জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

সুনান আত-তিরমিযী ও সুনান ইবনে মাজাহ (Sunan at-Tirmidhi & Ibn Majah) – ২০২২০৬, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩

Abswer.com Abswer.com
21 September, 2026
৫১ মিনিট পড়ার সময়
১০ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: সুনান আত-তিরমিযী ও সুনান ইবনে মাজাহ (Sunan at-Tirmidhi & Ibn Majah)
বিষয় কোড: ২০২২০৬
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা

ক বিভাগ (القسم الأول) – সুনানুত তিরমিযী (سنن الترمذي)

١. عن محمود بن لبيد عن رافع بن خديج قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: اسفروا بالفجر فإنه اعظم للأجر- قال أبو عيسى حديث رافع بن خديج حديث حسن صحيح-

[১. মাহমুদ ইবনে লাবীদ হতে বর্ণিত, তিনি রাফে ইবনে খাদীজ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি— “তোমরা ফজরকে ফর্সা করে পড়, কেননা এতে অধিক সওয়াব রয়েছে।” আবু ঈসা তিরমিযী (রহ.) বলেন: রাফে ইবনে খাদীজের হাদিসটি ‘হাসান সহীহ’।]

(أ) ফজরের নামাযের সর্বোত্তম সময় (أفضل وقت لصلاة الفجر)

ফজরের নামাযের সর্বোত্তম ওয়াক্ত নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে দুটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে:

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফী মাজহাব: হানাফী ফুকাহাগণের মতে ফজরের নামায ফর্সা করে (ইস্ফারে) পড়া মুস্তাহাব। অর্থাৎ পূর্বাকাশে যখন আলো ছড়িয়ে পড়ে এবং তীর নিক্ষেপের স্থান স্পষ্ট দেখা যায়, তখন দীর্ঘ কেরাত দিয়ে নামায শুরু করা এবং এমন সময়ে সালাম ফিরানো যেন কোনো কারণে নামায ফাসেদ হলে পুনরায় অজু করে সময়মতো সুন্নাত তরিকায় আদায় করা সম্ভব হয়। তাঁদের মূল দলিল হলো আলোচ্য সহীহ হাদিস: “أَسْفِرُوا بِالْفَجْرِ فَإِنَّهُ أَعْظَمُ لِلْأَجْرِ”
  • ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ (রহ.): জমহুর উলামাগণের মতে ফজর অন্ধকার থাকতে থাকতে (তাগলীসে) পড়া সর্বোত্তম। তাঁদের দলিল হলো হযরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা: রাসুল (সা.) ফজরের নামায এমন সময়ে শেষ করতেন যে নারীরা চাদর আবৃত করে ঘরে ফিরত অথচ অন্ধকারের কারণে তাদের চেনা যেত না (সহীহ বুখারী)।
  • সমন্বয়: হযরত শাহ ওলিউল্লাহ দেহলভী ও অন্যান্য গবেষক মুহাদ্দিসগণের মতে, একাকী আদায়কারীর জন্য তাগলীস বা অন্ধকারে পড়া উত্তম হলেও জামাতের উপস্থিতির সুবিধা ও সাধারণ মুসল্লিদের কল্যাণে ফর্সা করে পড়া অধিক সওয়াবের কারণ।

(ب) ইমাম তিরমিযীর ‘হাসান সহীহ’ (حسن صحيح) পরিভাষার ব্যাখ্যা

ইমাম আবু ঈসা আত-তিরমিযী তাঁর জামে গ্রন্থে কোনো কোনো হাদিসকে ‘হাদীসুন হাসানুন সহীহ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। বাহ্যিকভাবে হাসান ও সহীহ দুটি ভিন্ন স্তরের মান হওয়ায় মুহাদ্দিসগণ এর কয়েকটি সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন:

  1. একাধিক সনদের ক্ষেত্রে: হাদিসটির যদি দুটি সনদ থাকে, তবে একটি সনদের বিচারে হাদিসটি ‘হাসান’ এবং অপর সনদের বিচারে হাদিসটি ‘সহীহ’। ইমাম তিরমিযী সংক্ষেপে ‘হাসান সহীহ’ বলেছেন (আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানীর মত)।
  2. একক সনদের ক্ষেত্রে: হাদিসটির বর্ণনাকারীদের ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণের মতভেদ থাকলে, একদল মুহাদ্দিসের শর্তানুযায়ী তা সহীহ এবং অন্য দলের শর্তানুযায়ী তা হাসান।
  3. উচ্চমানের হাসান: হাদিসটি সাধারণ হাসানের চেয়ে অনেক উঁচুতে উন্নীত হয়ে সহীহর কাছাকাছি পৌঁছেছে।

٢. عن أبى قتادة (رض) قال ذكروا للنبى صلى الله عليه وسلم نومهم عن الصلاة فقال إنه ليس فى النوم تفريط إنما التفريط فى اليقظة فاذا نسى أحدكم صلاة أو نام عنها فليصلها إذا ذكرها-

