই হাদীসসমূহের সাথে হানাফী মাযহাবের ফিকহী ইজতিহাদ ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ যোগ করে এই সংস্করণটি সংকলন করেন।
‘মুওয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ’ গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (مميزات الكتاب)
- হাদীস ও ফিকহের অপূর্ব সেতুবন্ধন: ইমাম মুহাম্মদ কেবল হাদীসের সনদ ও মতন উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হননি; বরং প্রতিটি হাদীসের পর হানাফী ফিকহের সিদ্ধান্ত সংযোজন করেছেন। কিতাবটিতে বারবার এই পরিভাষা এসেছে:
«قَالَ مُحَمَّدٌ: وَبِهَذَا نَأْخُذُ، وَهُوَ قَوْلُ أَبِي حَنِيفَةَ رَحِمَهُ اللَّهُ تَعَالَى»
“ইমাম মুহাম্মদ বলেন: আমরা এই হাদীস অনুযায়ী আমল গ্রহণ করি এবং এটিই ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর অভিমত।” - তুলনামূলক ফিকহের (الفقه المقارن) পথিকৃৎ: গ্রন্থটিতে একদিকে মদীনার ফিকহ (ইমাম মালিক ও মদীনাবাসীদের আমল) এবং অন্যদিকে ইরাকের ফিকহ (ইমাম আবু হানীফা ও তাঁর ছাত্রদের রায়)-এর মধ্যে বস্তুনিষ্ঠ ও প্রামাণ্য তুলনা উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে হানাফী সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে হাদীস ও ক্বিয়াসের সমন্বয়ে অধিকতর শক্তিশালী।
- অতিরিক্ত হাদীস ও সনদের সংযোজন: মূল মুওয়াত্তার হাদীসের পাশাপাশি ইমাম মুহাম্মদ তাঁর অন্যান্য উস্তাদ (যেমন: সুফিয়ান সাওরী, আবু ইউসুফ, আবু হানীফা প্রমুখ)-এর সনদেও বহু অতিরিক্ত সহীহ হাদীস ও আছার সংযোজন করেছেন। ফলে গ্রন্থটি হাদীসের সংখ্যার দিক থেকেও সমৃদ্ধ হয়েছে।
- হানাফী মাযহাবের হাদীসভিত্তিক ভিত্তির অকাট্য প্রমাণ: বাতিলপন্থীরা প্রায়ই হানাফী মাযহাবকে ‘কেবল যুক্তিনির্ভর’ (আসহাবুর রায়) বলে অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করত। মুওয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, হানাফী ফিকহের প্রতিটি মাসআলা পবিত্র কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিশুদ্ধ হাদীসের মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
- মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের নিকট উচ্চ মর্যাদা: উম্মতের সকল যুগের আলেমগণ মুওয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদকে ইলমুল হাদীস ও ইলমুল ফিকহের এক অপরিহার্য টেক্সটবুক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) ও তাঁর পিতা এই গ্রন্থটির গভীর পাঠ ও অধ্যাপনা করতেন।
١٢- اذكر نبذة من حياة الإمام البيهقي مع بيان مزايا كتابه “شعب الإيمان”-
[১২. হাফেযুল উম্মাহ ইমাম আবু বকর আল-বাইহাকী (রহ.)-এর প্রামাণ্য জীবনচরিত এবং তাঁর অমর সংকলন ‘শু’আবুল ঈমান’-এর বৈশিষ্ট্য ও নৈতিক-আধ্যাত্মিক তাৎপর্য।]
ভূমিকা
হাদীসশাস্ত্রের অন্যতম শীর্ষ অভিভাবক, শাফেয়ী মাযহাবের সুদৃঢ় প্রমাণপঞ্জী প্রস্তুতকারী এবং মুসলিম উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকীহ হলেন ইমাম আবু বকর আহমদ ইবনুল হুসাইন আল-বাইহাকী (রহ.)। তিনি এমন এক যুগে আবির্ভূত হয়েছিলেন যখন হাদীসের গ্রন্থাবলী সংকলনের স্বর্ণযুগ প্রায় সমাপ্তির পথে। তিনি পূর্ববর্তী সমস্ত হাদীস সম্ভারকে অত্যন্ত সুচারুভাবে একত্রিত ও শ্রেণীবদ্ধ করে উম্মতকে উপহার দেন। বিশেষ করে ঈমানের শাখা-প্রশাখা নিয়ে তাঁর রচিত ‘শু’আবুল ঈমান’ হলো ইসলামী নীতিশাস্ত্র ও আধ্যাত্মিকতার এক অনুপম বিশ্বকোষ। নিম্নে তাঁর জীবনচরিত এবং শু’আবুল ঈমান গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যাবলী আলোকপাত করা হলো।
ইমাম আল-বাইহাকী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
১. নাম, বংশ ও জন্ম
তাঁর নাম ‘আহমদ’, কুনিয়াত ‘আবু বকর’। তাঁর পিতার নাম হুসাইন। বংশপরম্পরা: আহমদ ইবনুল হুসাইন ইবনে আলী ইবনে মূসা আল-বাইহাকী আল-খসরুজিরদী আল-খোরাসানী। তিনি ৩৮৪ হিজরীর শাবান মাসে (৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) তৎকালীন খোরাসানের বিখ্যাত শহর নিশাপুরের নিকটবর্তী ‘বাইহাক’ অঞ্চলের ‘খসরুজির্দ’ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
২. শৈশব ও ইলম অর্জন
ইমাম বাইহাকী অত্যন্ত ধার্মিক ও বিদ্যানুরাগী পরিবারে প্রতিপালিত হন। মাত্র পনেরো বছর বয়সেই তিনি ইলমে হাদীস অন্বেষণে যাত্রা শুরু করেন। তিনি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে নিশাপুর, বাগদাদ, কুফা, মক্কা, মদীনা ও হিজাজের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেন।
তাঁর প্রধান শিক্ষকগণের মধ্যে রয়েছেন:
- ইমাম আল-হাকিম আন-নিশাপুরী (রহ.): ‘আল-মুস্তাদরাক আলাস সাহীহাইন’-এর রচয়িতা। ইমাম বাইহাকী ছিলেন তাঁর প্রধান ও প্রিয়তম ছাত্র। তিনি ইমাম হাকিমের নিকট থেকে বিপুল পরিমাণ হাদীস অধ্যয়ন ও সনদ লাভ করেন।
- আবু আব্দুর রহমান আস-সুলামী (রহ.): বিখ্যাত সূফী ও মুহাদ্দিস।
- ইমাম আবু বকর ইবনে ফুরাক্ব (রহ.): বিশিষ্ট আশ’আরী মুতাকাল্লিম ও উসূলবিদ।
- আবু আলী আর-রূদবারী ও আবু তাহের আয-যিয়াদী (রহ.)।
৩. ইলমী মর্যাদা ও গ্রন্থাবলী
ইমাম বাইহাকী ছিলেন হাদীস, ফিকহ, উসূলে ফিকহ, আসমাউর রিজাল ও আক্বীদা শাস্ত্রে এক অপরাজেয় ব্যক্তিত্ব। ইমাম যাহাবী (রহ.) ‘সিয়ারু আ’লামিন নুবালা’ গ্রন্থে তাঁকে ‘শায়খুল ইসলাম, হাফেযুল উম্মাহ এবং আল্লামাতুল আসর’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন।
ইমামুল হারামাইন আব্দুল মালিক আল-জুওয়াইনী (রহ.) তাঁর সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক উক্তি করেছেন:
«مَا مِنْ شَافِعِيٍّ إِلَّا وَلِلشَّافِعِيِّ عَلَيْهِ مِنَّةٌ، إِلَّا أَبَا بَكْرٍ الْبَيْهَقِيَّ، فَإِنَّ لَهُ الْمِنَّةَ عَلَى الشَّافِعِيِّ لِتَصَانِيفِهِ فِي نُصْرَةِ مَذْهَبِهِ»
“শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী এমন কোনো ব্যক্তি নেই যার ওপর ইমাম শাফেয়ীর প্রত্যক্ষ অনুগ্রহ ও ঋণ নেই; কেবল আবু বকর আল-বাইহাকী ব্যতীত! কারণ তাঁর রচিত অসাধারণ গ্রন্থাবলীর মাধ্যমে ইমাম শাফেয়ীর মাযহাব ও দলীলসমূহকে শক্তিশালী করার কারণে খোদ ইমাম শাফেয়ীর ওপরই ইমাম বাইহাকীর মহা অনুগ্রহ রয়েছে!”
