জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আস-সিরাতুন্নাবাবিয়্যাহ (As-Sirah An-Nabawiyyah) – ২০২২০৪, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

Abswer.com Abswer.com
21 September, 2026
৭০ মিনিট পড়ার সময়
১১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আস-সিরাতুন্নাবাবিয়্যাহ (As-Sirah An-Nabawiyyah)
বিষয় কোড: ২০২২০৪
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা

ক বিভাগ (القسم الأول) – পূর্ণাঙ্গ রচনামূলক প্রশ্ন সমাধান

١. تحدث عن الأحوال السياسية والدينية والاجتماعية للعرب قبل الإسلام-

[১. প্রাক-ইসলামী আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগের আরবের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থা বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ববর্তী সময়কালকে আরব ইতিহাসে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞতার যুগ বলা হয়। সে সময় গোটা আরব উপদ্বীপে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ চরম তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা, পৌত্তলিকতার বাড়াবাড়ি এবং সামাজিক বর্বরতা সমগ্র জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত করেছিল।

১. রাজনৈতিক অবস্থা (الأحوال السياسية)

  • কেন্দ্রীয় শাসনের অনুপস্থিতি: প্রাক-ইসলামী আরবে কোনো কেন্দ্রীয় সরকার, আইন বা সংবিধান ছিল না। সমগ্র আরব মরুভূমি শত শত স্বাধীন ও যুদ্ধংদেহী গোত্রে বিভক্ত ছিল।
  • গোত্রপ্রথা ও ‘আসাবিয়্যাত’: গোত্রীয় অন্ধ অহমিকা ও পক্ষপাতিত্ব (العصبية القبلية) ছিল রাজনৈতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি। গোত্রের প্রধানকে বলা হতো ‘শায়খ’। গোত্রের কোনো এক ব্যক্তি অন্যায় করলেও পুরো গোত্র তার পক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করত। তাদের স্লোগান ছিল: “انصر أخاك ظالما أو مظلوما” (তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে অত্যাচারী হোক বা অত্যাচারিত হোক)।
  • শতবর্ষব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ: সামান্য তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলত। যেমন—একটি উটনিকে আঘাত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বনু বকর ও বনু তাগলিবের মধ্যে ৪০ বছরব্যাপী ‘বাসূসের যুদ্ধ’ (حرب البسوس) সংঘটিত হয়েছিল। এছাড়া ‘দাহিস ও গাবরা’র যুদ্ধ এবং হরমের পবিত্রতা নষ্টকারী ‘ফুজ্জারের যুদ্ধ’ ছিল অন্যতম।
  • বিদেশী সাম্রাজ্যের প্রভাব: আরবের উত্তর সীমান্তে গাসসানীরা রোমানদের এবং হীরা রাজ্যের লাখমীরা পারস্যের অধীনস্থ পুতুল শাসক হিসেবে কাজ করত। ফলে আরবরা বহিরাগত আগ্রাসনের হুমকিতেও ছিল।

২. ধর্মীয় অবস্থা (الأحوال الدينية)

  • চরম শিরক ও মূর্তিপূজা: হযরত ইব্রাহীম ও ইসমাইল (আ.)-এর তাওহীদী দ্বীনে হানিফ বিকৃত হয়ে আরবে মূর্তিপূজা ছড়িয়ে পড়ে। আমর ইবনে লুহাই আল-খুযায়ী শাম দেশ থেকে ‘হুবাল’ নামক মূর্তি এনে পবিত্র কাবার ছাদে স্থাপন করে পৌত্তলিকতার সূচনা করে। পরবর্তীতে কাবার অভ্যন্তরে ও চত্বরে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়।
  • বিখ্যাত মূর্তিসমূহ: কুরাইশদের প্রধান মূর্তি ছিল ‘হুবাল’। এছাড়া তায়েফে ‘লাত’, নাখলায় ‘উয্যা’, মদিনার আউস ও খাযরাজের ‘মানাত’ এবং অন্যান্য গোত্রে ‘ওয়াদ’, ‘সুওয়া”, ‘ইয়াগূছ’, ‘ইয়াউক্ব’ ও ‘নাসর’-এর পূজা করা হতো। এমনকি পরিবারগুলো ব্যক্তিগত পাথরের মূর্তিও তৈরি করত।
  • কুসংস্কার ও ভাগ্য গণনা: আরবরা শুভাশুভ নির্ণয়ে তীরের সাহায্যে জুয়া খেলত (الأزلام), জ্যোতিষী ও জিন-ভূতের আরাধনা করত।
  • অন্যান্য ধর্মের অনুসারী: ইয়ামান ও ইয়াসরিবে কিছু ইহুদি, নাজরানে খ্রিস্টান এবং পূর্ব আরবে কিছু অগ্নিপূজক বাস করত। তবে ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল ও যায়েদ ইবনে আমরের মতো হাতে গোনা কয়েকজন ‘হানিফ’ একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন।

৩. সামাজিক ও নৈতিক অবস্থা (الأحوال الاجتماعية)

  • নারীর চরম অবমূল্যায়ন ও বঞ্চনা: নারীকে ভোগের সামগ্রী মনে করা হতো। কোনো সম্পত্তিতে তাদের উত্তরাধিকার ছিল না। পিতার মৃত্যুর পর সন্তানরা বিমাতাকে নিজের সম্পত্তি হিসেবে বণ্টন করে নিত। বহুবিবাহের কোনো সীমা ছিল না।
  • কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া (وأد البنات): দারিদ্র্যের ভয় এবং সামাজিক অপমানের আশঙ্কায় পিতা নিজ হাতে নিষ্পাপ সদ্যোজাত কন্যা শিশুকে জীবন্ত পুঁতে ফেলত। পবিত্র কুরআনে এর কঠোর নিন্দা করে বলা হয়েছে: “وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِالْأُنثَىٰ ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ” (যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হতো, তখন তার মুখ কালো হয়ে যেত এবং সে অসহ্য ক্ষোভে ফেটে পড়ত – সূরা আন-নাহল: ৫৮)।
  • দাসপ্রথা ও অমানবিক নির্যাতন: সমাজে ক্রীতদাসদের পশুর চেয়েও অধম মনে করা হতো। মনিবদের যে কোনো ধরণের অত্যাচার ও হত্যারও অধিকার ছিল।
  • মদ, জুয়া ও সুদ: মদ্যপান, ব্যভিচার ও জুয়া ছিল দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অঙ্গ। চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের কারণে বহু পরিবার চিরতরে ঋণদাসে পরিণত হতো।

