اختبار السنة الثانية للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٠م
ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২০
الحديث والدراسات الإسلامية
আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
السنن للترمذى والسنن لابن ماجة
সুনানুত তিরমিযী ও সুনানু ইবনে মাজাহ
বিষয় কোড: 202206 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
الملاحظة: أجب عن الأسئلة حسب التوجيهات المقررة في ورقة الأسئلة-
[দ্রষ্টব্য: প্রশ্নপত্রে প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি বিভাগ হতে যথাযথ সংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) : الترمذي – أبواب الصلاة (ক-অংশ: তিরমিযী শরীফ – নামাজ অধ্যায়)
١- ما حكم صلاة الفجر في الإسفار والغلس؟ بين مذاهب الأئمة مع الأدلة-
[১. ফজর নামাজ ইসফার (উজালা) ও গালাস (অন্ধকার থাকতে) পড়ার হুকুম কী? দলিলসহ ইমামগণের মাযহাব আলোচনা কর।]
ভূমিকা: জামি’উত তিরমিযীর কিতাবুুস সালাত-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাসআলা হলো ফজরের নামাজের মুস্তাহাব সময় নির্ধারণ। এ বিষয়ে ফকিহ ও মুহাদ্দিস ইমামগণের মধ্যে দুটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, যা হাদিসের বর্ণনার আলোকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
১. পারিভাষিক পরিচয়:
- আল-গালাস (الغلس): রাতের অন্ধকার ফুরিয়ে সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার প্রাথমিক সময়, যখন চারদিকে রাতের কিছুটা অন্ধকার অবশিষ্ট থাকে।
- আল-ইসফার (الإسفار): সুবহে সাদিকের পর আকাশ পরিষ্কার হয়ে চারদিক আলোকিত ও ফরসা হয়ে ওঠার সময়কাল (সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত)।
২. ইমামগণের মাযহাব ও মতভেদ:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব: হানাফি মাযহাব অনুযায়ী পুরুষদের জন্য ফজর নামাজ ‘ইসফার’ করে অর্থাৎ আকাশ বেশ আলোকিত ও পরিষ্কার হওয়ার পর শুরু করা মুস্তাহাব বা উত্তম। তবে এমন সময় পড়তে হবে যাতে তারতীলের সাথে অন্তত ৪০-৫০ আয়াত পাঠ করার পরও কোনো কারণে নামাজ নষ্ট হলে পুনরায় পবিত্রতা অর্জন করে স্বাভাবিকভাবে নামাজ দোহরাবার সময় থাকে।
- জমহুর ইমামগণের মাযহাব (ইমাম শাফেয়ী, মালিক ও আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ.): তাঁদের মতে ফজর নামাজ সুবহে সাদিক প্রকাশিত হওয়ার পর প্রারম্ভিক অন্ধকার তথা ‘গালাস’ অবস্থায় শুরু করা এবং প্রথম ওয়াক্তে আদায় করাই সর্বাবস্থায় উত্তম।
৩. দলিলের পর্যালোচনা:
- হানাফিগণের দলিল (ইসফারের সপক্ষে):
- হযরত রাফে’ ইবনে খাদীজ (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «أَسْفِرُوا بِالْفَجْرِ، فَإِنَّهُ أَعْظَمُ لِلْأَجْرِ» (“তোমরা ফজরের নামাজ ফর্সা ও আলোকিত করে আদায় কর, কেননা তা তোমাদের জন্য অধিক সওয়াব ও পুণ্যের কারণ”) (তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ)। ইমাম তিরমিযী বলেন: হাদিসটি হাসান সহীহ।
- যৌক্তিক কারণ: আলোকিত করে পড়লে জামাতে মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের আগমন সহজতর হয়।
- জমহুরের দলিল (গালাসের সপক্ষে):
- উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত: «كُنَّ نِسَاءُ الْمُؤْمِنَاتِ يَشْهَدْنَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَاةَ الْفَجْرِ مُتَلَفِّعَاتٍ بِمُرُوطِهِنَّ ثُمَّ يَنْقَلِبْنَ إِلَى بُيُوتِهِنَّ حِينَ يَقْضِينَ الصَّلَاةَ لَا يَعْرِفُهُنَّ أَحَدٌ مِنَ الْغَلَسِ» (“মুমিন নারীরা নিজেদের চাদরে সর্বাঙ্গ আবৃত করে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাথে ফজরের নামাজে উপস্থিত হতেন, অতঃপর নামাজ শেষে ঘরে ফেরার সময় অন্ধকারের কারণে তাদের কেউ চিনতে পারত না”) (বুখারী ও মুসলিম)।
- রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সর্বোত্তম আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: «الصَّلَاةُ لِوَقْتِهَا» (“প্রথম ওয়াক্তে নামাজ আদায় করা”)।
সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত: ইমাম তাহাবী ও মুহাদ্দিসগণের মতে, রাসুলুল্লাহ (সা.) গালাস অবস্থায় নামাজ শুরু করতেন এবং কিরাত দীর্ঘ করে ইসফার পর্যন্ত নিয়ে যেতেন। ফলে উভয় হাদিসের ওপর পূর্ণ আমল হয়। হানাফি ফকিহদের মতে সাধারণ মানুষের জামাতে সুবিধার্থে ইসফার অধিক ফলপ্রসূ।
٢- ما حكم قراءة الفاتحة خلف الإمام في الصلاة الجهرية والسرية؟ بين بالتفصيل مع الأدلة-
[২. জাহরী ও সিররী নামাজে ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পাঠের হুকুম কী? দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা: সালাতের ভেতরে ইমামের পেছনে মুক্তাদীর সূরা ফাতিহা পাঠের বিধান ইসলামি ফিকহের অন্যতম সর্বাধিক আলোচিত ও জটিল মাসআলা। তিরমিযী শরীফে ইমাম তিরমিযী সাহাবি ও ফকিহগণের বিভিন্ন মতামত বিস্তারিত সংকলন করেছেন।
১. ফকিহ ইমামগণের মাযহাব:
