ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: উলূমুল কুরআন (Ulumul Quran)
বিষয় কোড: ২০২২০৫
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ক বিভাগ (القسم الأول) – পূর্ণাঙ্গ প্রশ্ন সমাধান
١. عرف علوم القرآن، ثم بين نشأة هذا العلم وتطوره عبر القرون-
[১. উলূমুল কোরআনের পরিচয় দাও। অতঃপর যুগ পরম্পরায় এ বিজ্ঞানের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।]
ভূমিকা
পবিত্র কোরআনুল কারীম মহান আল্লাহর অবিনশ্বর বাণী। কোরআনের অর্থ, তাৎপর্য, তেলাওয়াত, শানে নুযুল, নাসিখ-মানসূখ ও সংকলন ইতিহাস সংক্রান্ত যে বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার রয়েছে, তা-ই ইসলামী পরিভাষায় ‘উলূমুল কোরআন’ নামে পরিচিত।
১. উলূমুল কোরআনের পরিচয় (تعريف علوم القرآن)
আভিধানিক বিশ্লেষণ: ‘উলূম’ (علوم) শব্দটি ‘ইলম’ (علم)-এর বহুবচন, যার অর্থ জ্ঞান বা বিদ্যা। ‘আল-কুরআন’ (القرآن) হলো আল্লাহর কালাম।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী ও আল্লামা সুয়ূতী (রহ.)-এর মতে— “هو علم يشتمل على مباحث تتعلق بالقرآن الكريم من حيث نزوله وترتيبه وجمعه وكتابته وقراءته وتفسيره وإعجازه وناسخه ومنسوخه ودفع الشبه عنه” অর্থাৎ, “যে জ্ঞানের মাধ্যমে পবিত্র কোরআনের অবতরণ, বিন্যাস, সংকলন, লিপিবদ্ধকরণ, কিরাআত, তাফসীর, অলৌকিকত্ব (ই’জায), নাসিখ-মানসূখ এবং এর ওপর আরোপিত যাবতীয় সংশয় নিরসন সংক্রান্ত বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে উলূমুল কোরআন বলে।”
২. যুগ পরম্পরায় উলূমুল কোরআনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
- নবুওয়ত ও সাহাবা যুগ (প্রাথমিক পর্ব): রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং ছিলেন কোরআনের প্রথম মুফাসসির ও ব্যাখ্যাকারী। সাহাবায়ে কিরাম (রা.) ওহী নাজিলের প্রেক্ষাপট স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন। হযরত আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং উবাই ইবনে কা’ব (রা.) কোরআনী জ্ঞানে বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। এ যুগে কোরআনী জ্ঞান মৌখিকভাবে সংরক্ষিত ছিল।
- তাবেঈ যুগ (হিজরি প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দী): তাবেঈ যুগে বিভিন্ন অঞ্চলে তাফসীর ও উলূমুল কোরআনের মারকায গড়ে ওঠে। মক্কায় ইবনে আব্বাসের শিষ্য মুজাহিদ, আতা ও ইকরামা; মদিনায় উবাই ইবনে কা’বের শিষ্য যায়েদ ইবনে আসলাম; এবং ইরাকে আলকামা ও আসওয়াদ কোরআনের পাঠদানে নেতৃত্ব দেন।
- সংকলন ও স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে বিকাশ (হিজরি তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দী): ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামার ‘ইলমুল কিরাআত’, ইমাম ফাররা ‘মাআনিল কোরআন’ এবং ইমাম তাবারী (ওফাত: ৩১০ হি.) তাঁর সুবিশাল তাফসীর সংকলন করেন। আলী ইবনুল মাদীনী রচনা করেন ‘আসবাবুন নুযুল’।
- সর্বজনীন বিশ্বকোষ সংকলনের যুগ:
- ইমাম বদরুদ্দীন যারকাশী (ওফাত: ৭৯৪ হি.) রচনা করেন উলূমুল কোরআনের অনন্য বিশ্বকোষ ‘আল-বুরহান ফী উলূমিল কোরআন’ (البرهان في علوم القرآن)।
- ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (ওফাত: ৯১১ হি.) রচনা করেন সর্বশ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘আল-ইতকান ফী উলূমিল কোরআন’ (الإتقان في علوم القرآن)।
- আধুনিক যুগে শায়খ মান্না’ আল-কাত্তানের ‘মাবাহিস ফী উলূমিল কোরআন’ এবং মুফতি তাকী উসমানীর ‘উলূমুল কোরআন’ এ শাস্ত্রকে আধুনিক গবেষকদের জন্য সহজবোধ্য করেছে।
٢. عرّف الوحى- وكم نوعا له؟ ثم بين كوائف نزوله على رسول الله صلى الله عليه وسلم مع ذكر حاجة الناس إلى الوحى-
[২. ওহীর সংজ্ঞা দাও। উহা কত প্রকার? অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর ওহী নাজিলের পদ্ধতিসমূহ আলোচনা কর এবং ওহীর প্রতি মানবজাতির প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ কর।]
১. ওহীর সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ
আভিধানিক অর্থ: গোপনে দ্রুততার সাথে কোনো সংবাদ পৌঁছে দেওয়া (الإعلام الخفي السريع)।
পারিভাষিক অর্থ: মহান আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক কোনো নবী বা রাসুলের ওপর মানবজাতির হিদায়াত ও দিকনির্দেশনার জন্য কোনো বার্তা বা বিধান প্রেরণ করাকে ওহী বলে।
প্রকারভেদ: ওহী প্রধানত দুই প্রকার:
১. ওহীয়ে মাতলু (الوحي المتلو): যে ওহীর শব্দ ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং যা সালাতে তেলাওয়াত করা হয় (যেমন পবিত্র কোরআন)।
২. ওহীয়ে গায়রে মাতলু (الوحي غير المتلو): যার অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে কিন্তু শব্দ বা ভাষা রাসুল (সা.)-এর এবং যা নামাজে তেলাওয়াত করা হয় না (যেমন হাদিস)।
২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর ওহী নাজিলের পদ্ধতিসমূহ (كيفيات نزول الوحي)
- ঘণ্টাধ্বনির ন্যায় (مثل صلصلة الجرس): এটি ছিল ওহীর সবচেয়ে কষ্টদায়ক ও ভারী পদ্ধতি। প্রচণ্ড শীতের দিনেও নবীজী (সা.) ঘেমে যেতেন এবং উটের পিঠে থাকলে উট ভার সহ্য করতে না পেরে বসে পড়ত।
- মানবরূপে ফেরেশতার আগমন: হযরত জিবরাইল (আ.) মানুষের আকৃতিতে (অধিকাংশ সময় সুদর্শন সাহাবী দাহিয়াতুল কালবী রা.-এর আকৃতিতে) এসে সরাসরি কথা বলতেন। এটি ছিল সবচেয়ে সহজ মাধ্যম।
- ফেরেশতার স্বরূপে প্রকাশ: জিবরাইল (আ.) তাঁর আসল ফেরেশতার রূপ ধারণ করে দিগন্তজোড়া ছয়শত ডানা বিস্তার করে আগমন করতেন (হেরা গুহায় ও মিরাজের রাতে)।
- সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصالحة): ঘুমে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে ওহী আসা, যা ভোরের সূর্যের মতো সত্য প্রমাণিত হতো।
- অন্তরে প্রক্ষেপণ (النفث في الروع): ফেরেশতা না দেখে রাসুল (সা.)-এর অন্তরে সরাসরি ভাব প্রবিষ্ট করে দেওয়া হতো।
- পর্দার অন্তরাল থেকে সরাসরি কথোপকথন: কোনো মাধ্যম ব্যতীত মহান আল্লাহ তায়ালার সরাসরি কথা বলা (যেমন মিরাজের রাতে)।
৩. মানবজাতির জন্য ওহীর প্রয়োজনীয়তা (حاجة الناس إلى الوحي)
মানুষের বুদ্ধি, ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও দর্শন সীমাবদ্ধ। বুদ্ধি দিয়ে ভালো-মন্দের কিছুটা পার্থক্য করা গেলেও স্রষ্টার সত্তা, পরকাল, জান্নাত-জাহান্নাম, ইবাদতের নিয়ম ও নিখুঁত ইনসাফপূর্ণ বিধান প্রণয়ন করা মানুষের বুদ্ধির বাইরে। ওহী হলো মানুষের বুদ্ধির জন্য এমন এক আলোকবর্তিকা, যেমন চোখের জন্য সূর্যের আলো। ওহী ব্যতীত মানবজাতি বিভ্রান্তির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হতে বাধ্য।
٣. ما النسخ؟ فتحدث عن أقسامه- هل يمكن وقوع النسخ فى كتاب الله؟ بين-
[৩. নাসখ কাকে বলে? এর প্রকারভেদ আলোচনা কর। আল্লাহর কিতাবে কি নাসখ সংঘটিত হওয়া সম্ভব? ব্যাখ্যা কর।]
১. নাসখ (النسخ)-এর পরিচয়
আভিধানিক অর্থ: নাসখ শব্দের অর্থ বাতিল করা (الإبطال), দূর করা (الإزالة), অথবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করা (النقل)।
পারিভাষিক অর্থ: আল্লামা যারকানী (রহ.)-এর মতে— “رفع الحكم الشرعي بدليل شرعي متأخر عنه” অর্থাৎ, “পরবর্তী কোনো শরয়ী দলিলের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কোনো শরয়ী হুকুম বা বিধান রহিত বা স্থগিত করাকে নাসখ বলে।” রহিতকারী বিধানকে ‘নাসিখ’ (الناسخ) এবং রহিতকৃত বিধানকে ‘মানসূখ’ (المنسوخ) বলা হয়।
২. কোরআনে নাসখ সংঘটিত হওয়ার যৌক্তিকতা ও প্রমাণ
জমহুর উলামায়ে কিরাম এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকিদা হলো—পবিত্র কোরআনে নাসখ সংঘটিত হওয়া সম্পূর্ণ সম্ভব (জায়েয) এবং বাস্তবেও তা সংঘটিত হয়েছে। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা কোরআনে ঘোষণা করেন: “مَا نَنْسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنْسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِنْهَا أَوْ مِثْلِهَا” (আমি কোনো আয়াত রহিত করলে কিংবা ভুলিয়ে দিলে, তার চেয়ে উত্তম কিংবা তার সমমানের আয়াত নিয়ে আসি—সূরা আল-বাক্বারাহ: ১০৬)। মানবজাতির প্রয়োজন ও সামাজিক বিবর্তনের সাথে সাথে বিধানের নমনীয়তা আল্লাহর হিকমত ও রহমতেরই বহিঃপ্রকাশ।