উপসংহার

আইয়ামে জাহেলিয়াতের এই চরম অন্ধকার যুগে সমগ্র মানবজাতি যখন মুক্তির জন্য হাহাকার করছিল, ঠিক তখনই বিশ্বজাহানের রহমত হিসেবে আবির্ভূত হন মানবতার মহান ত্রাণকর্তা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।


٢. اكتب عن ولادة النبى صلى الله عليه وسلم ونشأته ورضاعته فى بنى سعد وكفالة عمه أبى طالب-

[২. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শুভ জন্ম, শৈশব, বনু সা’দ গোত্রে স্তন্যপান এবং চাচা আবু তালিবের অভিভাবকত্ব বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

সায়্যিদুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শুভ জন্ম ও শৈশবের প্রতিটি অধ্যায় ছিল মহান আল্লাহর প্রত্যক্ষ অলৌকিক কুদরত ও বিশেষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন সকল প্রকার জাহেলী পঙ্কিলতা থেকে পুত-পবিত্র।

১. শুভ জন্ম ও বংশমর্যাদা

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐতিহাসিক ‘আমুল ফীল’ বা হস্তীবর্ষে (আবরাহার কাবা আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার ৫০-৫৫ দিন পর) ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার সুবহে সাদেকের সময় পবিত্র মক্কা নগরীতে কুরাইশ বংশের বনু হাশিম শাখায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের পূর্বেই পিতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেছিলেন। জন্মের পর তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব পরম আনন্দে তাঁকে কোলে নিয়ে কাবার চত্বরে প্রবেশ করেন এবং মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’ (প্রশংসিত)। মাতা আমেনা নাম রাখেন ‘আহমদ’। জন্মের সময় পারস্যের রাজপ্রাসাদের ১৪টি চূড়া ধসে পড়ে, যা ছিল কুফরের পতনের ঐশ্বরিক নিদর্শন।

২. বনু সা’দ গোত্রে স্তন্যপান ও শৈশব

  • মরুভূমির মুক্ত হাওয়া ও বিশুদ্ধ ভাষা শিক্ষা: আরবের সম্ভ্রান্ত কুরাইশদের রীতি ছিল সন্তানদের মরুভূমির মুক্ত আবহাওয়া ও শারীরিক গঠনের জন্য এবং বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিক্ষার জন্য বেদুইন গোত্রে স্তন্যপানের জন্য প্রেরণ করা।
  • হালিমা আস-সাদীয়ার আগমন: বনু সা’দ গোত্রের মহীয়সী নারী হালিমা বিনতে আবী যুআইব আস-সাদীয়া মক্কায় আসেন। তিনি প্রথমে পিতৃহীন ইয়াতিম শিশু ভেবে দ্বিধাবোধ করলেও পরবর্তীতে অন্য শিশু না পেয়ে বরকতের আশায় মুহাম্মদ (সা.)-কে কোলে তুলে নেন।
  • অলৌকিক বরকত: মুহাম্মদ (সা.)-কে স্পর্শ করার সাথে সাথে হালিমার স্তনে দুধের নহর বয়ে যায়, তাঁর দুর্বল সওয়ারী কাফেলার অগ্রগামী হয়ে যায় এবং বনু সা’দের শুষ্ক চারণভূমিতে হালিমার বকরিগুলো দুধে পূর্ণ হয়ে ওঠে।
  • বক্ষ বিদারণ (شق الصدر): বনু সা’দে অবস্থানকালে চার অথবা পাঁচ বছর বয়সে একদিন শিশু নবী খেলার মাঠে থাকা অবস্থায় জিবরাঈল (আ.) এসে তাঁর বক্ষ বিদারণ করেন এবং হৃদয় বের করে জমজমের পানিতে ধৌত করে শয়তানের অংশ অপসারিত করে ঈমান ও হিকমত দিয়ে পূর্ণ করে দেন। এতে ভীত হয়ে হালিমা তাঁকে মক্কায় মাতার নিকট ফেরত পাঠান।

৩. মাতামহের ওফাত ও দাদা আব্দুল মুত্তালিবের অভিভাবকত্ব

ছয় বছর বয়সে মাতা আমেনা তাঁকে নিয়ে ইয়াসরিবে (মদিনা) স্বামীর কবর জিয়ারতে যান। ফেরার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে মাতা আমেনা ইন্তেকাল করেন। খাদেমা উম্মে আইমান তাঁকে মক্কায় নিয়ে আসেন। এরপর দাদা আব্দুল মুত্তালিব পরম স্নেহে তাঁকে লালন-পালন করেন। কিন্তু মাত্র আট বছর বয়সে দাদাও ইন্তেকাল করেন।

৪. চাচা আবু তালিবের অভিভাবকত্ব ও সান্নিধ্য

দাদার অসিয়ত অনুযায়ী চাচা আবু তালিব মুহাম্মদ (সা.)-এর অভিভাবকত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আবু তালিব আর্থিক দিক দিয়ে সচ্ছল না হলেও মুহাম্মদ (সা.)-কে নিজের সন্তানদের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন।

  • সিরিয়া সফর ও পাদ্রী বুহাইরার ভবিষ্যদ্বাণী: বারো বছর বয়সে চাচা আবু তালিবের সাথে তিনি বাণিজ্যিক কাফেলায় শাম (সিরিয়া) সফরে যান। পথিমধ্যে বুসরা নামক স্থানে খ্রিস্টান পাদ্রী বুহাইরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর মেঘমালার ছায়া দেওয়া এবং গাছের সেজদা দেওয়ার অলৌকিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। তিনি তাঁর কাঁধের মোহরে নবুওয়াত পরীক্ষা করে ঘোষণা করেন যে, ইনিই শেষ জামানার প্রতিশ্রুত নবী। তিনি ইহুদিদের ষড়যন্ত্রের আশঙ্কায় আবু তালিবকে অবিলম্বে মুহাম্মদ (সা.)-কে মক্কায় ফেরত পাঠানোর পরামর্শ দেন।
  • আবু তালিবের আজীবন পৃষ্ঠপোষকতা: নবুওয়াত প্রাপ্তির পর মক্কার কুরাইশরা যখন ইসলামের ঘোর শত্রু হয়ে দাঁড়ায়, তখন চাচা আবু তালিব নিজে ইসলাম গ্রহণ না করলেও আজীবন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ (সা.)-কে সমস্ত নির্যাতন থেকে রক্ষা করেন এবং ‘শে’আবে আবু তালিবে’ তিন বছরব্যাপী বয়কটের দিনেও তাঁর পাশে অবিচল থাকেন।

