জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

দিরাসাতুল হাদীস-২ (Dirasatul Hadith-2) – ২০২৮০৭, আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
১৭০ মিনিট পড়ার সময়
২০ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৩৩
اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۴
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة الحديث-٢
[দিরাসাতুল হাদীস-২]
বিষয় কোড: ২০২৮০৭
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن اثنين من مجموعة (أ) وعن اثنين من مجموعة (ب) وعن اثنين من مجموعة (ج) وعن اثنين من مجموعة (د)- الأعداد بالهامش تدل على الدرجات كاملة-
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিটি বিভাগ থেকে ২টি করে মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হলেও পরীক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ ও সমৃদ্ধ একাডেমিক প্রস্তুতির লক্ষ্যে নিম্নে প্রশ্নপত্রের চারটি বিভাগের মোট ১২টি প্রশ্নেরই গভীর তাত্ত্বিক ও রেফারেন্সভিত্তিক নির্ভুল সমাধান উপস্থাপন করা হলো।]


مجموعة (أ) — صحيح ابن حبان (সহীহ ইবনে হিব্বান)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)


١- أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْحَسَنِ بْنِ قُتَيْبَةَ اللَّخْمِيُّ بِعَسْقَلَانَ حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي السَّرِيِّ حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ أَخْبَرَنَا مَعْمَرٌ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ) قَالَ سَأَلَ رَجُلٌ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ! أَيُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: «الْإِيمَانُ بِاللهِ»، قَالَ: ثُمَّ مَاذَا؟ قَالَ: «ثُمَّ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ»، قَالَ: ثُمَّ مَاذَا؟ قَالَ: «ثُمَّ حَجٌّ مَبْرُورٌ»-

[১. মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ইবনে কুতায়বা আল-লাখমী আসকালানে আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন ইবনু আবিস সারী আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন আব্দুর রাযযাক আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন মা’মার যুহরী থেকে আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব থেকে, তিনি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসূল! কোন আমলটি সর্বোত্তম? তিনি বললেন: আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা। সে বলল: তারপর কোনটি? তিনি বললেন: অতঃপর আল্লাহর পথে জিহাদ করা। সে নিবেদন করল: তারপর কোনটি? তিনি বললেন: অতঃপর হজ্জে মাবরূর (কবুল হজ্জ)।]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ পরিচিতি

অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে আরজ করল: হে আল্লাহর রাসূল! কোন আমলটি সর্বোত্তম ও সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ? নবী করীম (সা.) ইরশাদ করলেন: “আল্লাহ তা’আলার প্রতি ঈমান আনয়ন করা।” সে পুনরায় জিজ্ঞাসা করল: তারপর কোনটি? তিনি বললেন: “অতঃপর আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” সে পুনরায় নিবেদন করল: অতঃপর কোনটি? তিনি ইরশাদ করলেন: “অতঃপর হজ্জে মাবরূর (পাপমুক্ত ও কবুল হজ্জ)।”

হাদীসের রাবী ও সনদ বিশ্লেষণ:

  • ইমাম ইবনে হিব্বান (রহ.): গ্রন্থের সংকলক, প্রখ্যাত হাফিযে হাদীস আবু হাতিম মুহাম্মদ ইবনে হিব্বান আত-তামীমী আল-বুসতী (মৃত্যু ৩৫৪ হিজরী)।
  • মুহাম্মদ ইবনুল হাসান ইবনে কুতায়বা আল-লাখমী: আসকালানের সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও ইমাম ইবনে হিব্বানের অন্যতম প্রধান শায়খ।
  • ইবনু আবিস সারী: মুহাম্মদ ইবনু আবিস সারী আল-আসকালানী, বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী।
  • আব্দুর রাযযাক আস-সান’আনী: ‘মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক’-এর প্রণেতা, বিশ্বখ্যাত হাফিযে হাদীস (১২৬-২১১ হিজরী)।
  • মা’মার ইবনে রাশিদ: বসরার অন্যতম শীর্ষ হাফিযে হাদীস ও ইমাম যুহরীর বিশিষ্ট ছাত্র।
  • ইমাম ইবনে শিহাব আয-যুহরী: মদীনার শীর্ষস্থানীয় তাবে’ঈ ও হাদীস সংকলনের অগ্রদূত।
  • সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব: মদীনার সাত ফকীহের (ফুকাহায়ে সাব’আ) অন্যতম শীর্ষ ইমাম ও সাইয়্যিদুত তাবে’ঈন।
  • হযরত আবু হুরায়রা (রা.): সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী জলীলুল কদর সাহাবী।

হাদীসের শব্দার্থ ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

  • أَيُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ: ‘আইয়্যু’ ইসমে ইসতিফহাম (জিজ্ঞাসাবোধক বিশেষ্য)। ‘আফদ্বাল’ ইসমে তাফযীল, যা আতিশয্য ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্দেশ করে। অর্থাৎ সাওয়াব ও মর্যাদার দিক থেকে কোন আমলটি সর্বাগ্রে?
  • الْإِيمَانُ بِاللهِ: আল্লাহর অস্তিত্ব, তাওহীদ ও তাঁর সিফাতে আন্তরিক বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি এবং তদনুযায়ী আনুগত্য। ঈমান হলো সকল সৎকাজের মূল ভিত্তি; ঈমানবিহীন কোনো আমল আল্লাহর নিকট গৃহীত নয়।
  • حَجٌّ مَبْرُورٌ: পুণ্যময়, পাপমুক্ত ও আল্লাহর দরবারে গৃহীত হজ্জ।

(أ) ما الحج المبرور؟ بين آراء العلماء مفصلا-

হজ্জে মাবরূরের পরিচয় ও উলামায়ে কিরামের বিস্তারিত অভিমত:

১. হজ্জে মাবরূরের আভিধানিক অর্থ:

‘মাবরূর’ (مَبْرُورٌ) শব্দটি আরবি ‘আল-বির্র’ (الْبِرُّ) ধাতু থেকে ইসমে মাফ’ঊল (اسم مفعول)। ‘বির্র’ শব্দের অর্থ হলো— পুণ্য, আনুগত্য, সততা, আন্তরিকতা, কল্যাণ ও একনিষ্ঠতা। অতএব আভিধানিক অর্থে ‘হজ্জে মাবরূর’ হলো এমন হজ্জ যাতে পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য ও পুণ্য সাধিত হয়েছে এবং যা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়েছে।

২. হজ্জে মাবরূরের পারিভাষিক রূপ ও উলামায়ে কিরামের অভিমতসমূহ:

ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় হজ্জে মাবরূরের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসীন ও ফকীহগণের সুনির্দিষ্ট বক্তব্যসমূহ নিম্নরূপ:

  • ইমাম কুরতুবী ও নববী (রহ.)-এর অভিমত: হজ্জে মাবরূর হলো— «الَّذِي لَا يُخَالِطُهُ إِثْمٌ» অর্থাৎ যে হজ্জের মধ্যে কোনো প্রকার গুনাহ, পাপাচার ও শরীয়তবিরোধী ত্রুটির সংমিশ্রণ ঘটেনি। পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: «فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ» অর্থাৎ “যে ব্যক্তি এই মাসগুলোতে হজ্জের সংকল্প করে, তার জন্য হজ্জ চলাকালীন স্ত্রী-সম্ভোগ (বা অশ্লীলতা), পাপাচার ও ঝগড়া-বিবাদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৯৭)। হজ্জের পুরো সফরে এই শর্তসমূহ পূর্ণাঙ্গভাবে অক্ষুণ্ণ রাখাই হলো হজ্জে মাবরূর।
  • সম্পদের হালাল হওয়া (ইমাম আহমাদ ও ইবনে হাজার): যে হজ্জ সম্পূর্ণ হালাল ও পবিত্র উপার্জনের অর্থ দিয়ে সম্পাদন করা হয়। হারাম বা সন্দেহযুক্ত সম্পদ দিয়ে হজ্জ করলে তা হজ্জে মাবরূর হয় না। হাদীসে এসেছে, হারাম মালের হজ্জকারী যখন বলে ‘লাব্বায়িক’, তখন আসমান থেকে ঘোষণা আসে: ‘লা লাব্বায়িকা ওয়া লা সা’দায়িক’ (তোমার হজ্জ কবুল নয়)।
  • ইখলাস ও রিয়ামুক্ত হওয়া (ইবনুল কাইয়্যিম রহ.): যে হজ্জে লোকদেখানো মনোভাব (রিয়া), খ্যাতি অর্জনের লিপ্সা (সুম’আ) বা জাগতিক কোনো উদ্দেশ্য থাকে না; বরং কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মাগফিরাত কামনায় নিষ্ঠার সাথে সম্পন্ন হয়।
  • হাদীসে নববীর প্রত্যক্ষ তাফসীর: সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছিলেন: «مَا بِرُّ الْحَجِّ يَا رَسُولَ اللهِ؟» (হে আল্লাহর রাসূল! হজ্জের পুণ্য বা মাবরূর হওয়ার লক্ষণ কী?)। রাসূলুল্লাহ (সা.) উত্তরে ইরশাদ করেছিলেন: «إِطْعَامُ الطَّعَامِ، وَإِفْشَاءُ السَّلَامِ (وفي رواية: وَطِيبُ الْكَلَامِ)» অর্থাৎ “ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করা, শান্তির বিস্তার (সালাম) ঘটানো এবং মানুষের সাথে উত্তম ও বিনম্র ভাষায় কথা বলা” (মুসনাদে আহমাদ, মুস্তাদরাকে হাকিম)।
  • হাসান বসরী (রহ.)-এর বিশ্লেষণ (হজ্জ কবুল হওয়ার জীবন্ত আলামত): প্রখ্যাত তাবে’ঈ হাসান বসরী (রহ.) বলেন: «الْحَجُّ الْمَبْرُورُ أَنْ يَرْجِعَ زَاهِدًا فِي الدُّنْيَا، رَاغِبًا فِي الْآخِرَةِ» অর্থাৎ “হজ্জে মাবরূর হলো— হজ্জ সমাপ্ত করে বান্দা এমন অবস্থায় স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবে যে, সে পার্থিব মোহ বর্জনকারী এবং আখিরাতের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হবে।” অর্থাৎ হজ্জের পর ব্যক্তির পূর্ববর্তী অন্যায় স্বভাব পরিবর্তিত হয়ে জীবন পরিশুদ্ধ ও তাকওয়াপূর্ণ হওয়াই হলো হজ্জ মাবরূর হওয়ার বাস্তব প্রমাণ।

৩. হজ্জে মাবরূরের সুমহান ফযিলত:

সহীহ হাদীসে হজ্জে মাবরূরের দুটি অতুলনীয় প্রতিদানের কথা ঘোষিত হয়েছে:

  • সরাসরি জান্নাত লাভ: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «وَالْحَجُّ الْمَبْرُورُ لَيْسَ لَهُ جَزَاءٌ إِلَّا الْجَنَّةُ» অর্থাৎ “আর হজ্জে মাবরূরের একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।
  • নিষ্পাপ জীবনের শুভ সূচনা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: «مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمَ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ» অর্থাৎ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্জ করল এবং কোনো অশ্লীলতা ও গুনাহে লিপ্ত হলো না, সে তার মাতৃগর্ভ থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ নিষ্পাপ শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে প্রত্যাবর্তন করে” (সহীহ বুখারী: ১৫২১)।

٢- أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللهِ بْنُ مُحَمَّدٍ الْأَزْدِيُّ قَالَ حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ قَالَ حَدَّثَنَا جَعْفَرُ بْنُ عَوْنٍ قَالَ حَدَّثَنِي ابْنُ إِسْحَاقَ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِبْرَاهِيمَ التَّيْمِيِّ عَنْ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخِيَارِكُمْ؟» قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ! قَالَ: «أَطْوَلُكُمْ أَعْمَارًا وَأَحْسَنُكُمْ أَخْلَاقًا»-

[২. আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল-আযদী আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন ইসহাক ইবনে ইব্রাহীম আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন জা’ফর ইবনে আউন আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন ইবনু ইসহাক আমার কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহীম আত-তায়মী থেকে, তিনি আবু সালামাহ থেকে, তিনি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “আমি কি তোমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তি সম্পর্কে অবহিত করব না?” সাহাবীগণ আরজ করলেন: অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি ইরশাদ করলেন: “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই, যে বয়সে দীর্ঘজীবী এবং চরিত্রে সর্বাধিক উত্তম।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের মধ্যকার সর্বোত্তম ব্যক্তি সম্পর্কে সংবাদ দেব না?” সাহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি ইরশাদ করলেন: “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হলো সে, যে দীর্ঘ আয়ু লাভ করেছে এবং যার চরিত্র ও আচার-ব্যবহার সর্বাধিক সুন্দর ও মার্জিত।”

হাদীসের রাবী ও সনদ পর্যালোচনা:

  • আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল-আযদী: আবু বকর আল-আযদী, নিশাপুরের নির্ভরযোগ্য শায়খ।
  • ইসহাক ইবনে ইব্রাহীম: বিশ্বখ্যাত মুহাদ্দিস ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ (রহ.), ইমাম বুখারী ও মুসলিমের অন্যতম শীর্ষ উস্তাদ।
  • জা’ফর ইবনে আউন: কূফার প্রখ্যাত বিশ্বস্ত হাফিযে হাদীস।
  • মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক: প্রখ্যাত সীরাত ও হাদীস বিশেষজ্ঞ ইবনে ইসহাক।
  • মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহীম আত-তায়মী: মদীনার খ্যাতনামা তাবে’ঈ ফকীহ।
  • আবু সালামাহ ইবনে আব্দুর রহমান: মদীনার শীর্ষ তাবে’ঈ ও ফকীহ।
  • হযরত আবু হুরায়রা (রা.): প্রখ্যাত সাহাবী। সনদটি সহীহ ও গ্রহণযোগ্য।

হাদীসের শব্দার্থ ও ব্যাকরণিক তাহকীক:

  • أَلَا أُخْبِرُكُمْ: ‘আলা’ হরফে ইসতিফতাহ ও তানবীহ (মনোযোগ আকর্ষণের অব্যয়)। ‘উখবিরুকুম’ মুদারী মারফূ’, অর্থাৎ আমি কি তোমাদের সংবাদ দেব না? প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে পাঠদান ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম শিক্ষণরীতি।
  • بِخِيَارِكُمْ: তোমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তি। ‘খিয়ার’ শব্দটি ‘খাইর’-এর বহুবচন অথবা ইসমে তাফযীল।
  • أَطْوَلُكُمْ أَعْمَارًا: তোমাদের মধ্যে যার আয়ু সর্বাধিক দীর্ঘ। ‘আ’মারান’ শব্দটি তাময়ীয (تمييز), যা দীর্ঘতার অস্পষ্টতা দূর করে।
  • أَحْسَنُكُمْ أَخْلَاقًا: যার চরিত্র সর্বাধিক সুন্দর। ‘আখলাক্বান’ও তাময়ীয।

(أ) تحدث عن أهمية حسن الخلق في ضوء الحديث-

হাদীসের আলোকে উত্তম চরিত্রের (হুসনুল খুলুক) গুরুত্ব ও তাৎপর্য:

১. উত্তম চরিত্রের স্বরূপ ও তাৎপর্য:

ইসলামী জীবনদর্শনে ‘হুসনুল খুলুক’ বা সচ্চরিত্র কেবল একটি সাধারণ নৈতিক গুণ নয়, বরং তা ঈমানের অন্যতম মূল নির্যাস ও মুমিনের আত্মিক পরিপূর্ণতার চূড়ান্ত প্রতীক। হাসান বসরী (রহ.) বলেন: «حُسْنُ الْخُلُقِ بَسْطُ الْوَجْهِ، وَبَذْلُ النَّدَى، وَكَفُّ الْأَذَى» অর্থাৎ “উত্তম চরিত্র হলো— প্রফুল্ল মুখমণ্ডল, অপরের প্রতি মুক্তহস্তে দান-কল্যাণ সাধন এবং কাউকে কোনো কষ্ট না দেওয়া বা কষ্টদায়ক বিষয় দূর করা।”

২. দীর্ঘায়ু ও সচ্চরিত্রের অনন্য সংযোগ:

আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বোত্তম ব্যক্তির দুটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন— দীর্ঘায়ু এবং সচ্চরিত্র। সাধারণ দৃষ্টিতে আয়ু দীর্ঘ হওয়া মানুষের নিজের ইচ্ছাধীন নয়, তবে আল্লাহ তা’আলা যখন কাউকে দীর্ঘ জীবন দান করেন এবং সেই দীর্ঘ জীবনকে বান্দা নেক আমল, তাওবা ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে সুশোভিত করে, তখন সে সমগ্র সৃষ্টির সেরা মানুষে পরিণত হয়। তিরমিযী শরীফের অপর এক হাদীসে এসেছে, এক বেদুইন আরজ করল: হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে কে সর্বোত্তম? নবীজী (সা.) ইরশাদ করলেন: «مَنْ طَالَ عُمُرُهُ، وَحَسُنَ عَمَلُهُ» অর্থাৎ “যার বয়স দীর্ঘ হয়েছে এবং যার আমল সুন্দর হয়েছে” (জামে’ তিরমিযী: ২৩২৯)। পক্ষান্তরে দীর্ঘায়ু পেয়েও যে পাপাচার ও দুশ্চরিত্রে লিপ্ত থাকে, সে সর্বাধিক নিকৃষ্ট ব্যক্তি।

৩. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে উত্তম চরিত্রের সুউচ্চ মর্যাদা:

  • মীযানের পাল্লায় সর্বাধিক ভারী আমল: ক্বিয়ামতের কঠিন দিনে মীযানের পাল্লায় সচ্চরিত্রের চেয়ে অধিক ভারী কোনো আমল থাকবে না। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «مَا مِنْ شَيْءٍ أَثْقَلُ فِي مِيزَانِ الْمُؤْمِنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ حُسْنِ الْخُلُقِ» অর্থাৎ “ক্বিয়ামতের দিন মুমিনের মীযানে উত্তম চরিত্রের চেয়ে অধিক ভারী আর কিছুই হবে না” (সুনানে তিরমিযী)।
  • তাহাজ্জুদ ও রোযাদারের সমকক্ষ মর্যাদা: একজন মুমিন সচ্চরিত্রের মাধ্যমে রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায়কারী এবং দিনে অনবরত নফল রোযাদারের সমপরিমাণ সাওয়াব অর্জন করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُدْرِكُ بِحُسْنِ خُلُقِهِ دَرَجَةَ الصَّائِمِ الْقَائِمِ» (সুনানে আবু দাউদ)।
  • জান্নাতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সর্বাধিক নৈকট্য লাভ: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلَاقًا» অর্থাৎ “ক্বিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে আমার সর্বাধিক প্রিয় এবং আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী মজলিসে অবস্থানকারী ব্যক্তি হবে সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে চরিত্রে সর্বোত্তম” (জামে’ তিরমিযী)।
  • ঈমানের পূর্ণতার মাপকাঠি: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: «أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا» অর্থাৎ “মুমিনদের মধ্যে ঈমানে সর্বাধিক পরিপূর্ণ ব্যক্তি সে, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর” (সুনানে তিরমিযী ও আবু দাউদ)।

৪. সমাজ জীবনে উত্তম চরিত্রের বৈপ্লবিক প্রভাব:

উত্তম চরিত্র সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও সামাজিক হানাহানি দূর করে ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যের শান্তিময় পরিবেশ নিশ্চিত করে। পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান, প্রতিবেশী, অধস্তন কর্মচারী এবং সর্বস্তরের মানুষের সাথে কোমল আচরণ ও ইনসাফপূর্ণ ব্যবহারই সমাজের প্রকৃত ভিত্তি। তাই দীর্ঘায়ুর প্রতিটি মুহূর্তকে সচ্চরিত্রের আলোয় উদ্ভাসিত করাই একজন মুমিনের জীবনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।


٣- أَخْبَرَنَا الْحَسَنُ بْنُ سُفْيَانَ قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ اللهِ بْنُ عُمَرَ الْجُعْفِيُّ قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ الْمُحَارِبِيُّ عَنْ عُثْمَانَ بْنِ وَاقِدٍ الْعُمَرِيِّ عَنْ أَبِيهِ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ عَنْ عُرْوَةَ عَنْ عَائِشَةَ (رَضِيَ اللهُ عَنْهَا) قَالَتْ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنِ الْتَمَسَ رِضَى اللهِ بِسَخَطِ النَّاسِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ وَأَرْضَى النَّاسَ عَنْهُ، وَمَنِ الْتَمَسَ رِضَى النَّاسِ بِسَخَطِ اللهِ سَخِطَ اللهُ عَلَيْهِ وَأَسْخَطَ عَلَيْهِ النَّاسَ»-

[৩. আল-হাসান ইবনে সুফিয়ান আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন আব্দুল্লাহ ইবনে উমর আল-জু’ফী আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন আব্দুর রহমান আল-মুহারিবী উসমান ইবনে ওয়াক্বিদ আল-উমারী থেকে আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি মুহাম্মদ ইবনুল মুনকাদির থেকে, তিনি উরওয়াহ থেকে, তিনি হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি মানুষের অসন্তুষ্টির মুখেও আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং মানুষের অন্তরকেও তার প্রতি সন্তুষ্ট করে দেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও মানুষের সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে, আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্ট ও ক্রুদ্ধ হন এবং মানুষের অন্তরকেও তার প্রতি অসন্তুষ্ট ও বিরূপ করে দেন।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি মানুষের অসন্তুষ্টি ও ক্ষোভ উপেক্ষা করে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে, আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং তার ওপর সন্তুষ্ট হন এবং মানবজাতিকেও তার প্রতি সন্তুষ্ট ও অনুগত করে দেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলাকে অসন্তুষ্ট ও অখুশি করে মানুষের সন্তুষ্টি ও মন রক্ষা করতে চায়, আল্লাহ তা’আলা তার ওপর অসন্তুষ্ট ও রাগান্বিত হন এবং মানবজাতিকেও তার বিরুদ্ধে অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ করে তোলেন।”

হাদীসের তাৎপর্য ও ব্যাকরণিক রূপ:

  • مَنِ الْتَمَسَ: ‘ইলতামাসা’ বাবে ইফতি’আল থেকে ফেলে মাযী, যার অর্থ অন্বেষণ করা, আকাঙ্ক্ষা করা বা চেষ্টা করা। এখানে শর্তবোধক জুমলা (جملة الشرط)।
  • بِسَخَطِ النَّاسِ: বা-টি ‘মুসাব্বাবা’ বা ‘মুলাবাসাহ’-এর অর্থে, অর্থাৎ মানুষের ক্ষোভ ও বিরূপতা সত্ত্বেও। ‘সাখাত’ অর্থ অসন্তুষ্টি, ক্ষোভ ও ক্রোধ।
  • أَرْضَى النَّاسَ عَنْهُ: আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান সঞ্চার করে দেন। ফলে যারা শুরুতে অসন্তুষ্ট ছিল, তারাও একপর্যায়ে তার প্রতি সন্তুষ্ট হতে বাধ্য হয়।
  • وَأَسْخَطَ عَلَيْهِ النَّاسَ: আল্লাহ মানবজাতিকে তার বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ ও ঘৃণা পোষণকারী বানিয়ে দেন। ফলে যাদের খুশি করার জন্য সে আল্লাহর অবাধ্য হয়েছিল, তারাই তাকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করে।

(أ) متى ولدت عائشة (رض)؟ اذكر نبذة من حياتها-

হযরত আয়েশা (রা.)-এর জন্মসাল ও সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত:

১. হযরত আয়েশা (রা.)-এর জন্ম ও বংশ পরিচয়:

  • নাম ও উপনাম: নাম আয়েশা, উপনাম ‘উম্মে আব্দুল্লাহ’ (ভাগ্নে আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবাইরের নামানুসারে রাসূলুল্লাহ সা. এই উপনাম রেখেছিলেন)। লকব ‘সিদ্দীক্বা’ (সত্যানিষ্ঠা) ও ‘হুমাযরা’ (লালচে-শ্বেত শুভ্র বর্ণের কারণে নবীজী সা. আদর করে ডাকতেন)।
  • বংশমর্যাদা: পিতা ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক্ব (রা.), মাতা উম্মে রূমান বিনতে আমির। তাঁর বংশধারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে মুররাহ ইবনে কা’ব-এ মিলিত হয়েছে।
  • জন্মসাল: অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিসের নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী, হযরত আয়েশা (রা.) নবুওয়াতের চতুর্থ বা পঞ্চম বর্ষের শেষভাগে (হিজরতের প্রায় ৮ বা ৯ বছর পূর্বে, ৬১৩ বা ৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে) মক্কা মুকাররামায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ইসলামের আলো ও ওহীর পবিত্র আবহে প্রতিপালিত হন। তিনি স্বয়ং বলতেন: “আমি যখন বুদ্ধিমান হয়েছি, তখনই আমার পিতা-মাতাকে দ্বীন ইসলামের অনুসারী হিসেবে পেয়েছি।”

২. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে শুভ বিবাহ ও দাম্পত্য জীবন:

হযরত খাদীজা (রা.)-এর ওফাতের পর আল্লাহর প্রত্যক্ষ নির্দেশে ওহীর মাধ্যমে নবী করীম (সা.)-এর সাথে তাঁর শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়। শাওয়াল মাসে মক্কায় শুভ আক্বদ এবং হিজরতের পর মদীনা মুনাওয়ারায় শাওয়াল মাসেই শুভ বাসর (বিদায়) অনুষ্ঠিত হয়। উম্মুল মুমিনীনগণের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র কুমারী স্ত্রী। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনের নয়টি বছর তিনি নবীজীর সান্নিধ্যে কাটান এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁরই হুজরায়, তাঁরই বক্ষদেশে মাথা রেখে ওফাত লাভ করেন এবং সেখানেই সমাহিত হন।

৩. ইলম, ফিকহ ও হাদীস বর্ণনায় অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্ব:

হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ বিদুষী নারী ফকীহ ও মুহাদ্দিস। সাহাবায়ে কিরামের যেকোনো জটিল ও অমীমাংসিত ফিকহী মাসআলায় হযরত আয়েশা (রা.)-এর কাছেই সমাধান পাওয়া যেত।

  • হাদীস বর্ণনায় স্থান: তিনি সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী মুকসিরীন (مكثرون) সাহাবীগণের মধ্যে অন্যতম। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ২,২১০টি। তাঁর মধ্য থেকে ইমাম বুখারী ও মুসলিম যৌথভাবে ১৭৪টি হাদীস তাঁদের সহীহাইনে সংকলন করেছেন।
  • বহুমুখী প্রজ্ঞা: তিনি কেবল হাদীস ও কুরআনের তাফসীরেই পারদর্শী ছিলেন না; বরং আরব্য সাহিত্য, কবিতা, ইতিহাস, বংশলতিকা এবং প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রেও অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারিনী ছিলেন। উরওয়াহ ইবনুয যুবায়ের (রহ.) বলেন: “আমি কুরআন, তাফসীর, ফারায়েয, হালাল-হারাম, কবিতা ও চিকিৎসাশাস্ত্রে আয়েশা (রা.)-এর চেয়ে অধিক জ্ঞানী কাউকে দেখিনি।”
  • ইজতিহাদ ও ফতোয়া: সাহাবায়ে কিরামের ভুলের সংশোধন করে তিনি প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করার মতো উপাদান প্রদান করেছেন, যা পরবর্তীকালে ইমাম যারকাশী ‘আল-ইজাবাহ লি-ইরাদি মা ইস্তাদরাকাতহু আয়েশাতু আলাস সাহাবাহ’ গ্রন্থে সংকলন করেন।

৪. ওফাত ও জানাযা:

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) ৫৮ হিজরীর ১৭ রমযান মঙ্গলবার রাতে (৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) ৬৬ বছর বয়সে মদীনা মুনাওয়ারায় ইন্তিকাল করেন। তাঁর ওসীয়ত অনুযায়ী প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) রাতের তারাবীর পর তাঁর জানাযার নামায পড়ান এবং গভীর রাতে মদীনার পবিত্র বাক্বী’ কবরস্থানে সাহাবায়ে কিরামের উপস্থিতিতে তাঁকে দাফন করা হয়।


مجموعة (ب) — صحيح ابن خزيمة (সহীহ ইবনে খুযায়মাহ)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)


٤- حَدَّثَنَا أَبُو سَلَمَةَ يَحْيَى بْنُ الْمُغِيرَةِ الْمَخْزُومِيُّ، ثَنَا ابْنُ أَبِي فُدَيْكٍ عَنِ الضَّحَّاكِ بْنِ عُثْمَانَ عَنْ نَافِعٍ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ؛ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؛ أَمَرَ بِإِخْرَاجِ زَكَاةِ الْفِطْرِ قَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلَاةِ وَأَنَّ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ كَانَ يُؤَدِّي قَبْلَ ذَلِكَ بِيَوْمٍ وَيَوْمَيْنِ-

[৪. আবু সালামাহ ইয়াহইয়া ইবনুল মুগীরাহ আল-মাখযূমী আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন ইবনু আবী ফুদাইক আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন দাহহাক ইবনে উসমান থেকে, তিনি নাফে’ থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের (ঈদের) নামাযের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বেই যাকাতুল ফিতর (সাদাকাতুল ফিতর) আদায় করার নির্দেশ প্রদান করেছেন; আর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ঈদের একদিন বা দুদিন পূর্বেই তা আদায় করতেন।]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ পরিচিতি

অনুবাদ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণ মানুষ (ঈদের) নামাযের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বেই যাকাতুল ফিতর আদায় করার জন্য চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছেন। আর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ঈদের একদিন অথবা দুদিন পূর্বেই তা প্রদান করতেন।

হাদীসের রাবী ও সনদ বিশ্লেষণ:

  • ইমাম ইবনে খুযায়মাহ (রহ.): গ্রন্থের সংকলক, প্রখ্যাত ‘ইমামুল আইম্মাহ’ আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযায়মাহ আন-নিশাপুরী (মৃত্যু ৩১১ হিজরী)।
  • আবু সালামাহ ইয়াহইয়া ইবনুল মুগীরাহ আল-মাখযূমী: মক্কার বিশ্বস্ত ও প্রখ্যাত হাফিযে হাদীস।
  • ইবনু আবী ফুদাইক: মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল ইবনে আবী ফুদাইক আল-মাদানী, সিহাহ সিত্তাহর প্রখ্যাত ছিক্বাহ রাবী।
  • দাহহাক ইবনে উসমান: মদীনার নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস।
  • নাফে’ মাওলা ইবনে উমর: সুবিখ্যাত তাবে’ঈ, যাঁর থেকে বর্ণিত সনদকে ইমাম বুখারী ‘সিলসিলাতুয যাহাব’ (স্বর্ণালী সনদধারা) আখ্যা দিয়েছেন।
  • হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.): প্রখ্যাত সাহাবী ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অতন্দ্র প্রহরী।

হাদীসের শব্দার্থ ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

  • أَمَرَ بِإِخْرَاجِ: রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন। উসূলে ফিকহের সর্বসম্মত নীতি হলো: «الأَصْلُ فِي الأَمْرِ لِلْوُجُوبِ» অর্থাৎ রসূলের আদেশ মূলত ফরয বা ওয়াজিব প্রমাণ করে।
  • زَكَاةِ الْفِطْرِ: ফিতরাহ বা রোযা ভঙ্গের সাদাকা। ‘ফিতর’ অর্থ রোযা সমাপ্তি বা রোযা ভঙ্গ করা; রমযানের সমাপ্তিতে এই সাদাকা ওয়াজিব হয় বলে একে ‘যাকাতুল ফিতর’ বলা হয়।
  • قَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلَاةِ: মানুষ ঈদের নামাযের উদ্দেশ্যে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে। এটিই ফিতরা আদায়ের সর্বোত্তম ও মুস্তাহাব সময়।
  • بِيَوْمٍ وَيَوْمَيْنِ: ঈদের একদিন বা দুদিন পূর্বে অগ্রিম প্রদান করা। সাহাবায়ে কিরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত যে ঈদের প্রস্তুতি ও বণ্টন সহজ করার স্বার্থে আগেভাগে আদায় করা সম্পূর্ণ বৈধ।

(أ) ما هي زكاة الفطر؟ بين أحكام زكاة الفطر مفصلا-

যাকাতুল ফিতরের পরিচয় ও ফিকহী আহকামসমূহের বিস্তারিত বিশ্লেষণ:

১. যাকাতুল ফিতরের আভিধানিক ও পারিভাষিক রূপ:

‘যাকাত’ (زَكَاةٌ) শব্দের আভিধানিক অর্থ পবিত্রতা, বরকত ও বৃদ্ধি। আর ‘ফিতর’ (فِطْرٌ) অর্থ রোযা ভঙ্গ বা প্রাতরাশ। শরীয়তের পরিভাষায়: «هِيَ صَدَقَةٌ مَعْلُومَةٌ بِمِقْدَارٍ مَعْلُومٍ عَنْ شَخْصٍ مَخْصُوصٍ بِشَرَائِطَ مَخْصُوصَةٍ عِنْدَ إِفْطَارِ رَمَضَانَ» অর্থাৎ পবিত্র মাহে রমযানের রোযা সমাপ্তির পর ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় নির্দিষ্ট শর্তযুক্ত সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর নিজের ও অধীনস্থদের পক্ষ থেকে নির্ধারিত খাদ্যসামগ্রী বা তার মূল্য গরীব-মিসকীনদের মাঝে বণ্টন করাকে যাকাতুল ফিতর বা সাদাকাতুল ফিতর বলা হয়।

২. যাকাতুল ফিতরের উদ্দেশ্য ও হিকমত:

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত সহীহ হাদীসে এর দুটি প্রধান হিকমত ঘোষিত হয়েছে: «فَرَضَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ، وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ» (সুনানে আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)।

  • রোযাদারকে নিষ্পাপ ও পবিত্র করা: রোযা পালনকালে অসাবধানতাবশত ঘটে যাওয়া অনর্থক কথা, অশ্লীল চিন্তা ও ত্রুটি-বিচ্যুতির কাফফারা হিসেবে ফিতরা কাজ করে।
  • দরিদ্রদের মুখে আহার ও ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া: ঈদের দিনে কোনো মুসলমান যেন অনাহারে না থাকে এবং অপরের কাছে হাত পাততে বাধ্য না হয়, সেজন্য এই সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

৩. যাকাতুল ফিতরের শরয়ী হুকুম:

যাকাতুল ফিতর আদায় করা শরীয়তের অকাট্য দলীলে ওয়াজিব। জমহুর ফুকাহায়ে কেরাম (ইমাম শাফে’ঈ, ইমাম মালিক ও ইমাম আহমাদ রহ.)-এর মতে এটি সরাসরি ‘ফরয’; আর হানাফী মাযহাব অনুযায়ী এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা সমতুল্য ‘ওয়াজিব’। স্বাধীন-গোলাম, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সকল সামর্থ্যবান মুসলমানের পক্ষ থেকে এটি আদায় করা আবশ্যক।

৪. কার ওপর যাকাতুল ফিতর ওয়াজিব?

