اختبار السنة الثانية للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٠م
ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২০
الحديث والدراسات الإسلامية
আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
علوم القرآن
উলুমুল কুরআন (কুরআন সম্পর্কিত বিজ্ঞানসমূহ)
বিষয় কোড: 202205 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
الملاحظة: أجب عن خمسة أسئلة من مجموعة (أ) وعن اثنين من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য: ক-অংশ হতে ৫টি এবং খ-অংশ হতে ২টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) : ক-অংশ (রচনামূলক প্রশ্নাবলী) (মান: ৫ × ১২ = ৬০)
١- عرف القرآن الكريم لغة واصطلاحا واذكر أسماءه وصفاته وبين الفرق بينه وبين الحديث القدسي-
[১. কুরআনুল কারীমের শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা দাও, এর নাম ও গুণাবলি উল্লেখ কর এবং কুরআন ও হাদিসে কুদসির মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর।]
ভূমিকা: মহাগ্রন্থ আল-কুরআন বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহর চিরন্তন বাণী এবং সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব। মানবজাতির হেদায়েতের জন্য প্রেরিত এই অবিনশ্বর ঐশী কিতাবের পরিচিতি ও মর্যাদা অনুধাবন করা উলুমুল কুরআনের মৌলিক সূচনা।
১. কুরআনের সংজ্ঞা (تعريف القرآن الكريم):
- শাব্দিক অর্থ (المعنى اللغوي): ‘কুরআন’ (القرآن) শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে দুটি প্রধান মত রয়েছে:
- ইমাম লহইয়ানী (রহ.) ও অধিকাংশ ভাষাবিদের মতে, এটি ‘ক্বরা-আ’ (قرأ – يقرأ – قراءة) ধাতু থেকে উৎপন্ন ‘গুফরান’ (غفران)-এর ওজনে একটি মাসদার বা ভাবমূল; যার অর্থ পাঠ করা বা তিলাওয়াত করা। যেহেতু এটি বিশ্বে সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ, তাই একে কুরআন বলা হয়।
- ইমাম আশ’আরী (রহ.) ও জাজ্জাজের মতে, এটি ‘ক্বারন’ (القرن) থেকে নির্গত, যার অর্থ সংযুক্ত করা বা মেলানো; যেহেতু কুরআনের আয়াত ও সূরাগুলো একে অপরের সাথে সুনিপুণভাবে সংযুক্ত।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা (المعنى الاصطلاحي): উসূল ও কালামশাস্ত্রবিদগণের সর্বসম্মত সংজ্ঞানুযায়ী:
«هُوَ كَلَامُ اللَّهِ الْمُعْجِزُ، الْمُنَزَّلُ عَلَى خَاتَمِ الْأَنْبِيَاءِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، بِوَاسِطَةِ الْأَمِينِ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ، الْمَكْتُوبُ فِي الْمَصَاحِفِ، الْمَنْقُولُ إِلَيْنَا بِالتَّوَاتُرِ، الْمُتَعَبَّدُ بِتِلَاوَتِهِ، الْمَبْدُوءُ بِسُورَةِ الْفَاتِحَةِ وَالْمَخْتُومُ بِسُورَةِ النَّاسِ»
“কুরআন হলো মহান আল্লাহর সেই অলৌকিক কালাম, যা হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে, যা গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ, কোনো প্রকার সন্দেহের অবকাশ ছাড়াই মুতাওয়াতির সূত্রে আমাদের কাছে পৌঁছেছে, যার তিলাওয়াত ইবাদত হিসেবে গণ্য, এবং যা সূরা ফাতিহা দ্বারা শুরু হয়ে সূরা নাস দ্বারা সমাপ্ত হয়েছে।”
২. কুরআনের প্রসিদ্ধ নাম ও গুণাবলি (أسماء القرآن وصفاته):
আল্লামা যারকাশী (রহ.) ‘আল-বুরহান’ গ্রন্থে কুরআনের ৫৫টি নাম উল্লেখ করেছেন। প্রধান কয়েকটি নাম ও গুণ নিম্নরূপ:
- আল-কিতাব (الكتاب): অর্থাৎ লিখিত গ্রন্থ। আল্লাহ বলেন: ﴿ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ﴾।
- আল-ফুরক্বান (الفرقان): সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী। আল্লাহ বলেন: ﴿تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ﴾।
- আয-যিক্র (الذكر): উপদেশ বা স্মারক। আল্লাহ বলেন: ﴿إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ﴾।
- আত-তানযীল (التنزيل): পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। আল্লাহ বলেন: ﴿وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ﴾।
- কুরআনের গুণবাচক নাম (صفات القرآن): নূর (نور – আলো), হুদা (هدى – পথনির্দেশ), শিফা (شفاء – আরোগ্য), রহমত (رحمة – করুণা), হাকীম (حكيم – প্রজ্ঞাময়), এবং আযীয (عزيز – পরাক্রমশালী)।
৩. কুরআন ও হাদিসে কুদসির মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য:
| বিষয় | পবিত্র কুরআন (القرآن الكريم) | হাদিসে কুদসি (الحديث القدسي) |
|---|---|---|
| শব্দ ও মর্ম (اللفظ والمعنى) | কুরআনের শব্দ এবং মর্ম উভয়ই শতভাগ সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহিয়ে মাতলু রূপে অবতীর্ণ। | মর্ম আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম বা ওহিপ্রাপ্ত, কিন্তু শব্দ চয়ন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব। |
| অলৌকিকত্ব ও চ্যালেঞ্জ (الإعجاز والتحدي) | কুরআন বিশ্ববাসীর প্রতি একটি মুজিজা এবং এর সমকক্ষ একটি সূরা রচনারও চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। | হাদিসে কুদসির দ্বারা কোনো সাহিত্যিক বা অলৌকিক চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়নি। |
| নামাজে তিলাওয়াত ও ইবাদত | নামাজের কিরাতে কুরআন তিলাওয়াত ফরজ এবং প্রতিটি বর্ণ তিলাওয়াতে ১০টি করে নেকি অবধারিত। | নামাজে হাদিসে কুদসি পাঠ করা বৈধ নয় এবং এর সাধারণ পাঠে নির্দিষ্ট বর্ণের সওয়াব বর্ণিত হয়নি। |
| বর্ণনার সূত্র (التواتر) | কুরআনের প্রতিটি হরফ ও আয়াত অকাট্য মুতাওয়াতির সনদে সংরক্ষিত; এর একটি শব্দ অস্বীকারকারী কাফের। | হাদিসে কুদসি অধিকাংশই খবরে ওয়াহিদ (আহাদ); এর সনদে সহীহ, হাসান কিংবা যয়ীফ হতে পারে। |
| স্পর্শের বিধান | পবিত্রতা ও ওজু ব্যতীত কুরআন স্পর্শ করা জায়েজ নয়। | ওজু ছাড়াও হাদিসে কুদসি সম্বলিত গ্রন্থ স্পর্শ ও অধ্যয়ন করা যায়। |
উপসংহার: কুরআনুল কারীম হলো ঐশী বিধানের চূড়ান্ত উৎস, যা অক্ষুণ্ন শব্দ ও মর্মে মানবজাতিকে কিয়ামত পর্যন্ত সত্যের দিশা প্রদর্শন করবে।
٢- ما معنى الآية والسورة وما الحكمة من تقسيم القرآن إلى سور وآيات؟ واذكر عدد الآيات والسور-
[২. আয়াত ও সূরার অর্থ কী এবং কুরআনকে আয়াত ও সূরাতে বিভক্ত করার হিকমত বা রহস্য কী? কুরআনের মোট আয়াত ও সূরার সংখ্যা উল্লেখ কর।]
ভূমিকা: আল-কুরআনের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস সুসংহত ও সুবিন্যস্ত। এটি ১১৪টি সূরা এবং ছয় সহস্রাধিক আয়াতে বিভক্ত। এই শ্রেণিবিন্যাস স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাওকীফী বা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় নির্ধারিত হয়েছে।
১. আয়াত-এর পরিচয় ও সংখ্যা:
- শাব্দিক অর্থ: ‘আয়াত’ (الآية)-এর আভিধানিক অর্থ নিদর্শন (العلامة), অলৌকিক মুজিজা (المعجزة), শিক্ষা বা উপদেশ (العبرة), এবং কোনো কিছুর দল বা অংশবিশেষ (الجماعة)।
- পারিভাষিক অর্থ: কুরআনের সূরার অন্তর্ভুক্ত এমন বাক্য বা শব্দসমষ্টি যা একটি নির্দিষ্ট সূচনা ও সমাপ্তির মাধ্যমে অন্য বাক্য থেকে পৃথক এবং যার শুরু ও শেষ ওহির মাধ্যমে নির্ধারিত, তাকে ‘আয়াত’ বলে।
- আয়াত সংখ্যা: কুরআনের মোট আয়াত সংখ্যা ৬,০০০-এর অধিক—এ বিষয়ে সকল উলামায়ে কেরাম একমত। তবে ওয়াকফ বা বিরতির গণনাসূত্রের ভিন্নতার কারণে নির্দিষ্ট সংখ্যায় কিছুটা মতভেদ রয়েছে:
- কুফার গণনা (ইমাম আসেম ও হামযাহ): ৬,২৩৬টি (বর্তমানে বিশ্বে সর্বাধিক প্রচলিত মুসহাফ এই গণনায় মুদ্রিত)।
- মদিনার গণনা: ৬,২১৪টি।
- সাধারণ বহুল প্রচলিত লোকগণনা: ৬,৬৬৬টি (যাতে আদেশ, নিষেধ, ওয়াদা ও উপদেশের সমষ্টিগত হিসাব ধরা হয়)।
২. সূরা-এর পরিচয় ও সংখ্যা:
- শাব্দিক অর্থ: ‘সূরা’ (السورة) শব্দটি ‘সূর’ (سور) থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ নগরপ্রাচীর (حائط المدينة)। যেমন নগরপ্রাচীর একটি শহরকে সুরক্ষিত ও সুবেষ্টিত রাখে, তেমনি সূরা কুরআনের আয়াতগুলোকে একটি নির্দিষ্ট বলয়ে ধারণ করে। অন্যমতে, এর অর্থ উচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব (المنزلة الرفيعة)।
- পারিভাষিক অর্থ: কুরআনের একটি সুনির্দিষ্ট অংশ যা একাধিক আয়াত সমন্বয়ে গঠিত, যার একটি নিজস্ব নাম এবং সুনির্দিষ্ট শুরু ও শেষ রয়েছে এবং সর্বনিম্ন তিনটি আয়াত সম্বলিত, তাকে ‘সূরা’ বলে।
- সূরার সংখ্যা: পবিত্র কুরআনে সর্বসম্মতভাবে মোট ১১৪টি সূরা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি ‘সূরা আল-ফাতিহা’ এবং সর্বশেষটি ‘সূরা আন-নাস’। দীর্ঘতম সূরা ‘আল-বাকারা’ (২৮৬ আয়াত) এবং ক্ষুদ্রতম সূরা ‘আল-কাউসার’ (৩ আয়াত)।
৩. কুরআনকে সূরা ও আয়াতে বিভক্ত করার অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা (الحكمة الإلهية):
- তিলাওয়াত ও মুখস্থকরণ সহজীকরণ: সমগ্র কুরআনকে একাধারে অবিচ্ছিন্ন রাখলে তা মুখস্থ করা ও তিলাওয়াত করা মানুষের জন্য অত্যন্ত দুরূহ হতো। ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করায় শিক্ষা গ্রহণ ও হিফজ করা সহজ হয়েছে।
- উদ্দীপনা ও মানসিক তৃপ্তি: একটি নির্দিষ্ট সূরা বা অধ্যায় সমাপ্ত করলে পাঠকের অন্তরে নতুন উদ্যম, অর্জন ও তৃপ্তির অনুভূতি সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তী অংশ অধ্যয়নে প্রেরণা জোগায়।
- বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ও বৈচিত্র্য: বিভিন্ন সূরায় তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাত, পূর্ববর্তী নবীদের কাহিনী, পারিবারিক ও সামাজিক আইন ইত্যাদি স্বতন্ত্র আঙ্গিকে আলোচনা করা হয়েছে।
- নামাজে কিরাতের সুবিধা: নামাজে রুকু ও রাকাতের জন্য ছোট-বড় সূরা পাঠ করার চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
- অলৌকিক চ্যালেঞ্জ প্রমাণ: আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের কুরআনের ন্যায় একটি কিতাব, এরপর দশটি সূরা এবং পরিশেষে মাত্র একটি একক সূরা রচনার চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন (সূরা ইউনুস: ৩৮)। সূরাতে বিভক্ত থাকার ফলেই এ চ্যালেঞ্জ সুনির্দিষ্ট হয়েছে।
উপসংহার: কুরআনের সূরা ও আয়াতের এই নিখুঁত বিন্যাস মানবজাতির সহজ অনুধাবন ও সংরক্ষণের জন্য মহান রব্বুল আলামীনের এক অপার কৌশল ও রহমত।
٣- بين نزول القرآن منجماً ومفرقاً، وما هي الفوائد التربوية والتشريعية لنزوله تدريجياً؟
[৩. কুরআন পর্যায়ক্রমে ও অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট এবং ধীরে ধীরে ও কিস্তিতে নাজিল হওয়ার শিক্ষণীয় ও বিধানগত সুবিধাসমূহ আলোচনা কর।]
ভূমিকা: অন্যান্য আসমানি কিতাব (যেমন তাওরাত, ইঞ্জিল ও যাবুর) একযোগে এককালীন নাজিল হলেও পবিত্র কুরআন সুদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে ও কিস্তিতে কিস্তিতে (منجماً ومفرقاً) অবতীর্ণ হয়েছে। এই ক্রমধারায় নাজিল হওয়া কুরআনের অন্যতম অনন্য বৈশিষ্ট্য।
১. কুরআন অবতরণের স্তরসমূহ (كيفية نزول القرآن):
মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণের মতে কুরআন দুই দফায় অবতীর্ণ হয়েছে:
- প্রথম পর্যায় (এককালীন অবতরণ): লাওহে মাহফুজ (লওহে মাহফুজ) থেকে কদরের রাতে প্রথম আসমানের ‘বাইতুল ইযযাহ’ (بيت العزة)-তে সমগ্র কুরআন একযোগে অবতীর্ণ হয়। মহান আল্লাহ বলেন: ﴿إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ﴾।
- দ্বিতীয় পর্যায় (পর্যায়ক্রমিক অবতরণ): এরপর বাইতুল ইযযাহ থেকে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে পার্থিব প্রয়োজনে ও পরিস্থিতির আলোকে মহানবী (সা.)-এর ওপর দীর্ঘ প্রায় ২৩ বছরে (১৩ বছর মক্কায় ও ১০ বছর মদিনায়) তিলে তিলে অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ বলেন: ﴿وَقُرْآنًا فَرَقْنَاهُ لِتَقْرَأَهُ عَلَى النَّاسِ عَلَىٰ مُكْثٍ وَنَزَّلْنَاهُ تَنزِيلًا﴾।
২. ধীরে ধীরে ও পর্যায়ক্রমে নাজিল হওয়ার শিক্ষণীয় ও আধ্যাত্মিক সুবিধাসমূহ (الفوائد التربوية):
- রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হৃদয়ের দৃঢ়তা ও সান্ত্বনা (تثبيت فؤاد النبي): কাফেরদের নিত্যনতুন উপহাস, মিথ্যা অপবাদ ও নির্যাতনের মুখে রাসুল (সা.) যখন ব্যথিত হতেন, তখন ওহি নাজিল হয়ে তাঁর অন্তরকে সান্ত্বনা ও শক্তি জোগাত। আল্লাহ বলেন: ﴿وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً ۚ كَذَٰلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ﴾।
- সাহাবায়ে কেরামের সহজ আত্মস্থকরণ ও আমল: যদি সমগ্র কুরআনের শত শত অনুশাসন ও নিষেধ একবারে চাপিয়ে দেওয়া হতো, তবে তা মুখস্থ করা ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা অত্যন্ত কঠিন হতো। পর্যায়ক্রমে নাজিল হওয়ায় সাহাবিরা ১০টি করে আয়াত শিখতেন, তার অর্থ বুঝতেন এবং জীবনে বাস্তবায়ন করতেন।
- নিয়মিত ওহির মাধ্যমে আসমানি যোগাযোগ রক্ষা: বারবার জিবরাঈল (আ.)-এর আগমনের ফলে রাসুল (সা.) ও সাহাবিগণ সর্বদা এক স্বর্গীয় সান্নিধ্য ও আনন্দ অনুভব করতেন।
৩. আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাসমূহ (الفوائد التشريعية):
- আইন প্রণয়নে ক্রমান্বয়িক নীতি (التدرج في التشريع): জাহিলি সমাজে মদ্যপান, জুয়া, ব্যভিচার ও রক্তপাতের মতো জঘন্য অপরাধ রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছিল। কুরআন এক ধাক্কায় সব নিষিদ্ধ না করে ক্রমান্বয়ে তা রহিত করেছে। যেমন মদ্যপান প্রথমে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, এরপর মাতাল অবস্থায় নামাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং পরিশেষে চূড়ান্তভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
- ঘটনা ও প্রশ্নের তাৎক্ষণিক সমাধান (الإجابة على الأسئلة): মানুষ যখন বিভিন্ন জটিল মাসআলা নিয়ে রাসুল (সা.)-এর নিকট প্রশ্ন করত (যেমন: ‘يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَهِلَّةِ’, ‘يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ’), তখন তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান সম্বলিত আয়াত নাজিল হয়ে বিধান স্পষ্ট করত।
- নাসেখ ও মানসূখের বাস্তবতা: সমাজ গঠনের প্রাথমিক প্রয়োজনে কিছু বিধান সাময়িক দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তীতে সমাজ পরিণত হলে তা পরিবর্তন করে স্থায়ী বিধান প্রবর্তন করা হয়।
উপসংহার: পর্যায়ক্রমিক অবতরণ পদ্ধতি প্রমাণ করে যে কুরআন কেবল পাঠ্য কোনো কিতাব নয়; বরং এটি একটি জীবন্ত সমাজ বিনির্মাণের বাস্তব সংবিধান।
٤- ما هو أول ما نزل وآخر ما نزل من القرآن الكريم؟ واذكر فوائد هذا العلم مع الأدلة-
[৪. পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ নাজিলকৃত আয়াত কোনটি? এ সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জনের উপকারিতা দলিলের আলোকে আলোচনা কর।]
ভূমিকা: উলুমুল কুরআনের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও প্রামাণ্য একটি শাখা হলো ‘আউয়ালু মা নুযযিলা ওয়া আখিরু মা নুযযিলা’ (সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত)। কোন আয়াত দিয়ে ওহির সূচনা এবং কোন আয়াত দিয়ে ওহির পরিসমাপ্তি ঘটেছিল, তা জানা বিধানের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ বোঝার জন্য অপরিহার্য।
১. পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত (أول ما نزل):
- সর্বসম্মত বিশুদ্ধতম অভিমত: জমহুর উলামায়ে কেরাম ও সহীহ বুখারী-মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, হেরা গুহায় সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত হলো সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত:
﴿اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ * خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ * اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ * الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ * عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ﴾ - অন্যান্য সম্পর্কিত অভিমত ও সমন্বয়:
- সূরা আল-মুদ্দাসসির: ওহির বিরতিকাল (ফাতরাতুল ওহি)-এর পর সর্বপ্রথম নাজিল হয় সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক অংশ (يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ)। এটি রিসালাতের প্রচারের ক্ষেত্রে প্রথম।
- সূরা আল-ফাতিহা: পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসেবে সর্বপ্রথম নাজিল হয়েছে সূরা ফাতিহা।
২. পবিত্র কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত (آخر ما نزل):
- সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য মত: ইমাম বুখারী ও নাসাঈতে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের মাত্র কয়েকদিন (মতান্তরে ৯ বা ২১ দিন) পূর্বে সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত হলো সূরা বাকারার ২৮১ নম্বর আয়াত:
﴿وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ۖ ثُمَّ تُوَفَّىٰ كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ﴾
“আর তোমরা সেই দিনকে ভয় কর, যে দিন তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। অতঃপর প্রত্যেকে যা অর্জন করেছে তা পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হবে এবং তাদের ওপর কোনো জুলুম করা হবে না।” - অন্যান্য প্রসিদ্ধ অভিমত:
- সূরা আল-মায়িদাহর ৩ নম্বর আয়াত: ﴿الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ﴾। এটি বিদায় হজের দিন আরাফার ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিল। এটি মূলত শরীয়তের হালাল-হারাম ও দ্বীনের বিধিবিধান পূর্ণতার দিক থেকে শেষ, কিন্তু সামগ্রিক তিলাওয়াতের দিক থেকে শেষ নয়।
- আয়াতুর রিবা (সূরা বাকারা: ২৭৮) এবং আয়াতুল কালালাহ (সূরা নিসা: ১৭৬)-কেও বিশেষ বিষয়ের শেষ আয়াত বলা হয়।
৩. এই শাস্ত্র ও জ্ঞান অর্জনের সুদূরপ্রসারী উপকারিতা (فوائد هذا العلم):
- নাসেখ ও মানসূখ (রহিতকারী ও রহিতকৃত আয়াত) শনাক্তকরণ: দুটি বিপরীতমুখী বিধান সম্বলিত আয়াতের ক্ষেত্রে কোনটি পূর্বে এবং কোনটি পরে অবতীর্ণ হয়েছে তা জানার মাধ্যমে পরবর্তী আয়াত দ্বারা পূর্ববর্তী আয়াত রহিত হওয়ার নিশ্চিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়।
- ইসলামি বিধান প্রণয়নের ইতিহাস জানা: কুরআন কীভাবে ধীরে ধীরে মানবসমাজকে সংস্কার করেছে এবং দ্বীনের স্তরসমূহ কীভাবে পূর্ণতা লাভ করেছে তার নিখুঁত রূপরেখা জানা যায়।
- কুরআনের সংরক্ষণ ও বিশুদ্ধতার প্রতি অবিচল বিশ্বাস: সূচনালগ্ন থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত প্রতিটি আয়াতের নির্ভুল সময়কাল সাহাবিদের মাধ্যমে এমন নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত থাকা প্রমাণ করে যে কুরআনে কোনো রূপ পরিবর্তন বা বিকৃতি ঘটেনি।
উপসংহার: ওহির প্রথম ও শেষ আয়াত নির্দেশ করে যে, ইসলামের যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘পড়ো’ (জ্ঞানার্জনের নির্দেশ) দিয়ে এবং সমাপ্ত হয়েছে ‘আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তনের জবাবদিহিতা’ স্মরণ করিয়ে দিয়ে।
٥- ما هو التفسير والتأويل وما هو الفرق بينهما؟ واذكر أقسام التفسير بالتفصيل-
[৫. তাফসির ও তাবীল কী এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য কী? তাফসিরের প্রকারভেদ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা: কালামুল্লাহর নিগূঢ় অর্থ, বিধান ও ঐশ্বরিক উদ্দেশ্য উন্মোচনের প্রধান শাস্ত্রীয় মাধ্যম হলো ‘ইলমুত তাফসির’। তাফসিরের পাশাপাশি ‘তাবীল’ শব্দটিও কুরআনের গভীর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত হয়।
১. তাফসির ও তাবীল-এর সংজ্ঞা:
- তাফসির (التفسير): আভিধানিক অর্থ স্পষ্ট করা, ব্যাখ্যা করা, উন্মুক্ত করা বা আবৃত বিষয় প্রকাশ করা (الكشف والإظهار)। পারিভাষিক অর্থে: «عِلْمٌ يُفْهَمُ بِهِ كِتَابُ اللَّهِ تَعَالَى الْمُنَزَّلُ عَلَى نَبِيِّهِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَبَيَانُ مَعَانِيهِ وَاسْتِخْرَاجُ أَحْكَامِهِ وَحِكَمِهِ» অর্থাৎ, যে জ্ঞানের সাহায্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ আল্লাহর কিতাবের অর্থ অনুধাবন করা যায় এবং তার অন্তর্নিহিত হুকুম ও হিকমত আহরণ করা যায়, তাকে ‘তাফসির’ বলে।
- তাবীল (التأويل): আভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা (الرجوع إلى الأصل)। পারিভাষিক অর্থে, কোনো শব্দের প্রকাশ্য বা সাধারণ অর্থ ছেড়ে শক্তিশালী দলিলের ভিত্তিতে তার সম্ভাব্য অন্তর্নিহিত গভীর অর্থের দিকে প্রত্যাবর্তন করানোকে ‘তাবীল’ বলে।
২. তাফসির ও তাবীলের মধ্যে পার্থক্য:
| বিষয় | তাফসির (التفسير) | তাবীল (التأويل) |
|---|---|---|
| ব্যাখ্যার ক্ষেত্র | শব্দের বাহ্যিক ও সুস্পষ্ট অর্থ এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে। | শব্দের গভীর, অন্তর্নিহিত ও রূপক অর্থ প্রকাশ করে। |
| নির্ভরতা | মূলত রেওয়ায়েত বা নির্ভরযোগ্য বর্ণনা (শুনুন ও সনদ)-এর ওপর নির্ভরশীল। | মুজতাহিদের গভীর গবেষণা ও সূক্ষ্ম বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল। |
| নিশ্চয়তা | তাফসিরে নির্দিষ্টভাবে দাবি করা হয় যে আল্লাহর উদ্দেশ্য এটাই। | তাবীলে সম্ভাবনা প্রকাশ করা হয় যে আল্লাহর কালামের মর্ম এটি হতে পারে। |
৩. তাফসিরের মূল প্রকারভেদ (أقسام التفسير):
পদ্ধতি ও উৎসের ভিত্তিতে তাফসির প্রধানত তিন প্রকার:
- তাফসির বির-রিওয়ায়াত বা বিল-মা’সুর (التفسير بالرواية أو المأثور): যে তাফসিরে কুরআনকে কুরআনের অন্য আয়াত দ্বারা, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও হাদিস দ্বারা, সাহাবায়ে কেরামের আসার এবং তাবেয়ীদের বক্তব্য দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়। এটি সর্বাধিক প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য তাফসির। যেমন: তাফসিরে ইবনে জারীর আত-তাবারী, তাফসিরে ইবনে কাসীর, তাফসিরে দুররে মানসুর।
- তাফসির বিদ-দিরায়াত বা বির-রায় (التفسير بالدراية أو الرأي): যে তাফসিরে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা, ব্যাকরণ, অলংকারশাস্ত্র এবং শরীয়তের মূলনীতির আলোকে ইজতিহাদ ও গবেষণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। এটি দুই প্রকার:
- মাকবুল বা প্রশংসনীয়: যা শরীয়ত ও আরবির নিয়মের অনুসারী। যেমন: তাফসিরে কাশশাফ, তাফসিরে কাবীর (রাযী), তাফসিরে বায়যাবী, তাফসিরে রূহুল মা’আনী।
- মর্দূদ বা নিন্দনীয়: যা মনগড়া ব্যাখ্যা ও প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত, যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।
- তাফসির বিল-ইশারাত বা ইশারী তাফসির (التفسير الإشاري): বাহ্যিক অর্থকে অক্ষুণ্ন রেখে আধ্যাত্মিক সাধক ও আলেমগণের অন্তরে উদ্ভাসিত সূক্ষ্ম ও আধ্যাত্মিক ইশারা সম্বলিত তাফসির। যেমন: তাফসিরুত তুসতারী।
উপসংহার: বিশুদ্ধ তাফসির চর্চাই পবিত্র কুরআনের চিরন্তন বার্তাকে যুগোপযোগীভাবে উপলব্ধি করার একমাত্র পথ।
٦- ما هو إعجاز القرآن؟ واذكر ثلاثة أوجه يتجلى فيها الإعجاز العلمي للقرآن الكريم-
[৬. কুরআনের অলৌকিকত্ব বা ই’জাযুল কুরআন কী? পবিত্র কুরআনের বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্ব প্রস্ফুটিত হয় এমন তিনটি দিক আলোচনা কর।]
ভূমিকা: পবিত্র কুরআন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ চিরন্তন মুজিজা। এটি যেমন তার সাহিত্যিক সৌন্দর্যে অতুলনীয়, তেমনি আধুনিক বিজ্ঞানের পরীক্ষিত সত্যের সাথে এর নিখুঁত সামঞ্জস্য ঐশ্বরিক অলৌকিকত্বের (ই’জায) এক অবিসংবাদিত প্রমাণ।
১. ই’জাযুল কুরআন-এর পরিচয় (مفهوم إعجاز القرآن):
- শাব্দিক অর্থ: ‘ই’জায’ (الإعجاز) শব্দের অর্থ অক্ষম করা, পরাভূত করা বা অপরাগ করে দেওয়া। ‘মুজিজা’ এমন অলৌকিক বিষয়কে বলে যা সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে প্রকাশ পায় এবং যার কোনো মানবিক বিকল্প তৈরি করা অসম্ভব।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: জিন ও মানবজাতির যাবতীয় শক্তি সমন্বিত হয়েও পবিত্র কুরআনের একটি সূরার সমকক্ষ কোনো রচনা তৈরিতে চিরন্তনভাবে সম্পূর্ণ অক্ষম ও ব্যর্থ প্রমাণিত হওয়াকেই ‘ই’জাযুল কুরআন’ (কুরআনের অলৌকিকত্ব) বলে। আল্লাহ কাফেরদের চ্যালেঞ্জ করেছেন: ﴿قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَىٰ أَن يَأْتُوا بِمِثْلِ هَٰذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا﴾।
২. কুরআনের বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্বের তিনটি উজ্জ্বল দিক (وجوه الإعجاز العلمي):
চৌদ্দশত বছর পূর্বে মরুভূমির বুকে নিরক্ষর নবীর ওপর অবতীর্ণ কুরআনে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত সূক্ষ্মতম সত্যের বর্ণনা বিস্ময়কর। এর তিনটি প্রধান ক্ষেত্র নিম্নরূপ:
- মহাবিশ্ব সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ তত্ত্ব (نشأة الكون وتمدده):
- মহাজাগতিক সংযোগ ও বিস্ফোরণ (Big Bang): আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে সৃষ্টির আদিতে সমগ্র মহাবিশ্ব একটি একক পিণ্ড ছিল, যা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে প্রসারিত হয়েছে। কুরআন ১৪০০ বছর আগেই সূরা আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছে:
﴿أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا ۖ وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ﴾
“কাফেররা কি দেখে না যে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল পরস্পরে ওতপ্রোতভাবে সংযুক্ত ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং প্রাণবান সবকিছু পানি থেকে সৃষ্টি করলাম?” - মহাবিশ্বের ক্রমাগত সম্প্রসারণ (Expanding Universe): এডউইন হাবল কর্তৃক ১৯২৯ সালে আবিষ্কৃত এই বৈজ্ঞানিক সত্যের সাক্ষ্য দিয়ে সূরা আয-যারিয়াতের ৪৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন: ﴿وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ﴾ (“আমি নিজ কুদরতে আকাশ নির্মাণ করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি একে ক্রমাগত সম্প্রসারিত করছি”)।
- মহাজাগতিক সংযোগ ও বিস্ফোরণ (Big Bang): আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে সৃষ্টির আদিতে সমগ্র মহাবিশ্ব একটি একক পিণ্ড ছিল, যা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে প্রসারিত হয়েছে। কুরআন ১৪০০ বছর আগেই সূরা আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছে:
- মানব ভ্রূণতত্ত্ব ও প্রজনন বিজ্ঞান (علم الأجنة):
কানাডার প্রখ্যাত অ্যানাটমি বিশেষজ্ঞ ড. কিথ এল. মুর কুরআনের ভ্রূণতাত্ত্বিক বিবরণ দেখে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য হন। সূরা আল-মুমিনুনের ১২-১৪ নম্বর আয়াতে মাতৃগর্ভে শিশুর বৃদ্ধির স্তরগুলো নিখুঁতভাবে বলা হয়েছে:
- নুৎফাহ (نطفة): শুক্রকীট ও ডিম্বাণুর মিলন।
- আলাক্বা (علقة): জরায়ুর দেয়ালে জেঁকে থাকা রক্তপিণ্ড বা জোঁকের মতো ঝুলন্ত অবস্থা।
- মুদগাহ (مضغة): চিবানো মাংসপিণ্ডের মতো রূপ।
- হাড় ও মাংসের আচ্ছাদন: ﴿فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا﴾ অর্থাৎ প্রথমে অস্থি কাঠামো গঠন এবং পরবর্তীতে তা পেশি বা মাংস দ্বারা আবৃত করা। আধুনিক আল্ট্রাসনোগ্রাফি ঠিক এই ক্রমধারাই প্রমাণ করেছে।
- পর্বতমালার ভূমিকা ও ভূ-ত্বকের ভারসাম্য (حفظ توازن الأرض بالجبال):
আধুনিক ভূতত্ত্ববিদ্যায় (Geology) ‘আইসোস্ট্যাসি’ (Isostasy) তত্ত্বে প্রমাণিত হয়েছে যে পর্বতের মাটির উপরে যতটুকু অংশ দেখা যায়, তার বহুগুণ মাটির গভীরে খুঁটির ন্যায় প্রথিত রয়েছে, যা ভূ-পৃষ্ঠের টেকটোনিক প্লেটকে স্থির রাখে। কুরআন মাজিদে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
﴿أَلَمْ نَجْعَلِ الْأَرْضَ مِهَادًا * وَالْجِبَالَ أَوْتَادًا﴾ (“আমি কি জমিনকে বিছানা এবং পর্বতমালাকে পেরেক বা খুঁটি সদৃশ করিনি?”)। সূরা আন-নামলে বলা হয়েছে: ﴿وَأَلْقَىٰ فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَن تَمِيدَ بِكُمْ﴾ (“তিনি জমিনে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন যাতে তা তোমাদের নিয়ে কেঁপে না ওঠে”)।
উপসংহার: কুরআনের এই বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে এটি কোনো মানব মস্তিষ্কপ্রসূত রচনা নয়; বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের মহান স্রষ্টা আল্লাহর বাণী।
مجموعة (ب) : খ-অংশ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী) (মান: ২ × ১০ = ২০)
٧- بين كيفية حفظ القرآن الكريم وتدوينه في عهد الرسول (ص)-
[৭. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় কুরআন সংরক্ষণ ও সংকলনের পদ্ধতি আলোচনা কর।]
ভূমিকা: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় পবিত্র কুরআন দুটি প্রধান মাধ্যমে অত্যন্ত নিখুঁত ও প্রামাণিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছিল: ১. অন্তরে ধারণ (হিফজ বা স্মৃতি সংরক্ষণ) এবং ২. লিখিত রূপায়ণ (কিতাবত বা নথিভুক্তি)।
১. স্মৃতিতে সংরক্ষণ (الحفظ في الصدور):
- আরবদের স্মৃতিশক্তি ছিল প্রবাদপ্রতিম। ওহি অবতীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে রাসুলুল্লাহ (সা.) তা মুখস্থ করতেন এবং সাহাবিদের তিলাওয়াত করে শোনাতেন।
- শত শত সাহাবি সমগ্র কুরআন মুখস্থ করেছিলেন। তাঁদের ‘কুররা’ (القراء) বা হাফেজ বলা হতো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও তাহাজ্জুদে নিয়মিত তিলাওয়াত স্মৃতিকে চিরভাস্বর রাখত।
- প্রতি বছর রমজান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.) রাসুল (সা.)-এর সাথে অবতীর্ণ সমস্ত কুরআনের পারস্পরিক শুনানী (দাওর) করতেন, যাকে ‘মুদারাসাহ’ বলা হতো। ওফাতের বছর এটি দুবার অনুষ্ঠিত হয় (আর্দায়ে আখিরাহ)।
২. লেখনীর মাধ্যমে সংরক্ষণ (التدوين في السطور):
- কাতিবানে ওহি (ওহি লেখক সাহাবিগণ): রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রায় ৪০ জনেরও বেশি নির্ভরযোগ্য সাহাবিকে ওহি লেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত, উবাই ইবনে কা’ব, আলী ইবনে আবি তালিব এবং আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।
- লেখার উপকরণ: তৎকালে কাগজের অপ্রতুলতার কারণে ওহি চামড়ার টুকরো (رقاع), মসৃণ পাথর (لخاف), খেজুর গাছের ডাল (عسب), এবং চওড়া হাড়ের ফলকে (أكتاف) লিখে রাখা হতো।
- আয়াত ও সূরার বিন্যাস: ওহি নাজিল হওয়ামাত্র রাসুল (সা.) নির্দেশ দিতেন: “এই আয়াতটি অমুক সূরার অমুক আয়াতের পর স্থাপন কর।” এই ক্রম ছিল সম্পূর্ণ তাওকীফী (আল্লাহর নির্দেশিত)।
উপসংহার: রাসুল (সা.)-এর তিরোধানের পূর্বেই সমগ্র কুরআনের প্রতিটি শব্দ স্মৃতি ও লেখনীতে হুবহু অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল।
٨- اذكر شروط المفسر وآدابه بالتفصيل-
[৮. একজন মুফাসসিরের যোগ্যতা, শর্তাবলি ও আদবসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা: মহান আল্লাহর কালামের ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত গুরুদায়িত্ব ও সংবেদনশীল কাজ। এ জন্য ইসলামি শরীয়ত মুফাসসিরের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু অ্যাকাডেমিক শর্ত ও চারিত্রিক আদব নির্ধারণ করেছে।
১. মুফাসসিরের মৌলিক শর্ত ও যোগ্যতা (شروط المفسر):
ইমাম সুয়ূতী (রহ.) ‘আল-ইতক্বান’ গ্রন্থে একজন মুফাসসিরের জন্য ১৫টি শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন শর্ত করেছেন, যার প্রধান কয়েকটি নিম্নরূপ:
- বিশুদ্ধ আকিদা: মুফাসসিরকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সহীহ আকিদাসম্পন্ন হতে হবে; বিদআতি চিন্তা বা বিকৃত মতবাদের অনুসারী হওয়া যাবে না।
- আরবি ভাষা ও ব্যাকরণে পূর্ণ পাণ্ডিত্য: আরবি অভিধান (লুগাত), নাহু (বাক্যরীতি), সরফ (শব্দরূপতত্ত্ব) এবং ইশতিক্বাক্ব (ধাতুমূল)-এ গভীর দখল থাকতে হবে।
- অলংকারশাস্ত্র (বালাগাত): মা’আনী, বায়ান ও বাদী’ শাস্ত্রে পারদর্শী হতে হবে, যা দ্বারা বাক্যের ভাবসৌন্দর্য বোঝা যায়।
- উলুমুল হাদিস ও সুন্নাহর জ্ঞান: হাদিসের সনদ, মতন এবং নাসিখ-মানসূখের পূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে।
- উসূলে ফিকহ ও শানে নুযুল: আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট ও স্থানকাল জানা অপরিহার্য।
২. মুফাসসিরের চারিত্রিক আদবসমূহ (آداب المفسر):
- ইখলাস ও আল্লাহর ভয়: কেবল পার্থিব খ্যাতি বা অর্থ নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাফসির রচনা করা।
- আমল ও তাকওয়া: নিজের অর্জিত জ্ঞানের ওপর আমল করা এবং সন্দেহজনক বিষয় পরিহার করা।
- বিনয় ও আত্মমর্যাদা: সত্য প্রকাশে আপসহীন থাকা এবং অহেতুক তর্ক পরিহার করা। কোনো বিষয়ে স্পষ্ট জ্ঞান না থাকলে ‘আল্লাহই সর্বাধিক অবগত’ (আল্লাহু আ’লাম) বলা।
উপসংহার: এই গুণাবলি ব্যতীত কেউ কুরআনের তাফসিরে প্রবৃত্ত হলে সে বিভ্রান্ত হবে এবং মানুষকেও বিভ্রান্ত করবে।
٩- ما هو علم تجويد القرآن وما هي أهميته وحكم تعلمه؟
[৯. ইলমুত তাজবীদ কী, এর গুরুত্ব এবং তাজবীদ শিক্ষা করার বিধান আলোচনা কর।]
ভূমিকা: কুরআন মজিদকে ভুলত্রুটিমুক্ত রেখে সঠিক উচ্চারণ ও সুমধুর স্বরে তিলাওয়াত করার শাস্ত্রীয় বিজ্ঞানের নাম হলো ‘ইলমুত তাজবীদ’।
১. ইলমুত তাজবীদের সংজ্ঞা:
- শাব্দিক অর্থ: ‘তাজবীদ’ (التجويد) অর্থ সুন্দর করা, শোভিত করা বা নিখুঁত করা (التحسين والترتيب)।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: «إِعْطَاءُ كُلِّ حَرْفٍ حَقَّهُ وَمُسْتَحَقَّهُ مِنَ الْمَخَارِجِ وَالصِّفَاتِ» অর্থাৎ, আরবি বর্ণমালার প্রতিটি হরফকে তার সঠিক মাখরাজ (উচ্চারণস্থল) এবং সিফাত (স্থায়ী ও অস্থায়ী গুণাবলি)-সহ আদায় করার নিয়মকানুন সম্পর্কিত শাস্ত্রকে তাজবীদ বলে।
২. তাজবীদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:
- বিকৃতি ও পরিবর্তন থেকে রক্ষা: আরবি ভাষায় সামান্য উচ্চারণের ভুলের কারণে অর্থের ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটে। যেমন: ‘قَلْب’ (ক্বলব – অন্তর) আর ‘كَلْب’ (কালব – কুকুর)। তাজবীদ এই মারাত্মক বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করে।
- কুরআনের নির্দেশ পালন: আল্লাহ তায়ালা সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন: ﴿وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا﴾ (“আর কুরআন তিলাওয়াত করুন ধীরে ধীরে ও সুস্পষ্টভাবে”)।
- তিলাওয়াত সুন্দর করা: রাসুল (সা.) বলেন: «زَيِّنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ» (“তোমাদের সুর দ্বারা কুরআনকে সৌন্দর্যমণ্ডিত কর”)।
৩. তাজবীদ শিক্ষা করার শরয়ী বিধান (حكم تعلم التجويد):
- তাত্ত্বিক জ্ঞানার্জন (علم التجويد نظرياً): তাজবীদের পারিভাষিক নিয়মাবলি তাত্ত্বিকভাবে মুখস্থ করা ও জানা ফরযে কিফায়াহ। সমাজে কিছু আলেম এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ থাকলে বাকিরা দায়মুক্ত হবে।
- বাস্তব তিলাওয়াতে প্রয়োগ (العمل به تطبيقياً): নামাজে বা সাধারণ তিলাওয়াতে ভুল এড়িয়ে তাজবীদের মৌলিক নিয়ম মেনে সঠিক উচ্চারণে কুরআন পড়া প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য ফরযে আইন। ইচ্ছাকৃত ভুল উচ্চারণ করা গুনাহে কবিরা।
উপসংহার: তাজবীদ হলো কুরআনের পবিত্র ধ্বনিগত অলংকার, যা তিলাওয়াতকে অর্থবহ ও বিশুদ্ধ রূপ দান করে।
١٠- ما هو اللحن وما هي أقسامه؟ واذكر حكم كل قسم مع الأمثلة-
[১০. লাহন (لحن) কী এবং এর প্রকারভেদ কী কী? উদাহরণসহ প্রতিটি প্রকারের বিধান আলোচনা কর।]
ভূমিকা: কুরআন তিলাওয়াতকালে ধ্বনিগত, স্বরচিহ্নগত বা উচ্চারণগত যে সকল বিচ্যুতি ও ত্রুটি ঘটে, তাজবীদের পরিভাষায় সেগুলোকে ‘লাহন’ (اللحن) বলা হয়।
১. লাহন-এর পরিচয় ও প্রকারভেদ:
- সংজ্ঞা: ‘লাহন’ শব্দের অর্থ ভুল করা, বিচ্যুত হওয়া বা সঠিক উচ্চারণ থেকে সরে যাওয়া। তাজবীদের পরিভাষায়, কুরআন পাঠের নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘন করে ভুল উচ্চারণ করাকে লাহন বলে।
- প্রকারভেদ: লাহন প্রধানত দুই প্রকার: ১. লাহনে জলী (اللحن الجلي – প্রকাশ্য বড় ভুল) এবং ২. লাহনে খফী (اللحن الخفي – সূক্ষ্ম বা গোপন ভুল)।
২. লাহনে জলী (اللحن الجلي):
- পরিচয়: এমন সুস্পষ্ট ও প্রকট ভুল যা সাধারণ শ্রোতা ও আলেম সবাই সহজেই ধরতে পারে এবং যার কারণে প্রায়শ শব্দের মূল অর্থ বিকৃত হয়ে যায়।
- উদাহরণ:
- এক হরফের স্থলে অন্য হরফ পড়া: যেমন ‘عَسَى’ (আসা – আশা করা)-এর স্থলে ‘عَصَى’ (আসা – অবাধ্য হওয়া) পড়া।
- হরকত পরিবর্তন করা: যেমন সূরা ফাতিহায় ‘أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ’ (আপনি অনুগ্রহ করেছেন)-এর ‘তা’ (تَ)-এর যবরের স্থলে ‘তু’ (تُ – আমি অনুগ্রহ করেছি) পড়া। এতে আল্লাহর প্রতি আরোপিত সিফাত নিজের ওপর এসে যায়, যা কুফরী অর্থ তৈরি করে।
- হরকতকে সাকিন করা বা সাকিনকে হরকত দেওয়া।
- বিধান: লাহনে জলী করা সর্বসম্মতভাবে হারাম ও কবিরা গুনাহ। নামাজে এমন লাহনে জলী করলে নামাজ বাতিল ও ফাসিদ হয়ে যায়।
৩. লাহনে খফী (اللحن الخفي):
- পরিচয়: এমন সূক্ষ্ম ভুল যা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না; কেবল দক্ষ কারী ও তাজবীদবিদগণ ধরতে পারেন। এর দ্বারা সরাসরি অর্থ পরিবর্তন হয় না, তবে শব্দের সৌন্দর্য নষ্ট হয়।
- উদাহরণ: গুন্নাহ্ ছেড়ে দেওয়া বা কম করা, ইখফা ও ইদগামে ত্রুটি করা, কলকলাহ যথাযথ না করা, অথবা মাদ্দের মাত্রা কম-বেশি করা।
- বিধান: লাহনে খফী করা মাকরুহ। এর দ্বারা নামাজ নষ্ট হয় না, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন করা তিলাওয়াতের আদব পরিপন্থী।
উপসংহার: প্রত্যেক মুসলিমের উচিত একজন দক্ষ শিক্ষকের সান্নিধ্যে মাশক্ব করে লাহনে জলী ও খফী থেকে নিজের তিলাওয়াতকে মুক্ত রাখা।
١١- بين مخارج الحروف الآتية: (التاء، الطاء، الجيم، الفاء)-
[১১. ‘তা’ (ت), ‘ত্বা’ (ط), ‘জীম’ (ج), এবং ‘ফা’ (ف)-এর মাখরাজ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা: আরবি হরফসমূহ মুখের যে স্থান থেকে উৎপন্ন ও উচ্চারিত হয়, তাকে ‘মাখরাজ’ (مخرج الحرف) বলা হয়। ইমাম ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর মতে আরবি হরফের মাখরাজ মোট ১৭টি।
উল্লিখিত চারটি হরফের মাখরাজের বিস্তারিত বিবরণ:
১. ‘তা’ (ت) এবং ‘ত্বা’ (ط)-এর মাখরাজ:
- উচ্চারণস্থল: জিহ্বার আগা যখন সামনের ওপরের দুটি দাঁতের গোড়ার (أصول الثنايا العليا) সাথে স্পর্শ করে, তখন এই হরফ দুটি উচ্চারিত হয় (এর সাথে ‘দাল’ (د)-ও উচ্চারিত হয়)।
- উভয়ের মধ্যকার পার্থক্য:
- ‘ত্বা’ (ط): এটি একটি মুস্তালিয়াহ (উচ্চমাত্রিক) ও ইতবাক্ব বিশিষ্ট মোটা ও ভারি হরফ। উচ্চারণের সময় জিহ্বার পেছনের অংশ তালুর দিকে উঠে যায় এবং মুখ পূর্ণ হয়ে আওয়াজ বের হয়।
- ‘তা’ (ت): এটি মুস্তাফিলাহ (নিম্নমাত্রিক) ও বারিক হরফ। এটি পাতলা ও মৃদু উচ্চারিত হয় এবং এতে হামস (হাওয়া বের হওয়া)-এর বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
২. ‘জীম’ (ج)-এর মাখরাজ:
- উচ্চারণস্থল: জিহ্বার মধ্যভাগ যখন তার সোজা বরাবর ওপরের শক্ত তালুর (وسط اللسان مع ما يحاذيه من الحنك الأعلى) সাথে লেগে যায়, তখন ‘জীম’ (ج) উচ্চারিত হয় (এর সাথে ‘শীন’ (ش) এবং মাদ্দহীন ‘ইয়া’ (ي)-ও বের হয়, যাকে ‘হুরুফে শাজারিয়্যাহ’ বলা হয়)।
- সিফাত ও বৈশিষ্ট্য: ‘জীম’ হরফটিতে ‘জাহর’ (বাতাস বন্ধ থাকা), ‘শিদ্দাত’ (শব্দ আটকে যাওয়া) এবং সাকিন অবস্থায় ‘ক্বলক্বলাহ্’ (প্রতিধ্বনি)-এর গুণ কার্যকর থাকে। ফলে এর উচ্চারণ সুদৃঢ় ও সুস্পষ্ট হয়।
৩. ‘ফা’ (ف)-এর মাখরাজ:
- উচ্চারণস্থল: সামনের ওপরের দুটি দাঁতের অগ্রভাগ (أطراف الثنايا العليا) যখন নিচের ঠোঁটের পেটের ভেতরের আর্দ্র অংশের (بطن الشفة السفلى) সাথে স্পর্শ করে, তখন ‘ফা’ (ف) উচ্চারিত হয়।
- সিফাত ও বৈশিষ্ট্য: এটি একটি দুর্বল ও মৃদু হরফ। এতে ‘হামস’ (প্রশ্বাস জারি থাকা) এবং ‘রিখাওয়াত’ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, ফলে বাতাস নির্গত হওয়ার সাথে সাথে এটি মসৃণভাবে উচ্চারিত হয়।
উপসংহার: মাখরাজের সঠিক অবস্থান জানা আরবি হরফের বিশুদ্ধ রূপায়ণ ও তিলাওয়াতের সৌন্দর্য রক্ষায় মৌলিক ভিত্তি।
١٢- اكتب السور الآتية غيباً مع بيان فضائلها: (سورة التكاثر / سورة الزلزلة / سورة التين)-
[১২. সূরা আত-তাকাসুর, সূরা যিলযাল অথবা সূরা আত-তীন মুখস্থ লেখ এবং এর ফজিলত আলোচনা কর।]
১. সূরা আত-তাকাসুর (سورة التكاثر – মক্কী সূরা, আয়াত: ৮):
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ (١) حَتَّىٰ زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ (٢) كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ (٣) ثُمَّ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ (٤) كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ (٥) لَتَرَوُنَّ الْجَحِيمَ (٦) ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ (٧) ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ (٨)
ফজিলত ও তাৎপর্য: রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশ্য করে বলেন: «أَيَعْجِزُ أَحَدُكُمْ أَنْ يَقْرَأَ أَلْفَ آيَةٍ كُلَّ يَوْمٍ؟ قَالُوا: وَمَنْ يَسْتَطِيعُ ذَلِكَ؟ قَالَ: أَمَا يَسْتَطِيعُ أَحَدُكُمْ أَنْ يَقْرَأَ أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ؟» (“তোমাদের কেউ কি প্রতিদিন ১০০০ আয়াত তিলাওয়াত করতে অক্ষম? সাহাবিরা বললেন: কার এই সামর্থ্য আছে? তিনি বললেন: তোমাদের কেউ কি সূরা তাকাসুর পড়তে পারে না?”) (বায়হাকী ও হাকিম)। এ সূরাটি মানুষের সম্পদ ও সন্তানাদির অন্ধ প্রতিযোগিতা ত্যাগ করে পরকালের হিসাবের ভয় অন্তরে জাগ্রত করে।
২. সূরা আয-যিলযাল (سورة الزلزلة – মাদানী সূরা, আয়াত: ৮):
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا (١) وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا (٢) وَقَالَ الْإِنسَانُ مَا لَهَا (٣) يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا (٤) بِأَنَّ رَبَّكَ أَوْحَىٰ لَهَا (٥) يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِّيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ (٦) فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ (٧) وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ (٨)
ফজিলত ও তাৎপর্য: তিরমিযী শরীফে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «إِذَا زُلْزِلَتْ تَعْدِلُ نِصْفَ الْقُرْآنِ» (“সূরা যিলযাল কুরআনের অর্ধেক অংশের সমতুল্য”)। এ সূরায় কিয়ামতের ভয়াবহ ভূকম্পন এবং অণু পরিমাণ ভালো ও মন্দ কাজের নিখুঁত প্রতিফল প্রাপ্তির অমোঘ ঘোষণা এসেছে।
৩. সূরা আত-তীন (سورة التين – মক্কী সূরা, আয়াত: ৮):
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
وَالتِّينِ وَالزَّيْتُونِ (١) وَطُورِ سِينِينَ (٢) وَهَٰذَا الْبَلَدِ الْأَمِينِ (٣) لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ (٤) ثُمَّ رَدَدْنَاهُ أَسْفَلَ سَافِلِينَ (٥) إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَلَهُمْ أَجْرٌ غَيْرُ مَمْنُونٍ (٦) فَمَا يُكَذِّبُكَ بَعْدُ بِالدِّينِ (٧) أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَحْكَمِ الْحَاكِمِينَ (٨)
ফজিলত ও তাৎপর্য: সহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সফর অবস্থায় মাগরিব বা এশার নামাজে সূরা তীন তিলাওয়াত করতেন এবং তাঁর চেয়ে সুন্দর কণ্ঠে কাউকে তিলাওয়াত করতে শোনা যায়নি। এ সূরায় আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টির সেরা রূপ ‘আহসানি তাকভীম’ দান করার কথা এবং ঈমান ও আমলহীন হলে সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্তরে পতনের সতর্কবার্তা ঘোষণা করেছেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. পবিত্র কুরআনের মোট সূরা ও আয়াত সংখ্যা কত?
পবিত্র কুরআনে মোট ১১৪টি সূরা রয়েছে এবং বহুল প্রচলিত কুফা গণনানুযায়ী মোট আয়াত সংখ্যা ৬,২৩৬টি (সাধারণ ধারণায় ৬,৬৬৬টি)।
২. পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত কোনটি?
সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য অভিমত অনুযায়ী হেরা গুহায় অবতীর্ণ সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত (اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ…) হলো কুরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ অংশ।
৩. তাফসির ও তাবীলের মূল পার্থক্য কী?
তাফসির হলো বাহ্যিক অর্থ ও বর্ণনাভিত্তিক সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা; আর তাবীল হলো প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে শব্দের অন্তর্নিহিত ও গভীর রূপক মর্মের অনুসন্ধান।
৪. পবিত্র কুরআন কত বছরে এবং কেন পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হয়েছিল?
কুরআন দীর্ঘ ২৩ বছরে অবতীর্ণ হয়; এর উদ্দেশ্য ছিল রাসুল (সা.)-এর অন্তরকে দৃঢ় রাখা, বিধান সহজ করা এবং সমাজকে ক্রমান্বয়ে সংস্কার করা।
৫. লাহনে জলী কী এবং এর শরয়ী হুকুম কী?
লাহনে জলী হলো সুস্পষ্ট ও মারাত্মক ভুল (যেমন হরফ বা হরকত পরিবর্তন করা)। এর হুকুম হলো এটি সম্পূর্ণ হারাম এবং নামাজে করলে নামাজ ভেঙে যায়।
৬. কোন সূরাকে হাদিস শরীফে কুরআনের অর্ধেকের সমতুল্য বলা হয়েছে?
হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন যে, ‘সূরা আয-যিলযাল’ (إذا زلزلت) ফজিলত ও তাৎপর্যের দিক থেকে পবিত্র কুরআনের অর্ধেক অংশের সমতুল্য।