[২. হযরত আবু কাতাদাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: সাহাবীগণ নবী করীম (সা.)-এর নিকট ঘুমিয়ে পড়ার কারণে নামায ছুটে যাওয়ার কথা উল্লেখ করলেন। তখন তিনি বললেন: “ঘুমের মধ্যে কোনো ত্রুটি বা অলসতা নেই, ত্রুটি তো জাগ্রত অবস্থায়। অতএব তোমাদের কেউ যদি নামাযের কথা ভুলে যায় অথবা ঘুমিয়ে থাকে, তবে সে যখনই স্মরণ করবে তখনই যেন তা আদায় করে নেয়।”]

(أ) সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময় জাগ্রত ব্যক্তির নামাযের হুকুম

যদি কোনো ব্যক্তি ফজরের নামায না পড়ে ঘুমিয়ে থাকে এবং ঠিক সূর্যোদয়ের মুহূর্তে জাগ্রত হয়, অথবা আসর না পড়ে সূর্যাস্তের সময় জাগ্রত হয়, তবে তার শরয়ী হুকুম হলো:

  • সূর্যোদয়ের সময়: হাদিসের স্পষ্ট নির্দেশ অনুযায়ী সূর্যোদয়ের সময় (যখন সূর্যের কিনার ওঠে) নামায পড়া মাকরূহে তাহরীমী। সুতরাং সে সূর্য পূর্ণভাবে উদিত হওয়া পর্যন্ত (প্রায় ১০-১৫ মিনিট) অপেক্ষা করবে এবং সূর্য এক বর্শা পরিমাণ ওপরে উঠলে তৎক্ষণাৎ ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত ও দুই রাকাত ফরজ কাজা আদায় করে নেবে।
  • সূর্যাস্তের সময়: যদি সেদিনের আসরের নামায এখনো না পড়ে থাকে, তবে সূর্য ডোবার পূর্বে হলেও আসরের ফরজ আদায় করে নিতে হবে (কারণ হাদিসে এসেছে: যে ব্যক্তি সূর্যাস্তের পূর্বে আসরের এক রাকাত পেল সে নামায পেল)। তবে অন্য কোনো নামাযের কাজা এ মাকরূহ ওয়াক্তে পড়া জায়েয নেই।

(ب) শব্দ বিশ্লেষণ (حلل الكلمات)

  • تفريط (তাফরীত্ব): বাবে তাফঈল (التفعيل)-এর মাসদার। মূল বর্ণ: ফ-র-ত্ব (ف-ر-ط)। অর্থ: অবহেলা করা, অলসতা করা বা দায়িত্বে অবহেলা প্রদর্শন করা।
  • نسي (নাসিয়া): ফে’লে মাযী, বাহাস ইসবাত ফে’লে মাযী মুতলক মারুফ। সীগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব। বাব: সামিআ-ইয়াসমাউ (سَمِعَ يَسْمَعُ)। মূল বর্ণ: নূন-সীন-ইয়া (ن-س-ي), নাকেসে ইয়ায়ী। অর্থ: সে ভুলে গেল।
  • صلاة (সালাত): ইসম বা বিশেষ্য। বহুবচন: সালাওয়াত (صلوات)। মূল বর্ণ: সোয়াদ-লাম-ওয়াও (ص-ل-و)। আভিধানিক অর্থ: দোয়া, তাসবীহ বা রহমত। পারিভাষিক অর্থ: বিশেষ আরকান ও আহকাম সম্বলিত নির্ধারিত ইবাদত বা নামায।

٣. عن أبى هريرة (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: الإمام ضامن والمؤذن مؤتمن- اللهم أرشد الأئمة واغفر للمؤذنين-

[৩. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন— “ইমাম হলেন যামিন (দায়িত্বশীল অভিভাবক) এবং মুয়াজ্জিন হলেন আমানতদার। হে আল্লাহ! তুমি ইমামদের সঠিক পথ প্রদর্শন কর এবং মুয়াজ্জিনদের ক্ষমা কর।”]

(أ) ইমামতের সর্বাধিক হকদার কে? (من هو أحق بالإمامة)

রাসুলুল্লাহ (সা.) সহীহ হাদিসে ইমামতের ক্রমিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছেন (সহীহ মুসলিম): “يَؤُمُّ الْقَوْمَ أَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ اللَّهِ…”। ফুকাহায়ে কিরামের মতে অগ্রাধিকারের ক্রম নিম্নরূপ:

  1. শরীয়ত ও নামাযের মাসআলা সম্পর্কে অধিক অভিজ্ঞ (الأعلم بالسنة): হানাফী মাজহাবের মতে যিনি নামাযের প্রয়োজনীয় আহকাম ও উসুল সর্বাধিক জানেন।
  2. বিশুদ্ধ ও সুন্দর কিরাআত পাঠকারী (الأقرأ لكتاب الله): যিনি কোরআন তাজবীদের সাথে শুদ্ধতম তেলাওয়াত করতে পারেন।
  3. অধিক মুত্তাকী ও পরহেজগার (الأكثر ورعا وتقوى): যিনি সন্দেহজনক বিষয় পরিহার করে চলেন।
  4. বয়সে প্রবীণ ব্যক্তি (الأسن): সমমানের যোগ্যতা থাকলে বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি প্রাধান্য পাবেন।
  5. উত্তম চরিত্র ও সুন্দর বংশমর্যাদার অধিকারী (الأحسن خلقا): যার আচার-আচরণ ও নৈতিক চরিত্র সমাজে সমাদৃত।