উপসংহার

পিতৃহীন, মাতৃহীন এই ইয়াতিম শিশুকেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমগ্র সৃষ্টির জন্য আলোকবর্তিকা বানিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَىٰ” (তিনি কি আপনাকে ইয়াতিম অবস্থায় পাননি, অতঃপর আশ্রয় দান করেননি? – সূরা আদ-দুহা: ৬)।


٣. تحدث عن الهجرة النبوية الشريفة إلى المدينة المنورة: أسبابها ودوافعها ونتائجها التاريخية-

[৩. মদিনা মুনাওয়ারায় নববী হিজরত: এর কারণ, পটভূমি ও ঐতিহাসিক সুদূরপ্রসারী ফলাফল বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষে (৬২২ খ্রিষ্টাব্দ) মক্কা থেকে ইয়াসরিবে (মদিনা মুনাওয়ারা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শুভ হিজরত ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। এটি নিছক দেশত্যাগ বা পলায়ন ছিল না; বরং একটি বিশ্বজনীন সার্বভৌম ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এক সুপরিকল্পিত ও ঐশ্বরিক মহাবিপ্লব ছিল।

১. হিজরতের প্রধান কারণ ও পটভূমি (الأسباب والدوافع)

  1. মক্কার কুরাইশদের অসহ্য অত্যাচার ও নির্যাতন: দীর্ঘ তের বছর ধরে মক্কায় রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। হযরত বিলাল, খাব্বাব ও সুমাইয়া (রা.)-এর মতো সাহাবীদের রক্তে মক্কার মাটি রঞ্জিত হয়। শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
  2. দারুন নাদওয়ার ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্র ও হত্যার নীলনকশা: নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষে মক্কার কুরাইশ নেতারা তাদের সংসদ ভবন ‘দারুন নাদওয়া’য় সমবেত হয়। ইবলিস এক নজদী শায়খের বেশে সেখানে উপস্থিত হয়। আবু জাহেলের প্রস্তাবে সিদ্ধান্ত হয়—প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী যুবক নির্বাচন করে একযোগে তরবারির আঘাতে মুহাম্মদ (সা.)-কে হত্যা করা হবে, যাতে বনু হাশিম সবার বিরুদ্ধে লড়াই করতে না পেরে রক্তপণ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।
  3. আল্লাহ তাআলার ঐশী নির্দেশ: আল্লাহ তায়ালা জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এই ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দেন এবং হিজরতের অনুমতি প্রদান করেন: “وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ” (স্মরণ কর, যখন কাফেররা তোমাকে বন্দি করতে, হত্যা করতে অথবা নির্বাসিত করার ষড়যন্ত্র করছিল – সূরা আনফাল: ৩০)।
  4. আকাবাতাইন বা আকাবার বাইআতসমূহ: হজের মৌসুমে মদিনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে। নবুওয়াতের দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ বর্ষে প্রথম ও দ্বিতীয় আকাবার বাইয়াতে মদিনাবাসী অঙ্গীকার করে যে, তারা রাসুলুল্লাহ (সা.) ও মুহাজিরদেরকে নিজেদের প্রাণের মতো রক্ষা করবে। ফলে মদিনা ইসলামের এক নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়।

২. হিজরতের বাস্তব ঘটনাক্রম

হত্যার রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে তাঁর বিছানায় রেখে দেন এবং কুরাইশদের গচ্ছিত আমানতসমূহ প্রত্যর্পণের নির্দেশ দেন। তিনি কাফেরদের চোখে ধুলো দিয়ে সূরা ইয়াসীনের আয়াত পাঠ করতে করতে গৃহ ত্যাগ করেন। তিনি বিশ্বস্ত সঙ্গী হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে নিয়ে মদিনার বিপরীত দিকে সাওর পর্বতের গুহায় (غار ثور) তিন দিন আত্মগোপন করেন। কাফেররা গুহার মুখে পৌঁছে গেলেও মাকড়সার জাল ও কবুতরের বাসার অলৌকিকতায় ফিরে যায়। সেখানেই রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু বকর (রা.)-কে অভয় দিয়ে বলেন: “لا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا” (চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন – সূরা তাওবা: ৪০)। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইক্বিতের পথপ্রদর্শনে তিনি নিরাপদে মদিনার উপকণ্ঠে কুবা পৌঁছান এবং সেখানে ইসলামের প্রথম মসজিদ ‘মসজিদে কুবা’ প্রতিষ্ঠা করেন।

৩. হিজরতের ঐতিহাসিক ফলাফল ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য (النتائج التاريخية)

  • ১. স্বাধীন সার্বভৌম ইসলামি রাষ্ট্রের পত্তন: হিজরতের মাধ্যমে ইসলামের প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
  • ২. মদিনা সনদ ও মানবাধিকারের ঘোষণা: মদিনার মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মাঝে সম্প্রীতি ও প্রতিরক্ষার জন্য ৪৭টি ধারাসংবলিত পৃথিবীর সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদিনা সনদ’ (وثيقة المدينة) প্রণয়ন করা হয়।
  • ৩. মুয়াখাত বা অনুপম ভ্রাতৃত্ব বন্ধন: মুহাজির ও আনসারদের মাঝে রক্তসম্পর্কের চেয়েও গভীর ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়। আনসারগণ তাঁদের সহায়-সম্পত্তি মুহাজিরদের সাথে সমান ভাগে বণ্টন করে দেন।
  • ৪. ইসলামি সংস্কৃতির বিকাশ ও শরীয়তের পূর্ণাঙ্গ রূপায়ণ: মদিনায় হিজরতের পর সালাতের জামাত, আযান, জুমুআ, যাকাত, সিয়াম, হজ, জিহাদ এবং পারিবারিক ও আন্তর্জাতিক আইনের মতো বিধানগুলো বিস্তারিতভাবে নাযিল হতে শুরু করে।
  • ৫. হিজরী সনের প্রবর্তন: হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খেলাফতকালে সাহাবায়ে কিরামের সর্বসম্মত ঐকমত্যে হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ইসলামের চিরন্তন হিজরী বর্ষপঞ্জির সূচনা করা হয়।

উপসংহার

হিজরত ছিল সত্যের সাথে মিথ্যার চিরন্তন বিভেদরেখা এবং তাওহীদের সার্বজনীন বিজয়ের প্রবেশদ্বার। এর মাধ্যমেই ইসলাম মক্কার নিপীড়িত অবস্থা থেকে বের হয়ে আন্তর্জাতিক মহাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল।


٤. اكتب عن غزوة بدر الكبرى: أسبابها وأحداثها ونتائجها وأثرها فى ترسيخ الدولة الإسلامية-

[৪. ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ: এর কারণ, ঘটনাবলি, ফলাফল এবং নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্র সুসংহতকরণে এর প্রভাব বিস্তারিত লেখ।]

ভূমিকা

দ্বিতীয় হিজরীর ১৭ই রমজানুল মুবারক সংঘটিত হয়েছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মুখ সমর ‘গাযওয়ায়ে বাদরে কুবরা’ (غزوة بدر الكبرى)। পবিত্র কুরআনে একে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ (يوم الفرقان) বা সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত ফয়সালার দিন আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটি ছিল রিক্তহস্ত ৩১৩ জন ঈমানদারের সাথে সুসজ্জিত ১০০০ কাফের সেনার অসম অথচ ঐতিহাসিক এক বিজয়ের মহাকাব্য।

১. বদর যুদ্ধের কারণ ও পটভূমি (الأسباب والدوافع)

  1. কুরাইশদের অব্যাহত শত্রুতা ও ষড়যন্ত্র: মদিনায় হিজরতের পরও কুরাইশরা শান্ত হয়নি। তারা মদিনার উপকণ্ঠে লুটতরাজ চালাত এবং আবদুল্লাহ ইবনে উবাইসহ মদিনার মুনাফিকদের হুমকি দিয়ে পত্র পাঠাত।
  2. মুহাজিরদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ আত্মসাৎ: মক্কার কাফেররা সাহাবীগণের ফেলে আসা ঘরবাড়ি ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ জোরপূর্বক দখল করে তা দিয়ে সিরিয়ায় বাণিজ্যের কাফেলা পাঠায়।
  3. আবু সুফিয়ানের বাণিজ্যিক কাফেলা রোধ: আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে ৫০ হাজার স্বর্ণমুদ্রার এক বিশাল কুরাইশ বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কা ফিরছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কার অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল করার জন্য এই কাফেলা রোধের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আবু সুফিয়ান সাগরের উপকূলীয় পথ ধরে পালিয়ে যায় এবং মক্কায় খবর পাঠিয়ে এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করতে বলে।
  4. আবু জাহেলের যুদ্ধোন্মাদনা ও অহমিকা: আবু সুফিয়ানের কাফেলা নিরাপদে রক্ষা পেলেও দাম্ভিক আবু জাহেল মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার সংকল্প নিয়ে মক্কা থেকে এক হাজার সেনার এক সুবিশাল ও সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে বদরের ময়দানের দিকে অগ্রসর হয়।

২. যুদ্ধের ঘটনাবলি (أحداث المعركة)

  • সৈন্যসংখ্যার তুলনা: মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন (মুহাজির ৮২ বা ৮৬ জন, বাকিরা আনসার)। তাঁদের কাছে ছিল মাত্র ২টি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। অপরপক্ষে কাফের বাহিনীতে ছিল ১০০০ যোদ্ধা, ১০০টি ঘোড়া এবং বিপুল অস্ত্রশস্ত্র।
  • রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রোনাজারি ও ঐতিহাসিক মোনাজাত: যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁবুতে (আরীশ) গিয়ে দুহাত তুলে আল্লাহর দরবারে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি আকুল হয়ে ফরিয়াদ করেন: “اللَّهُمَّ إِنْ تَهْلِكْ هَذِهِ الْعِصَابَةُ مِنْ أَهْلِ الإِسْلامِ لا تُعْبَدْ فِي الأَرْضِ” (হে আল্লাহ! আজ যদি ইসলামের এই ক্ষুদ্র দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত জমিনে তোমার ইবাদত করার মতো আর কেউ থাকবে না – সহীহ মুসলিম)। তাঁর চাদর মোবারক কাঁধ থেকে পড়ে যায় এবং আবু বকর (রা.) এসে তাঁকে সান্ত্বনা দেন।
  • মল্লযুদ্ধ (المبارزة): আরবের প্রথা অনুযায়ী প্রথমে মল্লযুদ্ধ শুরু হয়। কুরাইশদের পক্ষে উতবা ইবনে রবীআ, তার ভাই শায়বা এবং পুত্র ওলীদ ময়দানে নামে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে হযরত ওবায়দা ইবনুল হারিস, হযরত হামযা এবং হযরত আলী (রা.) ময়দানে নামেন। মুহূর্তের মধ্যে হামযা (রা.) শায়বাকে, আলী (রা.) ওলীদকে এবং আলী ও হামযা যৌথভাবে উতবাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেন। এতে কাফেরদের মনোবল ভেঙে যায়।
  • ফেরেশতাদের ঐশ্বরিক সাহায্য: তুমুল সাধারণ যুদ্ধ শুরু হলে আল্লাহ তায়ালা আসমান থেকে এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেন: “إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُم بِأَلْفٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ مُرْدِفِينَ” (সূরা আনফাল: ৯)। বদরের প্রান্তরে কাফেরদের ওপর অদৃশ্য শক্তির তরবারির আঘাত নেমে আসে। কিশোর দুই ভাই মুআয ও মুআউওয়ায আবু জাহেলকে আক্রমণ করে ধরাশায়ী করে এবং ইবনে মাসউদ (রা.) তার মস্তক বিচ্ছিন্ন করেন।

৩. ফলাফল ও ইসলামি রাষ্ট্র সুসংহতকরণে প্রভাব (نتائج المعركة وأثرها)

  • শোচনীয় পরাজয় ও কাফেরদের শীর্ষ নেতাদের পতন: যুদ্ধে আবু জাহেল, উতবা, শায়বা, উমাইয়া ইবনে খালাফসহ কুরাইশদের শীর্ষস্থানীয় ৭০ জন কুখ্যাত কাফের নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দি হয়। মুসলমানদের মধ্য থেকে ১৪ জন বীর সাহাবী (৬ জন মুহাজির ও ৮ জন আনসার) শাহাদাত বরণ করেন।
  • যুদ্ধবন্দিদের সাথে মানবিক আচরণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধবন্দিদের সাথে নজিরবিহীন সদ্ব্যবহার করেন। মুক্তিপণ ছাড়াও যে সকল বন্দি লেখাপড়া জানত, তাদেরকে মদিনার দশজন মুসলিম শিশুকে লেখাপড়া শিখিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে মুক্ত করে দেওয়ার ঘোষণা দেন, যা শিক্ষার প্রতি ইসলামের শ্রদ্ধার এক অনন্য নিদর্শন।
  • মদিনা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় হওয়া: এই ঐতিহাসিক বিজয়ের ফলে মদিনা রাষ্ট্র সমগ্র আরবের বুকে এক অপরাজেয় সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মদিনার ইহুদি গোত্রসমূহ এবং মুনাফিকদের ঔদ্ধত্য স্তব্ধ হয়ে যায়। আরবের দূর-দূরান্তের বেদুইন গোত্রগুলো ইসলামি রাষ্ট্রের সাথে মিত্রতা চুক্তি করতে বাধ্য হয়।

উপসংহার

বদর যুদ্ধ ছিল আত্মবিশ্বাস, নিখাদ ঈমান ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের চূড়ান্ত পরীক্ষা। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই তাওহীদের পতাকা চিরদিনের জন্য আরবের বুকে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।


٥. تحدث عن صلح الحديبية: بنوده وأثره فى انتشار الإسلام، ولماذا سماه القرآن “فتحا مبينا”؟

[৫. হুদায়বিয়ার সন্ধি: এর শর্তাবলি, ইসলাম প্রসারে এর ভূমিকা এবং কেন কুরআন একে ‘ফাতহুম মুবীন’ আখ্যা দিয়েছে তা বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ষষ্ঠ হিজরীর জিলকদ মাসে মক্কার অদূরে হুদায়বিয়া নামক স্থানে মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে সম্পাদিত ঐতিহাসিক সন্ধিচুক্তি ‘সুলহুল হুদায়বিয়া’ নামে পরিচিত। আপাতদৃষ্টিতে এর শর্তগুলো মুসলমানদের জন্য অবমাননাকর মনে হলেও দূরদৃষ্টির বিচারে এটি ছিল ইসলামের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিজয়।

১. প্রেক্ষাপট ও বাইয়াতে রিদওয়ান

রাসুলুল্লাহ (সা.) ১৪০০ সাহাবীকে সাথে নিয়ে উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাঁদের সাথে কোনো যুদ্ধের অস্ত্র ছিল না, কেবল কুরবানির পশু ও আত্মরক্ষার তলোয়ার ছিল। কুরাইশরা তাঁদের মক্কায় প্রবেশে বাধা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) আলোচনার জন্য হযরত উসমান (রা.)-কে দূত হিসেবে মক্কায় পাঠান। কিন্তু মক্কায় রটে যায় যে উসমান (রা.)-কে কাফেররা হত্যা করেছে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি বাবলা গাছের নিচে সাহাবীদের নিকট থেকে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেন, যা ইতিহাসে ‘বাইয়াতে রিদওয়ান’ (بيعة الرضوان) নামে খ্যাত। আল্লাহ এই সাহাবীদের ওপর সন্তুষ্টির ঘোষণা দেন (সূরা ফাতহ: ১৮)।

২. হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রধান প্রধান শর্তাবলি (شروط الصلح)

কুরাইশদের পক্ষে সুহাইল ইবনে আমর সন্ধির দূত হয়ে আসে। দীর্ঘ আলোচনার পর নিম্নোক্ত শর্তে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়:

  1. মুসলমানগণ এ বছর উমরাহ না করেই ফিরে যাবেন এবং আগামী বছর মাত্র তিন দিনের জন্য এসে উমরাহ পালন করতে পারবেন।
  2. উভয় পক্ষের মধ্যে আগামী ১০ বছর যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
  3. আরবের যে কোনো গোত্র মুসলমানদের সাথে কিংবা কুরাইশদের সাথে যার ইচ্ছা স্বাধীনভাবে মিত্রতা চুক্তি করতে পারবে (বনু খোজাআ মুসলমানদের সাথে এবং বনু বকর কুরাইশদের সাথে সন্ধি করে)।
  4. মক্কার কোনো লোক যদি অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় আশ্রয় নেয়, তবে মদিনা কর্তৃপক্ষ তাকে মক্কায় ফেরত পাঠাতে বাধ্য থাকবে; কিন্তু মদিনার কোনো মুসলিম মুরতাদ হয়ে মক্কায় চলে গেলে কুরাইশরা তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে না।

৩. সাহাবায়ে কিরামের ক্ষোভ ও হযরত উমর (রা.)-এর ভূমিকা

চুক্তির চতুর্থ শর্তটি স্পষ্টত অসম মনে হওয়ায় বীর সাহাবী হযরত উমর (রা.) অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন: “হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কি সত্যের ওপর নই আর তারা কি বাতিলের ওপর নয়? তবে কেন আমরা দ্বীনের ব্যাপারে এই হীনতা মেনে নেব?” রাসুলুল্লাহ (সা.) শান্তকণ্ঠে উত্তর দিলেন: “إني رسول الله، ولست أعصيه، وهو ناصري” (আমি আল্লাহর রাসুল, আমি তাঁর অবাধ্য হতে পারি না এবং তিনিই আমার সাহায্যকারী)। পরবর্তীতে আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-ও উমর (রা.)-কে একই উত্তর দেন। চুক্তি চলাকালেই সুহাইল ইবনে আমরের নির্যাতিত পুত্র আবু জান্দাল শিকল পরা অবস্থায় এসে সাহায্য চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) চুক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাঁকে ধৈর্য ধারণ করতে বলে ফেরত দেন।

৪. কেন কুরআন একে ‘ফাতহুম মুবীন’ (সুস্পষ্ট বিজয়) আখ্যা দিল?

হুদায়বিয়া থেকে মদিনায় ফেরার পথে আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-ফাতহ নাযিল করেন: “إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا” (নিশ্চয়ই আমি আপনার জন্য এক সুস্পষ্ট বিজয় উন্মুক্ত করে দিয়েছি – সূরা ফাতহ: ১)। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন: “হে আল্লাহর রাসুল! এটি কি বিজয়?” তিনি বললেন: “হ্যাঁ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, এটিই নিশ্চিত বিজয়।” একে ‘ফাতহুম মুবীন’ বলার কারণসমূহ:

  • ১. মুসলিম রাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্বীকৃতি: ইতিপূর্বে কুরাইশরা মুসলমানদের একটি বিদ্রোহী দল মনে করত। কিন্তু হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে তারা মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রকে একটি সার্বভৌম সমমর্যাদাসম্পন্ন শক্তি হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল।
  • ২. ইসলাম প্রচারের অবাধ সুযোগ ও পরিবেশ: দশ বছরের যুদ্ধবিরতির ফলে দীর্ঘদিনের শত্রুতার অবসান ঘটে। মানুষ নির্ভয়ে একে অপরের সাথে মেলামেশা শুরু করে। মক্কার কাফেররা মদিনায় আসত এবং সাহাবীদের অনুপম চরিত্র, লেনদেন ও তাহাজ্জুদ প্রত্যক্ষ করত। ইসলামের সৌন্দর্য মানুষের সামনে সরাসরি উদ্ভাসিত হয়।
  • ৩. অবিশ্বাস্য গতিতে ইসলাম গ্রহণ: ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম ও যুহরী উল্লেখ করেন, ইসলামের সূচনা থেকে হুদায়বিয়া পর্যন্ত (১৯ বছরে) যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল, হুদায়বিয়ার পরবর্তী মাত্র দুই বছরে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। খালেদ বিন ওলীদ ও আমর ইবনুল আসের মতো দিগ্বিজয়ী বীর সেনাপতিগণ এই সময়েই ইসলাম গ্রহণ করেন।
  • ৪. আন্তর্জাতিক দাওয়াতের সূচনা: এই শান্তির সুযোগেই রাসুলুল্লাহ (সা.) রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস, পারস্যের খসরু, মিসরের মুকাওকিস এবং আবিসিনিয়ার নাজ্জাশীর নিকট ঐতিহাসিক ইসলামি দাওয়াতনামা প্রেরণ করেন।
  • ৫. ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের সোপান: এই চুক্তির বদৌলতেই মাত্র দুই বছর পর রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো রক্তপাত ছাড়াই দশ হাজার সাহাবীর এক বিশাল কাফেলা নিয়ে বিজয়ী বেশে পবিত্র মক্কা জয় করতে সক্ষম হন।

উপসংহার

হুদায়বিয়ার সন্ধি প্রমাণ করে যে, তরবারির ঝনঝনানির চেয়ে দূরদর্শী কূটনৈতিক শান্তিচুক্তি ও ধৈর্য ইসলামের প্রসারে বহুগুণ বেশি কার্যকর ও ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে পারে।


٦. اكتب عن فتح مكة المكرمة: أسبابه وموقف النبى صلى الله عليه وسلم الكريم من قريش ونتائجه العظيمة-

[৬. ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়: এর কারণ, কুরাইশদের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অতুলনীয় ক্ষমা ও মহানুভবতা এবং এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

অষ্টম হিজরীর ২০শে রমজানুল মুবারক সংঘটিত হয় ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় ও রক্তপাতহীন বিজয়—’ফাতহু মাক্কাহ’ (فتح مكة)। যে পবিত্র নগরী থেকে একদা রাতের আঁধারে মানবতার মুক্তির দূতকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, আট বছর পর সেই নগরীতেই তিনি প্রবেশ করলেন বিজয়ী সম্রাট হিসেবে; তবে অহংকারের সাথে নয়, বরং আল্লাহর দরবারে পরম বিনম্রতায় মস্তক অবনত করে।

১. মক্কা বিজয়ের কারণ ও পটভূমি (الأسباب)

  • হুদায়বিয়ার চুক্তি ভঙ্গ: হুদায়বিয়ার চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আরবের বনু খুজাআ গোত্র মুসলমানদের সাথে এবং বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সাথে মিত্রতায় আবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু বনু বকর কুরাইশদের প্ররোচনায় হরম শরীফের পবিত্র সীমানার ভেতরে রাতের অন্ধকারে বনু খুজাআ গোত্রের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। কুরাইশরা গোপনে বনু বকরকে অস্ত্র ও সেনা দিয়ে সাহায্য করে সরাসরি হুদায়বিয়ার চুক্তি ভঙ্গ করে।
  • রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আল্টিমেটাম: বনু খুজাআ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করলে তিনি কুরাইশদের কাছে তিনটি শর্ত পাঠিয়ে একটি বেছে নিতে বলেন: (১) নিহতদের রক্তপণ দিতে হবে, (২) বনু বকরের সাথে মৈত্রী বাতিল করতে হবে, অথবা (৩) হুদায়বিয়ার চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে। দাম্ভিক কুরাইশরা চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয়। পরে আবু সুফিয়ান অনুতপ্ত হয়ে চুক্তি নবায়নের জন্য মদিনায় আসলেও রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো সমঝোতায় যাননি।

২. মক্কার পথে মহাযাত্রা

৮ম হিজরীর ১০ই রমজান রাসুলুল্লাহ (সা.) ১০,০০০ বীর সাহাবীর এক সুশৃঙ্খল বাহিনী নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। মক্কার উপকণ্ঠে ‘মাররুয যাহরান’ নামক স্থানে মুসলিম বাহিনী তাঁবু স্থাপন করে এবং রাতে প্রত্যেকে আলাদা আলাদা আগুন প্রজ্বলন করে। এই বিশাল দৃশ্য দেখে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা.)-এর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে।

৩. রক্তপাতহীন বিজয় ও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা (العفو العام)

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর বাহিনীকে চারটি ভাগে বিভক্ত করে চারদিক দিয়ে মক্কায় প্রবেশের নির্দেশ দেন এবং ঘোষণা করেন যে, কোনো প্রকার রক্তপাত বা বাড়াবাড়ি করা যাবে না। কেবল খালেদ বিন ওলীদের বহরে ইকরামা ও সুহাইলের কিছু লোক আক্রমণ করলে সামান্য সংঘর্ষে কাফেরদের ১২ জন মারা যায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সওয়ারী কাসওয়ার পিঠে আরোহণ করে বিনম্রচিত্তে সূরা ফাতহ তিলাওয়াত করতে করতে মক্কায় প্রবেশ করেন। বিনয়ের আতিশয্যে তাঁর মস্তক মোবারক সওয়ারীর পিঠের সাথে প্রায় লেগে যাচ্ছিল। তিনি কাবার চত্বরে এসে মূর্তিসমূহকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে ভেঙে ফেলেন এবং ঘোষণা করেন: “جَاءَ الحَقُّ وَزَهَقَ البَاطِلُ إِنَّ البَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا” (সত্য সমাগত এবং মিথ্যা বিলুপ্ত, নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল – সূরা বনী ইসরাঈল: ৮১)।

৪. কুরাইশদের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নজিরবিহীন মহানুভবতা

মক্কার কুরাইশরা—যারা দীর্ঘ ২১ বছর ধরে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছিল, যারা সুমাইয়া ও ইয়াসিরকে হত্যা করেছিল, নবীজীর গায়ে উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দিয়েছিল এবং বারবার হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল—আজ তারা কাবার চত্বরে অপরাধীর মতো মাথা নত করে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন:

“يا معشر قريش، ما ترون أني فاعل بكم؟”
(হে কুরাইশমণ্ডলী! তোমরা আজ আমার কাছে কেমন আচরণ প্রত্যাশা কর?)

তারা কুণ্ঠিত কণ্ঠে বলল: “خيرا، أخ كريم وابن أخ كريم” (আমরা আপনার কাছে উত্তম আচরণ আশা করি, আপনি তো উদার ও মহান ভাই এবং মহান ভাইয়ের সুযোগ্য পুত্র)।

তখন রহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ (সা.) পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে বললেন:

“لا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ، يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ، اذْهَبُوا فَأَنْتُمُ الطُّلَقَاءُ”
(আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ বা প্রতিশোধ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন, তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। যাও, তোমরা সবাই চিরদিনের জন্য মুক্ত ও স্বাধীন! – সুনানে বায়হাকী)।

৫. মক্কা বিজয়ের সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক ফলাফল

  • শিরকের চির অবসান: পবিত্র কাবা গৃহ ৩৬০টি মূর্তির পঙ্কিলতা থেকে চিরদিনের জন্য মুক্ত হয়ে তাওহীদের চিরন্তন মিনারে পরিণত হয়। হযরত বিলাল (রা.) কাবার ছাদে উঠে বিজয়ের আযান প্রদান করেন।
  • আরব উপদ্বীপে ইসলাম কবুল করার মহাবিপ্লব: মক্কা বিজয়ের পর কুরাইশদের দেখাদেখি আরবের দূর-দূরান্তের শত শত গোত্র দলবেঁধে ইসলাম গ্রহণ করতে মদিনায় ছুটে আসে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا” (সূরা আন-নাসর: ২)।
  • একক মুসলিম উম্মাহ ও সংহতি: আরবের শতধা বিভক্ত গোত্রগুলো বিলুপ্ত হয়ে এক অভিন্ন ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মুসলিম উম্মাহে রূপান্তরিত হয়।

উপসংহার

মক্কা বিজয় ছিল মানবিক উদারতা, ন্যায়পরায়ণতা ও ক্ষমার এমন এক অনন্য নিদর্শন, যা শত্রুর হৃদয় জয় করে মানবজাতিকে সত্যের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় দিয়েছিল।


খ বিভাগ (القسم الثاني) – পূর্ণাঙ্গ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন সমাধান

٧. اكتب نبذة عن حادثة شق الصدر الشريف وأبعادها الروحية-

[৭. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্ষ বিদারণের ঘটনা ও এর আত্মিক তাৎপর্য সংক্ষেপে লেখ।]

উত্তর:

ঘটনার বিবরণ: শৈশবে বনু সা’দ গোত্রে থাকাকালে চার বা পাঁচ বছর বয়সে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বক্ষ মোবারক বিদারণের ঘটনা ঘটে। হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের সাথে খেলছিলেন, এমন সময় জিবরাঈল (আ.) এসে তাঁকে শুইয়ে দিয়ে তাঁর বক্ষ বিদারণ করেন এবং তাঁর পবিত্র কলব বের করেন। অতঃপর তা থেকে একটি কালো রক্তের টুকরো বের করে ফেলে দিয়ে বলেন: “এটি আপনার মধ্যে শয়তানের অংশ ছিল।” এরপর একটি সোনার তশতরিতে জমজমের পানি দিয়ে তাঁর কলব ধৌত করে পুনরায় যথাস্থানে স্থাপন করে বক্ষ জোড়া লাগিয়ে দেন (সহীহ মুসলিম)।

আধ্যাত্মিক তাৎপর্য: এই অলৌকিক ঘটনার মূল উদ্দেশ্য ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে শৈশব থেকেই নিষ্পাপ (মা’সূম) রাখা, শয়তানের যে কোনো ধরনের প্ররোচনা থেকে চিরতরে মুক্ত করা এবং ভবিষ্যতের ওহী ও নবুওয়াতের সুবিশাল গুরুভার বহনের জন্য তাঁর হৃদয়কে পবিত্রতা, হিকমত ও রূহানী নূরে পরিপূর্ণ করা।


٨. اكتب نبذة عن تجارة النبى صلى الله عليه وسلم لمال خديجة رضى الله عنها وزواجه منها-

[৮. হযরত খাদিজা রা.-এর বাণিজ্য পরিচালনা ও তাঁর সাথে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শুভ বিবাহ সংক্ষেপে আলোচনা কর।]

উত্তর:

বাণিজ্য পরিচালনা: মক্কার সম্ভ্রান্ত, ধনবতী ও পুণ্যবতী নারী খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সততা ও বিশ্বস্ততার কথা শুনে তাঁর বাণিজ্য পরিচালনার প্রস্তাব দেন। ২৫ বছর বয়সে রাসুলুল্লাহ (সা.) খাদিজা (রা.)-এর দাস মায়সারাকে সাথে নিয়ে সিরিয়ায় বাণিজ্য সফরে যান। মায়সারা লক্ষ্য করেন যে, পথে একখণ্ড মেঘ নবীজীর ওপর ছায়া দিচ্ছে এবং বাণিজ্যে দ্বিগুণ মুনাফা অর্জিত হয়।

শুভ বিবাহ: মায়সারার নিকট মুহাম্মদ (সা.)-এর অসাধারণ আমানতদারী, সত্যবাদিতা ও অনুপম চরিত্রের বিবরণ শুনে মুগ্ধ হয়ে খাদিজা (রা.) তাঁর বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনাব্বিহের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। উভয় পরিবারের সম্মতিতে ২৫ বছর বয়সী মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে ৪০ বছর বয়সী খাদিজা (রা.)-এর শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিয়ের মোহরানা ছিল ৫০০ দিরহাম। খাদিজা (রা.) ছিলেন নবীজীর প্রথম স্ত্রী, এবং তাঁর জীবদ্দশায় নবীজী অন্য কোনো বিবাহ করেননি।


٩. تحدث بإيجاز عن حجة الوداع وخطبتها التاريخية الخالدة-

[৯. বিদায় হজ্জ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐতিহাসিক কালজয়ী ভাষণ সংক্ষেপে আলোচনা কর।]

উত্তর:

দশম হিজরীতে রাসুলুল্লাহ (সা.) সোয়া লক্ষ সাহাবীকে সাথে নিয়ে জীবনে প্রথম ও শেষবারের মতো যে হজ্জ আদায় করেন, তাকে ‘হাজ্জাতুল বিদা’ বা বিদায় হজ্জ বলা হয়। ৯ই জিলহজ্জ আরাফাতের ময়দানে জাবালে রহমতের পাদদেশে দাঁড়িয়ে তিনি মানবজাতির জন্য এক ঐতিহাসিক চিরন্তন ভাষণ প্রদান করেন।

ভাষণের প্রধান ঘোষণাসমূহ:

  • মানুষের জান, মাল ও ইজ্জত কাবার মতোই পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয়।
  • জাহেলিয়াত যুগের সমস্ত রক্তপাত ও প্রতিশোধ চিরতরে বাতিল করা হলো।
  • চক্রবৃদ্ধি সুদের সমস্ত লেনদেন নিষিদ্ধ ও রহিত করা হলো (প্রথমেই চাচা আব্বাসের সুদ মাফ করা হয়)।
  • নারীদের অধিকার রক্ষা ও তাদের সাথে সদয় ব্যবহারের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
  • বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের অবসান ঘটিয়ে ঘোষণা করা হয়: আরবের ওপর অনারবের এবং অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; একমাত্র তাকওয়াই শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড।
  • তিনি উম্মাহর জন্য দুটি জিনিস রেখে যান: আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের সুন্নাহ।

١٠. اكتب نبذة موجزة عن مرض النبى صلى الله عليه وسلم ووفاته الشريفة-

[১০. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসুস্থতা ও ওফাত সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা কর।]

উত্তর:

একাদশ হিজরীর সফর মাসের শেষদিকে জান্নাতুল বাক্বী জিয়ারতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হন। তিনি সকল স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)-এর হুজরায় অবস্থান গ্রহণ করেন। অসুস্থতা বৃদ্ধি পেলে তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে জামাতে নামাযের ইমামতি করার নির্দেশ দেন।

১১ হিজরীর ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার চাশতের সময় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর শেষ অসিয়ত ছিল: “الصَّلاةَ الصَّلاةَ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ” (সালাতের ব্যাপারে সতর্ক থাক এবং অধীনস্থ দাস-দাসীদের প্রতি যত্নবান হও)। তাঁর শেষ উচ্চারিত কথা ছিল: “بَلِ الرَّفِيقَ الأَعْلَى” (বরং আমি ঊর্ধ্বলোকের মহান বন্ধুকেই বেছে নিলাম)। হযরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরা মোবারকেই যেখানে তিনি ইন্তেকাল করেন, সেখানেই সাহাবীগণ তাঁকে দাফন করেন।


١١. اكتب عن خصائص الرسول صلى الله عليه وسلم وأخلاقه وشمائله الكريمة-

[১১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুপম চরিত্র ও শামায়েল সংক্ষেপে লেখ।]

উত্তর:

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ ও চরিত্রের পূর্ণাঙ্গ প্রতীক। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: “وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ” (নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের সর্বোচ্চ চূড়ায় অধিষ্ঠিত – সূরা আল-কলম: ৪)। হযরত আয়েশা (রা.)-কে তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: “كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ” (পবিত্র কুরআনই ছিল তাঁর জীবন্ত চরিত্র)।

তিনি ছিলেন পরম সত্যবাদী, আমানতদার, বিনম্র, দয়ালু ও দানশীল। তিনি কখনো নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে কারো ওপর প্রতিশোধ নেননি। ইয়াতীম, বিধবা ও মেসকিনদের আশ্রয় দিতেন। ছোটদের পরম স্নেহ করতেন এবং বড়দের যথাযথ সম্মান করতেন। শত্রুদের শত নির্যাতনেও তিনি তাদের জন্য হেদায়াতের দোয়া করতেন।


١٢. بيّن موقف النبى صلى الله عليه وسلم من أهل الذمة والمواطنين غير المسلمين فى وثيقة المدينة-

[১২. মদিনা সনদে অমুসলিম নাগরিক ও আহলে যিম্মাদের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নীতি ও অবস্থান ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর:

মদিনায় হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার ইহুদি গোত্রসমূহের (বনু কাইনুকা, বনু নাযীর, বনু কুরাইযা) সাথে ঐতিহাসিক ‘মদিনা সনদ’ সম্পাদন করেন। এই সনদে অমুসলিমদের মৌলিক মানবাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।

সনদের প্রধান ধারাসমূহ:

  • ইহুদিরা মুসলমানদের সাথে একটি একক রাজনৈতিক জাতি (উম্মাহ) হিসেবে গণ্য হবে।
  • ইহুদিদের তাদের নিজস্ব ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে, যেমন মুসলমানদের তাদের ধর্মের স্বাধীনতা রয়েছে (لِلْيَهُودِ دِينُهُمْ وَلِلْمُسْلِمِينَ دِينُهُمْ)।
  • বহিরাগত শত্রুর আক্রমণের মুখে মুসলিম ও ইহুদি যৌথভাবে মদিনা রক্ষা করবে এবং প্রতিরক্ষা খরচ উভয় পক্ষ বহন করবে।
  • মুসলিম ও অমুসলিম সকলেই সমান নাগরিক অধিকার ও আইনি সুবিচার ভোগ করবে; কোনো নির্দোষ অমুসলিমের ওপর অবিচার করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের ওপর অত্যাচার করবে, কিয়ামতের দিন আমি স্বয়ং তার বিরুদ্ধে বাদী হব” (সুনানে আবু দাউদ)।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. আস-সিরাতুন্নাবাবিয়্যাহ বিষয়ের মূল গুরুত্ব কী?

মানবজাতির সর্বোত্তম আদর্শ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনচরিত, নবুওয়াতের আন্দোলন, যুদ্ধনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার অনুপম আদর্শ বিস্তারিতভাবে উপলব্ধি করাই এ বিষয়ের মূল লক্ষ্য।

২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শুভ জন্ম কোন সনে হয়েছিল?

তিনি ঐতিহাসিক হস্তীবর্ষে ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার সুবহে সাদেকের সময় মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।

৩. মদিনা হিজরতের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) কোন গুহায় অবস্থান করেছিলেন?

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে সাথে নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কার দক্ষিণে অবস্থিত ‘সাওর পর্বতের গুহায়’ (غار ثور) তিন দিন অবস্থান করেছিলেন।

৪. বদর যুদ্ধে কতজন মুসলিম ও কাফের সৈন্য ছিল?

বদর যুদ্ধে মুসলিম মুজাহিদদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন এবং কাফের কুরাইশদের সুসজ্জিত সেনাদল ছিল প্রায় ১,০০০ জনের।

৫. পবিত্র কুরআনে কোন ঘটনাকে ‘ফাতহুম মুবীন’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে?

ষষ্ঠ হিজরীতে সম্পাদিত ঐতিহাসিক ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’-কে পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ফাতহে ‘ফাতহুম মুবীন’ (সুস্পষ্ট বিজয়) আখ্যায়িত করা হয়েছে।

৬. মক্কা বিজয়ের সময় কুরাইশদের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাধারণ ক্ষমার নীতি কী ছিল?

তিনি কোনো প্রতিশোধ না নিয়ে কুরাইশদের প্রতি ঘোষণা করেন: “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই, যাও তোমরা সবাই মুক্ত ও স্বাধীন।”

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *