ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: তারিখ ইলমুল হাদিস (Tarikh Ilm al-Hadith)
বিষয় কোড: ২০২২০১
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ক বিভাগ (القسم الأول) – পূর্ণাঙ্গ প্রশ্ন সমাধান
١. ما المراد بتدوين الحديث؟ بين تاريخ تدوين الحديث في عهد الصحابة موضحا-
[১. হাদিস সংকলন দ্বারা কী বোঝায়? অতঃপর সাহাবাদের (রা) যুগের হাদিস সংকলনের ইতিহাস বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামী শরীয়তের দ্বিতীয় বুনিয়াদি উৎস হলো আল-হাদিস। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর সাহাবায়ে কিরাম (রা.) দ্বীনের এই অমূল্য সম্পদ সংরক্ষণ ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অবিকৃতভাবে হস্তান্তরের জন্য যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তা মুসলিম ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়।
১. হাদিস সংকলন (تدوين الحديث)-এর পরিচয়
আভিধানিক অর্থ: ‘তাদভীন’ (تدوين) শব্দটি বাবে তাফঈল-এর মাসদার, যার আভিধানিক অর্থ হলো—সংগ্রহ করা (الجمع), লিপিবদ্ধ করা (الكتابة), গ্রন্থবদ্ধ করা (التقييد في الديوان) বা একত্রিত করে গ্রন্থ রূপ দেওয়া।
পারিভাষিক অর্থ: মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায়— “جمع الأحاديث النبوية وتقييدها بالكتابة في صحف أو كتب لحفظها من الضياع” অর্থাৎ, “নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসসমূহ বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে সহীফা বা গ্রন্থে আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ ও একত্রিত করাকে তাদভীনে হাদিস বা হাদিস সংকলন বলে।”
২. সাহাবায়ে কিরামের (রা.) যুগে হাদিস সংকলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সাহাবায়ে কিরামের যুগে হাদিস সংরক্ষণ মূলত তিনটি ধারায় পরিচালিত হয়েছিল:
- হিফয ও অসাধারণ স্মৃতিশক্তি (الحفظ والإتقان): সাহাবায়ে কিরাম প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। নবীজী (সা.)-এর প্রতিটি কথা তাঁরা হৃদয়ে ধারণ করতেন এবং নিয়মিত পরস্পরের মাঝে মুযাকারা (আলোচনা ও পুনরাবৃত্তি) করতেন।
- আমলি অনুশীলন (الممارسة العملية): সাহাবীগণ রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহকে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে হুবহু বাস্তবায়ন করতেন, যা সুন্নাহকে জীবন্ত ও সংরক্ষিত রেখেছিল।
- কিতাবাত বা ব্যক্তিগত লিপিবদ্ধকরণ (الكتابة والتقييد): নবী করীম (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই সাহাবীগণ হাদিস লিখতে শুরু করেন। সাহাবা যুগে এই ধারা আরও গতিশীল হয়।
৩. সাহাবা যুগে হাদিস সংরক্ষণে সতর্কতা ও পদ্ধতি
খোলাফায়ে রাশেদীন হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতেন:
- সাক্ষী তলব (طلب البينة): হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) কোনো একক সাহাবীর হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে অন্য কোনো সাহাবীর সাক্ষ্য গ্রহণ করতেন। হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রা.) যখন দাদীর মিরাস সম্পর্কে হাদিস বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর (রা.) মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.)-এর সাক্ষ্য নিয়ে তা গ্রহণ করেন।
- কসম গ্রহণ (الاستحلاف): হযরত আলী (রা.) কোনো কোনো বর্ণনাকারীকে হাদিস শোনার সত্যতার ব্যাপারে কসম করতে বলতেন।
- হাদিস অন্বেষণে দীর্ঘ ইলমি সফর (الرحلة في طلب الحديث): দূরদূরান্তে বসবাসকারী সাহাবীদের থেকে সরাসরি হাদিস শুনতে সাহাবীগণ দীর্ঘ সফর করতেন। হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) মাত্র একটি হাদিসের জন্য এক মাসের পথ পাড়ি দিয়ে শামে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনায়স (রা.)-এর নিকট উপস্থিত হয়েছিলেন। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) মিসরে গিয়ে হযরত উকবা ইবনে আমির (রা.) থেকে হাদিস যাচাই করেন।
৪. সাহাবা যুগে রচিত উল্লেখযোগ্য হাদিসের সহীফাসমূহ
- আস-সহীফাতুস সাদীকা (الصحيفة الصادقة): হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) কর্তৃক রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুমতিক্রমে লিখিত সহীফা, যাতে প্রায় এক হাজার হাদিস লিপিবদ্ধ ছিল।
- সহীফায়ে আলী (রা.): হযরত আলী (রা.)-এর নিকট সংরক্ষিত সহীফা, যাতে রক্তপণ (দিয়াত), বন্দিমুক্তি ও মদিনার হারাম সীমানা সংক্রান্ত বিধানাবলি ছিল।
- সহীফায়ে জাবির (রা.): হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)-এর সংকলন, যা মূলত হজের আহকাম ও অন্যান্য মাসআলা সম্বলিত ছিল।
- সহীফায়ে সা’দ ইবনে উবাদাহ (রা.): বিশিষ্ট আনসারী সাহাবী হযরত সা’দ (রা.)-এর হাদিস সংকলন।
- সহীফায়ে সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.): হযরত সামুরা (রা.) কর্তৃক তাঁর পুত্রের জন্য লিখিত সহীফা।
- সহীফায়ে আনাস ইবনে মালিক (রা.): হযরত আনাস (রা.) নবীজী (সা.)-এর হাদিস লিখে তাঁকে প্রদর্শন করে অনুমোদন নিতেন।
- সহীফায়ে আবু হুরায়রা ও হাম্মাম ইবনে মুনাব্বিহ: হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর ছাত্র হাম্মাম ইবনে মুনাব্বিহ কর্তৃক লিখিত ১৩৮টি হাদিস সংবলিত সহীফা, যা প্রাচীনতম অবিকৃত হাদিস গ্রন্থ হিসেবে আজও সংরক্ষিত রয়েছে।
উপসংহার
সাহাবায়ে কিরামের অসাধারণ বিশ্বস্ততা, গভীর তাকওয়া এবং কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমেই হাদিসের বিশুদ্ধতা অক্ষুণ্ণ ছিল, যা পরবর্তী তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈদের যুগে হাদিসের মহাগ্রন্থসমূহ প্রণয়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