তাঁর অমর গ্রন্থাবলীর মধ্যে রয়েছে:
- আস-সুনান আল-কুবরা (السنن الكبرى) — ১০ খণ্ডে ফিকহী হাদীসের সর্ববৃহৎ সংকলন।
- মা’রিফাতুস সুনান ওয়াল আছার (معرفة السنن والآثار)।
- শু’আবুল ঈমান (شعب الإيمان) — আলোচ্য পাঠ্যপুস্তক।
- দালায়েলুন নবুওয়াত (دلائل النبوة)।
- আল-আসমা ওয়াস সিফাত (الأسماء والصفات)।
- আল-ই’তিক্বাদ ওয়াল হিদায়াহ (الاعتقاد والهداية)।
৪. তাকওয়া ও ওফাত
ইমাম বাইহাকী ছিলেন চরম মুত্তাকী, দুনিয়াবিমুখ এবং আজীবন রোযাদার ব্যক্তি। তিনি জীবনের শেষ ত্রিশ বছর একটানা রোযা রেখেছেন (নিষিদ্ধ দিনগুলো ব্যতীত)। এই মহান সাধক ৪৫৮ হিজরীর ১০ই জুমাদাল উলা (১০৬৬ খ্রিষ্টাব্দে) নিশাপুর নগরীতে ওফাত লাভ করেন। পরবর্তীতে তাঁর মরদেহ স্বীয় জন্মভূমি খসরুজির্দে এনে দাফন করা হয়।
‘শু’আবুল ঈমান’ (شعب الإيمان) গ্রন্থের পরিচয় ও পটভূমি
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক প্রখ্যাত হাদীস রয়েছে:
«الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ شُعْبَةً، فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ، وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ»
“ঈমানের সত্তরের অধিক (বা তিয়াত্তরটি) শাখা-প্রশাখা রয়েছে। যার মধ্যে সর্বোত্তম হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা, আর সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা; আর লজ্জা হলো ঈমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
পূর্ববর্তী বহু মুহাদ্দিস (যেমন: আবু আব্দুল্লাহ আল-হালীমী) ঈমানের এই শাখাগুলোর তালিকা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ইমাম বাইহাকী (রহ.) সেই ৭৭টি শাখাকে মূল ভিত্তি ধরে একটি সুবিশাল, প্রামাণ্য হাদীসভিত্তিক বিশ্বকোষ রচনা করেন, যার নাম ‘শু’আবুল ঈমান’ (ঈমানের শাখাসমূহ)।
‘শু’আবুল ঈমান’ গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও মাহাত্ম্য (مزايا الكتاب)
- ঈমানের পূর্ণাঙ্গ ও ব্যবহারিক রূপরেখা: ইমাম বাইহাকী প্রমাণ করেছেন যে, ঈমান কেবল অন্তরের অন্ধ বিশ্বাস বা দার্শনিক বিমূর্ত ধারণা নয়; বরং মানবজীবনের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, আখলাক ও রাষ্ট্রীয় আচার-আচরণের প্রতিটি ভালো কাজই ঈমানের জীবন্ত অঙ্গ। তিনি ঈমানের ৭৭টি শাখাকে তিনটি স্তরে বিন্যস্ত করেছেন:
- অন্তরের আমল (আমালুল ক্বলব): ৩০টি শাখা (যেমন: আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাক্বওয়া, তাওয়াক্কুল, রিয়া বর্জন, তওবা ইত্যাদি)।
- মুখ ও জবানের আমল (আমালুল লিসান): ৭টি শাখা (যেমন: কুরআন তিলাওয়াত, তাওহীদের সাক্ষ্য, ইলম শিক্ষা দেওয়া, মিথ্যা বর্জন ইত্যাদি)।
- শারীরিক ও সামাজিক আমল (আমালুল জাওয়ারিহ): ৪০টি শাখা (যেমন: সালাত, যাকাত, পিতা-মাতার সেবা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, ইনসাফ কায়েম, মেহমানদারী, রাস্তা পরিষ্কার ইত্যাদি)।
- প্রামাণ্য মুত্তাসিল সনদের সমাবেশ: ইমাম বাইহাকী প্রতিটি শাখার অধীনে যে সমস্ত কুরআনের আয়াত, রাসূলের হাদীস, সাহাবাদের আসার এবং তাবেয়ী ও বুযুর্গদের মূল্যবান উক্তি উল্লেখ করেছেন, তার প্রায় সবই তিনি স্বীয় মুত্তাসিল সনদসহ সংকলন করেছেন। ফলে গ্রন্থটি মৌলিক সনদের এক সমৃদ্ধ আধার।
- হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাই ও সমালোচনা: ইমাম বাইহাকী কেবল হাদীস সংকলন করেননি; বরং প্রতিটি হাদীস উল্লেখের পর তার নির্ভরযোগ্যতা, সনদের মান (সহীহ, হাসান, গরীব বা যঈফ) এবং বর্ণনাকারীদের ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্পর্কে সূক্ষ্ম ইলমী মন্তব্য যুক্ত করেছেন।
- আখলাক ও তাযকিয়ায়ে নফসের অনন্য আধার: মানবাত্মার পরিশুদ্ধি, চারিত্রিক মাধুর্য, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করার জন্য এই গ্রন্থটির কোনো বিকল্প নেই। এটি তাত্ত্বিক ফিকহের শুষ্কতা দূর করে মুসলিম হৃদয়ে খোদাভীতি ও তাক্বওয়ার সঞ্জীবনী সুধা সঞ্চার করে।
- মুসলিম সমাজের নীতিশিক্ষার আলোকবর্তিকা: মুসলিম সমাজ গঠনের সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতাসমূহকে ঈমানের অপরিহার্য অংশ হিসেবে তুলে ধরার মাধ্যমে গ্রন্থটি ইসলামী সমাজবিজ্ঞানের এক অনন্য দিকনির্দেশক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: দিরাসাতুল হাদিস-১ কোর্সে মুওয়াত্তা ইমাম মালিক ও মুওয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ উভয়টি পাঠ্যভুক্ত করার মূল তাৎপর্য কী?
উত্তর: মুওয়াত্তা ইমাম মালিক হলো মদীনার প্রত্যক্ষ ঐতিহ্য ও আসহাবুল হাদীসের বিশুদ্ধতম সংকলন, অন্যদিকে মুওয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ হলো সেই হাদীসসমূহের ওপর ইরাকের আসহাবুর রায়ের যুক্তিনির্ভর ফিকহী ইজতিহাদের সমন্বয়। উভয় গ্রন্থ একযোগে পাঠ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মদীনা ও কুফার ইলমী ধারার তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ এবং সুন্নাহ থেকে ফিকহী মাসআলা আহরণের অন্তর্নিহিত পদ্ধতি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়।
প্রশ্ন ২: যুদ্ধকালীন আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সাথে হাদীসে বর্ণিত সমর-নীতির মৌলিক সামঞ্জস্য কোথায়?
