ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ (As-Sirah An-Nabawiyyah)
বিষয় কোড: ২০২২০৪
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ক বিভাগ (القسم الأول) – পূর্ণাঙ্গ প্রশ্ন সমাধান
١. اكتب الحالات الإجتماعية والدينية والخلقية للعرب فى الأيام الجاهلية-
[১. প্রাক-ইসলামী জাহেলি যুগের আরবদের সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক অবস্থার বিবরণ দাও।]
ভূমিকা
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবের ঐতিহাসিক যুগটিকে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞতার যুগ বলা হয়। এ সময়ে আরবের রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক জীবন চরম অবক্ষয়, অবিচার ও বর্বরতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল।
১. সামাজিক অবস্থা (الحالة الاجتماعية)
- গোত্রীয় শাসন ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত: সমাজে কোনো কেন্দ্রীয় শাসন বা সংবিধান ছিল না। গোত্রীয় অন্ধ অহমিকা ও বংশমর্যাদার ভিত্তিতে সমাজ পরিচালিত হতো। তুচ্ছ কারণে যুদ্ধ লেগে যেত এবং তা যুগ যুগ ধরে চলত (যেমন বাসূস ও ফিজারের যুদ্ধ)।
- নারীর অমর্যাদা ও কন্যা সন্তান জীবন্ত প্রোথিতকরণ (وأد البنات): নারীদের ভোগের সামগ্রী ও পারিবারিক বোঝা মনে করা হতো। কন্যা সন্তান জন্ম নেওয়াকে অত্যন্ত লজ্জাজনক বিবেচনা করে অনেকে নিষ্পাপ কন্যা শিশুকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলত। আল-কোরআনে ইরশাদ হয়েছে: “وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ” (আর যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?)।
- দাসপ্রথা ও অমানবিক শোষণ: দাস-দাসীদের কোনো মানবিক অধিকার ছিল না। মালিকরা তাদের ওপর পশুর মতো নির্যাতন চালাত এবং তাদের কেনাবেচা করত।
২. ধর্মীয় অবস্থা (الحالة الدينية)
- মূর্তি পূজা ও বহু ঈশ্বরবাদ: হযরত ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর তাওহীদি ধর্ম বিস্মৃত হয়ে আরবরা ঘোর মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়। আমর ইবনে লুহাই আল-খুজায়ী প্রথম সিরিয়া থেকে আরবে মূর্তি নিয়ে আসে। পবিত্র কাবা ঘরে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল (যেমন লাত, মানাত, উযযা, হুবাল)।
- ভাগ্য গণনা ও কুসংস্কার: তির নিক্ষেপ (আযলাম), গণক ও জ্যোতিষীদের ওপর নির্ভর করে শুভ-অশুভ নির্ধারণ করত। জিন, ভূত ও প্রেতাত্মার পূজা করত।
৩. নৈতিক ও চারিত্রিক অবস্থা (الحالة الخلقية)
- চারিত্রিক অবক্ষয়: মদ পান, জুয়া খেলা, ব্যভিচার, ডাকাতি, সুদ ও অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ ছিল নিত্যদিনের বিষয়। তাদের কবিতা ও সাহিত্যে নির্লজ্জতার প্রতিফলন ঘটত।
- ইতিবাচক গুণাবলি: অন্ধকারের মধ্যেও তাদের মাঝে কিছু সহজাত প্রশংসনীয় গুণাবলি ছিল—যেমন অনন্য মেহমানদারী, সাহসিকতা, অঙ্গীকার রক্ষা ও অসাধারণ কাব্যপ্রতিভা।
উপসংহার
এই ঘোর অন্ধকার যুগে মানবজাতিকে মুক্তি দিতে এবং জাহেলিয়াতের আবর্জনা দূর করতেই আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সিরাজাম মুনীরা বা আলোকোজ্জ্বল প্রদীপ হিসেবে প্রেরণ করেন।
٢. ماذا تفهم عن الهجرة؟ اكتب أسباب هجرة النبى صلى الله عليه وسلم من مكة إلى المدينة ونتائجها بالتفصيل-
[২. হিজরত বলতে কী বোঝ? মক্কা থেকে মদিনায় নবী করীম (সা.)-এর হিজরতের কারণ ও ফলাফল বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসে ৬২২ খ্রিস্টাব্দের হিজরত কোনো পলায়ন নয়, বরং বিশ্বজয়ী বিপ্লবের কৌশলগত সূচনা। মক্কার নিপীড়িত অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে মদিনায় একটি সার্বভৌমিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক বাঁক হলো হিজরত।
১. হিজরত (الهجرة)-এর পরিচয়
আভিধানিক অর্থ: ত্যাগ করা, সম্পর্ক ছিন্ন করা বা এক স্থান হতে অন্য স্থানে প্রস্থান করা।
পারিভাষিক অর্থ: দ্বীন ও ঈমান রক্ষার উদ্দেশ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের মাতৃভূমি ত্যাগ করে অন্য কোনো নিরাপদ অঞ্চলে গমন করাকে হিজরত বলে। পারিভাষিক অর্থে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবীগণের মক্কা থেকে ইয়াসরিবে (মদিনা) হিজরত করাকে বোঝায়।