٢. تحدث عن تدوين علم الحديث في القرن الثاني الهجري- ثم بين منهج الإمام مالك (رح) في ‘المؤطأ’ مع بيان مكانته بين الكتب المشهورة في الحديث-
[২. হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীতে হাদিস সংকলন সম্পর্কে আলোচনা কর। অতঃপর ‘আল-মুয়াত্তা’ সংকলনের ক্ষেত্রে ইমাম মালেক (রহ) এর রচনা পদ্ধতি ও হাদিসের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহের মধ্যে এর অবস্থান সম্পর্কে বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দী হলো হাদিস শাস্ত্রের আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকলনের স্বর্ণযুগ। এ শতাব্দীতেই হাদিসসমূহ বিষয়ভিত্তিক অধ্যায় বিন্যাসে (আবুয়াব অনুযায়ী) গ্রন্থবদ্ধ করা শুরু হয় এবং ইমাম মালেক (রহ.)-এর ‘আল-মুয়াত্তা’র মতো যুগান্তকারী গ্রন্থের আবির্ভাব ঘটে।
১. হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীতে হাদিস সংকলনের রূপরেখা
হিজরি দ্বিতীয় শতকের শুরুতে উমাইয়া খলিফা হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.) (ওফাত: ১০১ হি.) রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করে হাদিস সংকলনের নির্দেশ দেন। তিনি মদিনার গভর্নর আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আমর ইবনে হাযম এবং ইমাম মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব আয-যুহরী (রহ.)-কে হাদিস সংগ্রহের দায়িত্ব অর্পণ করেন।
এ শতাব্দীর সংকলনের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- বিষয়ভিত্তিক বিন্যাস (الترتيب على الأبواب الفقهية): ঈমান, সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ, ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি ফিকহী অধ্যায় অনুসারে হাদিস সাজানো হয়।
- মারফু ও মাওকুফ হাদিসের একত্রীকরণ: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসের পাশাপাশি সাহাবায়ে কিরামের ফতোয়া ও তাবেঈগণের আসার অন্তর্ভুক্ত করা হতো।
- প্রধান সংকলকগণ ও তাঁদের গ্রন্থসমূহ:
- মক্কায়: ইবনে জুরাইজ (ওফাত: ১৫০ হি.)।
- মদিনায়: ইমাম মালেক ইবনে আনাস (ওফাত: ১৭৯ হি.) – ‘মুয়াত্তা ইমাম মালেক’।
- বসরায়: সাঈদ ইবনে আবি আরূবা (ওফাত: ১৫৬ হি.) ও হাম্মাদ ইবনে সালামাহ (ওফাত: ১৬৭ হি.)।
- কুফায়: সুফিয়ান আস-সাওরী (ওফাত: ১৬১ হি.)।
- শামে: ইমাম আওযায়ী (ওফাত: ১৫৭ হি.)।
- খুরাসানে: আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (ওফাত: ১৮১ হি.)।
- ইয়েমেনে: মা’মার ইবনে রাশিদ (ওফাত: ১৫৩ হি.)।
২. ‘আল-মুয়াত্তা’ (الموطأ)-এ ইমাম মালেক (রহ.)-এর অনুসৃত মানহাজ ও পদ্ধতি
ইমাম দারুল হিজরাহ মালেক ইবনে আনাস (৯৩–১৭৯ হি.) দীর্ঘ চল্লিশ বছর সাধনা করে তাঁর অমর গ্রন্থ ‘আল-মুয়াত্তা’ রচনা করেন। ‘মুয়াত্তা’ শব্দের অর্থ সুবিন্যস্ত, সর্বজনস্বীকৃত বা সহজবোধ্য। তাঁর অনুসৃত পদ্ধতি ছিল:
- উচ্চমানের সনদ নির্বাচন (أصح الأسانيد): ইমাম মালেক সনদের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তাঁর বর্ণিত সনদ “মালেক আন নাফে’ আন ইবনে উমর” হাদিস বিজ্ঞানে ‘সিলসিলাতুয যাহাব’ বা স্বর্ণশিকল নামে খ্যাত।
- আহলে মদিনার আমলের প্রাধান্য (عمل أهل المدينة): তিনি মদিনাবাসীর অবিচ্ছিন্ন আমলকে মুতাওয়াতির সনদের সমতুল্য শক্তিশালী দলিল হিসেবে বিবেচনা করতেন।
- মারফু, মাওকুফ ও মাকতু-এর সমন্বয়: মুয়াত্তায় রাসুল (সা.)-এর মারফু হাদিসের সাথে সাহাবাদের ফতোয়া এবং তাবেঈদের আসার অত্যন্ত চমৎকারভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে।
- মুরাসাল হাদিস গ্রহণ: ইমাম মালেকের মতে নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত তাবেঈর বর্ণিত মুরাসাল হাদিস সহীহ ও গ্রহণযোগ্য।
- ফিকহী অধ্যায়ভিত্তিক বিন্যাস: কিতাবুত্তাহরাত থেকে শুরু করে ফিকহী ক্রমবিন্যাস অনুযায়ী অধ্যায়সমূহ সুবিন্যস্ত করা হয়েছে।
৩. হাদিসের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহের মাঝে আল-মুয়াত্তার মর্যাদা ও অবস্থান
- ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মূল্যায়ন: ইমাম শাফেঈ (রহ.) সহীহ বুখারী রচনার পূর্বে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন: “ما على ظهر الأرض كتاب بعد كتاب الله أصح من كتاب مالك” অর্থাৎ, “আল্লাহর কিতাব পবিত্র কুরআনের পর ভূপৃষ্ঠে ইমাম মালেকের মুয়াত্তার চেয়ে বিশুদ্ধতম কোনো কিতাব নেই।”
- উম্মতের সর্বসম্মত গ্রহণযোগ্যতা: ইমাম মালেক নিজেই বলেছেন, তিনি গ্রন্থটি মদিনার সত্তরজন শীর্ষ ফকীহকে প্রদর্শন করেছিলেন, তাঁরা সকলেই এর বিশুদ্ধতা ও শ্রেষ্ঠত্বকে অকুণ্ঠচিত্তে সত্যায়ন (তাওতিয়া) করেছিলেন।
- সহীহ বুখারী ও মুসলিমের পূর্বসূরি: ইমাম বুখারী ও মুসলিম উভয়েই ইমাম মালেকের সনদের হাদিসসমূহকে তাঁদের সহীহাইনে সর্বোচ্চ মর্যাদায় স্থান দিয়েছেন। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) তাঁর ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ গ্রন্থে মুয়াত্তা মালেককে হাদিসগ্রন্থের প্রথম স্তরে (ত্ববাকায়ে উলা) স্থান দিয়েছেন।
উপসংহার
হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীতে হাদিস সংকলনের মাধ্যমে যে নবজাগরণ সূচিত হয়েছিল, ইমাম মালেকের ‘মুয়াত্তা’ ছিল তার শীর্ষতম নিদর্শন। এই গ্রন্থই পরবর্তী শতাব্দীর সিহাহ সিত্তাহ সংকলনের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে।
٣. اكتب نبذة عن حياة الإمام النسائي مع بيان خصائص سنن النسائي مختصرا-
[৩. ইমাম নাসায়ী (রহ) এর জীবনী এবং তাঁর সুনানুন নাসায়ী গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যসমূহ সংক্ষিপ্তাকারে লেখ।]
ভূমিকা
সিহাহ সিত্তাহ বা কুতুবে সিত্তাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংকলক হলেন ইমাম আবু আব্দুর রহমান আহমদ ইবনে শুআইব আন-নাসায়ী (রহ.)। হাদিসের রাবী যাচাই, সনদের সূক্ষ্ম ইল্লাত উদ্ঘাটন এবং ফিকহী ইস্তিম্বাতের ক্ষেত্রে তাঁর রচিত ‘সুনানুন নাসায়ী’ হাদিস সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ।
১. ইমাম নাসায়ী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
- নাম ও উপনাম: আহমদ, উপনাম আবু আব্দুর রহমান, উপাধি হাফিজুল হাদিস, শাইখুল ইসলাম।
- জন্ম ও বংশপরিচয়: তিনি ২১৫ হিজরিতে খোরাসানের অন্তর্গত প্রসিদ্ধ শহর ‘নাসা’ (Nasa)-তে জন্মগ্রহণ করেন। সেই শহরের নামানুসারেই তাঁকে ‘নাসায়ী’ বলা হয়।
- ইলম অন্বেষণ ও সফর: শৈশবেই তিনি কুরআন হিফয করেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে হিজায, ইরাক, সিরিয়া, মিসর, জাযিরা প্রভৃতি ইলমি কেন্দ্র সফর করেন। তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দিস কুতাইবা ইবনে সাঈদ, ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ, আলী ইবনে হুজর, আবু দাউদ প্রমুখের নিকট হাদিস শ্রবণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি দীর্ঘদিন মিসরে বসবাস করে হাদিস শিক্ষাদানে আত্মনিয়োগ করেন।
- চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য: তিনি অত্যন্ত পরহেযগার, মুত্তাকী, দাউদী রোজা পালনকারী (একদিন পর একদিন রোজা) এবং নির্ভীক হকপন্থী ছিলেন।
- ওফাত: ৩০৩ হিজরিতে তিনি দামেস্কে এক দল দুষ্কৃতকারী কর্তৃক নির্যাতিত হন এবং পরে মক্কায় (কিংবা ফিলিস্তিনের রামাল্লায়) শাহাদাত বরণ করেন। সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
২. সুনানুন নাসায়ীর রচনার প্রেক্ষাপট ও পরিচয়
ইমাম নাসায়ী প্রথমে ‘আস-সুনানুল কুবরা’ নামে একটি বিশাল হাদিস গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। যখন ফিলিস্তিনের আমীর তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এর সব হাদিসই কি সহীহ?” তিনি উত্তরে বললেন, “না, এতে হাসান ও যঈফ হাদিসও রয়েছে।” আমীর তাঁকে কেবল বিশুদ্ধ হাদিসগুলো বাছাই করে সংকলন করতে অনুরোধ করলে তিনি কুবরা থেকে যাচাই-বাছাই করে ‘আল-মুজতাবা’ বা ‘আস-সুনানুস সুগরা’ সংকলন করেন। সিহাহ সিত্তাহর অন্তর্ভুক্ত সুনানুন নাসায়ী বলতে এই ‘আল-মুজতাবা’-কেই বোঝানো হয়।
৩. সুনানুন নাসায়ীর অনন্য বৈশিষ্ট্যাবলি
- সনদ পরীক্ষায় চরম সতর্কতা: ইমাম নাসায়ী রাবীদের বিশ্বস্ততা ও সনদের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে ইমাম মুসলিমের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে অধিক কঠোর ছিলেন। এজন্য অনেকে সুনানে আবু দাউদ ও তিরমিযীর পূর্বে সুনানে নাসায়ীর মর্যাদা নির্ধারণ করেছেন।
- সনদের সূক্ষ্ম ত্রুটি ও ইল্লাত প্রদর্শন (بيان العلل): একই হাদিস একাধিক সনদে বর্ণনা করে তিনি রাবীদের শব্দের তারতম্য, কোনো রাবীর বিভ্রান্তি বা ত্রুটি অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
- অনন্য তারাজিমুল আবওয়াব (অধ্যায় শিরোনাম): ফিকহী ইস্তিম্বাতের জন্য তিনি এমন সূক্ষ্ম ও চমৎকার শিরোনাম নির্ধারণ করেছেন যা হাদিসের নিগূঢ় ফিকহী বিধানকে স্পষ্ট করে দেয়।
- সহীহ হাদিসের সংখ্যাধিক্য: সিহাহ সিত্তাহর সুনান গ্রন্থগুলোর মধ্যে নাসায়ীতে যঈফ বা দুর্বল হাদিসের সংখ্যা সবচেয়ে কম। হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী ও ইবনুল আসীর (রহ.)-এর মতে, সুনান গ্রন্থসমূহের মধ্যে নাসায়ীর মর্যাদা শীর্ষে।
- পুনরাবৃত্তির বৈচিত্র্য: কোনো হাদিস বারবার আনলেও তিনি ভিন্ন ভিন্ন সনদ ও নতুন নতুন ফিকহী সূক্ষ্মতা প্রমাণে তা উপস্থাপন করেছেন।
উপসংহার
ইমাম নাসায়ী (রহ.) হাদিসের বিশুদ্ধতা রক্ষায় যে কঠোর মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, সুনানুন নাসায়ী তারই প্রামাণ্য দলিল। বিশ্বজুড়ে মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের কাছে এই কিতাব এক অপরিহার্য নির্দেশিকা হিসেবে সমাদৃত।
٤. بين تاريخ تدوين الحديث في القرن الرابع الهجري- ثم اذكر خمسة أسماء من الكتب المؤلفة في هذا القرن-
[৪. হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে হাদিস সংকলনের ইতিহাস সম্পর্কে বর্ণনা কর। অতঃপর উক্ত শতাব্দীতে রচিত পাঁচটি হাদিসের কিতাবের নাম উল্লেখ কর।]
ভূমিকা
হিজরি তৃতীয় শতকে যখন সিহাহ সিত্তাহসহ মৌলিক হাদিস গ্রন্থসমূহের প্রণয়ন সম্পন্ন হয়, তখন হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে হাদিস সংকলনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এ শতাব্দীতে প্রধানত মুস্তাদরাকাত (শর্ত পূরণকারী হাদিস সংগ্রহ), মুসতাখরাজাত (স্বতন্ত্র সনদে পূর্ববর্তী কিতাবের হাদিস সংকলন), মা’আজিম (উস্তাদভিত্তিক সংকলন) এবং সুনান গ্রন্থসমূহ রচিত হয়।
১. হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে হাদিস সংকলনের গতিধারা ও বৈশিষ্ট্য
চতুর্থ হিজরির হাদিস সংকলন শাস্ত্রীয় দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল:
- মুস্তাদরাক রচনা পদ্ধতি: ইমাম বুখারী ও মুসলিম যে শর্তাবলি আরোপ করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের গ্রন্থে স্থান দেননি, এমন সহীহ হাদিসসমূহ খুঁজে বের করে সংকলন করা। এর শীর্ষ উদাহরণ ইমাম হাকিম নিশাপুরী (রহ.)-এর ‘আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাঈন’।
- মুসতাখরাজ রচনা পদ্ধতি: সহীহ বুখারী বা মুসলিমের হাদিসগুলোকে লেখক নিজের ভিন্ন সনদে রাসুলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত পৌঁছিয়ে সংকলন করতেন। যেমন—আবু আওয়ানা (রহ.)-এর ‘মুসতাখরাজ আবি আওয়ানা আলা সহীহ মুসলিম’ এবং আবু নুআইম আল-ইসবাহানীর মুসতাখরাজ। এর ফলে সনদ আরও শক্তিশালী হতো এবং নতুন শব্দ ও ব্যাখ্যা পাওয়া যেত।
- মা’আজিম সংকলন: মুহাদ্দিসগণ তাঁদের শায়েখ বা উস্তাদগণের নামের বর্ণানুক্রমে হাদিস সংকলন করেন। যেমন ইমাম তাবারানী (রহ.)-এর তিনটি মু’জাম (আল-মু’জামুল কাবীর, আল-মু’জামুল আওসাত, আল-মু’জামুস সাগীর)।
- ফিকহুল হাদিস ও আহকামভিত্তিক সংকলন: আহকাম ও শারঈ মাসআলার পক্ষে হাদিসের দালিলিক বিশ্লেষণ যেমন ইমাম তাহাবী (রহ.) এবং ইমাম দারাকুতনী (রহ.)-এর সংকলনসমূহ।
- হাদিসের রাবী ও জারহ-তা’দীল শাস্ত্রের বিকাশ: রাবীদের জীবনী ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বিশাল বিশ্বকোষ রচিত হয়। যেমন ইমাম ইবনে হিব্বানের ‘কিতাবু তাহযীবুস সিক্বাত’ ও ‘আল-মাজরূহীন’।
২. হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে রচিত পাঁচটি প্রসিদ্ধ হাদিস গ্রন্থের বিবরণ
- সহীহ ইবনে হিব্বান (صحيح ابن حبان): ইমাম আবু হাতিম মুহাম্মদ ইবনে হিব্বান আল-বুসতী (ওফাত: ৩৫৪ হি.) কর্তৃক রচিত। তিনি প্রচলিত ফিকহী অধ্যায়ের পরিবর্তে তাওহীদ, ইলম, নসীহত, ইতিহাস ও তাকদীর ইত্যাদির ভিত্তিতে সম্পূর্ণ অভিনব পন্থায় সহীহ হাদিসগুলো সাজিয়েছিলেন। এর মূল নাম ‘আত-তাকাসীম ওয়াত তানওয়াঈ’।
- সুনানুদ দারাকুতনী (سنن الدارقطني): আবুল হাসান আলী ইবনে উমর আদ-দারাকুতনী (ওফাত: ৩৮৫ হি.) কর্তৃক রচিত। ফিকহী আহকামের দলিলসমূহ সংকলনের পাশাপাশি হাদিসের দুর্বলতা, ইল্লাত এবং সনদের ত্রুটি উন্মোচনে এটি এক অনুপম কিতাব।
- আল-মু’জামুল কাবীর (المعجم الكبير): ইমাম আবুল কাসিম সুলাইমান ইবনে আহমদ আত-তাবারানী (২৬০–৩৬০ হি.) কর্তৃক রচিত। সাহাবায়ে কিরামের নামের বর্ণানুক্রমে বিন্যস্ত এক সুবিশাল হাদিস কোষ, যাতে প্রায় ২৫ হাজারেরও বেশি হাদিস সংকলিত রয়েছে।
- শারহু মুশকিলিল আসার (شرح مشكل الآثار): ইমাম আবু জাফর আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আত-তাহাবী (২৩৯–৩২১ হি.) রচিত। বাহ্যত বিরোধপূর্ণ হাদিসসমূহের মধ্যে চমৎকার সমন্বয় সাধনে এটি ইসলামী সাহিত্যের অনন্য মাস্টারপিস।
- সহীহ ইবনে খুযাইমাহ (صحيح ابن خزيمة): ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযাইমাহ (ওফাত: ৩১১ হি.) কর্তৃক রচিত। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের পর বিশুদ্ধতার দিক দিয়ে এটিকে অন্যতম শীর্ষ সহীহ সংকলন গণ্য করা হয়।
উপসংহার
হিজরি চতুর্থ শতাব্দী হাদিস বিজ্ঞানের ভিত্তিকে পূর্ণতা দান করেছিল। এ শতাব্দীর মুহাদ্দিসগণের অক্লান্ত পরিশ্রমে পূর্ববর্তী শতাব্দীর হাদিসগুলোর সনদগত দৃঢ়তা শতগুণে বৃদ্ধি পায় এবং হাদিস সংরক্ষণ চিরন্তন রূপ লাভ করে।
٥. تحدث عن منهج الإمام الطحاوي في كتابه “شرح مشكل الآثار” واهتمام العلماء فيه-
[৫. ‘শারহু মুশকিলিল আসার’ কিতাব রচনার ক্ষেত্রে ইমাম তাহাবীর অনুসৃত পদ্ধতি ও আলেমগণের মাঝে এর গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
হানাফী মাযহাবের শীর্ষ মুহাদ্দিস ও ফকীহ ইমাম আবু জাফর আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আত-তাহাবী (২৩৯–৩২১ হি.) ছিলেন ইলমে হাদিস ও ফিকহের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। হাদিসের পারস্পরিক বাহ্যিক আপাত বিরোধ নিরসনে তাঁর অমর সৃষ্টি ‘শারহু মুশকিলিল আসার’ (شرح مشكل الآثار) হাদিস গবেষণায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
১. ইমাম তাহাবী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়
তিনি মিশরের ‘ত্বাহা’ নামক গ্রামে ২৩৯ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে তিনি তাঁর মামা ইমাম ইসমাঈল ইবনে ইয়াহইয়া আল-মুযানী (ইমাম শাফেঈর শীর্ষ ছাত্র)-এর নিকট শাফেঈ ফিকহ শিক্ষা করেন। পরবর্তীতে তিনি হানাফী মাযহাব গ্রহণ করেন এবং মিশরের প্রধান কাযী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি হাদীস ও ফিকহ উভয় শাস্ত্রে ইমামের মর্যাদা লাভ করেন।
২. ‘শারহু মুশকিলিল আসার’-এ ইমাম তাহাবীর অনুসৃত মানহাজ ও পদ্ধতি
ইমাম তাহাবী এই গ্রন্থে যে বৈজ্ঞানিক ও গভীর গবেষণাধর্মী পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তা নিম্নরূপ:
- মুশকিল হাদিস নির্বাচন: যে সকল হাদিসের অর্থ বাহ্যত কুরআন, অন্যান্য সহীহ হাদিস, সুস্থ বিবেক বা প্রতিষ্ঠিত ইজমার সাথে বিরোধপূর্ণ মনে হয়, তিনি সেগুলোকে বিষয়ভিত্তিক শিরোনামে একত্রিত করেছেন।
- পূর্ণ সনদসহ হাদিস উপস্থাপন: তিনি কেবল হাদিসের মতন উল্লেখ করেননি; বরং নিজস্ব শক্তিশালী সূত্রে সনদসহ হাদিস উল্লেখ করেছেন। ফলে এটি কেবল ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ নয়, স্বয়ং একটি মৌলিক রিওয়ায়েতের কিতাব।
- ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ (التحليل اللغوي): আরবী ভাষার সূক্ষ্ম ব্যুৎপত্তি, শাব্দিক অলংকার ও রূপক অর্থের সাহায্যে তিনি বিরোধপূর্ণ শব্দের জট খুলেছেন।
- নাসেখ-মানসুখ নীতি প্রয়োগ: একাধিক সহীহ হাদিসের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও অবতীর্ণের সময়কাল পর্যালোচনা করে কোনটি নাসেখ (রহিতকারী) এবং কোনটি মানসুখ (রহিত) তা অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে সাব্যস্ত করেছেন।
- ফিকহী সমন্বয় সাধন (التوفيق والجمع): মুহাদ্দিসগণের সাধারণ নিয়ম—হাদিস বর্জন না করে বরং ক্ষেত্রবিশেষে উভয় হাদিসের ওপর আমলের পথ উন্মুক্ত রাখা। ইমাম তাহাবী নিপুণভাবে দুটি আপাত বিপরীত হাদিসকে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য বিধান করেছেন।
- দলিলভিত্তিক নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ: তিনি হানাফী ফকীহ হওয়া সত্ত্বেও অন্ধ অনুকরণের ঊর্ধ্বে উঠে দলিলের শক্তিমত্তার বিচারে ফয়সালা দিয়েছেন।
৩. আলেম ও গবেষক সমাজের মাঝে এ কিতাবের গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা
- ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (রহ.)-এর মূল্যায়ন: তিনি ইমাম তাহাবীর এই পদ্ধতিকে হাদিস ব্যাখ্যার সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং তাঁর রচিত ‘উমদাতুল কারী’-তে বহুবার এই কিতাব থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
- ইবনে কাসীর ও ইবনে হাজার (রহ.)-এর নির্ভরতা: তাফসীর ও হাদিসের জটিল ব্যাখ্যায় হাফিজ ইবনে কাসীর ও হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী ইমাম তাহাবীর মুশকিলুল আসারের তাহকীককে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকারী প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
- মাযহাব নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্যতা: শুধু হানাফী আলেমগণই নন; বরং শাফেঈ, মালেকী ও হাম্বলী ফকীহগণও হাদিসের বিরোধ নিরসনে (মুখতালাফুল হাদিস) এই কিতাবকে প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
উপসংহার
ইমাম তাহাবীর ‘শারহু মুশকিলিল আসার’ গ্রন্থটি প্রমাণ করে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহীহ হাদিসসমূহের মধ্যে কোনো প্রকৃত বিরোধ নেই; বাহ্যিক বিরোধ মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার ফসল। এই গ্রন্থটি উম্মাহর বিভ্রান্তি দূরীকরণে এক অক্ষয় আলোকবর্তিকা।
٦. عرف الحديث الصحيح، والحديث الموضوع ثم بين جهود المحدثين في حفظ صحة الحديث عن سقيمه-
[৬. সহিহ হাদিস এবং মাওজু হাদিসের পরিচয় দাও। অতঃপর হাদিসের দুর্বলতা ও জাল হাদিস থেকে বিশুদ্ধতা রক্ষায় মুহাদ্দিসিনের প্রচেষ্টাসমূহ আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামের মৌলিক বিধানাবলি সুন্নাহর ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে এক শ্রেণীর ভ্রান্ত গোষ্ঠী নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য সাধনে এবং কতিপয় অজ্ঞ ব্যক্তি সওয়াবের আশায় হাদিস জাল করতে উদ্যত হয়েছিল। মুহাদ্দিসিনে কিরাম তাঁদের পর্বতসম ত্যাগ ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের মাধ্যমে বিশুদ্ধ হাদিসকে অপবিত্র জাল মিশ্রণ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রেখেছেন।
১. সহীহ হাদিস (الحديث الصحيح)-এর সংজ্ঞা ও শর্তাবলি
পারিভাষিক সংজ্ঞা: হাফিজ ইবনুস সালাহ (রহ.)-এর মতে— “الحديث الصحيح هو المسند الذي يتصل إسناده بنقل العدل الضابط عن العدل الضابط إلى منتهاه، ولا يكون شاذا ولا معللا” অর্থাৎ, “যে হাদিসের সনদের ধারাবাহিকতা রাসুলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন, যার প্রত্যেক বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ (আদল) ও পূর্ণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী (যাবত), এবং হাদিসটি শায (অধিকাংশের বর্ণনাবিরোধী) ও কোনো সূক্ষ্ম ত্রুটি (মু’আল্লাল) মুক্ত—তাকেই সহীহ হাদিস বলে।”
সহীহ হাদিসের ৫টি মৌলিক শর্ত:
- সনদ অবিচ্ছিন্ন হওয়া (اتصال السند)।
- রাবী ন্যায়পরায়ণ ও তাকওয়াবান হওয়া (عدالة الرواة)।
- রাবীর পূর্ণ স্মরণশক্তি ও সংরক্ষণ ক্ষমতা থাকা (ضبط الرواة)।
- হাদিসটি শায না হওয়া (عدم الشذوذ)।
- কোনো গোপন ক্ষতিকর ত্রুটি না থাকা (عدم العلة القادحة)।
২. মাওজু হাদিস (الحديث الموضوع)-এর সংজ্ঞা ও পরিচয়
পারিভাষিক সংজ্ঞা: “هو المختلق المصنوع المنسوب إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم كذبا وزورا” অর্থাৎ, “যে বক্তব্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা ও বানোয়াটভাবে বানিয়ে প্রচার করা হয়েছে, তাকে মাওজু বা জাল হাদিস বলে।”
মাওজু হাদিস মূলগতভাবে কোনো হাদিসই নয়; এটি হাদিসের নিকৃষ্টতম প্রকার এবং এর ওপর আমল করা বা রাসুল (সা.)-এর হাদিস বলে প্রচার করা সম্পূর্ণ হারাম ও জাহান্নামের কারণ।
৩. বিশুদ্ধ হাদিস সুরক্ষায় মুহাদ্দিসগণের ঐতিহাসিক প্রচেষ্টাসমূহ
- ইলমে জারহ ও তা’দীল আবিষ্কার (علم الجرح والتعديل): বর্ণনাকারীদের চরিত্র, সততা, আকিদা, স্মৃতিশক্তি এবং দুর্বলতা যাচাই করার এক অনন্য শাস্ত্র মুহাদ্দিসগণ উদ্ভাবন করেন। আপন পিতা বা পুত্রের ব্যাপারেও তাঁরা সত্য প্রকাশে বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি।
- সনদ তলব ও সনদের অনিবার্যতা (الإسناد من الدين): ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেন: “الإسناد من الدين، ولولا الإسناد لقال من شاء ما شاء” (সনদ দ্বীনের অংশ, সনদ না থাকলে যে যার খুশি তা-ই বলে বেড়াত)। সনদবিহীন কোনো বর্ণনা মুসলিম উম্মাহ গ্রহণ করেনি।
- জাল হাদিস শনাক্তকরণের বৈজ্ঞানিক মূলনীতি প্রণয়ন:
- রাবীর চরিত্র বিশ্লেষণ (মিথ্যাবাদী বা ফাসিক হিসেবে পরিচিতি)।
- ঐতিহাসিক অসম্ভাব্যতা (যে রাবী দাবি করে সে অমুক শায়খ থেকে শুনেছে, অথচ ওই শায়খের ওফাতের পর তার জন্ম)।
- মতন বা বক্তব্যের বিকৃতি (কুরআনের অকাট্য বিধান, সুপ্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ কিংবা সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির স্পষ্ট বিরোধী হওয়া)।
- অতি তুচ্ছ কাজে পাহাড়সম সওয়াব বা সাধারণ ত্রুটিতে চরম শাস্তির অবাস্তব ঘোষণা।
- জাল হাদিসের পৃথক বিশ্বকোষ রচনা: মুহাদ্দিসগণ জাল হাদিসসমূহকে চিহ্নিত করে আলাদা গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন যাতে সাধারণ মানুষ সতর্ক হতে পারে। যেমন:
- ইবনুল জাওযী (রহ.)-এর ‘আল-মাওদূ’আত’।
- আল্লামা সুয়ূতী (রহ.)-এর ‘আল-লাআলীল মাসনূ’আহ ফিল আহাদীসিল মাওদূ’আহ’।
- মোল্লা আলী কারী (রহ.)-এর ‘আল-আসরারুল মারফূ’আহ ফিল আখবারিল মাওদূ’আহ’।
- ইলমে তাখরীজ ও রিজাল গ্রন্থ প্রণয়ন: ইমাম বুখারীর ‘আত-তারীখুল কাবীর’, ইবনে হাজার আসকালানীর ‘তাহযীবুত তাহযীব’ ও ‘তাকরীবুত তাহযীব’, মিযযীর ‘তাহযীবুল কামাল’ ইত্যাদি কালজয়ী গ্রন্থ।
উপসংহার
মুহাদ্দিসিনে কিরামের অতন্দ্র প্রহরার ফলেই আজ চৌদ্দশত বছর পরও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সুন্নাহ স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ ও অবিকৃত অবস্থায় আমাদের মাঝে সংরক্ষিত রয়েছে।
٧. ماذا تعرف عن الكتاب المستدرك؟ بين منهج الامام أبي عبد الله الحاكم في كتابه وإهتمام العلماء به-
[৭. আল-মুস্তাদরাক কিতাব সম্পর্কে তুমি কী জান? ইমাম আবু আবদুল্লাহ আল-হাকিম এর উক্ত কিতাব সংকলন পদ্ধতি এবং আলেমগণের মাঝে উহার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
হাদিস শাস্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংকলন হলো ইমাম হাকিম নিশাপুরী (রহ.) রচিত ‘আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাঈন’। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শর্ত পূরণকারী কিন্তু উক্ত দুই ইমামের গ্রন্থে অনুপুস্থিত সহীহ হাদিসসমূহকে এক মলাটে একত্রিত করার এক অসাধারণ গবেষণা হলো এই গ্রন্থ।
১. কিতাবুল মুস্তাদরাক (المستدرك على الصحيحين)-এর পরিচয়
গ্রন্থকার: ইমামুল মুহাদ্দিসীন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ আন-নিশাপুরী, যিনি ‘আল-হাকিম’ নামে খ্যাত (৩২১–৪০৫ হি.)।
মুস্তাদরাক শব্দের অর্থ: ‘মুস্তাদরাক’ (مستدرك) অর্থ হলো যা পূর্ববর্তী লেখক বা সংকলকের হাত থেকে ছুটে গেছে তা খুঁজে বের করে পরিপূরক হিসেবে সংযোজন করা।
রচনার উদ্দেশ্য: একশ্রেণীর বিভ্রান্ত ব্যক্তি ধারণা করেছিল যে, বুখারী ও মুসলিম যে কয়টি হাদিস সংকলন করেছেন কেবল সেগুলোই সহীহ, এর বাইরে আর কোনো সহীহ হাদিস নেই। এই ভ্রান্ত ধারণা দূর করে ইমাম হাকিম প্রমাণ করেন যে, সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বাইরেও সহীহ সনদের বিশাল হাদিস ভাণ্ডার বিদ্যমান।
২. আল-মুস্তাদরাক সংকলনে ইমাম হাকিমের মানহাজ ও পদ্ধতি
ইমাম হাকিম তাঁর কিতাবে হাদিসসমূহকে প্রধানত তিনটি স্তরে বিন্যস্ত করেছেন:
- বুখারী ও মুসলিম উভয়ের শর্ত অনুযায়ী সহীহ (صحيح على شرط الشيخين): যে হাদিসের রাবীগণ ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম উভয়ের নিকট নির্ভরযোগ্য এবং সনদের স্তর তাঁদের শর্ত পূরণ করে।
- বুখারীর শর্তে সহীহ অথবা মুসলিমের শর্তে সহীহ (صحيح على شرط أحدهما): যে হাদিসের রাবীগণ কেবল ইমাম বুখারীর অথবা কেবল ইমাম মুসলিমের শর্ত পূরণ করেন।
- সনদগতভাবে সহীহ কিন্তু বুখারী-মুসলিমের শর্তাধীন নয় (صحيح الإسناد ولم يخرجاه): রাবীগণ ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত হলেও বুখারী ও মুসলিমের রাবীদের অন্তর্ভুক্ত নন।
৩. ইমাম হাকিমের তাসাহুল (শিথিলতা) ও আলেমগণের সমালোচনা
ইমাম হাকিম অত্যন্ত দ্রুততার সাথে জীবনের শেষ প্রান্তে এই গ্রন্থটি সংকলন করেছিলেন এবং পূর্ণাঙ্গ পরিমার্জনের সুযোগ পাওয়ার পূর্বেই ওফাত বরণ করেন। ফলে তিনি কিছু যঈফ, এমনকি কিছু মাওজু হাদিসকেও সহীহ বলে রায় দিয়ে ফেলেছেন। হাদিস বিজ্ঞানে ইমাম হাকিমকে ‘মুতাসাহিল’ (শিথিলতাকারী) মুহাদ্দিস হিসেবে গণ্য করা হয়।
৪. কিতাবটির প্রতি আলেমগণের বিশেষ গুরুত্ব ও ইমাম যাহাবীর তালখীস
- ইমাম যাহাবীর ভূমিকা (تلخيص الذهبي): অষ্টম হিজরির শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (রহ.) মুস্তাদরাকের প্রতিটি হাদিস চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ‘তালখীসুল মুস্তাদরাক’ রচনা করেন। তিনি ইমাম হাকিমের নির্ভুল সিদ্ধান্তগুলোকে সমর্থন করেছেন এবং ভুলগুলোকে সুস্পষ্টভাবে ধরিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে মুস্তাদরাকের সাথে যাহাবীর মন্তব্য ছাড়া কোনো হাদিসকে চূড়ান্ত সহীহ বলা হয় না।
- হাদিসের বিশাল সম্পদ: সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বাইরে শরীয়তের বহু গুরুত্বপূর্ণ হুকুম ও ঐতিহাসিক দলিলের জন্য আল-মুস্তাদরাক এক অপরিহার্য বিশ্বকোষ।
- ইবনে হাজার ও সুয়ূতীর অভিমত: হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, ইমাম হাকিমের মুস্তাদরাকের প্রায় অর্ধেক হাদিস বুখারী-মুসলিমের শর্তে সহীহ, এক-চতুর্থাংশ অন্যান্য সহীহ সনদে প্রমাণিত এবং বাকি এক-চতুর্থাংশের মধ্যে যঈফ ও মুনকার রয়েছে।
উপসংহার
কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতা থাকা সত্ত্বেও ইমাম হাকিমের ‘আল-মুস্তাদরাক’ ইসলামী জ্ঞানের এক কালজয়ী ভাণ্ডার। ইমাম যাহাবীর তাহক্বীকসহ এই গ্রন্থটি মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের গবেষণার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি।
٨. إلى أي موضوع توجه المحدثون في تدوين علم الحديث في القرن الخامس الهجري؟ تحدث عن الامام البغوي و كتابه “مصابيح السنة” موجزا-
[৮. হিজরি পঞ্চম শতাব্দীতে ইলমুল হাদিস সংকলনের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ কোন বিষয়ের প্রতি মনোনিবেশ করেছিলেন? ইমাম বাগভী ও তার রচিত মাসাবিহুস সুন্নাহ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
হিজরি পঞ্চম শতাব্দীতে হাদিস বিজ্ঞানের গতিধারা নতুন মোড় নেয়। এ শতাব্দীতে মূল গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি পূর্ববর্তী মৌলিক কিতাবগুলোর সংকলন, সংক্ষিপ্তকরণ, ব্যাখ্যা এবং উসূলে হাদিস বা হাদিস বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক নীতিমালা প্রণয়নের প্রতি মুহাদ্দিসগণ বিশেষ মনোনিবেশ করেন।
১. হিজরি পঞ্চম শতাব্দীতে মুহাদ্দিসগণের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু
পঞ্চম হিজরিতে মুহাদ্দিসগণ প্রধানত নিম্নোক্ত বিষয়সমূহে মনোনিবেশ করেন:
- পূর্ববর্তী বিশাল গ্রন্থসমূহের সমন্বিত সংকলন (الجمع بين الأصول): সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমকে একত্র করে ‘আল-জাম’উ বায়নাস সহীহাঈন’ রচনার ধারা শুরু হয় (যেমন ইমাম হুমাইদীর সংকলন)।
- সনদ বর্জন করে কেবল মতন সংকলন (تجريد المتون عن الأسانيد): সাধারণ মানুষ ও আলেমদের সহজে আমল করার সুবিধার্থে দীর্ঘ সনদ বাদ দিয়ে বিষয়ভিত্তিক সহীহ হাদিসের সংকলন তৈরি করা হয়।
- উসূলে হাদিস ও মুসতালাহুল হাদিস শাস্ত্রের চূড়ান্ত সংকলন: খতীব আল-বাগদাদী (ওফাত: ৪৬৩ হি.) হাদিসের প্রতিটি বিষয়ের ওপর একক গ্রন্থ রচনা করে উসূলে হাদিসের বুনিয়াদ পূর্ণাঙ্গ করেন (যেমন ‘আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ’)।
- হাদিস ব্যাখ্যা ও ফিকহুল হাদিস: হাদিসের কঠিন শব্দের ব্যাখ্যা (গরীবুল হাদিস) ও ফিকহী ইস্তিম্বাত নিয়ে ব্যাপক গ্রন্থ রচিত হয়। যেমন ইমাম বায়হাকী (রহ.)-এর ‘আস-সুনানুল কুবরা’।
২. ইমাম আল-বাগভী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়
নাম ও উপাধি: আবু মুহাম্মদ আল-হুসাইন ইবনে মাসউদ আল-ফাররা আল-বাগভী। তিনি ‘মুহয়িউস সুন্নাহ’ (সুন্নাহর পুনরুজ্জীবনকারী) এবং ‘রুকনুদ্দীন’ উপাধিতে ভূষিত হন।
জন্ম ও কর্মজীবন: তিনি ৪৩৬ বা ৪৩৭ হিজরিতে খোরাসানের মার্ভের নিকটবর্তী ‘বাগ’ নামক অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে যুগশ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস এবং শাফেঈ ফকীহ। তাঁর রচিত ‘তাফসীরুল বাগভী’ (মা’আলিমুত তানযীল) এবং ‘শারহুস সুন্নাহ’ জগদ্বিখ্যাত। তিনি ৫১৬ হিজরিতে মার্ভে ওফাত বরণ করেন।
৩. ‘মাসাবিহুস সুন্নাহ’ (مصابيح السنة) গ্রন্থের বিবরণ
- রচনার উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য: ইমাম বাগভী সাধারণ মুসলিম ও তালেবে ইলমদের আমলের সুবিধার জন্য সিহাহ সিত্তাহ ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ কিতাব থেকে খাঁটি হাদিসগুলো চয়ন করে এই গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।
- অভিনব বিন্যাস শৈলী: তিনি প্রতিটি অধ্যায়ে হাদিসগুলোকে দুটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন:
- সহীহ শ্রেণী (الصحاح): সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদিসসমূহ।
- হাসান শ্রেণী (الحسان): সুনানে আবু দাউদ, জামে’ তিরমিযী, সুনানে নাসায়ী ইত্যাদি গ্রন্থের হাদিসসমূহ।
- সনদ বর্জন: গ্রন্থটিকে সংক্ষিপ্ত ও সহজে ব্যবহারযোগ্য রাখার জন্য তিনি সনদ সম্পূর্ণ বর্জন করে কেবল হাদিসের মূল মতন উল্লেখ করেছেন।
- ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’-এর মূল উৎস: ইমাম বাগভীর এই ‘মাসাবিহুস সুন্নাহ’ কিতাবটির ভিত্তি ধরেই পরবর্তীতে অষ্টম হিজরিতে ইমাম ওয়ালীউদ্দীন আত-তিবরীযী (রহ.) প্রতিটি অধ্যায়ে তৃতীয় পরিচ্ছেদ (যাতে মুসনাদে আহমদ, বায়হাকী, দারেমী ইত্যাদি গ্রন্থের হাদিস যোগ করা হয়) এবং সনদের উৎসগ্রন্থের নাম উল্লেখ করে বিশ্ববিখ্যাত ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’ সংকলন করেন।
উপসংহার
ইমাম বাগভীর ‘মাসাবিহুস সুন্নাহ’ গ্রন্থটি দরসি ও আমলি অঙ্গনে হাদিস চর্চাকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। তাঁর এই সংকলন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম উম্মাহকে সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করে আসছে।
খ বিভাগ (القسم الثاني) – সংক্ষিপ্ত টীকা (৪টির উত্তর আবশ্যক, এখানে সবগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দেওয়া হলো)
٩. علق على اربعة مما يلى:
[৯. নিচের যে কোনো চারটি বিষয়ে টীকা লেখ:]
(الف) الجامع (আল-জামি’)
পরিচয়: হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষায় ‘আল-জামি” এমন হাদিস সংকলনকে বলা হয়, যাতে দ্বীনের সমস্ত মৌলিক ও প্রয়োজনীয় আটটি বিষয়ের হাদিস পূর্ণাঙ্গভাবে সন্নিবেশিত থাকে।
আটটি প্রধান বিষয়: (১) আকাইদ ও ঈমান, (২) আহকাম ও ফিকহ, (৩) সিয়ার ও তারিখ (নবীর জীবনী ও ইসলামের ইতিহাস), (৪) আদাব ও শিষ্টাচার, (৫) তাফসীর ও উলুমুল কুরআন, (৬) ফিতান ও কিয়ামতের আলামত, (৭) আশরাত ও রিক্বাক্ব (পরকাল ও আধ্যাত্মিক নসীহত), (৮) মানাকিব ও মাআসির (সাহাবাদের মর্যাদা)।
উদাহরণ: ইমাম বুখারীর ‘আল-জামি’উস সহীহ’ এবং ইমাম তিরমিযীর ‘আল-জামি’উল কাবীর’।
(ب) المسند (আল-মুসনাদ)
পরিচয়: মুসনাদ হলো হাদিসের এমন গ্রন্থ, যা বিষয়ভিত্তিক ফিকহী অধ্যায়ে সাজানো হয় না; বরং সাহাবায়ে কিরামের নামের ক্রমানুসারে (যেমন আশারায়ে মুবাশশারা, আহলে বদর বা নামের বর্ণানুক্রমে) সাজানো হয়। একজন সাহাবী রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে যত হাদিস বর্ণনা করেছেন, তা এক স্থানে একত্রিত করা হয়।
উদাহরণ: ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর ‘মুসনাদে আহমদ’, যাতে প্রায় চল্লিশ হাজার হাদিস রয়েছে।
(ج) السنن (আস-সুনান)
পরিচয়: যে সমস্ত হাদিস গ্রন্থ কেবল ফিকহী আহকাম ও হালাল-হারামের মাসআলা অনুযায়ী সাজানো হয় এবং যাতে সাধারণ ফিকহ গ্রন্থসমূহের মতো কিতাবুত্তাহরাত, কিতাবুস্ সালাত ইত্যাদি অধ্যায়ভিত্তিক বিন্যাস থাকে, তাকে ‘সুনান’ বলা হয়। এতে সাধারণত আকাইদ, ইতিহাস বা ফিতান সংক্রান্ত হাদিস থাকে না।
উদাহরণ: সুনানে আবু দাউদ, সুনানুন নাসায়ী, সুনানে ইবনে মাজাহ এবং সুনানুদ দারামী।
(د) المكثرون في الرواية (আল-মুকসিরুনা ফির রিওয়ায়াহ)
পরিচয়: যে সকল সাহাবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এক সহস্রাধিক (১,০০০+) হাদিস বর্ণনা করেছেন, হাদিস বিজ্ঞানে তাঁদের ‘আল-মুকসিরুনা ফির রিওয়ায়াহ’ (সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী) বলা হয়।
সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী শীর্ষ সাহাবীগণ:
- হযরত আবু হুরায়রা (রা.) – ৫,৩৭৪টি হাদিস।
- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) – ২,৬৩০টি হাদিস।
- হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) – ২,২৮৬টি হাদিস।
- উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) – ২,২১০টি হাদিস।
- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) – ১,৬৬০টি হাদিস।
- হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) – ১,৫৪০টি হাদিস।
- হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) – ১,১cwটি হাদিস।
(هـ) مسند الأمام أبي حنيفة (رح) (মুসনাদে ইমাম আবু হানিফা)
পরিচয়: ইমামে আযম আবু হানিফা নোমান ইবনে সাবিত (৮০–১৫০ হি.) ছিলেন ফিকহে ইসলামীর প্রধান ইমাম। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যে সকল হাদিস তাঁর নির্ভরযোগ্য উস্তাদগণের মাধ্যমে বর্ণনা করেছিলেন, সেগুলোকে তাঁর শীর্ষ ছাত্র ও পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ সংকলন করেন। এটি ‘মুসনাদে ইমাম আবু হানিফা’ নামে খ্যাত। এতে আবু হানিফা (রহ.)-এর শক্তিশালী মারফু হাদিসসমূহ ও সুউচ্চ সনদ সংকলিত রয়েছে। বিখ্যাত মুহাদ্দিস আবুল মুআইয়্যাদ মুহাম্মদ ইবনে মাহমুদ আল-খোয়ারিজমী (ওফাত: ৬৫৫ হি.) ইমাম আবু হানিফার ১৭টি ভিন্ন ভিন্ন মুসনাদ একত্রিত করে ‘জামি’উল মাসানীদ লিল ইমামিল আযম’ সংকলন করেন।
(و) صحيح ابن حبان (সহীহ ইবনে হিব্বান)
পরিচয়: বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ইমাম আবু হাতিম মুহাম্মদ ইবনে হিব্বান আল-বুসতী (ওফাত: ৩৫৪ হি.) কর্তৃক সংকলিত বিখ্যাত সহীহ হাদিস গ্রন্থ। এর মূল নাম “আল-মুসনাদুস সহীহ আলাত তাকাসীম ওয়াত তানওয়াঈ”। তিনি প্রচলিত অধ্যায়ের বাইরে নির্দেশাবলি, নিষেধাবলি, সংবাদসমূহ এবং রাসুল (সা.)-এর গুণাবলি ইত্যাদি অভিনব বিন্যাসে হাদিসগুলো সাজিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আমির আলাউদ্দীন আল-ফারিসী এটিকে ফিকহী অধ্যায়ে বিন্যস্ত করে নাম দেন ‘আল-ইহসান ফী তাকরীব সহীহ ইবনে হিব্বান’।
(ز) شرح معاني الآثار (শারহু মা’আনিল আসার)
পরিচয়: ইমাম আবু জাফর আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আত-তাহাবী (২৩৯–৩২১ হি.) রচিত আহকামুল হাদিস শাস্ত্রের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। এই কিতাবে ইমাম তাহাবী ফিকহী মাসআলা অনুযায়ী আপাত বিরোধপূর্ণ হাদিসসমূহ পূর্ণ সনদসহ উল্লেখ করেছেন এবং সাহাবায়ে কিরামের ফতোয়া, ঐতিহাসিক কার্যকারণ ও গভীর যুক্তির মাধ্যমে হানাফী মাযহাবের দলিলের শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশুদ্ধতা প্রমাণ করেছেন।
(ح) عمر بن عبد العزيز (رح) (উমর ইবনে আব্দুল আজিজ)
পরিচয়: উমাইয়া খলিফা হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (৬১–১০১ হি.) ছিলেন ইসলামের পঞ্চম ন্যায়পরায়ণ খলিফা ও হিজরি প্রথম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ। তিনিই প্রথম মুসলিম শাসক যিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করে হাদিস সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধকরণের নির্দেশ দেন। তিনি মদিনার গভর্নর আবু বকর ইবনে হাযম এবং ইমাম যুহরীকে হাদিস সংকলনের গুরুদায়িত্ব প্রদান করেন, যা হাদিস সাহিত্যের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় বিপ্লব ঘটায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. হাদিস সংকলন (تدوين الحديث) বলতে কী বোঝায়?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসসমূহকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সহীফা বা কিতাবে আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ ও সংকলন করাকে তাদভীনে হাদিস বলে।
২. সাহাবা যুগে হাদিস সংরক্ষণে প্রধান মাধ্যম কী ছিল?
সাহাবা যুগে হাদিস সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম ছিল প্রখর মুখস্থকরণ (হিফয), পারস্পরিক মুযাকারা, বাস্তব আমল এবং সহীফাতুস সাদীকা ও সহীফায়ে আলীর মতো নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিগত লিখিত সহীফা।
৩. মুয়াত্তা ইমাম মালেকের অনন্য বৈশিষ্ট্য কী?
মুয়াত্তা ইমাম মালেক হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সংকলন, যাতে স্বর্ণালী সনদ (সিলসিলাতুয যাহাব), মদিনাবাসীর অবিচ্ছিন্ন আমল এবং ফিকহী অধ্যায়বিন্যাসের মাধ্যমে বিশুদ্ধ হাদিস ও আসার সন্নিবেশিত হয়েছে।
৪. সুনানুন নাসায়ীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য কী?
সুনানুন নাসায়ীতে সনদের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে, হাদিসের রাবীদের সূক্ষ্ম ত্রুটি ও ইল্লাত তুলে ধরা হয়েছে এবং এতে দুর্বল হাদিসের সংখ্যা অত্যন্ত কম।
৫. ইমাম হাকিমের ‘আল-মুস্তাদরাক’ গ্রন্থের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম যে সকল শর্তের ওপর ভিত্তি করে হাদিস সংকলন করেছেন, কিন্তু তাঁদের গ্রন্থে আনেননি, এমন সহীহ হাদিসসমূহকে প্রমাণসহ এক মলাটে সংকলন করাই ছিল মুস্তাদরাকের মূল উদ্দেশ্য।
৬. ‘মাসাবিহুস সুন্নাহ’ এবং ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’-এর সম্পর্ক কী?
ইমাম বাগভী রচিত ‘মাসাবিহুস সুন্নাহ’-এর ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে ইমাম খতীব আত-তিবরীযী সনদের উৎসগ্রন্থ ও অতিরিক্ত হাদিস যোগ করে জগদ্বিখ্যাত ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’ সংকলন করেন।