জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলাদেশে হাদিস চর্চার ইতিহাস (Tarikh Ilm al-Hadith fi Shibh al-Qarrah) – ২০২২০২, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

Abswer.com Abswer.com
21 September, 2026
৬৮ মিনিট পড়ার সময়
১১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলাদেশে হাদিস চর্চার ইতিহাস
বিষয় কোড: ২০২২০২
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা

ক বিভাগ (القسم الأول) – পূর্ণাঙ্গ রচনামূলক প্রশ্ন সমাধান

١. تحدث عن دخول الإسلام فى شبه القارة الهندية مفصلا-

[১. ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ও প্রচার-প্রসার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

দক্ষিণ এশিয়া বা ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের আগমন পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক কারণে আরবদের সাথে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ব থেকেই বিদ্যমান ছিল। ইসলাম আগমনের পর সেই বাণিজ্যিক কাফেলার মাধ্যমেই ভারতে তাওহীদ ও সুন্নাহর আলো বিকশিত হতে শুরু করে। পরবর্তীতে বিজয়াভিযান, সুফি-সাধকদের দাওয়াত এবং সামাজিক সমতার দর্শনে মুগ্ধ হয়ে এ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।

১. প্রাক-ইসলামী যুগে আরব-ভারত সম্পর্ক

ভারত মহাসাগর ও আরব সাগরের মাধ্যমে প্রাচীনকাল থেকেই আরব বণিকগণ ভারতের পশ্চিম উপকূলীয় বন্দরগুলোতে (কেরালা, মালাবার, গুজরাট ইত্যাদি) বাণিজ্য পরিচালনা করতেন। তাঁরা মসলা, তলোয়ার ও সুগন্ধি সামগ্রী ক্রয় করতেন। ফলে ইসলামের সূচনাকালে যখন আরবরা মুসলমান হলেন, তখন তাঁরা নিষ্ঠাবান ব্যবসায়ী হিসেবে ভারতে ইসলামের মহান আদর্শ প্রদর্শন করতে শুরু করেন।

২. সাহাবায়ে কিরামের যুগ ও প্রাথমিক সামরিক অভিযান

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খেলাফতকালে (১৫ হিজরী / ৬৩৬ খ্রি.) বাহরাইন ও ওমানের গভর্নর উসমান ইবনে আবিল আস আস-সাকাফী (রা.)-এর নেতৃত্বে ভারতের বোম্বে উপকূলীয় থানা (Thana) ও ভারুচে প্রাথমিক নৌ-অভিযান প্রেরিত হয়। পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর যুগেও ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল মাকরান ও সিন্ধুর ভৌগোলিক অনুসন্ধান চালানো হয়। হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর আমলে মুহাল্লাব ইবনে আবী সুফরা সিন্ধুর সীমান্ত পর্যন্ত অগ্রসর হন।

৩. মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয় (৯৩ হিজরী / ৭১২ খ্রিষ্টাব্দ)

উপমহাদেশে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইসলামের বিজয়ের দরজা উন্মোচিত হয় কিশোর সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম আস-সাকাফী (রহ.)-এর মাধ্যমে।

  • পটভূমি: সিংহলের (শ্রীলঙ্কা) রাজা খলিফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক এবং ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জন্য কিছু মূল্যবান উপহার ও অনাথ মুসলিম নারী-শিশুদের একটি জাহাজে করে পাঠিয়েছিলেন। সিন্ধুর দেবল বন্দরের কাছে জলদস্যুরা জাহাজটি লুণ্ঠন করে এবং মুসলিম নারীদের বন্দি করে। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সিন্ধুর রাজা দাহিরের নিকট বন্দিদের মুক্তি দাবি করলে দাহির জলদস্যুদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ নেই বলে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে।
  • অভিযান ও বিজয়: হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তাঁর ১৭ বছর বয়সী সুযোগ্য ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ বিন কাসিমকে এক সুসজ্জিত বাহিনীর সেনাপতি করে প্রেরণ করেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে দেবল দুর্গ জয় করেন এবং ক্রমান্বয়ে নিরুন, সেহওয়ান এবং রাওয়ারের যুদ্ধে রাজা দাহিরকে পরাজিত ও নিহত করেন। পরবর্তীতে তিনি মুলতান পর্যন্ত সমগ্র সিন্ধু অঞ্চল মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।
  • ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার: মুহাম্মদ বিন কাসিম স্থানীয় হিন্দু ও বৌদ্ধ প্রজাদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা, উপাসনালয় রক্ষার প্রতিশ্রুতি এবং নিরাপত্তা প্রদান করেন। তাঁর অমায়িক ব্যবহার ও সুবিচারে মুগ্ধ হয়ে বহু স্থানীয় অধিবাসী স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে। তাঁর বিদায়ের সময় সিন্ধুর সাধারণ মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েছিল।

৪. সুলতানী ও তুর্কী যুগ (মাহমুদ গজনবী ও মুহাম্মদ ঘূরী)

একাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুলতান মাহমুদ গজনবী উত্তর ভারতে ১৭ বার অভিযান পরিচালনা করে পাঞ্জাব পর্যন্ত স্থায়ী মুসলিম শাসনের ভিত্তি গড়েন। অতঃপর দ্বাদশ শতকের শেষভাগে সুলতান শিহাবুদ্দীন মুহাম্মদ ঘূরী ১১৯২ সালে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ চৌহানকে পরাজিত করে দিল্লিতে স্থায়ী মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর সেনাপতি কুতুবুদ্দীন আইবেক দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন এবং আরেক সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা বিজয় করে ইসলামি শাসনের সূচনা করেন।

৫. সুফি-সাধক ও আউলিয়ায়ে কিরামের আধ্যাত্মিক বিপ্লব

উপমহাদেশে ইসলাম প্রসারে সবচেয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকা পালন করেন সুফি-দরবেশগণ। তৎকালীন হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা (বর্ণবাদ) ও অস্পৃশ্যতার যাতাকলে নিষ্পেষিত নিম্নবর্ণের মানুষ সুফিদের খানকাগুলোতে ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিক মর্যাদার সন্ধান পায়। উল্লেখযোগ্য সুফি সাধকগণ:

  • হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী আজমীরী (রহ.): ভারতে চিশতিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর দাওয়াতে রাজস্থানের লাখ লাখ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।
  • হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া ও কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহ.): দিল্লির কেন্দ্রস্থলে দাওয়াত ও শিক্ষার বিস্তার করেন।
  • হযরত শায়খ জালালুদ্দীন তাবরিযী ও হযরত শাহজালাল ইয়ামেনী (রহ.): বাংলায় ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দেন এবং সিলেটের ভূখণ্ডে তাওহীদের পতাকা উড্ডীন করেন।
  • হযরত বাবা ফরিদ গঞ্জে শাকার ও বাহাউদ্দীন জাকারিয়া মুলতানী (রহ.): পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেন।

উপসংহার

সততা, বাণিজ্য, রাজনৈতিক সুবিচার এবং আউলিয়ায়ে কিরামের আধ্যাত্মিক সাধনার সমন্বয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের বিস্তার ঘটে। এর ফলেই আজ এ উপমহাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।


٢. اكتب عن جهود العلماء فى نشر الحديث وعلومه فى عصر المغول-

[২. মুঘল আমলে হাদিস ও হাদিসের উলুম প্রসারে উলামায়ে কিরামের অবদান বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত মুঘল সাম্রাজ্য ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখে। মুঘল যুগে বিশেষ করে আকবরের বিভ্রান্তিকর দ্বীন-ই-ইলাহী ও বস্তুবাদী দর্শন প্রতিহত করে সহীহ হাদিস ও সুন্নাহর পুনরুজ্জীবনে উলামায়ে কেরাম যে ঐতিহাসিক সংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন, তা ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

১. মুঘল দরবার ও হাদিস চর্চার সামগ্রিক পটভূমি

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রথম দিকে ফিকহ, মানতিক (যুক্তিবিদ্যা) ও ফারসি সাহিত্যের চর্চা বেশি হলেও পরবর্তী সময়ে আরব ও হেজায ফেরত মুহাদ্দিসদের মাধ্যমে ইলমে হাদিসের ব্যাপক চর্চা শুরু হয়। বিশেষ করে সম্রাট আকবরের দরবারে যখন বিদআত ও দ্বীন বিকৃতির প্রকাশ ঘটে, তখন একদল মুখলিস আলেম সুন্নাহর পক্ষে আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর ও বিশেষ করে সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের আমলে হাদিস চর্চা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।

২. মুঘল যুগের শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিসগণের অবদান

  1. শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) (৯৫৮-১০৫২ হি. / ১৫৫১-১৬৪২ খ্রি.):

    তাঁকে মুঘল যুগে হাদিস শাস্ত্রের প্রধান পুনরুজ্জীবনকারী ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী মনে করা হয়। তিনি মক্কাতুল মুকাররমায় প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খ আব্দুল ওহাব আল-মুত্তাকী আল-মক্কীর নিকট বহু বছর অবস্থান করে হাদিস শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। দিল্লিতে ফিরে এসে তিনি মুঘল যুগে সর্বপ্রথম হাদিসের নিয়মতান্ত্রিক দরসগাহ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মিশকাতুল মাসাবীহের অমর আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘লুমা’আতুৎ তানকীহ’ (لمعات التنقيح) এবং ফারসি ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘আশি’আতুল লামা’আত’ রচনা করেন।

  2. ইমাম রব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানী শায়খ আহমদ সিরহিন্দী (রহ.) (৯৭১-১০৩৪ হি.):

    মুঘল সম্রাট আকবরের তথাকথিত ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’ এবং বেদআতি আচার-অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে তিনি একাই পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে যান। তিনি প্রমাণ করেন যে, সুন্নাহর অনুসরণ এবং হাদিসের আনুগত্য ব্যতীত কোনো আত্মিক উন্নতি বা শাসনব্যবস্থা সফল হতে পারে না। তাঁর বিখ্যাত ‘মাকতুবাতে ইমাম রব্বানী’তে তিনি সুন্নাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও বিদআতের ধ্বংসকারিতা হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দি হয়েও তিনি সুন্নাহর দাওয়াত অব্যাহত রাখেন।

  3. শায়খ আহমদ ইবনে আবদুর রহীম শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (রহ.) (১১১৪-১১৭৬ হি. / ১৭০৩-১৭৬২ খ্রি.):

    মুঘল সাম্রাজ্যের পড়ন্ত লগ্নে তিনি হাদিস চর্চায় বৈপ্লবিক রূপান্তর আনেন। তিনি হেজাজে গমন করে শায়খ আবু তাহের মুহাম্মদ বিন ইব্রাহীম আল-কুরদী মাদানী (রহ.)-এর নিকট হাদিসের সনদ গ্রহণ করেন। দিল্লিতে ফিরে এসে তিনি মাদরাসায়ে রহীমিয়ায় সিহাহ সিত্তার দরস শুরু করেন। তিনি মুয়াত্তা ইমাম মালেকের আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘আল-মুসাওয়া’ ও ফারসি ব্যাখ্যা ‘আল-মুসাফফা’ রচনা করেন। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’-তে তিনি হাদিসের আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শনের যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

  4. শাহ ওয়ালীউল্লাহর সুযোগ্য পুত্র ও উত্তরসূরিগণ:

    মুঘল যুগের শেষভাগে শাহ ওয়ালীউল্লাহর চার পুত্র উপমহাদেশে হাদিসের আলো ছড়িয়ে দেন: শাহ আব্দুল আযীয দেহলভী (যিনি ‘মুহাদ্দিসে দেহলভী’ নামে খ্যাত), শাহ রফীউদ্দীন, শাহ আব্দুল কাদির এবং শাহ আব্দুল গনী। তাঁদের হাত ধরেই ভারতের প্রতিটি প্রান্তে হাদিসের পাঠশালা উন্মুক্ত হয়।

  5. সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর ও ‘ফতোয়ায়ে আলমগীরী’:

    মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর ছিলেন পরম ধার্মিক ও হাদিসের অনুরাগী। তিনি শায়খ নিজামুদ্দীন বুরহানপুরীর নেতৃত্বে একদল শীর্ষ আলেমের মাধ্যমে বিশ্ববিখ্যাত ফিকহ ও হাদিসের আকর গ্রন্থ ‘আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ’ (ফতোয়ায়ে আলমগীরী) সংকলন করেন। তিনি আলেম ও মুহাদ্দিসদের বিপুল পরিমাণ জায়গীর ও ভাতা প্রদান করে সম্মানিত করেন।

  6. গুজরাট ও সিন্ধুর মুহাদ্দিসগণের অবদান:

    মুঘল যুগে গুজরাটের শায়খ মুহাম্মদ ইবনে তাহের আল-পাটনী (রহ.) (ওফাত: ৯৮৬ হি.) হাদিস বিজ্ঞানে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। তিনি হাদিসের বিরল শব্দাবলির অভিধান ‘মাজমাউ বিহারিল আনওয়ার’ (مجمع بحار الأنوار) এবং জাল হাদিস শনাক্তকরণে ‘তাযকিরাতুল মাউযু’আত’ রচনা করেন।

উপসংহার

মুঘল আমলে রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মাঝেও উলামায়ে কিরামের এই নিষ্ঠাপূর্ণ হাদিস সাধনা ভারতীয় উপমহাদেশকে পরবর্তীকালে গোটা মুসলিম জাহানের হাদিস চর্চার প্রধান আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছিল।


٣. اكتب نبذة عن حياة الإمام الشيخ أحمد السرهندى (مجدد ألف ثانى) رحمه الله ودوره فى تجديد الدين وإحياء السنة-

[৩. শায়খ আহমাদ সিরহিন্দী (মুজাদ্দিদে আলফে সানী) রহ.-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং দ্বীনের সংস্কার ও সুন্নাহর পুনরুজ্জীবনে তাঁর ভূমিকা বিস্তারিত লেখ।]

ভূমিকা

দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মহান সংস্কারক (مجدد الألف الثاني) ইমাম রব্বানী শায়খ আহমদ ফারুকী সিরহিন্দী (রহ.)। তিনি এমন এক ক্রান্তিকালে আবির্ভূত হয়েছিলেন যখন মুঘল দরবারের চাটুকার আলেম এবং ভ্রান্ত সুফিদের প্রভাবে ইসলাম তার নিজস্ব রূপ হারাতে বসেছিল। তিনি নির্ভীকচিত্তে বাতিল শক্তির মোকাবিলা করে বিশুদ্ধ সুন্নাহ ও শরীয়তের পুনরুজ্জীবন ঘটান।

১. সংক্ষিপ্ত জীবনী ও পরিচিতি

  • নাম ও বংশপরিচয়: নাম আহমদ, উপাধি বদরুদ্দীন, উপনাম আবু বারাকাত। তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর বংশধর হওয়ায় তাঁকে ‘ফারুকী’ বলা হয়। হিজরী দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে দ্বীনের সংস্কার করায় উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে তিনি ‘মুজাদ্দিদে আলফে সানী’ খেতাবে ভূষিত হন।
  • জন্ম ও শিক্ষা: তিনি ৯৭১ হিজরীর ১৪ শাওয়াল ভারতের পাঞ্জাবের অন্তর্গত সিরহিন্দ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা তিনি পিতা শায়খ আব্দুল আহাদের নিকট লাভ করেন। পরবর্তীতে শিয়ালকোটে গমন করে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আলেম মাওলানা কামালুদ্দীন কাশ্মীরীর নিকট ফিকহ ও উলুমুল আকলিয়া এবং শায়খ ইয়াকুব কাশ্মীরীর নিকট সহীহুল বুখারীসহ হাদিসের কিতাবসমূহ গভীর মনোযোগের সাথে অধ্যয়ন করে সনদ লাভ করেন। মাত্র সতের বছর বয়সে তিনি প্রচলিত সকল বিদ্যায় পূর্ণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
  • আধ্যাত্মিক সাধনা: তিনি প্রথমে চিশতিয়া ও কাদেরিয়া তরিকার সাধনা করেন। পরবর্তীতে দিল্লিতে এসে নকশবন্দিয়া তরিকার প্রখ্যাত বুযুর্গ খাজা বাকী বিল্লাহ (রহ.)-এর সান্নিধ্যে গিয়ে নকশবন্দিয়া তরিকার খেলাফত লাভ করেন। শায়খ বাকী বিল্লাহ তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন: “আহমদ এমন এক প্রদীপ যা দিয়ে গোটা পৃথিবী আলোকিত হবে।”
  • ওফাত: তিনি ১০৩৪ হিজরীর ২৮ সফর ৬৩ বছর বয়সে সিরহিন্দে ইন্তেকাল করেন। সেখানে তাঁর মাযার শরীফ আজও লাখ লাখ ভক্তের জিয়ারতস্থল।

২. দ্বীন সংস্কার ও সুন্নাহ পুনরুজ্জীবনে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা (دوره فى تجديد الدين وإحياء السنة)

  1. দ্বীন-ই-ইলাহী ও আকবরী ফেতনার মূলোৎপাটন:

    সম্রাট আকবর আবুল ফজল ও ফাইজীর পরামর্শে সকল ধর্মের জগাখিচুড়ি তৈরি করে ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’ নামক ভ্রান্ত ধর্ম প্রবর্তন করেছিল। নবুয়তের ধারণাকে অস্বীকার করা হচ্ছিল এবং দরবারে রাজকীয় সিজদা (সিজদায়ে তাহিয়্যা) বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। মুজাদ্দিদে আলফে সানী রাজন্যবর্গের তোয়াক্কা না করে ঘোষণা করেন যে, ইসলাম স্বয়ংসম্পূর্ণ দ্বীন। তিনি দ্বীন-ই-ইলাহীর প্রতিটি অনৈসলামিক বিশ্বাসের অসারতা যুক্তি ও দলীলের মাধ্যমে চূর্ণ করে দেন।

  2. মাকতুবাত শরীফের মাধ্যমে বৈপ্লবিক যোগাযোগ:

    তিনি কোনো রাজনৈতিক দল গঠন না করে তৎকালীন মুঘল উজির, সেনাপতি, সুবেদার ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নিকট সংস্কারমূলক চিঠি (مكتوبات) পাঠাতে শুরু করেন। খান-ই-খানান আব্দুর রহীম, খান-ই-আযম এবং অন্যান্য প্রভাবশালী আমিরদের নিকট প্রেরিত এই চিঠিগুলোতে তিনি সুন্নাহর গুরুত্ব, আখেরাতের জবাবদিহিতা এবং ইসলামি হুকুমত কায়েমের আবশ্যকতা তুলে ধরেন। তাঁর এই ‘মাকতুবাতে ইমাম রব্বানী’ ফারসি সাহিত্যের এক অতুলনীয় আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক দলিল।

  3. সম্রাটের সামনে আপসহীনতা ও কারাবরণ:

    সম্রাট জাহাঙ্গীর ক্ষমতা গ্রহণের পর মুজাদ্দিদকে দরবারে তলব করে রাজকীয় সিজদা করার নির্দেশ দেয়। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেন: “غير الله كے ليے سجده حرام هے” (আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো সামনে মাথা নত করা সম্পূর্ণ হারাম)। এই সত্যভাষণের কারণে তাঁকে গোয়ালিয়রের অন্ধকার দুর্গে বন্দি করা হয়। সেখানেও তিনি শত শত কয়েদী ও প্রহরীদের ইসলামের সুশীতল ছায়ায় নিয়ে আসেন। অবশেষে সম্রাট জাহাঙ্গীর নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়, তাঁকে সসম্মানে মুক্তি দেয় এবং তাঁর সকল শর্ত মেনে নিয়ে দরবারে ইসলামি অনুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

  4. ‘ওয়াহদাতুশ শুহূদ’ তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা:

    তৎকালীন বিভ্রান্ত সুফিরা ইবনুল আরাবীর ‘ওয়াহদাতুল উজূদ’ (সর্বেশ্বরবাদ)-এর অপব্যাখ্যা করে বলত—স্রষ্টা ও সৃষ্টি একাকার, ফলে শরীয়ত ও সুন্নাহর বাহ্যিক অনুসরণের প্রয়োজন নেই। শায়খ আহমদ সিরহিন্দী সুফিবাদের সংস্কার করে কুরআন-সুন্নাহসম্মত ‘ওয়াহদাতুশ শুহূদ’ (سير إلى الله ও سير في الله) তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, শরীয়তের অনুশাসনই তাসাউফের প্রাণ; সুন্নাহবিহীন তরিকত সম্পূর্ণ শয়তানী বিভ্রান্তি।

  5. সুন্নাহর প্রতিষ্ঠা ও বিদআতের মূলোৎপাটন:

    তিনি সমাজে প্রচলিত তথাকথিত ‘বিদআতে হাসানা’র তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, যেখানে একটি বিদআত জীবিত হয় সেখানে একটি সুন্নাহ মৃত্যুবরণ করে। তিনি সুন্নাহর হুবহু অনুসরণের ওপর জোর দেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাধারণ অভ্যাসগুলোকে অনুকরণ করাকেও পরম সৌভাগ্য বলে ঘোষণা করেন।

উপসংহার

ড. আল্লামা ইকবাল যথার্থই বলেছেন: “گردن نہ جھکی جس کی جہانگیر کے آگے، جس کے نفسِ گرم سے ہے گرمیِ احرار” (জাহাঙ্গীরের সামনে যাঁর গর্দান নত হয়নি, যাঁর আত্মিক উত্তাপে স্বাধীনচেতা বিপ্লবীদের হৃদয় চিরকাল উদ্বেলিত)। মুজাদ্দিদে আলফে সানীর এই আত্মত্যাগের ফলেই ভারতে ইসলাম নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল।


٤. اكتب نبذة عن حياة الشيخ عبد الحق المحدث الدهلوى رحمه الله ودوره فى نشر الحديث وعلومه فى شبه القارة الهندية-

[৪. শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ.-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং ভারতীয় উপমহাদেশে হাদিস ও তার উলুম প্রসারে তাঁর অনন্য ভূমিকা আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ভারতীয় উপমহাদেশে হাদিস শাস্ত্রের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী এবং ‘মুহাদ্দিসে দেহলভী’ উপাধিতে ভূষিত শীর্ষ মনীষী হলেন শায়খ আব্দুল হক দেহলভী (রহ.)। শাহ ওয়ালীউল্লাহর আবির্ভাবের এক শতাব্দী পূর্বে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি আরব বিশ্ব থেকে বিশুদ্ধ উলুমুল হাদিস ভারতে নিয়ে আসেন এবং এর সার্বজনীন পাঠদান শুরু করেন।

১. শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভীর সংক্ষিপ্ত জীবনী

  • নাম ও বংশপরিচয়: নাম আব্দুল হক, উপাধি মুহাদ্দিসে দেহলভী ও হাক্কানী। তিনি তুর্কী বংশোদ্ভূত এক সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শায়খ সাইফুদ্দীন ছিলেন উচ্চমানের আলেম ও আল্লাহভীরু সাধক।
  • জন্ম ও শিক্ষাজীবন: তিনি ৯৫৮ হিজরীতে (১৫৫১ খ্রি.) ঐতিহাসিক দিল্লি নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি প্রখর মেধার স্বাক্ষর রাখেন। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি কুরআন মাজীদ হিফয করেন। ২২ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি দিল্লির শীর্ষ আলেমদের নিকট থেকে ফিকহ, উসূলে ফিকহ, মানতিক ও কালাম শাস্ত্রের পাঠ সমাপ্ত করেন।
  • হেজাযে হিজরত ও হাদিস শিক্ষা: ৯৯৬ হিজরীতে তিনি পবিত্র মক্কা মুকাররমায় হিজরত করেন। সেখানে তিনি কুতুবুল ইরশাদ শায়খ আব্দুল ওহাব আল-মুত্তাকী আল-মক্কী (রহ.)-এর দরবারে দীর্ঘ তিন বছর অবস্থান করে হাদিসের সিহাহ সিত্তাহ ও অন্যান্য মূল গ্রন্থের পাঠ গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি উলুমুল হাদিস, আসমাউর রিজাল ও মুসতালাহুল হাদিসে সর্বোচ্চ দক্ষতা ও সনদের ইজাযত লাভ করেন।
  • দিল্লিতে প্রত্যাবর্তন ও ওফাত: ১০০১ হিজরীতে শায়খ মুত্তাকীর নির্দেশে তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে নিজ বাসভবনে হাদিসের আন্তর্জাতিক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সুদীর্ঘ অর্ধ শতাব্দী ধরে তিনি হাদিসের পাঠদান ও রচনায় মগ্ন থাকেন। অবশেষে ১০৫২ হিজরীতে (১৬৪২ খ্রি.) ৯৪ বছর বয়সে এই মহান সাধক দিল্লিতে ইন্তেকাল করেন। দিল্লির হাওজে শামসীর তীরে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

২. ভারতীয় উপমহাদেশে হাদিস চর্চায় তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা

  1. ভারতে হাদিসের নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদান:

    শায়খ আব্দুল হক দেহলভীর পূর্বে ভারতে কেবল ফিকহে হানাফীর ফাতওয়া এবং বালাগাত-মানতিকের চর্চা ছিল। হাদিস গ্রন্থসমূহ সরাসরি সনদসহ পড়ার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি দিল্লিতে সুবিন্যস্তভাবে মিশকাতুল মাসাবীহ এবং সিহাহ সিত্তার কিতাবসমূহের রিওয়ায়াত ও দেরায়াতভিত্তিক দরস শুরু করেন। ভারত ও মধ্য এশিয়ার হাজার হাজার তালিবে ইলম তাঁর দরবারে সমবেত হয়ে হাদিসের সনদ লাভ করে।