উত্তর: আধুনিক জেনেভা কনভেনশনের শত শত বছর পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন: বিশ্বাসঘাতকতা না করা, অঙ্গচ্ছেদ (মুছলাহ) না করা, নিরপরাধ শিশু, নারী, অতিবৃদ্ধ ও পুরোহিতদের হত্যা না করা এবং বেসামরিক পরিবেশ ও সম্পদ ধ্বংস না করা। এটি প্রমাণ করে যে ইসলাম যুদ্ধের ময়দানেও চরম মানবতা, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার সর্বোত্তম আদর্শ নিশ্চিত করেছে।
প্রশ্ন ৩: গনীমত বা গণসম্পদে ‘গুলূল’ (আত্মসাৎ)-এর ভয়াবহতা সম্পর্কে শরীয়তের অবস্থান কী?
উত্তর: গুলূল হলো অন্যতম নিকৃষ্ট কবিরা গুনাহ। এমনকি আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়া ব্যক্তিও যদি সামান্য দুই দিরহাম মূল্যের রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করে, তবে সে জাহান্নামের আগুনে শাস্তি ভোগ করবে এবং কিয়ামতের দিন উক্ত সম্পদ ঘাড়ে বহন করে চরম লাঞ্ছিত হবে। রাষ্ট্রীয় ও যৌথ আমানতের পবিত্রতা রক্ষায় ইসলামের এই কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি অনন্য।
প্রশ্ন ৪: নামাযে কাতার সোজা করার বিধান কী এবং এর সামাজিক তাৎপর্য কী?
উত্তর: জমহুর ফকীহদের মতে কাতার সোজা করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ এবং ইমাম বুখারী ও ইবনে হাযমের মতে ওয়াজিব। কাতার বাঁকা রাখলে অন্তরে বিভেদ সৃষ্টির কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। সামাজিকভাবে এটি মুসলমানদের মধ্যে ধনী-গরীব, রাজা-প্রজার ভেদাভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ থাকার পরম শিক্ষা দেয়।
প্রশ্ন ৫: একই দিনে জুমুআ ও ঈদ একত্রিত হলে জুমার সালাতের বিধান কী?
উত্তর: হানাফী ও জমহুর উলামায়ে কিরামের মতে, শহরের স্থায়ী বাসিন্দাদের ওপর ঈদের নামায ওয়াজিব এবং জুমার নামায পৃথকভাবে ফরযে আইন; একটির কারণে অপরটি মাফ হয় না। তবে হযরত উসমান (রা.)-এর আমল অনুযায়ী প্রত্যন্ত গ্রামের মুসল্লি যারা কষ্ট করে শহরে ঈদের নামাযে এসেছে, কেবল তাদের জন্য জুমার জামায়াতে না থেকে নিজ গ্রামে ফিরে গিয়ে সাধারণ যোহর পড়ার বিশেষ অবকাশ রয়েছে।
প্রশ্ন ৬: ইমাম বাইহাকীর ‘শু’আবুল ঈমান’ গ্রন্থের আলোকে ঈমানের শাখাগুলোর মূল বিন্যাস কীভাবে করা হয়েছে?
উত্তর: ইমাম বাইহাকী নবীজী (সা.)-এর হাদীসের ভিত্তিতে ঈমানের ৭৭টি শাখাকে তিনটি প্রধান ভাগে বিন্যস্ত করেছেন: অন্তরের আন্তরিক বিশ্বাস ও সংকল্প সংক্রান্ত ৩০টি শাখা (যেমন: তাওহীদ, তাক্বওয়া, ইখলাস), মুখের জবান ও ভাষা সংক্রান্ত ৭টি শাখা (যেমন: কালেমা পাঠ, সত্যবাদিতা, কুরআন তিলাওয়াত) এবং শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও সামাজিক সদাচার সংক্রান্ত ৪০টি শাখা (যেমন: সালাত, দান-সদকা, মা-বাবার সেবা ও কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ)।