৩. কোরআনে নাসখের প্রকারভেদ (أقسام النسخ في القرآن)
- তেলাওয়াত ও বিধান উভয়টি মানসূখ হওয়া (نسخ التلاوة والحكم معًا): যেমন হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত দশবার দুধপানের কারণে মাহরাম হওয়ার আয়াত, যা পরবর্তীতে সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়।
- তেলাওয়াত বহাল রেখে বিধান মানসূখ হওয়া (نسخ الحكم وبقاء التلاوة): এটিই সর্বাধিক প্রচলিত। যেমন: বিধবা নারীর ক্ষেত্রে এক বছরের ভরণপোষণ সংক্রান্ত আয়াত (সূরা বাকারা: ২৪০), যা পরবর্তীতে চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালনের বিধান (সূরা বাকারা: ২৩৪) দ্বারা মানসূখ হয়েছে। কিবলার পরিবর্তনের আয়াতও এর অন্তর্ভুক্ত।
- বিধান বহাল রেখে তেলাওয়াত মানসূখ হওয়া (نسخ التلاوة وبقاء الحكم): যেমন বিবাহিত ব্যভিচারীর জন্য রজম (পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড)-এর আয়াত, যার তেলাওয়াত কোরআন থেকে রহিত হলেও শরয়ী বিধান কেয়ামত পর্যন্ত জারি রয়েছে।
٤. عرّف السورة- وكم قسما لها؟ اذكر خصائص السور المدنية ومزاياها مفصلا-
[৪. সূরার পরিচয় দাও। ইহা কত প্রকার? মাদানী সূরার বৈশিষ্ট্য ও বৈশিষ্ট্যাবলি বিস্তারিত আলোচনা কর।]
১. সূরার পরিচয় ও প্রকারভেদ
সংজ্ঞা: পবিত্র কোরআনের যে অংশে একটি স্বতন্ত্র নাম, প্রারম্ভ ও সমাপ্তিসীমা রয়েছে এবং যা কমপক্ষে তিনটি আয়াত দ্বারা গঠিত, তাকে ‘সূরা’ (السورة) বলে। কোরআনে মোট ১১৪টি সূরা রয়েছে।
প্রকারভেদ: হিজরতের ঐতিহাসিক মানদণ্ড অনুযায়ী কোরআনের সূরাসমূহ প্রধানত দুই প্রকার:
১. মাক্কী সূরা: হিজরতের পূর্বে মক্কায় নাজিলকৃত সূরা (সংখ্যা ৮৬টি)।
২. মাদানী সূরা: হিজরতের পরে মদিনায় কিংবা মক্কার বাইরে নাজিলকৃত সূরা (সংখ্যা ২৮টি)।
২. মাদানী সূরার বৈশিষ্ট্য ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত দিকসমূহ (خصائص السور المدنية)
- পারিবারিক, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের বর্ণনা: বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার (মিরাস), বিচার ব্যবস্থা, দণ্ডবিধি (হুদুদ ও কিসাস) ইত্যাদি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আইন কানুন বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে (যেমন সূরা বাকারা, নিসা, মায়িদা)।
- জিহাদ ও কিতালের বিধান: জিহাদের অনুমতি, যুদ্ধনীতি, গনীমতের মালের বণ্টন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির নিয়মাবলি মাদানী সূরায় বর্ণিত হয়েছে।
- মুনাফিকদের চরিত্র উন্মোচন: মদিনায় যে কপট মুনাফিক চক্রের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল, তাদের ষড়যন্ত্র, গোপন চক্রান্ত ও মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে (যেমন সূরা মুনাফিকুন, তাওবা)।
- আহলে কিতাবদের (ইহুদি ও খ্রিস্টান) সাথে বিতর্ক: আহলে কিতাবদের বিকৃত মানসিকতা, তাদের কিতাব বিকৃতি এবং তাদের ইসলামের দিকে আহ্বানের দলিলসমূহ আলোচনা করা হয়েছে।
- দীর্ঘ সূরা ও বিস্তারিত বিধিবিধান: মাদানী সূরা ও আয়াতগুলো তুলনামূলকভাবে বেশ দীর্ঘ, শান্ত ও বর্ণনামূলক শৈলীতে অবতীর্ণ।
- বিশেষ সম্বোধন: মাদানী সূরায় সাধারণ সম্বোধন হলো “يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا” (হে মুমিনগণ!), পক্ষান্তরে মাক্কী সূরায় ছিল “يَا أَيُّهَا النَّاسُ” (হে লোকসকল!)।
٥. ماذا تعلم عن التفسير والتأويل؟ ثم ألق الضوء على التفسير بالمأثور والتفسير بالرأى مفصلا-
[৫. তাফসীর ও তা’বীল সম্পর্কে কী জান? অতঃপর তাফসীর বিল মা’সুর এবং তাফসীর বির রায় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত কর।]
১. তাফসীর ও তা’বীল-এর পরিচয়
তাফসীর (التفسير): আভিধানিক অর্থ উন্মোচন করা বা স্পষ্ট করা। পরিভাষায়—কোরআনের শাব্দিক অর্থ, শানে নুযুল, বাক্যগঠন ও সুস্পষ্ট বাহ্যিক বিধান ব্যাখ্যা করাকে তাফসীর বলে।
তা’বীল (التأويل): আভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তিত হওয়া বা মর্মার্থ অনুসন্ধান করা। পরিভাষায়—কোরআনের আয়াতের অন্তর্নিহিত নিগূঢ় অর্থ ও রূপক তাৎপর্য দলিলের আলোকে উন্মোচন করাকে তা’বীল বলে।
২. তাফসীর বিল মা’সূর (التفسير بالمأثور)
সংজ্ঞা: যে তাফসীর কোরআনের আয়াত দ্বারা, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহীহ হাদিস দ্বারা, সাহাবায়ে কিরামের আসার এবং প্রবীণ তাবেঈদের ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়, তাকে তাফসীর বিল মা’সূর (বা তাফসীর বির রিওয়ায়াহ) বলে।
গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাবলী: এটি তাফসীরের সর্বাধিক প্রামাণ্য ও নিরাপদ পদ্ধতি। এর শীর্ষস্থানীয় গ্রন্থসমূহ:
– ইমাম তাবারীর ‘জামেউল বায়ান ফী তাবীলিল কোরআন’।
– আল্লামা ইবনে কাসীরের ‘তাফসীরুল কোরআনিল আযীম’।
– আল্লামা বাগাভীর ‘মাআলিমুত তানযীল’।
– আল্লামা সুয়ূতীর ‘আদ-দুররুল মানসূর’।
৩. তাফসীর বির রায় (التفسير بالرأي)
সংজ্ঞা: যে তাফসীরকারক কোরআন-হাদিসের মূলনীতি এবং আরবি ভাষা, ব্যাকরণ ও সাহিত্যের জ্ঞানের আলোকে স্বাধীন যুক্তি ও ইজতিহাদের মাধ্যমে কোরআনের ব্যাখ্যা প্রদান করেন, তাকে তাফসীর বির রায় (বা তাফসীর বিদ দিরায়া) বলে।
প্রকারভেদ:
১. প্রশংসনীয় তাফসীর (الرأي المحمود): যা শরীয়তের মূলনীতির অনুকূলে, বিশুদ্ধ আরবি ভাষার নিয়মে এবং যোগ্য আলেমের দ্বারা রচিত। যেমন: ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর ‘তাফসীরে কাবীর’, আল্লামা যামাখশারীর ‘কাশশাফ’, আল্লামা আলুসির ‘রূহুল মাআনী’।
২. নিন্দনীয় তাফসীর (الرأي المذموم): যা নিজের মনগড়া কুপ্রবৃত্তি, বিদআতী আকিদা বা ভাষাজ্ঞানহীন ব্যক্তির দ্বারা রচিত। রাসুল (সা.) বলেছেন: “مَنْ قَالَ فِي الْقُرْآنِ بِرَأْيِهِ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ” (যে ব্যক্তি কোরআনের ব্যাপারে মনগড়া ব্যাখ্যা দেয়, সে যেন জাহান্নামে তার স্থান বানিয়ে নেয়—তিরমিযী)।
٦. عرف إعجاز القرآن- ثم تكلم عن ثلاث أى القرآن يتجلى فيها الإعجاز العلمى-
[৬. ই’জাযুল কোরআনের সংজ্ঞা দাও। অতঃপর কোরআনের তিনটি আয়াত উল্লেখ কর যাতে বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্ব প্রকাশ পায়।]
১. ই’জাযুল কোরআন (إعجاز القرآن)-এর পরিচয়
আভিধানিক অর্থ: ‘ই’জায’ শব্দের অর্থ অক্ষম করা, পরাভূত করা বা অপারগ করে দেওয়া।
পারিভাষিক অর্থ: কোরআনুল কারীম ভাষা, সাহিত্য, সত্য ভবিষ্যদ্বাণী, নিখুঁত বিজ্ঞান এবং জীবন বিধানের দিক থেকে এমন এক অলৌকিক গ্রন্থ, যার সমকক্ষ একটি সূরা রচনা করতেও আরবের বাঘা বাঘা কবি-সাহিত্যিকসহ সমগ্র জিন ও মানবজাতি চিরতরে অক্ষম প্রমাণিত হয়েছে। এই অনুপম অলৌকিক বৈশিষ্ট্যকেই ‘ই’জাযুল কোরআন’ বলে।
২. আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে কোরআনের অলৌকিকত্ব (الإعجاز العلمي) প্রকাশের তিনটি আয়াত
- মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ (Big Bang ও মহাজাগতিক প্রসারণ):
সূরা আয-যারিয়াতের ৪৭ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: “وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ” (“আমি নিজ কুদরতে আকাশমণ্ডল নির্মাণ করেছি এবং অবশ্যই আমি একে ক্রমাগত সম্প্রসারিত করছি”)। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান (এডউইন হাবলের তত্ত্ব) বিংশ শতাব্দীতে প্রমাণ করেছে যে মহাবিশ্ব প্রতি মুহূর্তে বেলুনের মতো প্রসারিত হচ্ছে, যা চৌদ্দশত বছর পূর্বে কোরআনে ঘোষিত হয়েছিল।
- মানুষের ভ্রূণতত্ত্ব ও পর্যায়ক্রমিক বিকাশ (Embryology):
সূরা আল-মুমিনুনের ১২-১৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন: “ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ” (“অতঃপর আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি জমাট রক্তে (আলাকাহ), অতঃপর জমাট রক্তকে পিণ্ডাকারে (মুদগাহ), অতঃপর পিণ্ডকে পরিণত করি হাড়ে এবং হাড়কে মাংস দিয়ে আবৃত করি…”)। প্রখ্যাত কানাডিয়ান ভ্রূণতত্ত্ববিদ প্রফেসর কেইথ মুর কোরআনের এই স্তরবিন্যাস দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ঘোষণা করেন এটি কোনো মানুষের কথা হতে পারে না।
- মিষ্টি ও লোনা পানির মাঝে অদৃশ্য অন্তরায় (বিচ্ছিন্ন মহাসাগর):
সূরা আল-ফুরকানের ৫৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে: “وَهُوَ الَّذِي مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ هَذَا عَذْبٌ فُرَاتٌ وَهَذَا مِلْحٌ أُجَاجٌ وَجَعَلَ بَيْنَهُمَا بَرْزَخًا وَحِجْرًا مَحْجُورًا” (“তিনিই সমান্তরালে দুই সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন, একটি সুমিষ্ট এবং অন্যটি লোনা ও ক্ষারবিশিষ্ট; উভয়ের মাঝে রেখেছেন এক অন্তরায় ও অলঙ্ঘনীয় প্রতিবন্ধক”)। সমুদ্রবিজ্ঞানীরা সম্প্রতি জিব্রাল্টার প্রণালীতে দেখেছেন দুই সাগরের ঘনত্ব ও তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে তাদের মাঝে এক অলৌকিক অদৃশ্য প্রাচীর সৃষ্টি হয়ে থাকে।
٧. عرف عن خلفية جمع القرآن فى عهد أبى بكر الصديق رضى الله عنه، ثم بين خصائص هذا الجمع بالتفصيل-
[৭. হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর যুগে কোরআন সংকলনের ঐতিহাসিক পটভূমি এবং এ সংকলনের বৈশিষ্ট্যসমূহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা কর।]
১. আবু বকর (রা.)-এর যুগে কোরআন সংকলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর ভণ্ড নবী মুসায়লামা কাযযাবের বিরুদ্ধে পরিচালিত ১২ হিজরির ঐতিহাসিক ইয়ামামার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রায় সত্তরজন শীর্ষস্থানীয় হাফেজে কোরআন সাহাবী শাহাদাতবরণ করেন। এতে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) শঙ্কিত হয়ে খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)-এর দরবারে উপস্থিত হন এবং কোরআন বিলুপ্তির আশঙ্কায় তা এক খণ্ডে গ্রন্থাকারে সংকলন করার জোরালো প্রস্তাব দেন। প্রথমে আবু বকর (রা.) দ্বিধাবোধ করলেও পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর অন্তর খুলে দেন।
২. যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে সংকলন পদ্ধতি
খলিফা ওহী লেখক ও প্রখ্যাত হাফেজ হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে প্রধান করে সংকলন বোর্ড গঠন করেন। যায়েদ (রা.) কোরআনের আয়াত গ্রহণের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব কঠোর বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনুসরণ করেন:
– কেবল হাফেজের মুখস্থ থেকে নয়, বরং রাসুল (সা.)-এর সামনে লিখিত পাণ্ডুলিপি হতে হবে।
– প্রতিটি লিখিত আয়াতের স্বপক্ষে কমপক্ষে দুইজন বিশ্বস্ত সাহাবীর প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য থাকতে হবে যে এটি রাসুল (সা.)-এর সামনেই লেখা হয়েছিল।
৩. এই সংকলনের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص هذا الجمع)
- প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুসহাফ তৈরি: ছড়ানো-ছিটানো খেজুরের ডাল, চামড়া ও পাথর থেকে কোরআনকে সর্বপ্রথম চামড়ার এক সুসংহত পাণ্ডুলিপিতে (মুসহাফ) গ্রন্থভুক্ত করা হয়।
- সর্বসম্মত ইজমা: সকল সাহাবীর উপস্থিতিতে ও প্রত্যক্ষ অনুমোদনে এটি সংকলিত হয়েছিল।
- আয়াত ও সূরার ক্রম সংরক্ষণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) যেভাবে জিবরাইল (আ.)-এর নির্দেশে সূরার আয়াতসমূহ বিন্যস্ত করেছিলেন, ঠিক সেভাবেই সুবিন্যস্ত রাখা হয়।
- সাত হরফের কিরাআত বহাল থাকা: এ সংকলনে সাত উপভাষার (আহরুফে সাবআহ) সুযোগ বিদ্যমান ছিল।
- রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ: এই মূল কপিটি প্রথমে আবু বকর (রা.)-এর নিকট, পরে উমর (রা.)-এর নিকট এবং তাঁর শাহাদাতের পর উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা.)-এর হেফাজতে সংরক্ষিত ছিল।
٨. عرّف علم التجويد مع بيان أهميته- ثم تحدث عن أحكام النون الساكنة و التنوين ممثلا-
[৮. ইলমুত তাজবীদের পরিচয় ও গুরুত্ব আলোচনা কর। অতঃপর নূন সাকিন ও তানভীনের হুকুমসমূহ উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
১. ইলমুত তাজবীদের পরিচয় ও গুরুত্ব
আভিধানিক অর্থ: ‘তাজবীদ’ শব্দের অর্থ সুন্দর করা, নিখুঁত করা বা অলংকৃত করা।
পারিভাষিক অর্থ: প্রতিটি আরবি হরফকে তার সঠিক উচ্চারণস্থল (মাখরাজ) এবং অন্তর্নিহিত গুণাবলি (সিফাত—যেমন ইস্তিলা, কলকলা, হামস ইত্যাদি) অনুযায়ী বিশুদ্ধভাবে আদায় করে কোরআন তেলাওয়াত করার জ্ঞানকে ‘ইলমুত তাজবীদ’ বলে।
গুরুত্ব: তাজবীদের সাথে কোরআন পড়া ওয়াজিব। মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন: “وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا” (এবং কোরআনকে সুস্পষ্ট ও তারতীলের সাথে আবৃত্তি কর)। তাজবীদ না মেনে পড়লে লাহনে জলী (মারাত্মক ভুল) হয়ে অর্থ বিকৃত হতে পারে এবং নামাজ নষ্ট হতে পারে।
২. নূন সাকিন ও তানভীনের চার হুকুম (أحكام النون الساكنة والتنوين)
নূন সাকিন (نْ) এবং তানভীন (ــًــٍــٌ)-এর পর আরবি বর্ণমালার হরফ আসার ভিত্তিতে চারটি প্রধান বিধান প্রযোজ্য হয়:
- ১. ইযহার (الإظهار – স্পষ্ট করে পড়া): নূন সাকিন বা তানভীনের পর হুরুফে হলক্বী বা কণ্ঠনালীর ৬টি হরফের (ء، هـ، ع، ح، غ، خ) যেকোনো একটি আসলে গুন্নাহ ছাড়া স্বাভাবিক ও স্পষ্ট করে পড়তে হবে। যেমন: مَنْ آمَنَ، عَلِيمٌ حَكِيمٌ، يَنْهَوْنَ।
- ২. ইদগাম (الإدغام – মিলিয়ে বা যুক্ত করে পড়া): এর হরফ ৬টি, যা ‘ইয়ারমালূন’ (يرملون – ي، ر، م، ل، و، ن) শব্দে একত্রিত। এটি দুই প্রকার:
- ইদগামে বাগুন্নাহ (গুন্নাহসহ): ৪টি হরফ (ي، ن، م، و)। যেমন: مَنْ يَقُولُ، مِمَّاءٍ مَهِينٍ।
- ইদগামে বেলাগুন্নাহ (গুন্নাহ ছাড়া): ২টি হরফ (ل، ر)। যেমন: مِنْ رَبِّهِمْ، غَفُورٌ رَحِيمٌ।
- ৩. ইক্বলাব (الإقلاب – পরিবর্তন করে পড়া): নূন সাকিন বা তানভীনের পর কেবল একটি হরফ ‘বা’ (ب) আসলে সেই নূনকে একটি ছোট্ট ‘মীম’ (م) দ্বারা পরিবর্তন করে গুন্নাহর সাথে পড়তে হয়। যেমন: مِنْ بَعْدِ -> مِمْبَعْدِ، سَمِيعٌ بَصِيرٌ।
- ৪. ইখফা (الإخفاء – গোপন করে গুন্নাহ সহকারে পড়া): নূন সাকিন বা তানভীনের পর পূর্বোক্ত ১৩টি হরফ ছাড়া বাকি ১৫টি হরফের (ت، ث، ج، د، ذ، ز، س، ش، ص، ض، ط، ظ، ف، ق، ك) যেকোনো একটি আসলে নূনের আওয়াজকে নাকের বাঁশিতে লুকিয়ে গুন্নাহ সহকারে পড়তে হয়। যেমন: مِنْ قَبْلُ، كِتَابٌ كَرِيمٌ، أَنْفُسَكُمْ।
খ বিভাগ (القسم الثاني) – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (৯-১৬)
٩. عرف القرآن الكريم- ثم اذكر عدد السور المكية والمدنية-
[৯. আল-কোরআনের পরিচয় দাও। অতঃপর মাক্কী ও মাদানী সূরার সংখ্যা উল্লেখ কর।]
আল-কোরআনের পরিচয়: “هو كلام الله المعجز، المنزل على خاتم الأنبياء محمد صلى الله عليه وسلم بواسطة جبريل عليه السلام، المكتوب في المصاحف، المنقول إلينا بالتواتر، المتعبد بتلاوته” অর্থাৎ, “আল-কোরআন হলো মহান আল্লাহর মুজিযাপূর্ণ কালাম, যা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ, মুসহাফে লিখিত, কোনো প্রকার পরিবর্তন ছাড়া মুতাওয়াতির সনদে আমাদের নিকট পৌঁছেছে এবং যার তেলাওয়াত স্বয়ং ইবাদত।”
সূরার সংখ্যা: পবিত্র কোরআনে মোট ১১৪টি সূরার মধ্যে মাক্কী সূরা ৮৬টি এবং মাদানী সূরা ২৮টি।
١٠. بين فوائد نزول القرآن الكريم منجما-
[১০. ধাপে ধাপে (মুনাজ্জামান) কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার ফায়দা ও হিকমত বর্ণনা কর।]
- নবীজী (সা.)-এর হৃদয়কে সুদৃঢ় করা (تثبيت فؤاد النبي): মুশরিকদের নির্যাতন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বারবার ওহী এসে নবীজীকে সান্ত্বনা ও সাহস জোগাত।
- মুখস্থ ও ধারণের সহজতা (تيسير حفظه وفهمه): উম্মত নিরক্ষর ছিল, অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হওয়ার কারণে সাহাবীগণ সহজেই তা মুখস্থ ও অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে পারতেন।
- বিধানের পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন (التدرج في التشريع): মদ নিষিদ্ধকরণ, নামায-রোজা ইত্যাদি কঠিন বিধান একবারে চাপিয়ে না দিয়ে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হয়েছিল।
- সমসাময়িক ঘটনার তাৎক্ষণিক সমাধান (الإجابة عن الأسئلة): মানুষের উত্থাপিত প্রশ্ন ও দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান ওহীর মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে প্রদান করা হতো।
١١. اذكر أول ما نزل وآخر ما نزل من القرآن الكريم-
[১১. পবিত্র কোরআনের সর্বপ্রথম এবং সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত উল্লেখ কর।]
সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত: নবুওয়তের প্রারম্ভে রমযান মাসে হেরা গুহায় জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে অবতীর্ণ সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত:
“اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ… عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ” (সহীহ বুখারী)।
সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত: বিশুদ্ধ মতানুসারে রাসুল (সা.)-এর ওফাতের মাত্র নয় বা সাত দিন পূর্বে অবতীর্ণ সূরা আল-বাক্বারার ২৮১ নং আয়াত:
“وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ” (“আর তোমরা সেই দিনকে ভয় কর, যে দিন তোমাদের আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে নেওয়া হবে…”)।
١٢. ما الفرق بين التفسير والتأويل؟
[১২. তাফসীর ও তা’বীলের মধ্যে পার্থক্য কী?]
| বিষয় | তাফসীর (التفسير) | তা’বীল (التأويل) |
|---|---|---|
| ১. অর্থগত ক্ষেত্র | শব্দ ও আয়াতের সুস্পষ্ট বাহ্যিক অর্থ প্রকাশ করে। | আয়াতের অন্তর্নিহিত গূঢ় রূপক অর্থ ও রহস্য ব্যাখ্যা করে। |
| ২. নির্ভরতা | রেওয়ায়াত, নকল ও শানে নুযুলের ওপর বেশি নির্ভরশীল। | ইজতিহাদ, গভীর প্রজ্ঞা ও দিরায়া ভিত্তিক চিন্তার ওপর নির্ভরশীল। |
| ৩. নিশ্চয়তা | একক ও দ্ব্যর্থহীন অর্থ প্রদান করে। | কয়েকটি সম্ভাব্য অর্থের মধ্য থেকে প্রাধান্যযুক্ত অর্থ গ্রহণ করে। |
١٣. اذكر أهمّ أوصاف المفسرين وآدابه مختصرًا-
[১৩. মুফাসসিরের আবশ্যকীয় গুণাবলি ও আদব সংক্ষেপে লিখ।]
- ১. বিশুদ্ধ আকিদা ও ইখলাস: আকিদাগত বিদআত ও কুপ্রবৃত্তি থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা।
- ২. আরবি ভাষায় পূর্ণ পাণ্ডিত্য: নাহু, সরফ, লুগাত (অভিধান), ইশতিক্বাক্ব ও বালাগাত (অলংকারশাস্ত্র)-এ সর্বোচ্চ বুৎপত্তি থাকা।
- ৩. শরয়ী علوم-এ দক্ষতা: ইলমুল হাদিস, উসুলুল হাদিস, ফিকাহ, উসুলুল ফিকাহ এবং আসবাবুন নুযুল সম্পর্কে গভীর প্রজ্ঞা।
- ৪. নাসিখ ও মানসূখের জ্ঞান: কোন আয়াত কোন বিধানকে রহিত করেছে তা অকাট্যভাবে জানা।
- ৫. খোদাভীতি ও চারিত্রিক সততা: তাকওয়া ও খোদাভীতির সাথে কোরআনের ব্যাখ্যার আমানত রক্ষা করা।
١٤. اكتب مخارج الحروف التالية: الدال، الياء، الواو، الحاء-
[১৪. দাল, ইয়া, ওয়াও ও হা হরফের মাখরাজ লিখ।]
- দাল (د): জিহ্বার আগা যখন ওপরের সামনের দুটি দাঁতের গোড়ার সাথে মিলিত হয়, তখন ‘দাল’ (দাল, তা, তোয়া) উচ্চারিত হয়।
- ইয়া (ي) [গায়রে মাদ্দাহ]: জিহ্বার মধ্যভাগ যখন ওপরের তালুর সাথে মিলিত হয়, তখন ‘ইয়া’ (জীম, শীন, ইয়া) উচ্চারিত হয়।
- ওয়াও (و) [গায়রে মাদ্দাহ]: দুই ঠোঁট গোল করে সামনের দিকে ফাঁকা রেখে ‘ওয়াও’ উচ্চারিত হয়।
- হা (ح): কণ্ঠনালীর মধ্যভাগ (وسط الحلق) হতে স্পষ্ট শ্বাসের সাথে ‘হা’ উচ্চারিত হয়।
١٥. ما الترقيق والتفخيم؟ بين بالأمثلة-
[১৫. তারক্বীক ও তাফখীম কী? উদাহরণসহ বুঝিয়ে দাও।]
তাফখীম (التفخيم – মোটা বা ভারী করে পড়া): হরফ উচ্চারণের সময় মুখ ভরে ভারী ও উদাত্ত আওয়াজে পড়াকে তাফখীম বলে। হুরুফে মুস্তা’লিয়াহর ৭টি বর্ণ (خ، ص، ض، غ، ط، ق، ظ – খুসসা দাগতিন কিয) সর্বদা তাফখীম হয়। এছাড়া যবর ও পেশযুক্ত ‘র’ (ر) এবং ‘আল্লাহ’ শব্দের লামের পূর্বে যবর বা পেশ থাকলে তাফখীম হয়। যেমন: خَالِدِينَ، رَسُولُ اللهِ، قَالَ اللهُ।
তারক্বীক (الترقيق – পাতলা বা চিকন করে পড়া): হরফ উচ্চারণের সময় মুখ স্বাভাবিক রেখে পাতলা ও চিকন আওয়াজে পড়াকে তারক্বীক বলে। হুরুফে মুস্তাফিলার হরফসমূহ এবং যেরযুক্ত ‘র’ (ر) ও ‘আল্লাহ’ শব্দের পূর্বে যের থাকলে তারক্বীক হয়। যেমন: بِسْمِ اللهِ، رِزْقًا، كِتَابٌ।
١٦. اكتب من حفظك سورة مما يلى: (أ) سورة الأعلى؛ (ب) سورة الضحى؛ (ج) سورة الهمزة-
[১৬. সূরা আল-আ’লা, সূরা আদ-দুহা, অথবা সূরা আল-হুমাযাহ মুখস্থ লিখে তার শিক্ষণীয় বিষয় ব্যাখ্যা কর।]
(ب) سورة الضحى (সম্পূর্ণ সূরা পাঠ):
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
وَالضُّحَىٰ (١) وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَىٰ (٢) مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَىٰ (٣) وَلَلْآخِرَةُ خَيْرٌ لَّكَ مِنَ الْأُولَىٰ (٤) وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَىٰ (٥) أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَىٰ (٦) وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَىٰ (٧) وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَىٰ (٨) فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ (٩) وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ (١٠) وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ (١١)
শিক্ষণীয় ও মূল বক্তব্য: ওহী সাময়িক বন্ধ থাকায় কাফেররা উপহাস করেছিল যে মুহাম্মদের রব তাকে ত্যাগ করেছেন। তখন এ সূরায় আল্লাহ শপথ করে সান্ত্বনা দেন যে রব তাঁকে কখনো ত্যাগ করেননি। এ সূরায় এতিমদের প্রতি সদয় হওয়া, অভাবী ও প্রার্থীকে ধমক না দেওয়া এবং মহান আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও প্রচার করার চিরন্তন শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: উলূমুল কোরআনের প্রামাণ্য গ্রন্থ কোনটি?
উত্তর: ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) রচিত ‘আল-ইতকান ফী উলূমিল কোরআন’ এবং ইমাম যারকাশী রচিত ‘আল-বুরহান ফী উলূমিল কোরআন’ এ শাস্ত্রের অবিসংবাদিত প্রামাণ্য গ্রন্থ।
প্রশ্ন ২: ওহী অবতরণের সর্বাধিক কষ্টদায়ক রূপ কোনটি ছিল?
উত্তর: ঘণ্টার তীব্র ধ্বনির মতো (صلصلة الجرس) ওহী নাজিল হওয়া ছিল রাসুল (সা.)-এর জন্য সর্বাধিক ভারী ও কষ্টদায়ক পদ্ধতি।
প্রশ্ন ৩: কোরআনে নাসখ সংঘটিত হওয়ার অর্থ কী?
উত্তর: আল্লাহর হিকমত অনুযায়ী পরবর্তী কোনো শরয়ী দলিলের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কোনো সাময়িক বিধান পরিবর্তন বা রহিত করাকে নাসখ বলে।
প্রশ্ন ৪: তাফসীর বিল মা’সূর বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: কোরআনের আয়াত, রাসুল (সা.)-এর সহীহ হাদিস, সাহাবাদের আসার ও প্রবীণ তাবেঈদের বর্ণনার ভিত্তিতে যে তাফসীর করা হয় তাকে তাফসীর বিল মা’সূর বলে।
প্রশ্ন ৫: হযরত আবু বকর (রা.)-এর সংকলন বোর্ডের প্রধান কে ছিলেন?
উত্তর: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশিষ্ট ওহী লেখক হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) ছিলেন আবু বকর (রা.)-এর কোরআন সংকলন বোর্ডের প্রধান।
প্রশ্ন ৬: নূন সাকিন ও তানভীনের হুকুম কয়টি?
উত্তর: নূন সাকিন ও তানভীনের হুকুম মোট চারটি: ইযহার, ইদগাম, ইক্বলাব ও ইখফা।