- প্রথম মত (ইমাম আবু হানিফা রহ.): ইমামের পেছনে মুক্তাদী কোনো নামাজেই (জাহরী তথা সশব্দ কিরাতের নামাজ হোক বা সিররী তথা নিঃশব্দ কিরাতের নামাজ হোক) সূরা ফাতিহা কিংবা অন্য কোনো সূরা পাঠ করবে না; বরং সম্পূর্ণ নীরব থেকে ইমামের কিরাত শ্রবণ ও মনোযোগ স্থাপন করবে। মুক্তাদীর কিরাত পাঠ করা মাকরুহে তাহরীমি।
- দ্বিতীয় মত (ইমাম শাফেয়ী রহ.): মুক্তাদীকে সর্বাবস্থায় (একাকী হোক বা জামাতে, জাহরী নামাজ হোক বা সিররী নামাজ হোক) সূরা ফাতিহা পাঠ করতেই হবে; অন্যথায় নামাজ আদায় হবে না।
- তৃতীয় মত (ইমাম মালিক ও আহমাদ রহ.): সিররী নামাজে (যোহর ও আসরে) মুক্তাদী সূরা ফাতিহা পাঠ করবে; তবে জাহরী নামাজে (ফজর, মাগরিব ও এশায়) ইমাম যখন শব্দ করে কিরাত পাঠ করবেন, তখন মুক্তাদী নীরব থাকবে এবং কোনো কিরাত পড়বে না।
২. দলিলসমূহের পর্যালোচনা:
- হানাফিগণের দলিল:
- কুরআনে কারীমের অকাট্য নির্দেশ: ﴿وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ﴾ (“আর যখন কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ সহকারে শোন এবং নীরব থাক, যাতে তোমাদের ওপর রহমত বর্ষিত হয়”) (সূরা আল-আ’রাফ: ২০৪)। মুফাসসির সাহাবিগণের মতে এ আয়াতটি নামাজের কিরাত প্রসঙ্গে নাজিল হয়েছে।
- হযরত জাবির (রা.) সূত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ، فَقِرَاءَةُ الْإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ» (“যার ইমাম রয়েছে, ইমামের কিরাত বা তিলাওয়াতই তার কিরাত হিসেবে গণ্য হবে”) (ইবনে মাজাহ, আহমাদ, মুওয়াত্তা)।
- সহীহ মুসলিমে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন: «وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا» (“আর ইমাম যখন কিরাত পড়ে, তখন তোমরা পুরোপুরি নীরব থাক”)।
- শাফেয়ীগণের দলিল:
- হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: «لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ» (“যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করল না, তার কোনো নামাজ হলো না”) (বুখারী ও মুসলিম)।
- আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে কুদসি: “আমি নামাজকে আমার ও বান্দার মধ্যে বণ্টন করেছি…”।
- হানাফিগণের পক্ষ থেকে জবাব: «لَا صَلَاةَ» সংক্রান্ত হাদিসটি একাকী নামাজ আদায়কারী (মুনফারিদ) অথবা ইমামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; কারণ জামাতের ক্ষেত্রে ইমাম মুক্তাদীর নামাজ ও কিরাতের জিম্মাদার।
উপসংহার: হানাফি দৃষ্টিভঙ্গি কুরআনের সরাসরি আদেশ ও জামাতের শৃঙ্খলা রক্ষার সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে মুক্তাদীর পক্ষ থেকে ইমামের তিলাওয়াতই যথেষ্ট হয়।
٣- ما هو إبراد الظهر في شدة الحر؟ وما الحكمة منه ومذاهب الفقهاء فيه؟
[৩. প্রচণ্ড গরমে জোহরের নামাজ বিলম্বে বা শীতল করে (ইবরাদ) পড়ার হুকুম কী? এর অন্তর্নিহিত হিকমত ও ফকিহগণের অভিমত আলোচনা কর।]
ভূমিকা: গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড তাপদাহের সময় জোহরের নামাজ প্রথম ওয়াক্তে আদায় না করে তাপমাত্রা কিছুটা কমে ঠাণ্ডা হওয়া পর্যন্ত বিলম্ব করাকে ‘ইবরাদ বিল-যুহর’ (الإبراد بالظهر) বলা হয়।
১. হাদিসের ভাষ্য ও প্রেক্ষাপট:
সহীহ বুখারী, মুসলিম ও সুনানুত তিরমিযীতে হযরত আবু হুরায়রা ও আবু যার আল-গিফারী (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
«أَبْرِدُوا بِالصَّلَاةِ، فَإِنَّ شِدَّةَ الْحَرِّ مِنْ فَيْحِ جَهَنَّمَ»
“তোমরা তাপমাত্রা শীতল করে জোহরের নামাজ আদায় কর; কেননা তীব্র গরমের প্রচণ্ডতা জাহান্নামের আগুনের উত্তাপ থেকে উদ্ভূত।”
২. ফকিহগণের মাযহাব ও অভিমত:
- ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক ও আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.): গ্রীষ্মকালে তীব্র তাপদাহের সময় জোহরের নামাজ বিলম্বে বা শীতল করে জামাত আদায় করা সুন্নাতে মুস্তাহাব। দেয়াল বা ছায়া দীর্ঘায়িত হলে এবং রোদের প্রখরতা হ্রাস পেলে জামাত অনুষ্ঠিত হবে। তবে শীতকালে প্রথম ওয়াক্তেই জোহর পড়া উত্তম।
- ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর অভিমত: ইবরাদ করা কেবল তখনই মুস্তাহাব হবে যখন তিনটি শর্ত পাওয়া যাবে: ১. চরম গ্রীষ্মকালীন প্রখর তাপ থাকবে; ২. নামাজ মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করা হবে; এবং ৩. মুসল্লিরা রোদের মধ্যে দূর থেকে মসজিদে আগমন করবেন। একাকী নামাজ আদায়কারী কিংবা মসজিদ শীতল থাকলে তিনি প্রথম ওয়াক্তে পড়াকেই প্রাধান্য দেন।
৩. ইবরাদের অন্তর্নিহিত হিকমত ও তাৎপর্য:
- খুশু-খুজু ও একাগ্রতা রক্ষা: প্রচণ্ড গরমে মানুষ ঘেমে অস্থির থাকে, ফলে নামাজের আন্তরিক নিষ্ঠা ও প্রশান্তি ব্যাহত হয়। আবহাওয়া শীতল হলে অন্তরে প্রশান্তি নিয়ে ইবাদত করা যায়।
- মুসল্লিদের কষ্ট লাঘব: ইসলাম সহজ ও মানবিক ধর্ম। দূরদূরান্ত থেকে তীব্র রোদের মধ্যে মুসল্লিদের মসজিদে আসতে গিয়ে যেন কোনো অসুস্থতা বা চরম কষ্ট না হয়, শরীয়ত সেই দিকটি বিবেচনা করেছে।
- জাহান্নামের স্মারক: হাদিসে গরমের তীব্রতাকে জাহান্নামের নিঃশ্বাসের সাথে তুলনা করে বান্দাকে আল্লাহর আজাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
উপসংহার: ইবরাদের বিধান প্রমাণ করে যে ইসলাম বাস্তবধর্মী এবং মানবীয় সুবিধার প্রতি সর্বাধিক সংবেদনশীল এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা।
٤- اشرح الحديث: «ثلاث لا تؤخر: الصلاة إذا أتت، والجنازة إذا حضرت، والأيم إذا وجدت لها كفؤا»-
[৪. হাদিসটির ব্যাখ্যা কর: “তিনটি কাজে বিলম্ব করতে নেই: নামাজের সময় হলে নামাজ আদায়, জানাজা উপস্থিত হলে জানাজার নামাজ এবং উপযুক্ত পাত্র পেলে বিধবা/অবিবাহিতা নারীর বিয়ে।]
ভূমিকা: সুনানুত তিরমিযীর আবওয়াবুুস সালাতে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) হতে একটি অত্যন্ত শিক্ষণীয় ও দিকনির্দেশনামূলক হাদিস সংকলিত হয়েছে, যেখানে জীবনের তিনটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মৌলিক বিষয়ে কালক্ষেপণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১. হাদিসের মূল পাঠ (متن الحديث):
«أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهُ: يَا عَلِيُّ! ثَلَاثٌ لَا تُؤَخِّرْهَا: الصَّلَاةُ إِذَا أَتَتْ، وَالْجَنَازَةُ إِذَا حَضَرَتْ، وَالأَيِّمُ إِذَا وَجَدْتَ لَهَا كُفُؤًا»
২. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দার্থ:
- ثَلَاثٌ لَا تُؤَخِّرْهَا: তিনটি বিষয়ে তোমরা অযথা দেরি বা বিলম্ব করবে না।
- الصَّلَاةُ إِذَا أَتَتْ: নামাজের নির্ধারিত ওয়াক্ত যখন উপস্থিত হয়।
- وَالْجَنَازَةُ إِذَا حَضَرَتْ: মৃতদেহের গোসল ও কাফন সম্পন্ন হয়ে জানাজার জন্য প্রস্তুত হয়।
- وَالأَيِّمُ إِذَا وَجَدْتَ لَهَا كُفُؤًا: অভিভাবকহীন বা বিবাহযোগ্য নারী (তা বিধবা হোক বা অবিবাহিত), যখন তার দ্বীনদার উপযুক্ত পাত্র (কুফু) পাওয়া যায়।
৩. বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও শিক্ষণীয় দিকসমূহ:
- প্রথম বিষয়: সময়মতো নামাজ আদায় (الصلاة لوقتها):
নামাজ ইসলামের প্রধান রুকন। আল্লাহ সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নামাজ ফরজ করেছেন (সূরা নিসা: ১০৩)। সময়মতো নামাজ আদায় করা আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল। শয়তান মানুষকে পার্থিব ব্যস্ততার অজুহাতে নামাজ পেছাতে উৎসাহিত করে; তাই ওয়াক্ত হওয়ামাত্রই সর্বাগ্রে নামাজ কায়েম করার প্রতি তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
- দ্বিতীয় বিষয়: জানাজা ও দাফন দ্রুত সম্পন্ন করা (التعجيل بالجنازة):
মৃত্যুর পর ময়্যিতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রধান দাবি হলো দ্রুত তার জানাজা ও দাফনকার্য সম্পন্ন করা। হাদিসে এসেছে: মৃত ব্যক্তি যদি নেককার হয়, তবে তাকে দ্রুত তার কল্যাণের দিকে পৌঁছে দাও; আর যদি বদকার হয়, তবে দ্রুত একটি অমঙ্গলকে নিজেদের কাঁধ থেকে নামিয়ে দাও। অহেতুক দূরবর্তী আত্মীয়দের অপেক্ষায় মৃতদেহ দীর্ঘক্ষণ ফেলে রাখা শরীয়তসম্মত নয়।
- তৃতীয় বিষয়: উপযুক্ত পাত্র পেলে নারীর দ্রুত বিয়ে দেওয়া (تزويج الأيم):
‘আইয়্যিম’ (الأيم) বলতে এমন নারীকে বোঝায় যার স্বামী নেই—তা কুমারী নারী হোক কিংবা বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তা। সমাজে নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা ও ব্যভিচার প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার হলো সময়মতো বিয়ে দেওয়া। যদি পাত্র ‘কুফু’ (সমকক্ষ) হয় অর্থাৎ দ্বীনদারী ও চরিত্রের দিক থেকে উপযুক্ত হয়, তবে ধন-সম্পদ বা যৌতুকের খোঁজে কালক্ষেপণ করা মারাত্মক সামাজিক ফিতনার কারণ হয়।
উপসংহার: এই তিনটি বিষয়ে দ্রুততা অবলম্বন করা উম্মতের ধর্মীয় নিষ্ঠা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার প্রধান কবচ।
٥- ما هي صلاة الوتر؟ واذكر حكمها وعدد ركعاتها ومذاهب الأئمة مع الأدلة-
[৫. বিতর নামাজ কী? এর হুকুম, রাকাত সংখ্যা এবং দলিলসহ ইমামগণের মাযহাব আলোচনা কর।]
ভূমিকা: এশার নামাজের পর রাতের শেষভাগে আদায়যোগ্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সালাত হলো ‘সালাতুল বিতর’। এর হুকুম ও রাকাত সংখ্যা নিয়ে ফকিহগণের মাঝে দলিলভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান।
১. বিতর নামাজের সংজ্ঞা:
- শাব্দিক অর্থ: ‘বিতর’ (الوتر) শব্দের অর্থ বিজোড় (الفرد)।
- পারিভাষিক অর্থ: এশার ফরজ ও সুন্নতের পর রাতের শেষ নামাজের অংশ হিসেবে বিজোড় সংখ্যক রাকাতে যে সালাত আদায় করা হয়, তাকে ‘বিতর নামাজ’ বলে। রাসুল (সা.) বলেন: «إِنَّ اللَّهَ وِتْرٌ يُحِبُّ الْوِتْرَ» (“নিশ্চয়ই আল্লাহ বিজোড়, তিনি বিজোড়কে ভালোবাসেন”)।
২. বিতর নামাজের হুকুম:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.): বিতর নামাজ ওয়াজিব। এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদার চেয়ে শক্তিশালী এবং অস্বীকারকারী পথভ্রষ্ট এবং ইচ্ছাকৃত বর্জনকারী ফাসেক হিসেবে গণ্য হবে। ছুটে গেলে কাযা আদায় করা ওয়াজিব।
- জমহুর ফুকাহা (শাফেয়ী, মালিক ও আহমাদ রহ.): বিতর নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে মুস্তাহাব্বাহ। এটি কোনো অবস্থাতেই ওয়াজিব বা ফরজ নয়, তবে কোনো ওজর ব্যতীত তা নিয়মিত ছেড়ে দেওয়া অত্যন্ত নিন্দনীয়।
৩. বিতরের রাকাত সংখ্যা ও আদায়ের পদ্ধতি:
- হানাফি মাযহাব: বিতর নামাজ এক সালামে তিন রাকাত, যার দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহহুদ পড়া হবে কিন্তু সালাম না ফিরিয়ে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াতে হবে। তৃতীয় রাকাতে কিরাত শেষে তাকবীর দিয়ে দুই হাত কান পর্যন্ত তুলে ‘দোয়ায়ে কুনুত’ পাঠ করে রুকু-সিজদা সম্পন্ন করে এক সালামে নামাজ শেষ করতে হবে (যেমন মাগরিবের নামাজ, তবে মাগরিবের তৃতীয় রাকাতে কিরাত নেই কিন্তু বিতরে কিরাত ও কুনুত রয়েছে)।
- শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব: বিতর সর্বনিম্ন এক রাকাত এবং সর্বোচ্চ এগারো রাকাত। তিন রাকাত পড়লে দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে আলাদাভাবে এক রাকাত পড়া (الفصل) উত্তম।
৪. দলিলের পর্যালোচনা:
- হানাফিগণের দলিল:
- উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) বলেন: «كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُوتِرُ بِثَلَاثٍ لَا يُسَلِّمُ إِلَّا فِي آخِرِهِنَّ» (“রাসুলুল্লাহ সা. তিন রাকাত বিতর পড়তেন এবং সর্বশেষ রাকাতের পূর্বে সালাম ফিরাতেন না”) (নাসাঈ ও হাকিম)।
- হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) প্রথম রাকাতে সূরা আ’লা, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা কাফিরুন এবং তৃতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পাঠ করতেন এবং শেষে কুনুত পড়তেন (তিরমিযী ও আবু দাউদ)।
- ওয়াজিব হওয়ার দলিল: রাসুল (সা.) বলেন: «الْوِتْرُ حَقٌّ، فَمَنْ لَمْ يُوتِرْ فَلَيْسَ مِنَّا» (“বিতর অপরিহার্য হক; যে ব্যক্তি বিতর পড়ে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়”) (আবু দাউদ ও হাকিম)।
- জমহুরের দলিল:
- হাদিস: «صَلَاةُ اللَّيْلِ مَثْنَى مَثْنَى، فَإِذَا خَشِيَ أَحَدُكُمُ الصُّبْحَ صَلَّى رَكْعَةً وَاحِدَةً تُوتِرُ لَهُ مَا قَدْ صَلَّى» (“রাতের নামাজ দুই দুই রাকাত, তোমাদের কেউ সুবহে সাদিকের আশঙ্কা করলে এক রাকাত পড়ে নেবে যা তার পূর্বের নামাজকে বিজোড় করে দেবে”) (বুখারী ও মুসলিম)।
উপসংহার: হানাফি পদ্ধতিটি সাহাবায়ে কেরাম (বিশেষত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.)-এর নিরবচ্ছিন্ন আমল দ্বারা অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণিত।
مجموعة (ب) : ابن ماجه – كتاب الزكاة (খ-অংশ: ইবনে মাজাহ শরীফ – যাকাত অধ্যায়)
٦- بين وعيد مانع الزكاة في ضوء القرآن والحديث، وما حكم قتالهم؟
[৬. কুরআন ও হাদিসের আলোকে যাকাত অস্বীকারকারীর কঠিন শাস্তি এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিধান আলোচনা কর।]
ভূমিকা: যাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম অর্থনৈতিক ভিত্তি। কুরআন ও হাদিসে বারবার নামাজের পাশাপাশি যাকাত আদায়ের কঠোর নির্দেশ এসেছে। যারা যাকাত প্রদান করতে অস্বীকার করে, তাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে ভয়াবহ শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
১. কুরআন মাজিদে যাকাত বর্জনকারীর ভয়াবহ পরিণতি (الوعيد في القرآن):
- সূরা আত-তাওবাহ্ (আয়াত ৩৪-৩৫): মহান আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন:
﴿وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ * يَوْمَ يُحْمَىٰ عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَىٰ بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ ۖ هَٰذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنتُمْ تَكْنِزُونَ﴾
“আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় (যাকাত প্রদান) করে না, তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সুসংবাদ দিন। যেদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের কপাল, পাঁজর ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে; (এবং বলা হবে) এটিই তা যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা রেখেছিলে, অতএব নিজেদের সঞ্চয়ের স্বাদ গ্রহণ কর।” - সূরা আলে ইমরান (আয়াত ১৮০): কৃপণতাকারীদের জমাকৃত ধনসম্পদ কিয়ামতের দিন বিষাক্ত সাপের বেড়ি বানিয়ে তাদের গলায় পরিয়ে দেওয়া হবে।
২. হাদিস শরীফে যাকাত বিরোধীদের শাস্তি (الوعيد في الحديث):
সুনানু ইবনে মাজাহ ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
«مَا مِنْ صَاحِبِ ذَهَبٍ وَلَا فِضَّةٍ لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ صُفِّحَتْ لَهُ صَفَائِحُ مِنْ نَارٍ…»
“যে ব্যক্তি তার স্বর্ণ-রৌপ্যের হক (যাকাত) আদায় করে না, কিয়ামতের দিন তার জন্য আগুনের পাত তৈরি করা হবে এবং জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করে তার পার্শ্বদেশ, কপাল ও পিঠে দাগা হবে। যখনই তা শীতল হবে, পুনরায় তা উত্তপ্ত করা হবে এমন এক দিনে যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান—যতক্ষণ না বান্দাদের বিচার নিষ্পত্তি হয়।” এছাড়া উট, গরু বা ছাগলের যাকাত না দিলে সেগুলো কিয়ামতের দিন আরও স্থূল ও শক্তিশালী হয়ে মালিককে শিং দিয়ে গুঁতো মারবে ও খুর দিয়ে মাড়াবে।
৩. যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শরয়ী বিধান (حكم قتال مانعي الزكاة):
- হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর আরবের কিছু গোত্র নামাজ পড়তে সম্মত হলেও নবপ্রতিষ্ঠিত বায়তুলমালে যাকাত দিতে অস্বীকার করে। তখন খলিফাতুল মুসলিমীন আবু বকর (রা.) এক ঐতিহাসিক ও আপসহীন ঘোষণা দেন:
«وَاللَّهِ لَأُقَاتِلَنَّ مَنْ فَرَّقَ بَيْنَ الصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ، فَإِنَّ الزَّكَاةَ حَقُّ الْمَالِ، وَاللَّهِ لَوْ مَنَعُونِي عِقَالًا كَانُوا يُؤَدُّونَهُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَقَاتَلْتُهُمْ عَلَى مَنْعِهِ»
“আল্লাহর কসম! নামাজ ও যাকাতের মধ্যে যে পার্থক্য সৃষ্টি করবে আমি অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। কেননা যাকাত হলো সম্পদের হক। আল্লাহর কসম! তারা যদি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে উট বাঁধার একটি রশিও যাকাত হিসেবে দিয়ে থাকত এবং আজ তা দিতে অস্বীকার করে, তবে এই অস্বীকৃতির কারণে আমি তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ ঘোষণা করব!” (বুখারী ও তিরমিযী)। - সাহাবায়ে কেরামের ইজমা (ঐকমত্য): ওমর ফারুক (রা.) প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে আবু বকর (রা.)-এর দূরদর্শিতা মেনে নেন এবং সমস্ত সাহাবি ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের বিরুদ্ধে ‘রিদ্দার যুদ্ধ’ পরিচালনা করেন।
- ফিকহি বিধান: যদি কোনো দল সম্মিলিতভাবে শক্তি প্রয়োগ করে ইসলামি রাষ্ট্রকে যাকাত দিতে অস্বীকার করে, তবে রাষ্ট্রের জন্য তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে রাষ্ট্রীয় আনুগত্য ও বায়তুলমালের অধিকার ফিরিয়ে আনা ওয়াজিব। আর যদি কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে কৃপণতাবশত না দেয় তবে তাকে বন্দি করে জোরপূর্বক তার সম্পদ থেকে যাকাত আদায় করা হবে এবং তাযীরী শাস্তি দেওয়া হবে।
উপসংহার: যাকাত অস্বীকার করা কেবল আর্থিক অপরাধ নয়; বরং তা ইসলামি অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর এক মারাত্মক বিদ্রোহ।
٧- من هو العامل على الصدقة؟ واذكر شروطه وصفاته وحكم أخذ الرشوة أو الهدية له-
[৭. যাকাত আদায়কারী কর্মকর্তা (আমেল) কে? তার শর্ত ও গুণাবলি এবং তার জন্য উপঢৌকন বা ঘুষ গ্রহণের হুকুম আলোচনা কর।]
ভূমিকা: পবিত্র কুরআনে বর্ণিত যাকাত বণ্টনের আটটি খাতের অন্যতম হলো ‘আল-আমিলীনা আলাইহা’ (العاملين عليها)। ইসলামি অর্থব্যবস্থায় যাকাত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণে নিয়োজিত দায়িত্বশীলদের আমেল বলা হয়।
১. আমেলের সংজ্ঞা ও পরিচয়:
ইসলামি সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের নিকট থেকে হিসাব অনুযায়ী যাকাত নির্ধারণ, আদায়, হেফাজত এবং তা যথাস্থানে অভাবীদের মাঝে বণ্টনের জন্য নিযুক্ত বিশ্বস্ত কর্মচারীকে ‘আমেলে যাকাত’ বলা হয়। সূরা তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে তাদের পারিশ্রমিক বা বেতন যাকাতের তহবিল থেকেই নির্ধারণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
২. আমেলের আবশ্যকীয় শর্ত ও গুণাবলি (شروطه وصفاته):
- মুসলিম হওয়া: আমেলকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে; কোনো অমুসলিমকে যাকাত ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া বৈধ নয়।
- বয়োপ্রাপ্ত ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া: নাবালক বা পাগলের নিয়োগ গ্রহণযোগ্য নয়।
- বিশ্বস্ততা ও ন্যায়পরায়ণতা (الأمانة والعدالة): আমেলকে সৎ, খোদাভীরু ও বিশ্বাসঘাতকতামুক্ত হতে হবে, যাতে সম্পদের অপচয় বা আত্মসাৎ না ঘটে।
- যাকাতের মাসায়েল ও হিসাবের জ্ঞান: বিভিন্ন সম্পদের নিসাব, পরিমাণ, উশর ও ফিকহি নিয়মকানুন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে।
- হাশেমি বংশোদ্ভূত না হওয়া: রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর বংশধরদের (বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব) জন্য যাকাত গ্রহণ ও আমেল হিসেবে যাকাত থেকে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ নয়।
৩. আমেলের জন্য উপহার বা উপঢৌকন গ্রহণের বিধান:
- উপহার গ্রহণের হুকুম: সম্পূর্ণ হারাম ও খেয়ানত। আমেল দায়িত্ব পালনকালে যাকাতদাতাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত হাদিয়া, উপহার বা অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে না। একে ‘গুলুল’ (আত্মসাৎ বা রাষ্ট্রীয় চুরি) হিসেবে গণ্য করা হয়।
- হাদিসের অকাট্য সাক্ষ্য: সুনানু ইবনে মাজাহ, বুখারী ও মুসলিমে হযরত আবু হুমাইদ আস-সায়েদী (রা.) হতে বর্ণিত:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বনু সুলাইম গোত্রের যাকাত আদায়ের জন্য ‘ইবনুল লুতবিয়্যাহ’ নামক এক ব্যক্তিকে আমেল নিযুক্ত করেন। ফিরে এসে সে বলল: “এটি আপনাদের (বায়তুলমালের) যাকাতের মাল, আর এটি মানুষ আমাকে ব্যক্তিগত হাদিয়া বা উপহার দিয়েছে।” এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে মিম্বারে দাঁড়িয়ে বললেন:
«مَا بَالُ الْعَامِلِ نَبْعَثُهُ فَيَجِيءُ فَيَقُولُ: هَذَا لَكُمْ وَهَذَا أُهْدِيَ لِي! فَهَلَّا جَلَسَ فِي بَيْتِ أَبِيهِ أَوْ فِي بَيْتِ أُمِّهِ حَتَّى يَرَى أَيُهْدَى إِلَيْهِ أَمْ لَا؟»
“কর্মকর্তার কী হলো যে তাকে আমি কোনো দায়িত্ব দিয়ে পাঠাই, আর সে ফিরে এসে বলে: এটি আপনাদের মাল আর এটি আমার হাদিয়া! সে কেন তার পিতার ঘরে বা মাতার ঘরে বসে রইল না, তখন সে দেখত তাকে কেউ উপহার দেয় কি না?!” অতঃপর রাসুল (সা.) শপথ করে বলেন, কিয়ামতের দিন যে ব্যক্তি এমন উপহার গ্রহণ করবে সে তা কাঁধে বহন করে জাহান্নামে উপস্থিত হবে।
উপসংহার: আমেলকে বায়তুলমাল কর্তৃক নির্ধারিত পারিশ্রমিকেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে; দায়িত্বের সুযোগ নিয়ে যেকোনো ধরনের তোহফা বা ঘুষ গ্রহণ মারাত্মক কবিরা গুনাহ।
٨- بين أحكام زكاة الزروع والثمار: العشر ونصف العشر ومذاهب الفقهاء فيهما-
[৮. ফসলের যাকাত বা উশরের বিধান আলোচনা কর: উশর (দশমাংশ) ও নিসফে উশর (বিংশতিংশ)-এর হুকুম ও ফকিহগণের মাযহাব।]
ভূমিকা: মানবজীবনের প্রধান খাদ্যশস্য ও কৃষিজাত ফলফসলের ওপর ইসলাম যে আর্থিক ইবাদত নির্ধারণ করেছে, তাকে ‘উশর’ (العشر) বলা হয়। কৃষি অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় এটি অত্যন্ত বরকতময় বিধান।
১. উশরের শরয়ী ভিত্তি:
- কুরআনের নির্দেশ: ﴿وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ﴾ (“ফসল কাটার দিনে তার হক আদায় কর”) (সূরা আল-আন’আম: ১৪১)। এবং ﴿أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الْأَرْضِ﴾ (সূরা বাকারা: ২৬৭)।
- হাদিসের বিধান: সুনানু ইবনে মাজাহ ও তিরমিযীতে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «فِيمَا سَقَتِ السَّمَاءُ وَالْعُيُونُ أَوْ كَانَ عَثَرِيًّا الْعُشْرُ، وَفِيمَا سُقِيَ بِالنَّضْحِ نِصْفُ الْعُشْرِ» (“বৃষ্টির পানি, প্রাকৃতিক ঝর্ণা বা ভূগর্ভস্থ আর্দ্রতায় যা উৎপন্ন হয় তাতে উশর (১০ ভাগের ১ ভাগ); আর যা সেচযন্ত্র বা শ্রমের সাহায্যে পানি দিয়ে ফলানো হয় তাতে নিসফে উশর (২০ ভাগের ১ ভাগ বা ৫%)“)।
২. কখন উশর এবং কখন নিসফে উশর প্রযোজ্য:
| বিভাগ | সেচ পদ্ধতি | দেয় পরিমাণ |
|---|---|---|
| উশর (العُشْر – ১০%) | আকাশের বৃষ্টি, নদীর প্লাবন, প্রাকৃতিক নালা বা ঝর্ণার পানি দ্বারা বিনা খরচে বা বিনা শ্রমে উৎপাদিত ফসল। | মোট ফসলের এক-দশমাংশ (১০%)। |
| নিসফে উশর (نصف العُشْر – ৫%) | কূপ, গভীর নলকূপ, মোটরের সেচ, কেনা পানি বা পশুর সাহায্যে অতিরিক্ত অর্থ ও শ্রমে উৎপাদিত ফসল। | মোট ফসলের বিশ ভাগের এক ভাগ (৫%)। |
৩. ফসলের ধরন ও নিসাবের ব্যাপারে ফকিহগণের মাযহাব:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.): জমির উৎপন্ন যেকোনো ফল বা ফসলেই উশর ওয়াজিব—তা ধান, গম, যব হোক বা শাকসবজি ও ফলমূল হোক। এতে কোনো ‘নিসাব’ (নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন পরিমাণ) নেই এবং এক বছর পার হওয়া (হাওলানুল হাওল) শর্ত নয়; অল্প হোক বা বেশি হোক জমিন থেকে ফসল বের হলেই উশর দিতে হবে। (তবে ঘাস, কাঠ ও বাঁশের মতো অখাদ্য উদ্ভিদে উশর নেই)।
- সাহেবাইন (ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ রহ.) এবং জমহুর (শাফেয়ী, মালিক ও আহমাদ রহ.):
- ফসলে উশর ওয়াজিব হওয়ার জন্য ৫ ওসাক্ব (خمسة أوسق) পরিমাণ নিসাব থাকা আবশ্যক। রাসুল (সা.) বলেন: «لَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسَةِ أَوْسُقٍ صَدَقَةٌ»। ১ ওসাক্ব = ৬০ সা’, অতএব ৫ ওসাক্ব = ৩০০ সা’ (প্রায় ২০ মণ বা প্রায় ৭৫০-৮০০ কেজি)।
- যে সকল ফসল সংরক্ষণযোগ্য ও শুকিয়ে রাখা যায় (যেমন ধান, গম, খেজুর, কিশমিশ) কেবল তাতেই উশর ওয়াজিব; পচনশীল কাঁচা শাকসবজিতে উশর নেই।
উপসংহার: উশর আদায় করা কৃষকের ফসলে বরকত আনে এবং সমাজের অনাহারক্লিষ্ট মানুষের খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধান করে।
٩- ما هي زكاة الفطر؟ وعلى من تجب؟ وما مقدارها ووقت إخراجها؟
[৯. সাদাকাতুল ফিতর কী? কার ওপর ওয়াজিব? এর পরিমাণ ও আদায়ের সময় আলোচনা কর।]
ভূমিকা: পবিত্র রমজানের সিয়াম পালন শেষে ঈদুল ফিতরের আনন্দের দিনে সমাজের দরিদ্রদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য শরীয়ত যে দানকে ওয়াজিব করেছে, তাকে ‘সাদাকাতুল ফিতর’ বা ফিতরা বলা হয়।
১. সাদাকাতুল ফিতরের সংজ্ঞা ও তাৎপর্য:
সুনানু ইবনে মাজাহ ও আবু দাউদে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত:
«فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ، وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ»
“রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজাদারের অনর্থক কথাবার্তা ও অশ্লীলতার ত্রুটি থেকে পবিত্র করার উদ্দেশ্যে এবং মিসকিনদের খাদ্যের সংস্থান হিসেবে সাদাকাতুল ফিতরকে ওয়াজিব করেছেন।”
২. কার ওপর ওয়াজিব (على من تجب):
- হানাফি মাযহাব অনুযায়ী: ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় যে স্বাধীন মুসলমানের নিকট নিজের ও পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন (বাসস্থান, পোশাক, গৃহস্থালি সামগ্রী) অতিরিক্ত সাড়ে ৫২ তোলা রূপা বা তার সমমূল্যের অতিরিক্ত সম্পদ থাকবে, তার ওপর নিজের এবং তার নাবালক সন্তানদের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। এতে এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া বা ব্যবসায়ী মাল হওয়া শর্ত নয়।
- জমহুর ফুকাহা: ঈদের দিন ও রাতের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত থাকলে প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর নিজের ও পোষ্যদের পক্ষ থেকে ফিতরা দেওয়া ফরজ।
৩. ফিতরার পরিমাণ (مقدارها):
হাদিস শরীফে প্রধানত চারটি খাদ্যদ্রব্যের ভিত্তিতে পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে:
- গম বা আটা: অর্ধ সা’ (نصف صاع) = প্রায় ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম (সতর্কতামূলক ২ কেজি)।
- খেজুর, কিশমিশ বা যব: এক পূর্ণ সা’ (صاع كامل) = প্রায় ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম।
- মূল্য দ্বারা পরিশোধ: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে খাদ্যদ্রব্যের সমপরিমাণ নগদ টাকা বা মূল্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা জায়েজ এবং দরিদ্রের প্রয়োজনের দিক থেকে অধিক উত্তম।
৪. ফিতরা আদায়ের সময় (وقت إخراجها):
- মুস্তাহাব সময়: ঈদের দিন সুবহে সাদিকের পর ঈদের নামাজের উদ্দেশ্যে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে আদায় করা সর্বোত্তম।
- জায়েজ সময়: রমজান মাসের যেকোনো সময় অগ্রিম প্রদান করা জায়েজ, যাতে গরিবরা ঈদের কেনাকাটা করতে পারে।
- দেরি করার হুকুম: ঈদের নামাজের পর আদায় করলে তা সাধারণ সাদাকা হিসেবে গণ্য হবে এবং ওয়াজিব আদায় হলেও ফজিলত ক্ষুণ্ন হবে।
উপসংহার: সাদাকাতুল ফিতর ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য দূর করে ঈদের আনন্দকে সার্বজনীন রূপ দান করে।
مجموعة (ج) : دراسة الكتب والمؤلفين (গ-অংশ: গ্রন্থ ও গ্রন্থকার পরিচিতি)
١٠- اكتب نبذة عن الإمام الترمذي وكتابه السنن ودرجات الأحاديث عنده ومكانته بين كتب الحديث-
[১০. ইমাম তিরমিযী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী, তাঁর ‘সুনান’ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য, হাদিসের শ্রেণিবিন্যাস এবং হাদিস শাস্ত্রে এর অনন্য মর্যাদা আলোচনা কর।]
ভূমিকা: সিহাহ সিত্তাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও হাদিস সমালোচক হলেন ইমাম আবু ঈসা আত-তিরমিযী (রহ.)। তাঁর সংকলিত ‘আল-জামি’ বা ‘সুনানুত তিরমিযী’ হাদিস ও তুলনামূলক ফিকহ সাহিত্যের এক অমর বিশ্বকোষ।
১. ইমাম তিরমিযী (রহ.)-এর জীবনী:
- নাম ও বংশ: মুহাম্মদ ইবনে ঈসা ইবনে সাওরাহ ইবনে মুসা ইবনে আদ-দাহহাক আস-সুলামী আত-তিরমিযী। উপনাম আবু ঈসা।
- জন্ম ও ওফাত: জন্ম ২০৯ হিজরিতে বর্তমান উজবেকিস্তানের তিরমিয শহরের নিকটবর্তী বুগ নামক গ্রামে; ওফাত ২৭৯ হিজরিতে নিজ জন্মস্থানে। জীবনের শেষভাগে আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
- শিক্ষা ও শিক্ষকগণ: তিনি জ্ঞানার্জনের জন্য খোরাসান, ইরাক ও হিজায সফর করেন। তাঁর প্রধানতম উস্তাদ ও দিকনির্দেশক ছিলেন ইমামুল বুখারী (রহ.)। ইমাম বুখারী তাঁকে বলতেন: “তুমি আমার কাছ থেকে যতটুকু উপকৃত হয়েছ, আমি তোমার কাছ থেকে তার চেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছি।” এছাড়া ইমাম মুসলিম ও আবু দাউদও তাঁর উস্তাদ ছিলেন।
২. জামি’উত তিরমিযীর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- হাদিস ও ফিকহের অপূর্ব সমন্বয়: ইমাম তিরমিযী কেবল হাদিস উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হননি; বরং প্রতিটি অধ্যায়ে সাহাবা, তাবেয়ী ও মুজতাহিদ ইমামগণের (আবু হানিফা, শাফেয়ী, মালিক, আহমদ, সাওরী) ফিকহি মাযহাব বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন।
- হাদিসের মান ও স্তরের সুনির্দিষ্ট বিচার: তিনিই প্রথম মুহাদ্দিস যিনি হাদিসের সনদের সূক্ষ্ম মান নির্ণয় করে ‘সহীহ’, ‘হাসান’, ‘গরীব’, ‘সহীহ হাসান’ বা ‘হাসান গরীব’ ইত্যাদি পরিভাষার আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেন।
- ‘হাসান’ (الحسن) পরিভাষার উদ্ভাবন: সহীহ ও যয়ীফের মাঝামাঝি পর্যায়ের ‘হাসান হাদিস’-কে সংজ্ঞায়িত ও প্রামাণ্য দলিলের রূপ তিনিই প্রথম ব্যাপকভাবে দেন।
- ‘ফিলে বাবি’ (وفي الباب)-এর নির্দেশ: সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আর কোন কোন সাহাবি থেকে হাদিস বর্ণিত রয়েছে, তার তালিকা উল্লেখ করে তিনি গবেষণার দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।
৩. হাদিস শাস্ত্রে জামি’উত তিরমিযীর মর্যাদা:
ইমাম তিরমিযী গ্রন্থটি রচনার পর হিজায, ইরাক ও খোরাসানের বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের সামনে পেশ করেন। তাঁরা অত্যন্ত প্রশংসার সাথে তা গ্রহণ করেন। তিনি নিজেই গর্বের সাথে বলেছেন:
«مَنْ كَانَ فِي بَيْتِهِ هَذَا الْكِتَابُ، فَكَأَنَّمَا فِي بَيْتِهِ نَبِيٌّ يَتَكَلَّمُ»
“যার ঘরে এই কিতাবটি রয়েছে, তার ঘরে যেন স্বয়ং নবী কথা বলছেন!”
উপসংহার: জামি’উত তিরমিযী মুহাদ্দিস ও ফকিহ উভয়ের জন্যই এক অপরিহার্য আকর গ্রন্থ, যা ইসলামের আইনি ঐতিহ্যকে চিরভাস্বর করে রেখেছে।
١١- اكتب نبذة عن الإمام ابن ماجه وترجمته وكتابه السنن وزوائد ابن ماجه ومكانته في الصحاح الستة-
[১১. ইমাম ইবনে মাজাহ (রহ.)-এর জীবনী, তাঁর ‘সুনান’ গ্রন্থ, যাওয়াইদে ইবনে মাজাহ এবং সিহাহ সিত্তায় এর অবস্থান আলোচনা কর।]
ভূমিকা: ইলমে হাদিসের ইতিহাসে সিহাহ সিত্তাহ বা কুতুবে সিত্তাহর ষষ্ঠতম গ্রন্থ হিসেবে যাঁর নাম চিরস্মরণীয়, তিনি হলেন ইমাম আবু আব্দুল্লাহ ইবনে মাজাহ আল-ক্বাযভীনি (রহ.)। তাঁর ‘সুনানু ইবনে মাজাহ’ চমৎকার অধ্যায় বিন্যাস ও বিরল হাদিসের সংকলন হিসেবে সুবিখ্যাত।
১. ইমাম ইবনে মাজাহ (রহ.)-এর জীবনী:
- নাম ও উপাধি: আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াযীদ ইবনে মাজাহ আল-ক্বাযভীনি আর-রবাঈ। ‘ইবনে মাজাহ’ তাঁর পিতার লকব বা উপাধি ছিল।
- জন্ম ও ওফাত: জন্ম ২০৯ হিজরিতে ইরানের বিখ্যাত ক্বাযভীন শহরে; ওফাত ২৭৩ হিজরিতে নিজ জন্মভূমিতে।
- ইলমি সফর ও শিক্ষকগণ: হাদিস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি তৎকালীন জ্ঞানকেন্দ্র কুফা, বসরা, বাগদাদ, দামেস্ক, মিশর ও হিজায সফর করেন। তাঁর প্রধান উস্তাদগণের মধ্যে ছিলেন আলী ইবনে মুহাম্মদ আত-তানাফিসি, আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহ ও হিশাম ইবনে আম্মার।
২. সুনানু ইবনে মাজাহর বৈশিষ্ট্য ও ‘যাওয়াইদ’:
- অনুপম বিন্যাস ও বালাগাত: সুনানু ইবনে মাজাহ অত্যন্ত সুসংহত ও সুবিন্যস্ত। এতে কোনো হাদিসের অহেতুক পুনরাবৃত্তি নেই এবং প্রতিটি অনুচ্ছেদের নামকরণ অত্যন্ত অর্থবহ ও আকর্ষণীয়। এতে মোট ৪,৩৪৭টি হাদিস রয়েছে (৩২টি কিতাব ও ১,৫০০টি বাব)।
- যাওয়াইদে ইবনে মাজাহ (زوائد ابن ماجه): সিহাহ সিত্তাহর বাকি পাঁচটি কিতাবে (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী ও নাসাঈ) নেই—এমন অতিরিক্ত ১,৩৩৯টি একক হাদিস ইমাম ইবনে মাজাহ তাঁর গ্রন্থে সংকলন করেছেন। মুহাদ্দিসদের পরিভাষায় এগুলোকে ‘যাওয়াইদে ইবনে মাজাহ’ বলা হয়। আল্লামা বুসিরী (রহ.) এই অতিরিক্ত হাদিসগুলোকে ‘মিসবাহুজ জুজাজাহ ফী যাওয়াইদি ইবনি মাজাহ’ নামে স্বতন্ত্র গ্রন্থে সংকলন ও সনদ বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে ৯২৮টি সহীহ বা হাসান এবং বাকিগুলো যয়ীফ।
৩. সিহাহ সিত্তায় সুনানু ইবনে মাজাহর অন্তর্ভুক্তি ও মর্যাদা:
- প্রাথমিক যুগে ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে ইমাম মালেকের ‘মুওয়াত্তা’ অথবা ইমাম দারেমীর ‘সুনান’-কে গণ্য করা হতো।
- পঞ্চম হিজরি শতকে প্রখ্যাত হাফেযে হাদিস আবুল ফজল মুহাম্মদ ইবনে তাহির আল-মাকদিসী (মৃত ৫০৭ হি.) সর্বপ্রথম সুনানু ইবনে মাজাহকে এর ফিকহি উপকারিতা ও অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিসের উপস্থিতির কারণে ‘সিহাহ সিত্তাহ’-এর ষষ্ঠতম কিতাব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। পরবর্তীতে হাফেয আব্দুল গনি আল-মাকদিসী ও আল্লামা ইবনুল আসীর একে চূড়ান্ত রূপ দান করেন।
- হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী ও ইবনে কাসীর বলেন: এটি চমৎকার বিন্যাসের এক অনন্য হাদিস গ্রন্থ।
উপসংহার: কিছু দুর্বল হাদিস থাকা সত্ত্বেও সুনানু ইবনে মাজাহর আইনি সংকলন ও ফিকহি প্রয়োগ ইসলামি জ্ঞানভাণ্ডারকে অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি দান করেছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. হানাফি মাযহাব অনুযায়ী ফজর নামাজ কোন সময়ে আদায় করা মুস্তাহাব?
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী পুরুষদের জন্য আকাশ আলোকিত ও পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত ফজর নামাজ ‘ইসফার’ করে আদায় করা সুন্নাতে মুস্তাহাব।
২. ইমামের পেছনে কিরাত পাঠের ব্যাপারে হানাফি মাযহাবের সিদ্ধান্ত কী?
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী জাহরী ও সিররী কোনো নামাজেই মুক্তাদী কিরাত পাঠ করবে না; বরং ইমামের কিরাত মুক্তাদীর কিরাত হিসেবে যথেষ্ট হবে।
৩. প্রচণ্ড গরমে জোহর শীতল করে আদায় করার হুকুম কী?
প্রচণ্ড গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা কিছুটা কমে ছায়া দীর্ঘ হওয়া পর্যন্ত জোহরের নামাজ বিলম্ব করে আদায় করাকে ‘ইবরাদ’ বলা হয়, যা হাদিসসম্মত মুস্তাহাব আমল।
৪. হানাফি মাযহাবে বিতর নামাজ কত রাকাত এবং এর হুকুম কী?
হানাফি মাযহাবে বিতর নামাজ এক সালামে তিন রাকাত এবং এটি ‘ওয়াজিব’; কোনো কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃত পরিত্যাগ করা গুনাহ।
৫. কৃষিজাত ফসলে উশর ও নিসফে উশরের পরিমাণ কত?
বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক পানিতে উৎপাদিত ফসলে উশর বা ১০ শতাংশ (১০ ভাগের ১ ভাগ), আর কৃত্রিম সেচ ও খরচে উৎপাদিত ফসলে নিসফে উশর বা ৫ শতাংশ (২০ ভাগের ১ ভাগ)।
৬. সিহাহ সিত্তার ষষ্ঠ কিতাব হিসেবে সুনানু ইবনে মাজাহকে কে প্রথম অন্তর্ভুক্ত করেন?
পঞ্চম হিজরি শতকে প্রখ্যাত হাফেযে হাদিস আবুল ফজল মুহাম্মদ ইবনে তাহির আল-মাকদিসী (রহ.) সর্বপ্রথম সুনানু ইবনে মাজাহকে সিহাহ সিত্তার অন্তর্ভুক্ত করেন।