২. হিজরতের প্রধান কারণসমূহ (أسباب الهجرة)
- কুরাইশদের অমানুষিক নির্যাতন ও বয়কট: প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার পর কুরাইশরা মুসলমানদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালায়। শিয়াবে আবি তালিবে তিন বছর অবরুদ্ধ করে রাখে।
- আশ্রয়হীনতা (আমুল হুযন): নবুওয়তের দশম বর্ষে রাসুল (সা.)-এর পরম আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিব এবং প্রিয় সহধর্মিণী হযরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর কুরাইশদের অত্যাচারের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায়।
- তায়েফবাসীর নির্মম প্রত্যাখ্যান: তায়েফে দাওয়াত দিতে গেলে তারা গুন্ডাবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে রাসুল (সা.)-কে রক্তাক্ত করে।
- মদিনাবাসীর আহ্বান ও আক্বাবার শপথ: প্রথম ও দ্বিতীয় আক্বাবার শপথে মদিনার আওস ও খাজরাজ গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে এবং রাসুল (সা.)-কে মদিনায় আসার আন্তরিক আমন্ত্রণ জানায় ও জান-মাল দিয়ে রক্ষার অঙ্গীকার করে।
- রাসুল (সা.)-কে হত্যার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র: দারুন নদওয়ায় আবু জাহেল ও কুরাইশ নেতারা রাসুল (সা.)-কে হত্যার সম্মিলিত নীল নকশা তৈরি করে। তখনই আল্লাহর পক্ষ থেকে হিজরতের চূড়ান্ত নির্দেশ আসে।
৩. হিজরতের সুদূরপ্রসারী ফলাফল (نتائج الهجرة)
- প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা: মদিনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং তিনি এর রাষ্ট্রনায়ক নির্বাচিত হন।
- মদিনা সনদ (دستور المدينة) প্রণয়ন: বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান রচিত হয় যা বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মাঝে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করে।
- আনসার ও মুহাজিরদের অপূর্ব ভ্রাতৃত্ব (المؤاخاة): দুনিয়ার ইতিহাসে ত্যাগের এক অনন্য নজির সৃষ্টি হয় যেখানে আনসারগণ নিজেদের সম্পদ মুহাজিরদের সাথে ভাগ করে নেন।
- বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচারের সুযোগ: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে আরব উপদ্বীপ ও বহিঃবিশ্বে ইসলামের দাওয়াত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
- হিজরি সনের প্রবর্তন: হযরত উমর (রা.)-এর যুগে এই মহিমান্বিত ঘটনা থেকেই ইসলামের চিরন্তন হিজরি পঞ্জিকার গণনা শুরু হয়।
٣. تحدث عن غزوة أحد ونتائجها ثم اذكر العبر التى تعلمها المسلمون من هذه الغزوة-
[৩. উহুদ যুদ্ধ ও এর ফলাফল আলোচনা কর এবং এ যুদ্ধ থেকে মুসলমানরা কী কী শিক্ষা লাভ করেছিল তা বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
৩য় হিজরির শাওয়াল মাসে ঐতিহাসিক উহুদ পাহাড়ে কুরাইশ ও মুসলমানদের মাঝে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয় তা ইসলামের ইতিহাসে এক অত্যন্ত শিক্ষণীয় ও নাটকীয় অধ্যায়।
১. উহুদ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও ঘটনাপ্রবাহ
বদর যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ এবং সিরিয়াগামী বাণিজ্যিক পথ নিরাপদ করার উদ্দেশ্যে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে তিন হাজার সুসজ্জিত সৈন্য নিয়ে মক্কার কাফেররা মদিনা আক্রমণ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক হাজার সাহাবী নিয়ে বের হন, পথিমধ্যে মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তিনশত সঙ্গী নিয়ে কেটে পড়ে। ফলে মাত্র সাতশত সাহাবী নিয়ে রাসুল (সা.) উহুদের পাদদেশে অবস্থান নেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর নেতৃত্বে ৫০ জন তীরন্দাজকে ‘আইনাইন’ গিরিপথে মোতায়েন করেন এবং নির্দেশ দেন: “আমরা জয়ী হই বা পরাজিত হই, কোনো অবস্থাতেই তোমরা এ স্থান ত্যাগ করবে না।”
যুদ্ধের প্রথমার্ধে মুসলিমরা প্রচণ্ড বীরত্ব দেখিয়ে কাফেরদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। কিন্তু কাফেরদের ফেলে যাওয়া গনীমতের মাল সংগ্রহ করতে দেখে গিরিপথের অধিকাংশ তীরন্দাজ রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ অমান্য করে পাহাড় থেকে নেমে আসে। এই সুযোগে খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে কাফের অশ্বারোহী বাহিনী পেছন থেকে অতর্কিত হামলা চালায়। ফলে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। ৭০ জন বিশিষ্ট সাহাবী শাহাদাতবরণ করেন (যার মধ্যে সাইয়্যিদুশ শুহাদা হযরত হামযাহ ও মুসআব ইবনে উমাইর রা. ছিলেন)। স্বয়ং রাসুল (সা.) মারাত্মক আহত হন এবং তাঁর দানদান মুবারক শহীদ হয়।
২. যুদ্ধের ফলাফল ও মুসলিমদের শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ (العبر والعظات)
- নেতার নির্দেশের আনুগত্যের গুরুত্ব (وجوب طاعة القائد): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামান্য নির্দেশ অমান্য করার কারণেই নিশ্চিত বিজয় হাতছাড়া হয়ে বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছিল। এর মাধ্যমে উম্মত শিখল যে আমীরের আনুগত্য কত অপরিহার্য।
- দুনিয়ার মোহ বর্জন: গনীমতের সামান্য সম্পদের মোহই বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। আল-কোরআনে ইরশাদ হয়েছে: “مِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الْآخِرَةَ” (তোমাদের মধ্যে কেউ দুনিয়া চায়, আবার কেউ আখিরাত চায়)।
- ঈমানের খাঁটি পরীক্ষা ও মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচন: পরীক্ষার মাধ্যমেই খাঁটি মুমিন ও ভণ্ড মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
- ব্যক্তিপূজা নয়, আদর্শের অনুসরণ: যুদ্ধে রাসুল (সা.) নিহত হয়েছেন বলে যে গুজব রটেছিল, তখন সাহাবীদের আল্লাহ তায়ালা সতর্ক করে আয়াত নাজিল করেন: “وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ” (মুহাম্মদ তো কেবল একজন রাসুল মাত্র, তাঁর পূর্বে বহু রাসুল গত হয়েছেন)। ইসলাম কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর সাথে শেষ হয়ে যায় না।
٤. اكتب أهم الأحداث قبل مولد النبى صلى الله عليه وسلم-
[৪. নবী করীম (সা.)-এর পবিত্র বিলাদতের পূর্বে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাবলী আলোচনা কর।]
ভূমিকা
সাইয়্যিদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জন্ম কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। তাঁর আবির্ভাবের পূর্বে মহান আল্লাহ তায়ালা কুরাইশ বংশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং মক্কার নিরাপত্তায় কতিপয় অলৌকিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটিয়েছিলেন।
পবিত্র বিলাদতের পূর্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী
- পবিত্র কাবার পুনর্নির্মাণ ও কুরাইশদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা: রাসুল (সা.)-এর পূর্বপুরুষ কুসাই ইবনে কিলাব কর্তৃক মক্কার বিচ্ছিন্ন কুরাইশ গোত্রসমূহকে একত্রিত করে কাবা ঘরের ব্যবস্থাপনা সুসংহত করা।
- যমযম কূপের পুনঃখনন (حفر بئر زمزم): জুরহুম গোত্র বিলুপ্ত হওয়ার পর যমযম কূপ দীর্ঘকাল বালুর নিচে ঢাকা পড়েছিল। রাসুল (সা.)-এর দাদা হযরত আব্দুল মুত্তালিব স্বপ্নে নির্দেশ পেয়ে যমযম কূপ পুনঃখনন করে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেন, যা কুরাইশদের মাঝে তাঁর সম্মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- হযরত আব্দুল মুত্তালিবের মানত ও আব্দুল্লাহর কুরবানী (فداء عبد الله): আব্দুল মুত্তালিব মানত করেছিলেন যে তাঁর দশটি পুত্র সন্তান হলে একজনকে আল্লাহর সন্তুষ্টিতে কুরবানী করবেন। লটারিতে রাসুল (সা.)-এর পিতা হযরত আব্দুল্লাহর নাম ওঠে। পরে কুরাইশদের হস্তক্ষেপে আব্দুল্লাহর পরিবর্তে ১০০টি উট কুরবানী করে তাঁকে রক্ষা করা হয়। এজন্য নবীজী (সা.) বলতেন: “أَنَا ابْنُ الذَّبِيحَيْنِ” (আমি দুই কুরবানীকৃত ব্যক্তির সন্তান—ইসমাঈল ও আব্দুল্লাহ)।
- ঐতিহাসিক হস্তী বাহিনীর ঘটনা (حادثة أصحاب الفيل): ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে রাসুল (সা.)-এর জন্মের মাত্র ৫০ বা ৫৫ দিন পূর্বে ইয়েমেনের হাবশী শাসক আবরাহা কাবার ধ্বংসের উদ্দেশ্যে বিশাল হস্তী বাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণ করে। মহান আল্লাহ তায়ালা ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল পাখি প্রেরণ করে পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে শক্তিশালী আবরাহার বাহিনীকে চর্বিত ঘাসের ন্যায় ধ্বংস করে দেন (সূরা ফীল)। এ বছরটি আরবে ‘আমুল ফীল’ (হস্তী বর্ষ) নামে পরিচিত হয়।
- পিতা আব্দুল্লাহর ইন্তেকাল: রাসুল (সা.) তখনও মায়ের গর্ভে। পিতা আব্দুল্লাহ ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া গিয়ে ফেরার পথে মদিনায় অসুস্থ হয়ে মাত্র ২৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ফলে বিশ্বনবী পিতৃহীন এতিম হিসেবে পৃথিবীতে আগমন করেন।
٥. بيعة العقبة ما هى؟ وكم مرة وقعت؟ تحدث عمن شارك فيها مع نتائجها-
[৫. বাইয়াতে আক্বাবাহ কী? ইহা কতবার অনুষ্ঠিত হয়েছিল? এতে অংশগ্রহণকারী এবং এর ফলাফল আলোচনা কর।]
১. বাইয়াতে আক্বাবাহর পরিচয় ও সংখ্যা
মক্কার নিকটবর্তী মিনা প্রাঙ্গণে অবস্থিত ‘আক্বাবাহ’ নামক সংকীর্ণ গিরিপথে মদিনার (তৎকালীন ইয়াসরিব) অধিবাসীগণ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে যে ঐতিহাসিক আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছিলেন, তাকে ‘বাইয়াতে আক্বাবাহ’ বলা হয়। এটি দুইবার সংঘটিত হয়েছিল।
২. ১ম ও ২য় বাইয়াতে আক্বাবাহর বিবরণ
- প্রথম বাইয়াতে আক্বাবাহ (নবুওয়তের ১২শ বর্ষ / ৬২১ খ্রি.):
- অংশগ্রহণকারী: মদিনার ১২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি (আওস গোত্রের ২ জন ও খাজরাজ গোত্রের ১০ জন)। তাদের মধ্যে আস’আদ ইবনে যুরারাহ অন্যতম ছিলেন।
- শপথের বিষয়: এটি ছিল মূলত ধর্মীয় ও নৈতিক আনুগত্যের শপথ। শিরক না করা, চুরি না করা, ব্যভিচার না করা, সন্তান হত্যা না করা, অপবাদ না দেওয়া এবং ভালো কাজে রাসুল (সা.)-এর আনুগত্য করার শপথ। এতে কোনো যুদ্ধের শর্ত ছিল না বলে একে ‘বাইয়াতুন নিসা’ (শান্তিপূর্ণ শপথ) বলা হয়।
- মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে প্রেরণ: রাসুল (সা.) মদিনায় ইসলাম প্রচার ও কোরআন শিক্ষার জন্য হযরত মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে প্রেরণ করেন। তাঁর মাধ্যমে মদিনার ঘরে ঘরে ইসলাম প্রবেশ করে।
- দ্বিতীয় বাইয়াতে আক্বাবাহ (নবুওয়তের ১৩শ বর্ষ / ৬২২ খ্রি.):
- অংশগ্রহণকারী: হজের মৌসুমে মদিনা থেকে মোট ৭৫ জন (৭৩ জন পুরুষ এবং ২ জন নারী—উম্মে আম্মারা ও উম্মে মানী) গভীর রাতে আক্বাবায় একত্রিত হন। সাথে রাসুল (সা.)-এর চাচা হযরত আব্বাস (যিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি) উপস্থিত ছিলেন।
- শপথের বিষয়: এটি ছিল জান-মাল দিয়ে রাসুল (সা.) ও ইসলামকে রক্ষা করার সামরিক ও রাজনৈতিক চুক্তি। রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরত করলে নিজেদের স্ত্রী-সন্তানের মতো তাঁকে সুরক্ষা দেওয়ার দৃঢ় শপথ গ্রহণ করা হয়।
- বারোজন নকীব নির্বাচন: মদিনার সমাজ পরিচালনার জন্য রাসুল (সা.) উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে ১২ জন প্রতিনিধি (নকীব) মনোনীত করেন।
৩. এর ঐতিহাসিক ফলাফল
বাইয়াতে আক্বাবাহই মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে এবং মুসলমানদের মদিনায় হিজরতের স্থায়ী আশ্রয় নিশ্চিত করে।
٦. تحدث عن أخلاق النبى صلى الله عليه وسلم وشمائله مفصلا-
[৬. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র চরিত্র ও শামায়েল (দৈহিক ও স্বভাবগত সৌন্দর্য) বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
মানবজাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ, পূর্ণাঙ্গ ও সর্বোত্তম আদর্শ ব্যক্তিত্ব হলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে তাঁর চরিত্রের প্রশংসা করে বলেছেন: “وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ” (নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত—সূরা আল-কলম: ৪)। হযরত আয়েশা (রা.)-কে তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: “كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ” (পবিত্র কোরআনই ছিল তাঁর বাস্তব চরিত্র)।
১. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুপম চারিত্রিক গুণাবলি (أخلاقه الكريمة)
- দয়া ও রহমত (الرحمة والرأفة): তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ (“وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ”)। শত্রুদের নির্যাতনেও তিনি কখনো বদদোয়া করেননি, বরং তায়েফে রক্তাক্ত হয়েও দোয়া করেছিলেন: “হে আল্লাহ, আমার জাতিকে ক্ষমা কর, কেননা তারা অজ্ঞ।”
- সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা (الصدق والأمانة): নবুওয়তের পূর্বেই মক্কার কাফেররা তাঁকে ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্ত) ও ‘আস-সাদিক’ (সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। চরম শত্রু আবু জাহেলও স্বীকার করেছিল যে, মুহাম্মদ কখনো মিথ্যা বলতে পারে না।
- ক্ষমাশীলতা ও উদারতা (العفو والصفح): মক্কা বিজয়ের দিন তিনি তাঁর সকল রক্তপিপাসু দুর্ধর্ষ শত্রুকে হাতের মুঠোয় পেয়েও ঘোষণা করেছিলেন: “لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ اذْهَبُوا فَأَنْتُمُ الطُّلَقَاءُ” (আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, যাও তোমরা সবাই মুক্ত)।
- বিনয় ও সাদাসিধে জীবন (التواضع والزهد): নিখিল বিশ্বের সম্রাট হওয়া সত্ত্বেও তিনি মাটিতে মাদুরে শুইতেন। নিজের জুতো নিজে সেলাই করতেন, ঘরের কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন। কোনো দিন পেট পুরে আটার রুটি খাননি।
২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দৈহিক সৌন্দর্য ও শামায়েল (شمائله الشريفة)
- তিনি অতিরিক্ত লম্বা ছিলেন না এবং খাটোও ছিলেন না, বরং মাঝারি ও আকর্ষণীয় গড়নের ছিলেন।
- তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় ছিল।
- তাঁর গায়ের রঙ ছিল ধবধবে সাদা ও লালচে আভার অপূর্ব মিশ্রণ।
- তাঁর মাথার চুল ছিল কোঁকড়ানো ও সোজা এর মাঝামাঝি, যা কান বা কাঁধ পর্যন্ত ঝুলত।
- তাঁর পবিত্র ঘাম থেকে মিশকে আম্বরের মতো সুবাস বের হতো। যে পথ দিয়ে তিনি হেঁটে যেতেন, সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ত।
٧. حجة الوداع ما هى؟ ثم بين الوصايا التى أوصى بها الرسول صلى الله عليه وسلم أمته فى حجة الوداع موجزا-
[৭. বিদায় হজ কী? অতঃপর বিদায় হজে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বীয় উম্মতকে যেসকল উপদেশ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেছিলেন তা সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
১. বিদায় হজের পরিচয়
১০ম হিজরিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবনের একমাত্র ফরজ ও অন্তিম যে হজ সম্পন্ন করেছিলেন এবং আরাফাতের ময়দানে সোয়া লক্ষাধিক সাহাবীর বিশাল সমাবেশে উম্মতকে চিরবিদায়ের বার্তা দিয়ে ঐতিহাসিক খুতবা প্রদান করেছিলেন, তাকে ‘বিদায় হজ’ (حجة الوداع) বলা হয়।
২. বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রধান প্রধান দিকনির্দেশনা (الوصايا النبوية)
- মানবাধিকার ও জান-মালের নিরাপত্তা: রাসুল (সা.) ঘোষণা করেন: “হে লোকসকল! নিশ্চয় তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্ভ্রম আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই শহরের মতোই পরস্পরের জন্য চিরতরে হারাম ও পবিত্র।”
- জাহেলি প্রথা ও রক্তের দাবি বাতিল: জাহেলিয়াতের সকল কুসংস্কার, পৌত্তলিক অহমিকা এবং রক্তের প্রতিশোধ পদদলিত করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমার পরিবারের রবীআ ইবনুল হারিসের রক্তের দাবি বাতিল করলাম।
- সুদের চূড়ান্ত উচ্ছেদ: জাহেলি যুগের সকল প্রকার সুদ নিষিদ্ধ করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমার চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সকল বকেয়া সুদ বাতিল ঘোষণা করলাম।
- নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা: “নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। কেননা তাদের তোমরা আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ। তাদের ওপর যেমন তোমাদের অধিকার আছে, তোমাদের ওপরও তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে।”
- বর্ণবাদ ও জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের অবসান: “কোনো অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; সাদার ওপর কালোর কিংবা কালোর ওপর সাদার কোনো প্রাধান্য নেই—একমাত্র তাকওয়া ছাড়া। তোমরা সবাই আদমের সন্তান, আর আদম মাটি থেকে তৈরি।”
- কোরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার তাগিদ: “আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতদিন তোমরা তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে রাখবে, ততদিন তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসুলের সুন্নাহ।”
খুতবার শেষে রাসুল (সা.) সাহাবীদের জিজ্ঞেস করেন: “আমি কি আল্লাহর দ্বীন তোমাদের নিকট পৌঁছে দিয়েছি?” সকলে একবাক্যে বললেন: “হ্যাঁ, নিশ্চয়।” তখন নবীজী আকাশে আঙুল তুলে তিনবার বললেন: “اللَّهُمَّ اشْهَدْ” (হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক)।
٨. ما معنى الجهاد لغة وشرعا؟ متى فرض الجهاد؟ وما حكمه؟ بين-
[৮. জিহাদের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? জিহাদ কখন ফরজ হয়েছিল এবং এর হুকুম কী? ব্যাখ্যা কর।]
১. জিহাদ (الجهاد)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
আভিধানিক অর্থ: ‘জিহাদ’ শব্দটি ‘জুহদ’ (الجُهْد) বা ‘জাহদ’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ সাধ্যমতো চেষ্টা করা, চরম পরিশ্রম করা বা সর্বশক্তি নিয়োগ করা।
পারিভাষিক অর্থ: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়— “بذل الجهد واستفراغ الوسع في قتال الكفار والبغاة لإعلاء كلمة الله تعالى والدفاع عن الدين والوطن” অর্থাৎ, “আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন ও কালেমাকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জান, মাল ও বাকশক্তি দিয়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোকে জিহাদ বলে।”
২. জিহাদ কখন ফরজ হয়েছিল?
মাক্কী জীবনে মুসলমানদের সশস্ত্র যুদ্ধের কোনো অনুমতি ছিল না। হিজরতের পর ২য় হিজরির সফর মাসে মহান আল্লাহ তায়ালা প্রথম আত্মরক্ষার্থে জিহাদের অনুমতি দেন। সূরা হজের ৩৯ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: “أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ” (যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো, কেননা তাদের ওপর জুলুম করা হয়েছে)। অতঃপর বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে সশস্ত্র যুদ্ধ ফরজ করা হয়।
৩. জিহাদের শরয়ী হুকুম
- ফরযে কেফায়াহ (فرض كفاية): স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে জিহাদ হলো ফরযে কেফায়াহ। অর্থাৎ মুসলিম সমাজের একদল লোক এ দায়িত্ব পালন করলে বাকিরা দায়মুক্ত হয়ে যাবে।
- ফরযে আইন (فرض عين): তবে তিনটি বিশেষ পরিস্থিতিতে জিহাদ প্রত্যেকের ওপর ফরযে আইন হয়ে যায়:
১. শত্রু যদি কোনো মুসলিম ভূখণ্ড আক্রমণ করে বসে (نفير عام)।
২. যুদ্ধের ময়দানে মুখোমুখি উপস্থিত হলে সেখান থেকে পলায়ন করা হারাম।
৩. রাষ্ট্রের বৈধ আমীর বা রাষ্ট্রপ্রধান যদি সকলকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের সাধারণ নির্দেশ দেন।
খ বিভাগ (القسم الثاني) – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (৯-১৬)
٩. تحدث عن حلف الفضول بالإيجاز-
[৯. হিলফুল ফুজুল সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বয়স যখন প্রায় ২০ বছর, তখন ফিজারের যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে জুবায়ের ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের উদ্যোগে কতিপয় বিশিষ্ট কুরাইশ নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের গৃহে সমবেত হয়ে মজলুম ও নিরপরাধ মানুষের সহায়তায় একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন। একে ‘হিলফুল ফুজুল’ বলা হয়। নবী করীম (সা.) এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। নবুওয়ত লাভের পরও তিনি বলেছিলেন: “আমি আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে এমন একটি চুক্তিতে উপস্থিত ছিলাম, যার পরিবর্তে লাল বর্ণের উট পেলেও আমি আনন্দিত হতাম না। ইসলামেও যদি কেউ আমাকে এমন চুক্তির দিকে আহ্বান করে তবে আমি সাড়া দেব।”
١٠. تحدث عن غزوة خيبر مختصرا-
[১০. খায়বার যুদ্ধ সংক্ষেপে বর্ণনা কর।]
মদিনা থেকে বনু নাযীর ও বনু কাইনুকা গোত্র বিতাড়িত হয়ে মদিনা থেকে ১০০ মাইল উত্তরে অবস্থিত সুরক্ষিত ইহুদি দুর্গ خیبر (খায়বার)-এ আশ্রয় নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অব্যাহত ষড়যন্ত্র চালাতে থাকে। ৭ম হিজরির মুহাররম মাসে রাসুল (সা.) ১৪০০ সাহাবী নিয়ে খায়বার অভিযান পরিচালনা করেন। খায়বারের দুর্গগুলো একে একে বিজিত হয়। শেষপর্যন্ত হযরত আলী (রা.)-এর অসামান্য বীরত্বে সর্বাধিক সুরক্ষিত ‘কামুস’ দুর্গ বিজিত হয় এবং ইহুদিদের ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত অবসান ঘটে।
١١. تحدث عن الهجرة إلى الحبشة بالإيجاز-
[১১. আবিসিনিয়ায় হিজরত সম্পর্কে সংক্ষেপে লিখ।]
কুরাইশদের অমানবিক নির্যাতন যখন চরম রূপ ধারণ করে, তখন নবুওয়তের ৫ম বর্ষে (৬১৫ খ্রি.) রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে আবিসিনিয়ার (বর্তমান ইথিওপিয়া) ন্যায়পরায়ণ খ্রিস্টান বাদশাহ নাজ্জাশীর নিকট হিজরত করার নির্দেশ দেন। প্রথম দফায় হযরত উসমান ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়্যাহ (নবী-কন্যা)-সহ ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী হিজরত করেন। দ্বিতীয় দফায় হযরত জাফর ইবনে আবি তালিবের নেতৃত্বে ৮৩ জন পুরুষ ও ১৯ জন নারী হিজরত করেন। বাদশাহ নাজ্জাশীর দরবারে হযরত জাফর (রা.) সূরা মারইয়ামের আয়াত তিলাওয়াত করে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেন এবং বাদশাহ তাঁদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেন।
١٢. كم قُتِلَ من الكفار في غزوة بدر؟ اكتب بعض أسمائهم المشهورة؟
[১২. বদর যুদ্ধে কতজন কাফের নিহত হয়েছিল? তাদের কয়েকজনের প্রসিদ্ধ নাম উল্লেখ কর।]
২য় হিজরির ১৭ই রমযান ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে মুসলিমদের অভাবনীয় বিজয়ের মুখে কাফেরদের ৭০ জন শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সৈন্য নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দি হয়। নিহতদের মধ্যে কুরাইশদের শীর্ষ কুখ্যাত নেতারা ছিল:
১. আবু জাহেল (আমর ইবনে হিশাম),
২. উতবা ইবনে রবীআ,
৩. শাইবা ইবনে রবীআ,
৪. উমাইয়া ইবনে খালাফ (হযরত বিলালের সাবেক অত্যাচারী মালিক),
৫. ওলীদ ইবনে উতবা,
৬. নযর ইবনুল হারিস,
৭. উকবা ইবনে আবি মুআইত।
١٣. بنو قريظة من هم؟ وماذا كانت خيانتهم مع النبى صلى الله عليه وسلم؟ وما العقوبة التى وقعت عليهم؟ بين-
[১৩. বনু কুরাইজা কারা? নবীজী (সা.)-এর সাথে তাদের বিশ্বাসঘাতকতা কী ছিল এবং তাদের ওপর কী শাস্তি আরোপিত হয়েছিল?]
পরিচয়: বনু কুরাইজা ছিল মদিনার উপকণ্ঠে বসবাসকারী একটি শক্তিশালী ইহুদি গোত্র, যারা মদিনা সনদে চুক্তিবদ্ধ ছিল।
বিশ্বাসঘাতকতা: ৫ম হিজরিতে খন্দক বা আহযাবের যুদ্ধের সময় যখন দশ হাজার কাফের মদিনা অবরোধ করে রেখেছিল, তখন বনু কুরাইজা মুসলমানদের পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার গোপন চক্রান্ত করে চুক্তি ভঙ্গ করে মক্কার কাফেরদের সাথে আঁতাত করে।
শাস্তি: খন্দক যুদ্ধ শেষে রাসুল (সা.) তাদের দুর্গ অবরোধ করেন। তারা তাদের সাবেক মিত্র হযরত সা’দ ইবনে মুআজ (রা.)-এর ফয়সালা মেনে নেওয়ার শর্তে আত্মসমর্পণ করে। হযরত সা’দ তাওরাতের বিধান অনুযায়ী ফয়সালা দেন যে, তাদের যুদ্ধক্ষম পুরুষদের হত্যা করা হবে, নারী ও শিশুদের বন্দি করা হবে এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে। এভাবেই বিশ্বাসঘাতকতার উপযুক্ত শাস্তি কার্যকর হয়।
١٤. اكتب ما تحمّل الرسول صلى الله عليه وسلم عند الجهر بالدعوة الإسلامية موجزًا-
[১৪. প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত প্রদানের পর রাসুল (সা.) কী ধরনের নির্যাতন ও কষ্ট সহ্য করেছিলেন সংক্ষেপে লিখ।]
সাফা পাহাড়ে প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়ার পর থেকেই রাসুল (সা.)-এর ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন নেমে আসে। আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মে জামিল তাঁর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখত। নামাযে সিজদারত অবস্থায় উটের নাড়িভুঁড়ি তাঁর পিঠের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো। উকবা ইবনে আবি মুআইত চাদর পেঁচিয়ে তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করে। তাঁকে পাগল, জাদুকর ও গণক বলে বিদ্রূপ করা হয়। তাঁর দুই মেয়ে রুকাইয়্যাহ ও উম্মে কুলসুমকে আবু লাহাবের ছেলেরা তালাক দেয়। অবশেষে তিন বছর শিয়াবে আবি তালিবে গাছের পাতা খেয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য করা হয়।
١٥. تحدث عن فتح مكة مختصرًا-
[১৫. ঐতিহাসিক মক্কা বিজয় সংক্ষেপে বর্ণনা কর।]
৮ম হিজরির রমযান মাসে হুদাইবিয়ার সন্ধি কুরাইশরা ভঙ্গ করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১০,০০০ সাহাবীর বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন। কুরাইশরা বিনা প্রতিরোধে আত্মসমর্পণ করে। রাসুল (সা.) অত্যন্ত বিনম্র চিত্তে আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতে করতে কাবার চত্বরে প্রবেশ করেন। তিনি কাবার ভেতরের ৩৬০টি মূর্তি নিজ লাঠি দিয়ে ভেঙে দেন এবং তিলাওয়াত করেন: “جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا” (সত্য সমাগত এবং মিথ্যা বিলুপ্ত, নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল)। তিনি কুরাইশদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
١٦. أثبت الإسراء والمعراج بالأدلة النقلية-
[১৬. অকাট্য প্রমাণের (কোরআন ও সহীহ হাদিস) আলোকে ইসরা ও মেরাজ প্রমাণ কর।]
নবুওয়তের দশম বা একাদশ বর্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সশরীরে ও জাগ্রত অবস্থায় উর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ ইসলামের এক অকাট্য মুজিযা। কোরআন ও মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা তা প্রমাণিত:
১. কোরআনের প্রমাণ (ইসরা): আল্লাহ তায়ালা বলেন: “سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا” (পবিত্র সেই সত্তা যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলা মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আকসায় ভ্রমণ করিয়েছেন—সূরা বনী ইসরাঈল: ১)।
২. কোরআনের প্রমাণ (মিরাজ): সূরা আন-নাজমে ইরশাদ হয়েছে: “وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى” (নিশ্চয় তিনি তাঁকে আরেকবার দেখেছিলেন সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে, যার নিকট জান্নাতুল মা’ওয়া অবস্থিত)।
৩. হাদিসের প্রমাণ: সহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত আনাস ও মালিক ইবনে সা’সাআ (রা.) থেকে বোরাকে আরোহণ ও সপ্তাকাশ অতিক্রমের মুতাওয়াতির হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: আইয়ামে জাহেলিয়াত বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবের অজ্ঞতা, পৌত্তলিকতা, অন্যায় ও নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত ঐতিহাসিক সময়কালকে আইয়ামে জাহেলিয়াত বলা হয়।
প্রশ্ন ২: হিজরত কত সালে সংঘটিত হয়েছিল?
উত্তর: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় ঐতিহাসিক হিজরত সম্পন্ন করেছিলেন।
প্রশ্ন ৩: উহুদ যুদ্ধে কতজন সাহাবী শাহাদাতবরণ করেছিলেন?
উত্তর: উহুদ যুদ্ধে সাইয়্যিদুশ শুহাদা হযরত হামযাহ (রা.)-সহ মোট ৭০ জন বীর সাহাবী শাহাদাতবরণ করেছিলেন।
প্রশ্ন ৪: বদর যুদ্ধে কতজন কাফের নিহত হয়?
উত্তর: ২য় হিজরির ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে আবু জাহেলসহ কাফেরদের ৭০ জন কুখ্যাত নেতা নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দি হয়।
প্রশ্ন ৫: মক্কা বিজয় কত হিজরিতে সংঘটিত হয়?
উত্তর: ৮ম হিজরির ২০ রমযান নবী করীম (সা.) দশ হাজার সাহাবী নিয়ে রক্তপাতহীনভাবে ঐতিহাসিক মক্কা বিজয় সম্পন্ন করেন।
প্রশ্ন ৬: বিদায় হজের প্রধান শিক্ষা কী ছিল?
উত্তর: বর্ণবাদ ও বংশীয় অহমিকা দূরীকরণ, নারী ও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সুদ নিষিদ্ধকরণ এবং কোরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে বিশ্ব মানবতার শান্তি নিশ্চিত করা।