(ب) হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

  • নাম ও উপনাম: ইসলাম গ্রহণের পূর্বে নাম ছিল আবদুশ শামস। রাসুল (সা.) তাঁর নাম রাখেন আব্দুর রহমান। বিড়ালছানাকে ভালোবাসার কারণে নবীজী ভালোবেসে তাঁকে ‘আবু হুরায়রা’ (বিড়ালছানার পিতা) উপনাম দেন।
  • জন্ম ও ইসলাম গ্রহণ: তিনি ইয়েমেনের দাওস গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। ৭ম হিজরিতে খায়বার বিজয়ের বছর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
  • আসহাবে সুফফার জীবন ও হাদিস সংরক্ষণ: তিনি মসজিদে নববীর ‘সুফফা’ চত্বরে চরম দারিদ্র্য ও অনাহারে থেকে সার্বক্ষণিক নবীজীর সান্নিধ্যে কাটিয়েছেন। নবীজীর বিশেষ দোয়ায় তিনি অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী হন।
  • হাদিস বর্ণনার সম্রাট: তিনি সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী (৫,৩৭৪টি হাদিস)।
  • ওফাত: ৫৯ হিজরিতে প্রায় ৭৮ বছর বয়সে মদিনা মুনাওয়ারায় তিনি ইন্তেকাল করেন এবং জান্নাতুল বাক্বীতে সমাহিত হন।

٤. عن أبى هريرة (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إذا إشتد الحر فابردوا عن الصلاة فان شدة الحر من فيح جهنم-

[৪. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন— “যখন গরম তীব্র আকার ধারণ করে, তখন তোমরা গরম ঠাণ্ডা করে (বিলম্ব করে) নামায আদায় কর; কেননা তীব্র গরম জাহান্নামের নিঃশ্বাসের অংশ।”]

(أ) ‘ফাইহু জাহান্নাম’ (فيح جهنم)-এর ব্যাখ্যা ও নববী উদ্দেশ্য

‘ফাইহ’ (فيح) শব্দের অর্থ স্ফুলিঙ্গ, তীব্র উত্তাপ বা উদগীরণ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী “فَإِنَّ شِدَّةَ الْحَرِّ مِنْ فَيْحِ جَهَنَّمَ”-এর মর্মার্থ হলো:

  • হাকীকী অর্থ: সহীহ হাদিস অনুযায়ী জাহান্নাম আল্লাহর দরবারে অভিযোগ করেছিল যে তার একাংশ আরেকাংশকে গ্রাস করছে। তখন আল্লাহ তাকে বছরে দুটি নিঃশ্বাস ফেলার অনুমতি দেন—একটি শীতকালে তীব্র ঠাণ্ডা (যামহারীর) এবং অপরটি গ্রীষ্মকালে তীব্র তাপ (ফাইহ)। অতএব গ্রীষ্মের এই প্রচণ্ড উত্তাপ বাস্তবিকই জাহান্নামের নিঃশ্বাসের পার্থিব প্রভাব।
  • মাজাযী অর্থ: রূপক অর্থে এর দ্বারা তীব্রতার ভয়াবহতা বোঝানো হয়েছে, যা জাহান্নামের আযাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

(ب) তীব্র গরমে নামায বিলম্বিত (ইবরাদ) করার হিকমত

  1. খুশু-খুজু ও মনোযোগ রক্ষা: প্রচণ্ণ গরমে মানুষের শরীর ক্লান্ত ও অস্থির হয়ে পড়ে। গরম কমে ঠাণ্ডা হলে মন শান্ত থাকে এবং নামাযে পূর্ণ একাগ্রতা লাভ করা যায়।
  2. মুসল্লিদের কষ্ট লাঘব: ইসলাম সহজতার ধর্ম। মসজিদে দূর-দূরান্ত থেকে আগত মুসল্লিরা যেন প্রখর রোদে কষ্ট না পায়।
  3. জামাতে উপস্থিতি বৃদ্ধি: রোদ ও উত্তাপের তীব্রতা কমলে সাধারণ মানুষের পক্ষে মসজিদে জামাতে হাজির হওয়া সহজতর হয়।

٥. عن أبى هريرة (رضى) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إنما جعل الإمام ليوتم به فإذا كبر فكبروا وإذا قرأ فانصتوا وإذا قال غير المغضوب عليهم ولا الضالين- فقولوا أمين- وإذا ركع فاركعوا وإذا قال سمع الله لمن حمده فقولوا اللهم ربنا لك الحمد وإذا سجد فاسجدوا وإذا صلى جالسا فصلوا جلوسا اجمعين-

[৫. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন— “ইমাম তো এই জন্যই নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে তার পূর্ণ অনুসরণ করা হয়। অতএব সে যখন তাকবীর বলে তখন তোমরাও তাকবীর বল; যখন সে কিরাআত পড়ে তখন তোমরা নীরব থাক; যখন সে ‘গাইরিল মাগদূবি আলাইহিম ওয়ালাদ দোয়াল্লীন’ বলে তখন তোমরা ‘আমীন’ বল; যখন সে রুকু করে তখন রুকু কর; যখন সে ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামীদাহ’ বলে তখন বল ‘আল্লাহুম্মা রব্বানা লাকাল হামদ’; যখন সে সিজদা করে তখন সিজদা কর; আর সে যখন বসে নামায পড়ে তখন তোমরা সবাই বসে নামায আদায় কর।”]

(أ) ইমামের পেছনে কিরাআত পড়ার হুকুম ও ইমামগণের মতভেদ

  • ১. হানাফী মাজহাব: ইমামের পেছনে মুক্তাদির জন্য কোনো প্রকার কিরাআত (সূরা ফাতিহা বা অন্য সূরা) পড়া জায়েয নেই, বরং সম্পূর্ণ নিষেধ ও মাকরূহে তাহরীমী; চাই তা জাহরী (শব্দে পড়া) নামায হোক বা সিররী (নীরব) নামায হোক। তাঁদের অকাট্য দলিলসমূহ:
    • কোরআনের নির্দেশ: “وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا” (যখন কোরআন পাঠ করা হয় তখন মনোযোগ দিয়ে শোন এবং চুপ থাক—আ’রাফ: ২০৪)।
    • আলোচ্য হাদিস: “وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا” (যখন ইমাম কিরাআত পড়ে তখন তোমরা চুপ থাক)।
    • সহীহ হাদিস: “مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ فَقِرَاءَةُ الإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ” (যার ইমাম আছে, ইমামের কিরাআতই তার কিরাআত—ইবনে মাজাহ)।
  • ২. শাফেয়ী মাজহাব: ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে মুক্তাদিকে সকল নামাযে (জাহরী ও সিররী) অবশ্যই সূরা ফাতিহা পড়তে হবে। দলিল: “لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ”
  • ৩. মালেকী ও হাম্বলী মাজহাব: তাঁদের মতে সিররী নামাযে (যোহর ও আসর) মুক্তাদি সূরা ফাতিহা পড়বে, কিন্তু জাহরী নামাযে (ফজর, মাগরিব, এশা) ইমামের কিরাআত শুনবে এবং চুপ থাকবে।

(ب) শব্দ বিশ্লেষণ (حلل الكلمات)

  • جُعِلَ (জুঈলা): ফে’লে মাযী মাজহুল (কর্মবাচ্য)। সীগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব। বাব: ফাতাহা-ইয়াফতাহু (جَعَلَ يَجْعَلُ)। মূল বর্ণ: জীম-আইন-লাম (ج-ع-ل)। অর্থ: নির্ধারণ করা হয়েছে বা বানানো হয়েছে।
  • كَبِّرُوا (কাব্বিরূ): ফে’লে আমর হাযের মারুফ (আদেশসূচক)। সীগাহ জমা মুযাক্কার হাযের। বাব: তাফঈল (التفعيل)। মূল বর্ণ: কাফ-বা-রা (ك-ب-ر)। অর্থ: তোমরা তাকবীর বল (আল্লাহু আকবার বল)।
  • مَغْضُوب (মাগদূব): ইসমে মাফউল। সীগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার। বাব: দারাবা-ইয়াদরিবু (غَضِبَ يَغْضَبُ)। মূল বর্ণ: গইন-দোয়াদ-বা (غ-ض-ب)। অর্থ: যার ওপর গজব বা ক্রোধ অবতীর্ণ হয়েছে।

٦. عن أبى الحوراء، قال قال الحسن بن على علمنى رسول الله صلى الله عليه وسلم كلمات أقولهن فى الوتر اللهم إهدنا فيمن هديت وعافنى فيمن عافيت وتولنى فيمن توليت وبارك لى فيما أعطيت وقنى شر ما قضيت فانك تقضى ولا يقضى عليك وإنه لا يذل من واليت تبارك ربنا وتعاليت-

[৬. আবুল হাওরা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: হযরত হাসান ইবনে আলী (রা.) বলেছেন— আমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিতরের নামাযে পড়ার জন্য কয়েকটি বাক্য শিক্ষা দিয়েছেন: “হে আল্লাহ! তুমি যাদের হেদায়েত দান করেছ তাদের সাথে আমাকেও হেদায়েত কর; যাদের নিরাপত্তা দিয়েছ তাদের সাথে আমাকেও নিরাপত্তা দাও; যাদের দায়িত্বভার নিয়েছ তাদের সাথে আমারও অভিভাবক হও; তুমি আমাকে যা দান করেছ তাতে বরকত দাও; এবং তোমার নির্ধারিত অনিষ্ট হতে আমাকে রক্ষা কর; কেননা তুমিই চূড়ান্ত ফয়সালাকারী, তোমার ওপর কারো ফয়সালা চলে না; নিশ্চয় যাকে তুমি বন্ধু বানিয়েছ সে কখনো অপদস্থ হয় না। হে আমাদের রব! তুমি বরকতপূর্ণ ও সর্বোচ্চ মর্যাদাশালী।”]

(أ) কুনুতের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ এবং প্রকারভেদ

আভিধানিক অর্থ: ‘কুনুত’ (القنوت) শব্দের অর্থ বিনম্র আনুগত্য (الطاعة), নীরব থাকা (السكوت), দীর্ঘ দাঁড়িয়ে থাকা (طول القيام), এবং দোয়া করা (الدعاء)।

পারিভাষিক অর্থ: নামাযের বিশেষ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা ও বিশেষ প্রার্থনামূলক দোয়া পাঠ করাকে কুনুত বলে।

প্রকারভেদ: কুনুত প্রধানত দুই প্রকার:
১. কুনুতে বিতর (قنوت الوتر): যা প্রতিদিন বিতরের নামাযে নিয়মিত পাঠ করা হয় (হানাফী মাজহাবে এটি ওয়াজিব)।
২. কুনুতে নাযেলাহ (قنوت النوازل): মুসলিম উম্মাহর ওপর কোনো মহাবিপদ, যুদ্ধ বা বালা-মুসিবত আপতিত হলে ফজরের ফরজ নামাযে যে বিশেষ বদদোয়া ও সুরক্ষার দোয়া করা হয়।

(ب) কুনুত রুকুর পূর্বে না পরে? ইমামগণের মতভেদ

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফী মাজহাব: বিতরের নামাযে ৩য় রাকাতে কিরাআত সমাপ্ত করে রুকুর পূর্বে অতিরিক্ত তাকবীর বলে হাত বেঁধে দোয়ায়ে কুনুত পড়া ওয়াজিব। দলিল: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও অন্যান্য সাহাবীগণ থেকে প্রমাণিত যে রাসুল (সা.) রুকুর পূর্বেই কুনুত পড়তেন (সুনানে নাসাঈ ও বায়হাকী)।
  • ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ (রহ.): তাঁদের মতে বিতরের কুনুত এবং কুনুতে নাযেলাহ রুকুর পরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাত তুলে পাঠ করতে হবে। দলিল: হযরত আনাস (রা.)-এর রেওয়ায়াত যেখানে তিনি রুকুর পর কুনুত পড়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

খ বিভাগ (القسم الثاني) – সুনানু ইবনে মাজাহ (سنن ابن ماجه)

٧. عن أبى هريرة (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: فيما سقت السماء والعيون العشر وفيما سقى بالنضح نصف العشر-

[৭. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন— “বৃষ্টি ও ঝর্ণার পানিতে যা সিক্ত হয় তাতে এক-দশমাংশ (উশর বা ১০%) এবং সেচযন্ত্রের সাহায্যে যা সিক্ত হয় তাতে অর্ধ-উশর (৫%) যাকাত ওয়াজিব।”]

(أ) ফসল ও ফলের যাকাত বা উশরের পরিমাণ (مقدار صدقة الزرع والثمار)

ইসলামী শরীয়তে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও ফসলের যাকাতকে ‘উশর’ বলা হয়। জমিনের সেচ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে উশরের পরিমাণ দুই ভাগে বিভক্ত:

  1. প্রাকৃতিক সেচ (العشر – পূর্ণ এক-দশমাংশ বা ১০%): যে জমি চাষাবাদে কোনো প্রকার আর্থিক খরচ বা কায়িক সেচযন্ত্রের প্রয়োজন হয় না, বরং বৃষ্টির পানি, নদী, ঝর্ণা বা ভূগর্ভস্থ আর্দ্রতা দ্বারা ফসল ফলে, তাতে মোট উৎপাদনের দশভাগের একভাগ (১০%) যাকাত হিসেবে প্রদান করা ফরজ।
  2. কৃত্রিম সেচ (نصف العشر – অর্ধ-উশর বা ৫%): যে জমিতে টিউবওয়েল, সেচপাম্প, সেচযন্ত্র বা কূপ থেকে পানি তুলে অর্থ ও শ্রম ব্যয়ের মাধ্যমে সেচ দিতে হয়, তাতে মোট ফসলের বিশভাগের একভাগ (৫%) যাকাত দেওয়া ফরজ।

(ب) দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের গুরুত্ব (أهمية الزكاة في إزالة الفقر)

  • সম্পদের সুষম বণ্টন: যাকাত ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে সমাজের সম্পদ পুঞ্জীভূত হতে দেয় না।
  • দরিদ্রদের স্বাবলম্বীকরণ: যাকাতের অর্থ দিয়ে দরিদ্রদের এককালীন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে তাদের স্বাবলম্বী করা যায়।
  • সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: এতিম, বিধবা, পঙ্গু ও অক্ষম ব্যক্তিদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে।
  • অপরাধ ও শোষণমুক্ত সমাজ: ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মানুষকে অপরাধে জড়ায়; যাকাত ব্যবস্থা সমাজ থেকে চুরি, ডাকাতি ও অনৈতিকতা দূর করে সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।

٨. عن أبى سعيد الخدرى (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لا تحل الصدقة لغنى الا لخمسة لعامل عليها أو لغاز فى سبيل الله أو لغنى إشتراها بماله أو فقير تصدق عليه فاهداها لغنى أو غارم-

[৮. হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— “কোনো ধনীর জন্য সাদকা (যাকাত) হালাল নয়, কেবল পাঁচ ব্যক্তি ব্যতীত: ১. যাকাত আদায়ের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা, ২. আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধরত মুজাহিদ, ৩. ধনী ব্যক্তি যে নিজ অর্থ দিয়ে তা ক্রয় করে নিয়েছে, ৪. এমন কোনো মিসকীন যাকে সাদকা দেওয়া হয়েছিল অতঃপর সে তা কোনো ধনীকে উপহার দিয়েছে, এবং ৫. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি।”]

(أ) যাকাতের খাতসমূহ (مصارف الزكاة)

পবিত্র কোরআনের সূরা আত-তাওবার ৬০ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা যাকাত বণ্টনের আটটি খাত সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন:

  1. ফকীর (الفقراء): যার কাছে সামান্য কিছু আছে কিন্তু নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই।
  2. মিসকীন (المساكين): যে সম্পূর্ণ নিঃস্ব, যার কিছুই নেই।
  3. যাকাত কর্মকর্তা (العاملين عليها): রাষ্ট্র কর্তৃক যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনে নিয়োজিত কর্মচারী।
  4. মন জয় করার উদ্দেশ্যে (المؤلفة قلوبهم): ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য নবমুসলিম।
  5. দাসমুক্তি (في الرقاب): দাস-দাসী ও বন্দীদের মুক্তির জন্য।
  6. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (الغارمين): যে ব্যক্তি ঋণ পরিশোধে সম্পূর্ণ অক্ষম।
  7. আল্লাহর রাস্তায় (في سبيل الله): দ্বীন কায়েমের মুজাহিদ ও দ্বীনি জ্ঞানের অন্বেষণকারী।
  8. মুসাফির (ابن السبيل): সফরকালে নিঃস্ব হয়ে পড়া পর্যটক।

(ب) শব্দ বিশ্লেষণ (حلل الكلمات)

  • سبيل (সাবীল): একবচন বিশেষ্য। বহুবচন: সুবুল (سبل)। অর্থ: পথ, রাস্তা বা মাধ্যম। ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ অর্থ আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে।
  • فقير (ফকীর): সিফাতে মুশাব্বাহ। বহুবচন: ফুক্বারা (فقراء)। বাব: ফাকুরা-ইয়াফকুরু। অর্থ: অভাবগ্রস্ত, দরিদ্র ব্যক্তি।
  • غارم (গারিম): ইসমে ফায়েল। মূল বর্ণ: গইন-র-ম (غ-ر-م)। অর্থ: ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, যার ওপর দেনার বোঝা চেপে রয়েছে।

٩. عن نافع عن ابن عمر (رض) قال فرض رسول الله صلى الله عليه وسلم صدقة الفطر صاعا من شعير أو صاعا من تمر على كل حرّ أو عبد، ذكر أو أنثى من المسلمين-

[৯. নাফে হতে বর্ণিত, তিনি হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক স্বাধীন বা ক্রীতদাস, পুরুষ বা নারী মুসলিমের ওপর এক সা’ যব অথবা এক সা’ খেজুর সদকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন।”]

(أ) সদকাতুল ফিতরের পরিচয় ও শরয়ী হুকুম

পরিচয়: ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের পর অভাবী ও দরিদ্রদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং সিয়াম সাধনার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করতে যে নির্ধারিত দান আদায় করা হয় তাকে ‘সদকাতুল ফিতর’ বলে। রাসুল (সা.) বলেছেন: “طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ” (রোজাদারের অনর্থক কথাবার্তা ও অশ্লীলতা থেকে পবিত্রকারী এবং মিসকীনদের খাদ্যস্বরূপ—আবু দাউদ)।
শরয়ী হুকুম: জমহুর ইমামগণের মতে এটি ‘ফরজ’ এবং হানাফী মাজহাবের মতে এটি ‘ওয়াজিব’। ঈদুল ফিতরের দিন সকালে যার কাছে নেসাব পরিমাণ অতিরিক্ত সম্পদ থাকবে তার নিজের ও অধীনস্থদের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব।

(ب) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

  • পরিচয়: ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সুযোগ্য জ্যেষ্ঠ পুত্র। উপনাম আবু আব্দুর রহমান। শৈশবেই পিতার সাথে মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন।
  • সুন্নাহর নিখুঁত অনুসরণ: তিনি রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর অন্ধ অনুকরণে ইতিহাসে অনন্য ছিলেন। রাসুল (সা.) যে পথে হেঁটেছেন, যেখানে বসেছেন বা নামাজ পড়েছেন, তিনি হুবহু তা অনুসরণ করতেন।
  • ইলমি মর্যাদা ও হাদিস বর্ণনা: তিনি ফতোয়া ও হাদিস বর্ণনায় মুকসিরীন সাহাবীদের অন্যতম। তিনি রাসুল (সা.) থেকে ২,৬৩০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন (দ্বিতীয় সর্বোচ্চ)।
  • ওফাত: ৭৩ হিজরিতে ৮৪ বছর বয়সে মক্কায় ইন্তেকাল করেন।

١٠. عن زينب إمراءة عبد الله قالت: سألت رسول الله صلى الله عليه وسلم أيجزى عنى من الصدقة على زوجى وايتام فى حجرى؟ قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لها أجران أجر الصدقة وأجر القرابة-

[১০. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর স্ত্রী যায়নব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম— “আমার যাকাত কি আমার দরিদ্র স্বামী এবং আমার অভিভাবকত্বে থাকা এতিম শিশুদের প্রদান করলে আদায় হবে?” তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন: “তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব—একটি সাদকার সওয়াব এবং আরেকটি আত্মীয়তার হক আদায়ের সওয়াব।”]

(أ) স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার সম্পদ থেকে স্ত্রীর দান করার হুকুম

স্বামীর সম্পদ থেকে স্ত্রীর দান করার ব্যাপারে আলেমদের মতামত নিম্নরূপ:

  • প্রচলিত সাধারণ খাবার ও সামান্য দান: যে পরিবারে প্রচলিত রেওয়াজ রয়েছে যে স্ত্রী মেহমানকে আপ্যায়ন করবে বা সাধারণ খাদ্যশস্য দান করবে যাতে স্বামী অসন্তুষ্ট হয় না, তা স্বামীর সাধারণ অনুমতি বিবেচনা করে স্ত্রী দান করতে পারে এবং উভয়েই সওয়াব পাবে।
  • মূল্যবান সম্পদ ও অর্থ দান: স্বামীর স্পষ্ট অনুমতি ও সন্তুষ্টি ছাড়া তার বড় ধরনের অর্থ, গহনা বা মূল্যবান সম্পদ থেকে দান করা স্ত্রীর জন্য বৈধ নয়। কারণ হাদিসে এসেছে: “لَا تُنْفِقُ الْمَرْأَةُ شَيْئًا مِنْ بَيْتِهَا إِلَّا بِإِذْنِ زَوْجِهَا” (স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী তার ঘর থেকে কোনো কিছু খরচ করবে না—তিরমিযী)।

(ب) ‘দ্বিগুণ সওয়াব’ (لها أجران)-এর তাৎপর্য

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী “لَهَا أَجْرَانِ: أَجْرُ الصَّدَقَةِ وَأَجْرُ الْقَرَابَةِ” প্রমাণ করে যে, নিকটাত্মীয়দের সাদকা দেওয়া সাধারণ অপরিচিত ব্যক্তিকে সাদকা দেওয়ার চেয়ে বহুগুণ শ্রেষ্ঠ।
১. সাদকার সওয়াব: অভাবীর প্রয়োজন পূরণ ও আল্লাহর ফরজ বিধান আদায়ের নির্ধারিত সওয়াব।
২. আত্মীয়তার সওয়াব (صله رحمی): রক্তের সম্পর্ক রক্ষা এবং পরিবারের স্বজনকে সহযোগিতা করার জন্য অতিরিক্ত বিরাট সওয়াব।


গ বিভাগ (القسم الثالث) – গ্রন্থ ও গ্রন্থকার পরিচিতি

١١. عرف الجامع- ثم أذكر خصائص الجامع للإمام الترمذى ومكانته بين الكتب الستة مفصلا-

[১১. জামে গ্রন্থের সংজ্ঞা দাও। অতঃপর ইমাম তিরমিযীর জামে গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য এবং সিহাহ সিত্তার মধ্যে এর মর্যাদা বিস্তারিত আলোচনা কর।]

১. ‘আল-জামে’ (الجامع)-এর সংজ্ঞা

হাদিস পরিভাষায় ‘আল-জামে’ হলো এমন পূর্ণাঙ্গ হাদিস সংকলন, যাতে দ্বীনের আটটি মৌলিক বিষয়ের সবকটি অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত থাকে:
১. আকাইদ ও ঈমান, ২. আহকাম ও ফিকহ, ৩. সিয়ার ও তারিখ (ইতিহাস), ৪. আদাব ও আখলাক, ৫. তাফসীর, ৬. ফিতান (ভবিষ্যৎ বিপর্যয়), ৭. আশরাত বা কিয়ামতের আলামত, এবং ৮. মানাকিব ও ফজিলত। ইমাম তিরমিযীর গ্রন্থটি একটি আদর্শ জামে।

২. জামে আত-তিরমিযীর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ

  1. হাদিসের মান নির্ধারণ: প্রতিটি হাদিস উল্লেখ করার পর তিনি হাদিসের স্তর নিরূপণ করেছেন (যেমন: সহীহ, হাসান, হাসান সহীহ, বা গারীব)। এটি তিরমিযীর একক বৈশিষ্ট্য।
  2. ফুকাহায়ে কিরামের মতভেদ ও দলিল উল্লেখ: সাহাবা, তাবেঈ এবং ফুকাহায়ে আমসার (আবু হানিফা, শাফেয়ী, মালেক, আহমদ, সাওরী) কোন হাদিসের ওপর আমল করেছেন তা বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
  3. অন্যান্য সাহাবীর বর্ণনার প্রতি ইঙ্গিত (وفى الباب عن فلان): মূল হাদিসের বিষয়বস্তুতে আরও কোন কোন সাহাবী থেকে হাদিস বর্ণিত হয়েছে তা এক নজরে বলে দিয়েছেন।
  4. ইলমুল ইলাল ও রাবীদের দোষত্রুটি আলোচনা: কিতাবের শেষে ‘কিতাবুল ইলাল’ সংযোজন করে হাদিস যাচাইয়ের বৈজ্ঞানিক মূলনীতি দিয়েছেন।

৩. সিহাহ সিত্তার মাঝে তিরমিযীর মর্যাদা

সিহাহ সিত্তার মধ্যে সহীহাইন (বুখারী ও মুসলিম)-এর পরই সুনানে তিরমিযীর ফিকহি ও প্রায়োগিক মর্যাদা অনন্য। ইমাম তিরমিযী নিজেই বলেছেন: “যার ঘরে এই কিতাবটি রয়েছে, তার ঘরে যেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) অবস্থান করছেন এবং কথা বলছেন।”


١٢. تحدث عن ترجمة الإمام ابن ماجه- ثم بين منزلة كتابه ‘السنن’ بين الصحاح الستة، مع ذكر خصائص كتابه-

[১২. ইমাম ইবনে মাজাহ (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং সিহাহ সিত্তায় তাঁর সুনান গ্রন্থের মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।]

১. ইমাম ইবনে মাজাহ (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

  • নাম ও পরিচয়: আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মাজাহ আল-কাজবিনী। ২০৯ হিজরিতে বর্তমান ইরানের কাজবিন শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
  • জ্ঞানার্জন: তিনি হাদিস অন্বেষণে কুফা, বসরা, বাগদাদ, শাম, মিসর ও মক্কা-মদিনা পরিভ্রমণ করেন এবং আলী ইবনে মুহাম্মদ আত-তানাফিসী ও আবু বকর ইবনে আবি শায়বার মতো উস্তাদগণের সান্নিধ্য লাভ করেন।
  • ওফাত: ২৭৩ হিজরির ২২ রমযান তিনি কাজবিনে ইন্তেকাল করেন।

২. সুনানে ইবনে মাজাহর বৈশিষ্ট্যসমূহ

  1. চমৎকার ও নিখুঁত অধ্যায় বিন্যাস (حسن الترتيب والتبويب): অধ্যায় ও অনুচ্ছেদের এমন সুসংহত বিন্যাস অন্য কিতাবে বিরল। ফিকহি মাসআলা খোঁজার জন্য এটি অত্যন্ত সহজ।
  2. যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ (الزوائد): সিহাহ সিত্তার অপর পাঁচ গ্রন্থে নেই এমন শত শত অতিরিক্ত বিশুদ্ধ হাদিস এতে সংকলিত রয়েছে। এতে মোট ৪,৩৪৭টি হাদিস রয়েছে।
  3. পুনরাবৃত্তি বর্জন: একই হাদিসের অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি পরিহার করে সংক্ষেপে সংকলন করেছেন।

৩. সিহাহ সিত্তায় সুনানে ইবনে মাজাহর অন্তর্ভুক্তি ও মর্যাদা

ইমাম ইবনে তাহির মাকদিসী ও হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) সুনানে ইবনে মাজাহকে এর অসাধারণ বিন্যাস ও অতিরিক্ত হাদিসগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় ‘সিহাহ সিত্তা’ বা ষড়গ্রন্থের ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি দেন।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: হানাফী মাজহাবে ফজরের নামাযের সর্বোত্তম সময় কোনটি?

উত্তর: হানাফী মাজহাব মতে আকাশ ফর্সা করে (ইস্ফারে) দীর্ঘ কিরাআতের সাথে ফজরের নামায আদায় করা সর্বোত্তম ও মুস্তাহাব।

প্রশ্ন ২: ইমাম তিরমিযীর ‘হাসান সহীহ’ পরিভাষার অর্থ কী?

উত্তর: হাদিসটির একাধিক সনদ থাকলে এক সনদে হাসান ও অন্য সনদে সহীহ, অথবা কোনো মুহাদ্দিসের মতে সহীহ এবং অপরের মতে হাসান হওয়াকে তিনি ‘হাসান সহীহ’ বলেছেন।

প্রশ্ন ৩: হানাফী মাজহাবে ইমামের পেছনে কিরাআত পড়ার হুকুম কী?

উত্তর: হানাফী মাজহাব মতে জাহরী কিংবা সিররী কোনো নামাযেই মুক্তাদির জন্য সূরা ফাতিহা বা কিরাআত পাঠ করা বৈধ নয়, বরং সম্পূর্ণ নীরব থাকা ওয়াজিব।

প্রশ্ন ৪: উশর বলতে কী বোঝায় এবং এর পরিমাণ কত?

উত্তর: কৃষিজ ফসলের যাকাতকে উশর বলে। বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক পানিতে উৎপাদিত ফসলে ১০% (উশর) এবং সেচযন্ত্রের সাহায্যে উৎপাদিত ফসলে ৫% (অর্ধ-উশর) যাকাত দেওয়া ফরজ।

প্রশ্ন ৫: হাদিস সংকলনে ‘আল-জামে’ কিতাব কাকে বলে?

উত্তর: যে হাদিস গ্রন্থে আকাইদ, আহকাম, আদাব, তাফসীর, তারিখ, ফিতান, কিয়ামত ও মানাকিব—এই আটটি মৌলিক বিষয়ের হাদিস সন্নিবেশিত থাকে তাকে জামে বলে।

প্রশ্ন ৬: সুনানে ইবনে মাজাহর প্রধান সৌন্দর্য কী?

উত্তর: সুনানে ইবনে মাজাহর প্রধান সৌন্দর্য হলো এর চমৎকার অধ্যায় বিন্যাস (হুসনুত তারতীব) এবং সিহাহ সিত্তার অন্যান্য গ্রন্থে নেই এমন অতিরিক্ত বহু সহীহ হাদিস (যাওয়ায়েদ) ধারণ করা।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *