ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: উলুমুল কুরআন (Ulumul Quran)
বিষয় কোড: ২০২২০৫
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ক বিভাগ (القسم الأول) – পূর্ণাঙ্গ রচনামূলক প্রশ্ন সমাধান
١. عرف علوم القرآن- ثم اكتب تاريخ نشأتها وتطورها مفصلا-
[১. উলুমুল কুরআনের পরিচয় দাও। অতঃপর এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস বিস্তারিত লেখ।]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনুল কারীম মানবজাতির জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব। এই মহিমান্বিত কিতাবের বিশুদ্ধ পাঠ, অর্থ উপলব্ধি, বিধিবিধান আহরণ এবং সংরক্ষণ সংক্রান্ত সকল বৈজ্ঞানিক শাস্ত্রকে সম্মিলিতভাবে ‘উলুমুল কুরআন’ (علوم القرآن) বলা হয়। এটি ইসলামি জ্ঞানজগতের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি।
১. উলুমুল কুরআনের পরিচয়
- আভিধানিক বিশ্লেষণ: ‘উলূম’ (علوم) শব্দটি ‘ইলম’ (علم)-এর বহুবচন, যার অর্থ জ্ঞান, বিজ্ঞান বা বিদ্যা। আর ‘কুরআন’ (القرآن) হলো আল্লাহর কালাম। সুতরাং আভিধানিক অর্থে ‘উলুমুল কুরআন’ মানে কুরআন সম্পর্কিত বিভিন্ন বিজ্ঞান বা জ্ঞানসমূহ।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লামা মান্না’ আল-কাত্তান (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘মাবাহিস ফী উলুমিল কুরআন’ গ্রন্থে বলেন— “العلم الذي يتناول الأبحاث المتعلقة بالقرآن الكريم من حيث نزوله، وترتيبه، وجمعه، وكتابته، وقراءته، وتفسيره، وإعجازه، وناسخه ومنسوخه، ودفع الشبه عنه” অর্থাৎ, “পবিত্র কুরআনের নাযিল হওয়া, তার বিন্যাস, সংকলন, লিখনরীতি, কিরাত (পঠনপদ্ধতি), তাফসীর, অলৌকিকত্ব (ই’জায), নাসিখ-মানসূখ, মুহকাম-মুতাশাবিহ এবং কুরআন বিরোধী অপপ্রচারের খণ্ডন সংক্রান্ত সার্বিক গবেষণামূলক শাস্ত্রকে উলুমুল কুরআন বলা হয়।”
২. উলুমুল কুরআনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ঐতিহাসিক পর্যায়সমূহ
- প্রথম পর্যায়: রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কিরামের যুগ:
এ যুগে উলুমুল কুরআনের বিভিন্ন শাখা কিতাবাকারে লিখিত ছিল না; বরং তা সাহাবীগণের স্মৃতিতে সংরক্ষিত ছিল। সাহাবীগণ স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মুখ থেকে কুরআনের তিলাওয়াত, শানে নুযূল ও ব্যাখ্যা প্রত্যক্ষ করতেন। তাঁদের আরবি ভাষার সহজাত দক্ষতা (সালিক্বা) ছিল অসাধারণ। এই যুগের শীর্ষস্থানীয় গবেষক সাহাবী ছিলেন চার খলিফা, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (যাঁকে বলা হতো তর্জুমানুল কুরআন ও রইসুল মুফাসসিরীন), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, উবাই ইবনে কা’ব এবং যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)।
- দ্বিতীয় পর্যায়: তাবেঈনদের যুগ (হিজরী ১ম শতক):
ইসলামী খেলাফত যখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল, তখন অনারবদের মধ্যে কুরআন বুঝার জন্য ইলমের প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে উঠল। তাবেঈনদের যুগে কুরআনের বিভিন্ন শহরকেন্দ্রিক পাঠশালা প্রতিষ্ঠিত হয়:
- মক্কার তাফসীর পাঠশালা: ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ছাত্রগণ—মুজাহিদ ইবনে জাবর, আতা ইবনে আবী রাবাহ, সাঈদ ইবনে জুবায়ের ও ইকরিমা।
- মদিনার পাঠশালা: উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর ছাত্রগণ—যায়েদ ইবনে আসলাম, আবুল আলিয়া ও মুহাম্মদ ইবনে কা’ব আল-কুরাযী।
- ইরাকের পাঠশালা: ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ছাত্রগণ—আলকামা, আসওয়াদ ও হাসান বসরী।
- তৃতীয় পর্যায়: পৃথক পৃথক বিষয়ে গ্রন্থ রচনার যুগ (২য় ও ৩য় হিজরী শতক):
এ যুগে উলুমুল কুরআনের বিভিন্ন অঙ্গ নিয়ে আলেমগণ স্বতন্ত্র কিতাব রচনা শুরু করেন:
- শানে নুযূল নিয়ে সর্বপ্রথম কিতাব লেখেন আলী ইবনুল মাদীনী (রহ.)।
- নাসিখ-মানসূখ নিয়ে রচনা করেন আবু উবাইদ আল-কাসিম ইবনে সালাম (ওফাত: ২২৪ হি.)।
- কিরাত নিয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ লেখেন ইমাম আবু উবাইদ ও ইমাম ইবনে মুজাহিদ (রহ.)।
- মুফরাদাতে কুরআন (শব্দার্থ) নিয়ে লেখেন আবু উবাইদা মা’মার ইবনুল মুসান্না (মাজাযুল কুরআন)।
- ই’জাযুল কুরআন নিয়ে লেখেন ইমাম আল-খাত্তাবী ও আবু বকর আল-বাক্বিল্লানী।
- চতুর্থ পর্যায়: সমন্বিত বিশ্বকোষ রচনার স্বর্ণযুগ (সপ্তম হিজরী ও তৎপরবর্তী):
এ যুগে মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণ উলুমুল কুরআনের সকল শাখাকে একত্রিত করে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শাস্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করেন:
- ‘আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন’ (البرهان في علوم القرآن): ইমাম বদরুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ আয-যারকাশী (রহ.) (৭৪৫-৭৯৪ হি.) এটি সংকলন করে ৪৭টি স্বতন্ত্র অধ্যায়ে উলুমুল কুরআন বিন্যস্ত করেন।
- ‘আল-ইতকান ফী উলুমিল কুরআন’ (الإتقان في علوم القرآن): ইমাম জালালুদ্দীন আব্দুর রহমান আস-সুয়ূতী (রহ.) (৮৪৯-৯১১ হি.) ৮০টি মৌলিক অধ্যায়ে উলুমুল কুরআনের সুবিশাল এনসাইক্লোপিডিয়া রচনা করেন, যা এ শাস্ত্রের সর্বোচ্চ চূড়া।
- আধুনিক যুগ: শায়খ মুহাম্মদ আব্দুল আযীম আয-যারক্বানীর ‘মানাহিলুল ইরফান’ এবং আল্লামা মান্না’ আল-কাত্তানের ‘মাবাহিস ফী উলুমিল কুরআন’।
উপসংহার
উলুমুল কুরআনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, আল্লাহ তায়ালা যেভাবে পবিত্র কুরআনকে সংরক্ষিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন, ঠিক সেভাবেই কুরআনের মর্ম ও বিজ্ঞান সংরক্ষণের জন্য যুগ যুগ ধরে অনন্য মনীষীদের সৃষ্টি করেছেন।
٢. عرف الوحى- ثم بين أنواع الوحى وصور نزوله على رسول الله صلى الله عليه وسلم-
[২. ওহীর পরিচয় দাও। অতঃপর ওহীর প্রকারভেদ এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী নাযিলের বিভিন্ন পদ্ধতি বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
মহান আল্লাহ এবং তাঁর প্রেরিত নবী-রাসুলগণের মধ্যে যোগাযোগের একমাত্র ঐশী মাধ্যম হলো ‘ওহী’ (الوحي)। ওহীর মাধ্যমেই মানুষের হেদায়াতের জন্য আসমানী কিতাব ও শরীয়তের হুকুম-আহকাম অবতীর্ণ হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী নাযিলের প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত অলৌকিক, গৌরবোজ্জ্বল ও বিস্ময়কর।
১. ওহীর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
- আভিধানিক অর্থ: ‘ওহী’ (الوحي) শব্দের আভিধানিক অর্থ গোপনে বা দ্রুতগতিতে কোনো সংবাদ বা বার্তা পৌঁছানো (الإعلام السريع الخفي)। এছাড়া ইঙ্গিত করা, অন্তরে কোনো ভাব ঢেলে দেওয়া বা গোপনে কথা বলাকেও ওহী বলা হয়।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায়— “هو كلام الله تعالى المنزَّل على نبي من أنبيائه بواسطة أو بغير واسطة، لتبليغه إلى الناس هداية وإرشاداً” অর্থাৎ, “মহান আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক কোনো মাধ্যমের সাহায্যে (জিবরাঈল আ.) কিংবা কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি তাঁর কোনো নবীর ওপর মানবজাতির হেদায়াত ও জীবন পরিচালনার জন্য যে ঐশী বাণী অবতীর্ণ করেন, তাকে ওহী বলে।”
২. সাধারণ ওহীর তিনটি মৌলিক মাধ্যম (কুরআনের আলোকে)
পবিত্র কুরআনের সূরা আশ-শূরায় মহান আল্লাহ ওহীর তিনটি সাধারণ মাধ্যমের কথা ইরশাদ করেছেন:
“وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَن يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ” [الشورى: ٥١]
- ইলকা ফিল কালব বা অন্তরে সরাসরি ভাব সঞ্চার (وحياً): আল্লাহ তায়ালা কোনো মাধ্যম ব্যতীত নবীর অন্তরে সরাসরি কোনো কথা বা হুকুম জাগ্রত করে দেন।
- পর্দার অন্তরাল থেকে বাক্যালাপ (من وراء حجاب): আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং কথা বলেন কিন্তু মানুষ তাঁকে চর্মচক্ষে দেখতে পায় না। যেমন তূর পাহাড়ে হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে আল্লাহর সরাসরি কথোপকথন হয়েছিল।
- ফেরেশতা মারফত ওহী প্রেরণ (يرسل رسولا): ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.)-কে বাণী দিয়ে নবীদের নিকট প্রেরণ করা, যা ওহীর সর্বাধিক প্রচলিত রূপ।
৩. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর ওহী নাযিলের বিভিন্ন পদ্ধতি ও অবস্থা (صور نزول الوحي)
সহীহুল বুখারীর ‘বাদউল ওহী’ অধ্যায়ে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত বিখ্যাত হাদিসের আলোকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে ওহী অবতীর্ণ হতো:
- ১. সত্য ও সুস্পষ্ট স্বপ্ন (الرؤيا الصالحة / الصادقة): নবুওয়াতের সূচনাপর্বে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুমে যা দেখতেন তা ভোরের আলোর মতো হুবহু সত্যে পরিণত হতো। টানা ছয় মাস তিনি এই সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে ওহী প্রাপ্ত হন। নবীদের স্বপ্ন অহীরই অংশ।
- ২. ঘণ্টার আওয়াজের ন্যায় ওহী নাযিল (مثل صلصلة الجرس): রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ওহীর পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: “أحيانا يأتيني مثل صلصلة الجرس وهو أشده علي” অর্থাৎ, “কখনো কখনো ওহী আমার নিকট ঘণ্টার টুংটাং শব্দের মতো তীব্র আওয়াজসহ আগমন করে, আর এটি আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টদায়ক রূপ।” এ সময় ওহীর অসীম ভারে নবীজীর শরীর দিয়ে তীব্র শীতেও ঘাম ঝরতে থাকত। উটের পিঠে থাকা অবস্থায় এভাবে ওহী নাযিল হলে উটটি ভার সইতে না পেরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ত।
- ৩. মানুষের সুরতে ফেরেশতার আগমন (تمثل الملك رجلاً): জিবরাঈল (আ.) অত্যন্ত রূপবান সাহাবী হযরত দাহিয়াতুল কালবী (রা.) অথবা কোনো অপরিচিত শুভ্রবসন পথিকের বেশে মানুষের সুরত ধারণ করে আসতেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে কথা বলতেন। সাহাবীগণও এ দৃশ্য দেখতেন, যার উৎকৃষ্ট প্রমাণ ‘হাদিসে জিবরাঈল’।
- ৪. ফেরেশতার স্বরূপে দর্শন (رؤية الملك في صورته الحقيقية): জিবরাঈল (আ.) তাঁর নিজস্ব আসল নূরের সুরতে ছয়শত ডানাবিশিষ্ট অবস্থায় আসমান ও জমিনের দিগন্ত ঢেকে আবির্ভূত হতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনে দুবার জিবরাঈল (আ.)-কে তাঁর স্বরূপে দেখেছিলেন—একবার হেরা গুহা থেকে ফেরার পথে দিগন্তে, এবং আরেকবার মেরাজের রাতে সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে।
- ৫. জাগ্রত অবস্থায় অন্তরে ফুঁকে দেওয়া (النفث في الروع): জিবরাঈল (আ.) অদৃশ্য থেকেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র কলবে ওহীর বাণী ঢেলে দিতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “إن روح القدس نفث في روعي أنه لن تموت نفس حتى تستكمل رزقها” (রুহুল কুদুস আমার অন্তরে ফুঁকে দিয়েছেন যে, কোনো প্রাণীই তার নির্ধারিত রিযিক পূর্ণ না করে মৃত্যুবরণ করবে না)।
- ৬. মেরাজের রাতে সরাসরি কথোপকথন (التكليم المباشر ليلة المعراج): মেরাজের রজনীতে সপ্তাকাশ ও সিদরাতুল মুনতাহা অতিক্রম করে রাসুলুল্লাহ (সা.) সরাসরি কোনো মাধ্যম ছাড়া মহান আল্লাহর সাথে বাক্যালাপ করেন এবং দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বিধান লাভ করেন।
উপসংহার
ওহী কোনো কল্পনা বা মানসিক ভাবাবেগ নয়; এটি পরম সত্য ও অকাট্য বাস্তবতা। এই ওহীর আলোকেই অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবী চিরন্তন হেদায়াতের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল।
٣. زعموا “أن محمدا صلى الله عليه وسلم ابتكر معانى القرآن الكريم وصاغ أسلوبه وليس وحيا يوحى” فند شبهتهم هذه بالحجج الدافعة-
[৩. প্রাচ্যবিদ ও বিরোধীদের ভ্রান্ত অপপ্রচার: ‘মুহাম্মদ (সা.) নিজেই কুরআনের ভাব ও ভাষা রচনা করেছেন, এটি কোনো ওহী নয়’—এই সংশয়ের দাঁতভাঙা জবাব অকাট্য যুক্তিসহ খণ্ডন কর।]
ভূমিকা
ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই মক্কার মুশরিকরা এবং পরবর্তীকালে ক্রুসেডার ও আধুনিক প্রাচ্যবিদরা (Orientalists) পবিত্র কুরআনকে মানব রচিত প্রমাণ করার জন্য অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। তাদের একটি প্রধান দাবি হলো: মুহাম্মদ (সা.) নিজের মেধা ও প্রতিভা দিয়ে কুরআনের ভাব উদ্ভাবন করেছেন এবং আরবি সাহিত্যে তা রূপ দিয়েছেন। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য, সাহিত্যিক অলৌকিকত্ব ও আধুনিক বিজ্ঞানের মানদণ্ডে এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসাড়।
১. অপপ্রচারের স্বরূপ
প্রাচ্যবিদদের দাবি, মুহাম্মদ (সা.) একজন অসাধারণ প্রজ্ঞাবান সাহিত্যিক ও সংস্কারক ছিলেন। তিনি তাওরাত ও ইঞ্জিলের পূর্ববর্তী জ্ঞান আহরণ করে আরবের জাহেলী সমাজের উপযোগী করে এই কুরআন রচনা করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ)। মক্কার কাফেররাও কুরআনের বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়ে বলেছিল: “إِنْ هَذَا إِلَّا إِفْكٌ افْتَرَاهُ وَأَعَانَهُ عَلَيْهِ قَوْمٌ آخَرُونَ” (এটি তো এক মনগড়া মিথ্যা যা সে বানিয়েছে এবং অন্য একদল লোক তাকে এ বিষয়ে সাহায্য করেছে – সূরা আল-ফুরকান: ৪)।
২. এই সংশয়ের অকাট্য জবাব ও খণ্ডন (الحجج الدافعة)
- রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মী হওয়া (أمية الرسول صلى الله عليه وسلم):
রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো বিদ্যালয়ে যাননি, কোনো শিক্ষকের কাছে পাঠ গ্রহণ করেননি এবং পড়তে বা লিখতে জানতেন না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং এই অকাট্য যুক্তি তুলে ধরেছেন:
“وَمَا كُنتَ تَتْلُو مِن قَبْلِهِ مِن كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ ۖ إِذًا لَّارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ” [العنكبوت: ٤٨]
(আপনি তো এর পূর্বে কোনো কিতাব তিলাওয়াত করেননি এবং নিজ হাতে কোনো কিছু লেখেননি; যদি তা করতেন তবে বাতিলপন্থীরা সন্দেহে পতিত হতে পারত)। চল্লিশ বছর ধরে মক্কার মানুষের মাঝে যিনি বাস করলেন অথচ কোনো সাহিত্যের আসরে কোনোদিন একটি কবিতাও বললেন না, হঠাৎ করে চল্লিশ বছর বয়সে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অলংকারসমৃদ্ধ গ্রন্থ নিজ থেকে রচনা করা এক অসম্ভব ব্যাপার।
- কুরআনের প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ও আরবের শ্রেষ্ঠ কবিদের অসহায়ত্ব (التحدي الصريح للإنس والجن):
তৎকালীন আরবরা ছিল ভাষার জাদুকর। ইমরুল কায়েস, জুহাইর ও লাবীদের মতো কবিদের সামনে কুরআন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল: যদি মনে কর এটি মুহাম্মদের বানানো কথা, তবে তোমরা সকলে মিলে এর সমকক্ষ একটি বই নিয়ে আস। তারা পারল না। অতঃপর কুরআন বলল: তবে দশটি সূরা বানিয়ে দেখাও (সূরা হূদ: ১৩)। তারা ব্যর্থ হলো। শেষ পর্যন্ত কুরআন বলল: একটি মাত্র ছোট্ট সূরার মতো সূরা বানিয়ে দেখাও (সূরা বাক্বারা: ২৩)। সমগ্র আরবের সাহিত্যের অহংকার ধূলিসাৎ হয়ে গেল; তারা বাক্য দিয়ে মোকাবিলা করতে না পেরে তরবারি নিয়ে যুদ্ধে নামতে বাধ্য হয়েছিল। যদি এটি মানুষের তৈরি হতো, তবে আরবের কবিরা এর জবাব দিতে পারত।
- কুরআনের ভাব ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসের ভাষার মৌলিক পার্থক্য:
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যক্তিগত মুখনিঃসৃত বাণী হলো ‘হাদিস’। হাদিসের ভাষা অত্যন্ত অলংকারপূর্ণ, কিন্তু তা কুরআনের অলৌকিক ছন্দ ও শৈলী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। হাজার হাজার সহীহ হাদিস ও কুরআনের আয়াত পাশাপাশি রাখলে যে কোনো আরবি ভাষাবিদ এক সেকেন্ডে বলে দিতে পারবেন কোনটি কুরআন আর কোনটি হাদিস। যদি মুহাম্মদ (সা.) নিজেই কুরআনের রচয়িতা হতেন, তবে তাঁর হাদিস ও কুরআনের ভাষা এক ধাঁচের হতো।
- অতীত জাতিসমূহের নির্ভুল ইতিহাস বর্ণনা:
কুরআনে হযরত নূহ, হূদ, সালেহ, ইউসুফ, মুসা ও ঈসা (আ.) এবং আদ ও সামূদ জাতির এমন বিশদ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেওয়া হয়েছে যা আরবে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “تِلْكَ مِنْ أَنبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ ۖ مَا كُنتَ تَعْلَمُهَا أَنتَ وَلَا قَوْمُكَ مِن قَبْلِ هَٰذَا” (এগুলো গায়েবের সংবাদ যা আমি আপনার নিকট ওহীর মাধ্যমে জানাচ্ছি; ইতিপূর্বে আপনি এবং আপনার সম্প্রদায় এর কিছুই জানতেন না – সূরা হূদ: ৪৯)।
- কুরআনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কঠোর সতর্কবার্তা ও ভর্ৎসনা:
কোনো মানুষ নিজের রচিত বইয়ে নিজেকে তিরস্কার বা ভর্ৎসনা করে না। অথচ কুরআনে অন্ধ সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমের ঘটনায় আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সংশোধন করে সূরা আবাসা নাযিল করলেন: “عَبَسَ وَتَوَلَّىٰ * أَن جَاءَهُ الْأَعْمَىٰ”। যায়েদ ও যয়নাব (রা.)-এর বিবাহের ক্ষেত্রে কিংবা তাহরীমের ঘটনায় আল্লাহ রাসুলকে মৃদু ভর্ৎসনা করেছেন। এটি অকাট্য প্রমাণ করে যে, কুরআন আল্লাহর বাণী, মুহাম্মদের স্বরচিত নয়।
- আধুনিক বিজ্ঞান ও মহাবিশ্বের চিরন্তন সত্যের সাথে পূর্ণ মিল:
ভ্রূণতত্ত্বের পর্যায়ক্রম (সূরা মুমিনূন), পর্বতমালার ভূমিকা, বিগ ব্যাং ও মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ (সূরা যারিয়াত), সাগরের দুই পানির মিলনস্থল (সূরা আর-রহমান)—এ সকল আধুনিক বিজ্ঞানের সত্য ১৪০০ বছর পূর্বে মরুভূমির কোনো মানুষের পক্ষে উদ্ভাবন করা কস্মিনকালেও সম্ভব ছিল না।
উপসংহার
অতএব অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, কুরআন কোনো মানুষের বুদ্ধির ফসল নয়; বরং এটি নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ অবিকৃত ওহী (تَنْزِيلٌ مِّن رَّبِّ الْعَالَمِينَ)।
٤. اكتب دوافع وخصائص جمع القرآن الكريم فى عهد أبى بكر رضى الله عنه مفصلا-
[৪. হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর যুগে কুরআন সংকলনের কারণ ও অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর আমলে পবিত্র কুরআনকে একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ কিতাবের রূপ দেওয়া হয়। এটি ছিল ইসলাম ও কুরআনের সংরক্ষণে উম্মতের ইতিহাসের সবচেয়ে দূরদর্শী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
১. আবু বকর (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলনের কারণ ও প্রেক্ষাপট (الدوافع)
- ভণ্ড নবীদের আবির্ভাব ও ধর্মত্যাগী আন্দোলন (حروب الردة): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পরপরই আরবে মুসাইলামাতুল কাযযাব, তুলাইহা ও সাজাহর মতো ভণ্ড নবীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং বহু গোত্র যাকাত দিতে অস্বীকার করে মুরতাদ হয়ে যায়। আবু বকর (রা.) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন।
- ইয়ামামার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ (معركة اليمامة): ১২ হিজরীতে মুসাইলামা কাযযাবের বিরুদ্ধে ইয়ামামার ময়দানে এক ভয়ংকর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে প্রায় বারোশত মুসলিম শহীদ হন, যার মধ্যে কুরআনের প্রখ্যাত কারী ও হাফিজ সাহাবীর সংখ্যাই ছিল প্রায় সত্তর (৭০) জন।
- হযরত উমর (রা.)-এর গভীর দূরদর্শিতা ও উদ্বেগ: এত বিপুল সংখ্যক শীর্ষ হাফিজ সাহাবীর শাহাদাতে দূরদর্শী সাহাবী হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর নিকট ছুটে গিয়ে বললেন: “হে খলিফাতুর রাসুল! ইয়ামামার যুদ্ধে বহু কুরআনের হাফিজ শহীদ হয়েছেন। বিভিন্ন যুদ্ধে এভাবে হাফিজগণ শহীদ হতে থাকলে কুরআনের অনেক অংশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতএব আমার প্রস্তাব হলো আপনি অবিলম্বে কুরআন একত্রিত ও সংকলন করার নির্দেশ দিন।”
- আবু বকর (রা.)-এর প্রাথমিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: আবু বকর (রা.) প্রথমে বললেন: “كَيْفَ تَفْعَلُ شَيْئًا لَمْ يَفْعَلْهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟” (যে কাজ আল্লাহর রাসুল করেননি, আমি আবু বকর তা কীভাবে করব?)। কিন্তু উমর (রা.) বারবার বোঝাতে লাগলেন: “هُوَ وَاللَّهِ خَيْرٌ” (আল্লাহর কসম! এতেই ইসলামের কল্যাণ রয়েছে)। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা আবু বকর (রা.)-এর অন্তরকে এই ঐতিহাসিক কাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।
২. যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নির্বাচন ও সংকলন বোর্ড গঠন
আবু বকর (রা.) এই মহান দায়িত্বের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রধান ওহী লেখক তরুণ ও প্রখর মেধার অধিকারী সাহাবী হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে মনোনীত করেন। আবু বকর (রা.) যায়েদকে বললেন: “তুমি একজন তরুণ, বুদ্ধিমান ব্যক্তি; তোমার বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই এবং তুমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওহী লিখতে। অতএব তুমি কুরআন অনুসন্ধান করে তা একত্রিত কর।” যায়েদ (রা.) অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেছিলেন: “আল্লাহর কসম! তাঁরা যদি আমাকে একটি পাহাড় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করার নির্দেশ দিতেন, তবে তা কুরআনের এই সংকলনের তুলনায় সহজ হতো।”
৩. হযরত আবু বকর (রা.)-এর সংকলনের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص جمع أبي بكر)
- ১. চরম সতর্কতা ও দ্বিমুখী সাক্ষ্য নীতি (التثبت والشهادة المزدوجة): যায়েদ (রা.) নিজে কুরআনের পূর্ণ হাফিজ হওয়া সত্ত্বেও এবং শত শত সাহাবী হাফিজ থাকা সত্ত্বেও তিনি কেবল স্মৃতির ওপর নির্ভর করেননি। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, কারও কাছে কোনো লিখিত আয়াত থাকলে তা আনতে হবে এবং একই সাথে দুজন বিশ্বস্ত সাক্ষী দিতে হবে যে এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে সরাসরি লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। যেমন সূরা তাওবার শেষ দুটি আয়াত কেবল হযরত খুযাইমা ইবনে সাবিত (রা.)-এর নিকট লিখিত পাওয়া গিয়েছিল, আর রাসুলুল্লাহ (সা.) ইতিপূর্বেই খুযাইমার একার সাক্ষ্যকে দুই সাক্ষীর সমান ঘোষণা করেছিলেন।
- ২. সর্বশেষ পেশকৃত পাঠের (العرضة الأخيرة) পূর্ণ আনুগত্য: রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনের শেষ রমজানে জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে দুবার সম্পূর্ণ কুরআন পাঠ (দাওর) করেছিলেন। যায়েদ (রা.) কেবল সেই সর্বশেষ নিরীক্ষিত পাঠের আয়াতগুলোই অন্তর্ভুক্ত করেন এবং যেগুলোর হুকুম ও তিলাওয়াত রহিত হয়েছিল তা বাদ দেন।
- ৩. সপ্ত ক্বিরাতের অন্তর্ভুক্তি (الأحرف السبعة): আবু বকর (রা.)-এর এই সংকলনে আরবের সাতটি উপভাষার (আহরুফে সাবআ) কিরাত অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছিল।
- ৪. সুবিন্যস্ত একক খণ্ড বা ‘মুসহাফ’ (المصحف): ইতিপূর্বে খেজুরের ডাল, পাথরের ফলক, চামড়া ও উটের হাড়ে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকা আয়াতগুলোকে একটি একক অভিন্ন মলাটবদ্ধ সংকলনে রূপ দেওয়া হয়। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর পরামর্শে এই বাঁধাইকৃত গ্রন্থের নাম রাখা হয় ‘আল-মুসহাফ’ (المصحف)।
- ৫. ঐতিহাসিক সংরক্ষণ: সংকলিত এই মূল কপিটি খলিফা আবু বকর (রা.)-এর নিকট সংরক্ষিত থাকে। তাঁর ওফাতের পর তা দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর নিকট এবং উমর (রা.)-এর শাহাদাতের পর তাঁর কন্যা উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা.)-এর তত্ত্বাবধানে সুরক্ষিত রাখা হয়।
উপসংহার
হযরত আলী (রা.) যথার্থই ইরশাদ করেছিলেন: “أعظم الناس في المصاحف أجرا أبو بكر، رحمة الله على أبي بكر، هو أول من جمع كتاب الله” (মুসহাফ সংকলনের ক্ষেত্রে মানুষের মাঝে সবচেয়ে বড় সওয়াবের অধিকারী হলেন আবু বকর; আবু বকরের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক, তিনিই সর্বপ্রথম আল্লাহর কিতাবকে সংকলন করেছেন)।
٥. عرف النسخ ثم اكتب أهميته وأنواعه وأدلة جوازه مفصلا-
[৫. নাসখ-এর পরিচয় দাও। অতঃপর এর গুরুত্ব, প্রকারভেদ এবং শরীয়তে এর বৈধতার দলীলসমূহ বিস্তারিত লেখ।]
ভূমিকা
ইসলামী শরীয়তের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ও সূক্ষ্ম বিজ্ঞান হলো ‘নাসিখ ও মানসূখ’ (الناسخ والمنسوخ)। মানবজাতির পর্যায়ক্রমিক মানসিক প্রস্তুতি, সামাজিক সংস্কার এবং শরীয়তের বিধানাবলিতে সহজতা আনয়নের জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা কোনো পূর্ববর্তী হুকুম স্থগিত করে তার স্থলে নতুন হুকুম প্রতিস্থাপন করেছেন, যাকে উসূলে ফিকহের পরিভাষায় ‘নাসখ’ বলা হয়।
১. নাসখ-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা
- আভিধানিক অর্থ: ‘নাসখ’ (النسخ) শব্দের দুটি মূল অর্থ রয়েছে:
- বিলোপ করা বা অপসারিত করা (الإزالة والإبطাল); যেমন বলা হয়: “نسخت الشمس الظل” (সূর্য ছায়াকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে)।
- অনুলিপি বা নকল করা (النقل والتحويل); যেমন: “نسخت الكتاب” (আমি কিতাবটি নকল করেছি)।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: উলুমুল কুরআন ও উসূলে ফিকহের পরিভাষায়— “هو رفع الحكم الشرعي بدليل شرعي متراخٍ عنه” অর্থাৎ, “একটি পরবর্তী শরয়ী দলীল দ্বারা কোনো পূর্ববর্তী শরয়ী হুকুমকে প্রত্যাহার বা পরিবর্তন করাকে নাসখ বলে।” যে আয়াত হুকুম রহিত করে তাকে ‘নাসিখ’ (ناسخ) এবং যার হুকুম রহিত হয় তাকে ‘মানসূখ’ (منسوخ) বলা হয়।
২. নাসখ জ্ঞানের গুরুত্ব (أهمية علم النسخ)
নাসখ জানা মুফাসসির ও ফকীহের জন্য অপরিহার্য। নাসিখ ও মানসূখের জ্ঞান ব্যতীত কেউ ফতোয়া দিলে সে হালালকে হারাম কিংবা হারামকে হালাল বানিয়ে ফেলার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। হযরত আলী (রা.) একদা এক ব্যক্তিকে মসজিদে নসিহত করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন: “তুমি কি নাসিখ ও মানসূখ সম্পর্কে জান?” সে বলল: “না।” তখন আলী (রা.) বললেন: “هلكتَ وأهلكتَ” (তুমি নিজে ধ্বংস হয়েছ এবং অন্যদেরও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছ!)।
৩. কুরআনে নাসখের প্রকারভেদ (أنواع النسخ في القرآن)
পবিত্র কুরআনের নাসখ প্রধানত তিন প্রকারে বিভক্ত:
- হুকুম বহাল থেকে তিলাওয়াত রহিত হওয়া (نسخ التلاوة وبقاء الحكم):
যে আয়াতের তিলাওয়াত মুসহাফে নেই কিন্তু তার বিধান শরীয়তে এখনো কার্যকর। যেমন—বিবাহিত ব্যক্তির ব্যভিচারের শাস্তি রজম সংক্রান্ত আয়াত। হযরত উমর (রা.) বলেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) রজম করেছেন এবং তাঁর পরে আমরাও রজম করেছি। কুরআনে অবতীর্ণ হয়েছিল: “الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البتة”, পরবর্তীতে এর তিলাওয়াত রহিত হলেও রজম কার্যকর রাখা হয়েছে।
- তিলাওয়াত বহাল থেকে হুকুম রহিত হওয়া (نسخ الحكم وبقاء التلاوة):
যে আয়াতের শব্দাবলি কুরআনে তিলাওয়াত করা হয় এবং তার বিনিময়ে সওয়াব পাওয়া যায়, কিন্তু তার বিধান রহিত হয়ে পরবর্তী আয়াতের হুকুম কার্যকর হয়েছে। উলুমুল কুরআনে এই প্রকারেরই নিদর্শন সর্বাধিক। যেমন—স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর জন্য এক বছর পর্যন্ত ভরণপোষণ ও অবস্থানের নির্দেশ (সূরা বাক্বারা: ২৪০), যা পরবর্তীতে চার মাস দশ দিনের ইদ্দতের আয়াত (সূরা বাক্বারা: ২৩৪) দ্বারা রহিত হয়েছে। অনুরূপভাবে প্রাথমিক যুগে জিহাদের ক্ষেত্রে ১ জন মুসলিমের জন্য ১০ জন কাফেরের সামনে অবিচল থাকার বিধান (সূরা আনফাল: ৬৫) পরবর্তী আয়াত (সূরা আনফাল: ৬৬) দ্বারা রহিত হয়ে ১ জনের বিপরীতে ২ জন করা হয়েছে।
- তিলাওয়াত ও হুকুম উভয়ই রহিত হওয়া (نسخ التلاوة والحكم معاً):
যে আয়াতের শব্দাবলি এবং বিধান উভয়টিই সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা হয়েছে। হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন: কুরআনে অবতীর্ণ হয়েছিল যে দশবার দুধ পানে বিবাহ হারাম হয়, পরবর্তীতে তা রহিত হয়ে পাঁচবার দুধ পানের বিধান কার্যকর হয় (সহীহ মুসলিম)।
৪. নাসখ বৈধ ও বাস্তব হওয়ার দলীলসমূহ (أدلة جواز النسخ ووقوعه)
ইহুদিরা এবং কিছু বিভ্রান্ত যুক্তিবাদী নাসখকে অস্বীকার করে দাবি করত যে এতে আল্লাহর জ্ঞানের অপরিপূর্ণতা প্রকাশ পায়। কিন্তু এটি চরম মূর্খতা। একজন দক্ষ চিকিৎসক যেমন রোগীর স্বাস্থ্যের উন্নতির সাথে সাথে ওষুধ পরিবর্তন করেন, তেমনি হাকিমুল হাক্কাম আল্লাহ মানবজাতির প্রয়োজনেই বিধানের পরিবর্তন আনেন। নাসখের পক্ষে কুরআনের সুস্পষ্ট দলীলসমূহ:
- কুরআনের অকাট্য আয়াত:
“مَا نَنسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِّنْهَا أَوْ مِثْلِهَا ۗ أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ” [البقرة: ١٠٦]
(আমি যখন কোনো আয়াত রহিত করি কিংবা ভুলিয়ে দিই, তখন তার চেয়ে উত্তম অথবা তার সমকক্ষ কোনো আয়াত নিয়ে আসি; তুমি কি জান না যে আল্লাহ সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান?)।
- অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: “وَإِذَا بَدَّلْنَا آيَةً مَّكَانَ آيَةٍ ۙ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يُنَزِّلُ” (আর যখন আমি এক আয়াতের স্থানে অন্য আয়াত প্রতিস্থাপন করি, আর আল্লাহ যা নাযিল করেন সে সম্পর্কে তিনিই সর্বাধিক অবগত – সূরা আন-নাহল: ১০১)।
- বাস্তব দৃষ্টান্ত (কেবলা পরিবর্তন): হিজরতের পর মুসলমানগণ দীর্ঘ ১৬-১৭ মাস বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে সালাত আদায় করতেন। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা সূরা বাক্বারার ১৪৪ নম্বর আয়াত নাযিল করে পূর্বের কেবলা রহিত করে কাবার দিকে ফিরে সালাত আদায়ের নির্দেশ দেন।
উপসংহার
নাসখ কোনো ত্রুটি নয়; বরং এটি দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা, আল্লাহর অনন্ত প্রজ্ঞা এবং বান্দার ওপর তাঁর অসীম করুণা ও সহজীকরণের উজ্জ্বল নিদর্শন।
٦. عرف إعجاز القرآن ثم اكتب أنواع إعجاز القرآن بالأمثلة-
[৬. ই’জাযুল কুরআনের পরিচয় দাও এবং কুরআন মু’জিযা হওয়ার বিভিন্ন দিক উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যুগে যুগে প্রেরিত নবী-রাসুলগণকে তাঁদের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে মু’জিযা প্রদান করেছেন। মুসা (আ.)-কে লাঠির অলৌকিকতা, ঈসা (আ.)-কে মৃতকে জীবিত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল যা তাঁদের যুগের সাথেই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেওয়া হয়েছে এক চিরন্তন, বুদ্ধিভিত্তিক ও অবিনশ্বর মু’জিযা—আর তা হলো পবিত্র আল-কুরআনুল কারীম।
১. ই’জাযুল কুরআনের পরিচয়
- আভিধানিক অর্থ: ‘ই’জায’ (الإعجاز) শব্দটি عجز (আজযুন) মূলধাতু থেকে নির্গত باب إفعال-এর মাছদার। এর আভিধানিক অর্থ অন্যকে অক্ষম, পরাভূত বা হতভম্ব করে দেওয়া (إثبات العجز والضعف في الآخرين)।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: উলুমুল কুরআনের পরিভাষায়— “هو إثبات عجز الإنس والجن عن معارضة القرآن الكريم والإتيان بمثله أو بمثل سورة منه” অর্থাৎ, “সমগ্র মানবজাতি ও জিন জাতিকে কুরআনের সমকক্ষ কোনো গ্রন্থ অথবা এর একটি সূরার সমকক্ষ কোনো বাক্য রচনা করার ক্ষেত্রে অক্ষম ও অপরাগ সাব্যস্ত করে কুরআনের সত্যতা অকাট্যভাবে প্রমাণ করাকে ই’জাযুল কুরআন বলে।”
২. ই’জাযুল কুরআনের প্রধান প্রধান দিকসমূহ (أنواع إعجاز القرآن)
- ১. ভাষাগত ও সাহিত্যিক অলৌকিকত্ব (الإعجاز البياني واللغوي):
কুরআনের ভাষা এমন এক অনন্য স্তরে উন্নীত যা কবিতা নয়, গদ্য নয়; অথচ এর অন্তর্নিহিত ছন্দ, সুরঝঙ্কার, শব্দচয়ন ও অলংকার মানব মস্তিষ্ককে সম্মোহিত করে দেয়। যে কোনো শব্দের বদলে বিকল্প কোনো সমার্থক শব্দ বসালে সেই সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। যেমন সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে শব্দচয়ন: কোথাও ‘মাত্বার’ (বৃষ্টি) ব্যবহার হয়েছে শাস্তির ক্ষেত্রে এবং কোথাও ‘গায়স’ ব্যবহার হয়েছে রহমতের ক্ষেত্রে। আরবের শত শত কবি-সাহিত্যিক কুরআনের মাত্র তিন আয়াতের সূরা আল-কাউসারের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছিল।
- ২. ভবিষ্যৎ ও অদৃশ্য বিষয়ের পূর্বাভাস সংক্রান্ত অলৌকিকত্ব (الإعجاز الغيبي):
কুরআন বহু ভবিষ্যতের এমন নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যা পরবর্তীকালে হুবহু সত্যে পরিণত হয়েছে:
- রোমানদের বিজয়: পারস্যের কাছে রোমানদের পরাজয়ের পর সূরা আর-রূমে ঘোষণা করা হলো: “غُلِبَتِ الرُّومُ * فِي أَدْنَى الْأَرْضِ وَهُم مِّن بَعْدِ غَلَبِهِمْ سَيَغْلِبُونَ * فِي بِضْعِ سِنِينَ” (রোমানরা পরাজিত হয়েছে পৃথিবীর নিম্নভূমিতে, কিন্তু তারা কয়েক বছরের মধ্যেই পুনরায় বিজয়ী হবে)। ঐতিহাসিক সত্য এই যে, ঠিক নয় বছরের মাথায় রোমানরা পারস্যকে বিধ্বস্ত করে বিজয় ছিনিয়ে আনে।
- মক্কা বিজয়ের ঘোষণা: মক্কা বিজয়ের পূর্বে হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় কুরআন ঘোষণা করেছিল: “لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ إِن شَاءَ اللَّهُ آمِنِينَ” (সূরা ফাতহ: ২৭), যা পরবর্তীতে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
- ফেরাউনের লাশ সংরক্ষণ: সাগরে নিমজ্জিত ফেরাউনের ব্যাপারে কুরআন ঘোষণা করে: “فَالْيَوْمَ نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لِمَنْ خَلْفَكَ آيَةً” (আজ আমি তোমার দেহকে রক্ষা করব যাতে তুমি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিদর্শন হতে পার – সূরা ইউনুস: ৯২)। ঊনবিংশ শতাব্দীতে মমি আবিষ্কারের মাধ্যমে এর সত্যতা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে।
- ৩. বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্ব (الإعجاز العلمي):
আধুনিক বিজ্ঞানের যেসব আবিষ্কার গত এক-দুই শতাব্দীতে হয়েছে, চৌদ্দশত বছর পূর্বে কোনো টেলিস্কোপ বা মাইক্রোস্কোপ ছাড়া তা কুরআনে হুবহু বর্ণিত থাকা কুরআনের ঐশ্বরিক মু’জিযার স্পষ্ট প্রমাণ:
- ভ্রূণতত্ত্বের নির্ভুল পর্যায়ক্রম: সূরা মুমিনূনে শুক্রবিন্দু (নুৎফাহ), জমাট রক্তপিণ্ড (আলাক্বা), মাংসপিণ্ড (মুদগাহ), অস্থির সৃষ্টি ও মাংসের আবরণ ইত্যাদি পর্যায় আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। বিশ্বখ্যাত ভ্রূণতত্ত্ববিদ ড. কিথ এল মুর কুরআনের এই বর্ণনা দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন।
- মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও বিগ ব্যাং: “أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا” (কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে আসমান ও জমিন একসাথে যুক্ত ছিল, অতঃপর আমি তাদের পৃথক করে দিলাম? – সূরা আম্বিয়া: ৩০)।
- মহাবিশ্বের ক্রমাগত সম্প্রসারণ: “وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ” (আর আমি আকাশকে নির্মাণ করেছি কুদরত দ্বারা এবং নিশ্চয়ই আমি একে ক্রমাগত সম্প্রসারিত করছি – সূরা যারিয়াত: ৪৭)।
- ৪. আইনগত ও বিধানিক অলৌকিকত্ব (الإعجاز التشريعي):
কুরআনে বর্ণিত পারিবারিক আইন, মিরাস (উত্তরাধিকার বণ্টন), দেওয়ানী ও ফৌজদারি দণ্ডবিধি এবং অর্থনীতি মানব রচিত যে কোনো আইনের চেয়ে বহুগুণ শ্রেষ্ঠ, ভারসাম্যপূর্ণ ও চিরন্তন। পৃথিবীর কোনো সংবিধানই কুরআনের মতো অপরাধমুক্ত সমাজ গঠন করতে পারেনি।
- ৫. মনস্তাত্ত্বিক ও প্রভাব বিস্তারের অলৌকিকত্ব (التأثير النفسي):
কুরআন তিলাওয়াত শুনলে পাষাণ হৃদয় গলে যায়। কুরাইশদের উগ্র নেতা হযরত উমর (রা.) তরবারি নিয়ে বের হয়ে বোনের বাড়িতে কেবল কুরআনের সূরা ত্বাহার তিলাওয়াত শুনে কেঁদে ফেলে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ঘোর শত্রু আবু জাহেল ও আবু সুফিয়ানও রাতের আঁধারে লুকিয়ে লুকিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কুরআন তিলাওয়াত শুনত।
উপসংহার
ই’জাযুল কুরআন হলো এমন এক আলোকবর্তিকা যার দ্যুতি সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে ম্লান হয় না; বরং প্রতিটি যুগে বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে এর অলৌকিকত্ব আরও উজ্জ্বলভাবে উদ্ভাসিত হতে থাকে।
খ বিভাগ (القسم الثاني) – পূর্ণাঙ্গ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন সমাধান
٧. اكتب أوصاف القرآن الكريم وأسماءه-
[৭. পবিত্র কুরআনের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য ও গুণবাচক নামসমূহ সংক্ষেপে লেখ।]
উত্তর:
পবিত্র কুরআনের বহু মহিমান্বিত নাম ও গুণবাচক বিশেষণ রয়েছে। আল্লামা যারকাশী তাঁর ‘আল-বুরহান’ গ্রন্থে কুরআনের ৫৫টি নাম উল্লেখ করেছেন।
কুরআনের প্রধান ৫টি মৌলিক নাম:
- আল-কুরআন (القرآن): সর্বাধিক পরিচিত নাম। অর্থ পঠিত বা একত্রিত। “إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৯)।
- আল-কিতাব (الكتاب): লিখিত সংকলন। “ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ” (সূরা বাক্বারা: ২)।
- আল-ফুরকান (الفرقان): সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন পার্থক্যকারী। “تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ” (সূরা ফুরকান: ১)।
- আয-যিকর (الذكر): উপদেশ, স্মরণ ও সম্মান। “إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ” (সূরা হিজর: ৯)।
- আত-তানযীল (التنزيل): যা রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে ক্রমান্বয়ে অবতীর্ণ। “وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ” (সূরা শুআরা: ১৯২)।
কুরআনের প্রধান গুণাবলি (أوصاف القرآن): নূর (জ্যোতি), হুদা (হেদায়াত), শিফা (রোগমুক্তি), রহমত (দয়া), মুবারক (বরকতময়), হাকীম (প্রজ্ঞাময়), আযীয (মহিমান্বিত), এবং মাজীদ (সম্মানিত)।
٨. بيّن فوائد نزول القرآن منجماً (مفرقاً)-
[৮. কুরআন একবারে নাযিল না হয়ে পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হওয়ার হিকমত ও ফায়দাসমূহ উল্লেখ কর।]
উত্তর:
কাফেররা প্রশ্ন তুলেছিল: “لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً” (তাঁর ওপর সম্পূর্ণ কুরআন একবারে কেন নাযিল হলো না? – সূরা ফুরকান: ৩২)। আল্লাহ দীর্ঘ ২৩ বছরে পর্যায়ক্রমে কুরআন নাযিলের নিম্নোক্ত প্রধান হিকমতসমূহ বর্ণনা করেছেন:
- ১. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হৃদয়কে সুদৃঢ় রাখা (تثبيت فؤاد النبي صلى الله عليه وسلم): কাফেরদের নির্যাতন ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের সময় বারবার জিবরাঈল (আ.)-এর আগমন নবীজীর কলবকে শান্ত ও আশ্বস্ত করত।
- ২. মুখস্থ ও হৃদয়ঙ্গম সহজ করা (تيسير حفظه وفهمه): আরবরা ছিল অধিকাংশ উম্মী। একবারে বিশাল কিতাব নাযিল হলে তা মুখস্থ করা ও ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন হতো; অল্প অল্প করে নাযিল হওয়ায় সাহাবীগণ তা সহজে মুখস্থ ও আমল করতে পেরেছেন।
- ৩. বিধানাবলিতে পর্যায়ক্রমিক সহজীকরণ (التدرج في التشريع): প্রাচীন জাহেলী অভ্যাস—যেমন মদপান, ব্যভিচার ও সুদ হঠাৎ এক ঘোষণায় বন্ধ করা সম্ভব ছিল না। কুরআন পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে বিধান কার্যকর করেছে।
- ৪. উপস্থিত ঘটনার সমাধান ও প্রশ্নের উত্তর প্রদান: সাহাবী ও কাফেরদের তাৎক্ষণিক প্রশ্নের জবাব (যেমন: يسألونك عن المحيض) এবং সামাজিক ঘটনার প্রেক্ষিতে সরাসরি আসমানী ফয়সালা প্রদান করা।
- ৫. কুরআনের অলৌকিকত্ব প্রমাণ: ২৩ বছর ধরে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে একটু একটু করে নাযিল হওয়া সত্ত্বেও এর ভাষার গাঁথুনিতে কোথাও সামান্যতম অসঙ্গতি বা বৈপরীত্য দেখা যায়নি।
٩. اكتب أقسام التفسير موضحاً (التفسير بالمأثور والتفسير بالرأي)-
[৯. তাফসীরের প্রধান দুটি প্রকারভেদ (তাফসীর বিল মা’সুর ও তাফসীর বির রায়) সুস্পষ্টভাবে লেখ।]
উত্তর:
তাফসীর প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত:
- তাফসীর বিল মা’সুর (التفسير بالمأثور):
একে রেওয়ায়েতভিত্তিক তাফসীর বলা হয়। অর্থাৎ যে তাফসীরে কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা কুরআনের অন্য আয়াত দ্বারা, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহীহ হাদিস দ্বারা, সাহাবায়ে কিরামের বর্ণনা দ্বারা এবং তাবেঈনদের নির্ভরযোগ্য উক্তি দ্বারা করা হয়। এটি সর্বোত্তম ও নির্ভরযোগ্য তাফসীর। উদাহরণ: ইমাম তাবারীর ‘জামিগুল বায়ান’, ইবনে কাসীরের ‘তাফসীরুল কুরআনিল আযীম’ এবং সুয়ূতীর ‘আদ-দুররুল মানসূর’।
- তাফসীর বির রায় (التفسير بالرأي):
একে দেরায়াত বা যুক্তিনির্ভর তাফসীর বলা হয়। যেখানে মুফাসসির নিজের আরবি ভাষা, ব্যাকরণ, অলংকারশাস্ত্র ও শরীয়তের মূলনীতির গভীর পাণ্ডিত্যের আলোকে কুরআনের অন্তর্নিহিত তত্ত্ব বিশ্লেষণ করেন। এটি দুই প্রকার:
- মহামুদ বা প্রশংসনীয় (الرأي المحمود): যা কুরআন-সুন্নাহ ও আরবি ব্যাকরণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। যেমন—ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর ‘তাফসীরে কাবীর’, আল্লামা যামাখশারীর ‘কাশশাফ’, কাজী বাযযাবীর ‘আনওয়ারুত তানযীল’।
- মযমুম বা নিন্দনীয় (الرأي المذموم): যা কোনো জ্ঞান ছাড়া কেবল মনগড়া প্রবৃত্তি ও ভ্রান্ত মতবাদ প্রমাণের জন্য করা হয়। হাদিসে এসেছে: “من قال في القرآن برأيه فليتبوأ مقعده من النار” (যে ব্যক্তি কুরআন সম্পর্কে নিজের মনগড়া কথা বলল, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়)।
١٠. اكتب أحكام النون الساكنة والميم الساكنة ممثلاً-
[১০. নূন সাকিন ও মীম সাকিনের নিয়মসমূহ উদাহরণসহ সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
উত্তর:
১. নূন সাকিন ও তানভীনের ৪টি বিধান (أحكام النون الساكنة والتنوين):
- ইযহার (الإظهار): হলকী বা কণ্ঠনালীর ৬টি হরফ (ء هـ ع ح غ خ)-এর পূর্বে নূন সাকিন আসলে গুন্নাহ ছাড়া স্পষ্ট পড়তে হয়। যেমন: مَنْ آمَنَ، أَنْعَمْتَ।
- ইদগাম (الإدغام): يَرْمَلُون (ي ر م ل و ن) এর ৬টি হরফের পূর্বে নূন সাকিন আসলে মিলিয়ে পড়তে হয়। গুন্নাহসহ (ي ن م و) যেমন: مَن يَّقُولُ; এবং গুন্নাহ ছাড়া (ل ر) যেমন: مِن رَّبِّهِمْ।
- ইক্বলাব (الإقلاب): ب (বা) হরফের পূর্বে আসলে নূন সাকিনকে ছোট م (মীম) দ্বারা পরিবর্তন করে গুন্নাহসহ পড়তে হয়। যেমন: مِن بَعْدِ (মিম বা’দি)।
- ইখফা (الإخفاء): বাকি ১৫টি হরফের পূর্বে নূন সাকিন আসলে নাকের বাঁশিতে লুকিয়ে গুন্নাহসহ পড়তে হয়। যেমন: مِن قَبْلِ، كُنتُمْ।
২. মীম সাকিনের ৩টি বিধান (أحكام الميم الساكنة):
- ইখফায়ে শাফাবী (الإخفاء الشفوي): م সাকিনের পর ب আসলে ঠোঁট মিলিয়ে গুন্নাহসহ পড়তে হয়। যেমন: تَرْمِيهِم بِحِجَارَةٍ।
- ইদগামে শাফাবী বা মিসলাইন (الإدغام الشفوي): م সাকিনের পর অপর একটি م আসলে মিলিয়ে গুন্নাহসহ পড়তে হয়। যেমন: لَهُم مَّا يَشَاءُونَ।
- ইযহারে শাফাবী (الإظهار الشفوي): ب এবং م ছাড়া বাকি ২৪টি হরফ আসলে গুন্নাহ ছাড়া স্পষ্ট পড়তে হয়। যেমন: أَلَمْ تَرَ، أَمْ أَمِنتُمْ।
١١. فصّل أنواع المد بالأمثلة-
[১১. মাদ্দের প্রকারভেদসমূহ উদাহরণসহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা কর।]
উত্তর:
মাদ্দ (المد)-এর পরিচয়: ‘মাদ্দ’ শব্দের অর্থ দীর্ঘ করা বা টেনে পড়া। মাদ্দের মৌলিক হরফ তিনটি: আলিফ সাকিন যার পূর্বে যবর (ـَ ا)، ওয়াও সাকিন যার পূর্বে পেশ (ـُ و)، এবং ইয়া সাকিন যার পূর্বে যের (ـِ ي)।
মাদ্দের প্রধান প্রকারভেদ:
- মাদ্দে আসলী বা তাবাঈ (المد الأصلي / الطبيعي): মাদ্দের হরফের পর হামযাহ বা সুকুন না থাকলে স্বাভাবিকভাবে ১ আলিফ পরিমাণ টেনে পড়তে হয়। যেমন: نُوحِيهَا (নূ-হী-হা)।
- মাদ্দে ফারঈ (المد الفرعي): মাদ্দের হরফের পর কারণ হিসেবে হামযাহ (ء) অথবা সুকুন (ـْ) আসলে তাকে মাদ্দে ফারঈ বলে। এটি প্রধানত চার প্রকার:
- মাদ্দে মুত্তাসিল (المد المتصل): একই শব্দের মধ্যে মাদ্দের হরফের পর হামযাহ আসলে (৪/৫ আলিফ টানতে হয়)। যেমন: جَاءَ، السَّمَاءِ، سُوءَ।
- মাদ্দে মুনফাসিল (المد المنفصل): প্রথম শব্দের শেষে মাদ্দের হরফ এবং দ্বিতীয় শব্দের শুরুতে হামযাহ আসলে (৩/৪ আলিফ টানতে হয়)। যেমন: إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ، يَا أَيُّهَا।
- মাদ্দে লাযিম (المد اللازم): মাদ্দের হরফের পর আসল সুকুন বা তাশদীদ আসলে (৬ হরকত বা ৪ আলিফ টানতে হয়)। যেমন: الضَّالِّينَ، الحَاقَّةُ، الم।
- মাদ্দে আরিযী (المد العارض للسكون): মাদ্দের হরফের পরের অক্ষরে ওয়াকফ করার কারণে অস্থায়ী সুকুন তৈরি হলে (৩/৪ আলিফ টানতে হয়)। যেমন: الرَّحِيمِ، تَعْلَمُونَ।
١٢. اكتب من حفظك سورة مما يلى: (الف) سورة الأعلى (ب) سورة الشمس (ج) سورة الطارق-
[১২. মুখস্থ লিখে পূর্ণ কর: (ক) সূরা আল-আ’লা (খ) সূরা আশ-শামস (গ) সূরা আত-তারিক।]
(الف) سُورَةُ الأَعْلَى (كاملة):
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى (١) الَّذِي خَلَقَ فَسَوَّىٰ (٢) وَالَّذِي قَدَّرَ فَهَدَىٰ (٣) وَالَّذِي أَخْرَجَ الْمَرْعَىٰ (٤) فَجَعَلَهُ غُثَاءً أَحْوَىٰ (٥) سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنسَىٰ (٦) إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ۚ إِنَّهُ يَعْلَمُ الْجَهْرَ وَمَا يَخْفَىٰ (٧) وَنُيَسِّرُكَ لِلْيُسْرَىٰ (٨) فَذَكِّرْ إِن نَّفَعَتِ الذِّكْرَىٰ (٩) سَيَذَّكَّرُ مَن يَخْشَىٰ (١٠) وَيَتَجَنَّبُهَا الْأَشْقَى (١١) الَّذِي يَصْلَى النَّارَ الْكُبْرَىٰ (١٢) ثُمَّ لَا يَمُوتُ فِيهَا وَلَا يَحْيَىٰ (١٣) قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ (١٤) وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّىٰ (١٥) بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا (١٦) وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ (١٧) إِنَّ هَٰذَا لَفِي الصُّحُفِ الْأُولَىٰ (١٨) صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ (١٩)
(ب) سُورَةُ الشَّمْسِ (كاملة):
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
وَالشَّمْسِ وَضُحَاهَا (١) وَالْقَمَرِ إِذَا تَلَاهَا (٢) وَالنَّهَارِ إِذَا جَلَّاهَا (٣) وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَاهَا (٤) وَالسَّمَاءِ وَمَا بَنَاهَا (٥) وَالْأَرْضِ وَمَا طَحَاهَا (٦) وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا (٧) فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا (٨) قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا (٩) وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا (١٠) كَذَّبَتْ ثَمُودُ بِطَغْوَاهَا (١١) إِذِ انبَعَثَ أَشْقَاهَا (١٢) فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ نَاقَةَ اللَّهِ وَسُقْيَاهَا (١٣) فَكَذَّبُوهُ فَعَقَرُوهَا فَدَمْدَمَ عَلَيْهِمْ رَبُّهُم بِذَنبِهِمْ فَسَوَّاهَا (١٤) وَلَا يَخَافُ عُقْبَاهَا (١٥)
(ج) سُورَةُ الطَّارِقِ (كاملة):
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
وَالسَّمَاءِ وَالطَّارِقِ (١) وَمَا أَدْرَاكَ مَا الطَّارِقُ (٢) النَّجْمُ الثَّاقِبُ (٣) إِن كُلُّ نَفْسٍ لَّمَّا عَلَيْهَا حَافِظٌ (٤) فَلْيَنظُرِ الْإِنسَانُ مِمَّ خُلِقَ (٥) خُلِقَ مِن مَّاءٍ دَافِقٍ (٦) يَخْرُجُ مِن بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ (٧) إِنَّهُ عَلَىٰ رَجْعِهِ لَقَادِرٌ (٨) يَوْمَ تُبْلَى السَّرَائِرُ (٩) فَمَا لَهُ مِن قُوَّةٍ وَلَا نَاصِرٍ (١٠) وَالسَّمَاءِ ذَاتِ الرَّجْعِ (١١) وَالْأَرْضِ ذَاتِ الصَّدْعِ (١٢) إِنَّهُ لَقَوْلٌ فَصْلٌ (١٣) وَمَا هُوَ بِالْهَزْلِ (١٤) إِنَّهُمْ يَكِيدُونَ كَيْدًا (١٥) وَأَكِيدُ كَيْدًا (١٦) فَمَهِّلِ الْكَافِرِينَ أَمْهِلْهُمْ رُوَيْدًا (١٧)
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. উলুমুল কুরআন বিষয়ের প্রধান উদ্দেশ্য কী?
পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত, নাযিলের প্রেক্ষাপট, সংকলন ইতিহাস, শরিয়তের বিধানাবলী এবং এর অলৌকিকত্ব গভীরভাবে অধ্যয়ন করাই এ বিষয়ের প্রধান লক্ষ্য।
২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর ওহী নাযিলের সবচেয়ে কষ্টদায়ক রূপ কোনটি ছিল?
ঘণ্টার তীব্র টুংটাং আওয়াজের মতো (صلصلة الجرس) ওহী নাযিল হওয়া ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য সবচেয়ে শারীরিক ও মানসিক কষ্টদায়ক অবস্থা।
৩. কার প্রস্তাবে হযরত আবু বকর (রা.) কুরআন সংকলনের সিদ্ধান্ত নেন?
ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফিজ সাহাবীর শাহাদাতের পর হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর দূরদর্শী প্রস্তাবে খলিফা আবু বকর (রা.) কুরআন সংকলনের নির্দেশ দেন।
৪. উলুমুল কুরআনে ‘নাসখ’ বলতে কী বুঝায়?
একটি পরবর্তী শরয়ী দলীল দ্বারা কোনো পূর্ববর্তী শরয়ী হুকুম বা বিধানের পরিবর্তন অথবা প্রত্যাহার করাকে নাসখ বলা হয়।
৫. নূন সাকিন ও তানভীনের কয়টি হুকুম রয়েছে?
নূন সাকিন ও তানভীনের প্রধান ৪টি হুকুম রয়েছে: ইযহার (স্পষ্ট করা), ইদগাম (মিলিয়ে পড়া), ইক্বলাব (মীমে রূপান্তর), এবং ইখফা (লুকিয়ে গুন্নাহ করা)।
৬. উলুমুল কুরআনের ওপর ইমাম সুয়ূতী রচিত সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থের নাম কী?
ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) রচিত ‘আল-ইতকান ফী উলুমিল কুরআন’ (الإتقان في علوم القرآن) হলো এ শাস্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য বিশ্বকোষ।