  • হানাফী মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি: ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় যে ব্যক্তির নিকট নিজের ও পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ (বাসস্থান, পোশাক, গৃহস্থালি সামগ্রী) বাদে যাকাতের নেসাব পরিমাণ (সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য সমমূল্যের) অতিরিক্ত সম্পদ থাকবে, তার ওপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। এতে পূর্ণ এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া বা সম্পদ বর্ধনশীল হওয়া শর্ত নয়।
  • জমহুর উলামায়ে কিরামের দৃষ্টিভঙ্গি: যে ব্যক্তির নিকট ঈদের দিন ও রাতে নিজের ও পোষ্যদের স্বাভাবিক খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের অতিরিক্ত কোনো খাদ্য বা সম্পদ উদ্বৃত্ত থাকে, তার ওপরই ফিতরা ফরয।

৫. ফিতরা আদায়ের সময়সীমা:

  • মুস্তাহাব ও উত্তম সময়: ঈদের দিন সুবহে সাদিক থেকে ঈদের নামাযের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার পূর্ববর্তী সময়।
  • অগ্রিম আদায় করা: হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী ঈদের এক বা দুই দিন পূর্বে আদায় করা সর্বসম্মতভাবে জায়েয। ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম শাফে’ঈ (রহ.)-এর মতে রমযানের শুরু থেকেই তা আদায় করা বৈধ, যাতে দরিদ্র ব্যক্তিরা ঈদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যে প্রস্তুতি নিতে পারে।
  • নামাযের পরে আদায় করা: ঈদের নামাযের পর আদায় করলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে বটে, তবে তা মাকরূহ হবে এবং সাধারণ নফল সাদাকায় পরিণত হবে (হাদীসের ঘোষণা: «فَمَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلَاةِ فَهِيَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ، وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلَاةِ فَهِيَ صَدَقَةٌ مِنَ الصَّدَقَاتِ»)।

৬. ফিতরার পরিমাণ ও খাদ্যদ্রব্য:

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে প্রচলিত খাদ্যদ্রব্য অনুযায়ী ফিতরার পরিমাণ নির্ধারিত:

  • গম বা আটা: অর্ধ সা’ (نصف صاع) — যা সমকালীন পরিমাপে প্রায় ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম বা ১ কেজি ৭০০ গ্রাম (সতর্কতামূলক পৌনে দুই কেজি)। হানাফী ফকীহগণ এই মত পোষণ করেন।
  • যব, খেজুর, কিসমিস বা পনির: পূর্ণ এক সা’ (صاع كامل) — যা প্রায় ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম।
  • নগদ অর্থ দ্বারা আদায়: ইমাম আবু হানীফা, উমর ইবনে আব্দুল আযীয ও হাসান বসরী (রহ.)-এর মতে খাদ্যদ্রব্যের পরিবর্তে তার সমমূল্যের নগদ টাকা প্রদান করা সম্পূর্ণ জায়েয এবং সমসাময়িক যুগে দরিদ্রদের বাস্তব প্রয়োজনের জন্য এটিই অধিক ফলপ্রসূ।

٥- حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يَحْيَى حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ وَهْبِ بْنِ عَطِيَّةَ حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ بْنُ مُسْلِمٍ حَدَّثَنَا مَرْزُوقُ بْنُ أَبِي الْهُذَيْلِ أَخْبَرَنَا الزُّهْرِيُّ حَدَّثَنِي أَبُو عَبْدِ اللهِ الْأَغَرُّ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ) قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ مِمَّا يَلْحَقُ الْمُؤْمِنَ مِنْ عَمَلِهِ وَحَسَنَاتِهِ بَعْدَ مَوْتِهِ عِلْمًا عَلَّمَهُ وَنَشَرَهُ أَوْ وَلَدًا صَالِحًا تَرَكَهُ أَوْ مَسْجِدًا بَنَاهُ أَوْ بَيْتًا لِابْنِ السَّبِيلِ بَنَاهُ أَوْ نَهْرًا أَجْرَاهُ أَوْ صَدَقَةً أَخْرَجَهَا مِنْ مَالِهِ فِي صِحَّتِهِ وَحَيَاتِهِ تَلْحَقُهُ بَعْدَ مَوْتِهِ»-

[৫. মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন মুহাম্মদ ইবনে ওয়াহব ইবনে আতিয়্যাহ আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন আল-ওয়ালীদ ইবনে মুসলিম আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন মারযূক্ব ইবনু আবিল হুযাইল থেকে, তিনি বলেন যুহরী আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন আবু আব্দুল্লাহ আল-আগ্বর্র আমার কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “নিশ্চয়ই মুমিনের মৃত্যুর পর তার আমল ও নেকিসমূহ থেকে যা তার কাছে পৌঁছে তা হলো— এমন ইলম যা সে অপরকে শিক্ষা দিয়েছে ও প্রচার করেছে, অথবা নেক সন্তান যা সে রেখে গেছে, অথবা মসজিদ যা সে নির্মাণ করেছে, অথবা মুসাফিরখানা যা সে পথচারীদের জন্য তৈরি করেছে, অথবা নদী-নালা যা সে প্রবাহিত করেছে, কিংবা এমন সাদাকা যা সে সুস্থাবস্থায় ও জীবদ্দশায় স্বীয় সম্পদ থেকে দান করেছে; মৃত্যুর পর তা তার কাছে পৌঁছাবে।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ পরিচিতি

অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “মুমিনের মৃত্যুর পর তার যে সকল নেক আমল ও পুণ্য তার সাথে যুক্ত হতে থাকে (যার সাওয়াব কবরে অব্যাহত থাকে), তা হলো— এমন দ্বীনী জ্ঞান যা সে নিজে শিক্ষা দিয়েছে এবং সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছে; অথবা এমন সুসন্তান যাকে সে দুনিয়ায় রেখে গেছে (যে তার জন্য দু’আ করে); অথবা কোনো মসজিদ যা সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্মাণ করেছে; অথবা কোনো মুসাফিরখানা যা সে পথচারী-মুসাফিরদের বিশ্রামের জন্য তৈরি করেছে; অথবা কোনো খাল বা নদী যা সে জনকল্যাণে প্রবাহিত করেছে; অথবা এমন দান-সাদাকা যা সে সুস্থাবস্থায় ও জীবদ্দশায় নিজের বৈধ সম্পদ থেকে ব্যয় করেছে— মৃত্যুর পর এই সমস্ত নেক কাজের সাওয়াব তার আমলনামায় ধারাবাহিকভাবে যুক্ত হতে থাকবে।”

হাদীসের রাবী ও সনদ বিশ্লেষণ:

  • মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া: ইমাম যুহলী (রহ.), খোরাসানের শায়খুল হাদীস ও ইমাম ইবনে খুযায়মার প্রধান উস্তাদ।
  • মুহাম্মদ ইবনে ওয়াহব ইবনে আতিয়্যাহ: দামেশকের নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস।
  • আল-ওয়ালীদ ইবনে মুসলিম: সিরিয়ার প্রখ্যাত হাফিযে হাদীস।
  • মারযূক্ব ইবনু আবিল হুযাইল: বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী।
  • ইমাম ইবনে শিহাব আয-যুহরী: মদীনার শীর্ষ তাবে’ঈ মুহাদ্দিস।
  • আবু আব্দুল্লাহ আল-আগ্বর্র: সালমান ইবনে আবদির রহমান আল-মাদানী, ছিক্বাহ তাবে’ঈ।
  • হযরত আবু হুরায়রা (রা.): প্রখ্যাত সাহাবী। ইমাম ইবনে খুযায়মাহ এই সহীহ হাদীসটি সাদাকায়ে জারিয়ার অধ্যায়ে সংকলন করেছেন।

হাদীসের শব্দার্থ ও ব্যাকরণিক তাহকীক:

  • إِنَّ مِمَّا يَلْحَقُ: নিশ্চয়ই যা কিছু যুক্ত হয় বা পৌঁছে। ‘লাহিক্বা-ইয়ালহাক্বু’ অর্থ মিলিত হওয়া বা পৌঁছানো। মৃত্যুর পরেও সাওয়াব পৌঁছানোর দলীল।
  • عِلْمًا عَلَّمَهُ وَنَشَرَهُ: এমন কল্যাণকর ইলম যা সে অপরকে পাঠদান করেছে, কিতাব লিখেছে বা প্রচার করেছে।
  • وَلَدًا صَالِحًا: সৎ সন্তান। সন্তান পিতা-মাতার জন্য দু’আ করলে বা সৎ আমল করলে তার এক বিরাট অংশ পিতা-মাতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাভ করেন।
  • نَهْرًا أَجْرَاهُ: খাল খনন, কূপ খনন বা সুপেয় পানির ব্যবস্থা করে দেওয়া। এটি পানি দানের সাদাকায়ে জারিয়া।
  • فِي صِحَّتِهِ وَحَيَاتِهِ: সুস্থ ও সবল অবস্থায় সম্পদ দান করা। মৃত্যুর মুখে ওসীয়ত করার চেয়ে সুস্থাবস্থায় দান করার সাওয়াব বহুগুণ বেশি।

(أ) هل يجوز إيصال ثواب الفرائض للأموات؟ فما رأى العلماء فيه؟

মৃত ব্যক্তির নিকট ফরয ইবাদতের সাওয়াব পৌঁছানো (ঈসালে সাওয়াব) কি জায়েয? ফকীহ ও উলামায়ে কিরামের বিস্তারিত পর্যালোচনা:

১. ঈসালে সাওয়াবের পরিচয় ও মূল দর্শন:

‘ঈসালে সাওয়াব’ (إِيصَالُ الثَّوَابِ) অর্থ কোনো নেক আমলের পুণ্য বা সাওয়াব অন্যের নিকট, বিশেষ করে মৃত মুসলিমের রূহের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে: «وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ» অর্থাৎ “আর যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে: হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের এবং আমাদের পূর্বে যেসব ভাই ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁদের ক্ষমা করুন” (সূরা আল-হাশর: ১০)। এই আয়াত ও বহু সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে জীবিতদের নেক দু’আ ও সাদাকা মৃতদের প্রভূত কল্যাণ বয়ে আনে।

২. ফরয ইবাদতসমূহের সাওয়াব ও দায়িত্ব মুক্তির বিশ্লেষণ:

ইবাদত প্রধানত তিন প্রকার: (ক) আর্থিক ইবাদত, (খ) শারীরিক ইবাদত, এবং (গ) মিশ্র (আর্থিক ও শারীরিক সমন্বিত) ইবাদত। ফরয ইবাদতের ক্ষেত্রে উলামায়ে কিরামের বিস্তারিত অভিমত নিম্নরূপ:

ক. আর্থিক ফরয ইবাদত (যাকাত, কাফফারা ও মান্নত):

মৃত ব্যক্তির জিম্মায় যদি ফরয যাকাত, মান্নত বা গুনাহের কাফফারা বাকী থাকে, তবে তা তার ওয়ারিস বা অন্য কেউ তার পক্ষ থেকে আদায় করলে সর্বসম্মতভাবে মৃতের জিম্মা মুক্ত হবে এবং এর সাওয়াব ও মুক্তি মৃত ব্যক্তি পুরোপুরি লাভ করবেন। এটি জমহুর ফুকাহায়ে কেরামের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত।

খ. মিশ্র ফরয ইবাদত (হজ্জে বদল):

হজ্জ শারীরিক ও আর্থিক উভয়ের সমন্বয়ে গঠিত। কোনো মুসলমানের ওপর হজ্জ ফরয হওয়া সত্ত্বেও যদি সে ওযরবশত বা মৃত্যুর কারণে আদায় করতে না পারে, তবে তার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে অথবা ওয়ারিসের নিজস্ব অর্থ থেকে ‘হজ্জে বদল’ সম্পাদন করা সহীহ হাদীসের সুস্পষ্ট নির্দেশে জায়েয ও সাব্যস্ত। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে, জুহায়না গোত্রের এক নারী নবীজী (সা.)-এর নিকট এসে আরজ করল: আমার মা হজ্জের মান্নত করেছিলেন কিন্তু হজ্জ না করেই মারা গেছেন, আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে হজ্জ করব? নবী করীম (সা.) বললেন: «حُجِّي عَنْهَا، أَرَأَيْتِ لَوْ كَانَ عَلَى أُمِّكِ دَيْنٌ أَكُنْتِ قَاضِيَتَهُ؟ اقْضُوا اللهَ، فَاللهُ أَحَقُّ بِالْوَفَاءِ» অর্থাৎ “হ্যাঁ, তুমি তার পক্ষ থেকে হজ্জ কর। দেখ তো, তোমার মায়ের ওপর কোনো দেনা থাকলে তুমি কি তা পরিশোধ করতে না? আল্লাহর পাওনা পরিশোধ কর; কেননা আল্লাহই পাওনা পাওয়ার সর্বাধিক হকদার” (সহীহ বুখারী: ১৮৫২)।

গ. শারীরিক ফরয ইবাদত (রোযা ও নামায):

শারীরিক ইবাদতের ক্ষেত্রে ফকীহগণের মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম মতপার্থক্য রয়েছে:

  • ১. ফরয রোযার ক্ষেত্রে:
    • ইমাম শাফে’ঈ (ক্বদীম মত), ইমাম আহমাদ ও আহলে হাদীসগণের মত: যদি কোনো ব্যক্তি রমযানের কাযা রোযা বা মান্নতের রোযা জিম্মায় রেখে মারা যায়, তবে তার ওয়ারিস তার পক্ষ থেকে রোযা রাখতে পারবে। দলীল সহীহ বুখারীর হাদীস: «مَنْ مَاتَ وَعَلَيْهِ صِيَامٌ صَامَ عَنْهُ وَلِيُّهُ» অর্থাৎ “যে ব্যক্তি রোযা কাযা থাকা অবস্থায় মারা গেল, তার অভিভাবক তার পক্ষ থেকে রোযা রাখবে।”
    • হানাফী ও মালিকী মাযহাব এবং শাফে’ঈ জাদীদ মত: তাঁদের মতে কোনো জীবিত ব্যক্তি অন্যের পক্ষ থেকে সরাসরি রোযা রাখতে পারে না; বরং মৃতের পক্ষ থেকে প্রতিটি কাযা রোযার বিনিময়ে অর্ধ সা’ গম বা তার মূল্য ‘ফিদয়া’ হিসেবে গরীবদের প্রদান করতে হবে। এতে মৃত ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে দায়মুক্ত হবে।
  • ২. ফরয নামাযের ক্ষেত্রে:
    • ইসলামের সকল ফকীহ একমত যে, এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির পক্ষ থেকে সরাসরি নামায পড়তে পারে না (নামাযে কোনো বদল নেই)।
    • তবে হানাফী ফুকাহায়ে কেরামের ফতোয়া অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি নামায কাযা রেখে মারা যায় এবং মৃত্যুর পূর্বে তার কাযা নামাযের ফিদয়া আদায়ের ওসীয়ত করে যায়, তবে তার পরিত্যক্ত এক-তৃতীয়াংশ মাল থেকে প্রতিটি ওয়াক্তের (বিতরসহ দৈনিক ৬ ওয়াক্তের) জন্য সদকায়ে ফিতর সমপরিমাণ খাদ্য বা মূল্য গরীবদের দিয়ে দিলে আল্লাহ তা’আলার রহমতে তাঁর নামাযের কাফফারা হয়ে যাবে বলে আশা করা যায়। একে ‘ইসক্বাতে সালাত’ (إِسْقَاطُ الصَّلَاةِ) বলা হয়।

৩. ফকীহগণের চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ:

উপসংহারে বলা যায়, ফরয ইবাদতের দায়মুক্তির ক্ষেত্রে আর্থিক ও হজ্জের বদল সর্বসম্মতভাবে জায়েয। আর রোযা ও নামাযের ক্ষেত্রে ফিদয়া আদায়ের মাধ্যমে মৃতের পরকালীন আযাব লাঘব ও সাওয়াব পৌঁছানো শরীয়তসম্মত ও মুস্তাহাব আমল।


٦- عَنْ سَعِيدِ بْنِ عَمْرِو بْنِ شُرَحْبِيلَ بْنِ سَعِيدِ بْنِ سَعْدِ بْنِ عُبَادَةَ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ؛ أَنَّهُ قَالَ خَرَجَ سَعْدُ بْنُ عُبَادَةَ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي بَعْضِ مَغَازِيهِ فَحَضَرَتْ أُمَّ سَعْدٍ الْوَفَاةُ فَقِيلَ لَهَا أَوْصِي؟ فَقَالَتْ فِيمَ أُوصِي؟ إِنَّمَا الْمَالُ مَالُ سَعْدٍ فَتُوُفِّيَتْ قَبْلَ أَنْ يَقْدَمَ سَعْدٌ فَلَمَّا قَدِمَ سَعْدٌ ذُكِرَ لَهُ ذَلِكَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ! هَلْ يَنْفَعُهَا أَنْ أَتَصَدَّقَ عَنْهَا؟ قَالَ: «نَعَمْ» قَالَ سَعْدٌ: حَائِطُ كَذَا وَكَذَا صَدَقَةٌ عَنْهَا لِحَائِطٍ قَدْ سَمَّاهُ-

[৬. সাঈদ ইবনে আমর ইবনে শুরাহবীল ইবনে সাঈদ ইবনে সা’দ ইবনে উবাদাহ থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত সা’দ ইবনে উবাদাহ (রা.) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কোনো এক যুদ্ধে গমন করলেন। ইতিমধ্যে সা’দের মাতার মৃত্যু উপস্থিত হলো। তাঁকে বলা হলো: আপনি কি ওসীয়ত করবেন? তিনি বললেন: কিসের ওসীয়ত করব? সমস্ত সম্পদ তো সা’দেরই সম্পদ। অতঃপর সা’দ ফিরে আসার পূর্বেই তিনি ইন্তিকাল করলেন। সা’দ যখন ফিরে এলেন তখন তাঁকে এই ঘটনা জানানো হলো। তিনি আরজ করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি আমার মায়ের পক্ষ থেকে সাদাকা করি তবে কি তা তাঁর কোনো উপকারে আসবে? নবীজী (সা.) ইরশাদ করলেন: “হ্যাঁ।” তখন সা’দ বললেন: অমুক অমুক খেজুরের বাগানটি আমার মায়ের পক্ষ থেকে সাদাকা হিসেবে উৎসর্গীকৃত— তিনি একটি সুনির্দিষ্ট বাগানের নাম উল্লেখ করলেন।]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: হযরত সা’দ ইবনে উবাদাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পৌত্র সাঈদ তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হযরত সা’দ ইবনে উবাদাহ (রা.) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সফরসঙ্গী হয়ে একটি জিহাদী অভিযানে বের হয়েছিলেন। এ সময় তাঁর পুণ্যময়ী মাতা অন্তিম শয্যায় শায়িত হলেন। উপস্থিত লোকজন তাঁকে জিজ্ঞাসা করল: আপনি কি কোনো ওসীয়ত করে যাবেন না? তিনি অত্যন্ত স্নেহ ও ইনসাফের সাথে বললেন: আমি কিসের ওসীয়ত করব? ধন-সম্পদ যা আছে তা তো আমার পুত্র সা’দেরই সম্পদ (আমার ব্যক্তিগত কিছু নেই)। অতঃপর সা’দ যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করার পূর্বেই তাঁর মাতা ইন্তিকাল করলেন। সা’দ (রা.) ফিরে আসার পর তাঁকে বিষয়টি অবগত করা হলে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র দরবারে হাজির হয়ে বিনম্র আরজ করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি আমার পরলোকগত মায়ের রূহের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে দান-সাদাকা করি, তবে কি তা তাঁর পরকালে কোনো উপকারে আসবে? বিশ্বনবী (সা.) ইরশাদ করলেন: “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আসবে।” তখন হযরত সা’দ (রা.) তাঁর অত্যন্ত মূল্যবান একটি ফলবান খেজুরের বাগানের নাম উল্লেখ করে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি সাক্ষী থাকুন, আমি এই বাগানটি আমার মায়ের পক্ষ থেকে আল্লাহর ওয়াস্তে সাদাকা করে দিলাম।

হাদীসের তাৎপর্য ও ফিকহী শিক্ষা:

  • মৃতের পক্ষ থেকে সাদাকা করার অকাট্য দলীল: এই হাদীসটি প্রমাণ করে যে, পিতা-মাতার মৃত্যুর পর সন্তান তাঁদের পক্ষ থেকে দান-সাদাকা ও ওয়াকফ করলে তার পূর্ণ সাওয়াব মৃত পিতা-মাতা অবশ্যই লাভ করেন।
  • হযরত সা’দ (রা.)-এর অনন্য দানশীলতা: তিনি তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান বাগান ‘মিখরাফ’ সাদাকা করে দিয়েছিলেন। সহীহ বুখারী ও নাসায়ীতেও এই ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এমনকি তিনি কূপ খনন করে বলেছিলেন: «هَذِهِ لِأُمِّ سَعْدٍ» (এটি সা’দের মায়ের জন্য সাদাকা)।
  • মাতার আমানতদারী: পুত্রের সম্পদে মাতা অযথা হস্তক্ষেপ করেননি, বরং স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে ধন-সম্পদের প্রকৃত মালিক তাঁর পুত্র সা’দ।

(أ) ما معنى الوصية لغة وشرعا؟ وما حكم الوصية؟ بين-

ওসীয়তের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ এবং শরয়ী হুকুমের বিশদ পর্যালোচনা:

১. ওসীয়তের আভিধানিক অর্থ (الوصية لغة):

‘ওসীয়ত’ (الْوَصِيَّةُ) শব্দটি আরবি ‘ওয়াসা-ইয়াছী’ (وَصَى – يَصِي) অথবা বাবে তাফ’ঈল ‘ওয়াচ্ছা-ইউওয়াতচ্ছী’ (وَصَّى – يُوَصِّي) ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ হলো—

  • সংযুক্ত করা বা মেলানো (الْوَصْلُ): মৃত ব্যক্তি ওসীয়তের মাধ্যমে স্বীয় মৃত্যুর পূর্ববর্তী জীবনের আমলকে মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের সাওয়াবের সাথে সংযুক্ত করে দেয়।
  • আদেশ বা নির্দেশ প্রদান (الْعَهْدُ وَالأَمْرُ): কাউকে কোনো কাজের দায়িত্ব অর্পণ করা বা উপদেশ প্রদান করা। যেমন কুরআনে এসেছে: «يُوصِيكُمُ اللهُ فِي أَوْلَادِكُمْ» (আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন)।

২. ওসীয়তের পারিভাষিক সংজ্ঞা (الوصية شرعا):

ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ওসীয়ত বলা হয়: «تَمْلِيكٌ مُضَافٌ إِلَى مَا بَعْدَ الْمَوْتِ بِطَرِيقِ التَّبَرُّعِ» অর্থাৎ মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার শর্তে কোনো ব্যক্তিকে স্বেচ্ছায় ও নিঃশর্তভাবে কোনো সম্পত্তি বা তার উপস্বত্ব (মুনাফা)-এর মালিক বানিয়ে দেওয়াকে ওসীয়ত বলা হয়। যিনি ওসীয়ত করেন তাঁকে ‘মূসী’ (مُوصِي), যার জন্য করা হয় তাকে ‘মূসা লাহু’ (مُوصَى لَهُ), এবং যে সম্পদ ওসীয়ত করা হয় তাকে ‘মূসা বিহী’ (مُوصَى بِهِ) বলা হয়।

৩. ওসীয়তের শরয়ী হুকুম ও প্রকারভেদ (أحكام الوصية):

শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে ওসীয়ত পরিস্থিতিভেদে পাঁচটি পৃথক হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হয়:

  • ১. ওয়াজিব ওসীয়ত (الْوَاجِبَةُ):

    যদি কোনো ব্যক্তির জিম্মায় আল্লাহর কোনো ফরয হক বাকী থাকে (যেমন অনাদায়ী ফরয যাকাত, হজ্জে বদল, কাফফারা বা মান্নত) অথবা কোনো বান্দার হক অনাদায়ী থাকে (যেমন ঋণ, আমানত বা গচ্ছিত মাল যার কোনো প্রকাশ্য লিখিত প্রমাণ নেই)— তবে মৃত্যুর পূর্বে সেই পাওনা ও হকের স্পষ্ট ওসীয়ত লিখে রেখে যাওয়া শরীয়তের চূড়ান্ত নির্দেশে ফরয ও ওয়াজিব। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «مَا حَقُّ امْرِئٍ مُسْلِمٍ لَهُ شَيْءٌ يُوصِي فِيهِ يَبِيتُ لَيْلَتَيْنِ إِلَّا وَوَصِيَّتُهُ مَكْتُوبَةٌ عِنْدَهُ» অর্থাৎ “যে মুসলমানের কাছে ওসীয়ত করার মতো কোনো হক বা বিষয় রয়েছে, তার জন্য ওসীয়তনামা লিখে নিজের কাছে প্রস্তুত না রেখে দুটি রাত অতিবাহিত করাও বৈধ নয়” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।

  • ২. মুস্তাহাব ওসীয়ত (الْمُسْتَحَبَّةُ):

    যদি কোনো ব্যক্তি সচ্ছল ও ধনবান হয়, তবে সে তার ওয়ারিসদের সচ্ছল রেখে তার মোট পরিত্যক্ত সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের (সুলুস) মধ্য থেকে নিকটাত্মীয়দের জন্য (যারা উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ পায় না) অথবা কোনো দ্বীনী প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা বা সমাজকল্যাণমূলক খাতে দান করার ওসীয়ত করা মুস্তাহাব ও অত্যন্ত পুণ্যময় কাজ।

  • ৩. মুবাহ ওসীয়ত (الْمُبَاحَةُ):

    কোনো ধনী বা সচ্ছল অনাত্মীয় ব্যক্তির অনুকূলে নিজের এক-তৃতীয়াংশ মাল থেকে ওসীয়ত করা মুবাহ বা সাধারণ পর্যায়ের বৈধ কাজ।

  • ৪. মাকরূহ ওসীয়ত (الْمَكْرُوهَةُ):

    যদি কোনো ব্যক্তির সম্পদ খুব সামান্য হয় এবং তার ওয়ারিসগণ দরিদ্র ও অভাবী হয়, তবে এমতাবস্থায় ওয়ারিসদের বঞ্চিত করে বাইরের কোনো মানুষের জন্য ওসীয়ত করা মাকরূহ তানযীহী। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.)-কে বলেছিলেন: «إِنَّكَ أَنْ تَذَرَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَذَرَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ» অর্থাৎ “তুমি তোমার ওয়ারিসদের সচ্ছল ও ধনী অবস্থায় রেখে যাওয়া— তাদেরকে নিঃস্ব ও মানুষের কাছে হাত পাতার মতো অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে বহুগুণ উত্তম” (সহীহ বুখারী: ১২৯৫)।

  • ৫. হারাম ও বাতিল ওসীয়ত (الْمُحَرَّمَةُ وَالْبَاطِلَةُ):

    নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে ওসীয়ত করা সম্পূর্ণ হারাম ও শরীয়তের দৃষ্টিতে বাতিল:

    • কোনো পাপকাজ বা শরীয়তবিরোধী উদ্দেশ্যে ওসীয়ত করা (যেমন মদের কারখানা, জুয়ার আড্ডা বা অনৈসলামিক কাজের জন্য)।
    • উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার অসৎ উদ্দেশ্যে ওসীয়ত করা। আল্লাহ তা’আলা বলেন: «مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصَى بِهَا أَوْ دَيْنٍ غَيْرَ مُضَارٍّ» (সূরা আন-নিসা: ১২)।
    • ওয়ারিসদের অনুমতি ব্যতীত সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের (১/৩) অধিক ওসীয়ত করা।
    • শরীয়তসম্মত কোনো বৈধ ওয়ারিসের অনুকূলে ওসীয়ত করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজ্জের ভাষণে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন: «إِنَّ اللهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ، فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ» অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক হকদারকে তার ন্যায্য অধিকার দান করেছেন; অতএব কোনো ওয়ারিসের জন্য নতুন করে কোনো ওসীয়ত করা বৈধ নয়” (সুনানে আবু দাউদ, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ)।

مجموعة (ج) — المستدرك للحاكم (আল-মুস্তাদরাক লিল-হাকিম)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)


٧- أَخْبَرَنِي أَبُو جَعْفَرٍ مُحَمَّدُ بْنُ حَاتِمٍ الْكَشِّيُّ ثَنَا عَبْدُ بْنُ حُمَيْدٍ أَنْبَأَ أَبُو عَاصِمٍ عَنْ عَزْرَةَ بْنِ ثَابِتٍ حَدَّثَنِي عِلْبَاءُ بْنُ أَحْمَرَ الْيَشْكُرِيُّ عَنْ أَبِي زَيْدٍ قَالَ: قَالَ لِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا أَبَا زَيْدٍ ادْنُ فَامْسَحْ ظَهْرِي» قَالَ: فَدَنَوْتُ مِنْهُ وَمَسَحْتُ ظَهْرَهُ وَوَضَعْتُ أَصَابِعِي عَلَى الْخَاتَمِ فَغَمَزْتُهَا فَقِيلَ لَهُ: وَمَا الْخَاتَمُ؟ قَالَ: «شَعْرٌ مُجْتَمِعٌ عِنْدَ كَتِفَيْهِ» – هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحُ الْإِسْنَادِ وَلَمْ يُخْرِجَاهُ-

[৭. আবু জা’ফর মুহাম্মদ ইবনে হাতিম আল-কাশ্শী আমাকে সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন আব্দ ইবনে হুমাইদ আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন আবু আসিম আমাদের আযরাহ ইবনে সাবিত থেকে সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন ইলবা ইবনে আহমার আল-য়াশকুরী আমার কাছে আবু যায়দ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন: “হে আবু যায়দ! নিকটে এসো এবং আমার পিঠ স্পর্শ কর।” তিনি বলেন: অতঃপর আমি তাঁর নিকটে গেলাম এবং তাঁর পিঠ স্পর্শ করলাম এবং মোহরে নবুওয়াতের ওপর আমার অঙ্গুলি স্থাপন করে তা মৃদু চাপ দিলাম। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো: মোহরে নবুওয়াতটি কী ছিল? তিনি বললেন: “উভয় কাঁধের সন্নিকটে একত্রিত কেশগুচ্ছ।” — ইমাম হাকিম বলেন: এই হাদীসটি সহীহ সনদে বর্ণিত, অথচ ইমাম বুখারী ও মুসলিম তা সংকলন করেননি।]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: সাহাবী হযরত আবু যায়দ আমর ইবনে আখতাব আল-আনসারী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্নেহভরে আমাকে ডেকে বললেন: “হে আবু যায়দ! আমার কাছে এসো এবং আমার পিঠে হাত বোলাও।” আবু যায়দ (রা.) বলেন: অতঃপর আমি নবীজীর একান্ত নিকটে উপস্থিত হয়ে পরম ভক্তিতে তাঁর পিঠ মুবারকে হাত বোলালাম এবং আমার আঙুলগুলো তাঁর নবুওয়াতের মোহরের ওপর রেখে আলতোভাবে স্পর্শ ও চাপ অনুভব করলাম। পরবর্তীতে উপস্থিত লোকজন আবু যায়দ (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করল: নবুওয়াতের মোহরটি কেমন ছিল? তিনি বললেন: “তা ছিল নবীজীর উভয় স্কন্ধের (কাঁধের) মধ্যবর্তী স্থানে একগুচ্ছ পুঞ্জীভূত ঘন কেশ ও শুভ্র ত্বকের সমন্বিত অলৌকিক নিদর্শন।” [ইমাম হাকিম নিশাপুরী বলেন: এটি সহীহ সনদে বর্ণিত হাদীস, তবে শায়খাইন (বুখারী ও মুসলিম) এটি নিজ গ্রন্থে সংকলন করেননি]。

হাদীসের রাবী ও সনদ পর্যালোচনা:

  • ইমাম হাকিম নিশাপুরী (রহ.): গ্রন্থের সংকলক, প্রখ্যাত হাফিয আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ আন-নিশাপুরী (মৃত্যু ৪০৫ হিজরী)।
  • আবু জা’ফর মুহাম্মদ ইবনে হাতিম আল-কাশ্শী: সমকালীন নির্ভরযোগ্য প্রবীণ মুহাদ্দিস।
  • আব্দ ইবনে হুমাইদ: প্রখ্যাত ইমাম ও ‘মুসনাদে আব্দ ইবনে হুমাইদ’-এর প্রণেতা (মৃত্যু ২৪৯ হিজরী)।
  • আবু আসিম আন-নাবীল: যাহহাক ইবনে মাখলাদ, সিহাহ সিত্তাহর বিশ্বখ্যাত উস্তাদ ও নির্ভরযোগ্য হাফিয।
  • আযরাহ ইবনে সাবিত আল-আনসারী: বসরার বিশ্বস্ত ছিক্বাহ রাবী।
  • ইলবা ইবনে আহমার আল-য়াশকুরী: বসরার প্রখ্যাত তাবে’ঈ।
  • হযরত আবু যায়দ আল-আনসারী (রা.): আমর ইবনে আখতাব আল-আনসারী, জলীলুল কদর সাহাবী। তাঁর জন্য নবীজী দু’আ করেছিলেন, ফলে শতবর্ষ বয়সেও তাঁর চুল-দাড়ি কাঁচা ছিল।
  • ইমাম যাহাবীর মূল্যায়ন: ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী তাঁর ‘আত-তালখীস’ গ্রন্থে ইমাম হাকিমের এই হুকুম সমর্থন করে বলেছেন: «صَحِيحٌ» (হাদীসটি বিশুদ্ধ)।

হাদীসের শব্দার্থ ও তাৎপর্য:

  • ادْنُ: ‘দানা-ইয়াদ্নূ’ থেকে ফেলে আমর, অর্থ কাছে এসো, নিকটে হও। সাহাবীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অতুলনীয় স্নেহ ও অমায়িক ব্যবহারের বহিঃপ্রকাশ।
  • فَغَمَزْتُهَا: ‘গামাযতুহা’ অর্থ আমি তা মৃদু চাপ দিলাম বা আঙুল দিয়ে স্পর্শের গভীর অনুভূতি নিলাম। এটি সাহাবীর অপরিসীম বরকত অর্জনের অনুপম দৃষ্টান্ত।
  • الْخَاتَمُ: খাতামুন নবুওয়াত (خَاتَمُ النُّبُوَّةِ) বা নবুওয়াতের অলৌকিক মোহরচিহ্ন।

(أ) ماذا تعرف عن الخاتم؟ بين آراء المحدثين والمؤرخين عن مكانه وصورته-

খাতামুন নবুওয়াতের বিস্তারিত পরিচয় এবং মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণের বিশ্লেষণ:

১. খাতামুন নবুওয়াতের পরিচয় ও তাৎপর্য:

‘খাতামুন নবুওয়াত’ (خَاتَمُ النُّبُوَّةِ) বা নবুওয়াতের মোহর হলো শেষ নবী ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র শরীরে প্রস্ফুটিত এক স্থায়ী, জীবন্ত ও অলৌকিক নিদর্শন। এটি আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে তাঁর সর্বশেষ নবী হওয়ার অকাট্য সিলমোহর। পূর্ববর্তী সকল আসমানী কিতাব—তাওরাত ও ইঞ্জীলে শেষ নবীর যে শারীরিক বৈশিষ্ট্যসমূহ লিপিবদ্ধ ছিল, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান আলামত ছিল এই নবুওয়াতের মোহর। এই মোহর প্রত্যক্ষ করেই শাম দেশের পাদ্রী বুহাইরা (বাহীরা রাহেব) বাল্যকালে নবীজীকে চিনেছিলেন এবং প্রখ্যাত সাহাবী হযরত সালমান ফারেসী (রা.) দাসত্ব থেকে মুক্তি ও ইসলাম গ্রহণের পূর্বে এটি স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করে চূড়ান্ত ঈমান এনেছিলেন।

২. খাতামুন নবুওয়াতের সুনির্দিষ্ট অবস্থান (مكانه):

মুহাদ্দিসীন ও সীরাত গবেষক ঐতিহাসিকগণের সর্বসম্মত বর্ণনা অনুযায়ী খাতামুন নবুওয়াত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র পিঠ মুবারকের উপরিভাগে অবস্থিত ছিল। তবে এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন সহীহ বর্ণনার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:

  • উভয় স্কন্ধের মধ্যবর্তী স্থানে: জমহুর মুহাদ্দিসীনের মতে এটি ছিল দুই কাঁধের ঠিক মাঝামাঝি স্থানে (بَيْنَ كَتِفَيْهِ)। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বহু হাদীসে স্পষ্ট এসেছে: «رَأَيْتُ الْخَاتَمَ بَيْنَ كَتِفَيْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ» (আমি রাসূলুল্লাহ সা.-এর উভয় কাঁধের মাঝে মোহর দেখেছি)।
  • বাম কাঁধের সন্নিকটে: ইমাম কুরতুবী ও হাফিয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহ.) বিভিন্ন হাদীসের সমন্বয় করে বলেন, মোহরটি পিঠের মাঝামাঝি হলেও বাম কাঁধের উপরের হাড়ের কাছে একটু ঢালু হয়ে অবস্থিত ছিল (عِنْدَ نُغْضِ كَتِفِهِ الْأَيْسَرِ)। এর হিকমত হলো— মানবদেহের হৃদপিণ্ড (ক্বলব) বাম পার্শ্বে অবস্থিত; অতএব অন্তরে শয়তানের প্ররোচনা ও ওয়াসওয়াসার প্রবেশপথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে দিয়ে খোদায়ী নিরাপত্তার সিল হিসেবে মোহরটি ঠিক হৃদপিণ্ডের পেছনের পিঠে স্থাপন করা হয়েছিল।

৩. খাতামুন নবুওয়াতের রূপ ও আকৃতি (صورته وصفته):

মুহাদ্দিসীন ও সাহাবায়ে কিরামের চাক্ষুষ বর্ণনা অনুযায়ী এর রূপ ও সৌন্দর্যের বিবরণ নিম্নরূপ:

  • ১. কবুতরের ডিমের ন্যায় স্ফীত মাংসপিণ্ড: হযরত সায়েব ইবনে ইয়াযীদ (রা.) বলেন: «وَنَظَرْتُ إِلَى خَاتَمِ النُّبُوَّةِ بَيْنَ كَتِفَيْهِ مِثْلَ زِرِّ الْحَجَلَةِ أَوْ مِثْلَ بَيْضَةِ الْحَمَامَةِ» অর্থাৎ “আমি নবীজীর কাঁধের মাঝে নবুওয়াতের মোহর প্রত্যক্ষ করেছি, যা ছিল কবুতরের ডিমের মতো বা হুজরার বোতামের মতো কিছুটা স্ফীত মাংসপিণ্ড” (সহীহ বুখারী: ৩৫৪১; সহীহ মুসলিম: ২৩৪৫)।
  • ২. পুঞ্জীভূত কালো কেশগুচ্ছ: আলোচ্য মুস্তাদরাকে হাকিমের বর্ণনায় আবু যায়দ (রা.) বলেছেন: «شَعْرٌ مُجْتَمِعٌ» অর্থাৎ সেই মাংসপিণ্ডের ওপর একত্রিত ছোট ছোট ঘন চুলের গুচ্ছ ছিল, যা দূর থেকে দেখলে উজ্জ্বল তিলকের মতো শোভা পেত।
  • ৩. বন্ধ মুষ্টির মতো: হযরত জাবির ইবনে সামুরাহ (রা.) বলেন: «رَأَيْتُ الْخَاتَمَ عِنْدَ كَتِفِهِ مِثْلَ غُدَّةٍ حَمْرَاءَ مِثْلَ بَيْضَةِ الْحَمَامَةِ» অর্থাৎ “তা ছিল লালচে রঙের মাংসগ্রন্থির মতো, যা কবুতরের ডিমের সমান উঁচু” (সহীহ মুসলিম)।
  • ৪. লিখিত দাবির তাহকীক: কোনো কোনো দুর্বল রেওয়ায়েতে মোহরের ভেতর ‘আল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু’ বা ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ লিখিত থাকার কথা বলা হলেও হাফিয ইবনে হাজার, ইমাম বায়হাক্বী ও ইবনে হিব্বান (রহ.) দৃঢ়তার সাথে প্রমাণ করেছেন যে, লিখিত হওয়ার কোনো বর্ণনা সহীহ সনদে সাব্যস্ত নয়; বরং তা ছিল জন্মগত ও কুদরতীভাবে গঠিত লালচে মাংসপিণ্ড ও কেশগুচ্ছের এক অনুপম মোহরচিহ্ন।

৪. ওফাতের পর মোহর অদৃশ্য হয়ে যাওয়া:

মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পরপরই সেই অলৌকিক মোহরে নবুওয়াত শরীর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। সাহাবীগণ এই অলৌকিক রূপান্তর প্রত্যক্ষ করেই নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, ওহীর চির সমাপ্তি ঘটেছে এবং তিনি ইহধাম ত্যাগ করে রফীকে আ’লার সান্নিধ্যে গমন করেছেন।


٨- أَخْبَرَنِي أَبُو الطَّيِّبِ مُحَمَّدُ بْنُ أَحْمَدَ الْحِيرِيُّ ثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الْوَهَّابِ ثَنَا يَعْلَى بْنُ عُبَيْدٍ ثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ إِسْحَاقَ عَنْ سَعِيدِ بْنِ أَبِي سَعِيدٍ الْمَقْبُرِيِّ عَنْ عَطَاءٍ مَوْلَى أُمِّ حَبِيبَةَ قَالَ: سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَيَهْبِطَنَّ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَدْلًا وَإِمَامًا مُقْسِطًا وَلَيَسْلُكَنَّ فَجًّا حَاجًّا أَوْ مُعْتَمِرًا أَوْ بِنِيَّتِهِمَا وَلَيَأْتِيَنَّ قَبْرِي حَتَّى يُسَلِّمَ عَلَيَّ وَلَأَرُدَّنَّ عَلَيْهِ» – يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ: أَيْ بَنِي أَخِي إِنْ رَأَيْتُمُوهُ فَقُولُوا: أَبُو هُرَيْرَةَ يُقْرِئُكَ السَّلَامَ-

[৮. আবু তায়্যিব মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল-হীরী আমাকে সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন ইয়া’লা ইবনে উবাইদ আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক সাঈদ ইবনু আবী সাঈদ আল-মাক্ববুরী থেকে আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি উম্মে হাবীবাহর আযাদকৃত গোলাম আত্বা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-কে বলতে শুনেছি: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “অবশ্যই মরিয়ম তনয় ঈসা (আ.) ন্যায়পরায়ণ শাসক ও সুবিচারক ইমাম হিসেবে অবতরণ করবেন। তিনি হজ্জ বা উমরাহ অথবা উভয়ের নিয়তে কোনো উপত্যকা দিয়ে গমন করবেন। আর তিনি অবশ্যই আমার রওজায় আসবেন এবং আমাকে সালাম পেশ করবেন, আর আমিও অবশ্যই তাঁর সালামের জবাব দেব।” — অতঃপর আবু হুরায়রা (রা.) উপস্থিত লোকদের সম্বোধন করে বললেন: হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্রগণ! তোমরা যদি তাঁকে দেখতে পাও, তবে বলবে: আবু হুরায়রা আপনাকে সালাম পৌঁছিয়েছেন।]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “আল্লাহর শপথ! মরিয়ম-তনয় ঈসা (আলাইহিস সালাম) অবশ্যই পৃথিবীতে একজন ন্যায়পরায়ণ বিচারক ও সুবিচারক ইমাম হিসেবে অবতরণ করবেন। তিনি হজ্জ অথবা উমরাহ অথবা উভয়ের সম্মিলিত নিয়ত করে গিরিপথ অতিক্রম করবেন। আর তিনি নিশ্চয়ই আমার কবরের (রওজা মুবারকের) সন্নিকটে এসে আমাকে সালাম নিবেদন করবেন এবং আমিও অবিকল তাঁর সালামের জবাব প্রদান করব।” এ কথা বলার পর হযরত আবু হুরায়রা (রা.) তাঁর শিষ্য ও উত্তরসূরীদের বললেন: “ওহে আমার ভাতিজাগণ! তোমরা যদি তোমাদের জীবদ্দশায় হযরত ঈসা (আ.)-এর সাক্ষাৎ লাভ করো, তবে তাঁকে বলবে— আবু হুরায়রা আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন!”

হাদীসের রাবী ও তাহকীক:

  • আবু তায়্যিব আল-হীরী: নিশাপুরের প্রখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য শায়খ।
  • মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব: আবু আলী আল-ফাররা আন-নিশাপুরী, বিশ্বস্ত মুহাদ্দিস।
  • ইয়া’লা ইবনে উবাইদ আত-ত্বানাফিসী: কূফার প্রখ্যাত হাফিযে হাদীস।
  • মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক: প্রখ্যাত ইমাম, এখানে তিনি সুস্পষ্ট বর্ণনার ঘোষণা দিয়েছেন।
  • সাঈদ আল-মাক্ববুরী ও আত্বা: মদীনার নির্ভরযোগ্য তাবে’ঈন।
  • হাদীসটির হুকুম: ইমাম হাকিম নিশাপুরী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন এবং ইমাম যাহাবীও তা সমর্থন করেছেন। সহীহ মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদেও এর সমর্থক রেওয়ায়াত মওজুদ রয়েছে।

হাদীসের শব্দার্থ ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

  • لَيَهْبِطَنَّ: লামে তাকিদ এবং নূনে তাকিদে সাক্বীলাহ যুক্ত হয়ে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ অর্থ প্রদান করেছে— অর্থাৎ অবশ্যই অবশ্যই তিনি অবতরণ করবেন। এটি ঈসা (আ.)-এর আগমনের অকাট্য দলীল।
  • حَكَمًا عَدْلًا: ন্যায়পরায়ণ ফয়সালাকারী ও শাসক। তিনি নতুন কোনো শরীয়ত নিয়ে আসবেন না, বরং মুহাম্মদ (সা.)-এর আনীত ইসলামী শরীয়তের ভিত্তিতে বিশ্ব পরিচালনা করবেন।
  • وَلَأَرُدَّنَّ عَلَيْهِ: আমি তাঁর সালামের জবাব দেব। এটি প্রমাণ করে যে নবী করীম (সা.) স্বীয় রওজা মুবারকে জীবিত এবং পেশকৃত সালাম সরাসরি শ্রবণ ও প্রত্যুত্তর দান করেন।
  • أَيْ بَنِي أَخِي: ওহে আমার ভাতিজাগণ! স্নেহের সম্বোধন। সাহাবীগণের নবীজীর বাণীর প্রতি অবিচল বিশ্বাসের অপূর্ব প্রতিফলন।

(أ) تحدث عن ولادة عيسى عليه السلام ورفعه إلى السماء ونزوله إلى الأرض قبل يوم القيامة موجزا-

হযরত ঈসা (আ.)-এর অলৌকিক জন্ম, আকাশে উত্তোলন এবং ক্বিয়ামতের পূর্বে অবতরণের সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

১. হযরত ঈসা (আ.)-এর অলৌকিক জন্ম (ولادته):

হযরত ঈসা (আলাইহিস সালাম) ছিলেন বনী ইসরাঈলের সর্বশেষ নবী ও রাসূল। আল্লাহ তা’আলা তাঁর কুদরতের পরম নিদর্শন হিসেবে কোনো পুরুষের স্পর্শ বা পিতা ব্যতিরেকেই কেবল সতী-সাধ্বী ও পুণ্যময়ী কুমারী মাতা হযরত মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর গর্ভ থেকে তাঁকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা’আলা হযরত জিবরীল (আ.)-কে প্রেরণ করেন এবং জিবরীল (আ.) মারইয়ামের পরিধেয় বস্ত্রে রূহ ফুৎকার করেন, যার ফলে আল্লাহর হুকুমে মারইয়াম (আ.) গর্ভধারণ করেন (সূরা মারইয়াম: ১৬-২২)। সন্তান প্রসবের পর যখন জাতি মারইয়ামের চরিত্রের ওপর অপবাদ আরোপ করতে চাইল, তখন সদ্যজাত শিশু হযরত ঈসা (আ.) দোলনায় থেকেই অলৌকিকভাবে কথা বলে উঠলেন: «قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا» অর্থাৎ “তিনি বললেন: নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর বান্দা, তিনি আমাকে কিতাব (ইঞ্জীল) দান করেছেন এবং আমাকে নবী মনোনীত করেছেন” (সূরা মারইয়াম: ৩০)।

২. জীবিতাবস্থায় সশরীরে আকাশে উত্তোলন (رفعه إلى السماء):

হযরত ঈসা (আ.) যখন বনী ইসরাঈলকে তাওহীদের দাওয়াত দেন, তখন ঈর্ষান্বিত ইয়াহূদী ধর্মনেতারা তাঁর বিরুদ্ধে রোমান গভর্নরের কাছে মিথ্যা অভিযোগ আনে এবং তাঁকে হত্যার চক্রান্ত করে। তারা যখন তাঁকে হত্যা করার জন্য তাঁর অবস্থানস্থলে প্রবেশ করল, তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁর অসীম কুদরতে বিশ্বাসঘাতক এক ব্যক্তিকে ঈসা (আ.)-এর হুবহু আকৃতিবিশিষ্ট বানিয়ে দেন, ফলে রোমান সৈন্যরা তাকেই ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করে। আর আল্লাহ তা’আলা হযরত ঈসা (আ.)-কে সশরীরে ও জীবিতাবস্থায় দ্বিতীয় আসমানে উঠিয়ে নেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা ইয়াহূদীদের দাবি খণ্ডন করে স্পষ্ট ইরশাদ করেন: «وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِن شُبِّهَ لَهُمْ… بَل رَّفَعَهُ اللهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللهُ عَزِيزًا حَكِيمًا» অর্থাৎ “অথচ তারা তাঁকে হত্যা করেনি এবং তাঁকে ক্রুশবিদ্ধও করেনি, বরং তাদের জন্য এক সাদৃশ্য সৃষ্টি করা হয়েছিল… বরং আল্লাহ তাঁকে নিজের সান্নিধ্যে (আসমানে) উঠিয়ে নিয়েছেন, আর আল্লাহ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়” (সূরা আন-নিসা: ১৫৭-১৫৮)।

৩. ক্বিয়ামতের পূর্বে পৃথিবীতে অবতরণ (نزوله إلى الأرض):

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের আক্বীদা অনুযায়ী ক্বিয়ামতের অন্যতম প্রধান মহানিদর্শন হলো হযরত ঈসা (আ.)-এর পৃথিবীতে পুনরায় অবতরণ। সহীহ হাদীসের মুতাওয়াতির বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর অবতরণের রূপরেখা নিম্নরূপ:

  • অবতরণের স্থান ও সময়: যখন মুসলিম বাহিনী ইমাম মাহদীর নেতৃত্বে দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবে, ঠিক সেই সময় ফজরের নামাযের প্রাক্কালে হযরত ঈসা (আ.) সিরিয়ার দামেশক নগরীর পূর্বদিকের শুভ্র মিনারে দুই ফেরেশতার ডানায় ভর করে জাফরানী রঙের পোশাকে অবতরণ করবেন।
  • ইমাম মাহদীর পেছনে নামায: ইমাম মাহদী তাঁকে নামাযে ইমামতি করার অনুরোধ জানালে তিনি উম্মতে মুহাম্মাদীর সম্মানে তা প্রত্যাখ্যান করে মুক্তাদী হিসেবে ফজর নামায আদায় করবেন, যা প্রমাণ করবে তিনি নতুন কোনো নবী নন, বরং উম্মতে মুহাম্মাদীর একজন অনুসারী হিসেবে এসেছেন।
  • দাজ্জাল নিধন ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা: তিনি বাবে লুদ (বর্তমান ফিলিস্তিনের লুদ শহর)-এর নিকটে পৌঁছে ভয়ংকর ফিতনা সৃষ্টিকারী অভিশপ্ত দাজ্জালকে হত্যা করবেন। তিনি ক্রুশ ভেঙে চূর্ণ করবেন, শূকর নিধন করবেন, অমুসলিমদের ওপর থেকে জিযিয়া ব্যবস্থা রহিত করবেন (ইসলাম গ্রহণ অথবা যুদ্ধ ব্যতীত অন্য কিছু গৃহীত হবে না) এবং সমগ্র পৃথিবীতে তাওহীদ ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। এমন শান্তি বর্ষিত হবে যে বিষধর সাপ শিশুদের সাথে খেলবে, নেকড়ে ও মেষ একসাথে চড়বে।
  • হজ্জ সম্পাদন ও ওফাত: তিনি হজ্জ ও উমরাহ পালন করবেন, মদীনা মুনাওয়ারায় এসে নবীজীর রওজায় সালাম পেশ করবেন। অবতরণের পর তিনি পৃথিবীতে ৪০ বছর অবস্থান করবেন। অতঃপর স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করবেন এবং মুসলমানগণ তাঁর জানাযা পড়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা মুবারকের অভ্যন্তরে তাঁরই পাশে তাঁকে দাফন করবেন।

٩- عَنْ أَبِي أَيُّوبَ وَمَعْمَرٍ وَالنُّعْمَانِ بْنِ رَاشِدٍ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ عُرْوَةَ عَنْ عَائِشَةَ (رَضِيَ اللهُ عَنْهَا) قَالَتْ: مَا لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُسْلِمًا مِنْ لَعْنَةٍ تُذْكَرُ وَلَا ضَرَبَ بِيَدِهِ شَيْئًا قَطُّ إِلَّا أَنْ يُسْأَلَ مَأْثَمًا كَانَ أَبْعَدَ النَّاسِ مِنْهُ وَلَا انْتَقَمَ لِنَفْسِهِ مِنْ شَيْءٍ قَطُّ يُؤْتَى إِلَيْهِ إِلَّا أَنْ تُنْتَهَكَ حُرُمَاتُ اللهِ فَيَكُونَ لِلَّهِ يَنْتَقِمُ وَلَا خُيِّرَ بَيْنَ أَمْرَيْنِ قَطُّ إِلَّا اخْتَارَ أَيْسَرَهُمَا-

[৯. আবু আইয়ূব, মা’মার এবং নু’মান ইবনে রাশিদ থেকে বর্ণিত, তাঁরা যুহরী থেকে, তিনি উরওয়াহ থেকে, তিনি হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কোনো মুসলমানকে স্মরণ রাখার মতো কোনো অভিশাপ দেননি; আর তিনি কখনো নিজ হাতে কাউকে কোনো প্রহার করেননি। যখনই তাঁর কাছে কোনো গুনাহের বিষয়ে আবেদন করা হতো, তিনি তা থেকে মানবজাতির মধ্যে সর্বাধিক দূরে অবস্থান করতেন। আর কখনো তাঁর ওপর কোনো অবিচার বা কষ্ট আরোপিত হলে তিনি ব্যক্তিগত কারণে কারো থেকে কোনো প্রতিশোধ নেননি; তবে আল্লাহর কোনো বিধান ও পবিত্রতা লঙ্ঘিত হলে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতেন। আর যখনই তাঁকে দুটি বিষয়ের মধ্য থেকে কোনো একটি বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হতো, তিনি সর্বদা তার মধ্য থেকে সহজতম বিষয়টি গ্রহণ করতেন।]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কোনো মুসলমানকে উল্লেখ করার মতো কোনো অভিশাপ দেননি; তিনি স্বীয় হাত দিয়ে কোনো মানুষকে বা প্রাণীকে কখনো একটি আঘাতও করেননি; গুনাহ ও পাপাচারের কোনো বিষয় সামনে এলে তিনি সমগ্র মানবজাতির মধ্যে তা থেকে সর্বাধিক দূরে থাকতেন; নিজের ব্যক্তিত্বের ওপর আঘাত বা কোনো অন্যায়ের কারণে তিনি জীবনে কখনো কারো থেকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি, তবে আল্লাহর কোনো পবিত্র বিধান লঙ্ঘিত হলে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির স্বার্থে উপযুক্ত শাস্তি ও সুবিচার নিশ্চিত করতেন; আর যখনই তাঁর সামনে দুটি বিষয়ের যেকোনো একটি পছন্দের সুযোগ আসত, তিনি সর্বদাই তার মধ্যে সহজতর পথটি বেছে নিতেন (যদি না তাতে কোনো গুনাহ থাকত)।”

হাদীসের তাৎপর্য ও ব্যাকরণিক রূপ:

  • مَا لَعَنَ: তিনি কখনো অভিশাপ দেননি। অভিশাপ হলো আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকার বদদোয়া। নবীজী প্রেরিত হয়েছিলেন ‘রহমাতুল্লিল আলামীন’ বা বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ।
  • وَلَا ضَرَبَ بِيَدِهِ شَيْئًا: তিনি নিজ হাতে কাউকে প্রহার করেননি। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় হযরত আয়েশা (রা.) স্পষ্ট করেছেন: «مَا ضَرَبَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَيْئًا قَطُّ بِيَدِهِ، وَلَا امْرَأَةً، وَلَا خَادِمًا، إِلَّا أَنْ يُجَاهِدَ فِي سَبِيلِ اللهِ» অর্থাৎ তিনি কোনো স্ত্রী, ভৃত্য বা কাউকে আঘাত করেননি, কেবল জিহাদের ময়দানে শত্রু ছাড়া।
  • إِلَّا أَنْ تُنْتَهَكَ حُرُمَاتُ اللهِ: যদি না আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘিত হয়। এটি মুমিনের ক্রোধের মানদণ্ড— নিজের জন্য নয়, কেবল দ্বীন ও ইনসাফের জন্য ক্রোধ।
  • إِلَّا اخْتَارَ أَيْسَرَهُمَا: সহজতরটি বেছে নিতেন। এটি ইসলামী শরীয়তের ‘তাইসীর’ বা সহজীকরণের মূলনীতি।

(أ) بين أخلاق النبي صلى الله عليه وسلم في ضوء الحديث-

হাদীসের আলোকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুমহান চারিত্রিক গুণাবলী:

১. কুরআনী চরিত্রের মূর্ত প্রতীক:

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-কে যখন নবী করীম (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন: «كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ» অর্থাৎ “পবিত্র কুরআনই ছিল তাঁর চরিত্র।” অর্থাৎ কুরআনের সমস্ত আদেশ-নিষেধ ও নৈতিক সৌন্দর্যের বাস্তব জীবন্ত রূপ ছিলেন বিশ্বনবী (সা.)। আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং তাঁর চারিত্রিক বিশালতা ঘোষণা করে বলেছেন: «وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ» অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত” (সূরা আল-কলম: ৪)। আলোচ্য হাদীসটিতে সেই সুমহান চরিত্রের পাঁচটি প্রধান দিক উন্মোচিত হয়েছে:

২. অভিশাপমুক্ত স্নেহশীল হৃদয় (কখনো বদদো’আ না করা):

নবী করীম (সা.) ছিলেন নিখিল বিশ্বের শান্তি ও দয়ার আধার। চরম শত্রুর প্রতিও তিনি অভিশাপ নিক্ষেপ করতেন না। সহীহ মুসলিমে এসেছে, একবার সাহাবীগণ আরজ করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের বিরুদ্ধে বদদো’আ করুন! তিনি উত্তর দিলেন: «إِنِّي لَمْ أُبْعَثْ لَعَّانًا، وَإِنَّمَا بُعِثْتُ رَحْمَةً» অর্থাৎ “আমাকে অভিশাপকারী রূপে পাঠানো হয়নি; বরং আমি কেবল রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছি।” তায়েফের ময়দানে রক্তে রঞ্জিত হয়েও তিনি ফেরেশতাদের দিয়ে তায়েফবাসীকে ধ্বংস করতে সম্মত হননি; বরং দু’আ করেছিলেন: “হে আল্লাহ! এদের ক্ষমা করুন, এরা জানে না; আমি আশা করি এদের বংশধরদের মধ্য থেকে একত্ববাদী মুসলিম বের হবে।”

৩. চরম কোমলতা ও অহিংসা (কাউকে প্রহার না করা):

নবীজী (সা.) পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে কখনো কারো ওপর হাত তোলেননি। দীর্ঘ দশ বছর নবীজীর সার্বক্ষণিক খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) সাক্ষ্য দিয়ে বলেন: “আমি দশ বছর নবীজীর খেদমত করেছি। আল্লাহর শপথ! তিনি কখনো আমাকে ‘উহ’ বা ‘উফ’ শব্দটুকুও বলেননি, কোনো কাজ করলে কখনো বলেননি ‘কেন করলে?’, আর কোনো কাজ না করলে কখনো ধমক দিয়ে বলেননি ‘কেন করলে না?’” স্ত্রীগণের সাথে তাঁর আচরণ ছিল বিশ্বের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ কোমল ও মর্যাদাপূর্ণ।

৪. ব্যক্তিগত স্বার্থ ও অপমানের প্রতিশোধ না নেওয়া (ক্ষমাশীলতা):

নবী করীম (সা.)-এর চরিত্রের অন্যতম সেরা ভূষণ ছিল পরম ক্ষমা। ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে তিনি জীবনে কোনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক দিনে যখন চরম অত্যাচারী কুরাইশ নেতারা ভয়ে কাঁপছিল, যারা নবীজীকে মক্কা থেকে বিতাড়িত করেছিল, সাহাবীদের নির্মমভাবে শহীদ করেছিল— তখন বিশ্বনবী (সা.) এক ঐতিহাসিক সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বলেছিলেন: «لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ، يَغْفِرُ اللهُ لَكُمْ، وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ، اذْهَبُوا فَأَنْتُمُ الطُّلَقَاءُ» অর্থাৎ “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই; আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন, আর তিনি শ্রেষ্ঠ দয়ালু। যাও, তোমরা সবাই আজ মুক্ত স্বাধীন!”

৫. আল্লাহর সীমারেখা রক্ষায় আপসহীন ও ন্যায়পরায়ণ:

নবী করীম (সা.) ব্যক্তিগত বিষয়ে ক্ষমাশীল হলেও আল্লাহর বিধান, দ্বীনের পবিত্রতা ও নির্যাতিত মানুষের অধিকারের প্রশ্নে ছিলেন লৌহকঠিন ও আপসহীন। মাখযূম গোত্রের এক কুরাইশ নারী চুরির অপরাধে ধরা পড়লে বিশিষ্ট সাহাবী উসামা ইবনে যায়দ (রা.) সুপারিশ করতে এসেছিলেন। এতে নবীজী (সা.) চরম অসন্তুষ্ট হয়ে লালবর্ণ ধারণ করেন এবং ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন: “তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছিল এই কারণে যে, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হতো আর দুর্বল মানুষ অপরাধ করলে শাস্তি দেওয়া হতো। আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, তবে মুহাম্মাদ তার হাতও কেটে ফেলার নির্দেশ দিত!”

৬. উম্মতের কল্যাণার্থে সহজ পন্থা অবলম্বন:

নবী করীম (সা.) তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে এবং উম্মতের জন্য শরীয়তের বিধানাবলীতে সবসময় সহজ পথকে অগ্রাধিকার দিতেন। তিনি অতিরিক্ত কঠোরতা, বৈরাগ্য ও বাড়াবাড়িকে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করতেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন: «يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا» অর্থাৎ “তোমরা মানুষের জন্য সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, মানুষকে বীতশ্রদ্ধ ও দূরে ঠেলে দিও না” (সহীহ বুখারী)।


مجموعة (د) — الأسئلة العامة / المقالية (সাধারণ তাত্ত্বিক ও রচনামূলক প্রশ্নাবলী)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (أجب عن الأسئلة الآتية)


١٠- اُكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ أَحْوَالِ أَبِي عَبْدِ اللهِ الْحَاكِمِ النَّيْسَابُورِيِّ مَعَ بَيَانِ مَكَانَةِ كِتَابِهِ «الْمُسْتَدْرَكِ» بَيْنَ كُتُبِ الْحَدِيثِ-

[১০. ইমাম আবু আব্দুল্লাহ আল-হাকিম আন-নিশাপুরী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবন ও কর্ম আলোচনা কর এবং হাদীসের কিতাবসমূহের মাঝে তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘আল-মুস্তাদরাক’-এর মর্যাদা ও অবস্থান সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা কর।]

১. ইমাম হাকিম নিশাপুরী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত:

  • নাম ও বংশ পরিচয়: তাঁর পূর্ণ নাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হামদওয়াইহ ইবনে নু’আইম আদ-দাব্বী আত-তাহমানী আন-নিশাপুরী। তাঁর উপনাম ‘আবু আব্দুল্লাহ’ এবং বিশ্বজুড়ে তিনি «الْحَاكِمُ النَّيْسَابُورِيُّ» (আল-হাকিম আন-নিশাপুরী) নামে সমধিক পরিচিত। ‘হাকিম’ শব্দের অর্থ বিচারক; তিনি যৌবনে দীর্ঘকাল নিশাপুর ও পার্শ্ববর্তী শহরের প্রধান বিচারপতির (ক্বাযী) দায়িত্ব অত্যন্ত সুনামের সাথে পালন করেছিলেন বিধায় তাঁর নামের সাথে ‘আল-হাকিম’ উপাধি চিরস্থায়ী রূপ লাভ করে। এছাড়া হাদীস শাস্ত্রে ‘হাকিম’ বলা হয় সেই সুউচ্চ স্তরের মুহাদ্দিসকে, যাঁর জ্ঞান হাদীসের অধিকাংশ স্তরকে পরিবেষ্টন করে।
  • জন্ম ও শৈশব: তিনি ৩২১ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে খোরাসানের বিখ্যাত ইলমী মহানগরী নিশাপুরে এক সম্ভ্রান্ত দ্বীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ও মাতামহ উভয়ই ছিলেন খ্যাতনামা মুহাদ্দিস। মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি পবিত্র কুরআন হিফয সমাপ্ত করেন এবং পিতার সান্নিধ্যে হাদীস শ্রবণ শুরু করেন।
  • ইলমী সফর ও উস্তাদবৃন্দ: তিনি হাদীস অন্বেষণে খোরাসান, মাভারাউন নাহার, ইরাক, হিজায, রায় ও বাগদাদসহ তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ইসলামী জ্ঞানকেন্দ্রসমূহে ব্যাপকভাবে সফর করেন। তিনি প্রায় দুই সহস্রাধিক (২,০০০) শায়খের কাছ থেকে হাদীসের সমাদৃত সনদ ও মতন গ্রহণ করেন। তাঁর প্রধান উস্তাদগণের মধ্যে অন্যতম:
    • ইমাম আবুল হাসান আদ-দারা কুতনী (রহ.) — যাঁর সাথে হাকিমের ইলমী বিতর্ক হাদীস শাস্ত্রের ইতিহাসে বিখ্যাত।
    • আবু আলী আন-নিশাপুরী (রহ.)।
    • ইসমাইল ইবনে মুহাম্মদ আস-সাফ্ফার।
    • ইবনে আবী দারিম কূফী।
  • বিশিষ্ট ছাত্রবৃন্দ: তাঁর দরবারে হাদীস শিক্ষার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মুহাদ্দিসগণ সমবেত হতেন। তাঁর প্রধান ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন:
    • ইমাম আহমদ ইবনুল হুসাইন আল-বায়হাক্বী (রহ.) — ‘আস-সুনানুল কুবরা’-এর প্রণেতা।
    • হাফিয আবু যর আল-হারাবী (রহ.)।
    • আবু ইয়া’লা আল-খালীলী (রহ.)।
  • আক্বীদা ও মাযহাব: ফিকহী মাযহাবে তিনি ছিলেন ইমাম শাফে’ঈ (রহ.)-এর অনুসারী। আক্বীদার ক্ষেত্রে তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তবে আহলে বাইতের প্রতি তাঁর হৃদয়ে প্রগাঢ় ভালোবাসা থাকার কারণে কোনো কোনো সমালোচক তাঁকে শিয়া ঘেঁষা বলে ইঙ্গিত করার চেষ্টা করলেও হাফিয যাহাবী ও তাজউদ্দীন সুবকী প্রমাণ করেছেন যে তিনি খাঁটি সুন্নী ছিলেন এবং শায়খাইন (হযরত আবু বকর ও উমর রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্বে অটল ছিলেন।
  • ওফাত: ইলমে হাদীসের এই মহান দিকপাল ৪০৫ হিজরীর ৩ সফর (১০১৪ খ্রিষ্টাব্দে) ৮৪ বছর বয়সে স্বীয় জন্মভূমি নিশাপুরে ইন্তিকাল করেন।

২. হাদীস সাহিত্যে ‘আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাঈন’-এর মর্যাদা ও মূল্যায়ন:

ইমাম হাকিমের অমর সংকলন «الْمُسْتَدْرَكُ عَلَى الصَّحِيحَيْنِ» হাদীস শাস্ত্রের অন্যতম প্রামাণ্য ও সুবিশাল বিশ্বকোষ। ‘ইস্তিদরাক’ (استدراك) শব্দের অর্থ পরিপূরক বা বাদ পড়ে যাওয়া বিষয়ের সংযোজন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মতো বিশুদ্ধ গ্রন্থ প্রণীত হওয়ার পরও অসংখ্য সহীহ হাদীস তাতে স্থান পায়নি। ইমাম হাকিম সেই সকল হাদীসকে একত্র করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন।

ক. গ্রন্থ প্রণয়নের উদ্দেশ্য ও হাকিমের শর্তাবলী:

ইমাম হাকিম তাঁর কিতাবে সংকলিত হাদীসগুলোকে মূলত চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছেন:

  1. সহীহ আলা শারতিশ শায়খাইন (صحيح على شرط الشيخين): যে হাদীসের রাবীগণ ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম উভয়ের গ্রন্থে নির্ভরযোগ্য হিসেবে গৃহীত এবং সনদ অবিচ্ছিন্ন।
  2. সহীহ আলা শারতিল বুখারী (صحيح على شرط البخاري): যে হাদীসটি ইমাম বুখারীর একক শর্তে উত্তীর্ণ।
  3. সহীহ আলা শারতি মুসলিম (صحيح على شرط مسلم): যে হাদীসটি কেবল ইমাম মুসলিমের শর্তে উত্তীর্ণ।
  4. সহীহুল ইসনাদ (صحيح الإسناد ولم يخرجاه): শায়খাইনের শর্তে না হলেও অন্যান্য গ্রহণযোগ্য রিজাল শাস্ত্রীয় নীতি অনুযায়ী যার সনদ সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ।

খ. ইমাম হাকিমের তাশাহুল (শিথিলতা) ও মুহাদ্দিসদের পর্যালোচনা:

ইমাম হাকিম নিশাপুরী স্বীয় গ্রন্থে বহু হাদীসকে সহীহ দাবি করলেও পরবর্তী মুহাদ্দিসীনদের সূক্ষ্ম বিচারে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি হাদীসের সহীহ হওয়ার রায় প্রদানে কিছুটা শিথিলতা বা ‘তাসাহুল’ (تَسَاهُلٌ) প্রদর্শন করেছেন। এর মূল ঐতিহাসিক কারণ হলো— তিনি জীবনের শেষভাগে বার্ধক্য অবস্থায় এই কিতাবটি সংকলন করেছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্বে কিতাবটির সামগ্রিক দ্বিতীয় দফা পর্যালোচনা ও পরিমার্জন (তানক্বীহ) সমাপ্ত করার সুযোগ পাননি।

গ. ইমাম যাহাবীর ‘আত-তালখীস’ ও মুস্তাদরাকের আধুনিক মূল্যায়ন:

ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (রহ.) মুস্তাদরাকের প্রতিটি হাদীসকে চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করে তাঁর বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ «تَلْخِيصُ الْمُسْتَدْرَكِ» রচনা করেন। যাহাবীর পর্যালোচনার সারসংক্ষেপ হলো:

  • মুস্তাদরাকের প্রায় ৫০% (অর্ধেক) হাদীস বাস্তবিক অর্থেই বুখারী ও মুসলিমের কঠোর শর্তে উত্তীর্ণ সম্পূর্ণ সহীহ।
  • প্রায় ৩০% হাদীস বিশুদ্ধ বা হাসান পর্যায়ের।
  • অবশিষ্ট প্রায় ২০% হাদীস জয়ীফ (দুর্বল), ত্রুটিযুক্ত (মু’আল্লাল) বা নিতান্তই শিথিল।

অতএব উসূলে হাদীসের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো— ইমাম হাকিমের একক রায়ের ওপর নির্ভর না করে ইমাম যাহাবীর তালখীসের নিরীক্ষা সমন্বয় করে মুস্তাদরাকের হাদীসকে গ্রহণ করতে হয়। এই সতর্কতা সত্ত্বেও সহীহাইনের বাইরে সহীহ হাদীস অন্বেষণের ক্ষেত্রে ‘আল-মুস্তাদরাক’ হাদীস শাস্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অমূল্য রত্নভাণ্ডার।


١١- اُكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاةِ الْإِمَامِ ابْنِ خُزَيْمَةَ مَعَ بَيَانِ مَنْزِلَتِهِ فِي عِلْمِ الْحَدِيثِ-

[১১. ইমাম ইবনে খুযায়মাহ (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত আলোচনা কর এবং হাদীস শাস্ত্রে তাঁর সুউচ্চ আসন ও মর্যাদা বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

১. ইমাম ইবনে খুযায়মাহ (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত:

  • নাম ও বংশ পরিচয়: তাঁর পূর্ণ নাম আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযায়মাহ ইবনে আল-মুগীরাহ ইবনে সালিহ ইবনে বকর আস-সুলামী আন-নিশাপুরী। বিশ্বজুড়ে তিনি «ابْنُ خُزَيْمَةَ» (ইবনে খুযায়মাহ) নামে খ্যাত। সমকালীন ও পরবর্তী সকল উলামায়ে কিরাম একবাক্যে তাঁকে «إِمَامُ الْأَئِمَّةِ» (ইমামুল আইম্মাহ বা ইমামগণের ইমাম) মর্যাদাপূর্ণ উপাধিতে ভূষিত করেছেন।
  • জন্ম ও প্রাথমিক শিক্ষা: তিনি ২২৩ হিজরীর সফর মাসে খোরাসানের নিশাপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি ইলম অন্বেষণে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। কিন্তু তাঁর পিতা তাঁকে শর্ত দেন যে আগে পবিত্র কুরআন হিফয সমাপ্ত করতে হবে। তিনি পিতার শর্তানুযায়ী অল্প বয়সেই কুরআন হিফয সমাপ্ত করেন এবং এরপর পিতার অনুমতি নিয়ে হাদীসের দরবারে আত্মনিয়োগ করেন।
  • জ্ঞানার্জনের পরিভ্রমণ ও উস্তাদবৃন্দ: তিনি হাদীস অন্বেষণে নিশাপুর, মারভ, রায়, বাগদাদ, বসরা, কূফা, ওয়াসিত, হিজায, শাম ও মিসর সফর করেন। তাঁর সমকালে এমন কোনো প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ছিলেন না যাঁর থেকে তিনি ইলম অর্জন করেননি। তাঁর শীর্ষ উস্তাদগণের মধ্যে অন্যতম:
    • ইমাম ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ (রহ.)।
    • মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া আয-যুহলী (রহ.)।
    • আলী ইবনে হুজর আস-সা’দী।
    • আহমাদ ইবনে মানী’ ও বুন্দার মুহাম্মদ ইবনে বাশশার।
  • সুপ্রসিদ্ধ ছাত্রবৃন্দ: তাঁর সান্নিধ্যে হাদীস শিক্ষা করে ধন্য হয়েছেন মুসলিম জাহানের শ্রেষ্ঠ দিকপালগণ। তাঁদের মধ্যে অন্যতম:
    • ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বান আল-বুসতী (রহ.) — যিনি সহীহ ইবনে হিব্বানের সংকলক এবং ইবনে খুযায়মার প্রধান ভাবশিষ্য।
    • ইমাম আবুল হাসান আদ-দারা কুতনী (রহ.)।
    • ইয়াহইয়া ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সাঈদ।
  • গুণাবলী ও সাধনা: তিনি ছিলেন একাধারে মুজতাহিদ ফকীহ, হাদীসের নির্ভুল হাফিয এবং প্রখর ইবাদতগুযার। তিনি সারা রাত নফল নামায ও তিলাওয়াতে অতিবাহিত করতেন। তিনি ছিলেন চরম পরহেযগার ও দানশীল। মিসরের শাসক ও উমারাগণ তাঁর ইলমী ব্যক্তিত্বের সামনে বিনীত থাকতেন।
  • ওফাত: ইমামুল আইম্মাহ ইবনে খুযায়মাহ ৩১১ হিজরীর ২ যিলক্বদ শনিবার রাতে (৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে) ৮৯ বছর বয়সে নিশাপুরে ইন্তিকাল করেন এবং নিজ বাসভবনের চত্বরেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

২. ইলমে হাদীসে ইমাম ইবনে খুযায়মার সুউচ্চ আসন ও মর্যাদা:

ইলমে হাদীসে ইমাম ইবনে খুযায়মাকে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর সমসাময়িক শ্রেষ্ঠ ইমামগণ তাঁর অতুলনীয় স্মৃতিশক্তি, সতর্কতা ও ফিকহী ইজতিহাদের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন:

  • ইমাম দারিমী ও রাবী’ ইবনে সুলাইমান বলেন: «اسْتَفَدْنَا مِنِ ابْنِ خُزَيْمَةَ أَكْثَرَ مِمَّا اسْتَفَادَ مِنَّا» অর্থাৎ “ইবনে খুযায়মা আমাদের কাছ থেকে যা শিখেছেন, আমরা তাঁর কাছ থেকে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ইলম অর্জন করেছি।”
  • ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বান (রহ.) বলেন: «مَا رَأَيْتُ عَلَى وَجْهِ الأَرْضِ مَنْ يُحْسِنُ صِنَاعَةَ السُّنَنِ وَيَحْفَظُ أَلْفَاظَهَا الصَّحِيحَةَ وَزِيَادَاتِهَا حَتَّى كَأَنَّ السُّنَنَ كُلَّهَا بَيْنَ عَيْنَيْهِ إِلَّا مُحَمَّدَ بْنَ إِسْحَاقَ بْنِ خُزَيْمَةَ» অর্থাৎ “সমগ্র পৃথিবীর বুকে হাদীসের শাস্ত্রীয় বিন্যাস, সহীহ শব্দাবলীর নিখুঁত হিফয এবং অতিরিক্ত শব্দ বর্ণনায় মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযায়মার মতো দ্বিতীয় কাউকে আমি দেখিনি; সমস্ত হাদীস যেন তাঁর চোখের সামনে উন্মুক্ত ছিল!”
  • হাফিয আয-যাহাবী (রহ.) বলেন: “তিনি ছিলেন হাদীস, রিজাল ও ফিকহের ক্ষেত্রে একজন স্বাধীন মুজতাহিদ এবং হাদীস শাস্ত্রের মুকুটহীন সম্রাট।”

৩. ‘সহীহ ইবনে খুযায়মাহ’-এর অনন্য বৈশিষ্ট্য ও স্থান:

তাঁর অমর কীর্তি হলো «مُخْتَصَرُ الْمُخْتَصَرِ مِنَ الْمُسْنَدِ الصَّحِيحِ» যা সংক্ষেপে «صَحِيحُ ابْنِ خُزَيْمَةَ» (সহীহ ইবনে খুযায়মাহ) নামে সুপরিচিত। সিহাহ সিত্তাহর বাইরে সহীহ হাদীস সংকলনের ক্ষেত্রে এটি প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ স্তম্ভ।

  • চরম সতর্কতা ও তাক্বয়ীদ: ইমাম ইবনে খুযায়মার শর্ত এতই কঠোর ছিল যে, সনদের কোনো রাবীর ব্যাপারে বা শব্দের মধ্যে সামান্যতম সন্দেহ দেখা দিলে তিনি নিঃসঙ্কোচে লিখতেন: «إِنْ صَحَّ الْخَبَرُ» (যদি বর্ণনাটি বিশুদ্ধ হয়) অথবা «فِي الْقَلْبِ مِنْهُ شَيْءٌ» (এই রাবী সম্পর্কে আমার অন্তরে খটকা রয়েছে)। তিনি কখনো অন্ধভাবে কোনো হাদীসকে সহীহ বলতেন না।
  • সহীহ গ্রন্থের স্তরবিন্যাস: মুহাদ্দিসীনদের সর্বসম্মত স্তরবিন্যাস অনুযায়ী, বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের পরেই সহীহ ইবনে খুযায়মার স্থান। এটি সহীহ ইবনে হিব্বান ও মুস্তাদরাকে হাকিম অপেক্ষা বহুগুণে বিশুদ্ধ ও সতর্কতাপূর্ণ। আল্লামা সুয়ূতী ও ইবনে হাজার আসক্বালানী স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, সহীহ ইবনে খুযায়মার শর্ত ইমাম ইবনে হিব্বানের শর্ত অপেক্ষা অনেক বেশি কঠোর ও প্রামাণ্য।

١٢- اُذْكُرْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاةِ أَبِي حَاتِمٍ مُحَمَّدِ بْنِ حِبَّانَ الْبُسْتِيِّ مَعَ بَيَانِ مَنْهَجِهِ فِي تَرْتِيبِ الْأَحَادِيثِ-

[১২. হাফিয আবু হাতিম মুহাম্মদ ইবনে হিব্বান আল-বুসতী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত উল্লেখ কর এবং হাদীস বিন্যাসে তাঁর অভিনব ও অনন্য সংকলন পদ্ধতি বিশদভাবে আলোচনা কর।]

১. ইমাম ইবনে হিব্বান (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত:

  • নাম ও বংশ পরিচয়: তাঁর পূর্ণ নাম আবু হাতিম মুহাম্মদ ইবনে হিব্বান ইবনে আহমাদ ইবনে মু’আয ইবনে মা’বাদ আত-তামীমী আদ-দারেমী আল-বুসতী। সংক্ষেপে তিনি «ابْنُ حِبَّانَ» (ইবনে হিব্বান) নামে মুসলিম জাহানে চিরস্মরণীয়। ‘বুসতী’ নিসবতটি আফগানিস্তানের বর্তমান সিজিস্তান/হেলমান্দ প্রদেশের প্রাচীন ঐতিহাসিক নগরী ‘বুস্ত’ (Bust)-এর সাথে সম্পৃক্ত।
  • জন্ম ও শিক্ষা জীবন: তিনি আনুমানিক ২৭০ হিজরীতে বুস্ত নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি প্রখর মেধা ও দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রাখেন। তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ হাদীসবিদগণের সান্নিধ্য লাভের জন্য তিনি স্বদেশ ত্যাগ করে খোরাসান, মাভারাউন নাহার, ইরাক, হিজায, শাম ও মিসর পরিভ্রমণ করেন।
  • প্রধান উস্তাদবৃন্দ: তাঁর উস্তাদগণের তালিকা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তন্মধ্যে শ্রেষ্ঠতম উস্তাদ হলেন:
    • ইমামুল আইম্মাহ আবু বকর ইবনে খুযায়মাহ (রহ.) — যাঁর থেকে তিনি দীর্ঘকাল হাদীস ও ফিকহের গভীর দর্শন আয়ত্ত করেন।
    • ইমাম আবুল হাসান আল-হাসান ইবনে সুফিয়ান আন-নাসাবী (রহ.)।
    • আবু ইয়াহইয়া আল-কারাবিসী ও জুনাইদ বাগদাদী (রহ.)।
  • বহুমুখী পাণ্ডিত্য ও বিচারপতি পদে দায়িত্ব: তিনি কেবল হাদীসের হাফিযই ছিলেন না; বরং ফিকহ, উসূলে ফিকহ, কালামশাস্ত্র, আরব্য সাহিত্য, ভূগোল, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিদ্যায় অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল সমরকন্দ, নাসাফ ও বিভিন্ন অঞ্চলের প্রধান বিচারপতির (ক্বাযী) পদে অধিষ্ঠিত থেকে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন।
  • অমর রচনাবলী: হাদীস ও রিজাল শাস্ত্রে তাঁর প্রধান গ্রন্থসমূহ হলো:
    • সহীহ ইবনে হিব্বান: মূল নাম «الْمُسْنَدُ الصَّحِيحُ عَلَى التَّقَاسِيمِ وَالأَنْوَاعِ» (আল-মুসনাদুস সহীহ আলাত তাকাসীমি ওয়াল আনওয়া)।
    • কিতাবুছ ছিক্বাত (كِتَابُ الثِّقَاتِ): নির্ভরযোগ্য রাবীদের সুবিশাল জীবনীকোষ।
    • কিতাবুল মাজরূহীন (كِتَابُ الْمَجْرُوحِينَ): দুর্বল ও প্রত্যাখ্যাত রাবীদের কঠোর সমালোচনা সংকলন।
    • রওযাতুল উক্বালা ওয়া নুযহাতুল ফুযালা (رَوْضَةُ الْعُقَلَاءِ وَنُزْهَةُ الْفُضَلَاءِ): আখলাক ও হিকমতের কালজয়ী গ্রন্থ।
  • ওফাত: জীবনের শেষভাগে তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং ৩৫৪ হিজরীর শাওয়াল মাসের শেষ জুমু’আর রাতে বুস্ত নগরীতে ইন্তিকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

২. হাদীস বিন্যাসে ইমাম ইবনে হিব্বানের অভিনব ‘তাকাসিম ওয়াল আনওয়া’ পদ্ধতি:

হাদীস সংকলনের ইতিহাসে ইমাম ইবনে হিব্বানের বিন্যাসপদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী, বৈপ্লবিক ও গণিতসুলভ যৌক্তিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তৎকালীন যুগে মুহাদ্দিসগণ মূলত দুটি পদ্ধতিতে হাদীস সংকলন করতেন:

  1. মুসনাদ পদ্ধতি (عَلَى الْمَسَانِيدِ): সাহাবীদের নামের আদ্যক্ষর অনুযায়ী হাদীস সাজানো (যেমন মুসনাদে আহমাদ)। এতে সাধারণ পাঠকের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট মাসআলার হাদীস খুঁজে পাওয়া কঠিন।
  2. মুসান্নাফ বা সুনান পদ্ধতি (عَلَى الْأَبْوَابِ الْفِقْهِيَّةِ): ফিকহী অধ্যায় (কিতাবুত তাহারাত, সালাত, যাকাত) অনুযায়ী সাজানো (যেমন সহীহ বুখারী, মুসলিম, সুনানে আরবা’আ)।

ক. পাঁচটি মূল বিভাগ (التقاسيم الخمسة):

ইমাম ইবনে হিব্বান এই উভয় পদ্ধতির বাইরে এসে সম্পূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও শরয়ী দর্শনের ওপর ভিত্তি করে সমগ্র দ্বীনকে ৫টি মৌলিক তাকাসীম বা বিভাগে বিন্যস্ত করেন:

  • ১. আল-আওয়ামির (الأَوَامِرُ): আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে বান্দার ওপর আরোপিত সমস্ত ইতিবাচক আদেশ ও ফরয-ওয়াজিব সংক্রান্ত হাদীসসমূহ। এর অধীনে তিনি ১১০টি প্রকার নির্দেশ করেছেন।
  • ২. আন-নাওয়াহী (النَّوَاهِي): শরীয়তের সমস্ত নিষেধ, হারাম ও বর্জনীয় কাজ সম্পর্কিত হাদীসসমূহ। এর অধীনেও রয়েছে ১১০টি প্রকার
  • ৩. আল-ইখবার (الإِخْبَارُ): এমন সব ঐতিহাসিক সংবাদ ও তথ্য যা জানার প্রয়োজন রয়েছে— যেমন পূর্ববর্তী নবীগণের ইতিহাস, সৃষ্টির সূচনা, জান্নাত-জাহান্নাম ও ভবিষ্যতের ফিতনা সংক্রান্ত হাদীস। এর অধীনে রয়েছে ৮০টি প্রকার
  • ৪. আল-ইবাহাত (الإِبَاحَاتُ): শরীয়তের যেসব বিষয় মুবাহ বা অনুমোদিত এবং যা পালনে বা বর্জনে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এর অধীনে রয়েছে ৫০টি প্রকার
  • ৫. আফ’আলুন নবী (أَفْعَالُ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ): রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব পবিত্র কার্যাবলী, যা কেবল তাঁর সাথেই খাস ছিল অথবা তাঁর সুন্নাহর নিদর্শন। এর অধীনে রয়েছে ৫০টি প্রকার

খ. সর্বমোট ৪০০ প্রকারের বৈজ্ঞানিক বিন্যাস (الأنواع الأربعمائة):

এই ৫টি মূল বিভাগের শাখা-প্রশাখা মিলিয়ে ইমাম ইবনে হিব্বান মোট ৪০০টি সূক্ষ্ম প্রকারে (أنواع) তাঁর কিতাবের হাদীসগুলোকে সুবিন্যস্ত করেন। তিনি প্রতিটি হাদীসের পূর্বে এক অপূর্ব উদ্ভাবনী শিরোনাম যুক্ত করতেন, যা তাঁর অসাধারণ ইজতিহাদী গভীরতাকে প্রকাশ করত।

গ. পরবর্তী যুগে ফিকহী অধ্যায়ে রূপান্তর (‘আল-ইহসান’):

ইমাম ইবনে হিব্বানের এই বিন্যাসপদ্ধতি তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে অতুলনীয় হলেও সাধারণ শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য নির্দিষ্ট ফিকহী মাসআলার হাদীস খুঁজে বের করা অত্যন্ত জটিল ও দুরূহ রূপ ধারণ করে। ফলে পরবর্তীকালের পণ্ডিতগণ এই গ্রন্থ থেকে সহজে উপকৃত হতে পারছিলেন না। এই সংকট নিরসনে অষ্টম হিজরীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আমীর আলাউদ্দীন আলী ইবনে বালবান আল-ফারিসী (রহ.) (মৃত্যু ৭৩৯ হিজরী) এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি ইবনে হিব্বানের সম্পূর্ণ কিতাবকে প্রচলিত ফিকহী অধ্যায় ও অনুচ্ছেদে পুনর্বিন্যস্ত করেন এবং এর নাম রাখেন: «الإِحْسَانُ فِي تَقْرِيبِ صَحِيحِ ابْنِ حِبَّانَ» (আল-ইহসান ফী তাক্বরীবি সহীহি ইবনে হিব্বান)। বর্তমান বিশ্বে সহীহ ইবনে হিব্বান এই ‘আল-ইহসান’-এর সুবিন্যস্ত রূপেই পঠিত ও সমাদৃত।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. সহীহ ইবনে হিব্বান, সহীহ ইবনে খুযায়মা ও মুস্তাদরাকে হাকিম—এই তিন গ্রন্থের স্তরভেদ কী?

বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে মুহাদ্দিসীনদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই তিন গ্রন্থের স্তরবিন্যাস নিম্নরূপ: সর্বাগ্রে সহীহ ইবনে খুযায়মাহ, কারণ তাঁর শর্ত অত্যন্ত কঠোর ও সতর্কতাপূর্ণ ছিল। দ্বিতীয় স্তরে সহীহ ইবনে হিব্বান, যা অত্যন্ত তথ্যবহুল হলেও রাবী যাচাইয়ে ইবনে হিব্বান কিছুটা মুতাসাহিল বা শিথিল ছিলেন। আর তৃতীয় স্তরে আল-মুস্তাদরাক লিল-হাকিম, যার অনেক হাদীস সহীহাইনের শর্তে উত্তীর্ণ হলেও ইমাম হাকিমের দ্রুত সংকলন ও তাশাহুলের কারণে এতে কিছু দুর্বল রেওয়ায়েতও অনুপ্রবেশ করেছে; ফলে ইমাম যাহাবীর তালখীসের নিরীক্ষা সমন্বয় করে তা পাঠ করতে হয়।

২. ইমাম হাকিমের “সহীহ আলা শারতিশ শায়খাইন” পরিভাষার সঠিক মর্মার্থ কী?

এর অর্থ হলো— সংশ্লিষ্ট হাদীসের সনদে উল্লিখিত বর্ণনাকারীগণ (রিজাল) ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম উভয়ের সহীহ গ্রন্থে দলীল হিসেবে গৃহীত এবং সনদটি পূর্ণাঙ্গভাবে মুত্তাসিল বা অবিচ্ছিন্ন। তবে মুহাদ্দিসগণ সতর্ক করেছেন যে, কোনো রাবী সহীহাইনে স্থান পেলেই হাকিমের সংকলিত সূত্রে তাঁর বর্ণিত হাদীসটি স্বতঃসিদ্ধভাবে সহীহ হয় না; কারণ কোনো কোনো রাবীর ক্ষেত্রে শায়খাইন কেবল সুনির্দিষ্ট উস্তাদের সূত্রে হাদীস নিয়েছেন, অথবা রাবীর জীবনের শেষভাগে বিভ্রান্তি (ইখতিলাত) ঘটেছিল যা হাকিম সর্বদা খেয়াল করতে পারেননি।

৩. ইমাম ইবনে হিব্বানের “তাকাসিম ওয়াল আনওয়া” পদ্ধতি পরবর্তীতে কীভাবে ফিকহী অধ্যায়ে রূপান্তরিত হয়?

ইমাম ইবনে হিব্বান প্রচলিত ফিকহী অধ্যায় বাদ দিয়ে সমগ্র দ্বীনকে ৫টি মূল বিভাগ ও ৪০০টি প্রকারে সাজিয়েছিলেন। এই বিন্যাস অতি উচ্চাঙ্গের হলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য হাদীস অনুসন্ধান করা অত্যন্ত জটিল ছিল। তাই পরবর্তীতে প্রখ্যাত আলেম আলাউদ্দীন আলী ইবনে বালবান আল-ফারিসী (রহ.) (মৃত্যু ৭৩৯ হিজরী) এই জটিল কাঠামো ভেঙে সাধারণ সুনান গ্রন্থের মতো ফিকহী তারতীবে সাজান, যা ‘আল-ইহসান ফী তাক্বরীবি সহীহি ইবনে হিব্বান’ নামে সমাদৃত হয়।

৪. ঈসালে সাওয়াবের ক্ষেত্রে শারীরিক ও আর্থিক ইবাদতের পার্থক্যের সারসংক্ষেপ কী?

আর্থিক ইবাদত (দান-সাদাকা, ওয়াকফ, কূপ খনন, যাকাত ও কাফফারা) এবং মিশ্র ইবাদত (হজ্জে বদল)-এর সাওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো এবং তাদের পক্ষ থেকে জীবিতদের তা আদায় করা সর্বসম্মতভাবে জায়েয ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। পক্ষান্তরে শারীরিক ইবাদতের ক্ষেত্রে (যেমন ফরয নামায ও রোযা) জীবিত ব্যক্তি সরাসরি অন্যের বদলী হিসেবে নামায পড়তে পারে না; তবে রোযার ক্ষেত্রে শাফেঈ ও আহলে হাদীসগণ বদলী রোযার পক্ষে মত দেন এবং হানাফী ফকীহগণ কাযা নামায ও রোযার জন্য ফিদয়া আদায়ের মাধ্যমে মাগফিরাত ও সাওয়াব পৌঁছানোর বিধান প্রদান করেন।

৫. নবুওয়াতের মোহর (খাতামুন নবুওয়াত) প্রত্যক্ষ করার ঐতিহাসিক তাৎপর্য কী?

খাতামুন নবুওয়াত ছিল পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে (তাওরাত ও ইঞ্জীল) বর্ণিত শেষ নবীর একটি সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য শারীরিক মুজিযা। পাদ্রী বুহাইরা বাল্যকালে এই মোহর দেখেই নিশ্চিত হয়েছিলেন যে মুহাম্মদ (সা.)-ই সেই প্রতিশ্রুত শেষ নবী। একইভাবে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত সালমান ফারেসী (রা.) দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে ইসলাম গ্রহণের পূর্বে অন্যান্য পূর্বাভাসের সাথে এই মোহরটি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে পূর্ণ ঈমান এনেছিলেন।

৬. ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষের দিরাসাতুল হাদীস-২ অধ্যয়নে এই তিন গ্রন্থের গুরুত্ব কী?

দিরাসাতুল হাদীস-২ অধ্যয়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সিহাহ সিত্তাহর পরবর্তী স্তরের তিনটি প্রধান স্তম্ভ—সহীহ ইবনে হিব্বান, সহীহ ইবনে খুযায়মাহ এবং আল-মুস্তাদরাক লিল-হাকিমের বর্ণনারীতি, সনদ বিশ্লেষণ ও সংকলন পদ্ধতির সাথে গভীর তাত্ত্বিক পরিচিতি লাভ করে। একই সাথে ইমাম ইবনে খুযায়মা, ইবনে হিব্বান ও হাকিম নিশাপুরীর মতো শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসগণের জীবন ও ইলমী অবদান আয়ত্ত করে উচ্চতর হাদীস গবেষণার পূর্ণাঙ্গ যোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।


উপসংহার

ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪-এর ‘দিরাসাতুল হাদীস-২’ (বিষয় কোড: ২০২৮০৭) প্রশ্নপত্রটি হাদীস সাহিত্যের উচ্চাঙ্গের মানদণ্ডে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও তথ্যবহুলভাবে প্রণীত হয়েছে। সহীহ ইবনে হিব্বানের ঈমান ও চরিত্রের রূপরেখা, সহীহ ইবনে খুযায়মার যাকাতুল ফিতর, সাদাকায়ে জারিয়া ও ওসীয়তের বিধান, আল-মুস্তাদরাক লিল-হাকিমের খাতামুন নবুওয়াত, হযরত ঈসা (আ.)-এর পুনরাগমন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুমহান চরিত্র এবং সর্বশেষে ইমাম হাকিম, ইমাম ইবনে খুযায়মা ও ইমাম ইবনে হিব্বানের জীবন ও সংকলন পদ্ধতির ওপর রচিত এই পূর্ণাঙ্গ ও রেফারেন্সভিত্তিক সমাধান ফাজিল পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের নিশ্চয়তা প্রদানের পাশাপাশি তাঁদের হাদীস গবেষণার জ্ঞানকে সমৃদ্ধ ও পরিশীলিত করবে।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন