اختبار السنة الثانية للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٠م
ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২০
الحديث والدراسات الإسلامية
আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
السيرة النبوية
আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ (নবীচরিত)
বিষয় কোড: 202204 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
الملاحظة: أجب عن خمسة أسئلة من مجموعة (أ) وعن اثنين من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য: ক-অংশ হতে ৫টি এবং খ-অংশ হতে ২টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) : ক-অংশ (রচনামূলক প্রশ্নাবলী) (মান: ৫ × ১২ = ৬০)
١- ما هي الجاهلية؟ بين الحالات السياسية والاقتصادية للعرب قبل الإسلام-
[১. জাহিলিয়্যাত কী? ইসলামপূর্ব আরবের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা আলোচনা কর।]
ভূমিকা: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত প্রকাশের পূর্ববর্তী যুগকে আরব ও বিশ্ব ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ‘আইয়ামে জাহিলিয়াত’ বা অজ্ঞতার যুগ বলা হয়। এ যুগে মানবতার সকল নৈতিক মূল্যবোধ ধ্বংস হয়ে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক চরম শোষণ বিরাজ করছিল।
১. জাহিলিয়্যাত-এর পরিচয় (مفهوم الجاهلية):
- আভিধানিক অর্থ: ‘জাহিলিয়্যাত’ (الجاهلية) শব্দটি ‘জাহল’ (الجهل) ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ অজ্ঞতা, মূর্খতা, অবিমৃশ্যকারিতা, বর্বরতা ও অহমিকা। এটি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক নিরক্ষরতা নয়; বরং সত্য ও ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে কামপ্রবৃত্তি ও হিংস্রতার অনুসরণকে জাহিলিয়াত বলা হয়।
- পারিভাষিক অর্থ: ইসলামের পরিভাষায়, নবুওয়াত প্রকাশের পূর্ববর্তী সেই ঐতিহাসিক যুগকে ‘জাহিলিয়াত’ বলা হয়, যখন মানুষ একত্ববাদ ভুলে শিরক ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিল, চারিত্রিক অবক্ষয় চরম সীমায় পৌঁছেছিল এবং পাশবিক শক্তিই সামাজিক চালিকাশক্তি হিসেবে পরিগণিত হতো। কুরআন মাজিদে চার প্রকার জাহিলিয়াত (ধারণা, হুকুম, প্রদর্শন ও অহমিকা)-এর উল্লেখ রয়েছে।
২. প্রাক-ইসলামি আরবের রাজনৈতিক অবস্থা (الحالة السياسية):
- কেন্দ্রীয় সরকারের অনুপস্থিতি: প্রাক-ইসলামি আরবে কোনো সার্বভৌম কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা বা সংবিধান ছিল না। সমগ্র আরব ভূখণ্ড বহুধা বিভক্ত যাযাবর গোত্রে (قَبَائِل) বিভক্ত ছিল।
- গোত্রপ্রথা ও ‘আসাবিয়্যাহ’ (العصبية القبلية): গোত্রীয় অন্ধ আনুগত্য বা বংশীয় অহমিকাই ছিল রাজনীতির ভিত্তি। গোত্রের প্রধানকে ‘শায়খ’ (الشيخ) বলা হতো। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার সমগ্র গোত্র অন্য গোত্রের ওপর প্রতিশোধ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ত। “তোমার ভাই জালেম হোক বা মজলুম—তাকে সাহায্য কর”—জাহিলি যুগে এ স্লোগান অন্ধ গোত্রীয় পক্ষপাতের ভিত্তিতে আক্ষরিক অর্থে প্রয়োগ করা হতো।
- দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ: তুচ্ছ কারণে শত বছর ধরে যুদ্ধ চলত। যেমন—একটি উটকে কেন্দ্র করে বনু বকর ও বনু তাগলিবের মধ্যকার ‘বাসুস যুদ্ধ’ (حرب البسوس) দীর্ঘ ৪০ বছর স্থায়ী হয়েছিল। এমনিভাবে ‘দাfeature ও গাবরা যুদ্ধ’ (حرب داحس والغبراء) এবং পবিত্র মাসে রক্তপাতের কারণে সংঘটিত ‘হারবুল ফিজার’ (حرب الفجار) আরবের রাজনীতিকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল।
- বৈদেশিক আগ্রাসনের প্রভাব: আরবের সীমানা ঘেঁষে উত্তর-পশ্চিমে রোমান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং উত্তর-পূর্বে পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের প্রভাবে ঘাসসান ও হীরা নামক পুতুল রাজ্যের সৃষ্টি হয়েছিল। অন্যদিকে দক্ষিণে ইয়েমেনে আবিসিনিয়া ও পারস্যের আধিপত্য বজায় ছিল। মক্কার কুরাইশরা ‘মালা’ (الملأ – প্রবীণ সভা) দ্বারা ক্বাবা কেন্দ্রিক কিছুটা স্থিতিশীলতা বজায় রাখলেও তা ছিল সীমিত।
৩. প্রাক-ইসলামি আরবের অর্থনৈতিক অবস্থা (الحالة الاقتصادية):
- চরম সুদি শোষণ (الربا الفاحش): জাহিলি অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ ছিল চক্রবৃদ্ধি সুদ। ঋণগ্রহীতা নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে মূলধন দ্বিগুণ করে দেওয়া হতো (أضعافا مضاعفة)। সুদ দিতে না পেরে বিত্তহীন মানুষেরা নিজেদের সন্তান-সন্ততি ও নিজেদেরকে দাস হিসেবে বিক্রি করতে বাধ্য হতো।
- লুটতরাজ ও রাহাজানি (الغزو والنهب): যাযাবর বেদুইনদের জীবিকার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল এক গোত্র কর্তৃক অন্য দুর্বল গোত্রের উট, ছাগল ও সম্পদ লুণ্ঠন করা। একে তারা বীরত্ব ও আভিজাত্য মনে করত।
- বাণিজ্য ও ‘রিহলাতুশ শিতা ওয়াস সাইফ’: মক্কা ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ট্রানজিট। কুরাইশরা শীতকালে ইয়েমেনে এবং গ্রীষ্মকালে সিরিয়ায় বাণিজ্য কাফেলা পরিচালনা করত, যার বর্ণনা সূরা কুরাইশে এসেছে (رِحْلَةَ الشِّتَاءِ وَالصَّيْفِ)। তবে বাণিজ্যের একচেটিয়া মুনাফা পুঁজিপতি ও সর্দারদের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল।
- কৃষি ও পশুপালন: তায়েফ, ইয়াসরিব (মদিনা) ও ইয়েমেনের উর্বর অঞ্চলে খেজুর ও ফলের চাষ হতো এবং মক্কার মরুভূমিতে ভেড়া ও উট চারণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা হতো। জুয়া (الميسر) এবং ভাগ্য গণনার মাধ্যমে দ্রুত সম্পদ উপার্জনের অপসংস্কৃতি অর্থনীতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গিয়েছিল।
উপসংহার: প্রাক-ইসলামি আরবের এই অন্ধকার রাজনৈতিক অনৈক্য ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মানবতাকে মুক্তি দিতেই মহান আল্লাহ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে বিশ্বজগতের রহমত হিসেবে প্রেরণ করেন।
٢- ما هي الدعوة؟ بين حكمة الدعوة السرية وبدايتها وكيف استجاب الناس لدعوة النبي (ص)؟
[২. দাওয়াত কী? গোপন দাওয়াতের প্রজ্ঞা ও এর সূচনা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতে মানুষের সাড়া প্রদানের বিবরণ দাও।]
ভূমিকা: নবুওয়াতের গুরুদায়িত্ব লাভের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) যে সুপরিকল্পিত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপায়ে তাওহিদের বাণী প্রচার করেছিলেন, তা দাওয়াহ্ শাস্ত্রের এক অনুপম পাঠ। প্রাথমিক পর্যায়ে আত্মরক্ষা ও মজবুত ভিত্তি নির্মাণের উদ্দেশ্যে তিনি গোপন দাওয়াতের নীতি অবলম্বন করেন।
১. দাওয়াত-এর পরিচয় (مفهوم الدعوة):
- আভিধানিক অর্থ: ‘দাওয়াত’ (الدعوة) আরবি ‘দা’আ’ (دعا – يدعو) ধাতু থেকে নির্গত। এর অর্থ আহ্বান করা, ডাকা, উৎসাহিত করা, নিমন্ত্রণ জানানো বা প্রার্থনা করা।
- পারিভাষিক অর্থ: আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালাত এবং পরকালের সত্যের প্রতি মানবজাতিকে প্রজ্ঞাপূর্ণ পদ্ধতিতে আহ্বান জানানো এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করার সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে ‘ইসলামি দাওয়াত’ বলে।
২. গোপন দাওয়াতের সূচনা ও এর ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা (بداية الدعوة السرية وحكمتها):
- সূচনা ও সময়কাল: সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াত (يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ * قُمْ فَأَنذِرْ) নাজিল হওয়ার পর মহানবী (সা.) গোপন দাওয়াত শুরু করেন। নবুওয়াতের প্রথম ৩ বছর এই দাওয়াহ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও গোপনে পরিচালিত হয়।
- দারুল আরকাম (دار الأرقم): গোপন দাওয়াত ও নবদীক্ষিত মুসলমানদের প্রশিক্ষণের জন্য সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত হযরত আরকাম ইবনে আবিল আরকাম (রা.)-এর বাড়িকে সদর দফতর বা গোপন কেন্দ্র হিসেবে নির্বাচন করা হয়।
- গোপন দাওয়াতের প্রজ্ঞা ও কৌশলগত রহস্য (الحكمة الإلهية):
- মক্কার জাহিলি পরিবেশ ও প্রতিক্রিয়া প্রশমন: মক্কার কুরাইশরা ছিল মূর্তিপূজার অভিভাবক। হঠাৎ প্রকাশ্য ঘোষণা দিলে তারা অঙ্কুরেই এই নবজাত আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করত।
- মৌলিক ভিত্তি ও নেতৃত্ব নির্মাণ: একটি বৈপ্লবিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার পূর্বে নিঃস্বার্থ, পাহাড়সম ঈমানদার একটি অগ্রগামী দল (السابقون الأولون) তৈরি করা অপরিহার্য ছিল, যারা যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকবে।
- মুসলিমদের জানমাল রক্ষা: প্রাথমিক দুর্বল অবস্থায় রক্তক্ষয় ও সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ঈমানের বীজ বপন করাই ছিল সময়ের সেরা প্রজ্ঞা।
৩. দাওয়াতে মানুষের সাড়া প্রদানের বিবরণ (استجابة الناس للدعوة):
- প্রথম সারির ঈমানদারগণ (السابقون الأولون):
- নারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম: উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রা.)।
- প্রাপ্তবয়স্ক মুক্ত পুরুষদের মধ্যে: হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।
- বালকদের মধ্যে: হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)।
- দাসদের মধ্যে: হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) এবং হযরত বিলাল ইবনে রাবাহ (রা.)।
- আবু বকর (রা.)-এর দাওয়াতি তৎপরতা: আবু বকর (রা.)-এর প্রভাবে কুরাইশদের শীর্ষস্থানীয় ও অভিজাত ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন হযরত উসমান ইবনে আফফান, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.)।
- দুর্বল ও নিপীড়িত শ্রেণীর সাড়া: দাস, মজদুর ও সমাজের অবহেলিত মানুষেরা ইসলামের সাম্য ও মানবিক মর্যাদার বাণীতে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত হয়ে দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করেন (যেমন: আম্মার বিন ইয়াসির ও তাঁর পরিবার, খুব্বাব ইবনুল আরাত প্রমুখ)। ৩ বছরে প্রায় ৪০ জন নির্ভীক সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হন।
উপসংহার: গোপন দাওয়াতের মাধ্যমে যে আত্মোৎসর্গকারী কাফেলা তৈরি হয়েছিল, তাঁদের অবিচলতার ওপর ভর করেই পরবর্তীতে ইসলামের বিশ্বজয়ের ভিত্তি রচিত হয়।
٣- ما هي أسباب هجرة المسلمين إلى الحبشة وأهميتها؟ اذكر بالتفصيل-
[৩. মুসলমানদের হাবশায় হিজরতের কারণ ও তাৎপর্য বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা: নবুওয়াতের ৫ম বর্ষে মক্কায় মুসলমানদের ওপর মুশরিকদের নির্যাতন যখন চরম রূপ ধারণ করে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে তৎকালীন খ্রিস্টান রাজ্য আবিসিনিয়া বা হাবশায় হিজরতের নির্দেশ দেন। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক হিজরত।
১. হাবশায় হিজরতের প্রেক্ষাপট ও কারণসমূহ (أسباب الهجرة إلى الحبشة):
- মুশরিকদের বর্বর নির্যাতন ও নিপীড়ন: প্রকাশ্যে দাওয়াত শুরুর পর কুরাইশরা বিশেষত দুর্বল, ক্রীতদাস ও নিঃসহায় মুসলমানদের ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার শুরু করে। বিলাল (রা.)-কে তপ্ত বালুতে পাথর চাপা দেওয়া, সুমাইয়া ও ইয়াসির (রা.)-কে নির্মমভাবে শহীদ করায় সাহাবিদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
- দ্বীন ও আকিদা রক্ষার বাধ্যবাধকতা: মুসলমানদের জোরপূর্বক ইসলাম ত্যাগ করাতে বাধ্য করা হচ্ছিল। ফলে নিজেদের ঈমান ও আকিদা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন ছিল।
- বাদশাহ নাজ্জাশির সুবিচার ও সহনশীলতা: রাসুলুল্লাহ (সা.) হাবশার খ্রিস্টান সম্রাট আসহামা আন-নাজ্জাশির ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে জানতেন। তিনি সাহাবিদের বলেন: «إِنَّ بِهَا مَلِكًا لَا يُظْلَمُ عِنْدَهُ أَحَدٌ» (“সেখানে এমন একজন বাদশাহ রয়েছেন, যার সান্নিধ্যে কারও ওপর জুলুম করা হয় না”)।
- ইসলামের আন্তর্জাতিক প্রচার ও বিকল্প ভিত্তির সন্ধান: কেবল মক্কার ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ না থেকে বহির্বিশ্বে ইসলামের পরিচিতি ঘটানো এবং কোনো কারণে মক্কায় বিপর্যয় ঘটলে বিকল্প কেন্দ্র তৈরি করাও এর দূরদর্শী উদ্দেশ্য ছিল।
২. হিজরতের বিবরণ:
- প্রথম হিজরত (নবুওয়াতের ৫ম বর্ষ – রজব মাস): ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী গোপনে লোহিত সাগর পাড়ি দেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন হযরত উসমান (রা.) ও তাঁর স্ত্রী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কন্যা রুকাইয়্যা (রা.)।
- দ্বিতীয় হিজরত: পরবর্তীতে নির্যাতন বৃদ্ধি পেলে হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর নেতৃত্বে ৮৩ জন পুরুষ ও ১৯ জন নারী হাবশায় গমন করেন।
৩. হাবশায় হিজরতের সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ও গুরুত্ব (أهمية الهجرة):
- জাফর (রা.)-এর ঐতিহাসিক ভাষণ ও কূটনীতি: কুরাইশরা আমর ইবনুল আস ও আব্দুল্লাহ বিন আবি রাবিয়াকে মূল্যবান উপহারসহ নাজ্জাশির দরবারে পাঠায় যেন মুসলমানদের ফেরত পাঠানো হয়। দরবারে জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.) জাহিলিয়াতের অন্ধকার ও ইসলামের সুমহান শিক্ষার ওপর এক অমর ভাষণ দেন এবং সূরা মারইয়ামের আয়াত তিলাওয়াত করেন। নাজ্জাশি কেঁদে ফেলেন এবং মুসলমানদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেন।
- ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের মৌলিক সেতুবন্ধন: হযরত ঈসা (আ.) ও বিবি মারইয়াম সম্পর্কে কুরআনের বিশুদ্ধ বক্তব্য শুনে খ্রিস্টান শাসক উপলব্ধি করেন যে এই বার্তা এবং ঈসা (আ.)-এর বার্তা একই নূরের আলোকচ্ছটা।
- কুরাইশদের আন্তর্জাতিক পরাজয়: বহির্বিশ্বের একটি পরাশক্তির দরবারে কুরাইশদের কূটনৈতিক অপচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলমানদের মর্যাদাকে বহুগুণ বৃদ্ধি করে।
- পরবর্তী মদিনা হিজরতের মহড়া: হাবশার হিজরত মুসলমানদের দেশত্যাগ, নতুন পরিবেশে টিকে থাকা এবং ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সাথে সহাবস্থানের বাস্তব অভিজ্ঞতা দান করে, যা মদিনা হিজরতকে সহজতর করে।
উপসংহার: হাবশার হিজরত ছিল মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষা ও ইসলামের আন্তর্জাতিকীকরণের এক ঐতিহাসিক বাঁক, যা নাজ্জাশির ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে এক চিরন্তন সৌহার্দ্য স্থাপন করে।
٤- ما هو الإسراء والمعراج؟ بين ذلك مع الأدلة النقلية والعقلية-
[৪. ইসরা ও মেরাজ কী? দলিল ও প্রমাণের (নাক্বলী ও আকলী) আলোকে তা আলোচনা কর।]
ভূমিকা: ‘ইসরা ও মেরাজ’ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের অন্যতম বিস্ময়কর, অলৌকিক ও ঈমানোদ্দীপক মুজিজা। নবুওয়াতের দশম বর্ষে ‘আমুল হুযন’ (শোকের বছর)-এ প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.) ও স্নেহশীল চাচা আবু তালিবের ইন্তেকালের পর তায়েফের মর্মান্তিক আঘাতের প্রেক্ষাপটে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীবকে এই স্বর্গীয় ভ্রমণ দ্বারা সম্মানিত করেন।
১. ইসরা ও মেরাজ-এর পরিচয় (مفهوم الإسراء والمعراج):
- ইসরা (الإسراء): আভিধানিক অর্থ নৈশভ্রমণ বা রাতে ভ্রমণ করানো। শরীয়তের পরিভাষায়, মহানবী (সা.)-এর রাতে জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস (মসজিদুল আকসা) পর্যন্ত অলৌকিক ভ্রমণকে ‘ইসরা’ বলা হয়।
- মেরাজ (المعراج): আভিধানিক অর্থ ঊর্ধ্বারোহণ বা উপরে ওঠার সিঁড়ি। পারিভাষিক অর্থে, মসজিদুল আকসা থেকে সপ্তাকাশ, সিদরাতুল মুনতাহা পেরিয়ে মহান আল্লাহর খাস সান্নিধ্যে আরশে আজিম পর্যন্ত সশরীরে ঊর্ধ্বারোহণকে ‘মেরাজ’ বলা হয়।
২. ইসরা ও মেরাজের সপক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর দলিল (الأدلة النقلية):
- পবিত্র কুরআনের আয়াত (ইসরা প্রসঙ্গে): মহান আল্লাহ সূরা বনী ইসরাইলের প্রথম আয়াতে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন:
﴿سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ﴾
“পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত…”। এখানে ‘بِعَبْدِهِ’ (স্বীয় বান্দা) শব্দটি আত্মা ও দেহ উভয়ের সম্মিলিত রূপকে প্রমাণ করে, কেননা শুধু আত্মাকে কখনো ‘আব্দ’ বলা হয় না। - কুরআনের আয়াত (মেরাজ প্রসঙ্গে): সূরা আন-নাজমে মেরাজের প্রত্যক্ষ দৃশ্যের বর্ণনা এসেছে:
﴿وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَىٰ * عِندَ سِدْرَةِ الْمُنتَهَىٰ * عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ * إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَىٰ * مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَىٰ * لَقَدْ رَأَىٰ مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَىٰ﴾
“নিশ্চয়ই তিনি তাকে আরেকবার দেখেছিলেন সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে… দৃষ্টি বিভ্রান্ত হয়নি এবং লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি।” - সহীহ হাদিসের সাক্ষ্য: সহীহ বুখারী ও মুসলিমসহ বহু গ্রন্থে মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদিসে বোরাকে আরোহণ, আম্বিয়ায়ে কেরামের ইমামতি, সপ্তাকাশে নবীগণের সাথে সাক্ষাৎ এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান প্রাপ্তির বিস্তারিত বিবরণ বর্ণিত হয়েছে।
৩. ইসরা ও মেরাজের পক্ষে যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল (الأدلة العقلية):
- আল্লাহর অসীম কুদরত ও সর্বশক্তিমানতা: যে মহান সত্তা সমগ্র মহাবিশ্ব, গ্যালাক্সি ও আলো-বাতাসকে অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বে এনেছেন, তাঁর পক্ষে নিজের প্রিয়তম রাসুলকে চোখের পলকে মহাকাশ ভ্রমণ করানো যুক্তির বিচারে সম্পূর্ণরূপে সম্ভব ও সহজসাধ্য।
- বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতা ও মহাকাশ গতিবিদ্যা: আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (Theory of Relativity) প্রমাণ করে যে আলোর গতিতে চললে স্থান ও সময় সংকুচিত হয়ে যায় (Time Dilation)। বোরাক (যার নাম ‘বারক্ব’ বা বিদ্যুৎ থেকে এসেছে) আলোর চেয়েও দ্রুতগতির বাহন হওয়ায় স্থান-কালের সীমা অতিক্রম করা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতা রাখে।
- আবু বকর (রা.)-এর যুক্তিনির্ভর ঈমানী মানদণ্ড: মক্কার কাফেররা যখন মেরাজের ঘটনা শুনে উপহাস করে আবু বকর (রা.)-কে প্রশ্ন করল, তখন তিনি অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে বললেন: “মুহাম্মদ (সা.) যদি বলে থাকেন তবে তা নিঃসন্দেহে সত্য। আমি তো প্রতিদিন বিশ্বাস করি যে সকাল-সন্ধ্যায় আকাশ থেকে আল্লাহর ওহি তাঁর কাছে নেমে আসে, যা মেরাজের দূরত্বের চেয়েও অনেক বেশি বিস্ময়কর!” একারণেই তাঁকে ‘সিদ্দিক্ব’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
উপসংহার: ইসরা ও মেরাজ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের অমূল্য উপহারপ্রাপ্তির এক অনন্য স্মারক।
٥- بين أسباب غزوة بدر ونتائجها وأهميتها التاريخية-
[৫. বদর যুদ্ধের কারণ, ফলাফল ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব আলোচনা কর।]
ভূমিকা: হিজরি ২য় সনের ১৭ রমজান সংঘটিত ‘গাযওয়ায়ে বদর’ (غزوة بدر) সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার প্রথম প্রত্যক্ষ সশস্ত্র যুদ্ধ। কুরআন মাজিদে একে ‘ইয়াওমুল ফুরক্বান’ (يَوْمَ الْفُرْقَانِ – সত্য-মিথ্যার মীমাংসার দিন) আখ্যায়িত করা হয়েছে।
১. বদর যুদ্ধের প্রধান কারণসমূহ (أسباب غزوة بدر):
- কুরাইশদের বৈরিতা ও মদিনায় হামলার হুমকি: হিজরতের পরও কুরাইশরা শান্ত থাকেনি। তারা মদিনার মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে চিঠি দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বহিষ্কারের হুমকি দেয় এবং মদিনার চারণভূমিতে কুরয বিন জাবির আল-ফিহরীর নেতৃত্বে অতর্কিত হামলা চালায়।
- মুহাজিরদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ দখল: মক্কার মুশরিকরা মুহাজির সাহাবিদের ঘরবাড়ি ও বিষয়-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করছিল।
- আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলা ও অর্থনৈতিক অবরোধ: মদিনা ছিল মক্কার সিরিয়াগামী বাণিজ্যিক কাফেলা চলাচলের প্রধান পথের পাশে। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে ৫০ হাজার স্বর্ণমুদ্রার একটি বিশাল বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কার দিকে ফিরছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরাইশদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড দুর্বল করার লক্ষ্যে এই কাফেলাটি আটকানোর উদ্যোগ নেন।
- আবু জাহেলের যুদ্ধোম্মাদনা: আবু সুফিয়ান পথ পরিবর্তন করে নিরাপদে চলে গেলেও অহংকারী আবু জাহেল মক্কার ১০০০ সশস্ত্র সৈন্যের বাহিনী নিয়ে বদরের প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয় এবং মুসলমানদের চিরতরে ধ্বংস করার উন্মাদনায় মেতে ওঠে।
২. যুদ্ধের ফলাফল (نتائج الغزوة):
- মুসলমানদের অভূতপূর্ব বিজয়: মাত্র ৩১৩ জন প্রায় নিরস্ত্র মুসলমান (যাঁদের ছিল মাত্র ২টি ঘোড়া ও ৭০টি উট) আল্লাহর গায়েবি সাহায্যে মক্কার ১০০০ সুসজ্জিত বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন।
- কুরাইশ শীর্ষ নেতৃত্বের পতন: ইসলামের কট্টর শত্রু আবু জাহেল, উতবা, শায়বা, উমাইয়া ইবনে খালাফসহ কুরাইশদের ৭০ জন নেতৃস্থানীয় যোদ্ধা নিহত হয়।
- যুদ্ধবন্দী ও গনীমত: ৭০ জন শত্রু সৈন্য বন্দী হয়। মহানবী (সা.) বন্দীদের প্রতি অভূতপূর্ব মানবিক আচরণ প্রদর্শন করেন এবং শিক্ষিত বন্দীদের মদিনার ১০ জন নিরক্ষর শিশুকে লেখাপড়া শেখানোর বিনিময়ে মুক্তিপণ নির্ধারণ করেন।
- মুসলিমদের শাহাদাত: মাত্র ১৪ জন সাহাবি (৬ জন মুহাজির ও ৮ জন আনসার) শাহাদাত বরণ করেন।
৩. বদর যুদ্ধের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও গুরুত্ব (الأهمية التاريخية):
- মদিনা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থায়িত্ব ও সার্বভৌমত্ব: বদর বিজয়ের ফলে মদিনা কেন্দ্রিক নতুন ইসলামি রাষ্ট্র সমগ্র আরব উপদ্বীপে একটি উদীয়মান মহাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। মদিনার ইহুদি ও মুনাফিকদের ঔদ্ধত্য স্তব্ধ হয়ে যায়।
- ফেরেশতা দ্বারা ঐশ্বরিক সাহায্য: মহান আল্লাহ বদরে ১০০০ ফেরেশতা পাঠিয়ে মুসলমানদের সাহায্য করেন (সূরা আলে ইমরান: ১২৩-১২৫), যা প্রমাণ করে সংখ্যার চেয়ে ঈমানের শক্তিই বিজয়ের মূল চাবিকাঠি।
- বদরি সাহাবিদের চিরন্তন মর্যাদা: ইসলামে বদরি সাহাবিদের মর্যাদা আকাশচুম্বী। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন যে আল্লাহ বদরি সাহাবিদের সকল অতীত ও ভবিষ্যৎ পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তাঁদের জন্য জান্নাত অবধারিত করেছেন।
- বিশ্ব ইতিহাসের নতুন দিগন্ত: বদরের প্রাঙ্গণে যদি সত্যের এই ক্ষুদ্র দলটি পরাজিত হতো, তবে পৃথিবীতে একত্ববাদের ঘোষণা চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যেত। তাই বদর বিজয় বিশ্বসভ্যতার গতিপথ পরিবর্তনকারী এক মহান বিপ্লব।
উপসংহার: বদর যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে সত্যের আদর্শের কাছে অন্যায়ের পেশিশক্তি ও সম্পদের প্রাচুর্য চরমভাবে পরাভূত হতে বাধ্য।
٦- اكتب بنود صلح الحديبية العشرة مع بيان أهميته ولماذا سماه الله بالفتح المبين؟
[৬. হুদায়বিয়া সন্ধির ধারাগুলো উল্লেখপূর্বক এর গুরুত্ব এবং কেন আল্লাহ তায়ালা একে ‘ফাতহুম মুবীন’ আখ্যা দিয়েছেন তা আলোচনা কর।]
ভূমিকা: হিজরি ৬ষ্ঠ সনের জিলকদ মাসে মক্কার অদূরে হুদায়বিয়া নামক স্থানে মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে যে ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদিত হয়, তাকে ‘সুলহুল হুদায়বিয়া’ (صلح الحديبية) বলা হয়। আপাতদৃষ্টিতে শর্তাবলি মুসলমানদের প্রতিকূলে মনে হলেও এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক দূরদর্শী রাজনৈতিক ও সামরিক বিজয়।
১. হুদায়বিয়া সন্ধির প্রধান শর্ত ও ধারাসমূহ (بنود الصلح):
কুরাইশ প্রতিনিধি সুহাইল ইবনে আমর এবং মুসলমানদের পক্ষে হযরত আলী (রা.)-এর হস্তাক্ষরে সম্পাদিত সন্ধির প্রধান শর্তাবলি ছিল নিম্নরূপ:
- দশ বছরের যুদ্ধবিরতি: উভয় পক্ষ আগামী ১০ বছর পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ রাখবে এবং কোনো ধরনের গোপন বা প্রকাশ্য শত্রুতায় লিপ্ত হবে না।
- এ বছর ওমরাহ না করে প্রত্যাবর্তন: মুসলমানরা এ বছর ওমরাহ না করেই মদিনায় ফিরে যাবেন।
- আগামী বছর ওমরাহ পালন: আগামী বছর মুসলমানরা মাত্র তিন দিনের জন্য মক্কায় আসতে পারবেন এবং ওমরাহ পালন শেষে মক্কা ত্যাগ করবেন।
- অস্ত্র বহনে নিষেধাজ্ঞা: মুসলমানরা কোনো যুদ্ধাস্ত্র আনতে পারবেন না; আত্মরক্ষার্থে কেবল কোষবদ্ধ তলোয়ার সঙ্গে রাখতে পারবেন।
- মক্কার কোনো ব্যক্তি মদিনায় গেলে ফেরত দান: মক্কার কোনো নাবালক বা অভিভাবকের অনুমতিহীন ব্যক্তি মদিনায় আশ্রয় নিলে তাকে মক্কায় ফেরত দিতে হবে।
- মদিনার কোনো ব্যক্তি মক্কায় এলে ফেরত না দেওয়া: মদিনার কোনো মুসলিম মুরতাদ হয়ে মক্কায় আশ্রয় নিলে কুরাইশরা তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে না।
- গোত্রসমূহের সাথে মৈত্রী চুক্তির স্বাধীনতা: আরবের যেকোনো গোত্র স্বাধীনভাবে মুসলমানদের সাথে বা কুরাইশদের সাথে মিত্রতায় আবদ্ধ হতে পারবে (এর ভিত্তিতে বনু খুজাআ মুসলমানদের সাথে এবং বনু বকর কুরাইশদের সাথে মৈত্রী চুক্তি করে)।
- ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা: কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলা মদিনার পথ দিয়ে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবে এবং মুসলিমরা নিরাপদ থাকবে।
- চুক্তির শর্তে পারস্পরিক বিশ্বস্ততা: কোনো পক্ষই চুক্তি লঙ্ঘন করবে না এবং বিশ্বাসঘাতকতা থেকে বিরত থাকবে।
- নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা: আরবের সামগ্রিক শান্তি ও বাণিজ্যিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখা হবে।
২. আল্লাহ তায়ালা কেন একে ‘ফাতহুম মুবীন’ (সুস্পষ্ট বিজয়) আখ্যা দিলেন? (لماذا سماه الله فتحا مبينا):
সন্ধিপত্র সম্পাদনের পর সাহাবিদের মন যখন ভারাক্রান্ত ছিল, তখন মহান আল্লাহ সূরা ফাতহের প্রথম আয়াতে অবতীর্ণ করেন:
﴿إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا﴾ (“নিশ্চয়ই আমি আপনার জন্য এক সুস্পষ্ট বিজয় উন্মুক্ত করে দিয়েছি”)। একে ‘ফাতহুম মুবীন’ বলার কারণসমূহ নিম্নরূপ:
- কুরাইশ কর্তৃক মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি: এতদিন কুরাইশরা মুসলমানদের বিদ্রোহী মনে করত; কিন্তু এই চুক্তিতে সমমর্যাদায় স্বাক্ষর করার মাধ্যমে তারা মদিনার ইসলামি রাষ্ট্র ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আন্তর্জাতিক কর্তৃত্বকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
- মুক্ত দাওয়াহ ও মেলামেশার সুযোগ: যুদ্ধবিরতির ফলে উভয় পক্ষের মানুষের মধ্যে অবাধ মেলামেশা ও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়। মক্কার অমুসলিমরা মুসলমানদের অনুপম চরিত্র ও কুরআনের সৌন্দর্যের সংস্পর্শে আসে।
- বিপুলসংখ্যক মানুষের ইসলাম গ্রহণ: ঐতিহাসিক ইবনে হিশামের মতে, নবুওয়াতের সূচনা থেকে হুদায়বিয়া পর্যন্ত ১৯ বছরে যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল, হুদায়বিয়ার পরবর্তী মাত্র ২ বছরে তার চেয়ে দ্বিগুণ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আমর ইবনুল আসের মতো মহান বীরেরা এ সময়েই মুসলমান হন।
- আন্তর্জাতিক সম্রাটদের নিকট চিঠি প্রেরণ: মক্কার দিক থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) রোম, পারস্য, আবিসিনিয়া ও মিশরের রাজাদের কাছে ইসলামের দাওয়াতি চিঠি প্রেরণ করেন।
- মক্কা বিজয়ের পথ সুগম হওয়া: এই চুক্তির ধারার মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত কুরাইশরা চুক্তি ভঙ্গ করে এবং এর প্রত্যক্ষ পরিণতি হিসেবে রক্তপাতহীনভাবে ঐতিহাসিক ‘মক্কা বিজয়’ (فتح مكة) অর্জিত হয়।
উপসংহার: হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অতুলনীয় রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞার শ্রেষ্ঠ স্মারক, যা ইসলামের বিশ্বজয়ের স্বর্ণদ্বার উন্মোচন করেছিল।
مجموعة (ب) : খ-অংশ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী) (মান: ২ × ১০ = ২০)
٧- ما هي السيرة النبوية وما هي أهمية دراستها؟
[৭. সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ কী এবং সিরাত অধ্যয়নের গুরুত্ব আলোচনা কর।]
ভূমিকা: মানবজাতির মুক্তির দিশারী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনচরিতই হলো ‘সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ’। কুরআন মজিদের বাস্তব ও জীবন্ত ব্যাখ্যা হলো তাঁর পবিত্র সিরাত।
১. সিরাতুন নাবাবিয়্যার সংজ্ঞা:
- শাব্দিক অর্থ: ‘সিরাত’ (السيرة) শব্দের অর্থ পথ, পদ্ধতি, স্বভাব, জীবনধারা বা জীবনবৃত্তান্ত।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জন্ম, শৈশব, যৌবন, নবুওয়াত লাভ, মক্কী ও মাদানী জীবনের দাওয়াতি তৎপরতা, যুদ্ধবিগ্রহ, রাষ্ট্র পরিচালনা, চারিত্রিক গুণাবলি এবং ওফাত পর্যন্ত সমগ্র বরকতময় জীবনের প্রামাণিক ইতিহাসকে ‘আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ’ বলা হয়।
২. সিরাত অধ্যয়নের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:
- কুরআন অনুধাবনের প্রধান মাধ্যম: সিরাত না জানলে কুরআনের আয়াতের শানে নুযুল ও বাস্তব প্রয়োগ বোঝা অসম্ভব। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন: «كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ» (“কুরআনই ছিল তাঁর চরিত্র”)।
- উত্তম আদর্শের অনুসরণ (الأسوة الحسنة): মহান আল্লাহ বলেন: ﴿لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ﴾। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসুল (সা.)-এর বাস্তব আদর্শ গ্রহণের জন্য সিরাত পাঠ অপরিহার্য।
- রাসুল (সা.)-এর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা বৃদ্ধি: কাউকে না জেনে তাকে ভালোবাসা যায় না। সিরাত পাঠের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আত্মত্যাগ ও উম্মতের প্রতি ভালোবাসার গভীরতা উপলব্ধি হয়, যা পূর্ণাঙ্গ ঈমানের শর্ত।
- দাওয়াতি কাজের দিকনির্দেশনা: প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে ধৈর্য ধারণ করতে হয় এবং সমাজ সংস্কার করতে হয়, সমকালীন দাঈদের জন্য সিরাত হলো সর্বশ্রেষ্ঠ পথনির্দেশিকা।
উপসংহার: সিরাত চর্চা কেবল একটি ঐতিহাসিক জ্ঞান নয়; বরং এটি আমাদের ঈমানি চেতনা ও সুন্নাতি জিন্দেগি গঠনের প্রাণশক্তি।
٨- ما هي بيعة العقبة؟ واذكر ما جرى في بيعة العقبة الأولى بالتفصيل-
[৮. বায়’আতে আক্বাবা কী? প্রথম বায়’আতে আক্বাবার ঘটনাবলি বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা: মক্কার মিনা প্রান্তরের ‘আক্বাবা’ নামক গিরিপথে ইয়াসরিবের (মদিনার) আনসারদের সাথে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্পাদিত দ্বীনি অঙ্গীকার ও আনুগত্যের শপথকে ‘বায়’আতে আক্বাবা’ বলা হয়। এটি হিজরত ও ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
১. বায়’আতে আক্বাবার পরিচয়:
নবুওয়াতের একাদশ ও দ্বাদশ বর্ষের হজ মৌসুমে মিনার আক্বাবা নামক স্থানে গোপনে মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের লোকদের সাথে রাসুল (সা.) যে ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ করেন, তা ইতিহাসে বায়’আতে আক্বাবা নামে পরিচিত। এটি দুই দফায় অনুষ্ঠিত হয়: প্রথম বায়’আতে আক্বাবা (নবুওয়াতের ১২শ বর্ষ) এবং দ্বিতীয় বায়’আতে আক্বাবা (নবুওয়াতের ১৩শ বর্ষ)।
২. প্রথম বায়’আতে আক্বাবা (১২ জন প্রতিনিধি):
- সময় ও সদস্য: নবুওয়াতের দ্বাদশ বর্ষে (৬২১ খ্রি.) হজের মৌসুমে ইয়াসরিব থেকে আগত ১২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি (১০ জন খাজরাজ ও ২ জন আউস গোত্রের) আক্বাবার উপত্যকায় রাসুল (সা.)-এর হাতে আনুগত্যের বায়’আত গ্রহণ করেন। এতে নেতৃত্ব দেন হযরত আস’আদ ইবনে যুরারাহ (রা.)।
- বায়’আতের মূল বিষয় ও শর্তাবলি (শপথনামা): হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, তাঁরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে নিম্নোক্ত মৌলিক নৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়ে শপথ করেন:
- আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করব না।
- চুরি করব না।
- ব্যভিচারে লিপ্ত হব না।
- সন্তানদের হত্যা করব না।
- কাউকে মিথ্যা অপবাদ ও অপপ্রচার দেব না।
- কোনো সৎকাজে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অবাধ্য হব না।
- মুসআব বিন উমাইর (রা.)-কে শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ: বায়’আত শেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে মদিনাবাসীদের কুরআন ও ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য ইসলামের প্রথম রাষ্ট্রদূত ও শিক্ষক হিসেবে মদিনায় প্রেরণ করেন। তাঁর দাওয়াতে মদিনার ঘরে ঘরে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ে।
উপসংহার: প্রথম বায়’আতে আক্বাবা মদিনায় রক্তপাতহীন ইসলামি সমাজ বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, যাকে ‘বায়’আতুন নিসা’ (অহিংস নৈতিক শপথ)-ও বলা হয়।
٩- اكتب نبذة عن أخلاق النبي (ص) وشمائله الكريمة-
[৯. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুপম চরিত্র ও মহান গুণাবলি সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
ভূমিকা: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চরিত্র ও নৈতিকতা ছিল মানবতার ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন: ﴿وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ﴾ (“নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত”)।
১. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশিষ্ট চারিত্রিক গুণাবলি (الشمائل والأخلاق):
- সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতা: নবুওয়াত লাভের পূর্বেই মক্কার ঘোর শত্রুরাও তাঁর সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্ত) এবং ‘আস-সাদিক’ (সত্যবাদী) উপাধি দিয়েছিল। হিজরতের রাতেও তিনি শত্রুদের আমানত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
- ক্ষমা ও দয়াশীলতা (العفو والرحمة): তায়েফের ময়দানে পাথরের আঘাতে রক্তে জুতো মোবারক ভিজে গেলেও তিনি তাদের ধ্বংস না চেয়ে হেদায়েতের দোয়া করেছেন। মক্কা বিজয়ের দিন চরম শত্রু আবু সুফিয়ান ও ক্বাবা চত্বরে সমবেত হত্যাকারীদের উদ্দেশ্য করে ঘোষণা করেন: «لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ» (“আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন”)।
- বিনয় ও সাধারণ জীবনযাপন: রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও তিনি খেজুর পাতার পাটিতে শুয়ে রাত কাটাতেন। নিজের জুতো নিজে সেলাই করতেন, ঘরের কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন এবং শিশুদের দেখলে বুকে জড়িয়ে সালাম দিতেন।
- ন্যায়পরায়ণতা: আইনের চোখে সবাই সমান—এ নীতি বাস্তবায়নে তিনি কুরাইশ বংশের সম্ভ্রান্ত নারীর চুরির মামলায় স্পষ্ট ঘোষণা করেন: “মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।”
উপসংহার: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই অনুপম চরিত্রই শতধা বিভক্ত বর্বর জাতিকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সভ্য জাতিতে পরিণত করেছিল।
١٠- ما هو الفرق بين الجهاد والقتال؟ وما هو حكم الجهاد في العصر الحاضر؟
[১০. জিহাদ ও ক্বিতালের মধ্যে পার্থক্য কী? বর্তমান যুগে জিহাদের বিধান আলোচনা কর।]
ভূমিকা: ইসলামে ‘জিহাদ’ একটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ অথচ প্রায়শ ভুল ব্যাখ্যায় জর্জরিত প্রত্যয়। জিহাদ ও ক্বিতালের সূক্ষ্ম পার্থক্য অনুধাবন করা বিশুদ্ধ ইসলামি দর্শনের অন্যতম মৌলিক দিক।
১. জিহাদ ও ক্বিতালের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য:
| বিষয় | জিহাদ (الجهاد) | ক্বিতাল (القتال) |
|---|---|---|
| অর্থ ও ব্যপ্তি | ‘জুহদ’ (الجهد) ধাতু থেকে উদ্ভূত; অর্থ সত্য প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম। এটি অত্যন্ত ব্যাপক। | ‘ক্বাতল’ (القتل) ধাতু থেকে উদ্ভূত; অর্থ কেবল সশস্ত্র যুদ্ধ বা অস্ত্র হাতে মুখোমুখি লড়াই করা। |
| মাধ্যম | জ্ঞান, বুদ্ধি, কলম, অর্থ, দাওয়াহ, নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও প্রয়োজনবোধে সশস্ত্র যুদ্ধ। | কেবলমাত্র অস্ত্র ও সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রেই ক্বিতাল সীমাবদ্ধ। |
| সময়কাল | শত্রুর আক্রমণ থাকুক বা না থাকুক, ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে জিহাদ কিয়ামত পর্যন্ত সার্বক্ষণিক চলমান। | কেবল সুনির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে জালেমের আগ্রাসন প্রতিহত করতে রাষ্ট্রীয় নির্দেশনায় সাময়িক প্রয়োগ। |
২. বর্তমান যুগে জিহাদের হুকুম ও প্রাসঙ্গিকতা (حكم الجهاد في العصر الحاضر):
- জিহাদুন নাফস (আত্মশুদ্ধির জিহাদ): নিজের কুপ্রবৃত্তি, লোভ-লালসা ও পাপের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা সর্বযুগে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ‘ফরজে আইন’। রাসুল (সা.) একে ‘জিহাদে আকবর’ বা শ্রেষ্ঠ জিহাদ বলেছেন।
- জিহাদ বিল ক্বলম ওয়াল লিসান (বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ): বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তি ও মিডিয়ার যুগ। কুরআন-সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান প্রচার, ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব দান এবং শিক্ষাক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন সমকালীন শ্রেষ্ঠ জিহাদ।
- জিহাদ বিল মাল (অর্থনৈতিক জিহাদ): মুসলিম উম্মাহর অর্থনৈতিক মুক্তি, দারিদ্র্য বিমোচন ও ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রসারে সম্পদ ব্যয় করা কুরআনের নির্দেশনায় ফরজ।
- সশস্ত্র জিহাদ (ক্বিতাল): অন্যায় আগ্রাসন প্রতিহত করতে বৈধ মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও শর্তসাপেক্ষে ক্বিতাল প্রযোজ্য; কোনো ব্যক্তি বা অননুমোদিত দলের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
উপসংহার: জিহাদ ধ্বংসের নাম নয়; বরং অন্যায় উচ্ছেদ করে সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার এক সামগ্রিক ও গঠনমূলক প্রচেষ্টার নাম।
١١- ما هو حلف الفضول؟ واذكر خلفية تكوينه وموقف النبي (ص) منه-
[১১. হিলফুল ফুজুল কী? এর গঠন পটভূমি এবং এতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভূমিকা আলোচনা কর।]
ভূমিকা: ইসলামপূর্ব জাহিলি আরবে নির্যাতিত ও মজলুমের অধিকার রক্ষার জন্য যে ঐতিহাসিক শান্তিসংঘ বা কল্যাণ সমিতি গঠিত হয়েছিল, তাকে ‘হিলফুল ফুজুল’ (حلف الفضول) বলা হয়। কিশোর মুহাম্মদ (সা.) এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
১. হিলফুল ফুজুলের পটভূমি (خلفية تكوينه):
- হারবুল ফিজারের বিভীষিকা: অন্যায় রক্তক্ষয়ী ‘হারবুল ফিজার’ (পাপের যুদ্ধ) প্রত্যক্ষ করে আরবের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা চরমভাবে ব্যথিত হন। কিশোর মুহাম্মদ (সা.) এ যুদ্ধে আহতদের সেবা ও তীর কুড়িয়ে দিয়েছিলেন।
- ইয়েমেনি ব্যবসায়ীর সাথে আস ইবনে ওয়ায়েলের প্রতারণা: জুবায়েদ গোত্রের এক ইয়েমেনি ব্যবসায়ী মক্কায় পণ্য বিক্রি করেন। কুরাইশ সর্দার আস ইবনে ওয়ায়েল আস-সাহমী পণ্য গ্রহণ করে পণ্যের মূল্য পরিশোধে অস্বীকৃতি জানায়। নিরুপায় হয়ে ব্যবসায়ীটি আবু কুবাইস পাহাড়ে উঠে কুরাইশদের ন্যায়বিচারের জন্য উচ্চকণ্ঠে ফরিয়াদ জানায়।
- আব্দুল্লাহ বিন জুদ’আনের গৃহে বৈঠক: এই অন্যায়ে আলোড়িত হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা যুবাইর ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের উদ্যোগে বনু হাশিম, বনু মুত্তালিব, বনু আসাদ, বনু জুহরা ও বনু তাইম গোত্রের নেতৃবৃন্দ মক্কার বিশিষ্ট দানশীল ব্যক্তিত্ব আব্দুল্লাহ ইবনে জুদ’আনের গৃহে এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হন এবং এই ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন।
২. হিলফুল ফুজুলের মূল অঙ্গীকারসমূহ:
- মক্কার স্থানীয় বা বহিরাগত যেকোনো ব্যক্তির ওপর জুলুম করা হলে সবাই মিলে তার পাশে দাঁড়াবে।
- মজলুমের সম্পূর্ণ পাওনা জালেমের কাছ থেকে আদায় করে দেওয়া হবে।
- সমুদ্রে এক ফোঁটা পানি থাকা পর্যন্ত এবং হেরা ও সাবীর পাহাড় স্বস্থানে থাকা পর্যন্ত এ অঙ্গীকার বলবৎ থাকবে।
৩. এই চুক্তিতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অবস্থান ও ভূমিকা:
- রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন প্রায় ১৫ বা ২০ বছর বয়সী তরুণ ছিলেন। তিনি অত্যন্ত আগ্রহ ও নিষ্ঠার সাথে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
- নবুওয়াত লাভের পরও তিনি পরম শ্রদ্ধার সাথে এ চুক্তির স্মৃতিচারণ করে বলেন: «لَقَدْ شَهِدْتُ فِي دَارِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ جُدْعَانَ حِلْفًا مَا أُحِبُّ أَنَّ لِي بِهِ حُمْرَ النَّعَمِ، وَلَوْ أُدْعَى بِهِ فِي الْإِسْلَامِ لَأَجَبْتُ» (“আমি আব্দুল্লাহ বিন জুদ’আনের গৃহে এমন এক চুক্তিতে উপস্থিত ছিলাম, যার বিনিময়ে আমাকে লাল উটের পাল দেওয়া হলেও আমি খুশি হতাম না। ইসলামেও যদি আমাকে এমন কোনো ইনসাফভিত্তিক চুক্তিতে আহ্বান জানানো হয়, তবে আমি সানন্দে সাড়া দেব”)।
উপসংহার: হিলফুল ফুজুল প্রমাণ করে যে সার্বজনীন মানবাধিকার রক্ষা ও অমুসলিমদের সাথে মিলে অন্যায়ের প্রতিরোধে কাজ করা ইসলামের মৌলিক আদর্শের অংশ।
١٢- من هم بنو قريظة؟ وما هي خيانتهم في غزوة الأحزاب وكيف عوقبوا؟
[১২. বনু কুরাইজা কারা? খন্দকের যুদ্ধে তাদের বিশ্বাসঘাতকতা এবং তাদের শাস্তি কী হয়েছিল?]
ভূমিকা: মদিনার উপকণ্ঠে বসবাসকারী তিনটি প্রধান ইহুদি গোত্রের অন্যতম ছিল বনু কুরাইজা। খন্দক যুদ্ধে (গাযওয়াতুল আহযাব) মুসলিমদের পিঠে ছুরি মেরে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করার অপরাধে তারা ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছে।
১. বনু কুরাইজা পরিচিতি (من هم بنو قريظة):
বনু কুরাইজা ছিল মদিনার দক্ষিণ-পূর্বে সুদৃঢ় দুর্গবেষ্টিত অঞ্চলে বসবাসকারী একটি শক্তিশালী ইহুদি গোত্র। হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনা সনদের (وثيقة المدينة) মাধ্যমে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দেন এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষার চুক্তিতে আবদ্ধ করেন যে, কোনো বহিঃশত্রু মদিনা আক্রমণ করলে তারা মুসলিমদের সাথে মিলে মদিনা রক্ষা করবে।
২. খন্দকের যুদ্ধে তাদের বিশ্বাসঘাতকতা (خيانتهم في غزوة الأحزاب):
- হুয়াই ইবনে আখতাবের প্ররোচনা: হিজরি ৫ম সনে মক্কার কুরাইশ, গাফফান ও বেদুইনদের সমন্বয়ে গঠিত ১০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল সম্মিলিত বাহিনী (আহযাব) মদিনা ঘেরাও করে। এই সংকটময় মুহূর্তে নির্বাসিত বনু নাদিরের ইহুদি নেতা হুয়াই ইবনে আখতাব বনু কুরাইজার দুর্গপতি কা’ব ইবনে আসাদকে চুক্তি ভঙ্গ করতে প্ররোচিত করে।
- চুক্তি লঙ্ঘন ও পেছন থেকে আক্রমণের পরিকল্পনা: কা’ব ইবনে আসাদ মদিনা সনদ ছিন্ন করে মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা মদিনার মুসলিম নারী ও শিশুদের অরক্ষিত শিবিরের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। এতে মুসলমানরা সামনে ১০ হাজার শত্রু এবং পেছনে বনু কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতায় চরম জীবন-মরণ সংকটে নিপতিত হন (যার বর্ণনা সূরা আহযাবে এসেছে)।
৩. বনু কুরাইজার শাস্তি ও পরিণতি (عقوبة بني قريظة):
- দুর্গ অবরোধ: খন্দক থেকে শত্রু বাহিনী বিতাড়িত হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বনু কুরাইজার দুর্গ অভিমুখে রওনা হন এবং ২৫ দিন তাদের দুর্গ অবরোধ করে রাখেন।
- সা’দ ইবনে মুয়াজ (রা.)-কে সালিশ নিযুক্ত: কোনো উপায় না পেয়ে বনু কুরাইজা তাদের পুরোনো মিত্র আউস গোত্রের প্রধান হযরত সা’দ ইবনে মুয়াজ (রা.)-এর ফয়সালা মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণ করে।
- তাওরাতের বিধান অনুযায়ী ফয়সালা: সা’দ ইবনে মুয়াজ (রা.) তাদের নিজস্ব ধর্মগ্রন্থ তাওরাতের যুদ্ধাপরাধী ও দেশদ্রোহীর বিধান (Deuteronomy 20:10-14) অনুযায়ী রায় দেন যে, তাদের যুদ্ধক্ষম পুরুষদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, নারী ও শিশুদের বন্দী করা হবে এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে।
- ফয়সালার বাস্তবায়ন: রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন: “তুমি তাদের ব্যাপারে আসমানের সাত স্তরের ওপর থেকে আল্লাহর ফয়সালা অনুযায়ী রায় দিয়েছ।” পরবর্তীতে খন্দকের যুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী প্রায় ৪০০ থেকে ৭০০ যোদ্ধাকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
উপসংহার: বনু কুরাইজার এই পরিণতি ছিল তাদের জঘন্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও সম্মিলিত মুসলিম জাতিকে গণহত্যার চক্রান্তের এক ন্যায়সঙ্গত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. আইয়ামে জাহিলিয়াত বলতে কোন সময়কে বোঝায়?
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত প্রকাশের পূর্ববর্তী যুগকে আইয়ামে জাহিলিয়াত বা অজ্ঞতার যুগ বলা হয়, যা রাজনৈতিক অরাজকতা, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও শিরকে নিমজ্জিত ছিল।
২. রাসুলুল্লাহ (সা.) কত বছর গোপনে ইসলামের দাওয়াত দেন?
নবুওয়াত লাভের পর মহানবী (সা.) প্রাথমিক পর্যায়ে ৩ বছর গোপনে ইসলামের দাওয়াত পরিচালনা করেন এবং সাফা পাহাড়ের পাদদেশে ‘দারুল আরকাম’-কে দাওয়াতের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেন।
৩. হুদায়বিয়া সন্ধি কোন হিজরি সনে এবং কত বছরের জন্য স্বাক্ষরিত হয়েছিল?
হিজরি ৬ষ্ঠ সনে (৬২৮ খ্রি.) মক্কার অদূরে হুদায়বিয়ায় মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে আগামী ১০ বছরের যুদ্ধবিরতির শর্তে এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
৪. পবিত্র কুরআনে কোন যুদ্ধকে ‘ইয়াওমুল ফুরক্বান’ বলা হয়েছে?
হিজরি ২য় সনের ১৭ রমজান সংঘটিত ঐতিহাসিক ‘বদর যুদ্ধ’-কে সত্য ও মিথ্যার চূড়ান্ত মীমাংসার দিন হিসেবে পবিত্র কুরআনে ‘ইয়াওমুল ফুরক্বান’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
৫. হিলফুল ফুজুল শান্তিচুক্তি কোন সাহাবির বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল?
মক্কার বিশিষ্ট মহানুভব ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনে জুদ’আনের বাসভবনে নিপীড়িত ও মজলুমের অধিকার সুরক্ষায় হিলফুল ফুজুল চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল।
৬. প্রথম বায়’আতে আক্বাবায় কতজন মদিনাবাসী অংশগ্রহণ করেছিলেন?
নবুওয়াতের দ্বাদশ বর্ষে মিনার আক্বাবা প্রান্তরে মদিনার (ইয়াসরিবের) আউস ও খাজরাজ গোত্রের ১২ জন বিশিষ্ট প্রতিনিধি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে প্রথম বায়’আতে আক্বাবা সম্পন্ন করেছিলেন।