  2. অমর হাদিস ব্যাখ্যাগ্রন্থ প্রণয়ন:

    তিনি হাদিস সাহিত্যে বহু অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেন, যা আজও বিশ্বব্যাপী সমাদৃত:

    • লুমা’আতুৎ তানকীহ ফী শারহি মিশকাতিল মাসাবীহ (لمعات التنقيح في شرح مشكاة المصابيح): এটি মিশকাতের একখানা অসাধারণ ও প্রামাণ্য আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ। এতে তিনি হানাফী ফিকহের সাথে হাদিসের গভীর সমন্বয় সাধন করেছেন এবং রাবীদের পরিচয় ও ভাষাগত জটিলতা সমাধান করেছেন।
    • আশি’আতুল লামা’আত ফী তারজামাতি ও শারহিল মিশকাত (أشعة اللمعات): এটি চার খণ্ডে সমাপ্ত মিশকাতুল মাসাবীহের বিশদ ফারসি ব্যাখ্যাগ্রন্থ। তৎকালীন সময়ে ফারসি ছিল রাজভাষা ও শিক্ষিত সমাজের ভাষা। এই গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি সাধারণ শিক্ষিত মহলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহীহ হাদিস পৌঁছে দেন।
  3. মুসতালাহুল হাদিস ও উসূলে হাদিসের প্রচার:

    তিনি ভারতে সর্বপ্রথম উলুমুল হাদিস ও পরিভাষার ওপর ‘মুকাদ্দিমা ফী উসূলিল হাদিস’ (مقدمة في أصول الحديث) নামক একখানা মৌলিক কিতাব রচনা করেন। এর মাধ্যমে ভারতীয় তালিবে ইলমগণ সহীহ, হাসান, যঈফ ও মাউযু হাদিসের পার্থক্য নিরূপণ করার যোগ্যতা অর্জন করেন।

  4. সিরাত ও রিজাল শাস্ত্রের চর্চা:

    তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও সিরাতের ওপর ফারসি ভাষায় কালজয়ী গ্রন্থ ‘মাদারিজুন নবুওয়াত’ (مدارج النبوة) রচনা করেন, যা সিরাত সাহিত্যের এক অতুলনীয় সম্পদ। এছাড়া বুযুর্গ ও আউলিয়াদের জীবনীর ওপর রচনা করেন ‘আখবারুল আখইয়ার’।

  5. সুলতানদের নিকট সুন্নাহর দাওয়াত:

    তিনি মুঘল সম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীরের সমসাময়িক ছিলেন। আকবরের ভ্রান্ত ধর্মীয় নীতির প্রতিবাদে তিনি দরবার থেকে দূরে থাকেন, তবে বাদশাহ জাহাঙ্গীরকে পত্র মারফত শরিয়ত ও সুন্নাহর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য উৎসাহিত করেন।

উপসংহার

শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে হাদিস বিদ্যার জনকতুল্য। তাঁর প্রতিষ্ঠিত হাদিসের ভিত্তিভূমির ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী যুগে শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী হাদিসের পূর্ণাঙ্গ সুরম্য অট্টালিকা নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।


٥. اذكر أحوال علم الحديث فى عهد سلاطين بنغال مفصلا-

[৫. বাংলার সুলতানি আমলে হাদিস চর্চার অবস্থা বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের পর থেকে ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে মুঘলদের হাতে বাংলা পতনের পূর্ব পর্যন্ত সময়কাল ‘সুলতানি আমল’ নামে পরিচিত। বিশেষ করে ইলিয়াস শাহী এবং হোসেন শাহী বংশের স্বাধীন সুলতানদের আমলে বাংলায় জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইসলামি সংস্কৃতি এবং হাদিস চর্চার এক সোনালী অধ্যায় রচিত হয়েছিল।

১. সুলতানি আমলে বাংলায় হাদিস চর্চার সামগ্রিক চিত্র

সুলতানি আমলে বাংলার রাজধানী গৌড়, পাণ্ডুয়া, সোনারগাঁও এবং চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। আরব্য ও পারস্যের বহু খ্যাতনামা মুহাদ্দিস ও ফকীহ বাংলায় হিজরত করেন। সুলতানগণ ছিলেন অত্যন্ত দীনদার, আলেম-প্রেমী এবং হাদিসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাঁরা মাদরাসা ও খানকা প্রতিষ্ঠা করে বিপুল পরিমাণ ওয়াকফ সম্পত্তি বরাদ্দ করতেন।

২. প্রধান হাদিস শিক্ষাকেন্দ্র ও মাদরাসাসমূহ

  1. সোনারগাঁওয়ের ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয় (মাদরাসায়ে শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা):

    সপ্তম হিজরীর শেষভাগে বোখারার প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ হযরত মাওলানা শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা (রহ.) সোনারগাঁওয়ে আগমন করেন এবং একটি সুবিশাল মাদরাসা ও হাদিস শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল তৎকালীন সমগ্র পূর্ব ভারতের সর্ববৃহৎ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়। ভারতের বিহারের প্রখ্যাত সুফি সাধক ও আলেম হযরত মাখদুম শরফুদ্দীন ইয়াহইয়া মানেরী (রহ.) এই মাদরাসায় দীর্ঘ ২২ বছর অবস্থান করে হাদিস ও ফিকহে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

  2. দারাসবাড়ি মাদরাসা (গৌড়/চাঁপাইনবাবগঞ্জ):

    সুলতান শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহের আমলে (১৪৭৯ খ্রি.) গৌড়ে সুবিখ্যাত ‘দারাসবাড়ি মাদরাসা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল তৎকালীন বাংলার রয়্যাল একাডেমি। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রাপ্ত শিলালিপিতে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই বিশাল বিদ্যাপীঠে কুরআন ও হাদিসের উচ্চতর পাঠদান করা হতো।

  3. পাণ্ডুয়ার মাদরাসা ও আতাউল্লাহর শিক্ষাকেন্দ্র:

    সুলতান জালালুদ্দীন ফতেহ শাহ এবং হোসেন শাহের আমলে পাণ্ডুয়ায় হাদিসের বড় বড় হালক্বা পরিচালিত হতো। সেখানে হাদিসের মূল কিতাবসমূহের নকল ও অনুলিপি তৈরি করা হতো।

৩. সুলতানি আমলে রচিত হাদিস ও ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থাবলি

বাংলার মাটিতে বসে আলেমগণ যে সকল প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, তার ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়:

  • মাজমুআয়ে খানী ফি আইনিল মাআনী (مجموعة خاني في عين المعاني):

    সুলতানি আমলে কামাল করীম নামক এক মনীষী দ্বারা বাংলায় সংকলিত এটি একটি মৌলিক ফিকহ ও হাদিসগ্রন্থ। এতে হাদিসের দলীলসহ শরীয়তের আহকাম বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

  • নামায়ে হক (نامۂ حق):

    হযরত মাওলানা শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা (রহ.) কর্তৃক সোনারগাঁওয়ে রচিত একখানা বিখ্যাত ফারসি কাব্যগ্রন্থ, যার বিষয়বস্তু হাদিস ও সুন্নাহসম্মত দৈনন্দিন জীবনের মাসায়েল ও আধ্যাত্মিক নসিহত।

  • শিলালিপিসমূহে হাদিসের উদ্ধৃতি:

    সুলতানি আমলের মসজিদ ও মাদরাসার শিলালিপিসমূহে সহীহ বুখারী ও মুসলিমের অসংখ্য হাদিস খোদাই করা পাওয়া যায়। বিশেষ করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস: “من بنى لله مسجدا بنى الله له بيتا في الجنة” (যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন) প্রায় সকল সুলতানি শিলালিপিতে অঙ্কিত দেখা যায়, যা প্রমাণ করে তৎকালীন সমাজে হাদিসের ব্যাপক প্রভাব ছিল।

৪. সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা

সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ মক্কা ও মদিনার জন্য বিপুল অর্থ পাঠিয়েছিলেন এবং মক্কায় ‘মাদরাসায়ে সুলতানিয়া’ ও মদিনায় একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে হাদিসের পাঠদান হতো। সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ ছিলেন পরম হাদিস অনুরাগী শাসক। তিনি আলেম ও মুহাদ্দিসদের রাজকীয় সম্মান প্রদান করতেন।

উপসংহার

সুলতানি আমলে বাংলায় হাদিস চর্চার যে মজবুত ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে বাংলা জুড়ে অসংখ্য কওমি ও আলিয়া মাদরাসায় ইলমে হাদিসের নদী প্রবাহিত হতে শুরু করে।


٦. بين دور الجامعة الإسلامية ببهاتيا، هاتهزارى، شيتاغونغ فى نشر الحديث وعلومه-

[৬. হাদিস ও উলুমুল হাদিস প্রসারে দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার ভূমিকা বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে প্রতিষ্ঠিত ‘আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম’ (جامعة دار العلوم معين الإسلام هاتهزاري) বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়। দারুল উলুম দেওবন্দের চিন্তাধারা ও পাঠ্যক্রমের আলোকে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠ গত সোয়া এক শতাব্দী ধরে বাংলাদেশে বিশুদ্ধ হাদিস ও সুন্নাহর চর্চায় এক অবিসংবাদিত নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।

১. হাটহাজারী মাদরাসা প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় যখন শিরক, বিদআত এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার আগ্রাসন চলছিল, তখন দারুল উলুম দেওবন্দের প্রত্যক্ষ ছাত্র ও অনুসারী চারজন মহান মনীষী—হযরত মাওলানা আব্দুল ওয়াহেদ বাঙ্গালী, হযরত সুফি আজিজুর রহমান, হযরত মাওলানা হাবিবুল্লাহ কুরাইশী এবং শায়খুল ইসলাম আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর অন্যতম খলিফা হযরত মাওলানা জমিরুদ্দীন আহমদের যৌথ উদ্যোগে ১৮৯৬ সালে হাটহাজারী মাদরাসার শুভ সূচনা হয়।

২. হাদিস ও উলুমুল হাদিস প্রসারে হাটহাজারী মাদরাসার ভূমিকা

  1. বাংলাদেশে সর্বপ্রথম দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) চালু:

    হাটহাজারী মাদরাসাই এ ভূখণ্ডে সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গরূপে সিহাহ সিত্তার সকল কিতাবের আদ্যোপান্ত পাঠদানের মাধ্যমে ‘দাওরায়ে হাদিস’ স্তর প্রবর্তন করে। এর পূর্বে বাংলায় হাদিসের এতো বিশাল আয়োজন করে সকল কিতাব পড়ানোর কোনো স্থায়ী বিদ্যাপীঠ ছিল না। প্রতি বছর এ জামিয়া থেকে সহস্রাধিক মুহাদ্দিস ও ফাযিল সনদ লাভ করে দেশে-বিদেশে হাদিসের খেদমতে ছড়িয়ে পড়েন।

  2. শায়খুল হাদিসগণের অমর পাঠদান ও গবেষণা:

    এ জামিয়ার হাদিসের মসনদ অলঙ্কৃত করেছেন উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় ক্ষণজন্মা মুহাদ্দিসগণ। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

    • আল্লামা মুফতী ফয়জুল্লাহ (রহ.): মুহাদ্দিস ও মুফতীয়ে আযম, যিনি হাদিস ও ফিকহের ওপর বহু মূল্যবান আরবি কিতাব রচনা করেছেন।
    • আল্লামা আব্দুল কাইয়ূম (রহ.): যাঁর হাদিসের দরস ছিল ভারত ও পাকিস্তানের আলেমদের কাছেও অত্যন্ত সমাদৃত।
    • আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.): দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সহীহুল বুখারীর দরস প্রদান করেছেন। তাঁর বুখারীর দরসের সংকলন ‘ফয়যুল জারী’ হাদিস শিক্ষার্থীদের জন্য এক অমূল্য পাথেয়।
    • আল্লামা মুফতী আব্দুস সালাম চাটগামী (রহ.): পাকিস্তানের জামিয়া বিন্নোরী টাউন এবং পরবর্তীতে হাটহাজারী মাদরাসার শায়খুল হাদিস ও প্রধান মুফতী, যাঁর বহু আরবি হাদিস ও ফতোয়া বিষয়ক গবেষণা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
    • আল্লামা শায়খ আহমদ (দা. বা.): বর্তমান শায়খুল হাদিস ও বুখারীর সফল দরস প্রদানকারী।
  3. উলুমুল হাদিস ও উচ্চতর হাদিস গবেষণা বিভাগ (তাকাসসুস ফিল হাদিস):

    সাধারণ দাওরায়ে হাদিসের পর হাদিসের সনদ, আসমাউর রিজাল, তাখরীজ ও তাহকীক নিয়ে উচ্চতর গবেষণার জন্য জামিয়াতে স্বতন্ত্র উচ্চতর হাদিস গবেষণা বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে। এখান থেকে শিক্ষার্থীরা প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা ও আধুনিক প্রেক্ষাপটে হাদিসের প্রয়োগ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে গড়ে উঠছেন।

  4. বিদআত প্রতিরোধ ও সুন্নাহর সার্বিক পুনরুজ্জীবন:

    চট্টগ্রামসহ গোটা বাংলাদেশে প্রচলিত পীরপূজা, কবরপূজা, মীলাদ-কিয়ামের নামে অতি বাড়াবাড়ি এবং সুন্নাহবিরোধী অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে হাটহাজারী মাদরাসার আলেমগণ সহীহ হাদিসের আলোকে আপসহীন সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন। তাঁদের ওয়াজ, মাহফিল ও ফতোয়ার মাধ্যমে সহীহ সুন্নাহর এক বিশাল জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে।

  5. মাতৃপ্রতিষ্ঠান হিসেবে শাখা বিস্তার:

    হাটহাজারী মাদরাসার অনুকরণে আজ সমগ্র বাংলাদেশে পটিয়া, লালবাগ, বসুন্ধরাসহ হাজার হাজার কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন লাখ লাখ তালিবে ইলম রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসের সুধা পান করছে। এই সকল প্রতিষ্ঠানের মূল প্রেরণা ও প্রাণকেন্দ্র হলো হাটহাজারী জামিয়া।

উপসংহার

হাটহাজারী মাদরাসা কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি বাংলাদেশে হাদিস সংরক্ষণের একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ। সুন্নাহর প্রচার ও হাদিস বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।


খ বিভাগ (القسم الثاني) – পূর্ণাঙ্গ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন সমাধান

٧. اكتب نبذة عن حياة الشيخ قطب الدين أحمد بن عبد الرحيم المعروف بالشاه ولى الله الدهلوى رحمه الله-

[৭. শায়খ কুতুবুদ্দীন আহমাদ ইবনে আব্দুর রাহীম যিনি শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী রহ. নামে পরিচিত, তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ।]

উত্তর:

জন্ম ও পরিচয়: শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (রহ.) ১১১৪ হিজরীতে (১৭০৩ খ্রি.) দিল্লির নিকটবর্তী ফুলত পরগনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মূল নাম আহমদ, উপাধি কুতুবুদ্দীন এবং পরিচিত নাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ। তিনি ছিলেন হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর বংশধর।

শিক্ষা ও পাণ্ডিত্য: তিনি তাঁর পিতা শাহ আব্দুর রহীমের প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায়ে রহীমিয়ায় শিক্ষা সমাপ্ত করেন। মাত্র পনের বছর বয়সে তিনি কুরআন, হাদিস, ফিকহ ও দর্শন শাস্ত্রে পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করেন। পরবর্তীতে হেজাযে গমন করে শায়খ আবু তাহের মাদানী (রহ.)-এর নিকট হাদিসের সর্বোচ্চ সনদ লাভ করেন।

অবদান: তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ভারতীয় মুসলমানদের বুঝার সুবিধার জন্য পবিত্র কুরআন ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেন (ফাতহুর রাহমান)। তিনি হাদিসকে সকল ধর্মীয় জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ইযালাতুল খিফা এবং মুয়াত্তার ওপর আল-মুসাওয়া রচনা করেন। ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে (১১৭৬ হি.) তিনি দিল্লিতে ইন্তেকাল করেন।


٨. اكتب نبذة عن حياة الشيخ مولانا قاسم النانوتوى رحمه الله-

[৮. শায়খ মাওলানা কাসিম নানুতবী রহ.-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ।]

উত্তর:

জন্ম ও পরিচয়: ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের সাহারানপুরের নানুতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হুজ্জাতুল ইসলাম আল্লামা মুহাম্মদ কাসিম নানুতবী (রহ.)। তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর বংশধর ছিলেন।

দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা: ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের ব্যর্থতার পর ব্রিটিশরা যখন মুসলিম সংস্কৃতি ও আলেমদের ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, তখন তিনি ১৮৬৬ সালের ৩০ মে সাহারানপুরের দেওবন্দে ঐতিহাসিক ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জনগণের অর্থায়নে পরিচালিত এক নতুন ধারার স্বনির্ভর মাদরাসা ব্যবস্থার রূপরেখা (উসূলে হাশতেগানা) প্রণয়ন করেন।

অবদান ও ওফাত: তিনি একাধারে মুহাদ্দিস, দার্শনিক ও অসাধারণ বিতার্কিক ছিলেন। আর্য সমাজ ও খ্রিস্টান মিশনারীদের বিরুদ্ধে তিনি বহু মুনাযারা ও বিতর্কে বিজয়ী হয়ে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। তাঁর রচিত কিতাব ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ ও ‘আব-ই হায়াত’ চিরস্মরণীয়। ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে (১২৯৭ হি.) মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।


٩. اكتب نبذة عن حياة الشيخ السيد نذير حسين الدهلوى رحمه الله-

[৯. শায়খ সাইয়্যেদ নাযির হুসাইন দেহলভী রহ.-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ।]

উত্তর:

জন্ম ও পরিচয়: শায়খুল কুল ফিল কুল সাইয়্যেদ নাযির হুসাইন দেহলভী (রহ.) ১২২০ হিজরীতে (১৮০৫ খ্রি.) ভারতের বিহারের মুঙ্গের জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন উচ্চমানের সালাফী ও আহলে হাদিস ঘরানার মুহাদ্দিস।

হাদিস শিক্ষা ও দরস: তিনি দিল্লিতে আগমন করে শাহ আব্দুল আযীয দেহলভী (রহ.)-এর সুযোগ্য ছাত্র শাহ মুহাম্মদ ইসহাক দেহলভী (রহ.)-এর নিকট হাদিসের গভীর শিক্ষা ও সনদ লাভ করেন। শাহ ইসহাক মক্কায় হিজরত করার পর তিনিই দিল্লির হাদিসের মসনদের প্রধান দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

অবদান: তিনি সুদীর্ঘ ৬০ বছর একটানা দিল্লিতে সহীহ হাদিসের দরস প্রদান করেন। সমগ্র ভারত, আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়া থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাঁর নিকট হাদিসের ইজাযত গ্রহণ করেন। তাঁর শীর্ষ ছাত্রদের মধ্যে মাওলানা শামসুল হক আজীমাবাদী (যিনি আবু দাউদের বিখ্যাত শারহ ‘আওনুল মা’বুদ’ রচনা করেন) এবং আল্লামা আব্দুর রহমান মুবারকপুরী (যিনি তিরমিযীর বিখ্যাত শারহ ‘তুহফাতুল আহওয়াযী’ রচনা করেন) অন্যতম। ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দিল্লিতে ইন্তেকাল করেন।


١٠. اكتب نبذة عن حياة الشيخ شمس الحق الأفغانى رحمه الله-

[১০. শায়খ শামসুল হক আফগানী রহ.-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ।]

উত্তর:

জন্ম ও পরিচয়: বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত মুফাসসির ও মুহাদ্দিস আল্লামা শামসুল হক আফগানী (রহ.) ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার চারসাদ্দায় জন্মগ্রহণ করেন।

শিক্ষা ও শিক্ষকতা: তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে শায়খুল ইসলাম আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানী এবং আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.)-এর নিকট অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে হাদিস অধ্যয়ন সমাপ্ত করেন। পরবর্তীতে তিনি দেওবন্দসহ বিভিন্ন বড় জামিয়াতে শায়খুল হাদিস ও সদরুল মুদাররিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অবদান: তিনি হাদিস, তাফসীর ও ইসলামি দর্শনে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তাঁর রচিত ‘উলুমুল কুরআন’ এবং কমিউনিস্ট মতবাদের বিরুদ্ধে রচিত ‘মুইনুল কালাম’ অত্যন্ত সমাদৃত। তিনি বাহাওয়ালপুর ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিয়াত ফ্যাকাল্টির ডিন হিসেবে হাদিস গবেষণায় অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন।


١١. اكتب نبذة عن حياة الشيخ عبد الحي اللكنوى رحمه الله-

[১১. শায়খ আব্দুল হাই লাখনবী রহ.-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ।]

উত্তর:

জন্ম ও পরিচয়: হাদিস ও রিজাল শাস্ত্রের প্রবাদপুরুষ ইমাম আবুল হাসানাত মুহাম্মদ আব্দুল হাই লাখনবী (রহ.) ১২৬৪ হিজরীতে (১৮৪৮ খ্রি.) ভারতের উত্তর প্রদেশের বান্দায় এক বিদগ্ধ আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

মেধা ও পাণ্ডিত্য: মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি কুরআন হিফয করেন এবং সতের বছর বয়সে যুক্তিবিদ্যা, গণিত ও হাদিস শাস্ত্রের সমস্ত কিতাব সমাপ্ত করেন। তাঁর পিতা মাওলানা আব্দুল হালীম লাখনবীর মৃত্যুর পর তিনি মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে ভারতের অন্যতম প্রধান মুফতী হিসেবে স্বীকৃতি পান।

অমর গ্রন্থাবলি ও ওফাত: মাত্র ৩৯ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি হাদিস, উসূলে হাদিস, রিজাল ও ফিকহের ওপর ১১০টিরও বেশি প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করেন। বিশেষ করে জাল হাদিস ও যঈফ বর্ণনাকারীদের ওপর তাঁর রচিত ‘আল-আসারুল মারফুআ ফিল আখবারিল মাওজুআ’ (الآثار المرفوعة) এবং ‘আয-যফরুল মুবীন’ হাদিস জগতে মাইলফলক। ১৩০৪ হিজরীতে (১৮৮৬ খ্রি.) এই বিস্ময়কর প্রতিভাধর ইমাম ইন্তেকাল করেন।


١٢. اكتب نبذة عن حياة الشيخ فخر الدين الشاتجامى رحمه الله-

[১২. শায়খ ফখরুদ্দীন চাটগামী রহ.-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ।]

উত্তর:

জন্ম ও পরিচয়: বাংলাদেশের হাদিস অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র আল্লামা ফখরুদ্দীন চাটগামী (রহ.) চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার কলাউজান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

শিক্ষা ও দারুল উলুম দেওবন্দ: তিনি প্রাথমিক শিক্ষা দেশে সমাপ্ত করে ভারতের ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন। সেখানে তিনি শায়খুল ইসলাম আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর অত্যন্ত খাস শাগরেদ হিসেবে বুখারী শরীফের পাঠ গ্রহণ করে সর্বোচ্চ সম্মান লাভ করেন।

বাংলাদেশে হাদিসের খেদমত: দেশে ফিরে তিনি ঢাকা আলিয়া মাদরাসা এবং পরবর্তীতে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসায় দীর্ঘকাল হেড মাওলানা ও শায়খুল হাদিস হিসেবে সহীহ বুখারীর পাঠদান করেন। এছাড়া তিনি চট্টগ্রামের পটিয়া আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া এবং বিভিন্ন শীর্ষ মাদরাসায় হাদিস শিক্ষাদানে জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁর দরস ছিল অত্যন্ত তাহকীকী ও সারগর্ভ। বহু প্রখ্যাত আলেম তাঁর নিকট হাদিসের সনদ লাভ করেছেন। এই মহান খাদেমুল হাদিস চট্টগ্রামে ইন্তেকাল করেন।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম কে রাজনৈতিকভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন?

৭১২ খ্রিষ্টাব্দে (৯৩ হিজরী) উমাইয়া সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে উপমহাদেশে স্থায়ী মুসলিম শাসনের সূচনা করেন।

২. ভারতে হাদিস শাস্ত্রের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী কে?

শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) মক্কা থেকে ফিরে এসে দিল্লিতে সর্বপ্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হাদিসের পাঠদান ও কিতাব রচনা শুরু করেন।

৩. মুজাদ্দিদে আলফে সানী কোন সম্রাটের অনৈসলামিক নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন?

তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের তথাকথিত ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’ এবং অনৈসলামিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম পরিচালনা করেন।

৪. বাংলার সুলতানি আমলে সোনারগাঁওয়ের বিখ্যাত হাদিস কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা কে?

বোখারার প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা (রহ.) সপ্তম হিজরীতে সোনারগাঁওয়ে এক বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

৫. বাংলাদেশে প্রথম দাওরায়ে হাদিস প্রবর্তনকারী প্রতিষ্ঠান কোনটি?

১৮৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রামের হাটহাজারী দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদরাসা সর্বপ্রথম দাওরায়ে হাদিসের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি চালু করে।

৬. শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (রহ.)-এর অমর হাদিস-দর্শন বিষয়ক গ্রন্থের নাম কী?

‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ (حجة الله البالغة) হলো তাঁর অমর শাহকার গ্রন্থ, যেখানে তিনি হাদিস ও শরীয়তের হিকমত যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *